পুরানো রাজ বাড়ি

পুরানো রাজ বাড়ি

গোয়েন্দা তিলকরাজ কুমারগুপ্ত এর নিকট একটা ফোন আসে। নারায়নগঞ্জ এর পুরানো রাজবাড়িতে দূই বার চোর এসে ছিল , কী চুরি গেছে বোঝা যায়নি। তাই টি কে গুপ্তকে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। গুপ্ত বাবু সেন্টুকে সঙ্গে নিয়ে দরজার বাহিরে পা রাখতেই ধনকুবের এ্যাডভেঞ্চার প্রিয় ঐরাবত বাবু পথ আগলে বলে,আরে করছেন কি! আমাকে ছাড়া চললেন কোথায় ?

— তেমন কোথাও নয়, একটা পুরানো রাজবাড়িতে।
—পুরানো রাজবাড়ি ! তার মানে রহস্যে ঘেরা । অর্থাৎ আমাকে যেতেই হচ্ছে।

গুপ্ত বাবু জানেন এক্ষেএে ঐরাবত বাবুকে আটকান বৃথা, অতএব লেট্স গো। রেলস্টেশন থেকে নেমে আধা ঘন্টার মেঠো পথ, তেমন লোকজন নেই বলে গাড়ি অমিল । তাই রাজবাড়ীর তরফ থেকে আমাদের জন্য একটি গরুর গাড়ি পাঠান হয়েছে। পথে চলতে চলতে সেন্টু বলে ঐরাবত বাবু আমরা রাজবাড়ীতে কেন যাচ্ছি তাতো জানতে চাহিলে না।

—আমি ভাবছি রাজবাড়ী যখন যে উদ্দেশে যাইনা কেন খাওয়া-দাওয়া মন্দ হবে না। অতপর ঘন জঙ্গল ঘেরা নির্জন পথ দেখে ভয়ে শিউরে উঠে বলে, আচ্ছা কোনো ডাকাত ভুয়ো ইন্ফর্মেশন দিয়ে আমাদেরকে মায়ের কাছে বলি দিতে নিয়ে যাচ্ছে নাত! টি কে স্যার বলেন ঐরবত বাবু আপনি কি রিভলবারটা আনতে ভুলে গেছেন?

— কই আপনিতো ওটা সঙ্গে নিতে বলেন নি ।
—সত্যান্বেষিরা যেকোনো সময় আক্রমন এর শিকার হতে পারে। ফলে সর্বদা সতর্ক থাকা জরুরি ।
—তবে কি আমি ফিরে যাব?
—সন্টু বলে এখন একা ফিরবেন কিভাবে শেষে কোনো নেকড়ের খাদ্য হবেন নাকি।
—নেকড়ে ! এই জঙ্গলে আবার নেকড়ে আছে নাকি ? কই আগে বলনি তো ।
—টি কে স্যার বলেন শুধু নেকড়ে কেন চিতা থাকা ওতো অসম্ভব নয়।
—ওরে বাবা চিতা তো আরো ভয়ংকর শুনেছি শিকারের সন্ধানে ওরা গাছের উপরে ও ওত পেতে বসে থাকে।
—এত ভয় পাওয়ার কিছু নেই ,একটু সতর্ক থাকলেই হবে।
—এই অন্ধকারে চিতাবাঘ যদি ঘাড়ের উপর এসে পড়ে!
—ভয় নেই আমরা এতজন একসাথে আছি দেখলে কাছে ঘেষবেনা। এমন সময় একটা মোরগের আর্ত চিৎকার শোনা গেলে ড্রাইভার বলে একটা মুরগি ধরে নিয়ে গেল খটাসে।

—ঐরাবত বাবু আতঙ্কিত হয়ে বলে খটাস কি ভাই! টি কে স্যর বলেন ওটা ছোট প্রজাতির বাঘ।
—বাঘ! বলছি এই জঙ্গলে রয়াল বেঙ্গল টাইগার নেইতো! শুনেছি ওই বঘের দেখা নাকি শেষ দেখা ।
—দক্ষিণরায়ের প্রবেশ ঘটলে গ্রামবাসীরা দু-এক দিনেই তা বুঝতে পারে। কারন তখন প্রতিদিন কোনো গরু,ছাগল কিংবা মানুষ মিসিং হতে থাকে। বর্তমানে তেমন খবর নেই,তবে এই ধান কাটার মরশুমেই বেশি বাড়-বাড়ন্ত।
—সেন্টু বলে অত না ভেবে মনে মনে বনবিবিকে স্মরণ করুণ বিপদ মুক্ত ।
—সেই ভাল বলে ঐরাবত বাবু মনে মনে বিড় বিড় করতে করতে বারে বারে কপালে তর্জনী ঠেকাতে থাকে।

একটা প্রকাণ্ড পুরানো বাড়ির সামনে দাঁড়াতে ওদের বুঝতে অসুবিধা হলনা এটি সেই বাড়ি। তখনো সন্ধ্যা নামেনি রাজবাড়িতে ঢোকার আগে টি কে স্যার বলল চলো আগে বাড়িটার আশ-পাশ একটু দেখে নিই। গাড়োয়ান বলল বাবু একটু সাবধানে চলবেন যখন তখন বিপদ আসতে পারে। ঐরাবত বাবু বলেন সেন্টু তুই আমার পিছনে থাক আর গুপ্ত বাবু সামনে কারন অস্ত্রটাতো সঙ্গে নেই। সেন্টু বলে ও নিয়ে ভাববেন না আপনাকে কেউ আক্রমণ করলেও আমাদের থেকে কেউ আপনার বডি নিয়ে যেতে পারবেনা।

—দেখ সেন্টু,অমন অলক্ষুণে কথা বলিস না। এই কথা বলে চলতে চলতে হঠাৎ উপর থেকে একটা আধলা ইট ঐরাবত বাবুর পায়ের সামনে পড়তে ঐরাবত ভয়ে লাফিয়ে ওঠে। বলে গুপ্ত বাবু একটুর জন্যে বেঁচে গেলাম, আমাদের উপর কেউ আক্রমণ চালিয়েছে!

—কুমির
—কুমির !
—উপরের দিকে তাকিয়ে দেখুন।
—তাইতো এতবড় গোসাপ! কুমির বটে কিন্তু ব্যাটা পুরানো দেওয়াল বেয়ে উঠছে কোথায় ?

শিকারের সন্ধানে। অতঃপর টি কে স্যার হঠাৎ হাঁটু মুড়ে বসে কি যেন দেখতে থাকে।

—আঙ্কল কি দেখছ?
—একটা ৯ নম্বর জুতোর ছাপ ।
—থাকতেই পারে, কেউ হয়তো এদিকে এসেছিল।
—ব্যাপারটা তা নয় জুতোটা বিশেষ এক দামী ব্র্যান্ডের।
—ঐরাবত বাবু আমতা-অমতা করে বলেন যারা দামি ব্র্যাণ্ডের জুতো পরে তারা কি চোর হয়?
—হঠাৎ এমন মনে হওয়ার কারন?

—না মানে আমার জুতোটাও দামি ব্র্যান্ডের কিনা। সেন্টু ও আঙ্কল হেসে ওঠে। আরো কিছুটা এগোতেই এক দৈত্যাকার লোক সামনে হাজির হয়। হাতে ধারাল কুঠার , চোখ দুটি রক্ত বর্ণ, শক্ত চোয়াল। টি কে স্যারের প্রশ্ন কে আপনি এখানে কি করছেন?

—কে কি করবে তা আপনাকে জানাতে হবে, কেন আপনি কি লাটের বাঁট আছেন নাকি ।
—আরে ভাই রাগছ কেন ,আমরা এখানে নতুন বেড়াতে এসেছি। যদি আপনার থেকে কিছু তথ্য সংগ্রহ করতে পারি তাই আর কি।

—আমার কোন তথ্য জানা নেই বলে লোকটা পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে যায়। ঐরাবত বাবু বলেন আচ্ছা ঐ কুঠার খানা কেমন ধারাল দেখেছেন ! ওতে বুঝি কেবল গাছ কাটা হয়!
—কেন আপনার ঘাড় বুঝি খুব শক্ত ওতে কাটা যাবে না।
—শুধু শুধু ঘাড় কাটতে যাবে কেন?
—শুধু শুধু হবে কেন ও যদি অপরাধী হয় এবং আমরা যে গোয়েন্দা

তা যদি জেনে ফেলে তবে কিছুই অসম্ভব নয়। সেন্টু বলে আঙ্কেল লোকটা কিন্তু সুবিধের বলে মনে হল না। লোকটি নিজেকে খুব চালাক ভাবে নয়ত বোকা। চারদিকে একটা চক্কর দিয়ে টি কে স্যার সবাইকে নিয়ে রাজবাড়িতে প্রবেশ করে। ড্রয়িং রুমে বসতেই রানীমা এসে জিজ্ঞাসা করলেন তোমাদের আসতে কোন অসুবিধে হয়নি তো? ঐরাবত বলেন অসুবিধে ,না না এর থেকে কত বড় বড় শিকারে আমরা গেছি। এমন সময় এক মনহারিনী অষ্টাদশীর আগমন ঘটল এবং বলল আপনাদের শিকারের জন্য এখানে ডাকা হয়নি, শিকারের জন্য ওই অস্ত্রটিই যথেষ্ট বলে দেওয়ালে ঝোলান দোনলা বন্দুকটির দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে । রানীমা পরিচয় করিয়ে দেন অষ্টাদশী মহিলাটি তাঁর নাতনী, নাম অহনা, কিছুদিন হল শহর থেকে গ্রামের বাড়িতে এসেছ। টি কে স্যার বলেন আচ্ছা আপনারা কি করে বুঝলেন আপনাদের বাড়িতে চোর ঢুকেছিল? অহনা বলল আমি তাকে দেখেছি হাইট সম্ভবত পাঁচফুট দশ হবে , অন্ধকারে চুপি চুপি স্টোর রুমে ঢুকতে দেখি,কি যেন খুঁজছিল।

—ঐরাবৎ বাবু বলেন দেখতেই যখন পেলেন ওই বন্দুকটা চালিয়ে দিলেই তো চোর বাবাজির আক্কেল গুড়ুম হয়ে যেত।

—একবার তা ভেবে ছিলাম কিন্তু পরক্ষনেই দেখলাম আমার ঘরের দরজা খোলা দেখে আমার ঘরেই ঢুকে গেল। আমি দরজার বাহিরে থেকে নজর রাখলাম । যখন দেখলাম আমার ড্রয়ার খুলে আমার গহনাগুল হাতে নিয়ে দেখল অথছ কোনটিই নিল না, তখন আমি গুলি করার সিদ্ধান্ত থেকে ফিরে আসি। ঐরাবত বাবু বলেন আশ্চর্য, চোর অথচ গহনা নিল না! সেন্টু বলে আঙ্কল ব্যাপারটা একটু গোলমেলে মনে হচ্ছে। সবাইকে গেস্ট হাউসের দুটো রুমে থাকার ব্যবস্থা করা হল। ঐরাবত বাবু বলেন দুটো প্রশ্ন, এখন আমরা চোরকে পাকড়াত্ত করব নাকি যা চুরি গেছে তা উদ্ধার করব? দুটোই তো নাগালের বাহিরে । টি কে স্যার বলেন নগালে থাকলে টিকটিকি নয় পুলিশকে খবর দিতেন। ঐরাবত বাবু বলেন ওই সব জটিল ব্যাপার আমার মাথায় ঢুকবে না আমি খওয়া ও ঘুমের ব্যাপারে গুরুত্ব দিতে চাই। রাতের খাবার মন্দ হয়নি । ঐরাবত বাবু বলেন ভাল খাবার পেলে আমার আর কোনো প্রশ্ন থাকে না, এবার আপনাদের ব্যাপার আপনারা ভাবুন বলে ঘুমের হাই তুলতে থাকে। টি কে স্যার বলেন পরিমিত খাবার সুস্থ সাস্থের সহায়ক ।

—দেখুন সুস্বাদু খাদ্যের ঘ্রাণ নেওয়ার পর কোনো নীতি জ্ঞান আমার মধ্যে কাজ করে না।
—সেন্টু বলে চোর চুরি না করে চলে গেছে এখন আমাদের করণীয় কি ?
—টি কে স্যার বলেন চোর এসেছিল কেন এটাই কোটি টাকার প্রশ্ন । এমন সময় সামনের জঙ্গলের দিক থেকে একটা আলোর ফোকাস ঘরের মধ্যে এসে পড়েই মিলিয়ে গেল। সেন্টু বলে আঙ্কল ওদিকে কোন রাস্তা বা লোকালয় নেই তাহলে আলোকরশ্মি এল কোথা থেকে !

—অনুমানে কোনো লাভ নেই, উৎস স্থলে গিয়ে ব্যাপারটা দেখা দরকার।
—ঐরাবত বাবু একরাশ বিষ্ময় প্রকাশ করে বলে, বলেন কি ! এই গভীর রাতে ওই ঘন জঙ্গলে!
—টি কে স্যার বলেন আপনার ভয়ের কারন নেই আপনি এখানে থাকবেন আমি আর সেন্টু যাব।
—সেই ভাল, পরক্ষনেই আর্ত চিৎকারে আরে বলেন কি এই ঘরে আমি একা থাকব! আর চোর যদি সেই সময়—
—চোর আপনার ঘরে ঢুকতে পারবে না। আপনি দরজা ভিতর থেকে বন্ধ রাখবেন।

—কিন্তু মশাই ভূতের প্রবেশ করতে তো আর দরজা লাগে না বরঞ্চ আপনাদের সঙ্গে যাওয়াই ভাল। অতএব তিন জনেই বেরিয়ে পড়ে অজানা আলোক উৎসের সন্ধানে । টর্চ্ এর আলো ফেলে তিন জনে এগোতে থাকে । ঐরাবত বাবু বলেন শুনেছি বাঘের চোখ রাত্রে জ্বলে,ওই আলো ঘরে পড়েনিতো?

—ও আলো চোখে পড়ে, গায়ে নয়।
—এত ভারি গোলমালে ব্যাপার দেখছি চোখে পড়ে অথচ গায়ে পড়ে না। আচ্ছা মিস্টার গুপ্ত বাঘ কি রাতের বেলায় মানুষ শিকার করে?

—সেন্টু বলে শিকার করলে আপনি জানতেই পারবেন না কারন মহারাজ পিছন থেকে ঘাড়ে পড়ে। ঐরাবত বাবু আমতা-অমতা করে বলে এর থেকে ঘরে থাকাই ভাল ছিল বলতে না বলতে বা—ঘ বলেই পিছনে সেন্টুর গায়ের উপর পড়ে।

—টি কে স্যার পিছনে না তাকিয়ে বলে ঐরাবত বাবু বাঘ নয় ওটা শৃগালের মাথা।
—আরে মশায় আমি শৃগাল চিনি, আমি বলছিলাম নিশ্চয় আশ-পাশে বাঘ আছে তারই শিকার এই হতভাগা ।
—এটি বাঘের শিকার নয়, মানুষের ।
—আঙ্কল ঠিক বলেছেন দাঁতের দাগ নয় কোন ধারাল অস্ত্রে এমন সমান করে কাটা যায়। এভাবে কথা বলতে বলতে সবাই এগোতে থাকে। হঠাৎ কাউকে দেখে টর্চ্ না সরিয়ে টি কে স্যার বলেন কে ওখানে দাঁড়াও বলছি নইলে গুলি চালিয়ে দেব।

—লোকটি দাঁড়িয়ে বলে গুলির ভয় দেখা বেন না স্যার,আমার কাছে ও অস্ত্র আছে।
—ঐরাবত বাবু বিস্ময় প্রকাশ করে বলে এতো সেই লম্বা লোকটা,হাতের ধারাল কুঠারটি রক্ত মাখা,পিঠে ভারি বস্তা নিশ্চয় সেই শেয়াল !

—টি কে স্যার কোনো জবাব না দিতে লোকটা ধীরে ধীরে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
—ঐরাবত বাবু বলেন শুনেছি শেয়াল খুব ধূর্ত, সেই শেয়ালকে কিনা রাতের অন্ধকারে শিকার করা লোকটিকে মশায় ভয়ংকর ছাড়া কি বলা যেতে পারে।
—টি কে স্যার কেবল মাথা হেলিয়ে সংক্ষেপে হু বলে।

টি কে স্যার নিরূত্তরে কেবলই চারদিকে টর্চের আলো ফেলতে থাকে। কিছুক্ষণ পর একটা নির্দিষ্ট বস্তুতে ফোকাস করতে ঐরাবত বাবু চিৎকার করে ওঠে খুন ! সেণ্টু বলে খুন, কোথায় ? —ঐরাবত বাবু ভয়ে দুপা পিছিয়ে বলে ওই তো একটা বাচ্চার কাটা হাত পড়ে রয়ছে। টি কে স্যার বলেন ওটা টোপ, ওই টোপ দিয়েই শিয়াল শিকার। ঐরাবত বাবু অধিকতর বিষ্ময় প্রকাশ করিয়া বলে ওরে ব্বাস এযে আরো ভয়ংকর, শিয়াল শিকারে মানুষের বাচ্চা টোপ ! না এ চলতে পারে না, এখনি ওদের ফাঁসি দেওয়া উচিত । টি কে স্যার বলেন ঐরাবত বাবু এত উত্তেজিত হওয়ার কোনো কারন নেই, আসলে এটা একটা কবর স্থান । চারি দিকে দেখছেন না ছোট ছোট কলস ও কোদালের বাঁট পড়ে রয়েছে। তার মানে এত রাত্রে আমরা শ্মশানে। আমি তেনাদের ভয়ে ঘর ছেড়ে শেষে কিনা শ্মশানে, বলে চোখ বুজিয়ে রাম নাম জপ করতে থাকে। সেণ্টু বলে আপনি দাঁড়িয়ে রাম নাম জপ করুণ আমরা চলি। ঐরাবত বাবু তৎক্ষণাত সেণ্টুর জামা ধরে ফেলে বলে, সেণ্টু আমারে ফেলে যাসনা তাহলে বডি টাও পাবি না, শ্মশানের শিয়ালরা বড় ভয়ংকর ।

ফেরার পথে ঐরাবত বাবু জিজ্ঞাসা করেন আচ্ছা ওই শিয়ালের মাংস কাহারা খায়? টি কে স্যার বলেন ইচ্ছে করলে আপনি ও খেতে পারেন, খাবেন নাকি–বলতে না বলতে হঠাৎ একটা কি যেন হুড়মুড়িয়ে গাছের ঝোপ ঠেলে পালিয়ে গেল। ঐরাবত বাবু পা স্লিপ্ করে মাটিতে বসে পড়ে। সেণ্টু বলে সব কিছুতে আপনি এত ভয় পান- – ঐরাবত বাবু বাধা দিয়ে বলে ভয় নয় আসলে রাতের জঙ্গলে কোথায় কোন জানোয়ার লুকিয়ে বসে আছে তার তো ঠিক নেই। টি কে স্যার বলে এই জঙ্গলে সব থেকে ভয়ানক হল কিং কোবরা। যেকোনো জন্তু ওদের থেকে সাবধান। ঐরাবত বাবু কাঁদ কাঁদ মুখে বলে তার থেকে ভয়ানক তো আপনি মশায়, জেনেশুনে আপনি আমাদেরকে এমন একটা জঙ্গলে ঢোকালেন, এখন ভালোয় ভালোয় এই জঙ্গল থেকে বের হতে পারলে বাঁচি। পরদিন সকালে টি কে স্যার বলেন ঐরাবত বাবু চলুন শিয়ালের মাংস দিয়ে ব্রেকফাস্ট টা সারা যায় কিনা দেখি।

—ছ্যা ছ্যা সক্কাল বেলাটা দিলেন মাটি করে, শিয়ালের মাংস তার উপর শ্মশানের শিয়াল, মশায় আপনি দেখছি আমাকে নরকে পাঠিয়ে ছাড়বেন।

—সেণ্টু বলে আপনি স্বর্গ নরক দেখেছেন নাকি?
—দেখ সেণ্টু মজা কোরণা, ওই কি একটা ব্রেকফাস্টের মেনু। টি কে স্যার হেসে বলে ভয় নেই, আপনাকে নরকে যেতে হবে না। খোঁজ নিয়ে জানা গেল অনতি দুরে একটাই মাএ ছোটখাট রেস্টুরেন্ট কাম হোটেল বর্তমান। সেণ্টুরা হাজির হতে এক হোটেল কর্মী সাদরে বসার জায়গা করে দিয়ে বলে, কি খাবেন বলুন। টি কে স্যার বলেন কফি পাওয়া যাবে কি?

—হ্যাঁ স্যার। তাহলে কফিই দিন। ক্ষনিক পরেই সবাইকে কফি দিয়ে যায়, সবাই তাতে চুমুক লাগায়। টি কে স্যার চারদিকে কেউ আছে কিনা দেখে নিয়ে বলে, আচ্ছা দুপুরে মানে লাঞ্চে আপনদের এখানে কি কি মেনুর ব্যাবস্থা আছে? কর্মীটি বলে দুরকম মাছ, মাংস, ডিম, সুক্ত- -। বাঃ আপনাদের এখানেতো দেখছি সবই পাওয়া যায় বলে টি কে স্যার উচ্ছাস প্রকাশ করেন। তখন কর্মীটি নিচু স্বরে বলে স্যার আপনারা চাহিলে হরিণের মাংসেরও ব্যাবস্থা করে দিতে পারি। কথাটা শুনেই ঐরাবত বাবু বেশম খায়। সেণ্টু বলে খাওয়ার সময় নিশ্চয় আপনার বাড়ি থেকে কেউ আপনার নাম করছে।

ঐরাবত বাবু চাপা স্বরে বলে বেশম খাবনা ? দেখলে না শিয়াল কেমন হরিণ হয়ে গেল। কফি শেষ হতে সবাই উঠে পড়ে এবং বাহিরে বেরিয়ে আসে। টি কে স্যার বলেন ঐরাবত বাবু চলুন আজ দিনের আলোতে জঙ্গলটা ভাল করে ঘুরে দেখা যাক। আশা করি আপনার আপত্তি নেই। ঐরাবত বাবু হেসে বলেন আপনারা আমাকে যতটা ভীতু ভাবছেন আমি ততটা ভীতু নই। আমার প্র-পিতামহ এক সময় বাঘ শিকার করতেন। সেই রক্ত একটু হলেও আমার দেহে বইছে। সেণ্টু বলে যতদূর শুনেছিলাম আপনার প্র-পিতামহ রবিঠাকুরের সহপাঠী ছিলেন এবং তিনি শান্তিনিকেতনে থাকতেন। তা এই শান্তিনিকেতনে বাঘ! ঐরাবত বাবু হেসে বলেন আসলে আমার প্রপিতামহ আমারই মত এ্যাডভেঞ্চার প্রিয় মানুষ ছিলেন। তাই মাঝে মাঝে চড়ুইভাতির ইচ্ছা হলে বন্দুক নিয়ে চলে যেতেন সুন্দরবনের গভীরে, সঙ্গে কোনো মাংস নিতেন না, রয়াল বেঙ্গল টাইগারের মাংস নাকি ওনাদের বেশ পছন্দের ছিল। এবার সেন্টুই খালি মুখে বেশম খায়। বেশ কিছু ক্ষণ ঘোরাঘুরি করে সবাই বাসায় ফিরে আসে। সবার সমক্ষে টি কে স্যার বলেন আজ আর আমাদের এখানে থেকে লাভ নেই, অগত্যা বিকালেই আমরা কোলকাতা ফিরছি। এর ঠিক তিন দিন পর সেণ্টু একটা নিউজ পেপার এনে বলে আঙ্কল কগজে একটা ছবি দেখেছ?

—নারায়ন গঞ্জের সেই দৈত্যাকার লোকটি হঠাৎ নিখোঁজ।

সেণ্টু বলে ব্যাপারটাতো কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। টি কে স্যার বলেন একটা নামের তালিকা পেয়েছি, সেটা অহনা দেবীর নিকট পাঠিয়ে ছিলাম, ওটাতে ওনাদের পরিচিত কোনো নাম আছে কিনা জানতে। তাতে কেবল একটা নাম পাওয়া গেছে। এখন আমরা দুজন তার সাথে দেখা করতে যাব বলে দুজনে বেরিয়ে পড়ে। ঠিকানা খুঁজে একটা বাড়ির দরজায় কলিং বেল চাপতে একটা যুবক বেরিয়ে এসে বলে বলুন কাকে চান? আমরা সুমিত গাঙ্গুলীর সাথে দেখা করতে চাই । ভিতরে আসুন আমিই সুমিত। টি কে স্যার বলেন আমি তিলকরাজ কুমারগুপ্ত আর সুমিত কথা কেটে নিয়ে বলে আপনি গোয়েন্দা টি কে গুপ্ত আর উনি আপনার সহকারী সেণ্টু। এখন বলুন আমি আপনাকে কি সাহায্য করতে পারি? টি কে স্যার বলেন ঘরে বসে কথা বললে বোধহয় ভাল হত।

—আসুন ভিতরে আসুন বলে ঘরে ঢোকাতে দেখে ঘরে বসে রয়েছে আরো এক যুবক। যুবকটি ওনাদের দেখে দাঁড়িয়ে পড়ে। অতঃপর যুবকটি বেরিয়ে যেতে চাহিলে টি কে স্যার বলেন আপনাকে কিছু বলার আছে আপনি বসুন। সুমিত বলে ও আমার এক বন্ধু কাছেই ওদের বাড়ি । টি কে স্যার একটা নামের তালিকা দিয়ে বলেন দেখুনতো এটাতে আপনার নাম আছে কিনা। ছেলেটি বিষ্ময় প্রকাশ করে বলে আশ্চর্য আপনি আমার নাম ঠিকানা পেলেন কোথা থেকে ! সে কথা পরে জানলে চলবে এখন আমার একটা প্রশ্ন আছে। আপনারা গত সোমবার আই মিন ১৪ই আগষ্ট রাত আট টার সময় আপনারা কোথায় ছিলেন? সুমিতের বন্ধু নরেশ বলে ওই সময় বাসস্ট্যাণ্ডের পাশে মহালক্ষী রেস্টুরেন্টে ছিলাম। আর সুমিত বাবু আপনি?

আমি তো নরেশের সাথেই ছিলাম। ওকে জিজ্ঞাসা করুন। নরেশ ঘাড় বাঁকিয়ে সম্মতি জানায়। আর তেমন কিছু জানার দরকার নেই আমরা এখন চলি বলেই টিকে স্যার উঠে পড়ে। পথে চলতে চলতে সেণ্টু বলে হঠাৎ সুমিতের বন্ধুকে আপনার দরকার পড়ল কেন? যখন কেউ কোন অপরাধ করে তাদের কোন ক্লু তাদের বন্ধুদের থেকে পাওয়া যেতে পারে যেমন আমরাও পেতে চলেছি। সেণ্টু বলে শুধু যে এই কারন আমার তা মনে হয় না। আমি বুঝতে পারছিনা নরেশের নাম তোমার লিস্টে এল কিভাবে । টি কে স্যার বলেন তুমি নিশ্চয় নরেশের পায়ের দিকে লক্ষ্য করেছ। হ্যাঁ ওর পায়ে ও সেই ব্র্যান্ডেড জুতো কিন্ত সেটাতো ওর বন্ধু সুমিতের হতে পারত। টি কে স্যার বলে তাহলে আমাদের সমস্যা বেড়ে যেত। আমি ওই জুতোর দোকান থেকে এ লিস্ট এনেছি। এখন তুমি বাসায় ফিরে যাও। আমি একটা জায়গা থেকে ঘুরে বাসায় ফিরব রাতে দেখা হবে। সেন্টু সন্ধ্যার পর টি কে স্যারের বাসায় যেতে বলে আজ রাতে বড় কোন অঘটন ঘটতে পারে।

—কি ঘটবে?
—তা বলা মুশকিল, আমদের অপেক্ষা করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। পরদিন টিভির খবরে শোনা যায় নরেশ দাস মদ্যপ অবস্থায় বাড়ির ছাদ থেকে পড়ে মারা যান। সেন্টু বলে আঙ্কল খবরটা একটা দুর্ঘটনা বলে প্রচার হলেও আসলে এটা খুন তাইতো?

—হুঁ, আজ বিকালেই এর সমাধান হবে । পুরানো রাজবাড়ির সদস্যরা আজ কলকাতায় আসছে। আজ রাতে আমার উপর দিয়ে বেশ ধকল গেছে এখন একটু বিশ্রাম নেওয়া দরকার। বৈকাল নাগাদ অহনার বাসায় যখন রাজবাড়ির সদস্যরা হাজির টি কে স্যার সেন্টু ও ঐরাবতবাবুকে নিয়ে প্রবেশ করে বলে অহনা দেবী কই আপনার বয়ফ্রেণ্ডকে তো দেখছি না। অহনা বলে ওই তো এসে গেছে। সুমিত রানীমাকে প্রণাম করে আসন গ্রহন করে। ঐরাবত বাবু বলে খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা আছে নাকি? টি কে স্যার বলে না, আপাতত আমরা কিছু গল্প শুনব এবং কিছু শোনাব। এখন রানীমার থেকে আমরা মা দুর্গার গল্প শুনব কারণ আর কদিন পরেই তো দু্র্গাপূজা। রানীমা বলুন হঠাৎ আপনাদের বাড়ির দুর্গাপূজা বন্ধ হয়ে গেল কেন?

—আমাদের বাড়ির দু্র্গামাকে সাজানো হত অত্যন্ত মূল্যবান সোনা ও হীরার গহনা দিয়ে। পূজা শেষে এই গহনাগুলো লূকিয়ে রাখা হত গোপন কোনো স্থানে । বাড়ির কেবল দুইজন সদস্য সেই গোপন স্থানের কথা জানত। গহনা গুলোর নিরাপত্তার কারনে এই নিয়ম। কিন্তু দুর্ভাগ্য বশত আমার স্বামী ও ছেলে গড়ি দুর্ঘটনায় এক সাথে মারা যাওয়ায় সেই গহনা আজও উদ্ধার হয়নি এবং সেই থেকে পূজা ও বন্ধ হয়ে যায়। এই ঘটনাটা বোধহয় সেন্টু ও ঐরাবতবাবু ছাড়া উপস্থিত সবার ই জানা কি বলেন সুমিত বাবু ? হ্যাঁ এমনি ঘটনার কথা অহনার মুখ থেকে শুনে ছিলাম অমিত জানায়। টি কে স্যার বলেন এর পর থেকেই আপনি গোপনে সেই গহনা উদ্ধারের চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকলেন। অবশেষে যখন সফল হলেন সামান্য একটা মিথ্যা কথার করনে বন্ধুকেও খুন করে বসলেন। সুমিত পালানোর পথ খোঁজার চেষ্টা করলে টি কে স্যার বলে কোনো লাভ নেই দরজাতে পুলিশ আছে। আমি খোঁজ নিয়ে দেখেছি গত সোমবার আপনি রেস্টুরেন্টে যান নি। এখন বলুন বন্ধুকে খুন করলেন কেন?

—সুমিত বলে নরেশ খুব জেদ ধরেছিল কেন আমি মিথ্যা বলছি এমনকি ব্ল্যাকমেল করার ও হুমকি দিচ্ছিল।
— তাই একটা মদের আসর বসিয়ে অবশেষে ছাদ থেকে ঠেলে সোজা নিচে। সেই ফাঁকে আমি আপনার তালা দেওয়া বদ্ধ ঘরে হানা দিয়ে গহনা গুলোর সন্ধান পাই যার ছবি অহনাকে পাঠিয়েছি। কিন্তু আরো একজনের খবর আপনার কাছে জানতে চাই। নারায়ন গঞ্জের সেই দৈত্যাকার লোকটি যে আপনাকে সাহায্য করেছিল।

—সুমিত বলে আমাকে এখুনি নিয়ে চলুন লোকটিকে মাটির তলায় গোপন কক্ষে আটকে দিয়েছি, যাহাতে গহনার কথা কাউকে না বলতে পারে। পুলিশ অফিসার সুমিতকে নিয়ে পুরানো রাজবাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।

গল্পের বিষয়:
রহস্য
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত