তিনআত্তা

তিনআত্তা

ছাত্র জীবনে টানতেন ডার্বি, হলিউড। এখন টানেন ব্যান্সন, ব্ল্যাক মাঝে মাঝে ইন্ডিয়া থেকে আনানো প্যারিসও টানেন। বলছিলাম সরকারী চাকুরীজীবী মাহিন সাহেবের কথা। একটার পর একটা সিগেরেট টেনেই যাচ্ছেন। ঘুষ খাওয়া, সিগেরেট টানা ছাড়াও তার আরও একটি নেশা আছে, বউ পেটানো। প্রতি সপ্তাহে অফিস শেষে যে কোন একটা ছুতোয় উনি বউ পেটাতে মজা পান। এ সময় তার চোখ আগুনের মত লাল থাকে। রিমার ধারনা মাহিনের পূর্ববর্তী বংশধর আগ্নেয়গিরির আশেপাশে থাকতেন। তাই তার মায়া মহব্বত বলে কিছু নাই। বউ পেটানো শেষে পাশের রুমে গিয়ে একসাথে পাঁচটার অধিক সিগেরেট টানেন। এরপর প্রতিদিনের নিয়ম অনুযায়ী নিজের রুমে ঘুমাতে যান।

রিমা নিম্ন মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে। বিয়ে হয়েছে মাস ছয়েক হল। এইচ এস সি পড়বার সময়ই বিয়ে হয় মাহিনের সাথে। সমাজে সরকারী চাকুরীর ডিমান্ড বেশি। সে হোক চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী বা অফিসার র‍্যাঙ্ক। রিমা খুব সুন্দর আর বয়স কম হওয়ায় পাত্রের হাতে কিছু দিতে হয় নি। তারপরও ঘর সাজানোর আসবা পত্র সব দিতে হয়েছে। সেদিক থেকে রিমার বাবা এজাজ সাহেব বেশ খুশি। মেয়ে সুন্দর না হলে লাখ পাচেক টাকা হাত থেকে খসত এটা নিশ্চিত।অবশ্য অত্যাধিক সৌন্দয, কম বয়স একজন মানুষের কোন যোগ্যতার মধ্যে পরে এ প্রশ্নটা কেউ কাউকে কখনও করে নি।

বছরখানেক হল মাস্টার্স শেষ করলেও কপালে চাকুরী জুটছে না হাবীবের। দু-একটার অফার পেলেও বেতন কম। সে বেতনে পেট চলবে কিন্তু মধ্যবিত্তের না গরীবের। তার নেশা সরকারী চাকুরীর। এ পর্যন্ত শখানেক চাকুরীর পরীক্ষা দিয়েছেন। ফলাফল শূন্য। আজকাল যে ভাল মানের সরকারী চাকুরী করে তাকেই ভাল টাকাওয়ালা আর পদবিওয়ালা বলা চলে। হাবীবের দুটোই দরকার। ওহ আরেকটা তথ্য তো দেয়াই হয়নি। রিমি হাবিব দুজন দুজনকে ভালবাসত। কিন্তু হাবিব বেকার হওয়ায় রিমির বাবার রাজি হন নি আর হাবিবও বেকার অবস্থায় রিমিকে বিয়ে করতে রাজি হয়নি।

যুবক অবস্থায় মাহিন সাহেব ভালবাসতেন পাশের পাড়ার এক মেয়েকে। বিদেশী পাত্র পেয়ে বিয়েতে রাজি হয় মেয়েটি। মেয়েটির কাছে নিজের দোষ জানতে যান মাহিন। কিন্তু নিজের দোষ না জানতে পারলেও ওই এলাকায় উত্যাক্তের দায়ে গনপিটুনি খেয়েছিলেন মাহিন।সম্ভবত তার প্রতিশোধ তোলেন রিমির ওপর। যদিও রিমি আর তার সাবেক প্রেমিকার মধ্যে কোন আত্মীয়তা আছে কিনা তা এখনও জানা যায় নি।
আজ অফিসে বসের ঝারি খাওয়ার পর বউয়ের উপর তার শোধ তুললেন মাহিন। তারপর পকেটে থাকা প্যকেট থেকে সিগেরেট বের করে জ্বালাতে জ্বালাতে পার্শ্ববর্তী রুমে চলে গেলেন। ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় মাহিন সাহেব সপ্ন দেখেন। তার মাকে তার বাবা প্রচণ্ড মারছে। তার মা বাচাও বাচাও বলে চিৎকার করছেন। শিশু মাহিন পাশের রুমে মায়ের কান্না শুনে ভয় পেয়ে কাদছে। মারধরের এক পর্যায়ে বাবা মায়ের গলা টিপে ধরেন। হঠাৎ মাহিনের ঘুম ভেঙ্গে যায়। মাহিনের মা মাহিন ছোট থাকতেই মারা যান। মাহিনের বাবার নির্যাতনেই মাহিনের মায়ের মৃত্যু হয়। ঘুম ভাঙ্গলে মাহিন পাশের রুমে যায়। রিমি জ্ঞান হারিয়ে ফ্লোরে পড়ে আছে। গায়ে হাত দিতেই বুঝতে পারে রিমার প্রচন্ড জর।

সারা রাত রিমির কপালে পট্টি লাগান মাহিন। ঘুম থেকে জাগার পর রিমি মাহিনকে খুজে পান নি। কিভাবে রিমি মেঝে থেকে বিছানায় এলেন তার মনে নেই। কিছুদিন পর মাহিনের প্রাডো গাড়িটিকে পোড়া অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। গাড়িটি এমন ভাবে পুড়েছিল যে লাশ শনাক্ত করা যায় নি। তিনমাস পর রিমিকে তার বাবা গ্রামে বাসায় নিয়ে যান। হাবীবের সরকারী চাকুরী হয়েছে। রিমির বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব পাঠায় সে। রিমির বাবার কাছে এ যেন ঈদের চাঁদ হাতে পাওয়ার মত অবস্থা। রিমি হাবীবের বিয়ে হয়ে যায়।

কিছুদিন পর পত্রিকায় একটা ছবি বেরয়। হেডলাইন হয় পুত্র মাহিন মির্জার হাতে পিতা রসিদ মির্জা খুন। পত্রিকায় ছবিটা দেখার সাথে সাথেই রিমির পুরনো ক্ষোভ প্রাণ ফিরে পায়। ছবির উপর তার সব রাগ ঝারতে থাকে। কিন্তু হাবীবের কথায় সে অবক হয়। হাবিব জানায় এই মাহিন মির্জার জন্যই তার চাকুরীটা হয়েছে। প্রায় এক মাস তার চাকুরীর জন্যে বিভিন্ন অফিসে দেন দরবার করেছেন মাহিন। মাহিন সাহেবের ফাসির আদেশ হয়েছে। একজন ফাঁসির আসামীকে দেখতে গেলে হয়তো সমাজের চোখে খারাপ হতে পারেন এই ভয়ে তাকে জাননি হাবীব সাহেব। ওহ হ্যা একটা কথা, খুনের পরে মাহিন সাহেন পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করে স্বীকারোক্তি দেন যে উনি নিজেই নিজের গাড়ি পুড়িয়ে ছিলেন। কেন পুড়িয়েছিলেন তার রহস্য ভেদ করা যায় নি।

রচনাঃ মুহাম্মাদ সারোওয়ারে জুলফিকার
লেখাঃ ৪ই মে ২০১৮

গল্পের বিষয়:
রহস্য

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত