মমি রহস্য

মমি রহস্য

গ্রীষ্মের ছুটি ।
পাবন,শুভ আর জয় মিলে ঠিক করলো সী-বিচে ঘুরতে যাবে । সেতু ওর ফুফুর বাড়িতে যাবে তাই ওদের সাথে যেতে পারবে না । তবে অরকিয়া যাবে । আজমল সাহেব ওদের থাকা, খাওয়া-দাওয়া আর যাবতীয় সকল খরচ বহন করার দায়িত্ব নিল ।
নির্দিষ্ট দিনে ওরা বাসে উঠে রওয়ানা দিল সী-বিচের উদ্দেশে্য ।বাসে ওরা অনেক মজা করলো । তবে এত মজার মধে্যও শুভ আর অরকিয়ার ঝগড়া কিন্তু থেমে রইলো না। পাবন আর জয় মিলে কোনরকম ওদের ঝগড়া সামাল দিল । যাই হোক ঝগড়া আর মজা দুইটা মিলিয়েই বাসভ্রমন শেষ হল ।
দুপুর নাগাদ ওরা সী-বিচে এসে পৌঁছালো । হোটেলে রুম আগেই বুক করা ছিল । পাবন,জয় আর শুভ উঠলো এক রুমে । অরকিয়া অন্য রুমে । দুপুরে খাওয়া দাওয়া করে যে যার যার রুমে গিয়ে বিশ্রাম নিল ।
বিকালে ওরা একসাথে সমুদ্রের তীরে ঘুরতে বের হল । একসাথে ছুটোছুটি করলো । কাকড়াঁ ধরলো । ঢেউয়ের সাথে পাল্লা দিয়ে ছুটলো । তবে শুভ আর অরকিয়া ই বেশি মজা করলো । ছোটাছুটির পর ক্লান্ত হয়ে ওরা তীরের কাছে একটা গাছের নিচে বসলো । পাশেই ছোটখাটো একটা জঙ্গল ।
পাবন আবার জঙ্গল খুব পছন্দ করে । জঙ্গলে বেড়াতে ওর খুব ভালো লাগে । জয়কে সাথে নিয়ে ও জঙ্গলের ভিতর ঘুরতে গেলো । শুভ আর অরকিয়া গাছের নিচেই বসে রইলো।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে । জঙ্গলের ভিতরটা মোটামুটি অন্ধকারই । পাবন হাটঁতে হাটঁতে বেশ খানিকটা এগিয়ে গেল । জয় পাবনকে দেখতে পেল না ।
পাবন জয়কে কিছু একটা বলার জন্য ডাক দিয়ে পেছনে ফিরতেই পা হরকে একটা গর্তের ভিতরে পড়ে গেলো । নিচে পড়ে ও অ্যাউককক করে একটা শব্দ করলো । বুঝতে পারলো না ও কোথায় পড়েছে ।চারপাশে খুব অন্ধকার । পকেট থেকে ছোট লাইটটা বের করে জ্বালালো। চারপাশটা ভাল করে দেখে ও বুঝতে পারলো এটা একটা ছোটখাটো গুহা । টর্চটা নিচের দিকে নামিয়ে আনতেই ও দেখতে পেল একটা লাশ পড়ে আছে নিচে আর ওটার হাতে ছোট একটা চিরকুট ।
দুই.
পাবন একটু ভয় পেল । একে তো অন্ধকার তার উপর আবার জঙগলের ভিতর একটা গুহাতে একটা লাশ । একটু ভয়ের ব্যাপার তো বটেই । তবে পাবন ভয়ের চিন্তাটা আপাতত মাথা থেকে নামিয়ে ভাবতে লাগল যেহেতু এখানে একটা লাশ আছে সেহেতু এখানে কেউ না কেউ যেকোন মুহূর্তে আসতে পারে তাই এখান থেকে যত দ্রুত সম্ভব বের হতে হবে । ও চারদিকে ভাল করে তাকিয়ে দেখলো গুহার পশ্চিম দিকে একটা টানেলের মত দেখা যাচ্ছে । চিরকুটটা লাশের হাত থেকে নিয়ে ও টানেলের ভিতর দিয়ে হাটতেঁ লাগলো । টানেলের মুখে এসে দেখলো ও সাগরের তীরের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে ।
ওদিকে জয় পাবনকে জঙ্গলে অনেকক্ষণ খুঁজল । জোরে জোরে ওর নাম ধরে ডাক দিল । কিন্তু কোন সাড়া পেল না । এদিকে অন্ধকারও নেমে আসছে । বাধ্য হয়ে ও জঙ্গল থেকে বেরিয়ে গেলো । শুভ আর অরকিয়াকে বিষয়টা জানালো ।
অরকিয়া বলল,” এত অন্ধকারে আমরা ওকে জঙ্গলে খুজেঁ পাব না । চল হোটেলে ফিরে যাই । হোটেলে গিয়ে সিকিউরিটি গার্ডকে খবর দেই আর ফোনে শাকিল আংকেলকে ঘটনাটা জানাই । তারপর ওদের সাথে আমরাও আসব ।”
জয় আর শুভ ওর কথার সাথে একমত হল । ওরা রওয়ানা দিল হোটেলের উদ্দেশ্যে । হঠাৎ পিছন থেকে কে যেন ওদের নাক ধরে ডাক দিল । পিছনে তাকিয়ে দেখলো পাবন আসছে ।
কাছে এসে পাবন বলল,” তোরা কত বেঈমান , আমাকে একা একা জঙ্গলে রেখে তোরা চলে যাচ্ছিস । ”
শুভ বলল,” আরে না,চলে যাচ্ছি কোথায় আমরা তো তোকে খুজাঁর জন্য সিকিউরিটি গার্ড আনতে যাচ্ছিলাম ।”
জয় বলল,” এতক্ষণ কোথায় ছিলি তুই ? কত চিন্তা হচ্ছিল জানিস ।”
পাবন ওর কাধঁ চাপড়ে দিয়ে বলল,” চল,রুমে গিয়ে সব বলছি।”
হোটেলে এসে পাবন ওদের সবকিছু খুলে বলল । সব শুনে তো ওরা অবাক ।
জয় বলল,” কি বলছিস ? জঙ্গলের ভিতর গুহা , তার ভিতর আবার লাশ । তবে কি আমরা যেখানেই যাই রহস্যও আমাদের পিছনে পিছনে আসে ।”
অরকিয়া বলল,” রহসে্যর ভিতর না ঢুকলেই তো হয় , বেড়াতে আসছি বেড়ানো শেষ হলে চলে যাব। কি দরকার ঝামেলায় জড়ানোর।”
পাবন একটু সামনে এগিয়ে গিয়ে বলল,” রহস্য যখন এসেই পড়ছে তখনতো সমাধান করেই ছাড়ব । আর তোরা কেউ আমার সাথে না থাকলেও আমি একাই রহস্যটা সমাধান করার চেষ্টা করবো ।”
শুভ বলল,” অরকিয়ার মত একটা ভীতুর ডিমের কথা শুনে তুই রাগ করছিস কেন ? আমি তো আছি তোর সাথে ।” জয় বলল,” আমিও আছি ।”
অরকিয়া রাগে ফোঁস ফোঁস করে কপালের চুলগুলোকে সরিয়ে বলল,” কি বললি আমি ভীতুর ডিম ? মনে রাখিস ভুতের কেসটাতে কিন্তু আমিই অতীশ সাহেবের মাথায় বাশঁ দিয়ে আঘাত করেছিলাম। আমিও আছি তোদের সাথে ।”
শুভ বলল,” হুমমমমম মাথায় একটা আঘাত করে উনি একদম মহাভারত অশুদ্ধ করে ফেলেছেন ।” কথাটা শুনে অরকিয়া শুভর দিকে তেড়ে আসলো ।
পাবন বাধাঁ দিয়ে বলল,” এখন কি ঝগড়া করার সময় ? চল দেখি চিরকুটটাতে কি লিখা আছে ?”
পাবন পকেট থেকে চিরকুটটা বের করে দেখলো তাতে লিখা ,” মমিটা কোথায় আছে ওটা শুধু আমি জানি । তুই চাইলেও সেটা খুজেঁ পাবি না ।” আর নিচে দুইটা শব্দ,”R.B”
তিন.
ওরা চিরকুটটা পড়ে কিছুই বুঝতে পারলো না । পাবন বলল,” মমি তো মিশরে থাকে । এখানে আসবে কিভাবে ? আর মমির সাথে ওই মৃতদেহের কি সম্প্রক ?” কিছুক্ষণ ভেবে ও বলল.” কাল সকালে আমরা আবার ওই গুহাটাতে যাবো । মনে হয় ওইখানে কোন সূত্র পেতে পারি ।”
পরদিন সকালে পাবন,শুভ আর জয় গেলো গুহাতে । অরকিয়াকে রেখে গেল হোটেলে । আর বলে গেল ওদের দেরি হলে যেন পুলিশকে ইনফর্ম করে ।
তবে আজ আর ওরা জঙ্গল দিয়ে ঢুকলো না । সাগরের তীরের কাছে টানেল দিয়ে ঢুকল । গুহাতে ঢুকার সময় শুনতে পেল কে যেন গুহার ভিতর কথা বলছে ।পাবন একটু লুকিয়ে টানেলের ভিতর থেকে দেখলো তিনজন লোক ওদের বিপরীত দিকে মুখ করে গুহার ভিতর কথা বলছে । দেখে মনে হল সামনের লোকটা বস আর পিছনের লোকগুলো সহকারী ।
বস টাইপের লোকটা বলল,” কিরে ডিক, লাশটাকে সাগরে ভাসিয়েছিস ?”
পিছন থেকে একজন বলল ,” হ্যা বস ।”
লোকটা আবার বলল,” ব্রুস আমাকে গাধা ভেবেছে ? ও ভেবেছে আমি ওকে খুজেঁ পাবো না । ” একটু থেমে আবার বলল,”চল ডেভিডের কাছে যাব। চিঠিটা দিয়ে আসি ।”
বলেই ওরা টানেলের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল । পাবন,জয় আর শুভ ধীর পায়ে সন্তপর্ণে টানেল থেকে বের হয়ে তীরের কাছে এসে কথা বলা শুরু করলো । লোকগুলো বের হয়ে ওদের দেখলো । কিছুক্ষণ ওদের দিকে তাকিয়ে চলে গেল । পাবন জয়কে বলল,” তুই শুভ কে নিয়ে ওদের ফলো কর আর আমি গুহায় ঢুকছি ।”
জয় আর শুভ চলে গেলে পাবন গুহাতে ঢুকলো । ভিতরটা খুব স্যাতঁস্যাতে । এককোণে একটা চেয়ার পড়ে আছে । যেটা ও আগের দিন দেখে নি । চেয়ারটার উপর একটা খাম পড়ে আছে। পাবন খামটা খুলে দেখলো তাতে একটা ছবি আর একটা কাগজ । ছবির নিচে লেখা রবার্ট ব্রুস । আর কাগজে লিখা – ” ছবিটা ব্রুসের । পাহাড়তলী এলাকায় লুকিয়ে আছে । ওর কাছেই মমিটার নকশা আর লুটকৃত স্বর্ণ আছে ।”
তখনই শুভ আর জয় দৌড়ে গুহাতে ঢুকল আর বলল,” ওরা গুহার দিকে আসছে । আমাদের পালাতে হবে ।” পাবন কাগজ আর ছবি টা খামে ঢুকিয়ে ঠিক জায়গায় রেখে দৌড়ে গুহা থেকে বের হয়ে গেল । ওরা জঙ্গলে ঢুকে গেল ।
পাবন বুঝতে পারলো ভুলে ওরা খামটা না নিয়ে চলে গিয়েছিল । এখন ওটাই ওরা নিতে আসছে । কিন্তু ভেবে পেল না ব্রুসটা কে ? আর মমি আর স্বর্ণের রহস্যটাই বা কি ? পাবন উপরের দিকে তাকাতেই দেখলো একটা পাখি গাছ থেকে উড়ে চলে গেল । হয়তো পাখিটা অজানা উদ্দেশে্য অনেক পথ পাড়ি দিবে । পাবনের কাছে মনে হল ওদেরও অজানা পথে অনেক দূর যেতে হবে এই রহসে্যর সমাধানের জন্য ।
চার.
কিছুক্ষণ পর ওরা জঙ্গল থেকে বের হল । সাগরের তীরের কাছে আসতেই দেখলো লোকগুলো চলে যাচ্ছে । ওরাও লোকগুলোর পিছন পিছন যেতে লাগল । কিছুদুর গিয়ে লোকগুলো গাড়িতে করে শহরের দিকে চলে গেল । ওরা একটা ট্যাক্সি ভাড়া করে গাড়িটাকে ফলো করলো ।
শহরের ভিতর গিয়ে লোকগুলো গাড়ি থেকে নেমে একটা রেস্তোরায় গিয়ে ঢুকল । পাবন জয়ের হ্যাটটা পড়ে নিল । আর ওদেরকে বলল একটু আড়ালে থাকতে । কারণ সকালে লোকগুলো ওদেরকে সাগরের তীরের কাছে দেখেছে । এখন দেখলে ওরা সন্দেহ করতে পারে ।
ভিতরে গিয়ে পাবন দেখলো একটা মাঝবয়সী লোক টেবিলে বসে সিগারেট খাচ্ছে । আর ওই লোকগুলো টেবিলের অপর পাশে । পাবন হ্যাটটা কপাল পর্যন্ত পড়ে পাশের একটা টেবিলে বসে পড়লো ।
বস টাইপের লোকটা বলল,” ডেভিড,এই নেও ব্রুসের ছবি । ও পাহাড়তলীতে আছে । ওর কাছেই মমির নকশা আছে ।আর আমি জানি ওই মমিটা তুমি খুজঁছো । মমির প্রতি আমার কোন আগ্রহ নেই । তুমি শুধু ব্রুসকে এনে দেও। আর তুমি ব্রুসকে পেলে মমিটাও পাবে তাই না ।”
ডেভিড ছবিটা দেখে বলল,” তুমি কোন চিন্তা কর না, ডিউক । আমি কালই লোকজন নিয়ে পাহাড়তলী চলে যাব।”
পাবন বুঝতে পারলো বস টাইপের লোকটার নাম ডিউক ।
একটু থেমে ডেভিড আবার বলল,”আচ্ছা তুমি ব্রুসকে মারতে চাও কেন ? কি করেছে ও। ? তুমি তো বললে মমির প্রতি তোমার কোন আগ্রহ নেই।”
ডিউক বলল,”আমি আর ও একসাথে গতবছর স্বর্ণের দোকান থেকে প্রচুর পরিমাণ স্বর্ণ লুট করেছিলাম । ও ওগুলো সমপরিমাণ ভাবে ভাগ করে দিবে বলে ওর কাছেই রাখতে চাইলো । আমিও ওকে খুব বিশ্বাস করতাম । তাই ওর কথায় রাজি হয়ে গেলাম । কিন্তু ও আমাকে ঠকিয়ে সব স্বর্ন নিয়ে পালিয়ে গেছে । পরে লোকমুখে শুনতে পেলাম ওর কাছে নাকি পুরাতন মিশরীয় মমির নকশা আছে। এই কথাটাও ও আমার কাছে লুকিয়েছিল। লুকানোর কিছুদিন পর আমার একজন লোক ওকে পাহাড়তলীতে দেখতে পায় । খবর পেয়ে যেতে যেতে ও পালিয়ে যায় ওখান থেকে । সমস্ত পাহাড়তলী খুজেঁও ওকে পেলাম না। শেষমেষ ওকে না খুজেঁ মমিটা খুজাঁ শুরু করলাম।ভাবলাম ও যেহেতু পাহাড়তলীতে আছে তাহলে মমিটা নিশ্চয়ই ওর কাছাকাছি আছে । কিন্তু ওটাও পেলাম না । গতকাল সকালে ও ওর এক অনুচরকে আমার কাছে একটা চিরকুট দিয়ে পাঠায় । চিরকুটে আমাকে তাচ্ছিল্য করে কিছু লেখা ছিল ।চিরকুটটা পড়ে আমার মাথায় রক্ত চড়ে গেল । ডিক আর জনকে হাতের ইশারা দিতেই ওরা দুইটা গুলি অনুচরটার মাথায় ঢুকিয়ে দিল । আজ সকালেই ওটাকে সাগরে ভাসিয়ে দিয়েছি ।” তবে এখন আর মমির প্রতি আমার কোন আগ্রহ নেই ।আমি শুধু স্বর্ন আর ব্রুরসকে চাই । আর তুমি মমিটা নিয়ে যেও ।”
ডেভিড সব শুনে বলল,” ওকে ডি্রল ফাইনাল ।”
কথা শেষ হলে লোকগুলো চলে গেল । পাবন কিছুক্ষণ পর রেস্তোরা থেকে বের হল । জয় আর শুভ পাবনকে দেখে আড়াল থেকে বেরিয়ে এল । ওদেরকে দেখে পাবন বলল,” তাড়াতাড়ি হোটেলে চল । আজই পাহাড়তলী যেতে হবে ।” জয় বলল,” কেন ?” পাবন ট্যাক্সিতে উঠতে উঠতে বলল,” আগে গাড়িতে বস তারপর সব বলছি ।” পাবন গাড়িতে বসে ওদের সবকিছু বলল ।
হোটেলে গিয়ে ওরা রেডী হতে লাগল । হঠাৎই শুভর আব্বু শুভকে ফোন দিল । বলল কি এক কাজ আছে এখনই ওকে বাসায় চলে আসতে ।
পাবন শুনে বলল,” সমস্যা নাই । তুই অরকিয়াকে নিয়ে চলে যা । আমি আর জয়তো আছিই ।” শুভ খুব আফসোস করল ওদের সাথে থাকতে না পেরে । কিন্তু কি আর করা যেতে তো হবেই । ওরা বাড়ি চলে গেল ।
পাবন আর জয় রওয়ানা দিল পাহাড়তলীর উদ্দেশে্য । বিকাল নাগাদ ওরা পাহাড়তলী পৌঁছে গেল । একটা পাহাড়ের নিচে নামিয়ে দিয়ে ওদের ভাড়া করা গাড়িটা চলে গেল ।ওরা আশেপাশে কোন ঘরবাড়ি দেখতে পেল না । চারদিকে শুধু পাহাড় আর জঙ্গল ।
পাবন বলল,” জয় চল , এই পাহাড়টার উপর উঠি । উপর থেকে এলাকাটা ভালো করে দেখা যাবে ।”
পাবন আর জয় পাহাড় বেয়ে উপরে উঠতে লাগল । যদিও পাহাড়ে চড়ার অভিজ্ঞতা ওদের তেমন একটা নেই । খুব কষ্ট হল ওদের । এক ঘন্টা লাগলো পাহাড়ের চূড়ায় উঠতে । উপরে উঠে ওরা দেখলো যতদূর চোখ যায় শুধু পাহাড় আর জঙ্গল । ভীষণ দুর্গম এলাকা । শুধু ওরা যে পাহাড়ে উঠেছে তার বিপরীত দিকে পাদদেশে বেশ কিছু ঘরবাড়ি আছে।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে ।
জয় বলল,” আমাদর তাড়াতাড়ি পাহাড়ের নিচে নামতে হবে । যেহেতু এটা পাহাড়ী দুর্গম এলাকা সেহেতু এখানে নিশ্চয়ই অনেক হিংস্র জীবজন্তু আছে। নিচে নেমে কোন একটা ঘরে আশ্রয় নিতে হবে ।”
পাবন ওর কথায় সায় দিল ।
বাম দিকে ঘুরে নামতে যাবে এমন সময় কারা যেন ওদের মাথায় লাঠি দিয়ে জোরে আঘাত করলো । অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল পাবন আর জয় ।
পাঁচ.
জ্ঞান ফিরলে পাবন চোখ খুলে দেখলো ও একটা বিছানার উপর শুয়ে আছে ছোট একটা ঘরের ভিতর । জানালা দিয়ে ভোরের আলো ঘরে ঢুকছে । ও উঠে বসল । কিছুক্ষণ পর জয়ও উঠে বসলো । জানালা দিয়ে বাইরে পাহাড় আর গাছের সারি দেখে বুঝতে পারলো ওরা পাহাড়তলীতেই আছে ।
দরজা খুলে চল্লিশোর্ধ বয়সের একটা লোক ঘরে ঢুকল । মুখে হালকা দাড়িঁ ।
ওদের দুইজনকে বসে থাকতে দেখে লোকটা হাসিমুখে বলল,”তোমরা উঠে গেছো । আসলে আমি খুবই দুঃখিত কালকের ঘটনার জন্য । আসলে কিছুদিন ধরেই আমাদের এলাকায় ডাকাতের উপদ্রব খুবই বেড়েছে । তাই এলাকার লোকজন অপরিচিত কাউকে দেখলেই সন্দেহ করে । তোমাদেরকে কাল পাহাড়ের উপর দেখে ডাকাত দলের সদস্য ভেবে আমার কাছে নিয়ে আসে । তবে তোমাদের দেখে আমার ডাকাত বলে মনে হয় নি ।”
জয় একটু রেগে বলল,” শুধু নিয়ে আসে নি । মাথায় আঘাত করে অজ্ঞান করে তারপর এনেছে। আর আপনি কে যে এলাকার লোকজন আমাদেরকে আপনার কাছেই নিয়ে আসলো ?”
লোকটা মুখের হাসিটা বজায় রেখেই বলল,” আমি আসলাম মিয়া । এই গ্রামের মোড়ল । তোমরা রাগ কর না । ওদের হয়ে আমি তোমাদের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি । তো তোমাদের পরিচয়টা কি জানতে পারি ?” লোকটার কথা শুনে ওদের ভালই লাগল ।
জয় বলল,” ও পাবন আর আমি জয় ।”
আসলাম সাহেব জিজ্ঞাসা করল,” এখানে কেন আসছো ?”
জয় কি যেন বলতে চাইছিল পাবন ওকে থামিয়ে একটু কেশে বলল,” আসলে আমাদের ক্লাশে পাহাড়ের উপর একটা প্রোজেক্ট ওয়ার্ক দিয়েছে । তাই আমরা এখানে আসছি । এখানে তো অনেক পাহাড় আছে তাই ভাবলাম এখানে আসলে হয়তো আমরা অনেক কিছু জানতে পারবো । ” জয়ও ওর কথায় সায় দিল ।
আসলাম সাহেব একটু হেসে বলল,” ও এই কথা । ঠিক আছে কিছুদিন তোমরা এখানে থেকেই তোমাদের কাজ চালিয়ে যাও । আমিও তোমাদের সাহায্য করব । এখন তোমরা নাস্তা করে নেও পরে কথা হবে ।”
কথাটা বলে উনি চলে গেলেন । ওরা নাস্তা করে ঘরের বাহিরে এলো ।
পাহাড়ের পাদদেশ ছোট এই গ্রামটাতে ১০ কি ১২ টা ঘর আছে । লোকসংখ্যা সব মিলিয়ে ৪০ কি ৫০ জন হবে । আসলাম সাহেব চেয়ারে বসে গ্রামের কয়েকজন লোকের সাথে কথা বলতেছিলেন । ওদেরকে দেখেই ডাক দিয়ে বলল,”এদিকে আসো তোমরা ।” পাবন আর জয় এগিয়ে গেল । আসলাম সাহেব ওদেরকে পরিচয় করিয়ে দিলেন লোকজনের সাথে আর বললেন ওদের এখানে আসার কারণ । কথা শেষ করে লোকজনদেরকে বিদায় দিয়ে পাবন আর জয়কে নিয়ে আসলাম সাহেব কাচারীতে গিয়ে বসলেন ।
জয় জিজ্ঞাসা করল,” এত দুর্গম এলাকায় থাকেন কিভাবে আপনারা ?”
আসলাম সাহেব একটা পান মুখে দিয়ে বললেন,” আমার বাপ-দাদারা এখানেই থাকতো । ছোটবেলা থেকেই ওনাদের দেখে শিখেছি কিভাবে এখানে থাকতে হয় । এই পাহাড় এই গাছপালা সবকিছুই আমাদের বন্ধুর মত । আর এদিকটা খুব বেশি একটা দুর্গমও না । পশ্চিম দিকে যতই যাবে বন ততই ঘন আর পাহাড় গুলোও দুর্গম হয়ে উঠবে । ওখানে কেউ থাকেও না ।” পাবন একটু জিজ্ঞাসু স্বরে বলল,” ওই দুর্গম এলাকায় কি মমি পাওয়া যায় নাকি । ”
আসলাম সাহেব ভ্রু কুচকেঁ পানের চিপ ফেলে বলল,” মমি এখানে আসবে কিভাবে ? ওগুলোতো শুনেছি মিশরে থাকে ।”
পাবন বলল,” লোকমুখে শুনেছি এই অঞ্চলে নাকি মমি আছে । তাই জিঞ্জাসা করলাম আরকি ।”
আসলাম সাহেব একটু বিরক্ত হয়ে বলল,” না আমিতো শুনি নি । কি জানি থাকলেও থাকতে পারে ।”
পাবন বলল,” ঠিক আছে আংকেল আমরা এখন উঠব । একটু পাহাড় দেখতে যাব ।”
আসলাম সাহেব বলল,” ঠিক আছে যাও, তবে পশ্চিমে বেশিদূর যেও না । জন্তু জানোয়ারে ভরা জায়গা ।” “ঠিক আছে,আংকেল” বলে পাবন আর জয় বের হয়ে গেল ।
কিছুদূর গিয়ে দেখলো একটা বুড়ো লোক বসে বসে বেড়া বানাচ্ছে । ওদেরকে দেখে লোকটা ডাক দিয়ে ওদের পরিচয় জিজ্ঞাসা করলো । পাবন বলল ওরা আসলাম মিয়ার বাড়িতে বেড়াতে এসেছে আর পাহাড় সম্পর্কে জানতে এসেছে । লোকটা ওদের বসতে দিল ।
বসে পাবন লোকটাকে জিজ্ঞাসা করলো ,” আপনি কি মমি সম্পর্কে কিছু জানেন । ” লোকটা বলল,” কেন বল তো ?”
জয় বলল,” আসলে আমাদের খুব জানার ইচ্ছে ।”
লোকটা বলল,” আমি আমার দাদার মুখে শুনেছি ১৮ দশকের দিকে মিশরীয়রা মমির গুড়া দিয়ে বিভিন্ন জটিল রোগের ঔষুধ তৈরি করতো । ঔষুধগুলো বিশ্বজুড়ে দারুন খ্যাতি অর্জন করেছিল । মমির গুড়াও তখন খুব দামী আর দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠে । মিশরের পাচারকারী দলগুলো তখন খুব সক্রিয় হয়ে উঠে । ওরা মিশর থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মমি পাচার করা শুরু করে । সে সময় একটা মমি পাচারকারীদের মাধ্যমে আমাদের দেশে আসে। মমি বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার আশংকায় মিশরের রাজা তখন মমির গুড়ার তৈরী সবধরনের ঔষুধ নিষিদ্ধ করে । আর সব দেশের প্রতিনিধিদেরকে পাচারকৃত মমি ফিরিয়ে দেওয়ার অনুরোধ জানায় ।মিশরের রাজার অনুরোধে এ দেশের সরকার মমি উদ্ধার করার জন্য সেনাবাহিনী মোতায়েন করে । পাচারকারীরা ধরা খাওয়ার ভয়ে মমি নিয়ে এই পাহাড়ী দুর্গম এলাকায় লুকায় । যতদূর জানি পাচারকারীর মধে্য বেশিরভাগই ছিল ব্রিটিশ । ওরা মমিটাকে এই অঞ্চলেই লুকিয়ে রাখে ।লোকমুখে শুনা যায় মমিটা নাকি এখনও এই অঞ্চলেই আছে ।” বলে লোকটা থামল । তারপর বলল,” অনেক কিছু বলে ফেললাম তোমাদের । অনেক কাজ পড়ে আছে আমার । তোমরা এখন যাও ।”
ওরা লোকটাকে ধন্যবাদ জানিয়ে সেখান থেকে চলে গেল । হাটতে হাটতে ওরা লোকালয় থেকে অনেক দূরে চলে আসলো । চারদিকে শুধু উচুঁ উচুঁ পাহাড় আর ঘন জঙ্গল ।
ছয়.
আরও কিছুক্ষণ হাটাঁর পর ওরা একটা গাছের নিচে বিশ্রাম নেওয়ার জন্য বসলো । জয় বলল ওর খুব পানি পিপাসা পেয়েছে । পাহাড়ের উপর থেকে বয়ে আসা ঝর্ণার পানি খেয়ে ওরা পিপাসা মিটালো ।
জয় বলল,” এই ঘন জঙ্গল আর পাহাড়ের মাঝে কোথায় খুজঁবি রবার্ট ব্রুস আর মমিটাকে ? আমার কাছে তো এই ঘুরাটাকে অহেতুক আর বোকামী বলে মনে হচ্ছে ।”
পাবন বলল,” আমার কাছেও তাই মনে হচ্ছে । অন্য কোন উপায় বের করতে হবে ।” হঠাৎই ওরা শুনতে পেল কে যেন পানি পানি বলে চিৎকার করছে। কিন্তু ওরা আশেপাশে কাউকে খুঁজে পেল না । ওরা পাহাড়টার পিছনের দিকে গিয়ে দেখলো পাহাড়ের গায়ে একটা গাছের পাশে ছোট একটা ফোকর ।পাবনের কাছে মনে হল শব্দটা ওখান থকে আসছে । ফোকরটাতে উকিঁ দিয়ে দেখলো ভেতরে ছোট একটা গুহা । ওইখানেই একটা লোক শুয়ে পানি পানি বলে ডাকছে । হামগুড়ি দিয়ে ভিতরে ঢুকল ওরা । পাবন লোকটার কাছে গিয়ে শরীরে হাত দিয়ে দেখলো জ্বরে লোকটার সারা শরীর পুড়ে যাচ্ছে । পাশেই একটা খালি বোতল পড়ে ছিল । ও জয়কে বোতলটা দিয়ে পানি আনতে পাঠালো । জয় পানি নিয়ে আসলো ।
লোকটা পানি খেয়ে কিছুটা সুস্থ হল ।
পাবন জিজ্ঞাসা করলো,” আপনি কে ? এই জনশূণ্য পাহাড়ী আর দুর্গম এলাকায় একা একা কি করছেন ?”
লোকটা আস্তে করে বলল,” আমি রবার্ট ব্রস ।” কথাটা শেষ না হতেই জয় চেচিঁয়ে বলল,” আপনিই ব্রুস ?”
লোকটা একটু ইতস্তত হয়ে বলল,” হ্যা । কেন ? তোমরা আমাকে চিনো নাকি ?”
পাবন ধীরে সুস্থ বলল,” আসলে আমরা সেরকম ভাবে আপনাকে চিনি না । তবে ডেভিড আর ডিউক নামে দুইজন লোক আপনাকে মারতে চায় সেটা আমরা জানি ।তাই আপনাকে খুজতেঁই আমরা এখানে আসছি । কিন্তু এত সহজে আপনাকে পেয়ে যাব ভাবতে পারি নি ।”
লোকটা জিজ্ঞাসু স্বরে বলল,” তোমরা কারা ? আর কি করে জানলে আমি এখানে আছি ?” পাবন বলল,” আমরা আসলে শখের গোয়েন্দা ।জঙ্গলে ঘুরতে গিয়ে ডিউকের গুহাতে আপনার অনুচরের লাশ দেখতে পাই । আর ডিউক যখন ডেভিডের সাথে কথা বলতে ছিল তখন জানতে পারলাম আপনি এখানেই থাকেন । কিন্তু আপনি এখানে এই অবস্থায় কেন ? আপনার সাথের লোকজন কই ?”
ব্রুস উঠে বসতে চেষ্টা করলো । কিন্তু দুর্বল শরীর নিয়ে উঠতে পারলো না ।
অগ্যাত শুয়ে শুয়েই বলল,” সবই আমার পাপের শাস্তি । আমর সব অনুচররা আমাকে ছেড়ে চলে গেছে । তোমরা এখানে না আসলে হয়তো আমি পানির অভাবে আজই মরে যেতাম । তোমাদের অসংখ্য ধন্যবাদ ।”
পাবন বলল,” আচ্ছা ডিউক আর ডেভিড আপনাকে মারতে চায় কেন ? আর কি এমন পাপ করেছেন যে শাস্তি পাচ্ছেন ?”
ব্রুস বলল,” আমি আর ডিউক মিলে একটা স্বর্ণের দোকান লুট করেছিলাম । কিন্তু ডিউককে স্বর্ণের ভাগ না দিয়েই আমি কৌশলে পালিয়ে এই জায়গায় চলে আসি । আর যে লোকটার দোকান লুট করেছিলাম ওই দোকানটাই ছিল ওর আয়ের একমাত্র উৎস । আমার মনে হয় ওর অভিশাপেই আজ আমার এই অবস্থা । কিন্তু একটা জিনিস বুঝতেছিনা আমার শত্রুতা তো ডিউকের সাথে । ডেভিডকে তো আমি ভালো করে চিনিও না । ও আমাকে মারতে চায় কেন ?”
পাবন একটু রহস্যময়ী কন্ঠে বলল,” মমির জন্য ।”
ব্রুস ভ্রু কুচকেঁ বলল,” তোমরা মমির কথাও জানো ?”
সাত.
পাবন বলল,হ্যা জানি । আর এটাও জানি আপনিই শুধু ওই মমিটার নকশা জানেন । ”
জয় একটু অনুরোধের সুরে বলল,” ওই মমিটা সম্প্রকে একটু বলবেন আমাদের ?”
ব্রুস বলল,” তোমরা যেহেতু আমার উপকার করেছো অবশ্যই তোমাদের বলবো ।”
পাবন বলল,” শুনেছি মমিটা নাকি পাচারকারীদের সহায়তায় এই অঞ্চলে এসেছে । তাহলে কি আপনি পাচারকারী দলর সদস্য ?”
ব্রুস একটু হেসে বলল,” বাহ্ ভালোই তো গোয়েন্দাগিরি শিখেছো । আসলে আমি পাচারকারী দলের সদস্য নই । তবে পাচারকারী পরিবারের সদস্য । আমার প্রপিতামহই মমিটা এই অঞ্চলে এনে লুকিয়ে রাখে । বংশানুক্রমে মমির নকশাটা আমার বাবার কাছে আসে । বাবা চেয়েছিল মমিটা মিশরে চড়া দামে বিক্রি করতে । কিন্তু বিশস্ত ক্রেতা আর কড়া নিরাপত্তার কারণে তিনি মমিটা চালান করতে পারেন নি । কিছুদিন পর বাবা ইংল্যাংড এ খুব অসুস্থ হয়ে পড়েন । তাই মমিটা সরাতে পারেন নি এখান থেকে ।”
একটু কেশেঁ তিনি আবার বলতে লাগলেন,” আমি ছোট থেকে বড় হয়েছি ইংল্যান্ডই । ছোটখাটো একটা ব্যবসা করতাম । হঠাৎই ব্যবসায় বড় ধরণের একটা লোকসান হয়ে গেলো । আর এদিকে বাবাও অসুস্থ হয়ে পড়লো । খুব কষ্টে দিন কাটতে লাগলো । কি করবো ভেবে পাচ্ছিলাম না । একদিন বাবা আমাকে ডেকে মমিটার কথা বলল । আর বলল ওটা মিশরে চালান করতে পারলে অনেক টাকা পাব । বাবার কথামত আমি ইংল্যানড থেকে পাহাড়তলী চলে আসলাম । কিন্তু বুঝতে পারলাম না কি করে মমিটা এখান থেকে সরাবো । একদিন সি-বীচে গেলাম ঘুরতে । সেখানে পরিচয় হলো ডিউকের সাথে । ওর ও তখন দুঃসময় চলছিল । তাই দুইজন মিলে প্লান করলাম স্বর্ণের দোকানে ডাকাতি করার । কিন্তু ডাকাতি করার পর এত স্বর্ণ একসাথে দেখে আর লোভ সামলাতে পারলাম না । কৌশলে সব সোনা ওর কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়ে চলে আসলাম আবার পাহাড়তলী । এই দুর্গম এলাকায় ও আমাকে খুজেঁই পেলো না । কিন্তু পাপ তো বাপকেও ছাড়ে না । কিছুদিন পর জানতে পারলাম বাবা মারা গেছে । তার কিছুদিন পর নিজেও একটা কঠিন অসুখে পড়লাম । তাই এখন আমি চিন্তা করেছি মমিটা মিশরে পৌছিঁয়ে দিব আর ডিউককে ওর স্বর্ণের ভাগ বুঝিয়ে দিব । বাকী স্বর্ণগুলো বিক্রি করে ইংল্যান্ডে গিয়ে আবার ব্যবসা করবো ।”
সব শুনে পাবন বলল,” কিন্তু ওরা তো আপনাকে মারার জন্য খুজঁছে । ”
ব্রুস বলল,” সে আমার কপালে যা আছে তাই হবে । মরণকে আমি আর ভয় পাই না ।”
জয় বলল,” মমিটা কি আমাদের একটু দেখাবেন ?”
ব্রুস বলল,” ঠিক আছে কাল সকালে দেখাবো ।”
এই প্রথম পাবন আর জয় পাহাড়ের গুহায় রাত কাটালো । এটা ওদের জন্য অ্যরকম দারুণ এক অভিজ্ঞতা ।রাতে ওরা শুভকে ব্রুসের পুরাতন টেলিফোন থেকে ফোন করলো । কিন্তু একবার কল ঢুকেই কেটে গেলো । নেটওয়ার্কের সমস্যার কারণে ওরা শুভর সাথে যোগাযোগ করতে পারলো না ।
পরদিন সকালে ঘুম থেকে ওরা পাহাড়ী গাছের ফল আর ঝর্ণার পানি দিয়ে নাস্তা করে রওয়ানা দিল মমি দেখার উদ্দেশে্য। আরও ঘন আর দুর্গম এলাকায় গিয়ে ঢুকলো ওরা । ব্রুসের হাটাঁচলা দেখেই ওরা বুঝতে পারলো যে এই দুর্গম এলাকা উনি খুব ভালো করেই চিনেন । ছোট আর অগভীর একটা জলাশয় ওরা পায়ে হেটেঁই পার হয়ে একটা পাহাড়ের কাছে এসে পৌঁছালো । পাহাড়ের উচুঁতে ছোট একটা ঢিলা । ব্রুস ওটার মুখ থেকে বড় একটা পাথর সরালো । ভেতরে ছোটখাট একটা ঘরের মত । ওটার মাঝখানেই মমিটা । পাবন আর জয় এই প্রথম মমি দেখলো । তাই ওরা খুব আগ্রহ ভরে ওটা দেখতে লাগলো। ব্রুস মমিটার নিচে একটা গর্ত খুড়ে দুইটা বস্তা বের করলো । বস্তা দুইটার মুখ খুলতেই বের হলো রাশি রাশি সোনা ।
হঠাৎ একটা গুলির আওয়াজ হল । পাবন আর জয় ব্রুসের দিকে তাকাতেই দেখলো ব্রুস মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আছে ।
শেষ অংশ.
পাবন আর জয় পিছনের দিকে তাকিয়ে দেখলো আসলাম মিয়া গুলি হাতে দাড়িয়ে আছে । আসলাম মিয়াকে দেখে পাবন আর জয় এত অবাক হলো যে ওদের মুখ দিয়ে কোন কথাই বের হলো না । আসলাম মিয়া পানের পিকটা মুখ থেকে ফেলে একটু হাসি দিয়ে বলল,” কি বাবারা খুব অবাক হলে তাই না । তোমরা আমাকে বোকা ভেবেছিলে তাই না। ভেবেছিলে প্রজেক্ট ওয়ার্ক এর কথা বললে আমি আর তোমাদের সন্দেহ করবো না ।কিন্তু আমি তোমাদের প্রথম দেখেই সন্দেহ করেছিলাম ।তোমাদের সেটা বুঝতে দেই নি । তারপর সেদিন মমির কথা যখন জিজ্ঞেসা করছিলে তখনই বুঝতে পেরেছিলাম তোমরা এখানে কোন একটা উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছো । তাই তো কাল থেকেই তোমাদের ফলো করছিলাম । ”
পাবন বলল,” কেন ?”
আসলাম মিয়া বলল,” কেন আবার মমিটার জন্য । কিন্তু এখন তো দেখছি মমির সাথে রাশি রাশি সোনাও আছে । আমার কি যে খুশি লাগছে । যাক বাবারা এখন তোমরা একটা কাজ করো তো দেখি । লাইনে দাড়িঁয়ে পড়ো । বেশিক্ষণ সময় নিব না । গুলিটা থেকে দুইটা গুলি তোমাদের বুকের মধে্য ঢুকিয়ে দিবো । সব ঝামেলা শেষ ।”
পাবন বলল,” কিন্তু আমরা তো আপনার কোন ক্ষতি করি নি । আমাদের শুধু শুধু মারবেন কেন ?”
আসলাম মিয়া বাকাঁ একটা হাসি দিয়ে বলল,” তোমরা তো আমার কোন ক্ষতি কর নি বরং ঊপকার করেছো । তোমাদের জন্যই তো আমি মমি আর সোনাগুলো পেয়েছি । কিন্তু কথায় আছে না উপকারীকে বাঘে খায় । তবে তোমাদের ভাগ্য খুব ভালো অন্তত বাঘের হাতে তো আর তোমাদের মরতে হচ্ছে না । নেও বাবারা দাড়িঁয়ে পড়ো । সময় অপচয় করা আমি আবার মোটেও পছন্দ করি না ।” পাবনের কাছে মনে হলো আসলাম মিয়ার বাকাঁ হাসিটা পৃথিবীর সবচেয়ে কুৎসিত হাসি ।
কি আর করা । জয় একটু বাম দিকে সরে পাবনের পাশে এসে দাড়াঁলো । দুইজনেই চোখ বন্ধ করে ভাবছে এই বুঝি গুলিটা এসে ওদের বুকে ঢুকল । হঠাৎই প্রচন্ড জোরে একটা গুলির আওয়াজ হলো । ধপাস করে কিছু একটা পড়ে যাওয়ার শব্দ হল । পাবন আর জয় চোখ খুলে দেখলো আসলাম মিয়া মাটিতে পড়ে আছে । আর পিছনে গুলি হাতে দাড়িয়ে আছে ডেভিড আর ডিউক ।
ডিউক ওদের দিকে না তাকিয়ে বলল,”কি ডেভিড বলেছিলাম না গুলিটার আওয়াজ এখান থেকেই আসছে ।”
ওদের দিকে তাকিয়ে আবার বলল,” খুব চালাক ভাবো নিজেদেরকে তাই না । ভাবছিলে সৈকতে, রেস্তোরায় আমি তোমাদের দেখি নি । তবে একটা জিনিস মানতেই হবে যে অনেক কিছু করার ইচ্ছে আর সাম্রথ্য দুটোই আছে তোমাদের । তবে আর কিছু করার সময় ও সুযোগ কোনটাই তোমরা পাবে না । কারণ এখনই তোমাদের মেরে এই গুহাতে কবর দিয়ে মমি আর সোনাগুলো নিয়ে আমরা চলে যাবো । ”
পাবন বলল,” ঠিক আছে মেরে ফেলতে চাইলে মেরে ফেলতে পারেন । তবে মরার আগে ডেভিড আংকেলের একটা উপকার করতে চাই । পাবন ডেভিডের দিকে তাকিয়ে বলল,” আংকেল,ডিউকের সাথে আপনার কি চুক্তি হয়েছে সেটা আমি জানি । চুক্তিটা ছিল এরকম যে, ব্রুসকে খুজেঁ পেলে আপনি নিবেন মমি আর ডিউক নিবে স্বর্ণ গুলো । কিন্তু ডিউক পরিকল্পনা করেছে যে ও আপনাকে ঠকিয়ে দরকার হলে মেরে মমিটাও হাতিয়ে নিবে ।
ডেভিড ভ্রু কুচঁকে জিজ্ঞাসা করলো,” তুমি এটা কি করে জানলে ?” পাবন একটু হেসে বলল,” বুদ্ধিটা না হয় আমার একটু কম কিন্তু খোঁজখবর নিতে পারি ভালই । আমাকে ডিউককে ২-৩ দিন ফলো করেছিলাম তো খবর টা তখনই জানতে পেরেছিলাম ।”
জয় মনে মনে ভাবলো এই রকম একটা বিপদের সময়ে পাবন এত সাবলীলভাবে মিথ্যা কথাগুলো বলছে কিভাবে ?
পাবনের কথা শুনে ডেভিডের মাথায় যেন রক্ত চড়ে গেলো । ডিউক বলল,” ডেভিড তুই আমাকে বিশ্বাস কর । ওদের কথা শুনিস না । তুই…………
….কথাটা শেষ হওয়ার আগেই ডিউকের বুক এফোড় ওফোড় হয়ে গেলো । রক্তে ভিজে গেল মাটি ।
ডেভিড ওদের দিকে তাকিয়ে বলল,” উপকার করার জন্য তোমাদের ধন্যবাদ । তাই আমি তোমাদের মারবো না । তবে খুশি হওয়ারও কোন কারণ নেই । আমি তোমাদের ছাড়বোও না । এই গুহার মধে্যই হাত পা বেধেঁ রেখে চলে যাবো । ভাগ্য ভালো থাকলে বেচেঁও যেতে পারো ।”
ডেভিড দড়ি নিয়ে ওদের কাছাকাছি আসতেই জয় ওর পেট সোজা ডাইভ দিলো । অ্যাউক বলে মাটিতে পড়ে গেলো ডেভিড । গুলিটাও হাত থেকে পড়ে গেল । পাবন দৌড়ে গিয়ে গুলিটা তুলে নিল । তারপর দুইজনে মিলে ডেভিডকে বেধেঁ ফেললো ।
হন্তদন্ত হয়ে গুহার মধে্য ঢুকলো শুভ,অরকিয়া আর শাকিল সাহেব । তিনটা লাশ আর হাত পা বাধা অবস্থায় ডেভিডের সাথে পাবন আর জয়কে দেখে খুব অবাক হলো ওরা । শুভ বলল,” কিরে এইসব কি করে হলো ।
পাবন বলল,” সব বলবো আগে বল তোরা এখানে কি করে আসলি ?”
শুভ বলল,” তোরা তো আজকে সকালে আমাকে ফোন দিয়েছিলি । কিন্তু নেটওয়ার্কের সমস্যার জন্য কলটা কেটে যায় । ভাবলাম তোরা কোন সমস্যায় পড়লি কিনা । তাই সকাল সকালই শাকিল সাহেব আর অরকিয়াকে নিয়ে পাহাড়তলী চলে আসলাম । এত দুর্গম পাহাড়ী পথ কি করে যে তোদের খুজেঁ পাবো ভাবতেই পারছিলাম না । হঠাৎ পরপর কয়েকটা গুলির শব্দ শুনতে পেলাম । আওয়াজটা অণুসরণ করে এখানে আসতেই দেখি তোরা ।”
শাকিল সাহেব ফোন দিয়ে ফোর্স নিয়ে আসলো । গাড়িতে তুলা হল লাশগুলি । ডেভিডকেও তোলা হলো গাড়িতে ।
তোলার আগে পাবন ডেভিডকে বলল,” সবসময় বন্ধুকে বিশ্বাস করবেন । বন্ধুকে অবিশ্বাস করে অপরিচিত কাউকে বিশ্বাস করলে সুফল নয় কুফলই বয়ে আসে ।” কথাটা শুনে ডেভিড মনে মনে হতাশ হওয়া ছাড়া আর কিছুই করতে পারলো ।
মমি আর সোনাগুলোও গাড়িতে তোলা হল । পাবন আর জয় যেতে যেতে ওদের সবকিছু খুলে বলল । সব শুনে অরকিয়া ভেংচি কেটে জামার হাতাটা গুটিয়ে পেশী দেখিয়ে বলল,” তোদের জায়গায় যদি আমি থাকতাম দেখতি একাই সবগুলোকে মেরে চলে আসতাম ।” শুভ ওর কথা শুনে বলল,” ভাগ্য ভালো এখানে কোন মুরগী নেই তা না হলে ওটাও তোর কথা শুনে হাসতো ।”
শুভর কথা শুনে গাড়ির সবাই একসাথে হেসে উঠলো ।

………………………………………………………সমাপ্ত……………………………………………………….

গল্পের বিষয়:
রহস্য

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত