তিনতলায় কারা থাকে

তিনতলায় কারা থাকে

এয়ারপোর্টে পৌঁছে সবে প্যাসেঞ্জার লাউঞ্জে ব্যাগপত্র নামিয়েছি, সাগরিকাদি থমথমে মুখ করে বললেন, “একটা খারাপ খবর আছে।”
আমরা যাচ্ছি ব্যাঙ্গালোর। ওখানকার একটি বাঙালি পাড়ার দুর্গোৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সাগরিকাদির গ্রুপটা, মানে আমাদের গ্রুপটার প্রোগ্রাম আছে। সাগরিকাদি আমাদের নাচের এই গ্রুপটার হেড। আমি, শেলি আর কাজরি তিনজন মিলে সাগরিকাদির নাম দিয়েছি ‘হেডু’। হেডু যা বলেন তার তীব্রতা সবসময় আসল ঘটনার চেয়ে কম হয়। তাই হেডু যখন খারাপ খবরের কথা বললেন আমরা তখন ধরেই নিয়েছি যে সেটা সামান্য কিছু একটা হবে। পথেঘাটে চলতে গেলে তো সবসময় প্ল্যান অনুযায়ী হয় না। তবে এইবার খারাপ খবরটা বেশ বোরিং ছিল। আমরা কেউ কিছু বলার আগেই হেডু আবার বলে উঠলেন, “ফ্লাইট চার ঘণ্টা লেট।”
“সর্বনাশ! চার ঘণ্টা এখন এখানে বসে থাকতে হবে?” আমিই বললাম।
“কী আর করবি? সব ফ্লাইট লেট চলছে। তাও ভালো মাত্র চার ঘণ্টা। ওদিকে চেন্নাই ফ্লাইট তো সাড়ে ছ’ঘণ্টা লেট।”
ফ্লাইট লেট ব্যাপারটা আমাকে একটু ভাবিয়ে তুলল। আসলে আমার যেকোনও কাজ শুরুটা গড়বড় হলে শেষ হতে হতে গড়বড়ের লিস্ট লম্বা হয়ে যায়। তাই ভাবতে লাগলাম, এরপর কী হয়।

শেষমেশ যখন ব্যাঙ্গালোর পৌঁছালাম তখন রাত দশটা প্রায়। এখানে আমাদের গ্রুপটাকে রিসিভ করেছেন মিস্টার অমলেশ দত্ত, এখানকার দুর্গোৎসব কমিটির ম্যানেজার। ওঁর গাড়ির পেছন পেছন আমাদের চারটে গাড়ি চলেছে। হেডুকে মিলিয়ে সবসুদ্ধ আমরা ষোলোজন আছি গ্রুপে।
একটা গাছপালার ছায়াঘেরা হোটেলের সামনে এসে আমাদের গাড়ি থামল। এয়ারপোর্ট থেকে আমাদের এখানে আসতে আরও ঘণ্টা খানেক লাগল। হেডু আমাদের গাড়িতেই ছিলেন। মিস্টার দত্ত এসে ডাকলেন, “ম্যাডাম, একবার আসবেন?”
আমরাও হেডুর পেছন পেছন গাড়ি থেকে নামতে গেলাম। মিস্টার দত্ত হাত তুলে আমাদের ইশারা করে বললেন, “আপনারা বসুন। একটু পরে নামবেন।”
দত্তবাবুর সাথে কথা বলে হেডু গাড়ির জানালার কাছে এসে বললেন, “আরও একটা ব্যাড নিউজ আছে। আমাদের জন্যে মিস্টার দত্ত যে হোটেলটা বুকিং করেছিলেন সেই হোটেলে একটা মার্ডার হয়েছে। তাই আপাতত হোটেলে নতুন কোনও বোর্ডারের এন্ট্রি নেই। আমাদের জন্যে এখানে এই হোটেলটায় ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমি দত্তবাবুর সাথে যাচ্ছি ম্যানেজারের সাথে কথা বলতে, তোরা ততক্ষণ গাড়িতেই বস।”
আমি জানতাম কিছু একটা হবে। কারণ, আমার কোনও কাজের শুরু খারাপ হলে পুরোটাই কেঁচিয়ে যায়। হেডু চলে যাওয়ার পর বললাম, “ধুস! পুরো ট্রিপটাই গড়বড় হবে দেখবি।”
আমার কথা শুনে শেলি বলল, “উফ্‌, তোর যতসব সুপারস্টিশনস। বাইরে বেরোলে একটু আধটু এরকম হয়।”
এদিকে এখন অক্টোবর মাসের প্রায় মাঝামাঝি। বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণাবর্তের জেরে সাইক্লোন আছড়ে পড়েছে। তার জেরেই ফ্লাইট লেট ছিল।
প্রায় আধঘণ্টা পর হেডু ফিরে এসে বললেন, “ব্যবস্থা হয়ে গেছে, তবে মাত্র চারটে রুম ম্যানেজ করা গেছে।”
মনে মনে হিসেব কষলাম, চারটে রুম মানে একেকটা রুমে চারজন। আমার ভাবনা শেষ হতে না হতেই কাজরি বলে উঠল, “আমরা চারজন কিন্তু তোমার রুমে তাহলে।”
আমি ভাবলাম, হেডু নিশ্চয়ই মানা করবে না। আসলে আমরা চারজনই হেডুর গ্রুপে একটু পুরনো। বাকিরা একেবারে আনকোরা। তাই আমাদের দাদাগিরি তো থাকবেই। হক তো বনতা হ্যায়।

বাড়ি থেকে বেরোনোর পর প্রায় আট-ন’ঘণ্টা হয়ে গেছে। খুব ক্লান্ত ছিলাম সকলেই। তাই রাতের খাওয়াদাওয়া সেরেই যে যার মতো বিছানায় বডি ফেলে দিলাম। খাওয়া বলতে প্যাচপ্যাচে ভাত আর চিকেন। খিদের মুখে সেটাই অমৃত। আমরা চারজন যে ঘরটায় আছি সেটা ডবল বেডরুম হলেও খাটের সাইজ বেশ বড়ো। তিনজনে আরামসে শোয়া যায়। ম্যানেজারকে বলে আর একটা সিঙ্গেল বেড আনিয়ে হেডুও ঘুমাচ্ছে। ঘুমানোর আগে ব্রিফিং দিয়ে দিয়েছে আগামীকালের পরিকল্পনা। সকালে উঠে ব্রেকফাস্ট সেরেই আমরা বেরিয়ে পড়ব। তারপর সারাদিন ওখানেই প্র্যাকটিস। ষষ্টির সন্ধেবেলায় উদ্বোধনী প্রোগ্রামের পর ডিনার সেরে একেবারে রাতে হোটেলে ফিরব। তারপরের দিন সকালের রিটার্ন ফ্লাইট।
নতুন জায়গা, নতুন বিছানায় ঘুম আসতে দেরি হয় আমার। তার উপরে আমার আবার একা শোয়া অভ্যাস। পাশে শেলি আর কাজরি ভোঁসভোঁস করে নাক ডাকছে। রুমের লাইট অফ হওয়ার পর চোখটা একটু অন্ধকার সয়ে এসেছিল। চারপাশে দেখলাম ঘরটা বেশ পুরনো ধাঁচে তৈরি। বিছানার চাদর আর ভারী ভারী পর্দাগুলো বেশ সাবেকি আমলের মনে হল। ঘরের দেওয়াল বেশ উঁচু, জানালা-দরজাও সাধারণের তুলনায় বেশ উঁচু। হয়তো পুরনো আমলের বাড়ি ছিল, এখন হোটেল বানানো হয়েছে। গাড়িতে আসার সময়েও দেখলাম, চারপাশটা বড়ো বড়ো গাছপালা। হোটেলটার নাম দেখেছিলাম ‘ব্লু ঈগল’। বাইরের লনে একটা নীল রঙের ঈগলের মূর্তিও বসানো আছে।
কিছুক্ষণ পরেই তন্দ্রামতো লেগেছিল। একটা সমবেত চিৎকারে তন্দ্রা কেটে গেল। ধড়মড় করে উঠে বসলাম বিছানায়। কারা যেন বলছে, “চিয়ার্স!”
“বাবা! এই হোটেলে আবার লেট নাইট পার্টিও হয়!” ওপাশে তাকিয়ে দেখি হেডুও জেগে বসেছে।
“হ্যাঁ, পার্টির হল্লাই তো। কিন্তু আসার সময় তো কিছু বুঝলাম না।”
“কী জানি।” হেডু আবার চাদরটা মাথা অবধি টেনে শুয়ে পড়ল।
আমি বিছানা থেকে নেমে একবার টয়লেট থেকে ঘুরে এলাম। এসে দেখি জানালার পর্দাটা সরানো। দূরে বাইরের লনের জমি খানিকটা দেখা যায়। এতক্ষণ তো পর্দা সরানো ছিল না। কে সরাল? নিশ্চয়ই হেডু। আমি জানালার কাছে গিয়ে বাইরেটা দেখলাম। আমাদের উপরতলার রুমের জানালা থেকে আলো এসে পড়েছে বাগানে। এই সময় একটা ঘড়ঘড় শব্দে চমকে উঠলাম। শব্দটা আসছিল উপরতলা থেকে। আমাদের রুমটা দোতলায়। তার মানে তিনতলায় শব্দ হচ্ছে। এত রাতে কেই বা জেগে আছে?
“এত রাতে কে ঘরের আসবাবপত্র সরাচ্ছে?” এবার শেলি বলে উঠল।
আমি বললাম, “তিনতলায় মনে হয়। আলো জ্বলছে ওপরের রুমে।” বলেই জানালা দিয়ে বাইরের লনে আলোর চতুর্ভুজটা দেখালাম।
শেলি বলল, “যাক গে! তুই জেগে কেন? শুয়ে পড়। কাল তো সারাদিন রেস্ট নেওয়ার সময় নেই।”
শেলির কথাটা ঠিক। কাল সারাদিন ধকল যাবে। অগত্যা নিজের বিছানায় ফিরে এলাম।

পরেরদিন সকালে ঘুম ভাঙল হেডুর মোবাইলের কর্কশ রিংটোনের শব্দে। মিস্টার দত্ত ফোন করেছেন। বললেন, গাড়ি পাঠিয়ে দেবেন। আমরা যেন ঘণ্টা খানেকের মধ্যে তৈরি হয়ে নিই।
ব্রেকফাস্টের টেবিলে গিয়ে মুডটা যথারীতি খারাপ হয়ে গেল। এ কী খাবারের ছিরি! কাল অনেক রাত হয়ে গেছিল বলে কিছু বলিনি। আজকের ব্রেকফাস্টটাও তা বলে এরকম? যাই অর্ডার দিচ্ছি তাতেই বলছে, হবে না ম্যাডাম। শেষ অবধি শুকনো পাউরুটি, ডিমসেদ্ধ আর কলা। সাথে এককাপ চা, তাও কেমন বিচ্ছিরি খেতে। হেডু দেখলাম ম্যানেজারকে ডেকে ভাঙা ভাঙা হিন্দিতে বললেন, “খাবারের এই ছিরি আপনাদের? অথচ রাতভর তিনতলায় পার্টি চলে। ফুর্তি, নাচগান, হল্লা সব ব্যবস্থা আছে। শুধু খাবারের ব্যাপারেই কোনও ব্যবস্থা নেই?”
ম্যানেজার আর ওয়েটার দেখলাম চোখ চাওয়াচাওয়ি করল, কিন্তু কিছু বলল না। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। আমাদের জন্যে গাড়ি চলে এসেছিল। তাই আর বাক্যব্যয় না করে আমরা অনুষ্ঠানের জন্যে রওনা দিলাম।

সারাদিন নির্বিঘ্নেই কাটল। দুপুরের লাঞ্চের বেশ ভালো আয়োজন দেখে কাজরি বলল, “সকালে জলখাবারটা এখানে এসে করলেই হত রে।”
আমি চিকেন পকোড়া চিবোতে চিবোতে বললাম, “হ্যাঁ রে, জানা ছিল না তো। কী আর করা যাবে! কাল আর রিস্ক নেব না। একটু আগে বেরিয়ে বাইরে কোথাও খাওয়া যাবে।”
এদিকে দুর্গোৎসবে আসা বাঙালিদের মধ্যে যাদের সাথেই পরিচয় হল তারা সবাই আমাদের হোটেলের নাম ‘ব্লু ঈগল’ শুনে বলতে লাগল, “আর জায়গা পেলেন না? মিস্টার দত্ত শেষ অবধি আপনাদের ওই হোটেলে ওঠালেন?”
কী জানি বাবা, লোকে এরকম কেন বলছে! কেউ ঝেড়ে কাশছে না। কিন্তু শুরু থেকে যেসব গড়বড় হচ্ছিল তার জন্যে আমাদের অনুষ্ঠানের কোনও ক্ষতি হয়নি। অনুষ্ঠান ভালো হয়েছে, লোকজন আমাদের পারফরম্যান্সে সন্তুষ্ট।

ডিনার করে হোটেলে ফিরতে ফিরতে বেশ রাত হল। ভালোয় ভালোয় আজকের রাতটা কাটলেই কাল সন্ধে থেকে পাড়ার পুজো প্যান্ডেলে।
আজ রাতে আর আমার ঘুম আসতে দেরি হল না। ব্যাগপত্তর সব গোছানোই ছিল। টুকটাক কয়েকটা জিনিস বাইরে আছে, সেসব সকালে হ্যান্ডব্যাগে ভরে নেব। একটু চোখ লেগেছে সবে, আবার কালকের মতো সেই ‘চিয়ার্স’ বলে চেঁচিয়ে উঠল কারা। আমার চোখ চলে গেছে জানালার দিকে। আজকে শুধু আমি একা নই, হেডু আর কাজরি তো উঠেইছে, সাথে শেলিও। কাজরি বলল, “এরা কি রোজ পার্টি করে নাকি, অ্যাঁ?”
কাজরির কথা শেষ হল না। এবার খুব জোর পিয়ানো বাজানোর শব্দ এল। হেডু চাদর সরিয়ে বিছানা থেকে নেমে চটি পরে ইন্টারকমের দিকে যেতে যেতে বললেন, “কমপ্লেন না করলে হবে না দেখছি।”
তারপর ইন্টারকমের রিসিভার তুলে খুট খুট করে নাম্বার টিপে বললেন, “ধুর! কোনও সার্ভিসই ঠিক নেই এদের।”
এমন সময় আমাদের রুমের দরজায় টোকা পড়ল – টকটক। হেডু গম্ভীর গলায় বললেন, “কে?”
বাইরে থেকে আওয়াজ এল, “ম্যাডাম, আমি বৈশালী। একটু বাইরে আসুন।”
আমাদের গ্রুপের নাচের মেয়ে বৈশালী। পাশের ঘরেই আছে। এত রাতে কী জন্যে ডাকছে? ওর গলা শুনে মনে হচ্ছে জরুরি দরকার। হেডু গিয়ে দরজা খুলে বলল, “কী হল? এত রাতে ডাকছ কেন?”
বৈশালী বলল, “ম্যাডাম, আমাদের রুমে আমরা কেউ ঘুমাতে পারছি না। ওপরতলার লোকজন এত হল্লা করছে, কিছুতেই ঘুম আসছে না। একটু রিসেপশনে বলবেন, প্লীজ?”
ঠিক তখনই আমরা দেখলাম করিডোরে আলো জ্বলে উঠল। একজন ইউনিফর্ম পরা ওয়েটার হাতে খাবারের সুসজ্জিত থালা নিয়ে লিফটের দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল। খাবারের সুগন্ধেই বোঝা যাচ্ছিল চিকেনের কোনও প্রিপারেশন নিয়ে যাচ্ছে সে। হেডু বলল, “এত রাতে খাবারের আয়োজন! আমাদের বেলায় তো খালি কাঁদুনি গাইছিল। এদিকে এদের রোজ রোজ হল্লাতে আমরা ঘুমাতে পারছি না।”
আমরা ঘর থেকে তিনজন করিডোরে এসে সত্যি খাবারের সুগন্ধ পেলাম। শেলি বলল, “ওরা লিফট ব্যবহার করছে। এদিকে আমাদের বলল, লিফট নেই সিঁড়ি দিয়েই উঠতে হবে।”
হেডু বৈশালীর দিকে ঘুরে বলল, “তুই রুমে যা, আমি দেখছি।” তারপর আমাকে বলল, “পম্পা, তুই চল আমার সাথে। দেখি তিনতলায় কী চলছে।”
হেডুর কথামতো আমি আর হেডু লিফটে করে তিনতলায় উঠে দেখি এক এলাহি আয়োজন। চারদিকে লোকজন গিজগিজ করছে, সাজানো গোছানো হল, সুন্দর আলোর ব্যাবস্থা। ওয়েটাররা খাবার সার্ভ করছে টেবিলে টেবিলে, একজন খুব সুন্দর একটা সুর করে পিয়ানো বাজাচ্ছে। এসব দেখে আমাদের মেজাজ সপ্তমে। হেডু বলল, “এসবের মানে কী? চল তো, রিসেপশনে গিয়ে বলি।”
আমরা পেছন ফিরে লিফটে উঠতে যাব, দেখি ভেতর থেকে একজন চিৎকার করে উঠলেন, “আগ! আগ লগি হ্যায়।”
আমরা সেদিকে তাকিয়ে দেখি হলের এক কোনায় বিশাল আগুন লেগেছে। লোকজন ছোটাছুটি করছে। যে লোকটা পিয়ানো বাজাচ্ছিল সে পিয়ানোটাকে দু’হাতে জোর দিয়ে ধাক্কা দিয়ে একপাশে সরিয়ে দিচ্ছে যাতে সকলে বাইরে বেরিয়ে যেতে পারে। দলে দলে লোক ছুটে সিঁড়ির দিকে যেতে লাগল। আমরা লিফটে চড়ে একতলার রিসেপশনে চেয়ারে ঢুলে পড়া লোকটাকে ধাক্কা দিয়ে ডাকলাম। বললাম, “তিনতলায় আগুন লেগেছে। প্লীজ ফায়ার ব্রিগেডে খবরটা দিন।”
লোকটা আমাদের কথা শুনে এমন অবাক ভঙ্গিতে তাকালো যেন ওর কাঁচা ঘুম ভাঙিয়ে আমরা বিশাল অপরাধ করে ফেলেছি। হেডু আবার বললেন, “কী হল, উঠুন!”
লোকটা এবার বলল, “রুমে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ুন। কিছু হয়নি।”
আমরা লোকটাকে একরকম কলার ধরে টেনে বের করলাম টেবিলের পেছন থেকে। বললাম, “ইয়ার্কি হচ্ছে?”
লোকটা কলার ছাড়িয়ে নিয়ে বললেন, “আমি জানি কী দেখেছেন আপনারা তিনতলায়। অনেক লোক পার্টি করছে, পিয়ানো বাজছে, এমনকি একজন ওয়েটার লিফটে করে খাবার নিয়ে যাচ্ছে। তারপর আগুন লেগে গেল, লোকজন ছুটে বেরিয়ে এল, তাই তো?”
“সব যখন জানেন তাহলে বসে আছেন কেন?” হেডু বেশ রেগে গেছে।
“ম্যাডাম, লোকজন ছুটে নেমে এসেছিল তো, কই তারা? এসব আমি আগেও দেখেছি।”
আমি আর হেডু এবার সত্যি সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম কেউ নেই। এমনকি লিফটের দরজা ছিল যেখানে সেখানেও নিরেট দেওয়াল। এবার সত্যি ভয় পেয়েছি আমরা দু’জনেই। কিন্তু এতটা ভুল দেখলাম দু’জনেই? কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছিল না। হেডু এবার বেশ অবাক হয়ে বলল, “কিন্তু আমরা তিনতলায় স্পষ্ট দেখলাম আগুন লেগেছে!”
এবার লোকটা চেয়ারে নিজের জায়গায় ফিরে গিয়ে বলল, “বিশ্বাস না হয় তো বাইরে থেকে একবার দেখে আসুন না তিনতলাটা। আমাদের হোটেলে মাত্র দুটো ফ্লোর, গ্রাউণ্ড ফ্লোর আর ফার্স্ট ফ্লোর। সেকেন্ড ফ্লোর নেই।”
আমরা দু’জনেই ছুটলাম বাইরে। হোটেলের লনে এসে উপরের দিকে তাকিয়ে দেখি সত্যি দুটোমাত্র ফ্লোর। তিনতলা বলে কিছু নেই। দু’বার বাইরে থেকে হোটেলে ঢুকেছি বেরিয়েছি, তাড়াহুড়োতে একবারও খেয়াল করিনি। ভয়ে আমাদের হাত পা হিম হয়ে গেছে।
রিসেপশনের লোকটা বেরিয়ে এসে আমাদের উদ্দেশ করে বলল, “আমাদের এই হোটেল পঞ্চাশ বছরের পুরনো। আগে এটা তিনতলা হোটেল ছিল, লিফটের ব্যবস্থা ছিল। আজ থেকে ষোল বছর আগে একদিন রাতের ঘটনা। তিনতলায় একটা বিয়ের রিসেপশন পার্টি চলছিল, সেইসময় আগুন লাগে। হোটেলে সব সুব্যবস্থাই ছিল তখন, কিন্তু অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা ছিল না। প্রচুর লোক তিনতলায় আর লিফটের ভেতরে অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যায়। তারপর তিনতলাটা ডিমলিশ করে দেওয়া হয়। দুটোমাত্র ফ্লোর বলে নতুন করে আর লিফটের ব্যবস্থা করা হয়নি। কিন্তু ঐ ঘটনার পর থেকেই হোটেলে রোজ রাতে এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে লাগল। আমাদের প্রচুর বোর্ডার এই নিয়ে কমপ্লেন করতে লাগলেন। কয়েকমাসের মধ্যে হোটেলের ভূতুড়ে বদনাম হয়ে গেল। এখনও পর্যন্ত কারও ক্ষতি হয়নি, কিন্তু কেই বা রাতে এই ভূতুড়ে হোটেলে থাকতে চায় বলুন। কোনওরকম চলছে হোটেল। আমাদের মতো পুরনো কর্মচারীর কথা ভেবে মালিক ভর্তুকি দিয়েও হোটেল চালু রেখেছেন। একেবারে যে কেউ আসে না তা নয়। এই আপনাদের মতো যা জেনে লোকজন আসেন মাঝে মাঝে। বছরের এই সময়টায় শহরের হোটেলগুলোতে রুম খালি না পেয়ে কেউ কেউ আসেন থাকতে।”
রিসেপশনে আমি আর হেডু যা শুনলাম তারপর আর সারারাত আমাদের ঘুম এল না। রুমে ফিরে গিয়ে কাউকে এখন কিছু বলতে বারণ করে দিয়েছিল হেডু। পরের দিন সকালে এয়ারপোর্টে পৌঁছে আমি আমাদের গ্রুপের বাকিদের ঘটনাটা বললাম। এরকম একটা ভূতুড়ে হোটেলে দু-দুটো রাত কাটানোর অভিজ্ঞতা আমরা কেউ কোনওদিনও ভুলব না। তবে সব জেনেশুনে আমাদের ঐ হোটেলেই কেন থাকার ব্যবস্থা করলেন মিস্টার দত্ত, সে ব্যাপারে হেডু দত্তবাবুর নামে ওই বাঙালি পাড়ার দুর্গোৎসব কমিটির কাছে একটা জোরদার লিখিত কমপ্লেন ঠুকেছিল।

………………………………………………..(সমাপ্ত)……………………………………………..

গল্পের বিষয়:
রহস্য

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত