পঞ্চবক্র তান্ত্রিক

পঞ্চবক্র তান্ত্রিক

ঝড় বৃষ্টির রাত ।জয়নাল হারিকেনের আলােতে বই পড়ছে । তাদের গ্রামে এখনও ইলেকট্রিসিটি এসে পৌছয়নি । প্রায় দশ বছর আগে ইলেকট্রিক লাইন টানার খুঁটি পোঁতা হয়েছিল । খুঁটি পোঁতা পর্যন্তই , লাইন টানা আর হয়ে ওঠেনি । গ্রামের মানুষ অপেক্ষায় আছে নিশ্চয়ই কোনও এক দিন খুঁটিতে লাইন টানা হবে , আর তারাও আলাের মুখ দেখতে পাবে ।
জয়নাল,হাজী মােঃ আবুল কালাম ডিগ্রি কলেজের ছাত্র । এ বছর সে ডিগ্রি পরীক্ষা দিচ্ছে । কাল ইংরেজি পরীক্ষা । ইংরেজিতেই তার যত ভয় । তার ধারণা , যদি সে ডিগ্রিতে ফেল করে এক মাত্র ইংরেজিতেই ফেল করবে । রাত পৌনে একটার মত বাজে । ঘুমে জয়নালের চোখ বুজে আসছে । বার – বার হাই উঠছে । এর পরও পড়া চালিয়ে যাচ্ছে । আরও আধ ঘন্টার মত পড়ার পরে বিছানায় যাবে।

জয়নালের মা নেই । ওর জন্মের পরপরই মা মারা যান । কোনও ভাই – বোনও নেই । আপনজন বলতে আছেন শুধু বাবা । বাবাই তাকে কোলে – পিঠে করে মানুষ করেছেন । ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আর বিয়ে থা – ও করেননি । তিনি রাজমিস্ত্রির কাজ করেন । যা রােজগার করেন তাতে তাদের বাপ ছেলের সংসার খেয়ে – পরে ভালই চলছে । জয়নালের বাবা অনেক আগেই ঘুমিয়েছেন । আকাশের মেঘ ডাকার শব্দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে গুড় – গুড় করে নাক ডেকে তিনি ঘুমাচ্ছেন । সারা দিনে অনেক পরিশ্রম করতে হয় তাকে । এক দিকে যেমন বাইরে রাজমিস্ত্রির কাজ করেন , তেমন ঘরে ফিরে রান্না – বান্না সহ যাবতীয় সাংসারিক কাজ সারতে হয় ।

জয়নালকে কোনও কাজেই হাত লাগাতে দেন না । তার শুধু একটাই চাওয়া , জয়নাল যেন লেখা – পড়া শিখে মানুষের মত মানুষ হয় । বড় চাকরি করে । তার মত হাড় ভাঙা খাটুনি যেন জয়নালকে করতে না হয় ।জয়নাল তার বাবার ইচ্ছে পূরণের যথাসাধ্য চেষ্টা করছে । সারাক্ষণ পড়াশােনা নিয়েই থাকে । বন্ধু – বান্ধবের সঙ্গে আড্ডা মেরে , চায়ের দোকানে বা অন্য কোথাও সময় কাটানাে , অথবা টিভি দেখে বা কোনও খেলা নিয়ে মেতে থেকে সময় নষ্ট করে না । অত্যন্ত নিরীহ- ভদ্র – লাজুক প্রকৃতির ছেলে । প্রয়ােজন ছাড়া ঘরের বাইরেও বেরােয় না। গ্রামের সবাই তাকে ভাল ছেলে হিসেবেই চেনে । পড়তে – পড়তে হঠাৎ জয়নাল অনুভব করল কেমন একটা অদ্ভুত বিদঘুটে গন্ধ পাচ্ছে নাকে । যেন ইঁদুর মরা গন্ধের সঙ্গে মুর্দার আতরের গন্ধের মিশেল।

জয়নাল বসার ঘরের খােলা জানালার সামনে টেবিলে বসে পড়ছে । খােলা জানালা দিয়ে হু – হু করে বৃষ্টি ভেজা ঠাণ্ডা হাওয়া আসছে । সে মাথা তুলে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল । বাড়ির সামনের ছােট্ট উঠানটা দেখা যাচ্ছে । ঘন ঘন বিজলি চমকানাের আলােতে উঠনে জমে থাকা বৃষ্টির পানি ঝিকমিক করছে । উঠানের এক পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ঝাকড়া আম গাছটাও দেখা যাচ্ছে । দমকা হাওয়া ভেজা আম গাছটার ডাল পালায় আলােড়ন সৃষ্টি করছে । জয়নাল আবার পড়ায় মন দিল । ভাবল , দমকা হাওয়ার তােড়ে দূরে কোথাও থেকে হয়তাে ওই বিদঘুটে গন্ধটা ভেসে এসেছে। কিছুক্ষণ পরেই ওটা আর পাওয়া যাবে না । খানিকবাদে লক্ষ করল গন্ধটা আরও তীব্র হয়ে উঠেছে । যেন গন্ধের উৎস আশপাশেই রয়েছে। চোখ তুলে আবার জানালার দিকে তাকাল । জানালায় চোখ পড়তেই ভীষণ চমকে উঠল । জানালার শিক ধরে অদ্ভুত ভয়ানক চেহারার এক লােক দাঁড়িয়ে রয়েছেন ।

লােকটা একদৃষ্টে তার দিকে তাকিয়ে আছেন । ডাকাতের মত বড় – বড় লাল চোখ জোড়ায় ভয়ানক অন্তর্ভেদী দৃষ্টি । মুখ ভর্তি দাড়ি -গোঁফের জঙ্গল । মাথায় জটা ধরা লম্বা চুল । গায়ে কালাে রঙের আলখিল্লা । গলায় কয়েক ধরনের মালা । রুদ্রাক্ষের , গাছের শিকড় – বাকড়ের , প্রাণীর হাড় – গােড়ের , পাখির পালকের , তাবিজের আর টকটকে লাল জবা ফুলের মালা । কাঁধে কাপড়ের পুঁটলি । হাতে ধরা সাপের মত একটা আঁকা – বাঁকা লাঠি।

ওই লােকটার থেকেই ভুরভুর করে সেই বিদঘুটে ঘ্রাণটা আসছে । গন্ধে জয়নালের কেমন মাথা ঝিমঝিম করছে । লােকটাকে দেখে জয়নাল এতটাই চমকে গেছে যে তার মুখে কথা ফুটতেই বেশ সময় লাগল । কে আপনি ?লােকটা কোনও জবাব দিলেন না । পলকহীন জয়নালের দিকে তাকিয়েই রইলেন ।জয়নাল আবার জিজ্ঞেস করল , “ কে আপনি ? এত রাতে কোথা থেকে এসেছেন ? কী চান ?

এবারে লােকটা কথা বলে উঠলেন । গমগমে গলায় ধমকের সুরে বললেন , ‘ আমি তােকে চাই । চল আমার সঙ্গে ।আমি তােকে নিতে এসেছি ।

জয়নাল অবাক গলায় বলল , ‘ কে আপনি ? আমাকে নিতে এসেছেন মানে ?
লােকটা গলার স্বর উঁচিয়ে বললেন , আমি তান্ত্রিক পঞ্চবক্র । সময় নষ্ট না করে চল আমার সঙ্গে চল । তােকে আমার খুব প্রয়ােজন ।

জয়নাল বলল , না , আমি আপনার সঙ্গে যাব না । চিনি না , জানি না , কেন যাব আপনার সঙ্গে ?
লােকটা প্রায় হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন , বেয়াদব ! আমার কথা না শুনলে তাের অনেক বিপদ হবে । তুই সব হারাবি।

জয়নাল কিছুটা চটা গলায় বলল, চিৎকার করছেন কেন ? আস্তে কথা বলুন । আমার বাবা ঘুমাচ্ছেন । তার ঘুম ভেঙে যাবে । রাস্তার পাগল কোথাকার !

লােকটা মেঘের গর্জনের মত গলায় বলে উঠলেন , তুই আমাকে রাস্তার পাগল ভাবছিস ? ! আমি তান্ত্রিক পঞ্চবক্র । আমার ক্ষমতা সম্পর্কে তাের কোনও ধারণাই নেই ।

জয়নাল বলল , রাস্তা – ঘাটে পীর – ফকির , সাধু – ওঝা – তান্ত্রিকের ভেক ধরা আধ পাগল অনেককেই দেখা যায় । তাই বলে এই মাঝ রাতে আপনি কোথা থেকে এসেছেন ?

লােকটা গর্জে উঠলেন , ‘তুই আমাকে ভণ্ড ভাবছিস ! তার মানে তুই আমার সঙ্গে যাবি না ?
ভণ্ড না ভেবে সত্যিকারের তান্ত্রিক ভাবলেও যেতাম না । এত রাতে বাবাকে না বলে অচেনা কারও সঙ্গে কোথাও যাওয়ার কোনও প্রশ্নই ওঠে না ! লােকটা ঠোটের কোনায় তির্যক হাসি ফুটিয়ে বললেন, তাের বাবা যদি তােকে ফেলে কোথাও চলে যায় ? ‘ জয়নাল আঁতকে উঠে বলল , না , আমার বাবা আমাকে ফেলে কোনও দিনও কোথাও যাবেন না।

লােকটা বললেন , আমার সঙ্গে না গিয়ে বিরাট ভুল করলি । অনেক বড় মাশুল দিতে হবে তােকে ।
চলে যাবার জন্য ঘুরে দাঁড়াতে – দাঁড়াতে বললেন , আবার আমি তােকে নিতে আসব ।সেদিন তুই স্বেচ্ছায় আমার সঙ্গে যেতে চাইবি ।

লােকটা হাতে ধরা লাঠিতে ভর দিয়ে খালি পায়ে উঠনের কাদা – পানির মধ্যে পা ফেলে ফেলে যেতে লাগলেন । জয়নাল তার গমন পথের দিকে তাকিয়ে রইল ।

এখনও বেশ বৃষ্টি হচ্ছে । সেই সঙ্গে বিজলি চমকাচ্ছে । সারা রাতই বােধহয় এমন বৃষ্টি হবে । কী আশ্চর্য ! জয়নাল অবাক – বিস্মিত চোখে দেখতে পেল , বৃষ্টিতে লােকটার গা ভিজছে না ।তার চলার পথের বৃষ্টি থেমে যাচ্ছে ।জয়নাল বিস্ফারিত চোখে চেয়েই রয়েছে । লােকটা বাড়ির সীমানা পেরিয়ে রাস্তায় নেমেছেন । বসার ঘরের এই জানালা দিয়ে রাস্তাটা অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায় ।

হঠাৎ তীব্র নীলচে আলাের ঝলকানিতে বিজলি চমকের সঙ্গে কান ফাটানাে বিকট শব্দে বাজ পড়ল । সেই সঙ্গে অদ্ভুত লােকটাও গায়েব হয়ে গেলেন । অথচ তার আগমুহুর্তেও থেমে ও থেমে বিজলি চমকানাের আলােতে লােকটাকে দেখা যাচ্ছিল । যেন কোনও অদৃশ্য শক্তি বজ্রপাতের তীব্র আলাের ঝলকানিতে লােকটাকে দৃশ্যপট থেকে মুছে ফেলেছে ।

সকালে ঘুম ভেঙে জয়নাল নিজেকে টেবিলে বইয়ের উপর মাথা রাখা অবস্থায় পেল । তার মানে গত রাতে সে পড়তে – পড়তে টেবিলে মাথা রেখেই ঘুমিয়ে পড়েছিল ।

আড়মােড়া ভেঙে সােজা হয়ে বসল জয়নাল । গত রাতের অদ্ভুত লােকটার কথা মনে পড়ল । লােকটা চলে যাবার পরপরই বােধহয় সে ঘুমিয়ে পড়েছিল । সে দ্বিধায় পড়ে গেল , সত্যিই কি সেই লােকটা এসেছিলেন ? নাকি টেবিলে মাথা রেখে ঘুমের মাঝে স্বপ্নে দেখেছে ?

ঝড় – বৃষ্টির রাতের পর রৌদ্রোজ্জ্বল ঝকঝকে সকাল । জয়নালের বাবা খুব ভােরেই ঘুম থেকে উঠেছিলেন । তিনি সকালের রান্না সেরে ফেলেছেন । আজ রান্না করেছেন মােটা চালের ভাত , শুকনাে মরিচ দিয়ে করা লালচে রঙের আলু ভর্তা , ধনে পাতা দেয়া ডিম ভাজি , চিংড়ী মাছ দিয়ে কলমি শাক আর কলাই ডালের চচ্চড়ি ।

প্রতিদিনই জয়নাল জেগে ওঠার আগেই তিনি সকালের রান্নার কাজ সেরে ফেলেন । জয়নাল জেগে উঠলে একসঙ্গে খেয়ে কাজের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েন । টিফিন ক্যারিয়ারে করে সকালের রান্না খাবার থেকে কিছু খাবার দুপুরে খাওয়ার জন্যও নিয়ে যান । বাকি খাবার থেকে যায় দুপুরে জয়নালের খাওয়ার জন্য । সন্ধ্যায় কাজ থেকে ফিরে আবার রাতের খাবার রান্না করেন । এভাবেই চলছে তাদের বাপ – ছেলের সংসার ।

বাবা – ছেলে একসঙ্গে সকালের খাওয়া সেরে দু ’ জনেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল । জয়নাল যাচ্ছে পরীক্ষা দিতে । সকাল ন ‘ টায় পরীক্ষা শুরু হবে । তার আগেই তাকে পরীক্ষা কেন্দ্রে পৌঁছতে হবে । জয়নালের বাবা যাচ্ছেন তাঁর কাজের সাইটে । তারও সকাল ন ‘ টার মধ্যে পৌছতে হবে । আজ একটা পাঁচতলা বিল্ডিঙের ছাদ ঢালাইয়ের কাজ করবেন । পরীক্ষা শেষে জয়নাল হল থেকে বেরিয়েছে । বেশ ভাল হয়েছে পরীক্ষা । ইংরেজি নিয়ে অনেক ভয় ছিল তার মনে । এখন মনে হচ্ছে ভয়ের কিছু নেই । ইংরেজিতে সে ষাটের উপরে নম্বর পাবে । বাকি পরীক্ষাগুলাে আশানুরূপ হলে এস . এস . সি, এইচ . এস . সি – র মত ডিগ্রিতেও সে ফার্স্ট ডিভিশন পাবে । পরীক্ষা কেন্দ্র থেকে বাইরে বেরিয়ে জয়নাল তার চাচাকে দেখতে পেল । জয়নালের বাবার এক মাত্র বড় ভাই বেলায়েত হােসেন । তাঁর মুখ অসম্ভব রকমের ভার । চেহারা কেমন বিধ্বস্ত । চোখ – মুখ লাল আর ফোলা – ফোলা । জয়নাল তার চাচার দিকে এগিয়ে গিয়ে অবাক গলায় জিজ্ঞেস করল , ‘ চাচাজান , আপনি এখানে ? ‘ বেলায়েত হােসেন থমথমে গলায় বললেন , ‘ তােকে নিতে এসেছি । ‘ জয়নাল আশ্চর্য হওয়া গলায় বলল , ‘ আমাকে নিতে এসেছেন মানে ? ! ‘ শঙ্কিত গলায় আরও ‘ যােগ করল , ‘ বাড়িতে কোনও সমস্যা হয়েছে নাকি ?

বেলায়েত হােসেন বুজে আসা গলায় বললেন , ‘ তাের বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন । জয়নাল ব্যাকুল গলায় বলে উঠল , “ বাবা অসুস্থ ! কী হয়েছে তার ? ! সকালে তাে দু ‘ জন একসঙ্গেই বাড়ি থেকে বেরােলাম । তিনি চলে গেলেন তাঁর কাজের সাইটে । কী হলাে বাবার ? বেলায়েত হােসেন ভারাক্রান্ত গলায় বললেন , ‘ চল , বাড়িতে গিয়েই দেখতে পাবি। জয়নাল চাচার সঙ্গে রিকশা করে বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিল । ওর মনের ভিতর তােলপাড় হয়ে যাচ্ছে। নিশ্চয়ই তার বাবার সাংঘাতিক কিছু হয়েছে। চাচাজান তাকে সব বলছেন না । কিছু একটা লুকাচ্ছেন । জয়নাল তাদের বাড়ির সামনে পৌছে দেখতে পেল উঠনে অনেক লােকের ভিড় । রিকশা থেকে নেমেই সে ছুটে চলে গেল বাড়ির দিকে । তাকে ছুটে আসতে দেখে লােকজন দু ‘ পাশে সরে তার যাওয়ার জায়গা করে দিয়েছে । উঠানের মাঝখানে চাটাইয়ের উপর কে যেন শুয়ে রয়েছে । তার পা থেকে মাথা পর্যন্ত সাদা চাদর দিয়ে ঢাকা । সমস্ত চাদরটা ছােপ – ছােপ রক্তে মাখা । জয়নাল সেখানে গিয়ে থামল ।

কেউ একজন শােয়ানাে লােকটার মুখের উপর থেকে চাদর সরাল । রক্ত মাখা একটা মুখ দেখা গেল । জয়নালের বাবার মুখ। নিথর পড়ে আছেন । জয়নালের বুঝতে দেরি হলাে না তার বাবা মারা গেছেন । আকাশ – বাতাস কাঁপিয়ে চিৎকার করে জয়নাল কাঁদতে শুরু করল । ওর কান্নায় আশপাশের পরিবেশ ভারী হয়ে উঠল । জয়নালের বাবা মারা গেছেন পাঁচতলা বিল্ডিঙের ছাদ ঢালাইয়ের সময় ছাদ থেকে পড়ে গিয়ে । তবে তাঁর পড়ে যাওয়াটা বেশ রহস্যজনক । তিনি এমনি – এমনি পড়ে যাননি । ছাদ ঢালাইয়ের মাঝে হঠাৎ কালাে রঙের একটা চিল এসে তার উপর চড়াও হয় । আরও অনেকেই সেখানে ছিল , কিন্তু তাদের সবাইকে ছেড়ে চিলটা শুধু ওর বাবাকেই লক্ষ্য বানায়। চিলটা উড়ে – উড়ে এসে ছোঁ মেরে ওর বাবার মুখে – মাথায় আঁচড় – খামচি আর ঠোকর বসাতে থাকে । হঠাৎ অতর্কিত হামলায় তিনি দিগ্বিদিকজ্ঞান হারিয়ে ছাদের কিনারে চলে গিয়ে ছাদ থেকে পড়ে যান ।

আসরের নামাজের পর জয়নালের বাবার জানাজা
হয়েছে । এখন কবরস্থানে নিয়ে গিয়ে কবর দেয়া হচ্ছে । জয়নাল কেঁদে – কেঁদে আকুল । তার দুই চাচাতাে ভাই আর চাচা মিলে তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে । কিছুতেই যেন জয়নালের চোখের পানি আটকানাে যাচ্ছে না ।কবরটা পুরােপুরি মাটি চাপা দিতে দিতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল । ততক্ষণে লাশের সঙ্গে আসা লােকেরা প্রায় সবাই – ই চলে গেছে । শুধু জয়নাল , তার দুই চাচাতাে ভাই , চাচা আর দুই গােরখােদক আছে । হঠাৎ জয়নালের চোখ পড়ল কবরস্থানের উত্তর মাথায় । সেখানে বেশ মােটা একটা রেইনট্রি গাছ রয়েছে । গাছটার আড়াল থেকে কে যেন তাদেরকে লক্ষ করছে । লােকটার গায়ে কালাে পােশাক । এক পর্যায়ে লােকটার মুখ দেখতে পেল । জয়নাল । গত রাতের সেই অদ্ভুত লােকটা । লােকটা সােজা তাকিয়ে রয়েছেন জয়নালের দিকে ।

তার ঠোটের কোণে তির্যক হাসি । জয়নাল তার চাচা আর চাচাতাে ভাইদেরকে লােকটার কথা জানাল । চাচা বেলায়েত হােসেন অবাক গলায় বললেন , ‘ কোথায় ? কে আমাদের লুকিয়ে দেখছে ? ‘ জয়নাল আঙুল তুলে রেইনট্রি গাছটার দিকে দেখাল । চাচা , চাচার দুই ছেলে সহ গােরখােদকরাও সেদিকে তাকাল । নাহ , কাউকেই তারা দেখতে পেল না । তবে কুচকুচে কালাে রঙের একটা কুকুর দেখতে পেল সবাই । বেলায়েত হােসেন বললেন , ‘ ওখানে তাে একটা কুকুর । মনে হয় লাশের গন্ধে এসেছে । ‘ গােরখােদকদের উদ্দেশ্য করে বললেন , ‘ ভালভাবে মাটি চাপা দিয়ে। শেয়াল – কুকুর যেন কিছুতেই মাটি সরিয়ে লাশের নাগাল না পায় । ‘ জয়নাল দেখল তার চাচা ঠিক কথাই বলছেন । সত্যিই রেইনট্রি গাছটার ওখানে একটা কুকুর।সেই অদ্ভুত লোকটা নয়।তাহলে কি এতক্ষণ চোখে ধাঁধা দেখেছে?

জয়নাল নিজেদের বাড়ি ছেড়ে চাচার বাড়িতে উঠেছে । চাচাই তাকে তার বাড়িতে নিয়ে এসেছেন । বাবাকে হারিয়ে জয়নালের পক্ষে পুরাে একটা বাড়িতে একা থাকা সম্ভব নয় । তার উপর এখনও পরীক্ষা শেষ হয়নি । তাই চাচা চাইছেন তার কাছে থেকে জয়নাল যাতে বাকি পরীক্ষাগুলাে নির্বিঘ্নে দিতে পারে । তা ছাড়া এই মুহূর্তে জয়নালকে একা রাখাটা কিছুতেই ঠিক হবে না । তাতে একা একা বাবার কথা মনে করে আরও বেশি কান্নাকাটি করবে । চাচার স্ত্রী মারা গেছেন বহু বছর আগেই । চাচার সংসার তার দুই ছেলেকে নিয়ে । বড় ছেলে স – মিলে কাজ করে । জয়নালেরই সমবয়সী। ছােট ছেলের গ্রামের বাজারে চায়ের দোকান রয়েছে । চাচা তার বড় ছেলেকে বিয়ে করাতে চাইছেন । | পছন্দসই মেয়ে পাচ্ছেন না বলে বিয়ে করানাে হচ্ছে না । চাচার সংসারে জয়নালের দিন ভালই কাটছে । চাচার দুই ছেলেই সারা দিন বাইরে কাটায় । শুধু দুপুরের খাওয়ার সময় তারা এসে খেয়ে যায় । চাচা বাড়িতেই থাকেন । তার দুটো দুধেল গাভী আছে । তিনি ঘরের রান্না – বান্না আর গাভী দুটোর দেখ – ভাল নিয়েই ব্যস্ত থাকেন । জয়নালকে বিছানা , আলনা , পড়ার টেবিল সহ আলাদা ঘর দেয়া হয়েছে । চাচা এবং দুই চাচাতাে ভাইয়ের কথা হচ্ছে কিছুতেই যেন জয়নালের পড়ায় কোনও ব্যাঘাত না ঘটে জয়নাল তাদের বংশের গর্ব । যে করেই হােক জয়নালকে পড়াশােনা শেষ করে ওর বাবার ইচ্ছে পূরণ করতে হবে । বাবার কাছে জয়নাল যেভাবে আদরে ছিল , বলা যায় চাচার কাছেও সেভাবে সুযােগ – সুবিধা পাচ্ছে ।

মাঝ রাত । জয়নালের ঘুম ভেঙে গেছে । সে আবার সেই অদ্ভুত লােকটাকে দেখেছে । ঠিক ধরতে পারছে না , সে কি স্বপ্নে লােকটার দেখা পেয়েছে , নাকি সত্যিই লােকটা এসেছিলেন ? সে ঘুমন্ত অবস্থায় ছিল । হঠাৎ সেই রাতের মত নাকে বিশ্রী গন্ধ পায় । ইদুর মরা দুর্গন্ধের সঙ্গে মুর্দার আতরের গন্ধের মিশেল । এক সময় অনুভব করে তার মাথার কাছে কেউ এসে দাঁড়িয়েছে । যে এসেছে তার গা থেকে লালচে আলাের দ্যুতি বেরােচ্ছে । অন্ধকার ঘর লালচে আভায় ভরে গেছে । গমগমে গলার স্বর শােনা যায় , তাের বাবা পৃথিবী থেকে চলে গেছেন , এখনও তুই আমার কথা শুনবি না ? জয়নাল ভীত গলায় বলে ওঠে , “ কে আপনি ? ‘ আমি তান্ত্রিক পঞ্চবক্র ‘ ‘ আপনি আবার এসেছেন ? ‘ হ্যাঁ, তােকে নিতে এসেছি । ‘ ‘ আপনার সঙ্গে আমি কেন যাব ? কী চান আমার কাছে ? ‘ শুধু তােকে চাই । বিনিময়ে তুই

কী চাস বল ? ধন – সম্পদ – ক্ষমতা এমনকী পরমায়ু – সব আমি তােকে দিতে পারব । ‘ ‘
আপনার কাছে কোনও কিছুই চাই না আমি । শুধু আপনার সঙ্গে যেতে চাই না । ‘ আবার ভুল করবি ? বাবাকে তাে হারালি , আরও কত হারাতে চাস ? | বাবার কথা ওঠায় জয়নালের মনটা ভীষণ কেঁদে উঠল । অসহিষ্ণু গলায় বলল , আপনি আমার কাছ থেকে চলে যান । চলে যান বলছি । ‘ ঠিক তখন জয়নাল নিজেকে ফিরে পেল । যেন স্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙেছে । সমস্ত গা ঘামে ভিজে গেছে । কেউ নেই তার মাথার কাছে । নেই লালচে আভা । অন্ধকার ঘর । তবে বিশ্রী গন্ধটা তখনও পাওয়া যাচ্ছে । | জয়নাল বিছানা থেকে উঠে এক গ্লাস পানি পান করে আবার শুয়ে পড়ল ।

সকালে চিৎকার – চেঁচামেচিতে ঘুম ভাঙল জয়নালের । আওয়াজটা আসছে বাইরে থেকে । জয়নাল ঝট করে বিছানা থেকে নেমে বাইরে বেরােল । বাইরে তার দুই চাচাতাে ভাই তাদের বাবাকে পাজাকোলা করে গােয়াল ঘরের দিক থেকে নিয়ে আসতে – আসতে সাহায্যের জন্য চিৎকার করে সবাইকে ডাকছে । জয়নালও ছুটে গিয়ে চাচাকে ধরল । চাচাকে সাপে কেটেছে । সকালে ঘুম থেকে উঠে তিনি গােয়াল ঘরে গিয়েছিলেন গরু দুটোকে খড় কেটে দিতে । সেখানে কুচকুচে কালাে রঙের একটা সাপ তাকে ছােবল মেরে পালিয়ে যায় । তাঁর আর্তচিৎকারে প্রথমে চাচাতাে ভাইদের একজন ছুটে যায় । সেই ভাইয়ের চিৎকার শুনে অন্য ভাইটিও জেগে উঠে ছুটে যায় । ততক্ষণে তিনি একেবারে ঢলে পড়েন । সমস্ত শরীর নীলচে রঙ ধারণ করেছে । মুখ দিয়ে ফেনা গড়াচ্ছে । মুহূর্তেই আশপাশের বাড়ির লোকজন জড় হয়ে যায় । একজন চলে যায় সাপের ওঝা ডেকে আনতে । কিন্তু ওঝা আসার আগেই তিনি মারা যান ।

মাঝ রাত । জয়নালের ঘুমের মাঝে আবার সেই অদ্ভুত লােকটা এসেছেন । গম্ভীর গলায় বলছেন , এবারে চাচাকেও হারালি , এখনও কি আমার কথায় রাজি হবি না ? জয়নাল বলল , আপনি কী বলতে চাচ্ছেন ? ‘ আমার কথা না শুনলে একে – একে সবাইকে হারাবি । এরপর পর্যায়ক্রমে তাের দুই চাচাতাে ভাই । প্রয়ােজনে সমস্ত গ্রাম উজাড় করে ফেলব । ‘ জয়নাল বিস্মিত গলায় বলল , “ আপনার কথার মানে বুঝতে পারছি না । ‘ ‘ তুই কী ভেবেছিস , তাের বাবার আর চাচার মৃত্যু এমনিতেই হয়েছে ? তাের কারণে হয়েছে । তুই আমার কথায় রাজি হসনি বলে তাদের মরতে হলাে । ‘ জয়নাল অবাক গলায় বলল , আমার কারণে তাদের মৃত্যু হবে কেন ? ! বাবা মারা গেছেন ছাদ থেকে পড়ে গিয়ে , চাচা মারা গেছেন সাপের ছোবলে।

পঞ্চবক্র হাে – হাে করে হেসে উঠে বললেন , ‘ আমার হাতে যে আঁকা – বাঁকা লাঠিটা দেখিস , এটা কোনও সাধারণ লাঠি নয় । এটা সাক্ষাৎ মৃত্যু । এই লাঠি আমি যার নাম বলে ছুঁড়ে মারব তার মৃত্যু ঘটবে । লাঠি মাটিতে পড়ার সঙ্গে – সঙ্গে জীবন্ত হয়ে উঠবে । যাকে মারতে যে রূপের প্রয়ােজন সেই রূপ নেবে । তাের বাবাকে মারতে চিলের রূপ , আর চাচাকে মারতে সাপের রূপ নিয়েছিল । তুই যদি আরও মৃত্যু দেখতে চাস কী আর করার ! তােকে আমার চাই – ই চাই। জয়নাল বুঝতে পারল তান্ত্রিক পঞ্চবক্র যা বলছেন ঠিকই বলছেন । তার অনেক ক্ষমতা । তিনি চাইলে সব কিছুই করতে পারেন । সে মরিয়া গলায় বলে উঠল , তারচেয়ে আপনি আমাকেই মেরে ফেলেন । ‘ না , তােকে কিছুতেই মারা যাবে না । তােকে পাবার জন্য পৃথিবীর সবাইকে মেরে ফেললেও , তােকে কিছুতেই মারব না । না অন্য কাউকে তােকে মারতে দেব । ‘

‘ আপনি কী চান আমার কাছে ? ‘
কতবার বলেছি আমি শুধু তােকে চাই । তােকে নিয়ে যেতে চাই । ইচ্ছে করলে আমি তােকে সম্মােহন করেও নিতে পারতাম । কিন্তু তাতে আমার কাজ হবে না । তােকে নিজের ইচ্ছেতে যেতে হবে ।
যতক্ষণ না তুই রাজি হবি , তােকে বাধ্য করার জন্য সব করব আমি ।
‘ জয়নাল হার মানা গলায় বলল , ঠিক আছে , আমি আপনার সঙ্গে যাব ।

তান্ত্রিকের চেহারায় পরিতৃপ্তির ছাপ দেখা গেল । চোখ দুটো আনন্দে ঝলমল করে উঠল । আয়েশি গলায় বললেন , ‘ চল , তা হলে । জয়নাল তান্ত্রিক পঞ্চক্রের সঙ্গে বেরিয়ে পড়ল।
নিশুতি রাত ।

আকাশে ঘােলাটে চাঁদ । চারদিক থমথম করছে । কোথাও কেউ নেই । গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে সমস্ত গ্রাম । এমনকী আশপাশে কোনও রাত জাগা কুকুর – বিড়ালও দেখা যাচ্ছে না। যেন কোনও অশুভ শক্তির ভয়ে সবাই লুকিয়ে রয়েছে । জয়নাল তান্ত্রিকের পিছু – পিছু এগিয়ে যাচ্ছে । কী আশ্চর্য ! চাদের আলােতে জয়নালের ছায়া পড়ছে , কিন্তু তান্ত্রিকের ছায়া দেখা যাচ্ছে না।তান্ত্রিক জয়নালকে নিয়ে গ্রামের উত্তর দিকের শেষ মাথায় ঘন জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে পড়লেন । এই জঙ্গল সুন্দরবনের একটা অংশ । এখান থেকে যতই সামনে এগােবে ততই সুন্দরবনের গভীরে চলে যাবে । তান্ত্রিক জয়নালকে নিয়ে জঙ্গল চিরে এগিয়েই যাচ্ছেন । কোথায় তার গন্তব্য কে জানে ! পথ যেন আর ফুরােবার নয় ! ক্লান্তিতে জয়নালের শরীর ভেঙে আসছে । বার বার হাই উঠছে । যেন চলতে চলতেই সে ঘুমিয়ে পড়বে ।রাত ফুরিয়ে চারদিক ফর্সা হয়ে উঠছে ।

পাখির কলতানে নতুন একটা দিনের সূচনা হচ্ছে। তান্ত্রিক আর জয়নাল গিয়ে পৌঁছেছে জঙ্গলের মাঝের পরিত্যক্ত এক শ্মশান কালী মন্দিরে । বিশাল জায়গা জুড়ে পলেস্তারা খসে পড়া , শেওলা ধরা , রাজ্যের আগাছা গায়ে জড়িয়ে কোনওক্রমে দাঁড়িয়ে রয়েছে ভাঙাচোরা কাঠামােটা । কমপক্ষে দেড় – দু ‘ শাে বছর আগে হয়তাে শ্মশানের পাশ ঘেঁষে কেউ এই মন্দির নির্মাণ করেছিল । এখন অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে গত একশাে বছরেও কেউ হয়তাে এই মন্দিরের চাতালে পা রাখেনি । শশানেও হয়নি কোনও শবদেহ পােড়ানাে । তান্ত্রিক জয়নালকে মন্দিরের ভিতরে এক গুপ্ত কামরায় নিয়ে গেলেন । এটাই বােধহয় তান্ত্রিকের ডেরা । বেশ পরিষ্কার – পরিচ্ছন্ন ।

তান্ত্রিক বললেন , ‘ আমার সঙ্গে এখানেই থাকবি তুই ।জয়নাল কিছু বলল না ।পথশ্রমে তার শরীর ভেঙে আসছে ।
তান্ত্রিক বললেন , ‘ যা , নদী থেকে স্নান করে আয় ।

মন্দিরের পাশ ঘেঁষেই একটা নদী বয়ে গেছে । পঞ্চাশ – ষাট হাত এগােলেই নদীটা দেখতে পাবি । ততক্ষণে আমি তাের খাওয়ার ব্যবস্থা করছি । ‘

জয়নাল নদী থেকে গােসল করে এল । তান্ত্রিক তার খাওয়ার ব্যবস্থা করেছেন । আস্ত দুটো ঝলসানাে বন মােরগ , পােড়া বুনাে – আলু , আর নানান ধরনের বুনাে ফলমূল । জয়নাল দেরি না করে খেতে বসল । সারা

রাত ধরে হেঁটে আসায় পেটে তার কুমিরের খিদে । খাবার দেখে নিজেকে আর সামলাতে পারল না । জয়নাল গােগ্রাসে খাচ্ছে আর তান্ত্রিক দূরে বসে তৃপ্তি ভরা চোখে তার খাওয়া দেখছেন ।

খেতে খেতে জয়নালের খেয়াল হলাে তান্ত্রিক নিজে কিছুই খাচ্ছেন না । সে বুনাে মােরগের রান চিবুতে চিবুতে বলে উঠল , ‘ আপনি কিছু খাচ্ছেন না কেন ?

তান্ত্রিক বললেন , “ আমার খাওয়ার দরকার হয় না । মানুষ খায় কেন ? শরীরে শক্তি জোগানাের জন্য । আমি ধ্যানে বসে সরাসরি সূর্যের আলাে আর বাতাস থেকে শক্তি শুষে নিই ।

‘ জয়নালের খাওয়া শেষ হলে তান্ত্রিক বললেন , আমি এখন ধ্যানে বসছি । ধ্যানমগ্ন অবস্থায় আমাকে কখনও বিরক্ত করবি না । ‘ জয়নাল কিছু না বলে ওপাশে মাদুরের উপর গিয়ে শুয়ে পড়ল । খুব ঘুম পাচ্ছে তার । চোখ দুটো আর মেলে রাখতে পারছে না ।

গল্পের বিষয়:
রহস্য

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত