ফ্রেডা ওয়ারিংটন : রিটার্ন অব ড্রাকুলা

ফ্রেডা ওয়ারিংটন : রিটার্ন অব ড্রাকুলা

জোনাথন হার্কারের ডায়েরী
।। ২২ শে জুন।।
হঠাৎ ট্রানসিলভানিয়া যাবার প্রস্তাব দিলেন ভ্যান হেলসিং। সেটা শোনামাত্র আমি এমন এক ধাক্কা খেলাম যে সোজা স্টাডিরুমে চলে আসতে হল। দরজা আটকে দিয়ে কিছুক্ষণ চেষ্টা করলাম নিজেকে সামলাতে। ডায়েরী খুলে বসলাম মনের অবস্থা লিখে রাখতে।
প্রায় সাত বছর পেরিয়ে গেছে ভয়ঙ্কর সেই অভিজ্ঞতার পর। কাউন্ট ড্রাকুলা নামের সেই অভিশাপকে ধ্বংস করার পর সাত সাতটা বছর কোথা দিয়ে যেন কেটে গেছে। কিন্তু এখনও সেই ভয়াবহ স্মৃতির হাত থেকে রক্ষা পাইনি আমরা কেউ। অন্তত প্রফেসর ভ্যান হেলসিংয়ের এমনটাই মত। সে কারণেই আমরা নাকি এখনও মানসিক ভাবে সুস্থ হতে পারিনি। ফের ট্রানসিলভানিয়া গেলে নাকি এই অস্থিরতা দূর হতে পারে বলে তিনি মনে করেন। কারণ? তিনি মনে করেন এসব আমাদের মনের কারসাজি। দুঃসহ স্মৃতিকে যতই চাপা দেয়া হোক না কেন, কখনো কখনো তা আবার জেগে উঠতে পারে। ভয়ঙ্কর ওই পিশাচ যে সত্যি সত্যিই ধ্বংস হয়ে গেছে তা এখনো কেন জানি পুরোপুরি মেনে নিতে পারিনি আমি, সেজন্যই বোধহয় এত বছর পরেও হঠাৎ ইদানীং আবার দুঃস্বপ্ন দেখতে শুরু করেছি আমি। তাই এই সমস্যার এক সমাধান দিয়েছেন প্রফেসর হেলসিং…..ফিরে যেতে হবে সেই দুঃস্বপ্নের উৎপত্তিস্থলে….মানে ট্রানসিলভ্যানিয়া।
প্রফেসর হেলসিং এর মতে দুটো উপকার হবে এতে….প্রথমত, আমরা নিশ্চিত হতে পারব যে ড্রাকুলার অভিশাপ থেকে সত্যি সত্যিই মুক্তি পেয়েছে পৃথিবী ; দ্বিতীয়ত, ওখানে গিয়ে খ্রীষ্টধর্মানুসারে একটা শাস্ত্রীয় আচার অনুষ্ঠান করা হবে, জায়গা পবিত্র করতে। তাতে মনেও শান্তি আসবে।
স্টাডিরুমে একাকী বসে বাইরের দিকে তাকালাম আমি। জানলার ঠিক ওপরে ফুটে আছে টকটকে লাল গোলাপের সারি, যেন নীরবে সাক্ষী দিচ্ছে আমার আর মীনার সুখী দাম্পত্য জীবনের। বাস্কেটারে ফিরে ঘর বেঁধেছি আমরা, প্রয়াত মিঃ হকিন্সের বাড়িতে….তাঁরই শেষ ইচ্ছানুসারে। ফুটফুটে এক পুত্র এসেছে আমাদের কোল জুড়ে…তাকে নিয়ে জীবনটা নির্বিঘ্নে আনন্দের মধ্যেই কাটাচ্ছি। তারপরও কেন জানি মন থেকে পুরোপুরি দূর করতে পারছি না ড্রাকুলার অশুভ স্মৃতি। হ্যাঁ, সত্যি বলতে কি, ড্রাকুলার ক্যাসলের সেই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার পর পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে পারিনি আমি কখনওই। হ্যাঁ, সাত বছর আগেকার সেই অভিযান থেকে প্রাণ নিয়ে ফিরেছিলাম আমরা পাঁচজন। মানে আমি, মীনা, আর্থার, ডাঃ সিউয়ার্ড আর প্রফেসর হেলসিং নিজে। ড্রাকুলা শেষ হবার পর সুখেই কাটছে জীবন….যুক্তির বিচারে কঠিন সেই অতীতও ঢাকা পড়ে গেছে সময়ের অতলে। কিন্তু ইদানীং গত কয়েক মাসে কি যেন হয়েছে আমার…. বেশ ক’বার দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে উঠছি রাতে। শরীর ভিজে গেছে ঘামে, কেঁপেছি হিস্টিরিয়াগ্রস্তের মতো। চোখ বুজলেই দেখছি বীভৎস সব দৃশ্য।
স্বীকার করতে দোষ নেই, ফের সেখানে যেতে চাইছি না আমি। যাবার কথা ভাবলেই আতঙ্কে হিম হয়ে আসছে হাত – পা। কিন্তু ভ্যান হেলসিংয়ের যুক্তি বেশ প্রভাব ফেলেছে মীনার ওপর। রাজি হয়ে গেছে ও। যদিও তাতে আমাদের ছেলে ক্যুয়েন্সি বেশ কিছুদিনের জন্য একা হয়ে যাবে। মীনা যদি ব্যাপারটা এত গুরুত্ব দেয় তা হলে আমারও আপত্তি করা চলে না।
কিন্তু কি আর করা, ইচ্ছের বিরুদ্ধে মেনে নিতে হচ্ছে সিদ্ধান্ত। যাব আমরা, মুখোমুখি হব নিজের আতঙ্কের। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা, যেন শক্ত রাখতে পারি নিজেকে।
১৪ ই জুলাই, বুদাপেস্ট থেকে মীনা তার পুত্র কুইন্সি’কে লেখা একটা চিঠি ছাড়ল।

প্রিয় কুইন্সি,
আমার গতকালের চিঠিটা কি পেয়েছ? ভিয়েনায় ট্রেনে চড়বার আগে লিখেছিলাম চিঠিটা। এখন আমরা বুদাপেস্টে পৌঁছেছি। বড়ই সুন্দর এক শহর, মাঝখান দিয়ে বইছে দানিয়ুব নদী। মানচিত্রে দেখিয়েছিলাম ওটা তোমায়, মনে পড়ে? তোমার বাবা আর আমি আজ বিকেলে ঘুরতে বেড়িয়েছিলাম, চমৎকার সব বাড়িঘর আর নানারকম ফোয়ারা দেখেছি। এসব পড়ে মন খারাপ কোরো না, যখন বড় হবে, তখন তোমায় নিয়েও আমরা বেড়াতে আসব এখানে। কথা দিলাম।
ট্রানসিলভানিয়ার পাহাড়ি এলাকায় যাবার আগে দু’দিন এখানে থাকব আমরা। ওদিককার কাজ শেষ হয়ে গেলেই আমরা ফিরে আসব বাড়িতে। কিচ্ছু ভেবো না। তোমাকে দেখার জন্য মন আনচান করছে।
আশা করি ঠিকমতো খাওয়া দাওয়া করছ। ঘরে আবদ্ধ হয়ে থেকো না। বাইরে অবশ্যই খেলতে যাবে। আগামীকাল আবার চিঠি লিখব। ভালবাসা নিও।
ইতি,
তোমার মা।
 

।। মীনা’র ডায়েরি।।
১৮ ই জুলাই
খুব অদ্ভুত লাগছে সাত বছরের সেই পুরনো পদচিহ্ন অনুসরণ করতে। বার বার মনে পড়ে যাচ্ছে সেসব স্মৃতি, যেন এই সেদিন ঘটেছে ঘটনাগুলো। এই অনুভূতি ভাগাভাগি করেছি আমরা সবাই মিলে – প্রফেসর আব্রাহাম ভ্যান হেলসিং, ডাঃ সিউয়ার্ড, আর্থার, জোনাথন আর আমি। নেই শুধু আমাদের আরেক সঙ্গী সেই সাহসী ক্যুইন্সি মরিস, অভিযান চলাকালীনই এক বেদের ছুরিকাঘাতে তার মৃত্যু হয়। তার স্মৃতির প্রতি সন্মান জানিয়েই আমি আর জোনাথন ছেলের নাম রেখেছি ক্যুইন্সি।
যা হোক, এবার আমরা ঘুরে বেড়াবার সুযোগ পাচ্ছি। সুন্দর শহর বুদাপেস্ট….. গোথিক, বারোক এবং ক্লাসিকাল নির্মাণশৈলীর মিশেল। যেদিকেই তাকাই….ফোয়ারা, ঝর্না এবং উষ্ণ প্রস্রবণের প্রবাহ। দু’রাত থাকব এখানে, থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে ভ্যান হেলসিংয়ের পুরনো এক বন্ধুর বাড়িতে। আন্দ্রে কোভাক্স তাঁর নাম, স্থানীয় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। তাঁর বাড়িতে থাকতে মন্দ লাগছে না; যাত্রাবিরতির প্রয়োজন আছে নিঃসন্দেহে। তবু কেন জানি মনে হচ্ছে, সরাসরি ট্রানসিলভানিয়া চলে গেলে ভাল হতো। সেক্ষেত্রে এই অভিযান দ্রুত শেষ করে বাড়ি ফিরতে পারতাম তাড়াতাড়ি।
আন্দ্রে কোভাক্সের বাড়ির একটা চমৎকার কামরায় বসে আছি এখন আমি, জানলা দিয়ে চোখে পড়ছে দানিয়ুব নদীর অপূর্ব দৃশ্য। বাড়ির মালিক আন্দ্রে কোভাক্স চিরকুমার, বিয়ে শাদী করেননি। বেশ লম্বা এবং প্রাণচঞ্চল, অত্যন্ত বুদ্ধিমান। স্বভাবেও খুব নরম এবং বিনয়ী। তিনি ছাড়াও আরও দু’জন থাকে এই বাড়িতে। প্রফেসরের বিপত্নীক ভাই এমিল এবং এমিলের মেয়ে ইলিনা।
এমিলকে কেন জানি ভাল লাগেনি আমার। আন্দ্রে কোভাক্সের ভাই হলেও চেহারায় বিরক্তির ছাপ সুস্পষ্ট। যদিও আমাদের সঙ্গে ওপর ওপর ভদ্রতা বজায় রেখে চলছে। শুনেছি সে একজন আর্টিস্ট। আর্টিস্টরা একটু অন্য টাইপের মানুষ হয়, এটাও বোধহয় তেমন কোনও ব্যাপার। তবে ইলিনা চমৎকার মেয়ে। আঠারো বছর বয়স মেয়েটার….শান্তশিষ্ট, নিজেকে নিয়ে থাকে।
আমরা ছাড়াও আরও একজন অতিথি এসে উঠেছে বাড়িতে…মিকলোস, প্রফেসর কোভাক্সের ছাত্র। ইলিনার ব্যাপারে খুব উৎসাহী, বোধহয় ওর প্রেমে ট্রেমে পড়েছে, বিয়ে করতে চায়। প্রফেসর কোভাক্স’ও ওকে বেশ স্নেহ করেন।
কি কারণে ট্রানসিলভ্যানিয়া চলেছি আমরা, তা জানানো হয়নি কাউকে।ভ্যান হেলসিং সবাইকে বলেছেন, বেড়াতে যাচ্ছি আমরা। সত্য গোপন রাখা পছন্দ নয় আমার তাই চাইছি এখানে বেশী সময় না কাটিয়ে তাড়াতাড়ি রওনা হয়ে যেতে।
সেদিন রাতে ডিনারের সময় হঠাৎ অপ্রত্যাশিতভাবে আমাদের সঙ্গে ট্রানসিলভ্যানিয়া যাবার ইচ্ছা প্রকাশ করল এমিল। ওর ইচ্ছে, ওখানকার প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলীর ছবি আঁকবে। ওর মেয়ে ইলিনাও নাকি সঙ্গে যেতে আগ্রহী। কথাটা শুনে ঠাট্টা করলেন প্রফেসর কোভাক্স। বললেন, ” দুনিয়া দেখি উলটোপথে চলছে। ট্রানসিলভ্যানিয়ার চাষাভুষো মানুষগুলো বুদাপেস্টে আসছে কাজের খোঁজে….আর এখানকার লোক ওখানে যাচ্ছে ছবি আঁকতে”।
হাসলেন ভ্যান হেলসিং। বললেন, ” ভালই তো। জনসংখ্যার ভারসাম্য রক্ষা হবে এতে”।
এমিল জানাল, ওখানকার যেকেলি গোত্রের এক কৃষক পরিবারকে চেনে সে। ছবি আঁকতে গিয়ে আগেও দুটো গ্রীষ্ম কাটিয়েছে ওদের খামারে। খামারটা নাকি বিসত্রিস আর বারগো গিরিপথের কাছে।
ভ্যান হেলসিং উচ্ছ্বসিত গলায় বললেন, ” আরে! আমরা তো ওখানেই যাচ্ছি! বারগো গিরিপথ পেরিয়ে কার্পেথিয়ান পর্বতমালার ভেতরটা দেখবার ইচ্ছে আমাদের!”
সঙ্গে সঙ্গে এমিল বলল, ” তাহলে তো আমরাও আপনাদের সঙ্গে যেতে পারি! মানে….যদি আপনাদের আপত্তি না থাকে আর কি। আমাদেরকে সঙ্গে নিলে আপনাদেরও সুবিধা হবে। খামারে আপনাদের থাকার ব্যবস্থা করে দেব আমি। হোটেল বা সরাইখানার চেয়ে খরচ অনেক কম পড়বে।”
” চমৎকার প্রস্তাব! ” বললেন ভ্যান হেলসিং, ” আমি আপত্তির কিছু দেখছি না।”
” এতজন একসঙ্গে থাকলে ওই কৃষকের আবার অসুবিধা হবে না তো?”জিজ্ঞেস করলাম আমি।
” না, না, সমস্যা কিসের?” বলল এমিল, ” বেশী মানুষ মানে বেশী আয়। তাছাড়া অতিথিপরায়ণতার জন্য সুনাম আছে ট্রানসিলভ্যানিয়ার অধিবাসীদের। আমাদের পেলে খুশীই হবে”।
” তাহলে আমার আপত্তি নেই”, ওর কথা শুনে বললাম আমি, ” এমনিতেও অবশ্য বেশীদিন থাকব না আমরা। বড়জোর দু-তিন রাত”।
ওই কথাই রইল। আমাদের সঙ্গে যাবে এমিল আর ইলিনা। ফেরার সময় অবশ্য একা ফিরতে হবে আমাদের। দু তিনদিনে কাজ শেষ করতে পারবে না এমিল, কাজেই মেয়েকে নিয়ে রয়ে যাবে সে।
বাড়ি ফেরার প্রসঙ্গ ওঠায় কুইন্সির কথা মনে পড়ে গেল। খুব মিস করছি ওকে। ডায়েরী লেখা থামাই, ঘুমোতে যাবার আগে কুইন্সি’কে চিঠি লিখতে হবে। জোনাথন ডাকছে আমায়। ভ্যান হেলসিংকে প্রফেসর আন্দ্রে কোভাক্সের সঙ্গে লাইব্রেরীতে যেতে দেখেছি, বোধহয় রাত জেগে গল্প করবেন। দুজনেই জ্ঞানী, আলাপচারীতার জন্য বিষয়ের অভাব হবে না, গল্প শুরু করলে ঘন্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দেবেন অনায়াসে। তার ওপর প্রফেসর কোভাক্স একজন ইতিহাসবিদ এবং লোককাহিনী বিশেষজ্ঞ। ভ্যান হেলসিং’ও পেটে কোনও কথা চেপে রাখতে পারেন না….কাউন্ট ড্রাকুলাকে নিয়ে আমাদের অভিজ্ঞতার কথা যদি প্রফেসর কোভাক্সকে বলে দেন, অবাক হব না।

মীনার ডায়েরী
২১ শে জুলাই
বিসত্রিসে যাওয়ার পথে ট্রেনে বসে লিখছি। জানলা দিয়ে চোখে পড়ছে অপূর্ব প্রাকৃতিক দৃশ্য, সেইসঙ্গেমনে হচ্ছে যেন বড় আস্তে চলছে ট্রেনটা। ক্লাউসেনবার্গে কাটিয়েছি গত রাতটা, উঠেছিলাম পুরনো এক হোটেলে। সে এক গা ছমছমে জায়গা,
দিনের বেলাতেও কেমন অন্ধকার অন্ধকার। পুরনো আমলের গম্বুজ আর খিলানওয়ালা ভবন, সামনের
আঙিনায় আগাছার জঙ্গল। সিঁড়িটা লোহার…জং ধরা, প্যাঁচানো। কামরাগুলো পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন
হলেও খুব ছোট ছোট। জোনাথন বলল, আগেরবার ও
যে হোটেলে উঠেছিল সেটা এর চেয়ে অনেক ভাল ছিল।
ইচ্ছে করেই ওখানে উঠিনি আমরা, যাতে কেউ
জোনাথনকে চিনতে না পারে। এখানকার লোকেরা
দয়ালু আর অমায়িক হলেও খুব কুসংস্কারাচ্ছন্ন।
আমাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য টের পেলে নির্ঘাত
থামাবার চেষ্টা করত…অযথা ঝামেলায় জড়াইনি।
হোটেলে একটা অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হয়েছে, সেটা লিখে
রাখা দরকার। আমরা যখন হোটেলের আগাছায় ভরা
আঙিনা পেরিয়ে মূল ভবনের দিকে যাচ্ছিলাম, তখন
নজরে পড়ল, হোটেলের দোতলার বারান্দায় একজন
জিপসি মহিলা দাঁড়িয়ে আছে। ছোটখাটো দেহ, গায়ে
ময়লা পোশাক, মাথায় রুক্ষ চুলের জটা। আমার দিকে
কুতকুতে চোখে তাকিয়েছিল, ওর দিকে মুখ তুলতেই সে
তার একটা হাত উঁচু করে রোমানিয়ান ভাষায় কি যেন
বলল। ঠিকমতো বুঝতে পারিনি কথাটা, মনে হলো,
যেন বলল, ” ওর রক্ত আর তোমার রক্ত….” এই
জাতীয় কিছু একটা। মহিলার হাবভাব দেখে গায়ে কাঁটা
দিয়ে উঠল আমার। জোনাথনকে ডেকে দেখাতে
চাইলাম, কিন্তু দ্বিতীয় বার মুখ তুলে সেদিকে
তাকাতেই দেখি গায়েব হয়ে গেছে জিপসিটা। ও কি
সত্যিই কোন মানুষ ছিল, নাকি আত্মা….কে জানে।
ভয়ে অন্তরাত্মা শুকিয়ে গিয়েছিল আমার। হোটেল
ছাড়তে পেরে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছি।
ইলিনার সঙ্গে যাত্রাপথে খুব একটা কথা হয়নি।
লাজুক স্বভাবের মেয়ে, এখনো পুরোপুরি খোলামেলা
হতে পারেনি আমার সঙ্গে। চমৎকার ইংরেজি বলে,
জার্মান ভাষার জ্ঞান তো আমার চেয়ে ভালই আর
হাঙ্গেরিয়ান ভাষাতেও বেশ দক্ষতা আছে….আমি
যার প্রায় কিছুই জানি না। কাজেই আমার প্রতি ওর
অনুরাগ সৃষ্টি হবার কোনও সম্ভাবনাই দেখছি না।
একবারই শুধু আমার ডায়েরী লেখার ব্যাপারে শুধু
কৌতূহল দেখিয়েছিল। আমার ডায়েরী লেখার অভ্যাস
দেখে খুব একটা মুগ্ধ হয়েছে বলে মনে হলো না।
উঁচুনিচু পাহাড়ি পথে ছুটে চলেছে ট্রেন। কোথাও দেখা
যায় মন জুড়ানো সবুজ বনানী, কোথাও বা বরফের
চাদরে ঢেকে আছে সবকিছু, সবুজ গালিচার মতো খেত
খামার, ছবির মতো সুন্দর গ্রাম। আকাশে যেন কেউ
নীল-সাদা রঙের পোঁচ দিয়ে দিয়েছে। এতসব চমৎকার
দৃশ্য, অথচ গতবার কিছুই লক্ষ্য করিনি। চেনা পথ
হয়েও এবার সবকিছুই কেমন নতুন মনে হচ্ছে চোখে।
বুঝলাম ট্রানসিলভ্যানিয়ার যে ভয়াল রূপ মনের
ভেতর গেঁথে আছে এখনো, এবার যেন তা দূর করতে
পারব। জোনাথনকেও বেশ শান্ত দেখাচ্ছে। মাঝেমাঝে
অবশ্য একটা গাঢ় ছায়া দেখতে পাচ্ছি ওর মুখে।
আমাদের মধ্যে ওর অভিজ্ঞতাই সবচেয়ে ভয়াবহ।
নিশ্চয়ই মনে পড়ে যাচ্ছে ওর সেসব। জোনাথনের
সঙ্গে কিছুটা মিল দেখা যাচ্ছে ডাঃ সিউয়ার্ডের
আচরণেও। শুধু ভ্যান হেলসিংএর মেজাজই প্রফুল্ল
মনে হচ্ছে- বার বার মনে করিয়ে দিচ্ছেন, অতীতের
অবসান ঘটেছে, জয়ী হয়েছি আমরা…..কাজেই
দুশ্চিন্তা ভুলে গিয়ে ভ্রমণটাকে হালকা মেজাজে
উপভোগ করা উচিত সবার।
এতকিছুর পরেও বলতে দ্বিধা নেই, ড্রাকুলার
ক্যাসলের যত নিকটবর্তী হচ্ছি, ততই নার্ভাস হয়ে
পড়ছি আমি, এর সঙ্গে অনুভব করছি খানিকটা
উত্তেজনা। বিপদ আপদ হবার কোনও সম্ভাবনা
নেই, এই উপলব্ধিই হয়তো সৃষ্টি করছে এই
উত্তেজনার। বুঝতে পারছি, হাসিখুশি থাকতে হবে
আমায়। জোনাথন যে কিছুতেই স্বাভাবিক হতে পারবে
না, তা আমি জানি। কাজেই আমাকেই দায়িত্ব নিতে
হবে ওকে চিন্তামুক্ত রাখার।
বিসত্রিসে পৌঁছে গিয়েছি প্রায়। এখানে একটা
হোটেলে খাওয়া দাওয়া সেরে তারপর একটা ঘোড়ার
গাড়ি ভাড়া করে যাওয়া হবে পার্বত্য এলাকার
খামার বাড়িটায়। আপাতত এটাই আমাদের
পরিকল্পনা। দু’দিনের ভেতর কাজ সেরে যত
তাড়াতাড়ি সম্ভব ফেরার পথ ধরার ইচ্ছে আছে
আমাদের।
২১ শে জুলাই
আজ আমরা বিসত্রিস থেকে খামারবাড়িতে এসে
পৌঁছেছি। ঘোড়ার গাড়িতে আলাদা কোনও কোচোয়ান
নেয়া হয়নি; জোনাথন, ডাঃ সিউয়ার্ড, আর আর্থার
পালা করে চালিয়ে নিয়ে এসেছেন আমাদের ক্যারিজটা।
পাহাড়ি পথ ধরে দীর্ঘ যাত্রা প্রায় নির্বিঘ্নে
কেটেছে। যাত্রাপথের দৃশ্য অবশ্য গতকালের মতোই
সুন্দর ছিল। বেশ কিছু গ্রাম পেরিয়ে এলাম আমরা,
সবগুলোই বলতে গেলে একরকম। কাঠ বা ইঁটের তৈরি
একতলা বাড়ির সারি, সামনে বেড়া দিয়ে ঘেরা ছোট্ট
উঠোন, উঠোনে খড়ের গাদা, চারপাশে ফলের
গাছ….কৃষকের বাড়ি যেমন হয় আর কি।
খামারবাড়িটার অবস্থান গ্রামের একেবারে
শেষপ্রান্তে- বাড়িটাকে ঘিরে থাকা বার্চগাছের
সারির জন্য দূর থেকে দেখা যায় না। গাছগাছালিতে
ঘেরা চমৎকার এক জায়গা, পেছনে মাথা তুলে রয়েছে
সুউচ্চ কার্পেথিয়ান পর্বতমালা। আমাদের
ক্যারিজটা বিশাল খামারবাড়িটার ধনুকাকৃতির
ফটকের সামনে দাঁড়াতেই বেশকিছু নারী পুরুষ এগিয়ে
এল আমাদের অভ্যর্থনা জানাতে। মহিলাদের গায়ে
অ্যাপ্রন, স্কার্ট আর ভেড়ার চামড়ার কোট।
পুরুষদের পরনে ঘরে সেলাই করা সুতির প্যান্ট,
টিউনিক, খড়ের টুপি আর চামড়ার বুট।
খামারবাড়িটা বেশ সুন্দর – আগাগোড়া কাঠের তৈরি।
থাম আর খিলানগুলোয় সুন্দর নকশা করা।
ওপরতলায় খোলামেলা ব্যালকনি, নিচের উঠোন জুড়ে
নানারকম খোঁয়াড়। কি নেই ওতে! শুকোর, ভেড়া, হাঁস
মুরগী…. সবই পোষা হচ্ছে খামারে। গন্ধে দম আটকে
আসার যোগাড়। এই খোঁয়াড়ের জন্যই নষ্ট হচ্ছে
খামারবাড়ির সৌন্দর্য।
খামারবাড়ির পেছনে চোখে পড়ল ফসলি খেত আর
ফলের বাগান। ওগুলো গিয়ে মিশেছে গাছপালা আর
ঝোপঝাড়ে ছাওয়া এক পাহাড়ি ঢালে। এমিল জানাল,
পাহাড়ের ওই জঙ্গলটায় নাকি প্রচুর নেকড়ে বাস
করে। শুনে বুক ঢিবঢিব করে উঠল – বুঝতে পারলাম,
গন্তব্যের কত কাছে পৌঁছে গেছি আমরা।
খামারের মালিক আর তার স্ত্রী ‘র সঙ্গে পরিচয়
হলো আমাদের। দুজনেই খুব অমায়িক। ভাঙা ভাঙা
জার্মান ভাষায় স্বাগত জানাল আমাদের। বিশেষ
করে এমিল আর তার মেয়ে ইলিনাকে দেখে এত খুশী
হলো, মনে হলো যেন ওরা তাদের পরিবারেরই একজন।
ওদের হাবভাবে মনে হলো, যেন দু-রাতের বদলে
আমরা এখানে পুরো গ্রীষ্মকালটা কাটিয়ে গেলেই যেন
ওরা বেশী খুশি হবে।
জানতে পারলাম সাত সন্তানের জনক -জননী এরা।
তিনটি মেয়ে আর চারটি ছেলে। মা – বাবার মতো
তারাও প্রত্যেকে সহজ সরল আর কুসংস্কারাচ্ছন্ন।
এমিলকে দেখলাম, এদের মাঝে এসে সে খুব
প্রাণচঞ্চল হয়ে উঠেছে, অথচ বুদাপেস্টে এমনটা ছিল
না মোটেও। তবে ইলিনা তার ব্যতিক্রম। ওর
চোখেমুখে স্পষ্টত অস্বস্তির ছাপ। শহুরে মেয়ে,
এসব গেঁয়ো লোকজন হয়তো পছন্দ করছে না
মোটেও।
ভাল একটা কামরা পেলাম আমি আর জোনাথন।
পরিচ্ছন্ন, প্রচুর খোলামেলা, আলো বাতাসযুক্ত
একটা ঘর। জানলা দিয়ে দেখা যাচ্ছে আপেল আর চেরি
ফলের বাগান, সেইসঙ্গে সবুজ প্রান্তর। শোনা
যাচ্ছে পাখির কলকাকলি। রাতে বেশ জম্পেশ
ডিনারের আয়োজন করেছিল খামার মালিক। আমরাও
পেট পুরে খেয়েছি। ঘুমিয়ে পড়েছে জোনাথন, কিন্তু ঘুম
আসছে না আমার। ডায়েরী খুলে বসেছি দিনলিপি
লিখতে।
।। ২৩ শে জুলাই।।
যাক, শেষ হয়েছে আমাদের অভিযান। দিনটাও কেটেছে
ভাল। বেশ ভোরেই ক্যারিজ নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম
আমরা। স্থানীয় অধিবাসীদের কুসংস্কার সম্পর্কে
জানা আছে আমাদের, তাই খামারের লোকজনকে
জানাইনি কোথায় যাচ্ছি আমরা। ভোরের ফুরফুরে
হাওয়া মেখে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। ততক্ষণে
সূর্যও উঠে গেছে। নবোদিত সূর্যের আলোয় সেজেছে
প্রকৃতি। দেখে বিশ্বাস করা কঠিন এই সুন্দর
জায়গায় কোনোকালে মূর্তিমান অমঙ্গল রাজত্ব
করত।
উপত্যকা থেকে বেরোবার পর বদলাতে শুরু করল
দুপাশের দৃশ্য। নেমে এল নীরবতা। কার্পেথিয়ান
পর্বতমালার পাদদেশের ছায়ায় ঢাকা বনের ভেতর
দিয়ে এঁকেবেঁকে হেলে দুলে এগিয়ে গিয়েছে কাঁচা রাস্তা।
যেদিকেই তাকানো যায়, চোখে পড়ে পাহাড়ের রাজকীয়
চূড়া। গিরিখাত দেখতে পেলাম আমরা….পেরোলাম
নুড়িপাথরে ভরা অগভীর স্রোতস্বিনী, বোরগো
গিরিপথ ধরে এগিয়ে চললাম পার্বত্য এলাকার
গভীরে।
বলতে দ্বিধা নেই, ধীরেধীরে এক অজানা ভয় ছেঁকে
ধরল আমায়। আমার হাত ধরে রেখেছিল জোনাথন,
কিন্তু ওর দৃষ্টি আটকে ছিল বাইরে। বুঝলাম পুরনো
স্মৃতি মনে পড়ে যাচ্ছে ওর। ব্যাপারটা নতুন নয়,
গত ক’দিন ধরেই লক্ষ্য করছি যাত্রার প্রতিটা
পর্যায়ে খুব উদাস হয়ে পড়ছে জোনাথন, আমারও
ধাপে ধাপে মনে পড়ে যাচ্ছিল পুরনো দিনগুলোর কথা।
ডাঃ সিউয়ার্ড যখন আর্থারের হাতে ঘোড়ার রাশ
ধরিয়ে দিয়ে ক্যারিজের ভেতর এসে বসলেন, তখন
জোনাথন তাঁকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠল, ” কেন
আবার আমরা খামোখা এসবের মধ্যে জড়াতে
যাচ্ছি?”
ওর কাঁধে হাত রেখে ভ্যান হেলসিং বললেন, ” সাহস
রাখো বন্ধু। তোমার মনের সমস্ত ভয় আর সন্দেহ
যে অমূলক, সেটা প্রমাণের জন্যই তো চলেছি
আমরা”।
গিরিখাতের সমতল অংশে পৌঁছলাম আমরা
অনেকক্ষণ পর। দু’পাশের পাহাড়ি দেয়াল তখন
অনেকটাই চেপে এসেছে গায়ের ওপর। হিম হিম হয়ে
উঠছে বাতাস- গ্রীষ্মকালীন পরিবেশ পেরিয়ে পাহাড়ি
এলাকার শীতল আবহাওয়ায় এসে পৌঁছেছি আমরা।
আকাশের সূর্যটাকেও কেমন ম্লান দেখাতে লাগল।
ড্রাকুলার ক্যাসল অভিমুখে পরিত্যক্ত পথ ধরে
ক্যারিজ ছোটালেন ডাঃ সিউয়ার্ড। ঘন ঘন চাবুকের
শব্দ শুনতে পেলাম। এবড়োখেবড়ো রাস্তায় ঝাঁকি
খেতে খেতে যেন উড়ে চলল আমাদের বাহন।
চারপাশের পরিবেশ আরও নীরব, আরও নিস্তব্ধ হয়ে
পড়ল। অজান্তেই গলায় ঝোলানো ক্রুশটার কাছে
উঠে এল আমার হাত।
ঢালু পথে ধীরেধীরে ওপরে উঠতে লাগল ক্যারিজ।
জানলা দিয়ে বাইরে তাকালাম – দেখলাম প্রাণহীন
বিরান প্রকৃতি – সাত বছরে কোনও পরিবর্তন
হয়নি। কয়েক ঘন্টা চলার পর আমরা পৌঁছলাম
পরিত্যক্ত সেই এলাকার প্রাণকেন্দ্রে। শুনতে
পেলাম পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা ঝর্নার কুলুকুলু
ধ্বনি।
হঠাৎ কোথা থেকে একটা ভয়ঙ্কর গর্জন ভেসে এল।
সচকিত হয়ে উঠলাম আমরা। কিসের ডাক ওটা?
কোনও বুনো কুকুরের….. না কি কোনও হিংস্র
নেকড়ের?

দূর্গ দেখা যেতেই রাশ টেনে ক্যারিজ থামালেন ডাঃ
সিউয়ার্ড। নেমে পড়লাম আমরা। ঘোড়াগুলোকে গাছের
সঙ্গে ভাল করে বেঁধে তারপর পায়ে হেঁটে এগোলাম
সবাই। আমাদের দৃষ্টি আটকে রইল দূর্গের ধূসর দেয়ালের ওপর।
মাথার ওপর তখন কালো মেঘ জমাট বাঁধতে শুরু করেছে।
গুড়গুড় শব্দে মেঘ ডেকে উঠল, বুক কেঁপে উঠল আমার।
শক্তকরে ধরলাম জোনাথনের হাত। ও-ও পাল্টা চাপ দিলআমার হাতে। অজানা এক ভয় লক্ষ্য করলাম ওর
চোখেমুখে।
ভ্যান হেলসিংকে ঘনঘন কপাল মুছতে দেখলাম। মুখে যা-ই বলুন, ভদ্রলোক যে ভেতরে ভেতরে ঠিকই বিচলিত হয়ে পড়েছেন, তা তাঁর মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। ওঁরও নিশ্চয়ই সেইসব পুরনো স্মৃতি মনে পড়ে যাচ্ছে। ড্রাকুলার সহচরী সেই তিন রক্তলোলুপ নারীর বুকে লৌহশলাকা গেঁথে তাদের হত্যা করেছিলেন তিনি-ই। নিবৃত্ত করেছিলেন তাদের পৈশাচিক প্রবৃত্তি। দৃশ্যটা আমি দেখিনি নিজের চোখে, কিন্তু এটুকু বুঝি…. সে অভিজ্ঞতা
কোনওভাবেই সুখকর হতে পারে না।
দূর্গ থেকে এক মাইল দূরে যেখানে কাউন্ট ড্রাকুলা তার
শেষ পরিণতির স্বীকার হয়েছিল, সেখানে পৌঁছে একটু
থামলাম আমরা। ঢালের গায়ে সেই উঁচু পাথরটা পরিষ্কার
চিনলাম – ওখানেই আশ্রয় নিয়েছিলাম আমি আর
প্রফেসর হেলসিং, কাউন্ট’কে নিয়ে দূর্গের পথে ফিরতে
থাকা জিপসিদের ওপর নজর রেখেছিলাম ওটার আড়াল থেকে। পুরো ঘটনাটা আজও চোখের সামনে ভাসে।
জিপসিদের ক্যারাভান থামানো হলো, ড্রাকুলার
কফিনের ডালা খোলা হলো, ঘুমন্ত পিশাচটার বুকে
লোহার গজাল ঢোকাল জোনাথন, ক্যুয়েন্সি মরিস গেঁথে
দিলেন একটা ধারাল ছুরি, মূহুর্তে ধূলোয় পরিণত হলো
জ্যান্ত লাশটা। চারপাশে তখন সোঁ সোঁ হাওয়া বইছে,
মেঘে মেঘে ঘর্ষণে চমকাচ্ছে বিদ্যুৎ। সে এক অদ্ভুত
পরিবেশ।
এসব ভাবতে ভাবতে অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম, হঠাৎ
জোনাথন বলে উঠল, ” দেখো! দেখো! ”
মুখ তুলতেই সূর্যের ওপর থেকে কালো মেঘটাকে সরে
যেতে দেখলাম। মেঘের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে এল সূর্যের
সোনালি কিরণ। সেই আলোয় আলোকিত হয়ে উঠল
ড্রাকুলার প্রাসাদ দূর্গ।
হেসে উঠলেন ভ্যান হেলসিং। জোনাথনের কাঁধে হাত
রেখে বললেন, ” এটা একটা সঙ্কেত। ড্রাকুলার অভিশাপ
থেকে মুক্ত হয়েছে পৃথিবী। ও আর কোনওদিনই ফিরবে না।
ঈশ্বরকে ধন্যবাদ “।
দূর্গের সামনে গিয়ে ধর্মীয় আচার পালন করলাম আমরা।
প্রার্থনাসঙ্গীত গাইলাম, ছিটোলাম পবিত্র পানি।
তারপর ফিরতি পথ ধরলাম। নিরাপদে ফিরে এলাম
খামারবাড়িতে।
আর কিছু লিখতে পাচ্ছি না। শরীর খুব ক্লান্ত। জোনাথন
তো ঘুমিয়েই পড়েছে। মনের অবস্থা ব্যাখ্যা করার সম্ভবত
কোনও প্রয়োজন নেই। শুধু এটুকু বলতে পারি, স্বস্তি অনুভব করছি।
।। ২৫ শে জুলাই, সন্ধ্যা।।
ট্রেনে চড়ে বুদাপেস্টে ফেরার পথে এখন ডায়েরী
লিখছি। এবারের ট্রানসিলভানিয়া ভ্রমণে সত্যিকার
ছুটির আনন্দ উপভোগ করেছি আমরা – মুক্ত, স্বাধীন,
বন্ধনহীন। ট্রানসিলভানিয়া ছেড়ে আসতে বরঞ্চ খারাপই
লাগছিল আমাদের। অশুভ আশঙ্কা দূরীভূত হওয়ায়
ওখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বড্ড ভাল লাগছিল
আমাদের, কেবলই মনে হচ্ছিল, আর ক’টা দিন এখানে
কাটিয়ে গেলে মন্দ হতো না।
গতকাল সন্ধ্যা আর আজ সকালে বেশ অনেকক্ষণ কথা
হয়েছে ইলিনার সঙ্গে। একসঙ্গে হাঁটতে বেরিয়েছিলাম
আমরা। গল্প করার ফাঁকে ও নিজের উচ্চশিক্ষা আর দেশ বিদেশ ভ্রমণের ইচ্ছের কথা জানাল আমায়। কিন্তু
নিরুপায়। বদমেজাজি, একগুঁয়ে বাপের কবলে পড়ে ওর
জীবন দূর্বিষহ হয়ে পড়েছে। ইলিনাকে দেখে মায়া হলো।
বেচারীর জন্য কিছু করার ইচ্ছা মনে মনে হলেও আমি
জানি আমি নিরুপায়। অন্যের মেয়ের ব্যাপারে নাক
গলাবার কোনও অধিকার আমার নেই। তাই বললাম, ”
এবারের গ্রীষ্মটা তো এই চমৎকার জায়গায় কাটাতে
পারছ, সেটাই বা কম কি? আমার পরামর্শ যদি শোনো তো বলি কি কাজে লাগাও এই সময়টা। বুদাপেস্টে ফেরার আগেই একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলো মিকোলাসের
ব্যাপারে। ছবিও আঁকতে পারো, তোমার বাবা খুশিই
হবেন তোমায় পেইন্টিং করতে দেখলে। তোমাদের
সম্পর্কটাও হয়তো সহজ হয়ে উঠবে তাতে।”
” কিন্তু আমি যে পেইন্টিং করতে পারি না, মাদাম
হার্কার”, বলল ইলিনা।
” সে কি!” বিস্মিত হলাম ওর কথায়, ” আমি তো ভেবেছি
তোমার বাবার মতো তুমিও একজন আর্টিস্ট। ”
” না, না”, মাথা নাড়ল ইলিনা, ” আমি স্রেফ বাবার
অ্যাসিস্ট্যান্ট। ইজেল, রঙ তুলি হাতের সামনে এগিয়ে
দেয়া, খিদে পেলে নাস্তা পরিবেশন করা – এসবই আমার
দায়িত্ব। উনি নিজেও চান না আমি পেইন্টিং করি।
তাছাড়া আমি নিজেও খুব একটা আগ্রহী নই এসব আঁকা টাঁকার ব্যাপারে।”” বেশ”, বললাম আমি, ” তা হলে আমি অন্তত ইংরেজিটা
আরও ভালভাবে শিখতে সাহায্য করব তোমায়।”
ফার্মহাউজে ফিরে আমি ইলিনাকে ‘ হাঙ্গেরিয়ান টু
ইংলিশ ‘ ডিকশনারিটা উপহার দিলাম। সেইসঙ্গে দিলাম
একটা নতুন খাতা, পেন আর এক দোয়াত কালি। সামান্য
এই উপহার পেয়েই আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়ল ইলিনা।
আবেগাপ্লুত গলায় বলল, ” ধন্যবাদ মাদাম, কথা দিচ্ছি, এই খাতায় আপনার মতোই ডায়েরী লিখব আমি। ভবিষ্যতেযদি কখনো দেখা হয়, পড়তেও দেব আপনাকে সেই
ডায়েরী। ”
মেয়েটার জন্য এটুকু করতে পেরেই ভাল লাগল আমার। তাসে যত সামান্যই হোক। অদ্ভুত এই এক মেয়ে ইলিনা। ওকেদেখে কেন জানি আমার বারবার বান্ধবী লুসি’র কথামনে পড়ে যাচ্ছিল, সাত বছর আগে যাকে চিরদিনের জন্য হারিয়েছি।
।। ৩০ শে জুলাই, এস্কেটার।।
অবশেষে বাড়ি পৌঁছেছি। আর পৌঁছন মাত্র জানতে
পারলাম, আমাদের অনুপস্থিতিতে ব্রঙ্কাইটিস হয়েছিল
আমাদের ছোট্ট ক্যুইন্সি’র। যদিও ডাঃ সিউয়ার্ড এবং
ভ্যান হেলসিং দুজনেই ওকে পরীক্ষা করে দেখে
বলেছেন, এখন সে সম্পূর্ণ সুস্থ। কোনও ভয় নেই। আমাদেরঅনুপস্থিতিতে ডাঃ সিউয়ার্ডের স্ত্রী মিসেস অ্যালিসসিউয়ার্ড যথাসাধ্য সেবাযত্ন করেছেন ক্যুইন্সির; তবু মনেমনে ক্ষুব্ধই হলাম, কেন তিনি চিঠিতে ক্যুইন্সি’র
অসুস্থতার কথা জানালেন না আমায়। যদিও জানি, চিঠি
পাঠালেও এর চেয়ে দ্রুত বাড়ি ফিরতে পারতাম না
আমরা।
যাই হোক, বাড়ি ফেরার পর আলমারি সিন্দুক ঘেঁটে পুরনো সমস্ত ডায়েরী, স্মৃতিকথা আর পত্রিকার কাটিং বের করেছি আমরা – একত্র করেছি ওগুলো। এবারের ভ্রমণের বৃত্তান্তও জোনাথন যোগ করবে ওগুলোর সঙ্গে। ফলে ড্রাকুলা সংক্রান্ত একটা পূর্ণাঙ্গ বিবরণ তৈরি হবে।
বলে রাখা ভাল, এরই মধ্যে ভ্যান হেলসিং স্বীকার
করেছেন, প্রফেসর আন্দ্রে কোভাসকে তিনি কাউন্ট
ড্রাকুলার ব্যাপারে সবকিছুই জানিয়েছেন।
হেলসিংয়ের কথায় ভ্রু কোঁচকাল জোনাথন। বলল, ”
কাজটা কি ঠিক করলেন? বাইরের কাউকে এসব
জানানো…… ”
” খামোখাই দুশ্চিন্তা করছ”, ওকে আশ্বস্ত করে বললেন
হেলসিং, ” শুনে খুশি হবে, তথাকথিত আধুনিক মানুষদের
মতো সঙ্কীর্ণমনা নয় আন্দ্রে কোভাক্স। পৃথিবীতে যে
ব্যাখ্যার অতীত কিছু ঘটনাও মাঝেমাঝে ঘটে, তা সে-ও
মানে। সে আমার প্রতিটা কথা বিশ্বাস করেছে ও
গোপনীয়তা বজায় রাখার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে।
তাছাড়া ইতিহাস আর মাইথোলজির ওপর ওর এমনিই ঝোঁক আছে, আমার কথা শোনার পর তা আরও বেড়েছে।
কার্পেথিয়ান এলাকা আর ড্রাকুলা ক্যাসলের ব্যাপারে
নানা গুজব সে বহুদিন ধরেই শুনে আসছে আর সেইসব
গুজবের পেছনে আসল রহস্য জানতে পেরে ও আমার কাছে রীতিমতো কৃতজ্ঞ হয়েছে”।
” তা হলে তো আর কিছুই বলার নেই”, শুকনো গলায়
প্রসঙ্গটার ইতি ঘটাল জোনাথন, ” আশা করি
ভেবেচিন্তেই যা করার করেছেন আপনি”।
খুব শিগগীরই ফিরে যাবেন আমাদের অতিথিরা। ডাঃ
সিউয়ার্ড আর আর্থার সস্ত্রীক ফিরে যাবেন লন্ডনে, আর
ভ্যান হেলসিং ফিরে যাবেন আমস্টারডামে। আমি আর
জোনাথনও ফিরে যাব আমাদের রোজকার স্বাভাবিক
জীবনে।
।। জোনাথন হার্কারের ডায়েরী।।
১০ ই অগস্ট।
গত সপ্তাহে ট্রানসিলভ্যানিয়া থেকে ফেরার পর
সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম – এবারের অভিযানের বিবরণটা
লিখে রাখব, সেটা রেখে দেব আমাদের ড্রাকুলা
সংক্রান্ত পুরনো নথিগুলোর সঙ্গে। কাজটা সম্পূর্ণ করতে
পেরে যেন মনে হচ্ছে কাঁধের ওপর থেকে বিরাট বোঝা
নেমে গেছে।
আমাদের বন্ধুরা সবাই চলে গেছেন, বাড়িটা খালি খালি
লাগছে। অদ্ভুত একটা ক্লান্তি আসছে মনের মধ্যে কিন্তু
কি জানি কেন মাঝেমাঝেই শিউরে শিউরে উঠছি।
একটা অজানা ভয় আমায় যেন গ্রাস করতে চাইছে। এই
ভয়ের উৎপত্তি হয়েছে এবারের ড্রাকুলা ক্যাসল
অভিযানে গিয়ে। কাউকে এখনো বলিনি…..কিন্তু
সেখানে গিয়ে কিছু একটা দেখেছি বা অনুভব করেছি।
পুরোটাই চোখের ভুল বা মনের কারসাজি হতে পারে, তাই কাউকে বলতে পাচ্ছি না কিছু। এমনকি ডায়েরীতেও
এখনো উল্লেখ করিনি……
ব্যাপারটা হলো কি, ড্রাকুলা ক্যাসলের কাছে পৌঁছনো
মাত্র একটা অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছিল আমার মধ্যে। সারাক্ষণ
মনে হচ্ছিল কেউ যেন নজর রাখছে আমাদের ওপর।
চোখের কোণে লম্বা একটা ছায়ার নড়াচড়াও লক্ষ্য
করেছি বেশ কয়েকবার, ঝট করে মাথা ঘুরিয়ে তাকিয়েও
কাউকে দেখতে পাইনি অবশ্য। চোখের ভুল হওয়াটাই
স্বাভাবিক, কারণ আমি ছাড়া আর কেউই এ জাতীয় কিছু
দেখেনি। তাই কাউকে এসব বলার প্রয়োজন মনে করিনি।
আমার সঙ্গীরা সবাই হালকা মেজাজ নিয়ে ফিরে
এসেছে, সবাই বলাবলি করছে, এই অভিযানটা নাকি
তাদের মনের যাবতীয় দ্বিধাদ্বন্দ্ব দূর করেছে কিন্তু কেন
জানি আমি ওদের সাথে একমত হতে পারছি না। কেবলই মনে হচ্ছে ট্রানসিলভ্যানিয়া ফিরে যাওয়া উচিত হয়নি আমাদের। কাজটা করে সেই ভয়াল দুঃস্বপ্নের দ্বিতীয় অধ্যায়টা শুরু করলাম না তো? না, কোনও প্রমাণ দেখাতে পারব না এই আশঙ্কার পেছনে; পুরোটাই অমূলক হতে পারে। তারপরেও ধারণাটা বদ্ধমূল হয়ে উঠছে বুকের গভীরে।
এসব কি আমারই মনের ভুল? কে জানে? সময়ই এর উত্তর দেবে।

কিছুদিন পর আব্রাহাম ভ্যান হেলসিংয়ের কাছে
প্রফেসর আন্দ্রে কোভাক্সের একটা চিঠি এল।
৪ ঠা অগস্ট, বুদাপেস্ট
বন্ধুবর আব্রাহাম,
আশা করি, ভাল আছ। তোমার অভাব অনুভব করছি সপ্তাহ না গড়াতেই। সারাক্ষণ মাথায় ঘুরছে তোমার মুখে শোনা সেইসব অদ্ভুত, রোমহর্ষক কাহিনী – কাউন্ট ড্রাকুলার কাহিনী!
অনেকদিন থেকেই কার্পেথিয়ানের গ্রাম্য এলাকায়
প্রচলিত নানা ধরনের গল্পগাথা নিয়ে গবেষণা করছি
আমি। ওখানকার এক গ্রামে গিয়ে নিজের চোখে
দেখেছি ব্যাখ্যার অতীত এক ঘটনা। কবর খুঁড়ে বের করতে দেখেছি বছরখানেকের পুরনো এক লাশ, অথচ তা একবিন্দু পচেনি… সেই লাশের বুকে গাঁথতে দেখেছি কাঠের গজাল,ক্ষত দিয়ে বেরোতে দেখেছি তাজা রক্ত!
বিজ্ঞানের যুক্তি দিয়ে বহু চেষ্টাতেও এই ঘটনার কোনও
ব্যাখ্যা খুঁজে পাইনি। কিন্তু তোমার মুখে শোনা কাহিনী
শেষ পর্যন্ত শান্ত করেছে আমার হৃদয়কে। বিশ্বাস করতে
শুরু করেছি, অতিপ্রাকৃত আর অশুভ শক্তির অস্তিত্ব আছে পৃথিবীতে। সেই শক্তির প্রমাণ তুমি আর তোমার বন্ধুরা স্বচক্ষেই দেখেছো।
আমি শুনেছিলাম ড্রাকুলা ক্যাসলের বাসিন্দারা বহুদিন
আগে মারা গিয়েছে। কিন্তু তোমার মুখে জানলাম, সেটা
মিথ্যে।বাস্তবে যা ঘটেছে তা কল্পনারও অতীত।
স্বান্তনা শুধু এ-ই যে, সেই দুঃস্বপ্নের ইতি ঘটেছে।
পৃথিবী এখন বিপদমুক্ত।
যাই হোক, এই চিঠি লেখার পেছনের মূল উদ্দেশ্য এবার
তোমায় জানাই। ড্রাকুলা নিয়ে আলোচনার সময় একটা
বিশেষ জায়গায় প্রসঙ্গ উঠে এসেছিল, যেটা নিয়ে খুব
একটা মাথা ঘামাওনি তুমি। কিন্তু আমার ধারণা,
সবকিছুর পেছনে ওটা’র-ই মস্ত ভূমিকা আছে। আমার
গবেষণা জীবনে বহুবার, বহু বই-য়ে, প্রাচীন লিপি-তে,
পান্ডুলিপিতে ওটা-র উল্লেখ পেয়েছি আমি, শুনেছি সব
ধরনের অঘটনের পেছনে ওটার সম্পৃক্ততার কথা। কিসের
কথা বলছি, আশা করি বুঝতে পারছ? হ্যাঁ…. ‘স্কলোম্যান্স’
বা ‘ শয়তানের আখড়া’র কথাই বলছি।
এই ‘ স্কলোম্যান্স’ বা ‘ শয়তানের আখড়া’ সম্পর্কে যতটুকু
জানি, তা তোমায় বলছি। সোজা কথায়, ওটা ছিল এক
ধরনের অ্যাকাডেমি বা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। হ্যাঁ, শয়তানী
বা ডাকিনীবিদ্যা শেখার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। ওখানে
বিভিন্ন রকম জাদুটোনা,কালা জাদু, প্রকৃতির রহস্য ও
বিভিন্ন পশুপাখির ভাষা শেখানো হতো। দশজন করে
শিক্ষার্থী নেয়া হতো এই ‘ স্কলোম্যান্সে’। প্রশিক্ষণ
শেষে নয়জনকে পাঠানো হতো দুনিয়ায় কালা যাদুর চর্চা
করার জন্য, আর দশম ছাত্রটিকে স্বয়ং শয়তান নিজের
কাছে রেখে দিত ডাকিনীবিদ্যা প্রদানের মূল্য হিসেবে। তা সেই ড্রাকুলা ক্যাসলের সেইসব বাসিন্দাদের বেশ ক’জন সদস্য এইরকম একটি ‘ স্কলোম্যান্সে যোগ দিয়েছিল বলে গুজব আছে…আর আমার তো মনে হয়, এই যে কাউন্ট ড্রাকুলা…সে নিজেও জীবিতকালে এইরকম কোনও স্কলোম্যান্সের সদস্য ছিল…ওখান থেকেই সে শয়তানী বিদ্যার সমস্ত কৌশল রপ্ত করে। সেই স্কলোম্যান্স হারমানস্টাডে অবস্থিত বলে শোনা যায়, সেটা কার্পেথিয়ান পর্বতমালার অভ্যন্তরে… যেখানে ট্রানসিলভ্যানিয়া আর ওয়ালচিয়া
বিভক্ত হয়েছে।
আমি ঠিক করেছি, স্কলোম্যান্স সংক্রান্ত কাহিনীর
পিছনের সত্যতা পরখ করতে অভিযানে বেরোব। বলতে
দ্বিধা নেই, এই অভিযানের অনুপ্রেরণা আমি তোমার
কাছ থেকেই পেয়েছি। প্রাথমিকভাবে কাজটাতে
মাসখানেক লাগতে পারে বলে মনে হচ্ছে। দু’সপ্তাহ
লাগবে কার্পেথিয়ান পর্বতমালায়, সামনে পেছনে এক
সপ্তাহ করে লাগবে প্রস্তুতি, প্রত্যাবর্তন এবং অন্যান্য
টুকিটাকি কাজে। মিকোলাস- আমার ছাত্র, আমার
সহযোগী এবং সন্তানতুল্যও বটে, যাচ্ছে আমার সঙ্গে।
আমরা যদি উল্লেখযোগ্য কিছু আবিষ্কার করতে পারি
তাহলে ভবিষ্যতে আরও বড় অভিযানের আয়োজন করা
হবে। এই খবর আপাতত তুমি ছাড়া আর কেউ জানতে
পারছে না। এমিল আর ওর মেয়ে ইলিনা ফেরার আগেই
আমরা অভিযান শেষ করে ফিরে আসব বলে আশা করছি,
তাই ওদের কিছু জানাইনি এখনো।
অভিযানের খুঁটিনাটি বিবরণ একটা জার্নালে তুলে
রাখব, তোমার সঙ্গে আবার যেদিন দেখা হবে আমার,
ওইদিন ওটা পড়লে সব জানতে পারবে তুমি। মানে যদি
আমাদের অভিযান সফল হয় আর কি!
আর কি লিখব…চিঠি এখানেই শেষ করি। প্রার্থনা
কোরো যাতে আমাদের অভিযান সফল হয়।
ইতি,
তোমার বন্ধু,
আন্দ্রে কোভাক্স
পুনশ্চ : মিকোলাস এদিকে ইলিনাকে বিয়ে করতে চাইছে,
কিন্তু ওতে আমার ঘোর আপত্তি। অমন কিছু ঘটতে দেখলেবাধা দেব। ইলিনার কোনও আগ্রহ নেই মিকোলাসের
ব্যাপারে কিন্তু ওর বাবা এমিলের আবার মিকোলাসকে
জামাই হিসেবে খুব পছন্দ। বাবার পীড়াপীড়িতে
শেষমেশ হয়তো মেয়েটা রাজি হতে পারে। বাপ আর
মেয়ের মধ্যে একটা অদ্ভুত টানাপোড়েন চলছে।
মিকোলাস বেচারাকে খামোখা এই সম্পর্কের মধ্যে
ফেলতে চাই না। এ ব্যাপারে তোমার কিছু পরামর্শ
থাকলে জানিও।
এ.কে.
ইলিনা কোভাক্সের ডায়েরী
২৫ শে জুলাই।
জীবনে এই প্রথমবার ডায়েরী লিখছি। লিখছি মাদাম
মীনা হারকারের কল্যাণে। অবশ্য বাবা এসব জানতে
পারলে খুবই রেগে যাবেন; তাই আমায় লুকিয়ে লিখতে
হচ্ছে। আর লিখছি ইংরেজীতে। এতে আমার ইংরেজীর
চর্চাটা বজায় থাকবে।
ফার্মহাউজের নীচতলায়, আমার ছোট্ট ঘরটায় বসে
লিখছি এই ডায়েরী। জানলা দিয়ে চোখে পড়ছে
আঙিনা। দেখতে পাচ্ছি কুয়া, গোলাঘরের একাংশ আর
ফলের বাগান। আঙিনায় ছোটাছুটি করে বেড়াচ্ছে মুরগি
আর শূকরের পাল। বাগান পেরিয়ে দেখা যাচ্ছে ঘন গাছে
ছাওয়া পাহাড়ি ঢাল, উঠে গেছে আকাশের দিকে। ইচ্ছে
করছে এক লাফে জানলা টপকে ছুটে চলে যাই ওই
পাহাড়ি জঙ্গলে, হারিয়ে যাই চিরদিনের মতো! ইশশশ,
যদি সত্যি পারতাম!
খামার মালিকের মেয়েরা সত্যিই ভাল….সহজ সরল, যত্ন
আত্তির কোনও ত্রুটি রাখছে না আমার। তারপরেও ওদের সঙ্গে কামরা বা বিছানা ভাগাভাগি করতে হচ্ছে না
বলে নিজের ভাগ্যকে ধন্যবাদ দিচ্ছি আমি। সেক্ষেত্রে
একটা মূহুর্তও নিজের বলে পেতাম না আমি।
অদ্ভুত এক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে আমার ভেতরে। জানি, এর পেছনে মস্ত অবদান আছে মাদাম মীনা হারকারের।
তিনি যদি না আসতেন, যদি না আমার সঙ্গে মমতা ভরে
কথা না বলতেন, তা হলে আমার মধ্যে এই পরিবর্তন হয়তো আসতই না। আমার চোখ খুলে দিয়েছেন তিনি – মার্জিত ব্যবহার, মার্জিত পোশাক আশাক আর চমৎকার
কথাবার্তা দিয়ে। তিনি বুঝিয়েছেন, মেয়েদের জীবন
মানেই ঘরের চার দেয়ালে বন্দি হয়ে থেকে সংসার করা
নয়, আমরাও পারি স্বাধীন হতে, করতে পারি যে কোনও
কাজ। তিনি চলে গেছেন তো কি, বদলে দিয়ে গেছেন
আমার পৃথিবী। দম আটকে আসছে আমার, মনে হচ্ছে আমার বাবা যেন আমায় একটা ছোট্ট পিঞ্জরে আটকে
রেখেছেন….এভাবে কি বাঁচা সম্ভব কারোর পক্ষে?
জানি না কেন বাবার অবাধ্য হবার ইচ্ছে মাথাচাড়া
দিচ্ছে আমার মনে। মনে হচ্ছে যেন কিছু একটা ঘটে
গেছে আমার মধ্যে। সারাজীবন বাবা’র আদেশ অক্ষরে
অক্ষরে পালন করেছি, কখনও তার জন্য অনুতাপ হয়নি,
কখনো নিজেকে বঞ্চিত মনে হয়নি… তা হলে আজ বাবা’র অবাধ্য হওয়ার ইচ্ছা জাগতে এরকম মনে হচ্ছে কেন?
এই রে, গোপন কথা লিখে ফেললাম আমি। এখন এই
লেখাগুলো যাতে বাবার চোখে না পড়ে তারজন্য এখন
এই ডায়েরীটা আমায় লুকিয়ে ফেলতে হবে। কিন্তু কি
করব, জীবনের কাছে বড্ড বেশী চাই আমি, কিন্তু পাই খুব সামান্য।
এখন আমাদের সেই অতিথি বন্ধুদের প্রসঙ্গে ফিরে যাই।
পর্বতের মাঝখানে কেন গিয়েছিলেন তাঁরা, খুব জানতে
ইচ্ছা করে। ফিরে আসার পর ওঁদের সবার মাঝে কেমন
একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করেছিলাম; ওঁদের মধ্যে মাদাম
মীনা হার্কারের পরিবর্তনটাই ছিল সবচেয়ে প্রকট। শুরু
থেকে এক ধরনের অস্বস্তি লক্ষ্য করেছিলাম তাঁর মধ্যে
কিন্তু পাহাড় থেকে ফেরার পর দেখলাম কেমন হাসিখুশী
হয়ে উঠেছেন তিনি। হতে পারে ব্যাপারটা আমার অতি
কল্পনা – ছেলের কাছে ফিরবেন বলেই হয়তো অমন খুশী
খুশী হয়ে উঠেছিলেন।
কারণ যা-ই থাক, অতিথিদের সবার মধ্যের এই পরিবর্তন
খুব অস্বাভাবিক লেগেছিল আমার চোখে। ভয় পেয়েছি
তাঁদের বদলে যেতে দেখে। হ্যাঁ ভয়! অস্বাভাবিক কোনও
কিছু দেখলেই ভয় লাগে আমার। কুসংস্কারে ভরা এক
দেশের অধিবাসী আমি, সবকিছুতেই অমঙ্গলের ছায়া
দেখি। মানতে ইচ্ছে করে না অনেক কিছুই, আবার সবকিছু পুরোপুরি উড়িয়েও দিতে পারি না। কেন এমন একটা কুসংস্কারাচ্ছন্ন দেশে জন্ম নিতে গেলাম? ওই
অতিথিদের দেশ ইংল্যান্ডের মতো একটা আধুনিক,
মুক্তিচিন্তার দেশে জন্ম নিলে এমন কি-ই বা ক্ষতি হতো
আমার?
।। ৩০ শে জুলাই।।
আপাতত ফসল তোলায় ব্যস্ত কৃষকদের ছবি আঁকছে এখন বাবা। ছবির পটভূমি হিসেবে দৃশ্যটা চমৎকার, কিন্তু
নিজে চোখে দেখছি, কেমন হাড়ভাঙা পরিশ্রম করছে
গরীব লোকগুলো। জীবন বড়ই কঠিন ওদের, বিশেষ করে শীতকালে….তখন কোনও ফসল ফলানো যায় না। পর্বত হয়ে পড়ে প্রাণহীন। প্রায়ই জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসে নেকড়ের পাল, হামলা চালায় কৃষকদের শীতকালের অবলম্বন… ভেড়ার পালের ওপর। ভেড়ার পালের ওপর বিষয়বস্তু হিসেবে ব্যাপারটা বেশ উৎসাহী করে তুলেছে বাবাকে – মানুষ আর পশু’র লড়াই। কিন্তু আমি ওতে কোনও আগ্রহ পাচ্ছি না। বাবা’র ফাইফরমাশ খাটবার পরেও এখনো আমার হাতে অঢেল সময়। কি করব ভেবে পাচ্ছি না।
গতরাতে একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখেছি….. হ্যাঁ, বড়ই অদ্ভুত।
সেই স্বপ্নের প্রভাব কাটাতে পারছি না কিছুতেই।
স্বপ্নে যেদিকেই তাকাই, ধোঁয়াটে কি যেন চোখে পড়ে।
স্বপ্নটার খুঁটিনাটি মনে নেই, তবে যেটুকু মনে আছে,
ঐটুকুনিই লিখছি।
স্বপ্নের শুরুতে অন্ধকার এক জায়গায় নিজেকে
আবিষ্কার করি আমি। অচেনা জায়গা। চারদিকে তরল
কুয়াশা ছাড়া আর কিছু দেখা যাচ্ছিল না। চারপাশে
ভীষণ ঠাণ্ডা। হঠাৎ কোত্থেকে একটা আবছা আলো এসে
পড়ল সেই কুয়াশার মাঝে, সেই আলোয় দেখতে পেলাম
দীর্ঘদেহী এক ছায়ামূর্তি। শরীরটা কালো, মুখ ভাল করে
দেখা যাচ্ছে না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল সেই মূর্তি, একটুও
নড়েনি কিন্তু তবু কেন যেন আতঙ্কে কেঁপে উঠেছিলাম
আমি।
কেন ভয় পেলাম জানি না। বিবশ হয়ে আসছিল শরীর।
জেগে উঠতে গিয়েও পারলাম না। চিৎকার করতে
চেয়েছি কিন্তু গলা দিয়ে বেরোল না একবিন্দু আওয়াজ।
শেষ পর্যন্ত যখন ঘুম ভাঙল, দেখি ঘামে জ্যাবজ্যাবে হয়ে
খাড়া হয়ে বসে আছি বিছানায়। কিসের সম্মোহনী টানে
জানলার কাছে গেলাম। উঁকি দিলাম বাইরে।
চাঁদের আলোয় বাইরে তখন ভেসে যাচ্ছিল প্রকৃতি।
খামারের আঙিনা, ফলের বাগান আর পেছনের
পাহাড়সারি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। কোথাও কেউ নেই। তবু
মনে হতে লাগল, কেউ যেন আড়াল থেকে আমার ওপর
লক্ষ্য রাখছে। জানি না কেন এই অদ্ভুত ধারণা হলো।
।। ২ অগস্ট।।
ভয়ঙ্কর কিছু একটা ঘটছে আমায় ঘিরে।
প্রতি রাতের মতো গত রাতেও ঘুম হয়নি আমার। যতবার
তন্দ্রা এসেছে, ভয়ানক সব দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে উঠেছি
বারবার। মাথাব্যথা করেছে, গরম হয়ে উঠেছে শরীর
কিন্তু পুরোপুরি ঘুম বা জেগে থাকা – কোনটাই সম্ভব
হয়নি আমার পক্ষে।
এভাবে শুয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ বাইরে থেকে একটা
আবছা আর্তনাদ শুনলাম – যেন বিপদে পড়ে কোনও
জানোয়ার আর্তনাদ করছে। প্রথমে মনে হলো, দূরের
পাহাড় থেকে আসছে শব্দটা, তারপর মনে হলো জানলার ওপাশেই রয়েছে জানোয়ারটা, তারপর আবার ওটা যেন সরে গেল দূরে। ভয়ঙ্কর সেই আর্তনাদ আমার শরীরের রক্ত যেন জল করে দিল। কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করলাম, যেন থেমে যায় শব্দটা, আমার স্নায়ু কিছুতেই সহ্য করতে পারছিল না সেই শব্দ।
জানলা দিয়ে বাইরে তাকাবার ইচ্ছে হলো কিন্তু বিছানা ছেড়ে উঠতেই পারছিলাম না।
অস্থির হয়ে উঠলাম এরপর থেকে। আধো ঘুম আধো
জাগরণে দেখতে শুরু করলাম অদ্ভুত সব দৃশ্য। সাদা সেই কুয়াশা দেখলাম আবার, তবে সেই কুয়াশার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে একটা লালচে আভা। যেন পানির মাঝে ঘূর্ণিউঠেছে তাজা রক্তের! দেখলাম, খাড়া এক পাহাড়ি
দেয়াল বেয়ে উঠবার চেষ্টা করছি আমি, কিন্তু বারবার
পিছলে নেমে যাচ্ছি নীচে। তারপর দেখলাম,
ভাঙাচোরা, পচা কতগুলো কাঠের তক্তা পড়ে আছে
রাস্তার পাশে….বৃষ্টিতে ভিজছে। এসব দৃশ্যের কোনও
ব্যাখ্যা খুঁজে পাচ্ছিলাম না আমি কিন্তু প্রতিটি স্বপ্নই
আমার বুক কাঁপিয়ে দিয়েছে বারবার। এখনো সেই
স্বপ্নের কথা লিখতে গিয়ে হাত কাঁপছে আমার। টের
পাচ্ছি কেমন একটা অব্যক্ত বেদনা।
শেষরাতের দিকে একটু ঘুমিয়েছিলাম,সকালে যখন
জেগে উঠলাম, তখন সূর্যের আলোয় ফকফক করছে
চারদিক। কোথাও কোনও অস্বাভাবিকতা নেই। রাতে
অদ্ভুত কিছু ঘটেছে বলেও মনে হলো না। হাতমুখ ধুয়ে
নাস্তা খেতে হাজির হলাম প্রাতঃরাশের টেবিলে।
এইসময়েই খামারবাড়িতে হাজির হলো এক রাখাল।
খামারমালিককে সে জানাল, গতরাতে নাকি নেকড়ে
নেমে এসেছিল পেছনের পাহাড় থেকে, তাদের খোঁয়াড়
থেকে একটা ভেড়া নিয়ে গেছে।
তা হলে কি গত রাতে ভেড়ার আর্তনাদ-ই শুনেছি আমি?
দুঃস্বপ্ন ছিল না ওটা?

উত্তেজিত হৈচৈ শুরু হলো। খবর পাঠানো হলো খামারের সব পুরুষদের কাছে – অস্ত্র নিয়ে যেন তৈরি থাকে ওরা, নাস্তার পরেই নেকড়ে শিকারে যাবে। কেন যেন ওদের এই
তৎপরতা ভাল লাগল না আমার। মায়া লাগল নেকড়েটার জন্য। একটা অবলা প্রাণী ভেড়া শিকার করেছে নিজের পেটের তাগিদে।
এটার জন্য ওটা’র প্রাণ নেওয়াটা কি ঠিক? মুখে অবশ্য কিছু বললাম না।
আমার কথায় বাবা হয়তো রেগে যেতে পারে, পাগল ঠাওরে বসলেও অবাক হব না।
রাখাল ছেলেটা, যে নেকড়ে কর্তৃক ভেড়া হত্যা’র খবর
খামারমালিককে এনে দিল, তার কি আমায় দেখে কোনও সন্দেহ হচ্ছে? মুখ তুলে চাইতে দেখি কিরকম একদৃষ্টে ছেলেটা তাকিয়ে আছে আমার দিকে। যদিও, ওর দৃষ্টিতে খারাপ কিছু ছিল না কিন্তু কেমন যেন মিইয়ে গেলাম ভেতরে ভেতরে। মনে হলো, আমার সমস্ত রহস্য যেন জেনে ফেলেছে ছেলেটা। বাবা ব্যাপারটা লক্ষ্য করে হুঙ্কার দিয়ে উঠল রাখালটাকে লক্ষ্য করে। উপায়ান্তর না দেখে পালিয়ে বাঁচল ছেলেটা।
।। ৩ আগস্ট।।
আজ সারাদিন বাবাকে ছবি আঁকার কাজে সাহায্য করেছি। টুকটাক কাজ করেছি, হাতের সামনে রঙতুলি এগিয়ে দিয়েছি। আজ বাবা ছবি আঁকার সময় আমায় গান গেয়ে শোনাতে বললেন। কিন্তু আমার গান বাবার পছন্দ হয়নি বলে অনুযোগও করলেন যে আমার গলা
নাকি বড্ড কর্কশ। মনটা খারাপ হয়ে গেল আমার। কিভাবে যে বাবাকে খুশি করব, বুঝতে পারছি না। ওফফো, কাল একটা ব্যাপার লিখতে একদম ভুলে গিয়েছি। ভেড়াখেকো সেই নেকড়েটার খোঁজ পেয়েছে খামারের লোকগুলো, ওটাকে গুলিও করা হয়েছে, আহত অবস্থায় পালিয়ে গেছে জানোয়ারটা। পরে অনেক খোঁজাখুঁজি করেও ওটার আর সন্ধান পাওয়া যায় নি। মরেছে কি বেঁচেছে – কে জানে! অন্তত ভেড়া
চুরির মজা যে নেকড়েটাকে পাইয়ে দেয়া গেছে, সে
ব্যাপারে সবাই নিশ্চিত। খুশি হয়ে উঠেছে ওরা।
কিন্তু আমার খারাপ লাগছে। অবলা একটা প্রাণী গুলির আঘাতে ধুঁকে ধুঁকে মরছে –
ভাবতে ভাল্লাগছে না আমার।

।। ৬ আগস্ট।।

গত রাতে বিছানায় শুয়ে একটা নেকড়ের ডাক শুনলাম। চড়া লয়ের ভীষণ এক হুঙ্কার, রাতের নীরবতাকে যেন বিদীর্ণ করে দিচ্ছে। ওই ডাক শুনে ঘুম ভেঙে গেল আমার। মনে হলো,শব্দটা যেন অন্য কোনও জগতের – একবার উঁচুতে, আবারনিচুতে নেমে যাচ্ছে…..তাতে মিশে আছে ক্ষোভ আর হাহাকার। গা হিম হয়ে এল আমার, কিন্তু কৌতূহলের কাছে হার মানলভয়। বিছানা ছেড়ে জানলার কাছে চলে গেলাম, তাকালাম বাইরে। যা
দেখলাম, তা অবিশ্বাস্য। আঙিনার ঠিক মাঝখানে দৃপ্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে একটা অতিকায় সাদা নেকড়ে।
কুয়োর পাশে দাঁড়িয়ে আছে জানোয়ারটা, পিঠ প্রায় কুয়োর দেয়াল -সমান উঁচু।
এত বিশাল নেকড়ে জীবনে দেখিনি আমি! চাঁদের আলোয় ধূসর দেখাচ্ছে তার গা, কিন্তু রক্তলাল চোখদুটো জ্বলছে আগুনের মতো! সোজা আমার দিকে তাকিয়ে ছিল প্রাণীটা।
আমি ওখানেই জমে গেলাম মূর্তির মতো। ট্রানসিলভ্যানিয়ার অধিবাসীরা নেকড়ে’কে সাঙ্ঘাতিক ভয় পায় – জানোয়ারটাকে ওরা ‘ নরকের দূত’, ‘ অশুভ শক্তির প্রতীক’ মনে করে। ওই মূহুর্তে আমার মধ্যেও জেগে উঠল ওদের ওই সংস্কার, ভয়।
তবু যন্ত্রচালিতের মতো খুলে ফেললাম জানলার পাল্লা, যেন
ঘুমের ঘোরে করলাম কাজটা। নড়ল না নেকড়ে, একদৃষ্টে
তাকিয়ে রইল আমার দিকে। সম্মোহিতের মতো আমিও তাকিয়েরইলাম ওটার দিকে। হঠাৎ তীব্র ইচ্ছা জাগল জানলা টপকে বাইরে বেরোনোর। তাই-ই করতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু বাধা পেলাম জানোয়ারটা নীচুস্বরে গরগর করে ওঠায়। আর তখুনি দূর থেকে শোনা গেল কুকুরের ডাক – একটা, দুটো নয়, যেন
অনেকগুলো গর্জন ভেসে এল দূরের গ্রাম আর আশপাশের খামারগুলো থেকে। বোধহয় নেকড়ের উপস্থিতি টের পেয়ে গেছে ওরা। কুকুরের ডাকের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পাহাড় থেকে ডেকে উঠল নেকড়ের পাল। পুরো এলাকা ভরে গেল ভয়াল গর্জনের আওয়াজে। শিউরে উঠলাম আমি, তাড়াতাড়ি জানলা বন্ধ করে ঘরের ভেতরদিকে পিছিয়ে এলাম কয়েক পা।
কিছুক্ষণ পর আবারও বাইরে উঁকি দিলাম। দেখলাম ঘুরে দাঁড়িয়েছে নেকড়েটা, নিঃশব্দে মিলিয়ে গেল রাতের অন্ধকারে। খুব আস্তে হাঁটছে জানোয়ারটা, ঘাড়ের কাছে রক্তের ছোপের মতো কি যেন একটা দেখলাম। হৃদস্পন্দন দ্রুততর হয়ে গেল আমার। এটাই সেই নেকড়ে, যেটাকে ভেড়া হত্যার দায়ে গুলি
ছুঁড়ে আহত করেছে চাষীরা! মায়া হলো খুব, জানোয়ারটার ব্যথা যেন অনুভব করতে পারছি। ইচ্ছে হলো ওটার জন্য কিছু করার, কিন্তু সে সুযোগ পেলাম না। তার আগেই অদৃশ্য হয়ে গেল জানোয়ারটা।
পুরো ব্যাপারটাই ছিল স্বপ্নের মতো। বিছানায় এসে মড়ার মতো সকাল পর্যন্ত ঘুমোলাম। দিনের আলোয় চেষ্টা করলাম নেকড়েটাকে খোঁজার কিন্তু কোথাও কোনও চিহ্ন দেখতে পেলাম না ওটার। আহত অবস্থায় কতদূর গেছে প্রাণীটা, বোঝার উপায় নেই। নেকড়েটার কথা কাউকেই বলিনি। কেন গোপন করলাম, জানি না। বুক ধুকপুক করছে, অনুভব করছি অজানা উত্তেজনা।
নেকড়েটা ভয়ঙ্কর, কিন্তু তারপরেও চাইছি ওটা আবার আসুক।

।। ৭ আগস্ট।।

এসেছে ও! ভয় করছে ওর কথা ভাবলে, তবু সব লিখে রাখব বলে ঠিক করেছি।
গত রাতে আবারও আচমকা ঘুম ভেঙে গেল আমার, তবে নেকড়ের গর্জন শুনে নয়। কেন জানি ঘুমের মধ্যে তাগিদ অনুভব করলাম, জানলা দিয়ে বাইরে তাকাবার। তা-ই দেখলাম আর তখনিই দেখলাম -আঙিনার মাঝখানে গতরাতের মতো দাঁড়িয়ে
আছে সেই দানব -নেকড়ে!
আগের মতোই স্থির হয়ে….দু’চোখ জ্বলছে আগুনের মতো। ভয় লাগল খুব, তারপরেও মনে হলো ওর কাছে যেতে হবে আমায়। জানলার হুড়কো খুললাম, উঠে পড়লাম চৌকাঠের ওপর। রাতের পোশাক খোঁচা লেগে প্রায় ছিঁড়ে যাচ্ছিল, কিন্তু পাত্তা দিলাম না।
নেকড়েটার কথা ভেবে হাতে এক টুকরো মাংস রেখেছিলাম হাতে, হাঁটু গেড়ে বসে সেটা বাড়িয়ে দিলাম ওর সামনে। গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে এল ওটা, আমার খোলা হাত থেকে মুখে নিয়ে খেলো মাংসটা। তারপর বিশাল মাথাটা রাখল আমার উরুতে। সাবধানে
হাত বুলিয়ে দিলাম ওর মাথায়। সারা গা কাঁপছিল আমার অদ্ভুত এক শিহরণে। বিশ্বাস করতে পারছিলাম না, এমন ভয়ঙ্কর একটা প্রাণীকে এত সহজে বশ করতে পেরেছি! ওর কাঁধের ওপর গর্তটার দিকে নজর পড়ল আমার। গুলি একপাশ দিয়ে ঢুকে আরেক পাশ দিয়ে বেরিয়ে গে ছে। দেখে মনে হলো এই আঘাতে নেকড়েটার তো মরে যাবার কথা ছিল। কেন মরল
না, ভেবে পেলাম না। একসময় মুখ তুলে নেকড়েটা আমার মুখের দিকে তাকাল। ওটার জ্বলন্ত চোখদুটোয় বেদনার ছাপ স্পষ্ট দেখলাম….দেখলাম দূর্বলতা।আস্তে আস্তে যেন কোমল হয়ে এল ওর দৃষ্টি। আমার হাতের তালু চেটে দিল, বোধহয় ধন্যবাদ দিল। তারপর উলটো ঘুরে এগোতে শুরু করল ফলের বাগানের দিকে।

পিছু পিছু আমিও এগোলাম, দিনের বেলা নেকড়েটা কোথায় আশ্রয় নেয়, দেখব। কিন্তু কিছুদূর যাওয়ার পরেই হারিয়ে গেল নেকড়েটা। আর দেখতে পেলাম না ওটাকে। আর তখনিই ঘোর কেটে গেল আমার। যেন জেগে উঠলাম আমি।
নিজেকে আবিষ্কার করলাম ফলের বাগানের গভীরে। চারদিকে শুধু গাছ আর গাছ – ছায়ার রাজত্ব সবখানে। মনে হলো যেন গাছের ছায়ার আড়াল থেকে আমার ওপর লক্ষ্য রাখছে কেউ। গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল আমার। তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এলাম বাগান থেকে। ত্রস্ত পায়ে ফিরে এলাম নিজের ঘরে। জানলা আটকে শুয়ে পড়লাম। নিরাপদ বোধ করলাম এতক্ষণে, সেইসঙ্গে রোমাঞ্চ। আশা করছি আবার আসবে ওই
নেকড়ে। আগামীকাল আরও কিছু খাবার জমিয়ে রাখব ওর জন্য।

আহত ও, হয়তো শিকার করতে পারছে না; আমাকেই জোগাতেহবে ওর আহার। কেন যেন মনে হচ্ছে, এটা আমার-ই দায়িত্ব। কাউকে বলা চলবে না নেকড়েটার কথা। বললে হয়তো সবাই ওকে মারার জন্য অস্থির হয়ে উঠবে; হয়তো আমাকেও পেতে হবে শাস্তি।।।৯ আগস্ট।।
বিশাল ওই নেকড়ে ছাড়া আর কিছুই এখন আমি ভাবতে
পারছি না আজকাল। এমনকি যখন বাবাকে ছবি আঁকার কাজে সাহায্য করি, তখনও চাতকের মতো অপেক্ষায় থাকি রাত নামার। কাজকর্মে মন নেই, ভুলভাল করছি সারাক্ষণ… বাবা গালাগাল করছে কিন্তু সেসব কানেঢোকে না আমার।
গত রাতে জঙ্গলের ভেতর আমায় নিয়ে গিয়েছিল ও,
চেটেপুটে খেয়েছে আমার দেয়া সব খাবার। পরিষ্কার
পানি দিয়ে ওর ঘাড়ের ক্ষতটা যদ্দূর পরিষ্কার করে
দিয়েছি আমি। কিন্তু ক্ষতটা বড্ড বেশী গভীর, যেভাবে
শুকিয়ে আসা দরকার, সেভাবে শুকোচ্ছে না। কি সমস্যা
বুঝতে পারছি না। অথচ মরণোন্মুখ বলে মনে হয় না ওকে, ওর শরীরে সবসময় আমি অমিতশক্তি র আভাস দেখি।গত রাতে ও যখন জিভ দিয়ে আমার হাত চাটল, শিউরে উঠেছিলাম আমি। জিভটা বরফের মতো ঠাণ্ডা! বিদায় নেবার সময়েও আবার আগুনের মতো জ্বলে উঠেছিল ওর চোখদুটো। না, জ্বলে ওঠার কথাটা স্রেফ ভাষার অলঙ্কার নয়, সত্যি সত্যিই আভা ছড়াচ্ছিল ওর চোখদুটো।
আতঙ্ক ভর করল সেই চোখের দিকে তাকিয়ে। মনে হলো
অজ্ঞান হয়ে যাব।
পরে যখন বাড়ি ফিরে বিছানায় শুয়ে পড়লাম, ঘুমের
মাঝে ভয়ঙ্কর, জান্তব সব দুঃস্বপ্ন দেখলাম আমি,
যেগুলোর ল্যাজামুড়ো কিছু বুঝতে পারছিলাম না আমি।
প্রতি রাতেই দুঃস্বপ্ন দেখতাম।
কখনো দেখতাম, আমি একটা মাটি ভর্তি লম্বা কাঠের
বাক্সে শুয়ে আছি। দেখতে অনেকটা কফিনের মতো।
কফিনের ভেতর শুয়ে শুয়েই বুঝতে পারছিলাম দিনের
আলো নেভেনি এখনো। কিছু করার ক্ষমতাই যেন নেই
আমার। তারপরেই লাল আলো ছড়িয়ে সূর্য ডুবতে দেখলাম, আর তখুনি আনন্দে ছেয়ে গেল হৃদয়। মনে হলো এবার নড়তে পারব আমি। শুধু তাই-ই নয়, ভয়ঙ্কর কিছু ঘটিয়ে ফেলারও ক্ষমতা অর্জন করেছি আমি। হঠাৎ দেখলাম কফিনের ঢাকনাটা খুলে গেল। দুজন মানুষের মুখ দেখতে পেলাম – ফ্যাকাসে, বিবর্ণ। তাদের হাতে ছুঁচালো কি যেন শোভা পাচ্ছে, নেমে আসছে আমার হৃদপিন্ড বরাবর!
চিৎকার করে উঠলাম আমি, ভীষণভাবে ঝাঁকি খেল আমার দেহ।
এরপর আমি নিমজ্জিত হলাম চরম অন্ধকারে – প্রশান্তির এক অন্ধকার আর নিঃসীম শূন্যতা। কোনো ভাবনা নেই, কোনও অনুভূতি নেই…..আছে শুধু চেতনা। বুঝলাম মারা গিয়েছি আমি; কিন্তু স্বর্গ না নরক – কোনওটাতেই পৌঁছতে পারিনি আমি। ঠাঁই পেয়েছি এক নিঃসীম অন্ধকারে যেখানে কোনওকিছুর অস্তিত্ব নেই।
…..স্বপ্নটা যখন ভাঙল, নিজেকে আবিষ্কার করলাম
বিছানায়। শরীরের অর্ধেকটা ঝুলছে বিছানার বাইরে।
বাঁকা হয়ে আছে পিঠ, শিরদাঁড়ায় কেমন তীব্র একটা
ব্যথা। চাদর আর বালিশের অবস্থা দেখে বুঝলাম, ঘুমের
মধ্যে রীতিমতো তড়পাচ্ছিলাম আমি…সব লণ্ডভণ্ড হয়ে
আছে। জামাকাপড় ঘামে ভিজে একাকার…. যেন জ্বর
থেকে উঠেছি।
উঠে বসে বিড়বিড় করে ঈশ্বরকে ডাকলাম। প্রার্থনা
করলাম এমন ভয়াবহ স্বপ্ন যেন আর না দেখি কোনওদিন।
কিন্তু প্রার্থনায় কাজ হয়নি। পরের রাতেও সেই একই রকম দুঃস্বপ্ন, কিন্তু আগের বারের চেয়ে আরেকটু বেশীক্ষণ।
অস্থিরভাবে ঘুমের মধ্যে এপাশ ওপাশ করতে করতে চোখ মেলে দেখি, পূবাকাশ ফর্সা হয়েছে। মোরগ ডাকছে
বাইরে। শান্তভাবে বিশ্লেষণ করলাম স্বপ্নটা। আর কিছু
না হোক, এটুকু বুঝতে পারছি, স্বপ্নের মাঝে অন্য কারোর
ভূমিকায় অবতীর্ণ হই আমি। তার চিন্তা চেতনার সঙ্গে
আমার কোনও মিল নেই। কিন্তু কে সে? নাকি পুরোটাই
আমার কল্পনা?
বলতে পারব না। তবে আজ কেন জানি আর অত ভয় লাগছে না।
।।১৩ আগস্ট।।
প্রতি রাতে সেই নেকড়েটার সঙ্গে যতটা সম্ভব সময়
কাটাচ্ছি আমি। ওর প্রতি আকর্ষণ ই শুধু নয়, আসলে যতদূর সম্ভব না ঘুমোবার চেষ্টা করি। ঘুমোলেই তো বিচ্ছিরি ওইসব স্বপ্ন দেখব! কিন্তু দেরী করে হলেও ঠিকই ঘরে ফিরতে হয় আমায়। বিছানায় শুয়ে শুয়ে এপাশ ওপাশ করি, চেষ্টা করি জোর করে নিজেকে জাগিয়ে রাখতে। এর কুফলও দেখা দিয়েছে। বাবা বলছে, আমি দিনদিন নাকি ফ্যাকাসে আর দূর্বল হয়ে যাচ্ছি। সেটার দায়ও আমার ঘাড়েই চাপিয়ে দিয়ে আমায় বকাঝকা করছেন বাবা।
কথাবার্তায় যা বুঝলাম, মিকোলাসের সাথে আমার
বিয়ের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছেন বাবা।
মনটা খারাপ হয়ে যেত।
আমি অপেক্ষা করতাম, কখন রাত নামবে। রাতের
প্রতীক্ষায় অস্থির হয়ে আছি আমি। রাত নামলেই তো
আসবে সে, ডাকবে আমায়। নেকড়েটার ঘাড়ের ক্ষতটা
একইরকম রয়েছে। স্বাস্থ্যটাও না আগের চেয়ে ভাল
হচ্ছে, না খারাপ… যেন চলতে ফিরতে থাকা একটা লাশ!
না, না, এসব কি লিখছি আমি? লাশ হবে কেন আমার বন্ধু?
আসলে এখানকার পরিবেশের বিশ্রী প্রভাব পড়েছে
আমার মনে। ছোট্ট কামরা, আলো কম….সবমিলিয়ে
হতাশায় ভরা এক পরিবেশ। এজন্যই বোধহয়……
।। ১৫ আগস্ট।।
গত রাতে একটা অদ্ভুত কান্ড ঘটল। ভয় লাগছে খুব।
গত রাতে নেকড়েটা আমার দিকে তাকিয়ে চোখের
ভাষায় কি যেন বলবার চেষ্টা করছিল। আগুনের মতো
জ্বলছিল ওর মণিদুটো, সেই আভা সহ্য করাও মুশকিল।
নিজের অজান্তেই ওকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলাম।
সঙ্গে সঙ্গে খেপে গেল ও। দাঁতমুখ খিঁচিয়ে চাপা হুঙ্কার
ছাড়ল ও। অস্ফুট আর্তনাদ বেরিয়ে এল আমার মুখ দিয়ে।
এক লাফে উঠে দাঁড়ালাম, উলটো ঘুরে ছুটতে শুরু করলাম নিজের ঘরের দিকে। পাগলের মতো। পেছন পেছন ধাওয়া করে এল ও-ও।
চাইলে ও আমায় অনায়াসে ধরে ফেলতে পারত….কেন
ধরল না, জানি না। তবে রুমে ঢুকে জানলা বন্ধ করতেই
পাল্লার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল ওটা, আঁচর কাটল জানলার কাঁচে। পুরো জানলাটাই যেন কেঁপে উঠল ওর ধাক্কায়। সভয়ে পিছিয়ে গেলাম আমি। মনে হলো জানলা ভেঙে এইবুঝি ও ঢুকে পড়ে কামরায়। তবে তেমন কিছু ঘটল না।
জানলার বাইরে থেকে বেশ কিছুক্ষণ অগ্নিদৃষ্টি হানার
পর জানলার চৌকাঠ থেকে পা নামিয়ে ফেলল ও। উলটো ঘুরে হারিয়ে গেল অন্ধকারে।
জানি না ওর হঠাৎ কেন মতিভ্রম হলো?
বিছানায় এসে শুলাম, কিন্তু ভোর পর্যন্ত ঘুম এল না। শেষ
পর্যন্ত যখন চোখ মুদলাম, দেখলাম এক নতুন ধরনের
দুঃস্বপ্ন। আগের চেয়েও খারাপ।
উঁচু এক পাহাড় দেখলাম আমি, ঢালটা ঘন অরন্যে ছাওয়া।
পাহাড়ের মাথায় সগর্বে মাথা তুলে আছে এক পুরনো
দূর্গ। স্বপ্নের মাঝে মনে হলো, আমায় অনন্ত ঘুম থেকে
যেন কেউ জাগিয়ে তুলল। সে কে, আমি জানি না।
তারপরও আশায় বুক বেঁধে পর্বতচূড়াগুলোর ওপর দিয়ে উড়ে চললাম সেই দূর্গের দিকে। হঠাৎ দেখলাম একটা বিশাল নেকড়ে, গুলি খেয়ে আহত অবস্থায় পড়ে আছে একটা বুড়ো ওক গাছের তলায়। অপেক্ষা করছে শেষ নিশ্বাস ফেলার।
আশাবাদী হয়ে উঠলাম। একটা আধার পাওয়া গেল আমার নিরাকার আত্মার জন্য। ওই নেকড়ের দেহ আশ্রয় করেই এই পৃথিবীর বুকে আবার পা রাখতে পারব আমি। নেকড়ের প্রাণবায়ু বেরোবার সাথে সাথে সুড়সুড় করে ঢুকে পড়লাম ওটা’র শরীরে।
আর লিখতে পারছি না। স্বপ্নের বাকিটুকু মনে নেই,
শরীরে শক্তি পাচ্ছি না। তাছাড়া….. লিখতে লিখতে
টের পেলাম, কি একটা ছন্নছাড়া স্বপ্ন ছিল ওটা।
খামোখা ওটার বিবরণ লিখে পাতা নষ্ট করছি আমি।
ভাবছি, আজ রাতেও যদি ও আসে, রান্নাঘর থেকে বড়সড় একটা মাংসের টুকরো এনে চেষ্টা করব ওকে খুশি করার।
আজকাল আমার খাবারের বেশিরভাগটাই ওর পেটে
যাচ্ছে, নিজে বলতে গেলে কিছুই খাচ্ছি না। কেউই
বুঝতে পারছে না, আমার দিনদিন শুকিয়ে যাবার কারণ
কি!
।। ১৬ আগস্ট।।
ফিরে এসেছে ও। আমার হাত থেকে শান্তভাবে মাংসও
খেল, আগ্রহ নিয়ে। তারপর যথারীতি আমার হাত চেটে
দিয়েছে।
বিছানায় গিয়ে শোবার পর কাল রাতেও একটা অদ্ভুত
স্বপ্ন দেখেছি। স্বপ্নটা বড্ড বাস্তব মনে হলো আমার
কাছে। দেখেছি একজন লম্বা বিবর্ণ লোককে – আমার
বিছানার ওপর ঝুঁকে দাঁড়িয়ে আছে। ঘরের আলোটা তার
পেছনদিকে জ্বলছিল বলে ছায়ায় ঢাকা পড়ে গিয়েছিল
তার মুখ, দেখা যাচ্ছিল না ভাল করে। ফিসফিস করে কি
যেন বলছিল আমায়। বলার ভঙ্গিতে মনে হলো খুব জরুরী কিছু বলছে। এখন অবশ্য কিছুই মনে নেই আমার। একসময় সে আমার একটা হাত তুলে নিল নিজের হাতে। অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম, লোকটার হাতদুটো কি লোমশ…. ঠিক যেন কোনও পশুর থাবা।
আমার ওপর আরেকটু ঝুঁকল সে। যেন চুমো খেতে
চলেছে এইভাবে…. কিন্তু চুমো না খেয়ে আমার ঘাড়ের কাছে নেমে এল তার মুখ….চাটতে শুরু করল ঘাড়ের জায়গাটা।
অনুভব করলাম, লোকটার জিভটা কি কর্কশ! গা রি রি
করে উঠল বিতৃষ্ণায়, কিন্তু তারপরেও বাধা দিতে
পারলাম না তাকে। বরং মনের ভেতর জেগে উঠল একটা
কামনা….. সে যেন না থামে!
লেখা থামিয়ে একটু প্রার্থনা করে নিলাম। এসব আমি
ডায়েরীতে কি লিখছি? পাগলের প্রলাপ! এটুকু বুঝতে
পারছি, রোজ রাতে যে স্বপ্নগুলো দেখছি, তা মোটেও
স্বাভাবিক নয়। এসব কি কোনও অমঙ্গলের সঙ্কেত? বুঝতে পারছি না।

।। ২২ আগস্ট।।

শরীর আমার খুব খারাপ, একবিন্দু শক্তি পাচ্ছি না হাত পায়ে। ব্যথায় অন্ধকার দেখছি চোখে। তবু কলম তুলে নিয়েছি। গত ক’দিন ডায়েরী লেখা হয়নি, আজ না লিখলেই নয়।
গত রাতে যখন আমার নেকড়ে বন্ধুর সঙ্গে দেখা হলো, ও কিছুতেই আমার কাছে এল না। বদলে চোখের একটা ইশারা করে ফলের বাগানের দিকে হাঁটতে শুরু করল। আমিও অনুসরণ করলাম ওকে। জানি, কাজটা উচিত হচ্ছিল না; কিন্তু অদ্ভুত এক ঘোরের মধ্যে ছিলাম আমি। সচেতন, আশপাশে কি ঘটছে, সবই টের পাচ্ছি….অথচ ইচ্ছেশক্তি বলে কোনও কিছু অবশিষ্ট নেই। চাইলেও নেকড়েটার ডাক অগ্রাহ্য করা সম্ভব ছিল না আমার পক্ষে।
ওর পিছুপিছু এগিয়ে চললাম। তারার আলোয় অপার্থিব রূপ ধারণ করেছে পাহাড়, জঙ্গল আর প্রান্তর। শিশিরে পা ভিজে গেল আমার। ভয়ার্ত দৃষ্টিতে চারদিকে তাকাতে লাগলাম। মন্ত্রমুগ্ধের মতো পা ফেলতে লাগলাম ওর পেছনে।
পাহাড়শ্রেণীর গোড়ায় পৌঁছে পূবদিকে ঘুরলাম আমরা, বুনো হরিণের ট্র্যাক ধরে ঢাল বেয়ে উঠতে শুরু করলাম আমরা। কিছুক্ষণ পরেই রাখালদের একটা কুঁড়েঘরকে পাশ কাটালাম, একটা পাহাড়ি ঝর্না পেরিয়ে ঢুকে পড়লাম জঙ্গলের ভেতর। ধীরেধীরে খাড়া হতে লাগল ঢাল। এগোতে খুব কষ্ট হচ্ছিল আমার, দম পাচ্ছিলাম না বুকে। তবু কষ্টেসৃষ্টে এগোতে লাগলাম স্প্রুস গাছের অরণ্য ভেদ করে। হঠাৎ গাছের ফাঁকে দুটো অবয়ব দেখতে পেলাম – ভাল্লুক! কিন্তু আমাদের ধারেকাছেও এল না জানোয়ার দুটো। পা ব্যথা করছিল আমার – বুঝতে পারছি অনেকদূর চলে এসেছি ;ভোরের আলো ফোটার আগে খামারে ফিরতে পারব না; কিন্তু থামতে পারলাম না।
পূবের আকাশ যখন ফর্সা হয়ে এল, তখন পর্বতমালার অনেক গভীরে পৌঁছে গেছি। একেবারে অচেনা একটা জায়গা। চারপাশের পাহাড়চূড়া চকচক করে উঠতে দেখলাম ভোরের প্রথম কিরণে। হিমেল বাতাসে গা কেঁপে উঠল। পায়ের ব্যথায় চোখে অন্ধকার দেখলাম, ক্লান্তির শেষ সীমায় পৌঁছে গেছি…..অথচ একটু বিশ্রাম পাচ্ছি না। থামার চেষ্টা করলেই ক্রুদ্ধ চোখে আমাকে যেন শাসাচ্ছে নেকড়েটা, রক্ত জল করে দিচ্ছে। কোথায় কতদূর চলে এসেছি, কিচ্ছু বুঝতে পারছি না।
সঙ্কীর্ণ একটা গিরিখাত পেরিয়ে চওড়া এক জলপ্রপাতের কাছে পৌঁছনোর পর এই প্রথম সামান্য বিশ্রাম মিলল। থেমে দাঁড়াল আমার নেকড়ে বন্ধু। সঙ্গে সঙ্গে পানির কাছে ছুটে গেলাম আমি, আঁজলা ভরে তৃষ্ণা মেটালাম। কিন্তু তৃষ্ণা মিটতেই এবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠল তীব্র খিদে। খাবারের খোঁজে আশেপাশে তাকাতেই চমকে উঠলাম। জলপ্রপাতের কারণে কুয়াশার মতো মিহি জলকণা ভাসছে বাতাসে;ঘোলাটে সেই পর্দার মাঝে বসে আছে অনেকগুলো প্রাণী – নেকড়ে, শেয়াল, হরিণ আর বুনো শূকর। নির্দিষ্ট একটা দূরত্ব বজায় রেখে আমাদেরকে ঘিরে বসে আছে ওরা, চোখে বিহ্বল দৃষ্টি। যেন জাদুটোনা করে টেনে নিয়ে আসা হয়েছে ওদেরকে।
যাত্রাপথের খুঁটিনাটি মনে নেই আমার – পুরো সময়টা যেন একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম। তবে এটুকু মনে আছে, একটা ছায়াময় গিরিপথের মাঝখান দিয়ে একটা কাঁচা রাস্তা বরাবর এগিয়ে গিয়েছিলাম আমরা। দু’পাশে ছিল ঘাসে ঢাকা জমি আর নানা ধরনের ঝোপ। খাড়া একটা ঢাল ধরে একটা গভীর খাদে নেমে গিয়েছিলাম আমরা, উঠে এসেছিলাম অন্য একটা ঢাল ধরে। দু’পাশে গায়ের ওপর চেপে এল ঘন জঙ্গল। তবে মাঝখান দিয়ে আমায় পথ দেখিয়ে নিয়ে চলল আমার সেই নেকড়ে বন্ধু।
অনেকক্ষণ পর শেষ হলো জঙ্গল। রুক্ষ, এবড়োখেবড়ো একটা পথ দেখতে পেলাম আমরা। পথের একপাশে খাড়া একটা পাহাড়ি প্রাচীর, অন্যপাশে গভীর একটা উপত্যকা, যার মাঝ দিয়ে বইছে দুরন্ত নদী। পথটা ধরে কিছুদূর এগোনোর পর থামল আমার নেকড়ে বন্ধু। সঙ্গে সঙ্গে ধপ করে বসে পড়লাম আমি – ক্লান্তির শেষ সীমায় পৌঁছে গেছি, বুক ওঠানামা করছে হাপরের মতো। একটু ধাতস্থ হয়ে মুখ তুলতেই চোখে পড়ল একটা পুরনো, ভাঙাচোরা দূর্গ – পাহাড়ের মাথায় সদম্ভে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। সঙ্গে সঙ্গে আমার গত কয়েক রাতের স্বপ্নে দেখা সেই দূর্গের কথা মনে পড়ে গেল। আরে, এ তো সেই আমার স্বপ্নে দেখা দূর্গ! ওটার পরিচয় আঁচ করতেও অসুবিধে হল না আমার। যে খামারবাড়িতে আশ্রয় নিয়েছি, সেখানকার স্থানীয় বাসিন্দাদের মুখে এক অভিশপ্ত দূর্গের ব্যাপারে ফিসফিসানি প্রায়ই শুনতে পাই। এটাই কি সেই অভিশপ্ত দূর্গ? এটা নিশ্চয়ই সেটা।
বিশ্রাম নেওয়া হলে আবার নড়েচড়ে উঠল আমার সাথী নেকড়েটা। পথ ছেড়ে আমায় নামিয়ে নিয়ে গেল ঢালে। সেখানে ভাঙাচোরা একটা বাক্স দেখতে পেলাম। অনেকটা যেন কফিনের মতো। তবে কাঠগুলো রোদে – তুষারে – বৃষ্টিতে পচে গেছে। নেকড়েটার চোখের ইশারায় সেই বাক্সের কাছে এগিয়ে গেলাম। কয়েকটা তক্তা সরাতেই দেখলাম মাটির একটা স্তুপ… তার গায়ে ধূসর কি যেন লেগে আছে। পরীক্ষা করে দেখে মনে হলো – ছাই।
কি যেন ভর করল আমার ওপর। গা থেকে খুলে নিলাম শালটা। তারপর শালটা মাটিতে বিছিয়ে তার ওপর ছাইমাটির মিশ্রণটা জড়ো করতে লাগলাম। একটু দূরে বসে নেকড়েটা আমার কাজ দেখতে লাগল। খুশী খুশী হয়ে উঠল ওর চেহারা। একটু পরে উলটো ঘুরে পথের দিক থেকে দাঁতে করে নিয়ে এল কি একটা।
সাবধানে ওর মুখ থেকে জিনিসটা নিয়ে দেখলাম – দামী কাপড়ের তৈরি, ঝালর দেওয়া একটা রুমাল। অভিজাত মহিলারা যে ধরনের জিনিস ব্যবহার করেন আর কি। রুমালের এক কোণে ছোটো ছোটো দুটো অক্ষর লেখা – এম. এইচ.
পড়ামাত্র অজান্তেই একটা নাম মনের মধ্যে ভেসে উঠল – মীনা হারকার। কিন্তু পরমূহুর্তেই মন থেকে ঝেড়ে ফেললাম চিন্তাটা। রুমালটা দিয়ে শালের ভেতর ছাইমাটির মিশ্রণ ভরা পুঁটলিটার মুখ ভাল করে বেঁধে উঠে দাঁড়ালাম।
নেকড়েটা এবার আমায় নিয়ে গেল সেই পরিত্যক্ত ক্যাসলের উঠোনে। বিশাল প্রবেশদ্বার আর আকাশছোঁয়া প্রাচীরগুলো কেমন ভয় ধরানো। মৃদু বাতাসে উড়ে বেড়াচ্ছিল উঠোনে পড়ে থাকা মরা পাতা, সেইসঙ্গে বুঝি অশুভ আত্মারাও। নড়বড়ে উঁচু মিনারটা দেখে মনে হলো যে কোনও মূহুর্তে ধসে পড়বে আমার মাথার ওপর। ওখান থেকে বেরিয়ে যাবার জন্য অস্থির হয়ে উঠলাম। নেকড়েটা আমায় একটা গর্ত দেখিয়ে দিল, সেখানে ছাইমাটির পুঁটলিটা রেখে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এলাম দূর্গের উঠোন থেকে।
অ্যাডমিনের তরফ থেকে কিছু কথা : পাঠক বন্ধুরা, কি বুঝলেন এতদূর পড়ে? ইলিনা নেকড়ের অনুসরণ করে যে দূর্গের কাছে এসেছে, সেটাই সেই কাউন্ট ড্রাকুলার কুখ্যাত ক্যাসল। ইলিনা অবশ্য এখনো কাউন্ট ড্রাকুলার ব্যাপারে কিছুই শোনেনি। এমনকি জানেও না যে, যে ছাইমাটির মিশ্রণটা সে শালের ভেতর পুঁটলি করে, মীনা হার্কারের ভুল করে ফেলে যাওয়া রুমাল দিয়ে পুঁটলির মুখ বেঁধে সে দূর্গের ভেতর রেখে দিয়ে এল, এভাবে নিজের অজান্তেই সে সেই ঘুমন্ত পিশাচকে ফের জাগিয়ে তুলল। ঐ ছাইমাটি আসলে ড্রাকুলার-ই দেহাবশেষ। কাউন্ট ড্রাকুলা পার্ট -১ এর শেষ পর্বে সবাই দেখেছেন, কিভাবে বুকে গজাল গেঁথে দিতেই ধূলোয় পরিণত হয়েছিল কাউন্ট ড্রাকুলার দেহ। সেই ধূলো বা ছাইমাটি-ই ইলিনা এখন নিজের অজান্তে দূর্গের ভেতর লুকিয়ে রেখে এল।
কিভাবে বাড়ি ফিরলাম বলতে পারব না। পায়ের ব্যথায় হিতাহিত জ্ঞান ছিল না আমার। পরিশ্রম আর ক্ষুধায় হয়ে পড়েছিলাম চরম কাহিল। যদ্দুর বুঝলাম, ওই নেকড়েটাই আমায় পৌঁছে দিয়ে গেছে খামারবাড়ি পর্যন্ত। যখন খামারে এসে পৌঁছলাম তখন বিকেল গড়িয়ে গেছে। দু’দিনের অভুক্ত আমি, পরনের পোশাক ছিঁড়ে ত্যানা ত্যানা হয়ে গেছে। আমাকে দেখামাত্র চমকে উঠল সবাই। ওরা সবাই আমার খোঁজ করছিল। কিন্তু এভাবে আমায় আবিষ্কার করবে, ভাবতেও পারেনি।
প্রশ্নের ঝড় বয়ে গেল আমার ওপর দিয়ে। কিন্তু কোথায় গিয়েছিলাম, কেন গিয়েছিলাম – কোনও প্রশ্নেরই সদুত্তর দিতে পারলাম না। পারব কি করে? এসবের উত্তর যে আমার নিজেরও জানা নেই।
আমায় চুপ করে থাকতে দেখে বেশ খেপে গেল বাবা। হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে এল আমার কামরায়। দরজা আটকে বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে দিল। বাবাকে বিশেষ দোষ দিতে পারছি না। এভাবে কাউকে কিছু না বলে হঠাৎ উধাও হয়ে যাবার শাস্তি তো আমার প্রাপ্য।
এখন আমি আমার কামরায় বন্দি অবস্থায় লিখছি। খাবার দেয়া হয়নি আমায়, খিদে আর শরীরের ব্যথায় জ্ঞান হারিয়ে ফেলব মনে হচ্ছে। একটু আগে বাইরে থেকে হৈচৈ এর শব্দ শুনতে পেয়েছি – খামারমালিক চিৎকার করছিল বাবার সঙ্গে, আমাদেরকে চলে যেতে বলছে এখান থেকে। তার ছোট ছেলে নাকি দেখেছে, আমি রোজ রাতে একটা নেকড়েকে মাংস খাওয়াই। কয়েকজন রাখাল’ও নাকি গভীর রাতে আমাকে ওই নেকড়ের সাথে খোলা প্রান্তরে হাঁটতে দেখেছে। ওদের তাই ধারণা, আমি ডাইনী ছাড়া কিছুই নই – এবং শয়তানের সঙ্গে আমার যোগ আছে। আমাদেরকে এখানে থাকতে দিলে গ্রামবাসীদের ওপর অভিশাপ নেমে আসবে। কিন্তু আমি কি করে বোঝাবো সবাইকে, যে ওই নেকড়েটা আমায় যেন সম্মোহন করেছে। ওটা এলে আমি যেন আর আমার মধ্যে থাকি না। একটা ঘোরের মধ্যে চলে যাই আমি।
বুঝতে পারছি, আমার কারণে এখানকার মানুষদের সঙ্গে বন্ধুত্ব হারাতে চলেছে বাবা। ছবি আঁকাও শেষ হয়নি তার, কাজ অসমাপ্ত রেখে ফিরে যেতে হবে। কোনওদিন বাবা ক্ষমা করবে না আমায়।
আগামীকাল চলে যাব আমরা। খবরটা শোনামাত্র স্বস্তির একটা পরশ ছুঁয়ে গেল যেন শরীরে। আর কিছু না হোক, নেকড়েটার সঙ্গে আর মুখোমুখি হতে হবে না, আমার দুঃস্বপ্নের ইতি ঘটতে চলেছে।
নেকড়েটা নিশ্চয়ই আমায় শহর পর্যন্ত ধাওয়া করে আসতে পারবে না?

প্রফেসর আন্দ্রে কোভাক্সের জার্নাল

( স্কলোম্যান্সের সন্ধানে অভিযানের বিবরণ)

১০ আগস্ট।।

এই জার্নালের শুরুতেই জানিয়ে রাখছি, আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু আব্রাহাম ভ্যান হেলসিং ছাড়া এই জার্নাল পড়ার অধিকার নেই আর কারোর। মানে….যদি উল্লেখযোগ্য কিছু পাই তবে আর কি। নইলে অভিযান শেষে জার্নালটা ছুঁড়ে ফেলব ফায়ারপ্লেসে। ব্যর্থ অভিযানের নথি রেখে লাভ কি?
আপাতত বুদাপেস্ট থেকে হারমানস্টাডে এসে পৌঁছেছি আমি আর আমার ছাত্র মিকোলাস। সঙ্গে রয়েছে দু’সপ্তাহ চলার মতো প্রয়োজনীয় রসদ। আমার ভাই এমিল আর তার মেয়ে ইলিনাও পাহাড়ি ওই এলাকাতেই রয়েছে, তবে ওরা আছে, আমরা বর্তমানে যে জায়গায় অবস্থান করছি, সেখান থেকে বেশ কয়েকশো মাইল উত্তর পূর্বে। যোগাযোগ হয়নি ওদের সাথে, হবার কথাও নয়। মাসখানেকের আগে ফিরবে না বুদাপেস্টে,আমরা ওদের আগেই বুদাপেস্টে ফিরে আসত পারব বলে আশা করছি।
সন্দেহ নেই, এমিলের সঙ্গে থাকবে ওর আঁকা নতুন মাস্টারপিস – যার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।আর আমি ফিরব কাঠখোট্টা গবেষণাপত্র নিয়ে – যেগুলো ঠাঁই পাবে কোনও মিউজিয়ামের আর্কাইভে। ব্যাপারটা ভাবলে একটু ঈর্ষান্বিত না হয়ে পারছি না।
আজ রাতে ঝোপঝাড়ে ঢাকা একটা পাহাড়ি ঢালে ক্যাম্প করেছি আমরা। ঢালের নীচে মাইলের পর মাইল জুড়ে সমভূমি। পাহাড়টা যেন সমভূমির কিনারায় বিশাল এক প্রাচীর – ঠেকিয়ে রাখছে মানুষের অগ্রযাত্রা। ওপাশের পার্বত্য এলাকার কোথাও কি লুকিয়ে আছে ‘ স্কলোম্যান্স’ বা ‘ শয়তানী বিদ্যা শেখার প্রাচীন পাঠশালা’র ধ্বংসাবশেষ? যেখানে কাউন্ট ড্রাকুলা তার জীবদ্দশায় পেয়েছিল কালা জাদু’র দীক্ষা? খুব শিগগীর এর জবাব পাব বলে আশা করছি।
১১ আগস্ট।।
আজ সারাদিন পাহাড়ি পথে হেঁটেছি আমরা। পথ ক্রমে দুর্গম থেকে দুর্গমতর হয়ে উঠেছে, বুনো হয়ে উঠছে প্রকৃতি। আবহাওয়া মন্দ নয়, তবে গরম পড়েছে খুব। বুট পরা স্বত্তেও পায়ের পাতায় ফোস্কা পড়ে গেছে আমাদের। কষ্ট হলেও নিজেকে দুঃসাহসী অভিযাত্রীর মতো লাগছে, যেন কিংবদন্তীর কোনও শহরের খোঁজে চলেছি। অনুভব করছি অজানা উত্তেজনা।
ক্যাম্প করার পর রসদ আর কতটা আছে, দেখে নিতে হবে। হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পর রাক্ষসের মতো খিদে পাচ্ছে আমাদের। গোগ্রাসে গিলছি সঙ্গের খাবারগুলো। এভাবে খাওয়া দাওয়া করলে দু সপ্তাহের আগেই শেষ হয়ে যাবে রসদ। আশপাশে কোনও লোকালয়ও নেই যে নতুন করে খাবার সংগ্রহ করব। যদ্দুর বুঝছি, খাওয়া দাওয়ায় লাগাম টানতে হবে এইবার।
একটা ম্যাপ নিয়ে এসেছি সঙ্গে। কিন্তু যত এগোচ্ছি, ততই ধরা পড়ছে ওটার ভুল ত্রুটি। কে বানিয়েছে এই ম্যাপ, কে জানে। জিনিসটা তেমন কোনও কাজেই আসছে না। অগত্যা ভবিষ্যৎ সফরের জন্য নিজেই ঠিকঠাক করে নিচ্ছি ওটা। অনুমানের ক্ষমতা আর আমার অভিজ্ঞতাই এখন সবচেয়ে বড় ভরসা।
এখন সন্ধ্যা।
হতাশা অনুভব করছি। আমাদের প্রথম প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। লেক হারম্যানস্টাডের পারে, যেখানে ‘স্কলোম্যান্সে’ র অবস্থান ছিল বলে আন্দাজ করেছিলাম, সে জায়গাটা আজ দিনভর তল্লাশি করেছি আমি আর মিকোলাস। না, কোনও রকম ধ্বংসাবশেষ বা বিল্ডিংয়ের ফাউন্ডেশন -ই চোখে পড়ল না। কোনওকালে এখানে মানুষের যাতায়াত ছিল বলেও মনে হয় না। কোনওরকম বিলুপ্ত পায়ে চলা পথ-ও আমার নজরে আসেনি। জানি অযথাই ধৈর্য হারাচ্ছি – এ ধরনের তল্লাশিতে সপ্তাহের পর সপ্তাহ, মাসের পর মাসও লেগে যেতে পারে। কিন্তু অত সময় নেই আমার হাতে। আপাতত একটা প্রমাণ …. তা সে যত ছোটই হোক না কেন….চাইছি আমি। তাহলে ভবিষ্যতে একটা বড়সড় দল তৈরি করে আবার অভিযানে আসতে পারব। হ্যাঁ, কেরিয়ারের দিক থেকে একটা বড়সড় ঝুঁকিই নিয়েছি আমি। এমন একটা জিনিস খুঁজে বেড়াচ্ছি, যেটা’কে সবাই এখন গল্পগাথা হিসেবে মেনে নিয়েছে। আমার অভিযানের উদ্দেশ্য’টা জানাজানি হলে হয়তো অধ্যাপক মহলে হাসাহাসি পড়ে যাবে। ব্যর্থতার সম্ভাবনাও মাথায় রাখতে হচ্ছে আমাকে।

কিন্তু এমনও তো হতে পারে, জিনিস’টা সত্যি সত্যিই আছে। এই হ্রদের পাড়ে নয়, হয়তো অন্য হ্রদের পাড়ে আছে। লোকমুখে ছড়িয়েছে ‘ স্কলোম্যান্সে’র কাহিনী। হ্রদের নাম কি পরবর্তীকালে ওলোট পালট হয়ে যেতে পারে না?

।।১২ আগস্ট, সকাল।।

সূর্যোদয়ের সময় এক অপূর্ব দৃশ্য দেখলাম এখানে। কুয়াশায় ঢেকে থাকা পাহাড়চূড়াগুলো যেন হেসে উঠল, সূর্যের প্রথম কিরণে, ছায়ায় ঢেকে দিল ঝোপঝাড় আর
গাছপালায় ছাওয়া পাহাড়ি ঢাল’টাকে। সেই ছায়া
গিয়ে মিশল নীচের গভীর উপত্যকায়। ছবি আঁকতে জানলে আলো – ছায়ার এই খেলাকে নিজের ক্যানভাসে বন্দি করে রাখতাম। এমিল থাকলে তাই-ই করত।
আমরা এখন অনেকটা ওপরে উঠে এসেছি। কাব্যের ভাষায় বলা যেতে পারে – সভ্যতাকে পেছনে ফেলে ঠাঁই
নিয়েছি পৃথিবীর ছাদে। এখানে উঠে আসার পথে চোখ
কান খোলা রেখেছি, মিকোলাসকেও বলেছি একই কাজ
করতে। পুরনো কোনও ট্র্যাক থাকলে তার সন্ধান পেতে
চেয়েছি। বলা বাহুল্য, এখনও তেমন কিছু দেখতে পাইনি।
ব্রেকফাস্টের সময় হয়ে গেছে। নাস্তা সেরে আবার পথে
নামব আমরা।

।। ১৩ আগস্ট।।

আরেকটা নিষ্ফল দিন কাটল। খাড়া, রুক্ষ পাহাড়ি ঢাল
পেয়েছি আমরা; তছনছ করেছি ঘন অরন্য…থেমেছি শক্তি ফুরিয়ে আসার পরে। মাথাই এখন আর কাজ করছে না।
দেখি, ভালমতো একটা ঘুম দিতে পারলে হয়তো বা ঠিক
হয়ে আসবে চিন্তাভাবনা।
উঁচু একটা ক্লিফের তলায় আজ ক্যাম্প করেছি আমরা।
রাতটাকে মনে হচ্ছে অন্যান্য রাতের তুলনায় অনেক
বেশি অন্ধকার। অগ্নিকুণ্ড জ্বেলে রেখেছি, কিন্তু
তাতে দূর হয়নি আলোর অভাব। মিকোলাস ইতিমধ্যে
ঘুমিয়ে পড়েছে, আমিও প্রস্তুতি নিচ্ছি ঘুমোবার।
বেশ ঠাণ্ডা পড়েছে। দূর থেকে ভেসে আসছে বুনো
নেকড়ের ক্রমাগত বিলাপ। ভৌতিক পরিবেশ। আশপাশের জঙ্গল যেন আমাদের শত্রু। দিক – টিক ঠিক রাখা দায়। গত দু’দিনে একই জায়গায় ঘুরে মরেছি কিনা, বোঝা দুঃসাধ্য।
শেষ পর্যন্ত পথ হারালেও অবাক হবার কিছু নেই।
ছি, ছি, এসব কি ভাবছি আমি? মনের দূর্বলতা ছাড়া কিছুই নয় এটা। পরিবেশ পরিস্থিতির বিরূপ প্রভাব পড়ছে।
স্থানীয় লোকজনের কুসংস্কার আর ভয় ভীতি কেন বাসা
বেঁধেছে, তা বুঝতে পারছি এবার। না, এসব নিয়ে আর
ভাবব না।

।। ১৪ আগস্ট।।

তল্লাশির এলাকা বড় করে নিয়েছি আজ, এগোচ্ছি
পশ্চিমদিকের একসারি পাহাড় লক্ষ্য করে। ওগুলোকে
দেখে কিছুটা আশার সঞ্চার হয়েছে মনে। পাথরে গড়া
ভীমদর্শন এক একেকটা চূড়া, জঙ্গলের মাঝ দিয়ে
দূর্গপ্রাচীরের মতো মাথা তুলে রেখেছে। দূর্গম পথ।
গভীর একটা গিরিখাতে নেমে এগোবার রাস্তা খুঁজেছি
আমরা, চেষ্টা করছি একপাশ দিয়ে পাহাড়সারিকে
অতিক্রম করতে, কিন্তু সফল হইনি। হরিণের পায়ের ছাপ
অনুসরণ করে কয়েক দফা এগিয়েছি, কিন্তু পথের অবস্থা
দেখে প্রতিবারই উলটো পথে ঘুরতে হয়েছে। ফিরে
আসতে হয়েছে গিরিখাতে। ম্যাপটা কোনও কাজে
আসছে না, মিকোলাসও বেশ বিরক্ত হয়ে পড়েছে, কিন্তু
হাল ছাড়ছি না আমি। কেন যেন মনে হচ্ছে পাহাড়সারির
ওপাশে রয়েছে আমাদের পরম আরাধ্য সেই গন্তব্য।
যেভাবে হোক, আমাদের যেতেই হবে ওপাশে। যত বাধা
পাচ্ছি, তত জেদ চেপে যাচ্ছে আমার মধ্যে।
মিকোলাসকে দেখে মনে হচ্ছে যেন বেদনা বা আতঙ্কের
মধ্যে আছে। ওর সেই হাসিখুশী ভাব মিলিয়ে গেছে।
বেশীরভাগ সময় চুপচাপ রয়েছে, কিছু যেন ভাবছে গম্ভীর হয়ে। কিছু জিজ্ঞেস করলেই অপ্রস্তুত হয়ে পড়ছে। হাঁটার সময় পেছনে ওর বিড়বিড়ানি শুনেছি। কি বলছিল বুঝতে পারিনি, তবে কয়েক দফা ‘ ড্রাগন ‘ শব্দটা কানে এসেছে।
বলতে দ্বিধা নেই, বেশ বিরক্ত হয়েছি ওর বিড়বিড়ানি
শুনে। উলটো একবার বলেছিলামও সে কথা, কিন্তু
ব্যাপারটা সরাসরি অস্বীকার করল ও। বলল, মুখই নাকি
খোলেনি!

।। ১৫ আগস্ট।।

আজ আমরা পাহাড়সারি অতিক্রম করেছি। ঈশ্বর, এখনো
হাত কাঁপছে আমার, কলম ধরে রাখাই কষ্টসাধ্য। বন্ধু ভ্যান হেলসিং, আশা করি আমার এই কাঁপা কাঁপা হাতের
লেখা তুমি পড়তে পারবে। কারণ, এখুনি আজকের ঘটনা
লিখতে বসেছি আমি।
আজ ভোরবেলায় গিরিখাত থেকে বেরিয়ে আসি আমরা,
কয়েকবারের চেষ্টায় শেষ পর্যন্ত খুঁজে পাই পাহাড়
টপকানোর কঠিন এক রাস্তা। চূড়ায় পৌঁছনোর পর দেখি
নীচে মাঝারি আকারের এক উপত্যকা – ঘন অরণ্যে
ছাওয়া ; সেটাকে চারদিক থেকে ঘিরে রেখেছে
পাহাড়ি প্রাচীর। রীতিমতো সুরক্ষিত একটা জায়গা।
স্কলোম্যান্সে’র জন্য একেবারে আদর্শ অবস্থান বলে
মনে হলো উপত্যকাটিকে, যদিও গাছগাছালির প্রাচুর্যের
জন্য কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। কথাটা বলার জন্য
মিকোলাসের দিকে ফিরলাম, থমকে গেলাম ওর
চেহারায় চাপা আতঙ্ক দেখে।
” ও….ওখানে কি নামতে হবে আমাদেরকে?” ভয়ার্ত গলায়।জিজ্ঞেস করল আমার ছাত্রটি।
” তা তো বটেই”, ভ্রু কুঁচকে বললাম, ” মিকোলাস….কি
হয়েছে?”
” কিছু না স্যার”, তাড়াতাড়ি বলল মিকোলাস।
বললাম, ” তোমায় ক্লান্ত দেখাচ্ছে। যদি চাও তো ক্যাম্প
করে পাহাড়ের ওপরেই থেকে যেতে পারো। উপত্যকায়
তল্লাশি আমি একা চালাতে পারব”।
” না স্যার”, বলল মিকোলাস, ” আপনাকে একা যেতে দেব না আমি”।
ওর কন্ঠের আতঙ্ক আমাকেও স্পর্শ করল। বিরক্ত হলাম
নিজের ওপর। এভাবে ভয় পাওয়া সাজে না আমার।
নিঃশব্দে পাহাড়ি ঢাল ধরে নামতে শুরু করলাম দুজনে।
খুব শীঘ্রই ঘন অরণ্য ঘিরে ধরল আমাদের। চারদিকে
থমথমে নীরবতা, আমাদের পায়ের আওয়াজ ছাড়া আর
কোথাও কোনও শব্দ নেই। এভাবে বেশ কিছুক্ষণ চলার পর হঠাৎ গাছের ফাঁকে আলোর আভা দেখতে পেলাম। পা চালালাম দ্রুত,একটু পরেই জঙ্গল ভেদ করে ছোট একটা হ্রদের ধারে এসে পড়লাম। হ্রদ’টিকে ওপর থেকে দেখা যায় নি। অদ্ভুত এক উত্তেজনা অনুভব করলাম জলাশয়টির দিকে তাকিয়ে। হ্রদের পানির রঙ নীলচে সবুজ। হ্রদটা চওড়ায় বড়জোর একশো ফুট হলেও পানিটা মনে হচ্ছে যেন অতল গভীর। চারদিকে সবুজ বনানী, তার পেছনে উঁকি দিচ্ছে পাহাড়ি প্রাচীর। পানির সোঁদা গন্ধ আর পাইনের সুবাসে ভরে আছে বাতাস।সবকিছু স্থির….. নড়ছে কেবল
হ্রদের উপরিভাগে পাক খেতে থাকা কুয়াশা। কেঁপে
উঠলাম আমি।
” এটা নিশ্চয়ই সেই জায়গা”, মিকোলাসের বাহু ধরে
ফিসফিসিয়ে উঠলাম আমি, ” এই হ্রদটাই খুঁজছি আমরা -যার নাম ‘ ইয়াডু ড্রাকুলুজ’…. মানে ‘ড্রাগনের পানপাত্র ‘।
এর আরেকটা অর্থ আছে, ‘ শয়তানের জলাশয় ‘।
স্কলোম্যান্স যদি থেকে থাকে, কাছাকাছিই আছে!”
ভয়ার্ত দৃষ্টিতে চারদিকে তাকাল মিকোলাস। আতঙ্কের
ছাপ আরও প্রকট হয়েছে ওর চেহারায়। সেটা না দেখার
ভান করে আমি বলে চললাম, ” স্থানীয় লোকজনের
ধারণা, এই হ্রদের পানি উঠে এসেছে পৃথিবীর কেন্দ্রস্থল
থেকে…..এর তলায় নাকি একটা ড্রাগন ঘুমোচ্ছে, নরকের
দরজা পাহারা দিচ্ছে সে। হ্রদের পানিতে পাথর ছুঁড়লে
ঘুম ভাঙবে ড্রাগনের, জেগে উঠে প্রলয় ঘটিয়ে দেবে!”
কথা শেষ করে একটা পাথর কুড়িয়ে নিলাম, এগোলাম
ওটা পানিতে ছুঁড়বার জন্য।
খপ করে আমার কবজি ধরে ফেলল মিকোলাস। চেঁচিয়ে
বলল, ” না, স্যার! ছুঁড়বেন না ওটা!”
পাহাড়ের গায়ে গায়ে বাড়ি খেয়ে প্রতিধ্বনি তুলল ওর
কন্ঠ। একটু খারাপই লাগল ওর জন্য। ক্ষুব্ধও হলাম নিজের ওপর। ছেলেটা ভয় পাচ্ছে, আর আমি কিনা ওকে স্বান্তনা না দিয়ে ভয় আরও বাড়িয়ে চলেছি?
পাথরটা ফেলে দিলাম হাত থেকে। শান্ত গলায় বললাম, ”
মিকোলাস, অযথাই ভয় পাচ্ছ। শুনে খুশি হবে, আমাদের
অভিযান প্রায় শেষ। আজ আমরা এই উপত্যকায় তল্লাশি চালাব, কিছু পাই না পাই, আগামীকাল রওনা হব বাড়ির পথে। ঠিক আছে?”
মাথা ঝাঁকাল মিকোলাস, স্বস্তি ফুটল ওর চেহারায়।
বলল, ” কিছু মনে করবেন না স্যার। কি যে হয়েছে আমার, নিজেও বুঝতে পারছি না। এখানে আসার সঙ্গে সঙ্গে এমন এক ভয় পেয়ে বসল…”
” ও কিছু না”, বললাম আমি, ” মনকে শক্ত করো, সব ঠিক হয়ে যাবে”।
দিনভর পুরো উপত্যকা আর পাহাড়ি ঢালে তল্লাশি
চালালাম আমরা, কিন্তু এমন কোনও নিদর্শন পেলাম না,
যা থেকে মনে হতে পারে, এখানে কোনওকালে কোনও
ধরনের স্থাপনা ছিল। যখন সন্ধ্যা নামল, তখন দুজনেই
ক্লান্ত; হতাশ হয়ে আবার ফিরে এলাম সেই হ্রদের ধারে।
” একটা কথা ঠিক”, বললাম আমি, ” এইসব স্কলোম্যান্সের ধারণা গল্পকথা হলেও হতে পারে। কিন্তু যে কোন গল্প বা কুসংস্কারের পেছনে একটা সত্য থাকে। সেটা কেন খুঁজে পাচ্ছি না, সেটাই বুঝতে পারছি না।”
” ধ্যাত! ” সখেদে বলল মিকোলাস, ” কোনও মানে হয় না
এসবের। এখানে শয়তানও নেই, ড্রাগনও নেই। খামোখাই
ভয় পেয়েছি আমি!” বলতে বলতে হাতে নুড়িপাথর নিয়ে
খেলছিল ও, বিরক্তির বশে ওটা ছুঁড়ে মারল হ্রদের
পানিতে।
টুপ করে পানিতে পড়ল পাথরটা। নিস্তরঙ্গ হ্রদের বুকে
সৃষ্টি হলো ছোট ছোট ঢেউয়ের। আর তখুনি দূর থেকে
ভেসে এল একটা কেমন গুমগুম আওয়াজ! চমকে উঠে
আকাশের দিকে তাকালাম, পরক্ষণেই বুঝতে পেরে হেসে
ফেললাম। মেঘ ডাকছে, বৃষ্টিবাদল হবে বোধহয়। অযথাই
চমকে উঠেছি।
” এসো, ক্যাম্প করি আজ রাতের মতো “, মিকোলাসকে
বললাম, ” কাল সকালে ফিরে যাব এখান থেকে”।
হ্রদের ধারে আমরা অগ্নিকুণ্ড জ্বালতে না জ্বালতেই
নেমে এল নিকষ অন্ধকার, শোঁ শোঁ করে বইতে শুরু করল হিমেল হাওয়া। কড় কড় কড়াৎ করে বাজ পড়ল কোথাও, আকাশ হয়ে উঠল আলোকিত। উপরদিকে চোখ তুলতেই আকাশে ঘন কালো মেঘ পাক খেতে দেখলাম।
ক্ষণেক্ষণে বিজলি চমকাচ্ছে মেঘের ঘর্ষণে। শুরু হলো
অবিরাম বজ্রপাত, সেই আওয়াজে কানে তালা লেগে
যাবার জোগাড়।
দু’হাতে কান চেপে ধরে মাটিতে শুয়ে পড়লাম আমি আর
মিকোলাস। তারপরই শুরু হলো প্রলয়ঙ্করী ঝড়। ঝমঝম করে বৃষ্টি নামল। বিদ্যুৎচমক আর বজ্রনিনাদে চোখ আর কান – দুইয়েরই ঝালাপালা হবার যোগাড়। হ্রদের পানি দেখে মনে হলো যেন টাইফুন সৃষ্টি হয়েছে, শরীরের নীচে মাটি কাঁপছে ভূমিকম্পের মতো। আমাদের অগ্নিকুণ্ড নিভে গেছে বৃষ্টির প্রথম ঝাপটাতেই।
বুঝলাম, খোলা জায়গায় এইমূহুর্তে নিরাপদ নয়।
তাড়াতাড়ি উঠে পড়ে গোছাতে শুরু করলাম জিনিসপত্র।
মিকোলাসকে ডাকতে গিয়ে দেখি, ঊর্ধশ্বাসে ও
ততক্ষণে ছুট লাগিয়েছে বনের দিকে। আমার চেঁচান যেন
শুনতেই পেল না। নিজের ন্যাপস্যাকটা পিঠে ঝুলিয়ে
আমিও ছুটলাম ওর পিছু পিছু।

মিকোলাসকে ধাওয়া করে উপত্যকার সীমানা পর্যন্ত
চলে গেলাম আমি। আর তখনিই বিদ্যুৎচমকের আলোয়
চোখে পড়ল ঢালের গায়ে হাঁ করে আছে একটা প্রকাণ্ড
গুহা – তল্লাশির সময় কিভাবে যেন মিস করেছি ওটা।
মিকোলাসকে কিছু বলার প্রয়োজন মনে করলাম না।
দেখি, ও সেই গুহার দিকেই ছুটছে।
আমিও সেদিকেই ছুটলাম।

মিকোলাস গুহামুখের কাছাকাছি পৌঁছতে না পৌঁছতেই
একটা গাছের ডাল ভেঙে পড়ল ওর ওপর। সাবধান করা কোনও সুযোগই পেলাম না। তার আগেই গাছের ডালটা
ভেঙে পড়ল ওর মাথা আর ঘাড়ের ওপর। মৃদু আর্তনাদ করে পড়ে গেল আমার ছাত্রটি।
কাছে গিয়ে দেখি, প্রায় অচেতন অবস্থা আমার
ছাত্রটির। ব্যথায় গোঙাচ্ছে। ওকে ধরে ধরে গুহার
ভেতরে নিয়ে গেলাম। ওখানেই আশ্রয় নিলাম।
গুহার ভেতরটা শুকনো। বিচ্ছিরি একটা গন্ধ ভাসছে
বাতাসে। গুহাটা মনে হচ্ছে বাদুড়ের আড্ডা। মেঝেতে
তাদের পড়ে থাকা বিষ্ঠার বহর দেখে বুঝলাম। তাজা
বাতাসের আশায় গুহামুখের যতটা সম্ভব কাছে এসে
বসেছি। মিকোলাসের অবস্থা বুঝতে পারছি না। একবার
জ্ঞান আসছে ওর, একবার চলে যাচ্ছে….. পুরোপুরি
সচেতন হচ্ছে না। বিড়বিড় করে প্রলাপও বকতে শুনছি
ওকে। বলছে, ‘ ঝড়ের মাঝে ড্রাগনের পিঠে সওয়ার হয়ে
নাকি পৃথিবীতে নেমে এসেছে শয়তান, আমাদেরকেও
নরকে নিয়ে যাবে!….. ‘ এইসব প্রলাপ আর কি!
কুসংস্কার বলে কিছু নেই আমার মাঝে, কিন্তু
মিকোলাসের প্রলাপ আমার বুকে কে জানে কেন ভয়
জাগিয়ে তুলছে।
বুঝতে পারছি পুরোটাই পরিবেশের প্রভাব। একে এই
অজানা অচেনা পাহাড়ি আদিম অরণ্য, তায় এই ভয়াল ঝড় আর অন্ধকার। ঘন ঘন বজ্রপাতের শব্দ পিলে চমকে দিচ্ছে একেবারে। দু’ঘন্টা হলো এই গুহায় বসে আছি, এর মাঝে একবিন্দু কমেনি ঝড়ের প্রকোপ। বাইরে ক্রমাগত চলছে আগুন আর পানির প্রলয়নৃত্য! একটা মোমবাতি জ্বেলেছি আমি, বাতাসে বার বার নিভু নিভু হয়ে যাচ্ছে ওটার শিখা। স্বল্প আলোতেই খুলে বসেছি জার্নাল, লেখালেখির মাঝে নিজেকে ব্যস্ত রেখেছি। কাজ
হয়েছে এতে – স্নায়ু শান্ত হয়ে এসেছে অনেকটা। ওই তো
মিকোলাসও নড়ছে….জ্ঞান ফিরছে বোধহয় ওর।

।। ১৬ আগস্ট।।

সকাল হয়েছে। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, ঝড়ের প্রকোপ
অনেকটাই কমেছে কিন্তু এখনো বৃষ্টি পড়ছে ঝমঝম করে।
কখন থামবে কে জানে! বৃষ্টি না থামলে রওনা হতে পারব
না। কি এক রাত গেছে…..এক ফোঁটা ঘুমোতে পারিনি।
উঠে বসেছে মিকোলাস, নাস্তা খাচ্ছে কিন্তু মাঝেমাঝে মুখ কোঁচকানো দেখে বুঝতে পারছি, মাথার
ব্যথাটা ভোগাচ্ছে ওকে। ডাক্তার দেখানো দরকার,
যদিও মরে গেলেও সেটা সে স্বীকার করবে না। ফেরার
পথে কোনও সমস্যা না হলেই হলো। আমিই এখানে নিয়ে
এসেছি ওকে… ওর কিছু হয়ে গেলে নিজেকে ক্ষমা করতে পারব না কিছুতেই।
কয়েক ঘন্টা পর।
কি বলব আজকের দিনটাকে- আতঙ্কের না আবিষ্কারের?
বৃষ্টির তোড় একটুও কমেনি, বরং পাগলা হাওয়ার তান্ডবে বারবার কেঁপে উঠছে গাছগাছালি, ভেঙে পড়ছে
ডালপালা। গুহার ভেতর আশ্রয় নেয়ায় নিরাপদে আছি
আমরা, কিন্তু এখনও বুঝতে পারছি না, গতকালের
তল্লাশির সময় এই গুহাটা’কে কেন দেখতে পেলাম না
আমরা। যা হোক – এক সময় তন্দ্রায় ঢলে পড়েছিলাম,
জেগে উঠে দেখলাম, মিকোলাস গুহার ভেতরদিকে
হাঁটতে শুরু করেছে।
তাড়াতাড়ি গিয়ে ওকে ফিরিয়ে আনতে চাইলাম, বললাম
বিশ্রাম নিতে; কিন্তু ও রাজি হলো না। আমার হাত
ছাড়িয়ে নিয়ে অদ্ভুত এক কথা বলল – গুহার ভেতরে নাকি কি যেন আছে! ওর কথার মাথামুণ্ড কিছু বুঝলাম না, মনে হলো নিশিতে পেয়েছে ওকে। দিনের আলোয় যতটুকু দেখেছিলাম, এখন দেখছি গুহাটা তার চেয়েও গভীর – অনেক গভীর…. ফলে কিছুটা কৌতূহলী হয়ে উঠলাম। কাঁধে ন্যাপস্যাক ঝুলিয়ে নতুন একটা মোমবাতি জ্বালালাম, তারপর পিছু নিলাম মিকোলাসের।
আগেই লিখেছি, গুহার মেঝে ভরে আছে বাদুড়ের
বিষ্ঠায়। আমাদের মাথার ওপরে উলটো হয়ে ঝুলছিল
প্রাণীগুলো। তলা দিয়ে আমাদের হাঁটতে দেখে নড়েচড়ে
উঠল ওগুলো, মুখে কিসব দুর্বোধ্য আওয়াজ করল। তবে কিছুদূর যাবার পর মেঝে পরিষ্কার হয়ে গেল। ছাদে’ও আর বাদুড় ঝুলছে না, মেঝেতে বিষ্ঠাও নেই। গুহাটা ততক্ষণে ফাটলের আকৃতি পেয়েছে – একেবারে সরু একটা করিডোরের মতো। সেই করিডোর ধরে পর্বতের গভীরে এগিয়ে চললাম আমরা।
অচেনা পথ…সাবধানে পা ফেলা উচিত….কিন্তু
মিকোলাস খুব দ্রুত হাঁটছিল, যেন কোনও অপার আকর্ষণে ছুটে চলেছে ও। ওকে আস্তে হাঁটতে বললাম, লাভ হলো না।
করিডোর ধরে পনেরো মিনিট এগোবার পর হঠাৎ খেয়াল
করলাম, আমার পকেটঘড়িটা কাজ করছে না। কম্পাসের কাঁটাও মাতালের মতো এদিকওদিক ঘুরছে। ভয় ভয় করে উঠল আমার। কোথায় চলেছি কে জানে। তবু থামতে পারলাম না। কিছুক্ষণ পরেই করিডোর থেকে বেরিয়ে এলাম সুন্দর এক প্রাকৃতিক গুহায়…ভেতরে পাথুরে কলামের অরণ্য।
কলামগুলোর ফাঁকফোকর ধরে অব্যাহত রইল আমাদের
অগ্রযাত্রা। গুহাটা চেপে এল, তারপর হঠাৎ নিজেকে
আবিষ্কার করলাম অদ্ভুত একটা জায়গায়! পর্বতের
গভীরের মাঝামাঝি এক চেম্বার – নিখুঁত জ্যামিতিক
নকশার এক দশভূজ আকারের কক্ষ, প্রাকৃতিক হতে পারে না। মোমবাতির আলোয় ভাল করে দেখলাম চারিদিক।
মেঝে আর দেয়াল টালি করা….রোমান আমলের
ডিজাইন….আরও পুরনো হতে পারে। সবখানে পুরু হয়ে আছে ধূলোর স্তর, এখানে ওখানে ঝুলছে মাকড়শারজাল।
চেম্বারটা ত্রিশ ফুট চওড়া, বিশ ফুট উঁচু। ঠিক মাঝখানটায় রয়েছে দশভূজ আকারের একটা মার্বেলের বেদি। ধূলোর প্রলেপ ভেদ করেও দেখা যাচ্ছে ওটার গায়ে খোদাই করা দুর্বোধ্য নকশা। চারপাশের দশ দেয়াল ঘেঁষে রয়েছে মার্বেলের দশটা বেঞ্চি। এ ছাড়া কক্ষে আর কোনও আসবাব নেই।
“দশটা আসন!….দশজন ছাত্র”! উত্তেজিত গলায় বললাম আমি, ” এটাই স্কলোম্যান্স!” আনন্দে প্রায় চিৎকার করে বললাম। আমারই ভুল….আলাদা বিল্ডিং থাকবে ভেবেছিলাম। তা হবে কেন, এমন একটা গোপন প্রতিষ্ঠান যে পাহাড়ের ভেতরে লুকনো থাকবে…. সেটাই তো স্বাভাবিক! ”
খুশি আর আনন্দে যখন পাগল হবার দশা তখনই খেয়াল হলো, শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছে মিকোলাসের। বাতাসের অভাবে খাবি খাচ্ছে। এতক্ষণ আনন্দের আতিশয্যে খেয়াল করিনি, পরে যখন খেয়াল করলাম, তখন তটস্থ হয়ে উঠলাম।
তাড়াতাড়ি একটা জায়গায় বসালাম ওকে, ফ্লাস্ক
থেকে পানি বের করে খেতে দিলাম।
শ্বাসপ্রশ্বাস একটু স্বাভাবিক হয়ে এলে মলিন ভঙ্গিতে
হাসল মিকোলাস। বলল, ” মাফ করবেন, স্যার। কি যেন
হয়েছে আমার। এখানে আসার পর থেকে একটার পর একটা ঝামেলার জন্ম দিচ্ছি। আমার বদলে ইলিনা’কে নিয়ে এলে বোধহয় ভাল করতেন। আমার চেয়েও অনেক শক্ত ও।”
” বাজে কথা বোলো না তো!” ধমকে উঠলাম ওকে, ”
চুপচাপ একটু বিশ্রাম নিয়ে নাও। এরপর আমরা কাজে
নামব। বুঝতে পারছ না, মিশরীয় সমাধির মতো একটা
গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছি আমরা?”
বিশ্রামের ফাঁকে খাওয়াদাওয়া সেরে নিলাম আমরা,
তারপর নামলাম চেম্বারের তল্লাশিতে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে
দেখলাম প্রতিটি ইঞ্চি। ধূলোবালির আস্তর সরিয়ে
উন্মুক্ত করলাম রঙবেরঙের টালি। দেয়ালে দেখতে
পেলাম হাতে আঁকা বিভিন্ন ছবি – যুদ্ধ বিগ্রহ,
সন্ন্যাসীদের ধর্মপ্রচার, নরবলি….এ ধরনের নানা দৃশ্য
ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ছবিগুলোতে। আঁকা হয়েছে
উজ্জ্বল রঙে, তাতে লালের আধিক্য চোখে পড়ে। মনে
হয় যেন রক্তের পটভূমিতে আঁকা হয়েছে প্রতিটা ছবি।
কাজটায় মগ্ন হয়ে পড়েছিলাম দুজনে। হঠাৎ বিস্মিত হয়ে
লক্ষ্য করলাম, যে পথে এই চেম্বারে ঢুকেছি, সেটা আর
খুঁজে পাচ্ছি না। ব্যাপারটা অবিশ্বাস্য, অসম্ভব….. কিন্তু
বাস্তব! চারপাশের দশটা দেয়ালই মনে হলো নিরেট,
ফাঁকফোকর নেই কোনও। ঢুকবার সময়ের পায়ের ছাপ
অনুসরণ করে যে ফিরব, তারও উপায় নেই। চেম্বারের
ভেতর হাঁটাহাঁটি করে পুরনো পায়ের ছাপগুলো নষ্ট করে
ফেলেছি আমরা।
চরম হতাশা নিয়ে এখন একটা পাথরের বেঞ্চিতে বসে
আছি আমরা, মাথা খারাপের মতো লাগছে। জার্নাল
খুলে বসেছি, যাতে সমস্যার কথা ভুলে থাকতে পারি।
কিন্তু এভাবে আর কতক্ষণই বা নিজেকে ব্যস্ত রাখা
যাবে? মিকোলাস ইতিমধ্যে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছে, ভয়ার্ত
ভঙ্গিতে মাথা নাড়ছে ক্ষণেক্ষণে। ওর সঙ্গে কথা বলার
চেষ্টা করেছি, লাভ হয়নি। একটা শব্দও বেরোচ্ছে না ওর
মুখ দিয়ে।
বারোটা মোমবাতি আছে আমাদের সঙ্গে। জ্বালিয়ে
নিভিয়ে খরচ করলে হয়তো বা বেশ কিছুটা সময় চালিয়ে
নেয়া যাবে….কিন্তু পরিস্থিতি এমন যে, আলো
নেভানোর সাহস পাচ্ছি না। হঠাৎ হঠাৎ কোত্থেকে বয়ে
আসা বাতাসে মোমবাতির শিখা কেঁপে কেঁপে উঠছে।
চেষ্টা করেও সে বাতাসের উৎস খুঁজে পাইনি। এটুকু
পরিষ্কার, বাতাসের অভাবে দম আটকে মরব না আমরা।
কিন্তু সেটা দুঃসংবাদ। এখানে বন্দি হয়ে পড়ে ক্ষুধা
পিপাসায় দিনের পর দিন তিলে তিলে মরবার চেয়ে দম
আটকে মরা অনেক ভাল। তাতে সময় কম লাগে।
ম্লান আলোয় বারে বারে আমার চোখ চলে যাচ্ছে
চেম্বারের মাঝখানে মাথা তুলে থাকা দশভুজ বেদিটার
দিকে। নকশাকাটা বেদি, তার ওপর ধূলোর আস্তর। মনের ভুল কিনা জানি না, তবে মাঝেমাঝেই মনে হচ্ছে যেন নড়ে উঠছে বেদিটা। গোড়ায় স্তুপ হয়ে আছে পুরনো
শ্যাওলা আর ধূলোর তাল। রেশম গুটির আকৃতি নিয়েছে, তবে অনেক বড়….অনায়াসে একজন মানুষের জায়গা হয়ে যাবে। স্রেফ ময়লার তাল, নাকি ভেতরে কিছু লুকিয়ে আছে, বুঝতে পারছি না। মাথা ঘামাবার শক্তিও পাচ্ছি না।
আরও কয়েক ঘন্টা পর।
হাতে কলম নিয়েই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে
একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলাম। স্বপ্নটার অর্থ করলে দাঁড়ায়
– হ্রদের জলে পাথর ছুঁড়ে ড্রাগনকে জাগিয়েছি আমরা,
খুলে ফেলেছি স্কলোম্যান্সের গুপ্ত দরজা। সেইসঙ্গে
সমন করেছি স্বয়ং শয়তানকে! যত্তোসব….মাথাই খারাপ
হয়ে যাচ্ছে আমার।
জেগে উঠে নতুন একটা মোমবাতি ধরালাম। টের পেলাম, স্বপ্ন’টাকে গুরুত্ব না দিলেও ওটার প্রভাবে এখনো বুক কাঁপছে আমার। মোম জ্বালার পরেও কমল না সে ভয়।
মিকোলাস আমার পাশে ঘুমোচ্ছে। ওকে আর জাগালাম
না। ক’টা বাজে এখন কে জানে। পকেট ঘড়িটা
একেবারেই অচল হয়ে গেছে। বাইরে এখন সকাল না রাত – কে জানে!
আরেক দফা খুঁজেছি চেম্বার থেকে বেরোবার পথ।
এবারও ব্যর্থ হতে হলো। কিভাবে উধাও হলো বাইরে
বেরনোর পথটা, তার কোনও ব্যাখ্যা খুঁজে পাচ্ছি না।
অতিপ্রাকৃত ব্যাপার? জানি না। শুধু এটুকু জানি, ‘
শয়তানের আখড়া’য় বন্দি হয়েছি আমরা!
আরও কিছু সময় কেটে গেল।
হাত কাঁপছে আমার….বুক কাঁপছে…..তবু তুলে নিয়েছি
কলম। সবকিছু লিখে রাখতেই হবে আমায়। আতঙ্কে
দিশেহারা অবস্থা। আপাতত এই কাগজ কলমই শান্ত
রাখতে পারে আমায়।
তখন লেখা বন্ধ করতেই দেখতে পেলাম, বেদির গোড়ার
তালটা নড়তে শুরু করেছে। প্রথমে মনে হলো, ভুল দেখছি কিন্তু পরক্ষণেই ভেঙে গেল ধারণাটা। নড়াচড়ার ফাঁকে ফাটল ধরল ওটার গায়ে, কি যেন বেরোতে শুরু করল ওটার ভেতর থেকে…..ঠিক ডিম ভেঙে পাখির ছানা বেরোবার মতো করে।
স্থবির হয়ে গেলাম এই দৃশ্য দেখে। একটু পরেই পিলে
চমকে উঠল ময়লার তাল থেকে বেরিয়ে আসা
প্রাণীটাকে চিনতে পেরে। মানুষ…. হ্যাঁ, একটা মানুষ।
কিন্তু স্বাভাবিক মানুষ বলা যাবে না কোনওভাবেই, বরং
বলা যেতে পারে একটা মমি। বীভৎস চেহারা, শরীরে
মাংস বলতে কিচ্ছু নেই, শুকনো চামড়া সেঁটে আছে খুলি
আর হাড়গোড়ের গায়ে। দুলতে দুলতে বেরিয়ে এল ওটা,
তারপর মাকড়শার মতো চার হাত -পায়ে ভর দিয়ে
কিলবিল করে এগিয়ে এল আমার দিকে।
এরপর আর আমার কিছু মনে নেই। জ্ঞান হারিয়ে
ফেলেছিলাম বোধহয়।
যখন হুঁশ ফিরল, প্রথমে মনে পড়ল না কিছু। কিছুক্ষণ পর সচেতন হয়ে উঠলাম। ঝট করে উঠে বসলাম মেঝেতে।
চারপাশে তাকিয়ে দেখলাম, অনেকগুলো মোমবাতি
জ্বলছে, সেগুলোর আলোয় আলোকিত হয়ে আছে
চেম্বারের অভ্যন্তর। কে জ্বেলেছে এত মোমবাতি,
জানি না। সেই অদ্ভুত প্রাণীটাকে দেখতে পেলাম না
কোথাও।
মিকোলাসের দিকে তাকালাম, মেঝের ওপর
নিস্পন্দভাবে পড়ে আছে ও। ডাকলাম কয়েকবার কিন্তু
কোনও সাড়া পেলাম না। তাড়াতাড়ি ছুটে গেলাম ওর
পাশে, গায়ে হাত দিয়েই চমকে উঠলাম। একেবারে
বরফের মতো ঠাণ্ডা শরীর। কাঁপা কাঁপা হাতে পরীক্ষা
করলাম নাড়ি। পরক্ষণে থমকে গেলাম।
মারা গেছে মিকোলাস….আমার পুত্রসম ছাত্র….আর নেই!
মন ভরে গেল বেদনায়। ওর বদলে আমি মরলাম না কেন? এই মৃত্যুর কথা আমি কি করে ওর পরিবারকে জানাব? কোন মুখে দাঁড়াব ওর বাবা-মা’র সামনে? ইলিনাকেই বা কি বলব? আমিই বা কি করে সইব ওকে হারানোর বেদনা? জানি না আমি, কিন্তু কঠিন সত্যকে অস্বীকার করার উপায় নেই। মারা গেছে মিকোলাস….পড়ে আছে আমারই চোখের সামনে।
কষ্টটা চাপা দিয়ে আবারও তল্লাশি চালালাম
চেম্বারের অভ্যন্তরে। লুকানো লিভার বা গুপ্তদরজা –
কোনও সম্ভাবনাই বাদ দিইনি। তারপরেও পেলাম না
কিছু। একটা নতুন সম্ভাবনাও মাথায় এল আমার….অবাস্তব সম্ভাবনা যদিও। চেম্বারের গঠনটাই হয়তো বদলে গেছে, এখন আর ঢোকা – বেরনোর কোনও রাস্তা নেই এতে।
আর শয়তানকে যদি সত্যি সত্যিই জাগিয়ে দিয়ে থাকি আমরা নিজেদের অজান্তে আর এটাই যদি সেই ‘ স্কলোম্যান্স’ হয়, তাহলে শয়তানের পক্ষে বস্তুর আকার আকৃতি বদলে দেয়া কঠিন কিছু নয়। সত্যিই কি তাই?
ভয় করছে আমার। বেদির গোড়া থেকে বেরিয়ে আসা
প্রাণীটা ভেতরেই কোথাও আছে – এখান থেকে বেরিয়ে
যাবার কোনও উপায় নেই ওটার। মিকোলাসকে খুন
করেছে, এবার আসছে আমার পালা।

ভাবতেই পারিনি, সামান্য একটা বৈজ্ঞানিক
অনুসন্ধানের পরিণতি এমন দাঁড়াবে। প্রিয় আব্রাহাম
ভ্যান হেলসিং, যদি দৈবক্রমে এই জার্নাল তোমার
হাতে পড়ে, তা হলে সাবধানে এগিয়ো। যে ভুল আমি
করেছি, তা তুমি করতে যেয়ো না। শয়তানকে অবজ্ঞা
করে নিজের মরণ ডেকে এনেছি আমি।

ইলিনা কোভাক্সের ডায়েরী

।।২৩ আগস্ট।।

খামারবাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছি আমি, তবে বাবার সঙ্গে
নয়। পালাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কঠিন এক সিদ্ধান্ত। বুক
ধুকপুক করছে কিন্তু কিছুতেই পিছপা হব না। ছোট একটা ব্যাগে ভরে নিয়েছি নিজের দরকারি সব জিনিসপত্র, অপেক্ষা করছি সুযোগের।
এমনিতে আগামীকাল রওনা হবার কথা আমাদের, তার
আগে বিসট্রিজে যাবার কোনও ব্যবস্থা করতে পারেননি
বাবা। বাড়তি এই দিনটাতে নানা ধরনের তিক্ত
অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছে।
সকালে যখন কামরা থেকে বেরোলাম, খামারবাড়ির লোকেরা আমায় দেখামাত্র হাত দিয়ে অদ্ভুত একটা ইশারা করল…..পরে জানলাম ওটা নাকি শয়তানকে তাড়াবার সঙ্কেত। ওদের কাজকর্ম দেখে খেপে গিয়েছিল বাবা, ‘ কুসংস্কারাচ্ছন্ন ছোটলোক ‘ বলে গাল’ও দিয়ে বসেছে। হাতাহাতি বেধে যেত, যদি না খামারমালিক আর তার বউ ব্যাপারটার মাঝে নাক না গলাত। বাবাকে শান্ত করেছে তারা, অনুরোধ করেছে যত দ্রুত সম্ভব আমরা যেন এখান থেকে চলে যাই।
অবস্থা বেগতিক দেখে নাস্তা না করেই কামরায় ফিরে
এসেছিলাম আমি, তাতেও রেহাই নেই। বাবা এসে
রীতিমতো জেরা শুরু করল… কাউকে কিছু না জানিয়ে
দু’রাত কোথায় ছিলাম আমি। ধমক খেয়ে শুধুই কেঁদেছি
কিন্তু জবাব দিইনি বাবার প্রশ্নের। জেদ চেপে
গিয়েছিল, বাবা যতই চেঁচাক, কিছুতেই মুখ খুলব না
নেকড়েটার ব্যাপারে।
” কোথা থেকে মুখ কালো করে এসেছিস বল?” চিৎকার
করছে বাবা, ” কার সাথে কোথায় অভিসারে গিয়েছিলি? কোনও চাষাভুষো…. না কি কোনও জিপসি ছোকরার সঙ্গে? আমার মান সন্মান সব ধ্বংস করেছিস
তুই…এখন কে বিয়ে করবে তোকে? হায়, কি করব আমি এখন তোকে নিয়ে, বল? হায় ঈশ্বর, এ তুমি আমার কোন পাপের শাস্তি দিচ্ছ?”
বাবার জন্য আমার একটু খারাপ লাগছিল না, তা নয়।
জানি, আমার নিজেরও কিছু খুঁত আছে; কিন্তু পিতা
হিসেবে তো ওঁর বোঝা উচিত যে কোনও কোনও
ব্যাপারে আমার নিজের হাত নেই। ভাল মন্দ মিশিয়েই
মানুষ। অথচ এসব না ভেবেই আমাকে একখানা কষে চড় মেরে বসল বাবা।
ব্যস, আমার চরম সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য ওইটুকুই যথেষ্ট
ছিল। রাগে রি রি করে উঠেছে আমার গা। মনে মনে ঠিক
করলাম….আর নয়…অনেক সয়েছি অপমান আর গঞ্জনা…. এবার আমি পালাবই….আর পালাব আজ রাতেই।
দরজায় তালা দিয়ে গেছে বাবা; কিন্তু তাতে কি? জানলা তো খোলা। আমি ওই জানলা দিয়েই পালাব। অপেক্ষা শুধু রাতের আঁধার নেমে আসার। তা-ও নেমে আসতে শুরু করেছে। খুব শীঘ্রই বেরিয়ে পড়ব আমি।
ওই তো, এসে পড়েছে আমার বন্ধু! সাঁঝের আঁধার ভেদ
করে এগিয়ে আসছে ওর বিশাল দেহ, আগুনের মতো জ্বলছে ওর দু’চোখ। জানলার কাছে এসে পড়েছে, দু’পায়ে ভর দিয়ে চৌকাঠের ওপর উঠে দাঁড়িয়েছে। কাঁচের ওপাশে দেখতে পাচ্ছি ওর সেই বিশাল আগ্রহী চেহারা। আমায় যেন নিঃশব্দে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে।
জানলা খুলব এখন আমি। সঙ্গে যাব আমার বন্ধুর। দেখা
যাক আমায় কোথায় নিয়ে যায় ও।

।।২৬ আগস্ট।।

শেষবার ডায়েরী লেখার পর বহুদূর চলে এসেছি। এর
মাঝে ঘটে গেছে অনেক কিছু। যতদূর সম্ভব গুছিয়ে
লেখার চেষ্টা করছি।
সে রাতে আমার নেকড়ে বন্ধুর আমন্ত্রণ পেয়ে দেরী
করিনি, ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম জানলা দিয়ে।
মাঠ পেরিয়ে আমায় ফলের বাগানের দিকে নিয়ে
চলছিল সে, আর তখুনি পেছন থেকে শুনতে পেলাম বাবা’র চিৎকার। ঘাড় ফেরাতেই দেখলাম, খামারবাড়ি থেকে চেঁচাতে চেঁচাতে বেরিয়ে আসছে বাবা। নিশ্চয়ই
গোপনে নজর রাখছিল আমার ওপর।
কাছে এসে তর্জনগর্জন শুরু করল বাবা, আমাকে ঘরে
ফিরে যেতে বলল। সাড়া দিলাম না তার কথায়। হাত ধরে
টানতে গেল বাবা, ঝটকা দিয়ে ছাড়িয়ে নিলাম হাত।
সঙ্গে সঙ্গে খেলাম চড়। চোখের সামনে লাল নীল তারা
জ্বলে উঠল। মুখ থুবড়ে পড়লাম মাটিতে। ব্যথা সয়ে এলে মাথা তুললাম। দেখলাম, বাবার দিকে চেয়ে চাপা গরগর শব্দ করছে আমার নেকড়ে বন্ধু। খ্যাপাটে গলায় তার উদ্দেশ্যে চিৎকার করল বাবা, বুঝি ভয় পাওয়াতে চাইছে।
কয়েক মিনিট এভাবে কাটার পর পাহাড়ের দিকে মুখ
ঘোরাল নেকড়ে, অদ্ভুত এক সুরে ডেকে উঠল। সঙ্গে
সঙ্গে শুনতে পেলাম হিংস্র গর্জন…. বহুকন্ঠের। একটু পরেই গাছপালার আড়াল থেকে বেরিয়ে এল ধূসর অনেকগুলো আকৃতি। ছুটে এল আমাদের দিকে। পাহাড়ি নেকড়ের পাল! হাঁ করে আছে প্রত্যেকটা নেকড়ে! চাঁদের আলোয় চকচক করছে তাদের মুখের ভেতরের ধারাল দাঁতের সারি।চেহারায় বন্যতা।
ভয় ফুটল বাবার চোখে। উল্টো ঘুরে পড়িমরি করে ছুটল
বাড়ির দিকে। কিন্তু অর্ধেক পথ যেতে না যেতেই পেছন
থেকে হামলা চালাল নেকড়ের পাল। হুমড়ি খেয়ে
মাটিতে পড়ে গেল বাবা। আর্তনাদ করে উঠল; কিন্তু
তাতে কোনও লাভ হলো না। তার দেহের এখানে সেখানে
কামড় বসাতে লাগল হিংস্র নেকড়ের দল।
ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলাম আমি। কি ভর করেছিল আমার ওপর, জানি না। এক বিন্দু করুণা অনুভব করলাম না বাবার জন্য, তাগিদ পেলাম না তাকে বাঁচানোর। বরং মনে হলো এটাই বাস্তব প্রাপ্য….এটাই তার শাস্তি।
কিছুক্ষণ দাপাদাপি করার পর স্থির হয়ে গেল বাবার
শরীরটা….চিরদিনের জন্য। ততক্ষণে তার লাশটা চেনার
কোনও উপায় নেই। দলা পাকানো মাংসের তালে পরিণত
হয়েছে। শুধু রক্ত আর মাংসের পিন্ড! আমার নেকড়ে বন্ধু এগিয়ে গেল সেদিকে। বাকি নেকড়েগুলো সরে দাঁড়াল, কাছে গিয়ে মাংসপিণ্ডটার ওপর মুখ নামাল নেকড়ে বন্ধু, জিভ বের করে রক্ত চাটতে শুরু করল।
এতক্ষণে মুখ ঢাকলাম আমি।
একটু পর যখন হাত সরালাম, তখন নেকড়ে বন্ধু ফিরে
এসেছে আমার পাশে। ইশারা করল তার সঙ্গে এগোবার
জন্য। ওর পিছু পিছু হাঁটতে শুরু করলাম। পেছনে পড়ে রইল আমার বাবার রক্তাক্ত মাংসপিণ্ড দেহটা, নেকড়েরা
তাণ্ডব শুরু করে দিয়েছে সেটার ওপর। দূরে খামারে হৈ
হল্লা শোনা গেল, জ্বলে উঠল অনেক আলো। দল বেঁধে
ওরা বেরিয়ে পড়েছে বোধহয় আমাকে আর বাবা’কে
খুঁজতে।
কোনওদিকে মনোযোগ দিলাম না আমি। নেকড়ে বন্ধুর
অনুসরণ করে প্রান্তর পেরিয়ে ঢুকে পড়লাম গাছপালার
আড়ালে। অদ্ভুত এক নির্বিকারত্ব ভর করেছিল আমার
ওপর। কোনওকিছুতেই পরোয়া নেই আমার।
রুক্ষ, পাহাড়ি পথে সেই প্রাচীন ক্যাসলের দিকে
আমাকে আবারও নিয়ে চলল আমার নেকড়ে বন্ধু। বনজঙ্গল আর পাহাড়ি ঢাল পেরিয়ে ওকে অনুসরণ করতে লাগলাম আমি। কি ও? সাধারণ এক নেকড়ে, নাকি নেকড়ের দেহে ভর করে আছে কোনও অশুভ আত্মা? আধুনিক। মেয়ে আমি, তারপরেও এই সম্ভাবনা আমার কাছে অবাস্তব ঠেকছে না।
যাই হোক, পরদিন সকালে ক্যাসলে পৌঁছে গেলাম
আমরা। প্রথম রাতে এখানে এসে যে জায়গায় ছাইমাটির
পুঁটলি টা রেখেছিলাম, সেটা যথাস্থানেই আছে
দেখলাম। পুঁটলিটা কাঁধে ঝুলিয়ে নিয়ে নেকড়ে বন্ধুর
পিছু নিলাম। সঙ্কীর্ণ একটা প্যাসেজ ধরে এগিয়ে
লোহায় মোড়া বিশাল এক দরজার সামনে আমায় নিয়ে
গেল নেকড়েটা। লক্ষ্য করলাম, পাল্লার ওপরে পেরেক
দিয়ে একটা কাঠের ক্রুশ গেঁথে রাখা আছে; চৌকাঠ আর
পাল্লার মাঝখানের ফাঁকফোকরগুলোও সাদাটে এক
ধরনের জিনিস দিয়ে ‘সীল’ করা। অঙ্গভঙ্গি’র মাধ্যমে
নেকরেটা আমায় যেন বোঝাল, ওগুলো সব সরিয়ে
ফেলতে। তাই-ই করলাম। টান দিয়ে খুলে ফেললাম ক্রুশটা, আঙুল দিয়ে খুঁচিয়ে উঠিয়ে ফেললাম সাদা ‘সীল’টা। কাজ শেষে টের পেলাম, সাদা জিনিসটা আসলে রসুনের পেস্ট….হাত গন্ধ হয়ে গেছে ওটা’র স্পর্শে। রসুন আর ক্রুশ – দুটোই ব্যবহার করা হয় অশুভ আত্মাকে ঠেকানোর জন্য। কিন্তু এই পুরনো, পরিত্যক্ত ক্যাসলে এসব কে বা কারা করে গেছে? কেন-ই বা করেছে? দূর্গে অশুভ আত্মার অনুপ্রবেশ ঠেকাতে চেয়েছে কেউ, নাকি ঠেকাতে চেয়েছে দূর্গ থেকে আত্মার বেরিয়ে আসা?
ক্রুশ আর শুকিয়ে আসা রসুনের পেস্টের জঞ্জাল ফেলে
দিলাম প্যাসেজের বাইরে। ঠেলা দিলাম পাল্লায়।
তালা নেই, হাঁ হয়ে খুলে গেল দরজা। প্রায় নাচতে নাচতে চৌকাঠ পেরিয়ে ওপাশের নিচু একটা করিডোরে
ঢুকে পড়ল আমার নেকড়ে বন্ধু। আমিও ঢুকলাম। শরীর তখন ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত। কিন্তু তারচেয়েও বেশি অনুভব
করলাম এক অজানা ভয়। দূর্গের ভেতর পা দেয়ামাত্র মনে হলো যেন কোনও অশুভ জগতে ঢুকে পড়েছি। কিন্তু
ফেরার উপায় নেই। যন্ত্রচালিতের মতো হাঁটতে থাকলাম নেকড়ে বন্ধুর পেছন পেছন।
ভূ-গর্ভস্থ, ধ্বংসপ্রায় এক চ্যাপেলে আমায় নিয়ে গেল ও।
ছাদের একাংশ ভেঙে পড়েছে, সেখান দিয়ে ঢুকছে
সূর্যের ম্লান আলো। বাতাস সোঁদা সোঁদা, সেইসঙ্গে
ভাসছে বোটকা এক দুর্গন্ধ….. যেন একদল ইঁদুর মরে পচে আছে ওখানে। সারি সারি কবর আর সমাধি দেখতে
পেলাম ওখানে। ভূগর্ভস্থ গোরস্থানে এসে পড়েছি আমি!
কতকাল যে এখানে কারোর পা পড়েনি কে জানে!
সবখানে পুরু হয়ে জমেছে ধূলো আর মাটি।
আমায় দাঁড় করিয়ে রেখে গোরস্থানে ঢুকে পড়ল
নেকড়েটা। একে একে সবগুলো কবরের পাশে গিয়ে
থামছে, গন্ধ শুঁকছে নাক টেনে। যেন বোঝার চেষ্টা করছে
কিছু। আমি তখন ক্লান্তির শেষ সীমায় পৌঁছেছি, ধপ
করে বসে পড়লাম মাটিতে। শরীরে একবিন্দু শক্তি
পাচ্ছি না। ঘুম পেয়েছে খুব, তাই শুয়ে পড়লাম। সবে চোখ বুজেছি, এমন সময় ফিরে এল আমার নেকড়ে বন্ধু। জামার হাতা কামড়ে ধরে টানাটানি শুরু করল। বুঝলাম, কোথায় যেন নিয়ে যেতে চাইছে। আর শুয়ে থাকা সম্ভব হলো না, অগত্যা সঙ্গী হলাম ওর।
একটা সমাধির সামনে আমায় নিয়ে এল ও। আকারে –
আয়তনে অন্যগুলোর চেয়ে আলাদা। ওপরে একটাই নাম লেখা – ‘ কাউন্ট ড্রাকুলা’।
নামটা পড়েই ভেতরে ভেতরে যে কেমন একটা অনুভূতি
হলো, তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। নামটা
অপরিচিত ; কিন্তু মনে হলো যেন কতকালের পরিচিত।
মুগ্ধতায় ভরে উঠল মন, একইসঙ্গে শিউরে উঠল ভয়ে।
পরিত্যক্ত এই ভূগর্ভস্থ গোরস্থান, প্রাচীন ক্যাসল আর
ক্যাসলের বাইরের শ্বাপদসঙ্কুল জঙ্গল যেন নীরবে
চিৎকার করে কিছু বলল আমায়।
মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে ছিলাম, সম্বিৎ ফিরল আমার
নেকড়ে বন্ধুর আওয়াজে। পাগলের মতো দু’পা দিয়ে মাটি খুঁড়ছে ও। খুব শীঘ্র একটা গর্ত করে ফেলল। তারপর ইশারায় বোঝাল, সঙ্গে আনা ছাইমাটি ওখানে ঢেলে ফেলতে হবে আমায়…..তারপর বোঁচকায় ভরতে হবে সদ্য খোঁড়া আলগা মাটি। অদ্ভুত এই নির্দেশের কোনও আগামাথা কিছু বুঝতে পারলাম না, একবার ভাবলাম বুঝি ভুলই করছি ইশারার অর্থ বুঝতে। কিন্তু দাঁতমুখ খিঁচিয়ে আমায় হুমকি দিল নেকড়ে। তাই আর দ্বিধা করলাম না, ওর ইচ্ছেমত গর্তে ছাইমাটি ঢেলে বোঁচকা ভরে নিলাম নতুন মাটি দিয়ে।
কাজ শেষে হাঁপাতে শুরু করলাম – ক্লান্তির শেষ সীমায়
পৌঁছে গেছি, জ্ঞান হারাবার দশা। আমার অবস্থা যেন
বুঝতে পারল নেকড়েটা। বোঁচকার মুখ চোয়ালে আটকে
টানতে শুরু করল, আমায় চোখের ভাষায় বলল অনুসরণ করতে। অপ্রকৃতিস্থের মতো ওকে অনুসরণ করলাম।
গোরস্থান থেকে বেরিয়ে এলাম আমরা। চওড়া এক সিঁড়ি
ধরে নিয়ে গেল ক্যাসলের ওপরতলায়। ওখানকার একটা
কামরায় আমায় পৌঁছে দিয়ে গায়েব হয়ে গেল নেকড়ে
বন্ধু।
ভেতরে কি আছে না আছে, খেয়াল করিনি। আবছাভাবে
একটা কাউচ দেখতে পেয়ে সেটার ওপর ঢলে বসে পড়লাম।
তারপর ঘুমিয়ে পড়েছিলাম না জ্ঞান হারিয়ে
ফেলেছিলাম, বলতে পারব না। কামরাটা এককালে খুব
সুন্দর ছিল, বোঝা যায়। দামি আসবাবপত্র, মেঝেতে
গালিচা, জানলায় রেশমি পর্দা, মাথার ওপর বহুমূল্য
ঝাড়বাতি – সবই ছিল। এখন আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।
আসবাবপত্রে ঘুণ ধরেছে, পোকায় খেয়ে ফেলেছে
গালিচা আর পর্দা। ঝাড়বাতির কাঁচ কালো হয়ে গেছে
ময়লা পড়ে। সবখানে ধুলো আর মাকড়শারজাল। পুরনো
একটা গন্ধ ভাসছে বাতাসে।
বাইরে সাঁঝের আঁধার নামতে শুরু করেছে, অনেক খুঁজেও কামরায় কোনও মোমবাতি পাইনি। রাতের অন্ধকারে এই ছমছমে পরিবেশে একাকী থাকতে হবে ভাবতেই আতঙ্কে হিম হয়ে আসছে হাত-পা। কোথায় গেল আমার নেকড়ে বন্ধু? কেন একাকী ফেলে চলে গেল আমায়? আর কি ফিরবে ও? নাকি ক্ষুধাতৃষ্ণায় তিলে তিলে মরতে হবে আমায়?
মাঝে মাঝেই জানলা দিয়ে বাইরে তাকাচ্ছি আমি।
দুগ্ধধবল জোছনায় স্নান করেছে প্রকৃতি। শ্বেতবর্ণ ধারণ
করেছে দূর্গের দেয়াল, উঁচু পাহাড়সারি আর ঘন অরণ্য।
মোহনীয় এক পরিবেশ। নেশার মতো লাগছে আমার।
কে যেন হাত বোলাচ্ছে আমার গায়ে। শুনতে পাচ্ছি
তরুণী কন্ঠে জলতরঙ্গের মতো হাসি….মোলায়েম, সুরেলা নারীকন্ঠ। মনে হলো, একটা নয়, কয়েকটি মেয়ে’র গলা।
” বোন! ” ফিসফিস করে উঠল একটা নারীকন্ঠ, ” মিষ্টি
বোন!”
ঠাণ্ডা লাগছে আমার….ভীষণ ঠাণ্ডা….

।।২৭ আগস্ট, সকাল।।

তাড়াতাড়ি যা লেখার লিখে ফেলতে হবে আমায়। হাত
কাঁপছে আমার, চোখ ভরে আছে পানিতে…দৃষ্টি খোলা।
গলার কাছে দলা পাকিয়ে আছে কি যেন! বুক ফেটে
যাচ্ছে কষ্টে। তারপরেও লিখতে হবে আমায়।
গত সন্ধ্যায় ডায়েরী লেখা শেষ করতে পারিনি, আচমকা
প্রচণ্ড ঠান্ডায় ঠকঠক করে কাঁপতে শুরু করেছিলাম।
হাড্ডিমজ্জা জমে যাচ্ছিল সেই ঠান্ডায়। মনে হচ্ছিল
কোমল হাতগুলোর স্পর্শেই এমন দশা হয়েছে আমার।
হাতের মালিকদের দেখবার ডাইনে বামে তাকিয়েছিলাম, কিন্তু বিস্মিত হয়ে দেখেছি কামরায় আমি ছাড়া আর কেউ নেই। তা হলে কারা এতক্ষণ হাত বোলাচ্ছিল আমার গায়ে? ধূলিমলিন মেঝেতে ফুটফুটে চাঁদের আলোতেও দেখেছি, আমার পায়ের ছাপ ছাড়া আর কারোর পায়ের ছাপ নেই। তাহলে আমি এতক্ষণ
আমার কানে কানে কাদের অস্পষ্ট গুঞ্জন শুনছিলাম?
আমি যে একটি নয়, বেশ কয়েকটি মেয়ের গুঞ্জন শুনেছি
আমার কামরায়।
গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল আমার।
এ সময় ফিরে এল আমার নেকড়ে বন্ধু। দৃপ্ত ভঙ্গিতে ঢুকল দরজা দিয়ে, এক লাফে আমার কাউচের ওপর উঠে বসল।
অস্তগামী সূর্যের মতো জ্বলছিল ওর চোখদুটো। জিভ
দিয়ে যখন আমার হাত চেটে দিল, উত্তাপ অনুভব করলাম।
অথচ এতদিন যখন আমার হাত চেটে দিত, মরা লাশের
শীতলতা অনুভব করতাম। এতকিছু ভাবার আর ক্ষমতা নেই আমার, আপনা থেকেই মুদে এল চোখদুটো, কাউচে শুয়ে পড়লাম আমি। টের পেলাম, আমার দেহের ওপর উঠে বসেছে নেকড়েটা, যেন গরম রাখতে চাইছে আমায়। গলায় ওর জিভ আর দাঁতের স্পর্শ অনুভব করলাম, শিহরিত হলাম অজানা এক আনন্দে।
বোধহয় তারপর স্বপ্নই দেখতে শুরু করলাম। আমার বন্ধুটির দিকে তাকাতেই ওকে আর নেকড়ে বলে মনে হলো না।
মনে হলো দীর্ঘদেহী এক মানুষ, যার হাতের আঙুলগুলো
অস্বাভাবিক লম্বা। কেমন বিবর্ণ আর পাণ্ডুর মুখটা।
চোখদুটো দিয়ে যেন লাল দ্যুতি বেরোচ্ছে। তবে
লোকটা নিরেট নয়। আমাকে ছুঁতে গিয়েও পারছে না। আমিও পারছি না তাকে ছুঁতে। লোকটার মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা হতাশা আর যন্ত্রণা অনুভব করতে পারছিলাম। মনে হচ্ছিল, লোকটা অন্য একটা জগতে রয়েছে এখন। সে জড়জগতে ফিরে আসতে যেন মরিয়া। চোখের সামনে একটা দৃশ্যও যেন ভেসে উঠল – পাহাড় বনানীর মাঝ দিয়ে ছুটে আসছে একটা ক্যারিজ…কারা যেন ক্যারিজটাকে থামাল, তারপর কফিনের মতো একটা বাক্স নামিয়ে নিয়ে এল ক্যারিজটা থেকে….তারপর কফিনের ডালা খুলে ভেতরে শুয়ে থাকা একটা মানুষের শরীরে বুকে গেঁথে দিল একটা গোঁজ….তারপর যেন সবকিছু আঁধার সমুদ্রে নিমজ্জিত হয়ে গেল।
এসব দেখতে দেখতে হঠাৎ ঝাঁকি খেলাম আমি, তীব্র
ব্যথায় কুঁকড়ে গেল দেহ। মনে হলো পাঁজর বিদীর্ণ করে
কিছু একটা ঢুকে পড়েছে শরীরে। যন্ত্রণায় ককিয়ে
উঠলাম, গোঙানি বেরোতে লাগল মুখ দিয়ে….তবে
বেশীক্ষণ স্থায়িত্ব হলো না সে ব্যথা। একটু পর কি এক
প্রশান্তি ভর করল আমার মাঝে। স্বপ্নহীন, নিরুদ্বেগের
ঘুমে তলিয়ে গেলাম।
আধঘণ্টা আগে যখন ঘুম ভাঙল, দেখলাম সকাল হয়ে গেছে। চোখে পড়ল আরেকটা ব্যাপার….আমার এতদিনের বন্ধু….আমার একান্ত সঙ্গী নেকড়েটা মরে পড়ে আছে আমার পাশে। বুকটা যে কেমন করে উঠল, বোঝাতে পারব না। ওকে জড়িয়ে ধরলাম আমি, কাঁদতে শুরু করলাম হাউমাউ করে। তারপর একটা কণ্ঠস্বর কানে আসতেই থেমে গেলাম….না, বাইরে থেকে নয়….আমার মাথার ভেতর থেকেই একটা পুরুষকন্ঠ যেন বলছে…..
” নেকড়ের ভেতর আমিই এতদিন আশ্রয় নিয়ে
ছিলাম….এবার আমি এই নেকড়ের দেহ ছেড়ে বেরিয়ে
এসেছি….. আপাতত ঠাঁই নিয়েছি তোমারই মধ্যে। ওটা’র
জন্য শোক করার প্রয়োজন নেই, কারণ নেকড়ে নয়, তুমি
এতদিন আমার ইচ্ছানুসারে কাজ করেছ। স্বপ্নে দেখা
সেই দীর্ঘদেহী মানুষটিই এখন কথা বলছে তোমার ভেতর
থেকে….আমিই তোমার মালিক….খুব শিগগীরই আমায়
দেখতে পাবে।”

একটু থেমে সেই কণ্ঠস্বর আবার বলল, ” তোমায় আমার খুব দরকার। একমাত্র তুমিই আমায় ফের জাগিয়ে তুলতে পারো….সাহায্য করতে পারো ফের রক্তমাংসের শরীর ধারণে সহায়তা করতে….আমার আগের দেহটাকে ধ্বংস করে দিয়েছিল ওরা….কিন্তু আমার আত্মা এখনো
আছে….সেই আত্মা আর দেহের সমস্ত দায়ভার এখন
তোমার….এ কাজে তোমার ব্যর্থ হলে চলবে না।”
পাগল হয়ে যাচ্ছি কিনা কে জানে….এ সব কি আমি ভুল
শুনছি! কিন্তু কি জানি কেন এই দায়িত্বটা পেয়ে আমি
যেন আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়ছি। আমার বাবা,
মিকোলাস বা আন্দ্রে চাচা….কেউই আর গুরুত্বপূর্ণ নয়
আমার জীবনে। মনে মনে ছিন্ন করেছি ওদের সঙ্গে
সমস্ত সম্পর্ক। আমার সারা অস্তিত্ব জুড়ে এখন শুধু একজনেরই প্রাধান্য….

আমার ওই অদৃশ্য সঙ্গী। তাকে আমি আমার আত্মা সমর্পণ করেছি। তার পথ-ই আমার পথ এখন থেকে।

ইলিনা কোভাক্সের ডায়েরীর শেষাংশ

।।১ সেপ্টেম্বর।।

অবশেষে ডায়েরী লেখার মতো শক্তি ফিরে পেয়েছি।
আমি এখন বুদাপেস্টে, আমাদের বাড়িতে। কিভাবে
এখানে পৌঁছলাম, সংক্ষেপে তা জানাই।
দূর্গ থেকে আমার অদৃশ্য সঙ্গীর নির্দেশে সেদিনই
বেরিয়ে পড়েছিলাম আমি, পাহাড়ের মাঝে উদভ্রান্তের
মতো ঘুরতে থাকা অবস্থায় একদল রাখাল আমায় খুঁজে
পায়। পাগলের মতো দেখাচ্ছিল আমায়- উষ্কখুষ্ক চুল,
গায়ে ময়লা, কাঁধে মাটিভর্তি বোঁচকা।
আসল ঘটনা কিছুই জানাইনি ওদের, মিথ্যে করে বলেছি… বাবার সঙ্গে ক্যারিজে চেপে বিসট্রিজে যাচ্ছিলাম, পথে একদল নেকড়ে হামলা করে আমাদের ওপর ;বাবা মারা গেছে, আমি কোনওমতে প্রাণ নিয়ে পালিয়েছি। আমার এ কাহিনী ওরা সরল মনেই বিশ্বাস করে নেয়, তাই খুব বেশী প্রশ্ন করেনি। গ্রামে নিয়ে গিয়ে আমার সেবা শুশ্রূষা করেছে, নতুন পোশাক দিয়েছে, তারপর তুলে দিয়েছে বুদাপেস্টগামী ট্রেনে।
বলা বাহুল্য, সবকিছুই ঘটে চলেছে আমার অদৃশ্য সঙ্গীর
ইশারায়। সে যা বলছে, তাই-ই করছি আমি। নিজস্ব স্বত্তা
বলতে কিছুই নেই, আমি এখন স্রেফ তার হুকুমের দাসী।
যেভাবে আমায় চালাচ্ছে, ঠিক সেভাবেই চলছি।
আনন্দের সঙ্গে।
বাড়িতে এখন আমাদের বুড়ি হাউজকীপার ছাড়া আর
কেউ নেই। ওর মুখেই শুনলাম, মিকোলাসকে নিয়ে আন্দ্রে চাচা নাকি কি এক প্রত্নতাত্ত্বিক অভিযানে
গেছেন….অন্তত দু’এক সপ্তাহের আগে ফিরছেন না। অবাক হইনি, ছেলেবেলা থেকেই জানি সুযোগ পেলেই ঘর ছেড়ে দূর দূরান্তে বেরিয়ে পড়া চাচা’র স্বভাব। উনি না
থাকাতে বরং খুশীই হয়েছি। এখুনি বাবা’র মৃত্যুসংবাদ
দিতে হলো না। ঘটনাটার সঠিক ব্যাখ্যা দেয়া সম্ভব হতো
না আমার পক্ষে।
বাড়িতে চাচা’র একটা চিঠি পড়ে আছে – আব্রাহাম
ভ্যান হেলসিংয়ের লেখা….খোলা হয়নি। বোধহয় চিঠিটা
এসে পৌঁছনোর আগেই রওনা হয়ে গেছেন চাচা। কেন যেন চিঠি’টা পড়ে দেখবার তীব্র ইচ্ছা জাগল, যদিও অন্যের চিঠি পড়া একদম উচিত নয়। নাহ, কাজটা ঠিক হবে না।
ডায়েরী লেখা থামাই। চিঠি লিখতে হবে এখন আমাকে।
আন্দ্রে কোভাক্সের কাছে আব্রাহাম ভ্যান হেলসিংয়ের চিঠি
( এই চিঠি প্রফেসর আন্দ্রে কোভাক্স পান’নি)

।।২৮ আগস্ট, আমস্টারডাম।।

প্রিয় আন্দ্রে,

প্রথমেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি তোমার চিঠির জবাব দিতে
এত দেরী করায়। গত কিছুদিন ধরে মনটা বিক্ষিপ্ত
হয়েছিল অন্য একটা বিষয়ে। কোনও কাজে মন দিতে
পারিনি।
আমার স্ত্রী মারা গেছে, আন্দ্রে। কষ্ট পাচ্ছি….কিন্তু
বলতে দ্বিধা নেই, মৃত্যুটা এক অর্থে মুক্তি দিয়েছে
ওকে। বেঁচে থাকতেই যেন ও বেশী কষ্ট পেত আর কষ্ট
দিত আমায়। তুমি তো ওর ব্যাপারটা জানো আন্দ্রে,
পাগল হয়ে গিয়েছিল বেচারি, অনেকদিন ধরেই মানসিক
হাসপাতালে ভর্তি ছিল, আমাকে পর্যন্ত চিনতে পারত
না। স্ত্রী বেঁচে থাকা স্বত্তেও আমি ছিলাম বিপত্নীক।
এবার সেই সুতোও ছিঁড়ে গেল। ভালই হয়েছে একদিক
থেকে।
যাক সেসব কথা। তোমার স্কলোম্যান্স অভিযানের
প্রসঙ্গে আসি। আগ্রহ জাগাবার মতোই একটা কাজে
নামতে চলেছ তুমি, কিন্তু তোমায় এক্ষেত্রে সতর্ক করে
দেবার প্রয়োজন আছে। আগেই বলেছি, শয়তানের অশুভ ক্ষমতার ব্যাপারটা স্রেফ গল্পগাথার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, ড্রাকুলা’র অস্তিত্ব -ই ছিল সেটার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
স্কলোম্যান্স আছে কি নেই, এই প্রশ্ন যদি করো তো
নির্দ্বিধায় বলব, ওটা আছে।
তবে স্কলোম্যান্স খুঁজে বের করা এবং সেখানে পৌঁছনো
সহজ কাজ নয়। নিঃসন্দেহে অত্যন্ত গোপন আর সুরক্ষিত জায়গায় লুকিয়ে আছে ওটা। শয়তান’ও নিশ্চয়ই এমন সব বাধা বিপত্তির জাল বিছিয়ে রেখেছে যে সাধারণ মানুষ সহজে ওখানে পৌঁছতেই পারবে না। তবে তোমার মতো উদ্যমী, জ্ঞানী এবং বুদ্ধিমান মানুষ যে সব বাধা উতরে যেতে পারবে, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু তারপর? স্কলোম্যান্স খুঁজে বের করার ফলাফল যে কি হতে পারে, তা কি তুমি ভেবে দেখেছ?
এই পরিস্থিতিতে একটাই পরামর্শ তোমায় দিতে
পারি…মানবে কি মানবে না, সেটা তোমার ব্যাপার।
আমি বলব, স্কলোম্যান্স’কে ঘাঁটাতে যেও না; যেমন
আছে, তেমনই থাকতে দাও অশুভ ওই জায়গা’কে।
না, শুধু পরামর্শ নয়, এ আমার অনুরোধ জানবে। যেয়ো না তুমি ওই অভিযানে, প্রিয় বন্ধু আমার। কিছুতেই না।
ইতি, তোমার বন্ধু,
আব্রাহাম ভ্যান হেলসিং

মীনা হারকারের কাছে ইলিনা কোভাক্সের চিঠি

।।১ সেপ্টেম্বর।।

প্রিয় মাদাম হারকার,

শ্রদ্ধা নেবেন। জটিল এক পরিস্থিতিতে এই চিঠি
লিখছি। ভয়ানক এক ঘটনা ঘটে গেছে….আমার বাবা মারা গেছেন। সন্ধেবেলায় ছবি আঁকতে গিয়েছিলেন বাইরে; কারোর বারণ শোনেননি, ফলে যা ঘটবার তাই ঘটেছে। বুনো নেকড়ের আক্রমণের শিকার হয়েছিলেন তিনি। যখন তাঁকে উদ্ধার করা হয়, তখন আর কিছু করার করার ছিল না।
অল্প সময় পরেই শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।
খামারে আর থাকা সম্ভব হয়নি আমার পক্ষে। সোজা
ফিরে এসেছি বাড়িতে। কিন্তু এখানে পৌঁছেই দেখলাম,
আন্দ্রে চাচা আর তাঁর ছাত্র মিকোলাস এক অভিযানে
চলে গেছেন। কবে ফিরবেন কোন ঠিক নেই। ওঁরা জানেন
না, ফেরার সঙ্গে সঙ্গে কি দুঃসংবাদ পাবেন তাঁরা।
এদিকে আমার মাথা খারাপের মতো অবস্থা….. একাকী এ বাড়িতে কিছুতেই মন বসছে না। একজন সঙ্গীর দরকার অনুভব করছি প্রতি মূহুর্তে। আপনার প্রতি তাই আমার অনুরোধ – যদি সম্ভব হয় কয়েকটা দিন আপনাদের ওখানে থাকতে দিন আমায়, চাচা না ফেরা পর্যন্ত।
অনুরোধটা করছি নিতান্ত অনন্যোপায় হয়ে। কথা দিচ্ছি,
আপনাদের কোনও অসুবিধা করব না। প্রয়োজনে
আপনাদের কাজেকর্মেও সাহায্য করতে রাজি আছি।
তারপরেও যদি আপত্তি থাকে, আমি কিছু মনে করব না।
কিন্তু যদি এটুকু উপকার করেন, আমি সেটা সারাজীবন
মনে রাখব।
আর কিছু লিখতে পারছি না। আপনার সিদ্ধান্ত তাড়াতাড়ি জানাবেন।

বিনীতা,

ইলিনা কোভাক্স

ইলিনা কোভাক্স’কে লেখা মীনা হারকারের চিঠি

।।৫ সেপ্টেম্বর।।

প্রিয় ইলিনা,

তোমার চিঠি পড়ে খুব কষ্ট পেলাম। এখানে আসতে
চাইছ….অবশ্যই আসবে। এ পরিস্থিতিতে একাকী থাকা
উচিত হবে না তোমার। মিঃ এমিল কোভাক্সের মৃত্যুর
খবর জেনে আমরা সবাই মর্মাহত। কার্পেথিয়ানের মতো
দুর্গম বিপদসঙ্কুল জায়গায় আরেকটু সতর্কভাবে
চলাফেরা করলে হয়তো এ ঘটনা ঘটত না। কিন্তু এখন আর এ নিয়ে মাতম করে লাভ হবে না। যত তাড়াতাড়ি পারো চলে এসো। প্রফেসর ভ্যান হেলসিং-কেও খবর দিয়েছি আমরা। তোমার চাচার ঘনিষ্ঠ বন্ধু তিনি, নিঃসন্দেহে তোমার পাশে থাকতে চাইবেন।
কবে – কখন – কিভাবে আসছ, পত্র মারফত জানিয়ো
আমাকে। যাত্রার ব্যাপারে কোনও সাহায্য বা
পরামর্শের প্রয়োজন হলে চাইতে দ্বিধা কোরো না।
ইংলন্ডে পৌঁছনোর পর ট্রেনে চেপে এক্সেটারে আসতে
পারবে, অথবা আমি আর জোনাথনই লন্ডনে গিয়ে তোমায় রিসিভ করতে পারি। কিসে তোমার সুবিধা হয় জানিও।
এখানে থাকার বিনিময়ে আমাদের ঘরের কাজে কর্মে
সাহায্য করতে চাও বলে জানিয়েছ, তবে ওসবের
প্রয়োজন নেই। একটা ব্যাপারেই শুধু বন্ধু হিসেবে তোমার
সাহায্য পেলে ভাল হয়… আমার ছেলে কুইন্সির
দেখাশোনার ব্যাপারে। ওর গভর্নেসের বিয়ে ঠিক হয়ে
গেছে, তাই চাকরী ছেড়ে চলে গেছে সে। মিসেস
অ্যালিস সিউয়ার্ড যদ্দূর পারেন করছেন, কিন্তু তাঁরও তো
ঘর সংসার আছে। কাজেই যে-কদিন এখানে থাকবে, সে-
কদিন তুমি একটু কুইন্সি’কে সঙ্গ দিতে পারো, খুব উপকার হবে আমাদের। আশা করি তার মধ্যে আমরা নতুন একজন গভর্নেস জোগাড় করে ফেলতে পারব।
তোমার আসার অপেক্ষায় রইলাম।

ইতি,

মীনা হারকার।

।। মীনা হারকারের ডায়েরী।

।। ১১ সেপ্টেম্বর।।

এসে পড়েছে ইলিনা। আমি আর জোনাথন লন্ডনে গিয়ে
স্টেশন থেকে রিসিভ করেছি ওকে। বাড়ির সবচেয়ে বড়
গেস্টরুমটায় উঠেছে ও। বেশ ভাল লাগছে মেয়েটা আসায়।
হোক অল্পসময়ের জন্য, তবু তো ভাল, একজন সঙ্গী
পেলাম। জোনাথন অফিস চলে গেলে আমি তো একেবারে একা হয়ে যাই, কথা বলবারও কেউ থাকে না। লন্ডন থেকে এক্সেটার আসার পথে গাড়িতে একেবারেই চুপচাপ ছিল ইলিনা।
কুশল বিনিময়ের পরে খুব একটা আর কথা বলেনি। আমরা ভাবলাম –
লম্বা জার্নির কারণে ক্লান্ত বেচারি, তাছাড়া বাবার মৃত্যুর শোক এখনো সম্ভবত কাটিয়ে উঠতে পারেনি- তাই আর বিরক্ত করিনি ওকে। এখানে এসে বিশ্রাম আর খাওয়া দাওয়ার পর অবশ্য সতেজ হয়ে উঠেছে ; আমাদেরকে খুলে বলেছে ওর বাবার মৃত্যুর ঘটনা। কাঁদেনি খুব বেশী, কথাও বলেছে সহজ ভঙ্গিতে….আশা করছি খুব শীঘ্রি স্বাভাবিক হয়ে উঠবে। মিঃ এমিল কোভাক্সের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার ব্যাপারে আলোচনাতেও চরম অনাগ্রহ লক্ষ্য করেছি ইলিনার মধ্যে। সংক্ষেপে শুধু বলেছে, সঙ্গে কোনও গুরুজন ছিল না বলে বাবা’র লাশটার সব দায়িত্ব সে ‘যেকেলি’ কৃষকদের ওপর ছেড়ে দিয়ে এসেছে। যা করারওরাই করবে। ইলিনার কথাবার্তা শুনে মনে হলো ওখান থেকে এক অর্থে যেন পালিয়ে এসেছে মেয়েটা….পিতার শেষকৃত্যের ভার সামলাতে চায়নি। ওকে দোষও দিতে পারছি না এজন্য। অল্পবয়সী একটা মেয়ে….বিদেশ বিভুঁইয়ে সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ…..এই পরিস্থিতিতে ওর কাছ থেকে দায়িত্বশীল আচরণ আশা করা যায় না। ইলিনা’কে জানিয়েছি, এখনও পর্যন্ত ওর চাচা মিঃ আন্দ্রে কোভাক্সের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারিনি আমরা। ভ্যান হেলসিং, মিঃ কোভাক্সের শেষ একটা চিঠি পেয়েছিলেন কিছুদিন আগে – তাতে প্রফেসর কোভাক্স লিখেছিলেন, মিকোলাসকে নিয়ে তিনি হারমানস্টাডের কাছাকাছি এলাকা থেকে অনুসন্ধান শুরু করতে চলেছেন। ওঁরা এখন ঠিক কোথায়, তা কেউই বলতে পারছে না। অবস্থাদৃষ্টে মনে
হচ্ছে, অভিযান শেষ না হওয়া পর্যন্তই অপেক্ষা করতে হবে প্রফেসর কোভাক্সের জন্য।
ইলিনা শুতে চলে যাবার পর পার্লারে বসেছিলাম আমি আর মিসেস অ্যালিস সিউয়ার্ড….মানে ডাঃ সিউয়ার্ডের স্ত্রী। গল্প করার ফাঁকে উঠে এল আমাদের নতুন অতিথির প্রসঙ্গ। ইলিনা এসে পড়ায় এবার নিজের বাড়িতে ফিরে যাবেন অ্যালিস; বললেন, ” কুইন্সি’কে ছেড়ে যেতে হবে ভেবে খারাপ লাগছে। ইলিনা ওকে সামলাতে পারবে কি না কে জানে!” ” ওসব নিয়ে চিন্তা করবেন না
তো!” বললাম আমি, ” আপনার নিজেরও তো সংসার আছে।
স্বামী সংসার ছেড়ে আর কতদিন এখানে পড়ে থাকবেন?”
মিসেস সিউয়ার্ড বললেন, ” জানি। কিন্তু কুইন্সি’র জন্যও মন কেমন করছে। ইলিনা নিজেই তো একটা বাচ্চা মেয়ে। দুঃখ কষ্টে কাতর হয়ে আছে। তার ওপর ওর কাঁধে বাচ্চাটার দায়িত্ব চাপানো….. ” ” তাতে কি!” আমি বললাম, ” ইলিনা তো একা নয়, আমিও আছি এখানে।
দুজনে সামলে নিতে পারব যেভাবে পারি। আপনি এমনিতেই যথেষ্ট করেছেন”। কথাটা জোর দিয়ে বললেও মনে মনে একটু যে শঙ্কা অনুভব করিনি, তা নয়। মিসেস সিউয়ার্ডের ওপর যেভাবে নির্ভর করেছি এতদিন, সেটা ইলিনার বেলায় সম্ভব হবে না। সত্যি বলতে কি, অ্যালিস সিউয়ার্ডকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করি আমি….অত্যন্ত বিশ্বাস করি। মনে মনে তাঁকে আমি বড় বোনের আসনে বসিয়েছি। তাঁর কাছে খুঁজে পাই অটল পাথরের মতো অবলম্বন। উনি চলে গেলেই অবলম্বনটা হারাব আমি, খারাপ লাগাটাই স্বাভাবিক।

।। ১৪ সেপ্টেম্বর।।

মিসেস সিউয়ার্ড চলে গেছেন। ইলিনাও চমৎকারভাবে আমাদের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে নিজেকে। কুইন্সি’র সঙ্গে ওর বেশ খাতির হয়ে গেছে এর মধ্যে…..নিয়মিত সঙ্গ দিচ্ছে,খেলছে, ঘুম পাড়াচ্ছে। কুইন্সি’ও ধীরেধীরে ভক্ত হয়ে উঠছে ওর।
দু’জনকে একসঙ্গে দেখতে বেশ লাগে।
আমিও ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠছি ইলিনার সঙ্গে। লুসি’র পর সত্যিকার অর্থে কোনও বান্ধবী ছিল না আমার এতদিন। কিন্তু এবার বুঝি তেমন একটা বান্ধবী পেতে চলেছি আমি। আশাবাদী হয়ে উঠছি। অবশ্য লুসি আর ইলিনা’র মধ্যে আকাশ আর পাতালের তফাত। লুসি ছিল হাসিখুশী, প্রাণোচ্ছল ; কিন্তু ইলিনা রীতিমতো গম্ভীর একটা মেয়ে।
তারপরেও ওর সঙ্গে কথা বলবার সময় অদ্ভুত এক আনন্দে ছেয়ে যায় হৃদয়।
কেন এমন বোধ করি কে জানে!

।।১৬ সেপ্টেম্বর।।

চমৎকার একটা দিন কাটল আজ। জোনাথন অফিসে চলে গেলে কুইন্সি’কে নিয়ে হাঁটতে বেরিয়েছিলাম আমি আর ইলিনা। আমাদের বাড়ির খুব কাছেই রয়েছে গ্রাম্য এলাকা, সেখানে অবারিত প্রকৃতি।
আবহাওয়াও ছিল চমৎকার…. খুব গরম নয়, আবার খুব ঠান্ডাও নয়।
সূর্যের আলোয় ঝলমল করছিল প্রকৃতি, গাছপালার ফাঁক দিয়ে আসছিল শরীর – মন জুড়নো হাওয়া। বুনো ঝোপঝাড়ে ফুটে ছিল রঙবেরঙের ফুল।
গীর্জার কাছে একটা কুঁড়েঘরে থেমে চা পান করেছি আমরা, গল্প করেছি। তারপর বাড়ি ফেরার পথে গীর্জার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ একটা অদ্ভুত অনুরোধ করে বসল ইলিনা। গীর্জা সংলগ্ন গোরস্থানটা একবার দেখতে চায় ও। অবাক হলাম প্রথমটায়।
তারপরে ভাবলাম,বোধহয় সদ্যপ্রয়াত বাবা’র কথা ভেবেই ও দেখতে চাইছে। ওর এই সামান্য অনুরোধ রক্ষা করায় তেমন কোনও ক্ষতি ছিল না, কিন্তু রাস্তা থেকে গোরস্থানের দিকে তাকিয়েই দমে গেলাম। কতকাল ধরে যে জায়গাটার পরিচর্যা করা হয় না, কে জানে! অযত্নে অবহেলায় ঘাস আর আগাছার জঙ্গল সৃষ্টি হয়েছে ওখানে। তার মাঝ থেকে মাথা উঁচু করে রেখেছে পুরনো পুরনো সব কবরফলকের সারি….বয়সের
ভারে কালচে রঙ ধারণ করেছে ওগুলো, গায়ে শ্যাওলার
আস্তর। গোরস্থানের পুরোটাই ছায়ায় ঢাকা…তাকালে কেমন একটা অশুভ অনুভূতি হয়। কুইন্সি’র জন্য এমন পরিবেশ মোটেও ভ্রমণের উপযুক্ত নয়। তাই যতটা সম্ভব ভদ্রভাবে প্রত্যাখ্যান করলাম ওর অনুরোধটা। ইলিনা মনে মনে মনঃক্ষুণ্ণ হলো কিন্তু কিছু করার ছিল না আমার।
যা হোক, বাড়ি ফেরার পথে আবার স্বাভাবিক হয়ে গেল ও।
হাসিমুখে কথা বলল, হাঁটল চপল পায়ে। উজ্জ্বল সূর্যালোকে ওর চেহারায় রক্তের আভা দেখতে পেলাম। ফ্যাকাসে ভাবটা কেটে যাচ্ছে। ব্যাপারটা লক্ষ্য করে ভাল লাগল। বাবা’কে হারানোর শোক ধীরেধীরে কাটিয়ে উঠছে মেয়েটা।
বাড়ি ফেরার পরে ঘুমোতে পাঠালাম কুইন্সিকে। কিছুতেই শুতে যেতে চাইছিল না ও, কিন্তু ভুলিয়ে ভালিয়ে ইলিনা ঠিকই বিছানায় নিয়ে গেল ওকে। ইলিনা যেন জাদু করেছে কুইন্সিকে; ওর কথা
কিছুতেই ফেলতে পারে না আমার ছেলে।
সন্ধেটা বেশ উপভোগ করলাম আমরা। ডিনারের পর চা নিয়ে বারান্দায় বসেছিলাম আমি, ইলিনা আর জোনাথন। গল্প করতে করতে উপভোগ করছিলাম সূর্যাস্ত। অস্তগামী সূর্যের ছটায় রাঙা হয়ে উঠেছিল আমাদের বাড়ির সামনের বাগান। সেদিকে তাকিয়ে মন ভরে গেছে অদ্ভুত এক আনন্দে।
রাতে শোয়ার জন্য যখন বিছানা ঠিকঠাক করছিলাম, তখন আমার কামরায় এল ইলিনা। জোনাথন শুয়ে পড়লে আয়নার সামনে বসেছিলাম দুজনে, চুল আঁচড়ে দিয়েছি একে অন্যের….ঠিক যেভাবে লুসি আর আমি পরস্পরের চুল আঁচড়াতাম। ক্ষণিকের জন্য ফিরে গিয়েছিলাম পুরনো সেই দিনগুলোয়। হাসিঠাট্টা আর গল্প করে চুল আঁচড়েছি আমরা। ইলিনার চুলগুলো আমার চেয়েও বেশী ঘন কালো….আর….. আর যেন একটু বেশীই লম্বা। যাকে বলে দীঘল কালো চুল…..
আগে এই ব্যাপারটা তো খেয়াল করিনি!

।।২২ সেপ্টেম্বর।।

গত কয়েকদিন ডায়েরী লিখিনি….লেখার মতো
উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটেও’নি এ ক’দিনে। আজ ডায়েরী
খুলে বসেছি স্রেফ একটা স্বপ্নের কথা লিখব বলে। যদ্দূর
সম্ভব বর্ণনা করছি পুরো ঘটনা….কল্পনার রঙ না মিশিয়ে।
গত কিছুদিন ধরে রাতে ঘুমোনোর আগে ইলিনা আর আমার–পরস্পরের চুল বেঁধে দেয়া আর গল্প করাটা অলিখিত এক রীতিতে পরিণত হয়েছে। গত রাতে লক্ষ্য করলাম, ওকে অন্যান্য দিনের চাইতে যেন বেশী সুন্দর লাগছে, গালে গোলাপি আভা। চুল আঁচড়ানোর ফাঁকে ও হঠাৎ আমার হাত ধরে বলল, ” মাদাম মীনা!
আমি যে আপনার প্রতি কতটা কৃতজ্ঞ, তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। এখানে আশ্রয় দিয়ে আমার বিরাট উপকার করেছেন আপনি, সুখী করে তুলেছেন আমাকে। কারণ এই বাড়িতে আমি স্বাধীন…. আগে কোনওদিন এমন স্বাধীনতা পাইনি আমি”। কথাটা
বলেই আমায় জড়িয়ে ধরল ও, চুমু খেল আমার গাল আর ঘাড়ে। চমকে উঠলাম, ওর এই আবেগটা ঠিক স্বাভাবিক মনে হলো না।
ভদ্রভাবে ওর আলিঙ্গন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিলাম আমি। বললাম, ” এভাবে বোলো না ইলিনা। তুমি এখানে আসায় আমরাও খুব খুশি….তোমার মতো একজন সঙ্গীরই দরকার ছিল কুইন্সি’র।
যতদিন খুশী এখানে থাকতে পারো, আমাদের কোনও আপত্তি নেই। চাইলে পাকাপাকিভাবেও থেকে যেতে পারো….মানে, তোমার চাচা যদি রাজি হ’ন, আর কি। এখন তো উনিই তোমার অভিভাবক। আমাদের দরজা তোমার জন্য সবসময়েই খোলা থাকবে। ” এ’কথা শুনে চোখ থেকে অশ্রু গড়াতে শুরু করল ইলিনার। সুন্দর মুখশ্রী আরও সুন্দর দেখাল ক্রন্দনরত অবস্থায়।
আমাকে বারবার ধন্যবাদ জানাল ও। শেষ পর্যন্ত আমি যখন বিছানায় শুতে এলাম, জোনাথন তখন ঘুমিয়ে পড়েছে….সারাদিনের পরিশ্রমে ক্লান্ত সে। জাগালাম না ওকে, তার বদলে বালিশে মাথা রেখে এটা সেটা ভাবতে লাগলাম। ঘুম আসছিল না কেন যেন।
হঠাৎ সচকিত হয়ে উঠলাম। অন্ধকারে কিছু দেখা যাচ্ছে না কিন্তু ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করলাম কিসের যেন উপস্থিতি। বাদুড় বা পাখি জাতীয় কিছু….পরিষ্কার শুনলাম ডানা ঝাপটানোর শব্দ।

জোনাথনের মধ্যে কোনও প্রতিক্রিয়া দেখলাম
না….একেবারে মড়ার মতো ঘুমোচ্ছে। ব্যাপারটা আমার মনের ভুল বলে সন্দেহ হলো, উঠে বসলাম, স্থির হয়ে রইলাম
কিছুক্ষণ। কিন্তু না, আবার শোনা গেল সেই ডানা ঝাপটানোর শব্দ।

প্রফেসর আন্দ্রে কোভাক্সের জার্নাল তারিখ ও সময় অজ্ঞাত কোনদিক দিয়ে কতটা সময় পেরিয়ে গেছে, বোঝার কোনও উপায় নেই আমার। হাতের লেখাও এত খারাপ হয়ে গেছে যে, নিজের পক্ষেই পড়া কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাও ঠিক করেছি, সব লিখে রেখে যাব। আমার বন্ধু ভ্যান হেলসিং, বা অন্য কেউ হয়তো সুদূর ভবিষ্যতে উদ্ধার করবে এই জার্নাল….জানতে পারবে কি ঘটেছে আমার ভাগ্যে।
বেঁচে আছি আমি, কিন্তু জানি না আর কতটা সময় বাঁচব। মরার আগে এটুকু জেনে যাচ্ছি, স্কলোম্যান্সের অস্তিত্ব আছে।
সফল হয়েছে আমার অভিযান। যদিও বাঁচার সম্ভাবনা নেই, কিন্তু স্বান্তনা এই যে, জ্ঞানের অন্বেষায় জীবন দিচ্ছি আমি। জ্ঞান – অভিশপ্ত এক জিনিস – এই জ্ঞানের তৃষ্ণাতেই স্বর্গ থেকে বিতাড়িত হয়েছিলেন আদম আর ঈভ! সেই জ্ঞান মৃত্যু ডেকে আনছে আমারও। যাক সে কথা, এখন আসল ঘটনা লিখতে শুরু করি।
মোমবাতি নিভে যাবার পর মূর্তির মতো অনেকক্ষণ বসে ছিলাম অন্ধকারে। বুঝতে পারছিলাম, মিকোলাসের খুনি…. মানে ওই মমি’র মতো দেখতে দানবটা অন্ধকারে আমার আশেপাশেই কোথাও আছে। নড়বার সাহস পাচ্ছিলাম না। কয়েক দফা বিজ্ঞানের যুক্তিতে
বোঝাতে চেষ্টা করলাম নিজেকে – হয়তো ভুল দেখেছি
আমি, হয়তো দূর্ঘটনায় মারা গেছে মিকোলাস….পা হড়কে হয়তো বা বাড়ি খেয়েছিল পাথরের বেঞ্চির সঙ্গে, রক্তবেরিয়ে এসেছিল….কিন্তু হাজার যুক্তিতেও লাভ হলো না।
মৃত্যুভয়ে কুঁকড়ে গেলাম আমি। খুব শীঘ্রি ভয়ানক ক্লান্তি ভর করল আমার মধ্যে। আধো ঘুম আর আধো জাগরণের মধ্যে দিয়ে সময় কাটতে লাগল। কিংবা হয়তো জ্ঞান হারালাম কয়েক দফা….ঠিক বলতে পারব না কি ঘটেছে। হঠাৎ সজাগ হয়ে উঠলাম চোখ ধাঁধানো আলো দেখে। চোখ পিটপিট করলাম, বুঝতে
পারছিলাম না কোথায় আছি। মাথা টনটন করছিল, সারা শরীরে অনুভব করছিলাম ভীষণ ব্যথা। খানিক পরে চোখ সয়ে এল আলো, পরিষ্কার হয়ে এল চারপাশ। লক্ষ্য করলাম, এখনও সেই চেম্বারেই আছি – বসে আছি মেঝেতে। তবে এ মূহুর্তে
পুরো চেম্বার জুড়ে জ্বলছে অনেকগুলো মোমবাতি।
কাছাকাছি একটা পাথরের বেঞ্চির ওপর পড়ে আছে
মিকোলাসের প্রাণহীন দেহ। দেখতে পেলাম, বুড়ো
মতো একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে আমার সামনে, হাতে একটা প্রদীপ। ঠোঁট সামান্য ফাঁক হয়ে আছে বুড়োটার, দেখা যাচ্ছে তার মুখের ভেতরে পশুর মতো ধারাল দাঁতের সারি। হিংস্র চেহারা, বাঁকানো নাক, মাথায় মস্ত টাক….শুধু দু’কানের ওপর ঝুলছে কিছু সাদা চুল। গায়ে লাল রঙের আলখাল্লা, তাতে সুতোয় বোনা
নকশা – ঠিক চেম্বারের অন্যান্য নকশাগুলোর মতো।
নাকে ভেসে এল পচা মাংসের বোটকা গন্ধ। গা গুলিয়ে উঠল আমার।
একটু হাসল বুড়োটা। তারপর প্রাচীন হাঙ্গেরিয়ান ভাষায় বলল, ” প্রিয় বন্ধু….প্রিয় অতিথি! কতকাল থেকে অপেক্ষা করছি তোমার জন্য!
ভয় পেয়ো না। ক্ষতি হবে না তোমার। কারণ তোমাকে আমার প্রয়োজন। স্বাগতম…. স্বাগতম! ” কথা বলতে বলতে আমার ওপর ঝুঁকে এল সে। বুড়োটার গা থেকে আসা সেই তীব্র মাংসপচা গন্ধে পেট উগরে বমি পেল আমার, ইচ্ছে হলো এক ধাক্কায় সরিয়ে দিই তাকে। কিন্তু পারলাম না কেন যেন। হঠাৎ হিম হয়ে এল সারা শরীর। চারপাশ থেকে শুনতে পেলাম অনেকগুলো
ফিসফিসে কন্ঠ। এরপর চোখের সামনে নেমে এল আঁধার।
পরেরবার যখন জেগে উঠলাম, নিজেকে মেঝেতে শুয়ে
থাকা অবস্থায় আবিষ্কার করলাম। মাথার নীচে মিকোলাসের জ্যাকেটটা ভাঁজ করে কে যেন বালিশের মতো রেখে দিয়েছে। ঝট করে উঠে বসলাম। চেম্বারটা তখনো আগের মতোই আলোকিত, কিন্তু বৃদ্ধ মানুষটির বদলে এবার দেখতে পাচ্ছি অপেক্ষাকৃত তরুণ আরেকজনকে।
ভ্রু কুঁচকে গেল আমার – নতুন এই যুবকটির চেহারা পরিচিত লাগছে। ভাল করে তাকাতে লক্ষ্য করলাম, এ-ও বুড়োর মতো লাল আলখাল্লা পরে আছে। ঠিক একইরকম নকশাকরা। একইরকম আলখাল্লা?
হঠাৎ বুঝলাম, লোকটাকে কেন চেনা চেনা লাগছে।
বুড়ো লোকটাই যেন যুবক হয়ে এসেছে।
একটা পাথরের বেঞ্চে বসে আছে সে, আমার ন্যাপস্যাক
থেকে বের করে নিয়েছে সব খাবার, সেগুলো সাজিয়ে
রেখেছে নিজের সামনে। আমাকে ইশারায় ডাকল। খাবার দেখেই পেটের ভেতর মাথাচাড়া দিয়ে উঠল খিদে। কিন্তু দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে ভাবলাম, লোকটার দিকে এগোব কি এগোব না ভেবে।
” এসো “, আমার মনের অবস্থা আঁচ করতে পেরে ডাকল সে, ” বলেছি তো ভয়ের কিছু নেই। বেশ কিছু প্রশ্ন আছে আমার, তাই বলে অতিথিকে ক্ষুধার্ত রাখতে পারি না। এসো, খেয়ে নাও আগে। তারপর কথা হবে।” বলতে লজ্জা লাগছে, পেটের খিদের কাছে পরাস্ত হলাম আমি। ভুলে গেলাম পারিপার্শ্বিক অবস্থার কথা, ভুলে গেলাম মৃত সঙ্গিটির কথাও।
তার বদলে হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে গেলাম অদ্ভুত লোকটার দিকে। তার সামনে বসে
গোগ্রাসে খেতে শুরু করলাম। খাবার, পানি আর দু’ঢোক ব্রান্ডি পেটে পড়ার পর কিছুটা শক্তি ফিরে পেলাম। খাওয়া দাওয়ার পুরো সময়টাতেই লোকটা আমার দিকে প্রচ্ছন্ন কৌতুকের দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল, ঠোঁটের কোণে উঁকি দিচ্ছিল আধো হাসি।
ভদ্রতার বশে খাবার সাধলাম একবার, জবাবে সে বলল, ” দরকার নেই, আমি খেয়েছি “। বলেই হাসল অদ্ভুত ভঙ্গিতে। কিছু যেন বোঝাতে চাইল সেই হাসির মাধ্যমে। তীক্ষ্ণ চোখে তাকে লক্ষ্য করতে লাগলাম। হাড় জিরজিরে এক মানুষ, কিন্তু দুর্বল বলে মনে হলো না। ধূসর চুল, বয়স আন্দাজ করা মুশকিল। ত্রিশ হতে
পারে….আবার পঞ্চাশও হতে পারে। প্রথমে দেখা বুড়ো
মানুষটার ছেলে হতে পারে। কিন্তু তারপরেই একটা অবৈজ্ঞানিক চিন্তা মাথায় এল। কেন কে জানে মনে হলো, প্রথম দেখা সেই বুড়ো মানুষটা….আর এই যুবক….একই ব্যক্তি। মিকোলাসের জীবন নিয়েই এই বুড়ো জোয়ান হয়ে উঠেছে!
চেম্বারের মাঝখানে, বেদির গায়ে ঠেস দিয়ে রাখা একটা কুঠার আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। ফলাটা বাঁকানো, হাতলে কাটাকুটি…. তাও আবার মসৃণ হয়ে এসেছে। মধ্যযুগীয় ডিজাইন, চেহারা বলে দিচ্ছে ওটা ব্যবহার করা হয়েছে বহুবার। জিনিসটা আগে দেখিনি বেদির পাশে। এল কোত্থেকে?
খাওয়া শেষ হলে আমায় প্রশ্ন করল লোকটা, ” কে তুমি?” নাম আর পেশা জানালাম তাকে। টের পেলাম, গলা খসখসে, কণ্ঠস্বর দুর্বল।
” আমাকে তুমি ‘বেহেরিট’ নামে ডাকতে পারো”, বলল লোকটা, ” ওটা আমার আসল নাম নয় যদিও, তবে এ নামেই পরিচিত আমি। যাক- গে, এখন বলো, এখানে কেন এসেছ? ”
বেহেরিট নামটা কেমন পরিচিত ঠেকল আমার কানে। কোথায় যেন পড়েছিলাম….না শুনেছিলাম। কিন্তু তখন অত ভাবার সময় নেই।
বললাম, ” আমি একজন গবেষক “। ইশারা করলাম মিকোলাসের দিকে, ” ও ছিল আমার সহযোগী, ছাত্র। দুজনে একটা পুরাতাত্ত্বিক অভিযানে এসেছিলাম….. ”
” অদ্ভুত শব্দ ব্যবহার করছ তুমি, যার অর্থ আমার জানা নেই”, ভ্রু কোঁচকাল বেহেরিট, ” কি খুঁজতে এসেছিলে তোমরা?” অধৈর্য শোনাল বেহেরিটের কন্ঠ। ভয় পেয়ে গেলাম, এর ওপরেই এখন আমার বাঁচা – মরা নির্ভর করছে। তাই ভণিতা না করে জানালাম, ” স্কলোম্যান্স নামে এক কল্পকাহিনীর জায়গা খুঁজতে এসেছি আমরা।
প্রমাণ করতে চেয়েছিলাম, সত্যিই অমন একটা
জায়গার অস্তিত্ব ছিল এককালে”।
ঠোঁটের কোণ একটু বেঁকে গেল বেহেরিটের।
জিজ্ঞেস করল, ” পেয়েছ?”
আত্মবিশ্বাসী সুরে বললাম, ” আমার তো তা-ই মনে হয়। আপনি এ ব্যাপারে কিছু বলতে পারেন?”
পালটা প্রশ্ন করল লোকটা এবার, ” কত সাল চলছে এখন? ”
বললাম। সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফারিত হয়ে উঠল তার দু’চোখ। মুখ ঢাকল দু-হাতে। গোঙানির মতো বীভৎস এক আওয়াজ করল, সেটা শুনে রক্ত পানি হয়ে গেল আমার। খানিক পরে উঠে দাঁড়াল সে। পায়চারি করতে করতে বলল, ” অনেক…. অনেক সময় পেরিয়ে গেছে! নিশ্চয়ই অনেক বদলে গেছে পৃথিবী “। থমকে দাঁড়াল এরপর। আমার দিকে ফেরাল ঘাড়। বলল, ” বলো, কতখানি বদলেছে বাইরের দুনিয়া?” ” কবেকার তুলনায়?” বিভ্রান্ত গলায় প্রশ্ন ছুঁড়লাম। শীর্ণ আঙুল তুলে বেদির
গোড়া দেখাল লোকটা।
বলল, ” প্রায় চারশো বছর ধরে ওখানে ঘুমিয়ে ছিলাম আমি। অনেক স্বপ্ন দেখেছি…. কিন্তু তার মধ্যে
কোনটা সত্যি কোনটা মিথ্যে জানি না”। চারশো বছর!
আমি হতবাক হয়ে গেলাম তার কথায়। ভয়ের কথা ভুলে গেলাম, মনের ভেতর জেগে উঠল কৌতূহল। বললাম, ” এই চারশো বছরে অনেক কিছুই বদলেছে, বেহেরিট। জ্ঞান বিজ্ঞানের অগ্রগতির দিকটা ধরলে…..”
” অগ্রগতি? ” আমাকে বাধা দিল সে, বাঁকা সুরে বলল, ” আজকের এই জ্ঞান বিজ্ঞান কোত্থেকে এসেছে বলে মনে হয় তোমার? নিশ্চয়ই এখান থেকে! এ জায়গা কেন খুঁজছিলে তুমি? দীক্ষা নেবার জন্য? কিন্তু না, চারশো বছর আগেই বন্ধ হয়ে গেছে এই স্কলোম্যান্স।” সাগ্রহে উত্তেজিত গলায় বললাম, ”
তার মানে আপনি বলতে চাইছেন….এটা সত্যিই এককালে স্কলোম্যান্স ছিল?”
” হ্যাঁ, এককালে ছিল”, উদাস গলায় বলল লোকটা। তার খোলা মুখ দিয়ে ভেসে এল কাঁচা রক্তের গন্ধ। এরই মাঝে আমি আন্দাজ করতে শুরু করেছি তার পরিচয়।
বেহেরিট বলে চলল, ” যার তারপক্ষে সম্ভব নয়, অথচ এ জায়গা তুমি খুঁজে পেয়েছ।
তার অর্থ…..” ” কি?” জিজ্ঞেস করলাম আমি।
বেহেরিট বলল, ” তার মানে পুনর্জাগরণের ক্ষণ ঘনিয়ে এসেছে। বহুকাল পর আবার আসতে চলেছে আমাদের সময়”।

আপাতত এখান থেকে বেরিয়ে যেতে পারলেই খুশি হই আমি”, মিকোলাসের দিকে এক পলক তাকিয়ে, বেহেরিটকে উদ্দেশ্য করে বললাম আমি, ” যদি কিছু মনে না করেন, আপনি কি আমায় এখান থেকে বেরোতে সাহায্য করতে পারেন….” এটুকু বলেই থমকে
গেলাম আমি। যেটা এতক্ষণ মনে পড়তে পড়তেও মনে
পড়ছিল না, এবার সেটা মনে পড়ল।

মনে পড়ে গেছে, কোন এক প্রাচীন পুঁথিতে পড়েছিলাম, ‘ বেহেরিট’ হচ্ছে এক প্রাচীন পিশাচের নাম।

( আন্দ্রে কোভাক্সের ডায়েরী)

” এত তাড়াতাড়ি তো তুমি যেতে পারবে না, বন্ধু”, মুচকি হেসে বলল বেহেরিট, “এভাবে আমাদের দেখা হবার পেছনে একটাই কারণ থাকতে পারে – আমরা পরস্পরকে সাহায্য করব। এখন থেকে তুমি আমার কথামতো চলবে। এসো, তোমাকে এখন এমন একটা জায়গায় নিয়ে যাই, যেখানে আরেকটু আরামে থাকতে পারবে তুমি”। হাত বাড়িয়ে আমাকে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করল বেহেরিট। উঠে দাঁড়াবার সঙ্গে সঙ্গে চক্কোর দিয়ে উঠল মাথা। বুঝতে পারলাম, লোকটার সঙ্গে লড়াই করার, বা তার কাছ থেকে পালিয়ে যাবার মতো শক্তি নেই আমার শরীরে। তার কথামতো চলাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। আমাকে দাঁড় করিয়ে রেখে মিকোলাসের কাছে গেল বেহেরিট।
একদৃষ্টে কিছুক্ষণ তার প্রাণহীন মুখের দিকে তাকিয়ে
থেকে বলল, ” না, এর আর জেগে ওঠার কোনও সম্ভাবনা নেই। সবসময় এরা ওঠেও না। আমাদের কাতারে সাধারণ মানুষকে নিয়ে আসতে হলে নির্ধারিত পরিমাণে রক্ত খেতে হয় তিনবার করে – বেশীও না, কমও না। কিন্তুষচারশো বছর পর আজ জেগে উঠে এত খিদে লেগেছিল যে তাগড়া ছোঁড়াটার শরীরে একবিন্দু রক্ত’ও আর অবশিষ্ট নেই। অবশ্য সবাই যদি আমাদের কাতারে চলে আসে, তাহলে মুশকিল আমাদেরই। কারণ তাতে তো জীবন্মৃতদের ভিড়ে ভরে যাবে পৃথিবী। শিকারীর সংখ্যা বেড়ে যাবে, কমবে শিকারের সংখ্যা। আমাদের জন্য খাবারের সঙ্কট দেখা দেবে। তাই সবসময় সবাইকে আমাদের দলে নিয়ে আসা যায় না”।
কথা শেষ করে বেদির গায়ে ঠেস দিয়ে দাঁড় করানো
কুঠারটা তুলে নিল বেহেরিট। বাতাসে আধপাক ঘুরিয়ে
সজোরে নামিয়ে আনল মিকোলাসের গলায়। মৃদু
আওয়াজের সঙ্গে ধড় থেকে আলাদা হয়ে গেল মাথা।
গড়িয়ে পড়ল মেঝেতে। বীভৎস দৃশ্য! বমি এসে গেল
আমার। কোনমতে অন্যদিকে তাকিয়ে সামলে নিলাম
নিজেকে।
রক্তাক্ত কুঠার নামিয়ে রেখে আমার কাছে ফিরে এল
বেহেরিট। বাড়িয়ে দিল ব্রান্ডির গ্লাস। ফিসফিসিয়ে
জিজ্ঞেস করলাম, ” কেন? কেন করলেন এ কাজ?” জবাব দিল না সে। তার বদলে হাতে তুলে নিল একটা মোমবাতি, তারপর আমার বাহু ধরে হাঁটতে শুরু করল। তার সঙ্গে চলতে বাধ্য হলাম আমি। চেম্বারের একপ্রান্তে , দুটো দেয়ালের সংযোগস্থলে আমায় নিয়ে গেল বেহেরিট।
বিস্মিত হয়ে লক্ষ্য করলাম, নিচু একটা আর্চওয়ে উদয়
হয়েছে ওখানে- ওপাশে অন্ধকার একটা টানেল। যে পথে
ঢুকেছিলাম আমরা, সে পথ নয়। এটা আরেকটা রাস্তা।
জায়গাটার সামনে দিয়ে অন্তত বিশবার হেঁটেছি আমরা
অথচ দেখতে পাইনি টানেলটা।
” এটার খোঁজ আগে পাইনি কেন আমরা?” হতভম্ব হয়ে
জিজ্ঞেস করে বসলাম।
” কারণ তুমি স্কলোম্যান্সের সদস্য নও”, গম্ভীর গলায় বলল বেহেরিট, ” তাই দেখতে পাওনি।” টানেল ধরে এগিয়ে চললাম আমরা। মোমের আলোয় দেখলাম, ওটার দেয়াল আর মেঝে গাঢ় আকাশী রঙে মোজাইক করা। ঠিক মাঝখানটায় রয়েছে শ্বেতপাথরে বাঁধানো একটা জলাশয়, চারদিকে নকশাদার খিলান আর ব্যালকনি, সেগুলোর পেছনে রয়েছে কিছু বন্ধ কামরা। মাথার ওপরে আকাশ নেই, বদলে রয়েছে অতিকায় এক গুহার ছাদ।
পুরোপুরি নিরেট নয়, ফাটল আছে; আর সেই ফাটল গলে বাইরে থেকে ঢুকছে সূর্যের আলো। সেই আলো দেখতে পেয়ে আনন্দে ভরে গেল হৃদয়। যেন কতযুগ পর বাইরের আলো দেখছি। লক্ষ্য করলাম, এই কোর্টইয়ার্ডটার এখানে সেখানে জন্মেছে কয়েক ধরনের গাছ আর নানা প্রজাতির ফার্ন। বোঝাই যাচ্ছে, জায়গাটা পরিত্যক্ত — বহুদিন ধরে কারোর পা পড়েনি এখানে। সবখানে ধুলোর আস্তর, বাতাস গুমোট হয়ে আছে। ”
এককালে এখানেই থাকতাম আমরা”, বলল বেহেরিট। ”
কে বানিয়েছে এই জায়গা?” জিজ্ঞেস করলাম আমি। ”
স্কলোম্যান্সের সদস্যরা”, উত্তরে বলল বেহেরিট, ” জানো না, শয়তানকে জ্যামিতির জনক বলা হয়? ঈশ্বর নন, শয়তানই এই জ্ঞান বিলিয়েছেন মানুষের মাঝে। ঈশ্বরের মন বড্ড ছোট, চাননি মানুষের জ্ঞানের বিকাশ হোক” – শেষের কথাটা বলার সময় এক ধরনের অবজ্ঞা প্রকাশ পেল বেহেরিটের কন্ঠে। লোকটাকে ভয় পাচ্ছি, কিন্তু ভয়ের চেয়েও বেশী হচ্ছে অদ্ভুত এক কৌতূহল। যাই হোক, কোর্টইয়ার্ডে কিছুটা সময় কাটাবার পর বড় একটা কামরায় আমায় নিয়ে এসেছে সে। ওখানে বসেই লিখছি আমার জার্নাল।
আমায় বিশ্রাম নিতে বলে চলে গেছে বেহেরিট।
কোথায় কে জানে। ঘুমোনোর সাহস পাচ্ছি না। কেবলই
মনে হচ্ছে, ঘুমোলেই বিচ্ছিরি কিছু একটা ঘটে যাবে।
কিন্তু শরীরও যে আর বইছে না।
কয়েক ঘন্টা পরে।। নিরুপদ্রবে ঘুমিয়েছি আমি। এর মাঝে বোধহয় ফিরে এসেছিল বেহেরিট, শয্যার পাশে খাবার আর ব্রান্ডি দেখে বুঝেছি ; কিন্তু ওর আগমনে ঘুম
ভাঙেনি আমার। খাবারগুলো আমারই ন্যাপস্যাক থেকে
বের করে আনা- এ দিয়ে আগামী কয়েকদিন কষ্টেসৃষ্টে
চালিয়ে নেয়া যাবে; অবশ্য যদি আমাকে ততদিন বাঁচতে
দেওয়া হয় আর কি। শুধু একটাই চাওয়া আমার – মরবার আগে যেন মনের সমস্ত জিজ্ঞাসার জবাব পাই। ঘুম যখনি ভেঙেছিল তখন ঘুটঘুটে অন্ধকার। কিন্তু এখন ধীরেধীরে ধূসর একটা আলো ঢুকছে দরজা দিয়ে। তারমানে আরেকটা রাত পেরিয়েছে। কোর্টইয়ার্ডের চারপাশটা ঘুরে দেখেছি আমি, তবে এখান থেকে বেরোবার কোনও রাস্তা পাইনি। এখানে এই একটাই কোর্টইয়ার্ড নয়, আরও বেশ কয়েকটা আছে। সবগুলোতেই রয়েছে শ্বেতপাথরে বাঁধানো জলাশয়। পার্থক্য বলতে – জলাশয়গুলোর পাশে শোভা পাচ্ছে পাথর কুঁদে বানানো অসংখ্য নারী পুরুষের মূর্তি।
ঘোরাফেরা করতে করতে পথ হারিয়ে ফেলেছিলাম, আমার কামরায় ফিরতে বেশ কষ্টই হয়েছে।
একটা ব্যাপার আমার কাছে পরিষ্কার, আমি এখানে
বন্দি। তবে চেম্বারের সেই বদ্ধ পরিবেশের বদলে
মোটামুটি গ্রহণযোগ্য একটা জায়গায় ঠাঁই পেয়েছি –
এটুকুই স্বান্তনা। এখানে শোবার জায়গা আছে, বাথরুমের ব্যবস্থা আছে, ইচ্ছেমত হাঁটাচলাও করতে পারছি। আমার বিশ্বাস, ভালমতো খোঁজাখুঁজি করলে মুক্তির একটা পথও পেয়ে যাব নির্ঘাত।
সমস্যা একটাই – এখনো খুব দুর্বল আমি। একটু হাঁটাচলা
করলেই ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়ছি। যেন আমার শরীর
আর্ধেক রক্ত শুষে নেয়া হয়েছে ; তবু মৃত্যু নিয়ে এখনো
মাথা ঘামাচ্ছি না। তাছাড়া মরবার আগে এমন একটা
আবিষ্কার করতে পেরেছি, এটাই তো আমার সাত জনমের ভাগ্য। দুঃখ শুধু একটাই – এই আবিষ্কারের খবর আমি দুনিয়াকে জানিয়ে যেতে পারছি না।
।।আরও কয়েক ঘন্টা পরে।।
আজ আরও এক চমকপ্রদ জায়গা খুঁজে পেয়েছি। একটা লাইব্রেরী। এমন লাইব্রেরীর জন্য একজন গবেষক তার আত্মা পর্যন্ত দিয়ে দিতে পারে। কি রকম উত্তেজনা অনুভব করছি, নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ। শরীর এত কাঁপছে যে কলম ধরে রাখাই দায়। মিকোলাসের জন্য খারাপ লাগছে, এমন একটা আবিষ্কারে যদি ও-ও অংশীদার হতে পারত।
অনেকটা সময় কাটিয়েছি আমি ওই লাইব্রেরীতে, এখন
এত ক্লান্ত লাগছে যে কোথাও আর যাবার শক্তি নেই,
ইচ্ছেও নেই। এখনও পর্যন্ত তিনটে রুম পেয়েছি,
প্রতিটিতে রয়েছে একটা করে ভল্ট- সাধারণ
ডিজাইন….বিশ ফুট উঁচু একেকটা গ্যালারি গড়ে উঠেছে
মোটা মোটা থাম আর পুরু দেয়ালের সাহায্যে। মেঝে
থেকে ছাদ পর্যন্ত সবকটা দেয়াল ঘেঁষে রয়েছে শেলফ,
তাতে নানা ধরনের বই, পাণ্ডুলিপি আর দলিল দস্তাবেজ।
বিভিন্ন ভাষায় লেখা বইপত্রের সমাহার এখানে।
ল্যাটিন, গ্রিক আর হিব্রু ভাষার লেখা চিনতে পারছি;
তবে আরও কিছু বর্ণমালা দেখেছি, যেগুলো একেবারেই
অচেনা। বোধহয় বিলুপ্ত কোনো প্রাচীন ভাষা ওগুলো।
বইপত্রগুলো অতি প্রাচীন হলেও বিস্ময়কর ভাবে
সংরক্ষিত। এমন সব বইও দেখছি, যেগুলো বহুকাল আগে ধ্বংস হয়ে গেছে বলেই জানে সবাই। প্রাচীনকালের ইতিহাস, দর্শন, চিকিৎসাশাস্ত্র.
…. এমনকি বাইবেলের হারানো ও বিতর্কিত অংশগুলো পর্যন্ত সযত্নে রাখা হয়েছে এখানে! আরও হয়ত কত কি পাওয়া যাবে এখানে!
অতুল জ্ঞানের যেন ভাণ্ডার লুকিয়ে আছে এখানে,
গুপ্তধন বললেও অত্যুক্তি হবে না। রাতের বেলা।।
লাইব্রেরীর একটা চেয়ারে বসে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম,
হঠাৎ জেগে উঠলাম চোখে আলো এসে পড়ায়। তাকিয়ে
দেখলাম, হাতে একটা প্রদীপ নিয়ে আমার সামনে এসে
দাঁড়িয়েছে বেহেরিট। তরুণ থেকে আবার বুড়োটে হয়ে
গেছে তার চেহারা,চামড়ায় দেখা যাচ্ছে হাজারো
ভাঁজ। ঠোঁটের কোণে ঝুলছে একটা হিংস্র, ক্ষুধার্ত
হাসি।
” তোমাকে অনেকক্ষণ থেকে খুঁজছি আমি, বন্ধু”, বলল সে, ” অবশ্য….আগেই অনুমান করা উচিত ছিল আমার, তোমার মতো একজন গবেষক, বিদ্যোৎসাহী এই লাইব্রেরীতে আস্তানা গাড়বে। যাক সেকথা, এখন কি করতে যাচ্ছি, বুঝতে পারছ নিশ্চয়ই। অতএব নোড়ো না। এখন খাবার চাই আমার, খাবার – পানীয় দুটোই”।
বলতে বলতে আমার গায়ের ওপর ঝুঁকে এল সে। ভয়ে
আত্মারাম খাঁচাছাড়া হবার দশা হলো আমার, কিন্তু
নড়তে পারলাম না। আমার নাকে মুখে এসে লাগছে ওর
গরম নিশ্বাস। দেখতে পেলাম ওর মুখের ভেতরে সাদা
ঝকঝকে তীক্ষ্ণ দু’সারি দাঁত। শিউরে উঠলাম। নেকড়ের
মতো জ্বলছে ওর চোখদুটো। অশুভ, লোভী দৃষ্টি সে
চোখদুটোয়। আস্তে আস্তে বিস্ফারিত হলো ওর
চোখজোড়া। তাতে বন্য চাহনি। আপ্রাণ চেষ্টা করলাম
ওদিকে তাকাব না। আপ্রাণ চেষ্টা করলাম ওদিকে
তাকাব না। কিন্তু নিজের ওপর থেকে যেন নিয়ন্ত্রণ
হারিয়ে ফেলেছি আমি। চোখ সরাতে পারলাম না
কিছুতেই। আমার গলার ওপর ঝুঁকল সে। গরম নিশ্বাসে
আমার গলার চামড়া যেন পুড়ে গেল। ভাবলাম, অজ্ঞান
হলে বেঁচে যাই তাহলে আর এসব দৃশ্য দেখতে হবে না।
কিন্তু আমার প্রার্থনা পূর্ণ হলো না। ওর ভারী, খসখসে,
শুকনো ঠোঁট এসে পড়ল আমার চামড়ায়…..তার পরপরই
তীক্ষ্ণ, তীব্র দংশন! অতি সূক্ষ্ম, সূঁচ ফোটানোর
মতো…..বুঝলাম, ঘাড়ের কাছের রক্তনালী ফুটো হয়ে
গেছে। সেখানে মুখ ঠেকিয়ে বুভুক্ষু হিংস্র জন্তুর মতো
রক্ত চুষতে লাগল বেহেরিট। কতক্ষণ এভাবে রক্ত চুষল
জানি না, কারণ একসময় আমি চেতনা হারিয়ে ফেললাম।
জ্ঞান যখন ফিরল…..আনুমানিক এক ঘন্টা পরে…..তখনও বেহেরিট দাঁড়িয়ে আছে সামনে। তবে এবার অভূতপূর্ব পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম তার মধ্যে। আগের চেয়েও আরোও তরতাজা যুবক হয়ে গেছে সে। একেবারে তারুণ্যে, প্রাণপ্রাচুর্যে যেন ঝলমল করছে তার চেহারা। আমায় জেগে উঠতে দেখে নীল রঙের একটা পানীয় ভরা গ্লাস এগিয়ে দিল আমার দিকে। জিনিসটা কি জানি না, তবু তৃষ্ণার্তের মতো ওটাই পান করলাম। তারপর আমারই ন্যাপস্যাক থেকে বের করে আনা কিছু খাবার দিল আমায়, খেতে। একইসঙ্গে ফের চলতে লাগল আলাপচারিতা। না, আলাপ নয়….জেরা বললেই মানানসই হবে।
বাইরের দুনিয়া সম্পর্কে নানা কথা জিজ্ঞেস করতে
করতে হঠাৎ বেহেরিট জিজ্ঞেস করল, ” কাউন্ট ড্রাকুলা
সম্পর্কে কি ভাবো তুমি?”
চমকে উঠলাম এই প্রশ্নে। জবাব খুঁজে না পেয়ে বোকার
মতো বললাম, ” কিছুই না”।
অসন্তোষ ফুটল তার চেহারায়। ” মিথ্যে বোলো না!” গমগম করে উঠল তার গলা। আমার জার্নালটা হাতে নিয়ে বলল, ” এই খাতার পুরোটাই পড়েছি আমি। কাউন্ট ড্রাকুলা-র কথা আছে এতে। কিছু জানো না বলে পার পাবে না”।
কি আর করা, বন্ধু ভ্যান হেলসিং, তোমার মুখে শোনা
পুরো কাহিনীটা বলতে বাধ্য হলাম আমি। চুপচাপ সব শুনল সে। কিন্তু কাহিনীর শেষে….ড্রাকুলাকে ধ্বংস করার
ঘটনা শোনামাত্র উত্তেজিত হয়ে উঠল বেহেরিট। প্রায়
চেঁচিয়ে উঠে বলল, ‘ কি বলছ এসব? ড্রাকুলা মরতে পারে না, কিছুতেই না”।
আমাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে উঠে দাঁড়াল
বেহেরিট। পায়চারি করল কিছুক্ষণ, প্রতি পদক্ষেপে তার
চেহারায় ক্রোধ ফুটতে দেখলাম। শেষে পায়চারী
থামিয়ে আমার কাছে এসে আমার গলা চেপে ধরে বলল, ” মিথ্যা বলছ তুমি”।
খাবি খেতে খেতে বললাম, ” একবর্ণ মিথ্যে নয়। আমার
বন্ধু আমায় যা যা বলেছে, তাই-ই বলেছি আপনাকে।
ড্রাকুলার সঙ্গে লড়াই করেছে ওরা, তাকে হত্যা করেছে
ড্রাকুলার ক্যাসলের পাদদেশে”।
দপ করে দু’চোখ জ্বলে উঠল বেহেরিটের।টের পেলাম,
গলার ওপর তার হাতের চাপ বাড়তে শুরু করেছে। মনে
হলো, এবার মরতে চলেছি। শরীর শক্ত করে ফেললাম তাই।
কিন্তু আচমকা যেন রাগ পানি হয়ে গেল তার। আমার গলা ছেড়ে দিয়ে নরম গলায় বলল, ” না, তোমার কোনও দোষ নেই। যা সত্যি ভাবছ, তাই-ই বলছ আমাকে। কিন্তু জেনে রাখো, ড্রাকুলার মরণ নেই। জীবদ্দশায় সে
স্কলোম্যান্সের সেরা ছাত্র ছিল…..শয়তানী বিদ্যা,
কালো জাদু’র ওপর গভীরভাবে আয়ত্ব করে সে সত্যিকার অমরত্ব অর্জন করেছিল। হয়তো ওর দেহটাকে ধ্বংস করেছে তোমার বন্ধুরা…কিন্তু তাই বলে মৃত্যু? না, মৃত্যু হয়নি ওর। আত্মা হিসেবে হলেও বেঁচে আছে ও”।
শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল আমার। তবু কৌতূহল বশত
জিজ্ঞেস করলাম, ” আপনি তাহলে ড্রাকুলাকে চেনেন?
এখানেই পরিচয় হয়েছিল?”
” তবে আর কোথায়? ”
” তা হলে প্লিজ সেই কাহিনী আমাকে শোনান”।
” যথাসময় জানবে”, মুচকি হেসে বলল বেহেরিট, ” এখন
এসো, তোমায় অনেক কিছু দেখানো বাকি”।
দাঁড়াবার শক্তি ছিল না শরীরে। আমায় উঠতে সাহায্য
করল সে। নিজের গায়ে ভর দিয়ে দাঁড় করালো। বুঝলাম,
ইচ্ছে না থাকলেও যেতে হবে। আমাকে একটা
বুকশেলফের কাছে নিয়ে গেল বেহেরিট, অল্প ধাক্কা
দিতেই শেলফটা সরে গেল দরজার পাল্লার মতো।
ওপাশে দেখা গেল নিচু এক করিডোর, কোনোমতে একজন।মানুষ সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারবে। হাতে প্রদীপ নিয়ে সেটায় ঢুকে পড়ল বেহেরিট। দেয়াল ধরে ধরে আমিও তার পিছু নিলাম।
করিডোরটা আমাদেরকে, যেন পর্বতের গভীরে নিয়ে
চলল। সমান্তরাল নয়, কখনো ঢালু হয়ে, আবার কখনো
ওপরদিকে উঠে গেছে। দেয়াল আর ছাদের মোজাইকে
নানা ধরনের দৃশ্য দেখতে পেলাম – দানব, পিশাচ, রাক্ষস,

ইত্যাদি….. গাঢ় রঙে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে তাদের
হিংস্র কর্মকাণ্ড….. দেখলেই বিবমিষার সৃষ্টি হয়। যত
এগোতে লাগলাম, ততই বাড়তে লাগল দৃশ্যগুলোর
হিংস্রতা। বুকের মধ্যে শুরু হয়ে গেল রীতিমতো
ধুকপুকানি।

মূল করিডোর থেকে বেরিয়ে যাওয়া শাখাপ্রশাখার
দেখা পেলাম এক পর্যায়ে। সেগুলো ছোট বড় নানা
আকারের গুহায় গিয়ে মিশেছে। গুহাগুলোর পাশ দিয়েহ
যাবার সময় দেখতে পেয়েছি আরও ভয়ানক সব দৃশ্য। বড় বড় কাঁচের পাত্রে শোভা পাচ্ছে মানুষের কাটা বিভিন্ন
অঙ্গপ্রত্যঙ্গ!

চরম আতঙ্ক নিয়ে এগোলাম আমি। কি অপেক্ষা করছে
পথের শেষে, সেই আশঙ্কায় আমার পাগল হবার দশা।

( মীনার ডায়েরী)

জোনাথনকে ডাকতে গিয়েও ডাকলাম না, সাবধানে
নেমে পড়লাম বিছানা থেকে। ড্রেসিংরুমে গিয়ে দরজা
আটকালাম, তারপর জ্বাললাম একটা মোমবাতি। কামরা
আলোকিত হয়ে উঠলে চারপাশে আর ওপর নীচে ভাল করে তাকালাম। কোথাও কিছু নেই, অথচ তখনো কানে আসছে ডানা ঝাপটানোর শব্দ। আয়নার সামনে ধপ করে বসে পড়লাম, মাথা চেপে ধরলাম দু’হাতে। নিজের
প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে লক্ষ্য করলাম অব্যক্ত এক
বেদনার ছাপ ফুটে উঠেছে চেহারায়।
হঠাৎ ঘুরে উঠল মাথা। মনে হলো অন্তহীন কোনও কুয়োয় পড়ে যাচ্ছি আমি। অদ্ভুত এক অনুভূতি। আর সেই অবস্থায়….আচমকা…. টের পেলাম, কেউ যেন আমার ভেতর ঢোকার চেষ্টা করছে। জানি, কথাটা প্রলাপের মতো শোনাচ্ছে…..কিন্তু আর কোনওভাবে সে অনুভূতি বর্ণনা দিতে পারব না আমি।
প্রায় অচেতন দশা তখন আমার। মোমের আলোয়
অতিপ্রাকৃত মনে হচ্ছে সবকিছু। চারপাশের সমস্ত দুনিয়া
যেন ভেঙেচুরে একাকার হয়ে যাচ্ছে। কানে আসছে খুব
কাছে দাঁড়িয়ে কে যেন ফিসফাস করে কিছু বলছে
আমায়। সেই কন্ঠ শুনে আতঙ্কে হিম হয়ে গেল হাত – পা।
তারপরেও অদ্ভুত এক আবেশ ভর করল দেহে। টের পেলাম, মাতালের মতো হাসতে শুরু করেছি। ড্রেসিংরুম’টা যেন অদৃশ্য হয়ে গেছে চারপাশ থেকে, সেখানে এখন শুধু কৃষ্ণ শূন্যতা। আঁধারের মাঝে জ্বলজ্বল করছে স্রেফ দুটো লাল তারা।
খানিক পরে উপলব্ধি করলাম, যে জিনিসটা এতক্ষণ ধরে আমার ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করছিল, সেটা ঢুকে
পড়েছে। তার প্রভাবে অন্য এক মানুষ হয়ে উঠলাম। মনে
হলো আমি এক চিরন্তন অশুভ শক্তি, ঈশ্বর যার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। প্রাণপণ চেষ্টা করলাম অশুভ সেই প্রভাব থেকে মুক্ত হতে, কিন্তু বিফলে গেল আমার সমস্ত প্রচেষ্টা। শেষে চোখ মুদে প্রার্থনা শুরু করলাম, সঙ্গে সঙ্গে ঝাঁকি খেতে লাগল দেহ। আঁধার সরে গিয়ে
উজ্জ্বল সোনালি আলো যেন স্নান করিয়ে দিল আমায়,
মানসচোখে ভেসে উঠল পবিত্র ক্রুশ। শেষবারের মতো
একটা ঝাঁকুনি দিয়ে আমার দেহ থেকে বেরিয়ে গেল সেই
অশুভ আত্মা। বুকের ওপর থেকে যেন নেমে গেল একটা
জগদ্দল পাথর। প্রশান্তিতে ছেয়ে গেল মন।
একটু পরে চোখ খুললাম। ড্রেসিংরুমে আগের মতো বসে
আছি আমি। সবকিছু স্বাভাবিক। বিরাজ করছে রাতের
নীরবতা, কোথাও কোনও আওয়াজ নেই। পা কাঁপছিল,
কোনোমতে উঠে দাঁড়ালাম। রান্নাঘরে গিয়ে সামান্য
ব্রান্ডি ঢাললাম গলায়। শান্ত করলাম স্নায়ুকে। তারপর
ফিরে এলাম।
কিছুক্ষণ ভাবনা চিন্তার পর বুঝতে পারলাম, এতক্ষণ যা
ঘটেছে, সবই দুঃস্বপ্ন… আর কিছুই নয়। কেন এমন একটা বিচ্ছিরি স্বপ্ন দেখলাম, কে জানে! হতে পারে অজানা কোনও কারণে অবচেতন মন অশান্ত হয়ে আছে, দুঃস্বপ্নটা তারই ফলশ্রুতি। জেগে থাকা অবস্থায় কি করে এরকম একটা দুঃস্বপ্ন দেখলাম, এটা একটা প্রশ্ন হতে
পারে….কিন্তু জেগে ছিলাম, তাই-ই বা বলি কি করে?
আসলে হয়তো ঘুমের ঘোরে হাঁটছিলাম, চলে গিয়েছিলাম ড্রেসিংরুমে।
চিন্তাটা মাথায় আসতেই দুর্ভাবনায় পড়লাম। অসুখ টসুখ
দেখা দিচ্ছে না তো? মারা যাবার কিছুদিন আগে লুসি’ও
এরকম ঘুমের ঘোরে হাঁটত। আমারও কি……
না, না…..এসব কি ভাবছি? সামান্য একটা দুঃস্বপ্ন নিয়ে
এতটা উতলা হবার কোনও মানে হয় না। তাছাড়া, এ ধরনের স্বপ্নকে মোকাবিলা করার শক্তি আমার আছে।
ইলিনা কোভাক্সের ডায়েরী

।।২৫ সেপ্টেম্বর।।

বড় সুখের জীবন কাটাচ্ছি আমি হারকারদের বাড়িতে
এসে। মাঝেমাঝে ভয় হয়, যে-রকম আতিথেয়তা দেখাচ্ছে ওরা, আমি হয়তো তার যোগ্য নই।
বিশাল একটা রুম দেয়া হয়েছে আমায় থাকার
জন্য….এক্কেবারে আমার….কখনো কেউ বিরক্ত করবে না। অনুমতি ছাড়া কেউ আমার ঘরের ভেতর ঢোকে না পর্যন্ত!
আমার ব্যক্তিগত সব জিনিসপত্র নিশ্চিন্ত মনে
এদিকওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখতে পারে, কারোর হাত
দেবার ভয় নেই। ভয় নেই আমার ডায়েরী কেউ খুলে
পড়বে। এমন প্রাইভেসি আমি নিজের বাড়িতেও পাইনি
কোনোদিন।
হারকারদের ছেলেটা’কেও বেশ ভাল লাগে আমার। ওকে
দেখলেই কিরকম যেন টান অনুভব করি। মনে হয়, জীবনের পূর্ণতা আমি অর্জন করে ফেলেছি। বিয়ে না করেও আমি যেন একটা ছেলে পেয়ে গিয়েছি। ইশশশ! ও যদি সত্যিই আমার ছেলে হতো! কি শান্ত! দুষ্টুমি করে না! অবশ্য দুষ্টুমি করার মতো শরীর স্বাস্থ্য’ও নেই ওর। ওর সঙ্গে আমি ঘরের মধ্যেই খেলি…রাতের বেলা ওর মাথার কাছে বসে ওকে শোনাই ঘুমপাড়ানি সব গল্প! ইশশ! ওর শরীরটা যদি একটু নাদুসনুদুস হতো!
হারকারদের সঙ্গে এতটা মাখামাখি করা বোধহয় উচিত
হচ্ছে না আমার। আমার ভেতরে লুকিয়ে থাকা সেই
অজানা সঙ্গীটির প্রবল শত্রু এরাই। এদের সঙ্গে যতটা
সম্ভব দূরত্ব বজায় রাখলেই বোধহয় ভাল করতাম! কিন্তু
ইচ্ছে থাকা স্বত্তেও সেটা সম্ভব হচ্ছে না….এত ভালো
এদের ব্যবহার! আর…. ওদিকে আমার ভেতরে,
ট্রানসিলভ্যানিয়ার সেই পুরনো ক্যাসল থেকে বাস করা
সেই অদৃশ্য সঙ্গীটি আমায় প্রতিনিয়ত তাড়া দিয়ে
চলেছে – তার জন্য একটা নির্জন আশ্রয় খুঁজে দিতে।
তেমন একটা জায়গা আমার চোখেও পড়েছে….গাঁয়ের
ছোট গীর্জার পাশের গোরস্থান।
জায়গাটার ব্যাপারে খুব বেশি আগ্রহ দেখাবার সাহস
পাইনি সেদিন, পাছে মাদাম হারকার কিছু সন্দেহ প্রকাশ
করে বসেন; গোমরটা ফাঁস হয়ে গেলে আমার অদৃশ্য
সঙ্গীটি’ও বিপদে পড়বে…সেটা হতে দেওয়া যাবে না
কিছুতেই। ওকে রক্ষা করা আমার দায়িত্ব।
পরদিন রাতে, সবাই ঘুমিয়ে যাওয়ার পর, গোরস্থানে
গিয়েছিলাম আমি একাকী। বুক ঢিবঢিব করছিল অজানা উত্তেজনায়, পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম বাড়ি থেকে। কাঁধে ঝুলছিল ছাইমাটি ভরা সেই বোঁচকাটা। অন্ধকার পথে অনেকক্ষণ ঘুরপাক খাওয়ার পর দেখতে পেয়েছিলাম গীর্জার অবয়ব, এরপর গোরস্থানের প্রবেশপথ খুঁজে পেতে দেরী হয়নি।
সারি সারি কবরের মাঝ দিয়ে হেঁটেছি আমি, শেষে
দেখতে পেয়েছি তিনটে সমাধি। সবকটাই অবহেলিত….
গায়ে বাসা বেঁধেছে আগাছা আর শ্যাওলার আস্তর।
কিভাবে যেন বুঝতে পারলাম, এরই একটাতে স্থানান্তর
করতে হবে আমার সঙ্গীকে। তিনটের মধ্যে যেটা
সবচেয়ে বড়, পা বাড়ালাম সেদিকে; কিন্তু আমার অন্তর
থেকে সঙ্গীটি ফিসফিস করে বলল, বড় নয়, ছোটটায়
যেতে হবে আমায়।
সমাধিটা একেবারেই সাধারণ। সাদা মার্বেলে তৈরি,
কালচে দাগ পড়েছে পাথরের গায়ে। বড় বড় গাছের
ছায়ায় প্রায় ঢাকা পড়ে আছে… এক অর্থে দৃষ্টিসীমার
আড়ালেই বলা চলে; সহজে মনোযোগ আকর্ষণ করে না।
আগাছার জঙ্গল ভেদ করে ওটার দিকে এগিয়ে গেলাম
আমি। সিঁড়ির আটটা ধাপ ভেঙে পৌঁছলাম জং ধরা
দরজার সামনে। ধাক্কা দিতেই খুলে গেল দরজা – কবজার সঙ্গে আটকানো তালা বহু আগেই নষ্ট হয়ে গেছে।
ভেতরে পা দিতেই নাকে ভেসে এল ভেজা স্যাঁতস্যাঁতে
গন্ধ। বলা বাহুল্য, এ ধরনের গন্ধ পছন্দ হবার কথা
নয়….কিন্তু কেন জানি না, ওটা খুব ভাল লাগল আমার।
মনে হলো, আমার সঙ্গীর বাসস্থানে এমন গন্ধই থাকা
দরকার।
সঙ্গে একটা মোমবাতি নিয়েছিলাম, সেটা জ্বেলে সমাধির
ভেতরটা দেখলাম। ছোট বড় কয়েকটা কবর দেখা যাচ্ছে, সবগুলো পাকা করা, উপরে কংক্রিটের ডালা। মেঝেতে মরা পচা পাতার কার্পেট, বাতাসে উড়ে এসে বছরের পর বছর ধরে জমা হয়েছে, কখনো পরিষ্কার করেনি কেউ। দেয়ালের কোনায় কোনায় ঝুলছে মাকড়শারজাল আর ঝুল। একেবারেই পরিত্যক্ত আর অবহেলিত ওই সমাধিটা। এখানে আমার সঙ্গীকে ঠাঁই দিতে ইচ্ছে হলো না। দামি পাথরে মোড়া, কারুকাজ করা একটা সমাধি ওর প্রাপ্য…..কিন্তু হায়, তা তো সম্ভব নয়! কানের কাছে ফিসফিস শুনলাম, আপাতত এটাই ঢের। আমার সঙ্গীর ইশারা পেয়ে মাঝখানের কবরটার দিকে এগিয়ে গেলাম, ঠেলতে শুরু করলাম ওটার কংক্রিটের ডালা। জিনিসটা ভীষণ ভারী, হাঁপিয়ে উঠলাম খুব শীঘ্রি, অনেক চেষ্টার পর মাত্র কয়েক ইঞ্চি ফাঁক করতে পারলাম। ওখান দিয়েই ঢুকিয়ে দিলাম হাত। ভেতরের লাশটা এখন স্রেফ কঙ্কাল, জোড়া থেকে হাড়গুলো আলাদা করে ফেলতে খুব একটা কষ্ট হলো না। ফাঁক দিয়ে একে একে সব হাড় বের করে আনলাম, স্তুপ করে রাখলাম দেয়ালের পাশে।
তারপর বোঁচকা থেকে ছাইমাটি ঢাললাম কবরের ভেতরে। হাত দিয়ে চেপে চেপে যতদূর সম্ভব সমান করে দিলাম।
সবশেষে ডালাটা আবার আগের জায়গায় নিয়ে এলাম। কাজ শেষ হলে বসে পড়লাম মাটিতে….বিশ্রাম নেবার জন্য। খুশি হয়েছে আমার সঙ্গী, তার পুরস্কার হিসেবে একটা দৃশ্য দেখাল আমায়।
একটা বেডরুম ভেসে উঠল চোখের সামনে, সেইসঙ্গে
সাদা চাদরে মোড়া একটা বিছানা….চাঁদের আলোয় ঝলমল করছে ঘর। জোনাথন হারকার ঘুমোচ্ছেন সেই বিছানায়, আর মাদাম মীনা হারকার….বসে আছেন হাঁটু গেড়ে, জড়িয়ে ধরে আছেন বিছানার পাশে দাঁড়ানো একটা দীর্ঘদেহী মূর্তিকে। সেই দীর্ঘদেহী মূর্তিই বর্তমানে আমার গোপন সঙ্গী! কালো পোশাক পরে আছে সে, মুখ ঢাকা পড়ে আছে ছায়ায়। মূর্তিটা মাদাম হারকারের র ঘাড়ের ওপর ঝুঁকে দাঁড়িয়ে আছে। মাদাম হারকার সম্ভবত ঘোরের মধ্যে আছেন। মূর্তিটা তার একটা হাত দিয়ে মাদাম হারকারের ঘাড়ের ওপর থেকে চুল সরিয়ে দিল, তারপর ঘাড়ের ওই উন্মুক্ত চামড়ায় নিজের মুখ ঠেসে ধরল। এতদূর দেখা মাত্রই অদ্ভুত এক শিহরণ বয়ে গেল আমার শরীরে।
মনে হলো, মাদাম হারকার নয়, যেন আমার ঘাড়েই মুখ ঠেসে ধরেছে আমার সঙ্গী।
বেশ অনেকটা সময় মাদাম হারকারের ওপর ঝুঁকে রইল আমার সঙ্গীটি। তারপর যখন সোজা হলো, দেখলাম তার মুখ লাল রক্তে রঞ্জিত। মাদাম হারকারের পরনের সাদা নাইটগাউনও লাল হয়ে গেছে, ঘাড় থেকে নেমে আসা রক্তধারায়।
এবার মুখ খুলল আমার সঙ্গী। মাদাম হারকারের উদ্দেশ্যে বলল, ” আমার বিরুদ্ধাচরণ করেছ তুমি, অন্যদের সাহায্য করেছ আমায় নিধন করতে। এর পরিণাম আবার টের পাবে তুমি….টের পাবে তোমরা সবাই।
বড্ড ভুল করেছ তোমরা – লাগতে গেছো এমন
একজনের সঙ্গে, যে শত শত বছর ধরে রাজত্ব করছে দুনিয়ায়, যার মৃত্যু নেই, যার শক্তির কোনও সীমা নেই। সাময়িক জয় পেয়েছিলে তোমরা, কিন্তু এবার তার মূল্য চোকাতে হবে কড়ায় গন্ডায়! শুরুটা তোমায় দিয়েই হচ্ছে – তোমাকে আমার দাসী বানানোর মধ্যে দিয়ে এর আরম্ভ হচ্ছে। তুমিই হতে চলেছ আমার সাহায্যকারিনী, আমার সহচরী। আমি তোমার রক্তপান করলাম….এখন তুমি পান করবে আমার শরীরের যুগসঞ্চিত ঠাণ্ডা রক্ত। ব্যস, তাহলেই আমার প্রভাব গিয়ে পড়বে তোমার ওপর। এখন থেকে আমার কথাতেই উঠবে বসবে তুমি। দেশ – কালের বাধা পেরিয়ে আমার আদেশ পালন করতে হবে তোমায়।”
কথা শেষ করে নিজের পরনের আলখাল্লাটা দু-ফাঁক করল আমার সঙ্গী। লম্বা নখ দিয়ে নিজের বুক চিরে একটা শিরা ছিঁড়ে ফেলল। গলগল করে বেরোতে লাগল তাজা রক্ত। মাদাম হারকারের মাথাটা ধরে এগিয়ে নিয়ে এসে ঠেসে ধরল নিজের বুকের ক্ষতস্থানটায়। বাধ্য করল রক্ত খেতে। বাধা দেবার কোনও চেষ্টাই করলেন না মাদাম হারকার, বা পারলেন না। রক্তের ধারা ঢুকতে লাগল তাঁর মুখে….গলায়।”
হঠাৎ দড়াম করে খুলে গেল ঘরের দরজা। দু’জন পুরুষ ঢুকে পড়ল ঘরে। তাদের দু’জনের হাতেই ক্রুশ। মাদাম হারকারকে ছেড়ে দিয়ে পিছিয়ে গেল আমার সঙ্গী। ক্রুশ’টার দিকে চেয়ে অস্ফুট আর্তনাদ করে লাটিমের মতো ঘুরল, পরক্ষণে কুয়াশায় পরিণত হলো তার দেহ। মিলিয়ে গেল বাতাসে। ……দৃশ্যটার সমাপ্তি ঘটল ওখানে। একটু পরে উঠে দাঁড়ালাম আমি, জামা থেকে ধুলোবালি ঝেড়ে বেরিয়ে এলাম সমাধি থেকে। বাড়ির পথ ধরলাম। জানি না স্বপ্নের মতো এই দৃশ্যের অর্থ কি। শুধু এটুকু জানি, দৃশ্যটা আমার ভেতর জাগিয়ে তুলেছে দুঃখ, বেদনা, ঈর্ষা আর কামনা। এতকিছু করছি আমার সঙ্গীর জন্য, আর ও কিনা…… কি অপেক্ষা করছে ভবিষ্যতে, কে জানে।

মীনা হারকারের
ডায়েরী

।।৩০ সেপ্টেম্বর।।

আবার অসুখে পড়েছে কুইন্সি। নিউমোনিয়া। গত কয়েকদিন ধরে খুব ব্যস্ত ছিলাম ওকে নিয়ে, ডায়েরী লেখারও সময়
পাইনি। এখনও বিপদ অবশ্য পুরোপুরি কাটেনি। ইলিনা পাশে না থাকলে কি যে হতো, বলা মুশকিল।

।।১ লা অক্টোবর।।

কুইন্সির অবস্থা আজ একটু ভাল। খাওয়া দাওয়া শুরু করেছে। বিছানায়
বসে খেলনা নিয়ে খেলতেও পারছে। আশা করি শীঘ্রি সুস্থ হয়ে উঠবে। আরেকটা ব্যাপার লিখে রাখা দরকার বলে মনে করছি। এখনো পর্যন্ত প্রফেসর আন্দ্রে কোভাক্সের
কোনও খোঁজ পাওয়া যায় নি। অভিযান সেরে আজ অবধি ফিরে আসেন নি। যত দিন যাচ্ছে, ততই উদ্বিগ্ন হয়ে উঠছি আমি আর জোনাথন। বিপদআপদ হলো কিনা কে জানে। ভদ্রলোককে খুব পছন্দ করি আমরা; তাঁর কিছু হয়ে গেলে প্রচণ্ড আঘাত পাবে ইলিনা আর জোনাথন। প্রার্থনা করি যাতে সুস্থ থাকেন তিনি।

(আন্দ্রে কোভাক্সের ডায়রি)

খুব কষ্ট হচ্ছে শ্বীস নিতে তীর পর এ আগ্রহ নিয়ে বেহেরিট এর কথা শুনছি….
“শয়তানের কথাই ধরো”, হঠাৎ বলল বেহেরিট, ” ঈশ্বরের
বিরুদ্ধাচরণ করেছিলেন তিনি….মানুষের মধ্যে বিলিয়ে
দিয়েছেন
সেইসব জ্ঞান, যা ঈশ্বর গোপন রাখতে চেয়েছিলেন…..ঈ
শ্বর চেয়েছিলেন মানুষকে অজ্ঞ আর মূর্খ বানিয়ে রেখে
চাকরের মতো ব্যবহার করতে। ঈশ্বরের সেই ইচ্ছায় বাদ
সেধেছিলেন আমাদের মহান শয়তান। ঈশ্বরকে চ্যালেঞ্জ
করেছিলেন – তুমিই বলো, কাজটা ঠিক করেছিলেন না
ভুল?”
জবাব দিলাম না। বেহেরিটের সঙ্গে পালটা তর্কে
যাওয়া স্রেফ
বাতুলতা।
আমার নীরবতায় কোনও প্রভাব পড়ল না লোকটার মধ্যে।
সে
বলে চলল, ” ধর্মীয় বইপত্রে লেখা আছে, ঈশ্বর নাকি
পতিত
দেবদূতদের প্রতিস্থাপন করার জন্য তৈরি করেছিলেন
মানুষকে।
ওখানে আরও বলা হয়েছে, মানুষের প্রতি ঈশ্বরের
ভালবাসাকে
নাকি ঈর্ষা করেন শয়তান….সেজন্যই নাকি প্রতিনিয়ত
বিপথে চালাতে
চান মানুষকে। কিন্তু ভেবে দ্যাখো বন্ধু, যদি শয়তান
মানুষের
সত্যিই ক্ষতি চাইতেন, তা হলে তো তিনি মানুষের
বিরুদ্ধে
অনেক কিছুই করতে পারতেন, তা না করে কেন
বিলিয়েছেন
জ্ঞান? জানো নিশ্চয়ই, এককালে তোমাদের পবিত্র
চার্চ,
বিজ্ঞানীদের শয়তানের সহচর ভাবত….পুড়িয়ে মারা
হতো
তাদের। কেন? জ্ঞান বিজ্ঞানের অগ্রগতি রুদ্ধ করার
জন্য। কারা তা
হলে বোকা…শয়তানের সহচরেরা না ঈশ্বরের অনুগতরা?
সেই
জ্ঞান প্রাচুর্য আর ক্ষমতার বিনিময়ে কি পেয়েছেন
শয়তান?
স্রেফ আত্মা, আর কিছুই না। মূল্য হিসেবে তা কি বড়ই
সামান্য নয়?”
চুপচাপ শুনে গেলাম বেহেরিটের কথা। তার কন্ঠে তখন
খেলা
করছিল অদ্ভুত এক দম্ভ। বুঝতে পারছিলাম, কোনও যুক্তি
দিয়ে
টলানো যাবে না তাকে।
টানেল ধরে ধরে বড় একটা চেম্বারের মতো জায়গায় এসে
পৌঁছলাম আমরা। উপাসনালয় ছাড়া আর কিছু বলা যায় না
জায়গাটাকে। দৈর্ঘ
প্রস্থে পঞ্চাশ ফুট, দশভূজ আকৃতির। মাঝখানে যখন
বেহেরিট
প্রদীপ নামিয়ে রাখল, দেখলাম, চেম্বারের দেয়াল, ছাত
আর
মেঝে…. সবখানে রঙবেরঙের তুলিতে ভয়াবহ সব দৃশ্য
আঁকা।
পিশাচ আর দানবদের হাতে মানুষের নিপীড়িত হবার দৃশ্য।
ছবিগুলো
এত জ্যান্ত যে মনে হচ্ছিল, নিপীড়িত মানুষগুলোর
আর্তনাদ
যেন শুনতে পাচ্ছি আমি। চেম্বারের একপ্রান্তের দেয়াল
ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে অতিকায় একটা ড্রাগনের মূর্তি –
কালো পাথর কুঁদে কুঁদে গড়ে
তোলা হয়েছে তার সুবিশাল দেহ; একেবারে নিখুঁত।
গায়ের
আঁশগুলো পর্যন্ত নিখুঁত। চোখের জায়গায় হলদেটে দুটো
স্ফটিকপাথর বসানো, অন্ধকারে জ্বলজ্বল করছে ওগুলো।
চোখের কারণে জ্যান্ত মনে হচ্ছে মূর্তিটাকে। দুই পায়ের
ফাঁকে একটা দরজা দেখতে পেলাম – না, কাঠের নয়,
সাদা
কোয়ার্টজ পাথরে তৈরি। মনে হলো দরজার পাল্লা ভেদ
করে
বেরিয়ে আসছে লালচে একটা আভা, যেন আগুন জ্বলছে
ওপাশে, ব্যাপারটা সত্যি হতে পারে, কারণ চেম্বারের
বাতাস গরম
হয়ে আছে, নাকে আসছে সালফারের গন্ধ। ” এখানেই”,
বলল বেহেরিট, ” এখানেই কালা যাদুর শিক্ষার্থীরা
নিজেদেরকে নিবেদন করত শয়তানের কাছে। দশম
ছাত্রটিকে
নিজের কাছে রেখে দিতেন স্বয়ং শয়তান, কালা
যাদুবিদ্যা
শেখানোর ভেট হিসেবে, বাকি ন’জন ফিরে যেতে পারত
বাইরের দুনিয়ায়…কালা যাদুর চর্চা করতে।” ” দশম
ছাত্রটির কপালে কি জুটর?” প্রশ্ন করলাম আমি। …..”
শয়তানের দাস হিসেবে তাকে কাটাতে হতো আজীবন।
ক্রীতদাসের জীবন যাপন করতে হতো। আত্মপরিচয় বলতে
কিছুই থাকত না। প্রভুর ইচ্ছেতেই বাঁচতে মরতে হতো
তাকে।”
…..” কাউন্ট ড্রাকুলা কি…..”
” হ্যাঁ, দশম শিক্ষার্থী হিসেবে তাকে বাছাই
করেছিলেন শয়তান”,
হিসহিস করে বলতে লাগল বেহেরিট, ” অমরত্বের সাধনা
করছিল
সে, পেয়েও গেল; কিন্তু শিক্ষা শেষে তাকেই নিজের
ভেট হিসেবে চেয়ে বসলেন শয়তান, রাজি হলো না
কাউন্ট।
স্বয়ং শয়তানকে অমান্য করল সে। বলল, মরে গেলেও
কারোর দাসত্ব করবে না সে।” হেসে উঠলাম এবার
বেহেরিটের কথা শুনে। ভ্রু কুঁচকে গেল বেহেরিটের।
জিজ্ঞেস করল, ” তুমি হাসছ?”
হাসতে হাসতেই বললাম, ” না হেসে উপায় কি? ঠিক
শয়তান যেমন
করে ঈশ্বরকে অমান্য করেছিল, ঠিক সেভাবেই তাকে’ও
অমান্য করল কাউন্ট। কথায় আছে না, ধর্মের কল বাতাসে
নড়ে?
উচিত শিক্ষা হয়েছে শয়তানের”। দীর্ঘশ্বাস ফেলল
বেহেরিট। ” হয়তো ঠিকই বলেছ। কিন্তু
তারপরেও….শয়তানের বিরুদ্ধাচরণ যে সে ব্যাপার নয়,
অথচ
সেটাই করে বসেছিল কাউন্ট। কাজটা আতঙ্কিত করে
তোলে
আমাদেরকে….কারণ ও দাসত্ব মেনে না নিলে অন্য
কাউকে
সে জায়গা নিতে হবে। সবাই মিলে হামলা করলাম ওর
ওপরে।
চেষ্টা করলাম ওকে পরাস্ত করে শয়তানের পায়ে
নিবেদন
করতে। লাভ হলো না। লড়াইয়ে সবাইকে খুন করল কাউন্ট,
বাঁচতে পারলাম কেবল আমি, তারপর ও পালিয়ে গেল
স্কলোম্যান্স থেকে। শয়তান সর্বশক্তি প্রয়োগ করেও
তাকে ঠেকাতে পারেননি। তারপর থেকেই বন্ধ হয়ে যায়
এই
স্কলোম্যান্স”।
” এখানেই ঘটেছিল সেই ঘটনা?” ফিসফিসিয়ে উঠলাম
আমি, ”
এখানেই সহপাঠীদের খুন করেছিল কাউন্ট?” উদাস
দৃষ্টিতে ছাদের দিকে তাকাল বেহেরিট। একটা
দীর্ঘশ্বাস
ফেলে বলল, ” হ্যাঁ। এখানেই সহপাঠীদের খুন করেছিল
ড্রাকুলা
“।
জিজ্ঞেস করলাম, ” আ…আপনি শয়তানকে স্বচক্ষে
দেখেছেন? আচ্ছা, কেমন দেখতে তাঁকে?” কাঁধ ঝাঁকাল
বেহেরিট। বলল, ” অনেক চেহারা আছে তাঁর। জ্বলন্ত
দেবদূতের মতো…. শিংওয়ালা ড্রাগনের মতো… তোমার
আমার মতো!”
ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলাম, ” আপনিই শয়তান ন’ন তো?”
হাসল বেহেরিট। ” হঠাৎ এ প্রশ্ন কেন? তোমার কি তাই-ই
মনে
হয়?”
…..” না, মানে…”
” বাজে চিন্তায় সময় নষ্ট করবে না। জরুরী দরকার আছে
আমার।
তুমি আমায় সাহায্য করবে।” …… ” কিভাবে? ”
” আমি অমর, বন্ধু”, বেহেরিট বলতে লাগল, ” কিন্তু খাদ্য
হিসেবে
রক্ত না পেলে আমার অবস্থা হয় শুকনো, প্রাণহীন
পাটকাঠির
মতো। চারশো বছরের অভুক্তি আমার সে দশাই করেছিল।
জ্বলন্ত আগুনের মতো সেই খিদের প্রথম ধাক্কাটা গেছে
তোমার ওই সঙ্গীটির ওপর দিয়ে। ওর শরীরের একবিন্দু
রক্ত
অবশিষ্ট রাখিনি। মারা গেছে ও। তবে তোমার বেলায়
এরকম কিছু
ঘটবে না। আত্মনিয়ন্ত্রণ ফিরে পেয়েছি আমি, তোমার
রক্ত
আমায় ফিরিয়ে দিয়েছে যৌবন…. তাই প্রতিদানে আমিও
একটা উপহার
দিতে চাই তোমায়। অমরত্ব! ”
” আপনি আমায় ভ্যাম্পায়ার বানাতে চান?” চরম ঘৃণায়
কেঁপে উঠলাম
আমি। ” কক্ষনো না”।
বেহেরিট বলল, ” রাজি না হলে তুমি মারা যাবে। মানুষ
হিসেবে
আমার খিদে মেটানো সম্ভব নয় তোমার পক্ষে”। ” তা হলে
মরব”, বললাম আমি।
” মরলে যে লাইব্রেরীটা মিস করবে”, বেহেরিটের কন্ঠে
ফুটে উঠল প্রচ্ছন্ন কৌতুক। এখানকার লাইব্রেরীটার
প্রতি আমার
মোহের ব্যাপারটা ধরে ফেলেছে সে। ” কেন এমন করতে
চাইছেন, আপনি?” অসহায়ের মতো চেঁচিয়ে বললাম আমি,
” আমাকে মেরে ফেলে মুক্তি দিচ্ছেন না কেন? মূল্যহীন
এক মানুষ আমি”। ” ঠিক তার উলটো”, বলল বেহেরিট, ”
আমার কাছে তুমি এক অমূল্য সম্পদ। আমার হয়ে একটা
কাজ করবে তুমি। তবে নশ্বর
মানুষ হিসেবে সে কাজ করা সম্ভব নয়”। ” কি কাজ?”
” ওই কাউন্ট ড্রাকুলাকে খুঁজে বের করতে হবে তোমায়”।
” আমি তো আপনাকে আগেই জানিয়েছি, সে ধ্বংস হয়ে
গেছে। ”
আমার কথাকে পাত্তা না দিয়ে বেহেরিট বলল, ” আর
আমিও বলছি সেটা সম্ভব নয়”। দু হাতে আমার কাঁধ চেপে ধরল সে, ” ওর মৃত্যু নেই। যাই করে থাকুক তোমার বন্ধুরা, সে আবারও ফিরে আসবে…..আসতেই হবে তাকে। আমি চাই না, স্কলোম্যান্সে ফের পা রাখুক সে”।
….” ক….কিন্তু আমি তাকে খুঁজে পাবো কি করে?”
” তোমার বন্ধুদের আশপাশে। ওখানেই যাবে ও।
প্রতিশোধের নেশায়”।
সচকিত হয়ে উঠলাম কথাটা শুনে। আমার প্রিয় বন্ধুর
সামনে ঘোর বিপদ! অনুনয়ের সুরে বললাম, প্লিজ….আমায় যেতে দিন।
আ…আমার বন্ধুকে সতর্ক করে দিতে হবে। ও…ও….”
” আমি তো তোমাকে পাঠাতেই চাইছি”, বেহেরিট বলল।
” না…না, ভ্যাম্পায়ার হিসেবে নয়। কেন এত বড় শাস্তি
দিচ্ছেন আমায়? কাউন্ট ড্রাকুলা’র ভয়ে? ও কেন এত বছর পর এখানে পা রাখতে আসবে?”
” কারণ গতবার মানে ওর জীবদ্দশায় ও তাড়াহুড়ো করে
এখান থেকে পালিয়ে গিয়েছিল। এরপর থেকে গা ঢাকা
দিয়েছিল ট্রানসিলভ্যানিয়ার এক গোপন দুর্গে। কিন্তু ও বুঝতে পারেনি – পিশাচ হিসেবে তখনো ওর সর্বোচ্চ ক্ষমতা আয়ত্ব হয়নি।
কিন্তু তোমার বন্ধুদের হাতে পরাস্ত হবার পর….. কায়াহীন
অবস্থায় ভেসে বেড়াবার সময়…ওর মধ্যে সেই উপলব্ধি আসে। ও
এখন পূর্ণ ক্ষমতা চাইছে….যে ক্ষমতা পেলে ওকে আর
দিনের বেলায় কফিনে শুয়ে থাকতে হবে না, ঘুরে
বেড়াতে পারবে সূর্যের আলোতেও! আর কোনও দূর্বলতা থাকবে না, হয়ে উঠবে শয়তানের সমকক্ষ! আর সেই ক্ষমতার গোমর লুকিয়ে আছে এখানে…..এই স্কলোম্যান্সে”।
” কোথায়?” জিজ্ঞেস না করে পারলাম না।
নিঃশব্দে ড্রাগনের পায়ের তলার দরজাটার দিকে
এগিয়ে গেল বেহেরিট। হাত নাড়তেই খুলে গেল পাল্লা। ভয়ানক কিছু একটা দেখব ভেবে আতঙ্কিত হয়ে উঠেছিলাম, কিন্তু বাস্তবে স্রেফ একটা অন্ধকার সুড়ঙ্গ ছাড়া আর কিছুই দৃষ্টিগোচর হলো না। সুড়ঙ্গের ভেতর থেকে ভেসে এলো একটা গরম হাওয়া, তাতে সালফারের উৎকট দুর্গন্ধ। আচমকা আমার ঘাড়ের সবকটি চুল দাঁড়িয়ে গেল আতঙ্কে। মনে হলো যেন অশুভ কোনও
কিছুর পরশ বয়ে গেল গায়ের ওপর দিয়ে। চক্কোর দিয়ে
উঠল মাথা, ইচ্ছের বিরুদ্ধে বসে পড়লাম হাঁটু গেড়ে। সঙ্গে সঙ্গে দড়াম করে বন্ধ হয়ে গেল দরজাটা।
ঠোঁটের কোণায় এক টুকরো হাসি ঝুলিয়ে আমার দিকে
এগিয়ে এল বেহেরিট। বলল, ” ওখানে….ওখানেই লুকিয়ে আছে সেই গোমর। নরকের সর্বোচ্চ ক্ষমতার উৎস! ”
বলতে বলতে ঠোঁটদুটো ফাঁক হয়ে গেল তার। বেরিয়ে এল দুটো শ্বদন্ত।
” না, প্লিজ”, শেষবারের মতো চেঁচালাম আমি, ” যেতে
দিন আমায়। নয়তো মেরে ফেলুন একেবারে। কিন্তু জীবন্মৃত করে বাঁচিয়ে রাখবেন না প্লিজ”।
” আর কোনও বিকল্প নেই”,আমার সামনে এসে হাঁটু গেড়ে বসল বেহেরিট, ” আমার ক্ষুধা তৃষ্ণা মেটাতে হবে
তোমায়…যেতে হবে কাউন্টে’র খোঁজেও। ভ্যাম্পায়ার না
হলে দুটোর কোনওটাই করা সম্ভব নয় তোমার পক্ষে। আর বাধা দিয়ো না। যদি স্বেচ্ছায় নিজেকে সমর্পণ করো”, কানের কাছে মুখ এনে সে ফিসফিস করে বলতে লাগল, ” তাহলে লাইব্রেরীতে অবাধ প্রবেশাধিকার দেব তোমায়।
অনন্তকাল ধরে ওই বইগুলো পড়তে পারবে তুমি”, এই বলে বিকটভাবে হেসে উঠল বেহেরিট।
অবশ হয়ে এল হাত পা। আর কিছু বলবার বা করবার শক্তি রইল না আমার দেহে। অসহায়ের মতো শুধু টের পেলাম, আমার ঘাড়ের কাছে মুখ নেমে এল বেহেরিটের। আবারও অনুভব করলাম তার দংশন। তৃতীয় বারের মতো আমার রক্ত চুষতে লাগল সে।
আমার চোখের দৃষ্টি ঘোলাটে হয়ে এল। সে অবস্থায়
দেখলাম, বাতাসে পাক খাচ্ছে অশুভ আত্মার দল, ঘুরপাক খাচ্ছে আমাদের ঘিরে। মুখে তাদের অশুভ হাসি। আমার রক্ত খাওয়া শেষ হলে সোজা হয়ে দাঁড়াল
বেহেরিট।
নিজের পরনের আলখাল্লার বোতাম খুলে ফেলল, তারপর নিজের ধারালো নখ দিয়ে চিরে ফেলল নিজের বুকের একটা শিরা। জোর করে ওর রক্ত খেতে বাধ্য করল আমায়।
জ্ঞান হারাবার আগে শুনতে পেলাম ওর কথা, ” এবার আমাদের আত্মা এক হয়ে গেল। তোমার চিন্তা, তোমার ভাবনা….সব এখন থেকে বুঝতে পারব আমি। চাইলেও আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারবে না তুমি”।
।।পরে।।
মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছি আমি। মরার আগে শেষ
শক্তিটুকু ব্যয় করে জার্নালের শেষ অংশটুকু লিখে যাচ্ছি। যদিও আগের মতো ঠিকমতো ব্যাখ্যা করে নয়, অসম্পূর্ণভাবেই লিখে যাচ্ছি; আমি তার জন্য দুঃখিত বন্ধু হেলসিং।
খানিক আগে আমার ভবিষ্যৎ করণীয় সম্পর্কে আমায়
উপদেশ দিয়ে গিয়েছে পিশাচ বেহেরিট। বলেছে, ” কাউন্ট ড্রাকুলার সঙ্গে দেখা হবার পর কোনও ধরনের ঝুঁকি নিতে যেয়ো না। সাদামাঠা ভাবে শুধু ওকে জানিয়ে দিও, ও যেন এই স্কলোম্যান্সে দ্বিতীয় বার পা না রাখে। খবরদার, জোর খাটাতে যেও না।। মনে রেখো, যদি ওর সাথে লড়াইয়ে যাও, ও তোমায় নিশ্চিতভাবে ধ্বংস করে দেবে।”
” আপনি নিজেই তাহলে কেন যাচ্ছেন না?” জিজ্ঞেস
করেছিলাম বেহেরিটকে দুর্বল গলায়।
” কারণ, এখান থেকে যাবার কোনও উপায় নেই আমার”,
উত্তরে বলেছে বেহেরিট, ” যা-ই ঘটুক, স্কলোম্যান্সেই আমায় থাকতে হবে অনন্তকাল “।
আর লিখতে পারছি না। আব্রাহাম ভ্যান হেলসিং, এমিল,
ইলিনা …..চিরবিদায়!

( প্রফেসর আন্দ্রে কোভাক্সের জার্নাল এখানেই শেষ)
এরপর আন্দ্রে কোভাক্স’কে দেখা যাবে ভ্যাম্পায়ার
হিসেবে।)

।। জোনাথন হারকারের ডায়েরী।।

১২ অক্টোবর।।

স্টাডিরুমে বসে ডায়েরী লিখছি এখন আমি। সঙ্গী বলতে
আমাদের একমাত্র পোষা সাদা বেড়ালটা। একেবারেই
জ্বালায় না আমাদের পুষি। মাঝেমাঝে ওর সঙ্গ দারুণ
উপভোগ করি আমি। ইলিনা আমাদের বাড়ি আসার পর
থেকে এখন মাঝেমাঝে স্টাডিরুমেই সময় কাটাতে হয়
আমায়; তখন সঙ্গী বলতে আমাদের একমাত্র এই পুষি। কি
শান্ত চোখদুটো পুষি’র। আদুরে ভঙ্গিতে মাঝেমাঝে
আমার পায়ে মাথা ঘষে।
না, ইলিনা মেয়েটাকে এড়িয়ে চলছি না আমি। বরঞ্চ ও
আসাতে খুশীই হয়েছি আমরা। কুইন্সি’র দায়িত্ব
ভাগাভাগি করার মতো একজন সঙ্গী পেয়েছে মীনা।
কিন্তু ইলিনা আসার পর থেকেই কেমন এক ধরনের বিমর্ষ
ভাব ভর করেছে আমার মধ্যে। তাই এই দূরে দূরে থাকা।
কেন এমনটা হচ্ছে, জানি না। অথচ ইলিনা আসার পর
থেকে বেশ খুশীতেই আছে দুজনে….হাসাহাসি….কত গল্প
দুজনায়। আমি চাই না, ওদের বন্ধুত্বে বাদ সাধুক আমার এই
গাম্ভীর্য, বিষণ্ণতা।
কেন এই বিমর্ষতা, আমি বুঝতে পারছি না। অনেক ভেবে
দেখেছি, এর একটা কারণ হতে পারে, ইদানীং আমাদের
ফার্মে একটা অফিসিয়ালি কারণে বেশ ঝামেলা চলছে।
তাছাড়া, কুইন্সি’র অসুস্থতাকেও অস্বীকার করা যায় না।
এসব কারণেই হয়তো….কিন্তু এগুলো তো নতুন কিছু নয়
আমার জীবনে! তাহলে হঠাৎ কেন এত বিষণ্ণতা চেপে
বসছে আমার ঘাড়ে?
ট্রানসিলভ্যানিয়ার ভ্রমণটাই কি এর মূলে? আমার
জীবনে সেই এক ভয়াবহ অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল,
ড্রাকুলার ক্যাসলে প্রথম পা রাখার সাথে; তারপর
কোনওমতে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে এসেছিলাম ঠিকই কিন্তু
তারপরও বহুদিন আমি অসুখে ভুগেছি। শারীরিক ও
মানসিক – দু’দিক থেকেই আমি ভুগেছিলাম। সুস্থ হয়ে
ওঠার পরও আরও কত ভয়াবহ জিনিস প্রত্যক্ষ করেছি।
মীনার বান্ধবী লুসি ওয়েস্টের্নার ভ্যাম্পায়ারের
শিকার হওয়া এবং নিজেরও ভ্যাম্পায়ারে পরিণত হওয়া,
ইংলন্ডে ড্রাকুলার আবির্ভাব এবং ত্রাস সৃষ্টি…. এবং
শেষমেশ মীনা’র দিকেও হাত বাড়িয়েছিল সে। রক্তপান
করেছিল আমার স্ত্রী -র। নিজেকে সেসময় বড়ই অসহায়
মনে হয়েছিল। মরমে মরে গিয়েছিলাম আমি সেদিন সেই
পিশাচের বিরুদ্ধে অক্ষমতায়। সময়ের ডানায় ভর করে
ভয়াবহ সেসব দিন আজ শুধুই স্মৃতি। সেইসব ভয়াবহ
অভিজ্ঞতার পর কেটে গেছে সাত সাতটা বছর। কিন্তু
আজও সেসব ঘটনা মনে পড়লে আমার আতঙ্ক জাগে। সমগ্র
স্বত্তার ওপর চেপে বসে এক চরম বিষাদ। এখন আমার
সেইরকম দশা’ই চলছে।
মনের এই অবস্থা জীবনে সবকিছুর ওপর প্রভাব ফেলে।
হাসি আনন্দ, দৈনন্দিন কাজকর্ম – কোনও কিছুই
স্বাভাবিক চলতে পারে না। আজকাল আমি সবকিছুর
মধ্যেই কিরকম একটা কালো ছায়া দেখতে পাই। ইলিনা
চমৎকার একটি মেয়ে, দেখতে শুনতে ভাল, খারাপ কোনও
স্বভাবই নেই ওর ভেতরে….কিন্তু তবু ওকে আজকাল আমার
কেমন যেন লাগে। ব্যাপারটা ভাষায় ঠিকভাবে
বোঝাতে পারব না আমি। ওর ভেতরে মাঝেমাঝে কিরকম
একটা অশুভ কিছু ইঙ্গিত প্রায়ই দেখতে পাই। বিশেষ করে
মীনা সামনে না থাকলে। আমার দিকে মাঝেমাঝেই ও
কেমন বাঁকা দৃষ্টিতে তাকায়….ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে
একটা দুর্বোধ্য হাসি….এসবের আমি কোনও মানে বুঝতে
পারি না। এসব কি আমার অতি কল্পনা? আর এমনই আশ্চর্য,
এই জিনিসগুলো একমাত্র আমি ছাড়া কেউ দেখতে পায়
না। এইসব ব্যাপারগুলোই ভাবিয়ে তোলে আমাকে, সুখ
শান্তির পথে বাধা সৃষ্টি করে, বিষন্ন করে তোলে।
ইলিনার কথা যখন এসেই পড়ল, তখন ওর ব্যাপারে আরেকটু
লেখা যাক। ইদানীং ওকে আমি খুব মনোযোগ দিয়ে
লক্ষ্য করছি। ওর পোশাকআশাক আমার চোখে বেশ
বেমানান ঠেকে। রঙচঙে যুবতী একটা মেয়ে, অথচ ওর
পোশাক বলতে শুধু গলা পর্যন্ত ঢাকা সাদা ব্লাউজ আর
লম্বা কালো স্কার্ট। ঠিক যেন গভর্নেস। ওটা ছাড়া আর
কোনও পোশাক কি নেই ওর? না থাকলে মীনার কাছ
থেকে পোশাক ধার চেয়ে নিতে পারে। কিন্তু সেটা
করছে না কেন? লজ্জায়? কিন্তু ওদের বন্ধুত্ব যে পর্যায়ে
পৌঁছেছে, তাতে তো ওর মধ্যে কোনও দ্বিধাদ্বন্দ্ব
থাকার কথা নয়।
ইলিনাকে দেখি আর কি যেন হয় আমার মধ্যে। ওকে যত
দেখি, তত একটা মুগ্ধতা কাজ করে আমার মধ্যে। আবার
সেইসঙ্গে চরম বিতৃষ্ণা। কেন এমন পরস্পরবিরোধী
আবেগের সঞ্চার হয় আমার মধ্যে? নাহ, এখন থেকে
নিজেকে আরও নিয়ন্ত্রণ করা দরকার আমার।
১৪ অক্টোবর।।
গত রাতে স্টাডি’তে বসে বসেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।
কিন্তু ঘুমের মধ্যে একটা কেমন অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলাম। যেন
চেয়ারে মূর্তির মতো আটকা পড়ে গেছি আমি; চেষ্টা
করেও নড়তে পারছি না। হঠাৎ এইসময় ইলিনা উদয় হলো
আমার কামরায়। ওর পরনে সাদা ফিনফিনে পোশাক,
পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি ওর শরীরের প্রতিটি বাঁক।
বাতাসে যেন ভাসতে লাগল ইলিনা….ভূতের মতো। বুক
শেলফের সামনে দিয়ে যখন ভাসতে ভাসতে গেল, লক্ষ্য
করলাম ওর শরীরটা জীবিত মানুষের মতো নিরেট নয়, ওর
শরীর ভেদ করেও পড়তে পারা যাচ্ছে শেলফে সাজিয়ে
রাখা বইগুলোর নাম। ম্যান্টেলপিসের সামনে দিয়ে ও
যখন গেল, ওখানে ঝুলিয়ে রাখা আয়নায় কোনও
প্রতিবিম্ব পড়ল না। ধীরেধীরে আমার চারপাশে চক্কোর
দিতে লাগল ও। ওর মুখে ফুটে উঠল মোহনীয় এক হাসি,
চোখ জ্বলজ্বল করতে লাগল। যেন সম্মোহন করছে আমায়।
” এখনও যুবক তুমি, জোনাথন”, মাদকতা মেশানো গলায়
বলল সে, ” এখনও শক্তিশালী। তুমি এখনও সন্তুষ্ট করতে
পারবে আমাদের সবাইকে”।
আমার গায়ের ওপর ঝুঁকে এল ইলিনা, চামড়ায় পেলাম ওর
গরম।নিশ্বাসের হলকা। ভয় পেলাম, সেইসঙ্গে বুক ঢিবঢিব
করে উঠল আমার এক অজানা উত্তেজনায়। এই অনুভূতির
সাথে আমি পরিচিত – ড্রাকুলা ক্যাসলে ড্রাকুলার
সহচরী ওই তিন ডাইনী যখন আমার কাছে এসেছিল, ঠিক
এমনটাই লেগেছিল আমার। মনের গহীনে জেগে উঠল
তীব্র প্রতিবাদ, চাইলাম ইলিনাকে ঠেলে সরিয়ে দিতে,
কিন্তু পারলাম না। ধীরেধীরে ওর ঠোঁট স্পর্শ করল আমার
ঘাড়……..
আর তখুনি ধড়মড় করে জেগে উঠলাম আমি। হতভম্ব হয়ে
চারদিকে নজর ঘোরাতেই দেখি, স্টাডি’তে আগের মত
বসে আছি আমি….একাকী, নিঃসঙ্গ। কেউ নেই
আশেপাশে।
আত্মগ্লানিতে হেঁট হয়ে এল মাথা। কি দেখলাম এসব?
অসহায়, আশ্রিতা একটা মেয়ে…..উপায়ান্তর না দেখে
ঠাঁই নিয়েছে আমার বাড়িতে…..আর তাকেই কিনা
ড্রাকুলা ক্যাসলের ওই পিশাচিনী’গুলোর রূপে কল্পনা
করলাম? নিশ্চয়ই আমার অবচেতন মনে এ ধরনের কোনও
চিন্তা খেলা করে, নইলে এমন দৃশ্য দেখতে যাব কেন?
খারাপ লাগছে খুব। ইলিনা আমাদের পরিবারের একজন
সদস্যের মতো হয়ে গেছে এই ক’দিনেই; তাকে নিয়ে
খারাপ চিন্তা মানায় না আমাকে। – হোক সেটা সচেতন,
বা অবচেতনভাবে। এই তো….ডায়েরী লিখতে লিখতেও
শুনতে পাচ্ছি ওর আর মীনার টুকরো টুকরো হাসি,
কথাবার্তা…. ঘুমোতে যাবার আগে দুজনে চুল আঁচড়াতে
বসেছে…. আমি চাই না ওদের মাঝে আমার কারণে
কোনও তিক্ততা সৃষ্টি হোক।

১৬ অক্টোবর।

আজকের দিনটা শান্তিতে কেটেছে। অফিসের কাজেই
ব্যস্ত ছিলাম সারাদিন, অন্য কিছু নিয়ে ভাববার সময়
ছিল না, আজেবাজে কোনও চিন্তাও জেঁকে বসেনি
মাথায়। বাসায় ফেরার পর মীনার সঙ্গে আনন্দঘন সময়
কাটিয়েছি। ও এখনো জানে না, মনের মধ্যে কি অশান্তি
নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি আমি….জানার ইচ্ছেও নেই।
কুইন্সিকে নিয়ে ও এমনিতেই যথেষ্ট পরেশান, এর মধ্যে
আর নতুন করে দুশ্চিন্তা গছানো ঠিক হবে না। আমার
একার সমস্যা আমাকেই সমাধান করতে হবে।

১৭ অক্টোবর।।

কাল রাতে অদ্ভুত একটা অভিজ্ঞতা হয়েছে। কেন ঘটল
ঘটনাটা, এর পেছনে কোনও যুক্তি আছে কিনা জানি না।
তারপরেও ঠিক করেছি ডায়েরীতে তুলে রাখব ওটা।
স্টাডিতে বসে পড়াশোনা করছিলাম গত রাতে, হঠাৎ
বাইরে থেকে শুনতে পেলাম আমাদের পোষা বেড়ালটার
একটানা মিঁয়াও মিঁয়াও ডাক। জানলার চৌকাঠে
বসেছিল ও, থাবা ঘষছিল কাঁচে; তাড়াতাড়ি জানলা
খুলে ওকে ভেতরে ঢোকালাম। ডেস্কের ওপর উঠে বসল
বেড়ালটা, শান্ত ভঙ্গিতে দেখতে লাগল আমার কাজ।
এমনিতে পুসি চুপচাপ স্বভাবের বেড়াল, কিন্তু কাল মনে
হলো আরও কেমন যেন থম মেরে আছে। কালকে ওর
উপস্থিতি কেমন যেন অস্বস্তি জাগিয়ে তুলছিল আমার
মধ্যে। হঠাৎ খেয়াল করলাম, ডেস্ক ল্যাম্পের আলোটা
বেড়ালের বিশাল এক ছায়া ফেলেছে পেছনের
দেয়ালে…..আর সেখানে জ্বলছে নিভছে লাল -নীল রঙের
ফুটকি।
কলম নামিয়ে রাখলাম আমি, বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে
রইলাম সেদিকে। বোঝার চেষ্টা করলাম ব্যাপারটা
চোখের ভুল কিনা। আর কোনও ব্যাখ্যা থাকতে পারে না,
কারণ লাল – নীল আলোর এই খেলা জীবনে স্রেফ একবার
দেখেছিলাম আমি – সেন্ট জর্জ দিবসের রাতে
ট্রানসিলভ্যানিয়ার আকাশে। সেই রাতেই প্রথমবারের
মতো ড্রাকুলা ক্যাসলে গিয়েছিলাম আমি।
যাই হোক, বর্তমান প্রসঙ্গে ফিরে আসি। বেড়ালটা
একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল আমার দিকে। ধীরেধীরে ওর
চোখের রঙ বদলাতে শুরু করল – সবুজ থেকে লাল- মনে হলো
শয়তান ভর করছে ওর মধ্যে। কানদুটো লেপ্টে গেল মাথার
সাথে, বীভৎস ভঙ্গিতে হাঁ করল প্রাণীটা, গলা দিয়ে
বেরিয়ে এল চাপা হিসহিসানি। আক্রমণের প্রস্তুতি
নিচ্ছে ওটা। ভয়ে অন্তরাত্মা শুকিয়ে গেল, ওর চেহারা
আর গলার আওয়াজ শুনে।
ঢোঁক গিলে ওকে তাড়াতে গেলাম, আর তখুনি আমায়
লক্ষ্য করে ঝাঁপ দিল বেড়াল। এসে পড়ল সোজা মুখের
ওপর। ধারালো নখের আঁচড়ে কেটে গেল আমার কপাল আর
গালের চামড়া, ব্যথায় চেঁচিয়ে উঠলাম। চেষ্টা করলাম
ওকে ছুঁড়ে ফেলতে, কিন্তু চামড়া আর মাংসে নখ গেঁথে
ঝুলে রইল বেড়ালটা। এক লাফে উঠে দাঁড়ালাম,
চেয়ারটা উলটে পড়ে গেল। আর্তনাদ করে সর্বশক্তিতে
খামচে ধরলাম বেড়ালের দেহ, এক ঝটকায় ছাড়িয়ে নিয়ে
ওকে ফেলে দিলাম একপাশে। আয়নার সামনে গিয়ে পড়ল
প্রাণীটা, মেঝেতে গড়ান দিয়ে সিধে হলো। শেষবারের
মতো গরগর করে উঠল আমার উদ্দেশ্যে, তারপর একছুটে
জানলা দিয়ে পালিয়ে গেল।
যন্ত্রণায় টলতে টলতে আয়নার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম।
দেখলাম রক্তাক্ত হয়ে গেছে আমার মুখ, সর্বত্র আঁচড়ের
দাগ।ব্যথার চেয়েও বড় হয়ে উঠল আরেকটা চিন্তা। মনে
হলো, বেড়ালটা যখন আয়নার সামনে গিয়ে পড়েছিল, তখন
আয়নায় ওর প্রতিফলন দেখিনি আমি!
কয়েক মূহুর্ত পরেই ছুটে এল মীনা আর ইলিনা। আমার
অবস্থা দেখে চমকে উঠল। সংক্ষেপে ওদেরকে
জানালাম, পুসি হঠাৎ আমায় আক্রমণ করে বসেছিল। কেন
জানি না।
ওরা আর কোনও প্রশ্ন করল না আমায়। আমার সেবা
শুশ্রূষায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল। পরে বেড়ালটাকে বাগানে
খুঁজে পেল মালি – একটা ঝোপের পেছনে বসে ঠকঠক করে
কাঁপছিল। ওকে সে বাসার ভেতরে দিয়ে এল।
আমি তখন ড্রয়িংরুমে বসে মুখের ক্ষতে মলম পট্টি
লাগাচ্ছি, মীনা বেড়ালটাকে নিয়ে এল আমার কাছে,
বন্ধুত্ব করিয়ে দেবার জন্য। কিন্তু আমি আর কোনও আগ্রহ
দেখালাম না। যদিও পুসি আবার তার শান্ত রূপে ফিরে
গেছে, তারপরেও কেন যেন আর ওকে সহ্য করতে পারছি
না। মীনা অবশ্য ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করল ওর আচরণের
– বলছে কোনও কারণে ঘাবড়ে গিয়েছিল প্রাণীটা, তাই
হামলা করে বসেছে আমার ওপরে…..কিন্তু আমার বিশ্বাস
হলো না কথাটা। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়েছে, জেনেশুনেই
আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল শয়তানটা।
হয়তো ভুল করছি আমি। সেবা শুশ্রূষার ফাঁকে মনে হলো,
মূহুর্তের জন্য হলেও ইলিনার চোখেও সেই বেড়ালটার
মতো শয়তানি দৃষ্টি দেখতে পেলাম আমি। এটা মনে হতেই
ওর দিকে ভাল করে তাকালাম, না, চোখের দৃষ্টি
একেবারেই স্বাভাবিক। কি যে হচ্ছে, কিছুই বুঝতে
পারছি না।

মীনা হারকারের ডায়েরী

২১ অক্টোবর।।

ধীরেধীরে সুস্থ হয়ে উঠছে কুইন্সি। এখনো বেশ দুর্বল ও,
বিছানায় কাটাচ্ছে বেশীরভাগ সময়…..তারপরেও
ডাক্তার জানিয়েছে, আর চিন্তার কিছু নেই। ছেলে ভাল
হয়ে উঠলেও নতুন সমস্যা দেখা দিয়েছে আমার স্বামীকে
নিয়ে। সঙ্গী হিসেবে ইলিনা থাকায় খুব ভাল হয়েছে –
উদ্বেগ ভাগাভাগি করার মতো একজন মানুষ পাচ্ছি আমি।
কি যে হয়েছে জোনাথনের, কিছুই বুঝতে পারছি না।
সেদিন বেড়ালের হামলার পর থেকে কেমন যেন হয়ে
গেছে ও। সবসময় বিমর্ষ হয়ে থাকে, চেহারা দেখে মনে
হয় যেন ঝড় বয়ে গেছে ওর ওপর দিয়ে। রাতেও বোধহয়
ঠিকমতো ঘুমোয় না, চোখের নীচে কালি পড়তে শুরু
করেছে। এক রাতে স্বপ্ন দেখে ছটফট করে জেগে উঠল,
অথচ কি দেখেছে, কিছুই মনে করতে পারল না। ডাক্তার
দেখানো দরকার। ডাঃ সিউয়ার্ডকে লন্ডন থেকে ডেকে
আনব কিনা ভাবছি।
বেড়ালটা সে রাতে অমন করল কেন, তা বুঝতেই পারছি
না এখনো। অথচ ওই ঘটনার পর থেকে একেবারে লক্ষ্মী
হয়ে গেছে, ঠিক আগের মতো। দেখে বিশ্বাস করা
মুশকিল, শান্তশিষ্ট এই প্রাণীটাই কারও ওপর অমনভাবে
হামলা করতে পারে। জোনাথন আর সহ্য করতে পারছে না
ওকে, দূরে সরিয়ে রাখছি কুইন্সি’র কাছ থেকেও। অযথা
ঝুঁকি নেবার কোনও মানে হয় না।
নিজের কথা যদি বলি….সংসার সামলাতে সামলাতে
ক্লান্ত আমি, তাছাড়া, ঘুমের মধ্যে দুঃস্বপ্নের উৎপাত
বন্ধ হয়নি পুরোপুরি। আজকাল বেশ টের পাই, পুরো
বাড়িতেই কেমন যেন একটা থমথমে পরিবেশ….ঠিক ঝড়
ওঠার আগে যেমন শান্ত থাকে প্রকৃতি। মাঝেমাঝে মনে
হয়, আড়াল থেকে কেউ যেন লক্ষ্য রাখছে আমাকে, কিন্তু
বাস্তবে তেমন কোনও আলামত পাইনি। ব্যাপারটা মনের
ভুল হবার সম্ভাবনা ষোলো আনা।
মনের এই অবস্থায় একমাত্র ইলিনাই আমায় সুস্থ
স্বাভাবিক থাকতে সাহায্য করছে। ওর প্রতি আমি
কৃতজ্ঞ।

২৩ অক্টোবর।।

আজ রাতে যা ঘটে গেছে, তা লিখবার ইচ্ছে হচ্ছে না
আমার, লজ্জায় সংকুচিত হয়ে আছে মন। তারপরেও এক
ধরনের তাগিদ থেকে কলম তুলে নিয়েছি হাতে – সত্যকে
লিপিবদ্ধ করার তাগিদ। যা আমি লিখে রেখে যাব, তা
হয়ত অদূর ভবিষ্যতে কাজে আসতে পারে….মানে ও যদি
আমার এই ডায়েরী পড়ে, আর কি। ও জানবে, আমি এখনো
ওকে আগের মতোই ভালবাসি এবং শ্রদ্ধা করি। কিন্তু
ডায়েরী’টা পড়ার পর ওর অনুভূতি কি হবে, তা স্রেফ
ঈশ্বরই জানেন।
রাত দশটার দিকে আমরা যখন শুতে গেলাম, জোনাথনকে
কেমন অস্বাভাবিক রকম নীরব দেখাল। ওর চোখে লক্ষ্য
করলাম খেলা করছে এক অদ্ভুত বুনো দৃষ্টি। অন্য কোনও
সময় হলে এর কারণ জিজ্ঞাসা করতাম, কিন্তু কাল কেন
যেন জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হল না। আমার নিজের
ওপরেও অন্যরকম এক মেজাজ ভর করেছিল। নিভু নিভু হয়ে
জ্বলছিল ঘরের প্রদীপগুলো, বাতাস বেশ গুমোট। তাজা
হাওয়ার জন্য খুলে দিলাম জানলা, কিন্তু টের পেলাম,
বাইরেও বাতাস বইছে না। দূর থেকে ভেসে এল চাপা
গুড়গুড় আওয়াজ – আকাশ ঢাকা পড়ে গেছে ঘন কালো
মেঘে। নামি নামি করেও নামছে না বৃষ্টি। বিদ্যুৎ চমকের
আলোয় ক্ষণে ক্ষণে ঝলসে উঠছে গাছপালার মাথা আর
দূরের গীর্জার চোখা চূড়া। জানলার সামনে ধূলোর একটা
মেঘ পাক খেতে দেখলাম…..সঙ্গে সঙ্গে একটা ঘোরের
মতো সৃষ্টি হলো, যেন আমায় মনে করিয়ে দিতে চাইল
কোনও অশুভ স্মৃতি। তাড়াতাড়ি জানলা বন্ধ করে দিলাম।
বিছানায় উঠেই আলো নিভিয়ে দিল জোনাথন। সেটাও
অস্বাভাবিক। ঘুমোনোর আগে কিছুক্ষণ গল্প করা
আমাদের অভ্যাস। আলোটা তখন জ্বালানোই থাকে।
কিন্তু কাল রাতে কোনও কথা বলল না জোনাথন, আলোও
নিভিয়ে দিল। ওর হাবভাব কেমন অস্বাভাবিক ঠেকল
আমার কাছে। বিরক্ত করলাম না ওকে, পাশ ফিরে শুয়ে
ঘুমোনোর চেষ্টা করলাম।
হঠাৎ চমকে উঠে তাকাতেই দেখি, আমার ওপর ঝুঁকে আছে
জোনাথন। পশুর মতো ধকধক করে জ্বলছে ওর চোখদুটো –
মণিদুটোর রঙ হলুদ থেকে ধীরেধীরে লালচে হয়ে উঠল। দম
আটকে এল আমার, ওই চোখজোড়া জোনাথনের হতে পারে
না, কিছুতেই না। কিন্তু কিছুই করতে পারলাম না, জ্বলন্ত
ওই চোখজোড়ার দিকে তাকিয়ে অবশ হয়ে এসেছে দেহ,
নড়বার ক্ষমতা নেই। ধীরেধীরে আমার ঠোঁটের ওপর নেমে
আসতে লাগল ওর ঠোঁট, ক্ষুধার্তের মতো চুমো খেল
আমায়।
এরপর যা ঘটল, তা আর বিস্তারিত বলতে পারছি না। কিন্তু
এখনও সেই স্মৃতি মনে পড়লে কেঁপে উঠছি বারবার।
কামোন্মাদ এক পশুর মতো আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল
ও…..এমন ঘটনা আর কখনো ঘটেনি। ওর আচরণ দেখে ভয়ে
আতঙ্কে বিহ্বল হয়ে পড়লাম আমি। ধাক্কা দিয়ে ওকে
সরিয়ে ছুটে বেরিয়ে এলাম বেডরুম থেকে। স্নায়ু শান্ত
হবার পর যখন ফের গেলাম বেডরুমে, তখন দেখি ও
ঘুমোচ্ছে। একটু আগে ঘটে যাওয়া ঘটনার কোনও প্রভাবই
দেখা যাচ্ছে না ওর মধ্যে।
সে রাতটা কুইন্সির ঘরে বসেই কাটিয়ে দিয়েছি। ভয়াল
একটা চিন্তা আস্তে আস্তে জেঁকে বসছে আমার মাথায়।
কেন যেন মনে হচ্ছে, আজ রাতে যাকে দেখলাম, সে
জোনাথন হতে পারে না। অন্য কেউ ছিল ওটা। জানি,
কথাটা অবিশ্বাস্য শোনাচ্ছে কিন্তু এ ছাড়া আর তো
কিছু ভাবতে পারছি না। এমন কেন করল জোনাথন? ও তো
এমন মানুষ নয়!
সকাল হলে ওর সঙ্গে কথা বলতে হবে ব্যাপারটা নিয়ে।
কিন্তু ও কথা বলবে কিনা সেটাই সন্দেহ। ক’দিন ধরে
দেখছি একেবারে গুম হয়ে গেছে জোনাথন। প্রয়োজন
ছাড়া মুখই খুলছে না। কি হয়েছে ওর!

২৪ অক্টোবর।।

বিচ্ছিরি একটা দিন শেষ হলো আজ। গুমোট আবহাওয়া,
আকাশ মেঘাচ্ছন্ন, অথচ ঝড় বাদলের নামগন্ধ নেই।
জোনাথনের সঙ্গেও যেভাবে চেয়েছি, কথা বলতে
পারিনি। প্রসঙ্গটা তুললেই বার বার এড়িয়ে যাচ্ছে ও।
মাতালের মতো চোখজোড়া লাল হয়ে আছে ওর, যদিও
মদ্যপান করেনি একফোঁটা ; আমার হাত ধরে এক পর্যায়ে
বলল, ” প্লিজ, এ নিয়ে এখন কোনও কথা বোলো না। বলবার
মতো কিছু নেই। ব্যাপারটা একটা বাজে দুঃস্বপ্ন ভেবে
ভুলে থাকলেই চলবে”।
” কিন্তু জোনাথন”, বললাম আমি, ” ব্যাপারটা স্বাভাবিক
নয়। আজ পর্যন্ত কখনো তোমার অমন চেহারা দেখিনি।
কিছু একটা কারণ তো নিশ্চয়ই আছে। এড়িয়ে গেলে তো
সমস্যার সমাধান হবে না!”
” বললাম তো, কোনও সমস্যা নেই”, একটু রাগী গলায় বলল
জোনাথন। এমন সুরে আমার সঙ্গে কখনো কথা বলেনি
জোনাথন। তারপরই নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, ” প্লিজ
মীনা, এ নিয়ে আর কথা বাড়িয়ো না। আমি তোমার মনে
আঘাত দিতে চাইনি”।
” আমি আঘাত পাইনি, জোনাথন”, বললাম আমি, ” শুধু
জানতে চাইছি, কাল রাতে কি হয়েছিল তোমার। শরীর
টরীর খারাপ করেছিল নাকি….”
কথা বলতে বলতেই জোনাথনের চেহারায় এক আশ্চর্য
পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম। বিষাদ সরে গিয়ে ওর মুখে ফুটে
উঠল একটা কুটিল হাসি। ঘাড় কাত করে বিকৃত গলায় বলল,
” শরীর খারাপ হয়নি তোমার স্বামীর। আসলে কি
ঘটেছিল সেটা তুমি খুব ভাল করেই জানো। স্বীকার
করতে চাইছ না”।
চমকে উঠলাম ওর এই কথায়। মনে হলো, তৃতীয় কোনও
ব্যক্তি কথা বলছে জোনাথনের ভেতর থেকে। ভয়ার্ত
কন্ঠে প্রায় চেঁচিয়ে উঠলাম, ” জোনাথন! কি বলছ এসব? ”
আমার গলা শুনে যেন সম্বিৎ ফিরে এল জোনাথনের।
ধড়মড় করে সোজা হয়ে বসল। হতভম্ব গলায় বলল, ” ক্ক….কি
বলেছি আমি?”
” কেন, তুমি জানো না?”
” না তো! খারাপ কিছু বলেছি? ”
জবাব দিলাম না।আসলে কি বলব সেটাই ভেবে পেলাম
না। বড়সড় একটা ধাক্কা খেয়েছি, সেটা সামলে নেবার
জন্য সরে এলাম জোনাথনের সামনে থেকে।
খানিক পরে ও নিজেই খুঁজে নিল আমায়। দু’হাত ধরে ক্ষমা
প্রার্থনার সুরে বলল, ” আমায় ক্ষমা করো মীনা। আমার
কি হয়েছে, আমি নিজেই জানি না। গত রাতের কথা খুব
সামান্যই মনে আছে আমার। শুধু এটুকু বলতে পারি,
পাশবিক কিছু একটা ভর করেছিল আমার ওপর ; নিজের
দৈহিক চাহিদা মেটানো ছাড়া আর কোনও কিছু ভাবতে
দিচ্ছিল না। জানি না, তোমার কোনও ক্ষতি করে বসেছি
কিনা…….”
” ক্ষমা চাইতে হবে না তোমায়, কিচ্ছু হয়নি আমার”,
আন্তরিক গলায় বললাম ওকে, ” শুধু এটুকু বলো, তোমার কি
সত্যিই কিছু মনে নেই গতরাতের কথা?”
….” মনে আছে। খুব অল্প”।
” জ্বর হয়নি তো?” বলে হাত রাখলাম ওর কপালে। কিন্তু
না, বাড়তি কোনও উত্তাপ অনুভব করলাম না। সমস্যাটা
অন্য কোথাও।
” আমি খুব দুঃখিত মীনা”, মিনমিন করে বলল জোনাথন।
” আমিও, জোনাথন”।
আমাদের কথা ওখানেই শেষ হলো। কিন্তু শেষ হলো না
উদ্বেগের। ইচ্ছের বিরুদ্ধে জোর করে ওকে
ট্রানসিলভ্যানিয়া নিয়ে গিয়ে ভুল করেছি কিনা ভাবতে
লাগলাম। ওখান থেকে ফেরার পর থেকেই শুরু হয়েছে যত
গণ্ডগোল। যে অশুভ ছায়া থেকে মুক্তি পাবার জন্য
গিয়েছিলাম ওখানে, মনে হচ্ছে সেটা আরও গাঢ় হয়েছে
আমাদের ভ্রমণের ফলে।

জোনাথন হারকারের ডায়েরী

২৭ অক্টোবর।।

ভয়ঙ্কর কিছু একটার কবলে পড়েছি আমি – এতে কোনও
সন্দেহ নেই। গত তিনরাত ধরে ঘটছে একই ঘটনা – পশুতে
পরিণত হচ্ছি আমি। রাত গভীর হলেই বুকের ভেতর দামামা
বাজতে শুরু করে, মাথার ভেতর বিস্ফারিত হয়
আগ্নেয়গিরি, কানের পাশে শুনতে থাকি বাদুড়ের ডানা
ঝাপটানির শব্দ। নিজের অজান্তেই ঝাঁপিয়ে পড়ি পাশে
শুয়ে থাকা প্রেমময়ী স্ত্রী ‘র ওপর। প্রথম দু’রাত ভয়ে
সিঁটিয়ে ছিল মীনা, পালিয়ে গিয়েছিল কামরা ছেড়ে;
কিন্তু গতকাল রাতে আত্মসমর্পণ করল ও, যেন এটাই ওর
নিয়তি। তারপর কি করেছি ওর সাথে, আমি জানি না।
তবে সকালে ঘুম ভাঙার পর ওর শরীরে দেখেছি নখের
আঁচড়ের অসংখ্য চিহ্ন। লজ্জায়, ঘৃণায় সঙ্গে সঙ্গে মিশে
যেতে ইচ্ছে করেছে আমার।
ভদ্রঘরের সন্তান আমি – ধার্মিক পরিবেশে বড় হয়েছি।
জানি, বিছানায় – নিজের স্ত্রী ‘র সঙ্গেও সংযম বজায়
রাখতে হয়। উন্মত্ত পশুর মতো আচরণ মানুষের জন্য নয়। অথচ
গত কয়েক রাত ধরে সেটাই করে চলেছি আমি।
ঈশ্বর, এ কেমন অবস্থায় ফেললে আমায়? আমায় এমন শত্রু
দাও, যাকে আমি দেখতে পারি, দু হাত দিয়ে স্পর্শ করতে
পারি, ধ্বংস করতে পারি। কিন্তু এই যে অদৃশ্য রিপু – এর
বিরুদ্ধে আমি লড়ব কি করে?
একটা ব্যাপার পরিষ্কার। এই সমস্যার সমাধান না হওয়া
পর্যন্ত আমাদের দুজনের কখনওই এক বিছানায় শোয়া
উচিত নয়.

মীনা’র ডায়েরী

২৯ অক্টোবর।।

জোনাথনের অবস্থার বিবরণ দিয়ে আজ একটা চিঠি
পাঠালাম প্রফেসর ভ্যান হেলসিংয়ের কাছে। জোনাথন
এতে আপত্তি করেছিল কিন্তু সেটা কানে তুলিনি আমি।
অবস্থা ক্রমেই জটিল আকার ধারণ করছে – এই অবস্থায়
প্রফেসর হেলসিংয়ের মতো অভিজ্ঞ মানুষের সাহায্য
না নেওয়াটা চরম বোকামি হবে।
গত কয়েকটা দিন ভাল কাটেনি। নিয়মিত অফিসে গেছে
জোনাথন, সবাইকে দেখাতে চেয়েছে ওর কোনও অসুবিধা
নেই, কিন্তু বাড়ি ফেরামাত্র আবারও ওকে পেয়ে বসেছে
বিমর্ষ ভাবটা। নিজেকে বন্দি করে রেখেছে স্টাডি’তে।
রাতেও ঠিকমতো ঘুমোতে পারছে না, দুঃস্বপ্ন দেখে
জেগে উঠছে বারবার। পাশে থেকে ওকে সাহায্য করতে
চাই আমি, কিন্তু বেডরুম ছেড়ে স্টাডিরুমে স্বেচ্ছা
নির্বাসন নিয়েছে সে, আমার সেখানে প্রবেশাধিকার
নেই।
খারাপ লাগছে আমার, নিঃসঙ্গ বোধ করছি। একবার
ভেবেছিলাম, ইলিনাকে বলব আমার সঙ্গে রাতে শোবার
জন্য; কিন্তু সাত পাঁচ ভেবে নিরস্ত করেছি নিজেকে।
ইলিনাকে ডাকা মানেই আমার আর জোনাথনের সমস্যা
ওর চোখের সামনে তুলে ধরা। সেটা করতে চাই না আমি।
একটাই প্রার্থনা এখন আমার – দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠুক
জোনাথন। ওকে ছাড়া আমি অসহায়।

৩০ অক্টোবর।।

প্রফেসর ভ্যান হেলসিং কে পাঠানো চিঠির জবাবে ওঁর
কাছ থেকে একটা টেলিগ্রাম পেলাম আজ। তিনদিন পর
এখানে এসে পৌঁছবেন ভ্যান হেলসিং। খুব ভাল লাগছে
খবরটা পেয়ে। আশা করি এবার অবসান ঘটবে সব সমস্যার।

ইলিনা কোভাক্সের ডায়েরী

৩০ অক্টোবর।।

হারকার দম্পতির দুর্ভোগ দেখে মাঝেমাঝে খারাপ
লাগে আমার। ওঁদের ধারণা, আমি ওঁদের সমস্যার কিছুই
বুঝি না কিন্তু বাস্তবে তাঁদের মধ্যেকার চাপা
অশান্তির খুঁটিনাটি সব বুঝতে পারছি আমি। এর রহস্যও
আমার অজানা নয়। আমার গোপন সঙ্গী খেলছে ওঁদের
নিয়ে – ঠিক যেভাবে শিকারের আগে ইঁদুরকে নিয়ে
খেলা করে বেড়াল। মন থেকে ঠিক সায় পাই না এতে,
কিন্তু এ-ও ভুলতে পারি না, এই দু’জন মানুষই নিষ্ঠুরভাবে
ধ্বংস করে দিয়েছিলেন আমার সঙ্গীকে। এখন যা ঘটছে,
তার জন্য দায়ী এঁরা নিজেরাই। খুব শীঘ্রি প্রতিশোধের
তৃষ্ণা মেটাবে আমার সঙ্গী – ফিরে পাবে তার দৈহিক
রূপ। সে নিজেও আমায় জানিয়েছে, প্রতিশোধের পালা
চরমে পৌঁছতে চলেছে খুব শীঘ্রি। কথাটা ভাবলেই তুষ্ট
হয়ে ওঠে হৃদয়। আর সমবেদনা অনুভব করি না আমার
আশ্রয়দাতাদের প্রতি।
হারকার’দের বাচ্চাটাকে প্রায় বশ করে ফেলেছি আমি।
হ্যাঁ, ও-ই এখন আমাদের ইচ্ছানুসারে কাজ করবে।

মীনা’র ডায়েরী

১ নভেম্বর।।

গভীর আগ্রহ নিয়ে আমরা অপেক্ষা করছি ভ্যান
হেলসিংয়ের জন্য। তাঁর আগমনের মধ্য দিয়ে আমার আর
জোনাথনের আঁধার জগৎটাকে আলোর একটা রেখার মতো
রাঙিয়ে তুলেছে।
এরই মাঝে একটা ছোট্ট দূর্ঘটনা ঘটে গেছে। আহত হয়েছি
আমি। মুখটা এমন বিচ্ছিরি ভাবে আহত হয়েছে যে খাওয়া
দাওয়াও করতে পারছি না।
ব্যাপারটা দুর্ভাগ্যজনকই বলতে হবে, কারণ দিনটা
এমনিতে ছিল খুব চমৎকার। কুইন্সিকে নিয়ে একসঙ্গে
লাঞ্চ সারলাম আমি আর ইলিনা। তারপর বারান্দায়
বসেছিলাম রোদ পোহানোর জন্য। উপভোগ করছিলাম
বাগানের শোভা – শরতের স্পর্শে রঙবেরঙের ফুল ফুটেছে
বাগানে, পরিবেশকে করে তুলেছে মোহময়। কুইন্সি
বারবার আমার কোল থেকে নেমে বাগানের বাইরে চড়ে
বেড়ানো গরুগুলোকে ছোঁবার জন্য যেতে চাইছিল;
কিছুতেই ওকে নিরস্ত করতে পারছিলাম না, কিন্তু
ইলিনা যেন জাদু জানে। এটা সেটা বলে অল্প সময়ের
মধ্যে মনোযোগ ঘুরিয়ে দিল আমার ছেলের।
রূপকথার একটা গল্প পড়ে শোনালাম কুইন্সি’কে। গল্প
শোনার পর আমাকে একটা গোলাপ উপহার দিতে চাইল ও।
ইলিনা ওকে বাগানে নিয়ে গেল, ডাল সহ একটা বড়
গোলাপ ছিঁড়ে দিল। কুইন্সি আবদার করল, গোলাপটা ও
মুখে কামড়ে ধরে আমায় দেবে, আমাকেও সেটা একই
ভঙ্গিতে নিতে হবে। এটা নাকি স্পেনীয় কায়দা।
ছেলেকে খুশী করতে প্রস্তাবটায় রাজি হলাম, আর
সেটাই কাল হলো আমার। ওর মুখ থেকে আলতো ভঙ্গিতে
ফুলটা নেবার সঙ্গে সঙ্গে নড়ে উঠল কুইন্সি। কুইন্সি
ভাবল, ফুলটা পড়ে যাচ্ছে আমার মুখ থেকে, আচমকা
চেপে ধরল আমার থুতনি। গোলাপের ডালে বড় বড় কাঁটা
ছিল, সেগুলো গেঁথে গেল আমার ঠোঁটের ভেতর দিকে।
ব্যথায় ঝটকা দিয়ে উঠলাম, ঘাবড়ে গেল কুইন্সি। আমাকে
রেহাই দেবার জন্য টান দিল ফুলটা ধরে, তাতে ঘটল
হিতে – বিপরীত। মুখ বন্ধ অবস্থায় টান খেয়ে ঠোঁটের
ভেতরটা ফালি ফালি করে দিল গোলাপের কাঁটা।
অঝোর ধারায় বেরিয়ে এল রক্ত।
ককিয়ে উঠলাম ব্যথায়। ভয় পেয়ে এক লাফে পিছিয়ে
গেল কুইন্সি। ওর মুখ দেখেই বোঝা গেল, বেশ ঘাবড়ে
গেছে বেচারা। এদিকে আমার মুখ দিয়ে তখন কলকল করে
রক্ত বেরিয়ে আসছে….ঠোঁটের ধমনী টমনী ছিঁড়ে গেছে
নিশ্চয়ই।
ইলিনা এবার এগিয়ে এল আমার দিকে। হাতে ধরা একটা
পাত্র, সেটা ধরল আমার মুখের নীচে। মনে হলো যাতে
জামায় রক্ত না লাগে, সেই চেষ্টাই করছে ও। সব রক্ত
গিয়ে জমা হতে থাকল বাটিতে। বিরক্ত হলাম, কি করছে
মেয়েটা! রক্ত থামাবার চেষ্টা না করে রক্ত জমাচ্ছে
কোন আক্কেলে? ওগুলো কি আবার আমার শরীরে
ঢোকান যাবে? তবে এক মূহুর্ত পরেই সংযত করলাম
নিজেকে। ভাবলাম, টেনশনে নিশ্চয়ই ওর মাথা কাজ
করছে না।
কথা বলার উপায় নেই, তাই ইলিনাকে কিছু বলতেও
পারলাম না। খুব শীঘ্রি অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে দুর্বল হয়ে
পড়লাম আমি। দুনিয়া আঁধার হয়ে গেল আমার চোখের
সামনে থেকে।
যখন জ্ঞান ফিরল, তখন আমি নিজের বিছানায়। মুখে
পেল্লায় এক ব্যান্ডেজ বাঁধা। আমার ওপর ঝুঁকে আছে
ইলিনা আর স্থানীয় চিকিৎসক – ডাঃ গাউ। কুইন্সিকে
দেখলাম, আমাদের বাড়ির পরিচারিকা মেরীকে জড়িয়ে
ধরে ঘরের একপাশে দাঁড়িয়ে আছে।
রক্তক্ষরণ ততক্ষণে বন্ধ হয়েছে, কিন্তু মুখের ভেতরে
তখনো অসহ্য ব্যথা। ডাঃ গাউ একটা ইঞ্জেকশন দিলেন
আমায়,রক্তপাতের কারণে দুর্বল হয়ে পড়েছি বলে
কয়েকটা দিন বিশ্রামে থাকার পরামর্শ দিলেন।
সেইসঙ্গে তরল কয়েকটা খাবার আর ওষুধের
প্রেসক্রিপশন লিখে দিয়ে বিদায় নিলেন।
দুর্ঘটনা ছাড়া আর কি বলব এটাকে? ক’দিন যে লাগবে
সুস্থ হতে কে জানে?

৩ নভেম্বর।।

এসে পড়েছেন ভ্যান হেলসিং। স্ত্রী হারানোর শোকে
কিছুটা যেন শুকিয়ে গেছেন। কিন্তু তারপরও
প্রাণচাঞ্চল্যে ভাটা পড়েনি এতটুকুও, তাঁর আগমনের
সঙ্গে সঙ্গে আমাদের পুরো বাড়িতে যেন নবজীবনের
সঞ্চার হলো। কুইন্সি তো খুব খুশী, ভ্যান হেলসিংয়ের
অন্ধ ভক্ত সে।
আমার মুখের অবস্থা দেখে বিচলিত হলেন ভ্যান
হেলসিং। তাড়াতাড়ি ব্যাপারটা হাল্কা করতে চাইলাম,
ব্যাপারটা একটা নিছক দুর্ঘটনা বলে। চিন্তা যদি করতে
হয়, জোনাথনকে নিয়ে করা উচিত। ও-ই আসল রোগী।
ডিনারের সময় খুব স্বাভাবিক দেখাল জোনাথনকে।
কথাবার্তা আর হাসিঠাট্টা করল স্বভাবজাত ভঙ্গিমায়।
দেখে বোঝার উপায়ই নেই, কোনও সমস্যা আছে ওর মধ্যে।
তবে এতে বিভ্রান্ত হলেন না ভ্যান হেলসিং, ডিনার
শেষে কুইন্সিকে নিয়ে ইলিনা শুতে চলে গেলে আমাদের
নিয়ে ড্রয়িংরুমে বসলেন তিনি। ভূমিকা টূমিকা না করে
সরাসরি গম্ভীর গলায় বললেন, ” হ্যাঁ, এবার শোনাও
তোমাদের কথা। সঙ্কোচ কোরো না। নিশ্চয়ই গুরুতর কিছু
ঘটেছে, নইলে এভাবে আমায় খবর পাঠাতে না। কি
হয়েছে বলো তো?”
মুখ চাওয়াচাওয়ি করলাম আমি আর জোনাথন। এরপর একটু
ইতস্তত করে ও বলল, ” ইয়ে….কোত্থেকে শুরু করব বুঝতে
পারছি না। আসলে…ভয় পাবার মতো আলাদা কোনও
ঘটনা ঘটেনি। আসলে বেশ কিছুদিন ধরে আমি দুঃস্বপ্ন
দেখছি, চোখে ভুলভাল সব দেখছি। ধ্যাত, এমন ছোটখাটো
ব্যাপারে আপনাকে টেনে আনাই বোধহয় উচিত হয়নি।”
স্থির চোখে জোনাথনের মুখভাব যাচাই করলেন ভ্যান
হেলসিং। বললেন , ” ঠিক তার উলটো বন্ধু। ঘটনা যতই ছোট
হোক, তা যদি তোমায় বিচলিত করে তোলে, ওটাকে
অগ্রাহ্য করা ঠিক নয়। আর আমার কথা বলছ? বন্ধু যদি
বন্ধুকে সাহায্য না করে, তাহলে করবেটা কে?
সাহায্যের প্রয়োজন যদি না-ও হয়, এখানে বেড়াতে তো
পারছি। সেটাও কি কম আনন্দের? বাদ দাও ওসব, কি
ধরনের স্বপ্ন দেখছ, সেটাই বলো আমায়”।
” বীভৎস…. কষ্টদায়ক “, বলল জোনাথন।
” বাজে স্বপ্ন আমিও দেখেছি “, এবার আমি বলে উঠলাম।
ঠোঁটের ব্যথাও ভুলে গেলাম কথা বলার আগ্রহে। বললাম, ”
হয়তো জোনাথনের মতো ভয়াবহ নয়, তারপরেও আমায়
অস্বস্তিতে ফেলার জন্য যথেষ্ট। কিছু মনে করবেন না,
প্রফেসর, দ্বিতীয়বার ট্রানসিলভ্যানিয়া যাওয়াটা
বোধহয় উচিত হয়নি আমাদের। পুরনো স্মৃতিগুলো
মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে আমাদের ভেতর “।
” কিন্তু সেসব স্মৃতি তো সাত বছর আগে আরও তাজা
ছিল”, যুক্তি দেখালেন ভ্যান হেলসিং, ” তখন দুঃস্বপ্ন
দেখোনি, তাহলে এখন কেন দেখছ?”
” সবকিছু গুছিয়ে বলতে পারব না”, বলল জোনাথন, ” আমার
ডায়েরীটা পড়লে হয়তো বা বুঝতে পারবেন। এনে দেব?”
” আমার ডায়েরীটাও এনে দেখাও প্রফেসরকে”, বলে
উঠলাম আমি।
ভ্যান হেলসিং সম্মতি দিলে ডায়েরীদুটো নিয়ে এলাম
আমরা, তুলে দিলাম তাঁর হাতে। একটু লজ্জাও করঁছিল
আমাদের, ডায়েরীতে আমাদের গোপন কথা আছে, কিন্তু
নির্বিকার রইলেন ভ্যান হেলসিং। এমন কিছু বললেন না
বা করলেন না যাতে বিব্রত হতে হয় আমাদেরকে।
” হুম”, ডায়েরীদুটো পড়া শেষ হলে গম্ভীর ভঙ্গিতে মাথা
ঝাঁকালেন তিনি।
” কিছু বুঝতে পারলেন?” সাগ্রহে জানতে চাইল জোনাথন।
” এখনি উদ্বিগ্ন হবার মতো কিছু নেই”, বললেন ভ্যান
হেলসিং, ” তবে কয়েক জায়গায় যে খটকা লেগেছে,
অস্বীকার করব না। তোমাদের কি মনে হয়? কেন ঘটছে
এসব? ”
কাঁধ ঝাঁকাল জোনাথন। আমি বললাম, ” মানসিক
অস্থিরতার কারণে এসব ঘটতে পারে। আবহাওয়া আর
পরিবেশেরও হয়তো প্রভাব আছে….”
” মীনা”, মৃদু হেসে বললেন ভ্যান হেলসিং, ” আর কেউ
জানুক বা না জানুক, আমরা তো জানি, দুনিয়ায়
অতিপ্রাকৃত শক্তির অস্তিত্ব আছে! তারপরেও যুক্তি
দিয়েই ব্যাখ্যা খোঁজো কেন সবকিছুর? অযৌক্তিক
কোনও ধারণা থাকলে বলেই ফেলো না!”
” আ….আমি জানি না প্রফেসর “, বললাম আমি।
” আমিও না”, যোগ করল জোনাথন, ” যদি জানতাম, তা হলে
তো আর খবর দিতাম না আপনাকে। প্লিজ প্রফেসর, কিছু
একটা করুন। এভাবে চলতে থাকলে নির্ঘাত পাগল হয়ে
যাব আমি। বলা যায় না, মীনা বা ক্যুইন্সি’র কোনও
ক্ষতিও করে ফেলতে পারি”।
দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ভ্যান হেলসিং। ” সমাধান করবার
আগে সমস্যাটা তো জানতে হবে আমায়। ডায়েরীতে
বলতে গেলে কিছুই লেখোনি তোমরা। আরও তথ্য চাই
আমার। সেটার জন্য একটাই উপায় আছে জোনাথন, আমি
তোমাকে সম্মোহন করতে চাই”।
ইতস্তত করল জোনাথন, দ্বিধায় ভুগল কয়েক মিনিট।
তারপর হাল ছেড়ে দেবার ভঙ্গিতে বলল, ” বেশ আপনি যা
ভাল বোঝেন, তাই করুন “।
এর আগে আমাকে কয়েক দফা সম্মোহন করেছিলেন ভ্যান
হেলসিং….সাত বছর আগে, আমি যখন ড্রাকুলার
মায়াজালে আটকা পড়েছিলাম।আমার মাধ্যমে তিনি
বের করে নিয়েছিলেন ড্রাকুলার হদিশ। সেইসঙ্গে
সম্মোহনের স্মৃতি খুব একটা মনে নেই আমার।আজ
প্রথমবার দেখব, কিভাবে সম্মোহন করা হয়।
জোনাথনকে ড্রয়িংরুমের বড় সোফাটায় শুইয়ে দিলেন
ভ্যান হেলসিং।তারপর ওর চোখে চোখ রেখে অদ্ভুত
ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। দু’হাতের তালু মাথার
দুপাশ থেকে এদিকওদিক করে কোমর পর্যন্ত ঘুরিয়ে
আনলেন বেশ কয়েকবার। ধীরেধীরে আধবোজা হয়ে এল
জোনাথনের চোখের পাতা, ভারী হয়ে উঠল শ্বাস
প্রশ্বাস।

( মীনার ডায়েরী)

অনেকটা ফিসফিসিয়ে অদ্ভুত সুরে ডাকলেন ভ্যান হেলসিং, ”
জোনাথন, শুনতে পাচ্ছ আমার কথা?”
জোনাথন : হ্যাঁ, প্রফেসর।
ভ্যান হেলসিং : ভাল। আমি চাই শান্তভাবে তুমি ভাববে, জোনাথন। ভয়
পেয়ো না, তুমি এখন নিরাপদ। কেউ কোনও ক্ষতি করতে
পারবে না তোমার। ভাবো, মীনার পাশে শুয়ে আছো তুমি।
হঠাৎ অদ্ভুত এক ধারণা ভর করল তোমার ওপর। ভয়ানক ও অশুভ এক
ধারণা….যেন জেগে জেগে স্বপ্ন দেখছ তুমি।
গুঙিয়ে উঠল জোনাথন।
” কি ঘটছে বলো আমায়”, সাগ্রহে জানতে চাইলেন প্রফেসর।
” বাদুড়…. ” ফিসফিসিয়ে বলল জোনাথন, ” বাদুড়ের ডানা ঝাপটানোর
আওয়াজ পাচ্ছি আমি। দীর্ঘশ্বাস শুনতে পাচ্ছি মানুষের, কিন্তু
কেউ কোথাও নেই। কালো একটা কুয়াশা ঘুরপাক খাচ্ছে আমার
চারদিকে…ঘিরে ফেলছে আমায়। চাইলেও নড়তে পারছি না,
শরীর অবশ হয়ে গেছে। না-আ! দেরী হয়ে গেছে। ও
আমার শরীরের ভেতর ঢুকে পড়েছে! ”
কেঁপে উঠলাম এই কথা শুনে। কিন্তু ভ্যান হেলসিং নির্বিকার।
শান্তস্বরে জিজ্ঞাসা করলেন, ” কে ঢুকেছে তোমার
ভেতরে?”
” ড্রাকুলা…কাউন্ট ড্রাকুলা”, উত্তরে বলল জোনাথন।
নামটা শোনামাত্র প্রচণ্ড এক ঝাঁকি খেলাম আমি, দুনিয়া দুলে উঠল
চোখের সামনে। কোনওমতে সামলালাম নিজেকে, এমন কিছু
করলাম না যাতে কাজে ব্যাঘাত ঘটে ভ্যান হেলসিংয়ের।
” কিভাবে বুঝলে ও কাউন্ট ড্রাকুলা?” শান্তভাবে পরের প্রশ্ন
ছুঁড়লেন প্রফেসর।
” আমি জানি”, জোর গলায় বলল জোনাথন, ” আমি আর ও এক হয়ে
গেছি। ওর ভাবনাই আমার ভাবনা, ওর অনুভূতিই আমার অনুভূতি। ওর
চোখ দিয়ে আমার পাশে শুয়ে থাকা মীনাকে দেখছি এখন।
জানলা দিয়ে ঘরে ঢুকছে চাঁদের আলো….মীনার দিকে
ঝুঁকতে শুরু করেছি আমি। না, না, আমি ওকে থামাতে চাই…..কিন্তু
পারছি না। আমার প্রতিটি অঙ্গ প্রত্যঙ্গ নিয়ন্ত্রণ করছে ও।”
” কিছু কি বলছে ?” জিজ্ঞেস করলেন ভ্যান হেলসিং।
বড় বড় শ্বাস ফেলল জোনাথন। চোখ বন্ধ, তারপরেও চেহারায়
ফুটে উঠল বেদনার ছাপ। বলল, ” না, স্রেফ আমাকে নিয়ন্ত্রণ
করছে ও। নিঃশব্দে উপহাস করছে আমাকে। বোঝাতে চাইছে,
ওকে হারাতে পারিনি আমরা। এখন আমারই দেহ ব্যবহার করবে ও
আমার মীনা’কে পাবার জন্য”।
” শান্ত হও”, জোনাথনের কপালে হাত বুলিয়ে দিলেন প্রফেসর
হেলসিং, ” ধরো, ওই পর্ব শেষ। এবার কি ঘটছে?”
” চলে যাচ্ছে ও”, জোনাথন বলতে লাগল, ” আমি আবার নিজের
স্বত্তা ফিরে পেয়েছি। বুঝতে পারছি, ভয়ানক বিশ্রী একটা কান্ড
করে ফেলেছি “। এই বলে চোখ খুলল জোনাথন, আঙুল
তুলল আমার দিকে। বলল, ” ও….ও জানত! ও জানত ওটা আমি ছিলাম না,
ছিল কাউন্ট। তারপরেও কিছু বলেনি”।
স্বামীর মুখে এই অভিযোগ শুনে রক্ত উঠে এল আমার
চেহারায়। লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। কিন্তু আমাকে কিছু বলার
সুযোগ দিলেন না হেলসিং। দু হাতে জোনাথনের কাঁধ চেপে
ধরে বললেন, ” শান্ত হও! শান্ত হও তুমি! ” আবার চোখ মুদল
জোনাথন। প্রফেসর বললেন, ” উত্তেজিত হবে না। এবার তুমি
ঘুম থেকে জাগবে। এক…..দুই…..তিন!”
তুড়ি বাজালেন হেলসিং। এবার স্বাভাবিক ভঙ্গিতে চোখ খুলল
জোনাথন। ফ্যালফ্যাল করে ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল
কিছুক্ষণ। তারপরেই উঠে বসে মুখ ঢাকল দু’হাতে।
” হা ঈশ্বর! ” কাতর ধ্বনি বেরিয়ে এল ওর মুখ দিয়ে।
” কি বলেছ এতক্ষণ, সব মনে আছে তোমার?” জিজ্ঞেস
করলেন হেলসিং।
” হ্যাঁ, সবকিছু “, নিচু গলায় বলল জোনাথন।
আমার দিকে ঘাড় ঘোরালেন হেলসিং। স্বাভাবিক গলায় বললেন, ”
মীনা, ব্রান্ডি খাওয়াতে পারবে? আমাদের সবারই একটু ড্রিঙ্ক
দরকার”।
মাথা ঝাঁকিয়ে ড্রয়িংরুমের আলমারির দিকে এগোলাম। গ্লাস আর
বোতল নিয়ে ব্রান্ডি পরিবেশন করলাম প্রফেসর আর
জোনাথন’কে। নিজেও নিলাম এক গ্লাস। আমাকে পাশে
বসালেন হেলসিং, তারপর তিনজনে চুপচাপ চুমুক দিলাম ব্রান্ডিতে।
অস্বস্তিকর নীরবতায় কাটল কিছুক্ষণ। শেষে প্রফেসর
বললেন, ” মীনা, অপ্রীতিকর একটা প্রশ্ন না করলেই নয়। সত্যি
করে বলো….তুমি কি জানতে….বা সন্দেহ করেছিলে যে,
রাতের বেলা জোনাথনের ওপর ড্রাকুলার অশুভ আত্মা ভর
করে?”
” এর কোনও জবাব নেই আমার কাছে, প্রফেসর “, ইতস্তত
করে বললাম আমি, ” কি বলব জানি না। আমরা দু’জনেই গত কয়েকদিন
ধরে অস্বাভাবিক আচরণ করছি। জোনাথন যতই হিংস্রতা দেখাক,
অজানা এক আকর্ষণ অনুভব করেছি আমি ওর প্রতি”।
গম্ভীর হয়ে গেলেন ভ্যান হেলসিং। বললেন, ” অশুভ
কোনও শক্তি তোমার শরীর দখল করতে চাইছে, এমন
কোনও অভিজ্ঞতা হয়েছে? এ ধরনের কয়েকটা ইঙ্গিত
দেখেছি আমি তোমার ডায়েরীতে”।
” তা তো হয়েছেই”, বললাম আমি, ” কিন্তু যখনই এমন মনে
হয়েছে, মন শক্ত করেছি। ঈশ্বরকে ডেকেছি
কায়মনোবাক্যে। আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে গেছে। তখন
ভেবেছি ব্যাপারটা আমার মনের ভুল”। এই পর্যন্ত বলে একটু
থামলাম আমি। তারপর ভ্রু কুঁচকে ভ্যান হেলসিংকে জিজ্ঞাসা করলাম,
” এসব প্রশ্ন কেন করছেন প্রফেসর? প্লিজ সত্যি করে বলুন
না…জোনাথন যা বলছে, তা কি ঠিক? সত্যিই কি ফিরে এসেছে
ড্রাকুলা? নাকি মানসিক কোনও রোগ দেখা দিয়েছে আমাদের?”
” মীনা!”, আদর করে ডাকলেন প্রফেসর হেলসিং, ” এখনই
কোনও সদুত্তর দিতে পারব না আমি। তুমি আর জোনাথন একই
ধরনের দুঃস্বপ্ন দেখছ – এটা স্রেফ একসঙ্গে থাকার জন্য
একজনের মনের ভয় আর দুশ্চিন্তা অন্য কারোর মধ্যে
সঞ্চারিত হবার কারণেও হতে পারে। কিন্তু এই যুক্তিটা আমার
নিজেরও মনে ধরছে না – একেবারেই না”।
” আর ব্যাপারটা যদি মনের সমস্যা না হয়?” হঠাৎ জিজ্ঞেস করল
জোনাথন, ” এখন আমার স্পষ্ট মনে পড়ছে সব। ড্রাকুলার উপহাস
আমি শরীরের প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে উপলব্ধি করেছি। ওটা যদি
সত্যি হয়? বলুন প্রফেসর, কি করব আমি? কি জবাব দেব আমার
স্ত্রী -কে? আমারই মাধ্যমে শয়তানটা…..”
” প্লিজ জোনাথন”, বাধা দিলাম ওকে, ” আমার কোনও অভিযোগ
নেই তোমার বিরুদ্ধে”।
কথাটা যেন কানেই গেল না জোনাথনের। তাকালও না আমার
দিকে।
বড় করে শ্বাস নিলেন ভ্যান হেলসিং। বললেন, ” বেশ, তবে ওই
ধারাতেই চিন্তা করা যাক। এমন কি হতে পারে, শয়তান কাউন্ট ড্রাকুলার
অশুভ আত্মা এখনও টিকে আছে….? ওর শরীর ধ্বংস হয়েছে
তো কি, ওর আত্মা এখনও আছে? আর সে প্রতিশোধ নিতে
চাইছে? ”
ভ্যান হেলসিংয়ের কথা শেষ হতে না হতেই ঘরের আলোটা
দপদপ করে কেঁপে উঠল কয়েকবার। যেন হেলসিংয়ের
কথাকে সমর্থন করতেই। মেরুদণ্ড বেয়ে যেন বরফজল
নেমে গেল আমার।
প্রফেসর হেলসিং বলে চললেন, ” কাউন্ট ড্রাকুলা শয়তানের
উপাসনা করে অমরত্ব অর্জন করেছিল….কাজেই যদি ধরে নিই,
দেহ ধ্বংস হলেও তার আত্মা ধ্বংস হয়নি, সেটা বোধহয় খুব একটা
বাড়াবাড়ি হবে না। এটুকু মেনে নিলে সবকিছুই খুব সহজে ব্যাখ্যা
করা যায়”।
” না, প্রফেসর “, প্রায় আর্তনাদ করে উঠলাম আমি, ” ও – কথা
বলবেন না।”
আমাকে স্বান্তনা দিতে আমার একটা হাত ধরলেন ভ্যান হেলসিং।
নরম গলায় বললেন, ” মীনা, তোমায় আমি ভয় দেখাতে চাইছি
না….আসলে যদি বলতে পারতাম, সবটাই তোমাদের মনের ভুল,
আমার চেয়ে খুশী আর কেউ হতো না। কিন্তু প্রমাণ ছাড়া অমন
কথা বলি কি করে? তুমি আর জোনাথন আমার সন্তানের মতো,
তোমাদের ব্যাপারে আমি কোনও ঝুঁকি নিতে পারি না। সবচেয়ে
খারাপটার জন্য প্রস্তুত থাকাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ”।
” কি করা উচিত আমাদের?” জিজ্ঞেস করল জোনাথন।
” পিশাচকে ঠেকানোর কিছু কিছু কৌশল তো তোমাদের জানাই
আছে”, বললেন প্রফেসর হেলসিং, ” আপাতত সেগুলো
দিয়েই শুরু করা যাক। বাড়ির প্রত্যেককে গলায় ক্রুশ ঝোলাতে
হবে, রসুন এনে সিল করে দিতে হবে বাড়ির সমস্ত দরজা জানলা।
বুনো গোলাপের ডাল এনে ঝোলাতে হবে দরজার গায়ে”।
” না”, প্রতিবাদ করে বলল জোনাথন, ” এ ব্যাপারে নিশ্চিত না হওয়া
পর্যন্ত আমি ওইসব উপদ্রব বাড়িতে আনতে রাজি নই। তাছাড়া,
ড্রাকুলার অশুভ প্রেতাত্মা আমাদের দেহ নয়, প্রভাব বিস্তার
করছে আমাদের মনের ওপর। ক্রুশ, বুনো গোলাপ আর রসুন
যে মনের ওপর আক্রমণ ঠেকাতে পারবে – এমন নিশ্চয়তা
আছে? ”
মিনমিন করে বললেন প্রফেসর হেলসিং, ” তা অবশ্য ঠিক। কিন্ত….”
” তা হলে কোনও কিন্তু নেই”, বলল জোনাথন, ” আমি রাজি নই
আপনার এ প্রস্তাবে”। এটুকু বলে গলার স্বর সামান্য নরম করল
জোনাথন, ” প্লিজ প্রফেসর, ওসব এখনি শুরু করবেন না। ভয়ানক
সেইসব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয় এখনি আবার যেতে চাই না আমি।
ওইসব ক্রুশ, রসুন ফুল আর বুনো গোলাপ – আমাদের সেই
আতঙ্ককে আরও গাঢ় করে তুলবে”।
” কিভাবে? ” জিজ্ঞেস করলেন হেলসিং।
” ব্যাপারটাকে সত্য বলে মনে হবে তখন “।
পালটা কোনও যুক্তি খুঁজে পেলেন না প্রফেসর ভ্যান হেলসিং।
বলার মতো কিছু খুঁজে না পেয়ে থম মেরে গেলেন। একটু
যেন মনঃক্ষুণ্ণই হলেন তিনি।
কয়েক মূহুর্ত নীরবতার পর আমি বললাম, ” জোনাথন বোধহয়
ঠিকই বলছে প্রফেসর। নিশ্চিত না হয়ে এখনই ওসব পদক্ষেপ
নেওয়া ঠিক হবে না। তাছাড়া, বাড়িতে ইলিনা আর চাকর বাকররা’ও
রয়েছে। এখুনি ওদেরকে কিছু জানাতে চাই না আমি”।
দীর্ঘশ্বাস ফেললেন হেলসিং। বললেন, ” ঠিক আছে, মেনে
নিচ্ছি তোমাদের কথা। এখনও পরিস্থিতি অত গুরুতর হয়নি। আপাতত
আমার পরামর্শ, তোমরা ডায়েরী লেখা চালিয়ে যাও। যা-ই ঘটুক,
ছোট বা বড় হোক, সব লিখে রেখো। আমি নজর রাখব
তোমাদের ওপর। সেইসঙ্গে পড়াশোনাও করব। দেখি, বইয়ে
এ ব্যাপারে কি বলে। আমাদের জানতে হবে, ভ্যাম্পায়ারের
প্রেতাত্মা বলে কিছু আছে কি না না কি স্রেফ মনের কারসাজিতে
আক্রান্ত হয়েছ তোমরা।”
আমাদের আলোচনার সমাপ্তি ঘটল ওখানে।
কয়েক ঘণ্টা পরে।।
ঘুম আসছে না আমার। ঠোঁট এখনও টনটন করছে ব্যথায়। কিছুক্ষণ
আগে জোনাথনের ঘরে গিয়েছিলাম। আমায় দেখেই মড়ার
মতো ফ্যাকাসে হয়ে গেল ওর মুখ। ভয়ার্ত গলায় বলল, ” চলে
যাও, চলে যাও, যতক্ষণ না আমি ওই পিশাচের হাত থেকে মুক্তি না
পাচ্ছি, আমার কাছে এসো না তুমি”।
স্বান্তনা দিতে গেলাম ওকে, কোনও কাজ হলো না। উলটে
সন্দেহ প্রকাশ করে বসল। শীতল গলায় বলল, ” তুমি কি আমার
কাছেই এসেছ না কি আর কারোর খোঁজে এসেছ? এখানে
কাকে পাবে বলে তুমি এসেছ? আমায় না কি….ড্রাকুলাকে?”
চমকে উঠেছি ওর অভিযোগ শুনে। বললাম, ” তাই-ই যদি তুমি
ভাবো, তাহলে আমার পক্ষে আর এক মূহুর্তও থাকা সম্ভব নয়
এখানে। অন্তত যতক্ষণ না তুমি সন্দেহমুক্ত হচ্ছ।”
চোখে জল নিয়ে উলটো ঘুরেছি আমি। জোনাথন বোধহয়
আঁচ করতে পারেনি আমার মনের অবস্থা। পেছন থেকে ডাকল,
” আমি দুঃখিত মীনা….প্লিজ, একটু দাঁড়াও”।
ওর কথা কানে না নিয়ে বেরিয়ে এসেছি ওর ঘর থেকে। এত
খারাপ লাগছিল যে মনটা ভাল করার জন্য ইলিনার কামরায় গেলাম। ও
জেগে থাকলে সুখ দুঃখের দুটো কথা বলব ওর সাথে।
কিন্তু অবাক ব্যাপার, রুমে নেই ইলিনা। রান্নাঘরে নেই….নেই
ড্রয়িংরুমেও। কুইন্সির ঘরে আছে কি? কিন্তু কুইন্সির ঘরে
আলো জ্বলছে না। আলো জ্বালিয়ে কুইন্সির ঘুম ভাঙানোর
ইচ্ছা হলো না আমার। ফিরে এলাম নিজের ঘরে। ডায়েরী
খুলে বসলাম।
অবশেষে ঘুম ঘুম লাগছে। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ। লেখা থামাই।

জোনাথন হারকারের ডায়েরী

৪ নভেম্বর।।

মীনা আর আমার মধ্যে সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। অবিশ্বাস্য
ব্যাপার…গত সাত বছরে কখনো আমাদের মধ্যে মনোমালিন্য
হয়নি। অথচ আজ….
আমি কিছুতেই আর ওকে সহ্য করতে পারছি না। মুখে ও যতই
অস্বীকার করুক, আমার দৃঢ় বিশ্বাস, ও এখনো ড্রাকুলার
প্রভাবমুক্ত হতে পারেনি…..ও নিজেও বুঝতে পারে, রাতে
আমার ওপর পিশাচ ভর করে….কিন্তু জেনেশুনেও ও…..
না, নিজের ওপরই ঘৃণা সৃষ্টি হচ্ছে, নিজের প্রিয়তমা স্ত্রী ‘র
ব্যাপারে এসব ভাবতে গিয়ে, কিন্তু চেষ্টা করেও এড়াতে পারছি
না চিন্তাগুলোকে। ওর দিকে তাকালেই মনে পড়ে যায়, ওই
পিশাচটার মায়াজালে একদিন বন্দি হয়েছিল ও….ওর নোংরা স্পর্শ
পড়েছিল ওর গায়ে।
বারান্দায় বসে বসে লিখছি এই ডায়েরী। ইলিনা এসে বসেছে
আমার কাছে। বড্ড শান্ত সমাহিত দেখাচ্ছে ওকে। মুখে কিছু
বলছে না, তারপরেও ওর উপস্থিতি আমাকে এক অদ্ভুত স্বস্তি
দিচ্ছে। কেন এমন লাগছে, এর কোনও জবাব নেই আমার
কাছে।

মীনা’র ডায়েরী

৪ নভেম্বর।।

সকালটা কুইন্সি আর ইলিনার সঙ্গে কাটিয়ে বেশ ভাল লাগছে।
আমার আর জোনাথনের অশান্ত দুনিয়ায় এরাই এখন শান্তি আর
সুখের নোঙর। পঙ্কিলতার স্পর্শ পায়নি এরা।
ডাঃ সিউয়ার্ড আর আর্থার-কে খবর পাঠাতে চাইছেন ভ্যান হেলসিং,
কিন্তু আমি আর জোনাথন রাজি হইনি। সসমস্যা কোথায়, সেটাই যখন
বের হয়নি, ওঁরা এসে কি-ই বা করতে পারবেন? ভ্যান হেলসিং
ব্যাপারটা এত সিরিয়াসলি নিয়েছেন যে, ভয়ই লাগছে আমার। স্বাভাবিক
জীবনযাপন প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ কুইন্সি আর
ইলিনার সামনে স্বাভাবিক থাকা খুবই জরুরী। যদ্দুর পারি, চেষ্টা
চালিয়ে যাচ্ছি আমি, সবাইকে হাসিখুশী রাখছি, সংসারের দায়িত্ব পালন
করছি….আর সময় পেলেই প্রার্থনা করছি সর্বশক্তিমানের
উদ্দেশ্যে। ঈশ্বর আমাদের সহায়তা করুন।

৫ নভেম্বর।।

ঝড় শেষে বাড়ি এখন শান্ত। ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে পড়ছে
আমার, তারপরেও কলম তুলে নিয়েছি। কষ্ট হলেও ঘটনাটা লিখে
রাখা দরকার।
বরাবরের মতো কাল রাতেও বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করছিলাম,
ঘুম আসছিল না। ঘন্টাখানেক কেটে যাবার পর হঠাৎ শুনতে পেলাম
গোলমালের আওয়াজ–পুরুষকন্ঠ….চড়া স্বরে কে যেন কার
সঙ্গে তর্কাতর্কি করছে। জোনাথন না ভ্যান হেলসিং, ঠিক বোঝা
গেল না। গলার আওয়াজের পাশাপাশি শোনা গেল ঘরের
আসবাবপত্রের ধুমধাম – যেন চেয়ার টেবিল ছুঁড়ে ফেলা
হচ্ছে এদিকওদিক। তাড়াতাড়ি গায়ে একটা ড্রেসিং গাউন চাপিয়ে
বেরিয়ে এলাম ঘর থেকে।
করিডোরে পৌঁছে বুঝলাম, শব্দ আসছে ভ্যান হেলসিংয়ের
গেস্টরুম থেকে। জোনাথনও ওদিকে ওর ঘর থেকে
বেরিয়ে এসেছে শব্দ শুনে।
দুজনে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে একবার পরস্পরের দিকে তাকিয়ে
হেলসিংয়ের গেস্টরুমের দরজায় এসে টোকা দিলাম দরজায়।
জবাব পাওয়া গেল না। তার বদলে ঘরের ভেতর থেকে ভেসে
এল গোঙানি, আর সেইসঙ্গে মেঝেতে মানুষের দেহ
আছড়ে পড়ার শব্দ। আর দেরী না করে উদ্বিগ্ন জোনাথন
হাতল ঘোরাল ঘরের দরজার, কিন্তু খুলল না দরজা। ভেতর
থেকে ছিটকিনি আঁটা।
জোনাথন ডাকল, ” কি হয়েছে প্রফেসর, আপনার? দরজা খুলুন।
ঢুকতে দিন আমাদের”।
সঙ্গে সঙ্গে ধড়াম আওয়াজে কেঁপে উঠল দরজা,মনে
হলো দরজার পাল্লার ওপর এসে আছড়ে পড়লেন ভ্যান হেলসিং।
কর্কশ গলায় কাতরধ্বনি ভেসে এল ভেতর থেকে, ” না!
ভেতরে এসো না কিছুতেই। তোমাদের ভালোর জন্য বলছি”।
ভ্যান হেলসিংয়েরই গলা। কিন্তু হঠাৎ এ কি হলো ওনার? কার সঙ্গে
ধ্বস্তাধস্তি হচ্ছে ভেতরে?
ভয়ে কেঁপে উঠলাম আমি…

জোনাথন এত সহজে ঘাবড়াবার পাত্র নয়। কয়েক পা পিছিয়ে গিয়ে ঝাঁপিয়ে এসে পড়ল দরজার গায়ে, কাঁধ দিয়ে ঠেলতে লাগল দরজা। চাপের মুখে হার মানল ছিটকিনি, ভেঙে গেল। হাট হয়ে খুলে গেল দরজা। দেখা গেল ঘরের অভ্যন্তর। প্রফেসর হেলসিংকে দরজা থেকে কয়েক ফুট দূরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম আমরা। পরণে সাদা গাউন, উদভ্রান্ত চেহারা। ঘরের বিছানাটা এলোমেলো হয়ে আছে, রিডিং টেবিলটা উল্টানো, ছড়িয়ে আছে বইপত্র এখানে সেখানে, দেয়ালে ঝোলানো আয়নাটা ভেঙে চৌচির হয়ে পড়ে আছে মেঝেতে। ” প্রফেসর! ” হতভম্ব গলায় বলল জোনাথন, ‘ এসব কি?” এগোতে যাচ্ছিল জোনাথন, সামনে দু হাত দেখিয়ে ওকে এগোতে নিষেধ করলেন হেলসিং। ভাঙা গলায় বললেন, ” জোনাথন!…এগিয়ো না….আর এক পা….মীনাকেও সরিয়ে নিয়ে যাও এখান থেকে….দোহাই তোমার!” প্রফেসরের ডান হাতে একটা বড়সড় ছোরা দেখতে পেলাম আমি আর জোনাথন – দুজনেই। যদি ভুল না করে থাকি, ওটা একটা ‘ বাউয়ি’ নাইফ….আমেরিকান ছুরি। আমাদের প্রয়াত বন্ধু কুইন্সি মরিস ওই ছোরাটা উপহার দিয়ে গিয়েছিল প্রফেসরকে। কয়েক মূহুর্ত নীরবতার পর প্রফেসর তাঁর ডান হাতে রাখা ছোরাটাকে নিজের বাঁ হাতের ওপর নিয়ে এলেন। ভাবভঙ্গি দেখে মনে হলো যেন বাঁ হাতের ওপর পোঁচ দিতে চলেছেন। ” না!” কি করছেন আপনি!” চেঁচিয়ে উঠল জোনাথন। ছুটে গিয়ে ধরে ফেলল প্রফেসরকে। তারপর শুরু হল ওদের ধস্তাধস্তি। কয়েক মিনিট ধরে দুজনের মধ্যে প্রবলতর ধস্তাধস্তির পর শেষটায় এক ঝটকায় নিজেকে ছাড়িয়ে নিলেন প্রফেসর। ততক্ষণে বীভৎস হয়ে উঠেছে প্রফেসরের চেহারা। সৌম্যকান্তি মানুষটার চেহারা যে অমন ভয়ানক আকার ধারণ করতে পারে, তা স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি। তাঁর মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে, ক্ষেপে উঠেছেন তিনি। পরক্ষণেই ছোরা হাতে ঝাঁপিয়ে পড়লেন জোনাথনের ওপর। আমি সভয়ে চিৎকার করে উঠলাম। কিন্তু সে চিৎকার ওঁর কানেই গেল না। আত্মরক্ষার প্রাণপণ চেষ্টা চালাল জোনাথন, সামনে হাত তুলে ঠেকাতে চাইল আক্রমণ। কিন্তু ছুরির ধারালো ফলার আঘাতে ওর নাইটশার্টের হাতা ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল, কেটে গেল দু’হাতের মাংস, বইল রক্তের ধারা। ” বোকার দল!” উন্মাদের মতো হেসে উঠে বললেন ভ্যান হেলসিং। অবাক হয়ে গেলাম তাঁর কণ্ঠস্বর শুনে। বিকৃত উচ্চারণে কথা বলছেন তিনি। ” এবার বুঝবি তোরা, তোদের যে – কাউকে হাতের মুঠোয় নিতে পারি আমি….শাস্তি দিতে পারি অনন্তকাল “। জোনাথন তখন বিছানার ওপর চিত হয়ে পড়েছে, ওর ওপর মরণ আঘাত হানতে চলেছেন তিনি। চিৎকার করে ছুটে গেলাম আমি, ঝাঁপিয়ে পড়লাম আমি, নিজের শরীরকে বর্ম বানিয়ে বাঁচাতে চাইলাম আমার স্বামীকে। রক্তলাল চোখে আমার দিকে তাকালেন প্রফেসর, নিরস্ত করলেন নিজেকে। হাবভাবে মনে হলো নিজের সঙ্গেই যেন ভেতরে ভেতরে যুদ্ধ করছেন তিনি। বিড়বিড় করে কি যেন বলতে শুরু করলেন প্রফেসর – ডাচ ভাষায়। তাঁর মুখে তখন নানারকম অভিব্যক্তি খেলা করতে লাগল। চেহারা বদলে যাচ্ছে ক্ষণে ক্ষণে। একবার যেন দেখছি চিরচেনা আমাদের প্রফেসর’কে, তারপরেই সেখানে উঁকি দিচ্ছে ভয়ানক এক পিশাচের চেহারা – হ্যাঁ, সেই পিশাচ আমাদের পরিচিত! হঠাৎ ছুরির মুখ ঘুরিয়ে ফেললেন তিনি। দুহাতে হাতল ধরে ছুরিটাকে নিয়ে যেতে লাগলেন নিজের বুক বরাবর। নিজেকেই নিজে ছুরিকাঘাত করতে উদ্যত হলেন। কিন্তু স্বেচ্ছায় নয়…. দাঁত মুখ খিঁচোন দেখে বোঝা যাচ্ছে, প্রাণপণ চেষ্টা করছেন অবশ্যম্ভাবীকে ঠেকাতে, কিন্তু তাঁর হাতদুটো যেন কোনও বাধাই মানছে না; হাতদুটো’র ওপর যেন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছেন তিনি। আমার বিস্ফারিত চোখের সামনে প্রফেসরের পরনের গাউনের কাপড় ভেদ করে ঢুকে গেল ছুরির ফলা, গাঁথতে শুরু করল বুকের চামড়ায়। বেরিয়ে আসতে লাগল রক্ত। ভয়ার্ত এক চিৎকার করে জোনাথনকে জড়িয়ে ধরলাম আমি , বীভৎস এই দৃশ্য দেখতে চাইছি না আমি। আর তখুনি আর্তনাদ করে উঠলেন ভ্যান হেলসিং। হাত থেকে খসে পড়ল ছুরি। বিছানায়, আমাদের পাশে দড়াম করে আছড়ে পড়লেন তিনি – আহত, কিন্তু জীবিত অবস্থায়। অনেকক্ষণ পড়ে রইলাম আমরা ওভাবে। একসময় ককাতে ককাতে উঠে বসলেন প্রফেসর ভ্যান হেলসিং। আমরাও উঠে বসলাম – বিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে রইলাম তাঁর দিকে। ফোঁপাতে শুরু করলেন দুঃসাহসী মানুষটা। বললেন, ” জোনাথন….মীনা, আ….আমি দুঃখিত। পরিস্থিতি খারাপ….খুব খারাপ। যতটা ভেবেছিলাম, তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশী। তোমাদের কপালে যা ঘটেছে…..আমার কপালে যা ঘটল….কোনওটাই মনের ভুল নয়, মানসিক রোগও নয়। সে ফিরে এসেছে! তার দেহ ধ্বংস হয়ে গেছে….কিন্তু আত্মা হিসেবে ফিরে এসেছে সে…..ভয়ঙ্কর শক্তিসম্পন্ন এক দুষ্ট প্রেতাত্মায় পরিণত হয়েছে সে….প্রতিশোধ নিতে এসেছে….ঈশ্বর, আমি জানি না, কিভাবে ওর বিরুদ্ধে লড়াই করা যাবে!” যতটুকু পারি, স্বান্তনা দিলাম তাঁকে। ব্যান্ডেজ এনে বেঁধে দিলাম জোনাথন আর প্রফেসরের ক্ষতগুলোয়। এরপর তিনি আমাদের শোনালেন কিভাবে ঘটল এই ঘটনার সূচনা। ” রাতের পোশাক পরে টেবিলে গিয়ে বসেছিলাম। ভেবেছিলাম, ঘুম না আসা পর্যন্ত একটু পড়াশোনা করে নিই। কিন্তু বই খুলে বসার সঙ্গে সঙ্গেই অদ্ভুত এক অনুভূতি হলো। মনে হলো, ঘরের বাতির আলোর জোর কেমন যেন কমে আসছে, বইয়ের অক্ষরগুলোও আর ঠিকঠাক পড়া যাচ্ছে না। এরপরেই জেগে জেগে স্বপ্ন দেখতে শুরু করলাম। দেখলাম, বিশাল এক অন্ধকার কামরার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছি আমি, দূর থেকে ভেসে আসছে অচেনা এক কণ্ঠস্বর। এরপর শুনলাম বাদুড়ের ডানা ঝাপটানির শব্দ। মস্তিষ্কের ভেতরের কোষে কোষে যেন ঢুকে যাচ্ছিল সেই আওয়াজ, হাজার চেষ্টা করেও তাড়াতে পারলাম না। হঠাৎ মনে হলো, আরও একজন কেউ ঢুকেছে কামরায়, অনুমান করলাম কে হতে পারে সেটা!” ” ড্রাকুলা? ” জিজ্ঞেস করলাম আমি। মাথা ঝাঁকালেন ভ্যান হেলসিং। ” আপনি নিশ্চিত?” সন্দিহান গলায় প্রশ্ন করলাম। ” অবশ্যই!” জোর গলায় বললেন প্রফেসর, ” ও ছাড়া আর কেউ হতে পারে না। এমন দুরাত্মা…. এমন শয়তান….দুনিয়া য় আর কেউ হতে পারে না। আমাকে বশ করেছিল ও, ঢুকে পড়েছিল আমার ভেতরে। পরিষ্কার টের পাচ্ছিলাম ওর অস্তিত্ব “। ” আমারও ঠিক একই অনুভূতি হয়”, বলে উঠল জোনাথন। কাঁধ ঝাঁকালেন ভ্যান হেলসিং। বললেন, ” যাই হোক, ওর উপস্থিতি টের পেয়েই লড়াই জুড়ে দিই আমি। চেষ্টা করি ওকে আমার ভেতর থেকে বের করে দিতে। তা দেখে ও হাসতে থাকে। আমায় বলল, ‘ এবার তুমি বুঝবে আমার ক্ষমতার দৌড়। শুধু দুঃস্বপ্ন দেখানোই নয়, চাইলে তোমায় নিয়ন্ত্রণও করতে পারি আমি। আমার ইচ্ছেয় সব করবে তুমি। তা হলেই বোঝো, তোমার মতো দৃঢ় মনোবলের লোককে যদি বশ করতে পারি, তাহলে তোমার আশপাশের দুর্বলদের কব্জা করা আরও কত সহজ আমার পক্ষে। কোথাও নিরাপদ থাকবে না তুমি, কারণ তুমি বুঝতেই পারবে না, কার ভেতর লুকিয়ে আছি আমি….কোনদিক থেকে আঘাত হানব, কিচ্ছু বুঝতে পারবে না তুমি!” এটুকু বলে দম নেবার জন্য একটু থামলেন ভ্যান হেলসিং। খানিক পরে ফের কথার খেই ধরে বলতে লাগলেন, ” ওকে তাড়াবার জন্য কি না করছিলাম…এইসব ভাঙচুর…. হৈ চৈ….সবই ছিল আমার লড়াইয়ের অংশ। কিন্তু কিছুতেই যখন কিছু হলো না তখন সুটকেস থেকে ছুরিটা বের করে নিলাম। কারণ আমার মনে হয়েছিল, যদি আত্মহত্যা করি, ব্যর্থতার জ্বালা নিয়ে পালাবে শয়তানটা। তাই-ই করতে যাচ্ছিলাম, তখনই তোমরা এলে। ড্রাকুলার উদ্দেশ্য পরিষ্কার বুঝতে পারছিলাম, ও… ও জোনাথনকে খুন করতে চাইছিল। সেজন্যেই মানা করেছিলাম কামরায় ঢুকতে। তুমি তো কথা শুনলে না, ড্রাকুলাও তোমায় খুন করার চেষ্টা চালাল। মীনা মাঝখানে এসে না পড়লে নির্ঘাত মারা যেতে আজ। ওকে দেখে থমকে গিয়েছিল শয়তানটা। আমিও সেই সুযোগে নিজের বুকে ছুরি বসাতে চাইলাম। কিন্তু চামড়া কেটে রক্ত বেরোবার সাথে সাথে আমার দেহ ছেড়ে বেরিয়ে গেল শয়তানটা, বোধহয় হাল ছেড়ে দিয়েই। আমিও তাই ক্ষান্ত দিলাম আত্মহত্যার চেষ্টায়”। ” ভাল করেছেন”, বললাম আমি, ” মরলেই সমস্যার সমাধান হতো না।” ” এমনিতেও হবে না”, হতাশ ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন হেলসিং, ” এই দুষ্ট প্রেতাত্মাকে রোখার কোনও কায়দা আমার জানা নেই”। ভ্যান হেলসিংয়ের এই হতোদ্যম চেহারা এই প্রথমবার দেখছি। এর প্রভাব আমার ওপরেও পড়ল। তারপরেও চেষ্টা করলাম তাকে সাহস যোগাতে। কিন্তু লাভ হয়নি। জোনাথনের হাত মারাত্মকভাবে জখম হয়েছে দেখা গেল। কেটে গেছে রক্তের ধমনী বা পেশী। হাতটা আর নাড়াতেই পারছে না। ” পুরোপুরি ঠিক হয়ত কোনদিনই হবে না”, বললেন প্রফেসর। অনুশোচনায়, সহানুভূতিতে তাঁর চোখে পানি এসে গেল। কিন্তু জোনাথন বলল, ” এর জন্য আপনি দায়ী নন প্রফেসর। দায়ী আমাদের চিরশত্রু – কাউন্ট ড্রাকুলা “। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, এত বড় একটা ঘটনা ঘটে গেল, অথচ তার কিছুই টের পেল না ইলিনা! মড়ার মতো ঘুমোচ্ছে নিজের ঘরের দরজা আটকে! ভালই হয়েছে অবশ্য তাতে। ৬ নভেম্বর।। জোনাথন আর ভ্যান হেলসিং বিশ্রাম নিচ্ছেন। প্রফেসরের শরীরের ক্ষতগুলো শার্টের নিচে ঢেকে রাখা যাচ্ছে কিন্তু জোনাথনের ক্ষতগুলো ঢাকা যাচ্ছে না। তাই সবাইকে বলতে হচ্ছে, কিচেনে পড়ে গিয়ে ছুরিতে হাত কেটে গেছে ওর। এ নিয়ে আর কেউ উচ্চবাচ্য করেনি। থমথমে এক পরিবেশ বিরাজ করছে আমাদের বাড়িতে। সন্দেহের চোখে সবার দিকে তাকাচ্ছি আমরা তিনজন, বোঝার চেষ্টা করছি….কি বলা যায় একে…..একে বশীভূত করে রাখেনি তো সেই শয়তানটা? বড়ই তিক্ত এক অনুভূতি হচ্ছে আমাদের। কাউকে বিশ্বাস করতে পারছি না। নিজেও বিশ্বাস হারাচ্ছি অন্য দুজনের। গতবার যখন ড্রাকুলার মোকাবিলা করেছি, তখন অন্তত এককাট্টা থাকতে পেরেছি আমরা…..আস্থা রাখতে পেরেছি একে অন্যের ওপর। পিশাচটার মায়াজালে স্বল্প সময়ের জন্য আটকা পড়েছিলাম আমি, তারপরেও এতটা খারাপ পরিস্থিতি দেখা দেয় নি। কিন্তু এবার…. না, এসব নিয়ে আর লিখব না। যত লিখব, ততই খারাপ লাগবে। আপাতত ইলিনা আর কুইন্সির সঙ্গে সময় কাটাচ্ছি আমি। খেয়াল রাখছি, আমাদের মনের আতঙ্ক যেন ওদের মধ্যে সংক্রামিত না হয়। আমাদের বাড়িতে এখন ইলিনাই একমাত্র স্বাভাবিক। ইদানীং ও বেশ উচ্ছল হয়ে উঠেছে, গোলাপি হয়ে উঠেছে ওর গালদুটো। ওকে দেখেই সাহস পাচ্ছি আমি, পাচ্ছি প্রাণের সাড়া। শুধু বুঝতে পারছি না, ওর হঠাৎ এত উচ্ছলতার কারণ কি! নতুন প্রেমে পড়লে জানি এমনটা হয়; কিন্তু ইলিনার তো এরকম কোনও সম্ভাবনা আপাতত নেই। সারাদিন তো বাড়িতেই থাকে, কোনও ছেলের সঙ্গে দেখা হবার সুযোগই নেই। তাহলে? বলে রাখা ভাল, ভ্যান হেলসিংয়ের প্রস্তাবে শেষমেশ রাজি হয়েছি আমরা। খবর পাঠিয়েছি ডাঃ সিউয়ার্ড আর লর্ড আর্থার গোড্যালমিংকে। আমাদের ড্রাকুলা নিধন অভিযানের সেই ছোট্ট দলটা আবার সংগঠিত হতে চলেছে। কিছুটা ভাল লাগছে এতে। একাকী আর পিশাচের মুখোমুখি হতে হবে না, পুরনো সহযোদ্ধারা পাশে থাকবে। দেখা যাক কি হয়। ৭ নভেম্বর।। ডাঃ সিউয়ার্ড আর আর্থার গোড্যালমিং এসে পড়েছেন। বিপদজনক কাজে এসেছেন বলে কেউই স্ত্রী -কে সঙ্গে আনেন নি। ডিনারের পর ডাইনিং টেবিলে গোল হয়ে বসলাম আমরা। যা যা ঘটেছে সব খুলে বলা হলো ওঁদেরকে। শুনে একটু গম্ভীর হয়ে গেলেও অবিচল রইলেন ডাঃ সিউয়ার্ড। হাবভাবে মনে হলো, এমন কিছু ঘটতে পারে, সেটা আগেই আঁচ করেছিলেন তিনি। তবে আর্থারকে উদ্বিগ্ন দেখাল….. স্ত্রী -সন্তানকে ফেলে এসেছেন বলেই হয়তো….বোধহয় ভাবছেন ওদের কোনও অমঙ্গল হতে পারে। যা হোক, ভাগাভাগি করে আমি, জোনাথন আর হেলসিং – পুরো ঘটনা ওঁদের জানাবার পর আমাদের মধ্যে একটা সংক্ষিপ্ত আলোচনা হলো। এরপর চেয়ার থেকে উঠে পরস্পরের হাত ধরলাম আমরা, চক্রাকারে দাঁড়ালাম। প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলাম আমরা – অশুভের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাব আমরা, পিশাচকে নির্মূলভাবে ধ্বংস করে দেবার জন্য জীবনও দেব আমরা…

ইলিনা কোভাক্সের ডায়েরী

৭ নভেম্বর।।

মাদাম হারকার আমায় নম্র ও শান্ত মেয়ে হিসেবে
জানেন। কিন্তু হায়, সত্যিটা যদি তিনি জানতেন! আমার
মতো মেজাজি মেয়ে খুব কমই আছে এই দুনিয়ায়। হাজার
রকমের আবেগ সর্বক্ষণ খেলা করে আমার মধ্যে – ভয়,
আনন্দ, উত্তেজনা, ঘৃণা। এই তো একাকী কামরায় বসে
ডায়েরী লিখছি আমি, তবু উত্তেজনায় কাঁপছে দুই হাত।
এই উত্তেজনা অনুভব করি আমি সাফল্যের আনন্দে।
যে – কেউই স্বীকার করবে, মাদাম মীনা’র রক্ত সংগ্রহ
করার কাজে অসাধারণ নৈপুণ্য দেখিয়েছি আমি। কারও
মনে সন্দেহ না জাগিয়ে ওটা সংগ্রহ করা ছিল এককথায়
অসম্ভব। অথচ সেটাই করেছি আমি। দুঃখ একটাই –
আনন্দটা ভাগাভাগি করার জন্য আমার সঙ্গী এখন আমার
ভেতরে নেই। ওর অভাব আমি অনুভব করি প্রতিটা মূহুর্তে।
মাঝেমাঝে ওর দেখা পাই বটে, কিন্তু সে প্রায় না
দেখারই মতো । এ বাড়ির মানুষগুলোর ওপর সওয়ার হয়ে
বেড়াচ্ছে আমার সঙ্গী, আমার দিকে ওর মনোযোগ নেই।
ব্যাপারটা বেশ অদ্ভুতই লাগে – ইংরেজরা কি বোকা,
নাকি বেপরোয়া স্বভাবের? আমার সঙ্গীর উপস্থিতি
টের পাচ্ছে ওরা….ওদের চেহারা দেখেই বুঝতে পারি
সেটা….অথচ ওরা চেষ্টা করছে তাকে অস্বীকার করার!
হাঙ্গেরিতে এ ধরনের ঘটনা ঘটলে তো এতক্ষণে পুরো
বাড়ি ভরে যেত রসুন আর পবিত্র ক্রুশে, কিন্তু এরা যেন
গায়ে হাওয়া লাগিয়ে বেড়াচ্ছে।
মাদাম হারকারের প্রতি ঈর্ষা অনুভব করি আমি। কেন
আমার সঙ্গীর চোখে সে এত গুরুত্বপূর্ণ? জানতে
চেয়েছিলাম….কিন্তু সঙ্গীটি কোনও জবাব দেয়নি। শুধু
বলেছে, মীনার রক্ত চাই তার। কিভাবে জোগাড় করব
সেই রক্ত, বলে দেয়নি। অসম্ভব কাজের ভারটা স্রেফ
চাপিয়ে দিয়েছে আমার ওপর।
দু’রাত ঘুম হয়নি আমার। জেগে জেগে ভেবেছি, কিভাবে
কি করা যায়। দুর্ঘটনার ছলে হয়তো হাত টাত কেটে দিতে
পারি মাদাম হারকারের, কিন্তু তাতে যথেষ্ট পরিমাণ
রক্ত ঝরবে না, তার আগেই ক্ষতটার পরিচর্যা করা হবে।
বার বার দুর্ঘটনা ঘটানো যাবে না, তাতে সন্দেহ জাগবে
সবার। ভাবতে ভাবতে হঠাৎ মনে পড়ে গেল, ছোটবেলায়
একবার ঠোঁট কেটে গিয়েছিল আমার, কলকল করে
ঝরেছিল রক্ত। সেই রক্ত থামাতে রীতিমতো বেগ পেতে
হয়েছিল ডাক্তারকে। ঘটনাটা মনে পড়তেই সমাধান
পেয়ে গেলাম আমার সমস্যার। এরপর কুইন্সি’কে বশ করে
কাজটা সারতে একটুও অসুবিধে হয়নি। সবচেয়ে বড় কথা,
যদি ব্যর্থও হতাম, কেউ আমায় দোষারোপ করতে পারত
না। কুইন্সি’কেই দায়ী ভাবত সবাই।
আহ, কিভাবে যে রক্ত ঝরেছে মাদাম হারকারের। মুখ
থেকে কলকল করে বেরিয়ে জমা হয়েছে আমার হাতে
ধরা পেতলের বাটিতে। তারপর আবার বেহুঁশ হয়ে গেলেন
তিনি…..সাহায্য চেয়ে পাঠাবার আগে বাটিটা লুকিয়ে
ফেললাম চোখের আড়ালে। ভাগ্যের সহায়তা বোধহয়
একেই বলে।
সেই রাতেই, বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে যাবার পর বাটিটা
নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম আমি। পুরনো গোরস্থানের
সমাধি কক্ষে গিয়েছিলাম, সমাধির ডালা সরিয়ে আমার
সঙ্গীর দেহ – ভস্মের মাঝে ঢেলে দিয়েছিলাম রক্তটা।
ওই রক্তের সাহায্য নিয়েই আবার নিরেট চেহারা ফিরে
পাবে আমার সঙ্গী। একটা আলখাল্লাও চুরি করে নিয়ে
গিয়েছিলাম বাড়ি থেকে – দেহপ্রাপ্তির পর যেন গায়ে
চড়াতে পারে আমার সঙ্গী। ওটা সমাধির মাথায় রেখে
একটা মোমবাতি জ্বেলেছিলাম। এরপর শুরু হয়েছিল
অপেক্ষার প্রহর।
পর পর তিন রাত আমি সমাধির পাশে ভোর পর্যন্ত
থেকেছি। কিন্তু কিছুই ঘটেনি। আমার সঙ্গী তার দৈহিক
রূপে ফেরার আগে শেষবারের মতো তাণ্ডব চালিয়েছে
মাদাম হারকার আর তাঁর সঙ্গীদের ওপর। হতাশ হয়ে
পড়েছিলাম আমি। ভেবেছিলাম খামোখাই আমায়
খাটিয়েছে ও, মানুষের দুনিয়ায় ফিরে আসার কোনও
ইচ্ছেই নেই ওর।
কিন্তু কাল রাতে…..
বরাবরের মতো সমাধির পাশে বসেছিলাম আমি। মাথা
নিচু করে রেখেছিলাম হতাশায়। সাত পাঁচ ভাবতে
ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি বলতে পারব না। হঠাৎ
ভীষণ শীত করে উঠল আমার। ঘুম ভেঙে গেল। চোখ
মেলতেই দেখি, সমাধির ভেতর থেকে কালো ধোঁয়ার
একটা কুণ্ডলী বেরিয়ে আসছে। সমাধি কক্ষের ভেতরটা
আচ্ছন্ন করে ফেলল সেই ধোঁয়া। অনেকক্ষণ পর যখন সরে
গেল সেই ধোঁয়া, কালো আলখাল্লা পরা দীর্ঘদেহী
একটা মূর্তিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম আমার সামনে।
দম আটকে এল আমার। বুঝতে পারলাম না জেগে আছি
নাকি স্বপ্ন দেখছি।
মোমবাতি তখন নিভে গেছে, সমাধি কক্ষের দরজা দিয়ে
ভেতরে ঢুকছে আবছা আভা – ভোরের আলো ফুটতে শুরু
করেছে বাইরে। স্বল্প আলোয় নড়তে দেখলাম
মূর্তিটাকে। একটা হাত বাড়াল সে আমার দিকে।
আঙুলগুলো শীর্ণ, অস্বাভাবিক রকম লম্বা, ডগায় ছুঁচালো
নখ।
আমার মুখের কয়েক ইঞ্চি সামনে এসে থামল হাতটা।
শুনতে পেলাম খসখসে একটা গলা। আমার নাম উচ্চারণ
করল সে –
” ইলিনা!”
ইলিনা কোভাক্সের ডায়েরীর পরের অংশ
আমার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে মূর্তিটা। জ্বলজ্বলে
চোখে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। কাঁপতে কাঁপতে
স্পর্শ করলাম তার হাত। এই প্রথমবার। সঙ্গে সঙ্গে মুঠো
করে আমার বাহু খামচে ধরল সে, চামড়ার মধ্যে বসে গেল
নখ। ব্যথার পাশাপাশি আমার শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে
গেল একটা শীতল স্রোত – হাতটা বরফের মতো ঠাণ্ডা।
তালুতে রয়েছে বড় বড় লোম। টান দিয়ে আমাকে দাঁড়
করাল সে।
আলোকস্বল্পতার জন্য ঠিকমতো তার চেহারা দেখতে
পেলাম না আমি। তবে মনে হলো, মূর্তিটা ভীষণ লম্বা,
আমার মাথা ওর কেবল কাঁধ ছুঁয়েছে। দেহের
চামড়াগুলোও যেন ভীষণ শুকনো – বয়সের কারণে যেমনটা
হয়। তারপরেও আমার হাতের ওপর তার মুঠোর চাপ থেকে
বুঝলাম, অমিতশক্তি রয়েছে তার শরীরে। ছায়ার মাঝে
গর্বিত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে সে, ঘাড় বেয়ে নেমে
এসেছে রূপোলী চুলের গোছা। শরীর থেকে মাটির গন্ধ
ভেসে আসছে – বুনো গন্ধ।
বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম কিছুক্ষণ।
সম্মোহিতের
মতো তাকিয়ে রইলাম তার জ্বলন্ত চোখজোড়ার দিকে।
একটু পর সাহস সঞ্চয় করে বললাম, ” আমি তোমার দাসী,
তোমার ইচ্ছেই আমার ইচ্ছে। কি চাও বলো, প্রাণ দিয়ে
হলেও পালন করব আমি”।
হালকা এক টুকরো হাসি ফুটল তার ঠোঁটে। নরম সুরে বলল, ”
ইলিনা, সবচেয়ে বড় উপহারটা পেয়েছি আমি তোমার
কাছে – নিজের অস্তিত্ব! চাইবার আর একটা জিনিসই
আছে শুধু – আমার জীবন”।
দু’হাতে আমায় জড়িয়ে ধরল সে, তার কঠিন আলিঙ্গনে
বাঁধা পড়লাম আমি। শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুততর হলো আমার।
ধীরেধীরে তার মুখ নেমে এল আমার ঘাড়ে…..তারপরেই
পেলাম সুঁচ ফোটানোর মতো তীব্র একটা ব্যথা। দুনিয়া
মাতাল হয়ে উঠল আমার চোখের সামনে। আহ, কি সেই
অনুভূতি! পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মাদকও পারবে না কাউকে অমন
সুখ দিতে। চোখের সামনে যেন হাজারো রঙের খেলা
দেখতে লাগলাম আমি। অদ্ভুত এক ঘোরের মধ্যে চলে
গেলাম যেন। আবছাভাবে টের পেলাম, আমার ঘাড়ে মুখ
লাগিয়ে রক্ত চুষছে সে। বাধা দিতে পারলাম না, বাধা
দেবার ইচ্ছেও হলো না। অবর্ণনীয় এক সুখের আবেশে তখন
ঝাঁকি খেয়ে চলেছে আমার দেহ।
এভাবে কতক্ষণ চলল, বলতে পারব না। সম্বিৎ ফিরতেই
নিজেকে সমাধি কক্ষের মেঝেতে আবিষ্কার করলাম,
আমার সঙ্গী অদৃশ্য। সমাধির দিকে তাকিয়ে দেখি, মিহি
একটা কুয়াশা পাক খেতে খেতে ঢুকে যাচ্ছে ডালার
ফাঁক দিয়ে। এত দ্রুত কেন চলে গেল ও? প্রশ্নটা মাথায়
আসতেই খেয়াল করলাম, সূর্য উঠে গেছে। সমাধিকক্ষের
দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকছে দিনের প্রথম আলো।
কষ্টেসৃষ্টে উঠে দাঁড়ালাম, বাড়ি ফিরতে হবে। কিন্তু
বেরোবার আগে সমাধির ভেতর একবার উঁকি দেবার লোভ
সামলাতে পারলাম না। পরিষ্কার আলোয় প্রথমবারের
মতো দেখতে পেলাম ওকে।
সমাধির ভেতর শান্ত সমাহিত ভঙ্গিতে শুয়ে আছে ঈগলের
মতো তীক্ষ্ণ চেহারার একজন মানুষ – একজন সম্ভ্রান্ত
ভদ্রলোক। চওড়া কপাল, ঘন ভ্রু, ঠোঁটের ওপরে পেল্লায়
গোঁফ আর দীঘল কেশ মিলে রীতিমতো সুপুরুষ বলা চলে।
মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকলাম তার দিকে। হঠাৎ সে চোখ
খুলল।
বলল, ” ইলিনা, চমৎকার সেবা করেছ তুমি আমার, যখন
অন্যেরা আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে চলেছে। এর
পুরস্কার অবশ্যই পাবে। কিন্তু এখন নয়। এখান আমার
বিশ্রাম প্রয়োজন। এখন বাড়ি যাও, আর সাবধানে থেকো।
কাল রাতে আবার এসো। ”
কথা শেষ করে আবার চোখ মুদল সে। আমি তখন খুশিতে
ডগমগ। শেষবারের মতো ওর দিকে তাকিয়ে বন্ধ করে
দিলাম সমাধির ডালা। তারপর বেরিয়ে এলাম ওখান
থেকে।
দুর্বল পায়ে গোরস্থান থেকে বাড়িতে ফিরলাম আমি।
নিজের কামরায় ঢুকেই আচ্ছন্নের মতো শুয়ে পড়লাম
বিছানায়। রাত আসতে আর কত দেরী? আমার যে আর তর
সইছে না।

৮ নভেম্বর।।

দিনটা মোটামুটি সহজভাবে কেটে গেছে। মাদাম
হারকার একবার বললেন, আমায় নাকি ফ্যাকাসে
দেখাচ্ছে। তাড়াতাড়ি ওঁকে আশ্বস্ত করলাম, কিচ্ছু হয়নি
আমার। উনি চলে গেলে দু’হাতে গাল ঘষে লাল করে
তুললাম, যাতে সন্দিহান হয়ে না ওঠে কেউ।
বাড়ির তিন অতিথি… মানে ভ্যান হেলসিং, লর্ড আর্থার
গোড্যালমিং আর ডাঃ সিউয়ার্ড এখনও আছে। ওদেরকে
সহ্য করতে পারছি না কিছুতেই…..আমার গোপন সঙ্গীর
জন্মশত্রু এরা, সারাক্ষণ ওর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে
চলেছে। রাগ হয় ওদের ওপর, আবার মনে মনে হাসি। কারণ
জানি, ওরা কিছুতেই সফল হতে পারবে না। বোকার দল,
খামোখাই কানাকানি আর ফিসফাস করে বেড়াচ্ছে।
খাবার টেবিলে যখন দেখা হয়, থমথম করে সবার চেহারা,
নিজেদের গোমর লুকিয়ে রাখতে চায় আমার কাছ থেকে।
ওরা তো জানে না, ওদের চেয়েও বড় গোমর লুকোচ্ছি
আমি।
সারাদিন ছটফট করেছি, রাত যেন আসেই না। শেষপর্যন্ত
যখন অন্ধকার নামল, কুইন্সিকে শুইয়ে দিলাম; তারপর শরীর
খারাপের ছুতো করে নিজেও চলে এলাম কামরায়।
অপেক্ষায় থাকলাম সবার ঘুমিয়ে পড়ার। চাই না আমায়
কেউ বেরোতে দেখুক।
কয়েক ঘন্টা পর যখন গোরস্থানে এসে পৌঁছলাম, তখন আর
উত্তেজনা অনুভব করছি না। তার বদলে ভয়ে ঢিবঢিব
করছে বুক। ভাবছি কেন এসব করছি? কেন এত বড় ঝুঁকি
নিচ্ছি? ভাবতে ভাবতে কবরফলকের সারির মাঝ দিয়ে
ধীর পায়ে এগিয়ে চললাম সমাধি কক্ষের দিকে।

( ক্রমশ)

(পরবর্তী পর্বের জন্য অপেক্ষা করুন)

গল্পের বিষয়:
অনুপ্রেরণা · রহস্য

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত