একটি অপহরনের গল্প

একটি অপহরনের গল্প

ঘরটা ঘুটঘুটে অন্ধকার,কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হল আমার একটুও অস্বস্তি হচ্ছে না। যেই আমি প্রচণ্ড শীতের রাতে জানলা খুলে না দিয়ে ঘুমাতে পারি না। সেই আমি একটা বদ্ধরুমে জীবনযাপন করছি। ইচ্ছায় নয় অনিচ্ছায়। ঘরের ভেতরে বেশি জিনিসপত্র নেই । একটা সিঙ্গেল বেডের খাট, একটি চেয়ার। আমার ডান পায়ে একটি বেড়ি পরিয়ে রাখা হয়েছে। আমাকে অপহরন করা হয়েছে। আমি বুঝতে পারছি না ,আমার অপরাধ কি । এই মুহূর্তে আমি চিন্তা করছি ,এই রুম থকে কিভাবে বের হওয়া যায় ।কিছু বুঝতে পারছি না। কে যেন বলেছিলেন,

“যে শুধুমাত্র পেশিশক্তি ব্যাবহার কর কাজ করে সে শ্রমিক, যে পেশীশক্তির সাথে মস্তিস্ক ব্যাবহার করে সে কারিগর,আর যে এই দুয়ের সাথে হৃদয় ব্যাবহার করে সে শিল্পী।”

আমি এই মুহূর্তে বদ্ধ ঘর থেকে বের হওয়ার জন্য একজন শিল্পী হতে যাচ্ছি ।যদিও আমি সব কাজ হৃদয় দিয়ে করার চেষ্টা করি ।গত বছর চারুকলা থেকে পাশ করে বের হয়েছি।এই মুহূর্তে আমার অন্ধকারের নিখুঁত চবি আঁকতে ইচ্ছে হচ্ছে।অন্ধকার নিয়ে একটি বিখ্যাত কবিতার কয়েক লাইন মনে পড়ছে।আমি আবৃত্তি করছি ,

“The wave were dead,the tides where in their grave.

The winds were withered in the stagnant air

And the cloud perished

Darkness had no need of help from them

She was the universe ”

Lord byron

সত্যিই অন্ধকারই মহাবিশ্ব ।

২।

লোকটা কিছুক্ষণ আগে রুমে ঢুকেছে । ৫০ ওয়াটের একটি বাতিতে লোকটিকে ঠিকমতো দেখতে পাচ্ছি না। লোকটার বয়স ৪৫-৫০ হবে । মাথায় ইয়ামোটা টাক। গালের চামড়া অনেকটা ঝুলে আছে। লোকটি ঘরে ঢুকেই বলল,

মৃত্তিকা মা তোমাকে একটা ধাঁধা বলি, ধাঁধাঁটা তোমার পছন্দ হবে। তিনটা পিঁপড়ে একটা সোজা লাইনে হাঁটছে । প্রথম পিঁপড়েটি বলল, আমার পিছনে দুটি পিঁপড়ে হাঁটছে । দ্বিতীয় পিঁপড়েটিও বলল ,আমার পিছনেও দুটি পিঁপড়ে হাঁটছে। তৃতীয় পিঁপড়েটি বলল ,আমার পিছনে চারটি পিঁপড়ে হাঁটছে। এটা কিভাবে সম্ভব?

লোকটাকে আমি বোঝার চেষ্টা করছি ।এই লোকের আমার কাছে কি চাওয়ার থাকে পারে । দেখে মনে হচ্ছে ,কোন এক গ্রামের স্কুলের বাংলার শিক্ষক, নাম অরবিন্ধু রায় । পান খেয়ে ক্লাসে ডুকে,ছাত্রছাত্রীদের গায়ে পানের পিক ছিটায় ।আমাকে এখানে ধরে আনা হয়েছে,তিনদিন। অথচ আমাকে ধরে আনার উদেশ্য বুঝতে পারছি না । উদেশ্য বুঝতে না পারায় সমস্যা হচ্ছে ।আমাকে তিন বেলা ভাল খাবারদাবার দেওয়া হচ্ছে । সবাই সম্মান করে কথা বলছে । লোকটির কথার উত্তর না দিয়ে চুপ করে বসে আছি । লোকটা মনে হয় ড্রিংকস করেছে । অতিরিক্ত রকমের মাতাল এই লোকের কথার উত্তর না দিয়ে চুপ করে বসে থাকা মঙ্গলজনক । লোকটি বলেই যাচ্ছে,আমি জানি তুমি এই ধাধার উত্তর দিতে পারবে না ।কারন তুমি নিজেই একটি গোলক ধাধার মধ্যে পরে আছো। আমার দেওয়া ধাঁধা নিয়ে চিন্তা করার সময় তোমার নেই । তার চেয়ে বরং তোমাকে একটা মজার কথা বলি , চীনের কিছু আধিবাসী কি করে জানো ,তারা নবজাতকের মুত্রে ডিম সিদ্ধ করে খায় ।তাদের বিশ্বাস এতে রোগমুক্ত থাকা যায় ।ব্যাপারটা মজার না । আমার ছাত্রছাত্রীরা আমার ক্লাস খুব মনোযোগ দিয়ে করে ,তারা মজা পায় ।

আমি কড়া গলায় বললাম, আপনার কথায় আমি মোটেও মজা পাচ্ছি না । বিরক্ত হচ্ছি। বলুন তো আমাকে এখানে কেন ধরে আনা হয়েছে। আর দয়া করে আমাকে মা বলে ডাকবেন না ।আপনি আমার বাবা নন।

-রেগে যাচ্ছ কেন? তোমাকে এখানে ধরে আনা হয়েছে একটা গল্প শুনানোর জন্য। গল্পটা আজ থেকে ২৫ বছর আগের।আমি গল্পের কথক, তুমি বিচারক। তুমি দশের স্কেলে নম্বর দিবে। নম্বর দেওয়ার পর তুমি আমাকে সালাম দিয়ে বিদেয় হয়ে যাবে । কফি খাবে?

– না ,আপনার সাথে কফি খাওয়ার কোন ইচ্ছে আমার নেই ।আপনার গল্প বলুন।

– মৃত্তিকা ,আমার বাবার মৃত্যু হয় আমি যখন ভার্সিটিতে মাত্র ভর্তি হয়েছি । মা এবং তিন বোনকে নিয়ে আমি মহাবিপদের মধ্যে পরে যাই। ভার্সিটির ক্লাস, টিউশনি করে নিজের খরছ চালাতাম ,বাসায় টাকা পাঠাতাম । এর মধ্যে আমার সুজাতার সাথে পরিচয়। আমাদের ডিপার্টমেন্টে দাঁড়িয়ে আছি । নবীণবরন অনুষ্ঠান হচ্ছে। একটি মেয়ে হঠাৎ আমাকে এসে বলল,মামা নবীনবরনটা কোন দিকে হচ্ছে ।আমি চোখ তুলে তাকিয়ে দেখি ,ফর্সামতো ,ছিপছিপে গড়নের একটা মেয়ে। নাকের উপর ঘাম জমে রয়েছে। আমি আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে দিলাম । এই দিন ডিপার্টমেন্টের ছাত্রদের পক্ষ থেকে আমি বক্তব্য দিয়েছিলাম । সব মোতালেব স্যার এর কাণ্ড ।আমাকে প্রায়ই বলতেন, জহির তুমি একদিন অনেক দূর যাবে । আমি অবশ্য অনেক দূর গিয়েছি দশটার মতো দেশে ইকোনমিক্স পড়িয়েছি। অনুষ্ঠান শেষে আমি বাইরে দাঁড়িয়ে আছি। হঠাৎ আমার পিছনে এসে মেয়েটি বলল,ভাইয়া আমি আপনাকে চিনতে পারিনি ,সরি ।আমি বললাম , ব্যাপার না ,ঠিক আছে । সে তখন বলল,ভাইয়া আমি সুজাতা । আমি আস্তে করে বললাম আচ্ছা । মেয়েটি আমার অনাগ্রহে বিরক্ত হল, তারপর চলে গেল ,

ক্লাস ,পড়াশোনা মায়ের চিন্তায় আমি মেয়েটির কথা ভুলেই গেলাম । যদিও আমি ওকে নিয়ে ভাবিই নি । কয়েকমাস পর ,আমি একদিন ক্যাম্পাসে হাঁটছি । হঠাৎ পিছন ফিরে দেখি ,একটা মেয়ে ডাকছে । কাছে আসতে দেখি সুজাতা ।সে বলল,

-ভাইয়া রাগ না করলে একটা কথা বলব ।

-আচ্ছা বল

-ভাইয়া ,আমি লক্ষ্য করেছি , আপনি প্রতিদিন এই লাল ক্যাঁটকেটে রঙের শার্ট পরে আসেন ।এইটাতে আপনারে একদম মানায় না । ভাইয়া,আমি আপনার জন্য একটা শার্ট কিনে এনেছি । আপনি নিলে খুব খুশি হব।

আমি ভেতরে ভেতরে রেগে গেলাম ।আমার আত্মসম্মানে খুব লাগল । মেয়েটাকে প্রচণ্ড বকা দিতে ইচ্ছে হল। কিন্তু পরক্ষণে যা বলল , তাতে মন ভাল হয়ে গেল।

-জহির ভাই সমস্যা সবার জীবনে থাকে ।আমি আপনার সম্পর্কে শুনেছি, আপনি জীবনের সাথে যুদ্ধ করছেন ।আমি আপনাকে সম্মান করি । আমার হাত খরচের টাকা বাচিয়ে এটা কিনেছি ।আপনি এই শার্টটা পরলে আমার অনেক ভালো লাগবে। আপনি এই শার্টটা পরে আসেন তো আমি আপনার সাথে খানিকক্ষণ হাঁটবো ।

মেয়েটার অধিকার কাটান দেখে আমার অবাক লাগলো।কিন্তু সত্যি ব্যাপার কি জানো,আমি মেয়েটির কথায় প্রভাবিত হলাম ।আমি শার্টটা পরে আসলাম । মেয়েটার সাথে খানিক হাঁটলাম। হঠাৎ সুজাতা বলল ,ভাইয়া আমাকে শুভ জন্মদিন বলেন ।আজ আমার জন্মদিন ।আমি বললাম,শুভ জন্মদিন সুজাতা । বলার সাথে সাথেই ও চলে গেল। আমার মনে হতে লাগলো ,মেয়েটিকে ছুটে গিয়ে আমি আটকাই । বলি যেও না তুমি ,তুমি আমার আশে পাশে থাকলে আমার প্রচণ্ড ভালো লাগে । প্রচণ্ড……।

এটুকু পর্যন্ত বলে লোকটি থামল ।আমাকে বলল, এক সাথে পুরো গল্প বললে ,আগ্রহ কম থাকে।বাকিটা রাতে বলব। তোমাকে এখন এক কাপ কফি বানিয়ে দিচ্ছি । তোমার ভালো লাগবে । গত বছর যখন কানাডাতে ছিলাম ,তখন কফির নেশা হয়েছে । কফি আমি অসাধারন বানাই ।

লোকটি আমার হাতে কফির মগ তুলে দিল। সত্যিই কফিটা অসাধারন ।

-কি ভালো হয়েছে না ।

-হয়েছে ।আপনি এখন যান ।রাতে এসে বাকি গল্প বলবেন । আপনাকে একদম সহ্য হচ্ছে না ।

-চলে যাচ্ছি ,যাওয়ার আগে তোমাকে একটা ধাঁধা দিয়ে যাই ।একটি ছেলে বছরের পর বছর একই ক্লাসে থাকে , কিন্তু সে কোন পরীক্ষায় ফেল করেনি ।কিভাবে সম্ভব।

লোকটি মুচকি হেসে চলে গেল ।আমার প্রচণ্ড ঘুম পাচ্ছে । কিছু ভাবতে পারছি না । ছোটবেলায় যখন প্রচণ্ড জ্বর হতো তখন মা গুন গুন করে একটি গান গেয়ে ঘুম পারাত,

“ নাক কামড়াই ,কান কামড়াই

কামড়ে দিলাম মন

তুমি আমার আঙ্গুরলতা ,আমার ত্রিভুবন ”

গানটা শুনতে খুব ইচ্ছে হচ্ছে। দ্রুত বন্ধ হয়ে আসছে চোখ ……………।

৩।।

যখন ঘুম ভাঙ্গল তখন চারপাশে অনেক অন্ধকার । হঠাৎ করে খুব ভয় লাগতে শুরু করল।মাকে খুব মিস করছি । লোকটা আমাকে কেন ধরে এনেছে । রেপ- টেপ করবে না। এসব ওল্ড এজের বুড়োরা পারবাটেড হয় । কিছুক্ষণের মধ্যে আমার রুমে লোকটি ঢুকলো । ঢুকেই বলল,

-মৃত্তিকা মা, ঘুম কেমন হয়েছে। তোমাকে দুটো ধাঁধা দিয়েছিলাম উত্তর খুজে পেয়েছ।

– পেয়েছি, তবে আপনাকে বলতে ইচ্ছে হচ্ছে না । তবুও বলছি ,নইলে ভাববেন খুঁজেই পাইনি।শেষের দুটি পিঁপড়ে মিথ্যে বলেছে।আর ছেলেটি পরীক্ষাই দিতো না ,ফেল করবে কিভাবে । এবার আপনার গল্প শেষ করেন ।আমাকে মুক্তি দেন ।

-তোমার মাথা ঘুমানোর ফলে বেশ পরিস্কার হয়েছে। এরপর ঘটনা খুব দ্রুত ঘটতে থাকে। সুজাতা আমাকে নিয়ে প্রায়ই বাইরে বের হতো। আমার পৃথিবী হয়ে গেল সুজাতাময়। আমি মা বোনদের কথা ভুলে গেলাম । টিউশনিতে অমনোযোগী হওয়ায় সেগুলো চলে গেল। তবুও চাইলাম । সব যাক সুজাতা থাকুক । একদিন সুজাতা আমাকে বলল, জহির ভাই ,আপনি আমার পাশ দিয়ে হাঁটলে না ,আমা খুব ভাল লাগে ।বিয়ে করবেন আমাকে। বলেই ফিক করে হেসে দিল, সিরিয়াস না রসিকতা কিছুই বুঝলাম না।

এরপর হঠাৎ একদিন শুনলাম সুজাতা এক ব্যাবসায়িকে বিয়ে করেছে । এবার বল,সুজাতা ,আমাকে তার সাথে জড়িয়ে , অন্য আরেকজনকে বিয়ে করেছে ।কাজটা কি ঠিক হয়েছে।আমিতো তাকে ভালবাসতাম । খুব ভালবাসতাম …।।

আমি বললাম, জহির সাহেব আপনার গল্প অনেক সুন্দর ,তবে বড় একপেশে । আমি আপনাকে দশের মধ্যে শূন্য দিবো। আমি খিল খিল করে হেসে উঠলাম । বললাম ,জহির সাহেব আপনার গল্পের নায়িকা সুজাতা না, রেবেকা। আমি তাকিয়ে দেখলাম,জহির সাহেবের মুখে বিস্ময়। আমি বলে যাচ্ছি, জহির সাহেব আমার মায়ের ডাইরির একটা পৃষ্ঠা আমি যত্ন করে মুখস্ত করেছি। কেন জানেন, এই পৃষ্ঠার প্রত্যেকটা শব্দ আমার খুব পছন্দ হয়েছে। ডাইরিটা পড়ে আমি আমার মাকে স্যালুট দিয়েছি । কি লিখা ছিল ,আপনাকে শুনাই আচ্ছা।

“জহিরকে আমি কিছুতেই ক্ষমা করব না। যদিও ক্ষমা করে দিতে পারতাম। আমি হুট করে বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছি । ভালো কি মন্দ চিন্তা করছি না।

সেদিন বৃষ্টি হচ্ছিল। ডিপার্টমেন্টে কেউ ছিল না। জহির হঠাৎ দরজা লাগিয়ে দিলো ……। মানুষের সাথে বসবাস করা যায় ,পশুর সাথে না। আমি জহিরকে কোনদিন ক্ষমা করব না।”

বলা শেষ করে আমি তাকিয়ে দেখি,আমার সামনে মাথানত করে দাঁড়িয়ে আছে একটা বয়সের ভারে নত হতাশাগ্রস্ত মুখ । পিছনে তার ছায়া পড়েছে । আমার এই অবনত মস্তকের চবি আঁকতে ইচ্ছে হচ্ছে ।

বৃষ্টি হচ্ছে । বৃষ্টিতে ধুয়েমুছে যাক , যাবতীয় বেদনা- নিষাদের গল্প। আমি আবৃত্তি করছি,

“যে ব্যাথা গহীনে ঘুমায়

সে ব্যাথার সূচ হৃদয়ে মহান

কষ্টের কাছে পরাজিত বলে, মিথ্যে কষ্টবিলাস “

খুব ক্লান্ত লাগছে।সময় দ্রুত পুরিয়ে যাচ্ছে ।হয়তো নিকটে শুভ্রতার সকাল…………।।

উৎসর্গ: বর্ষাকে,প্রতিদিন যাকে আগের দিনের চাইতে বেশি ভালবাসতে ইচ্ছে হয়।

গল্পের বিষয়:
রহস্য

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত