সাপ্পেরো স্টেশন

সাপ্পেরো স্টেশন

নুরুন নাহার লিলিয়ান: হোক্কাইডো বিশ্ব বিদ্যালয়ের মেইন গেট থেকে বের হয়ে ডান দিকে পাঁচ মিনিট হাঁটলেই সাপ্পোরো ষ্টেশন।বেশ বড় ষ্টেশন। এই সাপ্পোরো ষ্টেশনকে কেন্দ্র করে আছে অনেকগুলো শপিং সেন্টার দোকান আর রেস্টুরেন্ট সাপ্পোরো শহরটা অনেকটা পর্যটক কেন্দ্রিক। প্রতিদিন থাকে অনেক লোক সমাগম এবং বিদেশি পর্যটকের ভিড়। এই শহরটা বেশ সুপরিকল্পিত এবং সুন্দর। তুষারপাতের সময়গুলোতে সবাই আন্ডারপাস ব্যবহার করে।সাপ্পোরো ষ্টেশনটার নিচের আন্ডারপাস গুলো ও খুব সুন্দর করে গোছানো।

সেখানে টয়লেট থেকে শুরু করে জামা কাপড়,খাবারের রেস্টুরেন্ট, লাইব্রেরী এবং জাদুঘর সব কিছুই আছে। যেন মাটির নিচের নিরিবিলি কোন বাসভূমি।শীতকাল শুরু হওয়ার সময় থেকে লোকজনের আন্ডারপাস ব্যবহার বেড়ে যায়।সাপ্পোরো ষ্টেশন এর বেশীর ভাগ ট্রেন লাইনই মাটির নিচে। তাই অধিকাংশ সময় আন্ডারপাসগুলো ব্যস্ত থাকে। দুই বছর আগে পদার্থবিদ ডঃ আলমগীর হোসেন টোকিও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি শেষ করেছেন। এই তো এক বছর হল নতুন এক গবেষণার কাজে পাঁচ বছরের জন্য হোক্কাইডো বিশ্ব বিদ্যালয়ে গবেষক হিসেবে যোগ দিয়েছেন। একটি পাঁচবছরের কন্যা সন্তান এবং স্ত্রী কে নিয়ে সুখের সংসার । তারপর মধ্যে স্ত্রী সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা । এই খবরটা আলমগীরকে আরও বেশি সুখ এনে দিয়েছে। পাঁচ বছরের কন্যা মালিহার খুব আলমণ্ড চকোলেট পছন্দ।আজকের দুপুরে দুইবার মেয়ে ফোন করে বলেছে চকোলেট নিয়ে বাসায় ফেরার জন্য।ল্যাবে আজকে অনেক কাজ থাকায় দেরি হয়ে গিয়েছে । এপ্রিল মাসের তুষারপাত। তখন রাত প্রায় আটটা বাজে।

এখানে রাত নয়টায় প্রায় সব দোকান বন্ধ হয়ে যায় । কিন্তু বাসায় ফিরলে মেয়ে মালিহা চকোলেট না দেখলে ভীষণ মন খারাপ করবে ।আলমগির হোসেন হোক্কাইডো বিশ্ব বিদ্যালয়ের মেইন গেট থেকে বের হয়ে সোজা দুইটা ব্লক পার হয়ে মাটির নিচের রাস্তার দিকে গেলেন । সেখান দিয়ে সাপ্পোরো ষ্টেশনটা একটু সহজ পথ । বেশ কয়েক মিনিট এর ব্যাপার ।এখানে মাটির নিচের এই পথ গুলো প্রায় অনেক বড় বড় শপিং সেন্টার,অফিস, গুরুত্ব পূর্ণ ভবন গুলোর সাথে সংযুক্ত করা । তাই সব পথেই কিছু মানুষ দেখা যায় ।অনেকটা পথ হাঁটার পর ও আলমগির আজ হঠাৎ ষ্টেশন এর পথ খুজে পাচ্ছে না । বেশ কিছুক্ষণ । এমন করে হাঁটার পর অনুভব করল এতক্ষণ তো সময় লাগার কথা নয়। প্রায় প্রতিদিন সে এই পথেই ষ্টেশন এর মার্কেট এ আসে । নিজেকে কেমন বোকা মনে হচ্ছে।এমনিতে শীতের রাত।তারপর তুষারপাত হচ্ছে। বেশি রাত করা যাবে না । বাসায় ছোট মেয়ে এবং অসুস্থ অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী ।ফিরে যে যাবে সে পথ ও খুঁজে পাচ্ছে না ।

আন্ডারপাস গুলোতে বিভিন্ন ভাষায় চিহ্ন দেওয়া থাকে কোন পথে বের হবে। এই ধরনের কিছুই সে পাচ্ছে না । একটা অদ্ভুত দ্বন্দ্ব নিজের ভিতর তৈরি হলো। খুব ঠাণ্ডা অনুভব হল।হাড় হিম হয়ে যাওয়া একটা অনুভুতি মনের কোথাও আচমকা শুরু হলো। আশে পাশে কাউকে দেখা যাচ্ছে না । খুব বেশি নিরবতা যেন পুরো আন্ডারপাস জুড়ে । তবে হঠাৎ হঠাৎ ট্রেন আসার শব্দ শোনা গেল । কিন্তু ট্রেন লাইন বা মানুষ জন দেখা যাচ্ছে না । এর মধ্যে ত্রিশ মিনিট চলে গিয়েছে । মার্কেট বন্ধ হয়ে যাবে । এমন ভুল হবার কথা নয় । নিজের উপর খুব বিরক্ত লাগছিল। সেই সাথে একটা অস্বীকৃত ভয় ও কাজ করছিল । একটা অদ্ভুত শিহরণ ! একটা ভয়ংকর আতংক ! মনে হচ্ছিল নিজের পুরো শরীর বরফ জমাট হয়ে গিয়েছে । নিজের কাছে নিজেকে অচেনা মনে হতে লাগল । আরও কয়েক মিনিট এমন করে গেল । তারপর হঠাৎ চোখ পড়ল বামদিকের একটি চলন্ত সিঁড়িতে কে যেন নিচে নামছে ।আলমগির আন্ডারপাস থেকে ফিরে যাওয়ার জন্য দৌড়ে গেল সিঁড়ির দিকে । একটি তের চৌদ্দ বছরের মেয়ে । বাদামী রঙের চুল ।পিছনে স্কুল ব্যাগ । কালো রঙের স্কুলের ইউনিফর্ম গায়ে । কালো রঙের জুতা ।ছোট চুল গুলো এমন করে সামনে রাখা যে চেহারা ঠিক মতো বুঝা যাচ্ছে না ।

আলমগির কে দৌড়ে সিঁড়ির দিকে যেতে দেখে মেয়েটি চুলের ভিতর থেকে বলে উঠল,ঐদিকে কোন রাস্তা নেই । তুমি এখান থেকে বাইরে যেতে পারবে না ।আলমগীর একটু ভরকে গেল। বুকের কোথাও মোচর দিয়ে উঠলো।আলমগীর বলল, কেন যেতে পারব না? কি সমস্যা হয়েছে? মেয়েটি স্কুল ব্যাগ পিঠে একটু ঠিক করে নিয়ে বলল, তুমি এখন টোকিওতে আছো । বর্তমান থেকে আরও কয়েক বছর পিছিয়ে । কোন এক অতীত সময়ে ।আলমগীর ভ্রু কুচকালো,কি উল্টা পাল্টা বলছ ! আমার মেয়ে আর স্ত্রী আমার জন্য অপেক্ষা করছে।অদ্ভুত মেয়েটি হো হো করে হেসে উঠলো।মেয়েটির হাসি দেখে আলমগীর এবার একটু ভয় পেল। শুধু তাই নয়। ছোট জাপানিজ মেয়েটি খুব সুন্দর বাংলা ভাষায় কথা বলছে। ব্যাপারটা বুঝতে আর বাকি রইল না। আলমগীর অনুভব করল অন্য কোন ঘটনা তার চারপাশে ঘটে যাচ্ছে।

তবুও বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল। আলমগির মেয়েটিকে বললো, তুমি কি অদ্ভুত কিছু আমাকে বিশ্বাস করাতে চেষ্টা করছো? তুমি জানো আমি পদার্থ বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলাম ! এখন ও আমি এই বিষয়ে গবেষণা করছি । পৃথিবীতে তোমাদের অস্তিত্ব অমূলক। ভ্রান্ত কল্পনা ছাড়া কিছু না। মেয়েটি একটু এগিয়ে এলো। কাঁধের স্কুল ব্যাগটা পাশে রেখে সিঁড়িতে বসল। আলমগির পথ খুঁজতে লাগল। আরও কয়েক মিনিট এভাবেই গেল। তারপর মেয়েটি একটি তাচ্ছিলের হাসি দিয়ে বলল, তোমাদের বিজ্ঞানীদের নিয়ে এই একটা সমস্যা ! সব কিছু নিজেদের দায়িত্বে নিতে চাও । পৃথিবীর সব রহস্য কি তোমরা আবিষ্কার করতে পেরেছ? তাহলে পৃথিবীতে মানুষের জীবন কেন প্রতি মুহূর্তে নানা দ্বন্দ্বনিয়ে ঘুরে? আলমগীর একটু বিরক্ত কণ্ঠে বললো, মানব জীবনের দ্বন্দ্ব স্বাভাবিক। বিজ্ঞান জীবনকে  উপভোগ্য আর সহজ করে তোলে।

সেখানে এমন কল্পনা শুধুই বিনোদন। তার মানে তুমি বলতে চাও এখন যা কিছু সব কল্পনা আর বিনোদন ? আলমগীর একটু থেমে গেল । তার পর আমতা আমতা করে বলল , হয়তো আমার মনের কোন বিভ্রান্তি ! মেয়েটিকে দেখতে এখন অনেকটা কুঁজো বুড়ির মতো মনে হচ্ছে। ঠিক যেন একশ বছর বয়সের কোন বুড়ি স্কুল ড্রেস পড়ে আছে। ঠোঁটে আর মুখে নরম চকলেট লেগে আছে। তারপর বুড়ি ঘাড় বেঁকিয়ে বলল, পৃথিবীর নিজস্ব নিয়ম আছে যা সব আবিষ্কারের উপর। তুমি যা করবে তাই তুমি পাবে। আজ অনেক বড় দুর্ঘটনা তোমার সামনে ! আলমগীর বললো, কী দুর্ঘটনা! আমাকে কেন উল্টা পাল্টা চিন্তা করতে বাধ্য করছ? কয়েক বছর আগে তোমার এক বন্ধু তার নব বিবাহিতা বউ নিয়ে তোমার কাছে বেড়াতে এসেছিল । আলমগীর বলল, আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু। আমি তাকে অনেক আপ্যায়ন করেছিলাম। বুড়ি হো হো করে হেঁসে উঠলো।

খুব শীতল কণ্ঠে আলমগীরের কানের সামনে এসে বলল , সেই আপ্যায়নের মাঝেই জমে রাখা তোমার মনের কুৎসিত হিংসুটে ইচ্ছাটাও পূরণ করেছিল। আলমগীর বলে, আমি ছিলাম সবচেয়ে ভাল ছাত্র । এটা সত্যি ওর জীবনের পরবর্তী সাফল্য আর সুন্দর জীবন সঙ্গী পাওয়াটা আমাকে ওর সামনে তুচ্ছ করে দিচ্ছিল । তখন আমার মনের কোথাও একটা ধ্বংস অনুভব করেছিলাম । আমি কোন ভাবেই ওর উচ্ছল জীবন আর সুখ মেনে নিতে পারছিলাম না । বুড়ি বলল,তাই তুমি নিজের অনেক দিনের বন্ধুত্ব ভুলে হিংসাটাকে মূল্যবান করে তুললে । একটা সুন্দর সংসার ভেঙ্গে দিলে ! আর এখন নিজের সুখের সংসার নিয়ে ব্যস্ত। একবার কি নিজের বিবেকের মুখোমুখি হয়েছিলে? আলমগীর বলল, পরিণতি এতো ভয়ংকর হবে আমি ভাবিনি। আমি শুধু ওর সুখটা সহ্য করতে পারছিলাম না। সেটাই শুধু ধ্বংস করতে চেয়ে ছিলাম।

বুড়ি বলল, তোমার বন্ধুর বিশ্বাসটা তোমারউপর নির্ভর করতো। আলমগীর একটু উত্তেজিত হয়ে বলল, আমি ভাল ছাত্র এবং বুদ্ধিমান । আমি  আমার চিন্তা দিয়ে সবাইকে নিয়ন্ত্রণ করি। আমি চাইনা কেউ আমার উপরে থাকুক । বুড়ি বলল, সে কি খারাপ ছাত্র ছিল ? আসলে তোমার ভিতরে এক ভয়ংকর হিংসুট আত্মার বসবাস । আলমগীর বলল , সে খারাপ ছাত্র ছিলনা। সে ছিল সাধারণ আর নিরব। পৃথিবীতে কম বেশি সবার মধ্যেই হিংসার উপস্থিতি আছে । বুড়ি একটু অন্য রকম হাসি দিয়ে বলল, কিন্তু সেই হিংসা তোমার মতো ধ্বংসাত্মক নয়। যে ধ্বংস তুমি ডেকে এনেছিলে সেই ধ্বংসে এখন তুমিই পড়তে যাচ্ছো । ভালবাসাহীন হৃদয় শুধু হিংসার আগুনে পুড়ে । যার পরিণাম শুধুই ধ্বংস।

হঠাৎ আলমগীর ছটফট করতে লাগল। তারপর বুড়িকে বলল, আমি ক্ষমা চেয়ে নেব। বুড়ি বলল, ক্ষমা ! তুমি যখন নিজের ইচ্ছা চরিতার্থ করতে মেয়েটির নামে কাল্পনিক ব্যাখ্যা দিয়ে বন্ধুর কান ভারী করলে, ঠিক সেই সময় থেকে একটি সংসারের সুন্দর মূহূর্তগুলো পারস্পারিক ভুল বুঝাবুঝিতে ধ্বংস স্তূপে চাপা পড়তে লাগল। আত্মসম্মান রক্ষার্থে সেই মেয়েটি আত্মহনন বেছে নিল। দুঃখজনক যে মেয়েটি অন্তঃসত্ত্বা ছিল। তোমার হিংসাবোধের আগুনে দুইটি জীবন ফুরিয়ে গেল। একজন মানুষ হিসেবে তোমার কি মূল্য আছে? বুড়ির কথা গুলোতে আলমগির কেমন যেন একটা ধাক্কা খেল। অ্যান্ডারপাস এর এক সিঁড়িতে বসে পড়ল। মনে হচ্ছিল শরীরের সব শক্তি ফুরিয়ে গেছে। অনেকটা তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। এভাবে কতোটা সময় গেছে আলমগীর জানে না।

হঠাৎ কানের কাছে লোকজন চলাচলের শব্দ শুনতে পেল। সামনেই আট নাম্বার গেট উপরে উঠে আসার। বাইরে বের হওয়ার সময় যেন কেউ তার পাশ দিয়ে গেল। একটা অদ্ভুত সুন্দরী কোন তরুণী। দেখতে ঠিক কার মতো যেন। মনে করতে পারছে না। তার দিকে তাকিয়ে ম্লান হাসি দিল। অনেক পড়ে মনে হলো তাঁর বন্ধুর সেই মৃত স্ত্রীর মতো । থা গুলো ভাবতে ভাবতে আলমগির মোবাইল ফোনে তাকিয়ে দেখে একশো কল এসেছিল । বাসায় ফোন করে জানতে পারল তার স্ত্রীর অবস্থা খুব খারাপ । মেয়ের জন্য আর চকলেট নেওয়া হলনা। ঝরের বেগে তুষার উপেক্ষা করে বাসায় ফিরল। অবস্থা সঙ্কটাপন্ন অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে নিয়ে হাসপাতালে অনেকটা সময় পার হয়ে গেল ডাক্তার কিছুই জানালো না। পাঁচ বছরের মেয়ে বাবার পাশে নির্বাক বসে রইল।

মধ্য রাত পেরিয়ে যখন পৃথিবী নতুন সূর্য দেখবে ঠিক তখন ডাক্তার ভিতর থেকে ভয়ংকর খবরটা নিয়ে এলো। পরের দিনটা শুরু হলো অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে হারানোর দুঃখ নিয়ে। যে দুঃখ প্রকৃতির নিয়মে কোন একদিন সে নিজেই তৈরি করে ছিল। আলমগীরের ভিতরের আত্মগ্লানি আর হাহাকারের শব্দ চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে ছড়িয়ে গেল ভোরের আলোয়। পৃথিবীর কোন আবিষ্কার পারবে না তার পুরনো ভালবাসা আর জীবন ফিরিয়ে দিতে। সময় কোন এক অদ্ভুত রহস্যে মিটিয়ে নেয় তার সব দাবি ঠিক সময় মতো।

গল্পের বিষয়:
রহস্য

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত