প্রেমিকা

প্রেমিকা

ঈশান, একটা অত্যন্ত সাধারণ বাড়ির সাদাসিধে ছেলে। ছোটো বেলা থেকেই ঈশান লেখাপড়া র প্রতি অত্যন্ত মনোযোগী। শান্ত ও নিরীহ প্রকৃতির হওয়ায় তার ছোটো বেলা থেকেই তেমন কোনো বন্ধু ছিলোনা। তাই সে তার বই পত্র গুলোকে নিজের সঙ্গী হিসাবে বেছে নেয়। আর হাঁ, একটু পড়াকু টাইপের ছেলে হওয়ায় এমনি তে একটু ভজা ভজা লাগত ঈশান কে। তাই জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত তাকে খিললির শিকার হতে হতো, সবাই তাকে না না ভাবে অপমান করত, সব মুখ বুজে সহ্য করে নিত সে…..

আজ উচ্চ মাধ্যমিকের রেজাল্ট বেরোলো, প্রতি বারের মত এবার ও ঈশান স্কুল এ টপ। সেদিনও….

-এই এই, মাল টা কে দেখ, শালা হেভি স্টাইল মারছে ববরা___

-এমন দেবো না কানের গোড়ায়, ভালো রেজাল্ট করেছিস তো বাড়ি গিয়ে নাচ না শালা, এখানে 32 পাটি বের করে হে হে করছিস কেনো, ভাগ এখান থেকে….

এভাবে তাকে কিছু ছেলে তার আনন্দের দিনও অপমানিত করে আরো না না রকম কথা বলে।

বাড়িতে বাবা মা খুব খুশি ছেলের এই উন্নতি তে, কিন্তু তার মন যেনো ঠিক সন্তুষ্ট ছিল না, একটা অজানা ভয় তাকে ভিতরে ভিতরে খেয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু কিসের ভয়? হয়তো কলকাতার কোনও কলেজ এ অপদস্থ হওয়ার ভয়।স্কুলের ছেলেরা তাকে নিয়ে যেভাবে মজা করত সেখানে কলেজ এর সিনিয়র দাদা রা তো ঈশান কে মেরেই ফেলবে।

আজ কলেজ এর প্রথম দিন। ভালো একটা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে Computer Science নিয়ে B. Tech করছে ঈশান।

যে ভয় ঈশান এর প্রথম থেকেই লাগছিল তা আসতে আসতে সত্যি হচ্ছে, হোস্টেলে ছেলে গুলো সবাই একে একে ragging করতে শুরু করেছে। ঈশান ও জানতো সে 3 Idiots এর আমির খান নয় যে সব পরিস্থিতিতে নিজেকে সামলে নেবে, আর বাস্তব জীবনে তা সম্ভব ও নয়, তাই চুপ চাপ চোখের জল ফেলতে ফেলতে রাত টুকু কাটিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল, কাল সকালে কোনো উপায় বের করা যাবে, কিন্তু 3rd year এর ছেলে রা তাকে সারা রাত জ্বালিয়ে মারলো…..

-আর একটা মুহূর্ত এখানে নয়…..

সকালে ঈশান মা কে ফোন করে সব জানিয়ে দিলো। তার দূর সম্পর্কের এক মামা ওখানে একটু দূরে চাকরি করতেন। তিনি ঈশান এর জন্য একটা rent house জোগাড় করে দিলেন।
.

ঘর টা বেশি বড় নয়, বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। এক নজরে দেখলেই পছন্দ হবে।একটা মধ্য বয়স্ক লোক বাড়ির মালিক, নিচ তল টা তেই থাকতেন, ছেলে একটা 5 স্টার হোটেল এর MD, বিদেশে থাকে, লোকটার স্ত্রী ও বছর দুই আগে মারা গেছেন, একা সময় কাটে না বলে হয়তো ওপর টা ভাড়া দিয়ে দিলেন।

আজ খুব খুশি ঈশান। কলেজে থেকে ফিরে অনেক রাত পর্যন্ত পড়াশোনা করে একটা শান্তির ঘুম ঘুমোতে শুরু করেছে। যাই হোক হোস্টেলে এর অসভ্য ছেলে গুলোর থেকে তো রেহাই পাওয়া গেছে।
কিছু দিনের মধ্যেই কলেজ এ সব প্রফেসর সহ আরো এক জনের মন জয় করে নিল ঈশান।
মিতা, বর্তমানে ঈশান এর girl friend অর্থাৎ প্রেমিকা…

কেউ কখনো ভেবেছিল এই ছেলে ও একদিন প্রেম করবে… কিন্তু দুজনের মধ্যে ভাল বাসা থাকলেও মিতা ও ঈশান কে খিললি করতে ছাড়তো না, কিন্তু ঈশান মন প্রাণ দিয়ে মিতা কে ভালো বাসতে শুরু করেছিল। তাই সে কিছু বলত না।
.

রাত আড়াই টা, নিস্তব্ধ রাত, শুধু দেওয়াল ঘড়ির কাঁটার আওয়াজ – টিক টিক টিক টিক টিক…..
এমন সময় কেমন যেনো একটা আওয়াজ হল, দরজায় টোকা পড়ার মত, ঘুম ভেঙ্গে গেলো ঈশান এর, আওয়াজ টা ওর রুম এর বাথরুম থেকেই আসছে, এর আগেও অনেক বার আওয়াজ শুনেছে, কিন্তু তেমন গুরুত্ব দেয়নি ঈশান।

আজ যেনো একটু শব্দ টা বেশি,

-ঘুট ঘুট….. ঘুট ঘুট ঘুট ঘুট…..
…….

-ঘুট ঘুট….. ঘুট ঘুট ঘুট…. ঘুট…..

চুপচাপ বসে বসে দেখতে থাকলো ঈশান, সায়েন্স এর ছেলে ঈশান এর ভূতের ভয় নেই।
আওয়াজ টা বন্ধ….

একটু এগিয়ে গিয়ে বাথরুমের দরজা খুলে চেক করলো..

-ওহ, এই ব্যাপার, বাথরুমের পিছনে প্রায় দেওয়াল ঘেঁষে ট্রেন লাইন, রাতের এক্সপ্রেস যাচ্ছিলো একটা…. তাই বাথরুম টা vibrate হচ্ছিলো….

এত ঘুম পেয়েছে ঈশান এর যে তাড়াতাড়ি আবার শুয়ে পড়লো কিন্তু নিজের খাটে নয়, তার বেড এর পাশেই আরো একটা খাট ছিল, সেখানেই…..

রাত তিনটে,

ক্যাচ ক্যাচ… ক্যাচ…. ক্যাচ ক্যাচ… ক্যাচ…..

ক্যাচ ক্যাচ… ক্যাচ….

দুম করে লাফিয়ে উঠলো ঈশান, যেন তার খাট টা খুব জোরে কেউ নাড়াছে… কিন্তু সে ছাড়া আর ওই রুম এ কেউ ছিল না…. এই প্রথম খুব ভয় পেয়ে গেলো ঈশান…

গোটা শরীর ঘামে ভিজে যাচ্ছে….. তবু ও নিজেকে ঠিক রেখে আসতে আসতে ওই খাট থেকে নেমে নিজের টায় চলে আসে….. আওয়াজ বন্ধ…..

ঘুম উড়ে যায় তার… বসে বসে নিজের ভাগ্য কে দোষ দিতে থাকে… যে এখানে ও হয় তো তার ঠাঁই হবে না….. ঠিক এমন সময়…… আসতে আসতে বাথরুমের দরজা একা একা খুলতে লাগে…. ঈশান ঠিক ভয় পায়নি তবে অস্বস্তি বোধ করছিলো….

কিছুক্ষণ পর ঈশান যা দেখলো নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না…. বাথরুম থেকে জল সহ পায়ের ছাপ আসতে আসতে তার পাশের খাটের দিকে আসতে লাগলো…. খাটের গদি একটু দাবল… যেনো কেউ বসলো…. এতক্ষণ ঈশান সব টুকু সাহস নিয়ে চুপ চাপ পর্যবেক্ষণ করছিলো…. কিন্তু হটাৎ কি হল তার যে সে বলে উঠলো…..

-তুমিও কি আমার মত একা…..
.
পুরো ঘর নিস্তব্ধ, একটা বন্ধ ঘরে ভৌতিক কার্যকলাপ।

উত্তর এর আশা ঈশান করেনি । কিন্তু তার মনে হয়ে ছিল যে কেউ যেন তার পাশে এসেছে আর তার পাশে বসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।ঈশান এর শরীর টা থর থর করে কাঁপ ছিল। কিন্তু খুব ভালো লাগছিল তার। অতোটা স্নেহ হয়তো সে কারোর কাছে পায়নি। আসতে আসতে সব স্বাভাবিক হয়ে গেলো…..
পরেরদিন..

-এই জানো তো, আমার রুমে না আমাকে ছাড়া আরো একজন থাকে।
-আবার ভুলভাল বকে, বসে থাকতে থাকতে কি ভিমরতী ধরে নাকি…..

…….. চুপ করো তো, তোমার ভাট বকা শুনতে আসিনি, কিছু অর্ডার দাও খুব খিদে পেয়েছে…..

ঈশান এর কোনো কথা বিশ্বাস করলো না মিতা….

-এই বিশ্বাস না হয় তুমি আমার বাসায় চলো

-OK চলো, যদি কিছু না দেখতে পাই রে মন, সে তোমার মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে ছিল তো, আমি তোমার গলা টিপে আদর করব…..

কথা মত তারা ঈশান এর বাসায় গেলো কিন্তু ঈশান এর আশানুরূপ কিছুই হল না….

মিতা রেগে গজ গজ করতে লাগলো….

গল্প করতে করতে হঠাৎ চারিদিকে অন্ধকার হয়ে মেঘ ঘনিয়ে এলো, দরজা জানলা হাওয়া তে ঝপ ঝপ করতে লাগলো…. মিতা উঠে গিয়ে জানলা বন্ধ করতে গেলো…. কিন্তু মিতা ব্যার্থ…. মিতা এদিকে টানে তো, অন্য কেউ তাকে বাধা দেয়…. ব্যপার টা ঠিক বুঝে উঠার আগেই…. মিতার হাত ধরে কেউ যেনো সজোরে বাইরের দিকে টেনে রুম এ ঠেলে ফেলে দেয়…. জানলার গ্রিল এ ধাক্কা লেগে তার মাথা ফেটে রক্ত বেরোচ্ছিল…

এদিকে এইসব দেখে ঈশান হাউ হাউ করে কেঁদে ওঠে…

-কেনো তুমি এরকম করছো… Pls ছেড়ে দাও মিতা কে, ও আমার জীবন…
সুযোগ বুঝে মিতা উঠে পড়ে দৌড় লাগায়, কিন্তু বাইরের মেন গেট বন্ধ থাকায় তাকে চাবি আনতে উপরে আসতে হয়… উপরে গিয়ে মিতা শুনতে পেলো ঈশান যেনো কারোর সাথে কথা বলছে…. দরজা খুলে দেখলো কেউ নেই… কিন্তু ঈশান তাকিয়ে আছে তার দিকে, সে চাউনি ঈশান এর ছিল না… ঈশান যেনো আর ঈশান নেই… লাল লাল চোখে মিতার দিকে তাকিয়ে

-কেনো এসেছিস তুই এখানে,এ চৌকাঠের এপারে ঈশান শুধু আমার… তুই….
অজ্ঞান হয়ে গেলো মিতা…..

চোখ যখন খুলল মিতা তখন তার বাড়িতে… মা সহ আরো একজন মধ্য বয়স্ক লোক অর্থাৎ সেই বাড়ির মালিক….
.
-ওই বাড়ি টা আগে একটা Rented ladies hostel ছিল। পুরো বাড়িটা মেয়েরা বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতো… Uporer তলা টা তে ও মেয়েরা থাকতো…. ঈশান এর খাট এর পাশে যে খাট টা ছিল সেটা ছিল একটা ঈশান এর মতোন ই সাদা সিধে মেয়ের… সিনিয়র দের অত্যাচারের শিকার হয়ে ওই রুমে ই সুইসাইড করে…. তার জীবনের গল্পের সাথে ঈশান এর মিল থাকায় তার ঈশান এর প্রতি এক অমানবিক ভালোবাসা জন্মে ছিল…. তাই হয়তো মিতা কে সে ওই রুমে ঈশান এর সাথে সহ্য করতে পারেনি….

মিতা তারপর থেকে ঈশান এর সাথে কোনো সম্পর্ক রাখেনি।

কিছুদিন বাড়ির মালিক মারা যায়…. তার ছেলে দেশ এ না ফেরার ফলে বাড়িটা ঈশান এর নামে হয়ে যায়…. ঈশান এখন সুখে শান্তিতে সেই বাড়িতেই থাকে….

তার প্রেমিকার সাথে……

…………………………………………………………… সমাপ্ত ……………………………………………………………

গল্পের বিষয়:
রহস্য

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত