নিখোঁজ

নিখোঁজ

অজয়,অনিকেত,রাজু,সোম,কৌশিক এরা পাঁচজনে খুব ভালোবন্ধু। কলেজে এদের আলাপ। সেই প্রথম দিন থেকেই। ওদের বন্ধুত্ব এতোটা মজবুত ছিলো যে কারুর ক্ষমতা ছিলোনা তা আলাদা করবার। কিন্তু ওইযে কথায় আছেনা সত্যিকারের বন্ধুত্ব বেশীদিন টেকেনা। একবার না একবার একটু হলেও তাতে খাঁদ এসে মিশবে। অমিত হলো সেই খাঁদ। অমিত ছেলেটা কলেজের একেবারে শেষ বেঞ্চে এসে চুপচাপ বসে থাকতো। সোম ছেলেটা ওকে বসে থাকতে দেখে যেচে কথা বলতে গিয়েছিলো সেদিন। ব্যস ওইটাই বড়ো ভুল করে ফেলেছিলো সেদিন ওরা। না না ভুল-টা ওরা তখন বুঝতে পারিনি। সোম প্রথম অমিতের সাথে আলাপ করে, নিজের বন্ধুদের সাথে ওকে পরিচয় করিয়ে দেয়। তারপর থেকেই পাঁচজনের দলে যোগদান করলো। অমিত। দেখতে দেখতে বছর খানেক কেটে গেলো, প্রথম বর্ষের পরিক্ষাও হয়ে গেলো। তারপর থেকে এতো সুন্দর একটা বন্ধুত্বের দল-টা ধীরেধীরে ভাঙনের দিকে এগিয়ে চললো।

এই বন্ধুত্ব ভাঙনের মূল কারণ ছিলো একটা মেয়ে। যার উপর সোম বাদে বাকি পাঁচজন মুগ্ধ হয়েছিলো। মেয়েটার নাম ছিলো রিয়া। কিন্তু সোম ও মেয়েটাকে নিয়ে বেশি ভাবতোও না। একদিন ইতিহাস ( পাসের ) ক্লাসের শেষে সোমের কাছে মেয়েটা নীজে যেচে যায়। গিয়ে স্যারের নোট সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। যেটা দেখে অমিত মনে প্রাণে জ্বলছিলো। ব্যস তারপর থেকেই সোম আর রিয়ার বন্ধুত্বের বাঁধন আর মজবুত হয়
। কিন্তু অমিতের শেষমেষ এই সোমের প্রতি ঈর্ষার সমাপ্তি ঘটলো রিয়া আর সোমের প্রথম আলাপের ছ-মাস পর। ওইদিন শুক্রবার ছিলো। দুটো অনার্সের ক্লাস। একটা সকাল দশ-টা আর অন্য ক্লাস শুরু হতো দুপুর ২.০০ টোয়। সকাল দশ-টার ক্লাস করতে গেলে সোম-কে একটু আগে বেড়োতে হয়। কিন্তু সোম অনেক আগেই ৯.২০ এর মধ্যে কলেজ চলে এসেছিলো ওর বন্ধুরা এসে তখনো পৌঁছায়নি। ওইদিন রিয়াও কলেজে তাড়াতাড়ি গিয়েছিলো। সোম – কে একা দেখতে পেয়ে রিয়া তার গত ছ-মাসের প্রেম অভিজ্ঞতার কথা লুকিয়ে রাখতে পারিনি। এক ছুটে রিয়া সোমের কাছে গিয়ে জড়িয়ে ধরে ” আই লাভ ইউ বলে ” সোম ও ওকে মনেমনে ভালো বেসেছিলো। তাই ও কোনো কথা বলতে পারছিলোনা। সোম ও রিয়াকে জড়িয়ে ধরে। বিপদ-টা আসে ওইখানেই। অমিত তখন সবে কলেজে নিজেদের অনার্স ডিপার্টমেন্টের দরজা দিয়ে রুমে প্রবেশ করবে। কিন্তু রিয়ার দিকে চোখ পড়তেই সে স্তব্ধ হয়ে যায়। পাশ থেকে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখলো অমিত। ওইদিন ও ঠিক করলো যে করেই হোক সোম-কে রিয়ার থেকে আলাদা করবেই। সেদিন অমিত আর সোম ছাড়া ওদের বাকি বন্ধুরা কেউ কলেজে যাইনি। সুযোগের ব্যবহার করলো অমিত। কলেজ শেষ হওয়ার পর অমিত সোম-কে চেপে ধরলো খাওয়ানোর জন্য। নতুন গার্লফ্রেন্ড পাওয়ার খুশিতে। সোম ও না করতে পারলোনা। ওইদিন অমিত সোমের সাথে সারাটা বিকেল কাটালো। কিন্তু শেষমেশ যখন সোম বাড়ি যাওয়ার কথা তোলে তখন সোম সিনেমা দেখার কথা তুলে, ব্যাপার টা ভোলানোর চেষ্টা করে।

সোম – আমি যাই এবার বাড়িতে খুব বকাবকি করবে।

অমিত – আরে ভাবিস না, রাতের শেষ ট্রেনে করে যাবি। চল একটা সিনেমা দেখে আসি ভাই। রোজ রোজ তো আর সিনেমা দেখতে আসিনা।

সোম ও রাজি হয়ে গেলো। সারা-টা দিন মজা করে দুইবন্ধু বাড়ি ফিরছে ট্রেনে করে। পুরো ট্রেন ফাঁকা ছিলো। ওরস দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আসছিলো। এমন সময় অমিত এদিকওদিক তাকিয়ে সোম-কে ট্রেন থেকে ধাক্কা দেয় সজোরে। তারপর ঠিক না বোঝার ভান করে ট্রেনের একটা সীটে বসে পড়ে অমিত।

সোমের সাথেসাথে মৃত্যু হয়। সোমের বন্ধুরা খবর পাওয়া মাত্র শোকে দুঃখে ভেঙে পড়ে। এই ঘটনার ছ-মাস পর। সবাই তখন সোম-কে প্রায় ভুলেই গেছে। এখন সোমের বানানো বন্ধুত্বের দল-টা বিচ্ছিন্ন করে অমিত সেই দলের ভাঙন ধরায়।

দিন-টা ছিলো বুধবার। অমিত আর বাকীসব বন্ধুরা মিলে ঠিক করলো কোথায় ঘুরতে যাবে। ওরা ততদিনে সোম-কে ভুলেও গেছে। ওদের সেদিন বেশী ক্লাস ছিলোনা। তাই ঘুরতে যাবার পরিকল্পনা করে। ওটাই হয়তো ওদের বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। না না বিপদ-টা শুধু অমিতের হয়েছিলো। আর কারুর হয়নি। অমিত ভেবেছিলো প্রতিদিন যে ঝিলের সামনে দিয়ে ওরা কলেজে আসে সেই ঝিলে দু-য়েক টা ছোটোখাটো নৌকাও চলে। অমিত ভেবেছিলো আজ নৌকা করে ঝিলের ওপাড়ে যাবে। ভাবামাত্র কাজ। নৌকাতে সব বন্ধুরা মিলে উঠলো। উঠেই গল্প জুড়ে দিলো। পুরনো দিনকাল নিয়ে। হঠাৎ সোমের কথা বেড়িয়ে আসে।

অনিকেত – আজ যদি সোম থাকতো তাহলে কি ভালোই না হতো। কেন জানিনা আমার মনে হচ্ছে সোম ও আমাদের সাথে যাচ্ছে। তখনি একটা ভুল করে ফেলে অমিত। অমিত বলে ও কিকরে আমাদের সাথে যাবে আমিতো ওকে কবে ট্রেন থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছি। কথাটা বলে শেষ করামাত্র নৌকার পাশ থেকে দু-তিন-টে হাত উঠে। সেই হাত গুলো অমিতের দুইখানা হাত চিপে ধরে। তারপর জলের তলায় টেনে নিয়ে যায়। ব্যাপার – টা নিমেষের মধ্যে ঘটেছিলো। বাকীরা যখন নৌকা থেকে ঝাঁপ দেবার পরিকল্পনা করে তখন নৌকার মাঝি বলে উঠে – বাবুরা নীচে নামবেন না। আপনার বন্ধুকে যে নিয়ে গেছে তার কাছ থেকে মুক্তি পাওয়া অতো সোজা নয়। তাছাড়া এই ঝিলের একটা কোটা আছে – প্রত্যেক বছর একটা না একটা প্রাণ সে নেবেই। তাই আপনারা যদি জলে নামেন তাহলেই নিজেরাই নিজেদের বিপদ ডেকে আনে।

তখন বাকিরা চুপ করে নৌকায় বসে যায়। বাকিরা তখন বুঝতে পারে সোম আজ তাদের সাথেই থাকতো, যদিনা এই অমিত নামক ছেলেটি তাদের দলে থাকতো।

গল্পের বিষয়:
রহস্য

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত