ব্ল্যাক ভ্যাম্পায়ার

ব্ল্যাক ভ্যাম্পায়ার

এক.

গাড়ি থেকে নেমেই তাড়াহুড়ো করতে লাগলো শুভ ।  “আরে, তাড়াতাড়ি কর । দেরি হলে টিকেট পাবো না ।”
অরকিয়া ওর কথা শুনে বলল,”তোর সবকিছুতেই লাফালাফি । এখনও নীরা আসে নি । আর টিকেট তো আগেই কেটে রেখেছে পাবন ।”
সানগ্লাসটা চোখ থেকে খুলে জয় বলল,”কিন্তু পাবন কই ?”
“ও অন্য একটা কাজে গেছে । একটু পরেই আসবে”, অরকিয়া বলল । কিছুক্ষণপর বাইকে করে পাবন আসলো ।
ওকে দেখে ভেংচি কাটলো সেতু,”ঐ যে এসেছেন আমাদের হিরো ।”
পাবন শার্টের কলার ঠিক করতে করতে বলল,”কিরে সেতু ? মনে হয় রাগ করে আছিস ?”
“করবোই তো কতক্ষণ তোর জন্য অপেক্ষা করতেছি এই রোদের মধ্যে”,কপালের ঘাম মুছলো সেতু ।
“আসলে একটা কাজে আটকে গিয়েছিলাম তাই একটু দেরি হয়ে গেল”, ফিকে হাসি দিল পাবন,”কিন্তু এখনও নীরা আসতেছে না কেন ?”
” এই যে এসে পড়েছি পাবন ভাইয়া”,গাড়ি থেকে নামলো নীরা আর একটা মেয়ে । “এত দেরি করলি কেন ?” শুভ বলল ।
“আসলে আম্মুকে রান্নার কাজে সাহায্য করতে গিয়ে একটু দেরি হয়ে গেছে”, কানে ধরলো নীরা ।
“কিরে নীরা তোর সাথে ও কে ?” জয় জিজ্ঞাসা করলো ।
“ও আমার কাজিন মুশতারী । আমাদের বাড়িতে বেড়াতে এসেছে । তাই সাথে করে নিয়ে আসলাম”, নীরা হেসে বলল ।

একে একে সবাই পরিচিত হল মুশতারীর সাথে ।
শুভ টিপ্পনী কেটে বলল,”মুশতারী অর্থ তো এলিয়েন । তুমি কি এলিয়েন ?” মুশতারী কিছু বলতে যাবে তখনই অরকিয়া চেচিঁয়ে বলল,”তোর কি মানুষকে খোঁচা দিয়ে কথা বলার অভ্যাস যাবে না ।”
শুভ বলল – জ্বী না । সেটা আপনার অভ্যাস ।
– আমার অভ্যাস মানে ? কাকে খোঁচা দিয়েছি হুম ? রেগে গেল অরকিয়া ।
– কাকে আবার আমাকে । এই তো সেদিন তুই আমাকে খোঁচা দিয়ে শরীরে আচঁড় কেটে দিয়েছিলি ।
– আমি কি সেই খোঁচার কথা বলেছি নাকি ? আরও রেগে অরকিয়া ।
– তাহলে কি বলেছিস ?
– তোর মাথা বলেই রেগে হন হন করে হেটেঁ সামনের দিকে চলে গেল অরকিয়া ।

পাবন হেসে বলল,”মুশতারী, তুমি কিছু মনে করো না ওরা এমনি । তবে সবাই খুব ভালো ।”

তারপর জয়ের তাগাদায় ওরা সবাই সামনের দিকে হাটঁতে লাগলো ।

আজ ছুটির দিন ।

ওরা সবাই ড্রীম হিলস এ ঘুরতে এসেছে । এটা একটা পাহাড় । ভিতরে খুব সুন্দর সুরঙ্গ পথ আছে । আর কয়েকটা গুহাও আছে । আর কৃত্রিমভাবে গুহার ভিতর তৈরী করা হয়েছে সুইমিংপুল ।
আজই উদ্বোধন করা হল ড্রীম হিলস ।

“পরিত্যক্ত একটা পাহাড়কে পর্যটন স্পট বানিয়ে ভালো কাজ করেছে কর্তৃপক্ষ”, পাবন বলল ।
“ঐ যে রবার্ট ব্রুন । উনিই মালিক এই ড্রীম হিলসের”, স্যুট পড়া এক ভদ্রলোকের দিকে ইশারা করলো জয় ।
উনার সাথে গিয়ে পরিচিত হল ওরা সবাই । হাসিমুখেই ওদের সাথে কথা বললেন ব্রুন । তবে উনার মুখে কেমন যেন একটা অস্বস্তি ভাব দেখলো পাবন ।

পরিচয় পর্ব শেষ করে ওরা সুরঙ্গ মুখ দিয়ে ড্রীম হিলসে প্রবেশ করলো ।

সম্পূর্ণ সুরঙ্গ পথ আলোক সজ্জিত । দেওয়ালে খোদাই করে আঁকা বিভিন্ন হিংস্র পশুর ছবি । সৈন্যদের তলোয়ার নিয়ে যুদ্ধ করার ছবি । সুরঙ্গ পথ শেষ হওয়ার পরই পাঁচটা রাস্তা একসাথে । প্রতিটা রাস্তাই এক একটা গুহার সাথে সংযুক্ত । আরও অনেক দর্শনার্থী এসেছে ।ছুটির দিন বলে ভিড়টা একটু বেশিই ।
পাবন বলল,” যার যে পথে খুশি ঘুরে আয় । একসাথে যাওয়া যাবে না । অনেক ভিড় ।”

পাবনের কথামত এক এক জন এক এক পথে চলে গেল । নীরা আর মুশতারী একসাথে গেল । ওরা যে পথে গেল সে পথটা অন্য পথের তুলনায় কিছুটা অন্ধকার আর মানুষজনও কম । পাবন একাই হাটঁছে অন্য পথে । সবাই জানে ও একা হাটঁতে পছন্দ করে তাই ওকে একাই ছেড়ে দিয়েছে বাকিরা । হাটঁতে হাটঁতে পাবন খেয়াল করলো রবার্ট ব্রুন অস্থিরভাবে ভিড়ের মাঝে পায়চারি করছেন । একটু অবাক হল পাবন । ব্রুনের সাথে কথা বলার জন্য ও ব্রুনের উদ্দেশ্যে হাটঁতে লাগলো ।

হঠাৎ বেশ কিছু লোকের চিৎকার চেচাঁমিচি শুনা গেল । সবাই দৌড়ে সেদিকে যেতে লাগলো । পাবনও দৌড়ে গেল । দৌড়ে আসলো জয়, শুভ, অরকিয়া আর সেতুও ।

যে পথে নীরা আর মুশতারী এসেছিলো সেই পথ থেকেই চিৎকার ভেসে আসছে । সবাই ঐ পথে প্রবেশ করতে না করতেই হঠাৎই থেমে গেল চিৎকার চেচাঁমিচি ।

মুহূর্তের মধ্যেই উধাও হয়ে গেল ঐ পথে থাকা সকল দর্শনার্থী ; সাথে নীরা ও মুশতারী ।

খালি গুহাপথটার দিকে অবাক বিস্ময়ে তাকিঁয়ে রইলো সবাই ।

দুই.

বিস্ময়ের ঘোর কেটে যেতেই আতঙ্ক বিরাজ করতে লাগলো দর্শনার্থীদের মনে । হুড়মুড়িয়ে ড্রীম হিলস থেকে বের হতে লাগলো । সবাই বের হয়ে গেলে গুহামুখের সামনে দাড়িঁয়ে রইলো পাবন, জয়, শুভ, অরকিয়া আর সেতু । ওরা গুহার মধ্যে প্রবেশ করলো । চারদিকে পাথুরে দেওয়াল ছাড়া আর কিছু নেই । কোন রহস্যজনক কিছু ওদের চোখে পড়লো না ।
পাবন বলল,”এখানে মনে হয় না কোন ক্লু খুঁজে পাবো । এখনই ব্রুন সাহেবের সাথে দেখা করা দরকার ।”

আশেপাশে তাকিঁয়ে ওরা দেখলো সম্পূর্ণ ড্রীম হিলস ফাঁকা ।
“রবার্ট ব্রুনও ভিড়ের মধ্য দিয়ে চম্পট দিয়েছেন মনে হয়”,শুভ বলল ।
পাবন বলল,”এখনই আমাদের ব্রুনের বাড়িতে যেতে হবে।”

ড্রীম হিলস থেকে বেরিয়ে আসলো ওরা ।
যাদের আত্মীয় স্বজনরা ড্রীম হিলসে হারিয়ে গেছেন তারা ড্রীম হিলসের সামনে জড়ো হয়ে দাড়িঁয়ে আছে । কেউ কেউ কান্না করছে ।
ওরা সেখান থেকে বের হয়ে সোজা মেইন রোডে চলে আসলো ।

ড্রীম হিলস থেকে বেশি দূরে নয় ব্রুনের বাড়ি । তাই পায়ে হেটেঁই ওরা রওয়ানা দিল । সুন্দর কারুকার্য করা দু’তলা একটা বাড়ির গেইটের সামনে গিয়ে থামলো ওরা । গেইটে নক করলো জয় । গেইট খুললো মাঝবয়সী একজন লোক । মনে হয় কেয়ারটেকার হবে ।
“কাকে চাও ? ওদের দিকে তাকিঁয়ে বলল লোকটা ।
“আমরা রবার্ট ব্রুনের সাথে দেখা করতে এসেছি । উনার সাথে আমাদের জরুরী কথা আছে”, উত্তরে পাবন বলল ।
“ওহ্ , ঠিক আছে । ভিতরে আসো । উনি বাসাতেই আছেন ।

ওরা ভিতরে ঢুকে দেখলো রবার্ট ব্রুন অস্থিরভাবে পায়াচারি করছেন । ওদেরকে দেখে কিছুটা অবাক হলেন তিনি ।
তবে দ্রুত সামলে নিয়ে বললেন,”কি ব্যাপার তোমরা ?”
পাবন বলল,”আমরা আসলে ড্রীম হিলসের বিষয়ে কিছু জানতে চাই ।”

চোখ বড় বড় হয়ে গেল ব্রুনের ।
রাগী কন্ঠে বলল,”আমি এখন ব্যস্ত । তোমরা পরে এসো ।”

পাবন একটু হেসে বলল,”কিছুক্ষণপরই তো আপনার বাসায় পুলিশ আসবে । ড্রীম হিলস থেকে গায়েব হয়ে যাওয়া লোকগুলোর আত্মীয় স্বজন আসবে । জেরা করবে আপনাকে । যুতসই জবাব দিতে না পারলে আপনাকে জেলখানায় যেতে হবে এবং ফাঁসিও হতে পারে আপনার”, অসহায় ভঙ্গিতে পাবনের দিকে তাকালো ব্রুন,” তবে আমার কেন যেন মনে হচ্ছে মানুষগুলো উধাও হওয়ার কারণটা আপনি জানেন । কিন্তু সেই কারণটা খুব জটিল যেখানে আপনার কিছুই করার নেই । আপনি অপরাধী নন”. পাবন বলল ।
“তুমি কি করে জানলে ? ব্রুন জিজ্ঞাসা করলো ।
“আপনি অপরাধী হলে ঠিক পালিয়ে যেতেন । বাড়িতে আসতেন না । তাই অনুমান করলাম আরকি”,পাবন পাল্টা জবাব দিল,”যদি সেরকম কিছু হয়ে থাকে তাহলে আমাদেরকে বলতে পারেন । আমরা আপনাকে সাহায্য করবো । আমাদেরকে আপনার শুভাকাঙ্খী ভাবতে পারেন ।”

এবার কন্ঠ নরম করে ব্রুন বলল,”তোমার অনুমানটাই ঠিক । অনেক কষ্ঠ করে, অনেক টাকা খরচ করে আমি এই ড্রীম হিলস বানিয়েছি । যখন ড্রীম হিলসের কাজ অর্ধেক শেষ হয়েছিলো তখন একদিন হঠাৎ করেই দুইজন শ্রমিক ঐ গুহা থেকে হারিয়ে যায় । অনেক খুঁজেও শ্রমিকগুলোকে পেলাম না । সেদিন বাড়িতে এসে শোয়ার ঘরে গিয়ে দেখি আমার বিছানার উপর একটা রূপার গোল পাত পড়ে আছে । আর তাতে একটা নকশা আঁকা আর লিখা “B.V.” । আমি সেটাকে পাত্তা দিলাম না তেমন । ঘরের এক কোণে ছুড়ে ফেলে দিলাম । কিছুদিনপর আরও পাচঁজন শ্রমিক ঐ গুহাপথেই হারিয়ে যায় । আমি সেদিনও আমার শোবার ঘরে গিয়ে আগেরটার মতই আরেকটা রূপার পাত পাই । তখন আগের পাতটা ঘরের কোণা থেকে খুঁজে বের করলাম । মিলিয়ে দেখলাম একদমই এক । কিন্তু তখন নিজের ড্রীম হিলসের কথা ভেবে এই ৭ জন শ্রমিকের হারিয়ের যাওয়ার ঘটনাটা ধামাচাপা দিয়ে রাখি । সেদিনের ঐ স্বার্থপরতার জন্যই আজ এতগুলো মানুষের ক্ষতি হল ।

পাবন একটু রহস্যময় কন্ঠে জিজ্ঞাসা করলো,”আপনি আজও কি ঐ একই ধরনের পাত শোবার ঘরে পেয়েছেন?”
ব্রুন মাথা নাড়িয়ে পকেট থেকে একটা রূপার পাত বের করে পাবনের হাতে দিল ।

পাবন রূপার পাতটা হাতে নিয়ে দেখলো তাতে বড় ইংরেজী অক্ষরে B.V. লেখা আর অদ্ভুত এক নকশা আঁকা ।

তিন.

ওরা একটা রূপার একটা পাত নিয়ে ব্রুনের বাড়ি থেকে চলে আসলো ।
যাওয়ার পথে পাবন ইন্সপেক্টর শাকিল সাহেবের সাথে দেখা করলো । ইতিমধ্যেই হারিয়ে যাওয়া লোকজনদের আত্মীয় স্বজনরা থানায় রবার্ট ব্রাউনের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে এসেছে । পাবন ইন্সপেক্টরকে অনুরোধ করলো ব্রুন সাহেবকে গ্রেফতার না করার জন্য তবে তাকে পুলিশের নজরদারিতে রাখার আবেদন করলো এবং ওরা যে এই বিষয়টা নিয়ে তদন্ত করবে সেটাও জানালো । শাকিল সাহেব ওদের অনুরোধ রাখার আশ্বাস দিলেন । আর ওদের সাথে সাথে পুলিশি তদন্ত চলবে বলেও জানালেন ।
শাকিল সাহেবের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে আসলো ওরা ।

বিকাল ঘনিয়ে এসেছে ।

পাবন, জয়,শুভ, অরকিয়া,সেতু পাজয়ে বসে আছে ।
সবার-ই মন খারাপ । পাবনের চোখও ঝাপসা হয়ে আসছে । নীরা আর মুশতারীর জন্য । আচমকা ওদের এভাবে হারিয়ে যাওয়াটা মেনে নিতে পারছে না ওরা ।

পাবন রূপার পাতটা পকেট থেকে বের করলো ।
সেতু সেটার দিকে তাকিঁয়ে বলল,”কেন যেন মনে হচ্ছে এই নকশাটা কোথায়ও দেখেছি । কিন্তু ঠিক মনে পড়ছে না ।”

চার জোড়া চোখ ঘুরে গেল সেতুর দিকে ।
“একটু মনে কর । মনে করার চেষ্টা কর সেতুকে তাগাদা দিল পাবন ।
একটু ভেবে সেতু বলল,”এখন মনে পড়ছে । আমাদের শহর থেকে একটু দূরে একটা ছোট পরিত্যক্ত গ্রাম আছে । আগে কিছু মানুষ থাকতো সেখানে তবে এখন গ্রামটা সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত । সেখানে একটা পুরানো বাড়ি আছে । সেই বাড়িতে দেখেছিলাম এমন একটা নকশা ।”
“চল এখনই সেই গ্রামে যাবো”,পাবন বলল ।

সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়লো ওরা ।

সন্ধ্যা হয়ে গেছে ।
অন্ধকার নেমে গেছে চারদিকে ।

পুরানো বাড়ির গেইটের সামনে এসে সাইকেলগুলো থামলো । গেইটের বাইরে সাইকেল গুলো রেখে ওরা গেইটের ভিতর ঢুকলো । অনেক পুরানো হয়ে গেছে বাড়িটা । চুন, সুড়কি খসে পড়ছে বাড়ির দেওয়াল থেকে । দরজার উপরের আঁকা ওদের কাঙ্খিত সেই নকশাটা ।
“এটা কার বাড়ি ? প্রশ্ন করলো জয় ।
“আমি তো জানি না”, সেতু উত্তর দিলো ।

পাবন কিছু না বলে বাড়িটার ভিতরে ঢুকলো ।
এলোমেলো হয়ে আছে ঘরের সমস্ত আসবাবপত্র । মাকরসার জাল ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এখানে সেখানে । ধুলো ময়লা জমে আছে আসবাবপত্রের উপর । দেখেই বুঝা যাচ্ছে অনেক বছর এই বাড়িতে কেউ ঢুকে না । তবে অদ্ভুত বিষয় হচ্ছে এই বাড়ির শেষের দিকে সিড়ি আছে যেটা মাটির নিচে চলে গেছে । তবে অনেক অন্ধকার । পাবন ওর হাতের টর্চটা জ্বালালো ।

ওরা সিড়ি বেয়ে বাড়ির নিচে গুপ্ত একটা ঘরে গেল । বেশ কিছু বই মেঝেতে পড়ে আছে । বড় একটা বই শেলফ আছে ।
পাবন দেখলো সবগুলো বইয়ের লেখক জোসেফ আর্থার ।
“আরে এগুলো তো আমার প্রিয় লেখকের বই”,অরকিয়া বলল ।
“কিন্তু এই বইগুলো এখানে আসলো কি করে ? জয় বলল ।
“হয়তো এই বাড়ির কেউ আর্থারের ভক্ত ছিলেন”, শুভ বলল ।
পাবন ছোট একটা ডায়েরীর মলাট থেকে ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে বলল,”আমার কাছে মনে হচ্ছে কোন এক সময় আর্থার এই বাড়িতে থাকতেন । দেখ ডায়েরীর উপরে উনার নাম লিখা । ব্যক্তিগত ডায়েরী এটা । তবে ভিতরের কিছু লিখা নাই ।”
একটু থেমে পাবন জিজ্ঞাসা করলো,”আচ্ছা অরকিয়া, তোর প্রিয় লেখক মানে জোসেফ আর্থার কবে মারা গেছে জানিস ?”
অরকিয়া চটপট উত্তর দিলো,”২০০৯ সালে ।
“তার মানে ৭ বছর আগে মারা গেছেন তিনি”,মাথা চুলকালো পাবন ।
সেতু বলল,”পাবন, ঐ দিকে দেখ ।”

পাবন সেতুর নির্দেশমত টর্চটা সেদিকে ঘুরালো । দেখলো একটা কাঠের কফিন পড়ে আছে ঘরের এক কোণে । হালকা ধুলো জমে আছে কফিনের উপর । হাত দিয়েই ধুলোগুলো মুছলো জয় আর শুভ ।

কফিনের উপর আঁকা সেই রূপার পাতের নকশাটা আর ইংরেজীতে লিখা –

JOSHEP ARTHAR
( 1942 -2009 )

চোখ কপালে উঠে গেল ওদের ।
এটা কি তাহলে বিখ্যাত লেখক জোসেফ আর্থারের মৃতদেহের কফিন ?

হঠাৎ বাতাসে শোঁ শোঁ আওয়াজ আসতে লাগলো যেন ঘূর্ণিঝড় হচ্ছে ।
পাবন চেচিঁয়ে বলল,”সবাই উপরে উঠ, মনে হচ্ছে কোন বিপদ আসছে । শুধু আমি এখানে থাকবো ; যা তোরা ।”

অনিচ্ছা সত্ত্বে সবাই উপরে উঠে গেল । বাড়ি থেকে বের হয়ে গেল ওরা ।

শুধু পাবন গুপ্তঘরের বুক শেলফের পিছনে লুকিয়ে থাকলো ।
তবে ও একটু আতঙ্কে আছে কারণ ও নিজেই জানে না বিপদটা আসলে কোনদিক থেকে আসছে ?

হঠাৎ ই নড়ে কফিনের পাশের দেওয়ালটা । সরে গেল সম্পূর্ণ দেওয়াল । আলো আসছে খোলা জায়গাটা থেকে । সেই আলোতে পাবন দেখলো একদম কালো কুচকুচে কেউ একজন দাড়িঁয়ে আছে সেখানে । চোখগুলো টকটকে লাল ; তীক্ষ্ন দাঁতগুলো বেয়ে রক্ত ঝরছে টপটপ করে । আর পিঠে কালো কুচকুচে দুটি পাখনা ।

আড়াল থেকে পাবন মনের অজান্তেই ফিসফিস করে বলল,” ব্ল্যাক ভ্যাম্পায়ার !!!”

চার.

ধীরে ধীরে মিশে গেল দেওয়ালটা ।
নিভে গেল আলো । সম্পূর্ণ অন্ধকার হয়ে গেল গুপ্ত ঘরটা । একটু পর খটখট করে নড়ে উঠলো কাঠের কফিনটা । তারপর একদম সুশাসন নীরবতা নেমে আসলো ঘরজুড়ে ।

আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে পাবন শেলফের আড়াল থেকে বের হয়ে আসলো । হাতে থাকা টর্চটা জ্বালালো । কফিনে ঝুলছে বিশাল এক রূপার তালা । তালার পাশেই ছোট একটা লোহার দন্ড । পাবন সেটা ধরতেই কড়কড় করে উঠলো কফিনের পাশের দেওয়ালটা । অবাক হল ও । লোহার দন্ডটাকে আস্তে আস্তে নিচের দিকে টানলো । ধীরে ধীরে সাটারের মতো দেওয়ালটা উপরের দিকে উঠতে লাগলো । মাটির তৈরী সরু একটা গুহাপথ বেরিয়ে আসলো যেটাকে আড়াল করে রেখেছিলো দেওয়াল ।

পাবন একটু ভেবে ঢুকলো সরু পথটাতে । কয়েকটা কালো বাদুড় পাবনের মাথার উপর দিয়ে উড়ে চলে গেল । হাটঁতে হাটঁতে পাবন সরুপথটার একদম শেষপ্রান্তে চলে আসলো । নকশা করা একটা দরজা দিয়ে শেষ হয়েছে গুহা পথটা । ওটা খুলতেই চোখ ধাধিঁয়ে গেল পাবনের । এটা যে ড্রীম হিলসের সেই কক্ষটা যেখান থেকে উধাও হয়েছিলো নীরা আর মুশতারী । তারমানে ঐ বাড়িটার সাথে গুপ্তপথ দিয়ে ড্রীম হিলস সংযুক্ত ।

পাবন দরজাটা লাগিয়ে আবার ফিরে গেল আগের জায়গায় । লোহার দন্ডটা উপরে দিকে উঠিয়ে দিয়ে বন্ধ করে দিল দেওয়ালটাকে ।
পাবন কফিনটার দিকে তাকিঁয়ে ভাবলো,”কি আছে কফিনটার ভিতরে ? আর ঐ কালো ভ্যাম্পায়ারটাই বা কোথায় গেল ?”
তবে তালাটা এতটাই বড় যে খালি হাতে এটা খোলা বা ভাঙ্গা কখনই সম্ভব না । পাবন বেরিয়ে আসলো ঘর থেকে ।

জয়, শুভ,অরকিয়া আর সেতু পাবনের জন্য অপেক্ষা করছিলো । পাবন আসার সাথেই সাথেই সবাই ওর কাছে ছুটে আসলো ।
” তুই ঠিক আছিস তো ? কোন বিপদ হয়নি তো তোর ?” উৎকন্ঠা ঝরলো জয়ের কন্ঠে ।

পাবন ধীরকন্ঠে বলল,”আমি ঠিক আছি । আমার জন্য কোন চিন্তা করতে হবে না । আমি ভাবছি নীরা আর মুশতারীর কথা । ওরা অনেক বিপদে আছে মনে হয় । বেশি দেরি করা যাবে না । তাহলে ওদের বাচাঁতেই পারবো না হয়তো । একটা কথা মাথায় রাখ প্রতিপক্ষ খুব হিংস্র আর শক্তিশালী । লড়াইটা অনেক কঠিন হবে । সেভাবেই প্রস্তুত থাক ।”
“আমরা আসার পর কি হয়েছিল আর ঐ শোঁ শোঁ আওয়াজটাই বা কিসের”, শুভ জিজ্ঞাসা করলো ।
পাবন শুভর দিকে তাকিঁয়ে বলল,”এই বাড়িটা গুপ্তপথ দিয়ে ড্রীম হিলসের সাথে সংযুক্ত । ঐ কফিনটাতে কি আছে জানি না । তবে এটা জানি আমাদের প্রতিপক্ষ কে ?”
“কে?” প্রশ্ন করলো অরকিয়া ।
“ব্ল্যাক ভ্যাম্পায়ার”, ফোঁস করে একটা নিঃশ্বাস ছাড়লো পাবন ।

ওর কথা শুনে আতঁকে উঠলো সবাই ।
“ভ্যাম্পায়ার” প্রায় একসাথে বলে উঠলো ।
“ভয় পেলে চলবে না । আমাদেরকে উদ্ধার করতেই হবে মুশতারী, নীরা আর অসহায় ঐ মানুষগুলোকে”,দৃঢ়কন্ঠে বলল পাবন ।
“তাহলে আমাদের পরবর্তী পদক্ষেপ কি ?” জয় জিজ্ঞাসা করলো ।
পাবন একটু ভেবে বলল,”কাল সকালে আমরা আবার এই ঘরটাতে আসবো । ভাঙ্গতে হবে কফিনের তালাটা । দেখতে হবে ঐ কফিনের ভিতর কি আছে ? এখন চল । অনেক রাত হয়েছে । বাড়ি ফিরে যাই ।”

সাইকেলে চড়ে ওরা বাড়ির দিকে রওয়ানা দিল ।
চাঁদটা আবছা আলো ছড়াচ্ছে ।
পাবন পিছনে ফিরে তাকালো ।
পরিত্যক্ত বাড়িটাকে অনক রহস্যময় লাগছে । কালো একটা বাদুড় কোথা থেকে যেন উড়ে এসে ঘরটাতে ঢুকলো । হয়তো রক্তচোষা হবে ।

পরদিন সকাল ।

নাস্তা পর্ব শেষ করে পাজয় থেকে সাইকেলে করে ওরা রওয়ানা দিল পরিত্যক্ত বাড়িটার উদ্দেশ্যে । কিছুক্ষণের মধ্যেই বাড়িটার কাছে চলে আসলো । সাইকেলগুলো বাহিরে রেখে ওরা নিচের গুপ্তঘরটাতে গেল ।

কফিনটা আগের জায়গাতেই আছে । ওরা দেখলো কফিনের পাশে আগের মতোই একটা রূপার পাত পড়ে আছে । আর তার নিচে একটা সাদা কাগজ । কাগজটাতে একটা বাদুরের ছবি আঁকা ।

ছবিটার নিচে রক্ত দিয়ে লেখা –
“ONLY 90 DAYS” ।

পাবন কাগজটা হাতে নিল ।
জয় জিজ্ঞাসা করলো,” আর ৯০ দিন মানে ?”
“মানেটা তো আমিও বুঝতেছি না । তবে সেটা পরে ভাবছি আগে দেখি কফিনের ভিতর কি আছে ? পাবন বলল ।

শুভ একটা তালা কাটার যন্ত্র এনেছে । যন্ত্রটা দিয়ে বিশ মিনিট ধরে চেষ্টা করে ওরা তালাটার এক ইঞ্চিও কাটতে পারলো না ।
“কি তালা রে বাবা, কি দিয়ে বানানো কে জানে ?” রাগ ঝরলো অরকিয়ার কন্ঠে ।
আরও অনেকক্ষণ চেষ্টা করেও ওরা তালাটা খুলতে পারলো না ।
পাবন বলল,” মনে হয় তালাটা সাধারণ নয় । সাধারণ হলে এতক্ষণ খুলে যেত ।”
“আমারও তাই মনে হচ্ছে”,শুভ বলল ।
“এক বইয়ে পড়েছিলাম ভ্যাম্পায়াদের কফিনের তালা নাকি ওদের বাদুড় দেবতার মন্ত্রপুত রক্ত দিয়ে আটকানো থাকে”,অরকিয়া বলল ।
“তাহলে কি এটা সেরকমই কোন মন্ত্রপুত তালা ?” বিড়বিড় করে বলল সেতু ।

কফিনটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিঁয়ে থেকে পাবন বলল ,”হয়তো” ।

গল্পের বিষয়:
রহস্য

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত