মুখোশের আড়ালে মুখোশ

মুখোশের আড়ালে মুখোশ

বি.বাড়িয়া রেলওয়ে জংশন।
সন্ধ্যা ৭টা ৫০ মিনিট।

কিছুক্ষন আগে হালকা বৃষ্টি হয়েছিল। এখন বৃষ্টি নেই। সিগারেট হাতে ছলছল চোখে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে রোবেন। আকাশে ছোট্ট টিপের মত চাঁদ উকি দিচ্ছে। মাঝে মাঝে পাষন্ড মেঘ এসে ঢেকে দিচ্ছে সেই টিপ। দেখে মনে হয়, এ যেন চলছে আকাশের বুকে কালো মেঘ আর পুর্নিমা চাঁদের লুকোচুরি খেলা। এই খেলা দেখতে রোবেনের ভাল্লাগছে। সে সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে মুখ ভর্তি ধোয়া ছাড়ল।

অন্যদিনের মত স্টেশনে আজও অনেক ভিড়। কিছুক্ষন আগেই পারাবত এক্সপ্রেস এসে লাইনে দাঁড়িয়েছে। এরপর থেকেই মানুষজন যে যার মত ছুটাছুটি করছে। কেউ কারো দিকে তাকানোর সময় নেই। হলুদ আলোয় মানুষের এমন ছুটাছুটি দেখতে ভাল্লাগছে। রোবেন একটা টং দোকানের সামনে পাতা কাঠের ব্যাঞ্চে গিয়ে বসল। ট্রেন ছাড়তে আরো মিনিট দশেক বাকী আছে বোধহয়। এই ফাঁকে শরীর চাঙ্গা করতে এক কাপ চা খেয়ে নিলে মন্দ হয়না।

ট্রেনের ‘ঘ’ নং বগির ২৩ নাম্বার সিটে গিয়ে রোবেন বসল। সিটটা জানালার পাশে হওয়ায় সুবিধা হয়েছে। ইচ্ছে করলেই মাথা বের করে সিগারেট খাওয়া যাবে। রোবেন হাতে ঘড়ি দেখল ৮টা বাজে। ট্রেন হালকা একটু কাঁপুনি দিয়ে চলতে শুরু করল। রোবেনের পাশের সিটটা এতক্ষন খালি ছিল। এখন একটা বয়স্ক লোক এসে বসল। লোকটাকে দেখেই মনে হচ্ছে যথেষ্ট বিরক্ত করবে। রোবেন জানালা দিয়ে মুখ বের করে দিল। ঠান্ডা বাতাস এসে প্রেমিকার উষ্ণ আলিঙ্গলনের মত আলতো করে ছুয়ে দিচ্ছে। ব্যাপারটা মোটেও খারাপ লাগছে না।
পাশের সিটে বসা বয়স্ক লোকটা পান চিবুচ্ছে। জর্দ্দার কড়া গন্ধে নাকের ফুটোয় তালা লেগে যাওয়ার উপক্রম। রোবেনের আর সহ্য হচ্ছে না। মনে হচ্ছে এক্ষুনি সে বমি করে কাপড়-চোপড় সব নষ্ট করে ফেলবে। আচ্ছা উনি যে জর্দ্দাটা খাচ্ছে তার নাম কি বাবা জর্দ্দা নাকি অন্যকিছু? লোকটা একবার রোবেনের দিকে তাকাল। রোবেন সিট ছেড়ে বগির শেষপ্রান্তে দরজার সামনে গিয়ে একটা সিগারেট জালিয়ে দাঁড়াল। এখানে হালকা হলুদ আলো আসছে। সে প্যান্টের পকেটে হাত দিয়ে একটা চিঠি বের করল। চিঠিটা রোবেনের বাবার হাতে লেখা। উনি গতবছর হিমছড়ি থেকে প্রায় ১০-১৫ কি.মি. দূরে একটা পুরোনো বাড়ি কিনেছেন। বিশাল বড় পুরনো একটা বাড়ি। এই বাড়ির ছোট-খাটো বর্ননা দিয়েই পুত্রকে চিঠিটা লেখা হয়েছিল। রোবেন মৃদু আলোয় চিঠিটা মেলে ধরল।

প্রিয় পুত্র,
পত্রের প্রথমেই আমার স্নেহ আর ভালোবাসা নিও। আমি এখানে এসেছি আজ ৭দিন হল। এর মাঝে অনেক ঘটনা ঘটে গেছে। সবকিছু তোমাকে না বলা পর্যন্ত শান্তি পাচ্ছিনা। আমার ইচ্ছা তুমি তোমার ওদিককার সব কাজ কর্ম গুছিয়ে অন্তত কয়টাদিন আমার সাথে এখানে এসে কাটিয়ে যাও। তুমি আসলে মুখোমুখি বসে এখানকার সব ঘটনা খুলে বলব। আপদত তোমাকে বাড়িটা সম্পর্কে অল্প একটু লিখে চিঠিটা শেষ করছি – আমার ধারনা এই বাড়িটা এক সময় কোন রাজবাড়ি ছিল। বাড়ির ভেতরটা দেখে আমার এমনই মনে হচ্ছে। যাইহোক, তোমাকে আকৃষ্ট করার মত বাড়ির সামনে বাহারী রকমের ফুল গাছ আছে! বলা যায় ছোট-খাটো একটা ফুলের বাগান। বাড়ির পেছনে আছে মাঝারি ধরনের একটা দীঘি। শান বাঁধানো ঘাটও আছে। নিশি রাতে যখন ফুলের গন্ধে পুরো বাড়িটা মৌ মৌ করবে। তখন চাইলেই তুমি দীঘির ঘাটে বসে নিজেকে রহস্য উপন্যাসের নায়ক ভাবতে পারো। আজ এটুকুই। আশা করছি খুব শিগ্রই তোমার সাথে দেখা হবে। সেই পর্যন্ত ভালো থেকো।
ইতি
তোমার বাবা।

বাবার সাথে খুব সম্ভবত সেখানে অস্বাভাবিক কিছু একটা ঘটেছিল। যা বাবা চিঠিটে স্পষ্ট করে বলেনি। চেপে গেছে এবং আমার জন্য অপেক্ষা করছিল কখন আমি যাব? উনি হয়তো ভেবেছিলেন আমি গেলেই সব ঘটনা খুলে বলবে। কিন্তু ওখানে আসলে কি এমন ঘটেছিল যে, বাবা মাত্র তিনদিনের মাথার ধৈর্য হারিয়ে ফিরে এলেন? এসব ভাবে রোবেন। তার হাতের সিগারেটটা প্রায় শেষ পর্যায়ে। শেষ টান দিয়ে ওটা ফেলে দিল সে। তারপর চিঠিটা ভাজ করে পকেটে রাখতেই বয়স্ক লোকটা এসে তার সামনে দাঁড়াল। লোকটার ঠোটে এখন একটা সিগারেট জলছে। রোবেন সিগারেটের নাম দেখার চেষ্টা করল। লোকটা ঠোঁট থেকে সিগারেট নামিয়ে একটু হেসে বলল, এটা মার্লবুরু সিগারেট। আমি আবার এটা ছাড়া খেতে পারিনা অভ্যাস হয়ে গেছে। রোবেন কিছুক্ষন লোকটার দিকে তাকিয়ে রইল। উনার কাপড়-চোপড়ের সাথে এই সিগারেটটা কেন যেন মিলছে না। লোকটার কথা-বার্তা শুনে বুঝে নিতে হবে উনার অবস্থাটা কেমন। রোবেন জিজ্ঞেস করল, চাচা আপনি যাবেন কোথায়? লোকটা হাসল। আমরা কে কোথায় যাব তা কেউই জানিনা বাবা। সব উনি জানেন। তবে সামনের স্টেশনেই আমি নেমে যাব। আপনাকে আর বিরক্ত করবনা। তখন জর্দ্দার কড়া গন্ধে আপনার মাথা ধরিয়ে দেয়ার জন্য আমি দুঃখিত!

লোকটা পরিস্কার শুদ্ধ ভাষায় কথাগুলো বলেছে। এতে কোন গ্রাম্য বা আঞ্চলিক ভাষা ঢুকেনি। এ থেকে মনে হচ্ছে লোকটা অল্প হলেও শিক্ষিত। এবং চলাফেরা করেন স্ট্যান্ডার্ড লেভেলের মানুষের সঙ্গে। যে কারণে উনি পরিস্কার শুদ্ধ ভাষায় কথা বলে অভ্যস্থ। যেমন তেমন মানুষ পুরো শুদ্ধভাবে কথা বলতে পারেনা। উনি যেহেতু মার্লবুরু সিগারেট ছাড়া খেতে পারেনা। তাহলে উনি অবশ্যই আর্থিকভাবেও সচ্ছল। অসচ্ছল কেউ সাধারণত এত টাকায় সিগারেট কিনে খায়না। তাছাড়া আমি যে জর্দ্দার গন্ধে বিরক্ত হচ্ছিলাম। লোকটা এই ব্যাপারটাও সহজেই বুঝে ফেলেছেন। এ থেকে বুঝা যায় উনার চোখের দৃষ্টি অনেক ধারাল। এবং পর্যবেক্ষন ক্ষমতাও সেই লেভেলের। সবশেষে লোকটা দুঃখিত বলেছে। এ থেকে বুঝা যায় লোকটা নম্র ভদ্র এবং কিছুটা বিনয়ী।

ট্রেন আস্তে করে থামল। কোন ষ্টেশন এসেছে কে জানে? লোকটা ট্রেন থেকে নেমে রোবেনের দিকে তাকাল। তোমার মৃত বাবার ইচ্ছা তুমি অন্তত একবার হলেও সেই বাড়িটাতে যাও। ঐ বাড়িটাতে তোমার জন্য অনেক কিছুই অপেক্ষা করে আছে। সাবধানে থেকো।

রোবেন কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই ট্রেন ছেড়ে দিল। লোকটাও উলটো পথে হেঁটে চলে যাচ্ছে। লোকটাকে রোবেনের অনেক কিছুই জিজ্ঞেস করার আছে। অন্তত এই কথাটা জিজ্ঞেস করা দরকার ছিল, আমার বাবা চিঠি পাঠানোর তিনদিন পরই ফিরে আসেন। এবং পঞ্চমদিন সন্ধ্যেবেলায় মারা যান। কিন্তু এই ব্যাপারটা আপনি কি করে জানলেন?

ট্রেন ছেড়ে দেয়ায় কিছুই আর জিজ্ঞেস করা হল না রোবেনের। সে তার সিটে গিয়ে বসল। ঠান্ডা মাথায় ভাবলে হয়তো কোন একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করানো যাবে। লোকটা ট্রেনে থাকা অবস্থা আমাকে আপনি করে কথা বলছিল। ট্রেন থেকে নামা মাত্রই তুমি করা বলেছে। আচ্ছা লোকটা কোন ভাবে আমার ব্যাগের ভেতর বাবার ডায়রীটা পড়েনিতো?

রাত ১১টা ২০মিনিট।
কমলাপুর রেলওয়ে জংশন।

পারাবত এক্সপ্রেস এসে লাইনে দাঁড়াল। যাত্রীরা ধীরে ধীরে নেমে যাচ্ছে সব। রোবেন তার ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে উঠে দাঁড়াতেই নীচে অর্ধেক খাওয়া একটা মার্লবুরু সিগারেট চোখে পড়ল। তারমানে লোকটা এখানে বসেও সিগারেট খেয়েছে। লোকটার জন্য রোবেনের একটু মায়া হচ্ছে। মাঝে মাঝে পথে পাওয়া এমন মানুষদেরকেও আপন ভাবতে ভালো লাগে। রোবেন ষ্টেশন থেকে বের হয়ে একটা টেক্সি নিল। গন্তব্যস্থল খিলখাও।। আজ রাতটা সে তার বন্ধু আবীরের বাসায় কাটাবে। আবীরকে আগেই সব বলা আছে। কাল সকালে ওকে নিয়ে হিমছড়ি যাবে তাও বলে আছে। এবং এতে দেখা গেল এই ব্যাপারে রোবেনের চেয়েও আবীরই বেশী ইন্টারেস্টেড। রোবেন গাড়িতে উঠে চোখ বন্ধ করে বসল। টেক্সি ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে তার গন্তব্যে…

ঢাকা থেকে চিটাগং এসে একটা দিন থাকল ওরা। তারপর দিন সকালে একটা মাইক্রোবাসে করে যাত্রা শুরু করল। কক্সবাজার ছেড়ে হিমছড়ি। সেখান থেকে আরো প্রায় ১০ কি.মি দূরে ‘রাজারকুল’ নামক একটা জায়গায় এসে নামল তারা। এখান থেকে উচু নিচু পাহাড়ি রাস্তা শুরু। মাইক্রোবাস নিয়ে যাওয়া সম্ভব না। এই রাস্তা ধরে হেঁটে যেতে হবে প্রায় ৩ কি.মি. ভেতরে। আবীর বলল, আমি একটা ব্যাপার কিছুতেই বুঝতে পারছিনা। তোর বাবা এত জায়গা থাকতে এই জায়গার খবর কি করে পেল? মানে উনি কি করে জানলেন যে, এখানেই একটা পুরনো বাড়ি আছে। এবং সেটা বিক্রি করা হবে?
রোবেন কিছু বলল না। সে ব্যাগ কাঁধে নিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে। আবীর একটা সিগারেট জ্বালাল। আমি যদি আগে জানতাম এমনটা হবে! তাহলে কখনও আসতাম না। তোর সাথে আসাটাই আমার ভুল হয়েছে। ওখানে গিয়ে আবার কি হবে কে জানে? হয়তো গিয়ে দেখা যাবে আমরা ভুল ঠিকানায় চলে গেছি। তখন আবার হেঁটে হেঁটে ফিরে আসতে হবে। ডিসগাস্টিং!

রোবেনের কাছে এখানের রাস্তাটা কেমন পরিচিত মনে হচ্ছে। অথচ এর আগে সে কখনও এখানে আসেনি। সে আস্তে করে বলল, আবীর! ওরকম কিছু হবে না। আমরা ঠিক পথেই এগুচ্ছি। আবীরও কিছু বলল না। সে শুধু একবার রোবেনের দিকে তাকাল। এই তাকানোর মাঝেই ছিল প্রশ্ন! ‘সত্যিই তো’ ?

‘বাবা বাড়িটা কেনার বেশ কিছুদিন আগে থেকেই রাতে এটা ওটা স্বপ্ন দেখতেন। এবং সকালে ঘুম থেকে উঠেই সেসব স্বপ্নের দৃশ্য খুব সুক্ষভাবে ডায়রীতে লিখে রাখতেন। বাবার ঐ ডায়রীতেই একটা রাস্তার বর্ননা পড়েছিলাম মনে আছে। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে বাবার বর্ননা অনুযায়ী এই পাহাড়ি রাস্তাটা পুরোপুরি মিলে যাচ্ছে। যে কারণে রাস্তাটা আমার কাছে খুব পরিচিত মনে হচ্ছে। কিন্তু স্বপ্নের সাথে বাস্তবতা পুরোটা মিলে যায় কি করে? বাবাতো এর আগে এখানে কখনও আসেনি।’ এসব ভাবতে থাকে রোবেন। সে কিছুতেই কিছু মিলাতে পারছে না। ভাবতে হবে। প্রচুর ভাবতে হবে। আবীর বলল, পা’তো আর চলছে না বাপ! আর কতদূর? রোবেন বলল, আমরা খুব সম্ভবত চলে এসেছি। এখন কেউ একজনকে ডক্টর তাথৈ এর বাড়িটা কোথায় জিজ্ঞেস করে আগে ওখানে যেতে হবে। ‘ডক্টর তাথৈ! উনি আবার কে?’ রোবেন বলল, বাবা যার কাছ থেকে বাড়িটা কিনেছেন তিনিই ডক্টর তাথৈ। উনার সাথে একবার দেখা করা প্রয়োজন।

ডক্টর তাথৈ এর বাড়ি খুঁজে পেতে তেমন একটা বেগ পেতে হল না। একজনকে জিজ্ঞেস করতেই বাড়ি পর্যন্ত পৌছে দিয়ে গেল। তাদেরকে এখন গেস্টরুমে বসানো হয়েছে। তাথৈয়ের সাথে এখনো দেখা হয়নি। আবীর বলল, আসে পাশেতো কোন পুরনো বাড়ি দেখিনি। তাছাড়া এই গ্রামে বাড়িঘর এবং লোকজনও বোধহয় কম। আসার পথে মাত্র দুজন লোক চোখে পড়েছে। আমার মনে হচ্ছে আমরা ভুল জায়গাতেই চলে এসেছি। ‘উহু ভুল হতে পারে না। আমরা ঠিক জায়গাতেই এসেছি’ রোবেন এ কথা বলতেই একজন মধ্যবয়সী মহিলা এসে ঘরে ঢুকল। আবীর রোবেনের কানের কাছে তার মুখটা এগিয়ে এনে বলল, উনিই কি ডক্টর তাথৈ? চেহারার সাথেতো নাম মিল খাচ্ছে না। চেহারা দেখে মনে হচ্ছে ‘সখিনা বানু’ টাইপ কোন নাম হবে। রোবেন জিজ্ঞেস করল, আপনিই মিস তাথৈ?

মহিলাটা বলল, না আমি মোমেনা। ডাক্তার আপার কাজকর্ম করি। উনি এখন একটু ব্যাস্ত আছেন। আপনারা অনেক দূর থেকে এসেছেন। হাত মুখ ধোয়ে খাওয়া-দাওয়া করে বিশ্রাম করুন। সন্ধ্যায় আপা আপনাদের সাথে কথা বলবেন।

আবীর বোধহয় কিছু একটা বলতে চাচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই মহিলাটা রোবেনের হাতে একটা তোয়ালে ধরিয়ে দিয়ে বলল, ঐ কোণায় বাথরুম আছে। আপনারা হাত মুখ ধোয়ে নিন। আমি খাবারের ব্যাবস্থা করছি।

রোবেন হাতে ঘড়ি দেখল ৩টা ৭মিনিট। সন্ধ্যা হতে আরো অনেক সময়। আবীর বলল, যাক বাবা শেষপর্যন্ত পেটের একটা ব্যাবস্থা হয়েছে। পেট ঠান্ডাতো দুনিয়া ঠান্ডা। হা হা হা।

সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিট।

একটা অল্প বয়সী তরুনী চা নিয়ে ঘরে ঢুকল। মেয়েটা দেখতে অসম্ভব রুপতি। রোবেন একদৃষ্টিতে কিছুক্ষন তাকিয়ে রইল। যদিও মেয়েদের দিকে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে থাকার স্বভাব তার নেই। তবুও সে মেয়েটার চোখ থেকে চোখ সরাতে পারছে না। তার কেন জানি খুব জানতে ইচ্ছে করছে। মেয়েটা কি বিবাহিত? দেখে বুঝা যাচ্ছে না। হিন্দু মেয়েদের হাতে শাখা-পলা সিঁথিতে সিদুর এসব দেখে খুব সহজেই বুঝা যায়। কিন্তু মুসলমান মেয়েদের দেখে বুঝা যায়না। মেয়েটা চায়ের কাপ টেবিলের উপর নামিয়ে রেখে একটা চেয়ারে বসল। আপনার বন্ধুকে দেখলাম বাইরে পায়চারী করছে। আচ্ছা! আপনাদের এখানে কোন সমস্যা হচ্ছেনা তো? রোবেন মাথা নেড়ে বলল, না আমাদের কোন সমস্যা হচ্ছে না।

মেয়েটা একটা চায়ের কাপ রোবেনের দিকে এগিয়ে দিল। আমি ডক্টর তাথৈ। আপনি নিশ্চয় রোবেন চৌধুরী। আপনার বাবার মুখে আপনার অনেক গল্প শুনেছি। নিন চা খান।

রোবেন চায়ের কাপে চুমুক দিল। আসলে আমি বাবার একমাত্র আপনজন ছিলাম কিনা। তাই হয়তো বাবা আপনাকে আমার সম্পর্কে একটু বাড়িয়েই বলেছে। তবে মজার ব্যাপার কি জানেন? বাবার মুখে যখন আপনার কথা প্রথম শুনেছিলাম। তখন মনে হয়েছিল আপনি মধ্যবয়স্ক একজন মহিলা হবেন। কিন্তু এখনতো দেখছি আপনি মোটামুটি একটা বাচ্চা মেয়ে। আপনার বোধহয় এখনও বিয়ে হয়নি। তাইনা?

তাথৈ হা হা হা করে হাসল। রোবেন মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে। মেয়েটার হাসিও সুন্দর। কিছু কিছু মেয়ে আছে যাদের দেখলেই ইচ্ছে করে অন্তত একবার এই মেয়েটার প্রেমে পরি। তাথৈও সেই মেয়েদের মধ্যে একজন।

তাথৈ বলল, অনেকদিন পর আজ এত হাসলাম। তাও আপনার জন্য। বাবা মা মারা গেছে আমার ১৬ বছর বয়সে। তারপর থেকে অনেকদিন আমি হাসি না। আর আমার বিয়ের কথা বলছেন! মাত্র কয়েকদিন আগেইতো ডাক্তারি পাশ করে বের হলাম। এখনই ওসব নিয়ে ভাবছিনা।

রোবেন বলল, তারমানে আপনি এখন মোটামুটি নিঃস্বঙ্গ জীবন যাপন করছেন। এ যাবত আমার দেখা মতে, নিঃস্বঙ্গ মানুষেরা কারো অল্প একটু সঙ্গ পেলে, তুচ্ছ কারনেও হাসে। আপনিও তাদের দলে। যাইহোক, আমরা ঐ বাড়িতে কখন যাচ্ছি?

হঠাৎ প্রশ্নটা শুনতেই তাথৈ এর হাসিমাখা মুখটা কেমন বিবর্ন হয়ে গেল। হালকা একটা ভয়ের ছাপও বোধহয় চোখে-মুখে ভেসে উঠেছে। রোবেন সাহেব! আপনার বাবা যাওয়ার পর প্রায় একটা বছর কেটে গেছে। উনি মারা গেছে জানিয়ে আপনি একটা চিঠিও দিয়েছেন আমাকে। তাই আমি ধরেই নিয়েছিলাম এই বাড়িতে আর বোধহয় কেউ আসবে না। কিন্তু আজ হঠাৎ মোমেনার মুখে যখন শুনলাম আপনারা এসেছেন। তখন একই সাথে আমি আনন্দিত এবং আপনাদের সামনের দিনগুলোর কথা ভেবে কিছুটা কষ্টও পাচ্ছি। তবে যাইহোক, আজ রাতটা আপনাদের এখানেই থেকে যেতে হবে। কাল সকালে চাচাকে দিয়ে আপনাদের যাওয়ার ব্যাবস্থা করব।

তাথৈ উঠে চলে গেছে। মেয়েটা কিছু একটা চেপে গেছে বুঝাই যাচ্ছে। এবং উনি কোন কারণে চাইছিলনা কেউ এই বাড়িটাতে আবার ফিরে আসুক। কিন্তু কেন? তাছাড়া সামনের দিনের কথা ভেবে কষ্ট হচ্ছে। এই কথাটাই বা কেন বলল? আর আমার দেয়া চিঠি! এই কথাটাই বা বলল কেন? উফ! পুরো ব্যাপারটা পরিস্কারতো হচ্ছে না-ই। বরং আরো ঘোলাটে রুপ ধারন করছে।

রাত তেমন বেশী হয়নি। ১১টা ৭মিনিট। আবীর ঘুমিয়ে পরেছে। কিন্তু রোবেনের ঘুম আসছে না। সে ব্যাগ থেকে তার বাবার লেখা ডায়রীটা বের করল। তখন এই ডায়রীটাকে কেবলই একটা ডায়রী ভাবলেও। এখন এটা শুধুমাত্র একটা ডায়রী নয়। এই মুহুর্তে এটা খুবই গুরুত্বপুর্ন একটা জিনিসে পরিনত হয়েছে। যেহেতু এর ভেতরের বর্ননার সাথে এখানকার রাস্তার মিল পাওয়া গেছে। রোবেন টেবিল ল্যাম্পের নীচে ডায়রীটা মেলে ধরল। ডায়রীর প্রথম বেশ কয়টা পৃষ্টা খালি। লেখা শুরু হয়েছে ‘২-ফেব্রুয়ারী’ এই পৃষ্টা থেকে। ডায়রীতে বাবার প্রথম লেখাটা এমন –

‘‘দু-একদিন ধরে রাতে আমি বেশ অদ্ভুত একটা স্বপ্ন দেখছি। অদ্ভুত বলছি কারণ হল স্বপ্নটা দেখছি আমি ধারাবাহিকভাবে। অনেকটা ধারাবাহিক নাটক বা সিরিয়ালের মত প্রথম পর্ব, দ্বিতীয় পর্ব, তৃতীয় পর্ব এভাবে। যেমন প্রথম দিন স্বপ্নটা যতটুক দেখে আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়। তারপর দিন ঠিক এরপর থেকেই স্বপ্নটা আবার শুরু হয়। আরো পরিস্কার করে বলা যায়, ‘স্বপ্নের শুরুটা হয়েছে একটা রাজপ্রাসাদে। আমি সেখানে রাজকীয় পোশাক পরে একটা সিংহাসনে বসে আছি। কেউ একজনকে সেখানে ধর্ষনের দায়ে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এবং আমি সেই অভিযোগের বিচার কার্য পরিচালনা করছি’। প্রথমদিন এতুটুকু দেখতেই আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়। দ্বিতীয় দিন স্বপ্নটা শুরু হয় প্রথমদিনের শেষ অংশটা থেকে। সাধারণত কোন স্বপ্ন দেখলে সকালে স্বপ্নের ঘটনাটা আমার মনে থাকেনা। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার এই স্বপ্নটা আমি ভুলে যাচ্ছিনা। এমনকি নিজে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করেও না। স্বপ্নের দৃশ্যগুলো বরং সারাক্ষণই আমার মাথার ভেতর ঘুরপাক খায়। এবং একধরনের চিনচিনে ব্যাথার জন্ম দেয়।’’

এতটুকু পড়েই রোবেন ডায়রীটা বন্ধ করল। বাবার এমন ধারাবাহিক ভাবে স্বপ্ন দেখার ব্যাপারটা মোটেও স্বাভাবিক লাগছে না। মানুষ আজ একটা স্বপ্ন দেখেতো আরেকদিন অন্য একটা। কিন্তু ধারাবাহিক ভাবে দেখে যাওয়া…?
আচ্ছা! স্বপ্ন বিষয়ক কোন বই পড়লে কি এ ব্যাপারে কোন তথ্য পাওয়া যাবে? হয়তো যাবে। কিন্তু এমন কোন বইতো সাথে করে আনা হয়নি। মিস তাথৈকে বলে যদি কোন একটা বই যোগার করা যায়। এছাড়া মাথায় আর কিছুই কাজ করছেনা। টেবিলের উপর থেকে সিগারেটের প্যাকেটটা হাতে নিয়ে রোবেন বাইরে এল। আকাশ অন্ধকার! বাবা এই অন্ধকারের নাম দিয়েছিল ‘কাজলা দিদির রাত্রী’ এই রাত্রীতে নাকি কাজলা দিদিরা সব মনের আনন্দে ঘুরে বেড়ায়। বাবার যতসব ছেলেমানুষি কথাবার্তা। বলেই নিজ মনে হেসে উঠল রোবেন। তারপর একটা সিগারেট জ্বালিয়ে ঠোঁটের ভাজে রাখতেই হঠাৎ তার মনে হল, বাবার লেখাটার মাঝে অনেকগুলো গুরুত্বপুর্ন তথ্য আছে। এগুলো ধরে সামনে এগুনো যেতে পারে। সে মনে মনে কয়টা লাইন পয়েন্ট আকারে লিখে নিল এভাবে –

I. স্বপ্নের ধরনঃ ধারাবাহিক। (আজ যেখানে শেষ কাল সেখান থেকে শুরু)

II. স্থানঃ একটা রাজবাড়ি।

III.সাধারণত স্বপ্নের ঘটনা মনে থাকে না। কিন্তু এই স্বপ্নটা মনে থাকছে। শুধু যে থাকছে তা না। খুব ভালো ভাবেই থাকছে।

IV. স্বপ্নের ঘটনাঃ বিচারকার্য পরিচালনা।

V. স্বপ্নে পরিহিত পোশাকঃ রাজকীয় পোশাক।

রোবেন সিগারেটে একের পর এক টান দিতে লাগল। আচ্ছা! এই তথ্যগুলো থেকে কোন ব্যাখ্যা কি দাঁড় কারানো সম্ভব? অবশ্যই সম্ভব! তবে এখনই ব্যাখ্যা দাড় করিয়ে কোন সিদ্ধান্ত নেয়া ঠিক হবে না। আরো একটু সময় নিতে হবে।

সকাল ৮টা ১৮ মিনিট।

রাতে আবীরের খুব ভালো ঘুম হয়েছে। সে এখন বাইরে হাটা হাটি করছে। কিন্তু রোবেনের রাতে একদম ঘুম হয়নি। যে কারণে তার চোখজোড়া লাল হয়ে আছে। রাতে সে আবারও তার বাবার ডায়রীটা নিয়ে বসেছিল। প্রায় অর্ধেকটার মত পড়া শেষ করে ফেলেছে সে। এতটুকু লেখা থেকে মোটামুটি একটা সিদ্ধান্তে আসা যায়। কিন্তু জোর দিয়ে এখনো কিছুই বলা যাবে না। রোবেন সিগারেটের প্যাকেটে হাত রাখতেই তাথৈ এসে ঘরে ঢুকল। ব্রেকফাস্ট দেয়া হচ্ছে। আপনি ফ্রেশ হয়ে নিন। আর শুনুন এত সিগারেট খাওয়া কিন্তু ঠিক না। কাল রাতে আপনি বেশ কটা সিগারেট খেয়ে ফেলেছেন। এখন আর খাবেন না। প্লিজ!

রোবেন সিগারেটের প্যাকেটটা রেখে দিল। তাথৈ কোন ভাবে গতরাতে সিগারেট খাওয়ার ব্যাপারটা দেখে ফেলেছে। এসব মেয়েরা সাধারণত সিগারেট খাওয়া ছেলেদের খুব একটা পছন্দ করেনা। কিন্তু এখনই উনার চোখে অপছন্দের পাত্র হওয়া ঠিক হবে না। রোবেন বলল, ইয়ে মানে… রাতে ঘুম আসছিলনা তাই একটু…
তাথৈ মুচকি হাসল। হুম! বুঝেছি। আপনি যান। ফ্রেশ হয়ে আসুন। আমি মোমেনাকে দিয়ে আপনার জন্য ব্রেকফাস্ট পাঠাচ্ছি। রোবেন তোয়ালে নিয়ে বাথরুমে ঢুকল।

তাথৈ নিজেই তাদেরকে নিয়ে পুরনো বাড়িটার মুল ফটকের সামনে এসে দাঁড়াল। আবীর অবাক হয়ে বাড়িটা দেখছে। এত পুরনো একটা বাড়ি। অথচ এখনও কত জীবন্ত। বাইরের দেয়ালে আঁকা কয়েকটা শিল্পকর্ম নজর কাড়ার মত। রোবেন! আমি এখনো বিশ্বাস করতে পারছিনা। এত বড় একটা বাড়ির সামনে আমি দাঁড়িয়ে আছি। রোবেন কিছু বলল না। সে ধীরে ধীরে বাড়ির ভেতরে এগিয়ে যাচ্ছে। তার পিছু পিছু যাচ্ছে তাথৈ। আবীর তাদের সাথে যায়নি। সে তার নিজের মত করে এদিক ওদিক ঘুরে দেখতে লাগল। তাথৈ বলল, জানেন রোবেন! এই বাড়িটাতে ছোট বড় সব মিলিয়ে ৩২টার মত ঘর আছে।

রোবেন বলল, উহু ৩২টা না। এখানে সব মিলিয়ে ঘর আছে ৩৫টা। এবং সব কটা ঘরেই একটা করে খাট আছে। অন্যান্য আসবাবপত্রের সঠিক হিসেবটা বলা যাচ্ছে না। তবে পুরো বাড়ি জুড়ে জানালা আছে মোট ৭১টা। সামনে পেছনে দরজা আছে ৬৭টা। আর বাড়ির পেছনে আছে একটা দিঘী। দিঘীর শান বাঁধানো ঘাটের পাশে দুইটা কড়ই গাছও থাকার কথা।
বিস্ময়ে তাথৈ এর চোখ কপালে উঠে গেল। আমি নিজে গুনে দেখেছি ঘর ৩২টা। আর আপনি না গুনেই বলছেন ৩৫টা? তাছাড়া দরজা জানালা গাছ এসবই বা আপনি জানলেন কিভাবে? রোবেন বলল, আপনাকে সব বলব। কিন্তু তার জন্য একটু সময় দরকার। আপনার হাতে সময় আছেতো?
তা আছে। কিন্তু…

রোবেন তাথৈকে ‘কিন্তু’তেই থামিয়ে দিল। তারপর তার ব্যাগ থেকে বাবার ডায়রীটা বের করে তাথৈয়ের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, আপনি আমার বাবার লেখা এই ডায়রীটা পড়ুন। আমি এই ফাঁকে আপনাদের দিঘীটা দেখে আসি। তাথৈ ডায়রীটা হাতে নিতেই রোবেন বলল, ও আচ্ছা একটা কথা জানার ছিল। এই বাড়িটা বিক্রি হবে এমন কোন বিজ্ঞপ্তি কি আপনি কোথাও দিয়েছিলেন? পত্র-পত্রিকা, মিডিয়া বা অন্য কোথাও? যার সুত্র ধরে আমার বাবা আপনার সাথে যোগাযোগ করেছিল?

তাথৈ বলল, নাহ! এমন কিছু হয়নি। আসলে এই বাড়িটা বিক্রি করব এমন কথা আমি কখনও ভাবিনি। হঠাৎ একদিন আপনার বাবা এসে উপস্থিত! উনি এই বাড়িটা কিনতে চাইলেন। কিন্তু আমি কোন একটা কারনে এটা বিক্রি করতে চাইছিলাম না। আপনার বাবাও নাছড়বান্দা! উনি এটা কিনবেনই। শেষে উনার প্রবল আগ্রহের কাছে আমি মত বদল করলাম। ১২ লাখ টাকায় বাড়িটা বিক্রি করে দিলাম।
রোবেন মনে মনে বলল, তারমানে আমি যা ভাবছিলাম সেটাই। ওকে তাথৈ! আপনি বরং কোথাও বসে ডায়রীটা পড়ুন। আমি দিঘীর ঘাটে আছি। বাকি কথা ওখানেই হবে।
তাথৈ ডায়রীটা এপিঠ ওপিঠ উল্টে দেখল। খুব সাদামাটা একটা ডায়রী। কিন্তু উনি হঠাৎ করে এটা কেন পড়তে দিল কে জানে? তাথৈ একটা চেয়ার টানল। অনেক পুরনো দিনের জিনিস! তাই কেমন নড়বরে হয়ে গেছে। তাথৈ সাবধানে চেয়ারটায় বসে ডায়রীটা খুলে পড়তে শুরু করল।

রোবেন দিঘীর এমাথা থেকে ওমাথা পর্যন্ত একবার ভালো করে দেখে নিল। আশে পাশে কোন বাড়ি ঘর নেই। কোন লোকজনও চোখে পড়লনা। সে হাটতে হাটতে দিঘীর ঘাটে গিয়ে বসল। সুন্দর শান বাঁধানো ঘাট। এখান থেকে কয়েক পা এগুলেই সিড়ি নেমে গেছে পানি পর্যন্ত। পানিটা খুব পরিস্কার। দেখলেই হাত ভেজাতে ইচ্ছে করে। রোবেন নীচে নেমে হাত মুখ ধুলো। পানিটা বেশ ঠান্ডা। ঘাটের দুপাশে বিশাল দুইটা কড়ই গাছ থাকায় এখানে রোদ একদমই পরে না। বাবা এই গাছের কথাই ডায়রীতে লিখেছিল। আরো বলেছিল “তুমি চাইলেই গভীর রাতে দিঘীর ঘাটে বসে নিজেকে রহস্য উপন্যাসের নায়ক ভাবতে পার”। বাবা এখন নেই। অথচ……
তাথৈ ডায়রী পড়া শেষ করে রোবেনের পাশে এসে বসল। ডায়রীটা শেষ করতেই তার মাথার ভেতর একধরেন চিনচিনে ব্যাথা শুরু হয়েছে। যদিও তার মাথা ব্যাথাটা প্রায় সময়ই করে। কিন্তু এখনকার ব্যাথাটা অন্যদিনের মত মনে হচ্ছে না। একটু জানি কেমন কেমন।

রোবেন জিজ্ঞেস করল, ডায়রীটা পড়ে আপনি কিছু বুঝতে পেরেছেন? তাথৈ মাথা নেড়ে বলল, নাহ! তবে আমি প্রচণ্ড শকড! এটা কি করে সম্ভব? আমি কিছুই বুঝতে পারছিনা। রোবেন দিঘীর ঘাটে ডান পাশে যে কড়ই গাছটা আছে। সেটার নীচে বার বার তাকাচ্ছে। ওখানে ম্যানুয়েলের ডাকনার মত কিছু একটা দেখা যাচ্ছে। আচ্ছা! বাবা এটা নিয়ে ডায়রীতে কিছু কি লিখে গেছে? রোবেন মনে করার চেষ্টা করল। কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারলনা। মাঝে মাঝে প্রয়োজনীয় ব্যাপারগুলো মেমরী কেন যেন খুঁজে পায় না! শিট!

তাথৈ বলল, রোবেন! আপনি চুপ করে আছেন কেন? অন্তত কিছু একটা বলুন। এটা কি করে সম্ভব? একটা মানুষ দিনের পর দিন স্বপ্ন দেখে ডায়রী লিখে গেল। আর সেটা কিনা পুরোপুরি বাস্তবের সাথে মিলে যাবে? কিভাবে?

রোবেন বলল, ধরুন টেলিভিশনে একটা ২০০ পর্বের ধারাবাহিক নাটক বা সিরিয়াল শুরু হয়ে এখনও চলছে। আপনি কোন কারণে ১০০পর্ব পর্যন্ত দেখেন নি। আপনি দেখা শুরু করলেন ১০১পর্ব থেকে। সেক্ষেত্রে অবশ্যই আপনি ১০০পর্ব পর্যন্ত কি হয়েছে সেটা জানতে পারবেন না। আমার ধারনা! বাবার ক্ষেত্রেও ঠিক এই ঘটনাই ঘটেছে।
তাথৈ বলল, দেখুন আমি এখনো কিছু বুঝতে পারছিনা। আপনি আমাকে একটু সহজ করে খুলে বলবেন?

হুম! তাহলে আপনাকে সহজ করেই বলি। ব্যাপারটা হল এমন, বাবার আগের জন্মের একটা নির্দিষ্ট সময়ের স্মৃতিগুলো স্বপ্নের মাধ্যমে বর্তমানে ফিরে আসছিল। খেয়াল করবেন ‘নির্দিষ্ট সময়ের’ স্মৃতি। যেমন উনার স্বপ্নটা শুরু হয়েছে একটা রাজপ্রাসাদে। সেখানে উনি বিচার কার্য পরিচালনা করছিলেন। কিন্তু এর আগে কি হয়েছে বা না হয়েছে এসব কিন্তু বাবা মনে করতে পারতোনা। কিন্তু ঠিক এই ঘটনা থেকে এর পরের স্মৃতিগুলো একে একে বাবার মাঝে ফিরে আসছিল। যে কারণে উনি ধারাবাহিকভাবে স্বপ্নটা দেখতে শুরু করেন।

তাথৈ ঘামতে শুরু করল। মেয়েটা এমনিতেই সুন্দর। তার মাঝে মুখে ঘামের ছোট্ট ছোট্ট বিন্দু জমায় আরো সুন্দর লাগছে। তারমানে এই বাড়িটাই যে সেই রাজপ্রাসাদ ছিল। এতে কোন সন্দেহ নেই আপনার?
অবশ্যই না। আপনি ইতিহাস ঘেটে দেখুন। হয়তো আরো কিছু জানতে পারবেন। তাথৈ বলল, সে নাহয় দেখলাম। আচ্ছা! আপনার বাবার এই ব্যাপারটা নিয়ে কোন specialist এর সাথে কথা বলেন নি?
রোবেন পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করল। ভেতরে একটাই মাত্র সিগারেট আছে। এটা জ্বালাতে যাবে ঠিক সেই মুহুর্তে তার মনে হল, তাথৈ সিগারেট পছন্দ করে না। ওর সামনে সিগারেট জ্বালানোটা ঠিক হবে কিনা সে বুঝতে পারছেনা। সে কয়েক সেকেন্ড কি যেন ভাবল। তারপর সিগারেটটা ছুড়ে ফেলে দিল।

তাথৈ বলল, সিগারেট ফেলে দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ! এখন বলুন আপনি কারো সাথে এই ব্যাপারটা নিয়ে কথা বলছিলেন?
আহ… আসলে বাবার ব্যাপারটা নিয়ে কারো সাথে যে কথা বলিনি তা না। আমি একজন Psychologist এর সাথে কথা বলেছিলাম। উনি যা বললেন তা হচ্ছে, ‘Hippocampalgyrus’ বা ‘Memory centre’ মানুষের মস্তিস্কের এমন একটা অংশ বা এলাকা। যেখানে মানুষের নতুন এবং পুরাতন সব স্মৃতি জমা হয়ে থাকে। এই ‘Hippocampalgyrus’ অনেক সময় অনেক ভাবেই জেগে বা নড়ে উঠতে পারে। যেমন – কাসর ঘন্টার ধ্বনি, ‘ওম’ শব্দের উচ্চারন সহ আরো অনেক ভাবেই হতে পারে। এবং এটা যখন হয় তখন ‘Brainwave’ এ 3.5 Hz প্রতিধ্বনি সৃষ্টি করে। যার ফলে মানুষের পুরাতন স্মৃতি। এমনকি অতীত জীবনের স্মৃতিও ফিরে আসতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, কারো এই সমস্যাটা যদি এভাবে দিন দিন বাড়তেই থাকে। তবে পুরনো স্মৃতি যেগুলো ফিরে আসছে। সেগুলো স্থায়ী হয়ে বর্তমান স্মৃতিগুলো ধীরে ধীরে মুছে যেতে পারে। আবার এমনও হতে পারে, অতীত এবং বর্তমান দুইটা স্মৃতি-ই একসাথে থেকে গেল। এক্ষেত্রে তখন ব্রেইনে প্রচণ্ড রকমের চাপ পরবে। এমনকি এর ফলে ব্রেইনস্টোক করে মানুষ মারাও যেতে পারে।

রোবেন একটু থেমে বলল, এবং তাই হয়েছে। এখান থেকে যাওয়ার পর বাবা ব্রেইনস্টোক করেই মারা যান। যাওয়ার আগে আমাকে বলে গেছে অন্তত একবারের জন্য হলেও আমি যেন এখানে আসি। বাবা হয়তো চেয়েছিল আমি উনার সমস্যাটা কোথায় সেটা খুঁজে বের করি। বলতে পারেন এজন্যই আমার এখানে আসা। এবং আমি বোধহয় এই সমস্যাটা সমাধান করতে পেরেছি। কিন্তু এখানে আসার পর বাবার সাথে সম্ভবত কিছু একটা ঘটেছিল। যা বাবা চিঠিতে আমাকে বলতে গিয়েও বলেনি। এখন এই রহস্যটাই আমাকে সমাধান করতে হবে। আচ্ছ মিস তাথৈ! আপনি তখন বলছিলেন কোন কারণে বাড়িটা বিক্রি করতে চাচ্ছিলেন না। কারণটা কি আমি কি জানতে পারি? আসলে জানাটা আমার খুব দরকার। আপনি কিছু লুকুবেন না। প্লিজ।

তাথৈ একমুহুর্ত কি যেন ভাবল। তারপর বলতে শুরু করল – আসলে এই বাড়িটা প্রায় ১৯ বছর ধরে পরিত্যাক্ত অবস্থায় পরে আছে। আমার দাদাজান মারা যাওয়ার পর থেকেই এই বাড়িতে নানারকম অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটত। অস্বাভাবিক ঘটনা মানে Exactly কি এমন হত তা আমি বলতে পারছিনা। কেননা তখন আমি অনেক ছোট ছিলাম। বাড়ির মানুষজন নানারকম সমস্যার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল। তারপর একসময় বাবা ঠিক করলেন এই বাড়িতে থাকা আর সম্ভব না। আমরা চলে গেলাম অন্য একটা বাড়িতে। তখন থেকে এই বাড়িটা পুরোপুরি ফাঁকা। এরপর গ্রামের কিছু লোকজন কৌতূহলবশত বাড়ির ভেতর যেত। তখন নাকি অনেকেই কোন না কোন রকম অস্বাভাবিক ঘটনার মুখোমুখি হয়েছে। এ থেকেই লোকমুখে বাড়িটা অভিশপ্ত। এজন্যই দেখুন না! এই বাড়ির আশে পাশে আর কোন বাড়িঘর নেই। যাদের ছিল তারাও ভয়ে চলে গেছে। এজন্যই আমি বাড়িটা বিক্রি করতে চাইছিলাম না।

রোবেন বলল, অস্বাভাবিক ঘটনা মানে কি ভৌতিক কিছু? আপনি এসবে বিশ্বাস করেন? তাথৈ বলল, যদিও এসব কারনেই বাবা বাড়িটা ছেড়ে দিয়েছিল। তবে আমার সাথে কখনও এমন কিছু ঘটেনি। তাই আমার বিশ্বাস করারও কোন অবকাশ থাকে না। তবে গ্রামের লোকমুখে যেহেতু শুনতে হচ্ছে। তখন বিশ্বাস না করলেও মানতে তো হবে। তাই না?

আচ্ছা এসব ঠিক কি কারণে হচ্ছে। আপনারা কখনও জানার চেষ্টা করেন নি? তাথৈ বলল, কে চেষ্টা করবে বলুন? মানুষ হয়ে কি আর ভুত-প্রেতের সাথে লড়াই করা যায়? তাও আবার সাধারণ মানুষ হয়ে! আসলে এই গ্রামে এত সাহসী মানুষ একজনও নেই। যাইহোক, আপনি যদি এই ব্যাপারে কিছু করতে চান। আমি আপনাকে আমার সাধ্য মত সাহায্য করব। এখন আমি যাই। আমাদের অনেক পুরনো একজন লোক আছে। বশির চাচা। উনাকে পাঠিয়ে দেব। আপনাদের দেখাশুনা করবে। আর হ্যা! আপনারা অবশ্যই সাবধানে থাকবেন। কেমন? আসছি।

দুপুর ১টা ৫৩ মিনিট।

আবীর বাড়ির মুল ফটকের পাশেই মেঝেতে বসে আছে। এখানটায় রোদ আসে না। সামনে নানা জাতের ফুলের গাছ। বাতাসের ঝাপ্টায় এক একটা ফুলের ঘ্রাণ এসে নাকের ডগা ছুয়ে দিচ্ছে। সব মিলিয়ে বই পরার জন্য জায়গা এবং সময় দুটাই একেবারেই পার্ফেক্ট। আবীর তার হাতে রবি ঠাকুরের কবিতার বইটা মেলে ধরল। কবিতার নাম ‘রাহুর প্রেম’। মাঝে মাঝেই এই রাহু এসে তার মাথা এলোমেলো করে দিয়ে যায়। এখনও দিচ্ছে –

“কিবা সে রোদনে কিবা সে হাসিতে,
দেখিতে পাইবি কখনো পাশেতে,
কখনো সমুখে কখনো পশ্চাতে,
আমার আধার কায়া।
গভীর নিশীতে একাকী যখন
বসিয়া মলিন প্রানে,
চমকি উঠিয়া দেখিবি তরাসে আমিও
রয়েছি বসে তোর পাশে
চেয়ে তোর মুখ পানে।”

একজন বয়স্ক লোক টিফিন ক্যারিয়ার হাতে করে আবীরের সামনে এসে দাঁড়াল। লোকটার চুল দাঁড়ি দেখে মনে হচ্ছে মাত্র দু-একদিন আগে রঙ করিয়েছে। এই বয়সের বুড়োরা এটা করে যে কি আনন্দ পায় কে জানে! কে আপনি?
বুড়ো লোকটা বলল, আমি বাশার। তাথৈ মা আপনাদের জন্য খাবার পাঠিয়েছে। আবীর বলল, ও আচ্ছা! আপনি বাশার চাচা। ওকে এটা দিন আমাকে। লোকটা টিফিন ক্যারিয়ার আবীরের হাতে দিল। সাহেব! একটা কথা ছিল বলব?

কি কথা বলুন। লোকটা কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গেল। বলল, না থাক! পরে এক সময় বলব। আমি এখন যাই। আবীর বলল, শুনুন! এখনতো খাবার চলে এল। কিন্তু রাতের জন্যতো একটা ব্যাবস্থা করতে হবে। নাকি? লোকটা বলল, সে ব্যাবস্থা হয়ে যাবে সাহেব। আপনি চিন্তা করবেন না। আমি আসি।

রোবেন পুরো বাড়ির ভেতরটা আবারও ঘুরে দেখতে শুরু করল। কারণ ঘর সংখ্যা এখনো ৩২টা। কিন্তু বাবা ডায়রীতে লিখে গেছে ৩৫টা। তাহলে বাকী তিনটা ঘর কোথায়? তাছাড়া বাবা এই বিষয়টা ডায়রীতে পরিস্কার করে লিখে যায়নি কেন? উনি লিখেছেন এভাবে – ‘৩২টা+(৩টা) = ৩৫টা ঘর’। এভাবে লেখার কারণ কি? রোবেন ভাবতে লাগল। যে করেই হোক এই লেখার মানে খুঁজে বের করতেই হবে। তাছাড়া মাত্র তিনটা ঘরের ব্যাবধানে বাড়ির মোট দরজা সংখ্যা ৬৭ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৪৩ এ! তারমানে বাকী তিনটা ঘরেই আছে ২৪টা দরজা! কিন্তু কেন? মাত্র তিনটা ঘরে এতগুলো দরজা থাকবে কেন?
সকাল ৭টা ২০মিনিট।

বাড়ির সেন্টার রুম। এই রুমটা অনেক বড়। যে কারণে এটাকে এখন ড্রয়িং রুম হিসেবে ব্যাবহার করা হচ্ছে। বাড়ির মুল ফটক দিয়ে ঢুকলেই এই রুমটা আগে পরে। এবং অন্যান্য ঘরে যেতে হয়ে এই ঘরটা থেকেই। রোবেন তার ঘর থেকে বের হয়ে এই সেন্টার রুমে এসে দাঁড়াল। কেননা, কাল রাতে সে তার বাবার ডায়রীটা নিয়ে আবারও বসেছিল। এই ডায়রীটা যতবার পড়া হচ্ছে ততবারই কোন না কোন নতুন তথ্য বের হচ্ছে। যেমন গত রাতে বের হয়েছে সিংহাসনের অবস্থান। বাড়িটার মুল ফটক দিয়ে ঢুকে সোজা প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাত সামনের জায়গাটা একটু উচু করে বানানো হয়েছে। এই জায়গাটার উপরই একটা রাজকীয় সিংহাসন বসানো। তার মানে এই ঘরটাই আগে বিচার/রাজ সভা হিসেবে ব্যাবহার করা হত। এবং বাবার স্বপ্নের শুরুটা হয়েছে এখান থেকেই। কিন্তু এটা ঠিক কতদিন আগের ঘটনা হতে পারে? ১০০ বছর, ২০০ বছর, নাকি তারও বেশী? ভাবে রোবেন। সে ধীরে ধীরে সিংহাসনের দিকে এগিয়ে গেল। পেছনে কেউ একজন অচেতন অবস্থায় পরে আছে। রোবেন মানুষটার কাছে যেতেই দেখল এটা আর কেউনা। আবীর! কিন্তু ও এখানে আসল কেমন করে? তাছাড়া ওর এই অবস্থাই বা হল কি করে? তাহলে কি ওর সাথে…… ওহ গড!

আবীরকে তার রুমে বিছানায় শুইয়ে দেয়া হয়েছে। তাথৈ দেখে বলল, আমি কিছু মেডিসিন দিয়ে যাচ্ছি। আশাকরি ঠিক হয়ে যাবে। আর আপনি আমার সাথে একটু বাইরে আসুন তো। রোবেন তাথৈয়ের সাথে সাথে ঘর থেকে বের হয়ে এল। তাথৈ! আবীরের তেমন কিছু হয়নিতো?
তাথৈ বলল, না না তেমন কিছু হয়নি। তবে আমার ধারনা কোন কারনে উনি প্রচন্ড ভয় পেয়েছেন। এবং এখানে এমনটা হওয়াই স্বাভাবিক। এটা আমি আপনি সবাই জানি। বাই দ্যা ওয়ে, উনার এখন বিশ্রাম প্রয়োজন। আপনার কাছে একটা রিকুয়েস্ট! এখানে থেকে অযথা বিপদ ডেকে এনে লাভ কি বলুন? তার চেয়ে আপনার বাড়ি কেনার টাকাটা নিয়ে চলে যান। রোবেন বলল, এখান থেকে এভাবে আমি চলে যেতে পারিনা। আমাকে এই রহস্য সমাধান করতেই হবে। তাছাড়া লাইফের ফার্ষ্ট মিশনেই আমি ফেইল করতে চাইনা।

তাথৈ বলল, জানতাম আপনি রাজী হবেন না। কারন আপনি এসেছেনই এসব নিয়ে ঘাটাতে। আমার আর কিচ্ছু বলার নেই। কিচ্ছুনা। আমি আসছি। আপনারা সাবধানে থাকবেন।
রোবেন এসে আবীরে পাশে বসল। তোর এই অবস্থা দেখে আমার সত্যি খুব খারাপ লাগছে। আচ্ছা! তোর সাথে Exactly কি এমন হয়েছিল আমাকে একটু খুলে বলবি? মানে তুই আসলে ঐ সিংহাসনের পেছনে কেন গিয়েছিলি? আবীরের চোখে-মুখে আবারও ভয়ের চাপ ফুটে উঠেছে। সে শোয়া থেকে উঠে বসার চেষ্টা করল। রোবেন ধরে উঠিয়ে দিল। আবীরের শরীর কাঁপছে। এ থেকে রোবেনের বুঝতে বাকী রইলনা যে, আবীর কি পরিমানে ভয় পেয়েছে।

আবীর বলতে শুরু করল, আসলে কাল রাতে বশির চাচা আমাকে দু-বোতল হুইস্কি দিয়ে গিয়েছিল। আমি বোতল দুইটা আগ্রহ নিয়ে রাখলাম। যেহেতু এর আগে এসব আমি খাইনি। রাত তখন দুইটা কি আড়াইটা হবে। আমার ঘুম আসছিলনা। ভাবলাম ড্রয়িং রুমে ঐ সিংহাসনের মত চেয়ারটায় বসে বোতলটা খুলব। আমি ধীরে ধীরে সিংহাসনটার উপর গিয়ে বসলাম। নিজেকে তখন রাজা রাজা মনে হচ্ছিল। মানে তখনকার ফিলিংসটা আমাকে এতটাই নাড়া দিয়েছিল যে, আমি ভুলেই গিয়েছিলাম এই বাড়িটা অন্যসব বাড়ির মত নিরাপদ নয়। এখানে যেকোন সময় যেকোন কিছু হতে পারে। আর আমার…আমার সাথেই…. এতটুক বলেই আবীর হাপিয়ে উঠল। পা… পানি! পানি খাব।

রোবেন পানির গ্লাস এগিয়ে দিল। আবীর এক চুমুক পানি খেয়ে আবার বলতে শুরু করল – আমি বোতলের মুখটা খুলেছি মাত্র। হঠাৎ করে চেয়ারটা হালকা একটু কেঁপে উঠল। আমি মনের ভুল ভেবে পাত্তা দেইনি। তারপর আমি যখন বোতলটা মুখে দিতে যাব ঠিক তখনই কিছু বুঝে উঠার আগে আমি পেছনে উল্টে পরলাম। সাথে সাথে আমার হাতের বোতলটা পরে ভেঙ্গে গেছে। আমি ভাবলাম চেয়ারটা অনেক পুরনো তাই হয়তো কোথাও ভেঙ্গে-টেঙ্গে গেছে বলে পরে গেছি। নিজেকে সামলাতে আমার প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ সেকেন্ড সময় লেগেছিল। তারপর উঠে দেখি চেয়ারটা জায়গামতই আছে। অথচ আমার পুরোপুরি মনে আছে আমি চেয়ারটা সহ উল্টে পরেছিলাম।
তারপর কি ভেবে আমি চেয়ারটায় আবারো বসতে এগিয়ে গেলাম। ঘর অন্ধকার থাকায় পুরোপুরি কিছু দেখা না গেলেও বুঝা যাচ্ছিল চেয়ারটায় কেউ একজন বসে আছে। আমি মানুষটার মুখ দেখার চেষ্টা করলাম। ঠিক তখনই কোথায় যেন দপ করে আগুন জলে উঠল। আর আমি নিজের চোখে দেখলাম জগতের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দৃশ্য। একটা মানুষের মুখ এতটা কুৎসিত! এতটা বীভৎস হতে পারে আমি জানতাম না। আমি জীবনে কল্পনাও করিনি কখনও এমন কিছু। আস্তে আস্তে আগুনটা বাড়তে লাগল। আর আমি দেখলাম মানুষটার মুখ থেকে লালা ঝরার মত করে রক্ত ঝরে পরছে। উফ! কি ভয়ঙ্কর সেই দৃশ্য!
আবীর উত্তেজিত হয়ে গেছে। তার শরীরের কাঁপুনিটাও বেড়ে গেছে। রোবেন বলল, ওকে আবীর শান্ত হ’। আর বলতে হবে না। যা বোঝার আমি বুঝে গেছি। তুই শান্ত হয়ে বোস।

পা…পানি খাব। রোবেন পানির গ্লাসটা আবারও এগিয়ে দিল। তুই এবার বিশ্রাম কর। আমি একটু আসছি। কেমন?
রোবেন ড্রয়িং রুমে এসে দেখল। কোথাও কিছু নেই। না সিংহাসনের কিছু ভাঙ্গা আছে। না আছে কোন রক্তের ছিটে ফোঁটা। তাহলে কি এটা সত্যি কোন ভৌতিক কিছু ছিল? উহু! কেন জানি মন মানতে চাইছেনা। নিশ্চয় এখানে অন্য কোন ঘটনা আছে। এবং সেটাই আমাকে খুঁজে বের করতে হবে। রোবেন আরো কিছু সময় খুজা-খুজি করল। যদি কোন ক্লু পাওয়া যায়। যেটা দিয়ে অন্তত মনকে বুঝানো যাবে এটা ভৌতিক কিছু নয়। কিন্তু না! তেমন কিছুই পাওয়া যাচ্ছে না। রোবেন এখানে আর সময় নষ্ট না করার সিদ্ধান্ত নিল। এখন বরং অন্য কিছু ভাবতে হবে। আচ্ছা! এখানের কোন কিছু আমার চোখ থেকে এড়িয়ে যায়নিতো?

কাল রাতের ভয়ঙ্কর ব্যাপারটাকে ভুলে থাকার জন্য নিজেকে যেভাবেই হোক ব্যাস্ত রাখতে হবে। আবীর বিছানায় আধশোয়া হয়ে বই পড়ছে। তার হাতে রবি ঠাকুরের বই। ‘রাহু’ এসে আবারও তার মাথায় ভর করেছে। এই রাহু যদি ভুতের ভয় কিছুটা কাটিয়ে দিতে পারে। সে গুনগুন করে আবৃতি করে যাচ্ছে –

‘সামনে দাঁড়াবে পেছনের কেউ
পেছনে রবে ভয়,
হাঁটিতে থাকিবে দিবস রজনী
আঁধারের সংশয়।
একাকীত্বের ঘোর তামাশায়
ডাকিব কেবলি তোরে,
চারপাশ জুড়ে ফেলিবোরে শ্বাস
জগৎ আধার কো’রে’

রোবেন পকেট থেকে সিগারেট বের করে জ্বালাল। আবীর তুই ঠিক আছিস? আবীর বইটা নামিয়ে রেখে বলল, হ্যা! কিন্তু তোকে এমন অস্থির লাগছে কেন? কি হয়েছে?

নাহ! কিছু না। আই’ম ফাইন।

আবীর আর কিছু বলল না। কারন সে জানে রোবেন কোন ব্যাপারে খুব বেশী চিন্তা করলে এমন অস্থির হয়ে থাকে। সে নিশ্চয় এখন কিছু একটা নিয়ে ভাবছে।

রোবেন তার হাতের সিগারেটটা ফেলে দিয়ে চিৎকার করে বলে উঠল, ইয়েস! আমি পেয়েছি। আবীর! আমি এখন একটা কাজে যাব। যদি সন্ধ্যার ভেতর ফিরে না আসি। তবে তুই আজ রাতেই ঢাকায় ব্যাক করবি। আর যদি আমি ফিরে আসি তাহলে হয়তো আমরা দুজনই ব্যাক করব। সেই পর্যন্ত তুই সাবধানে থাকিস। আর হ্যা! যদি মনে হয় এখানে একা থাকতে পারবিনা। তাহলে তাথৈয়ের বাড়িতে চলে যাস। আমি যাচ্ছি।

আবীর আর কিছুই বলার সুযোগ পেলনা। তার আগেই রোবেন দ্রুত ঘর থেকে বেড়িয়ে এল। মিশনে যাওয়ার আগে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে নিতে হবে। যেমন দুইটা পাঁচ ব্যাটারির টর্চলাইট। যাতে একটা সমস্যার হলে অন্যটা কাজে আসে। নিতে হবে বিশ-পচিশ হাত লাম্বা দড়ি। তাছাড়া আরো কিছু জিনিস সাথে নিতে হবে। যেমন একটা ম্যাচবক্স, দু-একটা মোমবাতি আর একটা ছুরি। মাঝারি ধরনের দুইটা আয়নাও সাথে নেয়া যেতে পারে। কখন কোন কাজে আসে বলা যায়না। রোবেন একে একে সব কিছু ব্যাগের ভেতর গুছিয়ে নিতে শুরু করল।

ড্রয়িং রুমে সিংহাসনের সামনে এসে দাঁড়াল রোবেন। কাঁধের ব্যাগটা নীচে নামিয়ে রাখল সে। এখন সিংহাসনটাকে আগে সরাতে হবে। এটা দেখে যতটা কষ্ট হবে সরাতে ভেবেছিল। ঠিক ততটা কষ্ট হলনা। রোবেন খুব সহজেই এটাকে পেছনে সরিয়ে নিল। এটা সরাতেই চারকোণা লোহার একটা ডাকনা বের হল। এই ডাকনাটা তুলেতেই নীচে নামার সিড়ি দেখা যাচ্ছে। এই সিড়ি দিয়ে নেমে গেলেই হয়তো সকল রহস্যের জট খুলে যাবে। রোবেন ব্যাগ থেকে একটা টর্চ বের করল। এখন আস্তে আস্তে নীচে নামতে হবে। রোবেন ব্যাগ কাঁধে নিয়ে একটা একটা করে সিড়ি নেমে যাচ্ছে। আর একটু একটু করে অন্ধকার বাড়ছে।

সিড়িটা শেষ হতেই একটা সরু রাস্তা শুরু হয়েছে। রোবেন টর্চের আলো ফেলে সাবধানে এগিয়ে যেতে লাগল। এভাবে প্রায় ১০মিনিট যাওয়ার পর সামনে একটা দরজা পড়ল। লোহার একটা দরজা। রোবেন হালকা করে ধাক্কা দিতেই দরজাটা খুলে গেল। এই অন্ধকারে টর্চের আলো; এখন আর যথেষ্ট মনে হচ্ছে না তার কাছে। টর্চের আলো যেখানে পরছে। শুধু সেই যায়গাটাই দেখা যাচ্ছে। অথচ তাকে দেখে নিতে হবে পুরো জায়গাটা। তবে এটা যে একটা ঘর তা বুঝা যাচ্ছে। রোবেন ব্যাগ খুলে পাঁচটা মোমবাতি বের করল। তারপর একটা একটা করে মোমবাতি জ্বালিয়ে রাখল ঘরের চার কোনায় চারটা। আরেকটা রাখল মাঝখানে। এখন মোমের মৃদু আলোয় পুরো ঘরটাই দেখা যাচ্ছে। চোখে পরার মত এখানে তেমন কিছুই নেই। শুধু একটা ‘Bookshelf’ দেখা যাচ্ছে। সেখানে বেশ কটা বইও আছে। রোবেন সেদিকে এগিয়ে গেল। বইগুলোর উপর ধুলো জমায় কোনটা কোন বই বুঝা যাচ্ছে না। তবে ‘Bookshelf’ এর শেষ মাথায় একটা বই দেখা যাচ্ছে। এটা এখনো ঝকঝকে তকতকে। তার মানে এই বইটা এখনো কেউ পড়ে। কিন্তু কে পড়ে?

রোবেন বইটা হাতে নিয়ে কয়েকটা পৃষ্টা উল্টালো। ভেতরের লেখাগুলো কোন ভাষার সে ধরতে পারছেনা। তবে বইয়ের কভার পেজটা দেখে এটাকে খুব সাধারণ কোন বই বলে মনে হচ্ছে না। আবীর বেশ কটা ভাষায় লেখতে ও পড়তে জানে। ও নিশ্চয় এই বইয়ের লেখাগুলো পড়তে পারবে। রোবেন বইটা ব্যাগের ভেতর নিয়ে নিল।
‘Bookshelf’ এর সামনে থেকে সরে আসতেই রোবেনের মনে হল এর পেছনে কিছু একটা আছে। সে ‘Bookshelf’ এর পেছনে গিয়ে দেখল হ্যা! এখানেও একটা লোহার দরজা। রোবেন খুব সাবধানে এই দরজা খুলে ভেতরে গেল। ব্যাগ থেকে আরো কয়টা মোমবাতি জ্বালিয়ে মেঝেতে রাখতেই দেখল, এই ঘরটা অন্য সব ঘরের মত চারকোনা না। এটাকে একটা বৃত্তের মত করে বানানো হয়েছে? আরো আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে পুরো ঘরে দেয়ালের অংশটায় এক হাত সমান জায়গা ফাঁকা রেখে এক একটা দরজা বসানো হয়েছে। সব মিলিয়ে এই ঘরে দরজা দেখা যাচ্ছে ২২টা। কিন্তু একটা ঘরে এত দরজা দেয়ার কারণ কি? তাছাড়া সবগুলো দরজা দিয়েই কি আলাদা আলাদা কোন ঘরে যাওয়া যায়? রোবেন ব্যাগ থেকে দুইটা আয়না আর টর্চলাইট বের করল। আয়না দুইটা ঘরের দু-মাথায় রেখে টর্চ দুইটা জ্বালিয়ে দিল। আয়না আর টর্চ দুইটা এমনভাবে রাখল, যাতে পুরো ঘরটাতেই আলো পড়ে। মোমের মৃদু আলোর চেয়ে এই মুহুর্তে টর্চের আলোটাই বেশী কাজে দেবে।

এখানকার দরজাগুলো সব কাঠের। রোবেন হাতে একটা মোমবাতি নিয়ে ধীরে ধীরে একটা দরজার কাছে এগিয়ে গেল। এই দরজার কয়েকটা অংশে গুনে ধরেছে। রোবেন দরজাটা ধরে টান দিতেই ভেতর থেকে হঠাৎ করে কিছু একটা এসে তার মাথায় পড়ল। তৎক্ষণাৎ কপালের বা পাশটা ফেটে রক্ত পড়তে শুরু করেছে। রোবেন নিজেকে সামলে নেয়ার চেষ্টা করে উঠে দাঁড়াতেই দেখল দরজার ভেতরটা একটা আলমারীর মত। এবং এর ভেতর থেকেই একটা কঙ্কাল এসে তার মাথায় পড়েছিল। এই অবস্থায় হঠাৎ যে কেউই ভয় পাবে। রোবেনও খানিকটা ভয় পেয়েছে। তবে এখন ভয় পেয়ে বসে থাকলে চলবে না। আরো অনেকটা পথ এগুতে হবে। তবে তার আগে কপালের রক্ত পরাটা বন্ধ করতে হবে। রোবেন ব্যাগ থেকে ছুরিটা বের করল। তারপর পাঞ্জাবী একটা কোনা কেটে কপালে বেঁধে নিল।

একে একে বাকী দরজাগুলোও সাবধানে দেখতে লাগল রোবেন। সবগুলোই আলমীরার মত। এবং ভেতর থেকে হয় কঙ্কাল বের হচ্ছে। নাহয় ভেতরটা ফাঁকা থাকছে। এভাবে দেখতে দেখতে ২০টা দরজা খুলা হয়ে গেছে। সবগুলোতেই এমন। শেষ দরজাটা খুলতেই আরো একটা ঘরের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। রোবেন তার হাতে ঘড়িটার দিকে একবার তাকাল। দুপুর ৩টা ৭মিনিট। তার মানে হাতে সময় আছে আর মাত্র ঘন্টা তিনেক। রোবেন আয়না টর্চ গুছিয়ে নিয়ে তৃতীয় নাম্বার রুমে গেল। এই ঘরে তেমন কিছুই নেই। তবে দেয়াল জুড়ে বেশ কিছু লেখা রয়েছে। খুব সম্ভবত লেখাগুলো সংস্কৃত ভাষায়। কিন্তু রোবেন এই লেখাগুলোও পড়তে পারছেনা। সে ব্যাগ থেকে খাতা কলম বের করল। আপাদত লেখাগুলো খাতায় লিখে নিয়া যাক। এসব লেখার অর্থ বের করতে একমাত্র আবীরই ভরসা। ও নিশ্চয় এ ব্যাপারে সাহায্য করতে পারবে।

রোবেন আরেকটু সামনে আগাতেই দেখল; এ ঘর থেকে বের হবার জন্য আরো একটা দরজা দেখা যাচ্ছে। এটা আবার লোহার। আগে একবার অসাবধানতারবশে কপাল ফেটেছে। এখন আর সেই ভুল করা যাবে না। রোবেন খুব সাবধানে দরজাটা টেনে খুলল। এখান থেকে কিছুদূর যাওয়ার পর আবার তিন দিকে তিনটা সরু রাস্তা শুরু হয়েছে। এই রাস্তাগুলো দিয়ে কোনরকম পাশাপাশি দুজন যেতে পারবে। এমনভাবে রাস্তা তিনটা বানানো হয়েছে। কিন্তু রাস্তা তিনটার শেষ কোথায়? তাছাড়া তিনটা রাস্তাই একটা পয়েন্টে গিয়ে শেষ হয়েছে? নাকি আলাদা আলাদা?

রোবেন হাতে ঘড়িটা আবারও দেখল। সন্ধ্যা হতে এখনো প্রায় দুই ঘন্টার মত বাকী। কিন্তু এই সময়ের ভেতর কি তিনটা রাস্তার শেষ মাথায় গিয়ে আবার ফিরে আসা সম্ভম? ধরা যাক, একটা রাস্তা ধরে শেষ মাথায় যেতে সময় লাগল আনুমানিক ২০মিনিট। এবং ফিরে আসতে ২০মিনিট। তাহলে একটা রাস্তায় সময় ব্যায় হচ্ছে ৪০মিনিট। আর তিনটা রাস্তায় ১২০মিনিট। তারমানে প্রায় দুই ঘন্টা। এই সময়ে তিনটা রাস্তা দেখে আসতে পারলে ভালো। আর যদি একটা রাস্তাই ২০মিনিটের অধিক সময় লেগে যায় তখন? রোবেন ভাবতে লাগল। ভেবে দ্রুত কিছু একটা সিদ্ধান্ত যেতে হবে।

হঠাৎ করে রোবেনের মনে পড়ল। ডায়রীতে বাবার লেখা ৩৫টা ঘর আর ৬৭টা দরজার হিসেব মিলে গেছে। এখানের তিনটা ঘরসহ পুরো বাড়িতে ঘর হয় ৩৫টা। আর দরজাগুলো মিলিয়ে ৬৭টা। এবং এখানকার দ্বিতীয় ঘরে এতগুলো দরজা বসানোর একটাই কারণ হতে পারে। তা হল শত্রুপক্ষকে বিভ্রান্ত করা। এবং এই ব্যাপারটাতে একটা গোপনীয়তা ছিল। যে কারনে বাবা ডায়রীতে স্পষ্ট করে না লিখে এভাবে লিখেছিল – ‘৩২+৩=৩৫টা ঘর। ৪৩+২৪=৬৭টা দরজা’’।

দরজাগুলো বিভ্রান্ত করার জন্য বসানো হলে, তবে এটাও ধরে নিতে হবে এখানের তিনটা রাস্তাও বিভ্রান্ত করার জন্যই তৈরি করা হয়েছে। তাছাড়া এই সুরঙ্গটা তৈরি করার উদ্দেশ্যও যে ছিল; শত্রু পক্ষের আক্রমন সামলাতে না পেরে গোপনে পালিয়ে যাওয়া। এ ব্যাপারেও আর কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। এমন ঘটনা অবশ্য অস্বাভাবিক কিছু না। একবার শত্রুপক্ষের আক্রমন সামাল দিতে না পেরে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা। এবং পরবর্তিতে অধিক শক্তি সঞ্চয় করে পালটা আক্রমন করবে। এটাই বরং তখনকার সময়ের স্বাভাবিক ঘটনা ছিল। কিন্তু এখনকার সময়ে এই জায়গাটা ব্যাবহার করে কে বা কারা ফায়দা তুলার চেষ্টা করছে? কেনই বা করছে?

রোবেন তিনটা সরু রাস্তার মাঝখানেরটা দিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। অবশ্য এছাড়া আর কোন উপায়ও নেই। যেকোন একটা রাস্তা ধরে এগুতেই হবে। মাঝখানের রাস্তাটাই তার কাছে সঠিক রাস্তা বলে মনে হচ্ছে। তবে শেষ মাথায় গিয়ে যদি দেখা যায়; এখানে থেকে বের হবার রাস্তা আছে। তাহলে সিদ্ধান্ত ঠিক আছে। আর না থাকলে ভুল। এবং এই ভুলের মাশুল দিতে আরো কিছুটা সময় ব্যায় করতে হবে। রোবেন টর্চের আলো ফেলে ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে লাগল।

সন্ধ্যা হয়ে আসছে। রোবেন এখনো ফেরেনি। আবীরের খুব টেনশন হচ্ছে। সে এখন কি করবে তাও বুঝতে পারছেনা। তার কি অপেক্ষা করা উচিত? নাকি রোবেনের কথামত চলে যাওয়া উচিত? তাছাড়া এখানে একা থাকতে তার কিছুটা ভয়ও করছে। গতরাতের ঘটনাটা মনে হতেই তার গায়ে কাটা দিয়ে উঠল। আবীর মনে মনে ভেবে নিয়েছে। এখানে আর ১০মিনিট অপেক্ষা করবে। এর মধ্যে রোবেন ফিরে না আসলে সে ঢাকায় ফিরে যাবে। কিন্তু ওকে ফেলে একা যাওয়াটা কি ঠিক হবে?

তাথৈ এসে রোবেনকে খুঁজে না পেয়ে আবীরের ঘরে এল। আবীর তাথৈকে দেখে বলল, থ্যাংক্স গড! একা একা খুব ভয় পাচ্ছিলাম। আপনি এসেছেন ভালই হয়েছে।
তাথৈ বলল, আপনার বন্ধু কোথায়? উনার সাথে আমার কিছু কথা আছে। আবীর বলল, তখন আপনি যাওয়ার কিছুক্ষণ পরইতো রোবেন কি একটা কাজের কথা বলে কোথায় যেন গেল। আমাকে বলেছে যদি সন্ধ্যার ভেতর ফিরে না আসে। তাহলে আমি যেন আজ রাতেই ঢাকায় ব্যাক করি। আর যদি ও ফিরে আসে। তাহলে হয়তো আমরা দুজনই ব্যাক করব। কিন্তু এখনো ওর আসার কোন নাম গন্ধ নেই। আমিই বা এখন কি করব। কিছুই বুঝতে পারছিনা।

উনি কোথায় গেছে আপনাকে বলে যায়নি? আপনি জানতে চাননি?
আমিতো সেই সুযোগই পাইনি। তার আগেই ও বেড়িয়ে গেছে। তাথৈ খানিকটা উত্তেজিত হয়ে বলল, মানে কি? আপনি জিজ্ঞেস করবেন না কোথায় যাচ্ছে? আবীর কিছু বলল না। সে চুপ করে আছে। মেয়েটা হঠাৎ করে এত উত্তেজিত হল কেন? রোবেনের সাথে কি কিছু হয়েছে?
ঘড়িতে রাত ৮টা বেজে ৩মিনিট। আবীরের চেয়েও রোবেনের জন্য তাথৈয়ের বেশী টেনশন হচ্ছে। আবীর তাকিয়ে দেখল মেয়েটার চোখজোড়া ছলছল করছে। হঠাৎ দু এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পরলেই কাজলটা নষ্ট হয়ে যাবে। তাথৈ! আপনি একটু শান্ত হয়ে বসুন। রোবেন এক্ষুনি ফিরে আসবে। তাথৈ বলল, আবীর আপনি আমার টেনশন করার কারনটা বুঝতে পারছেন না। তাই আমাকে শান্ত হতে বলছেন। আপনিতো জানেনইনা আমার কাছে একটা…… তাথৈ কি যেন বলতে গিয়ে থেমে গেল। আচ্ছা উনার কোন বিপদ হয়নিতো?
আবীর কিছু বলল না। চুপচাপ কেটে গেছে কয়েক মিনিট। তারপর হঠাৎ করে আবীর বলে উঠল এইতো রোবেন চলে এসেছে। রোবেনকে দেখে যেন তাথৈয়ের স্বস্তি ফিরে এসেছে। সে চেয়ার ছেড়ে উঠে রোবেনের পাঞ্জাবীর কলারটা চেপে ধরল। এতক্ষন আপনি কোথায় ছিলেন? আপনি জানেন আপনার জন্য আমার কতটা টেনশন হচ্ছিল?
রোবেন একটু হাসল। সে মেয়েটাকে খুব পছন্দ করে। মেয়েটাও কি তাকে পছন্দ করে? হয়তো করে। না করলে এতটা অস্থির হবে কেন? তাথৈ! আমার জন্য এত টেনশন করার কিছু নেই। আপনি কেন এত টেনশন করছিলেন?

তাথৈ বলল, তার আগে বলুন এতক্ষন আপনি ছিলেন কোথায়? আর আপনার কপালে কি হয়েছে? কাপড় বেঁধে রেখেছেন কেন?
রোবেন বলল, ও কিছুনা। একটু কেটে গেছে। আপনি টেনশন করছিলেন কেন সেটা বলুন। কিছু কি হয়েছে? তাথৈ মাথা নেড়ে বলল, হ্যা। আমার কাছে একটা উড়োচিঠি এসেছে। এই যে দেখুন। তাথৈ চিঠিটা বের করে রোবেনের হাতে দিল। রোবেন চিঠিটা মেলে ধরতেই হাতের লেখাটা চিনে ফেলেছে সে। তবে চিঠিতে তেমন কিছু লেখা নেই। এটাকে চিঠি না বলে একটা চিরকুট বলাই ভালো।
‘’রাজবাড়িতে আসা দুজন মানুষকে একটু সাবধানে থাকতে বলবেন।
ওদের সামনে মহাবিপদ। একজনের জীবননাশও হতে পারে’’
তাথৈ বলল, এবার আপনি বুঝতে পারছেন কেন আমি আপনার জন্য এত টেনশন করছিলাম? রোবেন বলল, হ্যা পারছি। এবং এই চিরকুট আমাকে দেখানোর জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। যদিও আমি রহস্যের ৯৫% ই বের করে ফেলেছি। এখন এই চিরকুট বাকি ৫% বের করতে সাহায্য করবে। বাই দ্যা ওয়ে, এই চিরকুট পাওয়ার পর আপনার কি একবারও মনে হয়নি; এই বাড়িতে আসলে ভৌতিক কিছু ঘটেনা? এর পেছনে অন্য কোন ঘটনা আছে।

তাথৈ একমুহুর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। তারপর বলল, কোন ভুত-প্রেতের দ্বারা চিঠি লেখা কি সম্ভব? উহু! এমনতো কখনও শুনিনি। তবে কি এর পেছনে কোন মানুষ আছে?
Exactly! মানুষ! এতদিন এখানে যা কিছু ঘটেছে সবই মানুষের দ্বারা ঘটেছে। রোবেন তার পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে বলল, এই কাগজটা দেখুন। আপনার কাছে আসা চিরকুটের সাথে এই কাগজের লেখাটা মিলে কিনা?

তাথৈ কাগজে লেখাটা পড়ে বলল, এটাতো আমাদের এখানকার ঠিকানা। তাছাড়া হাতের লেখাও এক। তার মানে কি লেখা দুইটা একজনই লিখেছে?
রোবেন বলল, শুধু এই দুটা না! আমার বাবার মৃত্যুর সংবাদ দিয়ে আপনার কাছে একটা চিঠি এসেছিল। মনে আছে আপনার? আমার ধারনা ওই চিঠিও এই একজনই লিখেছে। আচ্ছা! হাতের লেখাগুলো আপনার কাছে পরিচিত মনে হচ্ছে না? মনে হচ্ছেনা এমন লেখা আপনি আগেও কোথাও দেখেছেন?

তাথৈ বলল, হ্যা হচ্ছে। কিন্তু কে যেন এমন ভাবে লিখে… আমি ঠিক মনে করতে পারছিনা। রোবেন বলল, আপনি চেষ্টা করে দেখুন। আমার ধারনা আপনি মনে করতে পারবেন।
রোবেন বিছানার পাশেই ছোট্ট একটা টেবিলের উপর থেকে পানির গ্লাস হাতে তুলে নিল। এক চুমুক পানি খেয়ে বলল, তাথৈ আপনি কি কিছু মনে করতে পারলেন? তাথৈ বলল, হ্যা এমন লেখা আমি একমাত্র বশির চাচাকেই লিখতে দেখেছি। কিন্তু উনি কেন এসব করবেন? উনার এতে লাভ কি? তাছাড়া বশির চাচার মত একজন লোক এসব করবে। আমার তা বিশ্বাস হয়না।

রোবেন বলল, আমরা ঠিক এই জায়গাটাতেই ভুল করি। যাকে আমরা খুব বিশ্বাস করি। যাকে দেখলে মনে হয় সে এমন কাজ কখনও করতে পারেনা। তার দিকে আমরা ফিরেও তাকাই না। অথচ তার দিকেই সন্দেহের আঙ্গুলটা প্রথমে তোলা উচিত। কেননা, বিশ্বাসী লোকরাই সাধারণত এত বড় অন্যায় করার সুযোগ পায়। কারণ সে জানে তার প্রতি আমাদের বিশ্বাসটা কোন পর্যায়ে। আপনার বশির চাচাও সেই রকমই একজন মানুষ।

আবীর এতক্ষন চুপ করে ছিল। কিন্তু এখন আর চুপ করে থাকা যায়না। সে তাথৈকে থামিয়ে দিয়ে বলল, রোবেন! বশির চাচা এই করেছে! সেই করেছে! তুই উনাকে ভুল-ভাল যা বুঝাচ্ছিস বুঝিয়ে যা। আমার কোন সমস্যা নেই। কিন্তু আমার সাথে যা ঘটেছে তার কি ব্যাখ্যা দিবি তুই। এর কোন যৌক্তিক ব্যাখ্যা আছে তোর কাছে? রোবেন বলল, হ্যা আছে। চল আমার সাথে। তাথৈ আপনিও চলুন। তাথৈ বা আবীর কেউই আর কোন কথা বলল না। তারা রোবেনের পেছনে পেছনে যেতে লাগল।
ড্রয়িং রুমের সেই সিংহাসনটার সামনে এসে নীচে নামার রাস্তাটা দেখিয়ে রোবেন বলল, এখনই একে একে সব রহস্যের জট খুলে যাবে। আবীর তখন তুই কি যেন বলছিলি? তোর সাথে যা ঘটেছে তার যৌক্তিক কোন ব্যাখ্যা আছে কিনা? হ্যা আমার কাছে ব্যাখ্যা আছে। শোন তাহলে। সেদিন রাতের বেলা বশির চাচা তোকে দু-বোতল হুইস্কি দিয়ে গিয়েছিল। এবং তুই একটা বোতল নিয়ে এই সিংহাসনে এসে বসেছিলি। তবে আরেকটা বোতল কোথায়?

আবীর আমতা আমতা করতে লাগল। ইয়ে মানে…মানে… রোবেন বলল, থাম! আমি বলছি। সেদিন রাতে বশির চাচার বলে যাওয়া গল্পের ব্যাপারটা নিয়ে তুই ঘরে বসে ভাবছিলি। যেখানে বশির চাচা খুব সুন্দর ভাবে এই সিংহাসনে বসে মদ্যপান করার অনুভুতিটা কেমন সেটা তোর মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছিল। আর তখনই তোর মনে হল এখানে বসে মদ্যপান করার কথা। কিন্তু ততক্ষনে অলরেডি তুই এক বোতল শেষ করে ফেলেছিস। এবং দ্বিতীয় বোতলটা নিয়ে এখানে এসে বসেছিলি। তারমানে সেই সময়টা তুই পুরো নেশার ঘোরে চলে গিয়েছিলি। আর এটাই বশির চাচা চেয়েছিল। যে কারনে গল্প করা এবং হুইস্কির বোতল দেয়াসহ এতকিছু প্ল্যান করেছে
আবীর বলল, কি বলছিস তুই? তার মানে বশির চাচাই এসব করেছে? কিন্তু আমি যে দেখলাম একটা মানুষের বীভৎস মুখ থেকে রক্ত ঝরছে। সেটা কি করে হল?

এটা আসলে তোকে বোকা বানানো হয়েছে। তাছাড়া তুই নেশার ঘোরে ছিলি। তোর চিন্তা চেতনাগুলোও ছিল এলোমেলো। তাই বশির চাচার এই ভন্ডামিটা বুঝতে পারিস নি। উনি এসে প্রথমে আগুন জ্বালালেন। এবং তার উপর ধরলেন লালরঙের একটা মুখোশের আকৃতির মত মোমবাতি। যেটা আগুনের তাপে আস্তে আস্তে গলে পড়ছিল। এবং তুই এই জিনিসটা দেখেই ভয় পেয়েছিলি। নেশার ঘোরে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা জলজ্যান্ত বশির চাচাকেও খেয়াল করিসনি তুই। এবার বুঝতে পারছিস তোকে কিভাবে বোকা বানিয়ে ভয় দেখানো হয়েছে?
আবীর একটু জোর করেই যেন হ্যা সূচক মাথাটা নাড়ল। রোবেন বলল, আবীর তুই হয়তো ভাবছি আমি কিভাবে এত জোর দিয়ে কথাগুলো বলছি। তাইনা?
‘না তা না আসলে…’

রোবেন হাসল। শোন! তুই যখন ঘটনাটা আমাকে বলছিলি তখন আমি তোর ঘরে খালি একটা বোতল খেয়াল করলাম। তারপর যখন উঠে ঘটনাস্থলে যাই। তখন না পাই চেয়ারের(সিংহাসন) পা ভাঙ্গা। না পাই রক্তেই কোন ছিটে ফুটো। তারপর অনেকটা হতাশ হয়েই তোর ঘরে আবার ফিরে যাই। কিন্তু তোর বিছানার চাদরটা যখন হঠাৎ করেই চোখে পরল উল্টিয়ে বিছানো। ঠিক তখনই মনে হল ড্রয়িং রুমের মেঝেতে বিছানো এই কার্পেটের কথা। আর তখনই আমি তোকে কাজের কথা বলে চলে আসি। তাথৈ আর আবীর মেঝের দিকে তাকাল। ওরা এই কার্পেটের ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারছে না।
রোবেন বলল, এই পুরো জায়গাটা জুড়ে কিন্তু আস্ত একটা কার্পেট বিছানো নেই। এখানে আলাদা আলাদা করে ১৬টা কার্পেট আছে। এবং প্রতিটা কার্পেট দৈর্ঘ-প্রস্থে সাড়ে পাঁচ হাত। তাথৈ আর আবীর বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে আছে রোবেনের দিকে।

রোবেন মেঝের একটা অংশ আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে বলতে লাগল, একটা জিনিস ব্যাবহারের ফলে ক্ষয় হয়। এর চাকচিক্যও মলিন হয়। এই কার্পেটগুলোও দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে তার চাকচিক্য হারিয়েছে। কিন্তু এই একটা কার্পেট এখনো নতুনের মত চকচক করছে। আর এটা দেখেই আমার সন্দেহ হয়। তারপর এটা উল্টাতেই দেখলাম যে, আমার সন্দেহের তীরটা ঠিক জায়গামতই লেগেছে। বশির চাচা এটাকে উল্টিয়ে রেখে গেছে। রোবেন একটু থামতেই আবীর সেই কার্পেটের কাছে এগিয়ে গেল। পেছন পেছন তাথৈও গেল। তারপর আবীর কার্পেটটা ধরে উল্টোটেই দেখল মোমবাতির দানাগুলো পরে জমে আছে।

রোবেন বলল, এখন আমার কথাগুলো বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছেতো?
আবীর হ্যা সূচক মাথা নাড়ল।
রোবেন তার ব্যাগ থেকে সুরঙ্গ পথে পাওয়া বই আর খাতাটা বের করে বলল, নে তাহলে এবার এগুলোর অর্থ বুঝার চেষ্টা কর। আবীর বই আর খাতাটা হাতে নিল। তাথৈ কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা! এই যে এদিকে নীচে নামার সিড়িটা। এটা ঠিক কতদূর পর্যন্ত গেছে? আর ভেতর কি আছে?

রোবেন একে একে এই সুরঙ্গ পথে ভ্রমণের খুটি-নাটি বিষয়গুলো বলে যেতে লাগল। কোথায় কি আছে না আছে এসব। তাথৈ চুপচাপ সব শুনে যাচ্ছে। আর মাঝে মাঝে বিস্মিত হচ্ছে। সব শেষে রোবেন বলল, এই পথের শেষ হয়েছে কোথায় জানেন? তাথৈ মাথা নাড়ল। উহু কোথায়?

দিঘীর ঘাটে একটা কড়ই গাছের নীচে ম্যানুয়েলের ডাকনার মত আছে সেখানটায় এ পথের শেষ হয়েছে। এবং বশির চাচা ওই দিক দিয়ে এসেই এই কর্মগুলো করতেন। তাছাড়া আমার ধারনা বশির চাচাই এই বাড়িটা অভিশপ্ত বলে গ্রামে গুজব ছড়িয়েছেন।

তাথৈ বলল, কিন্তু এতে উনার Motive কি? রোবেন কিছু বলার আগেই আবীর এসে বলল, রোবেন এই বইটা পড়ে যা বুঝতে পারছি তা হল- এই বইটা হচ্ছে একটা ব্ল্যাক ম্যাজিকের বই। এ বইয়ে মৃত দেহে আত্মাস্থাপন সহ আরো অনেকগুলো মন্ত্র লেখা আছে। এমনকি কোথায় কিভাবে বসে মন্ত্রপাঠ করতে হবে সেই বর্ননাও সুন্দরভাবে লেখা আছে। কিন্তু তোর খাতায় লেখাগুলোর কোন অর্থ বের করতে পারছিনা। কেননা, এই লেখাগুলো সংস্কৃত ভাষায় লেখা হলেও এগুলোকে আমি সংস্কৃত ভাষা বলব না। তার কারণ হল, আমাদের বাংলা ভাষায় ‘ক-ল-ম’ এই তিনটা অক্ষর একসাথে বসালে যেমন একটা অর্থপুর্ন শব্দ হয় ‘কলম’। তোর এই সংস্কৃত লেখাগুলোতে কিন্তু তেমন কিছুই নেই। একটা অর্থহীন শব্দ বা বাক্য থেকে কি অর্থ বের করব? যেমন ‘কঘউসঅযদফগ’ এই শব্দের কোন অর্থ হবে?

রোবেন না সূচক মাথা নাড়ল। আবীর আবারো বলতে শুরু করল, আমার ধারনা এই সংস্কৃত লেখাগুলো কারো তৈরী করা নিজস্ব প্রতীকী মাত্র। যেমন তুই আর আমি মিলে ইংরেজী ‘A’ অক্ষরটার মানে ধরলাম ‘she loves you too’। এটা আমি আর তুই ছাড়া তৃতীয় কোন ব্যাক্তি জানবেনা বুঝবেনা। ব্যাপারটা অনেকটা এরকম। বুঝলি?

রোবেন মাথা নেড়ে বলল, হুম একদম ক্লিয়ার! তোর এই ব্যাখ্যায় আমি রীতিমত মুগ্ধ। তো তাথৈ এখন বুঝতে পারছেনতো বশির চাচার মোটিভ কি? উনি এখানে ব্ল্যাক ম্যাজিক চর্চা করতেন। এছাড়াও উনি নারী পাচার কাজে এই বাড়িটা ব্যাবহার করতেন। আশে পাশের গ্রামের সহজ সরল মেয়েমানুষ এনে এই বাড়িতেই রাখতেন। এবং সময় সুযোগ বুঝে তা ইন্ডিয়া পাচার করে দিতেন। এবার বুঝলেন?

তাথৈ হা সূচক মাথা নাড়ল। রোবেন বলল, আমি পুলিশকে ইনফর্ম করে এসেছিলাম। এতক্ষনে উনার হাতে বোধহয় হাতকড়াও লেগে গেছে। যাইহোক, আবীর আমাদের কাজতো শেষ। এবার চল আমরা বরং ব্যাগ গুছিয়ে নেই। আজই ঢাকায় ব্যাক করব।

চলে যাবার কথা শুনতেই তাথৈতের মুখটা কেমন শুকিয়ে গেল। চোখ জোড়াও কেমন ছলছল করছে। মাথাটা নামিয়ে আস্তে করে বলল, আপনার না গেলে হয়না? রোবেন আবীরের দিকে তাকাতেই আবীর আঙ্গুল দিয়ে ‘A’ চিহ্ন একে দেখালো। যার মানে ‘She loves you too’।
রোবেন বলল, হুম বুঝতে পারছি কেউ একজন আমাকে মনে মনে ভালবেসে ফেলেছে। সে চাইছেনা আমি চলে যাই। কিন্তু মুখ ফোটে ভালোবাসার কথা বলতে না পারলে আমি থাকব কিনা বলতে পারছিনা। তাথৈ এবার মাথা তুলে তাকাল। সত্যি সত্যি মেয়েটার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। একটা মানুষ অন্য একটা মানুষকে চট করে এতটা ভালোবাসতে পারে কি করে? রোবেন ভেবে পেলনা। তাথৈ এসে তাকে জড়িয়ে ধরল। সব কথা মুখ ফোটে বলতে হবে কেন? এমন কিছু কথা আছে। যা কেবল চোখ দেখে বুঝে নিতে হয়। হুহ! রোবেন হেসে দিল। এদিক আবীরের মাথায় আবারও রবি বাবুর ‘রাহু’ এসে ভর করেছে। সে গুনগুন করে যাচ্ছে – – –

“ হেরো তমঘম মরুময়ী নিশা-
আমার পরান হারায়েছে দিশা,
অনন্ত ক্ষুধা অনন্ত তৃষা করিতেছে হাহাকার।
আজিকে যখন পেয়েছি রে তোরে
এ চিরযামিনী ছাড়বি কি করে,
এ ঘোর পিপাসা যুগযুগান্তে মিটিবে কি কভু আর! ”

********************************************(সমাপ্ত)******************************************

গল্পের বিষয়:
রহস্য

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত