নিঃস্বঙ্গ মুসাফির

নিঃস্বঙ্গ মুসাফির

এক.

নন্দিতা প্রতিদিন খেয়াল করে, রোজ একটি ছেলেকে। ছেলেটি প্রতিদিন নন্দিতাদের বাড়ির পাশে বয়ে যাওয়া ছোট্ট একটি নদীর পাড়ে আসে। হাতে থাকে একটি গিটার, তবে নন্দিতা কখনই তাকে গিটার বাজাতে এবং গান গাইতে শুনেনি। ছেলেটি মনে হয় গানই পারে না, হয়ত গিটারই বাজাতে পারে না। এমনি ভাব নেয়ার জন্য হয়ত কাছে রেখেছে। তবে একটা ব্যাপার সে লক্ষ্য করেছে। ছেলেটি নিরবে চুপচাপ বসে নদীর বয়ে যাওয়া শান্ত জলের দিকে তাকিয়ে থাকে। বিষয়টা কেমন যেনো।

এভাবে রোজ দেখতে দেখতে নন্দিতা কখন যে নিরব ছেলেটির প্রেমে পড়ে গেছে সেটা সে বুঝতেই পারেনি। একদিন ছেলেটি বসে বসে নদীর শান্ত জল দেখছিলো…

– এইযে মি.
-.জ্বি…
– গিটার বাজাতে পারেন?
– কেনো?
– রোজ রোজ এ দিকে কেনো আসেন?
– এমনি।
– গান গাইতে পারেন?
– কেনো?
– আপনার নামকি?
– আবির।
– ও, আমার নাম নন্দিতা।

আবির ছেলেটি খুব অবাক হয়েছিলো। কারণ এর আগে কোনোদিন এই মেয়েটাকে সে দেখেনি। রোজ আসতো, পানির দিকে চেয়ে থেকে চলে যেতো। কিন্তু কে এই মেয়ে? তাকে তো এর আগে দেখিনি।

– আপনি কে?
– ঐ যে বাসাটা দেখছেন… ওটা আমাদের বাসা।
– ওহ, আমি এখন যাই।

আবির চলে গেলো। তবে নন্দিতা সেখানেই বসে রইল। আসলে জায়গাটা অনেক সুন্দর। একটি গাছের নিচে রোজ আবির বসে। আর সেখানে বয়ে আসে ফিরফিরে বাতাস। শান্ত নদীর জল, মনটা আসলেই ভালো করার মত একটা পরিবেশ। ছেলেটির সাথে ছাড়া সে এখানে কখনই আসেনি। কাল একবার আসবো ভাবতে ভাবতেই নন্দিতা চলে গেলো।

বাসায় এসে নন্দিতা ভাবতে লাগল, ছেলেটিকে সে সত্যিই ভালোবাসে। কারণ তাকে দেখতে কেমন একটা আগ্রহ জাগে সবসময় মনের মধ্যে। যখন আবির চলে যাই তখন কেমন যেনো শুন্য শুন্য মনে হয় সব। তাহলে সত্যিই ভালোবাসলাম অচেনা ছেলেটির? হয়ত তাই। কিন্তু কে সে? আর এর আগেও তো সে এদিকে দেখিনি, কালই জিজ্ঞেস করতে হবে।

***

“নিঃসঙ্গতার প্রতীক আমি,
নিঃস্তব্ধতা আমার সঙ্গী…
নিজেকে…”

– বাহ হেব্বি কবিতা আবৃতি করেন তো?
– আজ আবারো আপনি?
– হুমম আসলাম আপনার সাথে গল্প করবো বলে… কিন্তু কবিতাটা শেষই করতে দিলাম না। সরি।
– কিন্তু আমি যে গল্প করি না। আমি কথা বলতে চাই না কারো সাথে। আমি যে নিঃস্বঙ্গ। একাকী, ভ্রমন পিপাসু মুসাফির আমি।
– খুব সুন্দর কথা বলতে পারেন।
– হুমম।
– আপনার বাসা কোথায়?
– না…
– নাই মানে? কোথায় থাকেন আপনি?
– যেখানে সেখানে।
– মানে?
– কিছুনা… আজ যাই।
– আবার কাল আসবেন তো??
– দেখি…

আবির চলে গেলো… নন্দিতা আজো সেখানে বসে রয়েছে। আসলেই জায়গাটা মন ভালো করার প্রতীক। একাকীত্বটাকে ভুলিয়ে দেবে নিমিষেই। তাহলে আবির একা? সত্যিই কি সে একা? কিন্তু কেনো? কি রহস্য আছে ওর মধ্যে? জানি না কি, তবে তাকে আমার চাই। তার একাকিত্বের সঙ্গী হতে চাই। দুজনে পাশাপাশি বসে এই পরিবেশটাকে উপভোগ করতে চাই হাতে হাত রেখে।

দুই.

আবির একজন বড়লোক বাবার ছেলে। সে এমন ছিলো না। সারাদিন দুষ্টামি আর মজাতে তার দিন কাটতো। কারণ, সে যে ভালোবাসতো জান্নাত নামের একটি মেয়েকে।

একে অপরের খুব ভালোবাসতো তারা। জান্নাতরা ছিলো আবিরদের থেকে একটু গরীব টাইপ। যার কারনে আবিরের বাবা তাদের সম্পর্কটি মেনে নেইনি। কিন্তু তারা একে অপরের খুব ভালোবাসতো বলেই তারা পালিয়ে যায়।

ছোট্ট একটি সংসার বাঁধে তারা। নিজেদের মধ্যে সব কিছুই ছিলো। সুখ ছিলো অনেক বেশি।

জান্নাত আর আবিরের বিয়ের দেড় বছরের মাথায়, সন্তান হতে যেয়ে মারা যায় জান্নাত ও তাদের সন্তান। এরপর থেকেই আবির এমন একা, নিসঙ্গ, ছন্নছাড়া।

আবির অনেক গান গাইতো, তাই গিটারটি ছিলো জান্নাতের দেয়া শেষ উপহার… যার জন্য আবির আজো সেটা কাছে রেখে দিয়েছে কিন্তু গান আর সে গায় না। গান গাইলে জান্নাতকে সে খুব মিস করতে থাকে। ফলে আবির আর বাসায় ফিরে যায়নি। সেখান হতে আবির আজ নিঃসঙ্গ মুসাফির।

– একটা গান গেয়ে শোনাবেন? (নন্দিতা)
– নাহ…
– প্লীজ একটা গান শোনান না…

আজ যখন নদীর পাড়ে বসে আবির জান্নাতের স্মৃতিগুলো ভাবছিল।। তখন নন্দিতা এসে তাকে গান গাইতে বললো।

– প্লীজ একটি গান গেয়ে শোনান…
– বললাম তো না।
– ওকে, একটা কথা বলার ছিলো।
– বলুন…
– ভালোবাসি আপনাকে… আজ থেকে অনেকদিন আগে থেকে। আপনার নিঃসঙ্গটাকে ভালোবাসি। আপনার পাশে আমি থাকতে চাই। দুজনে মিলে হাজারো স্বপ্ন বুনতে চাই… প্লীজ, আমাকে ভালোবাসবেন?
– আমি আজ যাই…

নন্দিতার কোনো কথা না শুনেই আবির উঠে চলে গেলো। আবির চায় না, জান্নাত কে সে ভুলতে। তার স্মৃতি নিয়েই সে বাকি জীবন কাটাতে চাই।

তিন.

আবির যাইনি সেখানে আজ তিন দিন হলো। ল্যামপোষ্টের নিচে গিটার হাতে দাঁড়িয়ে সে আকাশ দেখছে। হঠাৎ অনুভব করলো… জান্নাত এর ছায়ামূর্তি তাকে দেখছে।

– জান্নাত… আমার জান্নাত… তুমি ফিরে এসেছে?
– নাহ আবির। আমি যে না ফেরার দেশে আছি। এটা তো তোমার মাঝে আমার স্মৃতি।
– প্লিজ তুমি ফিরে এসো আমার কাছে।
– আবির নন্দিতার কাছে যাও।
– মানে?
– মেয়েটা তোমাকে অনেক ভালোবাসে।
– নাহ, আমি তোমাকেই ভালোবাসি। তোমাকে ছাড়া কাউকে ভাবতে পারবো না।
– আমি তোমাদের মাঝে ভালোবাসা হয়ে বাঁচতে চাই। তুমি যদি আমাকে ভালোবাসো তবে ফিরে যাও ওর কাছে। আমি বলছি যাও…
– জান্নাত… জান্নাত…

তখনি জান্নাত উবে গেল। আবির একটি স্থির হয়ে বোঝার চেষ্টা করলো কি হয়েছিলো তার। সে কি ঘুমিয়ে পড়েছিলো? কিন্তু জান্নাতের কথাগুলো এখনো তো আমার কানে বাজছে, বারবার বলছে ফিরে যাও তুমি নন্দিতার কাছে।

***

আবির সেই যে চলে গেলো, আর আসেনি। আবিরকে সে খুব ভালোবাসে। কেনো জানি না তার সাথে কথা বলতে, তার সাথে সময় কাটাতে খুব ভালো লাগে। সে কি আর আসবে না? আমি কি তার স্মৃতি নিয়েই বেঁচে থাকবো?

এসব ভাবছিলো নন্দিতা সেই নদীর পাড়টাই বসে… হঠাৎ আবিরের কথা শুনে চমকে পাশে থাকালো, সেই চেনা মায়াবি মুখ। যাবে নিয়ে কল্পনাতেই ভেসে গেছে বহু পথ।

– গান শুনবেন?
– হুমম

আজ কতদিন পর আবির গিটার বাজাতে লাগলো… আর আস্তে করে গাইতে লাগলো-

“তুমি কি আমার হাসি মুখের আবার কারন হবে
তুমি কি আমার শত ভুলের আবার বারন হবে
দেবো না জল আসতে চোখে কোনোদিনও আর
দাও যদি আর একটিবার জল মোছার অধিকার…”

আবির গেয়ে চলেছে গান। নন্দিতা চুপ করে আবিরের ঘাড়ে মাথা রেখে শুনছে। আর বুনছে হাজারো স্বপ্ন। তবে এটা কল্পনার নয়। বাস্তবের স্বপ্ন।

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত