বহুরূপী

বহুরূপী

(ছোট রহস্য গল্প)

মনটা খুব ছটফট করছিল মলিনার। ছেলেটা এখন অবধি স্কুল থেকে ফিরলনা আর ও না ফেরা পর্যন্ত ওর অঙ্ক খাতাটাও দেখা যাবে না। বেশ মনে আছে সেদিন ওর ছেলে নোটনের অঙ্ক খাতার পিছনেই সেই লোকটার  ফোন নম্বর লিখে রেখেছিল মলিনা। আজ সেটাই এখন সবচেয়ে বেশি দরকার ওর। অন্ধকারে ওটাই একমাত্র আলোর রেখা মলিনার সামনে।

বত্রিশ বছরের মলিনার স্বামী ভবেশ বহুরূপীর ছদ্মবেশে কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে টাকা রোজগার করে আর তাতেই ওদের চারজনের ছোট্ট পরিবারটা চলে যায়। ছেলেটা মিউনিসিপালিটির স্কুলে ক্লাস ফোরে পড়ছে আর মেয়েটা ক্লাস টুতে উঠেছে এবার। মলিনাকে অনেক কষ্টে চালাতে হয় এই সংসারটা।

মলিনার বেশ মনে আছে ছেলে নোটনের অঙ্ক খাতার পিছনে পরশু বিকালে  নীল রঙের প্রাইভেট কারে আসা লোকটার ফোন নম্বরটা টুকে রেখেছিল। ভবেশের কাছে প্রায়ই নাটক বা যাত্রা দলের লোকেরা আসা যাওয়া করে। ওই লোকটাও সেদিন এসে ভবেশের দেখা না পেয়ে মলিনাকে বলে গিয়েছিল ওনার ফোন নম্বরটা টুকে রাখতে এবং ভবেশ এলে ওনাকে ফোন করতে বলে যেন।

মলিনা সাধারণত এসব লোকের সাথে বেশি কথা বলে না। লোকটা চলে যেতেই ওই নম্বরটা নোটনের অঙ্ক খাতার পিছনে টুকে রাখে।  সন্ধ্যার পর ভবেশ জগদ্দল মেলা থেকে বাড়ি ফিরেই ফোন করে লোকটাকে ও পরের দিন সকালেই বেড়িয়ে যায় ওনার সাথে দেখা করতে। সেই থেকে ভবেশ আর বাড়ি ফেরেনি, দুদিন হতে চলল। বাচ্চাদের নিয়ে এখন অথৈ জলে পড়েছে মলিনা। একটা অজানা ভয় ওকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে।

আজ সকালে ওদের স্কুলে পাঠাবার পরেই মলিনার মনে পড়েছে যে সেইদিন  আসা লোকটার ফোন নম্বর ও নোটনের অঙ্ক খাতায় লিখে রেখেছিল। এখন ওই একটাই মাত্র ভরসা। ভবেশ সেদিন বেরোবার আগে ওকে বলে গেছিল যে ও বড় বাজারে ওই লোকটার সাথেই দেখা করতে যাচ্ছে বিশেষ কাজের জন্য কথা বলতে। কিন্তু তারপর ভবেশ কোন খবরও পাঠায়নি বা বাড়িতেও ফেরেনি। মলিনার খুব ভয় করছে এখন, কোন বিপদ হলনাতো লোকটার। ওদের শোভা বাজার গঙ্গার ঘাটের কাছের এই বস্তির ঝুপড়ি বাড়িতে এসে পর গত চার বছরে এরকম বিপদে কোনদিনই পড়তে হয়নি মলিনাকে।

পুরুলিয়ার ঘোষ পাড়াতে বিয়ের পর থেকে সাত বছর ভবেশের এবং ওর বাবা মা বোন আর ভাইদের সাথে একসাথে সংসার করেছে মলিনা। কিন্তু ওদের ছৌ নাচের দলের মধ্যে টাকা পয়সা নিয়ে গণ্ডগোলটা শেষে এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে অবশেষে ভবেশের দাদা, যিনি দলটার পাণ্ডা ছিলেন, ভবেশের সাথে সম্পত্তির ভাগাভাগি নিয়েও লড়াইয়ে নেমে পরলেন। তখনই ভবেশ রাগে দুঃখে অভিমানে সপরিবারে চলে এলো কলকাতায় রুটি রুজির সন্ধানে। আর সেই থেকেই মলিনারা আছে শোভা বাজারের এই ঝুপড়িতে।

ভবেশ কলকাতায় এসে প্রথমেই একটা যাত্রা দলে কাজ পেয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এক বছর বাদেই বুদ্ধিমান ভবেশ বুঝতে পেড়েছিল ঐ ছোটো চাকরিতে ওর তেমন কোন উন্নতির সম্ভবনা নেই। কলকাতার মত শহরে বৌ ছেলে মেয়ে নিয়ে থাকা , বাচ্চাদের স্কুলে পড়ানো এসবের জন্য চাই আরও অনেক টাকা। যদিও ভবেশের বাড়ি ভাড়া লাগতো না। ওর দেশের এক চেনাশোনা কাকাবাবুর ঝুপড়ি বাড়ি এটা। কলকাতায় হাওড়া স্টেশনে একটা অস্থায়ি পান বিড়ির দোকান ছিল ওনার। এখন বয়সের ভারে অসুস্থ হয়ে সেই দোকান তুলে দিয়ে উনি বরাবরের মত দেশে চলে গেছেন। সেই কাকাবাবুই ভবেশকে বাড়ির চাবিটা দিয়ে দিয়েছিলেন।

কলকাতায় অনেক পুরানো আর বিখ্যাত মন্দির আছে দেখতে পেয়েছে ভবেশ। একবছর যাত্রা দলে কাজ করতে করতে শহরটা সম্পর্কে ওর একটা স্বচ্ছ ধারণা তৈরি হয়ে গিয়েছিল। পয়ত্রিশ বছরের অভিজ্ঞ ভবেশ বেশ বুঝতে পারে যে বহুরূপী সেজে এই সব মন্দিরের সামনে বা কোন মেলাতে দাড়িয়ে থাকলে ঐ চাকরির চেয়েও অনেক বেশি রোজগার হবে ওর। তাছাড়া সিসন টাইমে যাত্রা দলে ওর ছোটোখাটো পার্টও মেলে এবং তাতেও কিছু রোজগার হয়। তবে মলিনাকেও বাধ্য হয়ে বাড়ি বাড়ি ঝি গিরি করতে হয়েছে প্রায় এক বছর।

ভবেশ বহুরূপী মানে কখনো শিব ঠাকুর কখনো শনি ঠাকুর বা কখনো মা কালীর বেশে সেজে গুঁজে মন্দিরে বা গঙ্গা ঘাটের পাশে দাঁড়াতে শুরু করল যখন, তখন থেকেই ওর রোজগার দুগুণ হয়ে গিয়েছিল। কলকাতার আশেপাশে এখানে ওখানে  প্রায়ই যে সব মেলা বসে সেখানেও যেতে লাগল ভবেশ। এরপর ভবেশ মলিনার ঝিয়ের কাজ ছাড়িয়ে দিয়েছিল। সে এখন বাড়িতে বসে ওদের পুরানো সেলাই এর মেশিনে ব্লাঊজ সায়া ইত্যাদি সেলাই করে আর তাতে বেশ কিছু রোজগার হাতে আসে ওর।

ভবেশ বহুরূপী সেজে মন্দিরে, মেলায়, গঙ্গার ঘাটে বা পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে ভালই রোজগার করছে। এখন প্রায় চার পাঁচটা দলের সাথে মাঝে মাঝেই ওকে বিভিন্ন জায়গায় যাত্রা পালা করতে যেতে হয়। সেই সব যাত্রায় ভবেশ কখনো যমদূত, কখনো ভগবান রাম, রাবন বা কখনো কোন রাজা বা জমিদারের বিবেকের পার্ট করে আর একটু আধটু গান টানও গায়। সাধারণত কখনো দুদিন বা কখনো তিন দিন বাদেই বাড়ি ফিরে আসে। কিন্তু এবার তো সেইরকম কোথাও যায়নি লোকটা। তাহলে দুদিন হয়ে গেল তবু সে ফিরছে না কেন ?

নোটনের অংক খাতার পেছনেই ছিল ঐ ফোণ নম্বরটা। মলিনা নোটন বাড়ি ফেরা মাত্র ঐ নম্বরটা টুকে নিয়ে সামনের ওষুধের দোকানে চলে এলো পয়সা ফেলে ফোন করবে বলে। ওদের দোকানে ওরকম একটা ফোনের যন্ত্র বা বুথ আছে দেখেছে। কিন্তু বার বার চেষ্টা করেও কিছুতেই ফোনটা লাগল না। আসলে ঐ প্রান্ত থেকে ফোনটাতে শুধু একটা কুক কুক শব্দ আসছিল। মলিনা ভাবল লোকটা বোধ হয় কোন কাজে  ব্যস্ত আছে। তখন বিকাল সাড়ে চারটা বাজে। চলে এলো মলিনা, আবার সন্ধ্যা বেলা একবার আর রাতের দিকে একবার চেষ্টা করল। কিন্তু কোন লাভ হলনা, এবার ওপার থেকে বলছে ফোনটি সুইচ অফ করা আছে।

পরদিন সকালে শোভা বাজার থানায় থানার দারোগা হালদার বাবু মলিনার সব ঘটনা শুনে ওর কাছ থেকে সেই লোকটার ফোন নম্বরটা আর ভবেশের একটা ফোটো চেয়ে নিলেন। এবার থানার সেকেন্ড অফিসারকে বলে দিলেন নম্বরটা চেক করে ওনাকে সব রিপোর্ট দিতে। হালদার বাবু লোকটা ভাল, মলিনার পোশাক ও ওর মার্জিত স্বভাব দেখে ওনার ওকে ভদ্র ঘরের মেয়ে বলেই মনে হল। উনি মলিনাকে ভরসা দিলেন যে উনি ওনার যথা সাধ্য চেষ্টা করবেন ওর স্বামীকে খুঁজে বেড় করবার। তবে এতো বড় কলকাতা শহরে একটা হারিয়ে যাওয়া লোককে খুঁজতে একটু সময় যে লাগবে সেটাও সাথে সাথে জানিয়ে দিলেন।

পরের দিন রবিবার সকাল দশটা নাগাদ ভবেশের ঝুপড়ি বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল দারোগা হালদার বাবুর জিপ গাড়ি। বস্তিতে পুলিশ দেখেই মুহূর্তে আসে পাশের অনেক লোকজন জড় হয়ে গেল ওখানে। নোটন পুলিশ দেখেই মাকে ডেকে দিয়েছিল। মলিনা ওদের বেড়ার ঘর থেকে বেড়িয়ে সামনেই দারোগা বাবুকে দেখে ভীষণ ঘাবড়ে যায়। এতো সকালে তাহলে কি দারোগা বাবু কোন খারাপ খবর নিয়ে এলেন ওর কাছে ?

“শুনুন, আপনার স্বামী ভবেশ দাসকে পুলিশ পরশু সন্ধ্যা বেলা কলকাতার এক বড় বিজনেস ম্যান মোহন লাল সিংকে খুন করার অপরাধে গ্রেফতার করেছে। উনি এখন বেহালা থানার লক আপে আছেন। আপনি যদি চান তো আজ বিকালে গিয়ে দেখা করে আসতে পারেন। মার্ডারের আসামী,কালই কিন্তু ওকে কোর্টে তোলা হবে। গত কাল আর আজ কোর্ট বন্ধ থাকায় কিছু করা যায়নি। সোমবার সকালেই কেস উঠে যাবে কোর্টে।“ হালদার দারোগা থামলেন এবার।

মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ল মলিনার। “আমার স্বামী খুন করেছে মানে ? আপনার কোথাও কোন ভুল করছেন নাতো ? উনি বহুরূপীর সাজে ঘুরে বেড়িয়ে দুটো পয়সা কামান আর তাতেই আমরা খেয়ে পড়ে বেঁচে আছি। আপনি এসব কি বলছেন দারোগা বাবু ? ও কাঊকে খুন করতে যাবে কেন ?” মলিনা ভিতরে ভিতরে কাণ্ণায় ভেঙ্গে পড়লেও চোখে মুখে শক্ত ভাব নিয়ে বলল কথাটা।

হালদার দারোগা দমবার পাত্র নন। মুচকি হেসে শুধু বললেন,”লোকে টাকার জন্য কি না কি করে জানেন ?“

একটু থেমে ভবেশের ঘর দোরের ও পরিবারের অবস্থা দেখে বোধ হয় দয়া হল লোকটার। আসে পাশে দাঁড়ানো লোকগুলির অবাক হয়ে যাওয়া মুখ গুলি দেখে নিয়ে বললেন,”আপনাকে জানিয়ে গেলাম। যদি আজই ওনার সাথে দেখা করতে চান তাহলে আমি স্পেশাল বন্দোবস্ত করে দেব। সেই জন্যই আমার আসা। আপনি কি তাহলে আজ যাবেন ভবেশের সাথে দেখা করতে ?”

মলিনার ভবেশের জন্য খুব দুশ্চিন্তা হচ্ছিল। দুদিন যাবত লোকটা থানার লকআপে কতই কষ্টে না আছে যেন। এখন যা করবার ওকেই করতে হবে। পাশের ঝুপড়ি থেকে ওর  সম বয়সী ও বান্ধবী সুপর্ণা এসে দাঁড়িয়েছিল ওর পাশেই। সুপর্ণাই ফিস ফিস করে বলে উঠল, “তুই কিছু চিন্তা করিসনা মলিনা, আমি বাচ্চাদের খেয়াল রাখব। তুই আজই ভবেশদার সাথে দেখা করে আয়। আমি আছি।“

বিকালে বেহালা থানায় এসে একটা ছোট খুপরিতে লোহার গরাদের এপারে দাঁড়িয়ে কথা বলল মলিনা ওর বিধ্বস্ত স্বামী ভবেশের সাথে। বোঝাই যাচ্ছে এই দুদিনে লোকটার উপর দিয়ে ঝড় বয়ে গেছে। মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, চোখের নিচে কালসিটে দাগ, হাতের চামড়ায় চাবুকের দাগ বসে গেছে।

সংক্ষেপে ভবেশ যা বলল তাতে জানা গেল যে ওকে একটা খুনের কেসে ফাঁসিয়ে দিয়েছে সেই লোকটা যে ওদের বাড়িতে এসেছিল সেদিন। লোকটার নাম বংশী লাল সিং। বেনারসের লোক, বেশ কয়েক পুরুষ যাবত কলকাতায় বাস ওদের। বড় বাজারে বিশাল শাড়ি কাপড়ের দোকান। সম্পত্তি নিয়ে বড় দাদা ও বাপ ছেলের ঝামেলা চলছিল বেশ কয়েকদিন যাবত। ভবেশকে ছেলে বংশী লাল কাজে লাগায় বাবাকে ভয় দেখিয়ে মেরে ফেলবার জন্য। ওর বাবার হার্টের রোগ ছিল। আর ভবেশ না জেনে শুনেই লোকটাকে ভালুক সেজে রাতের অন্ধকারে ওনারই ঘরে গিয়ে হটাত অন্ধকার থেকে বেড়িয়ে ওনাকে ভয় দেখিয়েছে। তাতেই লোকটার হার্ট এটাক হয় আর মারা যান। ওনার চীৎকার শুনেই বাড়ির দারোয়ান ও চাকরেরা ছূটে এসে ভালুক বেশি বহুরূপী ভবেশকে হাতে নাতে ধরে ফেলে আর পুলিশ ডেকে ওকে তুলে দেয় তাদের হাতে।

সমস্ত ঘটনা শুনে মলিনা প্রশ্ন করল,”আর ঐ লোকটা মানে বংশী লাল, সে তোমাকে দেখেছে না দেখেনি ? তুমি পুলিশকে জানালে না যে ঐ লোকটা তোমাকে ভাড়া করেছিল এই কাজের জন্য ?“

“আরে বংশী লাল তো এখানে নেই,বেনারস গেছে সেদিন দুপুরের ফ্লাইটে। এসব কথা পুলিশ থোরি বিশ্বাস করবে। আমাকে উনি বড় বাজারের দোকানের কাছেই সেন্ট্রাল এভেনিউয়ের একটা ছোট হোটেলে ডেকে নিয়ে ওনাদের বাড়ি ও বাবার ঘড়ের নকশা হাতে দিয়ে শুধু বলেছিলেন সন্ধ্যার আগেই যেন আমি ওনার ঘরে ঢুকে গিয়ে লুকিয়ে থাকি। রাতের খাওয়া চাকরেরা বাবার ঘড়েই দিয়ে যায়। ওনার ডিনার হয়ে গেলেই যেন আমি বেড় হয়ে ওনার সামনে ভালুক নাচ নাচতে থাকি। তাহলে ওর বাবা নাকি খুব মজা পাবেন। আমাকে লোকটা বলেই নি যে ওর বাবার হার্টের রোগ আছে। ভালুক দেখলে ভীষণ ভয় পান। আর আমি না বুঝে মজা দেখিয়ে চমকে দেবার একটা কাজ ভেবেই এটা করতে রাজি হয়ে যাই। আর টাকাটাও তো অনেক না ?“

মলিনার মনে তখনো অনেক প্রশ্ন। জিজ্ঞাসা করল,”কিন্তু তোমাকে লোকটা বাড়িতে ঢোকাল কি ভাবে ?”

“আমাকে উনি হোটেলেই থাকতে বলেন সারাদিন। বলেছিলেন  রাতে সাড়ে আটটার সময় ওদের একজন দারোয়ান একটা জরুরী কাজে চলে যাবে আর ওখান থেকেই বাড়ি ফিরে যাবে। রাত ঠিক আটটা পয়তাল্লিশে আরেক জন দারোয়ান চলে আসবে নাইট ডিউটি করতে। পনের মিনিটের একটা গ্যাপ থাকবে। আর তখনই আমাকে দারোয়ান সেজে বাড়ির মধ্যে ঢুকে যেতে হবে।“  কথাটা বলে ভবেশ একটু থামল।

একটু বাদেই আবার বলতে শুরু করল,”লোকটা এই কাজের জন্য এডভান্স পঞ্চাশ হাজার টাকা দিয়েছিল। আমি সেদিন দুপুরে মার্কেটে গিয়ে দারোয়ান আর ভালুকের পোশাক কিনে এনে ঠিক আটটা পঁয়ত্রিশে ওদের বাড়িতে ঢুকে গিয়ে সোজা বংশী লালের বাবা মোহন লালের ঘরে লুকিয়ে ঢুকে যাই। ওদের বাড়ি আর ওনার ঘড়ের নকশা আমার আগেই দেখা ছিল। আমাকে দারোয়ানের বেশে দেখে কেউ সন্দেহ করেনি।“

“লোকটা তোমাকে মোট কত টাকা দেবে কথা দিয়েছে এই কাজের জন্য?” মলিনার মুখে সন্দেহের রেখা।

“এক লাখ টাকা। তবে সেদিন দুপুরেই আগে আমি বাকি টাকাটা আমার ব্যাঙ্ক একাউণ্টে জমা করে দিয়েছি , প্রায় বেয়াল্লিশ হাজার টাকা।“ বলতে বলতে ভবেশের চোখ দুটো চিক চিক করে উঠল।

এরপর ফিস ফিস করে ভবেশ মলিনার কানের কাছে মুখ এনে কিছু বলল আর মলিনার চোখের কোনায় এক টুকরো আনন্দের ঝিলিক দেখা গেল যেন। মাথা নাড়িয়ে স্বামীর কাছ থেকে বিদায় নিলো মলিনা।

পরদিন বেলা দশটায় ভবেশ ও আরও দুজন বয়স্ক কয়েদিকে নিয়ে একটা পুলিশ ভ্যান রওনা দিলো ব্যাঙ্কশাল কোর্টের উদ্দেশে। কলকাতার ট্র্যাফিক পেড়িয়ে বেহালা থেকে ডালহৌসির কোর্টে পোঁছতে প্রায় একঘণ্টা লাগবার কথা। পুলিশ ভ্যানের ভিতর তিন জন কয়েদি ছাড়াও দুজন কনস্টেবল ও সামনের সিটে একজন ইন্সপেক্টর বসা। সামনে খুব ট্র্যাফিক জ্যাম চলছে, ফলে ওদের ভ্যানটা ধীরে ধীরে এগোচ্ছিল। ভ্যানটা চিড়িয়াখানার সামনে  আসতেই তলপেটে হাত রেখে চেঁচাতে লাগল ভবেশ,”উফ, কি পেট ব্যাথা করছে। পায়খানা পড়ে গেল যে। আরে একটু দাড়াও না ভাই।“ একজন কনস্টেবলের দিকে তাকিয়ে বলল কথাটা।

আরকজন কনস্টেবল ভবেশের অভিনয়টাকে সত্য বলেই বিশ্বাস করে ড্রাইভারের সিটের পিছনের ছোট জানালাটা খুলে সামনে বসা ইন্সপেক্টরকে জানাল সেটা। ফলে চিড়িয়াখানার গেটের একটু আগে গিয়ে থেমে যায় ওদের ভ্যান ও আরেকজন কনস্টেবল ভবেশের হাতে লাগানো হ্যান্ডক্যাপ খুলে ওকে নিয়ে চিড়িয়াখানার গেট দিয়ে ভিতরে ঢুকে যায় টয়লেটের খোঁজে। একটু দুরে গিয়ে টয়লেটে ঢুকে যায় ভবেশ আর বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে সেই কনস্টেবল।

মিনিট দশেক বাদেও যখন দেখা গেল ভবেশের পাত্তা নেই কনস্টেবলের সন্দেহ হয় আর সে দরজার উপর দিয়ে ভিতরে  উঁকি মারে। কিন্তু টয়লেট খালি ভিতরে কেউ নেই। উলটো দিকের জানালার শিকগুলি সব ব্যাকা করা, মানে ভবেশ ওখান দিয়েই পালিয়ে গেছে। টয়লেটের আসে পাশে চারিদিকে খুঁজেও ভবেশের আর কোন খোঁজ পাওয়া গেল না। কনস্টেবল ভ্যানে ফিরে এসে ইন্সপেক্টর সাহেবকে সব জানাল পর উনি নিজে গিয়েও সব দেখে শুনে বেশ বুঝতে পারলেন যে পাখী পালিয়ে গেছে। বাঁকিদের নিয়ে চলে গেলেন কোর্টের দিকে কিন্তু  লোকাল থানায় নির্দেশ দিয়ে গেলেন এসে পুরো চিড়িয়াখানা সার্চ করবার জন্য।

ভবেশ ইতিমধ্যেই ওর প্ল্যান মত টয়লেটের পিছনে দাঁড়ানো মলিনার হাত থেকে একটা বোরখা পড়ে নিয়ে নির্বিবাদে চড়িয়াখানা থেকে বেড় হয়ে ন্যাশনাল লাইব্রেরীর গেটে গিয়ে মলিনার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিল। মলিনা আসতেই দুজন অটোতে চেপে সোজা চলে আসে রবীন্দ্র সদন মেট্রো স্টেশন আর সেখান থেকে সোজা শোভাবাজার হয়ে বাড়ি পৌঁছয়। আধ ঘণ্টার মধ্যেই সবাই তৈরি হয়ে বেড়িয়ে পড়ে আর ভবেশ মলিনার উপর ছেলে মেয়ের দায়িত্ব দিয়ে ওদের পুরুলিয়ার উদ্দেশে  রওনা করিয়ে দেয়।

ভবেশ জানত পুলিশ এখন ওকে পাগলের মত খুঁজে বেড়াবে। সুতরাং প্রথমেই মলিনা, নোটন আর ঝিঙ্কিকে দেশের বাড়িতে পাঠিয়ে নিজে ভার মুক্ত হতে চাইছিল। এখন ওর সামনে একটাই লক্ষ্য আর সেটা হল বংশী লাল সিংকে খুঁজে বেড় করে ওর ব্যাপারে আরও খোঁজ নেওয়া এবং এবার উল্টে ওকে ফাসানো। এটা ওর জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ভবেশ তালতলায় ওর এক বহুরূপী বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে গা ঢাকা দিলো যাতে ধীরে সুস্থে ও ওর কাজ শুরু করতে পারে। ও নিজে একজন বহুরূপী হওয়ায় ওর কাছে এই কাজটা তেমন কঠিন বলে মনে হল না। ভবেশ এটাও ভালই জানত যে পুলিশের কাছে গিয়ে লাভ নেই, আগে ওকে সব প্রমাণ যোগার করতে হবে।

বড়বাজারে এম জি রোড আর চিতপুর রোডের ক্রসিং থেকে একটু দক্ষিন দিকে গেলেই বংশী লালদের কাপড়ের দোকান। প্রথম দিন মুখে দাড়ি লাগিয়ে আর মাথায় পাগড়ি বেঁধে পাঞ্জাবির বেশে ভবেশ গিয়ে দাঁড়াল সেই দোকানের ভিতর। উদ্দেশ্য বংশীর ব্যাপারে খবর নেওয়া। সেলস মানেরা ওকে ওর চাহিদা মত প্যান্টের পিস দেখাতে ব্যাস্ত হয়ে পড়ল। কিন্তু চারিদিকে চোখ বুলিয়ে বংশী লালকে দেখতে পেলনা ভবেশ। তবে এদের কথা বার্তায় বুঝতে পারল উনি শহরেই আছেন।

হোটেল সিমলা, মানে যেখানে ও বংশী লালের সাথে দেখা করেছিল, পরদিন সেখানে গিয়ে ভবেশ হানা দিলো কলকাতা পুলিশের সাদা পোশাকে ও মুখে চাপদাড়ি ও মাথায় টুপি পড়ে। গত শুক্রবার সকালে দশটা থেকে বারোটার মধ্যে হোটেলের রিসেপ্সনের উপরের সি সি টি ভি ফুটেজ চেক করল এবং ওদের বুকিং রেজিস্টার খাতাটাও চেক করল। সি সি টি ভিতে পরিষ্কার দেখা গেছে ভবেশ আর বংশী দেও একসাথে হোটেলে ঢুকেছে আর বংশী লাল সিং রেজিস্টারে সই করে ওদের ঘর ভাড়া ক্যাশে পেমেন্ট করছে।

সেদিনই ওই পুলিশ ইন্সপেক্টরের বেশেই গিয়ে ভোডা ফোন কোম্পানির শ্যাম বাজারের এরিয়া অফিস থেকে বংশী লাল সিঙের সেল ফোনের গত দশদিনের কল স্টেটমেন্ট প্রিন্ট কপি জুটিয়ে ফেলল ভবেশ। গত বৃহস্পতি বার দিন সন্ধ্যায় বংশী লালের সাথে ওদের বাড়ির সামনের বুথ থেকে ভবেশ ওর সাথে ফোনে কথা বলেছিল। স্টেটমেন্টে তারসাথে দুই মিনিট বত্রিশ সেকেন্ড কথা বলা রেকর্ডেড হয়ে গেছে।

এরপর ভবেশ সারা রাত ধরে আরও গভীর ভাবে চিন্তা করল যদি আর কোন সুত্র পেলে বংশী লাল সিংকে ভাল ভাবে ঘেরাও করা যায়। বোঝাই যাচ্ছে লোকটা মহা ধূর্ত আর ঘটনার দিন ভবেশকে কাজে লাগিয়ে দিয়ে ও কলকাতা ছেড়ে বেনারস চলে গেছিল। তাতে স্বাভাবিক ভাবেই ওর উপর কারও কোন সন্দেহ হবে না। কিন্তু ভবেশের কাছে এটা জীবন মরণ সমস্যা। ও এতো সহজে ছাড়বার পাত্র নয়।

সেদিনই মাঝরাতে ভবেশের ঘুম ভেঙ্গে যায় আর তারপর কিছুতেই ওর ঘুম আসছিলনা। বংশীর বাবা মোহন লালের ভয়ার্ত মুখটা বারবার ভেসে ভেসে আসছিল চোখের সামনে। ইস না জেনে শুনে কিভাবে ও নিরীহ লোকটাকে ভয় পাইয়ে একেবারে শেষ করে দিলো। ভদ্রলোক তার উইলে নিশ্চয়ই এমন কিছু লিখেছেন যাতে ওনার মৃত্যু হলে পর বংশী লাল সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে। না হলে এভাবে কেউ নিজের বাবাকে শেষ করে দেবার প্ল্যান করতে পারে ?

ভাবতে ভাবতেই হটাত ভবেশের মাথায় একটা প্রশ্ন ভেসে এলো। আচ্ছা, বংশী লাল কি করে জানলো যে ওদের দারোয়ান ঠিক রাত সাড়ে আটটায় কোন জরুরী কাজে কোথাও চলে যাবে ? তাহলে কি ওই দারোয়ান লোকটাও এর সাথে জড়িত, ও কি বংশী লালের খাস লোক নাকি ? না, এই ব্যাপারটা তো কেমন যেন খটমট লাগছে। কাল সকালে গিয়েই ওই দারোয়ানকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে।

পরদিন বেলা এগারোটা। বাড়ির সামনে আর কেউ নেই দেখতে পেয়ে পুলিশ ইন্সপেক্টর মিস্টার ঘোষালের ছদ্মবেশে ভবেশ এসে দাঁড়াল বংশী লাল সিঙের বেহালার সেই বাড়ির গেটে। মুখে মোটা ঘন গোঁফ, চোখে গগলস, মাথায় টুপি আর পড়নে সাদা পোশাক। বিহারি দারোয়ান ছোটন সিং তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়িয়ে স্যালুট করে ভবেশকে ভিতরে আসবার জন্য গেট খুলে দেয়। ভবেশ গেটের ভিতরে গিয়ে দাঁড়িয়ে একটু আশপাশটা দেখে নিয়ে বলে,”না না, আমি ভিতরে যাবনা। এখন তাড়া আছে। আমি এখান দিয়েই যাচ্ছিলাম। ভাবলাম একটা বিষয়ে তোমার সাথে কথা বলে যাই।“

“হা সাব, বলিয়ে ক্যা বাত হ্যায় সাব ?” ছোটন সিং আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞাসা করল পুলিশ বেশি ভবেশকে।

ভবেশ মুখে গাম্ভীর্য এনে জিজ্ঞাসা করল,”আচ্ছা যেদিন তোমার বড় সাহেব মারা যান ওই দিন রাতে তুমি কটার সময় ডিউটি শেষ করে বাড়ি গেছিলে মনে আছে ?”

“হা সাব। মনে আছে সাব। হামাকে রাত ঠিক সাড়ে আটটার সময় ছোট সাব বংশী লালজি ফোন করেছিল আর তাড়াতাড়ি উনার বন্ধু শর্মাজির ফ্ল্যাটে গিয়ে একটা খবর দিয়ে বাড়ি চলে যেতে বলেছিল সাব।“ ছোটন যেভাবে ঘটনার বিবরন দিল তাতে মনে হয় ও সত্যি কথাই বলছে।

কিন্তু ভবেশ আবার প্রশ্ন করল,”এই শর্মাজির ফ্ল্যাট এখান থেকে কত দুর ?”

ছোটন হেসে জবাব দেয়,”এই তো, বড় রাস্তার ওপারে একটা গলির ভিতরে ওনাদের মকান সাব।“

“বংশী লাল তোমাকে যে ফোন করেছিল তা কি খবর দিতে বলেছিল ওনার বন্ধুকে ?”

“বন্ধুকে না সাব। শর্মাজি তো বেনারস গিয়েছেন দুদিন আগে। ওনার স্ত্রী কে খবর দেবার ছিল। সাব বলেছিল ভাবিকে বলতে যে উনি রাতে ওনাদের বাড়িতে ডিনার করতে আসবেন। উনিতো  প্রায়ই যান ওখানে।“

ভবেশ বেশ বুঝতে পারছিল যে বংশী লাল লোকটার চরিত্রের দোষ আছে এবং গেট থেকে দারোয়ান কে সরানোর জন্যই ওকে পাঠিয়েছে বন্ধুর স্ত্রীকে খবর দিতে। সেল ফোনে খবরটা দিলেই তো চলতো। তার মানে এক ঢিলে দুই পাখি  শিকার। দারোয়ান ও গেট ছেড়ে সরবে আর বাবু তার রাত্রি বাসের ব্যাবস্থাও করবেন। তার মানে বংশী দেও আদৌ বেনারসে যান নি। সেই রাতে উনি কলকাতাতে বন্ধুর বাড়িতেই ছিলেন।

ভবেশ আর কথা বাড়াল না। ছোটন সিংকে শেষ প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করল,”তোমার চলে যাবার পর এখানে কে এসেছিল ডিউটিতে ? আর সে কখন এসেছিল জান ?”

এবার ছোটন উত্তেজিত হয়ে বলল,”নেহি সাব। ওটাই তো গণ্ডগোল হয়েছে। হামার পরেই পৌনে নটাতে মুন্নার ডিউটি ছিল। কিন্তু পনের মিনিটের ওই ফাঁকেই ওই ভালুক সাজা লোকটা দারোয়ান সেজে বাড়িতে ঢুকে সোজা উপরে চলে গিয়েছিল। তারপর ওকে আর কেউ দেখেনি সাব। হামি পড়ে জানতে পেড়েছি সাব। মুন্না কিছুই বুঝতে পারেনি সেদিন।  বাবু মারা যাবার পর সব জানা গেছে।“

ভবেশ ছোটন সিঙের সেল ফোন নম্বরটা টুকে নিলো আর বলল,”আমি যে তোমার কাছে এসেছিলাম আর এই সব আলোচনা করেছি তুমি কাউকে জানাবে না। আমি ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের অফিসার। এই কেসটা আমিই হ্যান্ডেল করছি। এখন একদম মুখ বন্ধ রাখবে।”

ছোটন সিং ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের অফিসার শুনে ঘাবড়ে গিয়ে বলল,”ঠিক হ্যায় সাব, নিশ্চিন্ত রহিয়ে।”

বন্ধুর বাড়ি ফিরে এসে বংশীর ফোনের স্টেটমেন্ট খানা ভাল করে চেক করতেই ওইদিন রাত সাড়ে আটটায় ছোটন সিঙের ফোন নম্বরে বংশী লালের নম্বর থেকে ফোন করার রেকর্ড স্পষ্ট দেখা গেল। ভবেশ গভীর চিন্তায় পড়ে গেল যে তাহলে বিকালের ফ্লাইটে বংশী বেনারস যায়নি ! ও ওর বন্ধু শর্মার বাড়িতে রাত কাটিয়ে পরদিন সন্ধ্যায় নিজের বাড়ি ফিরেছে। তার মানে শয়তান লোকটার ওই বেনারস যাবার গল্পটা একেবারে ডাহা মিথ্যা কথা। একমাত্র ওর দারোয়ান ছাড়া আর কেউই জানেনা ব্যাপারটা।

পরদিন সকালে এক অশীতিপর মাড়োয়ারি ব্যাবসায়ির ছদ্মবেশে ভবেশ পৌঁছে যায় লালবাজারে। হাতের বন্ধ প্যাকেটে ছিল বংশীর ফোনের দশ দিনের রেকর্ডের প্রিন্ট আউট। ওখানে গিয়ে খোঁজ খবর নিতেই বেড়িয়ে যায় কোন অফিসার বংশী লাল সিঙের বাবা মোহন লাল সিঙের খুনের কেসটা দেখছে তার নাম। নিজের পরিচয় বেনারস থেকে আসা সঞ্জীব আগরয়াল, সিল্ক শাড়ির ব্যাবসায়ি, জানিয়ে  তদন্ত কারি ইন্সপেক্টর মিস্টার সেনকে ভবেশ কিছু গোপন কথা জানাতে চায় অনুরোধ করতেই উনি আগে চেম্বারের দরজা বন্ধ করে জিজ্ঞাস করলেন,”বলুন আগরয়াল সাহেব। কি বলতে এসেছেন আপনি ?“

ভবেশ একটা ঘ্যারঘেরে গলার কাশি দিয়ে হাতের প্যাকেটখানা টেবিলের উপর রেখে গম্ভীর গলায় বলল, “সাহেব, আমি মোহনলালের ছোট বেলার বন্ধু। ওর ছেলে বংশী লাল একজন চরিত্রহীন লম্পট মানুষ আছে। ওর এই চরিত্রের কথা ওর বাবা মোহন লাল জেনে গেছিল এবং তাই তার উইল বদলাতে চেয়েছিল। আর একমাত্র এই কারনেই বংশী ওকে শেষ করে দিয়েছে সাহেব।“ আন্দাজে তীর খানা ছেড়ে দিল ভবেশ।

ভবেশের অনবদ্য অভিনয়ে আর বংশী লাল সম্পর্কে এই মারাত্মক তথ্য জেনে মিস্টার সেন চমকে উঠলেন। তার মানে ওই বহুরূপী লোকটা নির্দোষ ? “আপনি কি বলছেন মিস্টার আগরয়াল ? এটা কি করে সম্ভব ? আর ঘটনার দিন বংশী লাল তো বেনারসে চলে গিয়েছিল ? ওই বহুরূপী লোকটাই তো মোহনলালজিকে ভয় দেখিয়ে মেরে ফেলে আর তারপর হাতে নাতে ধরা পড়ে যায়।“

সঞ্জীব আগরয়াল মানে ভবেশ মাথা নাড়িয়ে চোখ বুজে বলে,”সাহেব, প্রথম কথা এই খুনের মোটিভ কি সেটা কি ভেবে দেখেছেন ?ওই লোকটা মোহন লালকে কেন খুন করতে যাবে ? আর আপনি কি নিশ্চিত আছেন যে বংশী লাল সত্যি সত্যি ওইদিন বেনারস গিয়েছিল ? বেনারসে গেলে ও বরাবর হামার বাড়িতেই উঁঠে। কিন্তু এবার ও বেনারস যায়নি, আমি খবর নিয়ে জেনেছি ও কলকাতাতেই ওর বন্ধু শর্মার বাড়িতে রাত কাটিয়েছে।“

মিস্টার সেন অবাক হয়ে প্রশ্ন করেন,”তাহলে ওই বহুরূপীটা এলো কোত্থেকে ? ও কেন মোহনলালজিকে খুন করতে গেল ? ওকে তাহলে কি কেউ লাগিয়েছে বলতে চান আপনি ?”

“ওই বেচারা বহুরূপীকে বংশী লাল ভাড়া করেছিল। আপনি গিয়ে সেন্ট্রাল এভেনুইয়ে হোটেল সিমলাতে গিয়ে শুক্রবার সকালের সি সি টিভি ফুটেজ ভাল করে দেখুন আর বংশীর ব্যাপারে খোঁজ নিন। এ ছাড়াও ওদের বাড়ির দারোয়ান  ছোটন সিংকে ভাল করে জিজ্ঞাসাবাদ করুন। তাহলেই সব জলের মত পরিষ্কার হয়ে যাবে।“ কথাটা বলেই উঠে দাঁড়াল ভবেশ। সাথে আনা বংশীর ফোনের রেকর্ডের প্রিন্ট খানা  ইচ্ছা করেই নিতে ভুলে গেল। আবার ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল,”হামি এখন যাচ্ছি মিস্টার সেন। বহুত কাম হ্যায় মেরা। আপনার একটা কার্ড দিন আমাকে, আপনাকে হামি পরে যোগাজোগ করব।“

হতচকিত মিস্টার সেন নিজেও উঠে দাঁড়িয়ে ওর দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে ছিলেন। উনি শুধু জিজ্ঞাসা করলেন,”একটা কথা বুঝতে পারছি না স্যার, ওই বহুরূপীটা তাহলে সেদিন চিড়িয়াখানা থেকে উধাও হয়ে গেল কেন ? ও যদি দোষী নাই হয় তাহলে পালিয়ে গেল কেন লোকটা ?”

ভবেশ চোখ বুজে শুধু হাসল আর বলল,”আরে ভাইসাব, যেই লোকটা হাতেনাতে ধরা পড়েও পালাবার সুযোগ পায় সে তো পালাবেই। পুলিশ কি করছিল ? দেখুন গিয়ে নিশ্চয়ই লোকটার কোন উদ্দেশ্য ছিল।“

ভবেশ মিস্টার সেনের হাত থেকে ওনার কার্ড নিয়ে বেড়িয়ে যায় আর সোজা লিফটের ভিতর গিয়ে দাঁড়ায়। ও জানে যে এর বেশি দাঁড়ালেই কথায় কথা বাড়বে এবং ওর ছদ্মবেশ ধরা পড়ে গেলেই ওকে পুলিশ আবার গ্রেফতার করে জেলে পুরে দেবে। এর চেয়ে দুরে থেকে সব কিছুর উপর নজর রাখা বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

এরপরের ঘটনা সংক্ষিপ্ত। পুলিশ সেদিনই তুলে আনে বংশী লালকে আর ভবেশের দেওয়া ইনফরমেশন আনুজায়ি হোটেল সিমলা থেকে সি সি টিভি ফুটেজ নিয়ে আসে ও দারোয়ান ছোটন সিঙের বয়ান রেকর্ড করে। ভবেশের ফেলে যাওয়া স্টেটমেন্ট চেক করে দেখে। মিসেস শর্মার কাছেও পুলিশ গিয়ে খোঁজ নিয়ে একটু চাপ দিতেই সত্যিটা বেড়িয়ে আসে যে বংশী লাল সেদিন ওনার বাড়িতেই রাত কাটিয়েছে।

মিস্টার সেন হোটেল সিমলাতে গিয়ে ও দারোয়ান ছোটন সিঙের বিবৃতি রেকর্ড করারা সময় জানতে পাড়ে যে আরেকজন ডিটেকটিভ পুলিশ অফিসার এই ব্যাপারে আগেই সব খোঁজ খবর নিয়ে গেছে। মিস্টার সেনের বুঝতে কষ্ট  হয়না যে বহুরূপী ভবেশেরই কাজ এসব। মনে মনে হাসে আর ওর এই প্রখর বুদ্ধির প্রশংসা করে। সঞ্জীব আগরয়াল উরফ ভবেশ বংশী লাল সিঙের গ্রেফতারের পরদিনই মিস্টার সেনকে ফোন করে ওনাকে অনেক ধন্যবাদ জানায়। নিশ্চিন্ত হয় যে এখন ওর আর কোন ভয় নেই,সমস্যা চুকে গেছে।

মিস্টার সেনের বুঝতে বাকি থাকে না যে এই মিস্টার আগরয়াল আর কেউ নয়, স্বয়ং ভবেশ এবং ও পালিয়ে গিয়ে বহুরূপী সেজে এসব কাণ্ড করে আসলে পুলিশকেই সাহায্য করেছে আসল অপরাধিকে ধরবার। মুচকি হেসে মিস্টার সেন বললেন, “মিস্টার আগরয়াল উরফ ভবেশ বাবু। অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। আর আপনাকে লুকিয়ে থাকতে হবে না। কাল আপনি আমার চেম্বারে আসুন। আপনাকে একটা বিশেষ পুরস্কার দেবার আছে আমার। আর আমাদের ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টে আপনার চাকরির ব্যাবস্থা করবো আমি। আজকের দিনে তদন্তের স্বার্থে আপনার মত বহুরূপী লোকই দরকার আমাদের।”

———-x———

* ছবি সৌজন্যে গুগুল।

গল্পের বিষয়:
রহস্য

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত