দানবের শিষ্য

দানবের শিষ্য

সে অনেকদিন আগের কথা। এক ছিল বালক। তার নাম ছিল ম্যানুয়েল। তার পিতা-মাতা এতটাই গরিব ছিল যে, তারা তাকে বিদ্যালয়ে পাঠাতে পারতো না। তাই সে সারাদিন জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতো, খেলা করতো। সেই জঙ্গলে আবার বাস করতো একটা দানব। একদিন দানবটির সাথে তার দেখা হয়ে গেল। দানবটি সারাদিন একা থাকার কারণে খুব একাকীত্ব বোধ করতো। একারণে তার ম্যানুয়েলের মতো একটা সন্তানের খুব শখ ছিল। শিশু ম্যানুয়েলকে দেখামাত্রই সে ম্যানুয়েলকে ভালোবাসে ফেললো। তারপর থেকে তারা একসাথেই থাকতো। দানবটি ম্যানুয়েলকে তার সকল গোপন শিক্ষা দেওয়া শুরু করলো। সে তাকে বাতাস ও বৃষ্টির, বর্জপাত ও বিদ্যুতের গোপনীয় শিক্ষাগুলো দিতে থাকলো। সেই সঙ্গে তাকে সকল সৌন্দর্যের গুপ্ত শিক্ষাও দিল। পাখি ও সাপের ব্যাপারে গভীর শিক্ষা দিতেও ভুললো না দানবটি। এভাবেই ম্যানুয়েল বিদ্বান হয়ে উঠতে লাগলো। তার পিতা-মাতা তার ও তার মহান শিক্ষক “দানবের” উপর খুব খুশি ছিল।

এভাবেই দিন কেটে যাচ্ছিলো। এরপর একদিন রাজার এক পেয়াদা রাজকন্যার একটা বার্তা নিয়ে আসলো। বার্তাটা হলো, রাজার সুন্দরী কন্যা তাকেই বিয়ে করবে, যে তাকে এমন একটা ধাঁধা বলতে পারবে যার উত্তর সে কখনো জানতো না। রাজকুমারীকে পাবার জন্য রাজকুমাররা রাজকন্যার জানালায় এসে চুপিসারে ভালোবাসার গান করতো, কিন্তু তাদের রাজকুমারী একটুও পছন্দ করতো না। আসলে তারা সকলেই ছিল বোকা। রাজকন্যা এমন একজনকে বিয়ে করতে চাইতো যে তার চাইতে বুদ্ধিমান।

বার্তাবাহকের কথা শুনামাত্রই ম্যানুয়েল তার মা বাবাকে বললো– আমি রাজপ্রাসাদে যাচ্ছি রাজকন্যাকে ধাঁধাঁ ধরতে। আমি নিশ্চিত সে আমার প্রশ্নের উত্তর কল্পনাও করতে পারবে না।

কিন্তু ম্যানুয়েলের মা বলে উঠলো­– তুই নিঃসন্দেহে বুদ্ধিমান, কিন্তু সেখানে অনেক বিজ্ঞ ও সুদর্শন পুরুষ থাকবে রাজকন্যাকে ধাঁধা ধরার জন্য। তাই রাজকন্যা যে তোমার মত ছোকড়ার কথা শুনবে, তার কী নিশ্চয়তা আছে?

উত্তরে ম্যানুয়েল বলে উঠলো– আমি রাজকন্যাকে আমার কথা শুনতে বাধ্য করবো।

ম্যানোয়েলের বাবা বললো– তুই কি ধাঁধা ধরবি রাজকন্যাকে শুনি?

বাবার প্রশ্নের জবাবে ম্যানুয়েল বললো– আমি সেটা এখনও ঠিক করিনি। রাজপ্রাসাদে যাওয়ার পথে ঠিক করে নেবো। আমি এখনি সেখানে যাচ্ছি, তোমরা থাকো।

দয়াবান দানবটি ম্যানুয়েলকে দোয়া করলো, তার ভালোমতো ফিরে আসার জন্য শুভকামনা করলো। তার মা তার জন্য খাবারের ব্যবস্থা করে দিল, যাতে সে পথিমধ্যে খেতে পারে। তার পিতা দরজায় দাঁড়িয়ে প্রতিবেশীদের বলতে লাগলো, তার ছেলে রাজকন্যাকে বিবাহ করতে যাচ্ছে। ম্যানুয়েল তার পোষা কুকুরটাকে সাথে নিয়ে চলতে শুরু করলো, যাতে চলার পথে সে বিরক্ত বা একাকীত্ব বোধ না করে।

ম্যানুয়েল একের পর এক জঙ্গল পার হতে লাগলো। একসময় তার মায়ের দেওয়া সমস্ত খাবারও শেষ হয়ে এলো। তাই ম্যানুয়েল একটি শহর পার হবার সময় একটি রুটি কিনে নিলো খাবার জন্য। তারপর রুটিটি খাওয়ার জন্য জঙ্গলের ধারে বসলো। নিজে খাওয়ার আগে রুটিটার একটা টুকরো সে তার সঙ্গী কুকুরকে দিল। রুটির টুকরোটি খাওয়ার সাথে সাথে কুকুরটি মারা গেল। কারণ রুটিটি ছিল বিষাক্ত। যখন সে দাঁড়িয়ে তার সঙ্গী কুকুরের জন্য কান্না করছিল, তখন তিনটি বড় শকুন তার কুকুরের লাশটিকে খেয়ে নিল। কিন্তু লাশটি খাওয়ার সাথে সাথে তারাও মারা গেল ওই বিষের কারণে। কিছুক্ষণ পরেই ম্যানুয়েল জোরালো আওয়াজ শুনতে পেলো। দেখতে পেলো সাতজন ডাকাত তার দিকেই আসছে। ডাকাতদের কাছে প্রচুর অর্থ ছিলো।

তারা এসে পৌঁছালে তাদের দলনেতা বললো– আমি ভীষণ ক্ষুধার্ত তাই একটা বড় পাখি হলে মন্দ হয় না। ডাকাত দলের সকলে বাজপাখি তিনটি আনন্দের সাথে খেয়ে নিল। বিষক্রিয়ায় তারাও মারা গেল।

ম্যানুয়েল ভাবতে লাগলো, যেহেতু বাজপাখিগুলো আমার কুকুরকে খেয়েছে সেহেতু বাজপাখিগুলো আমার। আবার যেহেতু ডাকাতরা আমার পাখিগুলোকে খেয়েছে সেহেতু তারাও আমার আর তাদের টাকা-পয়সাও আমার। তারপর ম্যানুয়েল ডাকাতদের থেকে টাকা-পয়সা সব নিয়ে নিলো। এরপর ডাকাত সর্দারের সুন্দর পোশাক গায়ে চাপিয়ে ও ডাকাতের ঘোড়ার পিঠে চেপে সে রাজপ্রাসাদের দিকে রওনা দিল।

কিছু সময় পর সে ভীষণ পিপাসার্ত হয়ে উঠলো। সে তার ঘোড়াটিতে বেঁধে রেখে তার ঘাম পান করে নিজের পিপাসা নিবারণ করলো। খুব শীঘ্রই সে রাজপ্রাসাদে পৌঁছে গেল। ডাকাতদের থেকে নেওয়া পোশাক ও ঘোড়ার সৌন্দর্যের কারণে তাকে ভিতরে প্রবেশ করতে কোনো বাঁধা পেতে হলো না। একসময় তাকে রাজকন্যার সমানে ডাকা হলো তার ধাঁধাটি ধরার জন্য। রাজকন্যা তার চোখের দিকে তাকিয়ে তার সমস্ত গভীর জ্ঞানকে অনুভব করতে পারলো। সে বুঝতে পারলো, যুবকটি তাকে যে ধাঁধা ধরবে তা তার কাছে একদম নতুন হবে। প্রতিবেশী রাজ্যগুলো থেকে আসা সকল রাজকুমার ও সুদর্শন পুরুষেরাও সেখানে ছিল। কিন্তু তারা সবাই বোকা। তারা যে ধাঁধাই ধরতে লাগলো তার সবগুলোর উত্তরই রাজকন্যা দিয়ে দিল। অনেক সময় রাজকন্যা তো ধাঁধা শেষ করার আগেই উত্তর দিয়ে দিচ্ছিলো। তারপর ম্যানুয়েলের পালা এলো। ম্যানুয়েল রাজকন্যাতে যে ধাঁধাটি ধরলো সেটি হলো–

“আমি পকেট ভর্তি করে ঘর থেকে বের হলাম

তারপর দ্রুতই সেটি ফাঁকা হয়ে গেল

তারপর আবার পকেট ভর্তি হলো

আমি বাড়ি থেকে একটা সঙ্গী নিয়ে বের হয়েছিলাম

আমার ভর্তি পকেট আমার সঙ্গীকে মেরে ফেললো

আমার মৃত সঙ্গী আবার তিনজনকে মেরে ফেললো

সেই তিনজন আবার সাতজনকে মেরে ফেললো

সাতজনের মধ্য থেকে আমি সর্বোত্তমটিকে বেছে নিলাম

আমি এমন পানি খেলাম যেটা স্বর্গ থেকে আসেনি

এবং আমি দাঁড়িয়ে আছি

পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী রাজকুমারীর সামনে।”

রাজকন্যা ম্যানুয়েলের ধাঁধা ভালোভাবে শুনলো, তারপর পুনরায় শুনলো, কিন্তু তার ধাঁধার সঠিক উত্তর দিতে পারলো না। এমনকি রাজপ্রাসাদের কেউই এর সমাধান করতে পারলো না।

রাজা ম্যানুয়েলকে বললো– রাজকুমারী তোমার!

ম্যানুয়েল তার ধাঁধার সমাধান দিতেই সবাই অবাক হয়ে গেল। রাজকন্যা বললো­– নিশ্চয় নোসা সেনহোরা তোমাকে পাঠিয়েছে। আমি কখনোই কোনো গর্দভকে বিয়ে করতাম না।

গল্পের বিষয়:
অনুবাদ

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত