স্কুল ফর রবিনসন্স: ০৩. মন্টোগোমারি স্ট্রীটে তাঁর যে অট্টালিকা

স্কুল ফর রবিনসন্স: ০৩. মন্টোগোমারি স্ট্রীটে তাঁর যে অট্টালিকা

০৩. মন্টোগোমারি স্ট্রীটে তাঁর যে অট্টালিকা

মন্টোগোমারি স্ট্রীটে তাঁর যে অট্টালিকা, সেটা বিশালত্ব আর সৌন্দর্যের দিক থেকে যে-কোন রাজপ্রাসাদকেও হার মানাবে। বৈঠকখানায় ঢুকলেন কোল্ডেরুপ। ঘরে তখন পিয়ানো বাজছে। ঢুকেই মনে মনে বললেন, ওরা দুজনেই দেখছি আছে। ভালই হলো। যাই, খাঁজাঞ্চীকে ব্যাপারটা জানাই, তারপর ওদের সঙ্গে আলাপ করা যাবে।

অফিসে এসে স্পেনসার আইল্যান্ড কেনা সংক্রান্ত তুচ্ছ খবরটা কর্মচারীদের জানালেন তিনি। হাতব্যাগে কিছু দলিল আছে, সেগুলোয় স্ট্যাম্প সেঁটে সীলমোহর লাগিয়ে দিলেই দ্বীপটা তাঁর হয়ে যাবে। বাকি থাকবে শুধু দুচার লাইন লিখে ব্যাপারটা তাঁর দালালকে জানানো। অফিস থেকে যখন বেরুলেন, গোটা ব্যাপারটা মন থেকে তার আগেই ঝেড়ে ফেলে দিয়েছেন।

বৈঠকখানায় তখনও বসে আছে ওরা দুজন। মেয়েটি পিয়ানো বাজাচ্ছে। ছেলেটি সোফায় আধ-শোয়া অবস্থায়, চেহারায় কেমন একটা উদাস ভাব।

শুনছ ঠিকই, কিন্তু সুরটা কি ধরতে পারছ? মেয়েটি জিজ্ঞেস করল।

তাহলে বলেই ফেলি, ফিনা! বুড়ো রবিন গ্রে-র সুর এত ভাল আগে কখনও বাজাওনি তুমি।

না, গডফ্রে, হলো না! আমি সুখী মুহূর্ত বাজাচ্ছি!

ও, হ্যাঁ, তাই তো! দুঃখিত, এবার মনে পড়েছে। গডফ্রে সত্যি সত্যি অন্যমনস্ক হয়ে আছে।

কাতর দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকল ফিনা। গডফ্রে সাহস করে ওর দিকে তাকাচ্ছে না।

মেয়েটির নাম ফিনা হলানে। সে কোল্ডেরুপের পালিতা কন্যা। একেবারে সেই শিশুকাল থেকে কোল্ডেরুপই ওকে মানুষ করেছেন, লেখাপড়া শিখিয়েছেন। মাত্র যোলো বছর বয়েস ফিনার। রূপ-সৌন্দর্য অসাধারণ কিছু না হলেও, অবশ্যই রূপসী বলতে হবে। মেয়েটির বয়েস কম হলে কি হবে, সাংসারিক বুদ্ধি অত্যন্ত প্রখর। সেজন্যে মাঝে মধ্যে লোকে তাকে ভুল বোঝে, স্বার্থপর মনে করে। এই বয়েসের মেয়েরা স্বপ্ন দেখতে ভালবাসে, কিন্তু ফিনা ব্যতিক্রম। রাতে ঘুমের মধ্যে যদিও বা দুএকটা দেখে, দিবাস্বপ্ন কখনোই দেখে না। এই মুহূর্তে ফিনা ঘুমাচ্ছে না, এমন কি ঘুমাবার কোন ইচ্ছাও ওর নেই। গডফ্রে? ডাকল ও।

বলো।

জানো, তুমি এখন কোথায়?

তোমার কাছে, এই ঘরে…

না, গডফ্রে। তুমি এই ঘরে বা আমার কাছে, কোথাও নেই। তুমি অনেক দূরে চলে গেছ। কি, ঠিক বলিনি? উত্তরের অপেক্ষায় না থেকে পিয়ানোয় বিষণ্ণ একটা সুর তুলল মেয়েটা। ওর এই সুর কোল্ডেরুপের ভাগ্নে গডফ্রের কাছে কেমন যেন অচেনা আর দুর্বোধ্য লাগল।

গডফ্রের মা কোল্ডেরুপের বোন। ফিনার মত গডফ্রের মা-বাবাও সেই ছোটবেলাতেই মারা গেছেন। কোল্ডেরুপের খুব ইচ্ছে ভাগ্নের সঙ্গে ফিনার বিয়ে দেবেন।

গডফ্রে তেইশে পা দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরুবার পর অলস সময় কাটাচ্ছে সে। লেখাপড়া শিখে এক অর্থে নেই লাভ হয়নি, কারণ খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার জন্যে তাকে কোন কাজ করতে হবে না। ছেলে হিসেবে শান্ত ও ভদ্র সে। প্রখর উপস্থিত বুদ্ধি। আচরণে যেমন দেমাক বা অহঙ্কার নেই, পোশাকেআশাকেও তেমনি জাঁকজমক পছন্দ করে না। বিয়েটা হলে দুজনেই কোল্ডেরুপের কাছ থেকে বিপুল সম্পদ যৌতুক হিসেবে পাবে। পরস্পরকে ওরা ভালবাসে কিনা, সে প্রশ্ন এখানে অবান্তর, কারণ কোল্ডেরুপের কথার ওপর কথা বলবে এত সাহস কার? তিনি চান খুব শিগগির বিয়েটা দেবেন। আর এখানেই একটু ঝামেলা দেখা দিয়েছে।

গডফ্রে ভাবছে, বিয়ে করার বয়স এখনও তার হয়নি। বিবাহ একটি গুরুদায়িত্ব, তা কাঁধে নেয়ার মত যোগ্যতা এখনও সে অর্জন করেনি। তবে বিয়ের ব্যাপারে এখনও কেউ তার মতামত জানতে চায়নি। তা চাইলে অনেক কথাই বলার আছে তার। লেখাপড়া শেষ করার পর থেকে জীবনটা বড় একঘেয়ে লাগছে গডফ্রের। কিছু না চাইতেই সব পেয়ে যাওয়া যার ভাগ্য, জীবনটা তার কাছে বিরক্তিকর তো লাগবেই। সেই ছোটবেলা থেকে প্রবল আগ্রহ ছিল, বিশ্বভ্রমণে বেরুবে সে। অথচ সানফ্রান্সিসকো ছাড়া এখনও তার কিছু চেনা হলো না। দুনিয়াটা দুচারবার ঘুরে দেখতে অসুবিধে কি? কিন্তু সানফ্রান্সিসকো ছেড়ে দূরে কোথাও যাবার অনুমতি নেই তার। কাজেই দুধের সাধ ঘোলে মেটাবার চেষ্টা করছে সে, যেখানে যা পাওয়া যায় ভ্রমণকাহিনী পড়ছে। মার্কো পোলোর পিছু নিয়েছে, দেখে এসেছে কুবলাই খানের দরবার। ক্রিস্টোফার কলম্বাসের সঙ্গে থেকে আবিষ্কার করেছে আমেরিকা। ক্যাপটেন কুকের সঙ্গে প্রশান্ত মহাসাগরেও গেছে। আর গেছে অবাচিতে, দ্যুঁমো দুরবিয়র-এর সঙ্গে। গডফ্রের খুব ইচ্ছা, তাকে সঙ্গে না নিয়ে ভ্রমণকারীরা যে-সব দেশে গেছেন সেসব দেশে অন্তত একবার করে বেড়িয়ে আসবে সে। বিশ্বভ্রমণে বেরুলে ঝুঁকি নিতে হয়, জানে গডফ্রে, তা নিতে তার আপত্তিও নেই। নৌ-যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবে সে, জলদস্যুদের সঙ্গে লড়বে, জাহাজডুবির ঘটনা ঘটলে সাঁতার কেটে তীরে পৌঁছানোর চেষ্টা করবে। নির্জন কোন দ্বীপে কয়েক বছর একা কাটিয়ে দিতে হলেও রাজি সে, আলেকজান্ডার সেলকার্ক বা রবিনসন ক্রুসোর মত। হ্যাঁ, যে যাই বলুক, রবিনসন ক্রুসোই সে হতে চায়। ড্যানিয়েল ডিফো আর জোহান ওয়েস পড়ার পর এই ইচ্ছাটাই তার মধ্যে প্রবল হয়ে উঠেছে। অথচ ঠিক এই সময় মামা কিনা তার বিয়ে দেয়ার জন্যে উঠেপড়ে লেগেছেন!

ফিনা ওরফে ভাবী মিসেস গডফ্রে মরগানকে নিয়ে কি আর রবিনসন ক্রুসো হওয়া সম্ভব? যেতেই যদি হয়, একাই যেতে হবে তাকে, ফিনাকে সঙ্গে নেয়ার প্রশ্নই ওঠে না। স্ত্রীকে রেখে যাবার অনুমতি যদি না পায়, এখন তাহলে তার বিয়ে করা চলে না। কে না জানে যে বিয়ে মানেই শিকল। দুনিয়াটা একবার ঘুরে দেখে আসুক, তারপর বিয়ে হলে ক্ষতি কি?

এটাই গডফ্রের অন্যমনস্কতার কারণ। ফিনার কথা শুনে সোফা ছেড়ে পায়চারি শুরু করল সে। আর ঠিক তখনই ঘরে ঢুকলেন কোল্ডেরুপ। ঢুকেই বললেন, তাহলে এবার একটা তারিখ ঠিক করতে হয়। শুভ কাজে আমি দেরি করতে চাই না।

তারিখ? কিসের তারিখ, মামা? রীতিমত আঁতকে উঠল গডফ্রে।

কিসের তারিখ মানে? তোদের বিয়ের তারিখ! হেসে উঠে একটু রসিকতা করলেন কোল্ডেরুপ, নাকি ভেবেছিস আমার বিয়ের তারিখ ঠিক করতে বলছি?

বাবা, বিয়ের তারিখ পরে ঠিক কোরো। পিয়ানো ছেড়ে উঠে পড়ল ফিনা। তার আগে ঠিক করো, কবে যাওয়া হবে।

মানে?

কেন, বাবা, তুমি জানো না? বিয়ের আগে গডফ্রে বিশ্বভ্রমণে বেরুতে চায়।

কি? ঝট করে ভাগ্নের দিকে ফিরলেন কোল্ডেরুপ। তারপর হাত বাড়িয়ে এমন ভঙ্গিতে তার দিকে এগোলেন, যেন গডফ্রে পালাবার চেষ্টা করলেই খপ করে ধরে ফেলবেন। তুই বেড়াতে যাবি?

হ্যাঁ, মামা।

কতদিন বেড়াবি?

দেড় কি দুবছর, সব নির্ভর করবে…

সব কিসের ওপর নির্ভর করবে?

তুমি যদি আমাকে যাবার অনুমতি দাও, আর ফিনা আমার জন্যে অপেক্ষা করতে রাজি হয়।

ফিনা তোর জন্যে অপেক্ষা করবে? বিয়ের কথা শুনেই যে ছেলে পালিয়ে যেতে চায়, তার জন্যে অপেক্ষা?

বাবা, গডফ্রেকে তোমার যেতে দেয়াই উচিত, শান্ত গলায় বলল ফিনা। আমি অনেক চিন্তা-ভাবনা করে দেখেছি। আমার চেয়ে ওর বয়েস বেশি হলে কি হবে, দুনিয়াদারি সম্পর্কে ওর কোন অভিজ্ঞতা নেই, তাই ছেলেমানুষিও যায়নি। বেড়ালে পরিণত হবে ও। দুনিয়াটাকে দেখে আসতে চাইছে, আসুক না দেখে। সব দেখার পর যদি ফিরে আসতে মন চায়, আসবে–আমি তো থাকবই।

এ-সব কি বলছিস তুই! কোল্ডেরুপ হতভম্ব। খাঁচা খুলে পাখিটাকে ছেড়ে দিতে চাইছিস?

হ্যাঁ, মাত্র দুবছরের জন্যে।

এই দুবছর ওর জন্যে তুই অপেক্ষা করবি?

দুবছর যদি ধৈর্য ধরতে না পারি, তাহলে আর ওকে ভালবাসলাম কি! বলে আবার পিয়ানোয় গিয়ে বসল ফিনা।

কাঠ হয়ে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে গডফ্রে, তার মাথাটা ধরে আলোর দিকে ফেরালেন কোল্ডেরুপ, ভাগ্নের চেহারাটা অনেকক্ষণ ধরে খুঁটিয়ে দেখলেন। সত্যি তুই যেতে চাইছিস, গডফ্রে? সত্যি?

গডফ্রে নয়, পিয়ানো থেকে জবাব দিল ফিনা। হ্যাঁ, বাবা, সত্যি যেতে চাইছে ও।

এই তাহলে তোর মনের কথা? ফিনাকে বিয়ে করার আগে দুনিয়াটাকে একবার ঘুরে দেখবি? ঠিক আছে, যা। কিন্তু কোথায় যাবি ঠিক করেছিস?

ঠিক করার দরকার নেই, মামা। যেদিক দুচোখ যায় সেদিক যাব। যেদিকে মন চায় সেদিক যাব।

কবে যেতে চাস?

তুমি যদি আজ অনুমতি দাও তো আজই।

বেশ, বললেন কোল্ডেরুপ। ভাগ্নের দিকে অদ্ভুত এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন তিনি। হিস হিস করে আবার বললেন, তবে আজ নয়, কিছুদিন পর। যাবার আগে প্রস্তুতি দরকার। এগিয়ে এসে হঠাৎ পিয়ানোর চাবিতে এমনভাবে চাপ দিলেন, কর্কশ ও বেসুরো আর্তনাদ করে উঠল সেটা।

গল্পের বিষয়:
অনুবাদ
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত