দেয়াল

দেয়াল

প্রতি শনিবার একটা করে নতুন পরিবার এখানে ছুটি কাটাতে আসে। এদের মধ্যে কেউ কেউ আসে খুব সকালে। তারা আসে দূরবর্তী কোনো জায়গা থেকে; তাদের উদ্দেশ্য একটাই– আনন্দময় কিছু সময় কাটানো। তবে সবাই যে সকাল সকাল এসে উপস্থিত হয় এমনটিও নয়। কেউ কেউ এসে পৌঁছায় সূর্য অস্ত যাবার পরে। তাদের দেরি করে পৌঁছাবার কারণও আছে। পথ ভুলে যাওয়া একটা প্রধান কারণ। এখানে আসতে গিয়ে অনেকেই পথ ভুলে যান। অবশ্য পথ চিনে এই জায়গাটাতে আসা খুব একটা সহজ কাজও নয়। তার উপর রাস্তায় যেসব পথনির্দেশক চিহ্ন আছে সেগুলো এতটাই অস্পষ্ট যে, পথ ভুল হতেই পারে।

সে যাই হোক, প্রতি শনিবারের মতো আজকেও একটি পরিবার আমাদের এখানে এসেছে। তারা এসেই আমাকে তাদের পরিচয় দিল। আমি বুঝতে পারলাম এদেরই আসার কথা ছিল। প্রথমেই আমি তাদের চারপাশটা ঘুরিয়ে দেখালাম। অবশ্য এই কাজটা সাধারণত আমি করি না, আমার মা করে থাকেন। তবে তিনি এখন বাড়িতে নেই। তিনি পাশের শহরে এক বৃদ্ধ লোকের দেখাশোনা করতে গেছেন। বৃদ্ধ লোকটিও এদের মতোই ছুটিতে ঘুরতে এসেছেন। তাই অগত্যা আমাকেই নতুন আগন্তুকদের সবকিছু বুঝিয়ে দিতে হচ্ছে।

প্রতিবারের মতো এবারও চারজন এসেছে। চারজনের সুখী পরিবার। মা, বাবা এবং তাদের দুটো বাচ্চা মেয়ে। তারা গাড়ি থেকে নেমে হাত-পা একটু ঝাড়া দিয়ে দৃষ্টি প্রসারিত করে চারদিকটা দেখে আমার কথামতো আমাকে অনুসরণ করলেন।

প্রথমেই আমরা বাড়িটির ছাউনি দেওয়া বারান্দার কাছে এসে থামলাম। সেখান থেকে সবুজ ঘাসে ভরা আঙিনার সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। বারান্দার উপরের অংশ তালপাতা দিয়ে ছাওয়া। তালপাতার ভিতর দিয়ে মৃদ্যু আলো এসে পড়ে। এককথায় জায়গাটা বেশ সুন্দর এবং দৃষ্টিনন্দন। বারান্দায় দুটো আরাম কেদারা আর সাদা কাপড়ে ঢাকা একটা সোফাও আছে। শুধু তাই নয়, সূর্যের মিষ্টি রোদ উপভোগের জন্য কতগুলো হেলানচেয়ারও সজ্জিত করা রয়েছে। এছাড়া বারান্দায় একটা বড় কাঠের টেবিল রয়েছে– যার চারপাশে বসে অনায়াশে দশ-বারোজন লোক জমিয়ে আড্ডা দিতে পারবে।

এরপর আমি তাদের দরজার স্লাইডিং গ্লাস সরিয়ে ভিতরটা দেখালাম। দরজা পেরুতেই একটা সুসজ্জিত বসার ঘর। ঘরটাতে একটা ফায়ারপ্লেস আছে, ঠিক তার সম্মুখে দুটো আরামদায়ক সোফা। এছাড়া বাড়িটিতে আছে একটা গোছালো রান্নাঘর এবং দুটো ছিমছাম শোবার ঘর। তাদেরকে শোবার ঘর দেখাবার পর তারা বাইরে আসলেন। বাবাটি তাদের গাড়ি থেকে মালামাল নিচে নামালেন। মেয়ে দুটোও গাড়ি থেকে নামলো। তাদের একজনের বয়স সাত, আরেকজনের নয় বছর হবে হয়তো। তারা নামতেই গাড়ির দরজা বন্ধ করে দিলেন লোকটি। আমি মেয়ে দুটোর মাকে টুকিটাকি কিছু বিষয় জানিয়ে দিলাম। কোথায় তোয়ালে আর কম্বল আছে সেটা জানালাম। কম্বল রাতের বেলায় অতি প্রয়োজনীয় এখানে, কেননা রাতের বেলা বেশ ঠান্ডা পড়ে।

এগুলো বাদেও তাকে ইঁদুরের বিষয়ে সতর্ক করলাম। ইঁদুরের উৎপাত বছরজুড়েই থাকে। তাই কোথায় ইঁদুর মারার বিষ রাখা আছে সেটাও জানিয়ে দিলাম। তাছাড়া ঘুমাতে যাবার আগে মাছি মারার বিষয়টাও তাকে সতর্ক করে রাখলাম। কেননা তারা যদি মাছি না মেরে ঘুমিয়ে পড়ে তাহলে দেখা যাবে সকাল পর্যন্ত তাদেরকে বিরক্তিকর ভোঁ-ভোঁ শব্দ শুনতে হচ্ছে। কীভাবে পার্শ্ববর্তী সুপার মার্কেটে যাওয়া যায়, কীভাবে বাড়ির পিছনের ওয়াশিং মেশিন চালাতে হয়, কোথায় কাপড় কাচার পর জামাকাপড় শুকাতে দিতে হয় সবকিছুই তাকে জানিয়ে রাখলাম।

এখানে পাশের ক্ষেতে যে লেটুস ও টমেটো আছে এগুলো যে কোনো অতিথিরা তুলে খেতে পারে। মা-টিকে আমি একথাটা বলতেও ভুললাম না। এ বছর প্রচুর টমেটো হয়েছিল, তবে দুর্ভাগ্যবশত জুলাইয়ের বৃষ্টিতে বেশিরভাগই নষ্ট হয়ে গেছে।

এরকম খুঁটিনাটি সব বিষয় তাদেরকে বুঝিয়ে আমি আমার নিজের কাজে চলে গেলাম। আমি আমার ঘরের কাজকর্ম ও বাগানে পানি দেওয়ায় মনোনিবেশ করলাম। আমি এমন ভাব করতে চাইলাম যেন আমি তাদের দিকে লক্ষ করছি না। আমি আমার কাজকর্মেই মগ্ন হয়ে আছি এমন একটা ভান করলাম। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে চুপিসারে তাদের দিকে খেয়াল করতে লাগলাম। আমি দেখলাম তারা এখানে আসতে পেরে বেশ খোশ মেজাজে আছে। জায়গাটা সম্পর্কে তারা খুব উৎসাহী। সবুজ আঙিনায় মেয়ে দুটোর দৌড়ঝাঁপ এবং তাদের কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম আমি। এমনকি কিছুক্ষণের মধ্যে তাদের নামও জেনে ফেললাম। যেহেতু এখানে যেসব অতিথিরা আসেন, তাদের বেশিরভাগই কাঁচের দরজা খোলা রেখেই একে অন্যের সাথে খোশগল্প করে, তাই তারা যখন ঘরের ভিতরে তাদের জিনিসপত্র গোছগাছ করছিল আমি তাদের কথা স্পষ্টভাবেই শুনতে পারছিলাম। তারা দুপুরের খাবারের সময় কী খাবে, তাদের পরিকল্পনা কী– সে সম্পর্কেও তাদের কথাবার্তা শুনে আমি কিছুটা আঁচ করতে পারলাম।

আমাদের কুটিরটি সুসজ্জিত বাড়িটা থেকে কয়েক গজ দূরে। অনেক বছর ধরে আমরা এককক্ষবিশিষ্ট এই কুটিরেই বসবাস করতাম। কক্ষের ভিতরেই আমাদের রান্নার ব্যবস্থা হত। এছাড়া আমাদের তিনজনের জন্য তিনটি বিছানাও পাতা ছিল কক্ষটিতে। দু’বছর আগে আমার বয়স যখন তেরো বছর হলো, তখন আমার মা বৃদ্ধ আগন্তুকদের দেখাশোনার কাজ শুরু করলেন। মূলত কিছু বাড়তি আয়ের জন্য মাকে এটা শুরু করতে হয়েছে। তাছাড়া কোন পথও ছিল না আমাদের হাতে। সে সময় আমার বাবা-মা জায়গাটার মালিককে বললেন, সে যেন আমার জন্য আরেকটা ছোট্ট কক্ষ বাড়িয়ে দেন। তিনি আমার জন্য ছোট একটা খোপ বাড়িয়ে দিলেন।

আমার বাবা পর্যটকদের জন্য নির্মিত বিশাল বাড়িটার দেখভাল করেন। এছাড়া তাকে আরও কিছু কাজ করতে হয়– এই যেমন কাঠ কাটা, মাঠে কাজ করা, আঙুরক্ষেতের দেখাশোনা করা। পাশাপাশি মালিকের পছন্দের ঘোড়াগুলোর পরিচর্যা করা তার নিত্যনৈমিত্তিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।

এই জায়গাটির মালিক অন্য এক স্থানে থাকেন, তার মানে এমন না যে তিনি বহিরাগত। তিনি মাঝে মাঝেই খোঁজখবর নিতে আসেন। তিনি অনেকটা ভবঘুরে টাইপের। তার কোনো পরিবার নেই। দিনের বেলায় তিনি ঘোড়ার পিঠে করে ঘুরে বেড়ান, আর সন্ধ্যায় বাড়ির ফায়ারপ্লেসের সামনে আয়েশে বসে বই পড়েন। এরপর হুট করেই তিনি আবার চলে যান।

গ্রীষ্মের সময় ছাড়া তার সুসজ্জিত বাড়িটা কেউ তেমন ভাড়া নেয় না, কেননা শীতকাল এখানে খুব তিক্ত প্রকৃতির। হাড় কাঁপানো শীত পড়ে এখানে। বসন্তকালটাও সুবিধের না– প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। সেপ্টেম্বর থেকে জুন পর্যন্ত আমার বাবা আমাকে গাড়িতে করে স্কুলে নিয়ে যান। স্কুলটাকে আমার ভিনজগত মনে হয়। আমি সেখানে অন্যদের সাথে তেমন মিশি না, আমি দেখতে ওখানকার আর কারো মতো নই, এটা একটা কারণ।

ওসব কথা থাক, সেই মেয়ে দুটোর কথায় আসি। মেয়ে দুটোর চেহারায় দিকে ভালো করে লক্ষ করে আগেই দেখেছি– তাদের চেহারায় অনেক মিল। এতটা মিল যে তুমি কাউকে না জিজ্ঞাসা করেই বলে দিতে পারবে তারা একে অপরের বোন। পরে অবশ্য এটা একদম নিশ্চিত হওয়া গেল, তারা একই পোশাক পরে সমুদ্রে সাঁতার কাটার জন্য বের হলে। সমুদ্র সৈকতটা এখান থেকে পনেরো মাইল দূরে।

মা-টি দেখতেও মেয়ে দুটোর মতোই। তিনি দেখতে হালকা-পাতলা গড়নের, সরু কাঁধ। খোলা চুলে থাকতেই তিনি পছন্দ করেন। কিছুক্ষণ আগে তিনি বাচ্চাদের মতো খালি পায়ে সবুজ ঘাসের উপর হাঁটতে বের হয়েছিলেন। বাবাটি তাকে বললেন, এখানে সজারু থাকতে পারে, সাপ থাকতে পারে, খালি পায়ে হেঁটো না। তার সেদিকে নজরই নেই। তিনি উচ্ছ্বসিত মনে ঘাসের উপর হাঁটা উপভোগ করতে লাগলেন।

কয়েক ঘন্টা পরে বিষয়টা এমন হয়ে গেল যে, তারা অনেকদিন ধরে এখানেই বসবাস করছেন। তারা এক সপ্তাহের ছুটি কাটানোর জন্য যা যা নিয়ে এসেছিল সবকিছু চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ফেললেন: বই, ম্যাগাজিন, ল্যাপটপ, খেলার পুতুল, হুডি জ্যাকেট, রঙ পেন্সিল, কাগজের প্যাড, চটি জুতো, সানস্ক্রিন সবকিছু দিয়ে তারা বাড়িটাকে সাজিয়ে তুললেন। দেখলে মনে হবে, এ যেন তাদেরই বাড়ি। আমি যতবার তাদের দিকে তাকালাম, দেখলাম তাদের ভিতর কেউ না কেউ একজন গ্লাস উপুড় করে টেবিলে রাখছে। আমি তাদের কথাবার্তার মৃদু স্বর, কফির কেতলির শব্দ, কফির ঘ্রাণ, সিগারেটের ধোয়া অনিচ্ছা সত্ত্বেও বুঝতে পারলাম।

দুপুরের খাবারে পর, বাবাটি মেয়ে দুটোর একজনকে তার চশমাটা আনতে বললেন। অনেক সময় ধরে, তিনি একটি রাস্তার ম্যাপ পর্যবেক্ষণ করলেন। তিনি ঘোরার জন্য আশেপাশের ছোট শহরগুলোর প্রত্নতাত্ত্বিক জায়গার একটা তালিকা তৈরি করলেন। মা-টি এতে একদমই আগ্রহ দেখালেন না। তিনি বললেন, বছরের এই সময়টাই সে সকল ঝামেলা থেকে মুক্ত থাকে, তাই ওসব প্রত্নতাত্ত্বিক জিনিস দেখার চেয়ে তার একটু বিশ্রামের বেশি প্রয়োজন।

কিছুক্ষণ পরে বাবাটি তার মেয়েদের নিয়ে সমুদ্রে গেলেন। যাবার পূর্বে তারা আমার কাছে জানতে চাইলো, সমুদ্র সৈকতে যেতে তাদের কত সময় লাগবে, সবচেয়ে ভালো সৈকত কোনটি? আমি তাদের বললাম। তারা আবহাওয়ার ব্যাপারেও আমাকে প্রশ্ন করলেন। আমি তাদের জানালাম, একটা দাবদাহ ধেয়ে আসছে বলে শুনেছি।

মা-টি অবশ্য কোথাও গেলেন না। বাড়িতেই থাকলেন। তিনি গোসল করার পোশাক পরেই সূর্যালোক উপভোগ করতে লাগলেন। তিনি একটা হেলান চেয়ারে শুয়ে পড়লেন। আমি ভেবেছিলাম তিনি হয়তো ঘুমিয়ে পড়বেন। কিন্তু আমি যখন জামাকাপড় কেচে শুকাতে দিতে গেলাম, দেখলাম তিনি কিছু একটা লিখছেন। তিনি তার উরুর উপর ছোট নোটবুকে কলম দিয়ে কী যেন লিখছেন। ঠিক কী বিষয়ে লিখছেন তা অবশ্য বুঝতে পারলাম না।

মাঝে মাঝে তিনি তার মাথাটা উঁচু করে চারিদিকে চোখ বুলাচ্ছেন। তিনি চারপাশের তৃণিভূমি, পাহাড়, বনাঞ্চলের দিকে তাকিয়ে থাকলেন একদৃষ্টিতে। নীলচে আকাশ, হলুদ খড়, বাড়িটির সীমানার বেড়া, নিচু পাথরের দেয়াল– আমি প্রতিদিন যা দেখি, তিনি সবকিছুই ভালোমতো পর্যবেক্ষণ করতে লাগলেন। কিন্তু অবাক হলাম এই ভেবে যে, এর মধ্যে তিনি নতুন কী খুঁজছেন! এ তো সাদামাটা দৃশ্য ছাড়া কিছু নয়। এসবের দিকে এমনভাবে তাকিয়ে থাকারই বা কী আছে!

সূর্যাস্তের পূর্বেই মেয়ে দুটো আর বাবা ফিরে আসলেন। তারা সকলে সুয়েটার আর লম্বা প্যান্ট পরিধান করলেন যাতে মশা তাদের কামড়াতে না পারে।

মেয়ে দুটো তাদের মাকে তাদের ঘুরাঘুরির কথা বলতে লাগলো। উত্তপ্ত বালুরাশির কথা, অস্বচ্ছ জলের কথা, সুন্দর কিন্তু উচ্ছৃঙ্খল ঢেউয়ের কথা তারা মাকে বলল। তারপর পুরো পরিবারটি একটু হাঁটতে বের হলো। তারা আস্তাবলের দিকে গেল ঘোড়া দেখতে। আস্তাবলের পেছনের খোয়াড়ের গাধা আর বুনো শূকরটাকে দেখতেও ভুললো না। তারপর বাড়ির সামনের রাস্তা আটকে দেওয়া মেষপাল দেখতে এগিয়ে গেল তারা।

বাবাটি তার মুঠোফোন দিয়ে ছবি তুলতে লাগলো। তিনি মেয়ে দুটোকে ছোট বরই গাছ, ডুমুর গাছ আর জলপাই গাছ দেখালেন। তিনি বললেন, সরাসরি গাছ থেকে তুলে আনা ফল খেতে বেশি সুস্বাদু হয় কারণ এগুলো সূর্যের ঘ্রাণ নেয়, গ্রামাঞ্চলের ঘ্রাণ নেয়– ফলগুলোতে সেই ঘ্রাণ লেগে থাকে।

তার কিছুক্ষণ পর বারান্দায় বসে বাবা-মা দুজনে একটা ওয়াইনের বোতল খুললো। তারা কিছু পনির আর এখানকার মধু’র স্বাদ নিল। তারা জায়গাটার তারিফ করতে থাকলো– এখানকার সূর্য, মেঘ, অক্টোবরের ডালিম ফলের রঙ সবই তাদের ভালো লেগেছে।

তারপর সন্ধ্যা নেমে আসে। তারা ব্যাঙ, ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ শুনতে পায়। বাতাসের শো-শো শব্দও তাদের কানে আসে। বায়ুপ্রবাহ সত্ত্বেও তারা ঘরের বাইরে উন্মুক্ত পরিবেশে খাবার খাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

আমি আর আমার বাবা নীরবে-নিভৃতে ছোট কুটিরের ভিতরেই খাই। বাবা যখন খাবার খান তখন কখনোই তিনি চোখ তুলে তাকান না। মা বাইরে থাকলে রাতের খাবারের সময় আমাদের মধ্যে কোনো কথাবার্তাও হয় না সাধারণত। খাবার সময় তিনি শুধুমাত্র মায়ের সাথেই কথা বলেন।

আমার মাও এখানকার কেউ নন। আমার বাবার মতোও তিনি বহুদূর থেকে এখানে এসেছেন। এমন নিস্তব্ধ পরিবেশে বসবাস করতে তার ভালো লাগে না। তার মতে, এখানকার লোকজনের মতিগতি ভালো নয়, সবাই অন্ধ গোছের– দেখেও কিছু দেখে না।

মায়ের অভিযোগ আমি তেমন অনুভব করি না। এমনকি আমি তার কথাকে খুব একটা পাত্তাও দিই না, তারপরেও মাঝে মাঝে মনে হয় সম্ভবত তিনি সঠিক কথাই বলেন। মাঝে মাঝে মা যখন বেশি বেশি অভিযোগ করেন, বাবা তখন ঘরের বদলে গাড়িতেই ঘুমিয়ে পড়েন।

নৈশভোজের পর মেয়ে দুটো আঙিনায় জোনাকি পোকার সাথে খেলা করে, তারা জোনাকি পোকা ধরার জন্য পিছে পিছে ছোটে। তারা তাদের ফ্লাশলাইট দিয়েও খেলা করে। বাবা-মা দুজনে বারান্দায় বসে তারকাময় আকাশ আর অন্ধকারের নিস্তব্ধতা অনুভব করতে থাকে।

মা-টি গরম পানির সাথে লেবু মিশিয়ে গ্লাসে চুমুক দেয়, বাবাটিও সামান্য চুমুক দিল। তারা বলছিল, এখানে থাকাটা তাদের কাছে খুব স্বাচ্ছন্দ্যকর, এমনকি এখানকার বায়ু ভিন্ন প্রকৃতির– পরিষ্কার ও স্বাস্থ্যকর। মন, দেহ উভয়ের জন্য এমন বায়ু আরামদায়ক। সবাইকে ছেড়ে এমন একটা পরিবেশে থাকাটা সবার কাছেই অসাধারণ ব্যাপার। তাদের কাছেও।

সকাল বেলা আমার প্রথম কাজ হচ্ছে মুরগির খাঁচার কাছে গিয়ে ডিম সংগ্রহ করা। ডিমগুলো গরম এবং নোংরা। আমি সেগুলো পরিষ্কার করি। তারপর একটা গামলাতে করে অতিথিদের ব্রেকফাস্টের জন্য ডিমগুলো দিয়ে আসি। সাধারণত এত সকালে কেউ ঘুম থেকে ওঠে না, তাই আমি বারান্দার টেবিলের উপর ডিমগুলো রেখে আসি। কিন্তু এবারে স্লাইডিং ডোরের কাচের ভিতর দিয়ে দেখলাম, মেয়ে দুটো ইতোমধ্যে জেগে গেছে। সোফার ওপর কয়েক প্যাকেট বিস্কুট আর রুটির টুকরো দেখলাম।

মেয়ে দুটো তাদের আশেপাশে যে মাছিগুলো ভনভন করছে সেগুলো মারার চেষ্টা করছে। মাছি মারার ব্যাটটা বড় মেয়েটা ধরে আছে। আর ছোট বোনটা হতাশভাবে দাঁড়িয়ে আছে আর বলছে, আমাকে দাও! আমাকে দাও! এবার আমার পালা। কিন্তু বড় মেয়েটি তাকে দিচ্ছেই না।

আমি ডিমগুলো টেবিলে রেখে আমাদের ঘরে চলে গেলাম। তারপর ফিরে এসে তাদের দরজায় নক করলাম। আমি আমাদের মাছি মারার ব্যাটটা তাদেরকে দিলাম। এতে করে তারা দুজনেই খুব খুশি হলো। তারা যখন মাছি মারার খেলায় মত্ত তখন বাবা-মা দুজনেই ঘুমে বিভোর।

দুদিন পর, সম্ভবত নির্ধারিত একটা কিছু হবে বলে মনে হলো। সকাল হবার কিছু পরে বাবাটি শহরের একটা ক্যাফেতে গেলেন কিছু দুধ, পেপার আর কফি আনতে। তিনি চাইলে সুপারমার্কেটেও একটা চক্কর দিতে পারতেন কিন্তু দেননি। ফিরে এসে পাহাড়ের দিকে দৌড়াতে গেলেন। আর্দ্রতা বেশি হওয়ায় অল্পতেই তিনি বেশ হাঁপিয়ে উঠলেন। ফেরার সময় একটা কুকুর তার পথ আগলে ধরে, যদিও শেষপর্যন্ত কিছু ঘটেনি তবু বিষয়টি নিয়ে তাকে বেশ উদ্বিগ্ন দেখায়।

মা-টি আমি যা করি তাই করে: তিনি মেঝে ঝাড়ু দেন, রান্না করেন, থালা-বাটি ধোয়। দিনে কমপক্ষে একবার তিনি জামাকাপড় শুকাতে দেন। আমিও আমাদের জামাকাপড় একইসাথে একই জায়গায় শুকাতে দিই। জামাকাপড় কাচার ঝুড়িটা হাতে নিয়ে তিনি তার স্বামী বলেন, এটা করতে তার খুব ভালো লাগছে। যেহেতু তারা শহরে এপার্টমেন্টে থাকে, সেখানে এভাবে মুক্ত পরিবেশে কাপড় ঝুলিয়ে শুকানোর ব্যবস্থা নেই। বিষয়টা সেজন্য তিনি উপভোগ করছেন।

দুপুরের খাবারের পর, বাবাটি মেয়ে দুটোকে সাথে নিয়ে সমুদ্র সৈকতে যায়। মা-টি বাড়িটিতে একা একাই থাকে। তিনি শরীর প্রসারিত করে একটা সিগারেট ধরান এবং গভীর মনোযোগের সাথে নোটবুকে কলম চালাতে থাকেন।

একদিন সমুদ্র সৈকত থেকে ফিরে, মেয়ে দুটো ঝিঁঝিঁ পোকা ধরার জন্য ঘাসের উপর লাফঝাঁপ শুরু করে। তারা খাবলা দিয়ে ঝিঁঝিঁ পোকা ধরে সেগুলোকে একটা কাচের পাত্রে রাখে। কাচের পাত্রের ভিতর আবার তারা কিছু টমেটোর টুকরো দিয়ে রেখেছে– এগুলো আসলে তারা বাবা-মায়ের সালাদ থেকে চুরি করে রেখে দিয়েছিল। তারা তাদেরকে পোষা ঝিঁঝিঁ পোকা বানিয়ে ফেললো, এমনকি তাদের নামও দিল। পরেরদিন ঝিঁঝিঁ পোকাগুলো আবদ্ধ পাত্রের মধ্যে মারা গেল, মেয়ে দুটো কান্নায় ভেঙে পড়লো। তারা বরই গাছের নিচে ঝিঁঝিঁ পোকাগুলোর কবর দিল এবং কিছু বন্য ফুল এনে সেই কবরের উপর রাখলো।

অন্য একদিন, বাবাটি আবিষ্কার করলো তার বাম পায়ের স্যান্ডেলটা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আমি তাকে বললাম, হয়তো একটা শেয়াল স্যান্ডেলটা নিয়ে গেছে, কারণ কিছুক্ষণ আগে আমি একটা শেয়ালকে ঘুরঘুর করতে দেখেছি। আমি আমার বাবাকে বিষয়টা বললাম, তিনি এখানকার প্রাণীদের বিচিত্র অভ্যাস এবং এরা কোথায় থাকে তা জানেন। কিছুক্ষণ পর সেই স্যান্ডেলসহ একটা বল ও শপিং ব্যাগ নিয়ে আসলেন আমার বাবা। বল আর শপিং ব্যাগটা দেখেই বুঝলাম পূর্ববর্তী পরিবারের ফেলে যাওয়া জিনিস এগুলো।

আমি অনুভব করি অতিথিরা এখানকার গ্রাম্য প্রকৃতি কতটা পছন্দ করে, এর প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয় তারা কেমনভাবে গ্রহণ করে তাও আমি বুঝি; এসকল বিষয় তাদেরকে ভাবায়, প্রশান্ত করে, স্বপ্ন দেখায়। মেয়ে দুটো কালো জাম পাড়ার সময় যখন তাদের সুন্দর পোশাকে দাগ লাগাচ্ছিল, মা-টি সেটা দেখেও তাদের কিছুই বলে না। বকাঝকার পরিবর্তে তিনি হাসেন। তিনি বাবাটিকে তাদের ছবি তুলতে বলেন, তারপর পোশাকগুলো ধোবার জন্য ছুঁড়ে ফেলেন।

একইসাথে আমি অবাক হই, তারা এখানকার একাকীত্ব সম্পর্কে কী জানে? তারা এখানকার দিনগুলো সম্পর্কে কী জানে? আমাদের জীর্ণশীর্ণ কুটিরে প্রতিটা দিনই একই রকম। এমনকি প্রতিটা রাতও একই রকম, ঝোড়ো হাওয়ার রাত– যে হাওয়াতে পৃথিবী কেঁপে ওঠে কিংবা প্রবল বৃষ্টির রাত, সবই আমারদের কাছে একই। যে মাসগুলোতে আমরা একাকী এই পাহাড়ের মাঝে থাকি– ঘোড়া, পোকামাকড়, পাখি বিস্তীর্ণ মাঠের উপর দিয়ে পার হয়। আমি ভাবি, তারা কী শীতের সেসব কর্কশ নিস্তব্ধ দিনগুলো পছন্দ করবে?

তারা যেদিন চলে যাবে তার আগের দিন, কতগুলো কার গাড়ি বাড়িটিতে আসলো। বাবা-মায়ের বন্ধুবান্ধবরা এবং তাদের বাচ্চাকাচ্চারাও এসেছে। তারা সবুজ আঙিনায় দৌড়াদৌড়ি করতে লাগল। বড়রা বাড়ির চারপাশ ঘুরে দেখল, কেউ কেউ সূর্যাস্তের সময় বাগানে গেল। সন্ধ্যা নামতে না নামতেই বারান্দার টেবিলটা বসার জন্য প্রস্তুত করা হলো।

তাদের খাবার সময় কী কথাবার্তা হচ্ছিল সবই আমি শুনছিলাম। আজকে রাতে তাদের হাসি, আড্ডা সবকিছুই উচ্চস্বরে হচ্ছে। এখানে তাদের দুর্দশার কথা বাবাটি বলল: এই যেমন- টমেটো খেকো ঝিঁঝিঁ পোকা, বরই গাছের নিচের কবর, কুকুর, স্যান্ডেল নিয়ে যাওয়া শিয়ালের কথা। মা-টি তাদের বলল, এমন প্রকৃতির সান্নিধ্য তার মেয়ে দুটোর জন্য ভালো।

একসময় তারা একটা কেক বের করলো, যাতে অনেকগুলো মোমবাতি লাগানো এবং আমি বুঝতে পারলাম কী উপলক্ষ্যে তাদের আয়োজন; আসলে দিনটা বাবা-টির জন্মদিন। তিনি পঁয়তাল্লিশ বছরে পা দিলেন। সকলে জন্মদিনের গান গাইলো, কেক কাটলো।

আমার বাবা আর আমি কিছু পাকা আঙুর খেয়ে টেবিলটা পরিষ্কার করতে যাব এমন সময় আমাদের দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ শুনতে পেলাম। দরজা খুলে দেখি সেই মেয়ে দুটো। তারা কিছুটা ইতস্তত, যেন তাদের দম ফুরিয়ে আসছে। তারা একটা প্লেটে করে আমার হাতে দু টুকরো কেক দিল– একটা আমার জন্য, একটা আমার বাবার জন্য। তাদেরকে ধন্যবাদ দেবার আগেই তারা ফুরুৎ করে চলে গেল।

ওখানে বড় টেবিলে তারা যখন রাজনীতি, ভ্রমণ এবং শহুরে জীবন নিয়ে কথা বলছিল, আমরা তখন কেক খাচ্ছিলাম। কেউ একজন তার মাকে জিজ্ঞাসা করলো, সে কোথায় কেকটা পেয়েছে। মা-টি জানালো কেকটি তারা যেখানে থাকে সেখানকারই, তাদের একজন অতিথি এটা নিয়ে এসেছে। সে বেকারির নামটি বললো এবং সেটা কোন মার্কেটে সেটাও বললো।

আমার বাবা তার কাটাচামচ নামিয়ে মাথা নিচু করে থাকলেন কিছুক্ষণ। আমার দিকে তাকাবার সময় তার চক্ষু ছলছল করে ওঠে। আচমকা তিনি সব ফেলে বাইরে গিয়ে একটা সিগারেট ধরায়। আমি সবই লক্ষ করি।

আমরাও ওই শহরেই বসবাস করতাম। আমার বাবা ওই মার্কেটের পাশেই ফুল বিক্রি করতেন। আমার মা তাকে সাহায্য করতেন।

তারা একটা সুন্দর খাম্বার কাছে দাঁড়িয়ে ফুলের তোড়া তৈরি করতেন, যেগুলো লোকজন তাদের টেবিল বা ঘরসজ্জায় ব্যবহার করত। নতুন জায়গায় এসে তারা সেসব ফুলের নাম জেনেছে: গোলাপ, সূর্যমুখী, ডেইজি। তারা ফুলগুলোকে সতেজ রাখার জন্য ফুলের ডাটাগুলো বালতির পানিতে ডুবিয়ে রাখত।

একদিন রাতে তিনজন লোক এলো। আমার বাবা সেদিন একাই ছিল; আমার মা তখন প্রেগন্যান্ট– আমি তখন তার পেটে। একারণে বাবা মাকে রাতে কাজ করতে দিত না। তখন বেশ রাত হয়েছে। অট্টালিকার আশেপাশের সব দোকান বন্ধ হয়ে গেছে, আমার বাবাও সেদিনের মতো তার মালপত্তর গোছগাছ করছিল।

কিন্তু তা আর হলো না। তাদের ভিতর একজন বলল, আমি আমার গার্লফ্রেন্ডকে দেখতে যাবো, আমাকে একটা সুন্দর ফুলের তোড়া দে তো!

লোকটি বেশ রুক্ষ স্বভাবের এবং মাতাল, তবু বাবা একটা ফুলের তোড়া বানিয়ে দিতে রাজী হলেন।

ফুলের তোড়া বানানো শেষ হলে, লোকটি বলল, ধুর! এতো ছোট কেন, বড় একটা বানা।

আমার বাবা তাতে আরও ফুল যোগ করতে লাগল। একসময় তোড়াটি বেশ বড় হলে লোকটি সন্তুষ্ট হলো। বাবা ফুলের তোড়াটা একটা কাগজ দিয়ে মুড়িয়ে একটা রঙিন ফিতা দিয়ে সেটা বেঁধে সজ্জিত করে দিল। তারপর লোকটিকে ফুলের দাম বললো।

লোকটি তার মানিব্যাগ থেকে কিছু টাকা বের করে ছুঁড়ে দিল। কিন্তু আমার বাবা যা চেয়েছিল তার চেয়ে অনেক কম। আমার বাবা ফুলের তোড়াটি তাকে দিতে চাইলো না। লোকটি বলল, তুমি একটা ইডিয়ট! তুমি জানোই না একটা মেয়েকে কি রকম ফুলের তোড়া দিতে হয়।

তারপর তারা সবাই মিলে আমার বাবাকে মারতে শুরু করে। মারতে মারতে তারা আমার বাবার মুখ দিয়ে রক্ত বের করে দেয়; দাঁতগুলোর কয়েকটা ভেঙে যায়।

বাবা চিৎকার করে ওঠে, কিন্তু অত রাতে কেউ সেই চিৎকার শুনতে পায়নি। তারা বাবাকে মেরে ফুলের তোড়াটা নিয়ে চলে যায়। বাবা মাটিতে পড়ে ব্যথায় কাতরাতে থাকে।

লোকজন টের পেলে বাবাকে হাসপাতালের ইমার্জেন্সি বিভাগে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি একবছর ধরে কোনো শক্ত খাবার খেতে পারতেন না। আমি যখন জন্মালাম, মানে যখন তিনি আমাকে প্রথম দেখেছিলেন, তখন তিনি একটা শব্দও উচ্চারণ করতে পারতেন না।

তখন থেকেই তিনি ভালোমতো কথা বলতে পারেন না। তিনি এমনভাবে কথাগুলো আওড়ান যেন কোনো বয়স্ক বৃদ্ধ লোক কথা বলছেন। ভাঙা দাঁতের জন্য তার হাসতেও লজ্জা লাগে। আমার মা আর আমি তাকে ভালোমতো বুঝি, কিন্তু অন্যরা তাকে বুঝতে পারে না। তারা মনে করে, সে বিদেশ থেকে এসেছে, তাই এদেশের ভাষা তার অজানা। এমনকি মাঝে মাঝে তারা ভেবে বসে আমার বাবা বুঝি বোবা।

আমরা বাগানের নাশপাতি ও লাল আপেল পাতলা স্লাইস করে কেটে দিতাম, যাতে সে সহজেই খেতে পারে। তার একজন স্বদেশী বন্ধু তাকে এখানকার চাকরিটার কথা বলেছিল। বাবা গ্রামের সাথে তেমন পরিচিত ছিল না: সে সবসময় শহরেই বসবাস করেছে, কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস তাকে এখানে এনে ফেলেছে।

বাবা তার মুখ না খুলেই এখানে বসবাস করতে পারে। কারো দ্বারা আক্রান্ত হবার ভয় তার নেই। সে পশুপালন আর জমি চাষের মধ্যেই তার জীবন পরিচালনা করাটাকে বেছে নিয়েছে। এই অশান্ত নিরাপদ আশ্রয়ের সাথে সে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে।

গাড়িতে আমাকে স্কুলে রেখে আসার সময় সে সবসময় আমাকে শুধু একই কথা বলত– জীবনে কিছুই করতে পারলাম না। সে একটা জিনিসই আমার কাছে চাইত, আমি যেন ভালো করে পড়াশুনা করি, স্কুল শেষ করে কলেজে পড়ি, তারপর তাদের কাছ থেকে দূরে কোথাও চলে যাই।

পরের দিন সকালে বাবাটি গাড়িতে মালামাল ভর্তি করতে লাগলেন। আমি চারজনকেই দেখলাম, কেমন জানি মনমরা। তারা এখান থেকে যেতে চায় না। সকালের নাস্তার সময় তারা বলাবলি করছিল, পরের বছর তারা আবার এখানে আসবে। কথাটা নতুন নয়। প্রায় সকল অতিথিরাই যাবার সময় একই কথা বলে। খুব কম লোকই আবার এখানে ফিরে আসে, বাকিরা ভাবে একবারই যথেষ্ট।

শহরে ফিরে যাবার পূর্বে, মা-টি আমাকে ফ্রিজে রেখে যাওয়া জিনিসগুলো দেখালো। তিনি আমাকে বললেন, তার বাড়িটা অনেক ভালো লেগেছে, ছেড়ে যেতে হবে ভেবে তিনি একটা শূন্যতা অনুভব করছেন। তিনি যদি বিষন্নতার মাঝে পড়েন অথবা কাজের চাপে কাহিল হয়ে পড়েন, তাহলে তিনি নাকি এই জায়গাটায় আসার কথা আবার ভেবে দেখবেন– এখানকার নির্মল বাতাস, পাহাড়, সূর্যাস্ত সবকিছুই নাকি তার কাছে অসাধারণ লেগেছে।

আমি পরিবারটির শুভকামনা করে তাদের বিদায় দিলাম। তাদের কার গাড়ি যতক্ষণ না চোখের আড়াল হলো, গাড়িটির দিকে তাকিয়ে থাকলাম। তারপর আমি বাড়িটাকে গোছগাছ করতে লাগলাম পরবর্তী অতিথির জন্য। বিছানাগুলো গোছগাছ করলাম। মেয়ে দুটো যে কক্ষটায় খেলা করতো সেটাও পরিপাটি করলাম। তারা যে সকল মাছি মেরেছিল, সেগুলো ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করলাম।

আমি দেখলাম, তারা ভুল করে অথবা কোনো উদ্দেশ্য নিয়েই হয়তো কিছু জিনিস ফেলে গেছে। সেগুলো হলো: মেয়ে দুটোর আঁকা কয়েকটি ছবি, সমুদ্র সৈকত থেকে নিয়ে আসা শামুকের খোলক, গোসল করার সুগন্ধী জেল, অস্পষ্ট বাজারের তালিকা এবং মা-টির লেখা স্ক্রিপ্ট– যেটাতে তিনি আমাদের সবার কথা লিখে গেছেন।

“গল্পটি ঝুম্পা লাহিড়ীর একটি ইতালিয়ান গল্পের ইংরেজি অনুবাদ “The Boundary” থেকে অনূদিত। গল্পটি “The New Yorker”-ম্যাগাজিনে কথাসাহিত্য বিভাগে ২০১৮ সালের জানুয়ারি সংখ্যায় প্রকাশিত হয়।”

গল্পের বিষয়:
অনুবাদ

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত