আলোক রহস্য সন্ধানে

আলোক রহস্য সন্ধানে

(প্রথমেই বলে নিই । গল্পটি একটু বড় তাই এক্ষেত্রে আমরা গল্পটিকে কয়েকটি পর্বে ভেঙে আপনাকে শোনাব । ঘটনাতে সুন্দরবনের স্থানীয়দের অলৌকিক বিশ্বাসের দিকটির পাশাপাশি আমরা ফিরে যাব সুন্দরবনের কিছু অজানা ইতিহাসের পাতায় , যা হয়ত অনেকেরই অজানা । ঘটনার শুরুতে আমি দূরসম্পর্কের এক দাদু প্রবীন বসুর মুখে শোনা ওনার জীবনের একটি ঘটনার উল্লেখ করলাম ।)

শীতের রাত্রি । খোলা নদীর উপর শন শন করে হিমেল হাওয়া পুলওভার ভেদ করে হাঁড়ে কাঁপুনি ধরিয়ে দিচ্ছে । দুপাশে জঙ্গলে চাপ অন্ধকারে মিশে গিয়ে এক বিভীষিকার ছদ্মবেশ নিয়েছে । অন্ধকার কালো নদীর উপর কয়েকটা ফ্লোটিং বোট অন্ধকারে মিশে রয়েছে । শ্যেনপক্ষীর মতো তাদের দৃষ্টি সজাগ । অন্ধকারে তাদের চোখ সয়ে গেছে । এখান তাদের অপেক্ষার পালা । জায়গাটা রায়মঙ্গল নদী আর ইচ্ছামতী নদীর কেন্দ্রস্থল । এই ইচ্ছামতী নদীর এপারে ভারত আর ওপরে বাংলাদেশ । আর এই দুটি নদী এক আন্তর্জাতিক বিভাজন রেখা, যার না আছে কাঁটা তার, না প্রচীর । কেবলমাত্র রয়েছে সজাগ দৃষ্টির অনন্ত পাহাড়া । দুপুর নাগাদ উড়ো খবর এসেছে , বাংলাদেশ থেকে সুন্দরবন সীমান্ত হয়ে ইচ্ছামতী পেরিয়ে এপারে আসতে পারে ওরা । সঙ্গে আগ্নেয়াস্ত্র থাকা অসম্ভব কিছু নয় ।

কিন্তুু রাতের আঁধারে চোখ জ্বেলে হাতে নাতে ওদের ধরার বেশ দক্ষতার প্রয়োজন, বি.এস.এফ -এর ডি.আই.জি প্রবীণ বসু এ ব্যাপারে বেশ সজাগ । গভীর রাতেও চোখের পাতা ফেলার জো নেই তার । অন্ধকারে চোখ ছাড়াও অন্যান্য ইন্দ্রীয়গুলোকেও সজাগ রাখতে হয় । পাশের গভীর জঙ্গলে গাছ ভাঙার শব্দে চমকে সতর্ক হচ্ছেন প্রতি মূহুর্তে। আসলে এদের দলের লোকজন মাঝে মাঝে এইসব বনেও ঘাপটি মেরে থাকে । পুলিশ দুষ্কৃতীদের উপর চড়াও হলেই ওরা পাল্টা চালায় পুলিসদের উপর । তাই এই বাড়তি সতর্কতা । সময় কাটে, রাত গভীর থেকে গভীরতর হয়। নৌকায় নদী ভাটার জল বিঁধে কল কল শব্দ , অপেক্ষার ঘড়িতে নতুন করে দম দেয় । ঠিক সেই সময়ই হঠাৎ চিৎকারটা প্রথম শুনতে পান প্রবীণ বাবু । প্রথমটাই বেশ তীক্ষন । তারপর তা যেন চাপা গোঙ্গানিতে পরিনত হল । পশ্চিমের জঙ্গলটার দিক থেকে আরো একবার । আর শেষবার । তারপর সব নিশ্চুপ । এই জনহীন শূন্য প্রান্তরে এমন করুন মরন আর্ত চিৎকার করে ? – উত্তর পেতে তাদের অপেক্ষা করতে হবে ভোরের আলোর ।

ভোরের আলো ফুটতেই প্রবীণ বাবু দুটো ফ্লোটিং বোর্ট পাঠিয়ে দিলেন নদীর পশ্চিম দিকটার জঙ্গলে । নদীর কাদা পাড়ে পেড়িয়ে ম্যানগ্রোভের বিশ্রী ফলার মতো শিকড়-বাকড় টপকে পাঁচ-জনের একটা দল বনের গভীরে ঢুকে পড়ল । তারপর মিনিট-দশেক চুপচাপ ।কোনো শব্দ নেই । এক নাম না জানা পাখি বিশ্রী শব্দ করে মাথার উপর দিয়ে উড়ে গেল । ঠিক তারপরই প্রবীণ বাবু দেখলেন ওরা একটা বডি ধরাধরি করে তুলে আনছে বোর্টে । ওদের বোর্টটা কাছে আসতেই একজন বি.এস.এফ জাওয়ান চেঁচিয়ে বললেন– ‘মর গায়া সাব । লেকিন শের নে নেহি মারা।

প্রবীণ বাবু তখন একদৃষ্টে তাকিয়ে রয়েছেন ডেডবডিটার দিকে । সাদা ফ্যাকাশে চেহারা, বুক থেকে পা অবধি কাদায় মাখামাখি , সম্ভবত নীচু জলায় পড়ে গিয়ে থাকবে । কিন্তুু সবচেয়ে আশ্চর্য যেটা, লোকটার গায়ে বা শরীরের কোনো জায়গায় একটু জখমের আঁচড় নেই । তাহলে এ মরলো কি করে?

বডি হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হল । ডাক্তার চেক করে রিপোর্ট দিলেন – ‘ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক ‘ । প্রবীণ বাবু শুধু মাথা নাড়লেন । কিন্তুু খটকাটা কাটিয়ে উঠতে পারলেন না । হার্ট অ্যাটাক -ই যদি হয় তবে ওভাবে কেউ চিৎকার করে ! সে চিৎকার মোটেই স্বাভাবিক নয় । বাঘ বা ওই জাতীয় কিছু দেখে থাকলে মানুষ এধরনের চিৎকার করবে সেটা স্বাভাবিক । কিন্তুু বাঘ হলে মরা নিয়ে গেলনা কেন? উত্তর গুলো মোটেই সুবিধার নয়, বরং সুন্দরীর শিকারী শিকড়ের মতোই গভীর, অভেদ্য, অলৌকিক ।

প্রবীণ বাবু অনেকদিন হলো রিটার্ড করেছেন । এখন অবসারে গল্প – কবিতা – লেখালেখি নিয়ে থাকেন । আমার দূর সম্পর্কের দাদু হন। আমি ভূত – তত্ত্ব নিয়ে কাজ শুরু করেছি শোনার পর বেশ উৎসাহিত হয়েই নিজের জীবনের এই অলৌকিক ঘটনাটি আমায় শোনান । তখন আমি কলকাতার জায়গাগুলোকে নিয়ে লেখালেখি করেছি । সুন্দরবন নিয়ে তখনও কিছু পড়িনি । জ্ঞানও নেই এ ব্যাপারে । তবে ঘটনাটা আমায় বেশ ভাবিয়ে তুলেছিল । সুন্দরবন নিয়ে বেশ কয়েকটা বই এনে পড়লাম । ইন্টারনেটও ঘাটলাম বিস্তর । তারপর বেশ কয়েকটা গুরুত্বপূর্ন ঘটনা পেলাম । স্থানীয়দের বিশ্বাস কিংবা কুসংস্কার যাই হোক না কেন, ঘটনাগুলো বেশ রোমহর্ষক । তাই ভাবলাম লিখেই ফেলি । যাদের রহস্য ভালো লাগে, তা অনায়াশেই সঙ্গী হতে পারেন আমার ।

সুন্দরবন । আসলে আমারা সুন্দরবন বলতে যতটা জানি বা বুঝি কিংবা আমারা যতটা ঘুরে দেখার সুযোগ পাই তা আদতে সুন্দরবনই নয় । বরং বন শুরু হবার আগের লোকবসতি কিংবা রিসার্ভ ফরেস্টটুকু । এর বাইরে যে সুন্দরবন আমাদের জ্ঞানচক্ষুর অন্তরালে রয়ে যায় তা গভীর, অমিমাংশীত এবং রহস্যের আদিম চরাচরভূমি । গ্রামের কেউ কেউ সেই সব বনের গভীরে মোম-মধু সংগ্রহ করতে যান । অনেক সময় তারাই সে সব অদ্ভুত ঘটনার সাক্ষী হন এবং লোকমুখে তা ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বাসের শিকড় গড়ে তোলে । আপনি হয়তো ভাবছেন বাঘ কিংবা কুমির । কারণ ওই যে আমাদের জ্ঞানের খাতায় রয়েছে, ‘জলে কুমির ডাঙায় বাঘ–

রহস্যের গন্ডি এখানেই কুপকাত । রহস্য আরো জটিল । বাঘ কিংবা কুমির তো পার্থিব । ধরুন তারা এমন কিছুর সম্মুখীন হলো যা আদতে পার্থিব নয় । রাতের আঁধারে গভীর জঙ্গলে জলাভূমির মাঝে জ্বলতে থাকা মরনদীপ্তি যা মানুষকে টেনে নিয়ে যেতে পারে মৃত্যুপুরীর হিমশীতলতায় । স্থানীয়দের ভাষায় এ হল ‘আলেয়া ‘ । সুন্দরবনের অনেকেই একে আলেয়া ভূত নামেও ডেকে থাকে থাকে । আপনি এসব শুনে বলবেন – ‘ কি ভুলভাল বলছেন, বিঞ্জানের পরিভাষায় এ হল মিথেন গ্যাস, পচা জলাভূমিতে অক্সিজেনের সংস্পর্শে জ্বলে ওঠে। ‘ হ্যাঁ, জানি । কিন্তু আপনি স্থানীয়দের এই বিশ্বাসের পিছনের ইতিহাসটি জানেন ? না জানলে এই রহস্যের ষোল আনাই আপনার কাছে বৃথা । কারন রহস্যের আসল স্বাদ তো ইতিহাসের পাতায়, রহস্যের অজানা তথ্যের গোড়ায় , অন্ধকারের ঠিক পাশেই , আপনার বিচার ক্ষমতা থেকে সহস্র ক্রোশ দূরে এক আলাদা জগতে ।

প্রাচীন অবিভক্ত বিস্তৃত সুন্দরবন অঞ্চল , আজকের চেয়ে অনেকে বেশী গভীর, অভেদ্য ও রহস্যময় । আমি বলছি আজ থেকে প্রায় ৪০০ বছর আগেকার কথা, তখন ভারত-বাংলাদেশ বুক চিরে সুন্দরবনকে ভাগ করে ফেলেনি । ব্রহ্মপুত্র, পদ্মা, মেঘনার ছড়ানো নদীজালে এই বিশাল ম্যানগ্রোভ বনভূমি অঞ্চল তখন তার আদিম রূপ নিয়ে লুকিয়েছিল লোকচক্ষুর আড়ালে । তবে সুন্দরবনের বেশ কিছু দ্বীপে তখন লোকবসতি ছিল, ছিল রাজত্ব । আর ছিল আঁধারের মতো কালো অভিশাপও । ৪০০ বছর আগের সেই দিনটা ছিল অন্যান্য দিনগুলোর চেয়ে একদম আলাদা । রাজা সুতোঞ্জয়ের সুযোগ্য পুত্র অলোঞ্জয়ের রাজ্যাভিষেক হবে । তার আগে তার সামনে এক যোগ্যতার পরিক্ষা । রাজপরিবারের নিয়ম, সাম্রাজ্যের শাসককে তার অকুতভয় দৃঢ়তা আর অদম্য সাহসের পরিক্ষা দিতে হবে । অলোঞ্জয় সাহসী । ছোটবেলা থেকেই দাপিয়ে বেড়িয়েছে সুন্দরবনের গভীরে মাঝি-

মল্লারদের সাথে । মা কামিনীদেবী ছেলের এই দস্যিপনা রুখতে ছেলেকে ঘরবন্দি করে রাখার সিদ্ধান্ত নিলেন । কিন্তু তাতে কি চলে ! রাজপরিবারের রাজপুত্র সে, প্রজাদের কল্যানে তাকে যে ছুটে যেতেই হবে জঙ্গলের গভীরে । বিপদ থাকলেও, নিজ বুকে তা আগলে , সুনিশ্চিত করতে হবে প্রজাকল্যান । আজ সেই দস্যি ছেলেই এই সুবিশাল জঙ্গল সাম্রাজ্যের আগামী শাসক । তাকে তো যোগ্যতার পরিক্ষায় ঝাপিয়ে পড়তেই হবে । পরিক্ষার শর্ত এই –

রাজকুমারকে একলা, কেবল তার তীর দিয়েই হত্যা করতে হবে জঙ্গল সাম্রাজ্যের সবচেয়ে কালো অভিশাপ রয়েল-বেঙ্গল বাঘকে । হিংস্র, সুবিশাল এই পার্থিব দানবের মুখোমুখি দাঁড়াতে যে কারোর বুক কাঁপে । রাতের আঁধার হোক কিংবা দিনের আলোয়, কত মানুষকে জঙ্গলের গভীরে টেনে নিয়ে গেছে এই বিশাল দানব তার ইয়ত্তা নেই । আজ রাজকুমার অলোঞ্জয়কে সেই দানব বধ করেই দিতে হবে রাজ্যাভিষেকের যোগ্যতার পরিক্ষা ।

কিন্তু রাজকুমার নির্ভক । মূহুর্তে সে নিজের বজরা নিয়ে বেড়িয়ে পড়ল খাল পেড়িয়ে মূল নদীর দিকে । তার লক্ষ্য পশ্চিমের ঘন জঙ্গল , সুন্দরবনের ত্রাস রয়েল বেঙ্গল বাঘের অধিকৃত সাম্রাজ্যভূমি । বিকেলের শেষ সূর্যকে তখন ঢেকে দিয়েছে কোন এক আতঙ্কের কালো মেঘ । বজরায় অলোঞ্জয়ের সাথে তার কয়েকজন সঙ্গী ছিল । তবে তারা নিরস্ত্র ।

রাজপরিবারের নিয়ম, বাঘ রাজকুমারকে একলাই বধ করতে হবে । হঠাত বনের মাঝে এক বিকট বজ্রপাতের শব্দ । প্রলয় আসন্ন । জঙ্গল আগের চেয়ে আজ বড্ড বেশী শান্ত । যেন লুকিয়ে গভীর কোন ষড়যন্ত্র চলছে । আকাশের কালো মেঘ ভেঙে বৃষ্টি নেমে আসবে কিছুক্ষনের মধ্যে । আঁধার নামলে ঝাপসা হয়ে আসবে চারপাশ । তখন শিকারের নিশানা করা মুশকিল । রাজকুমারের বজরা দ্রুত এগোতে লাগল গভীরে জঙ্গলে নদীর পাড়ের দিকে। হঠাত সবার যেন চোখ ঝলসে গেল এক হলদে আলোর ছটায় । ওটা কি ?! বজরার সবাই সজাগ … স্থির … নিশ্চুপ।

রাজকুমার হাতের ধনুকটা শক্ত করে চেপে ধরলেন । তার চোখের পলক পড়ছে না । বাকিরা তখনও আগের মতই হতবুদ্ধি হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে । তারা সামনে একি দেখছে ! নদীর পাড়ে জলে মুখ নামিয়ে ধীরভাবে জল পান করছে এক বিশাল রয়েল বেঙ্গল বাঘ , তার ঠিক পাশেই তার ছোট্ট শাবকটি । বজরায় রাজকুমারের পাশেই দাঁড়িয়েছিল তার বাল্যবন্ধু দেববর্মা । আলতো করে মুখ নামিয়ে রাজকুমারের কানে কানে বললে – ‘ এতো উজ্জ্বল হলুদ বাঘ আগে দেখেছো তুমি ? ‘ রাজকুমার আগের মতোই ধীর-স্থির । তিনি ধৈর্যশীল । একদৃষ্টে লক্ষ্যস্থির করে শিকার করাই তার মূল লক্ষ্য । তার চোখে শিকারীর মতো জলন্ত অভিপ্রায় । শিকারীর শিকারের প্রতি তীব্র আকর্ষনবোধ । বেশ খানিক্ষন সব চুপচাপ । বাঘিনীর জল খাওয়ার ছলাৎ ছলাৎ শব্দ যেন জঙ্গলের গভীরে ধ্বনিত হয়ে আসন্ন আবহকে আরো রোমাঞ্চকর করে তুলছে । তারপর হঠাত বাঘিনীর তীব্র গর্জনের শব্দ । একবার নয় দুবার , তিনবার , আর শেষবার । গর্জন ধীরে ধীরে ব্যর্থ গোঙানিতে পরিনত পরিনত হল তারপর একটা বিশাল দেহের লুটিয়ে পড়ার শব্দ ।

তীরবিদ্ধ বাঘিনীটি লুটিয়ে পড়ল তার শাবকের ঠিক পাশেই । ছোট্ট শাবক কিচ্ছু বুঝতে না পেরে তার মায়ের মৃতদেহটি ঘিরে পাক খেতে লাগল । সে কখনও তার মুখ চাটে আবার কখনও তার ছোট্ট থাবা দিয়ে সেই বিশাল নিথর শরীরটা নাড়াবার চেষ্টা করে । শিশু শাবকটি তখনও মাতৃদুগ্ধ ছাড়েনি । সে ক্ষুধার্ত । মৃতদেহটির আশেপাশে হতবুদ্ধি হয়ে ঘুরে বেড়াতে লাগল । আর ঠিক তখনই ছন্দপতন । একটা তীর এসে বিঁধলো তার গলায় । এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে লুটিয়ে পড়ল শাবকটি । দুটি মৃতদেহ বুকে আগলে সুন্দরবনের নিঝুম প্রান্ত অপেক্ষা করতে লাগল… প্রতিশোধের ।
আজকের প্রবীন স্থানীয়রা বলেন , এ গল্প তারাও তাদের পূর্বপুরুষদের মুখে শুনে বড় হয়েছে । তারা এও বলেন, রাজকুমার অলোঞ্জয়কে তার সাম্রাজ্যের প্রজারা ‘ আলোর দূত ‘ রূপে দেখতেন । তিনি যে সাক্ষাত মৃত্যুকে বধ করে তাদের জীবনে আলো এনে দিয়েছেন । আর সেই থেকেই প্রজাদের মনে-সম্মানে তিনি হয়ে উঠেছিলেন – ‘ আলেয়া ‘ অর্থাৎ তাদের আলোর দূত । কিন্তু কথায় বলে আলোর ঠিক পিছনেই থাকে গাঢ় অন্ধকার , যা মৃত্যুর মতোই শীতল । আর সেই শীতল অন্ধকার মৃত্যুই যে সেই পশ্চিমের জঙ্গল প্রান্তরে অপেক্ষা করেছিল তার আগামী গ্রহনের । রহস্যে ঘেরা সুন্দরবন যে আলো চায়না । আদিম শীতল আঁধারই যে তার কাঙ্খিত অধিকার , সে তা অর্জন করে নেবেই । আর হলও তাই …

অনেক সময় আমাদের যুক্তি-বুদ্ধি-বিচার বিশ্লেষণের বাইরে আমাদের দেখা লৌকিক জগতের বাইরেও একটা স্বতন্ত্র জগৎ রয়েছে এবং যাদের চেতনাশক্তি সেই সূক্ষ্ম জগতের অনুভূতির শীতলতা স্পর্শ করতে পারে , তারা মানেন, তারা বিশ্বাস করেন – ‘ Strange is stranger than truth. ‘

আজ থেকে ৪০০ বছর আগের ইতিহাসের গল্প শোনাচ্ছিলাম আপনাদের । সুন্দরবনে লোকমুখে প্রচলিত এক রাজপরিবারের গল্প । রাজকুমার আলোঞ্জয় নরশিকারী কুখ্যাত রয়েল বেঙ্গল বাঘকে হত্যা করে তার রাজ্যে আলো নিয়ে এসেছেন । এখন জেলেরা নিশ্চিন্তে বনের গভীরে তাদের নৌকা নিয়ে মাছ ধরতে যেতে পারে । মধু সংগ্রাহকদের সুস্বাদু বন্য মধু বন থেকে বয়ে আনতে আর জীবন হাতে নিয়ে যেতে হবে না । প্রজাদের ‘ আলোর দূত ‘ যে অচিরেই তাদের বনভূমির স্বর্গ রাজ্যের রক্ষাকর্তা হয়ে উঠলেন, তা বলাই বাহুল্য । কিন্তুু ওই যে বলেছিলাম না – আলোর ঠিক পিছনেই থাকে গাঢ় অন্ধকার , যে মৃত্যুর মতোই শীতল । তার সেই অন্ধকারের মধ্যেই ছিল আগামীর অভিশাপের এক অন্ধকার মৃত্যুকূপ । আলোঞ্জয়ের রাজ্যভিষেকের দুদিন পরের ঘটনা ।

এই ঘটনাই সেই রাজপরিবারের এতোদিনের গৌরবোজ্জ্বল আলোকদিপ্তি যেন এক লহমায় ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে দিয়েছিল । রোজ রাতের মতোই সেদিনেও রাজকুমার থুরি , নব অভিষিক্ত রাজা আলোঞ্জয় রাতের খাওয়া শেষ করে নিজের রাজকক্ষ শয়নের জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন । হঠাৎ রাজগুরু কক্ষের বাইরে এসে রাজাকে জরুরি কারনে একবার সাক্ষাৎ করতে বললেন । রাজা প্রথমটায় বেশ অবাকই হলেন । এভাবে এতোরাতে হঠাৎ কেন ডেকে পাঠালেন রাজগুরু । তিনি অযথা সময় ব্যয় না করে কক্ষের বাইরে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে এলেন । প্রসাদের বারান্দায় সাজানো প্রদীপের কয়েকটা তখন নিভে গেছে । সন্ধে থেকে দুপুরের গুমোটভাবটা কেটে গিয়ে একটু একটু হাওয়াও বইছে । রাজগুরু এককোনে একটা প্রদীপের পাশে দাঁড়িয়ে । তাঁর মুখ কম্পমান প্রদীপের শিখায় এক আলো -আধাঁরি দীপ্তি । তার মুখখানি কেমন যেন থমথমে । রাজাকে দেখে তার ঠোঁট কাঁপে ।

তিনি যেন কিছু বলতে চেয়ে তা বলতে ঠিক সাহস জুগিয়ে উঠতে পারছেন না । যেন কিসের একটা অদৃশ্য ভয় । শুধু তাকে নয় রাজকক্ষের বাইরে সারা বারান্দা জুড়ে । খোলা প্রান্ত দিয়ে তখনও শনশন হাওয়া বারান্দায় ঢুকে আসছে । দুটো প্রদীপের উজ্জ্বল শিখা কয়েক মিনি্ট ব্যর্থ কাঁপার চেষ্টা করে শেষটায় অন্ধকারে মিলিয়ে গেল । রাজা এবার প্রশ্ন করলেন – ‘ রাজগুরু আপনি জানেন নিশ্চয়ই আমি মানষিকভাবে অত্যন্ত কঠিন একজন ব্যক্তি । যে কোন শত্রুর সাথে সামনাসামনি যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে আমি বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করিনা । তাই কোন আগাম সতর্কীকরণ করে অযথা আমার বীরুচিত্তের অবনমন করবেন না, যদি কোন বিপদ আসে অামি রুখে দাঁড়াব । প্রজা কল্যাণই আমার লক্ষ্য । নিজেকে আগলে ভোগ-বিলাসের তাগিদে আমি রাজ্যভার গ্রহণ করিনি ‘ ।

রাজগুরু এবার মুখ খুললেন । চারপাশের পরিবেশে থমথমে ভাবটা আগের চেয়ে আরো বেড়ে গিয়ে চেনা পরিবেশটাকে কেমন যেন বিভীষিকাময় করে তুলেছে । এর মাঝে রাজগুরুর কথা যেন পরিবেশকে আরো ভারী করে তুলল– মহারাজ আজ যদি আপনি আপনার কথা শয়নকক্ষ পরিবর্তন করে অন্যত্র শোন, তাহলে আপনার মঙ্গল হয়।

রাজগুরু থামলেন । রাজা অলোঞ্জয় অবাক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে । তিনি তার কথার অর্থ খোঁজার চেষ্টা করছেন । তিনি প্রশ্ন করলেন – ‘ কেন? ‘ । রাজগুরু শুধু একটাই কথা বললেন – ‘ আপনার রাজকক্ষের চারপাশের বায়ু মোটেই মঙ্গলময় নয় মহারাজা, আপনি যদি আমার এ অনুরোধ রাখেন, তাহলে আপনারই মঙ্গল ।’ স্তব্ধ পরিবেশ বিদীর্ণ করে এক অট্টহাসি । রাজা হাসতে হাসতে বললেন, -এক বিশাল রাজ্যের রাজা যদি অশুভ কিছুর ভয়ে তার রাজকক্ষ ত্যাগ করেন, তা মোটেই রাজ্যের পক্ষে মঙ্গলজনক নয় । তিনি বীর অশুভ শক্তিকে প্রতিহত করাই তার কাম্য । তিনি তার নিজ কক্ষেই শোবেন । অগত্যা রাজগুরু মাথা নিচু করে কি যেন একটা বলতে বলতে প্রসাদের বারান্দা দিয়ে অন্ধকারে মিলিয়ে গেলেন ।

মধ্যরাতের কিছুপূর্বে এক প্রবল অস্বস্তিতে রাজার ঘুম ভেঙে গেল । রাজকক্ষ সম্পূর্ন অন্ধকার । শয্যার পাশে রাখা পিদিমটা কখন যেন নিশব্দে নিভে গেছে অন্ধকারে । খাটের থেকে বেশ কয়েক হাত দূরে মেঝেতে জানলা থেকে চাঁদের আলো এসে পড়েছে । আজ পূর্ণিমা । তাই জানলা দিয়ে আসা চাঁদের আলোয় আবছা আবছা বেশ কিছুটা দেখা যাচ্ছিল । রাজা বিছানায় উঠে বসলেন তার নাকে একটা অদ্ভূত গন্ধ লেগে , না গন্ধটা তার চেনা । এ গন্ধ আগেও তিনি কোথাও পেয়েছেন । তীব্র কটূ একটা গন্ধ । বন্য কোন পশুর গন্ধ কি? কাঁচা মাংসের সাথে পচা পাঁকের গন্ধ মেশানো যেন । কিন্তু এ গন্ধ ঘরের মধ্যে কি করে ?

ঘরের মধ্যে কোন মেঠো ইদুর ঢুকে তা কোনক্রমে মারা গিয়ে থাকতে পারে কি? না অসম্ভব । রোজ দুবেলা তার শয়নকক্ষ পরিষ্কার করা হয় তার ফরমাশ অনুযায়ী । তবে ? রাজা শয্যায় বসে বসে এসবই ভাবছিলেন । হঠাৎ খাট থেকে কয়েক হাত দূরে যেখানে জানলা দিয়ে চাঁদের আলোটা এসে পড়েছে, সেদিকটায়, তিনি দেখলেন একটা বিশাল হলদেটে কিছু একটা জানলার চারপাশে হেঁটে বেড়াছে নিশব্দে । জানলার কাছটায় আসতেই চাঁদের আলো গায়ে পড়ে চকচক করে উঠছে তার গায়ের হলদে লোম । রাজা মূহুর্তে সজাগ হয়ে বসলেন । তার বুকের ভেতর যেন দপদপ প্রহর গোনার হাতুরি পড়ে চলেছে । তিনি নিশব্দে তার বিছানার চারপাশে হাতরাচ্ছেন । কিন্তু দৃষ্টি তার স্থির , সামনে, সেই বিশাল হোলদে প্রানীটার দিকে । এখন সে জানলার আলোর ঠিক নীচে । স্পষ্ট দেখা যায় তার হলদে দেহে ডোরাকাটা কালো দাগগুলো । তাকে তিনি চেনেন । এই দুদিন আগেই তার সাথে তার সাক্ষাৎ ঘটেছিল বনের কিনারে, মৃত্যু তীরে ।

হঠাৎ ঘটলো বিপত্তি । অন্ধকারে হাতরাতে গিয়ে পিতলের পিদিমটি উল্টে পড়ল মেঝেতে । প্রচন্ড ধাতব শব্দে হলদে শরীরটা যেন মুহূর্তে মিলিয়ে গেল দরজার বাইরের অন্ধকারে । রাজা দ্রুত শয্যা ছেড়ে তীর -ধনুক হাতে বেড়িয়ে এলেন । বাইরে বারান্দা অন্ধকারে তিনি কিছুই দেখতে পেলেন না । বাঘ বাইরে গিয়ে থাকবে, তা ভেবেই তিনি দ্রুত বাইরে বেরিয়ে আসতেই দেখতে পেলেন সেই বিশাল হোলদে বাঘিনীটিকে । তাকে লক্ষ্য করেই তীর ছুঁড়লেন তিনি । কিন্তু তা যেন বাঘের দেহ স্পর্শ না করেই অন্ধকারে হারিয়ে গেল । তিনি দেখলেন বাঘ এবার একটু একটু করে দূরে মিলিয়ে যেতে শুরু করেছে । রাজার মাথায় তখন খুন চেপে গেছে । তিনি সেই বাঘিনীকে হত্যা করবেনই । রাজপ্রাসাদের তোরণ পেড়িয়ে তিনি ছুটতে শুরু করলেন বনের দিকে, যে পথে একটু আগেই অদৃশ্য হয়েছে সেই বিশাল দৈত্যটি ।

রাজাকে এভাবে হনহনিয়ে বেড়িয়ে যেতে দেখে প্রহরীরাও বেশ হকচকিয়ে গেলেন । তারাও চললেন রাজার পিছু পিছু। রাজমহলে খবর গেল । বৃদ্ধ পিতা সুতোঞ্জয় পুত্রের চিন্তায় দিশেহারা হয়ে বেড়িয়ে পড়লেন । কিন্তু অলোঞ্জয়ের কোন দিকেই হুঁশ নেই । তিনি এই বাঘের দেখা পাচ্ছেন , তীর চালাচ্ছেন আর ওমনি বাঘ অদৃশ্য । তিনি হতবুদ্ধি হয়ে ছুটে চললেন বনের আরো গভীর থেকে গভীরে , অন্ধকারে । প্রহরীরা রাজার পিছু পিছু ছুটে আসছে । একসময় তারা দূর থেকে দেখল, রাজা যেন ধীরে ধীরে অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছেন । তা দেখে তারা আরো জোরে ছুটতে লাগল সেদিকে । কিছুদূর এগিয়ে বিপদটা বুঝেই তারা থমকে দাঁড়ালেন । রাজার শরীর জলার পাঁকে আটকে রয়েছে । তিনি তলিয়ে যাচ্ছেন ক্রমে । তারা রাজাকে সাহায্যের জন্য এগিয়ে যেতেই ঘটল আরেক ভয়ানক ঘটনা । তারা দেখলেন রাজার ঠিক পাশেই তাকে ঘিরে হেঁটে বেড়াচ্ছে একটা বিশাল রয়েল বেঙ্গল বাঘ । আর তার ঠিক পাশে রয়েছে তার ছোট্ট শিশু শাবকটি । প্রহরীরা আর এগোতে পারল না । তারা সেখানেই থমকে দাঁড়িয়ে গেল । রাজা অলোঞ্জয়ের দেহ পাঁকে আঁধারে তলিয়ে গেল , গভীরে ।

এ গল্প সুন্দরবনের স্থানীয় মুখে আজও শুনতে পাবেন গেলে । আপনি হয়ত গভীর রাতে বনের গভীরে অ্যাডভেঞ্চারের জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন । তখন সেখানকার স্থানীয়রা আপনাকে সাবধান করে হয়ত সেই গল্পই শোনাবে। কারন তারা বিশ্বাস করে সুন্দরবনের গভীরে জলাগুলিতে আজও রয়ে গিয়েছে ‘ আলেয়া ‘-র অতৃপ্ত আত্মা যা মানুষকে সেই গভীরে পাঁকের অতলে টেনে নিয়ে গিয়ে মৃত্যুর হিমশীতলতায় ডুবিয়ে দিতে চায় । আবার অনেকে অবশ্য অন্য কথা বলে । ‘ আলেয়া ‘ অতটাও খারাপ নয় । সে নাকি আলোর দূত হয়েই আজও মানুষকে সাবধান করে দেয় । সামনে বিপদ এগোতে নিষেধ করে । কিন্তু কে ঠিক , কে ভুল তা বিচার করতে কে যাবে সেই অন্ধকার জঙ্গলে, সুন্দরীর চক্রবুহে ! আলোক-রহস্য সন্ধানে ?

( সমাপ্ত )

গল্পের বিষয়:
রহস্য

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত