মিলি খালা ও আমি

মিলি খালা ও আমি

এক শতাব্দী যৌবন শরীরে নিয়ে মিলি খালা একা। মিলি খালার বয়স আসলে কত সে হিসেব বোঝার বয়স তখন আমার না। তিনি বিয়ে করেনা কেন বা বিয়ে হয়না কেন সেটাও বোঝার মতো বয়স তখন না। আমি/আমরা তখনও দাড়িতে জীবনে প্রথমবারের মতো ক্ষুর ছোয়াইনি। লাল শাকের চারার মতো কচি কচি নরম কিছু লোম আমাদের থুতনির নিচে নিচে শোভা পায়। ঠোট থেকে তখনও মুছে যায়নি শিশু কালের লাল।

মিলি খালার উপচে পড়া যৌবন সঙ্গত কারনে তাই আমাদের টানেনা। কৌতুহল যে ছিলোনা তা বলি কী করে? আড় চোখে কি দু একবার তাকাইনি? তাকিয়েছি বৈকি। তবে সেটা কিশোর মনের রহস্য উন্মোচনের চেষ্টা মাত্র। আদতে সেখানে ভর করেনি পুরুষ দৃষ্টি। যৌনতা মুক্ত হয়ে তাকানো দোষের তো না। আমরা তখনও পর্ন দেখিনি। পড়িনি রসময় গুপ্ত। তাই মিলি খালার যৌবন নিয়ে ছিলো না আলাদা করে মাথা ব্যথা। ছিলোনা কল্পনা।

মিলি খালা প্রায় প্রায় ডাকতেন। ফার ফরমায়েশ খাটাতেন। এটা সেটা আনতে দিতেন। আমি বাধ্য ছেলের মতো দায়িত্ব পালন করতাম। দশ টাকার জিনিস এগার টাকা বলতে শিখিনি তখনও। নয়শ গ্রামকে কেজি বানানো শিখিনিও তখনও। মিলি খালা কৃতজ্ঞতা বশত আমার কালো ফোলা গাল টিপে দিতেন। সেটা যতটা জোরে চাপলে আদর হয় তারচে কিছুটা বেশি ছিল মনে হতো। ব্যথাও পেতাম মাঝে মাঝে। গাল আরেকটু লাল হতো। তবে খারাপ লেগেছিল/লাগতো সে কথা বলব না। ভালই তো লাগতো।

যেদিন আর ফার ফরমায়েশ থাকত না সেদিন তার সামনে বসে গল্প শুনতে হতো। মিলি খালা অনর্গল কথা বলে যেতেন। আমি মাথা নিচু করে শুনে যেতাম। মাঝে মাঝে বলতাম, তারপর? ও তাই? সত্যি? কিভাবে?….না তার থেকে বেশি কিছু মনে নেই আর। ভুলে গেছি সে সব গল্পের বিষয়বস্তু। হয়তো মিলি খালাদের গল্প ভুলে যেতে হয়। নতুবা সে গল্প এতই দূর্বদ্ধ যে ধরে রাখতে পারেনি সদ্য কিশোর হওয়া মন। হবে কিছু একটা। সুনাম ছোটে কচ্ছপ গতিতে। দূর্নাম ছোটে খরগোশ গতিতে। মিলি খালার দূর্নাম তাই কান থেকে কান/মন থেকে মন/বাড়ি থেকে বাড়ি পৌছাতে খুব একটা বেগ পেতে হয়নি। ঢেমনা মাগী বিয়ে করেনা কেন? আহা করবে কেন? বিয়ে করলে কচি কচি ছেলেগুলোর মাথা খাবে কে?

মাগী নিজেতো অপয়া, সেই সাথে নষ্ট করতেছে বাচ্চাগুলোরে! এরকম খারাপ হয় কেমনে মেয়ে মানুষ? লাজ লজ্জার মাথা কি খেয়ে ফেললো? আহা বিয়ে করলে তো এক স্বামী! তার কি আর এক স্বামীতে হবে? বিয়ে না করলে সবাই স্বামী! বুঝলেনা?

হুমমম ৪০ বছরের বুড়ি মাগীরে বিয়ে করবেই বা কে? এই কুত্তামী করেই কাটাবে! বয়স্ক মেয়ের খায় বুঝলেনা? কচি কচি ছেলে পাওয়া গেলে কে আর স্বামীর ঘর করে? বুঝি বুঝি বুঝি ৬ বাচ্চার মা তো আর এমনি হই নি আমি!! অভিজ্ঞতা আছে আমার। তখনও পরিবার থেকে চাপ। না মিলি খালার এক কথা সে কোনদিন বিয়ে করবে না। পরিবার একটা সময়ে হাল ছেড়ে দেয়। সবাই ধরেই নিলো মিলি একটা বাজে চরিত্রের মেয়ে। মিলি খালার পরিবার ধীরে ধীরে একঘরে মতো হয়ে গেল। প্রতিবেশিরা তাদের সদ্য কিশোর বাচ্চাগুলোরে আগলে রাখে। চোখে চোখে রাখে। ভুলেও যেন কেউ ডাইনির সামনে না পড়ে। বয়স্ক মাগী। বলা তো যায়না কবে কোন ঝামেলা বাধায়। ছোট ছেলেদের দিয়ে চাহিদা মেটায় মিলি।

মিলি খালার সাথে আমার শেষ দেখা হয় যে বার তখন আমার বয়স কাটায় কাটায় ১৫ বছর। বললেন, তুই আর কাল থেকে আসিস না বাবা। তুই আমার শেষ একটা উপকার করবি ফাহাদ? আমি বললাম অবশ্যই করব, বলুন? মিলি খালা হাতে টাকা গুজে দিয়ে বললেন, সুগন্ধাতে (একটা দোকানের নাম) যেয়ে সবচে বড় পুতুলটা কিনে আনবি। ওটা আমাকে দিয়ে তারপর আর তুই কোনদিন আসবি না।

কেমন? আমি মাথা নেড়ে পুতুল কিনবার জন্য বেরিয়ে গেলাম। মুখোমুখি আমি আর মিলি খালা। (পুতুল কেনার পর) মিলি খালা- তুই বড় হলে ভুলে যাবি না তো আমাকে? আমি- না তো ভুলে যাব কেন? মিলি খালা- তুই বড় হবি, একদিন তোর বিয়ে হবে। যদি প্রথম সন্তান মেয়ে হয় তবে আমি একটা নাম ঠিক করেছি। সেই নামটা তুই তোর মেয়ের জন্য রাখবি। নাম রাখবি “প্রথমা” ঠিকাছে? আমি- জি খালা রাখব (লজ্জা পেয়েছিলাম) মিলি খালা- কাল থেকে আর আসবি না, কেমন? আমি- আচ্ছা আসবো না।

মিলি খালা বড়সড় পুতুলটা বুকে নিয়ে হু হু করে কাদছেন। কেন কাদছেন ঘটনা কি আমি আগা মাথা কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। বোকার মতো ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে ছিলাম। মিলি খালা পুতুলের মাথায় আলতো করে হাত বোলাতে বোলাতে বললেন, জানিস আমি কোনদিন মা হতে পারব না। আল্লাহ আমাকে মা হবার ক্ষমতা দেন নাই। আমার তাই আর সংসার করাটা হলোনা রে। কাউকে বলিওনি। বললে হয়ত বউ টউ আছে এমন কোন বুড়োর সাথে আমাকে বিয়ে দিয়ে দিত জোর করে। যদি মা ডাক নাইবা শুনতে পেলাম তবে বিয়ে করে কি করব বল? তুই ছোট মানুষ অত কিছু বুঝবি না রে। তোদেরকে মাঝে মাঝে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরতাম, আদর করতাম। কেন জানিস? আমার মনে হতো তোরা সবাই আমার সন্তান! আমি তোদের মা! সমাজ আমাকে মা থেকে মাগী বানিয়ে দিল।

তুই একবার আমাকে মা বলে ডাকবি বাবা? স্রেফ একবার? আর কোনদিন ডাকতে হবেনা। একবার শুধু একবার ডাক….. আমি সেই প্রথম মিলি খালাকে ডাকলাম, মা! মিলি খালা উত্তর দিলেন না। পুতুলটিকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে কাদছেন। আহা সে কি কান্না। যতোটা কাদলে মন খারাপ হয় সৃষ্টিকর্তার তারচেয়ে বেশি ছিল কি সে কান্না? আমি বুঝিনি সেদিন। আমার নিজেরও কান্না পাচ্ছিলো। আমি মিলি খালাকে ঠিক সেভাবে রেখে আস্তে করে উঠে এসেছিলাম। সেই ছিল শেষ দেখা।

তার ঠিক এগার দিন পর মিলি খালাকে পেয়ারা গাছের সাথে গলায় দড়ি দেওয়া ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। আমি সাহস করে লাশ দেখতে যাইনি। জীবন্ত মিলি খালার সামনে যাবার সাহস আমার থাকলেও সাহস হয়নি মৃত মিলি খালার সামনে যাবার। মনে মনে বলেছিলাম, ক্ষমা করো আমাকে, আমাদের, পৃথিবীকে। পেয়েছিলাম কিনা তা আর জানা হলোনা। অপেক্ষায় আছি আজও।

 

 

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত