আবার যখের ধন (পর্ব ৯)

আবার যখের ধন (পর্ব ৯)

আসল পথ-চলা শুরু হয়েছে। সকলে দল বেঁধে চলেছে, কখনো বনের ভিতরে, কখনো পাহাড়ের কোলে, কখনো নদীর ধারে, কখনো মাঠের উপরে মাঝে-মাঝে একএকখানা নোংরা গ্রাম, তার কুঁড়েঘরগুলো যেমন নড়বড়ে আর ভাঙাচোরা, তার বাসিন্দারাও তেমনি গরিব ও শ্রীহীন। মাঝে মাঝে ধান ও আখ প্রভৃতির ক্ষেতও চোখে পড়ে। অনেক জায়গা দেখেই ভারতবর্ষকে মনে পড়ে।

পথে যেতে-যেতে কতরকম জানোয়ারই দেখা যায়! কোথাও উঠপাখির দল ঢ্যাঙাঢ্যাঙ পা ফেলে ছুটোছুটি করছে, কোথাও একদল জেব্রা মানুষ দেখেই দৌড় দিচ্ছে, কোথাও বেঢপ জিরাফ তার অদ্ভুত গলা বাড়িয়ে গাছের আগডাল থেকে পাতা ছিঁড়ে খাচ্ছে , তারপর মানুষের সাড়া পেয়েই ছুটে পালাচ্ছে !…এই জিরাফদের ছুটে পালাবার ভঙ্গি এমন বেয়াড়া যে, দেখলে গোমড়া-মুখো প্যাঁচারা পর্যন্ত না হেসে থাকতে পারবে না। এখানে গাছের উপর ব’সে বেবুন-বাঁদরের দল মানুষকে মুখ ভ্যাংচায়,নদীর জলে হিপোপটেমাসের দল সাঁতার কাটে ও বড় বড় কুমীরের দল কিলবিল করে এবং মানুষের দিকে মুখ তুলে যেন বলতে চায়- তোমরা দয়া করে একবার জলে নামো,আমাদের বড্ড খিদে পেয়েছে এখানে পায়ের তলায় ঘাসের মধ্যে থেকে সাপ ফোঁস করে ওঠে,রাত্রিবেলায় হায়েনারা চারিদিকে হা-হা করে হাসে, চিতাবাঘেরা তাঁবুর ভিতরেও বেড়াতে আসে এবং সিংহের দল কাছ ও দূর থেকে মেঘের ডাকের মতন এমন গম্ভীর গর্জন করে যে, অন্ধকার অরণ্য যেন শিউরে ওঠে এবং পৃথিবীর মাটি যেন থর্‌থর্‌ করে কাঁপতে থাকে।

মানিকবাবুর অশান্তির আর সীমা নেই! তার মতে এখানকার প্রত্যেক ঝোপই হচ্ছে কোন-না-কোন ভয়ঙ্কর জানোয়ারের বৈঠকখানা এবং প্রত্যেক গাছই হচ্ছে ভূত-প্রেতের আড্ডা! সন্ধ্যা হলেই তিনি রাম-নাম জপ করতে আরম্ভ করেন এবং পাছে কোন বদমেজাজি জন্তুর সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে যায়, সেই ভয়ে তাঁবুর ভিতর থেকে একবারও বাইরে উঁকি মারেন না ।

মাঝে-মাঝে কাতরমুখে বলেন, “বিমলবাবু, আমি তো আপনাদের কাছে কোন দোষই করি নি, তবে দেশ থেকে এখানে টেনে এনে কেন আপনারা আমাকে অপঘাতে মারতে চান?”

বিমল বললে, “মানিকবাবু, জানেন তো, কাপুরুষ মরে দিনে একশো বার করে, কিন্তু সাহসী মরে জীবনে একবার মাত্র।”

মানিকবাবু বললেন, “সাহসেরও একটা সীমা আছে তো? মরণকে যখন সামনে পিছনে ডাইনে বায়ে অষ্টপ্রহর দেখতে পাচ্ছি তখন ভয় না পেয়ে কী করি বলুন তো?”
–“মরণকে নিয়ে খেলা করুন, মরণকে দেখলে তাহলে আর ভয় পাবেন না!”
–“পাগলের সঙ্গে কথা কয়েও চলে যান।”

সেদিন বনের ভিতর দিয়ে চলতে চলতে হঠাৎ একটা কাফ্রিজাতীয় স্ত্রীলোকের মৃতদেহ পাওয়া গেল। তার দেহের নিচের অংশ নেই, উপর অংশও ভীষণরূপে বিক্ষত এবং তার মরা চোখদুটো ফ্যালফ্যাল করে আকাশের পানে তাকিয়ে আছে!

সেই ভয়াবহ দৃশ্য দেখেই মানিকবাবু ‘আঁ’ বলে আঁৎকে উঠে উন্মত্তের মতন দিগ্‌বিদিক জ্ঞান হারিয়ে বনের ভিতরে ছুটে পালিয়ে গেলেন।

কুমার মৃতদেহের দিকে চেয়ে বললে, “সিংহের কীর্তি।”
বিমল বললে, “হু। সিংহটা বোধহয় আমাদের সাড়া পেয়ে শিকার ছেড়ে বনের ভেতর গিয়ে লুকিয়েচে।”

রামহরি বললে, “কিন্তু মানিকবাবু যে ঐ বনের ভেতরেই গিয়ে ঢুকলেন!
—“ওকে ডেকে নিয়ে এস রামহরি, নইলে বিপদ।”

বিমল মুখের কথা শেষ হবার আগেই শোনা গেল, বনের ভিতর থেকে মানিকবাবু চিৎকার করে বলছেন, “গেলুম, গেলুম — বাঁচাও আমাকে বাঁচাও।

বিমল, কুমার, রামহরি ও আস্কারি বা সশস্ত্র কুলির দল তখনই বনের ভিতরে ছুটে গেল এবং খানিক পরেই যে দৃশ্য দেখা গেল এই – মানিকবাবু একটা গাছের মাঝ -বরাবর উঠে প্রাণপণে চ্যাঁচাচ্ছেন এবং ঠিক তাঁর মাথার উপর একটা ডালে বসে একটা বেবুন বাঁদর মুখ খিচিয়ে তাঁকে অনবরত ধমক দিচ্ছে এবং নীচে দাঁড়িয়ে একটা প্রকাণ্ড গণ্ডার গাছের গুড়ির উপরে বারবার খড়গাঘাত করছে। মানিকবাবুর অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় – তিনি না পারছেন উপরে উঠতে, না পারছেন নিচে নামতে ।

একসঙ্গে অনেকগুলো বন্দুকের গুলি খেয়ে গণ্ডারটা তখন মাটির উপরে পড়ে গেল এবং বেবুনটাও একলাফে অন্য গাছে গিয়ে প্রাণ বাঁচালে। তারপর সকলে মিলে মানিকবাবুকে প্রায় মরো মরো অবস্থায় গাছের উপর থেকে নামিয়ে আনলে ।

এবং সেই রাত্রেই আর-এক ব্যাপার! সেদিন আহারের ব্যবস্থা ছিল কিছু গুরুতর। কুমার মেরেছিল দুটো বুনো হাঁস এবং বিমল মেরেছিল একটা হরিণ। কাজেই সারাদিনই আজ রামহরির হাত জোড়া। কি আমিষ কি নিরামিষ রন্ধনে সে ছিল অদ্বিতীয় এবং রান্নাবান্নায় যত বেশি সময় পাওয়া যায় সে হত তত বেশি খুশি।

রাত্রিবেলায় রামহরি এসে যখন সুধোলে, “খোকাবাবু, খাবার দেব কি?” বিমল তখন জিজ্ঞাসা করলে, “তোমার আজকের রান্নার ফদ্দটা কি শুনি?”

রামহরি বললে, “চপ, কাটলেট, কোপ্তা, রোস্ট, আলুমাকাল্লা আর লুচি। একটা চাটনিও আছে।”

কুমার খুশি হয়ে হাততালি দিয়ে বললে, “রামহরি, তুমি অমর হও! তোমার দয়ায় আমরা বনবাস করতে এসেও স্বৰ্গ খুঁজে পেয়েছি!”

মানিকবাবুর জিভ দিয়ে জল গড়াতে লাগল! লম্বা একটা আরামের নিঃশ্বাস ফেলে তিনি বললেন, “আহা, রামহরি, কি মধুর কথাই শোনালে। আজ দিনের বেলাটায় বেবুনের মুখ খিঁচুনি আর গণ্ডারের তাড়া খেয়ে প্রায় মরো-মরো হয়ে আছি, এখন দেখা যাক্‌, রাতের বেলায় তোমার হাতের অমৃত খেয়ে আবার ভালো করে চাঙ্গা হয়ে উঠতে পারি কিনা!”

বিমল বললে, “রক্ষে করুন মানিকবাবু, আপনি আরো ভালো করে চাঙ্গা আর হবেন না! আফ্রিকায় এসে আপনার ভুঁড়ির বহর দুগুণ বেড়ে গিয়েছে, সেটা লক্ষ্য করেছেন কি?”

মানিকবাবু মুখ ভার করে বললেন, “আপনারা যখন-তখন আমার ভূঁড়ির ওপরে নজর দেন । এটা আমি পছন্দ করি না।”

বিমল হেসে বললে, “কিন্তু আপনার ভুঁড়ি যদি এভাবে বাড়তেই থাকে, তাহলে আফ্রিকার প্রত্যেক সিংহের নজর আপনার ওপরে পড়বে, সেটা আপনি ভেবে দেখছেন কি?”

মানিকবাবু চমকে উঠে বললেন, ‘ও বাবা, বলেন কি?”

—“হ্যাঁ । মানুষরা যখন মোটা পাঁঠা খোঁজে, তখন সিংহরাও নধর চেহারার মানুষ খুঁজবে না কেন?”

মানিকবাবু ম্রিয়মাণ কণ্ঠে বললেন, “খাওয়ার কথা শুনে আমার মনে যে আনন্দ হয়েছিল, আপনার কথা শুনে সে আনন্দ কর্পূরের মত উবে গেল…… বিমলবাবু আফ্রিকায় আমাদের আরো কতদিন থাকতে হবে?”

বিমল বললে, “এই তো সবে কলির সন্ধ্যে! আপাতত আমরা যেখানে আছি, এ জায়গাটার নাম হচ্ছে, ট্যাবোরা। এখান থেকে উজিজি আরো কিছুদিনের পথ। পথের বিপদ এড়িয়ে আগে উজিজিতে গিয়ে পৌঁছোই, তারপর অন্য কথা। আমাদের আসল অ্যাডভেঞ্চার শুরু হবে উজিজি থেকেই।”

—“আসল অ্যাডভেঞ্চার, মানে তো আসল বিপদ? অর্থাৎ আপনি বলতে চান তো, যে, উজিজিতে গিয়ে পৌছোবার পরে প্রতিক্ষণেই আমাদের প্রাণ নিয়ে টানাটানি হবে?”

—“হ্যাঁ।”

—“কেন? ঘটোৎকচ তো আর আমাদের পিছনে নেই!”

কুমার বললে, “এখন নেই বটে, কিন্তু দুদিন পরে নিজের ভ্রম বুঝতে পারলেই আবার সে আমাদের সঙ্গে আলাপ করতে আসবে।”

মানিকবাবুর মুখের ভাব যেরকম হল, সেটা আর বর্ণনা না করাই ভালো।

আচমকা কুমারের ঘুম ভেঙে গেল। ঘুমের ঘোর কাটবার আগেই সে বেশ বুঝতে পারলে, তার মুখের উপরে কার উত্তপ্ত শ্বাস পড়ছে। সে শ্বাসে কী দুর্গন্ধ!

খুব সন্তর্পণে আড়চোখে চেয়ে দেখলে, অন্ধকার তাঁবুর ভিতরে কার দুটো বড় বড় চোখ দপ্‌দপ্‌ করে জ্বলছে।

উত্তর নিঃশ্বাসটা তার মুখের উপর থেকে সরে গেল । কুমার অত্যন্ত আড়ষ্ট হয়ে শুয়ে রইল—কারণ, একটু নড়লেই মৃত্যু নিশ্চয়। জ্বলন্ত চোখ দুটো যে তার পানেই তাকিয়ে আছে, এটাও সে বেশ বুঝতে পারলো।

বাইরে বনভূমি তখন ঘনঘন সিংহের গর্জনে কেঁপে কেঁপে উঠছে। চারিদিক থেকে আরো যে কতরকম চিৎকার শোনা যাচ্চে তা বলবার নয়। মানুষেরা ঘুমোচ্ছে, কিন্তু তাদের শক্ররা এখন জাগরিত ।

এ তাঁবুর ভিতরে বিমল আর মানিকবাবুও গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন কিন্তু এখন কাউকে সাবধান করারও সময় নেই।

তাঁবুর ভিতরে এই সময়ে কার আবির্ভাব হল? এ মানুষ না কোন হিংস্র জন্তু?

এ ঘটোৎকচ নয় তো? সে কি এখনি তার ভ্রম বুঝতে পেরেছে?

কিছুই বুঝবার উপায় নেই। যে শত্রু তাদের গ্রাস করতে এসেচে অন্ধকার তাকে গ্রাস করেছে। কেবল দুটো প্রদীপ্ত চক্ষু এদিক থেকে ওদিকে যাচ্ছে আর আসছে-যাচ্ছে আর আসছে। সে যেন অন্ধকারের চক্ষু। মায়াহীন উপবাসী চক্ষু, তারা যেন বিশ্বকে পুড়িয়ে ভস্ম করে দিতে চায়!

আচম্বিতে কী একটা শব্দ হল। একটা কি ভারী জিনিস পড়ার শব্দ….

কুমার আর থাকতে পারলে না, এক লাফে উঠে বসে পাশ থেকে বন্দুকটা তুলে নিয়ে চেচিয়ে উঠল, “বিমল, বিমল!”

সঙ্গে সঙ্গে বিমলের গলা পাওয়া গেল, “কী হয়েছে কুমার, কী হয়েছে?”

—“ঘরের ভেতরে কে এসেছে?”

পরমুহুর্তে বিমলের টর্চ জ্বলে উঠল। কিন্তু কৈ, ঘরের ভেতরে তো কেউ নেই!

বিমল বললে, “এ কি! মানিকবাবু কোথায় গেলেন?”

কুমার বিস্মিত চক্ষে দেখলো, তাঁবুর ভিতরে মানিকবাবু নেই, তার বিছানাও নেই।

 

আরো গল্প পড়তে লিংক এ ক্লিক করুন……

আবার যখের ধন (পর্ব ৮)

আবার যখের ধন (পর্ব ১০)

গল্পের বিষয়:
রহস্য

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত