ওয়েস্টার্ন সিরিজ-শোধ

ওয়েস্টার্ন সিরিজ-শোধ

মালভূমির মত জায়গাটার চূড়ায় উঠে শহরটা দেখতে পেল সে। লাগাম টেনে ঘোড়া থামাল, হ্যাটের ব্রিম তুলে দিল খানিকটা। ঢালের নিচে ছোট্ট শহরটাকে আগাগোড়া খুঁটিয়ে দেখল এবার। চওড়া রাস্তার দুপাশে সারি সারি বাড়ি, একেবারে শেষ মাথায় ক্রুশঅলা দালাটাই গির্জা। ওটা ছাড়িয়ে দিগন্তের বুকে চলে গেছে সরু ট্রেইল, ঊষর প্রান্তরে গিয়ে মিশেছে। পুবে সুবিস্তৃত পর্বতসারির পাদদেশে সবুজ বনভূমি, শহর থেকে মাইল দুই দূরে; মাঝখানের জায়গাটুকু মোটামুটি সমতল। সরু নালার মত একটা ক্রীক এঁকেবেঁকে চিরে গেছে জায়গাটাকে। উল্টোদিকে, দুর্গম প্রান্তর পাঁচ মাইল দূরে রকি পর্বতমালায় গিয়ে মিশেছে। লিয়ন সিটির আশপাশে কোন সমভূমি বা রেঞ্জের চিহ্ন নেই, বোঝার উপায় নেই আসলেই এটা কোন ক্যাটল টাউন কি-না।

শহরের ওপর ফিরে এল তার দৃষ্টি। ধূলি-ধূসর অপরিচ্ছন্ন রাস্তা। বাড়িগুলোয় যে ধুলোর পুরু আস্তর জমেছে রঙজ্বলা ফ্যাকাসে চেহারা দেখে তা এখান থেকেই বোঝা যাচ্ছে। প্রখর রোদে রাস্তার ধূলিকণা চিকচিক করে উঠল। ফাকা রাস্তায় একটা নেড়ি কুকুর আর তিনটে মুরগী চোখে পড়ছে। লিয়ন সিটির জন্যে এটাই স্বাভাবিক। শহরটা অ্যারিজোনার একেবারে শেষপ্রান্তে, সামনে আরও বিশ মাইল গেলে পড়বে সল্টলেক মরুভূমি। তারপর, চল্লিশ মাইল দূরে মেক্সিকোর সীমানা। আর এদিকে সবচেয়ে কাছের শহর সিলভার টাউন একশো মাইল দূরে, তা-ও সেটার অস্তিত্ব কেবল গুটিকয়েক ভগ্নপ্রায় দালানের মধ্যে সীমাবদ্ধ। দুএকজন ভবঘুরেকে পাওয়া যেতে পারে যারা চলার পথে ভাঙা ওই বাড়িগুলোকে শ্যাক হিসেবে ব্যবহার করছে। পার্শ্ববর্তী পাহাড়ে রূপোর একটা দানা খুঁজে পেয়েছিল এক বুড়ো, সেই থেকে পনেরো দিনের মধ্যে গজিয়ে ওঠে শহরটা। শেষ হতেও সময় লাগেনি। প্রকৃতির অণ্ডার ফুরিয়ে যেতে বছর ঘোরার আগেই কেটে পড়েছে। ভাগ্যান্বেষী লোকগুলো। হঠাৎ কেউ উপস্থিত হয়ে পড়লে তাকে সঙ্গ দেয়ার জন্যে সেখানে আছে কেবল রঙজ্বলা প্রায় মুছে যাওয়া একটা জীর্ণ সাইনবোর্ড আর বুটহিলে ডজন দুয়েক কবর।

লিয়ন সিটির অবস্থা সিলভার টাউনের চেয়ে ভাল বলা যাবে না। পার্থক্য কেবল একটাই-লোকজনের বসতি আছে এখানে। নেহায়েত ঠেকা ছাড়া দুর্গম প্রান্তর পাড়ি দিয়ে এমন একটা শহরে আসবে না কেউ। তার ক্ষেত্রেও এটা সত্যি। জেদ আর প্রতিশোধস্পৃহা গত তিন বছর তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে ওকে, বৈরী পশ্চিমের বিভিন্ন ট্রেইলে কেটে গেছে হাজারটা রাত। পথ চলতে চলতে ক্লান্তি, হতাশা গ্রাস করে ফেলেছে ওকে। মনেপ্রাণে প্রার্থনা করছে এখানেই যেন থামতে হয়। নইলে ফিরে যেতে হবে, কিংবা আরও এগিয়ে সল্টলেক পাড়ি দিতে হবে। শেষ সূত্রটা ছিঁড়ে যাওয়ায় নতুন সূত্র খুঁজতে হবে।

তবে ওর মন বলছে ভিন্ন কিছু—এ শহরে থাকাটা ওর কাছে অভিজ্ঞতার নতুন উৎস বা দুবেলা খাওয়া আর অলস সময় কাটানোর ফাঁকে কিছু মানুষকে দেখার মধ্যেই হয়তো সীমাবদ্ধ থাকবে না, ফেলে আসা অনেকগুলো শহরের বেলায় যেমন ঘটেছে। তবে যে-কোন শহরে কোন আগন্তুক যেমন ঠাণ্ডা অভ্যর্থনা পায়, এখানেও তাই জুটবে ওর কপালে। এটাই স্বাভাবিক।

স্পার দাবাল সে, ঢাল বেয়ে এগোল সোরেলটা। সকাল থেকে টানা ছুটছে বলে ক্লান্ত। ঘামে চিকচিক করছে ওটার রেশমী কালো পশম। দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়ায় বিশ্রাম আর খাবারের অধিকার জন্মেছে ওটার। আগে আস্তাবলে যেতে হবে, ভাবল সে, ঘোড়াটার যত্নের ব্যবস্থা করার পর বেল্টের নিচে নিজের চুপসে যাওয়া পেটের গতি করা যাবে।

ঢাকার মুখে কামারের দোকান। হাপর টানছে লোকটা। চোখ তুলে ওকে দেখল একবার, নির্লিপ্ত নীল চোখ কিংবা মুখে কোন ভাবান্তর নেই। তারপর নিজের কাজে মনোযোগ দিল, গনগনে আগুনে লোহার টুকরোটা ঠিকমত বসিয়ে দিল।

দুপাশের বাড়িগুলোর ওপর নজর বুলাল সে। ব্যাংক, নাপিতের দোকান, লঅফিস, সেলুন, জেনারেল স্টোর, লিভারি স্ট্যাবল…সবই আছে। খানিক এগিয়ে প্রথম আস্তাবলটা পেয়ে থামল ও। এতক্ষণ টুলে বসে ওকে দেখছিল হসল্যার, উঠে এগিয়ে এল। ঠোঁটের কোণে সস্তা তামাকের রোল করা সিগারেট।

হাউডি, স্ট্রেঞ্জার! অনেক দূর থেকে আসছ মনে হয়? একমুখ ধোয়া ছেড়ে জানতে চাইল মাঝবয়সী লোকটা। গলাটা ফ্যাসফ্যাসে, মনে হলো ঠাণ্ডা লেগেছে। বেল্টের ওপর মাঝারি সাইতের একটা ভুঁড়ি, পেটের কাছে বাকস্কিন শার্ট ফুঁড়ে বেরোতে চাইছে। অস্থির দৃষ্টি লোকটার নীল রঙের চোখে, কোথাও স্থিরভাবে তাকাচ্ছে. না!

স্যাডল ছেড়ে নেমে পড়ল আগন্তুক, উত্তর দেয়ার প্রয়োজন বোধ করল না। এমন কোন প্রশ্ন নয় ওটা, সাধারণ শুভেচ্ছা বিনিময়ের মতই। হ্যাট খুলে কাপড় থেকে ধুলো ঝাড়ল। দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করল ও, এ ফাঁকে বাতাসে ওড়া ধুলো থিতিয়ে এল আস্তে আস্তে।

প্রতিদিনের জন্যে পঁচিশ সেন্ট, স্ট্রেঞ্জার, সোরেলটাকে ভেতরে নিয়ে যাওয়ার সময় বলল সে, মুখ থেকে সিগারেট না সরিয়েই। দানা-পানি আর দলাই-মলাইসহ। সস্তা, তাই না?

তোমার এখানে থাকার জায়গা হবে?

দুটো বাঙ্ক আছে। ওগুলোর জন্যে পঁচিশ সেন্ট। আর খড়ের গাদায় যদি রাত কাটাও, তবে পনেরো সেন্ট দিতে হবে।

আস্তাবলে বাঙ্ক, এই প্রথম শুনল সে। একপাশে ওঅশ বেসিন দেখে এগোল সেদিকে। পাশে রাখা গামলা থেকে পানি তুলে হাত-মুখ ধুল। কয়েকদিনের ক্ষৌরি না-করা মুখে দাড়িগুলো খসখসে, কাটার মত লাগছে। সামনের দেয়ালে ঝোলানো ছোট্ট আয়নায় মুখ দেখল-ক্লান্ত এক যুবকের থমথমে অবয়ব। দাড়ি আর পথচলার ক্লান্তি ওর বয়স বাড়িয়ে দিয়েছে।

কিছু বললে না যে? পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে হসল্যার। সিগারেটের শেষাংশ বুটের তলায় পিষল। খড়ের গাদায় না বাকে থাকবে?

একটা বাঙ্ক খালি রেখো। রাতে আসব আমি।

আগে টাকা দাও, হাত বাড়িয়ে দিল সে। মুখ ধোয়ার জন্যে পাঁচ সেন্ট, আর যদি গোসল করো তবে দশ-সাবানসহ।

মুচকি হাসল আগন্তুক, লোকটার বাড়তি কিছু টাকা কামানোর প্রয়াস অপছন্দ করলেও সে-সম্পর্কে কোন মন্তব্য করল না। কপাল মন্দ তোমার, মিস্টার। আগাম পাওনা মেটাতে পারছি না, অল্প কিছু খুচরো পয়সা আছে আমার পকেটে। আগে আমাকে পেটের তাগিদ মেটাতে হবে, যদি এরপরও কিছু অবশিষ্ট থাকে তো তোমার পাওনা মেটাব। নইলে…।

আচ্ছা বেয়াড়া লোক তো তুমি! আমার পাওনা শোধ দেবে কিভাবে?

ভেবো না, আমার কাছে দুটো ঈগল আছে। ওগুলো অবশ্য এখুনি ভাঙানোর ইচ্ছে নেই।

তাকিয়ে থাকল হসল্যার, ওর হাব-ভাব বোঝার চেষ্টা করছে। অস্থির দৃষ্টি কিছুক্ষণ ধরে লেগে থাকল ওর মুখে, তারপর অসহায় ভঙ্গিতে কাঁধ উচাল। যন্ত্রণা দেখছি! বিড়বিড় করে বিরক্তি প্রকাশ করল। যতসব ফুটো পকেটঅলাদের নিয়ে আমার কারবার! পয়সা না দিয়ে শেষে কেটে পড়বে না তো?

বেরিয়ে এসে ফুটপাথে দাঁড়াল সে। নজর বুলাল পুরো শহরের ওপর। আগ্রহী হয়ে দেখার নেই কিছু, নিতান্ত সাধারণ একটা শহর। উল্টোদিকে বিশ গজ দূরে একটা ক্যাফে দেখতে পেয়ে এগোল। রাস্তা পেরিয়ে কাচের দরজা ঠেলে ঢুকে পড়ল ভেতরে।

একটা টেবিলে বসে খাচ্ছে তিনজন। চোখ তুলে একবার দেখল ওকে, তারপর খাওয়ায় মনোযোগ দিল। রান্নাঘরের দরজায় দেখা গেল সাদা অ্যাপ্রন পরা মাঝবয়সী এক মহিলাকে, মেক্সিকান। চুলে সাদা ছোপ পড়তে শুরু করলেও চেহারায় বোঝা যায় নিঃসঙ্গ পুরুষের বুকে কাঁপন ধরানোর মত আকর্ষণ একসময় তার যথেষ্টই ছিল। হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে কপালের ঘাম মুছল মহিলা, মুখটা লালচে দেখাচ্ছে। এতক্ষণ বোধহয় চুলোর কাছে ছিল।

আঙুল উঁচিয়ে হ্যাটের কিনারায় ছোঁয়াল আগন্তুক, কাছের টেবিলে বসে পড়ল। সবচেয়ে সস্তা খাবার দাও আমাকে, ম্যাম, মহিলা এগিয়ে আসতে বলল।

স্টু, মটরশুটি, বেকন আর কফিতে চলবে? মাথা ঝাঁকাল সে, পকেট থেকে খুচরো পয়সা বের করল। কত? নব্বই সেন্ট। আগে খেয়ে নাও।

দারুণ ক্ষুধার্ত ছিল, খাওয়ার সময় টের পেল আগন্তুক। সকালে সূর্য ওঠারও আগে শেষ দুই টুকরো জার্কি দিয়ে নাস্তা করেছে। খালি পেট ভরেছে কফিতে। তারপর আর পেটে কিছু পড়েনি। ধীরে সময় নিয়ে খাওয়া সারল ও। রান্নাটা ভাল। গত কয়েকদিন ধরে শুকনো জার্কি আর বেকন খেতে খেতে মুখ বিস্বাদ হয়ে গেছে।

কফির মগ টেবিলে নামিয়ে রেখে এঁটো থালা-বাসন নিয়ে চলে গেল মহিলা।

কফি শেষ করে সিগারেট ধরাল সে। খাওয়ার দাম টেবিলে রেখে উঠে দাঁড়াল এরপর, হ্যাট তুলে নিয়ে দরজার দিকে এগোল।

আজব চিড়িয়া, কোত্থেকে যে আসে এরা! পেছনে ঔদ্ধত্যপূর্ণ একটা গলা শুনতে পেল ও। মিসেস বার্থেজ, এসব আজেবাজে লোককে এখানে ঢুকতে দেয়া উচিত নয় তোমার।

ঘুরে লোকটার দিকে তাকাল আগভুক। এখানে ঢোকার পর একবার নজর বুলিয়েছিল, ঝামেলা বা বিপদের আশঙ্কা করেনি। তারওপর পেটের তাগিদই ওকে অন্য কোন দিকে নজর না দিতে বাধ্য করেছিল। এবার সময় নিয়ে দেখল তাকে-ধোপ-দুরস্ত দামী পোশাক, শহুরে লোক। পুবের কোন শহরে একে ভাল মানাবে। সুদর্শন, নিখুঁত চেহারা। ত্রিশের কাছাকাছি হবে বয়েস। বাদামী চোখে। নিতান্ত অবহেলা, বোঝা যাচ্ছে অন্যদের সহজে আমল দেয় না এ নোক। অন্যদের চ্যালেঞ্জ করে, খুঁচিয়ে এক ধরনের আনন্দও পায় বোধহয়। মোট কথা, সিদ্ধান্তে পৌঁছল ও, খুব বিপজ্জনক না হলেও এ ধরনের লোকের উপস্থিতি অস্বস্তি কর। সঙ্গীদের দিকে তাকাল আগন্তুক, তারপর দুজনকেই বাতিল করে দিয়ে ফিরল লোকটির দিকে। আমাকে কিছু বলছ, মিস্টার? নিস্পৃহ কণ্ঠে জানতে চাইল ও।

না, মিসেস বার্থেজকে বলছিলাম, কাছে দাঁড়ানো মহিলার দিকে তাকাল সে, চাপা হাসি দেখা গেল চোখে-মুখে। ওকে কিছু বলেছি আমি? সঙ্গীদের উদ্দেশে শুধাল।

মুখ টিপে হেসে উঠল অন্যরা, উত্তরে মাথা নাড়ল।

আচ্ছা, বেন, মোটাসোটা সঙ্গীর দিকে তাকিয়ে জানতে চাইল সে, চোখে কৌতুক। লিয়ন সিটিতে এ ধরনের ছোঁকছোঁক করা ভবঘুরেদের আসা-যাওয়া কিভাবে বন্ধ করা যায়, বলো তো? এরকম একটা আইন করার সময় হয়তো হয়েছে-ইচ্ছে করলেই কেউ যেখানে-সেখানে ঢুকতে পারবে না।

বিশেষ করে এই ক্যাফের কথা বোঝাতে চাচ্ছ তুমি? হেসে পাল্টা জানতে চাইল বেন, উদ্দেশ্যপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাল অন্য সঙ্গীর দিকে।

তুমি বোধহয় আমার সম্পর্কেই বলছ, শান্ত, সাবলীল কণ্ঠে খোশ-গল্পে বাধ সাধল আগন্তুক। নির্বিকার দেখাচ্ছে তাকে। আমি ছাড়া আর কেউ এখানে নেই। তোমার বন্ধুদের যদি বলে থাকো, উল্টোদিকে বসা দুজনকে দেখাল। তাহলে মিটে গেল ব্যাপারটা। আমার তাতে কিছু যায়-আসে না।

ধক্ করে জ্বলে উঠল লোকটার চোখ, দাড়িয়ে পড়ল সে।

মি. ক্রুশার, দয়া করে শান্ত হয়ে বসো, চাপা স্বরে বলল মহিলা, কণ্ঠে বিরক্তি চাপা থাকল না। একজন ভদ্রলোকের আচরণ কি রকম হওয়া উচিত তা বোধহয় তোমার চেয়ে বেশি আর কেউ জানে না। ঘুরে আগন্তুকের দিকে ফিরল, তার ভয় হলো হয়তো এখানেই শেষ হবে না ব্যাপারটার; আগন্তুক সদিচ্ছা দেখালে অবশ্য তা ঘটতে পারে। প্রত্যাশা নিয়ে তার দিকে তাকাল মিসেস বার্থেজ। আগন্তুকের মধ্যে আগ্রহ না দেখে খুশি হলো, এগোল দরজার দিকে।

তাকে অনুসরণ করে পোর্টে বেরিয়ে এল সে। ধন্যবাদ তোমাকে, মৃদু স্বরে বলল মহিলা। তোমরা আগে থেকে পরিচিত?

প্রথম দেখলাম ওকে।

বুঝতে পারছি না। এমনিতে সে খুব ভদ্র আচরণ করে সবার সাথে, হঠাৎ…

হয়তো আমার চেহারা-সুরৎ ওর পছন্দ হয়নি, ক্ষীণ হেসে বাধা দিল সে। ওর মত দ্র কাপড় নেই পরনে, পকেটেও পর‍্যাপ্ত টাকা নেই।

তাতে ওর কিছু আসে-যায় না।

বোধহয় আসে-যায়, সে চায়নি ওর সামনের টেবিলে একজন ভবঘুরে বসে থাকুক, নড করল আগন্তুক, মহিলাকে আর কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়ে পোর্চ ছেড়ে নেমে সাইডওঅক ধরে এগোল।

শহরটা একবার চক্কর দেয়া যাক, ভাবল সে। গির্জা পর্যন্ত হেঁটে চলে গেল। পশ্চিমের কোন বিচ্ছিন্ন শহরে যেমন থাকে এখানে তারচেয়ে বেশিই আছে, গির্জার পাশে স্কুলটা দেখে ভাবল। ব্যাংকটা শহরের প্রায় মাঝখানে। ছোট দুটো হোটেলও আছে।

ফেরার পথে প্রথম সেলুনে ঢুকে পড়ল আগন্তুক। বাইরের চেয়ে ভেতরে আলো কম। একপাশে বিশাল বার, বাকিটা জুড়ে ছড়ানো-ছিটানো টেবিল আর চেয়ার। দেয়ালের কোণে আয়না লাগানো, কেউ ইচ্ছে করলে এককোণে বসেও সবার ওপর নজর রাখতে পারবে। বারের সামনে রাখা টুলের সারির একটায় বসে হুইস্কির ফরমাশ দিল সে। চোখ বুলাল অন্যদের ওপর। দুটো টেবিলে পোকার খেলা চলছে, কাছে দাঁড়িয়ে দেখছে কয়েকজন। আরেকটা টেবিলে বসে গল্প করছে তিন পাঞ্চার, সামনে হুইস্কির বোতল আর গ্লাস।

বারের ওপর গ্লাস নামিয়ে রাখল মোটাসোটা বারকিপার। থলথলে মুখ, চর্বির আধিক্যে চোখগুলো প্রায় সময়েই বুজে থাকছে। সবল ভারী হাত বারের ওপর রেখে ঝুঁকে এল সে। কাজ খুঁজছ নাকি?

মন্দ হয় না তাহলে। পকেটের অবস্থা সুবিধের নয়।

টেম্পলার লোক খুঁজছে। উত্তরে মাইল খানেক গিয়ে প্রথম ট্রেইল ধরে এগোলে বাথানটা পেয়ে যাবে। ওর হাল বিশেষ সুবিধের নয়, ঠিক মত বেতন দেয়ার অবস্থাও নেই। খরা আর রাসলাররা ডুবিয়ে ছেড়েছে। এদিকে ওকে নোটিশ দিয়েছে ক্রুশার। হয়তো দুই মাস পরই ব্যাংকের সম্পত্তি হয়ে যাবে বাথানটা।

ক্রুশার?

হেনরী ক্রুশার, ব্যাংক মালিকদের একজন।

হয়তো ক্যাফেতে দেখা সুবেশী ওই লোকটাই, বয়সটা কমই-ভাবল আগন্তুক।

অথবা প্রাইসের স-মিলে যেতে পারো। সকালে পা কেটে ফেলেছে ওর এক লোক। পরিশ্রম করতে রাজি থাকলে ওখানেই যাও। প্রাইস ভাল বেতন দেয়।

কোথায় পাব ওকে?

ব্যাংকের পাশের গলি ধরে পুবে কিছুদূর গেলে পেয়ে যাবে মিলটা।

ধন্যবাদ।

হুইস্কি শেষ করে উঠে দাঁড়াল আগন্তুক। সময়টা এখানেই কাটানো যাক, সিদ্ধান্ত নিল সে, পোকার টেবিলে চেয়ার খালি হয়েছে। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল, তারপর অন্য কেউ আগ্রহী হলো না দেখে বসে পড়ল। ডিলার লোকটা তাস বাটার ফাঁকে দেখল ওকে। ভাবলেশহীন মুখ, পেশাদার। অন্য দুজন তা না হলেও একেবারে আনাড়িও নয়। চোখের অস্থির চাহনি সতর্ক করল ওকে, ধারণা করল কোন ঝামেলা হলে এদের কাছ থেকেই আসার সম্ভাবনা বেশি।

তাস কখনও ঠকায়নি ওকে। কারণটা বোধহয় এই, হিসেব করে যুক্তি দিয়ে খেলে সে। আজও খেলল। খেলার ফাঁকে লোকজনের টুকরো টুকরো কথা কানে আসছে। পশ্চিমের যে কোন শহরে সেলুন হচ্ছে খবরের জন্যে আদর্শ জায়গা। কয়েক ঘণ্টায় মোটামুটি একটা চিত্র পেয়ে গেল-কেভিন লপার, হেনরী ক্রুশার, রিক স্যাভেজ…বেশ কয়েকটা নাম। পাঁচটা বাধানের নাম কানে এসেছে, খরার প্রকোপ চলতে থাকায় ঘুরে-ফিরে তা নিয়েই ওদের আলোচনা বেশি হচ্ছে। অবশ্য রাসলিং নিয়েও আলোচনা করেছে।

নিজের পকেটের অবস্থা কাউকেই বুঝতে দেয়নি আগন্তুক। প্রথম দুই ঘণ্টায় দুএকটা ঝুঁকি নিয়েছে কেবল, কাজে লেগে যাওয়ায় বেশ কিছু লাভ হয়েছে। ডিলার লোকটা চুরি করছে, কিন্তু ওর বেলায় তা করছে না, কারণটা বুঝতে পারল না ও। লোকটাকে বাজিয়ে দেখতে চাইল, উৎসাহ দেখা গেল না, তার মধ্যে। অবাক হলো ও, জুয়াড়ী এড়িয়ে যাচ্ছে ওকে, কিন্তু সুযোগ পেলেই অন্য দুজনকে কচুকাটা করতে দ্বিধা করছে না।

হেরে গিয়ে খেপে গেল ওরা। বাজিয়ে দেখতে গিয়ে আরও হারল। যথেষ্ট হয়েছে ভেবে হিসাব করে খেলা শুরু কৱল আগন্তুক। একটা ড্রিঙ্ক দিয়ে যাওয়ার সময় ওর পাশে এসে দাঁড়াল বারকিপার। তোমার দিন দেখছি আজ, স্ট্রেঞ্জার! হালকা সুরে বলল চর্বির দলা। লেসলির তো তলানিতে এসে ঠেকেছে, ডিলারের দিকে ইঙ্গিত করে যোগ করল।

আমার পক্ষ থেকে সবাইকে ড্রিঙ্ক দাও।

অন্য দুজন খেলে বোম হয়ে আছে। অনবরত সিগারেট ফুঁকে নিজেদের শান্ত রাখার চেষ্টা করছে।

শেষ দানটা বেশ বড়সড় হলো। সব চিপস পকেটে ঢুকিয়ে উঠে দাঁড়াল ও।

আরে, তুমি দেখছি চলে যাচ্ছ? তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলে উঠল ডান পাশের লোকটা। মগের মুল্লুক নাকি? ইচ্ছে হলো আর যখন-তখন চলে যাবে?

ভাগ্য আজ তোমাদের সাথে নেই, বন্ধুরা। আরও খেললে শেষে ফতুর হয়ে যাবে। ভরাডুবি হওয়ার আগেই সাবধান হওয়া ভাল নয় কি? আমার পক্ষ থেকে ড্রিঙ্ক নাও মাথা ঠাণ্ডা করে ভেবে দেখো ঠিক বলেছি কি-না।

চুরি করেছ তুমি? অভিযোগ করল অন্যজন।

ওর দেয়া তাসে খেললাম আমরা, ডিলারকে দেখাল আগন্তুক। ভজকটটা কোথায় হয়েছে বুঝছি না তো। তুমি যা বলেছ, ঘুরে লোকটার দিকে তাকাল। প্রমাণ করতে পারবে? কেউ বললেই তো…

তুমি চুরি করেছ! চড়া গলায় ওকে বাধা দিল প্রথমজন। রাগে ফুলে উঠেছে গলার পেশীগুলো। এর মধ্যে প্রমাণ দেয়ার কি আছে? আমাদের টাকা এখন তোমার পকেটে এবং কেটে পড়তে চাইছ তুমি। এটাই তো যথেষ্ট। কি বলো, লেসলি?

ছোট্ট করে মাথা ঝাঁকাল ডিলার, ঠোঁটে মৃদু হাসি।

তো? লোকটার মুখোমুখি হলো ও, চেয়ার পেছনে ঠেলে দিয়েছে।

সেলুনের বাকি লোকগুলো দেখছে ওদের।

খেলতে হবে তোমাকে! জেদী স্বরে বলল পাশের লোকটা।

উঁহুঁ, দৃঢ় স্বরে ঘোষণা করল আগন্তুক। সুযোগ পেলে আরেক দিন হয়তো খেলা যাবে। কিন্তু আজ আর নয়।

দুপা এগোতে সক্রিয় হয়ে উঠল ওরা। লাফিয়ে ওর পথরোধ করল পাশের লোকটা। চোখের কোণ দিয়ে আগন্তুক দেখতে পেল টেবিল থেকে হুইস্কির বোতল তুলে নিয়েছে অন্যজন। দেখো, বন্ধুরা, অযথাই মাথা গরম করছ, হালকা সুরে বলল ও যদিও তাতে বিন্দুমাত্র আপসের সুর. নেই বরং চাপা বিরক্তি প্রকাশ পেল।

জেফ, এই ব্যাটা দেখছি আমাদের জ্ঞান দিতে চাইছে! দুপা এগিয়ে এসে সামনে দাড়াল বোতলঅলা। চলো, টাকা নিয়ে কেটে পড়ার খায়েশ ওর মিটিয়ে দেই।

লোকটাকে দেখল আগন্তুক, গায়ে-গতরে জোর ভালই, আছে। তুলনায় অন্যজনকে শীর্ণদেহী বলা চলে। চোখে একরাশ জেদ, বোঝা যাচ্ছে একেও টপকে যেতে হবে। ডিলারের দিকে ফিরল ও, লোকটাকে নিস্পৃহ দেখাচ্ছে কিন্তু চোখে চাপা কৌতূহল। আগন্তুক নিশ্চিত হলো এ লড়াইয়ে অংশ নেবে না ডিলার, বরং ও কিভাবে লোকগুলোকে সামাল দেয় তা দেখতে আগ্রহী। পুরোপুরি পেশাদার লোক। অন্তত একজন তো কমল, ভাবল আগন্তুক।

টাকাগুলো টেবিলে রাখো, স্ট্রেঞ্জার। তারপর মানে মানে কেটে পড়ো, বলল লিউক। নির্দেশের মত শোনাল কথাগুলো।

উঁহু, তোমাদের কথাগুলো পছন্দ হচ্ছে না আমার।

নিকুচি করি তোমার পছন্দের! খেপে গিয়ে ঘুসি চালাল জেফ।

এরকম কিছু হতে পারে, জানত আগন্তুক। সরে গিয়ে ঘুসিটা কাটাল, তারপর হাত চালাল। উড়ে গিয়ে টেবিলের ওপর আছড়ে পড়ল জেফ। হুড়মুড় করে তাকে নিয়ে উল্টে পড়ল টেবিলটা। মেঝেতে মাথা ঠুকতে জ্ঞান হারাল সে।

ঝটিতি ঘুরে দাঁড়াল ও, লিউক ওর প্রত্যাশার চেয়ে বেশি ক্ষিপ্রতার সাথে যোতল চালিয়েছে। বলিষ্ঠ কাঁধে লাগল আঘাতটা। বোতল ভেঙে হুইস্কি আর কাচের টুকরো ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। দুপা এগিয়ে লিউককে ধরে ফেলল ও, ঝটপট দুটো ঘুসি হাঁকাল। মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল লোকটা। রাগে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাল এবার, হাত বাড়াল পিস্তলের দিকে ছুটে এসে পা দিয়ে তার হাত মেঝের সাথে চেপে ধরল আগন্তুক। ককিয়ে উঠল লোকটা।

ঝুঁকে হোলস্টার থেকে পিস্তলটা বের করে নিল ও, তারপর নামিয়ে আনল লিউকের দিতে। জ্ঞান হারানোর আগে খিস্তি করল সে।

পিছিয়ে এল আগন্তুক, ঘুরল ডিলারের দিকে।

নিজের চেয়ারে বসে আছে লেসলি উইলিয়ামস। অস্বস্তিভরে হাসল, কাঁধ উঁচাল অসহায় ভঙ্গিতে। বোকামির দণ্ড দিল ওরা, হালকা সুরে মন্তব্য করল।

কিন্তু তুমিই ওদের উস্কে দিয়েছ! শীতল কণ্ঠে অভিযোগ করল আগন্তুক। চুরি করেছ তুমি কিন্তু তা আমার ওপর চাপাতে চেয়েছ।

ঠিক বললানি, বন্ধু, হাসি ম্লান হলো না লেসলির।

তুমি একটা আস্ত মিথ্যুক এবং সস্তা চোর! তোমার মত বহু লোক দেখেছি আমি, হাত সাফাই করে যারা নিরীহ লোকের পকেট খালি করেছে। শেষপর্যন্ত ওরা শহর বা ক্যাম্প ছেড়েছে নয়তো বুটহিলে শুয়েছে। টেবিলের ওপর লিউকের পিস্তলটা ছুঁড়ে দিল ও।

লেসলি উইলিয়ামসের হাসি মুছে গেল। রাগ ফুটে উঠল চোখে। গানফাইটের আশঙ্কায় একপাশে সরে গেল সেলুনের সব লোক। পরস্পরের দিকে তাকিয়ে আছে ওরা। চোখ সরিয়ে নিয়ে টেবিলে রাখা পিস্তল দেখল জুয়াড়ী, তারপর আগন্তুকের উরুতে চলে গেল তার দৃষ্টি। দুপা ফাঁক করে দাঁড়িয়ে আছে সে পনেরো ফুট দূরে, শরীর টান টান। ক্ষিপ্রবেগে পিস্তল তুলে নিতে উরুর কাছে আলতোভাবে পড়ে আছে ডান হাত।

হঠাৎ নিজেকে গুটিয়ে নিল লেসলি, ক্লিষ্টভাবে হাসল। দেখো বাপু, ও জিনিসটা ভাল চালাতে জানি না আমি। তাছাড়া আমাদের মধ্যে এমন কিছু ঘটেনি যে ডুয়েল লড়তে হবে। ব্যাপারটা অন্য কোনদিন মিটিয়ে ফেলব আমরা।

সেদিন টেবিলটা দেয়ালের আয়নার কাছ থেকে সরিয়ে ঘরের মাঝখানে রাখবে আশা করি, আর ওই ফুলহাতা কোটটা পরে এসো না।

ত্যাগ করল ডিলার। তোমার ইচ্ছেমতই হবে, মিস্টার, জোর করে নিজেকে ভাবলেশহীন রাখার চেষ্টা করল যদিও তার চালাকি ধরা পড়ে গেছে।

হচ্ছে কি এখানে, অ্যাঁ? সজোরে খুলে গেল ব্যাটউইং দুরজা, ভরাট কর্তৃত্বপূর্ণ একটা স্বর শোনা গেল।

আর সবার মত ঘুরে সেদিকে তাকাল আগন্তুক, বিশালদেহী এক লোক এসে দাঁড়িয়েছে। ঘরের যে কোন লোকের চেয়ে অন্তত ইঞ্চি ছয়েক লম্বা হবে। প্রচণ্ড চওড়া বুকের ছাতি, পঁয়তাল্লিশ ইঞ্চির কম হবে না। শার্টের পকেটের ওপর আঁটা টিনের তারাটা বিশাল বপুর তুলনায় বেশ ছোটই লাগছে।

তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল আগন্তুকের দৃষ্টি। লিয়ন সিটির মার্শালের মুখের ওপর স্থির হলো। পাথরে গড়া একটা মুখ যেন, অনেকগুলো কাটা দাগ সেখানে। কানের গোড়ার কাছে উর্দিষ্ট চিহ্নটা খুঁজে পেল। সারা শরীরে প্রশান্তির পরশ, অনুভব করল সে, তিনটে বছরের বিরামহীন চলা শেষ হয়েছে বোধহয়। এমন একটা মুখই খুঁজছিল।

খুঁটিয়ে ওকে দেখছে মার্শাল। তোমাকে আগে কখনও দেখিনি।

দেখার কথাও নয়, আজই এসেছি।

কোথায় উঠেছ?

শহরে ঢোকার মুখে প্রথম আস্তাবলটায়।

কে যেন হেসে উঠল, মার্শাল সেদিকে ফিরতে চুপ মেরে গেল। ঘুরে বারকিপারের দিকে তাকাল সে। এ দুটোর মাথায় পানি ঢেলে জ্ঞান ফেরানোর ব্যবস্থা করো, বব, অবলীলায়, বাম হাতে একটা চেয়ার টেনে বসে পড়ল। ডিলারের দিকে ফিরল এবার। তোমার কোন অভিযোগ আছে?

না। যা ঘটেছে তাতে ওর কোন দোষ নেই। ঘরের আরও দুজনকে জিজ্ঞেস করল মার্শাল। মোটামুটি একই বক্তব্য পাওয়া গেল। আনমনে মাথা ঝাঁকাল সে, বারকিপারকে ড্রিঙ্ক দেয়ার ইঙ্গিত করল। টেবিলে রাখা তাস তুলে নিয়ে ফেটতে শুরু করল এরপর। তো লেসলি, এ নিয়ে একমাসের মধ্যে তিনবার ঝামেলা বাধল তোমার টেবিলে। এভাবে চললে কিন্তু খেলাটা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হব আমি। আর তোমাকে লিয়ন সিটি ছাড়তে হবে।

দেখো, রিক, আজকের ব্যাপারটায় আমার হাত ছিল না।

শাট আপ, লেসলি! আমাকে জ্ঞান দিতে এসো না, মুখিয়ে উঠল মার্শাল, থাবড়া মারল টেবিলে। পিস্তলটা দুহাত লাফিয়ে উঠে আবার টেবিলেই পড়ল, আর টেবিলটা কাঁপতে থাকল। তোমার মত ঘঁচোড় জুয়াড়ীদের এই রিক স্যাভেজ ভাল করেই চেনে, বহুবার শায়েস্তা করেছে। বোলচাল বাদ দিয়ে আসল কথায় আসো! এই লোকটা কোন ভজকট করেছে?

না। ও ফেয়ার খেলে জিতেছে।

অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল মার্শাল। চেয়ারটা কাঁপতে শুরু করল, ভেঙে পড়বে যেন। তো, আরেকবার হারলে তুমি, লেসলি! একটা, অচেনা লোক তোমাকে টেক্কা দিয়ে জিতে গেল, আর তা সহ্য করলে?

আমি হারিনি, রিক। হেরেছে ওরা দুজন।

তো এতক্ষণে বোঝা গেল ব্যাপারটা। তোমার চেয়ে সেয়ানা মনে হয়?

ভাল খেলে, জুয়াড়ীর সংক্ষিপ্ত জবাব।

লপার শুনলে খুশি হবে। সে তো খেলার লোকই পায় না। কি, জমবে ওর সাথে?

মন্দ হবে না।

আগন্তুকের দিকে ঘুরল রিক স্যাভেজ। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখল কিছুক্ষণ। থাকছু নাকি?

শহরটা আমাকে আগ্রহী করে তুলেছে।

সশব্দে চেয়ার ছাড়ল মার্শাল। ও দুটো কোথায়, বব? বারকিপের দিকে ফিরে জানতে চাইল।

পোর্চে আছে। বলেছি তোমার সাথে দেখা করে যেতে।

ভাল করেছ। দরজার দিকে এগোল স্যাভেজ, জুতো জোড়া, মেঝেতে ভরাট শব্দ তুলছে। হাতের তালু দিয়ে ব্যাটউইং দরজার পাল্লা ঠেলে বেরিয়ে গেল। পাল্লাজোড়া ফিরে এসে এত জোরে পরস্পরের সাথে বাড়ি খেল যে মনে হলো ভারী কিছু একটা মেঝেতে আছড়ে পড়েছে। এসো আমার সাথে! বাইরে মার্শালের চাপা গলার নির্দেশ শোনা গেল একটু পর।

জুয়াড়ীর ওপর আগন্তুকের চোখ। বিষদৃষ্টিতে মার্শালের পেছন দিকটা দেখছে লেসলি উইলিয়ামস, চোখে তীব্র ঘৃণা। বিড়বিড় করে বলল কি যেন। তারপর মেঝেতে একদলা থুথু ফেলল। ঘরের অন্যান্য তোক নিজেদের চরকায় তেল দেয়া মনস্থ করল এবার, যার যার জায়গায় ফিরে গিয়ে ঘটনাটা নিয়ে আলাপ করতে শুরু করল।

দরজার দিকে এগোল আগন্তুক।

সাবধানে থেকো, বন্ধু, চাপা স্বরে পেছন থেকে বলল জুয়াড়ী। অন্তত আজকের রাতটা।

ঝট করে ঘুরে দাঁড়াল সে, তাকাল লেসলি উইলিয়ামসের চোখে।

বেশ কিছু ডলার জিতেছ তুমি। অনেকেই ভাবতে পারে তোমার পকেটে থাকার চেয়ে ওগুলো তাদের নিজেদের পকেটে থাকাই ভাল হবে।

ব্যাপারটা অত সহজ হবে না।

সময় করে এসো একবার, ওপরে থাকি আমি, নিচু স্বরে বলল সে যাতে অন্য কেউ শুনতে না পায়। তোমার সাথে বেশ কিছু কথা আছে। মনে হচ্ছে একই দলের লোক আমরা।

স্থির দৃষ্টিতে জুয়াড়ীর দিকে তাকিয়ে থাকল ও। বুঝতে চেষ্টা করছে লোকটার এত রাখ-ঢাক আর উদ্দেশ্যপূর্ণ কথার পেছনে কি থাকতে পারে। আচরণে আর কথাবার্তায় যতটা সহজ-সরল মনে হচ্ছে মোটেও তা নয় সে-এটুকু নিশ্চিত। একটু আগেও ওকে শত্রু ভাবছিল অথচ এখন যেন নিজের দলে টানতে চাইছে। কারণটা কি? বোঝা যাচ্ছে মার্শাল রিক স্যাভেজের কারণে বদলে গেছে জুয়াড়ীর মনোভাব, এবং স্যাভেজকে ঘৃণা করে লোকটা।

লেসলি উইলিয়ামস আর কিছু না বলায় দরজার দিকে এগোল আগন্তুক।

বেরিয়ে এসে ব্যাংকের দিকে এগোল ও। সন্ধ্যার আর বেশি দেরি নেই। ফুটপাথ আর রাস্তায় বেশ কিছু লোক দেখা যাচ্ছে। বেশিরভাগই সাধারণ পাঞ্চার, ভবঘুরে অথবা ক্যাটম্যান; নেস্টর বা সাধারণ ব্যবসায়ীও আছে। একটা হোটেলের সামনে তিনজন মেক্সিকানকে দেখতে পেল ও, নিজেদের মধ্যে আলাপে ব্যস্ত। অন্য কোন দিকে ভুলেও মনোযোগ দিচ্ছে না। সীমান্তের কাছাকাছি হওয়ায় এদিকে মেক্সিকানদের বসতি অ্যারিজোনার অন্য যে কোন জায়গার চেয়ে বেশি।

খুরের আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত রাস্তা পেরিয়ে ব্যাংকের পাশের গলিতে ঢুকে পড়ল সে। স্রেফ কৌতূহল বশে তাকাল ল-অফিসের দিকে। জানালা পথে মার্শালকে দেখা যাচ্ছে, নিজের চেয়ারে বসে আছে। সামনে জেফ আর লিউক দাঁড়িয়ে। পকেট হাতড়ে টাকা বের করে এগিয়ে দিল ওরা, তারপর বেরিয়ে এল বিরস মুখে।

দাঁড়িয়ে থেকে পুরো ঘটনাটাই দেখল ও। রিক স্যাভেজের সাথে কি ধরনের রফা হলো ওদের, জরিমানা? কিন্তু সে তো কোন অভিযোগ করেনি! শ্রাগ করে এগোল আগন্তুক, এটা তার ব্যাপার নয়। অন্যের ব্যাপারে নাক না গলানোই বুদ্ধিমান লোকের কাজ।

গলি ধরে খোলা জায়গায় বেরিয়ে আসতে একরাশ ঠাণ্ডা বাতাস লাগল ওর শরীরে, পাইনের সুবাস নাকে দোলা দিল। পাহাড়ের দিকে তাকাল ও। আবছাভাবে চোখে পড়ছে চিরুনির মত খাজগুলো, শেষ বিকেলের আলোয় ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে আসছে। কিছুদূর এসে দেখতে পেল ছোটখাট কেবিনটা, ভোলামেলা জায়গাটার একেবারে কোণে, গুটি কয়েক পাইন আর কটনউডের ছায়ায় দাঁড়িয়ে। একপাশে অনেকগুলো গাছের গুড়ি পড়ে আছে, কাহেই বেশ কিছু চেলা করা কাঠ আর মাল টানার একটা ওয়াগন। নামমাত্র শেডের নিচে স্ট্র-তে দুটো তাগড়া খচ্চরকে খড় দেয়া হয়েছে। পাশে ওঅটর ট্রাফ। পুরো জায়গাটা পরিচ্ছন্ন।

কেবিনটা ছোট হলেও মজবুত। চিমনিতে ধোঁয়া উঠছে। নয়-দশ বছরের একটা ছেলে বেরিয়ে এল পোর্চে, দেখল ওকে, তারপর ছুটে ভেতরে ঢুকে পড়ল। আগন্তুক পোর্চ পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই চল্লিশোর্ধ্ব এক লোক বেরিয়ে এল। ছোটখাট মজবুত শরীর।

মি. প্রাইস? জানতে চাইল সে।

মাথা ঝাঁকাল লোকটা, চোখে প্রশ্ন নিয়ে তাকাল।

ববের কাছে শুনলাম তোমার একজন লোক দরকার।

ভেতরে এসো, বলে ঘুরে দাঁড়াল নিকোলাস প্রাইস। তারপর জোরাল গলায় ডাকল মার্ক নামের কাউকে। তোমার মা-কে আমাদেরকে কফি দিতে বলল, ছেলেটা দরজায় এসে দাঁড়াতে বলল সে।

প্রাইসের পেছনে ভেতরে ঢুকল আগন্তুক। ছোট কামরাটাই সম্ভবত কাঠ ব্যবসায়ীর অফিস। একটা টেবিল আর চারখানা চেয়ার। দেয়ালের কাছে ছোট ডেস্কে কাগজপত্র। ওপাশে গিয়ে নিজের চেয়ারে বসল প্রাইস, হাত বাড়িয়ে দিল। আমার পরিচয় তো জানোই। তুমি?

জেমস, হাত মেলানোর সময় জানাল আগন্তুক।

শুধু জেমস? কুটি করল প্রাইস।

ওটাই কি যথেষ্ট নয়?

থমকে গিয়ে কি যেন ভাবল সে, তারপর কাঁধ ঝাঁকাল। নামে কি আসেযায়। আমার দরকার কাজ। তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে তুমি তা পারবে।

মার্ক প্রাইস, ছেলেটা, একটা ট্রে-তে কফি আর বিস্কুট পরিবেশন করে কেটে পড়ল।

দুজন লোক ছিল আমার, কফিতে চুমুক দিয়ে বলল কাঠ ব্যবসায়ী। একদিনের ব্যবধানে দুজনকেই হারালাম। পরশু রাতে জুয়া খেলতে গিয়ে লেসলি উইলিয়ামসের গুলিতে মারা পড়েছে একজন। মদে চুর হয়ে ছিল লোকটা, জুয়াড়ীকে চ্যালেঞ্জ করে নিজেই বিপদ ডেকে এনেছে। আর অন্যজন, সকালে কাজ করার সময়ও মাতাল ছিল। কাঠ ফাড়তে গিয়ে নিজের পায়ে কোপ মেরে বসেছে। বোঝে অবস্থা, যত্তসব মাতাল নিয়ে আমার কারবার! তুমিও আবার ওরকম না তো?

উত্তর দেয়ার প্রয়োজন বোধ করল না জেমস।

পাশের ক্রীকটা দেখেছ? ওটা ধরে মাইল দুই গেলে পেয়ে যাবে জঙ্গলটা। ওখান থেকেই কাঠ সগ্রহ করি আমরা। গাছ কাটা, ফাড়ানোর পর বাড়তি কিছু কাজও করতে হবে। হোটেল, ক্যাফে আর কয়েকটা বাড়িতে কাঠ দিয়ে আসতে হবে। তবে সন্ধ্যার আগেই ছুটি পেয়ে যাবে।

দুপুরে আমার এখানে খাবে। রাতে এখানেই থাকতে পারো, সে তোমার ইচ্ছে। মাসে চল্লিশ ডলার। পরিশ্রমের তুলনায় বেতন হয়তো কম কিন্তু ইদানীং ব্যবসা ভাল যাচ্ছে না আমার। তাছাড়া ওই লোকটাকেও কিছু টাকা দিতে হবে, আমার কাজ করতে গিয়ে বিপদে পড়েছে বেচারা। যাকগে, তোমার পোষাবে?

শেষ চুমুক দিয়ে মগ নামিয়ে রাখার সময় মাথা ঝাঁকাল জেমস। ড্রয়ার খুলে চুরুট বের করে ওকে অফার করল প্রাইস।

কাজটা ভাল না লাগলে আগে থেকে জানিয়ে, হুট করে কেটে পড়ো না। বিপদে পড়ে যাব তাহলে। গরু রাইড করার জন্যে লোক এখানে যথেষ্ট আছে কিন্তু কাঠ কাটার তোক পাওয়া মুশকিল।

চুরুট ফুকছে জেমস, নিকোলাস প্রাইসকে ওর পছন্দ হয়েছে।

আরেকজন না পাওয়া পর্যন্ত তোমাকেই চালিয়ে নিতে হবে। উঠেছ কোথায়?

ঠিক করিনি এখনও।

এখানে চলে এসো। হোটেলে থেকে টাকা নষ্ট করার দরকার কি? যাও, জিনিসপত্র নিয়ে এসো…আর আমাদের সাথে সাপার খাবে।

বেরিয়ে এসে ফিরতি পথে এগোল জেমস। অন্ধকার হয়ে এসেছে। আবছাভাবে চোখে পড়ছে গলিটা। মূল রাস্তার কাছে আসতে সেলুনের হৈ-হল্লা কানে এল, রাস্তায় লোকজনের চলাচল বেড়েছে। পশ্চিমের আর সব শহরের মত সন্ধ্যার পরপর সরব হয়ে উঠেছে মরা শহরটা, যেন ঘুম থেকে জেগেছে। মাঝরাতের পর আবার নীরব হয়ে যাবে।

আস্তাবলে এসে সোরেলটাকে ছাড়িয়ে নিল ও। কিছুটা নিরাশ হয়েছে হসল্যার, বিরক্তি প্রকাশ করতেও ছাড়েনি। স্যাডলে না চেপে হেঁটে ফিরতি পথ ধরল জেমস। দুধারের বাড়ি আর দোকান থেকে আসা আলোয় রাস্তার আঁধার পুরোপুরি দূর হয়নি। পাশের বাড়ি থেকে একটা বাচ্চার কান্নার শব্দ ভেসে এল, চিৎকার করে কি যেন বলল এক মহিলা, বাচ্চার মা বোধহয়। জড়ানো গলায় তাকে গাল দিল একটা পুরুষকণ্ঠ, তারপর একটা চড়ের শব্দ ভেসে এল। বোধহয় মহিলার গালে পড়ল, চাপা ফোঁপানির শব্দে ধারণা করল জেমস।

শ্রাগ করে নিজের পথে এগোল ও পশ্চিমে বিচিত্র সব মানুষের কারবার, লিয়ন সিটিতেও তাই। একটা দিন পেয়োনোর আগেই ওর অভিজ্ঞতা কম হয়নি। তবে এ দম্পতির ব্যাপারটা খুব স্বাভাবিক, অহরহ ঘটছে সর্বত্র। ওর কাছে এদের আচরণ আলাদা কোন অর্থ বহন করে না যতটা করে লেসলি উইলিয়ামস, রিক স্যাভেজ বা হেনরী কুশারের আজকের আচরণ। এখন বোঝার উপায় নেই, কিন্তু কয়েকটা দিন গেলে পরিষ্কার হয়ে যাবে।

নিকোলাস প্রাইসের আস্তানায় ফিরে এল জেমস। বেডরোল আর স্যাডল ছাড়িয়ে সোরেলকে নিয়ে করালে চলে এল। ওটাকে দানাপানি দিয়ে দলাই-মলাই করল। খচ্চরগুলো নাক কুঁচকে সন্দেহের চোখে দেখল ওকে, তারপর খড়ের দিকে মনোযোগ দিল। একজন মহিলা বেরিয়ে এসেছে পোর্চে, খেয়াল করল জেমস। হাতে বালতি। করাল থেকে বেরিয়ে মহিলার দিকে এগোল ও। নড করল। ত্রিশোর্ধ, স্বাস্থ্যবতী মহিলা মিসেস প্রাইস। বালতি রেখে হাত বাড়িয়ে দিল সে।

ওগুলো আমাকে দাও, ম্যাম। এটা পুরুষদের কাজ।

মহিলার চোখে দ্বিধা, অস্বস্তিভরে তাকাল সদ্য নিযুক্ত লোকটির দিকে। না, আমিই পারব। এটা তোমার কাজের মধ্যে পড়ে না।

তাতে কি, মাটিতে রাখা বালতি তুলে নিল জেমস। কোত্থেকে আনতে হবে, ম্যাম, ক্রীকের পানি নিশ্চয়ই খাও না?

ব্যাংকের পেছনে কারসনদের কল থেকে নিয়ে এসো, ওটাই কাছে হবে।

পানি নিয়ে ফিরে খাবার ঘরে পৌঁছে দিল জেমস। খেয়াল করল বাসনকোসন ধোয়ার জন্যে ওঅশ বেসিনে ব্যবহারের পানিও ফুরিয়ে গেছে। ক্রীক থেকে পানি এনে দুটো পাত্রে ভরল ও।

তোমার কষ্ট হলো। মার্কের বাবা নেই, হোটেলে গেছে পাওনা আনতে। দুদিন ধরে কলটা ঠিক করতে বলছি। কাঠ কাটার জন্যে তোক কম থাকায় ওকেও হাত লাগাতে হচ্ছে। এদিকটা দেখার সময়ই পায় না বেচারা।

জেমস দেখল বিছানার ওপর বইপত্র নিয়ে বসেছে মার্ক। পড়ার চেয়ে ওর ব্যাপারে মনোযোগ বেশি ছেলেটার। চোখাচোখি হতে হাসল সে। জেমস নড করল ওকে, তারপর বেরিয়ে এল।

নিক এলেই খাবার দেব, পেছন থেকে বলল মহিলা। হাত-মুখ ধুয়ে এসো তুমি।

বেরিয়ে এসে স্যাডল ব্যাগ থেকে ক্ষুর আর কাপড় নিয়ে ক্রীকের কাছে চলে এল ও। দাড়ির জঙ্গলে হাত বুলাল। যতদূর মনে হচ্ছে পরিবারটা আন্তরিক, এদের সাথে তার সম্পর্কটা সুন্দরভাবেই শুরু হোক। নোংরা কাপড় আর দাড়ি নিয়ে টেবিলে বসা ঠিক হবে না। ক্রীকের পানিতে নেমে পড়ল ও। আন্দাজের ওপর মুখ ক্ষৌরি করল, আয়না ছাড়া অনায়াসে কাজটা করতে পারে। অনিশ্চিত যার জীবন সে পকেটে আয়না নিয়ে ঘুরে বেড়ায় না।

একটু পর খেতে বসল ওরা। খাওয়ার আগে প্রার্থনা করল প্রাইস, চোখ বন্ধ করে আছে। ছেলেটার সাথে বারবার চোখাচোখি হচ্ছে জেমসের, দারুণ কৌতূহলী মনে হচ্ছে ওকে।

খাওয়া শেষে বেডরোল নিয়ে ক্রীকের কাছে চলে এল জেমস, বিছানা করল। সময় নিয়ে সিগারেট রোল করল। ধরিয়েছে এসময় ওকে ডাকল প্রাইস, সাড়া দিতে সেখানে চলে এল কাঠ ব্যবসায়ী।

আরে তুমি দেখছি এখানে শোয়ার আয়োজন করেছ! বিস্মিত গলায় বলল সে। আমাদের একটা কামরা তো খালি পড়ে আছে। ওটা ব্যবহার করতে পারো।

খোলা ছাদই আমার কাছে স্বচ্ছন্দের, মি. প্রাইস, হেসে বলল জেমস। বাউণ্ডুলে মানুষ তো, অভ্যস্ত হয়ে গেছি।

কিছুক্ষণ একদৃষ্টিতে ওকে দেখল সে, তারপর শ্রাগ করে ফিরে গেল।

শুয়ে পড়ে সারা দিনের কথা ভাবল জেমস। মন্দ কাটেনি। অস্বচ্ছ একটা ধারণা নিয়ে এখানে আসা বোধহয় বিফলে যাবে না। একজনকে যখন পাওয়া গেছে তখন অন্যদেরও পাওয়া যাবে। উটকো ঝামেলা হিসেবে দেখা দিতে পারে লেসলি উইলয়ামস বা হেনরী ক্রুশার। জুয়াড়ীকে সামলানো কঠিন হবে না। ছোট্ট এ শহরের হেনরী কুশারের সাথে ওর আবার দেখা হবে এটা যেমন নিশ্চিত, তেমনি এ-ও ঠিক ওকে মোটেও পছন্দ করতে পারেনি লোকটা। প্রথম পরিচয়ের তিক্ততা খুব কমই কাটে, সেটা বরং পরে বাড়ে আরও। ত্রিশ চলছে ওর, অনেক বছর ঘুরে-ফিরে দেখেছে দেশটা। জানে পছন্দ করার মত লোককে প্রথম দেখায় ভাল লাগে, অন্তত খারাপ লাগে না। এ পরিবারটির ক্ষেত্রে যেমন হয়েছে-জেমস জানে, এদের সাথে ভাল কিছু সময় কাটবে ওর। প্রাইস দম্পতি সত্যিই আন্তরিক, পছন্দ করার মত মানুষ। ঠিক উল্টোটা হয়েছে হেনরী ক্রুশারের বেলায়। আর রিক স্যাভেজকে এই প্রথম দেখলেও তার সাথে জেমসের জীবনের সবচেয়ে তিক্ত ঘটনা জড়িয়ে আছে। ঘটনাটা ওকে তিনটে বছর ধরে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে, ক্লান্তিহীন পথ চলতে প্রেরণা জুগিয়েছে। অপরিসীম ঘৃণা ওকে নাচার করে ছেড়েছে; বিন্দুমাত্র ধৈর্যহারা হয়নি সে, জানত একদিন ঠিকই ওদের খুঁজে পাবে।

সামনে কঠিন সময়, নিজের জীবন বিপন্ন হতে পারে। কিন্তু তা নিয়ে মোটেই ভাবছে না ও। বরং এক ধরনের ক্লান্তিকর উল্লাস অনুভব করছে শরীরে, কারণ ওর পথচলা শেষ হয়েছে-গন্তব্যে পৌঁছে গেছে সে।

এবার প্রতিশোধের পালা।

ভোরে ওয়াগন নিয়ে বেরিয়ে পড়ল জেমস। ইয়েলার্স ক্ৰীক ধরে মাইল দুই পেরিয়ে এসে পেয়ে গেল বনভূমিটা, অসংখ্য সিডার আর অ্যাসপেনের ছড়াছড়ি। একপাশে ওয়াগন রেখে কুঠার আর ল্যাসো হাতে ভেতরে ঢুকে পড়ল। শুরুতে একটা শুকনো সিডার পেয়ে ওটায় চড়ে একটা শাখার সাথে বাঁধল ল্যাসোটা। অন্য প্রান্ত টান টান করে বাঁধল পাশের গাছের সঙ্গে। নিচে নেমে এসে এবার কাটা শুরু করল।

দুপুরে নিকোলাস প্রাইস যখন সেখানে পৌঁছল ততক্ষণে,কাঠ ফালি করতে শুরু করেছে ও।

খাবারের প্যাকেট এগিয়ে দিয়ে গাছের গুড়ির ওপর বসে পড়ল সে। খেয়ে নাও, জেমস।

কুঠার রেখে ক্রীক থেকে হাত-মুখ ধুয়ে এল জেমস, খেতে বসল।

শুকনো গাছ কাটতে পরিশ্রম বেশি। এরপর থেকে আর কেটো না, পরামর্শ দিল প্রাইস। কাঠের চেলাগুলো ওয়াগনে জড়ো করছে।

তোমার শেডে কিন্তু পর‍্যাপ্ত শুকনো কাঠ নেই।

যা আছে তাতে আরও দুদিন চলবে।

তৃতীয়দিন হয়তো বিপদে পড়বে। কাঠ কাটতে এবং শুকাতে সময় লাগবে, মি, প্রাইস।

শোনো, বাছা, আমাকে মিস্টার-ফিস্টার বলার দরকার নেই। শুধু নিক বলে ডেকো, একটু থামল কাঠ ব্যবসায়ী; ঘুরে তাকাল ওয়াগনে ভোলা কাঠের দিকে, মনে মনে হিসেব করল বোধহয়। যে হারে কাটছ, আমি সন্তুষ্ট, জেমস। সব জায়গায় জোগান দিয়েও বাড়তি কিছু কাঠ থেকে যাবে। বেশি বেশি কাটলে হাঁপিয়ে উঠবে, কাজ ফেলে শেষে চলে না যাও।

কয়েক মাস পরেই কিন্তু শীত আসছে, মনে করিয়ে দিল জেমস। তখন তো কাটা যাবে না, এখন থেকেই জমিয়ে রাখতে হবে। কাঠের দরকার কিন্তু তখনই বেশি।

শীতে ব্যবসাটা ভাল হওয়ার কথা, অথচ তা হয় না! আক্ষেপ করল প্রাইস।

তুমি বোধহয় পর‍্যাপ্ত কাঠ জমাতে পারো না।

কি করব, কাজটা যাকে দেই, সে-ই ফাঁকি দেয়। আর শীতের সময় তো শুয়ে-বসে কাটায় ওরা। আমি নিজে পারি না, বয়স হচ্ছে। একটুতে হাঁপিয়ে উঠি। একটা স কিনতে পারলে অবশ্য এত ঝামেলা হত না, কিন্তু ওটা কিনে বসানোর খরচ এখনও জমাতে পারিনি।

বিকেলে একসাথে ফিরল দুজনে। শেডের কাছে এসে ওয়াগন থেকে কাঠ নামাতে শুরু করল জেমস! অনুভব করল হাতের আঙুলগুলো টনটন করছে, চামড়ার দস্তানা পরার পরও ছড়ে গেছে কয়েক জায়গায়। ফোস্কা পড়েছে। অভ্যস্ত হয়ে গেলে অবশ্য দুদিনের মধ্যে স্বাভাবিক হয়ে যাবে।

হাত-মুখ ধুয়ে এসো তোমরা, বলল লরা প্রাইস। কফির পানি চড়িয়েছি।

আগুন গরম কফি জেমসের ক্লান্তি অনেকটাই দূর করে দিল। সিগারেট ধরিয়ে অপেক্ষা করল প্রাইস আর কোন ফরমাশ দেয় কি-না, তারপর শেডে চলে এল যেটাতে কাঠের চেলা গুছিয়ে রাখা হয়েছে। ছোট একটা বাক্স পেল এককোণে, কয়েকটা যন্ত্রপাতি আছে তার ভেতর-রেঞ্চ, হাতুড়ি, পেরেক। কেবিনে এসে কলটা খুলে ফেলল, আধ ঘণ্টার মধ্যে ঠিক হয়ে গেল ওটা।

ধন্যবাদ, জেমস, আন্তরিক কণ্ঠে বলল মিসেস প্রাইস নিককে অলস বানিয়ে ছাড়বে দেখছি।

হাসল জেমস, হাত ধুয়ে, শেডের কাছে চলে এল। যথেষ্ট সময় বাকি আছে সন্ধের। শেভের বেড়াটা কয়েক জায়গায় নষ্ট হয়ে গেছে, ওটা ঠিক করতে বসল।

রাতে, সাপারের সময় প্রসঙ্গটা তুলল প্রাইস। গতরাতে আস্তাবলে একটা লোক মারা গেছে। দুবার ওর গলায় ছুরি চালিয়েছে খুনী।

পাত্তা দেবে না মনে করেছিল জেমস, তারপর সহসাই লেসলি উইলিয়ামসের সতর্কীকরণ মনে পড়ল ওর। কোন্ আস্তাবলে? খাওয়া না থামিয়ে জানতে চাইল।

শহরে ঢোকার মুখে করবির আস্তাবল।

লোকটাকে চেনো নাকি?

ভবঘুরে। দুদিন ধরে কাজ খুঁজছিল, এখানেও এসেছিল। একদিন কাজ করার পর কেটে পড়েছে ব্যাটা, অলস লোক।

শক্রতা?

হতে পারে। তবে লোকটা নিরীহ ধরনের। আর এমনও নয় যে ওর পকেটে প্রচুর টাকা ছিল যে তা কেড়ে নিতে পারে কেউ।

টাকা? এ জিনিস তার কাছে বেশ কিছু আছে, এবং গতরাতে ওই আস্তাবলেই থাকার কথা ছিল ওর। হয়তো যা ভাবছে আদপে তা নয়, অন্য কোন ব্যাপার। কিন্তু জেমসের মন সায় দিচ্ছে না। সেলুন ভর্তি লোকজন শুনেছে আস্তাবলে রাতটা কাটাবে ও, এবং বেশ কিছু ডলার ওকে জিততে দেখেছে অন্তত ত্রিশজন লোক। এদের যে কেউ লোভী হয়ে উঠতে পারে।

পরদিন থেকে কাজগুলো হলো রুটিনমাফিক। বিকেল পর্যন্ত টানা কাঠ কাটে, ফিরে এসে খুঁটিনাটি কাজ সারে। শেডের চালাটা পুরো ঠিক হয়ে গেছে এখন, বেড়াগুলো মজবুত করে বেঁধেছে জেমস। দুদিন ওয়াগনে করে সাপ্লাই দিয়ে এসেছে হোটেল আর ক্যাফেতে।

প্রাইস একজন ভালমানুষ, এ কদিনে এটা ভালমতই বুঝেছে জেমস। তবে কঠোর পরিশ্রমের ব্যাপারে কিছুটা অনীহা আছে কাঠ ব্যবসায়ীর। তার বুদ্ধিমত্তা মোটেও উঁচুদরের নয়, গুছিয়ে বা কৌশল খাঁটিয়ে কাজ করতে পারে না। যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও তাই তার ব্যবসা জমছে না। তবে লোকটা মিশুক, বিবেচক এবং অন্যের ব্যাপারে নাক গলাতে পছন্দ করে না। ওর সম্পর্কে একবারও জানতে চায়নি। ওর কাজে সে খুশি, এটাই তার কাছে বড় ব্যাপার।

লরা প্রাইস চাপা স্বভাবের মহিলা। বুদ্ধিমতী, স্বামীর মত অগোছাল নয়। অল্পতে খুশি হওয়ার দুর্লভ গুণ রয়েছে তার। প্রয়োজন ছাড়া জেমসের সাথে কথা না হলেও ওর ব্যাপারে মহিলা একেবারে উদাসীনও নয়। সবচেয়ে বেশি পরিশ্রম করছে জেমস, এটা ঠিকই স্মরণে রেখেছে। খাওয়ার সময় তাই পরিমাণে ওকেই বেশি দিচ্ছে। না নিলেও জোর করে তুলে দেয়। ক্লান্ত শরীর নিয়ে বিকেলে যখন ফিরে আসে, গরম কফি আর বিস্কুট চাঙা করে তোলে ওকে।

তিনজনের মধ্যে মার্কই বেশি আকৃষ্ট করেছে জেমসকে। সুযোগ পেলেই ওর পিছু লেগে থাকছে ছেলেটা। দারুণ কৌতূহলী। জেমস এমনিতে কম কথার মানুষ, ছেলেটার প্রশ্নের উত্তর দিতে রীতিমত হাঁপিয়ে ওঠে।

চমৎকার একটা পরিবার। জেমস বিস্ময়ের সাথে অনুভব করে নিজেদের একজন হিসেবে ধরে নিয়েছে ওকে। পরিবারটা নির্ভর করে ওর ওপর, অথচ বেতন আর থাকা-খাওয়ার বিনিময়ে শ্রম দিচ্ছে ও। আন্তরিকতাটুকু টের পায় জেমস। মায়াটা কাটাতে কষ্ট হবে, একদিন তো ওকে চলে যেতেই হবে।

জেমস, মিসেস বার্থেজের সাপ্লাই দেয়ার কথা আজ, দিন পনেরো পরে এক বিকেলে ওকে ডেকে বলল প্রাইস। তোমাকেই নিয়ে যেতে হবে, হিসেবপত্র নিয়ে বসব আমি। ক্যাফের পেছনের দরজা দিয়ে যাবে, পাররে তো

আমিও যাব, বায়না ধরল মার্ক।

চোখ ছোট করে ছেলের দিকে তাকাল কাঠ ব্যবসায়ী, হেসে ফেলল একটু পর। দেখো, জেমস, ও তোমার ন্যাওটা হয়েছে কেমন। অথচ কদিন হলো এসেছ! তুমি চলে গেলে কষ্ট পাবে ছেলেটা।

কেন ভাবছ আমি চলে যেতে পারি?

লরা বলছিল, পরে আমারও তাই মনে হলো। তোমার মত লোক এখানে থাকতে আসবে না, এটুকু পরিষ্কার। লুকিয়ে থাকার জন্যে লিয়ন সিটি একটা আদর্শ শহর। সবচেয়ে কাছের শহর একশো মাইল দূরে, একপাশে মরুভূমি আর অন্য তিনদিকেই দুর্গম ট্রেইল। কোন টেলিগ্রাফ অফিস নেই যে বাইরের কোন শহরের সাথে যোগাযোগ করা যাবে। এখানে লুকিয়ে থাকা কোন ব্যাপারই নয় যদি রিক স্যাভেজকে সমঝে চলা যায়। থামল সে, হাল, তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেছে দৃষ্টি। হয় তুমি কাউকে খুঁজছু নয়তো নিজে লুকিয়ে থাকতে এসেছ।

লরা প্রাইসের চিন্তার গভীরতা জানতে পেরে বিস্মিত হলো জেমস।

আমার অবশ্য অত চিন্তা নেই, ক্ষীণ হেসে যোগ করল সে। আমাকে খোঁজার মত নেই কেউ, আর…

পরে একসময় এ নিয়ে আলাপ করব আমরা, নিক, শান্ত কণ্ঠে বাধা দিল জেমস। তোমাদের বেশি না জানাই ভাল। তবে এটুকু নিশ্চিত থাকতে পারো আমার দ্বারা তোমাদের কোন ক্ষতি হবে না।

আমরা জানি, জেমস। ধন্যবাদ। ঘুরে কেবিনের ভেতরে ঢুকে পড়ল সে।

ওয়াগনে কাঠ ভোলা হয়ে গেছে, আগেই। জেমস দেখল চালকের আসনে উঠে বসেছে মার্ক। ও উঠতে সরে বসল ছেলেটা, ওয়াগন চলতে শুরু করতে ওর একটা বাহু চেপে ধরল। তুমি চলে যাবে? চাপা স্বরে জানতে চাইল।

খুব শিগগিরই নয়, বাছা।

মা বলছিল গতকাল। ঘুমিয়ে পড়ার আগে শুনেছি আমি।

হয়তো বেশ কিছু দিন থাকব।

তারপর?

আমার বাড়িতে ফিরে যাব।

কি যেন ভাবল ছেলেটা। কারসনদের বাসা পেরিয়ে যাওয়ার সময় পোর্চে দাঁড়ানো একটা ছেলের উদ্দেশে হাত নাড়ল। ওখানে তোমার কে আছে?

দুটো মুখ ভেসে উঠল জেমসের মানসপটে-মোনা…ফ্রেড। না, এখন আর নেই কেউ।

তাহলে তোমার বাড়িতে কেউ নেই! বিস্ময় মার্কের কণ্ঠে। আমাদের এখানেই থেকে যেতে পারো তুমি।

জবাব না দিয়ে ওয়াগন চালানোয় মনোযোগ দিল জেমস। মূল রাস্তা ধরে কিছুদূর উত্তরে এগিয়ে জেনারেল স্টোরের পাশের গলি ধরে পেছনের রাস্তায় চলে এল। অপরিসর, নোংরা রাস্তা। খুব কমই ব্যবহার করা হয়। বাড়িগুলোর পেছন দিক সম্পূর্ণ ভিন্নরকম দেখাচ্ছে। এটাই স্বাভাবিক, ভাবল ও, পেছন দিকটা নিয়ে কেউ ভাবে না, দেখেও না।

রোজ আন্টির সাথে দেখা হবে! মৃদু স্বরে নীরবতা ভাঙল মার্ক, উফুল্ল দেখাচ্ছে ওকে।

পৌঁছে গেছে ওরা। আসন থেকে নেমে পড়ল জেমস, খেয়াল করল এ জায়গাটা পরিচ্ছন্ন। বোঝা যাচ্ছে নিয়মিত পরিষ্কার করা হয়। ক্যাফেটা একজন মহিলা চালায় বলেই বোধহয় সম্ভব হয়েছে এটা। মার্ককে নামিয়ে দিয়ে তাকাতে দরজায় দেখতে পেল মিসেস বার্থেজকে। নড করল জেমস।

আরে, মার্ক যে! উৎফুল্ল শোনল মহিলার গলা। মার্ক কাছে যেতে ওকে জড়িয়ে ধরে চুমো খেল। চলো, ভেতরে গিয়ে বসবে। ঘুরে এগোতে গিয়েও থেমে ফিরল জেমসের দিকে। ওদের কাজ নিয়েছ তুমি?

মাথা ঝাঁকাল ও।

মার্ককে নিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল মিসেস বার্থেজ।

ছোট একটা শেডে কাঠ রাখার ব্যবস্থা। ওয়াগন থেকে কাঠ নামিয়ে তাতে সারি করে রাখতে শুরু করল জেমস। মিনিট দশেকের মধ্যে শেষ হলো কাজটা। ওয়াগনের কাছে সরে এল ও। তামাক আর কাগজ বের করে সিগারেট রোল করল। ছেলেটার অপেক্ষায় আছে, মার্ক ফিরে এলেই যেতে পারে।

সিগারেট শেষ হয়েছে, এসময় ফের দরজায় দেখা গেল মারিয়া বার্থেজকে। শেডের দিকে চোখ পড়তে বিস্মিত হলো। আরে, তুমি দেখছি কাঠগুলো তুলে রেখেছ! নিকের সাথে এরকম কথা তো হয়নি। ও শেডের কাছে ফেলে চলে যায়, পরে আমরাই উঠিয়ে রাখি। তোমাকে বলেনি সে?

এটা পুরুষদের কাজ, ম্যাম, ক্ষীণ হাসল জেমস। তাছাড়া নিকও কিছু বলেনি। অবশ্য অন্য জায়গায়ও কাঠ তুলে দিয়েছি আমি।

ওরা তোমাকে মুফতে খাঁটিয়ে নিয়েছে।

মার্ক কোথায়? দেরি করলে ওর মা বোধহয় রাগ করবে।

ও তো রোজের কাছে, কি যেন ভাবল মহিলা। ভেতরে এসো, কফি খাবে।

অনড় দাঁড়িয়ে থাকল জেমস।

সঙ্কোচ করছ কেন? নিক এলেও তো কফি খেয়ে যায়। আর তুমি তো আমাদের কাজ কমিয়ে দিয়েছ। শোনো, আর এমন করবে না।

আধ-খাওয়া সিগারেট বুটের তলায় পিষে এগোল জেমস, খানিকটা আড়ষ্ট ও দ্বিধান্বিত। এ ধরনের সৌজন্য ওর মোটেই পছন্দ নয়। মহিলাকে শুধু শুধু ব্ৰিত করার মানে হয় না। মুফতে কফি খাওয়ার মত কিছুই করেনি সে, এবং মহিলা এখানে ব্যবসা করতে বসেছে।

প্রথম কামরাটা রান্নাঘর। জেমস দেখল উনুনে কফির আয়োজন করেছে মহিলা। একপাশে সরে দাঁড়াল ও। উল্টোদিকের দরজায় ক্যাফের ভেতরটা দেখা যাচ্ছে। দুজন খদের একটা টেবিলে বসে আছে।

ভেতরে গিয়ে বসো, মিস্টার…ওহ, তোমার নামই তো জানা হয়নি। আমি মারিয়া বার্থেজ। হাত বাড়িয়ে দিল মহিলা।

হাতটা ধরে ছেড়ে দেয়ার সময় নাম জানাল ও।

শুধু ওটাই?

জেমস অ্যালেন। চেষ্টা সত্ত্বেও নিজের অস্বস্তি ঢাকতে পারল না জেমস।

ভেতরে গিয়ে বসো, মি, অ্যালেন, ফের অনুরোধ করল মহিলা।

আমি বরং এখানেই দাড়াই। মার্ক এলেই তো চলে যাব।

ঝট করে ঘুরে তাকাল মারিয়া বার্থেজ, চোখে রাগ। তুমি কেমন ভদ্রলোক, অ্যালেন? ঠিক বুঝতে পারছি না। তোমাকে দুবার অনুরোধ করেছি, অথচ তা কানেই তুলছ না!

অপ্রস্তুত বোধ করল জেমস, আনমনে মাথা ঝাঁকাল। এগোতে গিয়ে দেখল মার্কের হাত ধরে দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে একটা মেয়ে। উনিশ কি বিশ হবে বয়েস, মিসেস বার্থেজের মতই দেখতে। সাদা পোশাকের পটভূমিতে ভরাট শরীর ফুটে উঠেছে। নিজের ওপর মেয়েটার অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি টের পেয়ে চোখ সরিয়ে নিল ও। দাঁড়িয়ে থাকল।

ঘুরে মেয়েটাকে দেখতে পেল মিসেস বার্থেজ। আমার মেয়ে, রোজালিনা।

নড করল জেমস। দ্বিতীয়বারের মত নিজের পরিচয় জানাল। সত্যিই একটা গোলাপ, ভাবল ও-সুন্দর, সতেজ এবং নিটোল!

মার্কের কাছে তোমার কথা শুনেছি, মিষ্টি গলায় বলল মেয়েটা।

অবাক হলেও কিছু বলল না জেমস, বরং মিসেস বার্থেজের মনোযোগ আকর্ষণ করল। আরেকদিন কফি খাব, ম্যাম, মহিলা উনুনের সামনে থেকে ফিরে তাকাতে বলল। নিক আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছে। চলো, মার্ক।

বাধ্য ছেলের মত এগিয়ে এল মার্ক, ওর হাত ধরল।

বোঝা যাচ্ছে সেদিনের ব্যাপারটা অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছে তোমাকে, গম্ভীর দেখাল মহিলাকে। হয়তো সেটা কাটাতে পারছ না।

বেরিয়ে এসে মার্ককে ওয়াগনে তুলে দিল জেমস। নিজে উঠে বসে লাগাম তুলে নিল। পাশ ফিরে তাকিয়ে দেখতে পেল মা-মেয়ে দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে। মার্ক হাত নাড়ল ওদের উদ্দেশে, লাগাম ঢিল দেয়ার সময় মৃদু নড করল জেমস। এগোল ওয়াগনটা।

পকেট থেকে চকোলেট বের করে মুখে পুরল মার্ক, দারুণ সুখী দেখাচ্ছে ওকে। রোজ আন্টি দিয়েছে, এখানে এলে কিছু একটা দেবেই আমাকে, বলল ছেলেটা। মা তো আসতেই দেয় না। আজ তোমার সাথে এসেছি, এ জন্যে বোধহয় না করেনি।

আকর্ষণটা তাহলে এখানে, ভাবল জেমস।

তুমি ওকে চিনতে না? বিস্মিত কণ্ঠে একটু পর জানতে চাইল মার্ক। সবাই তো চেনে। মি. ক্রুশারের সাথে বিয়ে হবে।

নীরবে মাথা নাড়ল জেমস, ওয়াগন চালানোয় মনোযোগ।

মা-কে কিন্তু বলতে পারবে না যে চকোলেট নিয়েছি আমি।

তোমার মা ঠিকই বুঝে ফেলবে, বাছা।

বুঝুক। তুমি না বললেই হলো।

মিথ্যে বলব?

ন-না। তুমি বলবে দেখোনি।

কিন্তু তোমাকে চকোলেট খেতে দেখতে পাচ্ছি।

বিমূঢ় দেখাল মার্ককে, ছোট্ট মাথায় সমাধান ভেবে পাচ্ছে না। একটু পর খুশি হয়ে উঠল ও। বলবে তুমি কিনে দিয়েছ।

সেটাও তো মিথ্যে হবে।

চকোলেট খাওয়া বন্ধ হয়ে গেল, বোকা দৃষ্টিতে ওকে দেখছে মার্ক।

জেনারেল স্টোরের পাশ দিয়ে যাচ্ছে ওরা। ওয়াগন থামিয়ে নেমে পড়ল জেমস। ভেতরে ঢুকে চকোলেটের খোঁজ করল। ফিরে এল কাগজে মোড়া দুই টুকরো চকোলেট নিয়ে।

মার্কের ছোট্ট মাথা কাজ করছে না, বিহ্বল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, হাত বাড়াল না লোভনীয় চকোলেটের দিকে। মা সত্যি আজ বকা দেবে আমাকে, সন্ত্রস্ত স্বরে বলল শেষে।

এবার আর মিথ্যে বলতে হবে না।

তোমার সাথে বের হওয়া বন্ধ করে দেবে। চকোলেট নিল মার্ক।

এত চিন্তা কোরো না, বাছা। তোমার মা-কে বুঝিয়ে বলব আমি।

এবার কিছুটা সন্তুষ্ট দেখাল ছেলেটাকে। চকোলেটের সদ্ব্যবহার শুরু করল পুরোদমে।

রাতে সাপারের টেবিলে এ নিয়ে কথা উঠল। মার্ককে ভেতরের কামরায় পাঠিয়ে দিয়েছে মিসেস প্রাইস।

কিছু মনে কোরো না, নিক, হালকা সুরে বলল জেমস। সমস্যাটা বোধহয় আমি ধরতে পারিনি।

মেয়েটা ওকে পছন্দ করে, উত্তর এল লরা প্রাইসের কাছ থেকে। ক্যাফে চালিয়ে কোনরকমে চলে যায় ওদের, তবু রোজ স্কুলের চাকুরিটা না নিলে বোধহয় সত্যি বিপদে পড়ত। মার্ক ক্যাফেতে গেলে কিছু একটা দেবেই। যে জিনিস বেচে কিছু টাকা পেত ওটাই দিতে হচ্ছে, এটা উটকো ঝামেলা নয়? ওরা হয়তো তা মনে করছে না। তাছাড়া ব্যাপারটা আমাদের পছন্দও নয়। এটা আত্মসম্মানের ব্যাপার। থেমে জেমসের দিকে ফিরল মহিলা। আজও দিয়েছে, তাই না? এ ব্যাপারে ভুল হয় না রোজের।

আমি কিনে দিয়েছি।

তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ওকে নিরীখ করল লরা প্রাইস, সন্দেহ ফুটে উঠল দৃষ্টিতে। সহাস্যে তাকিয়ে থাকল জেমস, কিন্তু মহিলাকে প্রভাবিত করতে পারল না। নিজের ধারণায় প্রবল বিশ্বাস যে তার আছে পরের কথাগুলোয় তা বোঝা গেল। বিশ্বাস করি না, রোজ অবশ্যই একটা কিছু দিয়েছে মার্ককে! তপ্ত স্বরে বললেও এবার কোমল হয়ে এল তার দৃষ্টি, প্রত্যাশা ফুটে উঠল চাহনিতে, প্রায় অনুনয়ের সুরে বলল: জেমস, দয়া করে এ কাজটা আর কখনও কোরো না। শেষে অভ্যাসে দাঁড়িয়ে যাবে। ওকে বুঝতে হবে আরেকজন কিছু দিতে চাইলেও সেটা নিতে নেই যদি না ওর পাওনা হয়। শেখার সময় ওর এখন, আমি চাই আমার ছেলে কখনও নিজের আত্মসম্মানবোধ হারাবে না।

ও তো বাচ্চা ছেলে, বলল প্রাইস। এসব বোঝার বয়স ওর হয়েছে নাকি?

আমার সাফ কথা, ওকে কখনও সাথে নেবে না তুমি! স্বামীর উদ্দেশে চড়া গলায় বলল মহিলা,অধৈর্য দেখাল তাকে। মি. অ্যালেন, তুমিও। এঁটো বাসনকোসন নিয়ে বেসিনের দিকে চলে গেল লরা প্রাইস, সেদিকে তাকিয়ে ত্যাগ করে সিগারেট ধরাল কাঠ ব্যবসায়ী। ব্ৰিত দেখাল তাকে, কিন্তু চোখ দেখে বোঝা গেল স্ত্রীর সাথে তর্কে যেতে নারাজ।

মহিলা অযৌক্তিক কিছু বলেনি, তার চিন্তাধারা পরিষ্কার, ভাবল জেমস। বেরিয়ে এল ও। বোঝা যাচ্ছে রোজালিনা বার্থেজের সাথে মার্কের সম্পর্ক ছাত্রশিক্ষিকার চেয়ে একটু বেশিই। হয়তো মেয়েটা আরেকজন লরা প্রাইস, আন্তরিকতার অভাব নেই। মার্ক অবশ্য যে কাউকে আকর্ষণ করবে।

বিছানায় শুয়ে সিগারেট ধরিয়ে রিক স্যাভেজকে নিয়ে ভাবল ও। মার্শাল হিসেবে লোকটা একগুঁয়ে, কঠিন মানুষ। যতটা না তার ব্যক্তিত্বপূর্ণ দৃঢ়তা তারচেয়ে বিশাল বপু আর বেপরোয়া স্বভাবের কারণে ওকে ভয় করে লোকজন, এ কদিনে এটুকু পরিষ্কার বুঝেছে জেমস। লোকটা শক্তপাল্লা, তারওপর এখানে আইনের প্রতিনিধিত্ব করছে। তাকে টলানো কষ্টকর হবে। তবে এ নিয়ে খুব একটা ভাবছে না জেমস। তিনটে বছর ধৈর্য ধরেছে, আরও কয়েকদিনে এমন কিছু যাবে-আসবে না। তাড়াহুড়ো করা ওর ধাতে নেই। সময় হলে ঠিকই তাকে চেপে ধরবে। তবে তার আগে অন্য দুজনকে খুঁজে বের করা দরকার।

জেমস অ্যালেন ধীরে চলার পক্ষপাতি, জানে অন্যদেরও খুঁজে পাবে। ওদের সম্পর্কে কাউকে কোন প্রশ্ন করেনি। ও খোজ নিলে কানে চলে যাবে তাদের, সতর্ক হয়ে যাবে। ওদের অলক্ষ্যে কাছাকাছি পৌঁছতে চায় জেমস যাতে হাতছাড়া না হয়ে যায় কেউ। একসাথে তিনজনকে শিকার করা কষ্টকর কাজ। কৌশলে একে একে ওদের মোকাবিলা করতে হবে।

লেসলি উইলিয়ামসের কথা মনে পড়ল ওর, অদ্ভুত লোক। একবার দেখা করা দরকার, লোকটা হয়তো কিছু তথ্য দিতে পারবে। রিক স্যাভেজকে ঘৃণা করে সে, সেই সূত্র ধরে লোকটার কাছ থেকে তথ্য বের করতে হবে। হয়তো স্যাভেজ ছাড়াও অন্যদের খোজও জানবে জুয়াড়ী…এ ধরনের লোক খুব সতর্ক হয়, হয়তো মুখই খুলবে না। কিন্তু জেমসের মনে হচ্ছে লেসলি উইলিয়ামসকে পটাতে অসুবিধা হবে না। অন্তত চেষ্টা করতে তো দোষ নেই।

পরদিন সন্ধের পরপরই সেলুনে গিয়ে ঢুকল জেমস। শনিবার বলে সরগরম হয়ে উঠেছে, পাঞ্চারদের সংখ্যাই বেশি। দেদার হুইস্কি আর সিগারেটের সদ্ব্যবহার করছে। জুয়াড়ীকে তার টেবিলে পাওয়া গেল, দুজনের সাথে খেলছে। এদের একজন হেনরী ক্রুশার। খেলায় মগ্ন সে, কোনদিকে তাকানোর ফুরসৎ নেই।

অন্য লোকটিকে দেখল জেমস-লম্বা, সুঠামদেহী। মোটামুটি সুদর্শন বলা চলে। বেশ পরিবর্তন হয়েছে চেহারায়, অন্তত ও যেভাবে জানে ঠিক সে-আদলে নেই আর। ছোট করে ছাঁটা পরিপাটি চুল, ক্ষৌরি করা মুখ। দামী জামাকাপড় তাকে অনেকটাই বদলে দিয়েছে। ভাল করে না দেখলে বিশ্বাসই হবে না। কিন্তু ক্যাল ইনগ্রসের দুর্ভাগ্য তার মুখটা জেমসের কাছে দারুণ আকাক্ষিত-এই মুখটা খুঁজে বের করার জন্যেই তিনটা বছর ঘুরে বেড়িয়েছে নানান জায়গায়।

ড্রিঙ্ক নিয়ে টুলে বসে ধীরে চুমুক দিল ও। ভুলেও তাকাচ্ছে না ওদের দিকে। নিশ্চিত হয়ে গেছে। তৃতীয়টাকেও নিশ্চয়ই আশপাশে পাওয়া যাবে।

লেসলি, তুমি নাকি কোন এক লোকের কাছে হেরে গেছ সেদিন? লোকটা চুরি করছিল? ভরাট গলায় বলল নতুন লোকটা। বেশ জোরের ওপর, জেমসের মনে হলো ওকে শুনিয়েই বলছে।

না, মি. লপার। ও সত্যি ভাল খেলে, উত্তরে বলল জুয়াড়ী।

আমরা তো খেলার লোকই পাচ্ছি না। আফসোস, আমার সাথে খেলতে চায়। কেউ।

ওরা হয়তো নিজেদের হীন অবস্থার কথা আগে ভাবে, তাছাড়া অযথা তোমার পকেট ভারী করা বোকামি মনে করে, হালকা সুরে মন্তব্য করল ক্রুশার। তাই বলে ভেবো না তোমার কাছ থেকে খসানোর খায়েশ ওদের একেবারেই নেই।

তোমার যেমন হয়?

দেখো, কেভ, হতাশ শোনাল ব্যাংকারের কণ্ঠ আমি কেবল আনন্দের জন্যে খেলি। তোমার সাথে খেলে আনন্দ আছে।

এটা নিশ্চয়ই বোঝাতে চাচ্ছ না যে হেরেও আনন্দ পাও তুমি?

কেভিন বা কেভলিন লপার…ক্যাল ইনগ্রস তাহলে এ নাম গায়ে চাপিয়েছে। অহঙ্কারী, আত্মবিশ্বাসী ও বিপজ্জনক—প্রথম দেখায় এটুকু উপসংহারে পৌঁছল জেমস।

আজ বোধহয় কাউকে পাব না, বলল জুয়াড়ী। তোমার কপাল মন্দ, মি. লপার।

ওকে ডাকছ না কেন? সহাস্যে বলল লপার।

কাকে?

তোমার পেছনেই আছে। দেখে সেদিনের বদলা নিতে পারো কি-না।

ঘুরে তাকিয়ে ভাবলেশহীন দৃষ্টিতে জেমসকে দেখল, লেসলি উইলিয়ামস, তারপর ক্ষীণ হাসল। ইচ্ছে হলে আসতে পারো। অনেকক্ষণ ধরে একটা চেয়ার খালি পড়ে আছে।

ও কি খেলবে, ওর পকেটে তো টাকাই নেই! তাচ্ছিল্যের সাথে বলল হেনরী ক্রুশার। মিসেস বার্থেজের ক্যাফেতে সবচেয়ে সস্তা খাবারের ফরমাশ দিচ্ছিল সেদিন, ওর জন্যে সেটা এমন চড়া দামের হয়েছে যে ওদিকের পথ মাড়ায়নি আর। তারপর গতকাল কি ঘটেছিল, নবে? সাপ্লাই দিতে ক্যাফেতে গিয়েছিল ও, মিসেস বার্থেজ ওকে কফির আমন্ত্রণ জানিয়েছিল দুবার। ও ঢোকেনি। শেষে মহিলা বিরক্ত হয়ে ওকে আচ্ছামত বকাঝকা করেছে। তারপরও ভয় কাটেনি ওর। আমার সন্দেহ হচ্ছে ও হয়তো ভেবেছে কফি খাওয়ার পর মহিলা আবার টাকা দাবি করে বসে নাকি? সস্তা রসিকতায় নিজেই হেসে উঠল ব্যাংকার!

তুমি কিন্তু এভাবে বলতে পারো না, হেনরী, সহাস্যে অনুযোগ করল লপার। সবার তো আর তোমার মত একটা ব্যাংক নেই।

এই হারামজাদা ভবঘুরেগুলোকে দেখলে আমার মাথা গরম হয়ে যায়!

ওদের আগ্রহ বোধহয় অন্য কোথাও, ইন্ধন যোগাচ্ছে লপার। বোধ করি কফি খাওয়ার উসিলায় সুন্দর একটা মুখ দেখতে যায়। বেরিয়ে আসার পর কেউ বলে না যে ওদের কফিটা খারাপ। তোমার বাপু কপাল মন্দ, তুমি তো আর মেয়েটাকে বিয়ে করোনি।

দেরিও নেই আর, ব্যাংকারের আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠ।

ওদেরকে বঞ্চিত করার জন্যে তাহলে তোমাকে অভিশাপ দেবে শহরের তাবৎ লোক।

তাতে আমার কি?

মাথা ঝাঁকাল লপার।

বিল মিটিয়ে উঠে দাঁড়াল জেমস, টেবিলের সামনে চলে এল। টের পেল সাবধানী দৃষ্টিতে ওকে দেখছে লপার, জুয়াড়ী ভাবলেশহীন। আর ক্রুশারকে গম্ভীর দেখাচ্ছে, প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে যে ওকে পছন্দ করেনি আক্রোশ ভরা চাহনিতে সেটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। চেয়ার টেনে বসে বারকিপারের দিকে তাকাল ও এক প্যাকেট নতুন তাস দাও, বব।

তুমি ভাবছ আমরা তাসে কিছু করেছি? মুখিয়ে উঠল ব্যাংকার।

আমি কি ভাবছি তাতে কিছু আসে-যায় তোমার, মি. শার? নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলল জেমস।, খেলায় ভারসাম্য থাকার জন্যে নতুন তাস। এতে যদি রাজি না থাকো তো উঠে চলে যেতে পারো।

প্রথমে বিস্মিত হয়ে ওকে দেখল সে, তারপর রাগে ফেটে পড়ল। গায়ের জোরে চাপড় মেরে বসল টেবিলে। তুমি কে, অ্যালেন? একটা ভবঘুরে ছাড়া তো কিছু নও, অথচ এমন ভাব করছ যেন আমাদের কিনতে এসেছ?

তাই মনে হচ্ছে তোমার? বিদ্রুপের ভঙ্গিতে হাসল জেমস। শান্ত হয়ে বসো, মি. ক্রুশার। এখানে কোন মহিলা নেই, বুঝতেই পারছ আজ আর তোমাকে ছেড়ে কথা বলব না। তুমি যে-ই হও কেয়ার করি না আমি।

ঝট করে উঠে দাঁড়াল ব্যাংকার, পেছনে হেলে পড়ল চেয়ারটা। ফর্সা মুখ। থমথমে দেখাচ্ছে। নর্দমার কীট! কি পেয়েছ তুমি? তোমার মত লোককে শহর ছাড়া করতে এক ঘণ্টাও লাগবে না! চেচিয়ে বলল সে, সেলুনের সব লোক তাকিয়ে আছে।

বারকিপার তাস দিয়ে যেতে শাফল করতে শুরু করেছে লপার। নির্লিপ্ত দেখাচ্ছে তাকে, চোখ দেখে মনে হচ্ছে দুজনের বাধাবাধি উপভোগ করছে।

ওদিকে আগ্রহভরে ওদেরকে দেখছে জুয়াড়ী।

সিগারেট রোল করে ধরাল জেমস। মি. লপার, দয়া করে ওকে চুপ করতে বলবে? আমার ধৈর্য একেবারেই কম। এখানে আসার প্রথম দিন থেকেই আমার পিছু লেগেছে তোমাদের ব্যাংকার, অথচ সেদিনই ওকে প্রথম দেখলাম। অনর্থক ঝগড়া না করলে হয়তো আমরা বন্ধুও হতে পারতাম।

বন্ধু! তোমার মত হতচ্ছাড়া? রাগে ফেঁসফেঁস করছে ক্রুশার। এগিয়ে এসে হঠাৎ লাথি মারল জেমসের চেয়ারে, নড়েচড়ে উঠল সেটা। কিন্তু জেমসকে বিকারহীন দেখে পিত্তি জ্বলতে থাকল তার, আরেক পা এগিয়ে হাত চালাল এবার।

উঠে দাঁড়ানোর সময় ঘুসিটা কাঁধে নিল জেমস, অটল তার মজবুত শরীর। বাম হাত বাড়িয়ে চেপে ধরল ব্যাংকারের শার্টের কলার। তুমি খুব যন্ত্রণা করছ, মি, ক্রুশার! আমি তোমার ব্যাংক থেকে টাকা চুরি করিনি কিংবা তোমার পা-ও মাড়িয়ে দেইনি। অযথাই খেপছ কেন? এবার ডান হাত চালাল ও, ক্রুশারের চিবুকে লাগল ঘুসিটা। ধরে না রাখলে উড়ে যেত শরীরটা, কিন্তু এত কমে ছাড়তে রাজি নয় জেমস। অরক্ষিত নাকে চালাল পরের ঘুসি। নরম মাংসের সাথে সংঘর্ষের আওয়াজ আর ব্যাংকারের চিৎকার প্রশান্তি এনে দিল ওর শরীরে। পাঁচ হাত দূরে শক্ত মেঝেতে চিৎ হয়ে পড়ল সে, অবিশ্বাস আর আতঙ্কে চোখজোড়া বিস্ফারিত। দরদর করে রক্ত ঝরছে নাক থেকে, তা দেখে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাল লোকটা। হাত বাড়াল কোমরে, পিস্তল বের করার আগেই তার কাছে পৌঁছে গেল জেমস। ক্রুশারের পিস্তল-ধরা হাতে পায়ের ভর চাপিয়ে দিল। চেঁচিয়ে উঠে অস্ত্র ছেড়ে দিল ব্যাংকার।

ঝুঁকে হেনরী ক্রুশারের শার্ট খামচে ধরে তাকে তুলল জেমস। টেনে নিয়ে চলল দেহটা। ঘিরে থাকা লোকজন সরে গিয়ে জায়গা করে দিল। পোর্চে চলে এল ও, কলার খামচে ধরে দাঁড় করাল ব্যাংকারকে। তারপর সর্বশক্তি দিয়ে ঘুসিটা হাঁকাল। উড়ে গিয়ে ধূলিময় রাস্তায় পড়ল সে, নিথর পড়ে থাকল।

ভেতরে ঢুকল জেমস, বিস্ময় আর সমীহের চোখে ওকে দেখছে অনেকগুলো কৌতূহলী মুখ। বারের কাছে এসে দাঁড়াল ও, ঠোঁট থেকে সিগারেট নামিয়ে ছাই ঝাড়ল।

চাপা হাসি লপারের মুখে! হেনরীর জন্যে দুঃখ হচ্ছে। কঠিন লোকের হাতে পড়ে গেছে ও এবার।

বলার আগেই গ্লাস এগিয়ে দিয়েছে বারকিপার। ওটা টেনে নিয়ে চুমুক দিল জেমস। জানে কিছুক্ষণের মধ্যে হাজির হয়ে পড়বে দানবটা।

রিক স্যাভেজের সাথে খানিক বাতচিৎ হলে মন্দ হয় না, ভাবল ও।
তিন রিক স্যাভেজের আগমনে নিঃশব্দ কবরে পরিণত হলো সেলুনটা। ভারী পায়ের শব্দ সে সেলুনে ঢোকার আগেই শোনা গেল। ধীরে এগিয়ে এল শব্দটা, দরজা পেরিয়ে এসে থামল। পুরো সেলুনে চোখ বুলিয়ে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করল মার্শাল।

পেছনে তার ডেপুটি।

ডেপুটির মুখটা একনজর দেখল জেমস। শীর্ণদেহীই বলা উচিত লোকটাকে—লিকলিকে হাত, হাড়সব মুখ; কণ্ঠার হাড়গুলো ভাসমান। গর্তে ভরা চোখগুলো সতর্ক করে দিল ওকে-শীতল, নেশাগ্রস্তের মত অস্থির। এ লোক ঠাণ্ডা মাথার খুনী, র‍্যাটলের চেয়েও বিষাক্ত। শিথিল হাতজোড়া হোলস্টার ছুঁইছুঁই। করছে। পালিশ করা পিস্তলের বাঁট আর স্থির লম্বা আঙুল দেখে জেমস নিশ্চিত হলো চোখের নিমেষে পিস্তল তুলে নিতে পারবে, প্রতিপক্ষ পিস্তল বের করার আগেই তাকে অনায়াসে বেঁধাতে পারবে।

দারুণ একটা জোড়া—সব অর্থেই। রিক স্যাভেজের শারীরিক সামর্থ্য আর অ্যাশলে গাইলসের পিস্তলের ক্ষিপ্রতা যে কারও জন্যে ভয়ঙ্কর। হিংস্রতায় কে যে কাকে ছাড়িয়ে যাবে তা আগাম বলা যাবে না। তবে পথটা আলাদা দুজনেররিক স্যাভেজ ওর দশাসই শরীর ব্যবহার করতে পছন্দ করবে এটাই স্বাভাবিক, তবে পিস্তলেও চালু সে। আর দো-আঁশলার হাতদুটো বরং একতরফাভাবে জোড়া পিস্তল ব্যবহারেই অনেক বেশি সিদ্ধহস্ত। ট্র্যাকিংয়ে যে কোন ইন্ডিয়ানের মত দক্ষ। জেমসকে যদি বলা হয় এদের যে কোন একজনকে বেছে নিতে, তবে অ্যাশলে গাইলসকেই পছন্দ করবে ও, তার পিস্তলের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস ও ক্ষমতা দুই-ই আছে ওর। কিন্তু হাতাহাতি লড়াইয়ে রিক স্যাভেজের মোকাবিলা করার সাহস করবে না। বুকে চেপে ধরে একটা চাপ দিলে হাড়গোড় সব ভেঙে যাবে।

আবারও তুমি! খানিকটা বিস্মিত শোনাল মার্শালের কণ্ঠ, তার নীল চোখে বিদ্বেষ স্পষ্ট প্রকাশ পেল। তবে এবার আর নিস্তার নেই, বাছা। শহরের একজন সম্মানিত লোকের গায়ে হাত তুলেছ।

দোষটা ওরই, সংক্ষেপে বলল জেমস। সেলুনের লোকজন অবাক হয়ে দেখল বিন্দুমাত্র উদ্বেগ বা ভয় নেই ওর মধ্যে।

সেটা আমি বুঝব, হাসল মার্শাল, নিজেকে জাহির করতে জোরাল গলায় বলল পরের কথাগুলো। আমার নিজস্ব পদ্ধতিতে তদন্ত করব, যখন আমার সময় হবে। তোমাকে বলতে হবে না। এগিয়ে গিয়ে লপারের সামনে দাঁড়াল সে। মি, লপার, আশা করি সবকিছু দেখেছ তুমি। দয়া করে ল-অফিসে আসবে একবার? সাক্ষী হিসেবে একটা স্বীকারোক্তি দেবে।

মাথা নাড়ল লপার। তার কি কোন প্রয়োজন আছে, স্যাভেজ? এখানে অন্তত বিশজন লোক ঘটনাটা দেখেছে। হেনরীকে পিটিয়ে রাস্তায় ফেলেছে এই অ্যালেন।

ধন্যবাদ, হাসি দেখা গেল স্যাভেজের মুখে। ঘুরে জেমসের দিকে তাকাল। শুনলে তো? নাও, এবার আমার অফিসে চলো।

কোথাও যাচ্ছি না আমি।

চোখ ছোট করে তাকাল দানব। বোঝার চেষ্টা করল জেমসের বোকামির কারণ, তার নির্দেশ এর আগে, অমান্য করেনি কেউ। যারা করেছে পরে সেজন্যে আফসোস করেছে। বুঝেছি, তোমার গা চনমন করছে, জোর করে নিয়ে যেতে হবে, হাসল সে আবারও, নিজের ওপর প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস আর জেমসের প্রতি প্রচ্ছন্ন অবহেলা প্রকাশ পেল কণ্ঠে। দেখো বাপু, তুমি নতুন মানুষ, তাই হয়তো জানো না অভিযুক্ত কোন লোক বেতাল করলে কিভাবে অফিসে নিয়ে যাই আমি। খোদার কসম, তোমার সেটা ভাল লাগবে না! এখনকার গোয়ার্তুমির জন্যে শেষে দুঃখ করবে।

নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে তাকে দেখল জেমস। পকেট থেকে তামাক আর কাগজ বের করে সিগারেট রোল করছে। ধরো সেটাও হবে না, রিক স্যাভেজের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল। আমাকে নিয়ে যেতে পারবে না তুমি। দেয়াশলাইয়ের কাঠি বারের কিনারায় ঘষে আগুন জ্বালিয়ে সিগারেট ধরাল। পুরো কাজটা করল ও বাম হাতে। ডান হাতটা ভুলেও ব্যবহার করেনি, এমনকি শরীরের পাশ থেকেও সরায়নি। পিস্তলের কাছাকাছি রেখেছে সবসময়, প্রয়োজন হলেই যাতে ড্র করতে পারে। অনায়াসে একহাতে সিগারেট রোল করতে বা ধরাতে পারে ও, বহুদিনের অনুশীলনের ফল। বৈরী এ দেশে কখন বিপদ এসে উপস্থিত হয় আগে থেকে বলা সম্ভব নয়, আর সে-কারণেই অভ্যাসটা রপ্ত করেছে যাতে মুহূর্তের জন্যেও ওকে অপ্রস্তুত অবস্থায় না পেয়ে যায় শত্রুপক্ষ। একটা মুহূর্তে অনেক কিছু ঘটে যেতে পারে, ওকে অপ্রস্তুত অবস্থায় পেয়ে কিংবা কোন একটা ছুতোয় গুলি করে বসলে কিছুই করার থাকবে না। সবচেয়ে বড় কথা, জেমস চায় না এখানে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করুক স্যাভেজ। তার মর্জির ওপর নিজের ভাগ্যকে সঁপে দেয়ার কোনরকম ইচ্ছে নেই ওর। তার অন্যায্য দাবি মেনে নেয়াও ওর পক্ষে সম্ভব নয়।

অবাক হয়ে ওকে দেখছে মার্শাল। কিছুক্ষণ বাদে, শ্রাগ করে ঘুরে তাকাল বারকিপারের দিকে। ওকে একটা ড্রিঙ্ক দাও, বব। মাথাটা খুলুক। ও বুঝতে পারছে না কি খারাবি ডেকে আনতে যাচ্ছে। রিক স্যাভেজ কাউকে নিয়ে যেতে চেয়েছে আর সে যায়নি, এমন কিছু হয়নি আজতক।

আজকে হবে না। আমি যাব না, স্যাভেজ, শান্ত স্বরে ঘোষণা করল জেমস, দৃষ্টি ঘুরে বেড়াচ্ছে বিশেষ কয়েকজনের ওপর—স্যাভেজ, গাইলস, লপারের ওপর। জুয়াড়ী বা বারকিপার ববকেও বাদ দিচ্ছে না। আসলে ঘরের একটা লোককেও বিশ্বাস করে না ও। কারণ আমি কোন দোষ করিনি, খেই ধরল ও। হেনরী ক্রুশার আগ বাড়িয়ে উত্ত্যক্ত করছিল আমাকে। সে-ই প্রথম আক্রমণ করেছে। পিস্তলেও হাত দিয়েছে। আমি ড্র করিনি, নইলে তোমাদের গণ্যমান্য নাগরিকের লাশ পড়ে থাকত রাস্তায়। লোকজনকে জিজ্ঞেস করে দেখো। এবং এখুনি, আমার সামনে জিজ্ঞেস করবে।

রিক স্যাভেজ স্তম্ভিত। এত বড় দুঃসাহস তাকে টলিয়ে দিয়েছে। জেমসের দৃঢ়, গম্ভীর মুখের দিকে তাকাল, তারপর বাকা কণ্ঠে জানতে চাইল: ধরো, তোমার পক্ষে যায় এমন কিছু ওরা বলল না?

তাহলে বলব এমন একটা শহরে আমি এসেছি যেখানকার লোকেরা তোমার মতই, তাজা একটা সত্যকে হুইস্কির সাথে হজম করে ফেলতে পারে। তেমন কিছু হলে, যদিও আমার ধারণা এরা ঠিক কথাটাই বলবে, আমাকে জোর করে নিয়ে যেতে হবে, স্যাভেজ।

তোমার কপালে সত্যি খারাবি আছে!

নিচু করে বাঁধা হোলস্টারের আরও কাছাকাছি হলো গাইলসের হাত।

ডেপুটির শীতল অভিব্যক্তিহীন চোখে তাকাল জেমস। পিস্তলে হাত দিয়ো না, ডেপুটি। আমি কোন অন্যায় করিনি। তুমি যদি পিস্তলে হাত দাও, ধরে নেব ড্র করছ। সেটাই তো স্বাভাবিক, তাই না? মরলেও অন্তত তোমাকে সাথে নিয়ে যাব আমি।

বিমূঢ় দেখাচ্ছে মার্শালকে। ক্ষণিকের মধ্যে তা কাটিয়ে উঠল সে, লেসলি উইলিয়ামসের দিকে ফিরল। কিন্তু তাকে কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই পরামর্শ দিল জেমস। মি. লপারের কথা এখনও শেষ হয়নি, স্যাভেজ। সে নিশ্চই বলবে হেনরী ক্রুশারকে পেটানোর আগে এখানে কি ঘটেছিল। সন্তুষ্ট ও, পালের গোদাকেই কোণঠাসা করে ফেলেছে। মিথ্যে বলে ওকে ফাসাতে চাইলে এতগুলো লোক তা ভাল চোখে দেখবে না। সারা শহরের লোক জানবে। লপার তা চাইবে না। এখানে সে একজন সম্রান্ত নাগরিক, লিয়ন সিটির লোকেরা তাকে সেভাবেই জানে এবং এ পরিচিতি ধরে রাখতে চায় লপার। ব্যাংকার যেমন তার সম্মান হারিয়েছে, বেফাঁস কিছু বললে ক্রুশারের সাথে শামিল হতে হবে তাকে। জেমসের ধারণা ক্রুশারকে পছন্দ করে না লোকটা, সহাস্যে বলা কাটা কাটা কথাগুলোর তাৎপর্য সেটাই। অন্যকে বাঁচাতে গিয়ে নিজের গায়ে কাদা লাগতে দেবে না কেভিন লপার।

হেনরী একটু বেশিই খেয়ে ফেলেছিল আজ। নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ ছিল না। ওর, জানাল লপার। কি করতে কি করে বসেছে! আমার ধারণা পরে ঠিকই অ্যালেনের কাছে দুঃখ প্রকাশ করবে ও।

মন্দ হত না তাহলে! ফোড়ন কাটল জেমস। আমিও ঘুসিগুলোর জন্যে ওর কাছে নির্ঘাত মাফ চাইতাম।

হেসে উঠল কয়েকজন, কিন্তু মার্শাল মুখ খুলতে থেমে গেল।

খুব স্মার্ট লোক তুমি, কোন সন্দেহ নেই, অ্যালেন, কাটা কাটা স্বরে বলল স্যাভেজ। একবার কায়দামত পেলে তোমার ত্যাড়ামির শখ মিটিয়ে দেব!

আমি কখনও শুনিনি কোন মার্শাল এভাবে হুমকি দেয় কাউকে, সহাস্যে বলল জেমস। গল্পটা অন্যদের বলা যাবে। আধ-খাওয়া সিগারেট শক্ত মেঝেতে ফেলে বুটের তলায় পিষল ও, কিন্তু চোখ সরাল না স্যাভেজের ওপর থেকে।

রিক স্যাভেজকে দেখে বোঝা গেল অপমানিত বোধ করছে সে। জ্বলে উঠল নীল চোখ, এক পা এগোল জেমসের দিকে। কিন্তু পার থামাল তাকে। শরীরের তুলনায় তোমার মাথায় আসলেই ঘিলু কম, রিক। ওর সাথে সুবিধে করতে পারবে না। নিজের দায়িত্ব সেরে ফেলল। নইলে কাল থেকে তোমাকে দেখে আড়ালে হাসতে শুরু করবে লোকজন। সবাইকে বুঝিয়ে দেয়া দরকার কাউকে আলাদা চোখে দেখছ না তুমি।

ধন্যবাদ, মি. লপার। খানিকটা ব্ৰিত দেখাচ্ছে মার্শালকে, অনেকটাই সামলে নিয়েছে নিজেকে। আসলে মি. ক্রুশারের অবস্থা দেখে মেজাজ ঠিক রাখতে পারিনি। এখানকার সব লোকেরও নিশ্চয়ই আমার মত খারাপ লেগেছে। একটা ভবঘুরে এসে এ শহরের একজন মানী লোককে পিটিয়ে যাবে এটা মেনে নিতে আমাদের কষ্ট হওয়ারই কথা। তাছাড়া লোকটাও সুবিধের নয়, এখানে। আসার পর প্রথম দিনও ঝামেলা করেছে।

মি, লপারের কথা এখনও শেষ হয়নি, মনে করিয়ে দিল জেমস।

ওর দিকে তাকাল লপার, হাসল, যদিও তার হাসি চোখ স্পর্শ করছে না। বড় নাছোড়বান্দা লোক তুমি, অ্যালেন। আমার পার্টনারকে পেটালে আর এখন আমার মুখ থেকে বের করতে চাইছ কথাগুলো।

তাকিয়ে থাকল জেমস, অপেক্ষা করছে।

লোকজনও আরও কিছু শোনার অপেক্ষায় আছে। অবস্থাটা উপলব্ধি করতে পারছে লপার, কোণঠাসা হয়ে পড়েছে সে। সম্মানের প্রশ্ন হয়ে দাড়িয়েছে তার মুখের কথাগুলো। ওরা যা দেখেছে তার উল্টো কিছু বলা তো যাবেই না, বরং স্পষ্টভাবে স্বীকার করার সময় এখন উপস্থিত। হেনরীর জন্যে সত্যি দুঃখ হচ্ছে। ও কখনও এমন করেছে, কেউ বলতে পারবে না। আসলে অতিরিক্ত হুইস্কিই ওর জন্যে কাল হয়েছে। বাড়াবাড়ি না করলেও চলত। আমি নিশ্চিত, নিজেই অনুতপ্ত হবে ও।

আসল কথাটা বলছ না তুমি।

বাকি কি থাকল, বন্ধু?

ঠিক আছে, বোঝা গেছে, বলে উঠল স্যাভেজ, তাড়া প্রকাশ পেল কণ্ঠে। লেসলি, এবার তুমিই বলো।

মি, লপারের সাথে একমত আমি।

তুমি? বারকিপারের দিকে ফিরে প্রশ্ন করল মার্শাল।

আমিও। মাথা ঝাঁকাল বব।

তোমরা? ঘুরে লোকজনের উদ্দেশে জানতে চাইল স্যাভেজ।

চুপ করে থাকল লোকগুলো।

তাহলে দেখা যাচ্ছে এ ব্যাপারে কারও কোন দ্বিমত নেই, প্রসন্ন গলায় বলল মার্শাল, হাসল। ধন্যবাদ সবাইকে। চমৎকারভাবে ব্যাপারটার সুরাহা হলো।

কিসের ব্যাপারে তোমরা একমত, মার্শাল? জেমস হাল ছাড়ছে না।

কেন, মি. ক্রুশার ঠিক নিজের মধ্যে ছিল না। একটু বেশি পান করে ফেলায়…

সে আমাকে আগে আক্রমণ করেছিল কি-না সেটা জিজ্ঞেস করো। পিস্তল বের করেছিল কি-না তা স্পষ্টভাবে তোমার জানা উচিত।

আমাকে জ্ঞান দিতে এসো না, স্ট্রেঞ্জার! নিজের কাজ আমি ভালই বুঝি! তড়পে উঠল স্যাভেজ। পেয়েছ কি, অ্যাঁ? সুযোগ পেয়ে সবার ওপর ছড়ি ঘোরাবে? ভেবেছ তোমার কথায় সায় দেবে শহরের লোকজন? তোমার চেয়ে হেনরী শারই ওদের জন্যে কাছের লোক, বহু বছর ধরে ওদের সাথে সম্পর্ক তার। বিপদে পড়লে পাশে এসে দাঁড়ায় মি. ক্রুশার। তোমার কাছে কখনও যাবে এরা, না তুমি ওদের পাশে এসে দাঁড়াবে?

মি. লপার, গাধাটাকে চুপ করতে বলো। আর তুমি কি দয়া করে আসল কথাটা জানাবে ওকে?

ক্ষণিকের জন্যে জ্বলে উঠল কেভিন লপারের চোখ, চাপা আক্রোশ ফুটে উঠল দৃষ্টিতে। কিন্তু নিজেকে সামলে নিল সে। হাসল। অ্যালেন নির্দোষ, রিক। ওকে না ঘটানোই ভাল, যতক্ষণ না কোন অন্যায় করছে সে…আমার পক্ষ থেকে সবাইকে ড্রিঙ্ক দাও, বব। হাসি প্রসারিত হলো তার, ফিরল জেমসের দিকে।

আমাদের খেলাটার কি হবে, অ্যালেন?

পরে কোন এক সময়ে।

তোমার ইচ্ছে, শ্রাগ করল সে। বারকিপার ত্রস্ত পায়ে হুইস্কি পরিবেশন করতে গ্লাস তুলে চুমুক দিল। টেবিলে এসে বসো, অ্যালেন। আলাপ করা যাক। তোমার সম্পর্কে কৌতূহল হচ্ছে। বোঝা যাচ্ছে কঠিন লোক তুমি, আমরা এমন লোককেই শ্রদ্ধা করি। একটা বিরূপ ঘটনা দিয়ে শুরু হলেও বোধহয় তারপরও বন্ধু হতে পারব আমরা। আমার তো খুশিই লাগছে পোকারের ভাল একজন প্রতিদ্বন্দী পেয়ে।

হাততালি দিয়ে উঠল সেলুনভর্তি লোকজন, সিটি বাজাল কেউ কেউ। কেভিন। লপারের উদারতা মুগ্ধ করেছে তাদেরকে।

কাজ আছে, বেশিক্ষণ থাকতে পারব না, বসার সময় বলল জেমস। যে সময়টা খেলার কথা তা এমনিতে ব্যয় করে ফেলেছি। তাছাড়া এখন আর খেলার মূড নেই। দারুণ ধূর্ত লোক, ভাবছে ও, এবং কপট। জানে কখন কি করতে হবে। কৌশলে নিজের ভাবমূর্তি ঠিকই ধরে রাখতে পেরেছে।

খেলতে এলে কিন্তু তোমার কাজ ফেলে আসতে হবে। আমি নিশ্চিত খেলাটা আমরা দুজনেই উপভোগ করব।

হয়তো।

কোথাকার লোক তুমি?

বরং জিজ্ঞেস করো কোথায় যাইনি আমি। সারা দেশ চষে বেড়িয়েছি।

এখানেও কি সেরকম এসেছ? লিয়ন সিটিতে বাইরের লোকজন খুব কম। আসে।

বলতে পারো ভুল করে। টাকসন ছেড়ে অনেকদূর চলে এসেছিলাম, যখন টের পেলাম ফিরে যাওয়ার চেয়ে সামনে চলাই আমার কাছে ভাল মনে হলো।

সল্ট লেক পাড়ি দিতে নাকি?

এক মাইনারের কাছে এ শহরটার কথা শুনেছি। সিলভার টাউন থেকে কেটে পড়া শেষ লোক সে-ই।

বুড়ো এখানে এসেছিল? আগ্রহী মনে হলো লপারকে। এখানকার কথা শুনেছিল ও।

হতে পারে, আনমনে মাথা ঝকাল সে। ওটাই তো সবচেয়ে কাছের শহর ছিল।

তুমি কোত্থেকে এসেছ? জানতে চাইল জেমস।

অনেকটা তোমার মতই, বিন্দুমাত্র অপ্রতিভ হলো না লপার। ঘুরতে ঘুরতে চলে এসেছি। বাউন্টি হান্টারের কাজ করেছি কিছুদিন। কয়েকশো ডলার পকেটে ছিল। এখানে এসে ব্যবসা শুরু করলাম, ভাগ্য খুলে গেল। জানো তো আমি শহর কমিটিতে আছি? লিয়ন সিটিকে উন্নত করার চেষ্টা করছি আমরা, এ জন্যেই থাকছি এখানে নয়তো কবে কেটে পড়তাম! হেনরীর আগ্রহ অবশ্য অন্য জায়গায়, রোজালিনা বার্থেজকে দেখে সেই যে ঘোর লেগেছে ওর, তা আর কাটেনি। মেয়েটা ওকে পাত্তা না দিলেও লেগে আছে। সুদর্শন সে, টাকাও আছে, শেষপর্যন্ত ওর ভাগ্যে শিকে ছিড়তে পারে।

মেক্সিকান একটা মেয়েকে বিয়ে করবে ওর মত সম্মানিত লোক?

কেন নয়? জেমসের বিপ ধরতে পারল না লপার, চিন্তিত মনে হচ্ছে তাকে। মেয়েটা এমনই যে ওর জন্যে সবকিছু করা যায়। দুজনকে মানাবেও।

আরেকদফা ড্রিঙ্ক আসতে প্রত্যাখ্যান করল জেমস। বেশি খেলে তোমার বন্ধুর মত অবস্থা হতে পারে।

হেসে উঠল কেভিন লপার। জেমস সেটাকে আন্তরিক মনে করত যদি লোকটা সম্পর্কে আগে থেকে না জানত।

মনে হচ্ছে আমাদের শহরটা তোমারও ভাল লাগতে শুরু করেছে?

মন্দ লাগছে না।

এক কাজ করতে পারো, ঝুঁকে এসে নিচু কণ্ঠে বলল লপার। এমনিতে ঝামেলা হয় না খুব একটা। কিন্তু মাঝে মাঝে দুএকজন কঠিন লোক এসে পড়ে। ওরা যা ইচ্ছে শুরু করে দিতে কতক্ষণ? বিচ্ছিন্ন একটা শহর আউট-লদের জন্যে উপযুক্ত জায়গা। এখানে এসে যদি ওরা আস্তানা গাড়ে তো কিছুই করার থাকবে না আমাদের। স্যাভেজ একটা আস্ত গাধা, শরীর ছাড়া কিছু নেই ওর। পিস্তলের বিরুদ্ধে শরীরটা কেবল বুলেটের জায়গাই দিতে পারবে। আর নের কিছুটা চালাতে পারে বটে কিন্তু একা কি করতে পারবে ও? তুমি ওদের সাথে যোগ দিলে আইনের হাতটা শক্ত হবে। কাঠ কেটে আর কত পাও। প্রাইসের ব্যবসা এমনিতেই মন্দা। তাছাড়া, ডেপুটির কাজে পরিশ্রম কম, তুলনায় বেতন বেশি।

ঝুঁকিও বেশি, যোগ করল জেমস, সিগারেট ফুকছে। খেয়াল করল সেলুনের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হয়ে গেছে, একটু আগের উত্তেজনার ছিটেফোটাও নেই। স্যাভেজ আর নেবর কেটে পড়তে লোকজনও সহজ হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে বিস্মিত দৃষ্টিতে দেখছে ওদের। দুজনকে একসাথে খোশ-গল্প করতে দেখবে এটা অন্তত আশা করেনি কেউ।

তা আছে। কিন্তু কামাইয়ের তুলনায় সেটা কমই। তোমার মত আরও দুজন। লোক পেলে নিশ্চিন্ত হতে পারব আমরা।

তার কোন দরকার আসলে আছে কি?

আছে, বন্ধু। তোমাকে মানতেই হবে আর দশটা শহরের মত লিয়ন সিটি ঠিক সুরক্ষিত নয়। সীমান্তের একেবারে কাছাকাছি, চল্লিশ মাইল গেলেই মেক্সিকো; পাহাড়ের ওপাশে আউট-লদের হাইড-আউট। ভাগ্য যে ওরা কখনও এদিকে মুনোযাগ দেয়নি। কিন্তু কে বলতে পারে বাইরের সাহায্য কখনও দরকার হবে না? টাকসন যেতেই লাগে পাঁচ দিন। যদি কখনও বিপদের পড়ি আমরা, ওখানে পৌঁছানোর আগেই চুকে যাবে সব।

নিজেদের এত ফেলনা ভাবছ কেন? প্রয়োজন হলে ঠিকই হাতে অস্ত্র তুলে নেবে এখানকার লোকেরা। সাধারণ মানুষ এগিয়ে এসে বিপজ্জনক লোককে হটিয়ে দিয়েছে এমন অনেক শহরের গল্প জানি আমি।

ছিলে নাকি দুএকটায়?

আরে নাহ! একবার তো আরেকটু হলে বিপদেই পড়েছিলাম। জেরেমি করবেটের নাম শুনেছ তো? ইয়েলোস্টোনে গণ্ডগোল হওয়ার সময় ওর সাথে ছিলাম, মওকা খুঁজছিলাম বাড়তি কিছু লাভের আশায়। ঠিক এমন সময়ে লোকজন তেড়ে এল। বেগতিক দেখে কেটে পড়লাম।

করবেটকে রেখে?

তো কি ওদের জন্যে বসে থাকব, আর শেষে কি-না উন্মত্ত লোকজন আমাকে ঝুলিয়ে দিক? আমি কেন অন্যের পাপের ভাগীদার হব? নিজেরগুলোর ঠেলা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছি।

তুমি দেখছি একেবারে পোয়া তুলসি পাতা নও, পকেট থেকে একটা সিগার কেস বের করল সে। অবশ্য এটাই স্বাভাবিক। কঠিন সব লোক এরকমই হয়। কেসের ঢাকনা খুলে সিগার বের করে ইঙ্গিতে অফার করল ওকে, প্রত্যাখ্যান করল জেমস।

দুএকটা কুকর্ম যে একেবারেই করিনি, তা নয়। একবার তো টাকার টানাটানি থাকায় গরু সরানোর কাজ করেছিলাম। বেশ লাগছিল, কিন্তু শেষপর্যন্ত অল্পতে সন্তুষ্ট হতে হলো।

ধরা পড়েনি?

ধরা পড়লে কি আর তোমার সাথে খোশ-গল্প করছি? লপার সিগার কেসটা পকেটে ঢোকানোর সময় খেয়াল করল জেমস: ওপরে দুটো অক্ষর খোদাই করা, ধাতব কিছু দিয়ে খুঁচিয়ে করা হয়েছে-কে আর এল।

হাসল কেভিন লপার, বুকে চাপড় মারল জেমসের কাঁধে। তুমি সত্যি দারুণ লোক, অ্যালেন! যা দেখালে আজ, স্বীকার করছি আমাকেও কোণঠাসা করে ফেলেছিলে। বাধ্য হয়ে খানিকটা কৌশল খাটাতে হলো। নিজের পিঠ বাঁচাতে তুমি যেমন সিদ্ধহস্ত তেনি আমাকেও তো নিজের সম্মান টিকিয়ে রাখতে হবে। হেনরী তোমার ওপর এত খেপল কেন, বলো তো? মেয়েটাকে কিছু করেছ নাকি? শেষ কথাগুলো এত নিচু স্বরে বলল যে আর কেউ শুনতে পেল না।

এটা আমার কাছেও একটা ধাধা। খেতে গিয়ে ক্যাফেতে দেখেছি ওকে। ফিরে আসার সময় মিসেস বার্থেজকে পরামর্শ দিল বাজে লোকদের জায়গা না দিতে।

সত্যি তাই ঘটেছে?

দেখো, লপার, আমি মিথ্যে বলি না! বাস্তবে খানিক আগে বলা ইয়েলোস্টোন আর গরুচুরির ব্যাপারগুলো সবই জেমসের নগড়া। মিথ্যেটা প্রয়োজনে তালই বলতে পারে, অন্তত ওর ধারণা তাই।

মেয়েটা ওখানে ছিল? মাথা নাড়ল জেমস। শুধু মিসেস বার্থেজ।

ঘর কাঁপিয়ে হেসে উঠল লপার। হেনরীর মাথা আসলেই খারাপ হয়ে গেছে। কদিন আগে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল মেয়েটাকে, সাফ না করে দিয়েছে রোজ। এরপর থেকে খেপে গেছে ও, পণ করেছে রোজালিনাকে বিয়ে করবেই। ব্যবসার চেয়ে মেয়েটাই ওর কাছে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে এখন। সন্দেহ করে অন্য কারও প্রতি হয়তো আগ্রহ আছে রোজের। তাই সবাইকে ঘোলা চোখে দেখে। আমার কাছ থেকে কথা আদায় করে নিয়েছে কখনও ওই ক্যাফেতে যাব না আমি। বোঝো অবস্থাটা।

কিন্তু সুদর্শন সে, টাকাও আছে। ওকে যে কোন মেয়েই পছন্দ করবে।

সেটা তো মেয়েটা ভাল জানে। হয়তো হেনরীর নিজেকে জাহির করার স্বভাবটা ওর পছন্দ নয় কিংবা আঠার মত লেগে থাকার ব্যাপারটা। আসলে, আমার কি মনে হয় জানো, মেয়েটা শক্তের ভক্ত। ওর দরকার কঠিন একটা লোক। একবার ওকে হাতের মুঠোয় ভরো, দেখবে তোমার ইচ্ছেমত চলছে সবকিছু।

এত কিছু বুঝেছ তুমি?

দুএকটা মেয়ের সাথে আমিও তো মিশেছি, নাকি? হাসল লপার, ঘন ঘন টান দিল সিগারে। ডেপুটি হতে তোমার আপত্তি নেই তো? কাল সকালে একবার আমার স্টোরে এসো। বেতন আর অন্যান্য বিষয় নিয়ে আলাপ করা যাবে। উঠে দাঁড়াল সে।

তুমি কি চাও স্যাভেজ আমার হাড় গুঁড়ো করে দিক? ব্যাপারটা ও মোটেও পছন্দ করবে না।

করবে। ওকে কিভাবে টাইট দিতে হয় সে আমি জানি। ওর বেতনটা আমরা দেই, এটা ওকে মানতেই হবে। জেমস নড করতে সন্তুষ্ট হয়ে দরজার দিকে এগোল সে। বিলটা পাঠিয়ে দিয়ো, বব, বারকিপারের উদ্দেশে বলল, ভাল হয় যদি সকালে গিয়ে টাকাটা নিয়ে আসো।

জ্বী, মি. লপার, সসম্রমে বলল বারকিপ। বোঝা গেল আগেও এমন ঘটনা ঘটেছে।

অদ্ভুত একটা লোক, ভাবছে জেমস অ্যালেন—কপট, কৌশলী, ধূর্ত এবং সর্বোপরি ভয়ঙ্কর। খানিক আগের খোশ-গল্প মনে পড়তে হাসি পেল ওর। পরস্পরকে বোঝাতে দুজনেই আন্তরিক চেষ্টা করেছে, কিন্তু জেমস যেমন তার কথা এক বর্ণ বিশ্বাস করেনি, সে-ও করেনি ওর কথাগুলো। তৃতীয় কেউ শুনতে পেলে অবাকই হবে। পরস্পরকে বুঝে নেয়ার চেষ্টা কম করেনি কেউ। লপারের ধাত সম্পর্কে জানে জেমস, এমন বহু লোক দেখেছে ও এর আগে; ওর প্রয়োজন লপারের এখানকার অবস্থানটা খতিয়ে দেখা। শত্রু সম্পর্কে জানা থাকলে তাকে মোকাবিলা করা সহজ হয়। লপারের ব্যাপারটাও অনেকটা সেরকম-ওকে চেনে

ঠিকই, কিন্তু জেমস আপাতত তার জন্যে একটা হুমকি। যতদূর বোঝা যাচ্ছে এখানে একটা চক্র হিসেবে আছে ওরা-লপার, স্যাভেজ আর নেবর। হেনরী ক্রুশার বা লেসলি উইলিয়ামসও যদি জড়িত থাকে তো অবাক হওয়ার কিছু নেই।

লেসলি উইলিয়ামসের চরিত্র ধোয়াটে লাগছে ওর কাছে। লোকটাকে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। বড় মাইনিং টাউন বা ক্যাম্পে পোকার খেলে প্রচুর টাকা কামিয়েছে সে, অসংখ্য মাইনারকে সর্বস্বান্ত করেছে, বেশিরভাগই চুরি করে। কয়েকটা খুনও করেছে। কোনভাবেই তাকে ভাল মানুষ বলা যাবে না। লপারের দলে থাকাই ওর পক্ষে স্বাভাবিক এবং লাভজনক, অথচ অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে ওদের বিরুদ্ধে দাড়াতে চাইছে সে।

জুয়াড়ীর খোঁজে চারপাশে তাকাল জেমস, দেখা যাচ্ছে না তাকে। টেবিল থেকে সরে গিয়ে বারের কাছে দাঁড়িয়ে পান করছিল, কখন যেন সটকে পড়েছে। লোকটার সাথে আলাপ করতে পারলে অনেক কিছু পরিষ্কার হয়ে যাবে। সম্ভবত নিজের রূমে পাওয়া যাবে তাকে, ভাবল জেমস। চেয়ার ছেড়ে পিছিয়ে এল ও, নিঃশব্দে সরে গেল পেছনের দরজার দিকে। ফাঁক বুঝে সটকে পড়ল, করিডরের শেষ মাথায় সিঁড়ি দেখে এগোল। দোতলায় উঠে এসে নক করল দ্বিতীয় কামরার দরজায়।

ঢুকে পড়ো, খোলাই আছে, ভেতর থেকে ভেসে এল জুয়াড়ীর গলা।

ভেজানো দরজা ঠেলে ঢুকে পড়ল জেমস, পা দিয়ে পেছনে ঠেলে দিল দরজার পাল্লা। দ্রুত চোখ বুলাল ঘরটায়। ঘোট তবে গোছানো, বোঝা যায় পরিপাটি থাকতে পছন্দ করে লোকটা। উল্টোদিকে জানালার কাছে বাঙ্ক, পাশে বেড-সাইড টেবিল। দুটো ঘোড়ার দামী মডেল, ইন্ডিয়ান চীফের আবক্ষ মূর্তি, রঙবহুল এক প্যাকেট তাস-সব ঝলমল করছে। দরজার পাশে কাঠের টেবিল আর একজোড়া চেয়ার। বেশ কিছু বই দেখা গেল টেবিলে। লাগোয়া দেয়ালে এক মানুষ সমান উঁচু পালিশ করা আয়না, ঘরের অর্ধেকটারও বেশি ফুটিয়ে তুলেছে নিজের শরীরে। ঠিক মাঝখানে ছাত থেকে ঝুলছে সুদৃশ্য ঝাড়বাতি। জানালায় নকশাদার পর্দা। মনে মনে একটা ধাক্কা খেল জেমস, সাধারণ এক জুয়াড়ীর এরকম রুচি আশা করেনি। এমন একটা ঘর বরং হেনরী ক্রুশার বা কেভিন লপারকেই মানায়।

বিছানায় বসে ছিল লেসলি উইলিয়ামস, নরম গদিতে কোমর পর্যন্ত ডুবে গেছে। হাতে হুইস্কির বোতল, অর্ধেক ইতোমধ্যে শেষ করে ফেলেছে। লণ্ঠনের স্বল্প আলোতেও চোখগুলো উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। বোসো, চেয়ার দেখিয়ে উঠে জানালার কাছে গেল সে, পর্দা সরিয়ে দেয়ার সময় থেমে গেল হাত। ফিড স্ট্যাবলের সামনে দাড়িয়ে আছে স্যাভেজ, চাপা স্বরে বলল সে, উত্তেজিত। পর্দা টেনে দিল। হলফ করে বলতে পারি কুত্তাটা আমার ঘরের ওপর নজর রাখছে। কেভিন লপার তোমার ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠেছে, বন্ধু।

ওর ব্যাপারে আমারও আগ্রহের কমতি নেই।

পুরানো শত্রুতা? হেসে বোতলে চুমুক দিল জুয়াড়ী। তাই হবে, নইলে কি আর এতদূর ছুটে আসতে? না, তোমার গল্প মোটেও বিশ্বাস করিনি আমি। বোধহয় লপারও করেনি।

সিগারেট রোল করছে জেমস, চুপ করে থাকল।

দারুণ দেখালে! সিগারেট রোল করার দিকে ইঙ্গিত করল লেসলি উইলিয়ামস। তাক লাগিয়ে দিয়েছ সবাইকে। আমি নিজেও কাউকে এভাবে সিগারেট রোল করতে দেখিনি। মুহূর্তের জন্যেও বোধহয় অসতর্ক হও না, তাই না?

কিছুই বলল না জেমস।

লপারের সিগার কেসটা তোমাকে আকৃষ্ট করেছে, তাই না? প্রসঙ্গ বদলাল সে।

ওরকম একটা জিনিস আগেও দেখেছি আমি।

সবজান্তার ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকাল লেসলি, একটা বাক্যে বুঝে নেয়ার চেষ্টা করল পুরো ব্যাপারটা। তোমাকে বোধহয় চেনেনি সে।

আমিও ওকে প্রথম দেখলাম।

এবার অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল জুয়াড়ী। কিছুক্ষণ পর মাথা ঝাঁকাল। নাহ, তোমার কাজ-কর্ম কেমন যেন! ফুটো একটা পকেট নিয়ে ঢুকেছ লিয়ন সিটিতে, আমাকে টেক্কা দিয়ে জুয়ার টেবিলে কামিয়ে নিলে বেশ কিছু ডলার। এরপর আরও কয়েকটা চমক…হেনরী ক্রুশারকে আজ যেভাবে শায়েস্তা করলে আমারই দুঃখ লাগছিল, অথচ কেভিন লপার, চুটিয়ে উপভোগ করেছে। পরে বন্ধুর দোষ ঢাকতেও চেষ্টা করেছে। শেষে তোমরা এমন রসালাপ শুরু করলে যে আরেকটু হলে বিশ্বাস করে ফেলেছিলাম, লপার বোধহয় তোমাকে পটিয়েই ফেলল। ওর মধুবর্ষণে দুই বছর আগে যেমন আমি পটেছি। থেমে টেবিলে বোতল নামিয়ে রেখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল জেমসের দিকে। তুমি যেদিন এসেছ, সে-রাতে কি করবির আস্তাবলে একটা খুন হয়। ওটার তাৎপর্য বুঝতে পারছ?

উত্তর দিল না জেমস, তাকিয়ে আছে লেসলি উইলিয়ামসের দিকে।

তোমাকে সতর্ক করেছিলাম, বেশ গিলে ফেলেছে জুয়াড়ী, কথা বলতে স্বস্তি পাচ্ছে। কার কাছ থেকে সাবধান থাকতে হবে তা কিন্তু বলিনি। না, ধারণাও করতে পারবে না। রিক স্যাভেজ, আমাদের মার্শাল, কারও পকেটে বেশি টাকা থাকাটা ঠিক সইতে পারে না সে। সেলুনে ঝামেলা হওয়া মানেই ওর পোয়াবারো। নিজের অফিসে নিয়ে গিয়ে দোষী ব্যক্তিকে জরিমানা করে, প্রয়োজনে গায়ের জোরে আদায় করে। কেউ দিতে না চাইলে তার কপাল যে সত্যি মন্দ সেটা হাড়ে হাড়ে বুঝিয়ে দেয়। এ কাজটা খুব আনন্দের সাথে করে ও। আর জরিমানার টাকার বিরাট অংশ চলে যায় লপারের পকেটে।

একবার আমাদের সাথে খেলে প্রচুর টাকা জেতে এক লোক। দারুণ খেলত, ভাগ্যও সেদিন ওর পক্ষে ছিল। পরদিন হোটেলের রূমে লাশটা পাওয়া গিয়েছিল, টাকাগুলো উধাও! লপারকে টেক্কা দিয়ে কেউ পার পেয়ে যাবে সেটা কোনমতেই হতে দেবে না সে। আমি যখন ওর সাথে জিতি, সেটা পরে ওকে ফেরত দিতে হয়। জেতার আনন্দটুকুই কেবল আমার।

তোমার অবস্থানটা আমার কাছে পরিষ্কার হয়নি, নির্লিপ্ত স্বরে মনে করিয়ে দিল জেমস।

প্রসঙ্গ বদলে যাওয়ায় ভাবান্তর হলো না তার, মাথা ঝাঁকাল! যেন জানত প্রশ্নটা আসবে একসময়। বছর দুই আগে এখানে এসেছিলাম। বেশ কিছু লোক খুঁজছে আমাকে। ভাবলাম এখানে কাটিয়ে দেয়া যাবে কিছুদিন, তারপর সুবিধামত ফিরে যাব। আমাকে চিনতে পেরেছিল লপার। সেলুনে জুয়ার আসর বসায় সে, ডিলার হলাম আমি। খেলাটা চালাতে হয় খুব সাবধানে, কারও সন্দেহ যাতে না হয়। হারতে অভ্যস্ত নই, আবার কাউকে সর্বস্বান্তও করা যাবে না, কিন্তু ওর ভাগের টাকা ঠিকই থাকে। ছোট্ট বখরায় রফা হলেও সেটা এখন অনেক বেড়ে গেছে। সময় নিয়ে ধীরে ধীরে লোকজনের টাকায় পাহাড় বানাচ্ছে ও।

চলে যাচ্ছ না কেন?

লপার হুমকি দিয়েছে পালিয়ে গেলে স্যাভেজ আর নেবরকে লেলিয়ে দেবে আমার পেছনে। দুজনকে ফাঁকি দিয়ে পালানো সম্ভব নয়। পালিয়ে গেলেও, একটা দিনও টিকতে পারব না, এলাকাটা যা দুর্গম! নেবর গন্ধ শুকে শুকে ঠিকই হাজির হয়ে যাবে।

তোমার এত আগ্রহের কারণ বোঝা যাচ্ছে এবার।

অস্বীকার করছি না। আমাকে সাহায্য করতে পারবে তুমি। জুয়াড়ী মাত্রই দুরদৃষ্টিসম্পন্ন, আমার মনে হয়েছে আগে-পরে যাই হোক ওরা তোমার পিছু লাগবেই। এবং তোমাকে সামলাতে গিয়ে দলটা ছোট হবে। সে-সুযোগটাই নিতে চাই আমি। দেখো, জেমস, তোমাকে কিছু না বললেও হত, টিনস্টারদুটোকে নিয়ে ব্যস্ত থাকতে, আর এদিকে কেটে পড়তাম আমি। নিজের কাজ যাতে সহজে সারতে পারো সেজন্যে তোমার দরকার কিছু তথ্য আর পরামর্শ। এখানে অন্য কারও কাছে ওদের সম্পর্কে আসল খবর পাবে না তুমি। লপার বা স্যাভেজকে আমি যেভাবে চিনি তেমন করে চেনে না কেউ।

লপার নিশ্চয়ই জানবে আমার সাথে কথা বলেছ তুমি।

জানুক। আমি জানি তোমাকে নিয়ে ব্যস্ত থাকবে ওরা। আমাকে থামিয়ে দেয়ার কথা সে চিন্তা করবে না এখন, তাহলে রোজগারের বড় একটা উৎস ফুরিয়ে যাবে। আর তোমাকে শেষ করতে পারলে আমার আশাও শেষ। নিজের কামাই আরও কতদিন ওকে দিয়ে যেতে হবে কে জানে!

জুয়া খেলছ তুমি, লেসলি।

হয়তো, হাসল সে, বিশ্বাসী দেখাচেছ তাকে। ড্রয়ার থেকে সিগার বের করে ধরাল। এবং ভাল তাসের পক্ষেই বাজি ধরে সবাই।

দুরাশা!

আমি ভেবে-চিন্তেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি, জেমস। তোমার কোন সাহায্য লাগলে বলবে, যতদূর পারি করব। ববকে বিশ্বাস করতে পারো।

ওদের সম্পর্কে ঠিক কতটুকু জানো?

অন্য যে কারও চেয়ে বেশি। স্যাভেজের কথাই ধরো—মাথামোটা এক দানব, লপারের একান্ত বাধ্য। দুহাতে চেপে ধরে ওকে মানুষ মারতে দেখেছি। নেবর একটা কেউটের মত, কখন ছোবল মারবে আগে থেকে জানার উপায় নেই। ঠাণ্ডা মাথায় তোমার চোখে চোখ রেখে গুলি করতে পারবে ও, প্রয়োজনে পেছন থেকে। ওকে দেখে পিস্তলবাজ মনে হয় ঠিকই, কিন্তু আসলে পারতপক্ষে সামনাসামনি লড়ে না। তাই বলে মটেও হেলাফেলার পাত্র নয়। ওরা দুজনেই লপারের ডালকুত্তা। এখানকার লোকেরা কাছাকাছি সময়ে তিনজনকে আসতে দেখেছে, কিন্তু সম্পর্কটা আবিষ্কার করতে পারেনি কেউ।

আর লপার…সে হচ্ছে সবচেয়ে বিপজ্জনক লোক যদিও ফুলবাবু। বিশাল একটা স্টোরের মালিক কিন্তু শুরু করেছিল মাত্র পাঁচশো ডলার নিয়ে। ক্রুশারের সাথে ভাগাভাগিতে ব্যাংক গড়েছে, কিন্তু তাকেও ল্যাং মারতে ছাড়বে না, এটা আমার হির বিশ্বাস।

পিস্তল ঝোলায় না ও, কিন্তু জিনিসটা ওর মত নেবরও চালাতে পারে কি-না সন্দেহ আছে আমার। দারুণ ক্ষিপ্র। একবার জুয়ায় হেরে গিয়ে পিস্তলে হাত দিয়েছিল এক লোক। আতঙ্কে যেখানে সিটিয়ে যাওয়ার কথা সেখানে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক কাউবয়ের হোলস্টার থেকে পিস্তল তুলে নিয়ে গুলি করে লপার, লোকটা গুলি করার আগেই। এত অনায়াস ভঙ্গিতে যে লোক পিস্তল চালাতে পারে তাকে সেরা না বলে উপায় নেই। এখানে পরিপূর্ণ জ্বলোক সে, শহর কমিটির মাথা। পিস্তল না ঝুলিয়ে অন্যদের কাছ থেকে নিজেকে আলাদাভাবে, ধরাছোঁয়ার বাইরে প্রতিষ্ঠিত করে নিয়েছে।

দারুণ একটা টীম, তাই না? বাজি ধরে বলতে পারি একটা সমৃদ্ধ অতীত পেছনে ফেলে এসেছে ওরা। তবে বিস্ময়ের ব্যাপার কোথাও ওদের পোস্টার তো দেখিইনি, নামও শুনিনি।

ওদেরকে আউট-ল বা ওরকম ভাবছ কেন? সুযোগ পেলে অনেকেই এরকম জুড়ে বসবে।

অবজ্ঞার সাথে হাসল লেসলি উইলিয়ামস। জীবনে অনেক লোক দেখেছি। ওদের ধাত আমার ভালই জানা আছে। লপারকে সন্দেহের বাইরে রাখা গেলেও স্যাভেজ বা নেবরকে অন্য কিছু ভাবতে পারবে না তুমি। এত বড় একটা শরীর নিয়ে দ্র জীবন-যাপনের কোন ইচ্ছে আমাদের মার্শালের নেই, আর ওর ডেপুটি তো একটা জাত খুনী। খারাপদের মধ্যেও সেরা লোক থাকে, জানো তো? এ জন্যেই হয়তো ওদের নামে কোন পোস্টার নেই। তাছাড়া দেশটা কত বড়, এক প্রান্তের খবর পৌঁছায় কজায়গায়?

ক্রুশার ওদের সাথে আছে নাকি?

আমি নিশ্চিত নই। লপার ভাব দেখায় সে যেন ওর জানের দোস্ত। আসলে সময় হলে চোখ উল্টে নেবে ও-ই। আজকেই তো স্পষ্ট হয়ে গেল। কদিন পর হয়তো দেখা যাবে পারই ব্যাংকের সব দখল করে আছে। ওর শয়তানী বুদ্ধির সাথে পারবে না হেনরী।

তারমানে সাচ্চা লোক সে? কিছুটা বিস্মিত হয়েছে জেমস, হেনরী ক্রুশারকে ওর ধোয়া তুলসি পাতা মনে হয়নি।

দারুণ স্মার্ট লোক, সবসময়ই পরিপাটি থাকে। শহরের লোকজনের কাছে সে একজন আদর্শ মানুষ। বলেছে পুব থেকে এসেছে, কিন্তু আমার ধারণা সেটা মিথ্যে। ওসব ফুলবাবুরা পশ্চিমের এত ভেতরে আসে না। তা-ও বিচ্ছিন্ন, সীমান্তের কাছাকাছি এমন একটা শহরে। হতে পারে সত্যি কথা বলেছে, ওর আচরণে অবশ্য তাই মনে হয়। এতগুলো টাকা নিয়ে এতদূর আসার কারণ বোধহয় কেবল সে-ই জানে। ব্যবসাটাও ভাল বোঝে। চড়া সুদে ঋণ দেয়, জানে এছাড়া উপায় নেই ক্যাটলম্যানদের। আবার রাউন্ড-আপের পর ওদের কাছ থেকেই গরু কেনে, টাকসন পর্যন্ত লম্বা ড্রাইভের খরচ আর সময় র‍্যাঞ্চারদের নেই বলে বাধ্য হয়ে ওর কাছে অল্প দামে গরু বিক্রি করে। সব গরু একত্রিত করে টাকসনে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে লোকটা।

ওর সাথে তোমার বনিবনা তাহলে ভালই।

অন্তত শত্রুতা নেই। তবে খেলায় হেরে গেলে মন খারাপ করে থাকে কয়েকটা দিন। ওর মন অবশ্য ভাল হয়ে যায় রোজালিনা বার্থেজের কাছে গেলে। পোকারের চেয়েও বেশি টান মেয়েটার প্রতি। কিন্তু কোনটাতেই বিশেষ সুবিধে করতে পারছে না ও।

আজকের ঘটনা নিশ্চয়ই ভুলে যাবে না সে? . ওর নাক ভেঙে দিয়েছ, সে তোমাকে চুমো খাবে নাকি? তোমার মুখটা ওই মেক্সিকান মেয়েটার মুখ হলে না হয় একটা কথা ছিল। হেসে উঠল জুয়াড়ী, ফের বোতল তুলে নিল। তবে যাই বলো দারুণ একটা মেয়ে, বুড়োদের বুকও কাঁপিয়ে দেয়। কিন্তু ও যেন পণ করেছে কোন পুরুষের বাহুলগ্না হবে না। কেভিন লপার তঅ চড়ই খেয়েছে। ( এত অহঙ্কারী মেয়ে? লপার বা কুশায় তো এখানে রাজার মত। ওর জায়গায় হলে যে কোন মেয়ে নিজেকে ধন্য মনে করবে। মজা পাচ্ছে জেমস, দেখা যাচ্ছে দুই পাটনার সব জায়গায় একসাথেই আছে।

হয়তো বিশ্বাসের অভাব। মেক্সিকানরা এ দেশে অনেকটা অবাঞ্ছিতের মত। একজন ইয়াঙ্কি মহিলা এখানকার সমাজে যে মর‍্যাদা পায় ওরা তা পায় না। সরকারীভাবে আমেরিকানদের মত সুবিধেও পায় না। যারা কয়েক পুরুষ ধরে থাকছে, এখানকার লোকেরা কখনোই নিজেদের একজন বলে ভাবতে পারেনি ওদের; ওরাও আত্মস্থ হতে পারেনি দেশটার সাথে। বেশিরভাগ লোকই হচ্ছে কেভিন লপার বা স্যাভেজের মত, একটা মেক্সিকান মেয়ে ওদের কাছে কেবল মেয়েমানুষ, ভালবেসে তার সাথে ঘর করার কথা ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করে না। মেক্স মেয়েরা তাই ইয়াঙ্কি পুরুষদের বিশ্বাসের চেয়ে অবিশ্বাসই করে বেশি। তারওপর নিজের মা-কে ঠকতে দেখেছে মেয়েটা। কুশারের মত ধনী কাউকে বেছে নেয়ার চেয়ে নিজ জাতের কাউকেই পছন্দ করবে সে।

তেমন কেউ আছে নাকি? হালকা সুরে বলল জেমস। লোকটা দারুণ ভাগ্যবান হবে।

নেই কেউ। কিন্তু মেয়েটা হয়তো তেমন কারও অপেক্ষায় আছে।

লপার বা ক্রুশার নিশ্চয়ই তোমার মতই ভাবে, তবু লেগে আছে কেন?

পর্দার কাছে সরে গেছে লেসলি উইলিয়ামস, বাইরে চোখ রেখে উত্তর দিল: লোভ। মেয়ে হিসেবে রোজালিনা বার্থেজ লোভনীয় তাতে কোন সন্দেহ নেই। আমি শুনেছি লপারকে চড় মারার পর থেকে নিজের সাথে ছোট্ট একটা ডেরিঞ্জার রাখতে শুরু করেছে মারিয়া বার্থেজ। কাউকে মেয়ের কাছাকাছি হতে দেখলে নাকি রেগে যায় মহিলা। স্যাভেজ গিয়েছিল একবার, পাছায় একটা গুলি নিয়ে ফিরে এসেছে ও। দুটো সপ্তাহ ঠিকমত ঘুমাতে পারেনি মাথামোটাটা। হাসছে জুয়াড়ী।

কিন্তু ব্যবসা করতে হলে লোকজন তো যাবেই ওর ক্যাফেতে।

তা যায়, চিন্তিত শোনাল লেসলির গলা। জানালা গলে উল্টোদিকের রাস্তার ওপর চলে গেছে চোখ, বিশাল একটা কাঠামো খুঁজছে। মারিয়া বার্থেজ নিজেই চালায় ক্যাফে। মেয়েকে ওপর থেকে নামতে দেয় না। খুব বেশি ঝামেলা হলে রান্নার কাজে সাহায্য করে মেয়েটা।

ওদের সম্পর্কে অনেক জানো দেখছি।

সেলুনে থাকি, ভুলে যাচ্ছ কেন? লোকজন আলাপ করে, শোনার ইচ্ছে না থাকলেও অনেক কথা কানে আসে। ঘুরে দাড়াল সে, চোখে সতর্ক দৃষ্টি। কুত্তাটাকে কোথাও খুঁজে পেলাম না। কেটে পড়েছে ভাবতে বাধছে আমার। নির্ঘাত ঘাপটি মেরে আছে কোথাও।

রিক স্যাভেজের কথা বলছে সে, ধারণা করল জেমস। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল ও। তাকাল জুয়াড়ীর দিকে, লোকটাকে স্বাভাবিক দেখাচ্ছে এখন। অতিরিক্ত হুইস্কি গেলার কোন নমুনা চেহারা বা আচরণে নেই। লেসলি উইলিয়ামস, আমি আমার নিজস্ব নিয়মে খেলি, স্থির, দৃঢ় কণ্ঠে বলল ও। পার বা স্যাভেজের সাথে আমার কোন শত্রুতা নেই, তাই যতক্ষণ না ওরা আমার পেছনে লাগছে আমিও কিছু করতে যাচ্ছি না। ওরা তোমার শত্রু, তাতে আমার কিছু যায়-আসে কি? আমরা এক দলের লোক নই, তোমার-আমার মধ্যে মিল কমই আছে। যদি আশা করে থাকো তোমার কথামত ওদের বিরুদ্ধে লেগে যাব, তাহলে ভুল করবে। নিজের গরজে ওদের সামলাতে হবে তোমার।

হতাশ দেখাল জুয়াড়ীকে, তাকিয়ে আছে।

ধন্যবাদ তোমাকে, কাজে লাগবে এমন অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছ। আমি এখন জানি ঠিক কার বিরুদ্ধে লড়তে হতে পারে। একটা পরামর্শ দেব, শেষপর্যন্ত অপেক্ষা করা বোধহয় ঠিক হবে না। প্রথম সুযোগে স্যাডলে চেপে বোসো।

জানি অন্তত একটা সুযোগ তো পাবই। তুমিই তৈরি করে দেবে, ক্ষীণ কণ্ঠে বলল জুয়াড়ী, গলায় জোর নেই।

এত নিশ্চিত হচ্ছে কি করে?

সবকটা দাঁত বেরিয়ে পড়ল তার, চোখ টিপল। তোমাকে শান্তিতে থাকতে দেবে না। এ-ও জানি এ জন্যে মাসুল দিতে হবে।

শ্রাগ ফল জেমস, জুয়াড়ীর চোখে চোখ রেখে পিছিয়ে এল। পেছনে হাত বাড়িয়ে খুলে ফেলল দরজাটা।

তুমি দেখছি আমাকেও অবিশ্বাস করছ! বিস্মিত গলা ভার।

আমি কাউকেই বিশ্বাস করি না।

নিচে নেমে এল জেমস, সেলুনের ভেতর থেকে লোকজনের কথাবার্তা ভেসে আসছে। রিক স্যাজের কথা ভাবল, হতে পারে ওর জন্যেই অপেক্ষা করছে। সামনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাবে এ আশায় আছে হয়তো, নাকি পেছনের দরজায়ও চোখ রাখবে? বোঝার উপায় নেই, ঝুঁকিটা নিতেই হবে। আনমনে কাঁধ ঝাঁকাল ও, দরজা তো মোটে দুটো একং ওগুলোর যে কোন একটা দিয়ে বেরিয়ে যেতে হবে। এমনিতে অনেক দেরি করে ফেলেছে, প্রাইসরা বোধহয় দুশ্চিন্তা করছে।

বেরিয়ে আসতে তাজা বাতাস লাগল গায়ে। মূল রাস্তা এড়িয়ে গেলেই বোবাধহয় ভাল হবে, মনে হলো ওর। সোজা দক্ষিণে এগোল, চেষ্টা করেও নিঃশব্দে চলতে পারছে না। একে অন্ধকার তারওপর রাস্তার ওপর সব ফেলনা জিনিসপত্র, উচ্ছিষ্ট ফেলে রাখা হয়েছ। ইচ্ছে থাকলেও ওগুলোর সাথে সংঘর্ষ এড়ানো যাচ্ছে না। মৃতের মত দেখাচ্ছে বেশিরভাগ বাড়িকে, বাতি জ্বলছে না। দ্রুত এগোল ও। শহরের শুরু পর্যন্ত যেতে হবে, তারপর ওপাশের বাড়িগুলোর পেছনে ক্রীকের পাড় ধরে গেলে পৌঁছে যাবে প্রাইসের বাড়িতে।

ক্যাফেটা সবে পেরিয়ে এসেছে ঠিক এসময় ভূতের মত উদয় হলো লোকটা। নিঃশব্দে, জেমস কিছু বুঝে ওঠার আগেই। লিকলিকে একটা দেহ, ডান হাতটা লম্বা। পেটে ধাতব নলের ঠাণ্ডা স্পর্শ পেল ও। পেয়েছি ওকে, রিক! চাপা স্বরে উল্লাস প্রকাশ করল লোকটা। জলদি এদিকে এসো।

এই প্রথম শুনতে পেলেও জেমস অ্যালেন বুঝতে পারল ওটা রেনে নেবরের কণ্ঠস্বর।
নড়ো না, অ্যালেন, ক্রোধে তপ্ত কণ্ঠে বলল নেবর। পেট ফুটো করে ফেলব তাহলে!

নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকল জেমস, ঘামতে শুরু করেছে। বোঝা যাচ্ছে ভাল গ্যাঁড়াকলে পড়েছে, সহজে ছাড় পাবে না এদের হাত থেকে। নাকি ঝামেলা একেবারে সেরে ফেলবে? পেছনে ভারী পায়ের শব্দ পেল ও, টের পেল হোলস্টার থেকে পিস্তলটা তুলে নিয়েছে কেউ।

জব্বর গল্প করলে, না? রিক স্যাভেজের ভরাট গলা শোনা গেল পেছনে। অপেক্ষা করতে করতে বিরক্তি ধরে গিয়েছিল আমার। কি এত আলাপ করলে?

লেসলি বলছিল তোমার মাথাটা একেবারেই নিরেট, গোবরে ভরা। আমারও তাই মনে হচ্ছে এখন।

কি বললি হারামজাদা? খেপা সুরে তড়পে উঠল মার্শাল।

তোমরা এখানে এসেছ, লপার জানে? সকালে দেখা করতে বলেছে ও, আমাকে নাকি ডেপুটির একটা তারা দেবে। মারিয়া বার্থেজ তোমার পাছার কোন দিকটা ফুটো করেছে, স্যাভেজ? এ ভুলের জন্যে লপার কিন্তু এবার অন্য দিকটা ফুটো করবে…।

ধাপ্পা দিচ্ছে ও! চাপা স্বরে মন্তব্য করল নেবর।

লপারের মাথা খারাপ হয়েছে আর কি, তোমাকে ডেপুটি বানাবে! অবজ্ঞার সুরে হেসে উঠল দানব। নিঃশব্দ রাত্রিতে শব্দটা জোরাল শোনাল, কিন্তু পরোয়া করছে না ওরা। নেবর, পিস্তলটা ধরে রাখো। আমার হাত নিশপিশ করছে! আগে ওকে আচ্ছামত থোলাই দিয়ে নেই, তারপর দেখা যাবে অন্যকিছু। আমার সাথে বাতচিৎ করার খায়েশ জনমের মত মিটিয়ে যদি না দিয়েছি তো আমার নাম রিক স্যাভেজ নয়!

পেটে চেপে থাকা পিস্তলের নল সরে গেছে, টের পেল জেমস। দূরে গিয়ে দাঁড়াল ডেপুটি, শিথিল হাতজোড়া পড়ে আছে কোমরের পাশে। বেচাল দেখলে গুলি করার জন্যে তৈরি। বিপদসঙ্কেত পেল ও, শিরশির করে উঠল ঘাড়ের পেছনটা। বিস্ময়ের সাথে এবার লক্ষ্য করল পেছন থেকে ওর দুই কবজি চেপে ধরেছে রিক স্যাভেজ। কিছু বুঝে ওঠার আগেই হাতগুলো পিঠের ওপর নিয়ে গেল, চেপে ধরল।

নড়ো না, খতম হয়ে যাবে! শাসাল নেবর।

আতঙ্কিত হয়ে পড়ল জেমস। একটু আগেও ভেবেছিল দানবটার মুখোমুখি হওয়ার সুবাদে একটা কিছু করার চেষ্টা করবে। কিন্তু স্যাভেজ সে-সুযোগ রাখছে না, দড়ি দিয়ে ওর কবজি বেঁধে ফেলেছে। হতাশা বোধ করল ও, অসহায়ভাবে মার খেতে হবে।

দানবীয় একটা উল্লাস শুনতে পেয়ে শক্ত হয়ে গেল ওর শরীর, সরে যাওয়ার চেষ্টা করল। ঘুসিটা কাঁধ ছুঁয়ে গেল কেবল, কিন্তু সেটাই টলিয়ে দিল ওকে। হুমড়ি খেয়ে পড়তে গিয়েও সামলে নিল নিজেকে, ঘুরে দাঁড়াল।

ততক্ষণে এসে পড়েছে দানব। ব্যাপারটা তাহলে মজাদারই হবে! উচ্ছ্বাস মার্শালের গলায়। একটু-আধটু বাধা না দিলে কি আর জমে? এক পা এগোল সে, ইচ্ছে করেই আঘাত করল না। পিছিয়ে গেল জেমস, পরের আক্রমণটা কিভাবে আসে বোঝার চেষ্টা করছে। এড়িয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই, দুহাত বাধা থাকায় রিক স্যাভেজের বিরুদ্ধে একটা শিশুর মত অসহায় হয়ে পড়েছে ও।

বিশাল কাঠামোটার ওপর চোখ রেখে হাত খোলার চেষ্টা করল জেমস। বিন্দুমাত্র শিথিল হলো না, বরং আরও এঁটে বসল। মনে মনে নিজের দুর্ভাগ্যকে অভিসম্পাত করছে, সত্যি কপালে খারাবি আছে আজ! বিদ্যুৎ গতিতে এল ঘুসিটা, কোন রকমে সরে গিয়ে এড়াল। কিন্তু মোক্ষম জায়গায় লাগল পরেরটা, যেন আধমণী একটা পাথর পড়েছে বুকে। উড়ে গিয়ে মাটিতে আছড়ে পড়ল ওর দেহ, শরীর পড়ল হাতের ওপর। জেমসের মনে হলো আগুন ধরে গেছে কবজি আর আঙুলগুলোতে। নির্ঘাত মচকে গেছে।

লাথিটা আসতে দেখে গড়িয়ে সরে যাওয়ার চেষ্টা করল জেমস, সফল হতে পারল না। পেটে লাগল। মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল সব বাতাস। বাতাসের জন্যে হাঁসফাঁস করতে লাগল, খাড়ার ঘা হিসেবে আরেকটা লাথি জুটল। ফের সরে যাওয়ার চেষ্টা করেও শক্তি পেল না।

কোথায় গেল তোমার এত তেজ, অ্যালেন? উল্লাস মার্শালের গলায়, দুহাত দূরে দাঁড়িয়ে হাসছে। উঠে এসো তো, বাছা, পুরুষ মানুষের মত সাহস দেখাও। জেমসকে অনড় দেখে মুখ দিয়ে এমন শব্দ করল যেন দারুণ দুঃখ পেয়েছে। নাহ্, তোমাকে দেখছি ধরে তুলতে হবে। ঝুঁকে এল সে, জেমসের বাকস্কিন শার্ট খামচে ধরে ওকে টেনে তুলে ফেলল।

মরিয়া হয়ে উঠেছে জেমস, মাথা চালাল। এমন কিছু হবে আশা করেনি দানব, বড়সড় নাক থেঁতলে দিল ওর কপাল। লোকটা এত জোরে চেঁচিয়ে উঠল যে কানে তালা লেগে গেল ওর। এখনও ওকে ধরে রেখেছে মার্শাল। সুযোগটা কাজে লাগাল-সর্বশক্তি দিয়ে হাঁটু চালাল। নরম মাংসের সাথে সংঘর্ষের ভোতা শব্দটা তৃপ্তিদায়ক লাগল ওর কাছে। ওকে ছেড়ে দিয়েছে স্যাভেজ। দুহাত আকাশে তুলে পিছিয়ে গেল সে। পড়ন্ত অবস্থায় মার্শালের হাঁটুতে বুট চালাল জেমস, ঠক করে আওয়াজ হলো। মাটিতে শুয়ে পড়ার পর জেমস দেখতে পেল দানবের মুখ হাঁ হয়ে আছে, দুহাতে চেপে ধরেছে দুই উরুর সন্ধিক্ষণ, পড়ে যাচ্ছে হাঁটু ভেঙে। ওর ওপরই।

সরে যাওয়ার চেষ্টা করেও পারল না জেমস, পাঁচমণী শরীরটা আছড়ে পড়ল ওর ওপর। ঠেলে সরে যাওয়ার চেষ্টা করল, পারছে না। নাক-মুখ ভিজে যাচ্ছে ওর গরম তরলে, সমানে রক্ত বেরোচ্ছে স্যাভেজের নাক থেকে। কিছুক্ষণ পড়ে থাকল ওরা দুজন, ককাচ্ছে মার্শাল। খানিক পর ওর ওপর থেকে সরে গেল সে, হুঁশ ফিরল যেন।

স্যাভেজ? নেবর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।

কি হয়েছে, ফ্যাচফ্যাচ করছ কেন? যন্ত্রণাকাতর কণ্ঠে বিরক্তি প্রকাশ করল স্যাভেজ।

মজা বুঝছ এবার? লোকটাকে ছোট করে দেখেছ তুমি। ওঠো এবার। ওকে নিয়ে কি করবে?

উঠে বসল সে, বার কয়েক মাথা নাড়ল। দুহাতে নাক চেপে ধরে পরে তা চোখের সামনে এনে দেখল। নিজের রক্ত দেখে জ্বলে উঠল ওর চোখ, তীব্র ক্রোধে কঠিন হয়ে গেছে সারা শরীর। এর শেষ দেখে ছাড়ব আমি! খরখরে কণ্ঠে শপথ করল, খোদার কসম, ওকে মেরেই ফেলব আজ! কসরৎ করে উঠে দাঁড়াল সে, যন্ত্রণাকাতরমুখটা আবছা আলোয় বীভৎস দেখাচ্ছে।

তোমার নিজের অবস্থাই সুবিধের নয়, সেটা বুঝতে পারছ?

একটা কাঁধ সামান্য কঁকাল স্যাভেজ, নেবরের কথায় মৃদু ভৎসনা টের পেলেও গ্রাহ্য ল না। চুপ করে থাকো, আর দেখো কি করে ওকে জনমের শিক্ষা দেই! ধীর পায়ে এগিয়ে এল সে, বুনো আক্রোশে ফেঁসফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলছে। জান্তব চাঞ্চল্য তার চোখে, শরীর টান টান। আগের মত ভুল করল না এবার, সামনে এসে দাঁড়িয়ে থেকে কিছুক্ষণ দেখল জেমসকে। উঠে দাড়া হারামজাদা, নইলে মাড়িয়ে শেষ করে ফেলব!

পেটের পেশীতে কাঁপন জাগল জেমসের, তলে তলে শীতল ক্রোধে ফুসছে। সরে এল কিছুদূর, উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল। শক্তি পাচ্ছে না শরীরে। লাফিয়ে সামনে চলে এল স্যাভেজ, লাথি চালাল পাঁজর লক্ষ্য করে। গড়িয়ে ওটা পিঠে নিল জেমস, কিন্তু এ সুযোগে ঝুঁকে অনায়াসে ওকে তুলে ফেলল মার্শাল। লোকটার মনোবল দেখে বিস্মিত হলো ও, মোক্ষম দুটো আঘাত তাকে মোটেও টলাতে পারেনি।

ঘুসি চালানো শুরু করল সে, যদিও গতি কমে গেছে। জেমস কেবল ওগুলো এড়ানোর চেষ্টা করছে। ব্যর্থ হচ্ছে। ভাগ্য ভাল লোকটার শরীরে আগের মত জোর নেই নইলে কয়েকটা ঘুসিতে দফা-রফা হয়ে যেত। তবু যে কটা মাথা, চিবুক আর বুকে-পেটে লাগল, সেগুলো পুরো বেসামাল করে দিয়েছে ওকে। অসাড় হয়ে গেছে পেটের পেশীগুলো, প্রচণ্ড যন্ত্রণায় মাথা ঝিমঝিম করছে। অনুভব করল বেশিক্ষণ আর টিকতে পারবে না। উন্মত্ত রিক স্যাভেজকে থামানোর বা নিদেনপক্ষে বাধা দেয়ার কোন সুযোগই ওর নেই।

কাছের বাড়িটার জানালা খুলে গেল, একরাশ আলো এসে পড়ল জায়গাটায়। হায় খোদা! লোকটাকে বেঁধে পেটাচ্ছে ওরা! মেয়েলি একটা আর্তনাদ শোনা গেল। মেরেই ফেলবে নাকি?

তুই সরে যা, অস্পষ্ট আরেকটা গলা শোনা গেল। আমি দেখছি।

স্যাভেজ, ওকে ছেড়ে দাও! নেবরের শীতল কণ্ঠ। যথেষ্ট হয়েছে। ছাড়ো ওকে, নইলে তোমাকেই গুলি করব!

জাহান্নামে যাও তুমি! রাগে চেঁচিয়ে উঠল মার্শাল। তার ঘুসিতে চোখে সর্ষে ফুল দেখল জেমস, টলে উঠল ওর পৃথিবী। মাটিতে আছড়ে পড়ল শরীর, অন্ধকার নেমে এল চোখে।

জ্ঞান ফিরতে দুজন মহিলার উদ্বিগ্ন মুখ চোখে পড়ল জেমসের। ঘোলাটে মুখগুলো অস্পষ্ট আলোয় পরিষ্কার হতে সময় লাগল, চিনতে পারল এবার—মারিয়া আর রোজালিনা বার্থেজ। নড়াচড়া করতে তীব্র প্রতিবাদ জানাল শরীরের সব কলকজা। মাথাটা একমণ ভারী মনে হচ্ছে, বুক ধুকপুক করছে এখনও। চোখ বুজে পড়ে থাকল কিছুক্ষণ, সারা শরীরের ব্যথা ভোলার চেষ্টা করছে। সুস্থির হতে তাকাল চারপাশে-একই জায়গায় পড়ে আছে। দুই মহিলা ছাড়াও আরও কয়েকজন কাছে-ধারে দাঁড়িয়ে আছে। প্রেয়ারির ঠাণ্ডা বাতাস কাঁপন ধরাল ওর শরীরে, সেইসাথে মনে করিয়ে দিল একটু আগের ঘটনা। জ্ঞান হারিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু অবচেতন মনে স্যাভেজের দেয়া মারের স্মৃতিটুকু দগদগে ঘায়ের মত জেগে আছে মনের পর্দায়।

তোমরা একটু সাহায্য করবে? মারিয়া বার্থেজের উদ্বিগ্ন কণ্ঠে অনুরোধ। ওকে ভেতরে নিয়ে যাওয়া দরকার। আর, পারলে কেউ একজন ডক শুলজকে নিয়ে এসো।

প্রাণপণ চেষ্টায় উঠে বসল জেমস, মাথা ঝিমঝিম করছে। আমি ঠিক আছি, ম্যাম, ধীর কণ্ঠে বলল ও, কথা বলতেও যে পরিশ্রম হয় তা টের পাচ্ছে এখন। তোমাদের ব্যস্ত হতে হবে না। এমনিতেই আমার প্রাণ বাঁচিয়েছ।

একটা কথাও বলবে না! কঠিন গলায় শাসাল মিসেস বার্থেজ।

উঠে দাঁড়াল জেমস, বহুকষ্টে নিজেকে স্থির রাখছে। দূরে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছে লোকজন, সাহায্য করতে এগিয়ে এল না কেউ। মারিয়া বার্থেজ তাকাল তাদের দিকে, দৃষ্টিতে ঘৃণা ফুটে উঠল। একহাত বাড়িয়ে চেপে ধরল জেমসের কাঁধ।

অস্বস্তি ঘিরে ধরল ওকে। আমি নিজেই যেতে পারব, ম্যাম, মহিলাকে নিরস্ত করতে দ্রুত বলে উঠল।

হয়েছে, আর বীরত্ব দেখাতে হবে না! মৃদু ভৎসনার সুরে বলল মহিলা। এই পুরুষ, মানুষগুলোকে নতুন করে চিনলাম আজ। স্যাভেজের ফাঁপা শরীর দেখে ভয়ে সিটিয়ে গেছে, ভাবছে তোমাকে সাহায্য করলে পরে ওদের ওপর চড়াও হবে সে। কিন্তু তার নিজেরই এখন সাহায্য দরকার বলে মনে হলো আমার। শেষ দিকে হেসে উঠল মারিয়া বার্থেজ।

আমার পিস্তলটা রয়ে গেছে, এগোতে গিয়েও থেমে গেল জেমস।

কোথায় পড়েছে বলো, বোজ খুঁজে আনবে।

লণ্ঠন হাতে দাঁড়িয়ে ছিল মেয়েটা। জুনিপার ঝোপটা দেখাতে সেদিকে এগোল, অনায়াসে খুঁজে পেল সিক্সশূটারটা। ফিরে এসে জেমসের পাশে দাড়াল। আমার কাঁধে হাত রাখো, বলল রোজালিনা।

তোমাদের ঝামেলা বাড়াচ্ছি কেবল, নিজের ওপর বিরক্তি বোধ করছে জেমস, বার্থেজদের সহযোগিতা নিতে ওর পৌরুষে বাধছে। কিন্তু এ ছাড়া উপায়ও নেই, সত্যি দারুণ বিপর্যস্ত ওর শরীর। এলোমেলো পা ফেলছে, নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেই।

পেছনের দরজা দিয়ে ক্যাফের ভেতরে ঢুকল ওরা। একটা চেয়ারে বসাল জেমসকে। দরজা বন্ধ করার সময় বাইরের লোকগুলোকে একবার দেখল মিসেস বার্থেজ, তারপর সপাটে দরজা আটকে দিয়ে ফিরল মেয়ের দিকে, অসন্তোষ তার চোখে। আজকের ঘটনাটা মনে রাখবি, রোজ, অনেক কিছু শেখার আছে। কাছে গিয়েও অ্যালেনকে সাহায্য করেনি ওরা। মনে রাখবি তোর বিপদেও এভাবে মুখ ফিরিয়ে নেবে। ইয়াঙ্কি হয়েও ওরা তাকে সাহায্য করেনি, আর আমরা তো নোংরা মেক্সিকান! চাপা বিষাদ প্রকাশ পেল কথাগুলোতে। চুলোয় পানি চড়িয়ে দে, মেয়েকে ফরমাশ দিল মহিলা। কফি পেলে চাঙাবোধ করবে ও। জেমসের কাছে এসে লণ্ঠনের আলোয় ওর মুখের ক্ষতগুলো খুঁটিয়ে দেখল। মনে হচ্ছে স্ট্যাম্পিডের শিকার হয়েছ তুমি, অ্যালেন, সহানুভূতির সুরে হাসল। রিক স্যাভেজের হাতদুটো মুগুর নাকি?

হামানদিস্তার চেয়েও ভয়ঙ্কর, হালকা সুরে উত্তর দিল জেমস।

রস এখনও বাকি আছে দেখছি! ভাল, মনোবলটা দৃঢ় না হলে পুরুষ মানুষের চলে নাকি?

গামলা ভরা গরম পানি টেবিলে এনে রাখল রোজালিনা। ওপরে ছুটে গেল এরপর, নরম এক টুকরো কাপড় নিয়ে ফিরে এল। কুসুম গরম পানিতে ওটা ভিজিয়ে ক্ষতগুলো ধোয়া শুরু করল মারিয়া বার্থেজ। প্রশান্তি অনুভব করছে জেমস, যতটা না শুশ্রুষায় তারচেয়ে বেশি প্রায় অচেনা দুজন মহিলার আন্তরিকতায়। কয়েকজন লোক যা করেনি তাই করছে এরা। রিক স্যাভেজ বা রেনে নেবরের ভীতির চেয়ে, একজন বিপদাপন্ন লোককে সাহায্য করাকে বড় ভেবেছে ওরা। দারুণ মহিলা, ভাবল জেমস-উদার, আন্তরিক এবং সদয়।

জেমস নিশ্চিত নয় ওরা তাকে শেষপর্যন্ত খুন করত কি-না। রিক স্যাভেজের ইচ্ছে যা-ই থাকুক না কেন, মার্শালের কাজে নাক গলিয়েছে বার্থেজরা। বলা যায় আইনকে বাধা দিয়েছে। স্যাভেজ ব্যাপারটাকে কিভাবে নেবে তারওপর নির্ভর করছে এদের আগামী দিনগুলো। তবে এটা ঠিক সেধে নিজেদের ঘাড়ে ঝামেলা চাপিয়েছে বার্থেজরা, মার্শাল এর শোধ নিতে চাইলে বিপদে পড়তে হবে ওদের।

আরামে চোখ বুজে ফেলেছিল ও, মহিলা ওর শার্টের বোতাম খুলতে শুরু করতে চমকে উঠে চোখ মেলল। কঠিন চাহনি হজম করতে হলো ওকে। শার্ট খুলে ওর ঊধ্বাঙ্গ পুরোটাই মুছে দিল মিসেস বার্থেজ। ওর মনে হলো কয়েক জায়গায় মাংসপেশী থেঁতলে গেছে, তবে ভাগ্য ভাল হাড়-গোড় কিছু ভাঙেনি।

কফির সুগন্ধে খিদে চাগিয়ে উঠল ওর, মনে পড়ল সাপার করা হয়নি। বলতে চেয়েও সংবরণ করে নিল নিজেকে। কিন্তু রোজালিনা একটা প্লেটে করে খাবার নিয়ে আসতে কৃতজ্ঞবোধ করল ও। ওর প্রয়োজন ঠিকই আঁচ করে নিয়েছে মেক্সিকান গোলাপ।

নাও, চটপট খেয়ে ফেললা। শরীরে জোর পেতে হলে খাবারের চেয়ে ভাল কিছু আর নেই। উৎসাহ জোগাল মহিলা।

সময় নিয়ে খেল জেমস, বুঝতে দিতে চায় না ওর খিদে কতটুকু। কফির মগ তুলে নিয়ে চুমুক দিতে শরীর জুড়িয়ে গেল, চাঙাবোধ করছে। ঠিক বুঝতে পারছি না কিভাবে কৃতজ্ঞতা জানাব, অসহায় দেখাল ওকে, ঘন ঘন দেখছে দুজনকে। তোমরা সাহায্য না করলে…

বুঝেছিস, রোজ, কৌতুকে নেচে উঠল মহিলার চোখজোড়া। ওর কাছে টাকা নেই।

মা-মেয়ে হেসে উঠল একসাথে।

আছে। তোমরা নিশ্চয়ই নেবে না।

এ ব্যাটা দেখছি আস্ত বোকা! মিসেস বার্থেজের হাসি আরও বিস্তৃত হলো। কিন্তু নিক বলেছিল খুব বুদ্ধিমান।

অস্তস্তি বোধ করছে জেমস, চোখ সরিয়ে নিয়ে তাকাল জানালার দিকে।

দুঃখিত, বাছা, ব্যাপারটা বোধহয় ঠিক পছন্দ হচ্ছে না তোমার। আমরা আসলে মজা করছিলাম। তোমাদের পুরুষদের এই জিনিসটা আমাকে এত আনন্দ দেয়-একজন মহিলার সামনে পড়লে বেশিরভাগ লোকই আর গুছিয়ে কথা বলতে বা চিন্তা করতে পারে না। সবচেয়ে অন্তরঙ্গ পরিবেশে আড়ষ্ট থেকে যায়। অথচ অন্য সময়ে দশজন সঙ্গীর মধ্যে নিজেকে নিশ্চিন্তে জাহির করতে পছন্দ করে।

একজন নয়, মা, মনে করিয়ে দিল রোজালিনা। দুজন মহিলা এখন ওর সামনে।

আরেকবার হাসি, এবং তাতে সহজ হয়ে গেল পরিবেশটা।

টেবিলে রাখা পিস্তল হোলস্টারে খুঁজে উঠে দাঁড়াল জেমস, হ্যাট চাপাল মাথায়। কিছু বলার ইচ্ছে হলো না, এগোল দরজার দিকে। সারা শরীরে দপদপানি চলছে ওর, বিশেষ করে বুক আর পেটে। ভোতা একটা চাপ চাপ অনুভূতি হচ্ছে মাথায়। কিন্তু সেসব চেপে রাখার চেষ্টা করছে। মহিলা দুজনকে বুঝতে দিতে চায় না ঠিক কতটুকু বিপর্যস্ত ও, ওদের আন্তরিক সেবা আর শুশ্রুষার পরও। অবশ্য যতটা আশা করেছিল তারচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে। সহজে হাঁটতে পারছে, বুক ভরে শ্বাস নিতে পারছে। মাথাটা পরিষ্কার লাগছে—নিজের বিপদ, পরিস্থিতি আর করণীয় সম্পর্কে সচেতন। বার্থেজরা ওকে সাহায্য না করলে এটুকুও সম্ভব হত না। হয়তো মরা একটা কুকুরের মত রাস্তায় পড়ে থাকতে হত, যতক্ষণ না নিজের বলে উঠে দাঁড়ানোর সামর্থ্য হত…

ঘরে গিয়ে লম্বা ঘুম দাও, তাহলেই অর্ধেকটা সেরে যাবে, পেছন থেকে বলল মিসেস বার্থেজ। সকালে একবার ডকের সাথে দেখা কোরো।

নড করল জেমস, বেরিয়ে গেল এরপর।

উঠে দরজা আটকে দিল রোজালিনা। কাচের ভেতর দিয়ে তাকিয়ে থাকল অস্পষ্ট দেহটার দিকে, দৃঢ় পায়ে হেটে চলে যাচ্ছে জেমস অ্যালেন। ফিরে এসে মায়ের পাশে বসল ও। একটা ধন্যবাদও বেরোয়নি ওর মুখ থেকে, হালকা সুরে বলল, অনুযোগ নয়।

তুই সেটা আশা করেছিস?

না। তবে বললে বোধহয় খুশি হতাম।

সমস্যাটা ওখানেই। একটা মৌখিক ধন্যবাদে শোধ-বোধটুকু শেষ হয়ে যায়। কিছু লোক আছে যারা এটা মোটেও পছন্দ করে না। বিপদের সময় পাশে এসে দাঁড়াবে ওরা, মুখে ধন্যবাদ দেয়ার চেয়ে এটাই ওদের জন্যে সহজ ও পছন্দের।

তারমানে সুযোগ খুঁজবে ও, চিন্তিত স্বরে বলল রোজালিনা। আমাদের সাহায্য করার জন্যে কেবল একটা ছুঁতে চাই ওর। ইশশ, আরেকজন!

ওরকম না ভাবাই ভাল, হয়তো ও তেমন লোক নয়, আত্মবিশ্বাসী দেখাল মারিয়া বার্থেজকে। একটু অন্যরকম…আর সবার চেয়ে আলাদা, কি যেন একটা আছে ওর মধ্যে। লপার বা কুশারের মত জোর কিংবা তোষামোদ করে কিছু অর্জন করা ওর ধাতে নেই।

মনে হচ্ছে যেন ওকে অনেকদিন থেকে চেনো?

অনেক লোক তো দেখলাম, এরা মোটামুটি একই রকম।

বাবার মত? হঠাৎ মুখ ফস্কে জানতে চাইল রোজালিনা।

চিন্তিত দেখাল মারিয়া বার্থেজকে, হাসল এরপর। অনেকটা ওর মতই স্বাধীনচেতা এবং জেদী। কিন্তু এতটা দৃঢ়তা নেই তোর বাবার।

এ জন্যেই সে চলে গেল?

আসল ব্যাপারটা হচ্ছে, এরা চলে গেলেও যতটুকু পারে নিজের সব দিয়ে যাবে তোকে। ভালবাসাকে ঘৃণায় রূপ পেতে দেবে না।

তাকে এখনও ভুলতে পারোনি তুমি, কিন্তু ঠিকই চলে যেতে দিয়েছ একদিন! অভিমান প্রকাশ পেল রোজালিনার কণ্ঠে, বাবা না মা-র প্রতি তা বোঝ গেল না।

সহাস্যে মেয়েকে দেখল, মিসেস বার্থেজ, গাঢ়, শোনাল তার কণ্ঠস্বর। দিয়েছি, কারণ তাকে আটকে রাখার কোন ইচ্ছে আমার হয়নি। ঘুরতে ভালবাসে সে, নেশাটা ওর রক্তের মধ্যে। কেউ তা ছাড়াতে পারবে না, আমিও পারিনি। একসময় ফিরে আসবে ও, আমি জানি, যদি বেঁচে থাকে।

মায়ের বুকে মুখ গুঁজল রোজালিনা। কিন্তু কাউকে এ কথা বলোনি তুমি! সবাই মনে করে বাবা আমাদের ছেড়ে চলে গেছে।

মেয়েকে জড়িয়ে ধরল মিসেস বার্থেজ। ওর নেশার চেয়ে এখানকার টানটাই বড়, রোজ, এ জন্যেই তাকে আটকাইনি। আমি জানি সে ফিরে আসবেই। হয়তো আরও দুটো বছর অপেক্ষা করতে হবে। এখানে একটা ঠিকানা রেখে গেছে সে, ওটাই তার একমাত্র অবলম্বন।

থমকে গেল রোজালিনা, কথাটার তাৎপর্য বুঝতে সময় লাগল। মায়ের দিকে তাকাল ও, কোন রকম দ্বিধা নেই তার মধ্যে, যেন নিশ্চিত জানে। আমি!?

হ্যাঁ, তুই। তোর জন্যেই ফিরে আসবে সে। একজন বাবা তার সন্তানকে কখনোই এড়াতে পারে না।
দুদিন পর কাজে যোগ দিল জেমস অ্যালেন। ভোরে বেরিয়ে গেল বনভূমির উদ্দেশে। ওয়াগন রেখে যথারীতি কাজে নেমে পড়ল। টানা কাঠ কেটে চলল, কোন অসুবিধে হচ্ছে না। দুপুর পর্যন্ত মিনিট বিশের জন্যে একবার বিরতি নিল। দুটো দিন কামাই হয়েছে, বাড়তি পরিশ্রম করে পুষিয়ে নিতে হবে।

দূর থেকে ঘোড়সওয়ারকে দেখল জেমস, স্যাড়লে বসার ভঙ্গিটা অপরিচিত ওর খাবার নিয়ে নিকোলাস প্রাইসের অবশ্য এখুনি আসার কথা, প্রতিদিন এ সময়ে আসে সে। অশ্বারূঢ় কাছে আসতে থেমে গেল ওর হাত, অবাক হয়েছে রোজালিনা বার্থেজকে দেখে। দ্রুত পাশে রাখা শার্ট, তুলে নিয়ে খালি গায়ে চাপাল। মেয়েটা কাছে আসতে নড করল।

নিকোলাস প্রাইসের গ্রুলায় চেপেছে রোজালিনা। স্যাডলে বসার ভঙ্গি সাবলীল, বোঝা যাচ্ছে শহুরে মেয়ে হলেও স্যাডলে চেপে অভ্যস্ত।

একজন ভদ্রলোকের উচিত হচ্ছে কোন মহিলাকে তার বাহন থেকে নামতে সাহায্য করা! কপট সমালোচনা মেয়েটার হাস্যোজ্জ্বল মুখে, জেমসের চমকে যাওয়া অভিব্যক্তি ওকে আনন্দ দিচ্ছে। আমি অবিশ্বাস করব যদি বলো তুমি তা জানো না।

মাথা ঝাঁকিয়ে এগিয়ে গেল জেমস, নামতে সাহায্য করল মেয়েটিকে।

ধন্যবাদ, মি. অ্যালেন।

নড করে একটু দূরে সরে গেল ও।

স্যাডল ব্যাগ থেকে একটা প্যাকেট বের করল মেয়েটা। অবাক হয়েছ, তাই? ওটা এগিয়ে দেয়ার সময় বলল। মার্কের সাথে স্কুল থেকে ফিরছিলাম, নিক মাত্র রওনা দিচ্ছিল। ওকে বাচিয়ে দিলাম, এই রোদুরে এতদূর আসতে হবে না বলে খুশি হয়েছে সে।

প্যাকেট নিয়ে চেলা দেয়া কাঠের ওপর রাখল জেমস। ক্রীক থেকে হাত-মুখ ধুয়ে এসে দেখল একটা শুকনো গাছের গুঁড়িতে বসেছে রোজালিনা। তুমি খেয়েছ, ম্যাম? প্যাকেট তুলে নিয়ে জানতে চাইল ও।

মাথা ঝাঁকাল মেয়েটা।

মার্ককে বোধহয় ক্যাফেতে নিয়ে গেছ তুমি, প্রশ্ন নয়, এমনিতে জানতে চাইল জেমস।

হ্যাঁ, ওখানেই লাঞ্চ করেছি আমরা।

খাওয়া শেষ করে সিগারেট ধরাল জেমস।

তুমি তো দারুণ লোক! লিয়ন সিটিতে এ মুহূর্তে সবচেয়ে আলোচিত লোক হচ্ছে জেমস অ্যালেন। একদিনে দুজনের নাক ফাটিয়ে দিয়েছ। লোকজন তো বিশ্বাসই করতে পারছে না কেউ স্যাভেজের অবস্থা এরকম করতে পারে।

চুপ করে থাকল জেমস। মেয়েটা কেন এসেছে, ভাবছে। মনে হচ্ছে খুব সহজে ওকে বিদায় করা যাবে না। তারমানে সময়টুকু অযথাই নষ্ট হবে। রোজালিনা এমন মেয়ে যাকে এড়িয়ে নিরবিচ্ছিন্নভাবে কাজ করা সম্ভব নয়। তুমি কি এমনিতে এসেছ, ম্যাম? একটু পর গাছের একটা গুড়িতে, কুড়ালের দুটো কোপ বসিয়ে বলল ও। দুটো দিন কামাই করেছি, শেষ করতে হলে আমাকে বেশি খাটতে হবে।

অবাক হয়ে ওর দিকে তাকাল রোজালিনা, ঠিক বিশ্বাস করতে পারছে না এভাবে সরাসরি এড়িয়ে যেতে চাইবে জেমস। কিছুক্ষণ কথা সরল না মুখে, অপমান বোধ হলো ওর। ঝট করে উঠে দাঁড়াল, এগিয়ে এসে সামনে দাঁড়াল। তুমি কি আমাকে চলে যেতে বলছ? মুখিয়ে উঠল ও, অপমানে সুন্দর মুখ লালচে দেখাচ্ছে কিন্তু চোখে খানিকটা বিস্ময় লেগে আছে এখনও।

খানিক তাকিয়ে থাকল জেমস, বোঝার চেষ্টা করল সমস্যাটা ঠিক কোথায় হয়েছে। সৌন্দর্য অহঙ্কারের জন্ম দেয়, আঘাতটা বোধহয় সেখানেই লেগেছে। হাসল সে, মাথা নাড়ল। আমি বলতে চেয়েছিলাম তোমার যদি তাড়া না থাকে তো আমরা একসাথে ফিরতে পারি। আমার কাজ শেষ হতে বেশিক্ষণ লাগবে না। তুমি কি একটু অপেক্ষা করবে, ম্যাম?

রোজালিনার চোখে এবার খুশির দ্যুতি দেখা গেল, ঘুরে দাঁড়িয়ে চপল পায়ে চলে গেল আগের জায়গায়। কপট, মিথ্যুক। বিড়বিড় করে বলল বসার সময়।

কুঠার তুলে নিল জেমস, কোপ বসাল গাছেল গুড়িতে। অদ্ভুত একটা মেয়ে!

মার্শালের সাথে তোমার বাধন কি নিয়ে?

আমাকে পছন্দ হয়নি ওর।

হেনরী ক্রুশার?

সে-ও তাই।

তোমাকে পছন্দ হয়নি, এ জন্যে নিশ্চই মারামারি করেনি?

না। ওরা চেয়েছিল।

কেউ মার খেতে চায় নাকি?

শুরুর আগে কেউ কি বলতে পারে শেষপর্যন্ত কে মার খাবে? ওদের হিসাবে ভুল হয়েছিল। তবে স্যাভেজ বোধহয় আমাকে মেরেই ফেলত, তোমরা বাধ না দিলে ঠিক ঠিক এতক্ষণে বুটহিলে শুয়ে থাকতাম।

তোমার সাবধানে থাকা উচিত, মি, আলেন, উদ্বেগ প্রকাশ পেল মেয়েটার শোধ কণ্ঠে। পরেরবার হয়তো হাত বেঁধেই ক্ষান্ত হবে না। ওই জোড়াটাকে আমার খুব ভয়ঙ্কর মনে হয়।

ধন্যবাদ, ম্যাম। সাবধানে থাকব আমি।

তোমাকে ওরা পেল কি করে?

লেসলি উইলিয়ামসের সাথে কিছুক্ষণ ছিলাম আমি। বাইরে অপেক্ষা করছিল ওরা। পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে এসেছি, এগোতে ওদের খপ্পরে পড়তে হলো। নেবুরকে আমি দেখতেই পাইনি।

ওরা কি ক্রুশারকে পেটানোর জন্যে তোমার বিরুদ্ধে চার্জ এনেছিল?

না। দোষটা ক্রুশারেরই, কেভিন লপারসহ অন্তত বিশজন লোক ঘটনাটার সাক্ষী। আমাকে ফাসাতে চেয়েছিল স্যাভেজ, কিন্তু প্রমাণ করতে পারেনি। ব্যর্থতাই হয়তো ওর এত আক্রোশের কারণ।

লোকটার অহঙ্কার এখন হুমকির মুখে, ওই রাতের কথা সে কখনও ভুলবে না। তোমার বোধহয় ওকে এড়িয়ে চলা উচিত।

সায় জানাল জেমস। মনোযোগ দিল কাজে। এ মেয়ে মার্কের মতই, আনমনে ভাবল ও, একটার পর একটা প্রশ্ন করে যাচ্ছে। খুব বেশি কৌতূহলী।

কাঠ ফাড়া শেষ। ওয়াগন নিয়ে এসে তাতে চেলা করা কাঠ ভরতে শুরু করল ও! শেষে খচ্চরদুটোকে ওয়াগনে জুড়ল।

গ্রুলায় চাপল রোজালিনা।

হেনরী ক্রুশারকে মোটেও খারাপ মনে হয়নি আমার, অনেকক্ষণ পর নীরবতা ভাঙল জেমস। শিক্ষিত, সুদর্শন এবং প্রচুর টাকার মালিক। ওকে বিয়ে না করে বোধহয় ভুল করছ তুমি। সারা শহরের লোকজন তোমাদের জুটিটাকে সেরা মনে করে।

আমি তোমার কাছে পরামর্শ চেয়েছি? ঠাণ্ডা সুরে বলল মেয়েটা।

না, ম্যাম। আমি দুঃখিত।

একবার ভেবে দেখেছ কার জন্যে সুপারিশ করছ? দুদিন আগে ওর নাক ভেঙে দিয়েছ, আর আজ…তুমি সত্যি মজার লোক, মি. অ্যালেন! শত্রু সম্পর্কে একজন পুরুষকে সুপারিশ করতে এই প্রথম দেখলাম।

ওর পেটে প্রচুর হুইস্কি ছিল তখন, মাথার ঠিক ছিল না

আবারও! তুমি ওর কে হও, বাপু? এবার হেসে উঠল রোজালিনা। যদ্র শুনেছি তোমাদের প্রথম দেখায় সে তোমাকে বাজে ভবঘুরে বলে অপমান করেছিল।

তবু লপারের চেয়ে ভাল লোক সে। তোমার ব্যাপারে ওর আবেগটা খাঁটি।

সেটা আমি বুঝব। দয়া করে চুপ করো।

পৌঁছে গেছে ওরা। মার্ক প্রাইস আর ওর মা-কে পোর্চে দেখা গেল। ছুটে এল ছেলেটা। আমি তোমাকে সাহায্য করতে পারি, সাহসী কণ্ঠে প্রস্তাব দিল জেমসকে।

না। তোমার হাত ছিলে যাবে, নামার সময় বলল জেমস, আড়চোখে তাকাল মিসেস প্রাইসের গম্ভীর মুখের দিকে। অস্বাভাবিক রকমের শীতল মনে হচ্ছে মহিলাকে। অথচ বরাবর কাজ শেষে ফিরে এলে উষ্ণ অভ্যর্থনা পায় ও।

পারব আমি! চাপা জেদ প্রকাশ পেল মার্কের কণ্ঠে, এগোল ওয়াগনের দিকে।

ফের লরা প্রাইসের দিকে তাকাল জেমস। মহিলার চোখে সম্মতি দেখে শ্রাগ করল। খচ্চরগুলোকে ছাড়িয়ে করালে নিয়ে গেল ও। ফিরে এসে কাঠ নামানো শুরু করল।

বাড়ির রান্নাঘরে তখন মহিলা দুজন।

তোমার ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারছি না, রোজ, চাপা স্বরে বলল মিসেস প্রাইস। ওর কাছে গেলে কেন?

এমনিতেই। কৌতূহল হচ্ছিল।

ওর মত একজন সম্পর্কে কৌতূহলী হওয়া কি ঠিক হবে? শেষে হয়তো আগ্রহী হয়ে উঠবে তুমি, সুযোগটা সে-ও ছাড়বে না। ভুল করার আগেই ভেবে দেখা উচিত।

মজার ব্যাপার কি জানো, ও ক্রুশার সম্পর্কে সুপারিশ করছিল।

ক্ষীণ হাসল লরা প্রাইস। হতে পারে এটা ওর অতি চালাকি, নয়তো সত্যি তাই বিশ্বাস করে সে। বোঝার উপায় নেই কোটা ঠিক। লোকটার থই পাওয়া কঠিন।

দেখা যাচ্ছে তুমিও ওর সম্পর্কে কৌতূহলী, ম্যাম।

স্বীকার করছি। সে এমন একজন লোক চারপাশের মানুষ যার অস্তিত্বটুকু সবসময়ই অনুভব করবে। কঠিন একজন মানুষ, দেখলেই বোঝা যায় কিন্তু কচিবোধ আছে। পারিবারিক পরিবেশে একটু আড়ষ্ট, অথচ নিশ্চিন্তে নির্ভর করা যায়। নিক পরিশ্রমী, কিন্তু দেখো ও যা কখনও করতে পারেনি এ কদিনে তাই করে ফেলেছে অ্যালেন। একেবারে বদলে দিয়েছে সবকিছু। আর মার্ক তো ওকে ছাড়া কিছু বোঝেই না, বাপের চেয়ে ওর কথায় গুরুত্ব দেয় বেশি।

হেসে ফেলল রোজালিনা। আমার চেয়ে তোমাকেই বেশি আগ্রহী মনে হচ্ছে, ওকে বোঝার চেষ্টা করছ তুমি!

সে এখানে থাকতে আসেনি, রোজ, এটুকু নিশ্চিত বুঝেছি আমি। হঠাৎ করে কিছু না বলে হয়তো চলে যাবে। এখানে কেন এসেছে বা পড়ে আছে তা-ই আমাকে বেশি ভাবাচ্ছে।

কিন্তু তোমাদের কাজ ঠিকই সামলাচ্ছে।

সেটা ঠিক, ট্রে-তে কফির মগ নামিয়ে রাখল লরা প্রাইস, একটা থালায় কিছু বিস্কুট সাজাল এরপর। আমিও ওর সাথে একমত, ক্রুশারের সাথেই তোমাকে ভাল মানাবে।

একই উত্তর তাহলে তোমাকেও দিতে হয়-ওটা আমার ব্যাপার।

অফিস রূমে চলল, ট্রে হাতে নিয়ে এগোল মহিলা। অনুসরণ করল রোজালিনা। টেবিলে ট্রে নামিয়ে রেখে পোর্চে চলে গেল লরা প্রাইস, গলা চড়িয়ে অ্যালেনকে ডাকল।

করালের ভেতর থেকে সাড়া দিল সে, খচ্চরগুলোর পরিচর‍্যা করছে বোধহয়। মার্কসহ একটু পর দরজায় দেখা গেল তাকে। নিক কোথায়, ম্যাম? একটা চেয়ার টেনে বসে জানতে চাইল জেমস।

নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ইদানীং সেলুনে যাওয়াটা নিয়মিত হয়ে পড়েছে ওর। দুপুরের পর ওকে দিয়ে আর একটা কাজও করানো যায় না। আমার ভয় হয় কবে স্যাভেজের পাল্লায় পড়ে ও। উদ্বেগ প্রকাশ পেল মহিলার কণ্ঠে।

কফি শেষ করে বেরিয়ে গেল জেমস। শেডের দিক থেকে হাতুড়ি পেটানোর শব্দ ভেসে এল একটু পর। উঠে দাঁড়াল রোজালিনা, বিদায় নিল লরা প্রাইসের কাছ থেকে। বেরিয়ে এসে এগোল শেডের দিকে। দূর থেকে দেখতে পেল কিছু একটার ওপর হাতুড়ি পেটাচ্ছে জেমস অ্যালেন। ওর পাশে মগ্ন হয়ে তা দেখছে মার্ক।

কাছে গিয়ে দেখল লম্বা একটা কাঠ কেটে-হেঁটে কি যেন করছে ওরা, পুরোমাত্রায় মনোযোগী মার্ক। রোজালিনা ওর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে সেটাও টের পায়নি।

তোমাকে এগিয়ে দেয়া উচিত, হাতের কাজ থামিয়ে উঠে দাঁড়াল জেমস, মার্কের দিকে ফিরল। কাজটা আমরা পরে শেষ করব, মার্ক।

বাধ্য ছেলের মত মাথা ঝাঁকাল সে যদিও কিছুটা অসন্তুষ্ট দেখাচ্ছে।

একাই যেতে পারব, মাত্র তো কয়েক গজ পথ।

আমি কিন্তু বলিনি যে একা যেতে পারবে না তুমি।

ক্ষণিকের জন্যে তাকিয়ে থাকল রোজালিনা, তারপর মৃদু হাসল। একজন সঙ্গী হলে অবশ্য মন্দ হয় না। তোমার ওপর বোধহয় নির্ভর করা যায়।

হাতুড়ি, করাত রেখে প্যান্টের পেছনে হাত মুছল জেমস, বেরিয়ে এসে অপেক্ষায় থাকল মেয়েটির জন্যে। মার্ককে আদর করে শেড ছেড়ে বেরিয়ে এল রোজালিনা।

এগোল ওরা।

মি. অ্যালেন?

ফিরে তাকাল সে।

এখানে আসার আগে ছিলে কোথায়?

আমি আসলে ভবঘুরে মানুষ, তবে বেশিরভাগ সময় অ্যাবিলিনে ছিলাম।

সে তো অনেক দূর। ঘুরতে ঘুরতে চলে এসেছ?

আসাটা হঠাৎ হয়ে গেছে।

তুমি কেন এসেছ এখানে, বলবে?

প্রশ্নটা থমকে দিল জেমসকে। এ ধরনের প্রশ্ন সরাসরি করে না কেউ, কোন মহিলা তো নয়ই। হঠাৎ চলে এসেছি।

মিথ্যুক!

অবাক হয়ে রোজালিনার দিকে তাকিয়ে থাকল জেমস। মেয়েটাকে আত্মবিশ্বাসী দেখাচ্ছে। ও মিথ্যে বলেছে কি করে এত নিশ্চিত হয় মেক্সিকান গোলাপ?

আমার যখন দশ কি এগারো বছর বয়েস, এ শহরে এসেছিলাম আমরা। তারপর অনেক মানুষ দেখেছি, বিচিত্র একেকজন। বেশিরভাগই ভবঘুরে নয়তো ফেরারী। কিছুটা হলেও তাদেরকে চিনতে শিখেছি। আমি জানি তুমি ফেরারী বা ভবঘুরে নও। তোমার মধ্যে গোছানো একটা ভাব আছে যা ওদের মধ্যে থাকে না। এখানকার কেউকেটাদের কাউকে পরোয়া করছ না, অথচ ফেরারী হলে ওদের সমঝে চলার কথা তোমার। এ থেকে একটা জিনিসই বোঝা যায়-নির্দিষ্ট একটা উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছ তুমি এবং হয়তো স্যাভেজরাই তোমার লক্ষ্য।

তুমি আমাকে বিস্মিত করছ, ম্যাম।

এটা খুব সহজ ব্যাপার যদি একটু খোজ-খবর রাখা যায়।

এত খবর জানলে কি করে?

প্রাইসদের কাছ থেকে। তুমি আসার পর ওখানে দুদিন গিয়েছি আমি, আর মার্কের সাথে তো রোজই দেখা হয়। ওদের বাড়িটা বদলে দিয়েছ তুমি। লরা তোমার ওপর খুব সন্তুষ্ট। আর মার্কের কাছে তো তুমি ওর আদর্শ পুরুষ, ও স্বপ্ন দেখছে তোমার মত হবে…।

চুপ করে থাকল জেমস, রোজালিনার কথাগুলো ভাবছে।

একটা উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছ তুমি, তাই না? ঘুরিয়ে ফের একই প্রশ্ন করল রোজালিনা।

কিছু না বলে ক্ষীণ হাসল জেমস। মূল রাস্তায় চলে এসেছে ওরা। ধুলোমাখা রাস্তা ধরে এগোচ্ছে। কৌতূহলী লোকের দৃষ্টি উপচে পড়ছে ওদের ওপর। কারণটা একেবারে সহজ-ওর মত ঠিকানাবিহীন কাউকে রোজালিনা বার্থেজের সাথে আশা করে না এরা। রোজালিনা মেক্সিকান হলেও এমন এক মেয়ে, যাকে সত্যিকার ভদ্রমহিলা মনে হয়-বনেদী আচরণ আর অতুলনীয় সৌন্দর্য ওকে আর দশটি সাধারণ মেয়ে থেকে আলাদা করেছে, এবং পুরুষের কাছে যে কোন অর্থেই কাক্ষিত। এ মেয়ের পাশে কেভিন লপার বা হেনরী ক্রুশারকেই ভাল মানাবে, ওর আর স্যাভেজ বা নেবরের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই।

এড়িয়ে যাচ্ছ তুমি, অভিযোগ করল মেয়েটা।

মাথা নাড়ল জেমস, গম্ভীর দেখাচ্ছে ওকে। ওপাশে কামারের দোকানের সামনে দেখতে পেয়েছে রেনে নেবরকে। পোর্চের খুটির সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আয়েশ করে, শীর্ণ দেহটাকে দেখাচ্ছে আরেকটা খুঁটির মত। মরা জানোয়ারের মত অভিব্যক্তিহীন চোখজোড়া স্থির হয়ে আছে জেমসের ওপর। পকেট থেকে দুমড়ানো একটা সিগার বের করে ঠোঁটে ঝোলাল। নোংরা মলিন বেল্টের চামড়ায় কাঠি ঘষে আগুন জ্বালাল, সেটা এত জোরে যে বিশ গজ দূর থেকে তা শুনতে পেল জেমস। একমুখ ধোয়া ছাড়ল সে, পায়ের ভর বদল করল। তারপর চোখ ফেরাল রোজালিনার দিকে। আঙুল তুলে হ্যাটের কিনারা ছুঁয়ে নড করল, কিন্তু লোকটার দৃষ্টিতে নগ্ন লোভ দেখতে পেল জেমস। অবাধ স্বাধীনতা দিয়েছে চোখদুটোকে। না তাকিয়েও বুঝতে পারল অস্বস্তি বোধ করছে মেয়েটা, উধাও হয়ে গেছে সারাক্ষণের সপ্রতিভ ভাবটুক।

দ্রুত চলা শুরু করল রোজালিনা, জেমসকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে। কয়েক পা এগিয়ে থেমে পাশ ফিরতে দেখল পোর্চ থেকে নেমে এসেছে ডেপুটি, ওদের দিকেই আসছে। রক্ত সরে গেল ওর মুখ থেকে, জেমস পাশে আসতে অজান্তেই তার শার্ট খামচে ধরল, তারপর তাল মেলাল জেমসের সাথে। মি. অ্যালেন, কথা যোগাচ্ছে না ওর মুখে। ও আসছে…আমাদের পিছু নিয়েছে। চাপা স্বরে বললেও ওর কণ্ঠে ভয় ঠিকই প্রকাশ পেল।

এগোও, ম্যাম, পাত্তা দিয়ো না। নেবর যদি টের পায় তুমি ভয় পাচ্ছ, আরও আগ্রাসী হয়ে উঠবে ও।

দ্রুত এগোতে চাইছে রোজালিনা, কিন্তু ধীরে একই গতিতে এগোেল জেমস।

ত্রিশ গজ এগিয়ে ক্যাফের পোর্চে উঠে আসতে ধৈর্য হারিয়ে ফেলল মেয়েটা। প্রায় ছুটে ঢুকে পড়ল ভেতরে, ফিরেও এল সাথে সাথে। দরজায় দাঁড়িয়ে এক নজর দেখল রেনে নেবরকে। তারপর অস্থির দৃষ্টি স্থির হলো জেমসের ওপর। ভেতরে এসো, মি. অ্যালেন, অনুরোধ ঝরে পড়ল ওর কণ্ঠে। কফি খেয়ে যাবে।

ঘামছে রোজালিনা, ভয়টা কাটেনি। কারণটা ঠিক ধরতে পারছে না জেমস। আনমনে মাথা ঝাঁকাল, পোর্চে উঠে এল। মেয়েটার ভয়ার্ত দৃষ্টি বলে দিচ্ছে এদিকেই আসছে ডেপুটি। জেমস সামনে আসতে সরে গিয়ে জায়গা দিল রোজালিনা, ঘুরে দুই সারি চেয়ার-টেবিলের মাঝখান দিয়ে দ্রুত এগোল। রান্নাঘরের দরজায় দেখা গেল মিসেস বার্থেজকে। মেয়ের মুখ, জেমসের ওপর, সবশেষে দরজা পথে বাইরে চলে গেল তার দৃষ্টি। প্রথমে উদ্বিগ্ন দেখাল তাকে, তারপর দৃঢ় সঙ্কল্পবদ্ধ হয়ে গেল মুখ, কঠিন হয়ে উঠেছে চাহনি। একটা টেবিলে হাতের ট্রে নামিয়ে রেখে দরজার দিকে এগোল মহিলা।

ওকে আসতে দাও, ম্যাম, চেয়ার টেনে বসার সময় মৃদু স্বরে বলল জেমস। দেখা যাক কি বলার আছে ওর।

থেমে জেমসকে দেখল মহিলা, কি যেন বলতে চেয়েও সংবরণ করে নিল। তারপর মাথা ঝাঁকাল, টেবিলে রাখা ট্রে-র দিকে এগোল। দুটো টেবিলে তিনজন খদ্দের আছে, তাদের মনোযোগ বাইরে পোর্চে উঠে আসা রেনে নেবরের ওপর।

দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল সে, নিপ্রাণ চোখ তুলে সারা কাফের ওপর নজর বুলাল। হ্যাট খুলে মাথা নুইয়ে নড করল মারিয়া বার্থেজকে।

কফি খাবে নাকি, মার্শাল? উদার কণ্ঠে আহ্বান করল জেমস। বসে পড়ো তাহলে।

ঘুরে তাকাল ডেপুটি, স্থির দৃষ্টিতে দেখল ওকে। মুখ ভাবলেশহীন, ভেতরে কি ভাবনা চলছে বোঝার উপায় নেই। জেমসের ওপর থেকে চোখ সরিয়ে সবার ওপর ঘুরে গেল তার দৃষ্টি, স্থির হলো ওপরে ওঠার সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে থাকা রোজালিনার ওপর। ক্ষীণ হাসল সে, কিন্তু আন্তরিক না হওয়ায় সেটা বিদঘুটে দেখাল।

নিশ্চিন্তে বসে পড়ো, সোৎসাহে বলল জেমস। আমিই বিল দেব।

দৃঢ় পায়ে এগিয়ে এল দো-আঁশলা। সামনে এসে উল্টোদিকের চেয়ারে বসল, জেমসের ওপর থেকে এক মুহূর্তের জন্যেও দৃষ্টি সরায়নি। আমার সাথে তামাশা কোরো না, অ্যালেন, শীতল হিংস্র কণ্ঠে বলল সে। আমি হেনরী ক্রুশার নই!

তুমি বলছ ওটা তাহলে তামাশা ছিল? হেসে বলল জেমস।

তো কি! ওকে উস্কে দিয়েছ তুমি। হেনরী ক্রুশার জীবনে কখনও মারামারি করেনি অথচ তাকে বাধ্য করেছ। সবার সামনে ওকে হেনস্তা করার চেষ্টা করেছ।

জেমসের হাসি বিস্তৃত হলো। তুমি বোধহয় ঘুমাচ্ছিলে তখন-স্যাভেজ যখন। ঘরভর্তি লোকের সামনে প্রমাণ করল যে মারামারির খায়েশ তোমাদের ব্যাংকারেরই হয়েছিল? নাকি স্যাভেজের সাথে একমত নও তুমি? আমার ভয় হচ্ছে একটু পরে হয়তো বলবে আমিই ক্রুশারকে অত হুইস্কি গিলিয়েছি।

টেবিলে থাবা মারল নেবর। চালিয়াতি ছাড়ো, অ্যালেন! তোমার তামাশা উপভোগ করতে আসিনি আমি।

এখন রাত নয়, তোমার হাতেও পিস্তল নেই। ভাবলাম বোধহয় তাই করতে এসেছ।

টাফ লোক, না? রেনে নেবরের ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি, জেমসের সূক্ষ্ম ভৎসনায় আমল দিল না। মেয়েছেলের সামনে এমন সবাই দেখাতে পারে। পিস্তল হাতে সামনে দাঁড়ালে তো পেচ্ছাব করে দেবে।

হয়তো, নেবর, চাপা স্বরে বলল জেমস, ঝুঁকে এসেছে। কে জানে হয়তো তুমিই তা করবে। আমার তো ধারণা বুকের চেয়ে কারও পিঠই তোমার পছন্দ।

ডেপুটির মুখ যেন পাথরে গড়া, ভাবান্তর হলো না। আমি তোমাকে খুন করব, অ্যালেন, খোদার কসম! ফিসফিস করে ঘোষণা করল।

দয়া করে দিনের বেলায় এসো।

তোমার মত বহু লোক দেখেছি, অ্যালেন। ওদের জন্যে আফসোস হয়। নিজের ওপর খুব বেশি ভরসা কোরো না, টেরই পাবে না কখন বুটহিলে ঠাই পেলে!

ধন্যবাদ। কফি নিয়ে এল মারিয়া বার্থেজ, মগ দুটো নামিয়ে রেখে দ্রুত কেটে পড়ল।

মার্শাল, কফিতে চুমুক দেয়ার সময় আলাপী সুরে বলল জেমস। দয়া করে। এদের কাছ থেকে দূরে সরে থেকো। ভুলেও এদের ক্ষতি করার চিন্তা কোরো না। তাহলে তোমাকে ছাড়ব না আমি। তোমার ওই তারাটা আমাকে আটকাতে পারবে না, ওসব টিনের টুকরোকে আমি পরোয়া করি না।

নিপ্রাণ চোখজোড়া সজীব দেখাল-কৌতুক আর অবজ্ঞা সেখানে। যদি করি? উস্কানি নেবরের গলায়।

চব্বিশ ঘণ্টা পেরোনোর আগেই খুন করব তোমাকে।

আরিব্বাপস! তুমি আইনের লোককে হুমকি দিচ্ছ, অ্যালেন! তো?

শোনো, অ্যালেন। ও তো একটা মেক্সিকান মেয়ে মাত্র। যে কেউ চাইলেই ওকে পেতে পারে। দেখছ না লপার, ক্রশার, স্যাভেজ সবাই ওকে পেতে চায়। তুমিও ব্যতিক্রম নও। তাহলে আমার দোষটা কোথায়?

মেয়েটা যদি চায় তো ওকে পাবে তুমি।

একটা মেক্স মেয়ের আবার চাওয়ার দাম কি!

আছে, নেবর। এবার অন্তত অনুমতি নিয়েই তোমাকে কোন মেয়ে…ওর কাছে যেতে হবে।

এবার? সন্দিগ্ধ দেখাল ডেপুটিকে।

বোঝা যাচ্ছে পুরানো পাপী তুমি, ব্যাখ্যা দিল জেমস। এবং এ ব্যাপারে ওস্তাদ লোক। দুএকটা দড়ি নিয়ে কখনও কেউ কি তোমার পিছু নেয়নি?

কি বলতে চাও? উত্তেজিত দেখাল নেবরকে। চোখ ছোট করে তাকিয়ে আছে।

তেমন কিছু না, কফিতে চুমুক দিল জেমস, অমায়িক হাসল। বলছিলাম তোমার যা স্বভাব দুএকজন মেয়ের বাবা কিংবা মহিলার স্বামী হয়তো খুঁজে বেড়াচ্ছে তোমাকে, নাগালে পেলে ঝুলিয়ে দেবে কোন একটা গাছে। আছে নাকি কেউ?

ডেপুটির চোখে সন্দেহ, বোঝার চেষ্টা করছে কথাগুলোর পেছনে আলাদা কোন অর্থ আছে কি-না। মনে হচ্ছে আরও কিছু জানো তুমি, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল, কিন্তু হতাশ হতে হলো তাকে। মিটিমিটি হাসছু জেমস, আগ্রহভরে তাকিয়ে আছে। খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসছ তুমি, অ্যালেন! ঠাণ্ডা সুরে বলল সে, খরখরে শোনাল গলা। আমিও তাই চাই। মনে হচ্ছে হেলাফেলা করার মত লোক নও তুমি। রিক তো পাত্তা দেয়নি, এখন সারাক্ষণ তোমার কথাই ভাবছে।

ওকে বললা পুরোপুরি সেরে ওঠার আগে যেন আমার সামনে না আসে। সেদিন রাতের ব্যাপারটা মোটেও ভুলে যাইনি।

কফিতে চুমুক দিল ডেপুটি, আড়চোখে একবার তাকাল কোণের টেবিলে বসে থাকা লোক দুজনের দিকে। তারপর ঝুঁকে এল ওর দিকে। আমার ধারণা, জেমস অ্যালেন, তোমার এ নামটা ভুয়া। অন্য কোথাও দেখেছি তোমাকে, এটা নিশ্চিত…রসো, মনে পড়ে যাবে। আচ্ছা, লিভারি সিটিতে ছিলে তুমি, কিংবা অরিগনে?

তোমার লাইনে আমাকে খুঁজে পাবে না।

বড় বেশি তড়পাচ্ছ, অ্যালেন। স্যাভেজ সুস্থ হয়ে নিক, তারপর টাইট দেব তোমাকে।

কিন্তু এদের কাছ থেকে দূরে থেকো। ওরা মেক্সিকান হতে পারে; কিন্তু ওদের অসম্মান শহরের লোকেরা মুখ বুজে সহ্য করবে না। লপার বা ক্রুশারও করবে না।

হাহ, মেক্সদের জন্যে খুব দরদ দেখাচ্ছ! ওরা তোমার কে?

কেউ না, নেবর, ডেপুটির চোখে চোখ রাখল জেমস। কিন্তু ওরা তোমাকেআমাকে একসূত্রে গেঁথে দিয়েছে। ওদের সাথে বেচাল করলেই তোমাকে চেপে ধরার একটা সুযোগ পেয়ে যাব আমি। সুতরাং বুঝতেই পারছ ওরা হচ্ছে তোমার জন্যে টোপ। যদি মনে করো হজম করতে পারবে তো গিলতে পারো, নয়তো এখুনি সে-আশা উগরে ফেলল। সবাই আপসে সবকিছু পায় না, জোর করে চড়া মূল্যের বিনিময়ে ওকে পাওয়া তোমার জন্যে বোকামি হবে।

হুমকি দিচ্ছ?

যা ইচ্ছে ভাবতে পারো। আমার কথার নড়চড় হবে না।

তোমার কথার নিকুচি করি! চড়া গলায় বলে উঠল নেবর, ধৈর্য হারিয়েছে। তোমাকে দেখে নেব, অ্যালেন। ওই মেয়েটাকেও ছাড়ব না!

ধীরে বন্ধু, কফিটা শেষ করো। একটা সিগার টেনে মাথা ঠাণ্ডা করো। প্রস্তাবটা আমি মন্দ দেইনি। তাতে তোমার পিঠ বাঁচবে।

উঠে দাঁড়াল ডেপুটি, বুক টান টান। মুখে স্বাভাবিক হাসি দেখা গেল এবার। যেভাবে আর যে জন্যেই এখানে এসে থাকো, অ্যালেন, বাতেই হচ্ছে তোমার কপাল মন্দ। আমাদের ইচ্ছে ছাড়া লিয়ন সিটি থেকে বেরিয়ে যেতে পারবে না। এখানে আইন বলতে স্যাভেজ আর আমাকেই বোঝায়, সুতরাং তোমারই উচিত আমাদের সমঝে চলা। জানো তো এ শহরে কোন কোট বা জাজ নেই? বিচারের কাজটাও তাই আমরা করি। একবার বাগে পেলে কেউ তোমাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারবে না। মনে রেখো তোমার মত লোক লিয়ন সিটিতে কেবল ঢুকতেই পারে, বেরিয়ে যেতে পারে না।

দেখা যাবে, নেবর।

ববের সেলুনে বসবে লপার। ইচ্ছে হলে আসতে পারো। উত্তরের অপেক্ষা করে ঘুরে দাঁড়িয়ে দরজার দিকে হাঁটতে শুরু করল সে। বেরিয়ে যাওয়ার সময় সশব্দে বন্ধ করল দরজাটা।

জেমসের টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল রোজালিনা বার্থেজ। শুকনো মুখ, অস্থির ভয়ার্ত দৃষ্টি ওর গভীর কালো চোখে। আমি ভেবেছিলাম তোমরা হয়তো ডুয়েল লড়বে…যা ভয়ঙ্কর লোক! স্যাভেজকেও এতটা ভয় লাগে না আমার।

কয়োটের মত নীচ, সুযোগসন্ধানী ওরা দুজনেই। কিন্তু কেভিন লপারকেও তোমার ভয় করা উচিত, ম্যাম।

কেন?

স্যাভেজ বা নেবরের চেয়ে ভিন্ন কিছু নয় সে, কেবল ভদ্রলোকের একটা মুখোশ ওকে আলাদা করে রেখেছে।

একটা চেয়ারে বসে পড়ল রোজালিনা। চোখে কৌতূহল। মনে হচ্ছে আগে থেকে চেনো ওদের?

কিছুটা।

তারমানে…হয়তো ওদের খোঁজেই এসেছ! ফিসফিস করে বলছে মেয়েটা, উত্তেজনায় উজ্জ্বল দেখাচ্ছে সুন্দর মুখ। হ্যাঁ, ঠিক এটাই হবে। লরা প্রাইসও এরকম সন্দেহ করছিল। তুমি কে, মি. অ্যালেন?

ওটাই আমার পরিচয়, ম্যাম।

কিন্তু লুকিয়ে রাখার মত অনেক কিছু আছে তোমার, স্পষ্ট বুঝতে পারছি। অস্বীকার কোরো না। কোনটা ভান আর কোনটা আসল এটুকু বোঝার বয়স আমার হয়েছে।

মানতে পারলাম না। তুমি হেনরী ক্রুশারের আবেগটা ধরতে পারোনি।

কে বলল পারিনি? নইলে তাকে না করতাম?

সিগারেট রোল করছিল জেমস, চুপ করে থাকল। চোখ তুলে দেখল অপেক্ষা করছে মেয়েটা, দৃষ্টিতে অফুরন্ত আগ্রহ। তোমার না জানাই ভাল, ম্যাম, সিগারেট ধরানোর সময় বলল ও। আমি দুঃখিত।

অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল রোজালিনা, ঠিক বুঝতে পারছে না কেন এ লোকটির ওপর বিন্দুমাত্র প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। সচরাচর দেখে এসেছে ওকে খুশি করার জন্যে মুখিয়ে থাকে পুরুষরা, কিছু জানতে চাইলে বাড়তি দুএকটা কথা বলবেই। অথচ ওর সৌন্দর্য বা আন্তরিক উপস্থিতি তাকে মোটেই স্পর্শ করছে না।

তুমি মেক্সিকানদের ঘৃণা করো?

না, ম্যাম, মোটেই তা নয়।

তাহলে কোন মেয়েকে ভালবাসো, তাই না?

হেসে ফেলল জেমস। রোজালিনার আরক্ত এবং বিব্রত মুখের দিকে তাকাল, খানিকটা অসহায়ও দেখাচ্ছে মেয়েটাকে, কারণটা জানে ও। সহজ একটা হিসাব করেছে মেয়েটি, ওকে প্রভাবিত করতে না পারার কারণ হিসেবে আরেকটি মেয়েকে দায়ী করেছে। আনমনে মাথা ঝাঁকিয়ে উঠে দাড়াল জেমস। পকেট থেকে খুচরো পয়সা বের করে রাখল টেবিলে। এগোতেই সামনে দেখতে পেল মিসেস বার্থেজকে। দুজনের মধ্যে কি ঘটেছে নীরবে বোঝার প্রয়াস পেল মহিলা। কিন্তু তাকে সময় দিল না জেমস, নড করে দ্রুত ক্যাফে থেকে বেরিয়ে গেল।

বাইরে এসে পোর্চে দাড়াল ও। সন্ধ্যার অন্ধকার জাকিয়ে বসেনি এখনও। বাড়িগুলোয় আলো জ্বলতে শুরু করেছে, রাস্তায় লোকজন কম। কাছের সেলুন থেকে হৈ-হল্লা আর নিচু লয়ের তাল ভেসে আসছে।

রেনে নেবরকে খানিকটা নাড়া দিয়েছে সে, এবার চিন্তায় পড়ে যাবে ওরা। জেমসের অতীত নিয়ে খোচানো শুরু করবে। শুরুটা মন্দ নয়, ভাবছে জেমস, আরেকটা ধাক্কা দেবে একটু পর। প্রতিক্রিয়াটা কেমন হবে আগে থেকে বোঝার উপায় নেই। হয়তো নেবরের মতই মুখিয়ে উঠবে কেভিন লপার, সুযোগের অপেক্ষায় থাকবে। কিংবা পাগলা কুত্তা হয়ে যাবে। জেমস ওটাই চায়। নিজেদের সীমানা ছেড়ে বেরিয়ে আসুক ওরা, তাহলে ওরই সুবিধে।

রাতের খাওয়া সেরে নেয়া যাক, তাছাড়া মার্কের খেলনাটাও শেষ করতে হবে। তারপর কেভিন লপারের সাথে খোশগল্প করা যাবে, সিদ্ধান্ত নিল ও। বুটের তলায় আধ-খাওয়া সিগারেট পিষে পোর্চ থেকে নেমে এল। ফুটপাথ ধরে এগোল। গলি, বাড়িগুলোর কোণায় তীক্ষ্ণ নজর রাখছে, কে বলতে পারে এর যে কোন একটা জায়গায় ওর জন্যে অপেক্ষা করে নেই কেউ?

সাপার সেরে মার্কের জন্যে খেলনা তৈরি করল জেমস। রবার্ট হার্ডিংয়ের সেলুনের উদ্দেশে যখন রওনা দিল ততক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েছে প্রাইসরা, অন্তত বাতি নিভিয়ে দিয়েছে। গলি ধরে নির্বিঘ্নে চলে এল ও।

সেলুনটা জমজমাট। একটা টেবিলে বসে গল্প করছিল কেভিন লপার আর লেসলি উইলিয়ামস। ওকে দেখে দূর থেকে হাত নাড়ল স্টোর মালিক, ক্ষীণ হাসল। বারের কাছে এসে হুইস্কির ফরমাশ দিল জেমস, ববের উইশের জবাবে মৃদু নড করল। বারকিপার মগভর্তি হুইস্কি দিয়ে যেতে চুমুক দিল, এই ফাঁকে সবার ওপর নজর দেয়ার কাজ সেরে ফেলেছে। বেশিরভাগ লোকই পাঞ্চার নয়তো ভবঘুরে। আগামী সপ্তাহে শুরু হতে যাওয়া রাউন্ড আপ আর খরা নিয়ে আলাপ করছে। শীত নিয়েও ভাবছে কয়েকজন। সল্ট লেক আর রকি পর্বতমালার কারণে এখানে শীতটা বেশিই পড়ে।

ওরা তোমার জন্যে অপেক্ষা করছিল, জানাল বব।

তাহলে কি এখন আর করছে না?

তা নয়। তবে ভাবছিল তুমি বোধহয় না-ও আসতে পারো। মি. লপার বলছিল ডেপুটির মাধ্যমে খবর পাঠানোয় তুমি হয়তো অন্য কিছু ভেবেছ।

অন্য কিছু কি?

হয়তো ভয় পেয়েছ।

ও তাই বলেছে নাকি?

ঠিক এরকম কিছু না বললেও ঘুরিয়ে ফিরিয়ে এটাই বোঝাতে চেয়েছে।

হুইস্কি শেষ করল জেমস, গম্ভীর দেখাচ্ছে ওকে। চিন্তা-ভাবনাগুলো গুছিয়ে নিচ্ছে মনে মনে, নিশ্চিত জানে কেভিন লপারই হবে আসল প্রতিদ্বন্দ্বী। ববের কাছ থেকে টাকার বিনিময়ে পোকার চিপস নিয়ে উদ্দিষ্ট টেবিলের দিকে এগোল। সামনে এসে দাঁড়াতে হাসল স্টোর মালিক, লেসলিকে ভাবলেশহীন দেখাচ্ছে।

আমি ভাবছিলাম ডেপুটি হওয়ার মত খেলার প্রস্তাবটাও তোমার মনে ধরেনি, হালকা সুরে বলল লপার। সিগার কেস বের করে সিগার ধরিয়ে তাকাল বারের দিকে। এক প্যাকেট নতুন তাস দাও, বব।

চেয়ার টেনে বসল জেমস। খেয়াল করল সেলুনভর্তি লোকজন কৌতূহলী হয়ে উঠেছে, উৎসাহী কয়েকজন কাছে এসে দাড়িয়েছে। বারকিপারের দেয়া নতুন তাস শাফল করল লেসলি উইলিয়ামস, কার্ড বেঁটে দেয়ার পর খেলা শুরু হলো। ঘণ্টাখানেক হিসেব করে খেলল সবাই, পরস্পরের খেলার ধরন বোঝার চেষ্টা করছে।

প্রথম থেকে আগ্রাসী ভূমিকা নিয়েছে জেমস। মাঝারি মানের কার্ড নিয়ে প্রচুর টাকা খেলল। ও চাইছে লপার যেন কিছুটা হলেও ভুল ধারণা পায়। খেলার আয়ু যত বাড়ল ওদের চারপাশে ভিড় বাড়তে থাকল। কেউই চুরি করছে না, নিশ্চিত জানে জেমস। লেসলি হারছে, ওর বেশিরভাগ টাকা এখন জেমসের ভাগে পড়েছে। পরের ঘণ্টায় অবস্থার পরিবর্তন হলো খানিকটা, লপারের কাছে ভাল তাস পড়তে শুরু করল।

জুয়াড়ী ভাবলেশহীন, হতাশা আর বিরক্তি চেপে রেখেছে। লপারকে উৎফুল্ল দেখাচ্ছে, উজ্জ্বল তার চোখজোড়া। একটার পর একটা সিগার ফুকে চলেছে, হাতের পাশে টেবিলের ওপর সিগার কেসটা। একনজর ওটা দেখল জেমস, নতুন তাস না নিয়ে দান বাড়াল। পরপর দুটো তাস নিল লপার। কিন্তু শেষপর্যন্ত খেসারৎ দিতে হলো তাকে, অল্পের জন্যে হেরে গেল লেসলির কাছে। সারাক্ষণ যা হেরেছে ওই একদানে তুলে ফেলল জুয়াড়ী।

খেলাটা উপভোগ করছে জেমস। কেভিন পার ধূর্ত ও কুশলী, তবু ফাঁদে ফেলা যাবে তাকে। লেসলি ছোটখাট একটা ধাপ্পা দিয়ে কাজটা সহজ করে দিয়েছে। পরের দানে জিতল ও, লেসলিকে একরকম বাধ্য করে টিকিয়ে রাখল অনেকক্ষণ পর্যন্ত। দুজনের হাতে বাজে তাস, লপার বসে গেছে। পরে দেখা গেল তার তাসই ওদের দুজনের চেয়ে ভাল ছিল।

এরার গম্ভীর দেখাল, কেভিন লপারকে, নড়েচড়ে বসেছে। উদাস দৃষ্টিতে তাকাল বাইরের দিকে। ঠোঁটে নতুন সিগার। একটু আগের সতর্ক ভাবটুকু উধাও হয়ে গেছে। চোখে চাপা রাগ, সেটা চেপে রাখার চেষ্টা করেও পারছে না। মনে মনে ক্ষীণ হাসল জেমস, খেলাটার মজাই এখানে প্রতিপক্ষকে বুঝতে পারলে সহজে টেক্কা দেয়া সম্ভব। হার জিনিসটা সবারই অপছন্দ, লপারও তার ব্যতিক্রম নয়।

পরের দুই দানে স্টোর মালিকের সঞ্চয় ফুরিয়ে গেল। বিতৃষ্ণার সাথে বারকিপকে ডাকল সে। দুহাজারের চিপস্ দিয়ে যাও বব। রসিদ লিখে দিচ্ছি। আর একটা বোতল।

সাদা একটা কাগজে রসিদ লিখে দিল সে। পরের দান শুরু হতে হুইস্কির গ্লাস তুলে নিল।

মুখ দেখে জেমস টের পেল ভাল তাস পেয়েছে লপার, দান বাড়াচ্ছে। প্রমাদ গুণল ও, একটা কার্ড নিয়ে দেখল। ফাকা একটা জায়গা পূরণ হয়েছে, আরেকটা দরকার। ওদিকে নিশ্চিন্তে খেলে যাচ্ছে স্টোর মালিক। একটা তাস তুলে দেখল, অসন্তুষ্ট মনে হলো তাকে।

লপারের পেছনে দাঁড়িয়েছিল এক কাউবয়, প্রচুর টেনেছে। ওর চোখ লপারের তাসের ওপর পড়তে লোকটার চোখে নিজের বিপদসঙ্কেত দেখতে পেল জেমস। আরেক দান খেলে শো করল। সেরা তাস পেয়েছে লপার। জেতা টাকা তাকে সন্তুষ্ট করতে পারল না। রাগ ফুটে উঠল চোখে।

নতুন করে তাস দেয়া হলো। পর‍্যাপ্ত টাকা নেই বলে ভাল তাস নিয়েও বসে গেল লেসলি উইলিয়ামস। একবারই বাড়তি একটা তাস নিয়েছে জেমস। দেখে টেবিলের ওপর ফেলে রাখল সেটা। মাঝে মাঝে লপারের দৃষ্টি চলে যাচ্ছে ওটার দিকে। লোভ আর জেদ পেয়ে বসেছে লোকটাকে। টাকার অঙ্ক দ্বিগুণ করল সে। ভ্রুক্ষেপ করল না জেমস, নিজের পালার সময় নিশ্চিন্তে চিপস দিয়ে গেল।

চিন্তিত দেখাচ্ছে লপারকে। সিগার কেসে হাত বাড়াল, খালি হয়ে গেছে ওটা। বব? ডাকল সে।

আমার কাছ থেকে নিতে পারো, পকেট থেকে একই রকমের একটা সিগার কেস বের করে এগিয়ে ধরল জেমস। যদি না তোমার আপত্তি থাকে।

কেভিন লপারের চোখ আটকে থাকল ওটার ওপর, শিখিল শরীর শক্ত হয়ে গেল। অজান্তে কেঁপে উঠল মুখের একটা পেশী। চোখাচোখি হতে তার চোখে একাধারে ভয় আর বিস্ময় দেখতে পেল জেমস। খানিক বাদে চোখ সরিয়ে নিল সে। হঠাৎ করে সতর্ক হয়ে গেছে স্টোর মালিক। হেলান দিল চেয়ারে, তারপর ফের দেখল জেমসকে। হাসল। ধন্যবাদ, ওতে চলবে না। এরচেয়ে কড়া জিনিস চাই।

একটু পর দেখা গেল চিপসের স্তুপ জমে গেছে টেবিলে। বসে থেকে দেখছে লেসলি, কৌতূহল শেষপর্যন্ত কে জেতে।

টাকা বাড়াচ্ছে লপার, জেদ তার পিছু নিয়েছে।

সর্বনাশ করার সময় এটাই, সিদ্ধান্ত নিল জেমস। জানে এ মুহূর্তে লপারের মনোযোগ খেলার চেয়ে ওর সিগার কেসের দিকেই বেশি, তাকে ভাবাচ্ছে ওটা। হয়তো ভাবছে কি করে জেমসের কাছে এল। ওর জন্যে মোক্ষম সুযোগ। সিগার ধরিয়ে দানের টাকা বাড়াল ও।

শেষ চিপসটাও বোর্ডে ফেলল লপার। দৃঢ় সঙ্কল্পবদ্ধ দেখাচ্ছে চোয়াল, উল্লাসে ফেটে পড়ার অপেক্ষায় আছে। আমার কাছে আর নেই, চাপা সুরে বলল সে। তুমি আপত্তি না করলে আমরা সরাসরি শো-তে যেতে পারি। না চাইলে আরও খেলে যাব, স্টোর থেকে নাহয় টাকা আনিয়ে নেয়া যাবে। মনে হচ্ছে এ দানটা আমিই…

যথেষ্ট হয়েছে ভেবে সায় জানাল জেমস।

কার্ড দেখাতে বিস্ময়ে ঝুলে পড়ল লপারের কাঁধ, দৃষ্টিতে অবিশ্বাস। নিজেকে দ্রুত সামলে নিল, ক্লিষ্ট হাসি দেখা গেল মুখে। স্বীকার করতেই হবে ধুরন্ধর লোক তুমি, অ্যালেন। আমাকে খেলতে বাধ্য করেছ। …আজকের মত যথেষ্ট হয়েছে। আমার সব টাকা তো তুমিই জিতলে।

সেলুন খালি হতে শুরু করেছে, লোকজনের মধ্যে গুঞ্জন। জেমস ভাবছে লপারের আজ রাতের ঘুম হারাম করে দিয়েছে ও। ব্যাপারটা কিভাবে নেবে সে আঁচ করা যাচ্ছে না।

উঠে দাঁড়াল লেসলি উলিয়ামস, শ্রাগ করে কিছু না বলে কেটে পড়ল। বারকিপারের কাছ থেকে একটা বোতল নিয়ে, ১ ওপাশের দরজায় গিয়ে ঘুরে দাঁড়াল, নীরবে অর্থপূর্ণ দৃষ্টি বিনিময় হলো জেমসের সাথে। সন্তুষ্ট দেখাচ্ছে। তাকে।

ওটা কোথায় পেলে, অ্যালেন? কণ্ঠের শীতল ভাব গোপন করতে ব্যর্থ হলো লপার। তোমার নিজের নয় বোধহয়?

কুড়িয়ে পেয়েছি।

নীরবে ওকে নিরীখ করল স্টোর মালিক, বোঝার চেষ্টা করছে কথাটার মধ্যে কতটুকু সত্যতা রয়েছে। একটু পর বিরক্তি দেখা গেল মুখে। দেখা যাচ্ছে আমারটার মত একটা সিগার কেস বয়ে বেড়াচ্ছ অথচ জানো না ওটা কার…

ওটা পাওয়ার পর আমি অবাকই হয়েছিলাম, হেসে তাকে থামিয়ে দিল জেমস। জিনিসটা দামী, স্বেচ্ছায় কারও ফেলে যাওয়ার কথা নয়।

শ্রাগ করল লপার। কোথায় পেলে? হালকা সুরে জানতে চাইলেও তার চোখ বলে দিচ্ছে ভেতরে ভেতরে কৌতূহলে ফেটে যাচ্ছে।

অ্যাবিলিন থেকে মাইল ত্রিশ উত্তরে একটা শহর আছে, জোনস সিটি। ওখানকার এক ক্যাম্পে। জেমস হলফ করে বলতে পারবে কেভিন লপারের মাথা খারাপ হওয়ার জো হয়েছে, এখনও নিশ্চিত হতে পারেনি সে, কিন্তু অনেকটাই আঁচ করে ফেলেছে। আরও অন্তত কয়েকটা প্রশ্ন ভিড় করেছে তার মনে,কিন্তু জিজ্ঞেস করার সুযোগ নেই; তাহলে, নিজের ওপরই সন্দেহ নিশ্চিত করা হয়ে পড়ে।

টেবিলের কিনারে চওড়া থাবা ফেলে রেখেছে লপার, অন্য হাতে সিগার, শক্ত হয়ে চেপে বসেছে আঙুলগুলো। লোকটার কপালের পাশে একটা শিরা লাফাচ্ছে। দেখা পেলে তাকে ফেরত দেবে নাকি? ধীরে আড়ষ্ট ভঙ্গিতে জানতে চাইল।

হতে পারে তাকে খুঁজেই পাব না, কিংবা কে বলতে পারে এটা নেয়ার ইচ্ছে তার হয়তো থাকবে না। উঠে দাঁড়িয়ে উইশ করল স্টোর মালিকের উদ্দেশে, সিগার কেস তুলে নিয়ে পকেটে ঢোকাল। ভাবছি তোমাকে দিয়ে যাব এটা, দুটোর একটা সেট হবে তোমার। একটা হারালেও অন্যটা দিয়ে কাজ চালিয়ে নিতে পারবে। নাম খোদাই করার ব্যাপারটাও বোধহয় সমস্যা করবে না, হেসে তার চোখে চোখ রাখল জেমস, গভীর উদ্দেশ্যপূর্ণ চাহনি। দুএকটা আঁক দিলেই তোমারটার মত হয়ে যাবে।

রাখ-ঢাকের কোন ঝামেলা রাখেনি জেমস, বুঝিয়ে দিয়েছে লপার সম্পর্কে কি ভাবছে ও। থমকে গিয়ে তাকিয়ে থাকল স্টোর মালিক, দৃষ্টিতে সন্দেহ আর আশঙ্কা। কাঁধ উচু করে হেলান দিল চেয়ারে, শিথিল হয়ে গেল শরীর। তুমি কেন ভাবছ ওটা নেব আমি?

টেবিলের সব চিপস্ দুহাতে তুলে নিয়ে হাঁটতে শুরু করেও থেমে ফিরে তাকাল জেমস। দেখো, লপার, আমি হচ্ছি বাউণ্ডুলে টাইপের লোক। পকেট খালি রেখে নোংরা কাপড় পরে ওরকম দামী একটা জিনিস বয়ে বেড়ানো আমাকে মানায় না। তোমার বা হেনরী ক্রুশারের মত সম্মানিত কারও হাতেই ওটা মানায়। ক্রুশার তো ধূমপান করে না, তাই তুমিই আমার একমাত্র পছন্দ।

টেবিলে রাখা গ্লাস তুলে নিয়ে চুমুক দিল লপার, হাসল, কিন্তু সেটা চোখ স্পর্শ করল না। সতর্ক ভাবটা ফিরে এসেছে তার মধ্যে। হাত নাড়ল ওর উদ্দেশে। সাবধানে যেয়ো, বন্ধু। তোমার পকেটে এখন অনেক টাকা।

বারে এসে ববের সাথে কিছুক্ষণ কথা বলল জেমস। পুরো টাকাই তার কাছে জমা রাখল ও, রসিদ লিখে দিল বারকিপ। বেরোনোর সময় দেখল এখনও বসে আছে স্টোর মালিক। ভাবছে কি যেন। বাইরে চলে এল ও। পুরো শহরটা ঘুমোচ্ছে। চাদের আলোয় চোখে পড়ছে সবকিছু। নিশ্চিন্তে উত্তরে এগোল।

কেভিন লপার আজ ঠিকমত ঘুমাতে পারবে না, তার বুকের ভেতর একটা কাটা ঢুকিয়ে দিয়ে এসেছে ও। নিশ্চিত হয়ে গেছে লোকটা। আসল খেলা শুরু হবে এবার। ওকে মেরে ফেলার মওকা খুঁজবে। খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসবে সব কজন।

রাখ-ঢাকের কোন ব্যাপার ওর কখনোই পছন্দ হয় না। সেলুনে ইচ্ছে হচ্ছিল লপারের মুখের ওপর বলে দেয় সত্যটা। কিন্তু তাতে মজাটা নষ্ট হয়ে যেত। প্রিয়জন হারানোর কষ্ট ওরা বুঝবে না, মরার আগে তাই দুশ্চিন্তা আর আশঙ্কায় কিছুটা হলেও ভুগুক। জেমস যতক্ষণ হাত গুটিয়ে বসে থাকবে ওদের আতঙ্ক ততই বাড়বে, একটাকে সরিয়ে দিতে পারলে তো কথাই নেই। ফাঁসির দড়ি হাতে ওদের জন্যে অপেক্ষা করার ইচ্ছে ওর নেই, প্রমাণ করতে হবে তাহলে। সেটা সম্ভব নয়। চারজনই তারা সত্যটা জানে, এটাই হচ্ছে বড় কথা।
কাজে যাওয়ার সময় ওয়াগনের সাথে নিজের ঘোড়াটাকেও নিয়েছে জেমস। জানে আজ থেকে লিয়ন সিটিতে ওর দিনগুলো অন্যরকম হবে, যে কোন সময়ে আক্রান্ত হতে পারে। কেভিন লপার ওকে শান্তিতে থাকতে দেবে না। প্রতি মুহূর্তে চোখ কান খোলা রাখছে ও, অসতর্ক অবস্থায় প্রাণ খোয়ানোর ইচ্ছে নেই।

বনভূমির অন্য প্রান্তে চলে এসেছে ও, গত কয়েকদিন এখানেই কাঠ কাটছে। ক্রীকের পাড় ধরে ঘুরপথে চলে এসেছে। পাশেই মেলবি পর্বতমালার ঢাল, ক্রমশ উচ্চতা হারিয়ে মালভূমির আকারে সমভূমিতে গিয়ে মিশেছে। ঢালের ওপর ছড়ানো-ছিটানো ঝোপ আর কিছু বোল্ডার। ইতস্তত বেড়ে ওঠা কয়েকটা সিডারও চোখে পড়ল।

অন্য দিনের মতই দুপুরে ওর খাবার নিয়ে এল নিকোলাস প্রাইস। তাকে দেখে জেমস আঁচ করল কিছু একটা ঘটেছে। দুশ্চিন্তাগ্রস্ত দেখাচ্ছে কাঠ ব্যবসায়ীকে। কোন প্রশ্ন না করে নীরবে খাওয়া সেরে নিল ও, একবার শুধু কাছে দাড়িয়ে থাকা প্রাইসকে দেখল। তারপর দুটো সিগারেট রোল করে অফার করল তাকে। কোন সমস্যা হয়েছে, নিক?

স্যাভেজ এসেছিল আমার কাছে।

কেন?

তোমাকে ছাঁটাই করতে বলে গেছে। নইলে আমার বারোটা বাজাবে। আমি দুঃখিত, জেমস। আমাকে বউ-বাচ্চা নিয়েই এখানে থাকতে হবে। বুঝতেই পারছ কিছু করার নেই।

এটা কেবল শুরু, ভাবছে জেমস। কাঁধ উঁচিয়ে শ্রাগ করল। ভালই হয়েছে, নিক। এমনিতেও ভাবছিলাম কাজটা ছেড়ে দেব।

ওরা তোমার পিছু লাগল কেন?

সে-রাতের ঘটনাই কি যথেষ্ট নয়?

হতে পারে, কিন্তু মনে হচ্ছে এরমধ্যে অন্য কোন ব্যাপার আছে। এরকম আর কখনও হয়নি, স্যাভেজকে আমার কাছে পাগলা কুত্তার মত মনে হয়েছে। দারুণ খেপে আছে তোমার ওপর। সামনে পেলে বোধহয় খুনই করে ফেলবে। প্রত্যাশা নিয়ে তাকাল কাঠ ব্যবসায়ী, কিন্তু হতাশ হতে হলো তাকে। মুখে কুলুপ এটে রেখেছে জেমস।

আতঙ্ক ভর করেছে মার্শালের ওপর, মরিয়া হয়ে এবার ওর পিছু নেবে। জেমস এটাই চায়।

আমার কাছে জানতে চেয়েছিল তুমি কোত্থেকে, কেন এসেছ, ম্লান কণ্ঠে বলে চলেছে প্রাইস। কিছু জানি না এটা বিশ্বাস করাতে যথেষ্ট কষ্ট করতে হয়েছে। পকেটে হাত ঢুকিয়ে টাকা বের করল সে, এগিয়ে ধরল। হতাশা আর অস্বস্তি তার মুখে। আমি লজ্জিত, জেমস। প্রতিবাদ করার সাহস আমার হয়নি। অথচ পুরুষ মানুষের মত তাই করা উচিত ছিল।

ধন্যবাদ, নিক। তোমাদের সাথে ভাল কিছু সময় কেটেছে। মার্ক আর ওর মা-কে শুভেচ্ছা জানিয়ো।

ওদের সাথে দেখা করবে না!?

পরে একসময় আসব…হয়তো।

আড়ষ্ট পায়ে ওয়াগনের দিকে এগোল নিকোলাস প্রাইস, চেলা করা কাঠ তুলতে শুরু করল। জেমস হাত লাগাতে ফিরল ওর দিকে। কোথায় থাকবে ঠিক করেছ?

ভাবছি হোটেলেই উঠব।

লরার সাথে তর্ক হলো। ও কোনভাবেই মেনে নিতে চাইছে না। ওর ধারণা আমি তোমার ওপর অন্যায় করছি।

মাথা নাড়ল জেমস। ঠিকই করেছ। ওদের নিরাপত্তার কথাই আগে ভাবতে হবে তোমাকে। তাছাড়া আমাকে তো পানিতে পড়তে হচ্ছে না।

কাঠ তোলা শেষ হতে খচ্চরদুটো ওয়াগনে জুড়ল প্রাইস। চালকের আসনে উঠে বসে দেখল ফেরার ব্যাপারে আগ্রহ নেই জেমসের, কাটা গাছের গুড়িতে বসে আছে। এগোতে শুরু করেছিল ওয়াগন, জোর করে লাগাম টেনে থামাল সে। কি ব্যাপার, ফিরবে না? পেছন ফিরে চড়া গলায় জানতে চাইল কাঠ ব্যবসায়ী।

নড করল জেমস। তুমি এগোও, আমার তাড়া নেই।

এক মুহূর্ত কি যেন ভাবল প্রাইস, মুখ খুলেও নিরস্ত করে নিল নিজেকে। ফিরতি পথে এগোল ওয়াগন।

কি চায় ওরা, ওকে এইসের কাছোড়া করার উদ্দেশ্য কি? জেমস সারাক্ষণ শহরে থাকুক, হয়তো এটাই চায়। কিন্তু তাতে লাভ কি? এমনিতেও ওর ওপর নজর রাখা যেত। নাব্যাপারটা ভিন্ন কিছু। প্রথম সুযোগে ওকে শেষ করে ফেলতে চায় ওরা, শহরে কোন আয়োজন করে রেখেছে বোধহয়। স্যাভেজ আর নেবর নিজেই হয়তো এর উদ্যোল। অন্য কেউ আসল ব্যাপার জানার আগেই ওর মুখ বন্ধ করতে চায়। কেভিন লপারও না থেকে পারে না। তবে শেষপর্যন্ত আড়ালেই থেকে যাবে, সে।

একসাথে দুজন…রেনে নেবর একাই ভয়ঙ্কর, তারওপর স্যাভেজ-কাজটা কঠিন হবে। সবচেয়ে বড় কথা আইনের লেবেল লাগানো আছে ওদের পিস্তলের নলে। জেমসের জন্যে এটাই অস্বস্তিকর, নইলে অনেক আগেই ওদের মুখোমুখি দাঁড়াত, কোন কিছুর পরোয়া করত না।

স্যাড়লে চেপে বসল ও, চারপাশে তাকাল। লরেঞ্জো পিস, ক্যাসল হিল, ওল্ডম্যান মাউন্টেন…ঘন সিডার বন, বিস্তীর্ণ প্রেয়ারি আর এলডার্স ক্রীক-অসাধারণ একটা ছবির মত। সবকিছুর কেন্দ্রে লিয়ন সিটির মত ছোট্ট একটা শহর-জোন্স সিটি। তিনটে মানুষকে চাই ওর…শুধুই তিনটে লাশ। তিনটি প্রাণের বিনিময়ে তিনটা কয়োটকে চাই, যারা ওর জীবনটাকে তছনছ করে দিয়েছে একদিন। এক মুহূর্তের জন্যেও আর শান্তি পায়নি জেমস। অপরিসীম কষ্ট আর প্রতিহিংসা বুকে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

মাসুল দিতে হবে ওদের!

শহরে যাওয়ার ট্রেইলের দিকে তাকাল ও। দূরে ছোট হয়ে এসেছে নিকোলাস প্রাইস আর ওয়াগনের অবয়ব। আরও দূরে, শহর থেকে স্কুলের পাশের গলি ধরে আগুয়ান পাঁচ ঘোড়সওয়ারকে দেখতে পেল। গতি বাড়িয়ে কাঠ ব্যবসায়ীর মুখোমুখি হলো ওরা, ওয়াগনটা থেমে গেছে।

ট্রেইল ছেড়ে বড়সড় একটা সিডারের পাশে সোরেলটাকে দাঁড় করাল জেমস। স্যাডল ব্যাগ হাতড়ে ফিল্ড গ্লাস বের করে চোখের সামনে তুলে ধরল। এক লাফে কাছে চলে এল লোকগুলো। নিকোলাস প্রাইসের সাথে কথা বলছে যে লোকটা চিনতে পারছে তাকে, কয়েকদিন আগে সেলুনে দেখেছিল। ঝামেলাবাজ ছাড়া অন্য কিছু মনে হয়নি। তবে নিঃসন্দেহে কঠিন তোক, পেশীবহুল চওড়া কাঁধ আর বাহু তারই সাক্ষ্য দেয়। মুখ দেখে মনে হলো রেগে গেছে লোকা, পাশেরজন এগোতে হাত নেড়ে নিরস্ত করল। বলল কি যেন। প্রত্যুত্তরে মাথা নাড়ল প্রাইস। এবার ট্রেইল ছেড়ে সরে গেল লোকটা, সঙ্গীরাও তাই করল। এগোল কাঠ ব্যবসায়ী। খানিক এগিয়ে ফিরে তাকাল সিডার বনের দিকে, মুখে দুশ্চিন্তা।

ফিল্ড গ্লাস পকেটে রেখে লাগাম ঢিলে করল জেমস। ওর শহরে পৌঁছানোর অপেক্ষা করেনি, আগ বাড়িয়ে নিজেরাই চলে এসেছে। কারা ওরা? বেপরোয়া কয়েকজন মানুষ, বিপজ্জনক তাতে কোন সন্দেহ নেই। জেমসের সাথে ওদের সরাসরি কোন স্বার্থ হয়তো নেই, কিন্তু কিছু ডলার খরচ করলে এমন লোক হামেশাই পাওয়া যায়। হয়তো কেভিন লপারই এদেরকে ভাড়া করেছে, কিংবা হেনরী ক্রুশার।

সিডার বনের ভেতরে ঢুকে পড়েছে ও। ঘাস আর শুকনো পাতা মাড়িয়ে এগোচ্ছে সোরেলটা। খুরের ছাপ পড়ছে খুব কমই, এ অবস্থায় ওকে অনুসরণ করা সহজ হবে না। বনের বুক চিরে চলে যাওয়া ট্রেইল ধরে ওপাশে গিয়ে ঘুরপথে শহরে চলে যেতে পারে, কিন্তু তাতে অবস্থার হেরফের হবে না। শহরে দুএকজন থাকবেই, লপার বোকা নয়। এদেরকে পেছনে নিয়ে শহরে ঢুকে দুই দলের মাঝখানে গ্যাড়াকলে পড়ার ইচ্ছে নেই ওর। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে শুরুতেই ব্যাপারটার শেষ দেখতে চাইছে লপার, তার পক্ষে অবশ্য এটাই স্বাভাবিক।

মেলবি পর্বতমালায় ঢোকার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে ও। জায়গাটা অপরিচিত, তারপরও। লোকগুলোকে ব্যস্ত রেখে বেরিয়ে যেতে পারলে হয়তো কাউকে পেছনে না নিয়েই শহরে পৌঁছতে পারবে। এটা অন্তত এখুনি শহরে যাওয়ার চেয়ে ভাল, যদিও দুটোই ঝুঁকিপূর্ণ।

মাঝারি গতিতে ছুটছে সোরেল। ঘোড়াটার দম অটুট রাখার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে। ঘোড়ার বা নিজের জন্যে খাবার নেই, তা নিয়ে খুব একটা ভাবছেও না জেমস। জীবনের অনেকগুলো বছর ট্রেইলে কাটিয়েছে ও, খাবার ঠিকই জোগাড় করে নিতে পারবে।

হালকা হয়ে এসেছে সিডারের সারি। সামনে ইয়েলার্স ক্রীক। মেলবি পর্বতমালার একটা শৃঙ্গ থেকে শুরু হয়ে লিয়ন সিটি ছাড়িয়ে চলে গেছে ওপাশের মালভূমি পর্যন্ত। চওড়ায় ত্রিশ গজের মত হবে। অগভীর স্বচ্ছ টলটলে পানিতে নেমে এল ও। তলার নুড়িপাথর স্পষ্ট চোখে পড়ছে। ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে উজান ধরে এগোল, সোজাসুজি না উঠে দুশো গজ পেরিয়ে ও-পাড়ে উঠল। ওর ট্রাক খুঁজতে গিয়ে এতে অন্তত কিছু সময় নষ্ট হবে ধাওয়াকারীদের।

লাগোয়া পাহাড়শ্রেণীর ওপর ওর চোখ। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে, খুঁটিয়ে দেখছে। নিরেট পাথুরে শরীরের আনাচে-কানাচে দুএকটা উপত্যকা পেয়েও যেতে পারে।

একটা ভাল আশ্রয় পাল্টে দিতে পারে সবকিছু।

পছন্দসই একটা জায়গা পেল আরও মাইলখানেক এগিয়ে। পাহাড়শ্রেণী ওখানে হঠাৎ করে বাঁক নিয়েছে, পাহাড়ের কোণ বেরিয়ে আছে তেরছাভাবে। দুটো বোল্ডার আর মেসকিট ঝোপ পেছনের উপত্যকাকে ট্রেইল থেকে আড়াল করেছে। সরু পথটা ধরে সহজে ভেতরে ঢুকে পড়া যাবে।

স্যাডল ছেড়ে নেমে পড়ল ও, হাতে রাইফেল। ঘোড়ার লাগাম ধরে হাঁটিয়ে ভেতরে নিয়ে এল। একপাশে কিছু ঘাস আছে, ব্যস্ত হয়ে পড়ল সোরেলটা। ওটার পিঠ চাপড়ে দিয়ে ফিরে এল জেমস। পাহাড়ের ঢালু শরীর বেয়ে উঠে এল কয়েক ফুট। বোল্ডারের কাছে দাঁড়িয়ে ফেলে আসা ট্রেইলের ওপর চোখ বুলাল। ক্রীকের ও-পাড়ে দেখা যাচ্ছে লোকগুলোকে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ওর ট্র্যাক খুঁজছে।

তামাক আর কাগজ বের করে সময় নিয়ে সিগারেট রোল করে ধরাল ও। আয়েশ করে টানছে। ক্রীকের পাড়ে ওর ট্র্যাক খুঁজে পেয়েছে লোকগুলো, সোৎসাহে এগোচ্ছে এখন। বিপদের আশঙ্কা করছে না, হয়তো ভেবেছে পালাতেই ব্যস্ত থাকবে জেমস।

লোকগুলো ত্রিশ গজ দূরে এসে পৌঁছতে বোল্ডার ছাড়িয়ে উঠে দাঁড়াল। ওকে দেখে থেমে গেছে প্রতিপক্ষ। একে একে সবকটা মুখ দেখল জেমস, চেহারাগুলো গেঁথে নিল মনের মধ্যে। হারামী লোক সব কজন, এবং বেপরোয়া। লপার কিভাবে ওদের জোগাড় করল কে জানে। আমাকে খুঁজছ বোধহয়? সামনের, লোকটার উদ্দেশে জানতে চাইল ও।

এত সহজে পেয়ে যাব ভাবিনি, স্মিত হাসল লোকটা, হ্যাটের কার্নিস ঠেলে তুলে দিল ওপরে। চওড়া কপাল বেরিয়ে পড়ল। নীল চোখে ঔদ্ধত্য ও বেপরোয়া একটা ভাব আছে। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সঙ্গীর দিকে তাকাল একবার, পিস্তলের বাট ছুঁইছুঁই করছে তার হাত।

আমার পিছু নিয়েছ কেন?

হেনরী ক্রুশার সহজ একটা কাজ দিয়েছে আমাদের। তোমার ব্যাপারে আগ্রহের কমতি নেই ওর। তুমি বেচাল করলে হয়তো একটু কষ্ট হবে, তবে আগে-পরে তোমাকে ঠিকই ধরতে পারব। তোমার লাশ পেলেও খুশি হবে সে।

আচ্ছা, এই তাহলে ব্যাপার, জেমস এমনভাবে বলল যেন আমোদ পেয়েছে। খুশি হলাম তার নতুন পরিচয়ে। আমার ধারণা তার হয়ে তোমরা এই প্রথম কাজ করছ না।

তাতে কি?

হয়তো তোমাদের জন্যে এটাই শেষ কাজ। বিশেষ করে তোমার জন্যে। সবার আগে তোমাকেই গুলি করব। শোনো, স্ট্রেঞ্জার, সময় থাকতে কেটে পড়ো। তোমাদের সাথে শত্রুতা নেই আমার, অযথা ঝামেলা কোরো না।

তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে হাসল লোকটা। আমরা পাঁচজন আর তুমি একা। আমি:একাই একশো।

শুনেছ, পিট, ও নাকি হিকক? হাসছে লোকটা, কাঁপছে ওর চওড়া বুকের ছাতি আর কাঁধ। আমার সন্দেহ আছে, জেমস অ্যালেন। একটা গরুর গলায় ফাঁস আটকানোর চেয়ে তোমাকে শিকার করা আমাদের জন্যে অনেক সহজ কাজ।

পরে কিন্তু বলতে পারবে না যে সাবধান করিনি।

ওরকম বড় বড় কথা অনেক শুনেছি। সুখের কথা কি জানো, এখনও বহাল তবিয়তে বেঁচে আছি। তোমার মত বাচালরা কিছুই করতে পারেনি আমার।

রাইফেল কক করল জেমস, হাত বদল করল এরপর। দেখল ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে ওরা, সবাইকে একসাথে নিশানা করার সুযোগ যাতে জেমস না পায়। ঝটিতি রাইফেল তুলে গুলি করল ও, দলনেতার হ্যাট ফুটো হয়ে পাঁচ হাত দূরে গিয়ে পড়ল। পিছিয়ে যাও, মিস্টার! শহরে ফিরে যাও। আমার পিছু নিলে পরেরবার তোমার কপাল ফুটো করব।

তার চোখে ভয় বা অস্বস্তি কোনটাই নেই, বরং হাসছে। নোংরা হলুদ দাঁত বেরিয়ে পড়েছে। আমার হ্যাটের দাম চুকিয়ে দাও। ফুটো হওয়া হ্যাট আমি পরি না। এগোনো বন্ধ হয়েছে, কিছুটা হলেও নিজের বেহাল অবস্থা আঁচ করতে পেরেছে। বুঝতে পারছে খোলা জায়গায় থেকে সুবিধে করতে পারবে না।

ক্রুশারের পা চেটে আর্জি জানাতে পারো। সে হয়তো কিনে দিতে পারে। ওর তো টাকার অভাব নেই।

তাকিয়ে থাকল লোকটা, বোঝা যাচ্ছে ভয় পাওয়ার লোক নয়। ভুল করলে, বন্ধু, এর মাসুল তোমাকে দিতেই হবে। ভেবেছ পার পেয়ে যাবে? উঁহু, মোটেই না। তোমাকে কোণঠাসা করতে সময় লাগবে না। ছেলেরা এমনিতেই মুখিয়ে আছে। তোমার জন্যে দুশো ডলার ঘোষণা করেছে ক্রুশার।

পাশের লোকটা, ছোটখাট, স্যাডলের ওপর ঝুঁকে পড়েছে। পিস্তলের বাঁট ছুঁয়েছে হাত। এক নজর তাকে দেখল জেমস, করুণা অনুভব করল। গাধাটা ভেবেছে কিছুই টের পায়নি ও। নিজেকে খুব স্মার্ট ভাবছে! চকচকে পিস্তলের বাঁট সতর্ক করল ওকে, অন্য একটা চিন্তা খেলে গেল মাথায়…দলনেতার চালাকি ধরতে পেরেছে—ওকে কথায় ব্যস্ত রেখে কাজ সারার ফন্দি এটেছে।

রাইফেল রেখে ধরা দিতে পারো, বলল দলনেতা, ঘোড়াটা আবার এক পা এগোল। নয়তো ঢুকে পড়ো ওই ট্রেইলে। বক্স ক্যানিয়নের মত কানা ওটা, নিরেট পাহাড়ের মাথায় শেষ হয়েছে। আমরা কেবল বসে থাকব এখানে, একসময় তুমি নিজেই এসে ধরা দেবে।

একটা ঝিলিক ধরা পড়ল জেমসের চোখে। রাইফেলের নল একটু তুলেই গুলি করল। কোমর পর্যন্ত পিস্তল তুলে এনেছিল ছোটখাট লোকটা, ভারী বুলেট ওর কপাল গুড়িয়ে দিল। স্যাডলের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল শরীর। ভয় পেয়ে ছুটতে শুরু করল ঘোড়াটা।

রাইফেল তুলে নিয়েছে দলনেতা, নিশানা করছে।

ঝাঁপ দিল জেমস, গুলিটা ওর মাথা ছুঁয়ে বেরিয়ে গেল। গড়ান দিয়ে বোল্ডারের আড়ালে সরে এসে এক লাফে উঠে দাঁড়াল, তারপর ঢাল বেয়ে ছুটতে শুরু করল। পেছনে চিৎকার শুনে বুঝল ওর পরিকল্পনা আঁচ করে ফেলেছে লোকগুলো। ঘোড়ার খুরের শব্দ ওর গতি বাড়িয়ে দিল। সোরেলের কাছে এসে ওটার পাছায় চাপড় মারতে ছুটতে শুরু করল ঘোড়াটা। দৌড়ে প্রথমে তাল মেলাল জেমস, তারপর স্যাডল হর্ন আঁকড়ে ধরে ঝুলে পড়ল। একটু পর অনায়াসে স্যাডলে চেপে বসল। ঘাড় ফিরিয়ে পেছনে তাকাল একবার। এখনও দেখা যাচ্ছে না কিন্তু জানে খুব বেশি পেছনে নেই প্রতিপক্ষ।

দ্রুত কয়েকগজ পেরিয়ে এল ও। সামনে ঢালের ওপর উইলো ঝোপ, ওটার পেছনে এসে রাশ টানল। ঘুরে তাকাল জেমস। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে দেখতে পেল প্রথম লোকটাকে। একটা গ্রুলায় চেপেছে, হাতে উদ্যত সিক্সশটার। বাম হাতে রাইফেল চালান করে দিয়ে পিস্তল তুলে নিল ও, নিশানা করল। ওর খোজে ইতি-উতি তাকাচ্ছে লোকটা, চোখাচোখি হলো। নির্দ্বিধায় ট্রিগার টিপে দিল জেমস। স্যাডলে হুমড়ি খেয়ে পড়ল লোকটা।

আরেকজন উপস্থিত হয়েছে। সঙ্গীর পরিণতি দেখে সতর্ক হয়ে গেছে, চলন্ত ঘোড়া থেকে লাফিয়ে স্যাডল ছাড়ল। মাটিতে পড়ে গড়ান দিয়ে সরে গেল একপাশে। একটা জওয়ার আড়ালে চলে গেল।

ঢাল বেয়ে নেমে এল জেমস, চোখ জওয়ার পেছনে অবস্থান নেয়া লোকটার ওপর। মাথা বের করে চারপাশ দেখার চেষ্টা করল সে, জেমস একটা গুলি করতে মাথা টেনে নিল।

ঘোড়াকে হটিয়ে নিয়ে জায়গাটা থেকে সরে এল জেমস। ব্যাটা ওখানে বসে থাকুক কিছুক্ষণ, ভাবল ও, একটা ভাল ধাক্কা দেয়া গেছে লোকগুলোকে। দুজন শেষ। এখন থেকে পুরো সতর্ক থাকবে ওরা।

ঘণ্টাখানেক টানা এগোল ও। সোরেলের ইচ্ছের ওপর ছেড়ে দিয়েছে। একসময় বুনো ছিল ওটা, অপরিচিত জায়গায় তাই ওটার সহজাত প্রবৃত্তিই ওর ভরসা। এলাকাটা অচেনা, তাই ঘোড়ার ওপর নির্ভর করা ছাড়া উপায় নেই। হুট করে নেয়া সিদ্ধান্ত ওকে ভোগাচ্ছে এখন, মেলবি পর্বতমালায় ঢোকার জন্যে শেষে দুঃখ করতে হয় কিনা কে জানে। হলফ করে বলতে পারব, লোকগুলো পিছু ছাড়বে না।

সন্ধ্যার খানিক আগে অন্ধকার নেমে এল পাহাড়শ্রেণীতে, পথ চলার উপায় থাকল না আর। বাধ্য হয়ে থামল জেমস, একটা মেসার ওপর রাত কাটানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। স্যাডল ছাড়িয়ে ঘোড়ার যত্ন নিল প্রথমে। বুনো কিছু ঝোপ আছে আশপাশে, সোরেলের জন্যে যথেষ্ট। আর ওকে উপোস থেকে কাটিয়ে দিতে হবে, ক্যান্টিনের পানিই একমাত্র সম্বল। আসার পথে এমন কিছু পায়নি যে খেতে পারে।

মেসার একেবারে কিনারে কয়েকটা মেসকিট ঝোপ, পাশে মোটামুটি সমতল ঢল নেমে গেছে অনেকদূর। আবছা আঁধারে নিচের কিছুই চোখে পড়ছে না। ক্যাম্প করল জেমস, বেডরোল বিছিয়ে শুয়ে পড়ল। পেছনের লোকগুলোর কথা ভাবল একবার, তারপর সব চিন্তা ঝেটিয়ে বিদায় করে দিল মাথা থেকে। ওর মত লোকগুলোও এগোতে পারবে না। তবু রাতের বেলায় হামলার আশঙ্কা একেবারে উড়িয়ে দেয়া যাবে না। কিছুক্ষণ নীরবে শুয়ে থাকল, আশপাশের শব্দগুলো শোনার চেষ্টা করছে। ১

ঘণ্টাখানেক পর উজ্জ্বল হয়ে উঠল চাদের আলো। অস্থির লাগছে, টের পেল ও, যদিও কোন কারণ খুঁজে পেল না। বিছানায় এপাশ-ওপাশ করল কিছুক্ষণ, সারা দেহে ক্লান্তি তবু ঘুম আসছে না। খিদেয় শূন্য অনুভূতি হচ্ছে পেটে, তবে তারচেয়েও বেশি ভোগাচ্ছে অজানা একটা অস্থিরতা। তার সহসাই আবিষ্কার করল জায়গাটার নিরাপত্তা নিয়ে সন্দেহ যাচ্ছে না ওর।

উঠে বসে ফেলে আসা পথ ধরে তাকাল ও। চাঁদের আলোয় আবছাভাবে চোখে পড়ছে ট্রেইলটা। স্নিগ্ধ আলোয় ভেসে যাওয়া পাহাড়ের তামাটে শরীরকে গলে শুকিয়ে যাওয়া মোমের মত ভঙ্গুর, পেলব মনে হচ্ছে। ঝোপের ভেতর আবছা আঁধার, আর উঁচু ক্লিফের ছায়াগুলো কে কাকে ছাড়িয়ে যাবে সে প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত যেন। ওগুলোর আশপাশে চাপ চাপ অন্ধকার। নির্মেঘ আকাশ বিশাল এক ছাতের মত আগলে রেখেছে পুরো এলাকাকে, নিভুনিভু তারাগুলোকে দেখাচ্ছে একেকটা নিভন্ত প্রদীপের মত-মিইয়ে যাওয়ার মাঝেই হঠাৎ করে জ্বলে ওঠার চেষ্টায় ক্লান্ত যেন।

সরে গিয়ে একটা শৈলশিরায় চলে এল ও। হাতে ফিন্ড গ্লাস। পাহাড়শ্রেণীর শুরুতে এ ট্রেইলে ঢোকার মুখ আর পথের কিছু অংশ চোখে পড়ছে। খুটিয়ে দেখল ও, কোথাও কোন ক্যাম্পের চিহ্ন চোখে পড়ল না। ওর মতই সতর্ক লোকগুলো, আগুন জ্বালায়নি। আসার পথে ট্র্যাক ফেলে এসেছে ও, তা ধরে চলে আসতে পারবে ক্রুশারের জুরা। হয়তো ওদের কাছে এলাকাটা নতুন নয়, সেরকম হলে অনায়াসে চলে আসতে পারবে এখানে। নিজেকে ওদের জায়গায় কল্পনা করল জেমস, নির্দ্বিধায় রাতে ক্যাম্পে হানা দিত ও। সুতরাং সামনের উপত্যকায় যে কোন মুহূর্তে কাউকে দেখা গেলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

পিছিয়ে ক্যাম্পের কাছে চলে এল ও। সিদ্ধান্ত নিতে পেরে স্বস্তি লাগছে। বেডরোল গুটিয়ে সোরেলের পিঠে স্যাডল চাপাল, ঢাল বেয়ে নামতে শুরু করল। চাঁদের আলোয় অন্ধকার পুরো কাটেনি, তবে এগোনো যাচ্ছে। শক্ত পাথুরে পথ। কিছুক্ষণ পর একটা উপত্যকা ছাড়িয়ে আরও এগোল। তিনশো গজের মত পেরিয়ে এসে একপাশের একটা উইলো ঝোপ দেখে থামল। জায়গাটা দেখে নিশ্চিন্ত হলো ও, মেসায় রাত কাটানোর চেয়ে নিরাপদ। প্রতিপক্ষ এখানে পৌঁছানোর আগেই টের পাবে। তাছাড়া ছায়া ঘেরা বোপটা খুব কাছ থেকেও ভাল করে না দেখলে চোখে পড়ে না।

ঘোড়াটাকে চরতে দিয়ে শুয়ে পড়ল ও। ক্লান্তি লাগছে। আগামীকালও হয়তো এভাবে ছুটতে হবে। অযথা শক্তিক্ষয়ের কোন অর্থ নেই, এমনিতেই যেহেতু অভুক্ত আছে। সোরেলটা ওর অনেকদিনের সঙ্গী, বিপদ হলে ওটাই সতর্ক করে দেবে ওকে।

সূর্য ওঠারও আগে জাগল জেমস অ্যালেন। প্রথমেই প্রচণ্ড খিদে অনুভব করল। মেসা আর আশপাশে চোখ বুলাল ও, ভোরের আলো ফুটছে এখন পাহাড়ের কাছে। বাতাস নেই। সূর্যের আলোয় ঝকমকিয়ে উঠল উপত্যকার শিশির-ভেজা ঘাস। একসময়, পর্বতমালার চিরুনির মত চূড়াগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠল। ছায়া ছুঁড়ে বেরিয়ে আসছে নিচের উপত্যকাগুলো। পাইনের সুবাস মাখা ঠাণ্ডা বাতাস বুক ভরে টেনে নিল ও। কোথাও কোন সাড়া নেই, নিঃসীম নীরবতার মধ্যে কেবল নিজের নিঃশ্বাসের শব্দই শুনতে পাচ্ছে, আর উপত্যকায় চরতে থাকা ঘোড়ার ঘাস টানার শব্দ।

নিশ্চিন্ত হয়ে বেডরোল গুটিয়ে নিল জেমস। সোরেলের পিঠে স্যাডল চাপিয়ে পানি পান করল, তারপর সিগারেট ধরাল। উপত্যকার কিনারে সামনের সরু ট্রেইলের ওপর চোখ বুলাল-পাহাড়শ্রেণীর আরও ভেতরে প্রবেশ করেছে। অন্য কোন পথ নেই, একটাই। এ পথের শেষ কোথায় জানা নেই ওর, হয়তো এখানে পা ফেলা প্রথম কোন মানুষ ও-ই। মনে পড়ল ক্রুশারের লোকটা বলছিল এটা কানা। তেমন হলে ওর কপালে সত্যি খারাবি আছে।

আকাশ আরেকটু পরিষ্কার হতে রওনা দিল জেমস। দুর্গম প্রান্তর। ইতস্তত ছড়িয়ে থাকা আকাশছোয়া ক্লিফের সারির মাঝখান দিয়ে চলে গেছে রুক্ষ ট্রেইল। সুবিস্তৃত ঢালু পথ উপত্যকার গভীরে গিয়ে পড়েছে; সেখানে অ্যাসপেন, মেসকিট আর বুনো উইলোর ছড়াছড়ি। ঘন সন্নিবেশিত ঝোপ ঠেলে এগোতে কষ্ট হচ্ছে ঘোড়াটার। একটু পর চড়াই-উত্রাইয়ের শুরু হলো। ছোট ছোট পাহাড়, কোনটাই খুব বেশি উঁচু নয়, মাঝে বিস্তৃত উপত্যকা। কোথাও কোন ক্রীক বা ঝর্নার নমুনাও নেই। জেমসের আশঙ্কা হলে শেষপর্যন্ত পিপাসায় কষ্ট করতে হয় কি-না ওকে। ঘোড়াটার জন্যে পানির অভাব আরও ঝামেলার হবে, এমনিতেই বিশ্রাম আর খাবার পাওনা হয়েছে ওটার। কিন্তু উপায় নেই। বুনো লতা আর ঝোপের ওপর ভরসা করতে হবে। আর বেল্টের নিচে চুপসে যাওয়া নিজের পেটের কথা ইচ্ছে করেই ভোলার চেষ্টা করছে জেমস, কিন্তু পারছে না।

দুপুর পর্যন্ত কেবল একবারের জন্যে থামল। ঘোড়ার ওপর চাপ কমাতে মাঝে মাঝে হেঁটে এগিয়েছে, কিন্তু কোনবারই বেশিদূর এগোতে পারেনি।

লোকগুলো ওর পিছু নিয়ে আসছে কি-না জানা নেই জেমসের। কষ্ট করে দুর্গম পাহাড়সারি পাড়ি দেয়ার ইচ্ছের ওপর নির্ভর করে। হয়তো এখনও ওই উপত্যকায় বসে আছে, কিংবা কয়েকশো গজ পেছনে, বোঝার উপায় নেই। ওর মনোযোগ সামনের ট্রেইলের ওপর, বেরিয়ে যাওয়ার পথটা অজান্তে পেছনে ফেলে যাবে এই ভয়ে অস্থির। পাহাড়ী গোলকধাঁধায় পথ হারানো মোটেও অস্বাভাবিক নয়।

জেমস জানে বামে চলে যেতে পারলে প্ৰেয়ারির কাছাকাছি পৌঁছতে পারবে। ইয়েলার্স ক্রীকের কাছে একবার যেতে পারলে এখান থেকে বেরিয়ে যাওয়া কঠিন হবে না। বুনো জানোয়ারের চলাচলের অনেকগুলো ট্রেইল চোখে পড়েছে ওর। সোরেলসহ পাড়ি দেয়া সম্ভব নয় বলে বাদ দিয়েছে।

ক্ষুৎপিপাসায় কাতর হয়ে একসময় থামল ও। প্রচণ্ড ক্লান্তি শরীরে, তবু ঘোড়ার যত্ন নিল। সন্ধের পর পানি খেয়ে শুয়ে পড়ল। আরেকটা উপোস আর উদ্বেগপূর্ণ রাত কেটে গেল।

পরদিন সকালে পথটা হঠাৎ করেই খুঁজে পেল ও। কিন্তু বেশিক্ষণ খুশি থাকতে পারল না। একটু এগিয়ে দেখতে পেল পথটা আগলে আছে কুশারের কুরা। মেসার ওপর থেকে নজর রাখল জেমস, তারপর নিশ্চিত হলো-চারজন। তারমানে আরও লোক এসেছে।

উপত্যকার মুখে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে অবস্থান নিয়েছে, বেরোতে গেলে ওদের চোখে পড়া ছাড়া উপায় নেই। হামলা করতে চাইলেও শৈলশ্রেণীর ওপর থেকে সুবিধা করা যাবে না। পিছিয়ে এসে ঢাল বেয়ে নামতে শুরু করল ও। পঞ্চাশ ফুট নিচের একটা রীজে এসে আশ্রয় নিল। শুয়ে পড়ে টেনে নিল রাইফেলটা, পুরো উপত্যকাই চোখে পড়ছে। বাছাধনদের এবার কিছুটা চমকে দেয়া যাক, ভাবল জেমস, নিদেনপক্ষে একজনকেও যদি খসিয়ে দেয়া যায় তো মন্দ কি!

একটা পাথরের সাথে হেলান দিয়ে বসে আছে বিশালদেহী এক লোক, ট্রেইলের ওপর নজর রাখছে। কোলের ওপর আড়াআড়িভাবে রাইফেল পড়ে আছে, হাতে হুইস্কির বোতল। ওটা তুলে চুমুক দিল সে, ছিপি এঁটে তারপর ছুঁড়ে দিল পাঁচ হাত দূরে শুয়ে থাকা সঙ্গীর দিকে। রাইফেলের নলে লোকটার কপাল নিশানা করল জেমস, বড় একটা নিঃশ্বাস নিয়ে ট্রিগার টেনে দিল। প্রচণ্ড শব্দে ভেঙে খান খান হয়ে গেল উপত্যকার নীরবতা। পেছনে হোঁচট খেল লোকটার মাথা, স্থির ভাবে বসে আছে যেন কিছুই হয়নি।

বোতল ফেলে লাফিয়ে উঠল অন্য লোকটা, ঝাঁপ দিল কাছের পাথরের আড়াল লক্ষ্য করে। জেমসের পরের গুলি ফস্কে গেল, চল্টা উঠাল পাথরের গায়ে। ইতোমধ্যে আড়ালে চলে গেছে লোকটা, অন্য দুজনও সটকে পড়েছে। ফাঁকা জায়গাটার ওপর চোখ বুলাল ও, ট্রেইলের আশপাশে তন্নতন্ন করে খুঁজছে ওর দৃষ্টি। লুকিয়ে আছে ওরা, পাল্টা একটা বুলেটও খরচ করেনি। এর কারণ একটাই—ওর অবস্থান এখনও আঁচ করতে পারেনি। সুতরাং আরেকবার সুযোগ নেয়া যেতে পারে।

সময় বয়ে চলেছে। দুপুরের সূর্য এখন গা তাতাচ্ছে, পাথরে ঠিকরে যাচ্ছে। রোদ। ঠায় পড়ে আছে জেমস, খানিক নড়েচড়ে হাত-পায়ের খিল ছাড়াল। ওদিকে অধৈর্য হয়ে পড়েছে প্রতিপক্ষ, নড়াচড়া শুরু হয়ে গেছে। পাথরের পেছনে একটা বাদামী রঙের হ্যাট দেখা গেল, ধীরে ওপরে উঠছে। বেশ খানিকটা ওঠার পর নিচে রাইফেলের নল দেখা গেল। মনে মনে একচোট হাসল জেমস।

মিনিট দশ চলে গেল আরও, তারপর বেরিয়ে এল হ্যাটঅলা। সতর্ক, ধীর, চলাফেরা। জেমস ইচ্ছে করলে তাকে ফেলে দিতে পারে, তা না করে অন্য লোকগুলোর বেরিয়ে আসার অপেক্ষায় থাকল। কোন গুলি ছুটে এল না বলে সাহস বেড়ে গেল লোকটার, দ্রুত পায়ে হেঁটে চলে এল বোতলের কাছে। ওটা তুলে নেয়ার সময় গলা উঁচিয়ে ডাকল সঙ্গীদের। ছিপি খুলে মুখে পানীয় ঢালছে সে, ঠিক এসময়ে গুলিটা করল জেমস। প্রচণ্ড ধাক্কায় পেছনে হেলে পড়ল লোকটা, হাত থেকে খসে পড়ল বোতল। টলতে টলতে দুপা এগোল, তারপর আছড়ে পড়ল শক্ত মাটিরওপর।

দশহাত দূরে একটা ঝোপ থেকে বেরিয়ে এসেছিল আরেকজন, অবস্থা বেগতিক দেখে ছুটতে শুরু করেছে। দ্বিতীয় চেষ্টায় তাকে বেঁধাল জেমস, উরুতে বা পায়ে লেগেছে গুলিটা। ঝোপের কাছে গিয়ে ঢলে পড়ল সে, প্রাণপণ চেষ্টায় আড়ালে টেনে নিল শরীর। জেমস ফের গুলি করার আগেই নির্বিঘ্নে একটা বোেল্ডারের পেছনে চলে গেল।

ওদের খায়েশ কিছুটা মিটবে এবার, পড়ে থাকা লাশদুটো দেখে ভাবল জেমস। উপত্যকার একটু নিচে বেঁধে রাখা ঘোড়াগুলোর ওপর স্থির হলো ওর দৃষ্টি। গুলির শব্দ আর ক্লিফের দেয়ালে সৃষ্ট প্রতিধ্বনি ভয় পাইয়ে দিয়েছে ওগুলোকে, ছটফট করছে। কয়েকটা বুলেট পাঠিয়ে ওগুলোকে আরও উত্তেজিত করে তুলল। একটু পর আতঙ্কে বাধন ছিঁড়ে ছুটে পালাতে শুরু করল ঘোড়াগুলো। কেউ একজন গাল দিল ওর উদ্দেশে। হেসে সরে এল জেমস, ঢাল বেয়ে নামতে শুরু করল। নিচে ঢালের শেষে অপেক্ষা করছে সোরেলটা।

ওকে দেখে খুশি হলো ঘোড়াটা। স্যাডলে চেপে গতি বাড়াল জেমস, মূল ট্রেইল ধরে এগোল। ঘণ্টাখানেক পর উঁচু একটা রীজে উঠে এসে পেছনে ফেলে আসা পথের ওপর দৃষ্টি রাখল, পাত্তা নেই লোকগুলোর। কারণটা বুঝতে পারল আরও কিছুক্ষণ পর যখন দেখল কয়েকশো ফুট উঁচু খাড়া পাথুরে দেয়ালের সামনে শেষ হয়ে গেছে ট্রেইল। হতাশা পেয়ে বসল ওকে, এত পরিশ্রম বিফলে যাবে যদি বেরিয়ে যেতে না পারে। নিশ্চিন্ত হয়ে পেছনে ট্রেইলের মুখে বসে থাকবে লোকগুলো; জানে ওকে ফিরে যেতে হবে, আপসে ধরা দিতে হবে।

ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে ফিরতি পথ ধরল জেমস। খানিক এসে একটা শৈলশ্রেণীতে উঠে এল, সময় নিয়ে জরিপ করল পুরো এলাকা। ওর হিসেব মত এতক্ষণে ইয়েলার্স ক্রীকের উৎসের কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ার কথা। কোনমতে একবার সেখানে পৌঁছতে পারলে এখান থেকে বেরিয়ে যাওয়া কঠিন হবে না।

ঘণ্টা দুই পরে সত্যি সেখানে পৌঁছল ও। তবে খুব একটা খুশি হতে পারল। পাহাড়ের যে জায়গা থেকে নিচের জমিনে পানি আছড়ে পড়ছে তার থেকেও অন্তত একশো ফুট ওপরে একটা চাতালে এসে উপস্থিত হয়েছে। ক্রীকের শুরু কয়েকশো ফুটেরও বেশি নিচুতে। ক্লিফের বাড়া শরীর বেয়ে এত পথ নেমে যাওয়ার চিন্তা মাথায় আসতে থমকে গেল ও, তারপর খুঁটিয়ে দেখল জায়গাটা।

অসম্ভব নয়।

সরে আরও কিনারায় চলে এল ও। ক্যান্টিন খুলে পানি ছিটাল মুখে, তারপর খেল খানিকটা। একটা সিগারেট রোল করে ভাবতে বসল। ঝুঁকি আছে কিন্তু সাফল্যের সম্ভাবনাই বেশি। অবরুদ্ধ থাকার চেয়ে এটা অনেক ভাল।

সোরেলের কাছে চলে এল জেমস। এ কদিনে ওর নিজের চেয়ে ঘোড়াটার ওপর দিয়েই ধকল বেশি গেছে। পরম মমতায় হাত বুলাল ওটার ঘর্মাক্ত শরীরে, ফিসফিস করে কথা বলল কিছুক্ষণ। তারপর লাগাম টেনে ওটার মুখ ঘুরিয়ে দিল ফেলে আসা ট্রেইলের দিকে। স্যাডল থেকে রাইফেল আর ব্যাগ নামিয়ে রাখল। সোরেলের পাছায় মৃদু চাপড় মারল এবার। একচুলও নড়ল না ওটা।

যা বাছা, ওটার গলায় সুড়সুড়ি দিল জেমস। আবার দেখা হবে আমাদের।

মাথা নাড়ল ঘোড়াটা, ধীরে এগোল।

দাঁড়িয়ে থেকে কিছুক্ষণ ওটার যাওয়া দেখল জেমস, তারপর শৈলশ্রেণীর কাছে ফিরে এল। শেষবারের মত বিচার করল সম্ভাবনাটা। প্রায় আড়াইশো ফুট নেমে যেতে হবে, কোন ভাবে হাত ছুটে গেলে সর্বনাশের মোলোকলা পূর্ণ হবে। তবে আশার কথা পাহাড় থেকে বেরোনো পাথুরে কোণ আর কিছু গুল্ম জাতীয় গাছের সাহায্য পাবে ও। অন্য সময় হলে নিশ্চিন্তে এগোতে পারত, কিন্তু দুদিনের খিদে আর টানা পথচলার ক্লান্তি ওকে দুর্বল করে দিয়েছে। ভয় হচ্ছে শেষপর্যন্ত হয়তো নেমে যেতে পারবে না, যে শক্তির প্রয়োজন আদপে তা হয়তো ওর শরীরে নেই।

সাহস সঞ্চয় করে নামতে শুরু করল জেমস, ধীরে সময় নিয়ে করতে হচ্ছে কাজটা। হাত-পা সবগুলো ব্যবহার করছে। পিঠে ঝোলানো রাইফেল বোঝার মত মনে হলো ওর কাছে। কিছুক্ষণের মধ্যে ঘামতে শুরু করল, একসময় টের পেল ভিজে গিয়ে শরীরের সাথে লেপ্টে গেছে শার্ট। কপাল থেকে ঝরে পড়া নোনা ঘাম চোখে জ্বালা ধরিয়ে দিচ্ছে। প্রখর রোদ, ক্লান্তি আর খিদে বারবার ওর মনোযোগ কেড়ে নিচ্ছে। একটা চাতালে নেমে এসে থামল, শক্ত পাথুরে মাটির ওপর শুয়ে পড়ল। হাত-পা কাঁপছে, হাপরের মত ওঠা-নামা করছে বুক। বিশ্রাম নিতে না পারলে আর একটা মিনিটও টিকতে পারত কি-না সন্দেহ।

মিনিট বিশ পর আবার নামতে শুরু করল ও। গুল্ম জাতীয় গাছের সংখ্যা আগের চেয়ে বেড়েছে। খানিকটা সহজ হলো নেমে যাওয়ার কাজটা। ভুলেও নিচে বা ওপরের দিকে তাকাচ্ছে না, ভয় হচ্ছে হয়তো দেখবে এতক্ষণে মাত্র কয়েক ফুট নেমেছে।

সূর্য যখন পশ্চিমাকাশে হেলে পড়েছে তখন উপত্যকায় নেমে এল ও। সবচেয়ে বিপজ্জনক জায়গাটা পেরিয়ে এসেছে। দুই পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে পানির স্রোত ষাট ফুট নিচে খসে পড়েছে। স্বচ্ছ পানিতে কয়েকটা পাথর ডুবে আছে। মাথা উঁচু করে তাকাল খাড়া দেয়ালের দিকে যেটা ধরে মাত্র নেমে এসেছে। দস্তানা খুলে পানিতে হাত চুবাল, কয়েক জায়গায় ছড়ে গেছে। আঁজলা ভরে পানি তুলে মুখ ধুল, ঠাণ্ডা পানি পান করল। একটু সুস্থির হতে তাকাল চারপাশে। বুনো একটা লতানো গাছ উপত্যকা থেকে বেরিয়ে এসে পানির প্রবাহের সাথে নিচে নেমে গেছে, লম্বায় অন্তত ত্রিশ ফুটের মত হবে। টেনে-টুনে পরীক্ষা করল জেমস, গোড়াটা যথেষ্ট মজবুত, ওর ওজন সইতে পারবে।

লতা ধরে নেমে পড়ল ও অনায়াসে নামা যাচ্ছে। শেষ মাথায় এসে ঝুলে থাকল কিছুক্ষণ। নিচে ফেনা আর স্রোত। অনেকগুলো পাথরও দেখা যাচ্ছে। লাফিয়ে পড়াটা ঠিক হবে না। আশপাশে তাকাল, পাহাড়ের গায়ে বেশ কিছু গাছ জন্মেছে। দোল খেয়ে সরে এল ও, দেয়ালের সাথে শরীর মিশিয়ে দিল। একটা মেস্কিটের কাণ্ড ধরে ঝুলে পড়ল। এখন আর পানি পড়ছে না গায়ে। কপাল আর চোখের ওপর থেকে ভেজা চুল সরাল। গাছের সাহায্য নিয়ে অনায়াসে নামতে থাকল দুর্বল শরীরে, যদিও ক্লান্তি লাগছে।

নিচে জলপ্রপাতের কাছে নেমে এল জেমস অ্যালেন। খানিক জিরিয়ে পানিতে নেমে পড়ল। ক্রীকটা এখানে গভীর। পাড় ঘেঁষে হাঁটু পানি ভেঙে এগিয়ে চলল। চল্লিশ ফুটের মত পেরিয়ে চলে এল একটা ঝোপের আড়ালে। ঘন ক্যাকটি ঝোপ ওকে পুরোপুরি আড়াল করেছে। স্যাডল ব্যাগ থেকে তামাক আর কাগজ বের করে সিগারেট রোল করল। সিগারেটটা অস্বাভাবিক তৃপ্তি দিল ওকে, জেমস, বুঝতে পারল একটা অসম্ভব কাজ করেছে বলেই বোধহয়।

সামনে, গ্রীষ্মের গোধূলিতে শহরের বাতির হলদে আভা দেখা যাচ্ছে। চারপাশে সমবেত গুঞ্জন তুলছে সিক্যাডার দল, দূরের উপত্যকা থেকে একটা কয়োটের আর্তনাদ, ভেসে এল। ক্রীকের পাড়ে বিরাট সিডারের গায়ে ঠোকর মারছে একটা কাঠঠোকরা। পাইনের সুবাস মাখা মৃদু হাওয়া ভেসে আসছে পাহাড় থেকে। গোধূলির আবছা অন্ধকারের দিকে তাকাল ও, লিয়ন সিটিতে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। আপাতত ওখানেই প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো পাওয়া যাবে খাবার হয়তো একটা নিরাপদ আশ্রয়। কিন্তু জেমস জানে ওখানে অনেক অনিশ্চয়তা অপেক্ষা করছে ওর জন্যে।
ক্যাফে থেকে বেরিয়ে লোকটাকে দেখতে পেল রোজালিনা বার্থেজ। গতকালও দেখেছে। উল্টোদিকে নরম্যানদের বাড়ির দেয়ালে হেলান দিয়ে পা ছড়িয়ে বসেছে। তোবড়ানো হ্যাট নিচু করা। নোংরা কাপড়ে ভবঘুরে মনে হয় তাকে। রোজালিনা জানে আসলে ক্যাফের ওপর নজর রাখছে সে। ওরা ভাবছে হয়তো এখানে আসবে জেমস অ্যালেন। সত্যি যদি আসত।

এখনও যখন হাল ছাড়েনি ওরা, তারমানে বেঁচে আছে সে। যুক্তি তাই বলে, কিন্তু ভরসা পাচ্ছে না রোজালিনা। ওর অস্থিরতা আর আশঙ্কা কেবল বেড়েই চলেছে। নিজের কামরায় দম বন্ধ হয়ে আসছিল, তাই বেরিয়ে চলে এসেছে। প্রাইসদের বাসায় যাওয়ার ইচ্ছে ওর, নিকোলাস হয়তো কিছু জানতে পারে। দুদিন আগে সাপ্লাইয়ের কাঠ, ডেলিভারি দেয়ার সময় সে-ই খবরটা জানিয়েছে।

পোর্চ ছেড়ে নেমে এসে ফুটপাথ ধরে এগোল রোজালিনা। শনিবার বলে আজ শহরে লোকজন বেশি। আশপাশের বাথানের পাঞ্চার ছাড়াও কয়েকজন ভবঘুরেকে চোখে পড়ছে। অনেকে দাঁড়িয়ে নড করছে ওকে, মিষ্টি হাসি উপহার দিচ্ছে। সেদিকে মনোযোগ দেয়ার মানসিকতা ওর অন্তত এখন নেই।

রাস্তা পেরিয়ে ওপাশে চলে গেল রোজালিনা। ব্যাংকের পাশের গলি ধরে ঢুকে পড়ল। অজান্তেই মেলবি পর্বতমালার দিকে চলে গেল ওর দৃষ্টি। হয়তো ওখানেই আছে লোকটা। অপরিচিত এলাকা, এতগুলো লোকের বিরুদ্ধে কতক্ষণ টিকতে পারবে অ্যালেন?

নিকোলাস প্রাইসকে দেখা গেল আঙিনায়, ওয়াগন থেকে কাঠ নামাচ্ছে। ঘেমে সারা। চোখ তুলে দেখল ওকে, নড করল।

কোন খবর পেয়েছ? অধীর কণ্ঠে জানতে চাইল রোজালিনা।

মাথা নাড়ল সে। গতকাল আরও চারজন যোগ দিয়েছে। সকালে কয়েকটা গুলির শব্দ শুনেছি।

হতাশা গ্রাস করল মেয়েটিকে, প্রাণপণ চেষ্টায় নিজেকে স্বাভাবিক রাখছে। ওরা ফিরেছে?

না। মনে হচ্ছে এখনও টিকে আছে জেমস, কাজ থামিয়ে কাছে এসে দাঁড়াল প্রাইস, অভয় দেয়ার ভঙ্গিতে হাসল। আমার ধারণা শেষপর্যন্ত ও বেরিয়ে আসবেই। যতটুকু বুঝেছি শক্ত লোক ও।

তুমি বলেছ ওর সাথে খাবার নেই।

মাথা ঝাঁকাল কাঠ ব্যবসায়ী। কয়েকদিন না খেয়েও বাঁচে মানুষ, কেবল কোন বুলেট তাকে স্পর্শ না করলেই হলো।

ও এলে আমাকে খবর দেবে, প্লীজ! প্রায় অনুনয়ের সুরে বলল রোজালিনা।

ভেতরে গিয়ে বসো। লরা কফি তৈরি করছে।

মাথা নাড়ল রোজালিনা। আজ ভিড় হবে। মা-কে সাহায্য করতে হবে। ঘুরে দাঁড়িয়ে ফিরতি পথে এগোতে লোকটাকে দেখতে পেল, পথের ওপাশে কটনউডের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দশাসই শরীর। লোকটাকে চেনে রোজালিনারেব হর্নার, হেনরী ক্রুশারের রাইডার। গরু কেনার পর টাকসনে ড্রাইডের নেতৃত্ব দেয় এ লোক। শীতল চোখজোড়া স্থির হলো ওর ওপর। সন্দেহ ছাপিয়েও লৌকটার দৃষ্টিতে লালসা ফুটে উঠল। অস্বস্তি অনুভব করল রোজালিনা, দ্রুত পা চালাল।

রেব হর্নারের দৃষ্টির আড়ালে এসে নিশ্চিন্ত হলো ও, অজান্তে শিউরে উঠল শরীর। পুরুষদের এই একটা ব্যাপার ওকে ভীষণ অস্বস্তিতে ফেলে দেয়, তিক্ত মনে ভাবল ও, ইচ্ছে করে চোখগুলোকে উপড়ে ফেলে। কিন্তু অসহায় সে, আজীবন এ নীরব অত্যাচার সইতে হবে। তবে নির্ভর করা যায় এমন কেউ পাশে থাকলে এ অনুভূতি হয়তো আর হবে না।

রোজালিনা বিস্ময়ের সাথে আবিষ্কার করল বৈরী এ দেশটাতে একজন পুরুষের কাছে কোন মেয়ের প্রথম চাওয়া এটাই—নির্ভরতা, যা এমনকি দৈনন্দিন কোন চাহিদা বা ভালবাসার চেয়েও মুখ্য জিনিস। এ কারণেই হেনরী শারকে ওর পছন্দ হয় না, কিংবা লপারকেও, তার চোখেও লোভী দৃষ্টি দেখেছে। অথচ অ্যালেন…ওঁর মধ্যে কোন ভণিতা নেই, মহিলাদের সম্মান করে সে, এবং ওর ওপর নির্ভর করা যায়, যেটা করা যায় না, ক্রুশার বা লপারের ওপর। তাদের সুদর্শন চেহারার চুয়ে বরং অ্যালেনের কঠিন মুখই একটা মেয়ের কাছে ভাল লাগবে। কারণ মেয়েটিকে নিশ্চিন্ত হতে হবে—বিপদে পুরুষটি পাশে এসে দাঁড়াবে, তাকে রক্ষা করতে পারবে। এই বিশ্বাসটুকু একটা মেয়ের প্রথম পাওনা।

এডি কারসনের সাথে সংঘর্ষ হতে সংবিৎ ফিরল ওর। বাড়ি থেকে ছুটে আসছিল ছেলেটা, হাতে কাঠের তৈরি পিস্তল। ছেলেটার সাথে পিস্তলটাও ভূপতিত হলো। দ্রুত নিজেকে সামলে নিল রোজালিনা, এগিয়ে গিয়ে এডির হাত ধরে মাটি থেকে তুলল ওকে।

দুঃখিত, মিস! অস্বস্তি ছেলেটির চোখে, পেছনে ছুটে আসা মার্কের দিকে তাকাল। বোধহয় খেলছিল ওরা, ধারণা করল রোজালিনা।

ঠিক আছে, এড। আমিও তোমাকে খেয়াল করিনি।

শাস্তি দেবে না তো? ভয়ে ভয়ে জানতে চাইল সে।

না, সোনা। ঝুঁকে ছেলেটাকে চুমো খেল রোজালিনা। বাড়ির ভেতরে চলে যাও। আঙিনায় খেলবে। ঠিক আছে?

ইয়েস, ম্যাম। মাথা ঝাঁকাল ছেলেটা, এগোল সেদিকে।

মূল রাস্তায় এসে আবারও ভাবনায় পড়ে গেল ও। জেমস অ্যালেনের চিন্তা মাথা থেকে যাচ্ছে না। ব্যাংকারকে এমন কিছু করেনি সে, রোজালিনা অন্তত তাই মনে করে। অথচ জেমসকে খুন করার জন্যে নিজের রাইডারদের লেলিয়ে দিয়েছে লোকটা। ব্যাংকারের প্রতি ঘৃণা অনুভব করছে ও।

ভয় লাগছে ওর, অ্যালেনের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত। আশপাশে এমন কোন জায়গা নেই যেখানে যেতে পারে সে। লিয়ন সিটিতে তাকে আসতেই হবে, এবং খুব সহজেই এদের সামনে পড়বে। অজান্তে শিউরে উঠল ও, বুঝতে পারল এখানে এলেও ছাড় পাবে না জেমস অ্যালেন, এসব লোকের মোকাবিলা করতে হবে তাকে। নিজের বিদ্বেষ চেপে রাখার কোন চেষ্টা করছে না ক্রুশার, যদিও শহরের কেউই আসল ব্যাপার জানে না। সামনে রাউন্ড-আপ, তাছাড়া আজ শনিবার। সাধারণ লোকজনের মধ্যে ঘুরে বেড়ানো আরও দুজন ক্রুকে চোখে পড়ল ওর। ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ওরা, এবং সতর্ক। অ্যালেন এলেই হামলে পড়বে।

ওর উদ্বেগ বেড়ে চলেছে। এস্ত পায়ে ফিরতি পথ ধরে এগোল। খেয়াল করল ক্যাফের সামনের লোকটা আগের মতই বসে আছে। ভেতরে ঢুকে দেখল ওর মা বক্স-বি বাথানের মালিক আর তার বউকে খাবার পরিবেশন করছে। একবার চোখ তুলে দেখল ওকে, কিছু বলল না।

বিশাল ভুড়িসর্বস্ব শরীর দুলিয়ে বউয়ের কি একটা কথায় হাসছিল জেথ্রো বারোজ, ওকে দেখে নড করল। মাথা ঝাঁকিয়ে রান্নাঘরের দিকে এগোল রোজালিনা। চুলোয় স্টু চাপাল, পাশেরটায় কফির পানি ফুটছে। তাক থেকে কফি-পট নামিয়ে ঢাকনা খুলে কেতলিতে কফির গুড়ো–ঢালল ও। মগে চিনি ঢালছে এসময় এঁটো থালা-বাসন নিয়ে ঢুকল মারিয়া বার্থেজ।

কোথায় গিয়েছিলে? নিচু স্বরে জানতে চাইল সে, রূঢ় ভাবটুকু গোপন থাকল না।

নিকের বাসায়।

কেন?

একটু ভাবল রোজালিনা, তারপর স্থির করল সত্যি কথাটাই বলবে। কেতলি থেকে গরম কফি ঢালল মগে। খুব অস্থির লাগছিল। নিক কিছু জানে কি-না জানতে গিয়েছিলাম।

মারিয়া বার্থেজের সাথে চোখাচোখি হলো ওর, ভৎসনা তার চোখে। এমন করবে না আর। এমনিতেই আমাদের ওপর খেপে আছে ওরা। নতুন কোন অজুহাত আমি ওদের দিতে চাই না। তাছাড়া ক্রুশারের নোংরা লেকগুলো ঘোরাঘুরি করছে সারা শহরে।

দেখেছ তুমি?

মাথা ঝাঁকাল সে। আপেল পাইয়ের কড়াই বসাও।

ঘণ্টাখানেক ধরে এটা-ওটা সারল রোজালিনা। খদ্দের কমে এসেছে। সেলুনের হৈ-হল্লা আর বাজনার শব্দ আবছাভাবে কানে আসছে।

কিছু এঁটো থালা-বাসন নিয়ে কলের কাছে গেল ও, ঘোয়া শুরু করতে পাশে বড় একটা নিঃশ্বাস ফেলার শব্দে চমকে উঠল। ঝটিতি পেছনের দরজার দিকে তাকাল। দরজার পাল্লা ধরে কোনরকমে দাঁড়িয়ে আছে জেমস অ্যালেন।

বিস্ময় আর সুখানুভূতি বাকরুদ্ধ করে ফেলল ওকে, দ্রুত সক্রিয় হতে পারল। থালা-বাসন রেখে গামলার পানিতে হাত ধুয়ে নিল, পরনের অ্যাপ্রনে হাত মুছে এগোল দরজার দিকে।

দরজার ওপর বসে পড়েছে অ্যালেন। ঝড় বয়ে গেছে যেন—বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে। মলিন কাপড় আর ক্লান্তি অসহায় করে তুলেছে তাকে। মৃদু নড করল, স্নান শোনাল কণ্ঠ। দুই দিন ধরে পেটে পড়েনি কিছু। যা-ই আছে আমাকে খেতে দাও, ম্যাম।

মাথা ঝকাল রোজালিনা, খাবারের পাত্রগুলোর দিকে এগোল। পরিবেশনের সময় খেয়াল করল কলের কাছে গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে নিয়েছে জেমস। তার চলাফেরায় স্বতঃস্ফুর্ত, আত্মবিশ্বাসী ভাবটা নেই। বোঝা যাচ্ছে মনের জোরই তাকে কোনরকমে চলতে সাহায্য করছে। টেবিলে গিয়ে বসো, মি. অ্যালেন। তোমার খাবার নিয়ে আসছি।

মাথা নাড়ল জেমস। না, ম্যাম। তোমাদের অসুবিধা না হলে এখানেই খাব। দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে মেঝেতে বসে পড়ল সে, রোজালিনার বাড়িয়ে দেয়া থালা নিয়ে খেতে শুরু করল। সময় নিয়ে খাওয়া সারল।

এই ফাঁকে দুটো টেবিলে স্টু আর পাই পরিবেশন করে এসেছে রোজালিনা। দরজার পর্দা ভাল করে টেনে দিয়েছে যাতে ক্যাফের মূল অংশ থেকে এখানটা কারও চোখে না পড়ে।

কফির স্বাদটা অপূর্ব লাগল জেমসের কাছে, মনে হলো জীবনে এরচেয়ে ভাল কফির স্বাদ বোধহয় পায়নি। ক্রমশ চাঙা হয়ে উঠছে শরীর, অনুভব করে খুশি হলো ও।

মারিয়া বার্থেজকে দেখা গেল দরজায়। ওকে দেখে থমকে দাঁড়াল মহিলা, অনিশ্চিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ। রোজালিনাকে কিছু একটা বলতে চেয়েছিল, বলা হলো না। তারপর দীর্ঘ সময় শেষে কাঁধ ঝাঁকাল, ফিরল মেয়ের দিকে।

রোজালিনা তাকিয়ে আছে তারই দিকে, ওর চোখে ভয় আর আশঙ্কা।

জেমসও খানিকটা দ্বিধান্বিত, ওর মনে হলো মহিলা হয়তো এখুনি ওকে বেরিয়ে যেতে বলবে কিংবা চিৎকার করে ওর উপস্থিতির কথা জানিয়ে দেবে। এখানে এসে ভুল করেছে ও, উপলব্ধি করল হঠাৎ করেই, হয়তো বিপদে ফেলতে যাচ্ছে পরিবারটিকে। স্যাভেজ আর নেবর এমনিতেই ওদের ওপর খেপা, এখন নতুন একটা ছুতো পেয়ে যাবে। এছাড়া অন্য কোথাও যাওয়ার জায়গা ছিল কি? নিজেকেই প্রশ্ন করল ও—ছিল, প্রাইসের মিলে যেতে পারত কিংবা অন্য কোন ক্যাফেতে। কিন্তু দুদিনের ক্ষুধা আর ক্লান্তি ওকে এতটাই নিরুদ্যম ও বিভ্রান্ত করে তুলেছিল যে এখানকার কথা ছাড়া অন্য কিছু মাথায় আসেনি।

জেমস অবাক হয়ে লক্ষ্য করল দৃঢ়চেতা এ মহিলার দৃষ্টি স্বাভাবিক হয়ে এসেছে, ওর উপস্থিতি পছন্দ না করলেও আপাতত মেনে নিয়েছে। কিন্তু রোজালিনাকে স্টু-র ফরমাশ দেয়ার সময় নিরুত্তাপ, তিক্ত শোনাল কণ্ঠ।

মিসেস বার্থেজ ক্যাফের ভেতরে চলে যেতে হাঁপ ছাড়ল রোজালিনা। এবার ভেতরে গিয়ে বসো। রান্নাঘরের মেঝেতে কাউকে পরিবেশন করা খুব অস্বস্তিকর ব্যাপার। ভেবো না কাজটা করে আমি খুব আনন্দ পেয়েছি।

কি যেন ভাবল জেমস, তারপর মাথা নাড়ল। তোমাদের অসুবিধে না হলে এখানে আরেকটু থাকব আমি। যত দেরিতে ওরা আমার খোঁজ পায় তত দ্রুত নিজেকে সামলে নিতে পারব।

বাইরে একটা লোক আছে। দুদিন ধরে দেখছি। নিকের বাড়ির কাছেও একজন আছে, রেব হর্নার। কুশারের কেনা গরু টাকসনে ড্রাইভে নিয়ে যায়। সারা শহরে আরও কজন আছে কে জানে।

কিছু বলল না জেমস, রোজালিনার গভীর কালো চোখে তাকিয়ে আছে। নীরবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে।

বুঝতে পারছি না কেন তোমার পেছনে এতগুলো লোক লেলিয়ে দিয়েছে ক্রুশার। ওরকম মারামারি তো সেলুনে হরহামেশা ঘটে।

হয়তো ওকে খুব বেশি আঘাত দিয়ে ফেলেছি আমি।

রাগ দেখা গেল রোজালিনার মুখে। লোকটাকে আমার ঘৃণা হচ্ছে। কাপুরুষ!

একটু গরম পানি দেবে, ম্যাম? হাতগুলো খুব জ্বালা করছে। গরম পানিতে ভিজিয়ে রাখলে বোধহয় আরামবোধ হবে।

মাথা ঝাঁকিয়ে চুলোর কাছে সরে গেল মেয়েটা, কেতলিতে পানি চড়িয়ে দিল। তোমার ঘোড় কোথায়? মনে হচ্ছে হেঁটে এসেছ? জেমসের কোমরের নিচে ভেজা প্যান্টের দিকে তাকাল, কয়েক জায়গায় কাদা আর শুকনো বালি লেগে আছে।

পাহাড়ে ছেড়ে এসেছি।

ওখান থেকে এতদূর হেঁটে এসেছ! তা-ও এ অবস্থায়?

বিপদে পড়লে মানুষ অনেক কিছু করে, ম্যাম।

কেতলি নামিয়ে একটা পাত্রে পানি ঢালল রোজালিনা, আঙুল চুবিয়ে তাপমাত্রা অনুভব করল। তারপর ওটা এনে জেমসের সামনে রাখল। মনে হচ্ছে এতেই চলবে।

পানিতে হাত ডুবিয়ে দিল জেমস। জ্বালা করে উঠল ক্ষতগুলো। মায়ের ডাকে সামনের রূমে চলে গেল রোজালিনা। টুকরো কিছু কথা ভেসে এল ওদিক থেকে, বুঝতে পারল না ও। অবশ্য শোনার ইচ্ছেও নেই ওর। উষ্ণ তরলের স্পর্শে আরাম পাচ্ছে।

মারিয়া বার্থেজ ঢুকল এবার। অসন্তোষ নেই তার মুখে, তবে নির্লিপ্ত দেখাচ্ছে। সামনে টেবিলে গিয়ে বসো, অ্যালেন। ক্যাফে বন্ধ করে দিয়েছি। আর কোন খদ্দের আসবে না,আজ।

অস্বস্তি বোধ করল জেমস। আমার জন্যে তোমাদের ব্যবসার ক্ষতি হলো, ম্যাম।…ওখানে যেতে হবে না। এরইমধ্যে অনেকটা সুস্থ লাগছে। দিব্যি চলে যেতে পারব।

মহিলার চোখ জ্বলে উঠল। দেখা যাচ্ছে একটা কথা তোমাকে দুবার না বললে চলে না! রূঢ়, কঠিন, নিরুত্তাপ কণ্ঠ। তুমি একটা ঝামেলা এ কথা সত্যি, কিন্তু আমি এড়াতেও পারছি না। আমরা তোমাকে এ অবস্থায় চলে যেতে দিতে পারি না।

উঠে দাঁড়াল জেমস, কলতলায় গামলা খালি করে সেটা একপাশে সরিয়ে রাখল। তারপর পকেটে হাত দিল টাকা বের করতে। ও কিছু বুঝে ওঠার আগেই চড়টা গালে এসে পড়ল।

কি পেয়েছ তুমি, অ্যালেন? এবার আরও চড়ল মারিয়া বার্থেজের গলা। দুজন মহিলাকে অপমান করতে খুব ভাল্লাগছে? তোমার এসব ভালমানুষি আর ভদ্রতা অন্য কারও জন্যে রেখে দাও, আমার সাথে ওসব চোটপাট দেখাবে না!

জীবনে এতটা বিস্মিত হয়নি জেমস। অবাক হয়ে মহিলার দিকে তাকিয়ে থাকল। বুঝতে পারছে না সমস্যাটা কোথায় হয়েছে। পাশ ফিরতে দরজায় রোজালিনার উদ্বিগ্ন মুখ চোখে পড়ল। একরাশ অস্বস্তি ঘিরে ধরল ওকে, মেক্সিকান এ মহিলাকে বুঝতে পারছে না বলে নিজের ওপরই রাগ লাগছে।

যাও, ভেতরে গিয়ে বসো! নির্দেশের মত শোনাল মিসেস বার্থেজের গলা। চুলোয় কফির পানি চড়িয়ে ঘুরে তাকাল জেমসের দিকে। এবার কোমল হয়ে এল তার কণ্ঠ। দুঃখিত, অ্যালেন। তোমার গোয়ার্তুমিও আমার মেজাজ খারাপ হওয়ার জন্যে দায়ী।

রোজালিনার পিছু নিয়ে ভেতরে এসে বসল জেমস। খেয়াল করল ক্যাফের সামনের দরজা বন্ধ। জানালার পর্দাগুলো নামানো। মাত্র দুটো লণ্ঠন ম্লান আলো বিতরণ করছে সারা ঘরে।

উল্টোদিকে বসল মেয়েটা, টেবিলের দিকে তাকিয়ে আছে। আনমনে হাতের নখ খুঁটছে। একটা অনুরোধ করব? মুখ তুলে তাকাল রোজালিনা, দৃষ্টিতে প্রত্যাশা।

মাথা ঝাঁকাল জেমস।

দয়া করে অযথা মা-র সাথে তর্ক কোরো না।

জেমস উত্তরে কিছু বলার আগেই ধূমায়িত কফি নিয়ে ওদের সাথে যোগ দিল মারিয়া বার্থেজ। গম্ভীর দেখাচ্ছে তাকে, নীরবে একটা মগ এগিয়ে দিল ওর দিকে। মেয়ের পাশে বসে পড়ল এরপর। শোনো, অ্যালেন, মনগড়া কিছু বলে আমাকে বুঝ দিতে পারবে না। সুতরাং সে-চেষ্টাও কোরো না। আমি স্পষ্ট জানতে চাই তুমি কে, কেন এখানে এসেছ। তোমার আসার পর থেকে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো মোটেও স্বাভাবিক কিছু নয়।

জানাটা জরুরী কি?

হ্যাঁ, জরুরী, একবার মেয়ের দিকে তাকাল মহিলা। যেভাবে হোক তোমার সাথে জড়িয়ে পড়েছি আমরা, আমার ধারণা প্রাইসদের চেয়েও বেশি। লুকোচুরির কোন ব্যাপার আমার মধ্যে নেই, জিনিসটা পছন্দও করি না। আমি চাই না মিথ্যে পরিচয় দিয়ে আমাদের সাথে পরিচিত হোক কেউ। সত্যিটা জানার অধিকার, আমাদের আছে, তাই না?

অস্বস্তিভরে সায় জানাল জেমস। তোমাদের না জানাই ভাল, ম্যাম। এমনিতেই আমাকে সাহায্য করে বিপদে আছ। বিপদটা আমি আর বাড়াতে চাই না।

কি মনে করো আমাদের? এখানকার টিনস্টারগুলোর পরোয়া করি না আমি। এরচেয়ে কঠিন মানুষ জীবনে ঢের দেখেছি। ওরা সাহস দেখাতে পারে কেবল অবলা আর নিরীহদের সাথে।

মনঃসংযোগ হারাল জেমস, মোনা আর ফ্রেডকে মনে পড়ছে। ক্লান্তি লাগছে ওর। এটা ওর একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার, এর সাথে অন্য কাউকে জড়ানোর মানে হয় না। কারও সহানুভূতি ওর দরকার নেই। তবে এটা ঠিক, এ দুজন মহিলার প্রতি অসীম কৃতজ্ঞতা ওর-ঋণের বোঝাটা পাহাড়সমান।

থাক, বলতে হবে না, জেমসের সিদ্ধান্তহীনতায় স্নান হাসল রোজালিনা। আমাদের জানা বা না-জানায় এমন কিছু যাবে-আসবে না।

চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল মারিয়া বার্থেজ, জেদ ফুটে উঠেছে চেহারায়। বোঝা যাচ্ছে জেমসের কাছ থেকে উত্তর পাওয়ার অপেক্ষায় আছে এখনও। ওপরে যা, রোজ, মেয়ের দিকে না ফিরেই বলল। গেস্টরুমটা ঠিক করে দে। আমরা কথা বলে আসছি।

আমি এখুনি চলে যাব।

কোথায়? সারা শহরে ক্রুশারের লোকজন, ফাঁকি দিতে পারবে না ওদের।

কোন একটা জায়গা মিলবেই।

আহত দৃষ্টিতে জেমসকে দেখছে রোজালিনা। অসহায় দেখাচ্ছে তাকে, চোখাচোখি হতে চোখ সরিয়ে নিল। মাথা নিচু করে টেবিলের দিকে তাকিয়ে, সংশয় আর সিদ্ধান্তহীনতার ঝড় চলছে লোকটির মনে, আঁচ করল রোজালিনা। থাক, মা। ও যখন বলতে চাইছে না তখন জোর করা কি ঠিক হবে? বোঝাই যাচ্ছে আমাদের অনুরোেধ ওর অহঙ্কারকে টলাতে পারবে না।

ঝট করে উঠে দাঁড়াল জেমস। দুঃখিত, ম্যাম, মহিলাদের দিকে সরাসরি তাকাল না ও। হয়তো পরে কোন একসময় বলব তোমাদের। ঘুরে দাঁড়িয়ে কিচেনের দিকে এগোল। হাঁটতে কিছুটা দুর্বল বোধ করছে কিন্তু দৃঢ় পা ফেলে চলে এল রান্নাঘরে।

মি. অ্যালেন? পেছনে চাপা স্বরে ওকে ডাকল রোজালিনা।

ঘুরে তাকাল জেমস, দেখল মেয়েটাকে। উদ্বিগ্ন মুখ, কালো গভীর চোখে অস্থিরতা।

সামনে এসে দাঁড়াল রোজালিনা, মুখ তুলে তাকাল। সাবধানে থেকো। আর…কোন অসুবিধে হলে এখানে চলে এসো।

সেটা কি ঠিক হবে?

কেন, সমস্যা কোথায়?

বোকা মেয়ে, ভাবল জেমস। ক্ষীণ হাসল ও, মাথা ঝাঁকিয়ে সায় জানাল কিন্তু রোজালিনার প্রশ্নটা এড়িয়ে গেল। বেরিয়ে এল বাইরে। পেছনে মেয়েটার পায়ের শব্দ শোনা গেল, দরজা পর্যন্ত এসে থামল, তারপর কিছুক্ষণ বাদে দরজা আটকে দিল।

দাঁড়িয়ে থেকে অন্ধকারে চোখ সইয়ে নিল জেমস অ্যালেন। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে জরিপ করল পুরো জায়গাটা, চিন্তিত হওয়ার মত কিছু নেই। সমস্যা হবে পরে, জানে ও, যখন ক্রুশারের কোন লোক ওকে দেখতে পাবে। ভীমরুলের চাকে ঢিল পড়ার মত অবস্থা হবে, হন্যে হয়ে ওকে খুঁজে বেড়াবে লোকগুলো।

উত্তরে এগোল ও, অন্ধকারে চোখ সয়ে আসায় অসুবিধে হচ্ছে না। চাদের ম্লান আলো ছাড়াও আশপাশের বাড়িগুলো থেকে কিছু আলো এসে পড়েছে রাস্তায়। এ পথে কয়েকবার যাওয়া-আসা করায় চেনা হয়ে গেছে। রবার্ট হার্ডিংয়ের সেলুমের কাছে এসে একবার ভাবল ভেতরে ঢুকে পড়ে, কিন্তু সাথে সাথেই চিন্তাটা বাতিল করে দিল। স্বয়ং ক্রুশার এখানে থাকতে পারে, আরও দুএকজনকে তো পাওয়া যাবেই। লপার, নেবর বা স্যাভেজও থাকতে পারে। সব কজনকে একসাথে মোকাবিলা করার সামর্থ্য ওর নেই, আগে বরং চুনোপুঁটিদের শিকার করা যাক। ওদের শক্তি কমুক, তারপর দেখা যাবে কি করে আসল তিনটাকে বাগে পাওয়া যায়।

কেভিন লপারের স্টোরের পাশের গলি ধরে মূল রাস্তায় চলে এল জেমস। কিছু বাড়িতে আলো জ্বলছে এখনও, সেলুনগুলো জমজমাট। নাপিতের দোকানের অন্ধকার কোণে দাঁড়িয়ে রাস্তার আনাচে-কানাচে, বাড়ির কোণগুলো নিরীখ করল। রোজালিনাদের ক্যাফের সামনের ফুটপাথে একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে, আস্তাবলের কাছে আরও দুজন। ঠায় দশ মিনিট অপেক্ষা করল ও, আর কাউকে খুঁজে পেল না। থাকলেও ওর অজান্তে রয়ে গেছে।

রাতটা কোথায় কাটাবে এ নিয়ে ভাবছে। নিকোলাস প্রাইসের ডেরায় কাটিয়ে দিতে পারে, যদিও তা যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ কারণ কুশারের লোকেরা সবার আগে ওখানেই খুঁজবে। তাছাড়া রোজালিনার কথা অনুযায়ী ওখানে অন্তত একজনের থাকার কথা। লোকটাকে কাবু করা হয়তো কঠিন হবে না। ওর সুবিধে লোকগুলো এখনও জানে না শহরে চলে এসেছে জেমস।

কিছুটা অধৈর্য লাগছে। দুই দিনের ক্ষুৎপিপাসা আর পরিশ্রম কাহিল করে ফেলেছে ওর শরীর। শয়তানগুলোকে চেপে ধরার ইচ্ছে হচ্ছে। কিন্তু জানে সেটা কঠিন হবে, অন্তত এখন। আগে কুশারের দলটাকে সামলাতে হবে, তারপর লপার আর ওর সঙ্গীদের সামনে যাওয়া যাবে।

রোজালিনা বার্থেজের কমনীয় মুখটা ভেসে উঠল ওর মানসপটে। উদ্বেগ আর অস্থিরতায় ভরা চোখজোড়া টানছে ওকে। অবাক হয়ে লক্ষ্য করল ক্যাফেতে ফিরে যেতে ইচ্ছে করছে। নিঃসন্দেহে সারা লিয়ন সিটিতে ওটাই ওর জন্যে সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা।

কারসনদের বাড়ির সামনে আসতে ভুলটা বুঝতে পারল জেমস। বিশগজ দূরে অন্ধকার কুঁড়ে বেরিয়ে এসেছে ওরা। তিনজন। ঘোড়ায় চেপে আছে। মাঝখানের লোকটা বিশালদেহী, অস্পষ্ট আলো আর নিচু করে রাখা হ্যাট আড়াল করে রেখেছে মুখ। ধীরে এগিয়ে আসছে, পাশের বাড়ির জানালা পথে আসা চৌকো আলো পড়ল লোকটির ওপর, এক ঝলকের জন্যে রিক স্যাভেজের দৃঢ় পেশীবহুল মুখটা দেখল ও।

বিচিত্র একটা শব্দে উল্লাস প্রকাশ করল মার্শাল। থেমে গেল তার ঘোড়া, মাথা নাড়ল অস্থির ভঙ্গিতে।

দো-আঁশলাটা কোথায়? ভাবছে জেমস, একসাথে থাকার কথা ওদের। সহসা ক্ষীণ আওয়াজ পেল পেছনে, বুটের আঘাতে একটা নুড়িপাথর গড়ানোর হালকা শব্দ। ঠায় দাঁড়িয়ে পড়ল ও, সীমাহীন সতর্কতা গ্রাস করল ওকে। শীতল একটা অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল শিরদাঁড়া বেয়ে। মনে মনে নিজের চোদ্দগোষ্ঠি উদ্ধার করছে, ক্ষণিকের অসতর্কতার সুযোগ নিয়েছে ওরা। বোকার মত ফাদে পা দিয়েছে সে। দুদিক থেকে সহজেই ওকে কচুকাটা করে ফেলতে পারবে ওরা।
বড় বেয়াড়া লোক তুমি, অ্যালেন, রিক স্যাভেজের গলায় চাপা উল্লাস। কিন্তু কপাল খারাপ, নইলে কি আর আবার আমার সাথে দেখা হয়? হাসল সে, হাসিটার আওয়াজ বীভৎস শোনাল জেমসের কানে।

দেখা যাচ্ছে রাতে ডিউটি দেয়াই তোমার পছন্দ, স্যাভেজ, হালকা সুরে বলল জেমস। কান খাড়া, আর মনোযোগ সামনের তিনজনের চেয়ে পেছনেই বেশি। শত্রুর সংখ্যা আর অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ঠিকই, ভাবছে ও, কিন্তু লড়াইয়ে নিয়ামক হয়ে দাঁড়াবে পেছনের লোকটা।

তাতে তোমার কি? রাত-দিন চব্বিশ ঘণ্টাই আমার ডিউটি! ঝামটে উঠল মার্শাল।

এখানে এসেছ কেন?

তোমাকে ধরতে। চার-চারটা খুন করে ঘুরে বেড়াচ্ছ। আরও কটা যে করে ফেলো কে জানে!

ওরা কি পাসির সদস্য? স্যাভেজের সঙ্গীদের দিকে ইঙ্গিত করল জেমস।

অনেকটা তাই।

পাহাড়ে আমাকে তাড়া করল যে লোকগুলো, ওরাও কি পাসির সদস্য ছিল? তুমি ওদের অনুমোদন দিয়েছ?

আমি স্বীকার করলে ব্যাপারটা তাই দাঁড়ায়।

ব্যাপার তাহলে এই, হাসল জেমস, সতর্ক দৃষ্টি বুলাল সবার ওপর। হেনরী ক্রুশারের কুকুরগুলো হচ্ছে পাসির সদস্য, আর তুমি গা-মোটা মূখ তাদের নেতা। এই তো?

বেশি ডাঁট দেখাচ্ছ, অ্যালেন! শীতল শোনল মার্শালের কণ্ঠ। একবার সেলের ভেতর ঢুকিয়ে নিই, তারপর দেখব তোমার উট কোথায় যায়।

হাত-পা চারটে বেঁধে নিয়ো এবার, সহাস্যে পরামর্শ দিল ও। টের পেল পেছনে অধৈর্য হয়ে নড়েচড়ে দাঁড়িয়েছে লোকটা। উঁহু, দো-আঁশলা নয়। নেবর হলে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকত। ইতোমধ্যে লোকটার অবস্থান আঁচ করে নিয়েছে ও। দুপা সরে এল জেমস, নিজের সাথে লাইন অভ ফায়ারে ফেলল পেছনের লোকটাকে।

আগের জায়গায় ফিরে যাও, অ্যালেন! খেঁকিয়ে উঠল মার্শাল। এই যে হর্নার, এগিয়ে এসে ওর পিস্তলটা তুলে নাও তো, আমি ওকে কাভার করছি। দেখি ড্র করার খায়েশ ওর হয় কি-না। তেমন হলে সবাই মিলে বুলেটে পেট ভরিয়ে দেব।

শিথিলভাবে দেহের দুপাশে ঝুলছে ওর হাতু, পা ফাঁক করে দাঁড়িয়ে, শরীর টান টান। হর্নার মিয়া, জায়গা ছেড়ে নড়ো না, মৃদু স্বরে উপদেশ খয়রাৎ করল। এক পা এগোলে মার্শালের বুক ফুটো করে দেব। স্যাভেজের ওপর থেকে এক মুহূর্তের জন্যেও চোখ সরাল না জেমস।

সশব্দে হাসল মার্শাল। একা চারজনের সাথে পেরে ওঠার কথা চিন্তা করছ নাকি? তাচ্ছিল্য ভরা কণ্ঠে বলল সে। দারুণ দুঃসাহসী লোক দেখছি! বোকারাই এরকম দুঃসাহস দেখায় এবং শেষে মরে।

পেছনে নড়াচড়ার শব্দ হতে ছোবল মারল জেমসের হাত। ঝটিতি উঠে এল সিক্সশ্যটার। হাসিটা বিস্তৃত হচ্ছিল দানবের, মাঝপথে থেমে গেল। বিশাল হাতে হোলস্টারে খাবলা মারল সে, পিস্তল তুলে আনতে যাচ্ছে। টের পেল দেরি হয়ে গেছে, একইসঙ্গে বুলেটের তীব্র ধাক্কা অনুভব করল বুকে। স্যাডলের ওপর টলে উঠল বিশাল দেহ, জেমসের দ্বিতীয় গুলি তার পতন ত্বরান্বিত করল এবার।

ডান দিকের লোকটা কোলে রাখা পিস্তল তাক করে ফেলেছে। তাকে গুলি করার সময় এক-পা সরে গেল জেমস। তপ্ত সীসা ওর গালে গরম ছেকা দিয়ে চলে গেল। দ্বিতীয়বার আর সুযোগ দিল না তাকে, ঝুঁকে পড়া শরীরটা ধরাশায়ী হলো ওর গুলিতে।

ঊরুর ওপর হাতুড়ির বাড়ি পড়তে ভারসাম্য হারাল জেমস, সামনের দিকে হেলে পড়ল। ঠিক এসময়ে পেছন থেকে বাম কাঁধের এক খাবলা মাংস তুলে নিয়ে চলে গেল আরেকটা বুলেট। হর্নারের কীর্তি। ধূলিশয্যা নিল ও, প্রায় সঙ্গে সঙ্গে গড়ান দিয়ে উঠে দাঁড়াল। সামনের লোকটা গুলি করতে যাচ্ছে দেখে আন্দাজের ওপর নিশানা ছাড়াই গুলি করল। ফলাফল দেখার সুযোগ নেই, উল্টোদিকে ঘুরল এবার। দেখল হর্নারকে, পরের গুলি করার তোড়জোড় করছে সে। রেব হর্নারের গলা ফুটো করে দিল ওর বুলেট, মাটির ওপর আছড়ে পড়ল দেহটা। গলগল করে রক্ত পড়তে শুরু করল।

দূরে একটা চড়া গলা শোনা গেল, তারপর কয়েকজনের দৌড়ে আসার শব্দ। নিজেকে অসহায় লাগছে জেমসের, দাড়িয়ে থাকা ঘোড়াগুলোর দিকে এগোতে গিয়ে টের পেল পায়ে জোর পাচ্ছে না। হোঁচট খেয়ে পড়তে গিয়েও কোনমতে সামলে নিল। তীব্র ব্যথা ছড়িয়ে পড়ছে সারা শরীরে। পরোয়া করল না ও, জানে যেভাবেই হোক কেটে পড়তে হবে।

রিক স্যাভেজের ঘোড়াটা দাঁড়িয়ে আছে, স্যাডলশূন্য। কাছে যেতে হুঁশ ফিরল ওটার, সরে যেতে চাইল। হাত বাড়িয়ে রাশ টেনে ধরল জেমস, ঘোড়াটা চলতে শুরু করতে পমেল আঁকড়ে ধরে লাফ দিল। ভয় পেয়ে দ্বিগুণ হয়ে গেল জানোয়ারটার গতি। পমেল ধরে স্যাডলে চেপে বসার চেষ্টা করছে ও, এ অবস্থায় দেখতে পেল লোকগুলোকে—গলির মুখে চলে এসেছে। নিশানা ছাড়াই গুলি করল জেমস, প্রতিপক্ষকে ব্যস্ত রাখতে চাইছে। সরে গিয়ে আড়াল নেয়ার চেষ্টা করল দুজন, আরেকজন শুয়ে পড়েছে। চতুর্থ লোকটা পড়ে গেল হাঁটু ভেঙে।

আড়াল নেয়া লোকগুলো গুলি করছে।

খেয়াল করেনি জেমস, ঘোড়াটা হঠাৎ দিক বদল করার সময় তাই তীব্র টান পড়ল হতে। যন্ত্রণায় চোখে অন্ধকার দেখল ও। দাঁতে দাঁত চেপে পমেল আঁকড়ে ধরে থাকল, হেঁচড়ে ওঠার চেষ্টা করল স্যাডলে। ততক্ষণে কারসনদের আঙিনায় ঢুকে পড়েছে ঘোড়াটা। চোখের নিমেষে পেরিয়ে গেল বাড়িটা, করালের পাশ দিয়ে ছুটছে। বাইরে ফেলে রাখা খড়ের গাদা পাশ কাটানোর সময় ফের বাঁক নিল। এবার আর সামলাতে পারল না জেমস, পমেল থেকে হাত ছুটে গেছে। খড়ের গাদার ওপর আছড়ে পড়ল ওর দেহ। স্কুণ-ঘরের দিকে ছুটে চলেছে আতঙ্কিত ঘোড়াটা।

ছুটে ওকে পেরিয়ে গেল তিনজন। কিছুদূর গিয়ে থেমে গেল।

শালা ভেগেছে! চাপা স্বরে বিরক্তি প্রকাশ করল একজন।

কি করবে এখন? আরেকটা কণ্ঠ শোনা গেল।

নিথর পড়ে থাকল জেমস, ভয় তো পাচ্ছেই তাছাড়া নড়াচড়ার শক্তিও পাচ্ছে। উরুতে প্রচণ্ড যন্ত্রণা হচ্ছে, কাঁধের কাছে অবশ হয়ে গেছে ডান বাহু। দপদপানির মত একটা ব্যথা সারাক্ষণই ছড়িয়ে পড়ছে একেবারে হাতের আঙুল পর্যন্ত। কণ্ঠস্বরগুলো চেনার চেষ্টা করল ও। উঁহু, অপরিচিত, আগে কখনও শোনেনি।

ঘটনাটা এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না আমি, বলল প্রথম লোকটা। স্যাভেজ মারা গেছে! ওর সাথে আরও তিনজন ছিল। ভেবে দেখো, অ্যালেনের সাথে কোন সুবিধাই করতে পারেনি ওরা।

চোপরাও, জন! ধমকে উঠল অন্যজন। গলায় বিরক্তি আর খানিকটা ভয়ও প্রকাশ পেল। বোকামি করেছে স্যাভেজ, ওকে দেখেই গুলি করা উচিত ছিল। বেশি বড়াই করলে এরকমই হয়। ব্যাটা আজীবনই নিজের শক্তি দেখাতে পছন্দ করত। এখন মজা বুঝেছে! তবে আমাদের কাজটা সহজ করে দিয়েছে ও। অ্যালেন আহত হয়েছে, হলফ করে বলতে পারি। খেয়াল করোনি?

তাতে লাভটা কি হচ্ছে শুনি?

গাধা! ওকে ধরা এখন সহজ হয়ে যাবে। শহরের আশপাশে থাকবে ও, যেহেতু ওর শুশ্রুষা দরকার। এখন ঘোড়ায় চেপে পালিয়েছে ঠিকই, কিন্তু ওকে শহরে ফিরতেই হবে।

অনুসরণ করবে নাকি?

এই অন্ধকারে? মাথা খারাপ! আমি আর এগোতে রাজি নই। না জেনে হয়তো ওর সামনে গিয়ে পড়ব, আর একটা গুলিতে ল্যাঠা চুকিয়ে দেবে সে। না বাপু, আজ আর কোথাও বেরোব না। তাছাড়া ট্র্যাকিং করব কিভাবে? তারচেয়ে

সকাল হোক, দেখে-শুনে এগোতে পারব।

আমার মনে হয় আশপাশেই আছে ও, জেফ, নিচু কণ্ঠে বলল জন, গলায় জোর নেই।

চোখের মাথা খেয়েছ নাকি? বিরক্তিতে গজগজ করে উঠল জেফ নামের লোকটা। ওকে ঘোড়ায় চড়তে দেখোনি? তোমার মত বোকা নয় ও। বাহন পেয়েও কেউ খালি পায়ে পালাবে, তা-ও আহত অবস্থায়?

তা ঠিক। কিন্তু আমাদের ভাওতা দিতে চাইলে…

তাহলে তুমিই যাও, জন, খুঁজে বের করো ওকে। টাকাটা তাহলে একাই পাবে। তবে মনে রেখো স্যাভেজ বাগে পেয়েও আটকে রাখতে পারেনি অ্যালেনকে এবং ওর সাথে আরও তিনজন ছিল। দুশো ডলারের আশায় যদি কপালে একটা বুলেট নিতে চাও তো তোমাকে বাধা দেব না।

এভাবে বলছ কেন? আমি কি সত্যি তাই বলেছি নাকি?

হয়তো টাকাটা একা কামাই করার খায়েশ হয়ে থাকবে তোমার! বিদ্রুপ করল জেফ।

জন নামের লোকটা তর্ক করল না। চলো, মি. লপারের বাড়ি যাই। তাকে জানিয়ে আসি। তার আগে অবশ্য আন্ডারটেকারের কাছে যাওয়া উচিত। লাশগুলো ােের দিতে হবে।

স্যাভেজ আর ওদের জন্যে তোমার দেখছি ভারি চিন্তা হচ্ছে! আরে, সে তোমার দুলাভাই নাকি? ও তো এখন একটা লাশ! রাস্তার মরা কুকুরের সাথে ওর পার্থক্য কোথায়? সকাল পর্যন্ত পড়ে থাকলই বা। ওকে আগে কবরে শোয়ালে কি স্বর্গে যাবে? শুনে রাখো, জন, ওর আর আমাদের রাস্তা ওই এক জায়গায়ই…নরকে।

মৃদু পদশব্দ এগিয়ে আসতে শুরু করল। বাঁক নিয়ে স্কুলের পাশ দিয়ে মূল রাস্তার দিকে চলে গেল একটু পর।

চেপে রাখা নিঃশ্বাস ছাড়ল জেমস। চিৎ হয়ে পড়ে থাকল কিছুক্ষণ। আকাশের দিকে তাকাল, কয়েকটা তারা ঝিকিমিকি করছে। তীব্র ব্যথা শুরু হলো এবার, উত্তেজনায় টের পায়নি এতক্ষণ। একটা আশ্রয় চাই, অবচেতন মনে ভাবছে, ক্ষতের চিকিৎসা দরকার। হেনরী ক্রুশারের লোকেরা আপাতত বিরতি দিলেও সকাল থেকে আবার পিছু নেবে, ট্রাক ধরে ওকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করবে।

কারসনের বাড়িতে বা করালে রাত কাটানো নিরাপদ হবে না। প্রথমে এখানেই খুঁজবে ওরা, প্রাইসের মিলের ক্ষেত্রেও তাই। তাছাড়া অতটা পথ যাওয়ার শক্তি বোধহয় ওর শরীরে নেই। ক্ষতগুলো থেকে চুইয়ে রক্ত ঝরছে, বেশি নড়াচড়ায় ক্ষরণ বেড়ে যাবে।

সময় যেন স্থির হয়ে আছে। তেষ্টায় মুখ শুকিয়ে গেছে, অনুভব করল জেমস। দশ হাত দূরে কারসনদের কল, কিন্তু যোজন দূরে মনে হচ্ছে ওটাকে। ইচ্ছে থাকলেও নড়ল না, শরীরটা আগে সুস্থির হোক, তারপর একবারে উঠে পড়বে।

স্কুল-ঘরের ওপর চোখ পড়তে ধারণাটা মাথায় এল ওর। মন্দের ভাল। কষ্টে-সৃষ্টে উঠে দাঁড়াল, দুর্বল বোধ করছে। অস্পষ্ট, আলোয় খড়ের গাদার কিছু অংশ কালচে দেখাচ্ছে, জেমস বুঝতে পারল ওগুলো ওর রক্তে ভিজেছে। ঝুঁকে বেশ কিছু খড় তুলে নিল, নিশ্চিত যে তেমন কোন চিহ্ন রেখে যাচ্ছে না। এবার স্কুলের দিকে এগোল। ঘোড়াটা হয়তো অনেকদূর নিয়ে যাবে ওদের, ও যে এখানেই ছিল লোকগুলো তা না-ও ভাবতে পারে। সে সম্ভাবনাই বেশি। শেষপর্যন্ত ট্রেস করতে পারলে অবশ্য পরিষ্কার হয়ে যাবে সব। তবু সকাল পর্যন্ত সময়টুকু পাওয়া যাবে, ভাবছে জেমস, এবং এরমধ্যে সরে পড়তে হবে।

কোণের কামরাটা অফিস। ক্লাস রুমগুলোর মত এটাও তালা আটকানো। মুহূর্তের জন্যে দ্বিধা হলো ওর, তারপর সেটা নাকচ করে দিল। এছাড়া উপায় নেই, এটাই আপাতত ওর জন্যে নিরাপদ আশ্রয়, অন্তত আজ রাতের জন্যে। পিস্তল বের করে তালার ওপর গায়ের জোরে বাট নামিয়ে আনল জেমস। দুবারের চেষ্টায় সফল হলো। তালার কিছু হলো না, নরম কাঠের পাল্লা থেকে আঙটা খুলে এসেছে। ঠেলা দিতে সরে গেল কবাটদুটো। ভেতরে ঢুকে দরজা ভিড়িয়ে দিল ও, পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়াল। দেয়াশলাই বের করে জ্বালাল, মৃদু আলোয় নজর বুলাল ঘরের ভেতর। মাঝখানে বড়সড় একটা টেবিল, দুদিকে মোট চারখানা চেয়ার। পাশেই একটা নিচু তাক, তাতে কিছু কাগজপত্র। টেবিলে একটা জগ আর গ্লাসও আছে। পেছনের দেয়ালের কাছে কাঠের আলমারি।

টেবিলের ওপর রাখা লণ্ঠন জ্বালাল জেমস, সলতে কমিয়ে দিল। অস্পষ্ট আলো ছড়িয়ে পড়ল ঘরে। একটা চেয়ার তুলে নিয়ে দরজার দিকে এগোল। পা টেনে নিয়ে এগোচ্ছে যাতে ঊরুর ওপর চাপ না পড়ে। অন্যসময় হলে যে কাজটা অনায়াসে করতে পারত, সেটাই এখন ভোগাচ্ছে ওকে—সামান্য একটা চেয়ার টেনে নিতে হাঁপিয়ে উঠল। দরজার কাছে চেয়ার রেখে বেরিয়ে এসে বারান্দা থেকে খড়গুলো তুলে নিল, ফিরে এসে টেবিলের পেছনে খালি জায়গায় মেঝেতে বিছিয়ে দিল। তাকের কাছে চলে এল এবার। হাঁপানি রোগীর মত হাঁপাচ্ছে রীতিমত। মাথা ঝিমঝিম করছে। ওর ভয় হচ্ছে এখুনি হয়তো ধড়াস করে পড়ে যাবে। প্রবল মনের জোরই ওকে টিকিয়ে রেখেছে এতক্ষণ পর্যন্ত।

জগে পানি দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল জেমস অ্যালেন। কাঁপা হাতে গ্লাসে পানি ঢেলে পান করল। স্বস্তি লাগছে। রোজালিনা…এ মেয়েটা ভালভাবেই পেয়ে বসেছে আমাকে। দেখা যাচ্ছে লিয়ন সিটিতে নিরাপদ জায়গাগুলোতে এ মেয়েটির স্পর্শ থাকছেই-ক্যাফে…স্কুল। কৃতজ্ঞচিত্তে পুরো পানিটা শেষ করল ও, তেষ্টায় কষ্ট পাচ্ছিল এতক্ষণ। জগে পানি না থাকলে কলের কাছে যেতে হত আবার। অজান্তে ওর মস্ত উপকার করে রেখেছে মেক্স মেয়েটি।

দরজা ভিড়িয়ে দিয়ে চেয়ারটা ঠেস দিয়ে রাখল কবাটের সাথে। প্রচণ্ড ক্লান্তি কাবু করে ফেলেছে, মনে হলো শরীরে একবিন্দু শক্তি নেই। ধপ করে বসে পড়ল ও। ঘনঘন শ্বাস ফেলছে, স্বাভাবিক হতে ব্যানডানা দিয়ে উরুর ক্ষতটা বাধল। নড়াচড়া করায় রক্তক্ষরণ বেড়ে গেছে। কোন রকমে টেবিলের কাছে এসে লণ্ঠন নিভিয়ে দিল। অন্ধের মত হাতড়ে চলে এল খড়ের বিছানার কাছে।

হাতে পিস্তল নিয়ে শুয়ে পড়ল জেমস অ্যালেন। তীব্র ব্যথার মধ্যেও একরাশ প্রশান্তি ঘিরে ধরল ওকে, চোখ বুজে আসতে চাইছে। মোনর মুখ ভেসে উঠল ওর চোখে…একটা শেষ, সন্তুষ্ট হয়ে ভাবল…আর দুজন বাকি।

ঘুম আসছে না রোজালিনার, বারবার মনে পড়ছে জেমস অ্যালেনকে। কিছুতেই ভুলতে পারছে না দৃঢ় মুখটা। একটু আগে অনেকগুলো গুলির শব্দ শোনার পর থেকে উৎকণ্ঠায় মরে যাচ্ছে ও। খারাপ কিছু ঘটেনি তো? কোথায় আশ্রয় নিয়েছে গোঁয়ার লোকটা?

সারা রাত উদ্বেগের মধ্যে কাটল ওর। শেষ রাতে ঘুম নেমে এল চোখে, জাগল দেরি করে। গির্জায় যাওয়ার খানিক আগে ওকে জাগাল মারিয়া বার্থেজ উঠে গোসল সেরে খানিকটা মুখে দিয়ে বেরিয়ে পড়ল। ক্যাফের উল্টোদিকে পাহারায় নেই কেউ আজ। মহিলা আর বাচ্চারা গির্জার দিকে চলেছে, পুরুষের সংখ্যাও কম নয়।

লরা প্রাইসের পাশে বসল ও। প্রার্থনা শুরু হয়ে গেছে। জীবনে এই প্রথম বাপ ছাড়া অন্য কোন পুরুষের জন্যে প্রার্থনা করল রোজালিনা। কোন খবর জানো, ম্যাম? বেরিয়ে আসার সময় মিসেস প্রাইসের কাছে জানতে চাইল ও।

তুমি কিছু শোনোনি? চাপা স্বরে বলল মহিলা, উত্তেজিত দেখাচ্ছে তাকে। ক্রুশারের দুজন লোক মারা গেছে। আরেকজনের অবস্থাও বিশেষ সুবিধের নয়। গরম খবর হচ্ছে রিক স্যাভেজ মারা গেছে।

কেন জানি খুশি হলো রোজালিনা। জঘন্য একটা লোক মারা গেছে, লিয়ন, সিটির কারও তাতে দুঃখিত হওয়ার কিছু নেই, ভাবল ও। ভয়ও পেল, বুঝতে পারল নেবর বা ক্রুশার এবার মরিয়া হয়ে উঠবে। অ্যালেনকে কোনভাবেই ছেড়ে দেবে না। চারপাশে তাকাল ও, দুজন মহিলা পেরিয়ে গেল ওদের। এগোতে গিয়ে বাধা পেল ও, ওর হাত ধরে থামাল লরা প্রাইস। টেনে নিয়ে গেল বারান্দার দিকে।

পুরো ঘটনা দেখেছে বিল কারসন, বলল মহিলা। ঘর অন্ধকার করে জানালায় দাড়িয়ে ছিল ও। দুদিক থেকে জেমসকে চেপে ধরেছিল তারা। শেষে, আরও লোক এসে পড়ায় একটা ঘোড়ায় চেপে কেটে পড়েছে ও। বিলের ধারণা জেমস আহত হয়েছে।

রোজালিনার চোখে উদ্বেগ দেখা গেল। ও হয়তো তোমাদের ওখানে আসবে। সাহায্য দরকার হবে ওর।

ওর একটা হাত ধরে চাপ দিয়ে অভয় দিল লরা প্রাইস। গতকাল ক্যাফেতে এসেছিল ও, তাই না?

নড় করল ও, এগোল ফিরতি পথে। সামনে কেভিন লপারকে দেখে থমকে গেল, অজান্তে হাঁটা শ্লথ হয়ে গেল।

টুপি খুলে সম্মান দেখাল সে। কেমন আছ, মিস্ বার্থেজ?

ভাল। তুমি? হাসার চেষ্টা করল ও।

খানিকটা। তবে জেমস অ্যালেন ভাল থাকতে দিচ্ছে না।

ওর সাথে তোমার আবার কি ঘটল?

বাইরের একটা লোক এ শহরের মার্শালসহ অন্তত আটজনকে খুন করেছে। আতঙ্কিত হয়ে আছে সবাই। এ অবস্থায় কি ভাল থাকা যায়?

তোমার অসুবিধে কি, তুমি তো আর ওকে খোচাতে যাচ্ছ না! নাকি শুরু করেছ?

ম্লান হলো না লপারের হাসি। দেখা যাচ্ছে এখানে কিছু শুভাকাক্ষী জুটিয়ে নিয়েছে অ্যালেন, কিন্তু একজন আসামী সে। দুশো ডলারের একটা পোস্টার ছাড়া হবে আজই। রেনে নেবর দশজনের পাসি গঠন করে লোকটাকে ধরার জন্যে ইতোমধ্যে বেরিয়েও গেছে। ধরতে পারলে সোজা ঝুলিয়ে দেবে।

প্রার্থনা করেছ তো ওরা যেন সফল হয়?

থমকে গেল কেভিন লপার। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল ওর দিকে। নীল চোখে একরাশ বিদ্বেষ দেখা গেল।

লপারের ওপর থেকে চোখ সরিয়ে মিসেস প্রাইসের দিকে ফিরল রোজালিনা। বিদায় জানাল তাকে, মৃদু হেসে চলে গেল মহিলা।

মিস বার্থেজ!

লপারের দিকে ফিরল রোজালিনা, শীতল চোখজোড়া ভয় পাইয়ে দিল ওকে।

গতকাল তোমাদের ক্যাফেতে এসেছিল সে। মা-মেয়ে মিলে ওকে বেশ খাতির করেছ, স্টোর মালিকের কণ্ঠে শ্লেষ, চোখে বিদ্রুপ। কিন্তু এটাই শেষ। পরেরবার কোন অজুহাতের ধার ধারব না আমি। ক্রুশারের মায়া এখানে অচল, তোমার প্রতি ওর দুর্বলতার কথা চিন্তা করব না আমি, নেবরও করবে না। তোমাদের শহরছাড়া করতে নেবর তো মুখিয়েই আছে। তুমি কি চাও ক্যাফেতে হানা দিক ও? তোমাকে হাতের মুঠোয় পেলে কি যে করবে ও, কল্পনাও করতে পারবে না। আমি কি তোমাকে বোঝাতে পেরেছি? হাসল সে, কিন্তু হাসিটা চোখ স্পর্শ করল না। বরং সেখানে কিসের একটা ছায়া দেখা গেল যেন, যার অর্থ খুঁজে পেল না রোজালিনা। অ্যালেন এখন আসামী, জঘন্য রকমের, খেই ধরল সে, একবার তাকাল গির্জার দরজার দিকে। ওকে সাহায্য করলে কিংবা আশ্রয় দিলে বিপদে পড়বে তোমরা। শত্রুর বন্ধু শত্রুর মতই, তাই না?

অ্যালেনের প্রতি তোমার বিদ্বেষের কারণটা বুঝলাম না।

একজন লোক যখন আইনের মানুষকে খুন করে তখন আর কোন বাধা তার সামনে থাকে না। সে যে কাউকে হত্যা করতে পারে। আমি বা তুমিও এর বাইরে নই। আমি শহর কমিটির চেয়ারম্যান না হলেও এখানে অ্যালেনের ভূমিকা আমাকে উদ্বিগ্ন করত। একের পর এক খুন করে বেড়াচ্ছে সে, সাধারণ লোকজনের আতঙ্কিত হওয়ার জন্যে এটুকুই যথেষ্ট নয় কি?

জঘন্য কিছু লোককে খুন করেছে সে, ভাবল রোজালিনা, আত্মরক্ষার খাতিরে যে কেউ তা করত; কিন্তু মুখে প্রকাশ করল না সেটা। তুমি কেন ভাবছ আমাদের কাছে আসবে সে?

হাসল কেভিন লপার, আত্মবিশ্বাসী দেখাচ্ছে। প্রাইস বা তোমরা, আমার জানা মতে এ দুই পরিবারের সাথে খাতির হয়েছে অ্যালেনের। সুতরাং বিপদে এদের কাছেই আসবে সে।

এতগুলো লোক লেলিয়ে দিয়েও পারছ না ওর সাথে! শ্লেষ আর তাচ্ছিল্যের সাথে বলল রোজালিনা, দেখল লপার এমনভাবে তাকিয়ে আছে যেন খুন করে ফেলবে ওকে। শিউরে উঠল ও, আতঙ্ক গ্রাস করল ওকে। সহসা টের পেল কেভিন লপারের ভেতরের রূপটা, পরিচ্ছন্ন ফিটফাট পোশাকের আড়ালে সে একজন ভয়ঙ্কর মানুষ-স্যাভেজ বা নেবরের চেয়েও ভয়ঙ্কর।

কুগার শিকার করা কি সবাইকে মানায়, মিস বার্থেজ? সহাস্যে বলল লপার, কৌতুক খেলা করছে চোখে। আমি অপেক্ষা করছি। ধরতে না পারলেও ওকে আমার কাছে তাড়িয়ে নিয়ে আসবে ওরা। বাকি কাজটুকু এরপর হয়তো আমাকেই সারতে হবে।

ও পালাবে।

উঁহু, তা ও করবে না। লিয়ন সিটিতে সে আসবেই।

তোমার জন্যে, তাই না, মি. লপার? আবিষ্কারের আনন্দে আমোদ পেল রোজালিনা। জেমস অ্যালেনের এখানে আসার কারণ তাহলে এই লোক! হয়তো পুরানো কোন হিসেব-নিকেশ বাকি রয়ে গেছে তোমাদের মধ্যে।

কি বলেছে ও? কৌতূহলী দেখাচ্ছে লপারকে, এবং সতর্ক। তার চোখের তারায় অস্বস্তি।

কিচ্ছু না। তোমার আগ্রহ দেখে ধারণা করেছি।

তাকিয়ে আছে লপার, রোজালিনার কথার সত্যতা বোঝার চেষ্টা করছে। মৃদু মাথা ঝাঁকিয়ে হিসেব কষল সে, তারপর ক্ষীণ হাসল। যাই বলো না কেন আমার ধারণা তোমাদের ওখানেই আসবে অ্যালেন।

আগে থেকে চেনো ওকে? লপারের মন্তব্য এড়িয়ে গেল রোজালিনা।

লিয়ন সিটিতে প্রথম দেখলাম। অ্যালেন আমাদের মার্শালের খুনী। তাই সরাসরি না হলেও সে এখন আমার শত্রু, এবং বোধ করি গোটা শহরের শত্রু।

মিথ্যেটা ঠিকই ধরতে পারল রোজালিনা, কিন্তু চেপে গেল। মেয়রের বউয়ের পাশে নিজের মা-কে দেখতে পেল ও।

সেদিকে একবার তাকাল–লপার, তারপর ফিরল ওর দিকে। মনে রেখো, মিস বার্থেজ, তোমাদের ওপর সবসময় একটা চোখ রাখবে নেবর, কাটা কাটা স্বরে হুমকি দিল। ওকে না খেপানোই ভাল। অ্যালেন এলে আমাকে নয়তো নেবরকে খবর দেবে, ঠিক আছে?

আনমনে মাথা ঝকমল রোজালিনা, লপার চলে যেতে তার পিঠে স্থির হয়ে থাকল ওর চোখ, বিষদৃষ্টিতে দেখছে।

কি বলল লপার? মারিয়া বার্থেজ পাশ থেকে শুধাল ওকে।

পরে শুনো।

ওকে দেখল মহিলা, তারপর মাথা ঝাঁকিয়ে এগোল।

ক্যাফের কাছে আসতে দূর থেকে দেখতে পেল লোকটাকে। পঞ্চাশের মত হবে বয়স, সমর্থ শরীর। চওড়া কাঁধ। লম্বায় ছফুট ছাড়িয়ে যাবে। মুখে দাড়ির জঙ্গল, উষ্কখুষ্ক চুল। মলিন রঙজ্বলা ডেনিম শার্ট আর জিন্স পরনে। বুড়ো আঙুল আর গোড়ালির কাছে ক্ষয়ে গেছে জুতোজোড়া। পোর্চে বসে আছে, অধৈর্য দেখাচ্ছে তাকে। ঠোর্টের কোণে ঝুলে থাকা সিগারেট থেকে ধোঁয়া উঠছে।

মা-মেয়ে দুজনেই থমকে দাড়িয়েছে, পা যেন চলছে না। ওদের ওপর চোখ পড়তে উঠে দাঁড়াল সে, সিগারেট ফেলে বুটের তলায় পিষে এগিয়ে আসতে শুরু করল। ততক্ষণে নড়ে উঠেছে রোজালিনা, ছুটছে। উড়ে গিয়ে লোকটার বাড়ানো বাহুতে ধরা দিল। দুহাতে তাকে চেপে ধরে ফোপাতে শুরু করল।

সতৃষ্ণ দৃষ্টিতে,দৃশ্যটা দেখছে মারিয়া বার্থেজ। অপেক্ষার পালা শেষ হয়েছে তার। রক্তের আকর্ষণ টেনে এনেছে রেমন্ড বার্থেজকে। ধরে এগোল মহিলা, চোখ স্বামীর ওপর। মেয়েকে বুকে চেপে ধরে হাসছে সে।

এই প্রীচার ব্যাটা বেশিক্ষণ প্রার্থনা করে বুঝি? হালকা সুরে বলল সে। সেই কখন থেকে বসে আছি। নিজের বাড়িতে ফিরে এসেও বসে থাকতে হলো এতক্ষণ! প্রীচ ব্যাটাকে বলে দিতে হবে প্রার্থনার কাজটা এখন থেকে যেন সংক্ষিপ্ত করে।

ক্যাফের তালা খুলে ভেতরে ঢুকল মারিয়া বার্থেজ। রান্নাঘরে এসে সময় নিয়ে জুস তৈরি করল। বাপ-মেয়ে টেবিলে বসে সমানে বকবক করছে। আপেল পাই, জুস, ওমলেট আর রুটি নিয়ে দুজনের গল্পে বাধ সাধল মিসেস বার্থেজ।

বাবার ফিরে আসার সৌজন্যে আজ ক্যাফে বন্ধ থাকুক, প্রস্তাব করল রোজালিনা,। মায়ের দিকে তাকাল, দৃষ্টিতে আবেদন ঝরে পড়ছে। সম্মতি আসতে বাপের দিকে ফিরল। দেখেছ, বলেছি না মা রাজি হয়ে যাবে!

খাওয়ায় মনোযোগ দিল রেমন্ড, ভেঙচি কাটল মেয়েকে। তারপর সহসা মনে পড়ল রোজালিনা এখন আর পাঁচ বছর আগের কিশোরী নয়, পরিপূর্ণ তরুণী সে। এই বয়সে বেশিরভাগ মেয়ে তাদের স্বামীদের দুএকটা বাচ্চাও উপহার দিয়ে ফেলে। বুকে একটা কষ্ট খোচা মারল তার, অবিবেচকের মত সংসারটা ফেলে চলে গেছে সে। এদের সুখ-দুঃখের ভাগীদার হওয়া তার হয়ে ওঠেনি। অথচ কোন অভিযোগ করবে না দুজনের কেউ।

সারাটা দিন অপার আনন্দে কাটল রোজালিনার, বাপের সাথে গল্প করে। রাতে বিছানায় যেতে মনে পড়ল জেমস অ্যালেনকে। অস্বস্তি ঘিরে ধরল ওকে। এখনও বেঁচে আছে ও? কোথায় রাত কাটিয়েছে। আহত অবস্থায় আছে…শুশ্রষা দরকার…আর নিরাপদ একটা জায়গা যেখানে ক্রুশার বা লপারের লোকজন ওকে খুঁজে পাবে না।

আগের রাতের মতই ঠিকমত ঘুমাতে পারল না ও। তবে জাগল ভোরবেলা। স্কুল আছে আজ। দ্রুত তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়ল। আগে নিকোলাস প্রাইসের কাছে যাওয়া যাক, সিদ্ধান্ত নিল ওঁ, কোন খবর থাকতে পারে।

কিন্তু বিফল হয়ে ফিরতে হলো ওকে। স্কুলের দিকে হেঁটে চলল। শহরে বা এখানে ক্রুশারের কোন লোককে দেখতে পায়নি। হয়তো ওকে পেয়ে গেছে শয়তানগুলো রোজালিনার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এল, বুকে কষ্ট অনুভব করল। এরকম লাগছে কেন? জেমস অ্যালেন ওর কেউ নয়। বরং ওকে অপমানই করেছে সে। ওর অনুরোধ তাকে টলতে পারেনি। অন্য কোন পুরুষ হলে কত আগেই গলে যেত। অথচ সে পাত্তাই দেয়নি! এত অহঙ্কার… কেবল আরেকটা মেয়েকে ভালবাসে বলে?

তিক্ত মনে অনুভব করল কঠিন এ মানুষটা টানছে ওকে। জেমস ওকে পছন্দ করলে খুশি হত। একটুখানি স্পর্শে গলে যেত। সাহসী একটা সিদ্ধান্ত নিল ও, লপার বা নেবরকে পরোয়া করবে না। দরকার হলে সাহায্য করবে অ্যালেনকে। ওর বাবা পাশে আছে, এখন, কাউকেই ভয় করে না রোজালিনা। কে কি মনে করল তাতেও ওর কিছু আসে-যায় না।

অফিসরুমের সামনে এসে স্কার্টের পকেট থেকে চাবি বের করে তালা খুলতে গেল ও। দরজার বাটের ওপর চোখ পড়তে চমকে গেল, এতক্ষণ খেয়ালই করেনি ওটার আঙুটা ভাঙা। ধড়াস করে লাফ দিল ওর কলজে। কটের ফাঁক গলে তাকাল ভেতরের দিকে, কিছুই চোখে পড়ছে না। সাহস করে ঠেলা দিল দরজায়। খানিক সরে গেল কবাট দুটো। একটা চেয়ার ঠেস দিয়ে রাখা। মেঝেয় চোখ পড়তে শুকনো রক্ত দেখে চমকে উঠল। একইসঙ্গে ভয় আর আশার দোলায় দুলে উঠল ওর মন। ঘাড় ফিরিয়ে আশপাশে তাকাল, নেই কেউ। তারপর ঠেলে খুলে ফেলল পুরো দরজা। ছুটে ভেতরে ঢুকল ও, টেবিলের কাছে আসতে দেখতে পেল তাকে।

গুলি খাওয়া অসহায় পশুর মত পড়ে আছে জেমস অ্যালেন, পিস্তল ধরা হাত তোলার প্রয়াস পাচ্ছে। জোর করে চোখ মেলল, রোজালিনার অস্ফুট কাতরধ্বনি থামিয়ে দিল তাকে। হাতটা নেমে গেল দেহের পাশে, শিথিল হয়ে গেল মুঠি।

ছুটে এসে পাশে বসে পড়ল রোজালিনা। অ্যালেনের মুখ শুকনো, বিবর্ণ দেখাচ্ছে। কপালে হাত রাখতে বুঝল জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে শরীর। পট্টি সরিয়ে কাঁধ আর উরুর ক্ষতগুলো দেখল, দগদগ করছে। অজান্তে শিউরে উঠল ও।

কি করবে ও একা এখান থেকে অ্যালেনকে কিভাবে বের করে নিয়ে যাবে? সেরকম শারীরিক সামর্থ্য, ওর নেই, তাছাড়া ক্রুশার বা লপারের লোক দেখে ফেলতে পারে। বাইরে বেরিয়ে এল ও, চারপাশে চোখ বুলিয়ে এবারও কাউকে দেখতে পেল না। নিকোলাস প্রাইসের বাড়ির ওপর দৃষ্টি পড়তে বুদ্ধিটা মাথায় এল। দ্বিতীয়বার চিন্তা না করেই ছুটল সেদিকে।

বাইরে যাওয়ার তোড়জোড় করছিল নিকোলাস প্রাইস, খচ্চরদুটো জুড়েছে ওয়াগনে। দ্রুত, একনাগাড়ে তাকে বলে গেল রোজালিনা। অবাক হয়ে ওকে দেখছে কাঠ ব্যবসায়ী, নড়ছে না। ওকে সাহায্য করা দরকার তা-ও মাথায় আসছে না।

কি হলো, নিক? তাড়া দিল রোজালিনা। সাহায্য করবে, নাকি দাঁড়িয়ে থেকে মজা দেখবে?

তারমানে…তুমি ক্যাফেতে সাপ্লাই দিতে বলছ!

তো অন্য কিছু বলেছি নাকি? বিরক্তি চেপে রাখতে পারল না রোজালিনা, অধৈর্য লাগছে ওর। ওয়াগন নিয়ে চলে এসো। স্কুলের কাঠ নামিয়ে দেয়ার পর ওকে তুলে নেব আমরা। দেখল এবার নড়ে উঠেছে প্রাইস, ওয়াগনে কাঠের চেলা তুলতে শুরু করেছে।

ফিরতি পথ ধরে এগোল ও। উদ্বেগের মধ্যে কাটছে প্রতিটি মুহূর্ত। ভয় হচ্ছে হয়তো ধরা পড়ে যাবে কিংবা দেখে ফেলবে কেউ। জেমসের কাছে এসে বসল ও, মাথায় হাত বুলাতে চোখ মেলল সে, লাল হয়ে আছে ওগুলো। শূন্য দৃষ্টিতে দেখল ওকে, তারপর চোখ বুজল।

মোনা…একটাকে শেষ করেছি, বিড়বিড় করে শব্দগুলো উচ্চারণ করল জেমস, ঠোঁট প্রায় নড়ছেই না। একটু অপেক্ষা করতে হবে, সোনা, বাকি দুটোকেও শেষ করে ফেলব!… আরও কিছু বলল সে, কিন্তু এত অস্পষ্ট যে ধরতে পারল না রোজালিনা।

রোজ? বাইরে প্রাইসের গলা আর ওয়াগনের ঘড়ঘড় শব্দ শোনা গেল।

বেরিয়ে এসে কাঠ নামিয়ে রেখে পোর্চে তুলে রাখল দুজনে।

ভেতরে আছে ও, মৃদু স্বরে বলল রোজালিনা, ওয়াগনের পাটাতনে চোখ বুলাল। একপাশ খালি করে রাখা, অনায়াসে ওখানে শোয়ানো যাবে জেমসকে।

একটু ভেতরে আসবে? চাপা গলায় ওকে ডাকল প্রাইস। দুজনে মিলে ধরলে চোট পাবে না ও।

তিন মিনিটে কষ্টকর কাজটা সারল ওরা। জেমসের অচেতন দেহ ওয়াগনের পাটাতনে বিছিয়ে দিয়ে তারওপর খড় আর কাঠ চাপিয়ে দিল। আসনে উঠে বসে লাগাম তুলে নিল প্রাইস, ঘুরে তাকাল রোজালিনার দিকে। মনে হয় ঠিক ভাবেই কাজটা সারতে পেরেছি আমরা, সন্তুষ্টি তার গলায়, স্লান হাসল। আমি বোধহয় পাপ খণ্ডন করলাম। ওকে,কাজ থেকে ছাড়িয়ে দেয়ার পর লরা একচোট নিয়েছে আমার ওপর, আর মার্ক তো এরপর থেকে কথাই বলছে না।

কাউকে কিছু বলার দরকার নেই, নিক। সোজা চলে যাও।

ওয়াগন চলা শুরু করতে ভেতরে ঢুকল রোজালিনা। শুকনো একটা কাপড় বের করল ড্রয়ার থেকে। কলের পানিতে ভিজিয়ে এনে মেঝে থেকে রক্তের দাগ মুছে ফেলল। সব খড় ওয়াগনে তুলে নিয়ে গেছে কাঠ ব্যবসায়ী। লোকটা একেবারে বোকা নয়, ভাবল ও, দেখা যাচ্ছে দরকারে মাথাটা ঠিকই খুলে যায়। তবে বুদ্ধি কম হলেও যথেষ্ট সাহস তার আছে, জানে রোজালিনা, নইলে এভাবে নিশ্চিন্তে কাজটা করতে পারত না সে, রাজিও হত না।

নিজের চেয়ারে বসে মিসেস মেনার্ডের জন্যে একটা নোট লিখল ও। চারদিনের ছুটি চেয়ে টেবিলে রাখল ওটা। বেরিয়ে এসে কবাটের আঙুটা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। কয়েক মিনিটের চেষ্টায় মোটামুটি চলনসই অবস্থায় নিয়ে এল ওটাকে। তালা আটকে দ্রুত পায়ে ফিরে চলল।

মূল রাস্তায় ঢোকার মুখেই স্টোরের সামনে কেভিন লপারকে দেখতে পেল রোজালিনা। দৌড়ে পালাতে ইচ্ছে করছে ওর, কোনরকমে সামলে রেখেছে। আড়চোখে দেখল স্টোরের পাশের গলিতে ঢুকছে প্রাইসের ওয়াগন, লপারের সামনে দিয়েই। ওটার দিকে মনোযোগ না দিয়ে ওকেই দেখছে স্টোর মালিক। হাঁপ ছাড়ল রোজালিনা, মনে হচ্ছে ঠিকমতই পৌঁছে যাবে প্রাইস। এখন অতি উৎসাহী কেউ দেখে না ফেললেই হলো। প্রাণপণ চেষ্টায় নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছে ও, যাতে ওর মুখ বা আচরণ দেখে সন্দেহ করতে না পারে কেভিন লপার। সরাসরি তার চোখে তাকাল রোজালিনা, মৃদু হাসল। নিজেই বুঝতে পারল হাসিটা প্রভাবিত করতে পারেনি লপারকে, সরু চোখে তাকিয়ে আছে সে। এ সময়ে স্কুলে থাকার কথা ওর, লপারও সেটা জানে। আমি অসুস্থ, চারদিনের ছুটিতে আছি-ব্যাপারটা যাতে সবাই জেনে যায় সেটা নিশ্চিত করতে হবে, ভাবল ও। নইলে হয়তো দুপুরেই দলবল নিয়ে ক্যাফেতে এসে উপস্থিত হবে সন্দেহপ্রবণ লোকটা।

ক্যাফের রাস্তাটুকু অনেক দূরত্বের মনে হলো ওর কাছে। পৌঁছানোর পর অজান্তে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।

স্ত্রীর সাথে গল্প করছিল রেমন্ড বার্থেজ, চোখ তুলে দেখল ওকে। প্রশ্ন ফুটে উঠল চোখে।

মায়ের দিকে তাকাল রোজালিনা, দৃষ্টিতে আবেদন। আমি ওকে খুঁজে পেয়েছি। নিক নিয়ে আসছে। ওর খুব সাহায্য দরকার, মা!

স্থির দৃষ্টিতে মেয়েকে দেখল মারিয়া বার্থেজ, তারপর আনমনে মাথা ঝাঁকিয়ে উঠে দাঁড়াল। রান্নাঘরের দিকে এগোল। রেম, এসো তো, নিককে সাহায্য করবে। রোজ, তুই ওপরে যা। গেস্টরুমটা ঠিক করে রাখ। আমরা ওকে নিয়ে আসছি।

ছুটে চলল রোজালিনা।

দশ মিনিটের মধ্যে জেমস অ্যালেনকে নরম বিছানায় শুইয়ে দিল ওরা। শার্ট খুলে, ক্ষতগুলো ধুল মিসেস বার্থেজ, এদিকে উরুর কাছে প্যান্ট কেটে ফেলেছে রেমন্ড। দুটো ক্ষতই ফুলে উঠেছে, লাল দগদগে দেখাচ্ছে। চুইয়ে রক্ত ঝরছে। পরিষ্কার কাপড়ে পট্টি বেঁধে দিল মারিয়া বার্থেজ। তারপর পাশের কামরায় বেসিনে হাত ধুতে গেল।

ছেলেটা কে? পাশে এসে দাঁড়িয়েছে রেমন্ড।

তোমার মতই কোন বাউণ্ডুলে বোধহয়, এখানে এসে কুশারের তোপের মুখে পড়েছে। দুদিন আগে ওর হাতে মারা পড়েছে এখানকার মার্শাল।

আরিব্বাপ, গনগনে আগুন দেখছি! ওকে ছুঁলেই হাত পুড়ে যাবে! হালকা সুরে মন্তব্য করল সে, হাসছে।

কিন্তু তোমার মেয়ে তার পরোয়া করছে না।

রেমন্ডের হাসি থেমে গেল, চিন্তিত মুখে তাকাল স্ত্রী-র দিকে। ঠিক বুঝতে পারলাম না, অসহায় ভঙ্গিতে কাঁধ উঁচাল।

না বোঝার কি আছে! নিজের কামরায় নিয়ে তুলেছে লোকটাকে, এ থেকেও বুঝতে পারছ না?

তোমাকে কিন্তু নারাজ মনে হচ্ছে না। ওকে বাধা দাওনি। তাছাড়া শোনার পর নিজেও সাহায্য করতে ছুটেছ।

ওকে একেবারে অপছন্দ করি, তা নয়। নিজের সম্পর্কে কিছুই জানায়নি এটাই হচ্ছে আমার অস্বস্তির কারণ।

পশ্চিমের বেশিরভাগ লোক তাই করে।

সেটা ঠিক। সবচেয়ে বেশি করে আউট-লরা।

বিহ্বল দেখাল রেমন্ডকে। তুমি সন্দেহ করছ ছেলেটা…

আমার ধারণায় কিছু যায়-আসে কি? রূঢ় স্বরে বাধা দিল মারিয়া বার্থেজ, তোয়ালেতে হাত মুছে নিচে নেমে এল। কফির পানি চড়িয়ে দিল চুলোয়। টেবিলে গিয়ে বসো, স্বামীর উদ্দেশে বলল। জরুরী কথা আছে।

কফি খাওয়ার ফাঁকে বিশ্লেষণ করল মারিয়া বার্থেজ।

গম্ভীর দেখাল রেমন্ডকে। তুমি আশা করছ এখানে হানা দিতে পারে ওরা?

প্রথমে হয়তো কথা বলতে চাইবে। কিন্তু ভালমানুষের মত এমনিতে চলে যাওয়ার লোক নয় কেউই। অ্যালেনের উপস্থিতির কথা একবার জানতে পারলে

কোনকিছুই ওদেরকে আটকাতে পারবে না।

এমন হতে পারে ওরা হয়তো কিছুই জানে না।

হতে পারে, কিন্তু একসময় জানবেই।

জানুক। দুদিনের মধ্যে দাঁড়াতে পারবে ছেলেটা। তারপর নিজ থেকেই চলে যাবে। ওর সম্পর্কে যা শুনলাম তাতে তাই মনে হচ্ছে আমার।

পুরো সুস্থ হওয়ার আগে ওকে ছেড়ে দিতে পারি না আমরা।

এবার হাসল রেমন্ড। দেখা যাচ্ছে ওর ওপর মায়া জন্মে গেছে তোমার! রোজকে দোষ দেয়া যায় না।–মাথা ঝাঁকাল মারিয়া বার্থেজ, ক্যাফের দরজার কাচ গলে তাকাল দিগন্ত বিস্তৃত মেলবি পর্বতমালার দিকে। কি যেন একটা আছে ওর মধ্যে…ওপরে কঠিন একটা আবরণ, কিন্তু ভেতরে নরম একটা মন, আমি জানি। একটা ঘোরের মধ্যে আছে ছেলেটা, চারপাশের কোন কিছুই ওর চোখে পড়ছে না। নিজের উদ্দেশ্য সম্পর্কে খুব সচেতন অথচ রোজ যে ওকে পছন্দ করে সেটা খেয়ালই করছে না।

আমার ভয় কেবল একটাই-শেষে রোজ কষ্ট না পায়।

কষে কোমর বেঁধে নেমে পড়তে বলল ওকে। কাজ হয়ে যেতেও পারে।

তামাশা করছ!

পছন্দসই জিনিস বেছে নেয়ার অধিকার সবারই আছে, তাই না? তুমি কি আমার হাত ধরে নিজ গোত্রের লোকজনকে ছেড়ে আসোনি?

আমি কিন্তু ঠকিনি।

আশা করো রোজও ঠকবে না।
বিছানায় শুয়ে-বসে দিন কাটানো সীমাহীন বিরক্তিকর ঠেকছে জেমস অ্যালেনের কাছে। কিন্তু ইচ্ছে থাকলেও উঠে পড়ার জো নেই। রোজালিনা বার্থেজের মতের ওপর নির্ভর করছে সেটা। জেমস বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করেছে গত তিনদিন ধরে ওর ওপর নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে মেয়েটা। অবাধ্য হলে খেপে উঠছে।

রোজালিনা যখন নাস্তার ট্রে নিয়ে ঢুকল জেমস তখন জানালার কাছে দাড়িয়ে দিগন্ত জুড়ে থাকা ফ্লো মাউন্টেন দেখছে। বারবার অ্যাবিলিনের ছোট্ট একটা বাথানে চলে যাচ্ছিল ওর হৃদয়। সমৃদ্ধ একটা বাথান, কিন্তু শূন্যতায় ভরা।

একটা সুখবর আছে, টেবিলে ট্রে নামিয়ে রাখার সময় উৎফুল্ল স্বরে বলল রোজালিনা। গতকাল ভোরে প্রাইসের করালে ফিরে এসেছে তোমার সোরেলটা।

কিছু বলল না জেমস, জানে এমন হতেই পারে। শুকাতে শুরু করা কাঁধের ক্ষ তটা দেখল, সপ্তাহখানেক পর কেবল একটা দাগ থাকবে। ওকে ভোগাচ্ছে ঊরুর জখমটা। একটু বেশি নড়াচড়া করলেই টান পড়ছে। স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে আরও কয়েকদিন লাগবে। সেই দিনগুলো এখানে কাটাতে হবে ভাবতেই রাগ হচ্ছে ওর, এভাবে বসে থাকার কোন মানে নেই। প্রতি মুহূর্তে এ পরিবারটির বিপদের আশঙ্কা বাড়ছে।

রোজালিনা তাড়া দিতে কোন বাক্যব্যয় ছাড়াই নাস্তা সারল। ওর নীরবতা গম্ভীর করে তুলেছে মেয়েটাকে। কফি শেষ করে সিগারেট ধরাল জেমস। চোখ তুলে দেখল দরজার সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটি, বুকের কাছে। দুহাত বাঁধা। শান্ত, চাহনিতে একরাশ কৌতূহল। নিজেকে ঝামেলা মনে হচ্ছে, তাই না? হেসে জানতে চাইল মেক্সিকান গোলাপ।

এভাবে বসে থাকতে ভাল লাগছে না।

কিন্তু এখনও পুরো সুস্থ হওনি তুমি। দুদিন পরেও লেন-দেনটা চুকাতে পারবে। লপার বা নেবর কেউই তো পালিয়ে যাচ্ছে না।

খানিকটা বিস্মিত হলো জেমস। তুমি জানলে কি করে?

ধারণা করেছি।

জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল ও।

রোববার গির্জা থেকে ফেরার পথে আমাকে শাসাল কেভিন লপার, ব্যাখ্যা করল রোজালিনা। ওর কথায় সন্দেহ হলো। তাছাড়া জ্বরের মধ্যে প্রচুর প্রলাপ বকেছ তুমি।

কি বলেছি?

মোনা নামের একটা মেয়েকে ডাকছিলে খুব।

সিগারেটে টান মেরে চলল জেমস, রোজালিনার ওপর থেকে চোখ সরিয়ে জানালাপথে ফ্লো মাউন্টেনের দিকে তাকাল। ঘরে অখণ্ড নীরবতা। ধোয়ার ওপাশ থেকে দেখল মেয়েটাকে। শান্ত কিন্তু ভাবলেশহীন নয়, উদ্বেগ নেই কিন্তু কৌতূহল আছে।

মোনা আমার স্ত্রী, নীরবতা ছাপিয়ে উঠল জেমসের দ্বিধাহীন কণ্ঠ। মোনার বাবা, ফ্রেড জিপসন, আমাকে কোলে-পিঠে করে বড় করেছিল। বুড়ো মানুষটাকেও রেহাই দেয়নি ওরা। …মোনাকে রেপ করার পর যখন খুন করে ওরা, দুমাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিল ও। তিনজন মানুষ আর একটা পরিবার হারালাম আমি। আমার বেঁচে থাকার আনন্দটাই মাটি করে দিয়েছে ওরা।

গত তিনটে বছর ধরে ওদেরকে খুঁজছি আমি। একটা রাতও ঠিকমত ঘুমাতে পারিনি। ওরা কেবল মোনাকেই মারেনি, আমার বাচ্চাটাকেও খুন করেছে। বাচ্চাটা এতদিনে…প্রায় তিন বছর হয়ে যেত ওর বয়েস। হাঁটত তো অবশ্যই, দৌড়াতেও পারত, তাই না?

থমকে গেছে রোজালিনা, কঠিন লোকটার ভেতরকার কষ্ট পীড়া দিচ্ছে ওকে। তিনটে বছর সীমাহীন যন্ত্রণা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে সে, অপরিসীম মনের জোর না থাকলে সেটা সম্ভব হত না। আর তীব্র ঘৃণা… ওর চোখ তাই বলে দিচ্ছে ক্ষমার সাথে এ লোকের পরিচয় নেই। মোনা মেয়েটি ভাগ্যবতী, ভাবছে রোজালিনা, এ মানুষটির গভীর ভালবাসা পাওয়ার সৌভাগ্য ওর হয়েছে। স্ত্রী-হত্যার প্রতিশোধ নিতে এভাবে বছরের পর বছর ঘুরে বেড়ায় খুব কম মানুষ, আর এতে এটাও পরিষ্কার নিজের স্ত্রী-কে কি পরিমাণ ভালবাসত মানুষটা।

এগিয়ে গিয়ে জেমসের পাশে দাড়াল রোজালিনা, কাধে হাত রাখল। সহানুভূতি তার প্রয়োজন নেই, কিন্তু একটুখানি মমতা আর নির্ভরতা তার সঙ্কল্পকে আরও দৃঢ় করবে, জানে ও। ওরা কারা?

রিক স্যাভেজ, রেনে নেবর আর কেভিন লপার, ক্ষীণ হাসল জেমস, সামলে নিয়েছে নিজেকে। এখানে এসে নতুন নাম নিয়েছে। কিন্তু মরার আগে ওদের কথা আমাকে বলেছে ফ্রেড। শরীরে পাঁচটা বুলেট নিয়ে দুদিন বেঁচে ছিল সে। কি অমানুষিক কষ্ট পেয়েছে মানুষটা অবাক হয়ে খেয়াল করল এতদিনের বুনো আক্রোশ বা তিক্ততা নেই ওর মধ্যে। সুস্থির লাগছে নিজেকে, সেটা কি সত্যটি প্রকাশ করায়? নাকি মেয়েটির মমতা আর আন্তরিক সহানুভূতি ওকে স্পর্শ করেছে, প্রশম করেছে ওর অস্থিরতাকে? জানে না জেমস।

কিন্তু তুমি তো প্রমাণ করতে পারবে না।

প্রমাণের অপেক্ষায় বসে আছে কে, ম্যাম? ওসর্বের ধার আমি ধারি না! পকেট থেকে একটা সিগার কেস বের করল ও। ঠিক এরকম একটা জিনিস লপারের আছে, তাই না?

সায় জানাল রোজালিনা।

এটার ওপর সি-আই অক্ষরদুটো খোদাই করা। লপারের কাছে যেটা আছে তাতে কে-এল। দশ মিনিটের মধ্যে আমি এটাকে লপারের বলে চালিয়ে দিতে পারব। কেবল দুটো আঁকের ব্যাপার। এঁকে দেখাল জেমস, বিস্ময়ের সাথে তা দেখল রোজালিনা। লোকটার সৌখিনতাই ওকে ডুবিয়েছে। সিগার কেসটা ফেলে আসার পরও সে পাত্তা দেয়নি, কেন জানো? ও নিশ্চিত ছিল ওকে খুঁজে পাবে না কেউ। পেলেও সামনে এসে দাঁড়াতে পারবে না। কারণ ওর নাম ক্যাল ইনগ্রস।

দম বন্ধ হওয়ার অবস্থা হলো রোজালিনার, আতঙ্কিত হয়ে উঠল। চোখজোড়া বিস্ফারিত। ইনগ্রস! হায় খোদা, ও তো অ্যারিজোনার সবচেয়ে কুখ্যাত বন্দুকবাজ!

কিন্তু তিন বছর আগে নিজের মৃত্যু পরোয়ানায় সই করে এসেছে ও।

ওর সাথে টিকতেই পারবে না তুমি!

হয়তো, ম্যাম। কিন্তু তার পরোয়াও করি না। হয় আমি, নয়তো ও বেঁচে থাকবে।

শিউরে উঠল রোজালিনা। তীব্র আতঙ্ক আর আশঙ্কা অস্থির করে তুলল ওকে। তারপর সহসাই বিয়োগের সুর বাজল বুকে। হাহাকার করে উঠল ওর ভেতরটা। তোমার দুঃসাহস দেখে অবাক হচ্ছি, মি. অ্যালেন! নীরব, উষ্ণ কামরায় ওর ছন্দহীন গভীর নিঃশ্বাসের শব্দ স্পষ্ট শোনা গেল। বোকার মত লপারের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চাইছ। ওকে পেতে হলে আগে নেবরকে টপকে যেতে হবে, অথচ সেটাই আমার কাছে অসম্ভব মনে হচ্ছে।

ধরো লিয়ন সিটিতে একটা ইতিহাসের জন্ম দেব আমি। হাসছে জেমস, আত্মবিশ্বাস উপচে পড়ছে ওর চোখে-মুখে।

তুমি!?

ফের হাসল সে। মাথা ঝাঁকাল।

রোজালিনার কাছে অচেনা মনে হচ্ছে জেমসকে। এতটা আত্মবিশ্বাসী সে হয় কি করে? তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে! অসম্ভব কিছু না ভেবে বরং আইনের সাহায্য নিতে পারো তুমি। কাউন্টি শেরিফের কাছে সব খুলে বললে সে-ই ব্যবস্থা নেবে। তাছাড়া ইনগ্রসের নামে কোন পোস্টার নিশ্চই আছে। এমনিতেও সে দাগী আসামী।

ওগুলোয় কোন চেহারা নেই। পশ্চিমের একেক জায়গায় ওর একেক ধরনের বর্ণনা পাবে যার একটার সাথে আরেকটার কোন মিল নেই। সিগার কেসের প্রতি দুর্বলতাই ওর কাল হবে। এটা না পেলে আমি নিশ্চিত হতে পারতাম না। তবে স্যাভেজ আর নেবরকে ট্রেস করা কোন সমস্যাই নয়।

চুপ করে থাকল রোজালিনা। মনে-প্রাণে লোকটাকে নিরুৎসাহিত করতে চাইছে। কিন্তু কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না। শেষে নিবৃত্ত করে নিল নিজেকে, বেরিয়ে নিচে চলে এল। কফি তৈরি করে ওপরে উঠে এল একটু পর।

তোমার আক্ষেপ বা কষ্ট যতটা না মোনার জন্যে তারচেয়ে বেশি বাচ্চাটার জন্যে, তাই না?

প্রশ্নটা বুঝতে পারল না জেমস, জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাল ওর দিকে।

বাবা আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছিল, সবাই অন্তত তাই জানত। আসল ব্যাপারটা মা কখনোই কাউকে জানায়নি। বাবা ভবঘুরে মানুষ, ঘোরার নেশাটা তার রক্তের মধ্যে, তারপরও মা বিশ্বাস করত বাবা ফিরে আসবে, আমার জন্যে। আসলেও তো তাই হয়েছে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যোগসূত্রটা তৈরি করে সন্তানরা। ঠিক এ জন্যেই বললাম তোমার কষ্টের কারণ অনাগত সন্তান।

গম্ভীর, চিন্তিত দেখাল জেমসকে। তুমি সংসার করোনি, ম্যাম। অথচ ভাবছ একজন বয়স্কা মহিলার মত।

মা-র চিন্তা-ভাবনাগুলো আমাকে পেয়ে বসেছে, অকপটে বলল রোজালিনা, ক্ষীণ হাসল। সবচেয়ে বড় ব্যাপার, পছন্দগুলোও। আমার ধারণা কি জানো, হয়তো বাবার মতই চালচুলোহীন কাউকে শেষপর্যন্ত পছন্দ করে ফেলব।

এ জন্যেই ক্রুশার বা লপারকে তোমার পছন্দ নয়, তাই না? অথচ অন্য কোন মেয়ে ওদেরকে পেলে নিজেকে ধন্য মনে করত।

হয়তো…সঠিক কারণটা আমি নিজেও জানি না। কিন্তু নিজেকে ধন্য মনে করব আমার পছন্দমত লোক পেলে।

উঠে দাঁড়াল জেমস, এগোল দরজার দিকে।

উঁহু, শুয়ে থাকো, চড়া গলায়, কঠিন সুরে বাধা দিল রোজালিনা। আমার সাথে তর্ক করে সুবিধে করতে পারবে না। এরপরও যদি জেদ ধরো তাহলে আমাকে টপকে যেতে হবে। তুমি নিশ্চয়ই একজন মহিলার সাথে জোর করবে না? হাসল ও, জেমসকে বিছানায় শুয়ে পড়তে দেখে নিশ্চিন্ত হলো। অ্যাবিলিনে তোমার কে আছে?

চোখ বুজে ছিল জেমস, হাঁটাহাঁটি করায় দুর্বল বোধ করছে। ভাবছিল স্বাভাবিকভাবে আবার কবে হাঁটতে পারবে। বোঝা যাচ্ছে ঊরুর ক্ষতটা আরও কয়েকদিন ভোগাবে। রোজালিনার প্রশ্নে চোখ তুলে তাকাল, কালো গভীর চোখজোড়া দেখল। কিন্তু ওর চোখে ভেসে উঠল ছোট্ট একটা বাথান…সুনসান নীরব এক উপত্যকা, পাইনের সুবাস মাখা পাহাড় বাতাস যেখানে তৃণভূমির ঘাসের ওপর দামাল ছেলের মত ছুটে বেড়ায়…পাহাড়ের কোলে ছোট্ট কেবিন, তার পাশে সজি বেডের কাছে দুটো কবর। কেউ নেই, ম্যাম। কেবল দুটো কবর আর কিছু স্মৃতি। বুকের গভীর থেকে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস বেরিয়ে এল, আটকাতে পারল না জেমস।

তুমি ওদেরকে ভুলতে পারছ না!

সেটা সম্ভব, ম্যাম?

ক্ষমা চাইছি। ওভাবে বলা ঠিক হয়নি। মাথা নাড়ল রোজালিনা। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল, জেমস কিছু না বলায় উঠে দাঁড়াল। স্কুলে যাচ্ছি আমি। খবরদার, উঠবে না!

এখানে থাকা ঠিক হচ্ছে না, রোজালিনা বেরিয়ে যাওয়ার পর ভাবল জেমস। সারা শহরের নোক মেয়েটা সম্পর্কে কি ভাববে? এমনিতেই মেক্সিকান, একটা ইয়াঙ্কি মেয়ের চেয়ে ওর দিকেই বাঁকা চোখে তাকায় সবাই। মেয়েটার জীবন নরকগুলজার করে ছাড়বে ওরা। তার আগেই কেউ জেনে যাওয়ার আগেই ওর সরে পড়া উচিত। নইলে ভুগবে নিশ্চাপ মেয়েটা। সবচেয়ে বড় ব্যাপার শপার বা নেবর ওদের ওপর প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে পারে।

ব্যাপারটা হঠাৎ করে মাথায় এল ওর, লিয়ন সিটি থেকে বেরিয়ে কি করবে? তিনটে বছরে অপরিসীম ঘৃণা আর আক্রোশ ছিল নিত্যসঙ্গী, শীতল ক্রোধ ব্যপ্ত ছিল ওর সারা দেহ জুড়ে। যদি শোধ নিতে পারে, ফিরে যেতে হবে নিজের বাথানে। ওখানে ওর জন্যে কেবল একাকীত্ব আর বিয়োগের কষ্টই অপেক্ষা করছে। অ্যাবিলিনের শূন্য বাথান আর কেবিন ওর যন্ত্রণা কমাতে পারবে না, মোনা আর ফ্রেডের অভাবটুকু ঠিকই বুকে বাজবে।

দুদিনের মধ্যে অনেকগুলো সংবাদ পেল জেমস অ্যালেন। লেসলি উইলিয়ামস পালিয়েছে, তাকে তাড়া করতে এক মুহূর্তও দেরি করেনি রেনে নেবর। একাই স্যাডলে চেপে বসেছে। সাথে একটা ওয়ারেন্ট, জোচ্চুরি আর প্রতারণার।

ক্রুশারের রাইডারেরা এখনও হাল ছাড়েনি। মেলবি পর্বতমালার কাছে ঘোড়াটাকে খুঁজে পেয়েছে। বোঝা যাচ্ছে দলটার সাথে নেবর ছিল না, নইলে সহজেই ফাঁকিটা ধরে ফেলত। একটা সওয়ারবিহীন ঘোড়ার ছাপ ভিন্ন রকমের, তাছাড়া ব্যাপারটা ওরাও ধরতে পারত যদি মাঝপথে কোথাও সরে পড়ত জেমস। কারসনদের করালের কাছে খড়ের গাদায় পড়ে যাওয়ার পর, প্রায় শুরু থেকেই সওয়ারহীন ঘোড়ার ছাপ অনুসরণ করেছে ক্রুরা। ফাঁকিটা তাই ধরতে পারেনি।

অথবা ওর গন্তব্য সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারছে না।

প্রাইসের বাড়ির কাছে দুজনকে পাহারায় বসিয়েছে ক্রুশার। সে নিজে বেশিরভাগ সময় ক্যাফেতে থাকছে। বার্থেজরা বিরক্ত হলেও সুবিধে করতে পারছে না ব্যাংকারের সাথে। আপত্তি করেও লাভ হয়নি।

পরদিন বিছানা থেকে উঠে উরুতে হোলস্টার বাঁধল জেমস। রোজালিনার কিনে আনা কাপড় পরেছে। ঝুঁকে বুট পরার সময় টান পড়ল উরুর পেশীতে, না চাইলেও ব্যথায় কুঁচকে উঠল মুখ। চকিতে তাকাল দরজার কাছে দাঁড়ানো রোজালিনার দিকে। নির্বিকার মুখে ওকে দেখছে মেক্সিকান গোলাপ, কিন্তু চোখ বলে দিচ্ছে রেগে আছে।

আরও দুটো দিন বিশ্রাম নিলে এমন কি হত? উত্তেজনা চেপে রাখতে ব্যর্থ হলো মেয়েটা। অধৈর্য হয়ে এক পা থেকে অন্য পায়ে শরীরের ভর চাপাল।

সোজা হয়ে দাড়াল জেমস। অসহায় ভঙ্গিতে কাঁধ উঁচাল। এমন কিছু হত। কিন্তু আমার ভাল লাগছে না।

কি করবে তুমি?

ঠিক করিনি এখনও।

চেয়ে থাকল রোজালিনা, বোঝার চেষ্টা করছে ওকে। ক্লান্ত ভঙ্গিতে মাথা দোলাল, তারপর চেষ্টাকৃত কোমল কণ্ঠে বলল: তোমার মত লোক আর দেখিনি, মি. অ্যালেন। নিজের জেদটাই বড় হয়ে গেল! অন্যরা কি ভাবল কখনও বোঝার চেষ্টা করেছ?

হতে পারে।

মোনা যদি তোমাকে এমন অনুরোধ করত, কি করতে?

কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল জেমস, তারপর ক্ষীণ হাসল। হয়তো ওর কথা শুনতাম।

পার্থক্যটা তাহলে এখানেই, তিক্ত সুরে বলল মেয়েটা, ঠোঁটগুলো চেপে বসল পরস্পরের ওপর। আমি মোনা হলে ঠিকই আমার কথা শুনতে!

অবাক হয়ে রোজালিনাকে দেখছে জেমস। তুমি নিজেকে ওর জায়গায় ভাবছ কেন?

এগিয়ে কাছে এসে দাঁড়াল রোজালিনা। চোখ তুলে দেখল জেমসকে। কঠিন মানুষটার মধ্যে কোন প্রতিক্রিয়া নেই, সে তার মৃত স্ত্রীকে নিয়েই আছে। ঘোরটা কখনোই কাটবে না; ভাবল ও। হঠাৎ করে নিজেকে খুব ছোট মনে হলো। একটা মেয়ে হয়ে যথেষ্ট এগিয়েছে ও। মানুষটা বুঝতে পারছে না, কিংবা না বোঝার ভান করছে। বুকে অপরিসীম কষ্ট অনুভব করল ও, কিছু বলতে গিয়েও মুখ ফুটে বেরোল না একটা শব্দও। আশাহতের যন্ত্রণায় কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে গেছে। ঝটিতি ঘুরল ও, তারপর বেরিয়ে গেল ঘর ছেড়ে।

বোকার মত দূরজার দিকে তাকিয়ে থাকল জেমস। তারপর মাথা ঝাঁকাল। ক্ষীণ হাসি ফুটে উঠল ওর মুখে, শিহরিত হলো শরীর। আরেকটা মোনার সন্ধান পেয়ে গেছে ও! যেভাবেই হোক মেয়েটাকে আকৃষ্ট করতে পেরেছে সে, অথচ বুঝতেই পারেনি এতদিন!

দরজার দিকে এগোল ও, কি মনে করে ফিরে এল আবার। পুরানো কাপড়গুলো রয়ে গেছে আলনাতে। প্যান্টের পকেট হাতড়ে দেখল কিছু নেই। অথচ ওর স্পষ্ট মনে আছে দুটো পোস্টার আর কিছু কাগজ ছিল।

বিছানার ওপর বসে পড়ল জেমস। রোজালিনার ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকল কিছুক্ষণ, তারপর নিচে চলে এল।

হেনরী ক্রুশারকে খাবার পরিবেশন করছে রেমন্ড বার্থেজ। সিঁড়িতে পায়ের শব্দ পেয়ে চোখ তুলে তাকাল ব্যাংকার। বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে গেল চোখজোড়া। কিছু বলার জন্যে মুখ খুলেছিল, কিন্তু হাঁ হয়ে থাকল।

মি. ক্রুশার, হাসি চেপে বলল বার্থেজ। তোমার নাস্তা দেয়া হয়েছে।

মাথা ঝাঁকাল সে, বার কয়েক মাথা নাড়ল। জেমসের ওপর থেকে চোখ সরিয়ে সামনে টেবিলে রাখা খাবারের দিকে তাকাল। খাওয়া শুরু করার আগেই তার টেবিলের কাছে চলে গেল জেমস। অনুমতির তোয়াক্কা করল না, একটা চেয়ার টেনে বসে পড়ল। অস্বস্তি বোধ করছে ক্রুশার, নড়েচড়ে বসল নিজের চেয়ারে।

ভাঙা নাকটা দেখল জেমস, ডাক্তার শুলজ কারিগরি ফলিয়ে বেশ ভাল চেহারা দিয়েছে। দুপাশে সরু দুটো কাটা দাগ ছাড়া আর কিছু নেই।

তাহলে এই ব্যাপার! স্বমূর্তিতে ফিরল ক্রুশার, তাচ্ছিল্যভরা কণ্ঠ। সারা তল্লাট চষে ফেলছি আমরা, অথচ দিব্যি আরামে এখানে দিন কাটাচ্ছে এ লোকটা। লপারকে আমি বলেছিলাম, কিন্তু বিশ্বাস করেনি ও।

তো? হাসছে ক্যাফে মালিক।

তোমাদের কপালে খারাবি আছে, মি. বার্থেজ, জেমসের দিকে ফিরেও তাকাল না সে, দৃষ্টি রেমন্ড বার্থেজের ওপর। তোমরা যদি স্বেচ্ছায় ওকে জায়গা দিয়ে থাকো তবে নেবরকে ঠেকাতে পারবে না কেউ। আর যদি, হারামিটা জোর করে থাকে তাহলে অবশ্য ভিন্ন কথা।

তোমার এত আগ্রহ কেন?

তো কার থাকবে? সুযোগ পেয়ে সবার সামনে আমাকে পেটাল শয়তানের বাচ্চাটা। ওকে ছেড়ে দেব নাকি? ওর হাড় গুঁড়ো করে লিয়ন সিটির রাস্তায় ছড়িয়ে দেব।

আমি তোমার সামনেই বসে আছি, বলল জেমস।

সময় হলেই টের পাবে।

ক্ষীণ হাসল জেমস, চোখে কৌতুক। রেমন্ড বার্থেজ ওর সামনে কফির মগ রেখে যেতে তুলে চুমুক দিল। তোমার স্বার্থটা আমার কাছে পরিষ্কার নয়, ক্রুশার। সম্ভবত কেভিন লপারই আমার বিরুদ্ধে খেপিয়ে তুলেছে তোমাকে। অথচ আমাদের মধ্যে এমন কিছু হয়নি। ভুল একজন লোককে পার্টনার হিসেবে পেয়েছ, ওর বুদ্ধিতে তোমার ক্ষতি ছাড়া লাভ হবে না। একটু থেমে ব্যাংকারের মুখ নিরীখ করল, ঠিক বোঝা যাচ্ছে না কথাগুলো তাকে স্পর্শ করেছে কি-না। একটা সুযোগ দিচ্ছি, আমার পথ থেকে তোমার লোকদের সরিয়ে নাও, সব ভুলে যাব আমি।

অন্তত ছয়জনকে খুন করেছ তুমি!

সেটা সত্যি, প্রয়োজনে আরও খুন করব। শেষে দেখবে সব কজনকে টপকে তোমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছি। তখন কথা বলার চেয়ে ট্রিগার টিপতেই ভাল লাগবে আমার।

তুমি একা। বারবার উৎরে যাবে এরকম ভাবছ কেন?

শ্রাগ করল জেমস। যা ইচ্ছে ভাবতে পারো, ক্রুশার। কিন্তু আমার কথা বিশ্বাস করলে ভাল করবে।

কফিতে চুমুক দিল হেনরী ক্রুশার, আড়চোখে তাকাল দূরে দাঁড়িয়ে থাকা রেমন্ড বার্থেজের দিকে। তারপর ফিরল জেমসের পানে, চেহারায় জেদ ফুটে উঠল। তোমার কাপাল খারাপ, অ্যালেন। আমাকে দেখা দিয়ে দারুণ ভুল করেছ। এখান থেকে বেরিয়ে যাওয়া আর হবে না তোমার। উঠে দাড়াল সে, কাউন্টারের কাছে গিয়ে বিল মেটাল। কাচের দরজা গলে তাকাল বাইরে দাঁড়ানো লোক দুজনের দিকে, ওপাশের ফুটপাথে দাঁড়িয়ে আছে। দরজার কাছে গিয়ে ঘুরে দাঁড়াল সে, আত্মবিশ্বাসের সাথে হাসল। বিদায়, অ্যালেন, এটাই আমাদের শেষ দেখা।

ব্যাংকার বেরিয়ে যেতে রান্নাঘরের দিকে এগোল জেমস। চুলোর কাছে কি যেন করছিল মারিয়া বার্থেজ, অবাক হয়েছে ওকে হন্তদন্ত হয়ে ছুটতে দেখে। দরজা গলে বেরিয়ে যাওয়ার সময় তার উদ্দেশে নড করল ও।

পেছনের জায়গাটা ফাকা থাকবে আশা করেনি। কোন বুলেট ছুটে এল না দেখে হাঁপ ছাড়ল। কেভিন লপারের স্টোরের দিকে ছুটতে শুরু করল এবার। কুশারের ক্রুদের মুখোমুখি হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও সোজা পথটাই বেছে নিয়েছে। হেনরী ক্রুশার খবর দেয়ার পর ক্যাফেতে হামলে পড়বে রাইডাররা। এ সুযোগটাই নিতে চায় জেমস।

স্টোরের কাছে এসে লোকজনের সাড়া, পেল ও, সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন বোধ করল। দেয়ালের পাশে দাড়িয়ে শোনার চেষ্টা করল-লপারের গলা, রাইডারদের নির্দেশ দিচ্ছে। একটু পর হেনরী কুশারের গলা শোনা গেল, কি যেন বলল সে, তাচ্ছিল্য আর অহঙ্কারে ভরা কণ্ঠ।

জায়গাটা থেকে সরে এল জেমস। পঞ্চাশ গজের মত এগোনোর পর বেরিয়ে এল মূল রাস্তায়। ব্যাংকের পোর্চে এসে দাঁড়াল, দূর থেকে ক্যাফের ওপর নজর বুলাল। সকালের দুজন বসে আছে এখনও, নতুন কেউ যোগ দেয়নি তাদের সাথে। অন্যরা এখন লপারের স্টোরের ভেতর। হিচিং রেইলে বাঁধা ঘোড়াগুলো গুনল ও-সাতটা। লপার আর কুশারের ঘোড়া এরমধ্যে না থাকলে সাতজনই রাইডার।

প্রাইসের বাড়ির কাছে আরও দুজন আছে। এছাড়া অন্তত তিনজন ছড়িয়েছিটিয়ে থাকবে। সংখ্যাটা বিশাল ভাবছে জেমস, ফাঁকি দেয়া কঠিন হবে। ভাগ্যের সহায়তা পেলেও এতগুলো লোকের বিরুদ্ধে জেতার উপায় কেবল একটাই, যদি ও ভাল অবস্থানে থাকতে পারে।

তামাক আর কাগজ বের করে সিগারেট রোল করল জেমস। ধরিয়ে ধীরে টান দিল। ঝরঝরে লাগছে শরীর, উরুতে খানিক অস্বস্তি ছাড়া আর কোন অসুবিধে নেই। নিজেকে মুক্তপুরুষ মনে হচ্ছে, কোন পিছুটান নেই, বন্ধন নেই…এক ধরনের শীল, সর্বগ্রাসী ক্রোধ ক্রমে আচ্ছন্ন করে ফেলছে ওকে। হিংস্র কুগারের মত ঝাঁপিয়ে পড়বে সে। হয় আজ তার জীবনের শেষ দিন নয়তো শয়তানগুলোর!

বড় করে শ্বাস টানল ও, সিগারেটের শেষাংশ বুটের তলায় পিষে চারপাশে তাকাল। খুঁটিয়ে দেখল সবকিছু, তারপর এগোল। উল্টোদিকের সাইডওঅকে এসে দাঁড়াল ক্ষণিকের জন্যে, দেখল কেভিন লপারের স্টোর থেকে বেরিয়ে এসেছে লোকগুলো। লাগাম খুলে ঘোড়ায় চেপে বসল একে একে, তারপর ক্যাফের দিকে এগোল। কোনদিকে চোখ ফেলার ফুরসৎ নেই, নিশ্চিত জানে ক্যাফেতে আছে ওদের শিকার।

একটু অপেক্ষা করল জেমস, লপার বা ক্রুশার কেউই বেরিয়ে এল না। এবার গলি ধরে সরে এল জায়গাটা থেকে, স্কুলের কাছে এসে দক্ষিণে এগোল। কারসনদের বাড়ির কাছে নেই কেউ। নিঃশব্দে আঙিনা পেরিয়ে এল ও, পেছন ফিরে দেখে নিল ফেলে আসা পথ। করালের কাছে এসে দাঁড়াল। নিকোলাস প্রাইসের বাড়ির ওপর চোখ বুলাল। অনায়াসে খুঁজে পেল দুজনকে। অপেক্ষা করতে করতে অধৈর্য হয়ে পড়েছে বোধহয়, স্বভাবতই অসতর্ক। ট্রেইলের পাশে একটা জুনিপার ঝোপের আড়ালে লুকিয়েছে।

নিঃশব্দে ওদের দশগজ পেছনে এসে দাঁড়াল জেমস অ্যালেন, টেরই পেল না কেউ। রাইফেল বাম হাতে চেপে ধরে ডান হাতে একটা সিক্সটার ক করল, নিমেষে স্থির হয়ে গেল ওদের শরীর। ঠায় বসে থাকল কয়েক সেকেন্ড, তারপর ধীরে উঠে দাঁড়াল।

কোন চালাকি কোরো না, মৃদু স্বরে নির্দেশ দিল জেমস। দুই আঙুলে পিস্তল তুলে দূরে ফেলবে, একজন একজন করে। প্রথমে তুমি, ডান দিকের জন।

ধীরে কোমরের কাছে চলে গেল লোকটার হাত, কিন্তু সহসাই বিদ্যুৎ গতিতে ছোবল হানল হোলস্টারে। এরকম কিছু হতে পারে আশা করেছিল জেমস। নির্দ্বিধায় গুলি করল। ঘুরতে শুরু করেছিল লোকটা, জেমসের গুলি ওর পাঁজর বিদীর্ণ করে ভেতরে ঢুকে পড়ল। পরের গুলিতে ভূপতিত হলো সে।

শেষ মুহূর্তে ভুলটা বুঝতে পারল অন্যজন, একই সাথে গুলি করল ওরা। তাড়াহুড়োয় ফস্কে গেল লোকটার গুলি, ওই একটা বুলেটে নির্ধারিত হয়ে গেল সবকিছু।

পিস্তল রিলোড করল জেমস, চারপাশে তাকাল একবার। ক্যাফেতে হানা দেয়া লোকগুলো এখন জেনে যাবে ওর অবস্থান। এক হিসেবে ভালই হয়েছে, আপাতত বাজেদের ওপর আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে ওরা। কিছুক্ষণের জন্যে হলেও মেক্সদের বিপদের আশঙ্কা কমল।

প্রাইসের কেবিনের দিকে এগোল ও, আঙিনায় ঢুকতে দেখল পোর্চে এসে দাঁড়িয়েছে লরা প্রাইস। হ্যাটের কিনারা ছুঁয়ে তাকে সম্মান জানাল জেমস, করালে ঢুকে পড়ল। ওকে দেখে শব্দ করে খুশি প্রকাশ করল সোরেলটা, পা ছুঁড়তে শুরু করেছে। কাছে এসে ওটার কাঁধে চাপড় মারল ও, স্যাডল চাপিয়ে বেরিয়ে এল।

শহরের দিক থেকে কয়েকটা খুরের শব্দ শোনা গেল।

মার্ক কোথায়, ম্যাম? স্যাডলে চেপে জানতে চাইল জেমস।

স্কুলে।

ভেতরে যাও। ওরা এসে পড়েছে। আমি চেষ্টা করব যাতে এখানে কিছু না ঘটে।

নির্বিকার মুখে ওকে দেখল মহিলা, ঘুরে ভেতরে ঢুকে পড়ল এরপর। ট্রেইলে এসে দাঁড়াল জেমস, অপেক্ষায় থাকল।

সেকেন্ড কয়েক পর দেখা গেল লোকগুলোকে—চারজন। উত্তেজনায় টগবগ, করে ফুটছে। ওকে দেখে থমকে গেল, ঘোড়াগুলোকে সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। শক্ত হাতে লাগাম টানায় সশব্দে ডেকে উঠে প্রতিবাদ জানাল একটা ঘোড়া, সামনের দুপা তুলে দিয়েছে। কোনরকমে স্যাডল হর্ন আঁকড়ে ধরে সামলে নিল সওয়ারী, তীব্র গাল বল ঘোড়ার উদ্দেশে। নির্দয়ভাবে স্পর দাবাল। আর্ত চিৎকার করে উঠল অবলা প্রাণীটি, দুই পা এগিয়ে শান্ত হয়ে গেল।

তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে লোকগুলোকে দেখল জেমস। সব কজন বেপরোয়া, চাহনিতেই পরিষ্কার ওদের উদ্দেশ্য—দল বেঁধে খুন করতে এসেছে।

তোমরা বোধহয় আমাকেই খুঁজছ? মৃদু কণ্ঠে জানতে চাইল ও। মুখে হাসি, আচরণে ঢিলে ভাব থাকলেও সতর্ক। জানে আগাম কোন সঙ্কেত বা কথা-বার্তা ছাড়াই এদের যে কেউ পিস্তল বা রাইফেল তুলে নিতে পারে।

ঠিকই ধরেছ, চাঁছাছোলা স্বরে জবাব দিল সামনের লোকটা, মাটিতে থুথু ছিটাল। ভেবো না তোমাকে দেখে ভয়ে পেচ্ছাব করে দিয়েছি আমরা। নিজের রসিকতায় নিজেই হেসে উঠল সে।

আরও কয়েকটা লাশ পড়বে কেবল। আমি ভাবছি আন্ডারটেকার লোকটা শেষে আবার কবর খুঁড়তে খুঁড়তে বিরক্ত হয়ে যায় কি-না।

হাসি থেমে গেল ওদের, সতর্ক দৃষ্টিতে মাপছে ওকে।

হেনরী ক্রুশারের জন্যে তোমাদের এত দরদ! আমি ভাবছি সেটা কার বেশি, তাকেই আগে গুলি করব। তুমি একা, অ্যালেন।

সত্যি, কিন্তু তোমাদের বন্ধুরাও এমনই বলেছিল। ওরা কুলিয়ে উঠতে পারেনি। হেনরী ক্রুশারের টাকা ওদের কোন কাজে আসছে না এখন।

কি বলতে চাও? জানতে চাইল প্রথম লোকটা, সুর বদলে গেছে, গলায় সন্দেহ।

নিজের অফিসে আরামে বসে আছে সে, কয়েকটা ডলারের জন্যে অযথাই জীবনের ঝুঁকি নিচ্ছ তোমরা। বাস্তবে আমাদের মধ্যে কোন শত্রুতা নেই। এমন এক লোকের লড়াই তোমরা করছ নিজে লড়ার সাহস যার নেই। শুরুতে কজন ছিলে তোমরা?

ও ভাঁওতা দিচ্ছে, হবস, পেছন থেকে বলল একজন। কেটে পড়ার ফায়দা খুঁজছে।

বোঝা যাচ্ছে ক্রুশারের প্রতি তোমারই দরদ বেশি। ঠিক আছে তোমাকে দিয়েই শুরু করা যাক।

জেমসের শীতল স্বর শিহরিত করল লোকটাকে। ভয় পেল সে, টের পেল গোলাগুলি আরম্ভ হলে সবার আগে সে-ই মারা যাবে। জেমস অ্যালেনকে সহজে কুপোকাত করা যাবে না, এটা গত কয়েকদিনে খুব ভালভাবে বোঝা গেছে। শক্তপাল্লা সে। এমন হতে পারে নিজে মরার আগে সবাইকে শেষ করে ফেলবে।

সন্দেহটা ঢুকিয়ে দেয়া গেছে ওদের মনে, আতঙ্কও, সন্তুষ্টির সাথে ভাবল জেমস। এবার শান্তিপূর্ণভাবে শেষরক্ষা করা যাক। আমি বলি কি, তোমরা বরং যার যার কাজে ফিরে যাও, ক্রুশার বা লপারের কাছ থেকে পাওনা বুঝে নাও। কারণ আজকের পর আর তোমাদেরকে বেতন দেয়ার জন্যে ওরা কেউই বেঁচে থাকবে না।

হেসে উঠল সামনের লোকটা। শুনেছ, কি বলছে ও? লপার আর ক্রুশারকে নাকি খুন করবে! আগে তো আমাদেরকে টপকে যেতে হবে।

আলতোভাবে স্পার দাবাল জেমস, সোরেলটা আগে বাড়তে শুরু করল। হবসের চোখে তাকিয়ে আছে। পরে বলতে পারবে না কোন সুযোগ দেইনি। অন্যরা যা পায়নি, তা পাচ্ছ তোমরা। ইচ্ছে হলে সরে গিয়ে আমাকে চলে যেতে দেবে, নয়তো অস্ত্র ধরবে। কোনটা করবে সে তোমাদের মর্জি। কিন্তু কাউকেই দয়া করব না আমি।

দশহাত দূরে এসে দাঁড়াতে ভড়কে গেল লোকগুলো। নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাল পেছনের লোকটা। প্রতিপক্ষ নির্দ্বিধায় চলে আসছে, ভয়-ডর কিছু নেই তার মধ্যে। এটাই অস্থির করে তুলল পাঞ্চারকে। কোমরে হাত বাড়াল সে, তুলে আনল পিস্তল। নিশানা করতে গিয়ে দেখল জেমস অ্যালেনের পিস্তল তাকিয়ে আছে ওর দিকে। বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল লোকটা, আতঙ্কে স্কুলে পড়ল কাঁধ। তার কাছে মনে হলো পিস্তলটা জেমসের হাতে প্রথম থেকেই ছিল।

পিস্তলটা ফেরত পাঠাও, মিস্টার! শীতল সুরে নির্দেশ দিলজেমস, কেঁপে উঠল লোকটার দেহ। আর যদি মরতে চাও তো আরেকটু তুলে আনো!

বোকার মত চেয়ে থাকল সে, পরে বুঝতে পারল ইচ্ছে করলে ওর্কে মেরে ফেলতে পারত অ্যালেন। দ্রুত নির্দেশ পালন করল পাঞ্চার, সঙ্গীদের দিকে তাকাল একবার, ওরাও থমকে গেছে। অ্যালেন এত দ্রুত পিস্তল বের করে আনবে ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেনি।

শেষবারের মত বলছি, জেমসের পিস্তল অনড়। তোমাদের সাথে শত্রুতা নেই আমার। ইচ্ছে করলে আমার পথ থেকে সরে যেতে পারো।

আমাদেরকে চলে যেতে দিচ্ছ? অবিশ্বাসে ঝুলে পড়ল হবসের কাঁধ।

সে তোমাদের ইচ্ছে। কিন্তু অস্ত্রগুলো এখানেই ফেলে যাবে।

দুই মিনিটের মধ্যে ঝটপট চারজোড়া পিস্তল আর রাইফেল পড়ল ঝোপের ভেতর। ট্রেইলের একপাশে সরে দাঁড়াল ওরা।

দয়া করে ভুলেও অন্যকিছু মাথায় এনো না। সবচেয়ে ভাল হয় যদি এখুনি শহর ছাড়ো। পরে কোন এক সময়ে এসে অস্ত্রগুলো নিয়ে যেয়ো।

উল্টোদিকে রওনা দিল লোকগুলো।

এবার নিশ্চিন্তে শহরে ঢুকল জেমস। মূল রাস্তায় দাঁড়িয়ে দুপাশে নজর বুলাল। ক্যাফের সামনে কাউকে দেখা যাচ্ছে না। অস্বাভাবিক ব্যাপার। অন্তত দুজনের থাকার কথা। ওরা এত সহজে হাল ছেড়ে দেবে বিশ্বাস করতে পারছে না।

রবার্ট হার্ডিংয়ের সেলুনের দিকে এগোল জেমস। সামনে এসে স্যাডল ছেড়ে রেইলের সাথে সোরেলের লাগাম বাধল। ভেতরে ঢুকল। সেলুনটা ফাকা। ন্যাকড়া দিয়ে বোতল মুছছিল বব, ব্যাটউইং দরজা খুলে যেতে ফিরে তাকাল। ওকে দেখে অবাক হলো, তারপর সরে এল বারের কাছে। উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছে।

হুইস্কি, ফরমাশ দিল জেমস।

নেবর ফিরেছে, গ্লাস এগিয়ে দেয়ার সময় জানাল সে। দলবল নিয়ে ক্যাফের কাছে গেছে।

লেসলি?

ধরে নিয়ে এসেছে। পিটিয়ে আধমরা করে ফেলেছে বেচারাকে। ওপরের রূমে ওকে রেখে গেছে নেবর, বাইরে তালা ছাড়াও দুজন পাহারায় আছে।

লপার কোথায়, জানো?

দেখিনি ওকে।

সময় নিয়ে হুইস্কি শেষ করল জেমস, ভাবছে। রেনে নেবরকে ক্যাফের সামনে দেখতে পায়নি, অথচ ববের মতে ওখানেই আছে মার্শাল। তরল পানীয় গলায় জ্বালা ধরিয়ে দিচ্ছে, রক্ত উস্কে দিতে চাইছে। কিন্তু নিজেকে সামলে নিল জেমস, তাড়াহুড়ো করলে আসল কাজটাই সারা যাবে না। শেষ মুহূর্তে সবকিছু ওলট-পালট হয়ে যাক, এটা সে চায় না। লেসলি উইলিয়ামস ওর কোন কাজে আসবেনা এখন, তার ব্যবস্থা পরেও করা যাবে।

বিল মিটিয়ে বেরিয়ে এল ও। পোর্চে দাঁড়িয়ে দেখল শহরটা। ক্যাফের সামনে কাউকে দেখা গেল না এবারও। কিন্তু আশপাশেই আছে ওরা, বাজি ধরে বলতে পারবে জেমস। রেইল থেকে বাধন খুলে স্যাডলে চাপল। ধীরে এগোতে দিল সোরেলটাকে। পুরোমাত্রায় সতর্ক ও। আশপাশের বাড়ির জানালা, ছাদ আর গলির মুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। জানে যে কেউ লুকিয়ে থাকতে পারে। ঘোড়ার লাগাম আলতোভাবে বাম হাতে ধরা, ডান হাত শিথিলভাবে পড়ে আছে কোমরের পাশে, যাতে প্রয়োজনে হোলস্টার থেকে পিস্তল বা স্যাডল হর্নের সাথে আড়াআড়িভাবে ঝুলিয়ে রাখা রাইফেলের যে কোনটা তুলে নিতে পারে।

ক্যাফের সামনে পৌঁছে গেল ও। কাচ গলে ভেতরের দিকে তাকাল, কিছুই চোখে পড়ছে না। স্যাডল ছাড়তে যাবে ঠিক এসময়ে খুলে গেল দরজা, পোর্চে এসে দাঁড়াল রেনে নেবর। পা ফাঁক করে দাঁড়িয়ে, লিকলিকে হাতজোড়া কোমরের পাশে স্থির হয়ে আছে। হলদেটে চোখে দেখল ওকে, তারপর ক্ষীণ হাসল। বেঁকে গেছে ঠোঁটের কোণ।

পেছনে অন্তত তিনজন এসে দাঁড়িয়েছে, সহসা টের পেল জেমস। এতক্ষণ আড়ালে থেকে অপেক্ষা করছিল। মেরুদণ্ড বেয়ে শীতল একটা স্রোত নেমে গেল। সংখ্যাটা আন্দাজ করার চেষ্টা করল—ঠিক পেছনে, ফিড স্ট্যাবলের কাছে দুই জন, আরেকজন একটু ডানে, গলির মুখে। বামে, মাইক টিরেলের জেনারেল স্টোরের দরজার কাছে চতুর্থ লোকটি…

স্মার্ট লোক তুমি, অ্যালেন, পকেট হাতড়ে একটা দুমড়ানো সিগার বের করে ধরাল নেবর, মুহূর্তের জন্যেও তার চোখ সরছে না জেমসের ওপর থেকে। যেভাবেই হোক ম্যানেজ করে ফেলছ সবকিছু। এতগুলো লোক, অথচ ওরা তোমার টিকিটিও ছুঁতে পারেনি। হয়তো এ জন্যেই যে শেষতক আমার হাতেই মারা পড়তে হবে তোমাকে।

স্যাডল ছাড়ল জেমস, চাপড় মারল সোরেলের পিঠে। এগিয়ে একপাশে সরে গেল ঘোড়াটা। ঠায় একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকল ও। সতর্ক, প্রস্তুত। লপার কোথায়, নেবর? হালকা সুরে জানতে চাইল।

তোমার হয়ে ওকালতি করবে ভেবেছ নাকি? হেসে উঠল মার্শাল, কর্কশ শোনাল গলা। বরং তোমার ওপর খেপে আছে ও। প্রাইস আর বার্থেজরাও খুব জ্বালাচ্ছে, এবার সবকটাকে টাইট দিতে হবে।

অ্যাশলে গাইলশ, তোমার আশা পূরণ হবে না।

থমকে গিয়ে তাকিয়ে থাকল নেবর, হাসি মুছে গেছে। চোখে পলক পড়ছে, বোঝার চেষ্টা করছে ওকে।

অ্যাবিলিনের ছোট্ট একটা বাথান, গাইশ, ভুলে গেছ?

তুমি কে, অ্যালেন? নিচু গলায় জানতে চাইল সে, গলায় সন্দেহের সুর। ২৪৬

আমি ওই মেয়েটার স্বামী।

আচ্ছা, এ জন্যেই তোমাকে দেখে চেনা চেনা মনে হয়েছিল! তোমার বাথানের বেডরূমে ছবি দেখেছিলাম। ঠিক উদ্দেশ্য নিয়ে দেখিনি, এমনিতেই চোখে পড়েছিল। ভালই হলো। একেবারে চুকে যারে ব্যাপারটা। তোমার মরিয়া হয়ে ওঠার কারণ এবার বোঝা যাচ্ছে। তিন বছর বেশ লম্বা সময়, তাই না? অন্য কেউ হলে হাল ছেড়ে দিয়ে ভুলেই যেত। দেখা যাচ্ছে ভুলতে পারোনি তুমি। না পারারই কথা, মেয়েটা খাসা ছিল।

মাথায় রক্ত চড়ে যাচ্ছে, টের পেল জেমস, হলুদ শয়তানটার টুটি চেপে ধরতে ইচ্ছে করছে। বহুকষ্টে নিজেকে সামলে নিল ও, বুঝতে পারছে নির্মম তামাশা করে ওকে বেসামাল করতে চাইছে নেবর। ঘৃণাভরে তাকে দেখল জেমস, মাটিতে একদলা থুথু ফেলল। তারাটা খুলে ফেলো, গাইলশ, শীতল সুরে বলল ও। ওটা তোমার মত বেজন্মাকে মানায় না। বিষাক্ত একটা হলুদ শেয়াল তুমি, গাইলশ!

ধক্ করে জ্বলে উঠল মার্শালের চোখজোড়া। সিঁড়ি ভেঙে দুধাপ নেমে এল সে। হোলস্টারের কাছে নেমে গেছে হাত। আড়চোখে জেমসের পেছনে দাঁড়ানো সঙ্গীদের দেখল, তারপর ঠোঁটের সাথে চেপে থাকা সিগারে উঠে এল বাম হাত। দুই আঙুলে চেপে ধরে মুখ থেকে সরিয়ে নিল ওটা, তারপর ছুঁড়ে দিল জেমসের দিকে। নিমেষে হাত বাড়াল, ছোবল মেরে হোলস্টার থেকে তুলে আনল জোড়া পিস্তল। নিশানা করার সময় টের পেল বুকে হাতুড়ির ঘা পড়েছে। টলে উঠল রেনে নেবরের হালকা শরীর। ট্রিগারে টান পড়ায় একটা বুলেট বেরিয়ে গিয়ে জেমসের সামনের মাটিতে ধুলো উড়াল। ফের নিশানা করার আগেই পেটে আঘাত করল দ্বিতীয় বুলেট। অ্যাশলে গাইলশ চরম বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করল হাতে বা পায়ে জোর পাচ্ছে না সে, অবশ হয়ে আসছে সব। দৃষ্টি ঝাঁপসা হয়ে যাচ্ছে। হাঁটু ভেঙে পড়ে গেল সে, চরম ক্লান্তি গ্রাস করতে চাইছে সারা দেহ। অজান্তেই শিথিল হয়ে গেল পিস্তলধরা মুঠি। হাহাকার উঠল তার বুকে-কোন এক অখ্যাত জেমস অ্যালেনের কাছে হেরে গেছে সে!

ওদিকে পেছনের লোকগুলোকে নিয়ে ব্যস্ত জেমস। নিশানা ছাড়াই কোমরের কাছ থেকে একের পর এক গুলি করে চলেছে। শেষ লোকটা ধরাশায়ী হতে চারপাশে তীক্ষ্ণ নজর বুলাল। নেই কেউ। ঘুরে ক্যাফের দোতলায় জানালার দিকে তাকাল ও। হাস্যোজ্জ্বল রেমন্ড বার্থেজ হাত নাড়ল ওর উদ্দেশে, আরেক হাতে রাইফেল। পেছনের লোকগুলো কোন পাত্তাই পায়নি তার জন্যে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই খুন হয়ে গেছে দুজন।

মৃদু নড করল জেমস, তারপর এগিয়ে গিয়ে নেবরের কাছে এসে দাঁড়াল। বুটের আগা দিয়ে ঠেলে চিৎ করল উপুড় হয়ে পড়ে থাকা শরীরটা। জোর করে চোখ মেলল দো-আঁশলা, বিকৃত হয়ে গেছে মুখ।

বুড়ো লোকটাকে মনে পড়ে, গাইশ? ঘৃণাভরে বলল জেমস। তোমার গুলি ওর পেট ফুটো করে দিয়েছিল, তাই নিয়ে দুটো দিন বেঁচে ছিল সে। কি অমানুষিক কষ্ট পেয়েছিল বুঝতে পারছ? দ্রুত মৃত্যুর জন্যে প্রার্থনা করো! একটু আগেও তুমি বাঁচতে চেয়েছিলে, কিন্তু আমার ধারণা এখন আর সেরকম ইচ্ছে হবে না তোমার।

পিস্তল ধরার জন্যে হাত বাড়াল সে, কোনরকমে শ্লথ গতিতে তুলে নিল। নির্দয়ভাবে গুলি করল জেমস, নেবরের হাত থেকে ছিটকে পড়ল পিস্তল। কবজি গুড়িয়ে গেছে।

তুমি কে, অ্যালেন? আমার বিশ্বাস সাধারণ কেউ নও।

কি হবে জেনে? ধীরে পিস্তলে টোটা ভরল জেমস। তিন বছর আগেও যদি জানতে তুমি ভয় পেতে, পিছিয়ে যেতে? শোনো, ওই বুড়ো মানুষটা আমাকে কোলে-পিঠে করে মানুষ করেছিল। তুমি মরেছ ওর জন্যে। ফের পিস্তল তুলে গুলি করুল ও, নেবরের দুই হাঁটুতে। তারপর তাকাল মার্শালের চোখে, আতঙ্ক ফুটে উঠেছে সেখানে।

দয়া করে আমার মাথায় একটা গুলি করো, অ্যালেন… আর্তনাদ করল নেবর, ফিসফিসানির মত শোনাল সেটা।

এখানে পড়ে থেকে বুড়োর কাছে মাফ চাও, গাইলশ, মাথা নেড়ে বলল জেমস। ও হয়তো তোমাকে ক্ষমা করতে পারে। কিন্তু আমি পারলাম না।

চোখ বুজে পড়ে থাকল রেনে নেবর। ঘন হয়ে এসেছে নিঃশ্বাস, মুখ বিকৃত। রক্তের একটা পুকুরের মাঝখানে পড়ে আছে।

ঝুঁকে পিস্তলদুটো তুলে নিল জেমস। সিলিন্ডার খুলে বুলেট বের করে দূরে। ছুঁড়ে ফেলল, তারপর অস্ত্রগুলো ফেলে রাখল নেবরের ভূপতিত দেহের পাশে। ঘুরে চারপাশে তাকাল ও, বেশ কয়েকজনকে দেখা যাচ্ছে-তামাশা দেখছে। ওদের মধ্যে নিকোলাস প্রাইসকে দেখে অবাক হলো। চোখাচোখি হতে হাত নাড়ল সে, এগিয়ে এল।

একটা ঝামেলা হয়ে গেছে, জেমস, কাছে আসতে নিচু স্বরে বলল সে, উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছে।

চোখে প্রশ্ন নিয়ে তাকাল ও।

তোমার কাগজপত্র নিয়ে আমাদের সাথে বসতে চেয়েছিল রোজ। দশটার সময় ওর অফিসে বসার কথা ছিল। ও স্কুলে যাওয়ার পরপরই সেখানে উপস্থিত হয় লপার আর ক্রুশার। কাগজপত্রসহ রোজকে ধরে নিয়ে গেছে ওরা।
কি বলতে চেয়েছিল ও? জানতে চাইল জেমস অ্যালেন।

তিনটে পোস্টার আছে, বলেছিল ও। আর তোমার পরিচয়।

রেমন্ডকে জানিয়েছ? রোজালিনা খুব বেশি সাহস দেখিয়ে ফেলেছে, ভাবল ও, লপার আর কুশারের বিপক্ষে শহরবাসীকে সংগঠিত করতে চেয়েছিল। ওর প্রতি যে অন্যায় করেছিল তারা, সেটা জানিয়ে জেমসের পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে চেয়েছে। অথচ কিছুই জানে না ও! মেয়েটার মাথায় এ চিন্তা এল কোত্থেকে?

না।

লপারকে কোথায় পাওয়া যাবে, বলতে পারো?

মাথা নাড়ল প্রাইস। হয়তো ওর অফিসে কিংবা বাসায়।

কেভিন লপারকে ভাল করে চেনা আছে ওর, লোকটার স্বভাব সম্পর্কে জানে। সুযোগসন্ধানী সে, রোজালিনাকে একা পেলে সর্বনাশ করে ছাড়বে। ক্রুশার হয়তো সাথে আছে, তাকে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করবে কিংবা দলে ভেড়াবে। ওর বাসা চেনো?

চলো। আমিও যাব।

তুমি শুধু বাসাটা দেখিয়ে চলে আসবে।

দেখা যাবে, ক্ষীণ হেসে এগোল নিকোলাস প্রাইস। পেছন দিক দিয়ে যাব আমরা।

ক্যাফের পোর্চে দেখা গেল রেমন্ড বার্থেজকে। মনে হচ্ছে আমাকে বাদ দিয়ে সবটার মজা একাই নিতে চাইছ? সহাস্যে অনুযোগ করল সে, হাতের রাইফেলে চাপড় মারল। বুড়ো হয়ে গেলেও নিশানাটা ভালই আছে। কি বলো, জেমস?

অসাধারণ! প্রত্যুত্তরে হাসল জেমস। এবং সঠিক সময়ে উপস্থিত হওয়ার গুণটাও আছে। তুমি সময়মত বাগড়া না দিলে ওরা ঠিকই আমাকে পেড়ে ফেলত।

বাগড়া? তুমি এটাকে বাগড়া বলছ! শুনে কষ্ট পেলাম, বাছা! কৃত্রিম নিরাশা তার মুখে, কিন্তু গলায় সন্তুষ্টির প্রচ্ছন্ন সুর। এই ঠেলায় সব জঞ্জাল সাফ করে ফেলব। তিনজনে মিলে আমরা দলটা একেবারে হেলাফেলা করার মত নই, কি বলো?

কাজটা সহজ হবে না, বলল প্রাইস। জীবনে কাউকে খুন করিনি আমি।

এটাকে খুন বলছ কেন, নিক? এটা আমাদের দায়িত্ব। এ শহরের নাগরিক হিসেবে এখানকার শান্তি বজায় রাখা আমাদের কর্তব্য। আমরা নিজেরা যদি তা করতে পারি…

মি. রেমন্ড, বাধা দিল জেমস, গম্ভীর দেখাচ্ছে ওকে। এখানেই থাকা উচিত তোমার। এদের কোন বিপদ হলে তোমাকেই দেখতে হবে।

নীরবে তাকিয়ে থাকল বার্থেজ। ভুরু কোঁচকাল যেন একমত হতে পারছে। অবশেষে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল সে, দুলে উঠল কাঁধজোড়া। আসলে আমাকে এড়িয়ে যেতে চাইছ। ঠিক আছে, যাও তোমরা।

নিক, তুমি বরং এখানেই থেকে যাও। মি. রেমন্ডের সাহায্য দরকার হতে পারে।

বিস্মিত দেখাল কাঠ ব্যবসায়ীকে। একা ওখানে যাওয়ার পাঁয়তারা করছ নাকি? ভুলে যাও। একগাদা লোক তোমাকে হেঁকে ধরবে। তারচেয়ে, আমি বলি কি…দুজনে মিলে গেলে সহজ হয়ে যাবে কাজ।

মাথা নাড়ল জেমস। ঠিক আছে, যাবে তুমি। কিন্তু বাড়িটা দেখিয়ে দিয়ে তোমার ছুটি। প্রাইস কিছু বলতে উদ্যত হতে হাত তুলে থামিয়ে দিল। কোন কথা শুনতে চাই না। লপারের বাড়ি দেখিয়ে দেয়ার জন্যে এ শহরে ঢের লোক পাওয়া যাবে।

তোমার ইচ্ছে, হতাশ দেখাল প্রাইসকে। কেউ যদি সেধে ঘাড়ে বিপদ নিতে চায় তো আমার কি! বলে ঘুরে উত্তরে এগোতে শুরু করল।

অনুসরণ করল জেমস।

পেছনে ওদের দিকে তাকিয়ে থাকল রেমন্ড বার্থেজ, অনেকক্ষণ। ব্যাপারটা বোধগম্য হচ্ছে না তার। ঘুরে ক্যাফের দিকে তাকাল। মারিয়া যথেষ্ট দৃঢ়চেতা, ঝামেলা সামাল দেয়ার ক্ষমতা ওর আছে, ভাবছে সে। তাছাড়া তেমন কিছু হওয়ার সম্ভাবনা আছে কি? রোজালিনা স্কুলে আছে, ওর কাছেই যাওয়া যাক, সিদ্ধান্ত নিল বার্থেজ। দেখা যাক কতদূর এগোতে পারল মেয়েটা।

ফুটপাথ ধরে এগোল সে। জেমস বা নিকোলাসকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না।

মিনিট পাঁচের মধ্যে স্কুল থেকে ঘুরে এল সে। মিসেস লয়ারীর কাছ থেকে দুঃসংবাদটা শোনার পর মাথায় রক্ত চড়ে গেছে। আফসোস আর অপরাধবোধ হচ্ছে তার, মেয়েকে সে নিজেই উৎসাহিত করেছে। জেমসের কাগজপত্র দেখে আর পরিচয় জানার পর রোজালিনাকে পরামর্শ দিয়েছিল শহরের শীর্ষস্থানীয় লোকজনের সাথে দেখা করে আসল সত্যটা জানাতে। বড্ড ঝুঁকি নেয়া হয়ে গেছে, ভাবল সে, আরেকজনের উপকার করতে গিয়ে নিজের সবচেয়ে প্রিয় জিনিসের ঝুঁকি নিয়ে ফেলেছে। কোনভাবেই ব্যাপারটা পছন্দ করতে পারছে না বার্থেজ, রোজালিনাকে এরমধ্যে না জড়ালেও চলত। এখন খারাপ কিছু হয়ে গেলে?

জেমস অ্যালেন আছে…নিজেকে সান্ত্বনা দিল সে…ও নিশ্চয়ই বসে থাকবে না।

দ্রুত পায়ে হেঁটে ব্যাংকের কাছে চলে এল বার্থেজ। ক্রুশার বা লপার কাউকেই পাওয়া গেল না। এক কর্মচারী ওদের বাসার পথ বাতলে দিল।

কেভিন লপারের বাসাটা দোতলা। বিশাল সুদৃশ্য বাড়ি। নিঃসন্দেহে লিয়ন সিটির সেরা বাড়ি। বাইরে সাদা চুনকাম করা, বাগানে হরেক ফুলগাছের সমারোহ। দালানের পেছনে পাইনের ঝাড়। সব মিলিয়ে অপূর্ব। খোলা গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল রেমন্ড বার্থেজ। কোন বাধা না আসায় সন্দেহ হলো হয়তো ভুল জায়গায় চলে এসেছে, কিংবা লপার বোধহয় আদৌ বাড়িতে নেই।

মূল দরজায় কড়া নাড়ার পর ভুলটা ভাঙল। হাসিমুখে নিজেই দরজা খুলল কেভিন লপার। আরে মি. বার্থেজ যে! উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাল স্টোর মালিক। এসো, ভেতরে এসে বসো।

অস্বস্তি অনুভব করছে রেমন্ড, এরকম আন্তরিক সম্ভাষণ আশা করেনি। ধীর পায়ে পারের পিছু নিয়ে ভেতরে ঢুকল ও। বড়সড় একটা হলরুমে এসে বসল ওরা।

রোজালিনার খোজে এসেছি আমি, মৃদু স্বরে নিজের উদ্দেশ্য জানাল রেমন্ড।

চেয়ার ছেড়ে দেয়ালের কাছে চলে গেল লপার। দেয়ালের বুকে বসানো কেবিনেট, কাচের দরজার ভেতর সুদৃশ্য বোতল সাজিয়ে রাখা। দরজা খুলে বোতল আর গ্লাস বের করল সে, পানীয় ঢালতে শুরু করল। ও যদি আমার কাছে আসত সত্যি খুশি হতাম, খানিকটা ম্লান সুরে বলল সে। আগে-পরে যাই হোক, আমি একজন অবিবাহিত পুরুষ এবং রোজালিনা এ শহরের সবচেয়ে আকর্ষণীয় মহিলা। মি, বার্থেজ, বুঝতেই পারছ…।

আমি শুনেছি ওকে নিয়ে এসেছ তুমি! বাধা দিল ক্যাফে মালিক, মেয়ের অমঙ্গল আশঙ্কায় অধৈর্য হয়ে পড়েছে।

পানীয় ভরা গ্লাস পরিবেশন করল সে। চোখ তুলে তাকাল, চাহনিতে কোন রকম ছলনা বা চাতুরির চিহ্ন নেই। তুমি হয়তো ভুল বুঝেছ, মি. বার্থেজ, হেসে দরাজ গলায় বলল লপার। স্কুলে গিয়েছিলাম আমি ঠিক, এ জন্যে আমাকে দোষ দিতে পারবে না তুমি। রোজালিনা এখানকার সব পুরুষের আগ্রহের বিষয়, এমনকি বিবাহিতদের কাছেও। মেয়েকে সারাজীবন নিজের কাছে রাখার চিন্তা নিশ্চয়ই করছ না!

তোমার সাথে ওর দেখা হয়েছে? রুক্ষ স্বরে জানতে চাইল রেমন্ড।

হয়েছে, রেমন্ডের রূঢ় স্বরকে গ্রাহ্য করল না লপার। তার হাসি অম্লান, গ্লাস তুলে চুমুক দিল। তুমি নিশ্চই চাও না আমাদের মধ্যে কি কি কথা হয়েছে তা-ও বয়ান করি?

তারপর?

গ্লাস রেখে সিগার কেস তুলে নিল সে। অফার করল ওকে, মাথা নেড়ে প্রত্যাখ্যান করল রেমন্ড বার্থেজ। মূল রাস্তা পর্যন্ত ওকে এগিয়ে দিয়েছি আমি, সিগার ধরিয়ে ধোঁয়া গিলল লপার। অযথা তোমার হয়রানি হচ্ছে বলে আমার খারাপ লাগছে, মি. বার্থেজ। হতে পারে ও প্রাইসের বাসায় গেছে কিংবা অন্য কোথাও।

তোমার বাসা খুঁজে দেখব আমি।

এবার গম্ভীর দেখাল স্টোর মালিককে। তুমি কি আমাকে মিথ্যেবাদী ভাবছ নাকি …।

অত কিছু বুঝি না, লপার, অধৈর্য কণ্ঠে বাধা দিল রেমন্ড। তুমি আমাকে স্বেচ্ছায় বাড়িটা দেখতে দেবে কি-না তাই বলো।

আমি অপমান বোধ করছি, মি. বার্থেজ! হতাশা প্রকাশ পেল লপারের কণ্ঠে। ত্যাগ করে সিগারটা ছাইদানিতে গুঁজে রাখল। তুমি আমার সম্মানিত অতিথি আর… অসহায় ভঙ্গিতে কাঁধ উঁচাল সে। তোমার কাছে অস্ত্র আছে কিন্তু আমার কাছে নেই, এটাই বোধহয় বড় ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ওকে এখানে খুঁজে পেলে একটা অস্ত্র তোমার হাতে তুলে দেব! শীতল সুরে ঘোষণা করল ক্যাফে মালিক। সমান সুযোগ পাবে তুমি।

হাসল লপার। তার দরকার হবে না, মি. বার্থেজ। এসো।

সারা বাড়ি খুঁজে দেখল ওরা একটা কামরাও বাদ গেল না।

দুশ্চিন্তা পেয়ে বসেছে রেমন্ড বার্থেজকে। মুখ থমথমে। দরজার দিকে এগোতে গিয়েও ঘুরে দাঁড়াল, অস্বস্তিভরা দৃষ্টিতে তাকাল লপারের দিকে। আমি দুঃখিত, লপার। অযথাই তোমার হয়রানি হলো।

হেসে হাত বাড়িয়ে দিল স্টোর মালিক। তোমার মানসিক অবস্থা বুঝতে পারছি। আমি বলি কি, আগে ক্যাফেতে ফিরে যাও, মি. বার্থেজ। রোজালিনা হয়তো এরমধ্যে ফিরেছে।

গেট পর্যন্ত রেমন্ডকে এগিয়ে দিল সে। তারপর দরজা বন্ধ করে ফিরে এল হলঘরে। টমাস? গ্লাসে পানীয় ঢেলে চড়া গলায় ডাকল কাজের লোককে।

ভেতরের কামরা থেকে বেরিয়ে এল মাঝবয়সী এক লোক।

মেয়েটা কোথায়? নতুন সিগার ধরিয়ে জানতে চাইল লপার। আনন্দে পুলকিত, খুব সহজে সামাল দেয়া গেছে রেমন্ড বার্থেজকে।

ওপরে, তোমার বেডরুমে।

একটা রাইফেল নিয়ে দোতলায় চলে যাও। হ্যাঙ্কস আর মুরকে গেটের কাছে পাঠাও। কাউকে ঢুকতে দেবে না। তবে কারও সাথেই জোরাজোরি করার দরকার নেই। খুব ঝামেলা না হলে আমাকে ডেকো না।

মাথা ঝাঁকিয়ে চলে গেল লোকটা।

ফের গ্লাসে পানীয় ঢালল লপার। গলায় ঢেলে দিল সবটা। তরল আগুন নেমে গেল গলা দিয়ে। আজ তার জন্যে দারুণ একটা দিন। হেনরী ক্রুশারের বহু সাধনার জিনিস পেতে যাচ্ছে সে। সামান্য দুশ্চিন্তার একটা ব্যাপার রয়ে গেছে এখনও-জেমস অ্যালেনকে সামাল দেয়া গেছে কি-না এ খবর এখনও আসেনি। তাকে অবশ্য পরেও সামলানো যাবে।

সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠে এল সে। দুটো কামরা পরে তার বিলাসবহুল শোবার ঘর। না চাইলেও বারবার দৃশ্যটা চোখে ভাসছে…নরম বিছানায় রোজালিনাকে পেতে যাচ্ছে। গলায় সিগারের ধোয়া আটকাতে বিষম খেল লপার। কাশল বার কয়েক, তারপর বারান্দা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিল সিগার। বন্ধ দরজার সামনে এসে দাড়াতে ফের সুখানুভূতি গ্রাস করল তার সারা শরীর। ইশশ, মেয়ে বটে একখানা!

তালা খুলে ভেতরে ঢুকল কেভিন লপার। রোজালিনাকে একটা চেয়ারের সাথে বেঁধে রাখা হয়েছে। মুখে কাপড় গুঁজে দেয়া। দরজা খোলার শব্দে ফিরে তাকাল ও, লপারকে দেখে ম্লান হয়ে গেল সুন্দর মুখটা।

ঘুরে দরজা আটকে দিল লপার। রোজালিনার সামনে এসে দাঁড়াল। তাড়াহুড়োর কি আছে, অফুরন্ত সময় হাতে। সময় নিয়ে রসিয়ে রসিয়ে সারা যাবে কাজটা। বিছানার ওপর বসে রোজালিনার দিকে ঝুঁকে এল। আমাদের বোঝাঁপড়াটা বাকি রয়ে গেছে, হানি, মৃদু হাসি ফুটল তার মুখে, মেয়েটার অসহায় অবস্থা উপভোগ করছে। মিটিয়ে ফেলা যাক এবার। হাত বাড়াতে ভয়ে কুঁকড়ে গেল রোজালিনা, কিন্তু লপার কেবল ওর মুখ থেকে গুজে দেয়া কাপড় সরিয়ে নিল। রোজালিনার তটস্থ অবস্থা দেখে কৌতুক ফুটে উঠল তার চোখে।

কে এসেছিল? জানতে চাইল রোজালিনা, আতঙ্কে গলা বুজে আসতে চাইছে।

তোমার বাবা।

বোকা বোকা দেখাল মেয়েটাকে।

আমাকে চ্যালেঞ্জ করল সে, লপারের হাসি দুকান পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। সারা বাড়ি ঘুরিয়ে দেখালাম। দুর্ভাগ্য, মেয়েকে খুঁজে পায়নি বেচারা।

হতাশায় কিছু বলতে পারল না রোজালিনা। জেমস অ্যালেন এর সম্পর্কে সতর্ক করেছিল, মনে পড়ল ওর। দারুণ ধূর্ত লোক, সবাইকে বোকা বানিয়ে ছেড়েছে। একটু আগে ওকে নিচে নামিয়ে নিয়ে গিয়েছিল টমাস লোকটা, মিনিট পাঁচ পার্লারের কাছে অপেক্ষা করে ওপরে নিয়ে এসে ফের বেঁধে রেখে গেছে। তখন এর অর্থ বুঝতে পারেনি, এখন সবটাই পরিষ্কার হয়ে গেছে।

সে কি আসবে? উঁহু, মোনা ছাড়া অন্য কোন মেয়ে তার জগতে নেই। রোজালিনার আগ্রহ সে ধরতে পারেনি বা ইচ্ছে করেই এড়িয়ে গেছে। অথচ ওর ধারণা ছিল তাকে জয় করতে পারবে। কয়েকটা দিন তো নিবিড় করে পেয়েছিল, তবু একবারের জন্যেও ধরা দেয়নি কঠিন লোকটা।

তুমি একটা অন্যায় করতে যাচ্ছিলে, হানি। তোমাকে সাবধান করেছিলাম। কিন্তু আমার কথাকে পাত্তাই দাওনি। নিশ্চিন্তে অ্যালেনকে জায়গা দিয়েছ, সেবা করে সুস্থ করে তুলেছ। আবার আমার বারোটা বাজানোর জন্যে কয়েকটা পোস্টার নিয়ে মীটিং ডেকেছ। না, রোজালিনা, আমি তোমার সাহসের প্রশংসা করছি। দুঃখ হচ্ছে তোমার জন্যে শেষপর্যন্ত ব্যর্থ হলে তুমি।

চুপ করে থাকল ও। ভয়ে মুখ-গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। জিভ দিয়ে শুকনো ঠোঁট ভেজাল, ঢোক গিলল, কিন্তু কাজ হলো না। দয়া করে একটু পানি দেবে? শুকনো গলায় অনুরোধ করল।

নিশ্চই, চাই কি হুইস্কিও দিতে পারি। উঠে বিছানার কিনারে টেবিলের কাছে গেল লপার, গ্লাসে পানি ঢেলে এগিয়ে ধরল ওর মুখের কাছে। সাগ্রহে পান করল রোজালিনা। ফিরে গিয়ে শূন্য গ্লাস টেবিলে রাখল সে। এবার আমাদের আলাপটা সারতে পারি, তাই না?

জেমস অ্যালেন কি মারা গেছে?

চোখ ছোট করে তাকাল লপার, বোঝার চেষ্টা করল কি যেন। হয়তো, তবে নিশ্চিত খবর পাইনি এখনও। ওর ব্যাপারটা হেনরী দেখছে। আমি বলেছি অ্যালেনকে শেষ করতে পারলে তোমার দাবি ছেড়ে দেব।

ও হয়তো মারা যায়নি এখনও, প্রবোধের সুরে বলল রোজালিনা।

হতে পারে। কিন্তু সেটা ভেবে আশায় থেকে লাভ নেই, হানি। এখানে ঢুকতে পারবে না সে। তাছাড়া এতক্ষণে না মরলেও দুএকটা গুলি নিশ্চয়ই হজম করতে হয়েছে ওকে। বিছানায় বসল লপার, নীরবে রোজালিনাকে দেখল কিছুক্ষণ। তারপর কেশে গলা পরিষ্কার করল। অনেকদিন আগে তোমাকে একটা প্রস্তাব দিয়েছিলাম। হয়তো ভুলে গেছ, তবু মনে করিয়ে দিচ্ছি। আমাকে বিয়ে করতে হবে তোমার।

তাকিয়ে থাকল রোজালিনা, মুখে কথা সরছে না।

তোমাকে স্বীকার করতেই হবে মানুষটা আমি মন্দ নই, খেই ধরল কেভিন লপার। তার কণ্ঠে আত্মপ্রসাদের সুর। টাকা, সম্পত্তি আর সম্মান-কোনটারই অভাব নেই। দেখতেও বদখৎ নই। তোমার আপত্তিটা কোথায় বুঝতে পারছি না।

নিজের সম্পর্কে আমাকে জ্ঞান দিতে এসো না, মি, লপার, বিরক্তি চেপে রাখতে পারল না ও। তোমার সম্পর্কে জানি আমি।

জেমস অ্যালেনের কল্যাণে, তাই না? হাসল লপার, পকেট থেকে পোস্টারগুলো বের করল। এগুলো ওর কাছ থেকে পেয়েছ নিশ্চয়ই? আমাকে ফসানোর জন্যে যথেষ্ট নয়। তুমি বা কেউই প্রমাণ করতে পারবে না। ক্যাল ইনগ্রসের সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই।

তুমি স্বীকার করবে না, এটাই স্বাভাবিক।

মাথা ঝাঁকাল লপার। এবার জেমস অ্যালেনের প্রসঙ্গ। ওর সম্পর্কে। বোধহয় সবচেয়ে বেশি জানো।

তোমার চেয়ে বেশি কিছু নয়।

বিশ্বাস করলাম না।

সেজন্যে কি তোমার পায়ে ধরতে হবে?

রোষের সাথে তাকাল কেভিন লপার। সাহস ফিরে পাচ্ছে মেয়েটা, ভাবল সে, হয়তো ভেবেছে আপাতত ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা নেই ওর। শোনো, রোজালিনা, আমাকে খোঁচা মারবে না। এ জিনিসটা আমি একেবারে সইতে পারি না। কঠোর দেখাল তার মুখ, শীতল ভাবটুকু স্পষ্ট। প্রস্তাবটা ভেবে দেখার জন্যে সময় দিতে পারছি না। সিদ্ধান্তটা তোমাকে এখুনি নিতে হবে।

যদি তোমার পছন্দ না হয়?

রোজালিনার সারা শরীরে নজর বুলাল লপার। হাসল এরপর। নিজের ভাল বোঝার ক্ষমতা, তোমার হয়েছে, তাই না?…আগামী রোববারই গির্জায় যাচ্ছি আমরা। সকালে ক্যাফের দরজায় বাগি নিয়ে অপেক্ষা করব আমি।

ধরো রাজি হলাম না।

ক্যাল ইনগ্রস সম্পর্কে কেবল শুনেছই তুমি, কিছু জানো না। সারা জীবন যাতে তোমাকে পস্তাতে হয় সেই ব্যবস্থা করব আমি। এখান থেকে ছাড়া পাবে ঠিকই, ততদিনে কাউকে যাতে মুখ দেখাতে না পারে সেটা নিশ্চিত করব। তোমার বাবা-মাকেও ছাড়ব না, ওদেরকে চেপে ধরলেই রাজি হয়ে যাবে তুমি। সবচেয়ে বড় ব্যাপার, এখানে দুটো দিন থাকলেই আমাকে বিয়ে করার জন্যে পাগল হয়ে উঠবে।

অজান্তে কেঁপে উঠল রোজালিনার শরীর। কোণঠাসা অবস্থাটা বুঝতে পারছে। ভয়ে-আতঙ্কে গলা শুকিয়ে আসছে, বুক ধড়ফড় করছে। বুকের খাচার ভেতর লাফাচ্ছে ওর হৃৎপিণ্ড। নিজের দ্রুত লয়ের নিঃশ্বাস স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে। ভাবার চেষ্টা করল কি করে এড়ানো যায় অবশ্যম্ভাবী ঘটনাটা, কিন্তু মাথা কাজ করছে না। আমাকে কয়েকটা দিন সময় দাও, কথা দিচ্ছি ভেবে দেখব।

আমাকে হাসালে, হানি। সময় পেলে তোমাকে কখনোই আর কজা করতে পারব না। উঁহু, দেরি সইবে না আমার। সরে গিয়ে টেবিলের কাছে চলে গেল সে, ড্রয়ার খুলে কাগজ-কলম বের করল। বিছানার ওপর সেগুলো রেখে সিগার ধরাল। জানালার কাছে সরে গেল এবার, বাইরে ফ্লো মাউন্টেনের ওপর চোখ রাখল। উঁহু, রোজালিনা, আমার সাথে তামাশা কোরো না। দুই মিনিট সময় পাবে তুমি। যদি রাজি থাকো, তোমার হাত খুলে দেব। কাগজে স্বাক্ষর করবে, তারপর সসম্মানে তোমাকে পৌঁছে দেব আমি। এবং তোমার বাবা-মার সামনে বিয়ের প্রস্তাব দেব। রোববারে, আগে যা বলেছি, ঠিক সেভাবে সেরে যাবে বিয়েটা।

চুপ করে থাকল রোজালিনা। মাথা নিচু করে আকাশ-পাতাল ভাবছে। হায় খোদা, কেউ কি আসতে পারে না! হেনরী ক্রুশার, সে-ও কি বুঝতে পারেনি কি ভয়ঙ্কর বিপদে আছে ও? দীর্ঘ একটা কাঠামো ভেসে উঠল ওর মানসপটে, দৃঢ় সঙ্কল্পবদ্ধ একটা মুখ…কিছুটা নিষ্ঠুর আদল কিন্তু চোখজোড়ায় অফুরন্ত নির্ভরতা-জেমস, অ্যালেন। কোথায়?

অভিমান আর আশাহতের যন্ত্রণা পাগল করে তুলেছে ওকে। অনুভব করল গলার কাছে কিছু একটা আটকে আছে যেন, চোখ ফেটে কান্না আসতে চাইছে। একটা মেয়ে হিসেবেও কি ও তার কাছে এতটুকু সহানুভূতি পেতে পারে না? এতগুলো লোককে একা সামাল দিতে পেরেছে, অনায়াসে এখানে আসতে পারে সে। এমনকি ক্যাল ইনগ্রসের সামনে দাড়ানোর মত সাহস তার আছে। অথচ…

রোজালিনা, আমি ধৈর্য হারাচ্ছি! ওকে রূঢ় বাস্তবে টেনে আনল কেভিন লপার।

দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস ফেলল ও, তারপর দেখল লপারকে। ঘৃণা করে, তবু এ লোকটিকেই ওর বিয়ে করতে হবে। দুটো শর্ত আছে, মি. লপার, ক্ষীণ কণ্ঠে জানাল।

সাগ্রহে ওর দিকে ফিরল সে।

জেমসকে চলে যেতে দেবে তুমি।

অনেকক্ষণ ধরে তাকিয়ে থাকল কেভিন লপার, গম্ভীর দেখাচ্ছে। ধূসর কালো চোখজোড়া বিদ্ধ করল রোজালিনাকে, ভয় ধরে গেল ওর মনে। তারপর সহসাই হেসে উঠল সে, দুহাতের তালু দিয়ে নিজের উরুতে চাপড় মারল। শব্দটা শুনে চমকে উঠল রোজালিনা, এত জোরাল শোনাল যেন সপাটে চড় কষানো হয়েছে। কারও গালে।

উঠে দাঁড়াল লপার, হাসিটা এখনও আছে কিন্তু তাচ্ছিল্য আর কৌতুকে ঠোঁটের কোণ বেঁকে গেছে। এই তাহলে ব্যাপার? তলে তলে ওর প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েছ তুমি। কোত্থেকে একটা ভবঘুরে এল লিয়ন সিটিতে আর তাকে দেখে মজে গেলে তুমি। নাহ্, রোজালিনা, তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে!

শর্তটা মানছ? দৃঢ় শোনাল রোজালিনার গলা, কিন্তু সেটা কষ্টকৃত। ভেতরে ভেতরে দারুণ ভয় পেয়েছে।

ধরো, মানলাম না। কি করতে পারবে? আমার কজায় আছ তুমি। তোমার বাবা-মাকেও ইচ্ছে করলে হাতের মুঠোয় পেতে পারি। আর অ্যালেন? সে আগেপরে আসবেই। ওর মত লোক বহুবার আমার সামনে দাঁড়িয়েছিল, কিন্তু তারা সবাই এখন বুটহিলে শুয়ে আছে।

এত সহজ ভাবছ কেন, তুমি কি অজেয়? হিককও তো গুলি খেয়ে মরেছে। বন্দুকবাজরা বন্দুকের গুলিতেই মরে।

ক্যাল ইনগ্রসকে চেনার লোক তুমি ছাড়া কেউ নেই, হানি। অ্যালেনকে এখান থেকে জীবিত বেরোতে দেব না আমি।

ইচ্ছে করলেই পালাতে পারে ও। তোমার লোকেরা যে আটকাতে পারবে না তা এ কদিনে বেশ বোঝা গেছে।

খুব সাফাই গাইছ ওর পক্ষে, ব্যাপার কি? আত্মবিশ্বাসীও মনে হচ্ছে তোমাকে। অন্ধ বিশ্বাস? না অন্য কিছু জানো ওর সম্পর্কে?

চুপ করে থাকল রোজালিনা, লপারের তীক্ষ্ণ অন্তর্ভেদী দৃষ্টিকে গ্রাহ্য করল। আচ্ছা, তুমি কি একজন মেয়েলোক চাও, নাকি একজন স্ত্রী?

স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল লপার, তারপর হেসে উঠল। নাহ, তুমি সত্যিই বুদ্ধিমতী, রোজালিনা। তোমার মত মেয়েকে কেভিন লপারের স্ত্রী হিসেবেই মানায়। সুন্দরী, বুদ্ধিমতী, শিক্ষিতা এবং গুণী। সারা শহরের লোক আমাদেরকে দেখে বলবে আদর্শ জোড়া।

তাহলে বিয়ের আগে আমাকে স্পর্শ করতে পারবে না, সাহসী, আশাবাদী হয়ে উঠেছে ও। আর…অ্যালেনকে তাড়া করতে পারবে না। ওকে চলে যেতে বলব আমি, জানাব যে তোমাকে বিয়ে করতে যাচ্ছি। …দুটো শর্তের একটা ভাঙলেও আমাদের আর বিয়ে হবে না।

নীরবে একটা সিগার ধরাল লপার। চিন্তিত দেখাচ্ছে তাকে। মাঝে-মধ্যে সিগার টানার ফাঁকে দেখছে ওকে। কিন্তু অ্যালেন যদি আমার কাছে আসে, চ্যালেঞ্জ করে?

সে প্রমাণ করতে পারবে না তুমিই ক্যাল ইনগ্রস, একটু আগে তাই বলেছ। তাছাড়া আমার অনুরোধ ফেলবে না ও।

গভীর সম্পর্কের আঁচ পাচ্ছি যেন! কৌতুক স্টোর মালিকের চোখে। দ্রুত কয়েকটা টান দিল সিগারে। ধরো, রাজি হলাম, ধীর কণ্ঠে বলল, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখছে ওকে।

তাহলে হাত খুলে দাও, স্বাক্ষর করছি আমি।

সাথে সাথেই নড়ল না সে, আরও কিছু সময় ব্যয় করল। জানালার কাছ থেকে ঘুরে এল একবার। সিগার শেষ করে ছাইদানিতে গুজে রাখল। তারপর ওর পেছনে এসে দাঁড়াল। আমার সাথে বেঈমানি করার চিন্তা ভুলেও মাথায় এনে, হানি, বাঁধন খোলার সময় শাসাল সে। তোমার জীবনটা তাহলে বিষিয়ে তুলব, খোদার কসম!

বাঁধনমুক্ত হতে হাতের কবজি ডলতে লাগল রোজালিনা। রক্ত চলাচল স্বাভাবিক হতে কাগজ টেনে নিয়ে লিখতে শুরু করল। দূরে দাঁড়িয়ে থেকে দেখছে কেভিন লপার। স্নান দেখাচ্ছে মেয়েটাকে, মেনে নিয়েছে নিয়তি। কাঁপা হাতে কঠিন কাজটা সারল রোজালিনা, তারপর পাশে দেখতে পেল লপারকে।

একটা হিংস্র কুগারের মত ঝাপিয়ে পড়ল লপার। রোজালিনার কোমর চেপে ধরে ওকে আছড়ে ফেলল বিছানার ওপর। প্রবল বিস্ময় আর আতঙ্কে কোন বাধাই দিতে পারল না ও। দেখল লপারের আগ্রাসী ঠোঁটজোড়া এগিয়ে আসছে। লপার, তুমি কথা রাখছ না! আহত স্বরে রাগে চেঁচিয়ে উঠল রোজালিনা, মুখ সরিয়ে নিয়েছে।

পৈশাচিক হাসি দেখা গেল তার মুখে। সবই ঠিক থাকবে, হানি। বিয়ে হবে, অ্যালেনকেও চলে যেতে দেব। কেবল এই একটা ব্যাপার ছাড়া। ক্লেইম ফাইল কি জিনিস জানো? নিজের মালিকানা প্রতিষ্ঠিত করতে যাচ্ছি আমি। বাধা দিয়ো না, সোনা! দুদিন পর এমনিতেই তুমি আমারই হবে। কিন্তু অতটুকু ধৈর্যও আমার নেই। বিশ্বাস করো, তুমি আমাকে পাগল করে তুলেছ!

সমানে হাত-পা চলছে রোজালিনার, কিন্তু সুবিধে করতে পারছে না। ঠেলে ফেলে দিতে চাইছে তাকে। কিন্তু এক বিন্দু শিথিল হলো না বাঁধন। তোমাকে আমি বিশ্বাস করেছিলাম! ঘৃণায় শিরশির করে উঠল ওর শরীর। থুথু ছিটাল ও, লপারের চোখে-মুখে গিয়ে পড়ল।

রাগে দিশেহারা হয়ে পড়ল কেভিন লপার। হাত চালাল, প্রচণ্ড চড় এসে পড়ল রোজালিনার গালে। পরপর আরও তিনবার হাত চালাল সে। রাগে কাপছে শরীর, রোজালিনার কোমরের ওপর উঠে বসেছে। তোমাকে এমন শিক্ষা দেব যে জীবনেও এমন করবে না আর! হিসিয়ে উঠল লপার। থাবা মারল, খামচে ধরল ওর ব্লাউজ। টান দিতে চড়চড় করে ছিঁড়ে এল।

চড়গুলো বেসামাল করে দিয়েছে রোজালিনাকে, চোখে অন্ধকার দেখছে। ব্লাউজ হেঁড়ার শব্দ ওর বুক কাঁপিয়ে দিল। প্লীজ, লপার! আর্তনাদ করে উঠল ও।

সহসা জানালার কাচ ভাঙার শব্দ হলো, চমকে সেদিকে তাকাল রোজালিনা। ভাঙা জানালার ফাঁকে পিস্তলের একটা নল দেখা গেল। পাশে একটা হাত প্রবেশ করল ঘরে, হাতড়ে ছিটকিনি খুলল। জানালার পাল্লা সরে যেতে দেখা গেল জেমস অ্যালেনের দৃঢ় কঠিন মুখ। চোখে শীতল দৃষ্টি।

ওকে ছেড়ে দাও, লপার! উঠে এসে দেয়ালে হাত ঠেকিয়ে দাঁড়াও। উঁহু, তুমি নিরস্ত্র এটা মোটেই আমল দেব না আমি। বেচাল দেখলেই গুলি করব। একটা হিংস্র কুগারকে গুলি করার সময় কেউ আশা করে না ওটার থাবায় পিস্তল থাকবে।

কেভিন লপার হতবাক। দ্রুত সামলে নিল নিজেকে। উঠে দেয়ালের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। কোটা সত্যিকার হুমকি তা ভাল করেই জানে। ধৈর্য ধরার পক্ষপাতি সে, জানে নিরস্ত্র অবস্থায় ওকে গুলি করবে না অ্যালেন। তারচেয়ে অপেক্ষায় থাকা যাক, টমাস বা অন্য কেউ চলে আসতে পারে। ছকটা তখন পাল্টে যেতে পারে।

রোজ?

ধড়মড় করে উঠে বসল রোজালিনা। তারপর লজ্জা পেল, শুধু অন্তর্বাস ওর বুকে। বিছানার চাদর টেনে তুলে গায়ে চাপাল।

দরজাটা খোলো, তারপর জানালার কাছে এসো। খবরদার, আমার আর লপারের মাঝখানে আসবে না! এই তো লক্ষ্মী মেয়ে! সাহস জোগাল জেমস, একবারের জন্যেও লপারের ওপর থেকে চোখ সরাল না।

জানালার কাছে এসে দাঁড়াল রোজালিনা।

এটা ধরো, পিস্তল এগিয়ে ধরল জেমস। লপার নড়লেই গুলি করবে। আসছি আমি, এক মিনিটের বেশি লাগবে না।

অসহায় দৃষ্টিতে রোজালিনাকে পিস্তল নিতে দেখল কেভিন লপার। পিস্তল হস্তান্তরের সময় অন্য একটা পিস্তলে ওকে নিশানা করে রেখেছে জেমস অ্যালেন। রোজালিনাকে দেখল সে, পিস্তল ধরা হাত মৃদু নড়ছে, ট্রিগারে চেপে থাকা আঙুলে রক্ত সরে গেছে। মুহূর্তের ব্যবধানে গুলি বেরিয়ে যেতে পারে। ঠায় দাঁড়িয়ে থাকল লপার। মেয়েটার আতঙ্ক এখনও কাটেনি, খুনের নেশা ওর চোখে। অনায়াসে গুলি করবে। লপার জানে পিস্তলে মোটেই আনাড়ি নয় রোজালিনা বার্থেজ। তাছাড়া এ অবস্থায় ঝুঁকি নেওয়াও ঠিক হবে না, সাফল্যের সম্ভাবনা একেবারেই নেই।

খোলা পিস্তল হাতে কামরায় প্রবেশ করল জেমস। পা দিয়ে ঠেলে দরজা ভিড়িয়ে দিল। জানালার কাছ থেকে সরে গেল রোজালিনা। উড়ে গিয়ে আছড়ে পড়ল জেমসের বুকে। মৃণাল দুটো বাহু জড়িয়ে ধরল ওর গলা। কাদছে মেয়েটা, বুকে মুখ ঘষছে। ও আমাকে অপমান করেছে, জেমস। তুমি শোধ নেবে না? কাপা গলায় অনুরোধ করল রোজালিনা।

একহাতে মেয়েটার সরু কোমর বেষ্টন করল জেমস, আরেক হাতে পিস্তল, শিথিলভাবে ঝুলছে দেহের পাশে। চোখ সরছে না লপারের ওপর থেকে। অন্তত এইবার সময়মত আসতে পেরেছি আমি, মৃদু স্বরে বলল, ও, অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাল লপারের দিকে। সন্দেহ আর কৌতূহল ফুটে উঠল স্টোর মালিকের চোখে।

প্রশান্তি অনুভব করছে রোজালিনা। ছাড়ল না জেমসকে।

রোজ?

মুখ তুলে তাকাল ও, জেমসের মুখে হাসি। এবার ওর সাথে আমাকে লেনদেনটা চুকাতে দাও। তিনটে বছর ধরে জ্বলে মরছি আমি।

একপাশে সরে দাঁড়াল ও।

ওর ড্রয়ার খুলে একটা শার্ট পরে নাও, বিছানার ওপাশে ওয়ার্ডরোবৃটা দেখিয়ে বলল জেমস, এগোল লপারের দিকে। ঠায় দাঁড়িয়ে আছে সে, মুখ ভাবলেশহীন। সামনে গিয়ে দাঁড়াল ও, লপার কিছু বুঝে ওঠার আগেই প্রচণ্ড চড় মারল।

মাথা একপাশে হেলে গেল তার, কিন্তু সরাসরি তাকাল জেমসের চোখে। নীরবে হজম করল পরের চড়গুলো। তোমার হাতে পিস্তল আছে বলে বাহাদুরি করছ, অ্যালেন, শীতল সুরে বলল সে। ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি। প্রতিপক্ষ নিরস্ত্র থাকলে ওরকম বড়াই যে কেউ করতে পারে।

ক্ষীণ হাসল জেমস। ভেবো না তোমাকে কোন সুযোগ দেব না আমি। কিভাবে চাও, লপার? হাতাহাতি, না পিস্তলে?

পিস্তল, সংক্ষেপে জানাল স্টোর মালিক।

মাথা ঝাঁকাল ও। জানতে ইচ্ছে করছে না কেন তিনটে বছর ধরে খুঁজে মরছি তোমাকে? তুমি আমার শান্তি কেড়ে নিয়েছ, লপার। তিনটে বছরের অপরিসীম কষ্ট আর পরিশ্রমের শোধ তুলব আজ। কেন জানো? তিন বছর আগে অ্যাবিলিনের ছোট্ট একটা বাথানে নিজের কফিনে পেরেক ঠুকে এসেছ তোমরা, ইনগ্রস। তোমার দুই সঙ্গী শেষ, এবার তোমার পালা।

তুমি কে, অ্যালেন? ওই মেয়েটা…

ওর স্বামী। যাক, মনে করতে পেরেছ তাহলে। আমি ভেবেছি তোমাকে হয়তো মনে করিয়ে দিতে হবে।

নির্লজ্জের মত হাসল লপার। দারুণ কেটেছিল সকালটা।

সপাটে ঘুসি হাঁকাল জেমস। বুঝতে পারছে নোংরা ইঙ্গিত করে ওকে বেসামাল করতে চাইছে লোকটা। লড়াইয়ের আগে প্রতিপক্ষের আত্মবিশ্বাস বা মনঃসংযোগে চিড় ধরাতে পারলে কাজটা সহজ হয়ে যায়। পকেট থেকে সিগার কেসটা বের করল ও। একটা সিগার ছিল, ধরাল। চিনতে পারছ, ইনস? নাকি অস্বীকার করবে?

তাতে কি? ফাটা ঠোঁটে জিভ বুলিয়ে রক্তের নোনা স্বাদ পেল লপার। রাগে ফেটে পড়তে চাইছে, কিন্তু সামলে রেখেছে নিজেকে। পরিস্থিতি মোটেই অনুকূলে নয়। একটা সুযোগ পাবে, নিশ্চিত জানে। সুতরাং বেতাল কিছু করে সেটা হারানো ঠিক হবে না। জেমস অ্যালেন বেপরোয়া লোক, ইচ্ছে করলে ওকে পিটিয়ে ছাতু বানিয়ে ফেলতে পারবে। রিক স্যাভেজ হাত বাঁধা অবস্থায়ও কুলিয়ে উঠতে পারেনি তার সাথে। ঘটনাটা ভুলে যায়নি লপার, অ্যালেনের ধাত বুঝতে ওই একটা ঘটনাই যথেষ্ট-একাধারে প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী, সেইসাথে দারুণ একরোখা লোক।

কিছু আসে-যায় না অবশ্য, সরে গিয়ে চেয়ারে বসল জেমস, একটু আগে যেটায় বেঁধে রাখা হয়েছিল রোজালিনাকে। সিগার ফুকছে। পরোয়াও করি না। তুমি যেই হও তাতে কিছু আসে-যায় না। বিলি দ্য কিড বা সাডেনও যদি তোমার জায়গায় হত, পরোয়া করতাম না আমি। ক্যাল ইনগ্রস, তোমার সাথে ওদের তুলনা চলে না। ওরা কঠিন মানুষ, কিন্তু জীবনে কখনও কোন মহিলার অসম্মান করেনি অথচ তুমি হরহামেশা করেছ।

নীরবে ওকে দেখছে কেভিন লপার। বুকের সাথে দুহাত বাঁধা, ভাব দেখে মনে হচ্ছে মনোযোগী শ্রোতা। জেমস অ্যালেনকে ভয় পাওয়ার কোন কারণ ঘটেনি, ভাবছে ও। পিস্তলের ফয়সালায় অনায়াসে খুন করতে পারবে তাকে, এটুকু ক্ষমতা আর আত্মবিশ্বাস ওর আছে।

কোথায় লড়তে চাও, ইনগ্রস? রাস্তায় না তোমার বাড়ির লনে?

লিয়ন সিটির মানুষ ডুয়েলটা দেখুক, নাকি তোমার আপত্তি আছে?

লপারের প্রস্তাবে উদারভাবে হাসল জেমস। সবই তোমার মর্জিমাফিক ঘটছে, ইনগ্রস। এবার তোমার পিস্তল পাবে। খুব সাবধান, জানি নিজের মৃত্যুকে এগিয়ে আনবে এমন বোকা লোক তুমি নও। তবু, সাবধানের মার নেই। মনে রেখো, তোমাকে একবিন্দু বিশ্বাস করি না আমি। এবার বলো কোথায় রেখেছ তোমার অস্ত্র।

ড্রয়ারে।

রোজ?

সাড়া দিল মেয়েটা। বেঢপ সাইজের শার্ট আর স্কার্টে হাস্যকর দেখাচ্ছে ওকে।

কোথায় আছে বলে দাও, বলল জেমস। রোজ বের করে নেবে। রাস্তায় গিয়ে ওগুলো পাবে তুমি।

পাঁচ মিনিট পর রাস্তায় দেখা গেল তিনজনের দলটাকে। জেমস আর রোজালিনা পাশাপাশি, ওদের সামনে কেভিন লপার। হোলস্টারসমেত একজোড়া পিস্তল দেখা যাচ্ছে মেয়েটার হাতে। একটু পর টেম্পলার, প্রাইস আর বার্থেজকে দেখা গেল বাড়িটা থেকে বেরোতে। পেছনে তিনটে লাশ ফেলে এসেছে ওরা।

মি. বার্থেজ?।

জেমসের দিকে ফিরল রেমন্ড বার্থেজ। রেমন্ড নামটাই আমার পছন্দ, বাছা। বন্ধুরা আমাকে ওই নামেই ডাকে। টের পেল পাশে এসে দাঁড়িয়েছে রোজালিনা, একহাতে তার বাহু জড়িয়ে ধরেছে।

ওর পিস্তল আর হোলস্টারটা দিয়ে আসবে, নিক? অনুরোধ করল জেমস, টেম্পলার আর রেমন্ডের দিকে ফিরল এবার। তোমরা নজর রেখো ও কোন চালাকি করে কি-না। হয়তো হোলস্টারে পিস্তল ঢোকানোর সময় মাথায় দুষ্টবুদ্ধি চাপতে পারে। মনে রেখো লোকটার নাম ক্যাল ইনগ্রস, মুহূর্তের ব্যবধানে ও সবাইকে খুন করে ফেলতে পারবে। মি. টেম্পলার, গুলি ফুটিয়ে পিস্তলগুলো পরখ করে নাও। আমি চাই না পরে কেউ বলুক ওকে অচল অস্ত্র দেয়া হয়েছে।

ওর নির্দেশ পালন করল জোহান টেম্পলার। পালিশ করা চকচকে পিস্তলের বাটগুলো উঁকি দিচ্ছে লপারের হোলস্টার থেকে, চল্লিশ গজ দূরে থেকে দেখতে পেল জেমস অ্যালেন। এখন আর লিয়ন সিটির নিপাট ভদ্রলোক মনে হচ্ছে না তাকে, হিমশীতল আগুন-ঝরা দৃষ্টি চোখে। দাঁড়ানোর ভঙ্গিই বলে দিচ্ছে বহুবার এভাবে প্রতিপক্ষের সামনে দাঁড়িয়েছে, অটল পাহাড়ের মত দৃঢ়তা আর সাহস নিয়ে। চূড়ান্ত সময়ে এসেও তার মধ্যে কোন রকম চাঞ্চল্য দেখা যাচ্ছে না, মুখের পেশী পর্যন্ত কাঁপেনি। অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথার চতুর একজন খুনী। অনায়াস দক্ষতা আর প্রবল নিষ্ঠার সাথে কোমরে ঝোলানো অস্ত্রটাকে নিজের সাথে এতই আত্মস্থ করে নিয়েছে যেন ওটা ওর শরীরেরই একটা অংশ।

বড় করে শ্বাস টানল জেমস, মোনা আর ফ্রেডের চেহারা ভেসে উঠল ওর চোখের সামনে। তারপর সহসাই ইচ্ছে হলো রোজালিনাকে দেখে একবার। কে বলতে পারে একটু পর বেঁচে থাকবে সে? অ্যারিজোনার সবচেয়ে কুখ্যাত বন্দুকবাজের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, খানিকবাদে হয়তো দুএকটা বুলেট ঢুকবে বুকে…ওর আশা অপূর্ণ থেকে যাবে। মনে পড়ল মেয়েটিকে বলা হয়নি ওকে পছন্দ করে, একটা পরিকল্পনা করেছে ওকে নিয়ে।

মনে মনে নিজেকে অভিসম্পাত করল জেমস, সবচেয়ে সঙ্কটপূর্ণ মুহূর্তে যত সব ফালতু চিন্তা ওকে বেচাল করতে চাইছে। আর হয়তো কয়েকটা সেকেন্ড, তারপরই প্রশান্তি ঘিরে ধরবে ওকে, দুঃসহ জ্বালা মিটে যাবে চিরতরে। কিন্তু হারানোর ব্যথাটা সবসময়ই থেকে যাবে।

বাপের কাছে সরে এল রোজালিনা, দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখছে দুই প্রতিদ্বন্দীকে। দুঃসহ উৎকণ্ঠা হচ্ছে ওর, মনে হচ্ছে এই উদ্বেগ কখনও কাটবে না। দুহাতে বার্থেজের বাহু জড়িয়ে ধরল ও। বাবা, আমি সহ্য করতে পারছি না। যদি কিছু হয়ে যায়… কেঁপে গেল ওর গলা।

প্রার্থনা কর, মা, মেয়েকে প্রবোধ দেয়ার চেষ্টা করল বার্থেজ। নিজেও মনে মনে তাই করছে। আমরা এতগুলো লোক চাইছি যেন অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে ছেলেটা, এত লোকের প্রার্থনা বিফলে যেতে পারে না। নিশ্চয়ই আমাদের কথা শুনবেন প্রভু। বুকে ক্রুশ আকল সে, তার নিজেরও অস্থির লাগছে। তাছাড়া…এত ধৈর্য ধরেছে ও, নিশ্চয়ই সফল হবে। পুরস্কারটা ওর পাওয়া উচিত।

দুপা ফাঁক করে দাঁড়িয়ে আছে কেভিন লপার, আত্মবিশ্বাস ঠিকরে পড়ছে তার দাঁড়ানোর মধ্যে। ঝুঁকে এসেছে কিছুটা, হাতজোড়া পিস্তল ছুঁইছুঁই। পুরোপুরি প্রস্তুত সে, এবং ডুয়েলের পরিণতি সম্পর্কেও নিশ্চিত। জেমস অ্যালেন শক্তপাল্লা ঠিকই কিন্তু তাকে অনায়াসে হারানো যাবে। বোকা আর কাকে বলে, ভাবল লপার, হাজার মাইল দূর থেকে মরতে এসেছে এখানে!

সোজা হয়ে বুক উঁচিয়ে দাঁড়াল সে, তারপর দুপা এগোল। নীরব হয়ে থাকা দর্শকরা ওর আচরণে হঠাৎ করে খাবি খেল মনে মনে। ওদের বিস্মিত দৃষ্টির পলক পড়ার আগেই বিদ্যুৎ খেলে গেল লপারের হাতে। পরিচিত পিস্তলের বাটগুলোর স্পর্শ তার মধ্যে আগুন ধরিয়ে দিল। কোমর সমান তুলে ট্রিগার টিপল। সহসা বুকে কিছু একটা প্রচণ্ড আঘাত করতে হাত কেঁপে গেল। টলে উঠল তার শরীর, লপারের মনে হলো ভূমিকম্প হচ্ছে। দূরে দাঁড়ানো জেমস অ্যালেনের দেহেই কেবল তার দৃষ্টি, অন্য কিছু দেখছে না—অ্যালেনের শরীর কাঁপছে। আগুন ঝরল তার হাত থেকে। ফের টলে উঠল বন্দুকবাজের দেহ। চরম বিস্ময়ের সাথে টের পেল শূন্য অনুভূতি হচ্ছে মাথায়। জোর পাচ্ছে না হাতের মুঠিতে, পিস্তল ধরে রাখতে কষ্ট হচ্ছে। হাঁটু ভেঙে পড়ে গেল সে। শেষবারের মত চেষ্টা করল পিস্তল তোলার, কিন্তু দশমণী পাথরের মত ভারী মনে হচ্ছে ওগুলোকে। সীমাহীন ক্লান্তি গ্রাস করছে তাকে, ঝাঁপসা দৃষ্টিতে দেখল এগিয়ে আসছে অ্যালেন। দৃঢ় পদক্ষেপ, একটুও টলছে না।

তুমি কে, অ্যালেন? নিচু, কঁপা স্বরে জানতে চাইল লপার। আমি বিশ্বাস করি না সাধারণ একজন জেমস অ্যালেন আমাকে হারিয়ে দিতে পারে।

শুনে শান্তি পাবে?

অসহায় দৃষ্টিতে জেমসকে দেখল লপার। এটা হতেই পারে না, ভাবছে সে, এভাবে হেরে যাবে সাধারণ এক লোকের কাছে বিশ্বাসই করতে পারছে না।

মেয়েটাকে মনে পড়ে, ইনগ্রস?

দুর্বোধ্য একটা আওয়াজ করল সে, কিছু বলল না। মরার আগে তাকে শেষ মানসিক কষ্টটা দিতে চাইছে জেমস অ্যালেন, যেন জেনে যেতে পারে কেন, কোন কারণে মারা যাচ্ছে।

এলিসনের নাম শুনেছ, ইনগ্রস? ফ্লিন্ট এলিসন আমার নাম।

ইশশ, আগে যদি জানত! হাহাকার উঠল লপারের সারা শরীর জুড়ে। ঘুণাক্ষরেও মেয়েটার গায়ে হাত দিত না সে, কিংবা আজ ডুয়েল লড়ত না। চরম ক্লান্তিতে নুয়ে পড়ল তার শরীর। তুমিই জিতলে, এলিসন। আমার সান্ত্বনা সেরা একজনের কাছে হারলাম? বলার চেষ্টা করল সে, কিন্তু একটা শব্দও বেরোল না মুখ দিয়ে। অন্ধকার চিরতরে গ্রাস করল তাকে।

কেভিন লপারের দেহের পাশে দাঁড়িয়ে থাকল জেমস, পকেট থেকে সিগার কেসটা বের করে চোখের সামনে তুলে ধরল। ক্ষীণ হাসি ফুটল ওর মুখে, তারপর সেটা ছুঁড়ে দিল লপারের ভূলুণ্ঠিত শরীরের ওপর। তোমার জিনিস তোমাকে ফেরত দিলাম, ইনগ্রস। ওটা এখন আর আমার কোন কাজে আসবে না।

পরদিন বিকেল।

স্যাফের ওপরের তলায় রোজালিনার কামরা। জানালার কাছে দাঁড়িয়ে আছে জেমস অ্যালেন, ফ্লো মাউন্টেনের ওপর স্থির হয়ে আছে ওর চোখ। অনেকক্ষণ ধরে চেয়ে থাকল, আসলে ভাবছে: মেয়েটাকে কি করে বলা যায় কথাটা?

একটু পর ঘুরে তাকাল সে। মেক্সিকান গোলাপ চেয়ে আছে। আমি তোমাকে কিছু কথা বলব।

ছোট্ট করে মাথা ঝকাল রোজালিনা, মুখে কিছুই বলল না।

তোমরা আমার সত্যিকার পরিচয়টা জানো না।

তোমার নাম জেমস এলিসন, এই তো? এরপরও যদি কিছু লুকানোর থাকেও, ওসব নিয়ে ভাবছি না। আমি তোমাকে বুঝতে পারি সেটাই তো বড় ব্যাপার, তাই না?

পুরোটা জানো না তুমি। জেমস ফ্লিন্ট এলিসন। রোজালিনার দিকে তাকাল জেমস, বোঝার চেষ্টা করল নামটা মেয়েটির মধ্যে কি প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।

সামনে এসে দাঁড়াল রোজালিনা, গভীর দৃষ্টিতে দেখছে জেমসকে। ওকে দেখে মনে হচ্ছে না সারা পশ্চিমে পরিচিত নামটার আলাদা কোন অর্থ আছে ওর কাছে। নামটা আমার কাছে ভাল লাগছে, মৃদু স্বরে বলল ও।

আমার জীবনটা খুব অনিশ্চিত, রোজ। লপারের মতই হয়তো খুন হয়ে যাব কোন একদিন।

আমি একটা বোকা মেয়ে, জেমস। যুক্তি-টুক্তি কম বুঝি। কিন্তু এটুকু নিশ্চিত জানি, আমি ভুল করিনি এবং ঠকবও না। আমার মধ্যে কোন দ্বিধাও নেই। একটু থামল ও, তারপর চঞ্চল চোখজোড়া স্থির হলো জেমসের চোখে। জেমস, এলিসন, তোমার চোখ বলে দিচ্ছে তুমি আমাকে চাও, চাও না? তাহলে দ্বিধা করছ কেন?

অসহায় দেখাল জেমসকে, কি বলতে চেয়েও মাথা নাড়ল। তারপর ঘুরে ফের জানালা গলে তাকাল বাইরে। কাল চলে যাব আমি। তিন বছর আগে বেরিয়ে পড়ার পর নিজের বাড়িতে আর যাওয়া হয়নি।

কাল সকালে গির্জায় যাব। লপারকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, ওটা আমি ভাঙতে পারি না।

ঝট করে ঘুরে দাঁড়াল জেমস, বিস্ময় দুচোখে। বুঝতে পারছি না।

ঠিক করেছি মায়ের বিয়ের গাউনটা পরব কাল। আর তুমি যদি বলো কোন স্টোর থেকে না হয় কিনে নেব একটা। লপারকে যখন কথা দিয়েছি বিয়ে করব, সেটা তো রাখতে হবে, তাই না?

বাজে বকছ, রোজ! অস্ফুট স্বরে বলল জেমস, বিছানায় এসে বসেছে।

আমি ভাবছি তুমি বিয়ে করতে রাজি হবে কি-না, মিটিমিটি হাসছে রোজালিনা, জেমসের সামনে এসে দাঁড়িয়ে দুই বাহু রাখল ওর কাঁধে। মজার ব্যাপার কি জানো তুমি বিয়ের প্রস্তাব দেয়ার আগেই আমি পণ করেছি তোমাকেই বিয়ে করব আগামীকাল। আর দেখো, লপারও তাতে সায় দিয়ে দিল কিভাবে! কাগজে কি লিখলাম পড়েও দেখল না সে। জেমস, আমি কি ভুল করেছি? আমি তোমার প্রিয় আরেকটা মোনা হতে চাই!

উঠে দাঁড়িয়ে দুহাতে রোজালিনার কোমর বেষ্টন করল জেমস। খুব বড় ঝুঁকি নিয়েছিলে তুমি। লপার যদি পড়ে দেখত? তারপর কি হত…

অত কিছু ভেবে দেখিনি, বাধা দিল রোজালিনা, উষ্ণ কামরার নীরবতা ছাপিয়ে উঠল ওর রুদ্ধ কণ্ঠস্বর। জীবনে এমন করে আর কিছু চাইনি আমি, মনেপ্রাণে তোমাকে আশা করছিলাম। আমার বিশ্বাস ছিল লপারের বাড়িতে যাবে তুমি, কিন্তু দেরি দেখে খুব কষ্ট হচ্ছিল।

ছোট্ট একটা বাথান আছে আমার, রোজ। কোন রকমে চলে যায়। তোমার তাতে চলবে?

দুবাহু তুলে জেমসের গলা জড়িয়ে ধরল রোজালিনা। খুব চলবে, জেমস! প্রবল আবেগে গলা বুজে আসছে ওর। কিন্তু আগে তোমাকে স্থির করতে হবে আমাকে মোনার মত ভালবাসবে কি-না।

ওকে বুকে টেনে নিল জেমস।

প্রবল নির্ভরতায় তাকে আঁকড়ে ধরল রোজালিনা। ফ্লিন্ট এলিসন? উঁহু, ওর কাছে সে অহঙ্কারী একরোখা অপ্রতিভ জেমস অ্যালেন। নিষ্ঠুর কিন্তু নিজের স্ত্রীকে যে আর দশজনের চেয়ে বেশিই ভালবাসে। রোজালিনার মনে হলো কালকের দিনটা হবে ওর জীবনের সবচেয়ে মধুর দিন। কাল যাবে তুমি?

না, রোজালিনার মুখ তুলে ওর কপালে চুমো খেলো জেমস। তবে তার পরেরদিন। সাথে আমার বউকে নিয়ে যাব। আমার শূন্য বাথানটা পূর্ণতা পাবে এবার।

গল্পের বিষয়:
অনুবাদ

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত