প্রতিশোধের স্পর্ধা

প্রতিশোধের স্পর্ধা

।। ১ ।।

বেল‌ শুনে ঘরে ঢুকে সাব-ইন্সপেক্টর রতনলাল একটা স্যালুট জানিয়ে বললেন-“জি স্যার। কুছ কাম থা?”
নিলাংশু বাবু একটু মজা করেই বললেন -“আধঘন্টা আগে এক কাপ চা চেয়েছিলাম।তো সেটা কি আজ আর জুটবে?”
রতনলাল একটু কাঁচুমাঁচু খেয়ে বললেন -“সরি স্যার।বাহার সবনে চায়ে পিলি থি তো হামে লাগা কি আপ কো ভি,,,অভি বোলতে হে হম ছোটে কো”
-“থ্যাংক ইউ।একটু জলদি বলে দিও,কেমন😊?”

একটু পরেই দরজায় ধাক্কা শুনে নিলাংশু বাবু ভাবলেন বোধহয় চা এলো,-“কাম ইন”
একজন কমবয়স্ক ছেলে ঘরে ঢুকে স্যালুট করে বললো
-“ইন্সপেক্টর অনির্বাণ রিপোর্টিং স্যার।”
-“ওহ্।অনির্বাণ পাত্র।তাইতো? এসো বসো বসো। ওয়েলকাম টু C.I.D”
আবার বেল বাজিয়ে দুটো চা আর সিঙ্গারা বলে দিলেন নিলাংশু বাবু।
-“তো অনির্বাণ, ছোটবেলায় লুকোচুরি খেলেছো আশা করি।এই দেখো তোমাকে তুমি বলছি।কিছু মনে করোনা আবার।তুমি আমার ছেলের বয়সি তো।”
-“না স্যার।ঠিক আছে।”
-“হ্যাঁ তো যেটা বলছিলাম, লুকোচুরি আর কানামাছি এই দুটো খেলা খুব রিলেটেবল এই লাইনে বুঝলে! আস্তে আস্তে বুঝবে”
চা আর সিঙ্গারার পর্ব শেষ হতে না হতেই  ইন্সপেক্টর আরতি হুড়মুড়িয়ে রুমে ঢুকলেন -” স্যার,রমানাথ সান্যাল বাবুর ফোন এসেছিল।আপনার সাথে কথা বলতে বাড়িতে ডেকেছেন।”
-“কেনো কি হয়েছে ?”
-” টিভি তে খবরটা দেখেননি?আজ সকালেই দেবনাথ বাবু মারা গেছেন।কাল থেকে হঠাৎ খুব অসুস্থ হয়ে পড়েন।আজ সকালে হাসপাতাল আনার পথেই মারা গেছেন।”

দেবনাথ বাবু শহরের নামি উকিল।হাই প্রোফাইল কেস সব ওনার কাছেই আসতো।দেবনাথ বাবুর বাবা,মানে রমানাথ বাবুও এককালে খুব নামকরা উকিল ছিলেন।সান্যাল পরিবারের সাথে নিলাংশু বাবুর বেশ ভালই যোগাযোগ ছিলো।তাই এই আকস্মিক মৃত্যুর খবর শুনে রীতিমতো চমকে উঠলেন নিলাংশু বাবু,
-“হোয়াট 😲!!কিভাবে হয়েছে এসব?”
-“খবরে তো দেখাচ্ছে যে কাল থেকেই দেবনাথ বাবু নাকি খুব অসুস্থ ছিলেন।রাত্রে ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়েছিলেন। সকাল বেলায় অনেক ডাকাডাকির পরও ঘুম না ভাঙ্গায় ওনাদের সন্দেহ হয়।তারপর হাসপাতালে নিয়ে গেলে ওনাকে মৃত ঘোষণা করা হয়।”
-“কিন্তু রমানাথ বাবু এইসময় ফোন করে ডাকছেন কেনো🤨?যাইহোক ডেকেছেন যখন একবার দেখা করে আসতেই হয়।আরতি,সবাইকে রেডি হয়ে বেরোতে বলো। উফ্ 😨।
চলো অনির্বাণ, খেলা শুরু।”
রাস্তায় যেতে যেতে নিলাংশু বাবু আবার শুরু করলেন
-“কি অনির্বাণ,কি ভাবছো?প্রথম দিনেই শুরু হয়ে গেল এসব?”
-“সত্যি বলতে হ্যাঁ স্যার।ভাবছিলাম প্রথম দিনেই এত হাই প্রোফাইল কেস।যদিও এখনও জানা যায়নি যে   স্বাভাবিক মৃত্যু নাকি..”
-“হুম। এই অজানাকে জানা,ঘটে যাওয়া ঘটনার পুনঃনির্মাণ,আর আসামির সাথে লুকোচুরি খেলা – এতেই দিন কাটবে এবার।অভ্যেস করে নাও😊😊
এই দেখো এসবের চক্করে তোমাকে কারো সাথে পরিচয়ই করানো হইনি।এই যে সুঠাম চেহারার মানুষটিকে দেখছো আমার পাশে, ইনি আমাদের D.S.P., শ্রী অভিজিৎ সান্যাল।বুদ্ধি আর হাত দুইই সমানে চলে এনার।তোমার বাঁপাশে বসে ইন্সপেক্টর আরতি শুক্লা,আমাদের লেডি সিংঘম।আর আমি S.P নিলাংশু মিশ্র।”
-“স্যার হামারা পেহচান নহী করাইয়েগা?”
-“বিলকুল করায়েঙ্গে। ইনি হলেন আমাদের ডিপার্টমেন্টের সবার প্রিয়, সাব- ইন্সপেক্টর রতনলাল।বিহারে বাড়ি।বাংলাটা বোঝেন,বলতে পারেন না।এরপর তোমার পরিচয়টা তুমিই দাও অনির্বাণ।”
-“আমি ইন্সপেক্টর অনির্বাণ পাত্র।বাড়ি মেদিনীপুরে।আজই জয়েন করেছি।”
সবাই করমর্দন করলেন একে একে অনির্বাণের সাথে।

।।  ২  ।।

নাথভিলার সামনে মানুষজনের ভিড় কাটিয়ে গেটের কাছে যেতেই পুলিশের গাড়ি দেখে দারোয়ান সদর দরজাটা খুলে দিল।
গাড়ি থেকে নেমে বাড়ির একজন কর্মচারীকে ডেকে নিলাংশু বাবু বললেন -” শোনো,ভেতরে গিয়ে রমানাথ বাবুকে একটু বলো আমরা এসেছি।”
বাড়িটা তিনতলা।বাইরে একটা প্রশস্থ বাগান।বাগানে কয়েকটা আরামকেদারা রাখা।দেখলেই বোঝা যায় উচ্চবিত্ত সম্ভ্রান্ত পরিবার।
একটু পরেই কর্মচারীটি এসে বললো -“ভেতরে আসুন।”
ঘরে ঢুকে ওনারা দেখলেন নিচের একটা বড় হলঘরে সব কাছের আত্মীয়রা জড়ো হয়েছেন।দেবনাথ বাবুর স্ত্রী, অনুসুয়া দেবী পাথরের মতো বসে আছেন মৃত স্বামীর দিকে তাকিয়ে।ওনাদের একমাত্র ছেলে তীর্থঙ্কর এককোনায় দাঁড়িয়ে আছে অন্যমনস্ক ভাবে।
কর্মচারীটি নিলাংশু বাবুর উদ্দেশ্যে বললো -“বড়বাবু আপনাকে ওপরের কামরায় ডেকেছেন”
-“আচ্ছা।এই শোনো,তোমরা একটু অপেক্ষা করো।আমি একটু কথা বলে আসি।”- বলেই ওপরের কামরার দিকে চলে গেলেন নিলাংশু বাবু।
কামরায় ঢুকে নিলাংশু বাবু দেখলেন একজন মাঝবয়সি ভদ্রলোক আর রমানাথ বাবু চেয়ারে বসে আছেন।ওনাকে দেখে রমানাথ বাবু বললেন –
-“আসুন নিলাংশু বাবু।আপনারই অপেক্ষা করছিলাম।কিছু জরুরী কথা আছে।”
-“হ্যাঁ স্যার বলুন।”
-“দেখুন আপনি জানেনই আমাদের পেশায় বন্ধুর চেয়ে শত্রুর সংখ্যাই বেশি। দেবুর এরকম হঠাৎ চলে যাওয়া আমি একেবারেই মেনে নিতে পারছিলাম না নিলাংশু বাবু।হয়তো মেনেও নিতাম একসময় যদিনা ডাক্তারবাবু এসে আমায় ওই কথাগুলি বলতেন।”- বলে ওই মাঝবয়সী ভদ্রলোকের দিকে চোখ দিয়ে ইঙ্গিত করলেন রমানাথ বাবু।
-“কি কথা?”-নিলাংশু বাবু বেশ উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলেন।ডাক্তারবাবু বলে উঠলেন এবার -“আমি সুবীর ভৌমিক।অনেক বছর ধরেই এবাড়ির ফ্যামিলি ডাক্তার।কাল সকালে আমায় অনুসুয়াদি ফোন করে বলে যে দেবুদার মাথা ঝিমঝিম করছে,শরীর ঠিক লাগছেনা।আমি ১১ টা নাগাদ এসে দেখে যা বুঝলাম যে ওটা নর্মাল সিম্পটমস।ঘুমের ওষুধ বরাবরই খেতো দেবুদা।তাই এরকম ঝিমুনি আসতেই পারে।আমি বললাম রেস্ট করো।বেশি অসুবিধে হলে আমায় ডেকো।এমনকি কাল রাতেও আমি ফোন করে খবর নিলাম,তখনো ভালো ছিল।তারপর হঠাৎ রাতে ঘুমের মধ্যে দেবুদা কোমায় যায় আর তারপরেই…”
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ডাক্তারবাবু আবার শুরু করলেন -“দেখুন আমি এক্ষুনি বলছিনা এটা স্বাভাবিক মৃত্যু নয় বা কিছু,কিন্তু একটা কোথাও খটকা লাগছে আমার।তাই আমি রমানাথ বাবুকে তদন্ত করানোর কথা বললাম।”
রমানাথ বাবু নিলাংশু বাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন -“যে গেছে তাকে তো আর ফিরে পাবোনা।কিন্তু যদি কেও সত্যি আমার ছেলের সাথে এরকম করে থাকে তো কাল সে আমার বৌমা বা নাতির সাথেও,,,,,তাই আমি চাই যে আপনি তদন্তের ভারটা নিন আর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সত্যিটা বের করুন।”
-“আচ্ছা রমানাথ বাবু।আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন।আমার যতটা করার আমি অবশ্যই করবো।আচ্ছা আমি উঠি এখন।”

নিচে নেমে বাকিদের পুরোটা বুঝিয়ে দিয়ে নিলাংশু বাবু বললেন-“অভিজিৎ তুমি আর অনির্বাণ , তীর্থবাবুর সাথে কোনো কথা বলা যায় কিনা দেখো,,আমি আর আরতি অনুসুয়া দেবীর সাথে একটু কথা বলে দেখি,আর রতনলাল তুমি সবার নাম,ফোন নং আর ঠিকানাগুলো কালেক্ট করে নাও ।”-বলেই নিলাংশু বাবু এগিয়ে গেলেন অনুসুয়া দেবীর দিকে-“অনুসুয়া দেবী,কিছু কথা ছিল।”
অনুসুয়া দেবী কোনো উত্তর দিলেন না। পাশ থেকে একজন ভদ্রমহিলা বললেন -“এক্সকিউজ মি স্যার।”
আপনি যদি ম্যামকে এই মুহূর্তে কোনো প্রশ্ন না করেন,তাহলে একটু ভালো হয়।”
নিলাংশু বাবু ঘাড় নেড়ে বললেন -” হুমম।আপনার পরিচয়?”
-“আমি ম্যামের পার্সোনাল সেক্রেটারী, রোমা রায়।”
-“আপনার সাথে কিছু কথা বলা যাবে?”
-“হ্যাঁ স্যার অবশ্যই, বলুন।”
-“কতদিন কাজ করছেন আপনি এখানে?”
-“স্যার বিগত দুবছর ধরে।”
-“দেবনাথ বাবুর মৃত্যুর ব্যাপারে কি জানেন?”
-“খুব বেশি কিছুনা।কাল বিকেল বেলায় পার্থদার ফোন আসে যে স্যারের খুব শরীর খারাপ।আমি আর পার্থদা সন্ধ্যেবেলায় দেখাও করে যাই।তখন ভালোই ছিলেন।তারপর আজ সকালে হঠাৎ খবরটা শুনি”
-“পার্থদা?”
-“পার্থসারথি দত্ত। দেবনাথ বাবুর কাছে ওকালতি শিখছেন অনেকদিন ধরেই।ওই যে লম্বাগোছের, দাড়িওয়ালা ভদ্রলোককে দেখছেন তীর্থবাবুর পাশে,উনিই।”
-“আচ্ছা।তো পার্থবাবুর আপনাকে ফোন?আপনার সাথে ওনার কোনো বিশেষ সম্পর্ক?”
-“নানা।সেরকম কিছুনা। একই বাড়িতে কাজ করলে পরিচিতি তো থাকেই বলুন।”
-“আচ্ছা দেবনাথ বাবুর সাথে অনুসুয়া দেবীর সম্পর্ক কেমন কিছু জানেন?”
-“স্যার এটাতো ওনাদের পার্সোনাল ব্যাপার।আমি কি বলবো!! এমনি দেখে তো কিছু মনে হইনি সেরকম কখনো বাইরে থেকে।”
-“আচ্ছা, ধন্যবাদ।দরকার হলে আবার যোগাযোগ করবো।আপনার ফোন নম্বর আর ঠিকানাটা দিয়ে দিন।”
নিলাংশু বাবু চোখের ইশারায় ডেকে অভিজিৎ বাবুকে বললেন -“কোনো কথা হলো?”
-“না স্যার, তীর্থবাবুর সাথে সেরকম কোনো কথা হইনি। সাডেন ডেথ তো।সবাই খুব ভেঙ্গে পড়েছেন।”
-“সেটা ঠিক অভিজিৎ,এই অবস্থায় জিজ্ঞাসাবাদটা ঠিক হবেনা।তাও একবার এই পার্থবাবুর সাথে দেখাটা করেই যাই।”
এরপর নিলাংশু বাবু এগিয়ে গেলেন পার্থ বাবুর দিকে -“নমস্কার পার্থবাবু।আমি S.P নিলাংশু মিশ্র।কিছু প্রশ্ন করার ছিল।”
-“স্যার,আমাকে কেন?মানে আমিতো..”
-“আরে নানা ঘাবড়াবেন না।এমনি ক্যাজুয়াল রুটিন ওয়ার্ক।জানি প্রশ্ন উত্তরের সময় নয়,কিন্তু আমাদেরও তো চাকরি বলুন।”
-“আচ্ছা বলুন।”
-“মিস রোমা বললেন আপনি দেবনাথ বাবুর সাথেই কাজ করেন।কি কাজ করেন আপনি?”
-“আমি ওনার কাছে ইন্টার্নশিপ করছি বিগত ২ বছর ধরে।”
-“দেবনাথ বাবুর মৃত্যুর ব্যাপারে কি জানেন?”
-“কাল দুপুরে কাজের দরকারে যখন ফোন করি, ম্যামের কাছে শুনি স্যারের শরীর ভালো নেই।সন্ধ্যেবেলায় যখন দেখা করতে আসি, তখন ভালোই ছিলেন।বললেন মাথাটা একটু ঝিমঝিম করছে,ক্লান্ত লাগছে।তার আগের রাতে আসলে পার্টি ছিলো,তাই সবাই ভাবলাম ওই কারণেই হয়তো…”
-“কিসের পার্টি?”অভিজিৎ বাবু আটকালেন পার্থবাবুকে।
-“আমাদের শেষ কেসের সাকসেস পার্টি ছিলো স্যার।”
-“কে কে এসছিলেন পার্টিতে?”
-“অনেকেই।সমস্ত কলিগরা,জজ সাহেব,ইন্সপেক্টর বাগলে।”
-“আচ্ছা,তারপর?”
-“হ্যাঁ,তারপর আমি সন্ধ্যে বেলায় এসে স্যারের সাথে দেখা করে গেলাম।স্যার বললেন ঠিক আছি।তারপর আজ সকালে খবরটা শুনে আমি একদম বিশ্বাস করতে পারিনি।”
-“আচ্ছা।আপনার কি মনে হয় এটা স্বাভাবিক মৃত্যু নাকি খুন?”অনির্বাণ পিছন থেকে জিজ্ঞাসা করলো।
-“স্যার আমার কি মনে হবে!!!মানে আমি…”
-“আচ্ছা দেবনাথ বাবুর কারো সাথে কোনো শত্রুতা বা ঝামেলা?”
-“স্যার এসব লাইনে ঝামেলা তো অনেকের সাথেই থাকে।আর স্যারের মত নামকরা লোকজনদের তো আরো বেশি।”
-“আচ্ছা,ধন্যবাদ।দরকার হলে আবার যোগাযোগ করবো।আপনার ফোন নম্বর আর ঠিকানাটা দিয়ে দিন।আর হুমম কেসের তদন্ত শেষ না হওয়া অব্দি শহর ছাড়বেন না।”
ঘর থেকে বেরিয়ে নিলাংশু বাবু বললেন -“রতন বডিটা ফরেন্সিকে পাঠিয়ে দাও।
কাল এসে আবার তীর্থবাবু আর অনুসুয়া দেবীর সাথে কথা বলতে হবে, বুঝলে অভিজিৎ।ততক্ষণে একটা কাজ করো আরতি আর অনির্বাণ তোমরা, কললিস্ট চেক করো বাড়ির সবার।দেখো কিছু চোখে পড়ে কিনা।
এবার চলো এক কাপ চা খেতেই হবে, আমারই মাথা ঝিমঝিম করছে এবার।”

(ক্রমশঃ)

গল্পের বিষয়:
রহস্য
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত