শূণ্য লকার

শূণ্য লকার

জোড়া গোপন কথা বের করবার কায়দাটা পুলিশের কুক্ষিগত হলেও, রহস্য সমাধানের এখতিয়ার বর্তাবার কথা গোয়েন্দাদের যেখানেই রহস্য, সেখানেই বাজারী গোয়েন্দা, কেনো না অপরাধীকে উল্টো করে বেঁধে প্রতি হালি ডিমের বিপরীতে দুই ঘাড়েই, আর আজকের এই পরিবর্তিত অর্থনীতিতে গোয়েন্দা পেশায় টিকে আছে কেবল বাজারী গোয়েন্দা একলা, সে বাজারটা বোঝে বলেই হয়ত।

আর তাই, কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের বান্টুরচর শাখার একটা লকার সম্পূর্ণ ফাঁকা করে দিয়ে যখন এক কাঁদি নোট লুট হয়ে গেলো, তখন তলব করতে হলো তাকে।বাজারী গোয়েন্দা এসে দেখলো ব্যাঙ্কে ঊর্দ্দিধারী পুলিশ, র্যাব, উৎসুক জনতা, মিলিটারীতে ছয়লাপ হয়ে প্রায় উপচে পড়ছে, সবাই নিজেদের নিজেদের ঊর্দ্দি পড়ে উঁকি দিচ্ছে ক্রাইম সীনে, রুম নম্বর ৩০০৯-এ, আর তাদের মুখেই শোনা গেলো, চুরি যাওয়া টাকা নাকী মূল্যমানে দেড়শো কোটি ছাড়াবে।

জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়ে গেলো নগদে, আর প্রথমেই দারোয়ান। আমি ত স্যার কাউরে বের হতি দেখি নাই স্যার। এরপর রিসেপশনের মেয়েটা। আমি কাউকে উপরে যেতে দেখিনি। জিজ্ঞাসাবাদ করা হলো ম্যানেজারকে।

(টিশুতে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে হাপাবার শব্দ) লকারের ভারপ্রাপ্ত সিনিয়র অফিসাররে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন  হ্যাঁ, অ্যাঁ, লকার খুলে দেখি টাকা নাই, কিছু লোক বসে আছে, একটু বিব্রত, ঘামে ভিজে চকচকে মুখ তাদের, আমি ওদের ছেড়ে দিতেই ওরা চলে গেলো  না, ওদের সাথে ত কোনো ব্যাগ ছিলো না  যেতে দিলাম কেনো, লকারে কোত্থেকে ওরা, আমার কেনো যেনো মনে হলো, ওরা ঐখানে আছে ঠিকই আছে, বিশেষ কিছু মনে হয়নি বাজারী গোয়েন্দা ভুরু কুঁচকায়, সাহেব দারোগা এই অফিসারেরে হাজতে চালান করে দেয়, আর টিটকিরির হাসি দেয় গোয়েন্দাপ্রবরের দিকে, যেনো সমাধানের বাকী আছে আর কিছু। এদিকে বাজারী গোয়েন্দা ম্যানেজারেরে জিজ্ঞেস করে, সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজটাও একটু দেখা যায় কী না। ঘড়ঘড় শব্দে রিলের পর রিল ভিডিওটেপ চলে  প্রত্যুত্তর হিসেবে।

সিসিটিভি ফুটেজ বলে চলে  এদের সাথে কোনো ব্যাগ-বস্তা ছিলো না  নাহ্, খালিহাতে বের হয়ে গেছে, শুধু গায়ে আঁকা আবছা দেখা যায় এমন কিছু উল্কি, এই দেখুন না  বাজারী গোয়েন্দার হিসেব মেলে না, অফিসার কেনো মিথ্যা বলতে যাবে, উল্কি আঁকা নির্বিবাদ লোকেরা কোন্ ফুটো দিয়ে লকারে ঢুকবে, এসবের।

তা, সে ত আর এযুগের শার্লক বা সেযুগের ব্যোমকেশ নয় যে সাথে সাথে সব সমাধা হয়ে যাবে, মগজে ঢুকলো আর হলো, সে একগাদা ফাইলপত্তর আর টেপ নিয়ে ঘরে ফেরে, ভাবতে বসে, কোনো কূল না পেয়ে সিনেমা দেখে কিছুক্ষণ, সদ্য বের হওয়া আওয়ারা নামের সিনেমা, কূল ত কূল, কূলের টিকিটাও না পেয়ে সে ঘুমে ঢলে পড়ে। না, স্বপ্নেও কোনো হদিস ধরা দেয় না তার হাতে। হদিস ধরা দেয় পরদিন, পত্রিকা পড়বার সময়।

ঘুম থেকে উঠে দুই দশটা পত্রিকা তাকে ঘাটতে হয়, গোয়েন্দাবৃত্তির খাতিরেই, আর আজ সে প্রথম পত্রিকার প্রথম পাতায় দেখে হরেক শিরোনাম, মার্কিন মুলুকে জনৈক ধনকুবের চার বছরের জন্য মহারাজা পদে অধিষ্ঠিত, এখন চলছে সেই নিমিত্তে রাজসূয় যজ্ঞ, শেয়ার বাজারে ধ্বস, কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের পয়সা চুরি, এক দুইটা খুনের খবর, ব্যবসায় ঝুঁকি, কী যেনো খোঁচাতে থাকে তার মনের ভেতর, আর এরপর সে দেখে ভেতরের এক পাতায়, ইসলাম ব্যবসাকে উৎসাহিত করে, পাতা ওল্টায়, অভ্যাসবশত রাশিফল দেখবে বলে, আর সেইখানে সে দেখে মোটা হরফে লেখা আছে, অর্থলগ্নী শুভ! সবকিছু তার মাথার ভেতর খাপে খাপ মিলিয়ে বসে যেতে থাকে, সে সত্ত্বর ফোন দেয় ব্যাঙ্কের ম্যানেজাররে। হ্যালো, ম্যানেজারবাবু? হ্যালো, হ্যাঁ, বাজারী গোয়েন্দা, কোনো সুরাহা হলো নাকী?

সুরাহা বলতে, ব্যাঙ্ক থেকে পয়সা কীভাবে গায়েব হয়েছে সেটা আপনাকে বলে দিতে পারি, আপনার অফিসারকেও ছুটানোর ব্যবস্থা করতে হবে জেল থেকে, তবে ঐ টাকা নিজে থেকে আপনার কাছে ফিরে না এলে মনে হচ্ছে না পুলিশ কিছু করতে পারবে। কেনো? গেলো কোথায় এতগুলো টাকা? বলছি, বলছি। আজকের পত্রিকাটা দেখেছেন? হ্যাঁ, দেখেছি একবার  শিরোনামগুলো দেখেছেন?

হ্যাঁ, ঐ সবসময় পত্রিকায় যা থাকে, আমি আসলে ঐ খেলার পাতাটা আর ঐ বিনো  সবসময় পত্রিকায় যা থাকে, আপনাদের নিয়ে এই এক বিপদ। আরে একদিনে ত আপনি বুড়ায়ে যান নাই, কিন্তু দিনে দিনে মানুষের বয়স বাড়ে না?

হ্যাঁ, কিন্তু তার সাথে আমাদের ঐ টাকা চুরির সম্পর্ক  আচ্ছা, ভেঙে বলছি। সম্পর্কটা এই যে দিন পাল্টাতে পাল্টাতে আমরা আর টাকাপয়সা এই ধনতন্ত্রের চোখে প্রায় অভিন্ন হয়ে গেছি, আর তাই আপনার ঐ অফিসার টাকাগুলোকে মানুষ ভেবে বের হয়ে যেতে দিয়েছে। কী?

হ্যাঁ, আজকের পত্রিকাতেই ত, দেখুন না, কয়টা মানুষের খবর, আর কয়টা পয়সার। এক কাজ করুন বরং, আপনি ত ব্যাঙ্কে, একটু চারদিকে তাকান, কয়টা নোট আর কয়টা মানুষ গুনুন।

মানিব্যাগ দেখলেই ত মাথা ঘুরে যায়, আমার ওয়ালেট থেকেই দেখছি কিছু হাড় জিরজিরে নোট আমার দিকে তাকিয়ে আছে, রাস্তায় যে কাউরে দিয়ে দেবো, কারে নিয়ে কার কাছে দেবো, দেখতে ত সব এক। ও হ্যাঁ, আর একটা কাজ করুন, কিছু ষণ্ডামতন নোট আমার কাছে পাঠিয়ে দিন, পারিশ্রমিক হিসেবে। দেখে পাঠাবেন, ষণ্ডা লোক আবার না হয় যেনো! রাখি।

এই বলে ফোন রেখে দিলো বাজারী গোয়েন্দা। আর ম্যানেজার তখন সম্বিত ফিরে পেতে চারদিকে তাকিয়ে দেখে, আসলেই তাই, টেলার মেশিন মনোযোগে মানুষ গুনছে, আর আরেকদিকে একগাদা নোট লাইনে দাঁড়ানো, একেবারে সামনেরটি ভাংতি মানুষ ফেরত নিতে।

বিড়ির জন্য, আগুনের জন্য উসখুস করছে সেইসব   নোটের কেউ কেউ।

গল্পের বিষয়:
রহস্য

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত