এক সন্ধ্যায় শার্লক হোমসের সঙ্গে

এক সন্ধ্যায় শার্লক হোমসের সঙ্গে

আমি মশাই মানুষটা একটু অন্যরকম। যে কোনও জিনিসই অন্যদের থেকেও আরও পাকাপোক্ত ভাবে করেই আমার আমোদ আসে বেশি। তাই ভাবলাম, যাই, একদিন শার্লক হোমসের সঙ্গে একটু দেখা করে আসি।

শার্লক হোমসকে চেনেন নিশ্চয়ই। হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন, সেই প্রাইভেট ডিটেকটিভ, যার নানান কান্ডকারখানার কথা মিঃ কোনান ডয়েল এখন স্ট্র্যান্ড ম্যাগাজিনে লিখছেন। হোমসের বৈশিষ্ট্য হল কারোর দিকে একঝলক তাকিয়েই তার সম্বন্ধে – যেমন ধরা যাক – সে গত বিয্যুদবার রাতে কী খেয়েছিল এ-সব খুঁটিনাটি বলে দেওয়া। খবরের কাগজ আর সাধারণ লোকজন স্বভাবতই মোহিত। খুবই বিরক্তিকর এই ব্যাপারটা(আমার বদলে অন্য লোককে পাবলিক খুব তোল্লা দিচ্ছে, এ ব্যাপারটা আমার অসহ্য লাগে)। তাই ভাবলাম, ভদ্রলোকের সঙ্গে একহাত খেলা দরকার। একদিন সোজা চলে গেলাম মিঃ কোনান ডয়েলের কাছে, বললাম শার্লক হোমসের সঙ্গে আলাপ করতে চাই, আমাকে আর ওঁকে একদিন একসঙ্গে বাড়িতে ডাকুন।

সেই বিকেলটা মিঃ হোমসের সারা জীবন মনে থাকবে। বেচারা! আমি ঠিক করেই রেখেছিলাম, ওঁর অস্ত্রেই ওঁকে মারব। কাজেই যথারীতি তিনি যখন বলতে শুরু করলেন, “মিঃ অচেনাবাবু, আপনার চুরুট-কাটারটার অবস্থা দেখেই বুঝতে পারছি আপনি গানবাজনা পছন্দ করেন না,” আমি নির্বিকার গলায় বললাম, “হ্যাঁ, সে তো নিশ্চয়ই।”

মিঃ হোমস এতক্ষণ তাঁর বরাবরের অভ্যেসমাফিক ইজিচেয়ারে বসেছিলেন(ডুবেছিলেন বলা যায়), আমার কথা শুনে বিচ্ছিরিরকম চমকে উঠলেন, তারপর অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে তাকালেন আমাদের আপ্যায়নকর্তা মিঃ কোনান ডয়েলের দিকে। কোনান ডয়েলের মুখটাও কেমনধারা হয়ে গেছে দেখলাম।

“সিগার-কাটারটা দেখে কী করে বুঝলেন উনি গানবাজনা পছন্দ করেন না?” মিঃ কোনান ডয়েল চমৎকারভাবে অবাক হয়ে বললেন কথাটা। অবাক হওয়াটা খুবই সুন্দর হয়েছে।

“এ তো খুব সোজা”, বললেন মিঃ হোমস, কড়া চোখে আমার দিকে তাকিয়ে।

“এর চেয়ে সোজা ব্যাপার বিশ্বসংসারে আর নেই”, আমি একমত হলাম।

“ও, বোঝানোর দরকার নেই তাহলে?” মিঃ হোমস রেগে গেলেন।

“কিস্যু দরকার নেই”, আমি বললাম।

আমি পাইপে তামাক ভরতে লাগলাম। কিছুটা সময় গেল এতে, আর সেই ফাঁকে ডিটেকটিভ আর তাঁর জীবনীকার দুজন একটু চোখ চাওয়াচাওয়ি করে নিলেন। আমি এমন ভান করলাম, যেন কিছুই দেখিনি, তারপর টেবিলের ওপরে রাখা মিঃ হোমসের সিল্কের টুপিটা দেখিয়ে বললাম, “তাহলে মিঃ হোমস, এর মধ্যে গ্রামে ঘুরে এলেন?”

মিঃ হোমসের চুরুটের ডাঁটিটায় এমন জোর কামড় পড়ল একটা, যে তার জ্বলন্ত মুখটা গিয়ে ঠক করে লাগল তাঁর কপালে।

“আপনি আমায় দেখেছিলেন নাকি?” মিঃ হোমসের গলার স্বর রুক্ষ।

“আরে না”, আমি বললাম, “কিন্তু আপনার টুপি দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে আপনি শহরের বাইরে গেছিলেন।”

“ফুঃ!” হোমসের গলায় বিজয়ীর সুর, “আন্দাজে মারলেন বোঝাই যাচ্ছে! আসলে আমি –”

“ঐ টুপিটা নিয়ে যাননি।” আমি পাদপূরণ করলাম।

“একদম ঠিক”, হেসে বললেন হোমস।

“কিন্তু আপনি কী করে –” বলে উঠলেন মিঃ কোনান ডয়েল।

“হুম! বুঝলাম যে”, আমি বললাম, “ঘটনা থেকে আজেবাজে জিনিসগুলো যে বাদ দিতে হয়, এ ব্যাপারটার সঙ্গে আপনারা কেউই পরিচিত নন(হোমস দেখলাম ছটফট করছেন), কিন্তু যারা চোখ কান খোলা রাখে, তাদের কাছে এটা কিছুই নয়। যখনই দেখলাম, মিঃ হোমসের টুপির সামনের দিকে টোল পড়া, যেন জোর ধাক্কা খেয়েছে, তখনই বুঝলাম উনি এর মধ্যে গ্রামে গেছিলেন।”

“কদ্দিনের জন্য শুনি? অল্পদিন না বেশি দিন?” হোমসের ঠাণ্ডা মেজাজ আর নেই।

“এক সপ্তাহের জন্য তো বটেই”, আমি বললাম।

“এটাও ঠিক বললেন!” হোমস বললেন মনমরা গলায়।

“ঐ টুপি আরও বলছে যে”, আমি বললাম, “আপনি এ বাড়িতে চারচাকা – না, হ্যানসম-এ এসেছেন!”

অস্ফুট একটা শব্দ বেরোল শার্লক হোমসের মুখ থেকে।

“কিছু যদি মনে না করেন, একটু বুঝিয়ে বলবেন?” বললেন আমাদের আপ্যায়নকর্তা।

“বিলক্ষণ! মনে করার কী আছে আবার!” আমি বললাম, “যখনই দেখলাম মিঃ হোমসের টুপিতে টোল খাওয়া, তক্ষুনি বুঝলাম এটা আচমকা শক্ত কিছুর সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে হয়েছে। সম্ভবত উনি যখন কোনও গাড়িতে উঠতে যাচ্ছিলেন, তখন তার ছাদে ধাক্কা খেয়েছেন। গাড়িতে চাপলেই বেশির ভাগ সময় টুপিতে এটা হয়। আবার, সাধারণত এই ধরণের যাত্রাগুলো চারচাকাতেই হয়, তবে মিঃ হোমসের ক্ষেত্রে খুবই সম্ভব যে উনি হ্যানসমে এসেছেন।”

“গ্রামে গেছি জানলেন কী করে?”

“আসছি সে কথায়। লন্ডনে থাকলে সিল্কের টুপি পরা আপনার স্বভাব, কিন্তু যাদের এই অভ্যেস আছে, তারা নিজের অজান্তেই হাত দিয়ে টুপি সামলানোর অভ্যেস করে ফেলে। তাই বুঝলাম, আপনি এর মধ্যে গোল-টুপি পরেছিলেন, আর হাত দিয়ে লম্বা সিল্কের টুপিটা আড়াল করার অভ্যেসটা ভুলে গেছিলেন। কিন্তু লন্ডনে থাকলে আপনি তো এরকম ছোট টুপি পরবেন না, কাজেই বুঝলাম, আপনি গ্রামে গেছিলেন, যেখানে ব্যতিক্রমী না হলে গোল-টুপি পরাই দস্তুর।”

মিঃ হোমসের পায়ের তলা থেকে এখন প্রতি মুহূর্তে মাটি সরে যাচ্ছে, সেই সঙ্গে মিঃ কোনান ডয়েলেরও, কাজেই তিনি প্রসঙ্গটা পাল্টে ফেললেন।

“আজ দুপুরে একটা ইতালিয়ান রেস্তোরাঁতে খেলাম, বুঝলেন”, তিনি বললেন মিঃ কোনান ডয়েলকে, “ওয়েটার আমাকে বিলটা যেভাবে দিল, সেটা দেখেই বুঝলাম যে ওর বাবা –”

“আগে একটা কথা বলুন”, আমি বাধা দিয়ে বললাম, “রেস্তোরাঁ থেকে বেরোনর সময় গেটের গোড়ায় আপনার সঙ্গে আরেকটা লোকের ঝামেলা হয়েছিল, তাই না?”

“সেটা কি আপনিই ছিলেন নাকি?” জিজ্ঞেস করলেন হোমস।

“না মশাই”, আমি বললাম, “আপনার তো অবস্থা খুবই খারাপ দেখছি! মানুষের মুখই মনে রাখতে পারেন না!”

উত্তরে হোমসের মুখ দিয়ে একটা গোঁ গোঁ আওয়াজ বেরোল শুধু।

“খুবই সাধারণ ব্যাপার মিঃ ডয়েল”, আমি বললাম, “রেস্তোরাঁর দরজার দুটো ভাগ। একটা ঠেলে খুলতে হয়, আরেকটা টেনে। মিঃ হোমস আর ঐ লোকটা দরজার দুধারে ছিলেন, আর দুজনেই টান মেরেছেন। বুঝতেই পারছে, এসব ক্ষেত্রে দরজা খোলা সম্ভব নয়, যতক্ষণ না একজন ছেড়ে দিচ্ছে। তারপর একজন আরেক জনের দিকে কটমট করে তাকিয়ে যে যার মত চলে গেল।”

“আপনি নির্ঘাত ওখানে ছিলেন,” বললেন মিঃ কোনান ডয়েল।

“প্রশ্নই নেই,” আমি বললাম, “তবে যখনই আমি শুনেছি মিঃ হোমস ওরকম ছোট রেস্তোরাঁগুলোর একটায় খেতে গেছিলেন, তখনই আমি ব্যাপারটা আঁচ করতে পেরেছিলাম। এগুলোর সবকটাতেই দুটো দরজা আর আলাদা আলাদাভাবে “ঠেলুন” আর “টানুন” লেখা। দেখবেন, কুড়িজনের মধ্যে উনিশজনই ঠেলার জায়গায় টানে আর টানার জায়গায় ঠেলে। আবার যখনই আপনি রেস্তোরাঁ থেকে বেরোতে যাবেন, দেখবেন কেউ না কেউ ঢুকছে। এই হল ব্যাপার। আর আসল ব্যাপারটা হল, যখনই এরকম ভুল হয়, আমাদের মুখ দিয়ে দুয়েকটা শব্দ বেরিয়েই যায়, যেন পুরো দোষটাই ঐ লোকটার।”

“হুম!” ক্যাটকেটে গলায় বললেন হোমস, “মিঃ ডয়েল, এই চুরুটের কাগজের পাকটা খুলে গেছে।”

“আরেকটা নিন–” বলে আমাদের আপ্যায়নকর্তা শুরু করতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু তার আগেই আমি তাঁকে থামিয়ে দিয়েছি।

“আপনি যে কথাটা বললেন, মিঃ হোমস, তার থেকেই আমি বুঝলাম আপনি হেয়ার-ড্রেসারের কাছ থেকে আসছেন।”

পরিষ্কার দেখলাম, এটা শুনে হোমসের কন্ঠাটা বারকয়েক ওঠানামা করল।

“আপনি আপনার গোঁফটা মোম পালিশ করিয়েছেন।”(মিঃ হোমস কিছুদিন যাবৎ গোঁফ রাখছেন)।

“আমার বলার আগেই ও করেছে ওটা”, উত্তর দিলেন হোমস।

“একদম ঠিক”, আমি বললাম, “আর সেই কারণেই আপনি হ্যানসমে উঠে ওটা আগের মত করতে গেছিলেন।”

“বুঝেছি”, আচমকা উল্লসিত হয়ে উঠলেন আমাদের আপ্যায়নকর্তা, “আঙুলে মোম লেগে আছে বলে চুরুটের কাগজ পিছলে যাচ্ছে!”

“আর তাছাড়া”, আমি বললাম, “ওঁর সঙ্গে হ্যান্ডশেক করার সময়েই আমি বুঝেছিলাম উনি নাপিতের কাছ থেকে আসছেন।”

“আচ্ছা, গুড নাইট”, টুপিটা খামচে ধরে উঠে দাঁড়ালেন মিঃ হোমস(ওঁকে যতটা লম্বা ভেবেছিলেম, ততটা লম্বা উনি নন), “আমার আবার রাত দশটায় একজন ব্যাঙ্কারের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে, যে –”

“বিলক্ষণ”, আমি বললাম, “আপনি যেরকমভাবে উঠে দাঁড়ালেন, তাতেই আমি বুঝেছিলাম যে –”

কিন্তু ততক্ষণে ঘর ছেড়ে উধাও হয়ে গেছেন মিঃ শার্লক হোমস।

গল্পের বিষয়:
অনুবাদ

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত