দ্য অ্যাডভেঞ্চার অফ দ্য ওয়েস্টার্ন স্টার

দ্য অ্যাডভেঞ্চার অফ দ্য ওয়েস্টার্ন স্টার

পোয়ারোর বসার ঘরের জানালায় দাঁড়িয়ে অলসভাবে নীচে রাস্তার দিকে তাকিয়েছিলাম।

আরে এতো অদ্ভুত ব্যাপার, নিজের মনেই হঠাৎ বলে উঠলাম।

কি হল কি? পোয়ারো চেয়ারে আরাম করে বসেছিল, আমার মন্তব্য শুনে সে প্রম করল।

যা দেখেছি বলে যাচ্ছি, আমি বললাম, মন দিয়ে শুনে যাও। এক অল্পবয়সী যুবতী ধীরপায়ে হেঁটে আসছেন, পরনে দামী ফারের পোষাক, মাথায় ফ্যাশনদুরন্ত টুপি। হাঁটতে হাঁটতে উনি দুপাশের বাড়িগুলোর দিকে বার বার মুখ তুলে তাকাচ্ছেন। এদিকে তিনজন পুরুষ ও তিনজন মাঝবয়সী মহিলা যে পেছন থেকে ছায়ার মত অনুসরণ করছে, মনে হয় তা ওঁর জানা নেই। একটা ছোঁড়া আবার এসে জুটেছে এদের সঙ্গে। আঙ্গুল তুলে বারবার যুবতীকে দেখিয়ে সে যেন ওকে কি বলছে। এ কেমন নাটক তা বুঝতে পারছিনা। যুবতীটি কি কোনও অপরাধ করে পালিয়েছে আর যারা ওঁর পিছু নিয়েছে তারা কি গোয়েন্দা, হাতেনাতে ধরার সুযোগ খুঁজছে? অথবা ওরা একদল বদমাশ, ঐ নিরীহ যুবতীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার তাল খুঁজছে? এ বিষয়ে আমাদের বিখ্যাত গোয়েন্দা মশায়ের কি অভিমত?

বিখ্যাত গোয়েন্দা মশাই ব্যাপার কি তা নিজেকে দেখার জন্য সব চাইতে সহজ পথটি নেবেন, তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়বেন, বলে পোয়ারো সত্যিই চেয়ার ছেড়ে আমার পাশে এসে দাঁড়াল।

নাঃ ক্যাপ্টেন হেস্টিংস, তোমায় নিয়ে আব পাবলাম না। পোয়ারো নিচের দিকে তাকিয়ে আপন মনে মুচকি হাসল, ইনি ত ফিষ্টার মিস মেবী মার্ভেল। আরা ওর পিছু নিয়েছে তারা বদমাশ বা গোয়েন্দা এ দুটোর একটাও নয়, আসলে এরা ওঁর স্তবক যাকে তোমাদের ভাষায় বলে ফ্যান। আর এও জেনে রেখো হেষ্টিংস, এরা যে ওঁর পিছু নিয়েছে তা কিন্তু মিস মার্ভেলের অজানা নেই।

বা, কি সহজ ব্যাখ্যা, হেসে বললাম, কিন্তু এ জন্য আমি কিন্তু একটি মার্কসও তোমায় দেবনা পোয়ারো, আসলে যুবতীর মুখ তোমার খুব চেনা তাই সমস্যার সমাধান করতে নেমেছে।

তাই নাকি? পায়োয়ো গম্ভীর হয়ে গেল। মিস মার্ভেলের কটা ছবি তুমি এ আবৎ দেখেছে বলো ত?

তা কম করে ডজন খানেক ত বটেই, একটু ভেবে জবাব দিলাম।

এক ডজন ছবি দেখার পরেও তুমি ওঁকে চিনতে পারনি, পোয়ারো বলল আর আমি এ পর্যন্ত মিস মার্ভেলের ছবি একটার বেশী দেখিনি। তবু একবার দেখেই ওকে আমি ঠিক চিনতে পেরেছি, কিন্তু তুমি পারলে না।

আসলে ওঁকে অন্যরকম দেখাচ্ছিল, আমি বললাম তাই ঠিক চিনতে পারিনি। মুখে বললেও নিজের যুক্তি আমার নিজের কানে সেই মুহুর্তে খুবই দুর্বল ঠেকল।

বাঃ, চমৎকার সাফাই গাইলে বন্ধু। পোয়ারো গলা সামান্য চড়ালো, তুমি কি আশা করেছিলে যে এই লওন শহরে ইনি হয় খালি পায়ে নয়ত মাথায় কাউবয় টুপি চাপিয়ে কেয়ারি করা চুলের বাহার দেখিয়ে ঘুরে বেড়াবেন? তোমায় নিয়ে আর পারলাম না, সেই নাচিয়ের কেসটা নিশ্চয়ই ভুলে যাওনি, সেই যে ভ্যালেরি সেইট ক্লেয়ার?

আমি মুখে কোনও জবাব দিলাম না শুধু হাবে ভাবে পোয়ারোকে বুঝিয়ে দিলাম যে তার এহেন আচরনে কিছুটা ক্ষুব্ধ হয়েছি।

না না, মুখ কালো করার মতো কিছু হয়নি, পোয়ারো হঠাৎ শান্ত হয়ে বলে উঠল, সবাই ত আর এরকুল পোয়ারো নয়, হতেও পারে না এটা আমার খুব ভালই জানা আছে।

আমি যাকে চিনি সে যেই হোক তুমি যে তাকে আরও হাড়ে হাড়ে চেনো সে কথা মানছি! ভেতরে ভেতরে তখন আমি একই সঙ্গে বিরক্ত আর মজা পাচ্ছি, তবু কথাটা না বলে পারলাম না।

কি করা যায় বলো পোয়ারো বলল। সেরা লোকেরা তাদের গুণ আর যোগ্যতার কথা জানে, বাকি যারা তারাও একথা মানতে বাধ্য যেমন ধরো মিস মার্ভেল আমার কাছেই আসছেন।

কি করে টের পেলে?

খুব সোজা ব্যাপার, পোয়ারো বলল, এই রাস্তাটা মোটেই বনেদি এলাকা বা বড়লোক পাড়া নয়। কোনও পয়সাওলা নামী ডাক্তার বা ডেন্টিস্ট এখানে থাকেন না কিন্তু মাথায় প্রচুর বুদ্ধি রাখেন এমন একজন বেসরকারী গোয়েন্স এখানে থাকেন যার নাম এরকুল পোয়ারো।

তার কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে একতলার দরজার কলিং বেল বেজে উঠল। পোয়ারো বলে উঠল, কেমন, দেখলে? ইনি মিস মার্ভেল না হয়েই যান না।

পোয়ারোর ধারনা ঠিক, আর কিছুক্ষনের মধ্যে ল্যাণ্ডলেডী যে যুবতীকে পথ, পিয়ে আমাদের কাছে নিয়ে এলেন তিনি সেই মিস মার্ভেল, কয়েক মিনিট আগে যার সম্পর্কে আমরা আলোচনা করছিলাম।

আমেরিকান চলচ্চিত্রাভিনেত্রী মিস মার্ভেল যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেছেন। তার স্বামী গ্রেগরী বি রলফ নিজেও একজন অভিনেতা, হালে তারা দুজনে ইংল্যান্ডে এসেছেন। মাত্র একবছর আগে আমেরিকায় ওঁদের বিয়ে হয়েছে, বিয়ের পর এই প্রথম ওঁরা একসঙ্গে এদেশে এলেন। এখানকার মানুষ তাদের বিপুল সংবর্ধনা জানিয়েছে, মেরী মার্ভেলের রূপ, যৌবন তার হালফ্যাশানের পোষাক, ফারের কোট, জড়োয়া গহনা এসব নিয়ে খবরের কাগজওয়ালারা পাগলের মত মাতামাতি করেছে। সেই সব জড়োয়া গয়নার মধ্যে একটি বড় হীরের কথাও কাগজে উল্লেখ করা হয়েছে যার নাম দ্য ওয়েস্টার্ণ স্টার আর একদিক থেকে নামকরণ কত সার্থক হয়েছে বলাই বাহুল্য। সত্যি মিথ্যে জানিনে, তবে অনেকের মুখেই শুনেছি ঐ পেল্লাই হীরে খানা পঞ্চাশ হাজার পাউন্ডের বীমা করা আছে।

ফি মার্ভেকে অভ্যর্থনা জানাতে পোয়ারো আর আমি দুজনেই উঠে দাঁড়িয়েছি আর তখনই এসব তথ্য আমার মনে পড়ল।

বাচ্চা মেয়ের মত দেখতে ছোটখাটো মিস মেরী মার্ভেলের বড় বড় নীল টি চোখে অপার সরলতা মিশে আছে পোয়ারো নিজেই একটা চেয়ার এগিয়ে দিল তার সামনে।

আপনি সব শুনে আমায় পাগল বা যা খুশি ভাবতে পারেন মঁসিয়ে পোয়ারো। মিস মার্ভেল চেয়ারে বসেই কোন ভূমিকা না করেই শুরু করলেন, তবু বুক ভরা বিস নিয়েই আমি ছুটে এসেছি। এই তো গতকাল রাতে লর্ড ক্রনশ আমায় কবিনে ওঁর ভাইপোর মৃত্যুর রহস্য কি অসাধারণভাবে আপনি সমাধান করেছেন, তখনই মনে হল একবার আপনার শরণ নিই, উপদেশ শুনি। আমার স্বামী গ্রেগরীর মতে গোটা ব্যাপারটা নিছক প্রতারণা, কিন্তু আমার মন সে কথা কেন জানিনা মানতে চাইছে না। বিশ্বাস করুন, এই ভাবে দিনরাত দুশ্চিন্তা করলে শীগগিরই আমার মৃত্যু হবে! এইটুকু বলেই থেমে গেলেন মিস মার্ভেল, হাঁ করে বার বার দম নিতে লাগলেন।

অত ঘাবড়ে গেলে ত চলবে না মাদাম, পোয়ারো আশ্বাস দেবার সুরে বলল, বুঝতেই পারছেন, সব কিছু খুলে না বললে রহস্য আমার কাছে অজানাই থেকে যাবে।

এই চিঠিগুলো আমি পেয়েছি, মিস মার্ভেল তার হাতব্যাগ খুলে তিনটে খাম বের করে তুলে দিলেন পোয়ারোর হাতে।

খুব শক্ত কাগজ, থামগুলো নাড়াচাড়া করতে করতে পোয়ারো মন্তব্য করল, নাম ঠিকানা খুব সাবধানে ছাপানো হয়েছে। দেখা যাক ভেতরে কি আছে। বলে প্রথম খাম খুলে একটুকরো কাগজ টেনে বের করল সে। পোয়ারোর ঘাড়ের ওপর দিয়ে দেখলাম কাগজে কি যেন লেখা হয়েছে। সহজ সেই বাক্যটি তর্জমা করলে যা পড়ায় তা এরকম :

বড় হরেটি দেবতার বা চোখে বসানো ছিলো, অবিলম্বে তা যথাস্থানে ফিরিয়ে দেবার নির্দেশ দেয়া হল।

দ্বিতীয় চিঠির ভাষা প্রায় একই তাতে অন্য কোনও বৈশিষ্ট্য নেই। তৃতীয় চিঠিতে লেখা :

তোমায় হুঁশিয়ার করে দেয়া হয়েছিল কিন্তু তুমি তাতে কান দাওনি। এবার হয়েটি তোমার কাছ থেকে কেড়ে নেয়া হবে। আগামী পূর্ণিমায় দেবতার বা আর ডান চোখে সানো হীরে দুটি তার কাছে আবার ফিরে আসবে এই ভবিষ্যদ্বানী করা হয়েছে।

প্রথম চিঠিটা পেয়ে ধরেই নিয়েছিলাম কেউ নিশ্চয়ই আমার সঙ্গে মজা করছে মিস মার্ভেল নিজে থেকেই বললেন, দ্বিতীয়, তৃতীয় চিঠিটা পাবার পরে ভাবনায় পড়লাম। গতকাল তৃতীয় চিঠিটা পেয়ে মনে হল আমি নিজে গোড়ায় ব্যাপারটাকে যত হালকা ভেবেছি আসলে তা নয় বরং তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

চিঠিগুলো ক মারফৎ আসেনি দেখছি, পোয়ারো বলল।

না, মিস মার্ভেল বললেন।

এক চীনে যুবক ওগুলো দিয়ে গেছে আর সেই কারণেই আমি ভয় পাচ্ছি।

কেন?

কারণ তিন বছর আগে গ্রেগরী সান ফ্রানসিসকোতে এক চীনে যুবকের কাছ থেকেই ঐ হয়েটি কিনেছিল।

মাদাম, পোয়ারো গম্ভীর গলায় বলে উঠল, চিঠিতে যা উল্লেখ করা হয়েছে আপনি দেখছি সেই–

দ্য ওয়েস্টার্ণ স্টার, পায়োরাকে বাধা দিলেন মিস মার্ভেল, আমার স্পষ্ট মনে আছে হীরেটা কেনার পরে গ্রেগরী বলেছিল ওর সঙ্গে এক পুরোনো কাহিনী জড়িয়ে আছে, কিন্তু ঐ চীনে যুবকটি ঐ হীরে বিক্রী করেছিল সে কিছু বলেনি। গ্রেগরী এও বলেছিল লোকটা যে কোন কারণেই হোক ভয়ানক ঘাবড়ে গিয়েছিল এবং মনে হয়েছিল কোনও মতে জিনিসটা গছিয়ে দিতে পারলে সে যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচে। আর হয়ত এই কারণে হীরেটির যা আসল দাম লোকটি তার দশভাগ শুধু দাম হিসেবে দাবী করেছিল। গ্রেগরী বিয়েতে ঐ হীরেটা আমায় উপহার দিয়েছিল।

আপনার মুখ থেকে সব শুনে আর চিঠিগুলো পড়ে যা বুঝলাম তা এক অবিশ্বাস্য গল্পকথা। পোয়ারো বলল, তা হলেও-কে জানে? ক্যাপ্টেন হেষ্টিংস ছোট পাঁজিটা একবার হাত বাড়িয়ে দাও।

পোয়ারোর নির্দেশ মত হোট পঞ্জিকাটা বের করে হাতে তুলে দিলাম।

এই ত পেয়েছি, কয়েকটা পাতা উল্টে পোয়ারো আপন মনেই বলে উঠল, এই শুক্রবারেই পূর্ণিমা, তার মানে হাতে আর তিন দিন সময় আছে। শুনুন মাদাম, আপনি এখানে এসে আমায় উপদেশ চেয়েছিলেন? এবার সেই উপদেশ আমি দিচ্ছি, মন দিয়ে শুনুন। যে অলীক ইতিহাস আপনার হীরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তা হয়ত সত্যি, হয়ত নয়! আমি তাই বলছি, এই শুক্রবার পর্যন্ত আপনি হীরেটা আমার হেপাজতে রাখুন। ঐ দিনটা কেটে গেলে আমরা আমাদের পছন্দমত যেকোন পথ ধরে এগোতে পারব।

পোয়ারোর প্রস্তাব কানে যেতেই মিস মার্ভেলের সুন্দর ফর্সা মুখের ওপর নেমে এল কালো মেঘের ছায়া, মুখে বললেন, মনে হচ্ছে সেটা আমার পক্ষে সম্ভব হবে না।

তার মানে ওটা এখন এই মুহুর্তে আপনার কাছেই আছে? পোয়ারো মিস মার্ভেলকে খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে বলে উঠল।

কোনও উত্তর না দিয়ে মিস মার্ভেল তার গলা থেকে খুলে আনলেন একটি পাতলা চেন, সেটা মুঠোয় ধরে তিনি এগিয়ে এলেন। পোয়ারোর চোখের সামনে এনে হাত খুললেন। সঙ্গে সঙ্গে আমার দুচোখ ধাধিয়ে গেল, দেখলাম তার ভান হাতের পাতায় রাখা একখণ্ড সাদা আগুন প্ল্যাটিনামে সেট করাশ্য ওয়েস্টার্ণ স্টার! সেই চোখ ধাঁধানো একখণ্ড সাদা আগুনের দিকে তাকিয়ে পোয়ারো আওয়াজ তুলে শ্বাস নিল। বিড়বিড় করে বলল, মাফ করবেন মাদাম, একটু ছুঁয়ে দেখছি। বলে হীরেটা দু আঙ্গুলে তুলে নিল সে, খোলা চোখে এক পলক যাচাই করে আবার সেটা তার হাতের মুঠোয় ফিরিয়ে বলল, খটি বেদাগ হীরে, এমন একটা দামী জিনিস আপনি সব সময় গলায় ঝুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন? কি সর্বনাশ।

না, মশিয়ে পোয়ারো, মিস মার্ভেল বললেন, এটা শুধু আপনাকে দেখানোর জন্য আজ গলায় পরে এসেছি। অন্য সময় এটা আমার গয়নার বারে থাকে আর সেটা থাকে হোটেলের সেফ ডিপোজিট ভস্টে। আমরা ওখানে দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট হোটেল উঠেছি, ওখানে যে ভল্ট আছে, এটা সেখানেই রাখা থাকে।

তাহলে আপাতত এটা আপনি আমার কাছেই রাখছেন, তাই ত? পোয়ারো জানতে চাইলো।

আপনি আমায় ভুল ভুঝবেন না মঁসিয়ে পোয়ারো, মিস মার্ভেল হেসে হেসে বললেন, আসলে মুসকিল হয়েছে আসছে শুক্রবার আমরা ইয়ার্ডলি চেজ যাচ্ছি, লর্ড আর লেডি ইয়ার্ডলির কাছে কিছুদিন থাকব আমরা তাই এটা এক্ষুণি আপনার কাছে রেখে যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।

ইয়ার্ডলি চেজ-সর্ড আর লেডি ইয়ার্ডলি! নাম দুটো যেন আগেও শুনেছি বলে আমার মনে হল, কিন্তু কবে, কোথায়, কার মুখে, কি প্রসঙ্গে শুনেছি তা তখনই মনে করতে পারলাম না। মনটা তখনকার মত অন্যদিকে ঘুরিয়ে ভাবতে লাগলাম। একটু ভাবতেই মনে পড়ল আমার কয়েক বছর আগের ঘটনা যা সেইসময় এক বিরাট কেচ্ছার আকার নিয়েছিল। সংক্ষেপে ব্যাপারটা হল, বছর কয়েক আগে লর্ড আর লেডি ইয়ার্ডলি একসঙ্গে আমেরিকায় গিয়েছিলেন, সেখানে লেডি ইয়ার্ডলির নাম ক্যালিফোর্নিয়ার এক নামী চলচ্চিত্রাভিনেতার নামের সঙ্গে জড়িয়ে কেচ্ছা রটেছিল। কি আশ্চর্য বিদ্যুৎ ঝলকের মত সেই অভিনেতার নাম আমার মনে পড়ে গেল— গ্রেগরী বি রলফ, অর্থাৎ মিস মেরী মার্ভেলকে যিনি বিয়ে করেছেন বলে জেনেছি, সেই ভদ্রলোক।

একটা খুবই গোপনীয় বিষয় আমি আপনাকে জানাচ্ছি, মঁসিয়ে পোয়ারো, মিস মার্ভেল মুখে হাত চাপা দিয়ে বললেন, লর্ড ইয়ার্ডলির সঙ্গে আমাদের একটা ব্যবসায়িক চুক্তির কথাবার্তা চলছে, ওর পূর্বপুরুষেরা যেখানে দিন কাটাতেন সেই জায়গায় আমরা একটা ছবির স্যুটিং করব ভাবছি, অতীতের ইয়ার্ডলি নাইট আর জমিদারদের কেন্দ্র করেই ঐ ছবি তোলা হবে।

তার মানে আপনি ইয়ার্ডলি চেজের কথা বলছেন, আমি বিস্ময় চাপতে না পেরে চেঁচিয়ে বললাম, ইংল্যাণ্ডে যত দেখার মত জায়গা আছে ইয়ার্ডলি চেজ তাদের মধ্যে একটি।

ঠিকই ধরেছেন, মিস মার্ভেল ঘাড় নেড়ে সায় দিলেন, পুরো ব্যাপারটার জন্য লর্ড চেঞ্জ প্রচুর দাম হাঁকছেন, আমি এখনও জানিনা শেষ পর্যন্ত কাজটা আদৌ হবে কিনা। তবে গ্রেগ একটু বেপরায়ো গোছর লোক, তাছাড়া ব্যবসায় মধ্যে কিছু আমোদ প্রমোদ টেনে আনা ওর বরাবরের শখ।

কিন্তু আমি আমতা আমতা করে বললাম, আমার অধিকারের পীর মধ্যে থেকেই বলছি, আপনার ঐ দামী হীরেটা সঙ্গে নিয়ে ইয়ার্ডলি চেজ কি আপনার না গেলেই নয়?

উঁহু, মিস মার্ভেলের ছেলেমানুষী ভরা চাউনী নিমেষে ধূর্ততার কাঠিন্যে মিলিয়ে গেল, কিছুটা শক্ত গলাতে তিনি বললেন, এটা গলায় পরেই আমি ওখানে যাব।

তাহলে তাই যান, আমিও সঙ্গে সঙ্গে নিজের সুর পাল্টে বললাম, লর্ড ইয়ার্ডলির কাছেও শুনেছি এমন প্রচুর দামী রত্ন আছে যাদের পেছনে আছে কোনও কোন ঐতিহাসিক ঐতিহ্য, এছাড়া একটা বড় হীরেও তাদের কাছে আছে শুনেছি। ঠিকই শুনেছেন, মিস মার্ভেল সংক্ষেপে বললেন।

তাহলে লেডি ইয়ার্ডলির সঙ্গে আপনার ইতিমধ্যেই পরিচয় হয়েছে।

পোয়ারো প্রশ্ন করল, নাকি আপনার পতিদেবতা ওকে আগেই চিনতেন?

লেডি ইয়ার্ডলি তিনবছর আগে আমেরিকায় গিয়েছিলেন, একমুহূর্ত দ্বিধা করে কি ভেবে উত্তর দিলেন মিস মার্ভেল, তখন ওঁদের চেনাজানা হয়েছিল। ইয়ে-মানে আপনারা কেউ সোসাইটি গসিপ কাগজটা পড়েন?

পোয়ারো আর আমি দুজনেই তার প্রশ্ন শুনে লজ্জায় মুখ নীচু করলাম।

জানতে চাইছি তার কারণ এ হপ্তায় ঐ কাগজে বিখ্যাত প্রচীন রত্ন সম্পর্কে একটি প্রবন্ধ ছেপেছে আর ওটা সত্যিই পড়ে দেখার মত বলেই তিনি চুপ করে গেলেন।

আমি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম, এককোণে রাখা সেই কাগজটা নিয়ে আবার ফিরে এলাম। কাগজটা চোখে পড়তেই মেরী আমার হাত থেকে প্রায় ছিনিয়ে নিলেন, নির্দিষ্ট প্রবন্ধটি খুঁজে বের করে জোরে জোরে পড়তে লাগলেন।

…অন্যান্য বিখ্যাত প্রাচীন রত্নের মধ্যে আছে ষ্টার অফ দ্য ইস্ট নামে একটি বড় বেদাগ হীরে যা বহু বছর ধরে ইয়ার্ডলির জমিদার পরিবারের হেপাজতে আছে। বর্তমানে লর্ড ইয়ার্ডলির কোনও এক পূর্বপুরুষ চীন থেকে ঐ হরেটি নিয়ে এসেছিলেন, এর সঙ্গে এক অলীক কাহিনী জড়িত তা হল, কোনও এক মন্দিরের বিগ্রহের ডান চোখে বসানো ছিল ঐ হীরে। হুবহু ঐরকম আরেকটি হীরে বসানো ছিল ঐ বিগ্রহের বাঁ চোখে, এবং কথিত আছে, এই হীরেটিও চুরি হবে। একটি হীরে যাবে পশ্চিমের কোন একটি দেশে, অন্যটি যাবে পূর্বদিকে। ভবিষ্যতে ঐ দুটি হীরে ফিরে আসবে সেই মন্দিরের বিগ্রহের কাছে। এটা নিছক কাকতলীয় যে বর্তমানে ঐরকম একটি হীরের নাম শোনা গেছে বা স্টার অফ দ্য ওয়েস্ট অথবা দ্য ওয়েস্টার্ণ স্টার নামে পরিচিত আপাততঃ বিখ্যাত চিত্রতারকা মিস মেরী মার্ভেলের হেপাজতে ঐ হীরেটি আছে। দুটি রত্নের মধ্যে সাদৃশ্য ওজনগত তুলনা সত্যিই যথেষ্ট কৌতুহল জাগাবে।

ও এই হল ব্যাপার, পোয়ারো নিজের মনে বলে উঠল প্রথম প্রেমের ফল। পরমুহুর্তে মেরীর দিকে তাকাল সে, গম্ভীর গলায় বলল, এসব পড়েও আপনি এক ভয় পান না মাদাম? ধরুন, কোনও চীনে বদমাশ শেষপর্যন্ত সত্যিই ওখানে আপনার সামনে এসে হাজির হল তারপর দুটি হীরে একসঙ্গে ছিনিয়ে নিয়ে সে চলে গেল তার দেশ চীনে, তখন কি করবেন আপনি?

পোয়ারো যে মেরীকে নিছক ঘাবড়ে দেবার উদ্দেশ্যে এসব বলছে তা বুঝতে আমার বাকি নেই, কিন্তু এও জানি যে পোয়ারোর হাসি ঠাট্টার মধ্যেও কোনও না কোনও কিছু লুকিয়ে থাকে সেটা পরে ধরা পড়ে।

লেভি ইয়ার্ডলির কাছে যে হীরেটা আছে আমি জানি সেটা আমারটার মত এত ভাল নয়, মেরীর গলায় চিরকালের নারীসত্তা ফুটে বেরোল, তবু আমি একবার নিজের চোখে ওটা দেখতে চাই!

পোয়ারো হয়ত কিছু বলত কিন্তু তার আগেই বন্ধ দরজা বাইরে থেকে সজোরে গেল খুলে সেই সঙ্গে সুদর্শন ও স্বাস্থ্যবান একজন পুরুষ মানুষ ঘরের ভেতরে ঢুকলেন। তার চুলের বাহার থেকে শুরু করে পায়ের চামড়ার জুতোজাড়া দেখে যে কেউ রোমান্টিক নায়ক ছাড়া আর কিছু ভাববে না। সঙ্গে সঙ্গে আমি বুঝতে পারলাম ইনি কে।

ডাবলাম এবার তোমায় ডাকব মেরী, গ্রেগরী রলফ ঘরকানো গলায় বলে, উঠলেন, শেষকালে নিজেই চলে এলাম। যাক, মঁসিয়ে পোয়ারো আশাকরি সব শুনেছেন, এই সমস্যা সম্পর্কে আপনার কি অভিমত তাই একবার শুনি। আমার নিজের ধারণা, এ নিছক ভয় দেখিয়ে লোক ঠকানোর কারবার, জানি না আপনি কি বলবেন?

পোয়ারো গ্রেগরীর দিকে তাকিয়ে উদ্দেশ্যপূর্ণ হাসি হেসে বলল, সে যাই হোক না কেন মিঃ রলফ, আমি আপনার স্ত্রীকে বারণ করেছিলাম যাতে উনি অতবড় হীরেটা সঙ্গে নিয়ে আসছে শুক্রবার দিন ইয়ার্ডলি চেজে না যান।

এবিষয়ে আমি আপনার সঙ্গে একমত, রলফ বললেন মেরীকে, আমি আগেই হুঁশিয়ার করেছিলাম, কিন্তু হলে কি হবে, মেরী নিজে যোলআনা মেয়েমানুষ, গয়নাগাটির ব্যাপারে আরেকজন মেয়েমানুষের কাছে সে হার স্বীকার করে কি করে?

কি সব বাজে বক, গ্রেগরী? মেরী রলফকে কড়াগলায় ধমক দিলেন বটে, কিন্তু স্পষ্ট দেখলাম পুলক মেশানো লজ্জায় লাল হয়ে উঠেছে তার মুখখানা।

মাদাম, পোয়ারো কুষ্ঠিত গলায় বলল, আমি আপনাকে আমার সাধ্যমত সদুপদেশ দিলাম, এর বেশী কিছু করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।

মেরী আর রলফকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে এসে পাটি হয়ে বসল তার চেয়ারে, খুশিখুশি মুখে বলল।

পতিদেবতাটি ভাল সন্দেহ নেই, একদম মোক্ষম জায়গায় ঘা দিয়েছেন।

তবু উনি খেলায়োড় নেহাই কাচা, মেয়েদের খেলানোর কৌশলটা উনি নেন না।

কয়েক বছর আগে ক্যালিফোর্নিয়ায় গ্রেগরীর সঙ্গে লেডি ইয়ার্জলির অসামাজিক প্রেম ভালবাসার সত্যকাহিনী এবার লায়োরোকে যতদূর মনে আছে বললাম, নে সে এমন ভাব দেখালো যা দেখে মনে হল ঘটনাটা তারও মনে আছে।

আমিও ঠিক এমন কিছুই ধরে নিয়েছিলাম, পোয়ারো বলল, যাক, ক্ষন দিয়ে শোন আমি একটু বেরোচ্ছি খানিক পরেইফিরে আসব। আমি ফিরে না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা রে।

পোয়ারো বেরিয়ে যেতে আমি দুচোখ বুজে একটু ঘুমোবার চেষ্টা করছি এমন সময় বাইরে থেকে দরজায় মৃদু টোকা দেবার শব্দ হল! চোখ মেলতেই দেখি ল্যাণ্ডলেডি মিসেস মাচিনসন ঘরের ভেতরে দরজার পাড়া সামান্য ফাক করে মাথাটা ভেতরে ঢুকিয়েছেন। আমি চোখ মেলতেই তিনি বললেন, ক্যাপ্টেন হেস্টিংস, আরেকজন ভদ্রমহিলা মঁসিয়ে পোয়ারোর সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন, দেখে মনে হল দূরের গাঁগঞ্জের লোক। উনি কাজে বেরিয়েছেন শুনে মহিলা বললেন তার খুব দরকার মঁসিয়ে পোয়ারো ফিরে না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন।

তাহলে ওকে বরং এখানেই নিয়ে আসুন, মিসেস মাচিনসন, আমি বললাম, হয়ত আমি ওঁর জন্য কিছু করতে পারি।

একটু পরে মিসেস মাচিনসন যে ভদ্রমহিলাকে ভেতরে নিয়ে এলেন তাকে দেখেই আমার বুকের ভেতরের কলজেটা ধুকপুক করে উঠল বারেকের জন্য। হ্যাঁ, এ মুখ আমার খুবই পরিচিত। এ দেশের সভ্রান্ত ও রক্ষণশীল সমাজের বিভিন্ন কে কেলেংকারী নিয়ে প্রকাশিত মুখরোচক কাহিনীগুলোতে এই মুখের ফোটো বহুবার ছেপে বেরিয়েছে। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি চেয়ার তার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললাম, বসুন, লেডি ইয়ার্ডলি, আমার বন্ধু মঁসিয়ে পোয়ারো একটু বেরিয়েছেন, অল্প কিছুক্ষনের মধ্যেই তিনি ফিরে আসবেন।

ধন্যবাদ জানিয়ে লেডি ইয়ার্ডলি বসলেন আমার মুখোমুখি। কিছুক্ষণ আগে যিনি এসেছিলেন সেই মেরী মার্ভেলের তুলনায় ইনি অত্যন্ত অন্য রকম। লম্বা, ঘন তামাটে গায়ের রং, মুখখানা ফ্যাকাশে হলেও এক সম্ভ্রান্ত গর্ববোধ সেখানে ফুটে উঠেছে। তার দুচোখ অদ্ভুত দীপ্তিময়, ঠোঁট দুটি কামনামদির।

তার সমস্যা নিয়ে কথা বলার সাধ জাগল আমার মনে। আর জাগবে নাই বা কেন? বন্ধুবর পোয়ারো সামনে থাকলে বেশীর ভাগ সময় আমি কিছু অসুবিধা বোধ। করি নিজের কোণি দেখাতে পারি না বলে। অ হলেও গোয়েন্দাগিরি করার কিছু ক্ষমতা সীমিত পরিমাণে যে আমার মধ্যেও আছে তাতে কোনও সন্দেহ নেই। ভেতরের সেই তাগিদেই সামনের দিকে ঘাড় ঝুঁকিয়ে বললাম, লেডি ইয়ার্ডলি, আপনি কেন কি কারণে এখানে এসেছেন তা আমি জানি। হীরে সম্পর্কে আপনি অচেনা কোনও লোকের কাছ থেকে উড়ো চিঠি পেয়েছেন যা ব্ল্যাকমেলিং বলে আপনার সন্দেহ হবে।

প্রশ্ন শোনার সঙ্গে সঙ্গে লেডি ইয়ার্ডলির গাল দুটো গেল চুপসে, আমার মনে হল সেখানকার সব রক্ত কেউ শুষে নিয়েছে। হাঁ করে অবাক চোখে আমার দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, আপনি কি ভাবে জানলেন?

এত সাধারণ মুক্তির নিয়ম, আমাদের হাসি হেসে বললাম, মিস মেরী মার্ভেল যদি ভয় দেখানো চিঠি পান তাহলে–

মিস মার্ভেল? লেডি ইয়ার্ডলি ব্যাকুলভাবে প্রশ্ন করলেন, উনি এখানে এসেছিলেন?

হ্যাঁ, পাবিক সুর বজায় রেখে বললাম, অর্থাৎ কিছুক্ষণ হল উনি গেছেন। তা যা বলছিলাম, জোড়া হীরের একটি ওঁর কাছে আছে আর তাকে কেন্দ্র করেই উনি যখন বারবার ভয় দেখানো রহস্যময় চিঠি পাচ্ছেন তখন অন্য হীরেটি যার হেলাতে আর সেই আপনিও নিশ্চয়ই একই ধরণের কিছু উড়ো চিঠি পেয়েছেন। এটা কত সহজ ও সরল ব্যাপার তা দেখলেন ত? তাহলে বলুন, আপনিও ঐরকম কয়েকটি ভয় দেখানো চিঠি পেয়েছেন?

মুহুর্তের জন্য তিনি দ্বিধা করলেন যা দেখে মনে হল আমাকে বিশ্বাস করে কিছু বলা ঠিক হবে কি না তা বুঝতে পারছেন না, কিন্তু পরক্ষণেই হেসে বিনীতভাবে আনালেন, আপনি ঠিকই ধরেছেন।

কি ভাবে পেয়েছেন চিঠিগুলো, প্রশ্ন করলাম, কোনও চীনে যুবক এসে কি হাতে হাতে দিয়ে গেছে?

আজ্ঞে না, লেডি ইয়ার্ডলি বললেন, চিঠিগুলো সব ডাকে পেয়েছি। আচ্ছা বলুন না, মিস মার্ভেলের বেলাতেও কি একই রকম সব ঘটনা ঘটেছে?

আমি সকালবেলায় যা যা ঘটেছে সব তাকে জানালাম, লেডি ইয়ার্ডলি সব কিছু মন দিয়ে শুনে বললেন, দেখতে পাচ্ছি আমাদের দুজনের বেলায় একই রকম ঘটনা ঘটেছে, ওঁকে যে চিঠিগুলো পাঠানো হয়েছে আমাকেও পাঠানো চিঠিগুলো তাদেরই প্রতিলিপি। একটাই তফাৎ যে উনি হাতে হাতে চিঠিগুলো পেয়েছেন আর আমি পেয়েছি ডাকে। আরেকটা অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ্য করেছি তাহল আমি যে চিঠিগুলো পেয়েছি তাদের সবকটায় মিশে আছে একরকম অদ্ভূত কড়া গন্ধ, যেমন গন্ধ পাওয়া যায় ধূপকাঠি জ্বালালে। এই গন্ধ পাবার পরে আমার মনে হচ্ছে চিঠিগুলো পূবের কোনও দেশ থেকে হয়ত এসেছে। কিন্তু এ সবের মানে কি বলতে পারেন!

সেটাই ত আমাদের খুঁজে বের করতে হবে, তার প্রশ্নের উত্তর দিতে না পেরে বললাম, চিঠিগুলো আপনি সঙ্গে এনেছেন? ডাক টিকিটের ওপর যে শীলমোহর পড়েছে তা দেখে আমরা হয়ত কিছু খুঁজে পেতাম।

খুবই দুর্ভাগ্যের ব্যাপার যে খাম সমেত সবগুলো চিঠি আমি আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে ফেলেছি, লেডি ইয়ার্ডলি জানালেন, গোড়ায় আমি ধরেই নিয়েছিলাম যে কেউ নিছক মজা পাবার জন্য আমায় এমনি ভয় দেখিয়ে চিঠি লিখছে। একদল চীনে বদমাস সত্যিই ঐহীরে দুটো যোগাড় করতে উঠে পড়ে লেগেছে একথা বিশ্বাস করতে কি মন চায়? কোন সু বুদ্ধিসম্পন্ন লোকের কাছে এই ধারণা বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হবে বলতে পারেন?

যে সব ঘটনা ঘটেছে তাই নিয়ে আমরা দুজনে আরও কিছুক্ষণ কথা বললাম কিন্তু তাতে রহস্যের সামানতম সমাধানও হল না। সেখানে লেডি ইয়ার্ডলি উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, মনে হচ্ছে মঁসিয়ে পোয়ারোর জন্য আর অপেক্ষা করে আমার লাভ হবে না। আমি যেজন্য এসেছিলাম আশাকরি সে সবই আপনি ওঁকে বুঝিয়ে বলতে পারছেন, কেমন? যথেষ্ট ধন্যবাদ আপনাকে, ইয়ে কি যেন আপনার নাম

ক্যাপ্টেন হেস্টিংস, হ্যাঁ, এইবার মনে পড়েছে। ক্যাভেণ্ডিসরা আপনার খুব চেনা, তাই না? মেরী ক্যাভেণ্ডিসই আমায় দিয়ে পোয়ারোর কাছে পাঠিয়েছিলেন।

পোয়ারো ফিরে এলে আমি তার অনুপস্থিতিতে যিনি এসেছিলেন তার নাম এবং তার কাছ থেকে যা যা জেনেছি সবকিছু খুলে বললাম, সব শুনে সে লেডি ইয়ার্ডলির সঙ্গে আমার যা কথাবার্তা হয়েছে সেগুলো খুঁটিয়ে জানার জন্য যেভাবে একের পর এক প্রশ্ন ছুঁড়তে লাগল তা রীতিমত জেরার পর্যায়ে পড়ে।

পোয়রোর জেরার ধরণ শুনে স্পষ্ট বুঝতে পারলাম যে কিছুক্ষণ আগে বাইরে যেতে হয়েছিল বলে এখন তার ক্ষোভ হয়েছে, লেডি ইয়ার্ডলির সঙ্গে দেখা না হওয়ায় মোটেই খুশি হয়নি সে। আমার ক্ষমতাকে খাটো করে দেখাটা এখন তার স্বভাবে পরিণত হয়েছে, আর সেই সঙ্গে এখনও মনে হচ্ছে যে আমার বুদ্ধির কোনও সমালোচনা করার পথ না পেয়ে ও ভেতরে ভেতরে খুবই ক্ষেপে উঠেছে। ব্যাপারটা উপলব্ধি করে আমি ভেতরে ভেতরে যথেষ্ট আত্মপ্রসাদ অনুভব করলাম, কিন্তু সেকথা মুখ ফুটে বললে পাছে খ্যাক করে ওঠে সেই ভয়ে চুপ করে রইলাম। যতই খিটখিটে মেজাজ আর বজ্জাতি বুদ্ধি থাকুক না কেন তবু এই বাঁটকুল ও মহা ধুরন্ধর বন্ধুর সঙ্গে আমি সর্বদা একাত্ম হয়ে থাকি।

তাহলে মতলব মতই সব এগোচ্ছে, অনেক্ষণ অত চাউনী মেলে তাকিয়ে থেকে পোয়ারো মন্তব্য করল, হেস্টিংস, ঐ ওপরের তাকে ইংল্যাণ্ডের জমিদারদের কুলজীখানা রাখা আছে, কষ্ট করে ওটা একটু পেড়ে আনোত।

এই তো, পেয়েছি। জমিদারদের কুলজীর কয়েকটা পাতা পরপর উন্টে এক জায়গায় ও থামল, ইয়ার্ডলি জমিদার বংশ…এখন যিনি জমিদার তিনি ঐ বংশের দশম ভাইকাউন্ট, দক্ষিণ আফ্রিকার যুদ্ধে একটি ব্রিটিশ বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ১৯০৭ সালে ব্যারণ বংশের চতুর্থ কন্যা শ্রীমতি মড স্টপারটেনকে বিয়ে করেন… হুম….! দুই মেয়ের বাবা একজন ১৯০০, আরেকজন ১৯১০ সালে জন্মেছে। এইসব ক্লাবে যাতায়াত আছে..নিবাস..না, এখানে যা জানতে চাইছি তা নেই। তবে হেস্টিংস, আগামীকাল সকালে আমরা ইয়ার্ডলির এই হুজুরের কাছে যাচ্ছি!

কি?

হ্যাঁ, ঐ যা বললাম। যাচ্ছি বলে আমি ওকে টেলিগ্রাম পাঠিয়েছি। আমি ত ভেবেছিলাম এই কেস তুমি করবে না স্থির করেছে, আমি বললাম।

তোমার ভাবনাটা কি পুরোপুরি ঠিক হয়নি, পোয়ারো বলল, মিস মার্ভেল আমার উপদেশ মানতে চাননি তাই আমি ওঁর হয়ে কাজ করব না। তবু আমি এই কেসের তদন্ত চালিয়ে যাব, আর তা শুধু আমার নিজের—এরকুল পোয়ারোর আত্মতৃপ্তির জন্য। নাচতে নেমে আর ত পিছিয়ে যাওয়া যায় না ভাই।

এবং শুধু তোমার আত্মতৃপ্তির জন্য তুমি লর্ড ইয়ার্ডলিকে গা ছেড়ে সাত তাড়াতাড়ি শহরে আসবার জন্য টেলিগ্রাম করেছো? বড় হুজুর কিন্তু তোমার এহেন আচরণে আদৌ খুশি হবেন না।

হবেন, খুশি হবেন, পোয়ারো মুচকি হাসল, ওদের এতদিনের ঐতিহ্যবাহী দামী হরেটা যদি আমার জন্য শেষপর্যন্ত বেঁচে যায় তখন উনি সত্যিই খুশি হবেন কি আজীবন কৃতও থাকবেন।

তাহলে—তাহলে তুমি বলতে চাও ওটা খায়ো যাবার সম্ভাবনা সত্যিই আছে? আমি জানতে চাইলাম।

সেটা প্রায় নিশ্চিত, পোয়ারো জবাব দিল, ঘটনাপ্রবাহ যে ঐদিকেই যাচ্ছে তা কি তুমি নিজেও বুঝতে পারছে না?

কিন্তু কিভাবে? কেমন করে?

ব্যাস, আর একটি কথাও নয় ক্যাপ্টেন, দোহাই তোমার। অযথা কথা বলে মাথাটা ঝুলিয়ে দিয়োনা। পোয়ারো ইংল্যাণ্ডের জমিদারদের পেল্লাই কুলজীখানা বন্ধ করে আমার হাতে ফিরিয়ে দিল, নাও, বইখানা যেখানে ছিল ঠিক সেখানে রেখে দাও। থাকে থাকে ভালো করে বইগুলো রাখো তার নীচে, আয়তনে ছোট যেগুলো সেগুলো রাখো তার নীচে এইভাবে। সবকিছুতেই একটা শৃঙ্খলা থাকা দরকার। ক্যাপ্টেন হেস্টিংস যে কথাটা এর আগেও বহুবার পইপই করে শুনিয়েছি তোমায়।

ঠিক বলেছে, বলে আমি সেই বিকালে বইখানা দুহাতে তুলে নিয়ে তার আগের জায়গায় ঢুকিয়ে দিলাম।

লর্ড ইয়ার্ডলি বেশ হৈচৈ করা আমুদে স্বভাবের লোক এবং সুরসিক।

কি সব অদ্ভুত ব্যাপার ঘটছে দেখুন মঁসিয়ে পোয়ারো, যার ল্যাজা মুড়ো কিছুই খুজে পাচ্ছি ন লর্ড ইয়ার্ডলি বললেন, আশা করি শুনেছেন যে আমার গিন্নী কতগুলো উড়ো চিঠি পেয়েছেন, আবার ও একই ধরণের চিঠি পেয়েছেন মিস মার্ভেলও। আপনিই বলুন, এসবের মানে কি?

পোয়ারো সোসাইটির মাসিক পত্রিকার একটি সংখ্যা তার হাতে দিয়ে বলল, তার আগে মিঃ লর্ড, আমি জানতে চাই হীরে সম্পর্কে যা কিছু এখানে ছেপে বেরিয়েছে তা সত্যি কিনা?

একনজর তাকিয়ে খবরটুকু পড়ে তার মুখ রাগে লাল হয়ে উঠল, কাগজখানা তখুনি পায়োয়োকে ফিরিয়ে দিয়ে বলে উঠলেন, এসব পুরো গাঁজাখুরি গপ্পে! হীরের পিছনে কোনও অলীক কাহিনী নেই, কোনকালে ছিলও না। এ হীরেটি এসেছে ভারত থেকে অদ্ভুতঃ আমার নিজের তাই দৃঢ় বিশ্বাস। কোনও চীনে ঠাকুর দেবতার চোখে হীরে বসানো ছিল এমন কথা কখনও শুনিনি।

তা সত্ত্বেও এ হীরেটি দ্য ষ্টার অফ দ্য ইষ্ট নামেই খাত।

বেশ, কিন্তু তাতে হল কি? শর্ডের পাল্টা প্রশ্ন শুনে বুঝলাম তিনি বেশ চটেছেন।

পায়োরার ঠোঁটে এবার ফুটে উঠল অর্থব্যঞ্জক হাসি, স্বাভাবিক সুরে সে বলল মি লর্ড, আপনি আপনার এই সমস্যাটা পুরোপুরি আমার ওপর ছেড়ে দিন। কোনরকম সঙ্কোচ না করে যদি তা করেন, তাহলে আপনার বিপদ কাটিয়ে দিতে পারব এ বিশ্বাস আমার আছে।

তাহলে আপনার মতে এসব নেহাৎ গালগপ্পে নয়, এর ভেতরে কিছুটা সত্যি আছে?

আপনি আমার কথামত কাজ করবেন? নিশ্চয়ই করব, কিন্তু

তাহলে আপনার অনুমতি নিয়ে কয়েকটা প্রশ্ন করছি, আশাকরি সদুত্তর দেবেন। ইয়ার্ডলি ষ্টেজে স্যুটিং করার ব্যাপারে আপনি কি মিঃ রফের সঙ্গে চুক্তি করেছেন?

ও উনি আপনাকে এ বিষয়ে সব বলেছেন, তাই না? না, এখনও পর্যন্ত পাকাপাকিভাবে তেমন কিছু হয়নি, সামান্য ইতস্ততঃ করলেন লর্ড ইয়ার্ডলি। তার মুখের পোড়া রং ইটের মত লালচে হয়ে উঠেছে দেখে বুঝলাম ভেতরে ভেতরে উত্তেজিত হয়েছেন।

মঁসিয়ে পোয়ারো, জীবনে বহুবার আমাকে ঠকতে হয়েছে–কাল পর্যন্ত দেনায় ড়ুবে আছি আমি কিন্তু আমি সব ঝেড়ে ফেলে আবার উঠে দাঁড়াতে চাই। আমি আমার সন্তানদের ভালবাসি, সেইসঙ্গে যা কিছু ঝামেলা সব চুকিয়ে ফেলতে চাই, তাছাড়া আমার পৈত্রিক জমিদারীতেই জীবন কাটাতে চাই। গ্রেগরী রলফ আমায় প্রচুর টাকা দিতে চাইছেন। আমার ধার দেনা মিটিয়ে আবার নিজের পায়ে উঠে দাঁড়াতে যে টাকা দরকার, ওঁর অফার করা টাকার পরিমাণ তার চাইতে অনেক বেশী। কিন্তু এ টাকা নিতে আমার মন চাইছে না—বাড়ির ভেতরে স্যুটিং হচ্ছে, ভীড়ের গাদাগাদি হৈচৈ, চেঁচামেচি, এসব ভাবতেও আমার ঘেন্না হয় কিন্তু হয়ত আমাকে তাই মেনে নিতে হবে, যতক্ষণ পর্যন্ত না- এইটুকু বলেই থেমে গেলেন লর্ড ইয়ার্ডলি।

পোয়ারো এতক্ষণ তীক্ষ্ণ চাউনী মেলে দেখছিল তাঁকে, তিনি থামতেই সে বলে উঠল।

তাহলে আপনার হাতে আরও একটি বিকল্প আছে? সেটা কি দ্য স্টার অফ দ্য ইষ্ট? আপনি কি ঐ হীরেটা বিক্রী করার কথা বলছেন?

ঠিকই ধরেছেন, ঘাড় নেড়ে সায় দিলেন লর্ড ইয়ার্ডলি, গত কয়েক পুরুষ ধরে ঐ হীরেটা আমাদের পরিবারে আছে। মজার ব্যাপার দেখুন, পূর্বপুরুষেরা কেউ ওটাকে দেবত্র সম্পত্তি করে যাননি যার ফলে ওটা বিক্রী করার অধিকার আমার পুরোপুরি আছে। তাহলেও এমন দুর্লভ হীরে কিনবে এমন খাঁটি সমঝদার খদ্দেরই বা কোথায় কজন আছে? হ্যাটন গার্ডেন কোম্পানীর দালাল আছে হফবান, ভাল খদ্দের খুঁজে বের করার কথা ওকে অনেক বলে দেখেছি। কিন্তু তেমন খদ্দের যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওকে খুজে বের করতে হবে নয়ত আমায় শেষকালে জলের দরে এটা বেচে দিতে হবে।

আর একটা প্রশ্ন, মি লর্ড, পোয়ারো প্রশ্ন করল, আপনি যা করতে চাইছেন তাতে লেডি ইয়ার্ডলির মত আছে?

উনি হীরেটা বিক্রী করতে মোটেই চান না, লর্ড জবাব দিলেন, মেয়েমানুষের স্বভাবের কথা আপনাকে আর কি বলব। উনি চান আমাদের বাড়িতে ছবি তোলা হোক, বড় বড় তারকারা আসুন স্যুটিং করুন, এইসব।

আপনি এক্ষুণি বাড়ি যেতে চাইছেন, মি লর্ড? পোয়ারো এক মুহূর্ত কি ভেবে বলল, কিন্তু আমার সঙ্গে আপনার যেসব কথাবার্তা হল তা ভুলেও যেন কাউকে বলবেন না। মনে রাখবেন আমরা আজই বিকেল পাঁচটার কিছু পরে ওখানে যাচ্ছি।

বেশ, কিন্তু অবস্থাটা শেষ পর্যন্ত কি দাঁড়াবে তা এখনও বুঝে উঠতে পারছি না, লর্ড ইয়ার্ডলির গলায় নিশ্চিত্ততার কোনও ভাব সত্যিই পেলাম না।

আপনার হীরেটা যাতে খায়ো না যায় তা আমি দেখব, এটাই আপনি চান, তাই? পোয়ারো বলল।

হ্যাঁ, কিন্তু!

হলে যা বলছি তাই করুন!

বিভ্রান্ত মুখে ইয়ার্ডলি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন।

বিকেল সাড়ে পাঁচটার পরে আমরা পোঁছোলাম ইয়ার্ডলি চেজে লর্ড ইয়ার্ডলির খাস জমিদারীতে। দুধে সোনালী জরির বিল্লা আঁটা ফুলহাতা সাদা জ্যাকেট আর লাল ফিতে লাগানো ট্রাউজার্স পরা এক পেটমোটা বাটলারের পেছন পেছন পোয়ারো আর আমি এসে হাজির হলাম ইয়ার্ডলি ভবনের ড্রইংরুমে। ঘরের ভেতরে পুরোনো মানার অভিজাত্যের ছাপ এখনও টিকে রয়েছে, ফায়ার প্লেসের কাঠ ভূছে গমগম করে। ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছেন সুন্দরী লেডী ইয়ার্ডলি তার দুই মেয়েকে নিয়ে, মেয়ে দুটিও তাদের মায়ের মতন সুন্দর দেখতে। ঘন কালো চুলে ভরা মাথাটা গর্বিত ভঙ্গীতে মেয়েদের মাথার ওপর নুইয়ে দাঁড়িয়ে আছেন লেডী ইয়ার্ডলি। অপূর্ব দেখাচ্ছে তাকে এভাবে। লর্ড ইয়ার্ডলি হাসিমুখে মেয়েদের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছেন।

বাটলার দুপা এগিয়ে আমাদের আগমনবার্তা জানাতেই ইয়ার্ডলি নিমেষে চমকে উঠে তাকালেন, তার স্বামীর পোয়ারোর মুখের দিকে তাকানোর ভঙ্গী দেখে বুঝতে বাকি রইল না যে অতঃপর কি করবেন তা ইঙ্গিতে জানতে চাইছেন তার কাছে।

মাফ করবেন, পোয়ারো পরিস্থিতি সামাল দিতে সঙ্গে সঙ্গে বলল, মিস মার্ভেলের কেসের তদন্তু এখনও আমি চালিয়ে যাচ্ছি। আচ্ছা, আগামী শুক্রবার দিন ত ওর এখানে আসার কথা, তাই না? তার আগে সবকিছু ঠিকঠাক আছে কিনা তা নিজের চোখে একবার দেখতেই আমি চলে এলাম। আর হ্যাঁ, তাছাড়া আমার এখানে আসার পেছনে আরো একটা কারণ আছে—আমি লেডি ইয়ার্ডলির কাছে জানতে এসেছি যেসব উড়ো চিঠি উনি পেয়েছিলেন তাদের সাথে কোন পোেষ্ট অফিসের ছাপ মারা ছিল তা ওর মনে আছে কি?

দুঃখিত, লেডী ইয়ার্ডলি ঘাড় নেড়ে জানালেন, নামগুলো আমার এই মুহুর্তে আদৌ মনে পড়ছে না। চিঠিগুলো নষ্ট করে আমি খুবই বোকামি করেছি একথা স্বীকার করছি, কিন্তু আমারই বা কি দোষ বলুন, ব্যাপারটা যে শেষকালে এমন গুরুত্ব নেবে তা আমি আগে স্বপ্নেও ভাবিনি।

আপনারা রাতটা এখানেই থাকছেন ত? লর্ড ইয়ার্ডলি জানতে চাইলেন।

না, মি লর্ড, পোয়ারো চটপট জবাব দিল, আমরা এখানে পৌঁছেই একটা সরাইয়ে উঠেছি, মালপত্র সব সেখানেই আছে তাই এখানে থেকে আপনাদের অসুবিধা করতে চাইছি না।

আমাদের অসুবিধার কিছু নেই, লর্ড ইয়ার্ডলি বললেন, আমি এক্ষুনি লোক পাঠিয়ে ওগুলো আনিয়ে নিচ্ছি। না, না, বিশ্বাস করুন আপনারা এখানে থাকলে আমাদের বিন্দুমাত্র অসুবিধা হবে না। লর্ড ইয়ার্ডলি বারবার অনুরোধ করছেন দেখে পোয়ারো আর আপত্তি করল না। লর্ড ইয়ার্ডলির পাশে বসে তার মেয়ে দুটির সঙ্গে গল্পে মেতে উঠল সে। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই পোয়ারো মেয়েদের সঙ্গে বেশ জমিয়ে নিল, পোয়ারোর ইশারায় আমাকেও হাত ধরে টেনে তাদের পাশে এনে বসিয়ে দিল তারা। কিছুক্ষণ বাদে গালফুলো গম্ভীর দেখতে একজন ধাই মেয়েদের ভেতরে নিয়ে যেতে এল, ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও মায়ের চোখের ইশারায় তারা ধাইয়ের পেছন পেছন ভেতরে চলে গেল।

মানুষের জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় হল তার ছেলেবেলা, লেডি ইয়ার্ডলির উদ্দেশ্যে মন্তব্য করতে গিয়ে পায়োয়োর গলা থেকে একরাশ শ্রদ্ধা ঝরে পড়ল। আপনার সন্তানদের দেখে আজ সেকথা নতুন করে মনে পড়ল।

ওদের আমি কত স্নেহ করি, ভালবাসি তা বলে বোঝাতে পারব না। কথাটা বলতে গিয়ে লেডি ইয়ার্ডলির গলাটা আবেগে ঝুঁজে এল।

ওরাও আপনাকে শ্রদ্ধা করে, ভালবাসে, কুর্নিস করার ভঙ্গিতে মাথা ঈষৎ ঝুঁকিয়ে পোয়ারো বলল, এবং তার সঙ্গত কারণও আছে।

জমিদার বাড়িতে থাকাই যখন সাব্যস্ত করেছি তখন সেখানকার যাবতীয় রীতি মেনে চলতেই হবে। খানিক বাদে বাড়ির ভেতরে ঘন্টা বাজতেই বাটলার এল আমাদের শোবার ঘরে নিয়ে যাবার জন্য। এমন সময় আরেকজন বাটলার একটা থালায় মুখবন্ধ খাম নিয়ে এসে দাঁড়াল লর্ড ইয়ার্ডলির সামনে।

মাফ করবেন, মঁসিয়ে পোয়ারো। লর্ড ইয়ার্ডলি খামটা তুলে একপলক চোখ বুলিয়ে বললেন, এত দেখছি টেলিগ্রাম। খামের মুখ ছিড়ে ভেতর থেকে তারবার্তা বের করে পড়লেন তিনি, তারপর বললেন, আপনাকে এটা জানিয়ে রাখা আমার কর্তব্য, মঁসিয়ে পোয়ারো। টেলিগ্রাম করেছে হফবার্ণ, ও লিখেছে আমাদের হয়েটা কেনার মত একজন আমেরিকানের সন্ধান ও পেয়েছে, আগামীকাল ওর জাহাজ ছাড়বে। তার আগে আজ রাতে ওরা ওদের লোক পাঠাবে, সে এসে পাথরটা যাচাই করে যাবে। হে ঈশ্বর, সত্যিই যদি ওটা এত সহজে বিক্রী হয় তাহলে, এইটুকু বলেই লর্ড ইয়ার্ডলি কেন জানিনা হঠাৎ মাঝপথে থেমে গেলেন। লেডি ইয়ার্ডলি টেলিগ্রামটা হাতে নিয়ে গলা নামিয়ে বললেন, জর্জ, পাথরটা এত দিন ধরে আমাদের পরিবারে আছে ওটা তুমি বিক্রী করতে চাইছে তা আমার ইচ্ছে নয় বলে তিনিও চুপ মেরে গেলেন। মনে হল স্বামীর কাছ থেকে কোনও উত্তর আশা করছেন, কিন্তু তার স্বামী একটি কথাও উচ্চারণ করলেন না। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে লেডি ইয়ার্ডলি আপনমনে বলে উঠলেন, যাই, পোষাকটা পাল্টে ফেলি, মালটা দেখাবার ব্যবস্থাও আমাকেই করতে হবে, বলেই পায়োরের দিকে তাকিয়ে ভুরু সামান্য কুঁচকে গম্ভীর গলায় বললেন, এত বিশ্রী নোংরা আর ভয়ানক নেকলেসের নকশা আগে কোথাও হয়নি। পাথরগুলো নতুন করে সেট করে একটা নেকলেস গড়িয়ে দেবে একথা জর্জের মুখে বহুবার শুনেছি, কিন্তু এ কথা দেয়াই সার হয়েছে, নতুন নেকলেস আজও আমার কপালে জোটেনি! বলেই তিনি ভেতরের দিকে চলে গেলেন।

আরও আধঘন্টা কাটল, বিশাল ড্রইংরুমে আমরা তিনজন বসে আছি লেডি ইয়ার্ডলির অপেক্ষায় ডিনারের সময় কয়েক মিনিট হল পেরিয়েছে।

হঠাৎ সামান্য খস্ খস্ শব্দ হতে চোখ তুলে দরজার দিকে তাকালাম, দেখলাম পা পর্যন্ত লম্বা দামী সাদা পোষাক পরে সেখানে এসে দাঁড়িয়েছেন লেডি ইয়ার্ডলি। তাঁর গলার দিকে চোখ পড়তেই চমকে উঠলাম, মনে হল সেখানে যেন ধ্বকধ্বক করে জ্বলছে সাদা আগুনের স্রোতরাশি। পরমুহূর্তে বুঝতে পারলাম সাদা আগুন বলে যা মনে হচ্ছে তা আসলে হীরের জ্যোতি— দ্য ষ্টার অফ দ্য ইষ্ট! বাঁ হাত কোমরে রেখে ডান হাতে সেই হীরের নেকলেসটা ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছেন লেডি ইয়ার্ডলী গর্বিত ভঙ্গিতে, এই মুহূর্তে তাকে ঠিক গভীর গহন জঙ্গলের এক হিংস্র চিতাবাঘিনীর মত দেখাচ্ছে।

এটা আপনাদের সামনে বলি দেব, লেডী ইয়ার্ডলি হালকা রসিকতা করতে চাইলেও তার গলায় অদ্ভুত হিংস্র শোনা, একটু অপেক্ষা করুন, আগে বড় বাতিটা জ্বালিয়ে নিই তারপর ইংল্যাণ্ডের সবচাইতে বিশ্রী আর যাচ্ছেতাই দেখতে নেকলেসটা আপনাদের সামনে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করব আমি আজই এখুনি! দামী জিনিস কিভাবে নষ্ট করতে হয় তাই দেখুন আপনারা।

ঘরের বৈদ্যুতিক আলোর সবকটি সুইচ ছিল তিনি যে দরজার ওপর এসে দাঁড়িয়েছেন তার ঠিক পিছনে। লেডি ইয়ার্ডলি সেদিকে হাত বাড়াতেই ঘটে গেল এক অদ্ভুত ঘটনা আগে থাকতে কোন জানান না দিয়ে এঘরের আলেগুলো সব নিভে গেল। দরজার পান্নাতেও কোন কিছু ধাক্কা লেগে প্রচন্ড জোরে আওয়াজ উঠলো। এবং সেই সঙ্গে দরজার ওপার থেকে ভেসে এলো নারী কন্ঠে সুতীব্র আর্তনাদ।

কি ব্যাপার? লর্ড ইয়ার্ডলি উত্তেজিত হয়ে উঠলেন, এতে মডের গলা! কি হল?

লর্ড ইয়ার্ডলি আগেই চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন, এবার আমরাও অন্ধকারের ভেতর হাতড়ে হাতড়ে এগোলাম দরজার দিকে। কয়েক পা এগোতে আঁধারে চোখে পড়ল। সামনে কি যেন দলা পাকানো অবস্থায় পড়ে আছে মেঝের উপর। টর্চ বের করে জ্বালাতেই দেখলাম দলাপাকানো অবস্থায় যেটা পড়ে আছে সেটা লেডি ইয়ার্ডলির অচেতন দেহ, এই মুহূর্তে তার গলা খালি, সেখানে দড়ির ফাঁসের মত একটা লাল দাগ ফুটে উঠেছে—নেকলেসটা জোর করে কেউ গলা থেকে ছিনিয়ে নেবার ফলে যে ঐ দাগ ফুটে উঠেছে তার গলায় এবিষয়ে আমাদের কোনও সন্দেহ রইলনা।

ততক্ষণে ঘরের বৈদ্যুতিক আলোগুলো আবার জ্বলে উঠেছে। আমরা তিনজনে উবু হয়ে তার মাথার কাছে বসলাম, হাতের শিরা পরীক্ষা করে দেখলাম লেডি ইয়ার্ডলি এখনও বেঁচে আছেন, হৃৎপিন্ডের গতিও স্বাভাবিক। তাহলে?

হঠাৎ চোখ মেলে চাইলেন লেডি ইয়ার্ডলি, বলে উঠলেন, চীনে, লোকটা জাতে চীনে, পাশের দরজা দিয়েই— বলেই থেমে গেলেন তিনি।

স্ত্রীর কথা কানে যেতেই একটা কঠিন শব্দ বেরিয়ে এল লর্ড ইয়ার্ডলির মুখ থেকে, আমার নিজের বুকের ভিতরে হৃৎপিন্ডটা ধুকপুক করে লাফিয়ে উঠল আবার সেই চীনে! লেডি ইয়ার্ডলি যেখানে দাঁড়িয়েছিলেন সেখান থেকে আরো বড়জোর চল্লিশ গজ দুরে দেয়ালের গায়ে একটা ছোট দরজা, সেখানে এসে দাঁড়াতে চৌকাঠের দিকে চোখ পড়ল আর সঙ্গে সঙ্গে আমি উত্তেজিত হয়ে আমি চেঁচিয়ে উঠলাম। উত্তেজনার মানে ঠিক সেখানেই পড়ে আছে লেডী ইয়ার্ডলির সেই নেকলেস, অল্প কিছুক্ষণ আগেও এটা তিনি গলায় পরেছিলেন। বুঝতে পারলুম ঐ দরজা দিয়ে পালিয়ে যাবার মুখে কোন কারণে চোর বাধা পেয়েছিল আর তখনই এক অসতর্ক মুহূর্তে তার হাত থেকে নেকলেসটা চৌকাঠের কাছে মেঝের উপর পরে যায়। হারানো মাল অবশেষে খুঁজে পেয়েছি ভেবে নেকলেসটা মেঝে থেকে তুলে নিলাম, কিন্তু ভাল করে সেটা খুটিয়ে দেখতে গিয়ে আবার চমকে উঠলাম, চাপা আর্তনাদ বেরিয়ে এল আমার গলার ভেতর থেকে। ততক্ষণে লর্ড ইয়ার্ডলিও এসে দাঁড়িয়েছেন আমার পাশে, নেকলেসের দিকে একপলক তাকিয়ে আমারই মত এক আর্তনাদ বেরিয়ে এল তার নিজের গলা থেকেও। আমাদের দুজনের আর্তনাদের একটাই কারণ লেডি ইয়ার্ডলির নেকলেস থেকে তরল সাদা আগুনের মত দেখতে সেই অমূল্য হীরে দ্য স্টার অফ দ্য ইস্ট উধাও হয়েছে।

তাহলে এই হল ব্যাপার, আমি বললাম, যে এসেছিল সে সাধারণ ছ্যাচরা বা সিঁধেল চোর নয়, শুধু ঐ পাথরটিই ছিল তাদের লক্ষ্য।

কিন্তু লোকটা ভেতরে ঢুকল কোন পথে? লর্ড ইয়ার্ডলি আপন মনে প্রশ্ন করলেন।

এই পথে, আমি দেয়ালে লাগায়ো ছোট দরজাটা ইশারায় দেখিয়ে বললাম।

কিন্তু এটা ত সব সময় তালা বন্ধ থাকে।

অন্য সময় থাকে কিনা জানি না, কিন্তু এখন এই দরজা তালাবন্ধ নেই, বলেই হাতল ধরে টেনে আমি সেই দরজার পাল্লা খুলে ফেললাম। দরজাটা টেনে খোলার সঙ্গে সঙ্গে কি যেন পড়ে গেল মেঝের ওপর। ঝুঁকে তুলে নিতে দেখলাম সেটা একফালি রেশমী কাপড়, তার গায়ে সেলাই করা নকশা দেখে বুঝলাম ওটা কোনও চীনে যুবকের পরনে ছিল, পালিয়ে যাবার সময় দরজার হাতলে লেগে ছিড়ে গিয়ে থাকবে, এই ধাচের নকশা করা রেশমী পোষাক পরার রেওয়াজ এখনও পর্যন্ত শুধু চীনেদের মধ্যেই চালু আছে।

দৌড়ে আসুন সবাই। চেঁচিয়ে বলে উঠলাম, লোকটা এই পথ ধরে নিশ্চয়ই বেশী দূরে যেতে পারেনি।

লর্ড ইয়ার্ডলি, বাটলার, আর রাঁধুনীদের নিয়ে আমি সেই দরজা দিয়ে অনেকদূব পর্যন্ত গেলাম বটে, কিন্তু যাওয়াই সার হল। রাতের আঁধারে চীনে চোর বাবজী তার অনেক আগেই বাড়ির চৌহদ্দি থেকে বেরিয়ে পালিয়ে গেছে। আমরা যে পথ দিয়ে চোর ধরতে গিয়েছিলাম সেই পথ ধরে আবার ফিরে এলাম বাড়িতে। লর্ড ইয়ার্ডলি তার একজন পরিচারককে পুলিশ খবর দিতে তখনই থানায় পাঠালেন।

পোয়ারো কিন্তু চোর ধরতে আমার সঙ্গে যায়নি, সে লেডি ইয়ার্ডলিকে নানাভাবে প্রশ্ন করে বাস্তবে কি ঘটেছে তাই জানতে চাইছিল।

বড় বাতির সুইচটা জ্বালাতে যাব এমন সময় পেছন থেকে লোকটা ঝাপিয়ে পড়ল আমার ওপর, লেডি ইয়ার্ডলি বললেন, ও এত জোরে নেকলেসটা আমার গলা থেকে ছিড়ে নিল যে আমার মাথা গেল ঘুরে। টাল সামলাতে না পেরে আমি মেঝের ওপর পড়ে গেলাম। পড়ে যাবার সময় এক পলকের জন্য দেখলাম লোকটা দেওয়ালের লাগায়ো দরজা দিয়ে পালাচ্ছে, আর তখনই চোখে পড়ল ওর মাথায় পেছনে হোট বাঁধা চুলের হোট বিনুনি আর পরণে হলদে রেশমী আলখাল্লা, তাই দেখেই বুঝলাম লোকটা জাতে চীনে। এইটুকু বলে সম্ভবত ঘটনার আকস্মিকতায় শিউড়ে উঠে থেমে গেলেন লেডি ইয়ার্ডলি। পোয়ারো মন দিয়ে তার বক্তব্য শুনল, একটি প্রশ্ন বা মন্তব্যও করলনা সে।

মিঃ হফবার্নের কাছ থেকে এক ভদ্রলোক দেখা করতে এসেছেন, মি লর্ড, বাটলার ভেতরে ঢুকে চাপা গলায় বলল, আপনারা ওঁর জন্য অপেক্ষা করছেন।

হায় ঈশ্বর! লর্ড ইয়ার্ডলি নিজেই আক্ষেপের সুরে বলে উঠলেন, পরমুহূর্তে স্বাভাবিক গলায় বললেন, তবু ওঁর সঙ্গে আমায় অবশ্যই দেখা করতে হবে। শোন, মুলিংস, এখানে নয়, ভদ্রলোককে লাইব্রেরীতে নিয়ে গিয়ে বসাও, আমি যাচ্ছি।

আর কি আমাদের এখানে থাকা ভাল দেখাবে? পোয়ারোকে একপাশে ডেকে বললাম, এই রাতেই লণ্ডনে ফিরে গেলে হয় না?

লণ্ডনে ফিরে যাব? পোয়ারো আমার কথা শুনে যেন আকাশ থেকে পড়ল কিন্তু কেন যাব, ক্যাপ্টেন হেস্টিংস?

এটাও আমায় ব্যাখ্যা করতে হবে? গলা ঝেড়ে নিয়ে চাপা গলায় বললাম ব্যাপারটা যে এখন আমাদের হাতের বাইরে চলে গেছে তাও কি তুমি বুঝতে পারছে না? তুমিই লর্ড ইয়ার্ডলিকে বলেছিলে তোমার কথামত যেন উনি চলেন–তারপরে তোমারই চোখের সামনে হীৱেটা চুরি হয়ে গেল, এর পরে কোন লজ্জায় আমরা আর এখানে থাকব বলতে পারো?

সে ত বটেই, পোয়ারো এমনভাবে কথাটা বলল যেন আসলে তেমন কিছুটা ঘটেনি, আমি যেসব কেসে বিরাট ভেলকি দেখিয়ে জিতেছি এটা তাদের মধ্যে পড়েনা ঠিকই। তাহলে ত বুঝতেই পারছে, কিছু মনে কোনো যেন তোমার মকেল ল্যাজেগোবরে হবার পরে এখানে দাঁড়িয়ে থাকার চাইতে বাড়ি ফিরে যাওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে না কি?

আর জমিদার বাড়ির ডিনার, তার কি হবে? পোয়ারো এতক্ষণে গলা চড়ালো, লর্ড ইয়ার্ডলির খাস রাঁধুনি আমাদের জন্য যে কি ডিনার বানিয়েছে তা না খেয়েই চলে যাব? না বাবু ফিরে যেতে চাও তুমি যাও, আমি আগে ডিনার খাব, তারপর জমিদার বাড়ির বিছানায় নরম গদীতে গা ঢেলে আরমে ঘুমোব।

বয়স বাড়লে মানুষের বুদ্ধি কমে আর সেই তুলনায় তার নোনা আর বেহায়াপনা যায় খুব বেড়ে, পোয়ারো যে সেই পর্যায়ে পৌঁছে গেছে এই মুহুর্তে সে বিষয়ে আমার মনে এতটুকু সন্দেহ নেই।

হুঁ, কি এমন আহামরি ডিনার! আমার মন্তব্যে ভেতরের অধৈর্য ভাব কিছুটা বেরিয়ে পড়ল।

তোমার কি হল, হেস্টিংস?

পোয়ারো বলল, তোমার হাবভাব দেখে আমি সত্যি বলতে কি, কি বলব তাই ভেবে পাচ্ছি না, এখানকার খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারটা যেন এক সাংঘাতিক ব্যাপার, এমন ভাবই বেরোচ্ছে তোমার বুলিতে।

বেশী বাজে বক না, ভেতরের বিরক্তি এবার আমার মুখ দিয়ে ফুটে বেরোল, মিস মার্ভেলের হীরেটার নিরাপত্তার কথা ভেবেও তোমার যত শীগগির সম্ভব লণ্ডনে ফিরে যাওয়া দরকার।

তার সঙ্গে আমার লণ্ডনে এখুনি ফিরে যাবার কি সম্পর্ক?

পোয়ারোর ন্যাকামো দেখে আমার আবার ধৈর্যচ্যুতি হল, গলা কিছুটা চড়িয়ে বললাম, নিজের চোখেই ত দেখলে একটা হীরে কেমন আমাদের চোখের সামনে বেহাত হল, শত্রুপক্ষ যে এবার ওর জোড়াটা হাতাবার তালে থাকবে এই সহজ কথাটা তোমার মাথায় আসছে না কেন?

ওঃ, এই কথা। কয়েক পা এগিয়ে পেছিয়ে পোয়ারো এমন এক চাউনী মেলে আমার দিকে তাকাল যেন অদ্ভুত কিছু দেখছে, তারপর স্বাভাবিক গলায় বলল, কিন্তু তুমি একটা ব্যাপার ভুলে যাচ্ছ বন্ধু, মিস মার্ভেল যেসব চিঠি পেয়েছেন তাতে পূর্ণিমার রাতের উল্লেখ রয়েছে আগামী শুক্রবার পূর্ণিমা, অতএব আমাদের হাতে এখনও প্রচুর সময় আছে।

পূর্ণিমার উল্লেখ সত্যিই আমার মনে ছিল না, পোয়ারো কথাটা মনে পড়িয়ে দিতে আমার শরীর আতঙ্কে হিম হয়ে এল। তবু পোয়ারোকে ধন্যবাদ যে সে সত্যিই ডিনার খাবার জন্য আর বসে রইল না, থাকা সম্ভব হচ্ছে না বলে লর্ড ইয়ার্ডলির কাছে মার্জনা চেয়ে একটি চিঠি লিখে সে আমায় নিয়ে তখনই রওনা হল লণ্ডনের দিকে।

মিস মার্ভেল উঠেছেন ম্যাগনিফিসেন্ট হোটেলে, তা আগেই উল্লেখ করেছি, আমার ইচ্ছে ছিল রাতেই মিস মার্ভেলের সঙ্গে দেখা করে লেভী ইয়ার্ডলির হীরে ছিনতাই হবার খবরটা আগাম দিয়ে তাকে হুঁশিয়ার করে দিই, কিন্তু পোয়ারো তাতে রাজী হল না, বলল যে ঐ খবর আগামীকাল সকালেই দেয়া যাবে সেজন্য তাড়া নেই। পায়োয়োর কথা না মেনে উপায় নেই তাই কোনও প্রতিবাদ না করে নিজের মনে গজগজ করতে লাগলাম।

কিন্তু পরদিন সকালবেলায় পায়োয়োর ভাবগতিক দেখে বুঝতে পারলাম যে বাড়ির বাইরে যাবার ইচ্ছে তার মোটেই নেই। গোড়াতেই আমি ধবে নিলাম একটা বড় ভুল হয়ে গেছে তাই পোয়ারো আর এই কেস নিয়ে এগোতে চাইছে না। কিন্তু আমি জোরাজুরি করতে ও মিস মার্ভেলের কাছে না যাবার যে ব্যাখ্যা কবল তাতে প্রমাণ হল আমার অনুমান ভুল, পায়োরা যুক্তি দিয়ে এটাই বোঝাতে চাইল যেহেতু ইয়ার্ডলি চেজের হীরে ছিনতাইয়ের ঘটনা ইতিমধ্যেই স্থানীয় সব খবরের কাগজে বিবিতভাবে ছেপে বেরিয়েছে তাই মিস মার্ভেল আর তার স্বামী মিঃ রলফকে এই খবটা এখন নতুন করে জানানো নিরর্থক। পায়োরার যুক্তি অকাট্য তা মেনে নিয়ে আপন মনে গজরানো ছাড়া আসার আর কিছুই করার রইল না।

কিন্তু এর পরের ঘটনা প্রমাণ করল যে আমার আকাঙ্খা ও হুঁশিয়ারী এতটুকু অযৌক্তিক ছিল না—বেলা দুটো নাগাদ টেলিফোন ঝনঝন করে বেজে উঠল। পোয়ারো রিসিভার তুলে কয়েক মুহূর্ত কানে ঠেকিয়ে কি শুনল কে জানে, তারপর আচ্ছা, রাখছি, বলে সেটা আগের জায়গায় রেখে দিল।

কি হয়েছে জানতে চাও? পোয়ারোকে এই প্রথম মুখ কালো করতে দেখলাম। লজ্জার সঙ্গে জানাল, মিস মার্ভেলের হীবেটাও চুরি হয়েছে।

সে কি? পোয়ারোর কথা শুনে আমি লাফিয়ে উঠে দাঁড়ালাম, সুযোগ পেয়ে এ রসিয়েই বললাম, কি গো, তোমার পূর্ণিমার রাতের কি হল? এমন ত হবার কথা ছিল না, তাহলে?

পোয়োরা কোনও জবাব দিল না, মুখ নিচু করে বসে রইল সে।

চুরিটা হল কখন?

ওদের কথা শুনে বুঝলাম আজ সকালে, পোয়ারো জানাল।

আমার কথা শুনলে এটা অবশ্যই এড়ানো যেত, আমি জোর গলায় বললাম, আমার ধারণা যে ঠিক তা এখন তুমি নিজেই দেখতে পাচ্ছে।

তাই ত দেখাচ্ছে সোনা, পোয়ারো সতর্কভাবে মন্তব্য করল, অনেকের মতে দেখানোর মধ্যে একটা ঠকানো আর ঠকে যাওয়ার ব্যাপার আছে, তবু ঘটনা যেমন দেখায় সেটা অবশ্যই মেনে নিতে হবে।

এবার আর ঘরের ভেতর শুয়ে বা বসে থাকা চলবে না তাই ট্যাক্সি চেপে আমরা দুজনে রওনা হলাম ম্যাগনিফিসেন্ট হোটেলের দিকে, যাবার পথে বললাম, পূর্ণিমার রাতে হীরে চুরি করার মতলব নিঃসন্দেহে অভিনব। শুক্রবারের আগে পর্যন্ত কিছু হবে না এই বলে আমাদের নজর সেদিকে ব্যস্ত রেখে তস্কর চূড়ামণি তার অনেক আগেই তার কাজ হাসিল করে ফেলল। তার মতলব তুমি আগে থেকে টের পাওনি এটাই যা দুঃখের ব্যাপার।

যা বলেছো! পোয়ারো এতক্ষণ তার স্বভাবিক গলায় বলল, একজনের পক্ষে সব কিছু আগে থাকতে ভেবে রাখা সম্ভব নয়!

পোয়ারো যে জোর করে তার পুরোনো হাসিখুশি মেজাজ বজায় রাখতে চাইছে সে বিষয়ে আমার কোনও সন্দেহ রইল না, অন্যদিকে তার এই ব্যর্থতার কথা ভেবে দুঃখও কম হল না। পোয়ারো নিজে যে কোনরকম ব্যর্থতাকে কিরকম ঘেন্না করে তা আমার অজানা নাই।

জিতে রহো ভাইসাব, পোয়ারোকে সান্ত্বনা দিয়ে বললাম, পরের বার তোমাকে ঠেকাবে কার সাধ্য!

ম্যাগনিফিসেন্ট হোটেলে গিয়ে পৌঁছোনোর পর ওখানকার কর্মচারীরা আমাদের নিয়ে এল ম্যানেজারের কামরায়। মিস মার্ভেলের স্বামী গ্রেগরী রলফ সেখানে আগেই এসে হাজির হয়েছিলেন। স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড থেকে আসা দুজন গোয়েন্দা তাকে নানাভাবে জেরা করছে। হোটেলের জনৈক কেরাণীকে দেখলাম ফ্যাকাশে মুখে উল্টোদিকে বসে তাদের কথাবার্তা শুনছেন। আমরা ভেতরে ঢুকতেই রলফ মাথা নেড়ে সংক্ষেপে অভিবাদন জানালেন।

আমরা ব্যাপারটার গোড়ায় যাবার চেষ্টা করছি, রল মন্তব্য করলেন, কিন্তু ঘটনাটা এখনও পর্যন্ত বিশ্বাস করতে পারছি না। জিনিসটা হাতানোর মত সাহস লোকটার হল কি করে তাই আমি বুঝে উঠতে পারছি না।

গ্রেগরী রলফের মুখ থেকে ঘটনার বিবরণ যেটুকু শুনলাম তা রকম। সকাল এগারোটা বেজে পনেরো মিনিট নাগাদ উনি কোনও কাজে হোটেল থেকে বেরিয়েছিলেন, ঠিক পনেরো মিনিট বাদে অর্থাৎ সকাল সাড়ে এগারোটায় হুবহু তারই মত দেখতে একটি লোক হোটেলে ঢুকে ম্যানেজারের কাছে তার গয়নার বাক্সটি চান। ম্যানেজার নিয়ম অনুযায়ী একটি রসিদে তাকে সই করতে বলেন। ভদ্রলোক রসিদে সই করার পরে ম্যানেজার গ্রেগরী রলফের মূল স্বাক্ষরের সঙ্গে সেটা মিলিয়ে দেখেন এবং লক্ষ্য করেন যে পরের স্বাক্ষরটি কিছুটা অন্যরকম। এই বিষয়টি উল্লেখ করলে ভদ্রলোক জানান যে ট্যাক্সি থেকে নেমে দরজা বন্ধ করার সময় তার ডানহাতের দুটি আঙ্গুল জখম হয়েছিল যে কারণে তার পরের স্বাক্ষর হুবহু একরকম ঠেকছে না।

রলফের বক্তব্য শেষ হতেই হোটেলের কেরানী ভদ্রলোক মুখ খুললেন, তিনি যা বললেন তাতে এই বোঝায় যে দ্বিতীয় স্বাক্ষর তিনিও দেখেছেন তবে তাতে উল্লেখ করার মত কোনও তফাৎ ছিল না।

দেখবেন, আপনারা আবার যেন আমাকে চোর চোর বলে ভাববেন না, সেই ভদ্রলোক মন্তব্য করেছিলেন, একজন চীনে বেশ কিছুদিন ধরে আমায় ভয় দেখানো চিঠি লিখছে আর দুঃখের ব্যাপার হল আমি নিজেই অনেকটা চীনেদের মত দেখতে, বিশেষ করে আমার চোখ দুটো ত প্ৰায় ওদের মত।

ভদ্রলোকের মুখের দিকে আমিও তাকিয়েছিলাম, কেরানী ভদ্রলোক বলে উঠলেন, দেখলাম ঠিকই চোখদুটো একটু কুতকুতে যেমন থাকে চীনেদের।

বাজে গালগপ্পো রাখুন, গ্রেগরী রলফ শরীরটা সামনে ঝুকিয়ে দিয়ে বললেন, দেখুন আমার চোখদুটো কি চীনেদের মত কুতকুতে?

কেরানী ভদ্রলোক মুখ তুলে বেশ কিছুক্ষণ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তাকে দেখলেন তারপর মন্তব্য করলেন, না মশাই, আমার নিজের চোখে অন্ততঃ ঠেকেছে না। কি ভেবে আমিও ভাল করে তাকালাম রলফের চোখের দিকে। কিন্তু না, এত সেই চেনা কটা দুটি চোখ গভীর আত্মপ্রত্যয় যেখান থেকে ফুটে বেরোচ্ছে। এ চোখের চাউনীকে কোনভাবেই সন্দেহ করা যায় না।

খদ্দেরটির বুকের পাটা আছে বলতে হবে, স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড থেকে আসা গোয়েন্দা অফিসারটি মন্তব্য করলেন, সন্দেহ এড়ানোর জন্য দুচোখে সামান্য মেকাপ নিয়েছিলেন আগে থেকেই। তবে এটাও ঠিক যে, লোকটা আগে থেকেই আপনার ওপর নজর রেখেছিল, আপনি বেরিয়ে যাবার পবেই ও এসে ঢুকেছিল হোটেলে।

ত মিঃ রলফের সেই গয়নার বাক্সটার কি হল? আমি জানতে চাইলাম।

ওটা পাওয়া গেছে, ম্যানেজার বললেন, হোটলের করিডোরে পড়েছিল, ভেতরে সবকিছু যেমন ছিল তেমনি কি আছে, শুধু একটি জিনিস বাদে তাহল দ্য স্টার অফ দ্য ইষ্ট নামে একটি দামী হীরে।

ম্যানেজারের কথা যোগ হতে পোয়ারো আর আমি দুজনেই দুজনের মুখের দিকে তাকালাম-গোটা ব্যাপারটা যেন অতিপ্রাকৃতিক, অবিশ্বাস্য।

এমন একটা ঘটনা ঘটে গেল অথচ আমি কোনও কাজে এলাম না; পোয়ারো আক্ষেপের সঙ্গে মন্তব্য করল, আচ্ছা, মিঃ রলফ আপনার স্ত্রীর সঙ্গে একবার দেখা করতে পারি?

আমার আপত্তি করার কিছু নেই, রলফ জানালেন, তবে এতবড় একটা ঘটনা ঘটার পরেও মানসিক দিক থেকে খুব বড় আঘাত পেয়েছে, বেচারী এখন শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে, তাই বলছিলাম—

থাক, বুঝেছি, পোয়ারো হাত তুলে তাকে বাধা দিল, তাহলে আপনার সঙ্গে কয়েকটা কথা বলার ছিল, আপনার অসুবিধে নেই ত?

কোনও অসুবিধা নেই। রলফু বললেন, আসুন আমার কামরায়।

পোয়ারো গ্রেগরী রলফের সঙ্গে গেল আবার পাঁচ মিনিটের মধ্যে ফিরে এল।

চলো, ক্যাপ্টেন হেস্টিংস, পোয়ারো বলল, এবার একবার পোস্ট অফিসে যেতে হবে, একটা টেলিগ্রাম করতে হবে।

কাকে?

লর্ড ইয়ার্ডলিকে, পোয়ারো আমার হাত ধরে টানতে টানতে বলল, চলো, আর দেরী করার মত সময় নেই। তুমি মনে মনে কি ভাবছো তা আমি বুঝতে পারছি, আমার জায়গায় থাকলে তুমি হয়ত মুখ বুজে থাকতে পারতে না ও নিয়ে আমার মনে করার কিছু নেই। ওসব বাদ দাও, চলো এবার গিয়ে লাঞ্চ খেয়ে আসা যাক।

লাঞ্চ খেয়ে পায়োরার সঙ্গে তার বাড়িতে যখন ফিরে এলাম তখন বিকেল প্রায় চারটে বাজে। জানালার পাশে একটি লোক একা বসেছিল, আমাদের ঢুকতে দেখেই উঠে দাঁড়াল লর্ড ইয়ার্ডলি। মুখের দিকে তাকালে বোঝা যায় প্রচণ্ড মানসিক ঝড়ে কি নিদারুণ বিপর্যস্ত হয়েছেন তিনি।

আপনার তার পেয়েই ছুটে এসেছি, লর্ড ইয়ার্ডলি কোনরকম ভূমিকা না করে বললেন, এদিকে আরেক রহস্য দানা বেঁধেছে—আপনার এখানে আসবার আগে আমি হফবার্নের সঙ্গে দেখা করেছি, ওর মুখ থেকেই শুনলাম গত রাতে ওদের দালাল হিসেবে যে লোকটি আমাদের বাড়িতে গিয়েছিল তাকে ও চেনে না, এছাড়া আমায় কোনও টেলিগ্রামও পাঠায় নি? এই হল ব্যাপার এখন বলুন আপনার–

মাফ করবেন! হাত তুলে পোয়ারো তাকে থামালো, ঐ টেলিগ্রাম আমিই আপনাকে পাঠিয়েছিলাম আর হফবার্নের দালাল বলে যে আপনার কাছে গিয়েছিল সেও আমারই লোক, ওকেও আমিই পাঠিয়েছিলাম।

আপনি! এসব আপনার কীর্তি তাহলে? লর্ড ইয়ার্ডলি পোয়ারোর স্বীকারোক্তি শুনে হোচট খেলেন, কিন্তু এসবের অর্থ কি?

অর্থ একটাই—পুরো ব্যাপারটা আমি একটা জায়গায় নিয়ে আসতে চেয়েছিলাম, পোয়ারো জানালা এছাড়া অন্য কোনও উদ্দেশ্য আমার ছিল না।

পুরো ব্যাপারটা এক জায়গায় নিয়ে আসতে চেয়েছিলেন, হা ঈশ্বর! পায়োয়োর মন্তব্যের অর্থ যে লর্ড ইয়ার্ডলি বুঝতে পারছেন না তা তার কথাতেই ফুটে বেরোল।

আমার উদ্দেশ্য সফল হয়েছে, মি লর্ড, পোয়ারো খোশমেজাজে বলে উঠল, আর তাই আপনার জিনিস আপনাকে ফিরিয়ে দিতে পেরে আমি নিজেকে ধন্য মনে করছি, বলে পকেট থেকে কি একটা জিনিস বের করে নাটকীয় ভঙ্গিতে সে মেলে দিল লর্ড ইয়ার্ডলির দিকে। ভাল করে তাকিয়ে দেখলাম জিনিসটি বড় আকারের একটি হীরে।

এইতো আমার সেই চুরি যাওয়া হীরে, বলতে গিয়ে লর্ড ইয়ার্ডলির গলা কেঁপে গেল, দ্য স্টার অফ দ্য ইস্ট! কিন্তু আমি এখনও ভেবে পাচ্ছি না..

সত্যিই পাচ্ছেন না? পায়োরা মুচকি হাসল, অবশ্য তাতে কিছুই যায় আসে। কিন্তু বিশ্বাস করুন এই হীরেটা চুরি যাওয়া খুব দরকার ছিল। আমি আপনাকে বলেছিলাম আপনার জিনিস আপনার কাছেই গচ্ছিত থাকবে মনে পড়ে? আমি আমার সেই কথা রেখেছি। কি ভাবে এটা উদ্ধার করেছি তা একান্ত গোপনীয়, এবং অনুগ্রহ করে তা জানতে চাইবেন না। যাক লেডী ইয়ার্ডলিকে আমার আন্তরিক শ্রদ্ধা জানাবেন এবং এও জানাবেন যে তার হারানো মাণিক তাকে ফেরৎ দিতে পেরে আমি নিজেও এত খুশি হয়েছি যা ভাষায় বলে বোঝানো যায় না। বিদায়, মিল।

লর্ড ইয়ার্ডলিকে এক বিশাল ধাধার মধ্যে পেলে আমার বাঁটকুল গোয়েন্দা বন্ধু এরকুল পোয়ারো হাসতে হাসতে তাকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিল। তিনি বেরিয়ে যেতে দরজা বন্ধ করে সে আবার এসে ঢুকল ঘরে।

পোয়ারো, আমি খুব শান্ত সুরে বললাম, তোমার মাথা কি খারাপ হয়ে গেছে?

না, বন্ধু, পোয়ারো জবাব দিল, এ মাথা আমার খারাপ হয়নি, আসলে তুমি মানসিক দিক থেকে ধোঁয়াশার মধ্যে পথ হাতড়ে বেড়াচ্ছো।

হীরেটা তুমি কোথা থেকে পেলে?

মিঃ গ্রেগরী রলফের কাছ থেকে।

মিঃ রল! কি বলছ তুমি?

পায়োরের কথা শুনে মনে হল এবার আমার মাথা সত্যিই খারাপ হয়েছে। হ্যা ক্যাপ্টেন হেস্টিংস, একজন চীনে মিস মার্ভেলকে ভয় দেখিয়ে চিঠি লিখছে, তাছাড়া সোসাইটি গসিপ মাগাজিনের লেখা। এসব যার উর্বব মস্তিষ্কের ফসল তিনি হলেন মিঃ গ্রেগরী রলফ দুটো হীরে হুবহু একই রকম দেখতে, একটা আরেকটার জোড়া কিন্তু এসব নিছক গুল ছাড়া কিছু নয়। আসলে হীরে একটাই আর তা আছে ইয়ার্ডলি পরিবারে অন্যান্য দামী বত্নেব সঙ্গে, মনে বেশখা এই একটা হীবে তিন বছর ছিল গ্রেগরী রলফের কাছে। আজ সকালবেলা নিজের দুচোখের কোণে সামান্য চর্বির মেকাপ লাগিয়ে চেহারাটা পাল্টে নিয়েছিলেন তিনি যাতে চোখদুটো দেখাবে চীনেদের মত। নাঃ হেস্টিংস যাই বলল না কেন, রল লোকটা জাত অভিনেতা বলতে হয়, দেখতে হবে ফিল্মে ওকে কেমন দেখায়!

কিন্তু রলফ ওঁর নিজের হীরে কেন চুরি করবেন তা ত বুঝলাম না। কিছু বুঝতে না পেরে জানতে চাইলাম।

অনেকগুলো কারণে, পায়োরা জবাব দিল, যার মধ্যে একটি হল লেডিইয়ার্ডলি যিনি ভয়ানক ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিলেন।

লেডি ইয়ার্ডলি?

হ্যাঁ, উনি যে কিছুদিন ক্যালিফোর্নিয়ায় ছিলেন সেকথা আশাকবি মনে আছে, ঐ সময় ওঁর পতিদেবতা অর্থাৎ লর্ড ইয়ার্ডলি অন্য কোনও মহিলার সঙ্গে ফুর্তি করে দিন কাটাচ্ছিলেন যার ফলে লেডি ইয়ার্ডলি সবদিক থেকে হয়ে পড়েন নিঃসঙ্গ। সেই সময় তার জীবনে এসে আবির্ভূত হলেন হলিউডের সুন্দর ও সুপুরুষ অভিনেতা গ্রেগরী রল। রলফের চেহারা আর ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হয়ে লেডি ইয়ার্ডলি নিজেকে সঁপে দিলেন তার কাছে। ঐ সুযোগে রল লেডি ইয়ার্ডলিকে চূড়ান্তভাবে উপভোগ করলেন। রলফ কিন্তু সেখানেই থামলেন না, লেডি ইয়ার্ডলিকে তিনি ব্ল্যাকমেল করতে লাগলেন। সেদিন ইয়ার্ডলি চেজে গিয়ে লেডি ইয়ার্ডলিকে আমি এ বিষয়ে প্রশ্ন করতে উনি মুখ ফুটে স্বীকার করেছেন। লেডি ইয়ার্ডলি এই প্রসঙ্গে যা বলেছেন তার অর্থ তিনি খুবই অসর্তক ছিলেন যে কারণে ঐ ঘটনা ঘটেছিল, ওঁর বক্তব্য আমি পুরোপুরি বিশ্বাস করেছি। কিন্তু এটাও ঘটনা যে লেডি ইয়ার্ডলি একসময় নিজের হাতে কিছু প্রেমপত্র লিখেছিলেন রলফকে। এবং তিনি ঐগুলো ফাঁস করে দেবেন বলে ভয় দেখান মহিলাকে। রলফের ব্ল্যাকমেলিংয়ে ঘাবড়ে গেলেন লেডি ইয়ার্ডলি। প্রেমপত্রের কথা জানাজানি হলে তার ভাবমূর্তি বিকৃত হবে এবং লর্ড ইয়ার্ডলি ইচ্ছে করলেই তাকে ডিভোর্স করবেন যার পরিণতি হিসেবে প্রাণের চাইতেও প্রিয় সন্তানদের ছেড়ে তাকে চলে যেতে হবে। এইসব ভেবে তিনি রলফের হাতের পুতুল হয়ে দাঁড়ালেন। লেডি ইয়ার্ডলির নিজের জমানো টাকাকড়ি বলতে কিছুই ছিল না জেনেই রল তাকে নিজের ইচ্ছেমত চালাচ্ছিলেন, এমনকি শেষপর্যন্ত রলফের নির্দেশে আঠার সাহায্যে নিজের দামী হীরেটির একটি হুবহু নকলও তিনি বানাতে বাধ্য হন এবং আসলটি তুলে দেন অলফের হাতে। দুটি হীরেই কেড়ে নেওয়া হবে এবং দ্য ওয়েস্টর্ণ স্টার নামে হীরেটিকে পুনরুদ্ধার করা হবে এই ব্যাপারটাই প্রথম সন্দেহ তোলে আমার মনে। লর্ড ইয়ার্ডলি ঝামেলা মোর্টেই পছন্দ করেন না, তিনি সবকিছু মিটিয়ে ফেলার জন্য তৈরী হচ্ছিলেন এমন সময় হীরে বিক্রী করার সিদ্ধান্ত লেডি ইয়ার্ডলির কাছে আরেক সমস্যা হয়ে দেখা দিল—কারণ আসল হীরেটি রল তার কাছ থেকে আগেই হাতিয়ে নিয়েছে, তার নিজের কাছে যা আছে তা হল আঠা দিয়ে তৈরী ঐ হীবের একটি নকল যা বিক্রী দূরে থাক, যাচাইয়ের সময় ঠিক ধরা পড়ে যাবে। গ্রেগরী রলফ তখন সবে ইংল্যান্ডে এসে পৌঁছেছেন সেইসময় লেডি ইয়ার্ডলি নিজের সমস্যা জানিয়ে তাকে চিঠি লিখলেন এবং এ ব্যাপারে সাহায্য কবার অনুরোধ করলেন। রলফ লেডি ইয়ার্ডলিকে সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে বলে আশ্বাস দিলেন এবং তারপর জোড়া ডাকাতির এক পরিকল্পনা করলেন। এভাবে তিনি তার একদা প্রেমিকার মুখ বন্ধ করতে পারবেন যিনি তার সঙ্গে নিজের অতীতের কেলেঙ্কারীর কথা বিশ্বাসযোগ্যভাবে জানাবেন তার স্বামীকে কিন্তু তাতে আমাদের ব্ল্যাকমেলার রলফের কি লাভ হবে? লাভ হবে বইকি-বীমার ক্ষতিপূরণজনিত বীমার টাকা বাবদ তিনি পাবেন নগদ পঞ্চাশ হাজার পাউণ্ড আবার একই সঙ্গে হীরেটা থেকে যাবে তারই দখলে। ঘটনা যখন এতদুর এগিয়েছে ঠিক তখনই মঞ্চে আরেকজনের আবির্ভাব তার নাম এরকুল পোয়ারো। এই আমি, এ হীরে যাচাই করার নোক আসছে শুনেই লেডী ইয়ার্ডলি তার গলার হীরে ঝােলানো হীরে ছিনতাই হবার এক নাটক করে বসলেন আর চমৎকার অভিনয়ের ফলে নাটকটা সফল হল! কিন্তু এরকুল পোয়ারোর চোখের নজর ঠেকায় এমন সাধ্য কার আছে? বাস্তবে কি ঘটনা? লেডি ইয়ার্ডলি নিজেই দরজার পিছনের সুইচ টিপে ঘরের আলো নেভালেন, ঘরের লাগায়ো দরজার পাল্লাটা খুলে জোর আওয়াজ তুলে বন্ধ করলেন, গলা থেকে নেকলেসটা খুলে দরজার চৌকাঠের সামনে ছুঁড়ে ফেলে বেইস হবার ভান করে মেঝের ওপর কিছুক্ষণ পড়ে রইলেন। এই নাটক করার আগেই যে উনি ওঁর নেকলেস থেকে হীরের আদলটা বের করে নিয়েছিলেন আশাকরি তা নতুন করে বলার দরকার নেই।

কিন্তু ঘটনা ঘটার আগে ওঁর গলায় যে নেকলেস ছিল তা আমি নিজে দেখেছি। বাধা দিয়ে বলে উঠলাম।

আমার কথা এখনও শেষ হয়নি, বন্ধু, পোয়ারো হাত তুলে বলল, আগে ধৈর্য ধরে সবকথা শোন। নেকলেসটা উনি যে হাত দিয়ে ছুঁয়েছিলেন তা আশাকরি এখনও তোমার মনে আছে। হীরের আদলটা খুলে নেবার সঙ্গে সেই ফাকা জায়গাটা উনি আসলে হাত দিয়ে কৌশলে ঢেকে রেখেছিলেন, এই হল ব্যাপার। এরপর আসে রেশমী কাপড়ের টুকরোর ব্যাপার যেটা পরে লাগায়ো দরজার ওপাশে পাওয়া গিয়েছিল। ক্যাপ্টেন হেস্টিংস, এমন একটি নাটক করার পরিকল্পনা যার মাথা থেকে বেরিয়েছে এক টুকরো রেশমী কাপড় ঐখানে ফেলে রাখা কি তার পক্ষে এমন আর কি কঠিন কাজ। তারপরে কি ঘটনা জানতে চাইছে? খবরের কাগজে লেডি ইয়ার্ডলির বাড়িতে তার বিখ্যাত হীরে ছিনতাই হয়েছে ও খবর পড়েই আসল নাটের গুরু গ্রেগরী রলফ নিজেও নাটক করার লোভ সামলাবেনই বা কি করে? লেডি ইয়ার্ডলির মত তিনিও চুরি বলল, ডাকাতি বলল, ছিনতাই বলল, ঐ সাজানো নাটকে বেড়ে অভিনয় করলেন। অভিনেতা হিসেবে মেকাপের কারুকার্য রল ভালই জানেন, দুচোখে এমন চর্বি লাগালেন যাতে দেখলে তাকে চীনে বলে যে কেউ ভেবে বসে। হোটেল থেকে বেরিয়ে চোখের চাউনি পাল্টে আবার তিনি ফিরে এলেন কিছুক্ষণের মধ্যে, তারপর হীরে চুরির দ্বিতীয় সাজানো নাটকে অভিনয় করলেন।

সবই ত বুঝলাম, পোয়ারো থামতে জানতে চাইলাম, কিন্তু তুমি রলকে এমন কি বলেছে যাতে ভয় পেয়ে উনি হীরেটা তোমার হাতে ফিরিয়ে দিয়েছেন?

তেমন কিছুই বলিনি, পোয়ারো বলল, শুধু বললাম লেডি ইয়ার্ডলি ওঁর অতীতের পা ফসকানোর ঘটনা তার স্বামীকে খুলে বলেছেন এবং ইয়ার্ডলি পরিবারের ঐতিহ্যবিজড়িত হীরেটা ফেরৎ নিতেই যে তিনি আমায় পাঠিয়েছেন তাও বললাম, আর হ্যা সেই রলফকে এও বললাম যে হয় ভালোয় ভালোয় তিনি হীরে ফেরৎ দিন, নয়ত পুলিশ এসে ওকে উদ্ধার করবে এবং তার নামে মামলা রুজু করা হবে। এরকম আরও কয়েকটা মিছামিছি ভয় দেখাতেই রলফের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল, হীরটা তিনি আমার হাতে তুলে দিলেন।

কিন্তু ভেবে দ্যাখো, একটু চুপ করে থেকে বললাম, তোমার এই সাফল্যের ফলে কি মেরী মার্ভেলের ওপর খুব অন্যায় অবিচার করা হল না? বিনাদোষে বেচারীকে নিজের হীরেটা খোয়াতে হল।

ভুল করছ, পোয়োরা বলল, ওর সঙ্গে ত একখানা জলজ্যান্ত বিজ্ঞাপন সবসময় ঘুরে বেড়াচ্ছে, বাইরে অন্য কোনদিকে ওর মন নেই, চিন্তা-ভাবনাও নেই।

অর্থাৎ এখানেও সেই গ্রেগরী রল, পোয়ারোর ইঙ্গিত ধরতে পেরে বললাম, এখন আমার সন্দেহ হচ্ছে রলফ নিজেই ওকে উড়ো চিঠি লিখতেন।

হতে পারে, পোয়ারো আমার বক্তব্যে গুরুত্ব না দিয়ে বলল, আমি লেডি ইয়ার্ডলির কথা ভাবছি, সে কী ক্যাভেণ্ডিসের উপদেশ মেনে উনি নিজের সঙ্কট সমাধানের উদ্দেশ্যে এসেছিলেন আমার কাছে। ঘটনাচক্রে আমি তখন বাড়ি ছিলাম না। ওকে শুনিয়ে দিল যে মেরী মার্ভেলেও এখানে এসেছেন সঙ্কট মোচনের উদ্দেশ্যে। মেরী মার্ভেলকে লেডী ইয়ার্ডলি নিজের শত্রু বলে ভাবেন, তিনিও এখানে এসে হাঞ্জির হয়েছেন জেনেই তিনি নিজের সিদ্ধান্ত পাল্টালেন, ততক্ষণে তোমার মুখ থেকে তিনি জেনেছেন জল কতদূরে গড়িয়েছে। তোমায় প্রশ্ন করেই জেনেছি। ভয় দেখানো চিঠি মিস মার্ভেলের মত উনিও পাচ্ছেন কিনা একথা তোমার মুখ থেকেই বেরিয়েছে, উনি গোড়ায় নিজে থেকে এ বিষয়ে তোমাকে কিছুই বলেন নি। তোমার কথা শুনেই উনি একটা সুযোগ নেবার সিদ্ধান্ত নেন।

দুঃখিত তোমার সঙ্গে আমি একমত নই। পোয়ারোর কথার প্রতিবাদ করে বললাম, তুমি নিজে মনস্তত্ব নিয়ে চর্চা করো না এটা খুবই দুঃখের বিষয়, পায়োরা বলল, চিঠিগুলো পুড়িয়ে ছাই করে ফেলেছেন একথা লেডি ইয়ার্ডলি তোমায় বলেন নি? হায় বুদ্বুরাম, মেয়েরা প্রকৃতপক্ষে কখনও কোনও চিঠি নষ্ট করে না; এমনকি যদি সেটা তার পক্ষে অমঙ্গলজনক হয় তবুও না!

আমার ভেতরে রাগ ক্রমেই বাড়ছে টের পাচ্ছি, বহু কষ্টে তা চেপে বললাম, তুমি নিজে ত দিব্যি জিতে গেলে, আর এদিকে আমি, আমার অবস্থা কি হল? এই কেসের গোড়া থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত তুমি আমাকে বোকা বানিয়ে ছাড়লে। এরও একটা সীমা থাকা দরকার।

কিন্তু নিজের বোকামিটুকু ত তুমি গোড়া থেকে উপভোগ করছিলে, বন্ধু, পোয়ারো তার চিরাচরিত ভাল মানুষের মত মুখ করে নিরীহ গলায় বলল, তোমার বোকামি আর মূর্ধামির সেই স্বর্গ নিজের হাতে ভেঙ্গে গুড়িয়ে দিয়ে তোমাকে ব্যথা দিই কি করে বললা?

ওসব বোল না। ওতে আমায় ভোলানো যাবে না, আমি বললাম আমাকে বোকা বানাবার বরাবরের খেয়ালটা এবার তুমি মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে!

আহা, অত রাগ করছ কেন? পোয়ারো প্রবোধ দেবার স্বরে বলল রাগ করার মত এমন কিই বা হয়েছে শুনি?

আমারও ধৈর্যের একটা সীমা আছে! চেয়ার ছেড়ে উঠে দরজাটা পায়োয়োর মুখের ওপর বন্ধ করে বাইরে বেরিয়ে এলাম। পোয়ারো অন্যান্যবারের মত এবারেও তার বুদ্ধির সূততা ছিড়ে গেছে আর আমি দিব্যি সেই সূততা গিলে শেষপর্যন্ত এক বিশ্ব ভোদাইয়ে পরিণত হয়েছি। কিন্তু বারবার এই খেলায় বাজি জিতে যাবে পোয়ারো? না? ঢের হয়েছে, এবার ওকে এমন শিক্ষা দেব যা নাকি বহুদিন মনে থাকবে। ভেতরে ভেতরে আমার রাগ এমন বেড়েছে টের পাচ্ছি যে কিছু সময় না কাটলে পোয়ারোকে কিছুতেই ক্ষমা করতে পারব না! বারে গোয়েন্দা পোয়ারো, এমন তো আমায় দিয়ে গেলে যে নিজের বোকামির ফাঁদে আমাকে নিজেকেই জড়িয়ে পড়তে হল।

গল্পের বিষয়:
অনুবাদ

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত