মা

মা
-আপনি টাকা জমা দিতে এসেছেন অথচ কিছু লিখেন নি কেনো আজব?
-বাবা আমি লিখতে পারিনা। একটু লিখে দাওনা।
-আপনি কিছু লিখতে পারেন না মূর্খ কোথাকার ব্যাংকে আসছেন কেনো তাহলে?
-বাবা আমি আসতে চাইনি কিন্তু আনুমানিক ৭০+ বয়সী বৃদ্ধা মহিলাকে থামিয়ে পাশের ক্যাশিয়ার মাহমুদ বলে উঠলো,
-হ্যা মি. আসাদ মায়েরা মূর্খ। কিছু লিখতে পারে না। কেনো যে ব্যাংকে আসে তারা আমি বুঝিনা।
-বাবা আমি কি করবো বলো? একটু দেখিয়ে দাও আমি লিখার চেষ্টা করি? মাহমুদ বললো,
-মা আপনি সাইডে একটু দাড়ান ওয়েট করুন। মি. আসাদ মায়েরা কিছু পারে না। আমরা বড়লোক হয়ে গেলেই মায়েদের গাধা মনে হয়। মায়েরা গাধা বলেই আমরা এতদূর আসতে পেরেছি। শিক্ষিত হতে পেরেছি। এই মায়েরাই আমাদের বড় করেছে। মানুষ করেছে। আপনার মা বেঁচে আছে কিনা জানিনা ইনিও আমাদের মতো কারো মা। চাইলেই আপনি ডিপোজিট বইয়ের পৃষ্টা টা লিখে জমা করে নিতে পারতেন। মায়েরা মায়ের জায়গায় থাকে, উনারা যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলে না। তাল মিলিয়ে চললে আপনার মতো বেয়াদবই জন্ম নিবে। আপনি নিজেকে অনেক বড় ভাবছেন উনাকে ধমক দিচ্ছেন নুন্যতম নৈতিক শিক্ষা আপনি পাননি। ষ্টুপিড।
-মুখ সামলে কথা বলুন মাহমুদ।
-তা তো বলছিই। এদিকে বৃদ্ধা মহিলা কেঁদে চলেছে। মাহমুদ ক্যাশ টেবিল থেকে উঠেই বৃদ্ধার দিকে এগিয়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরে বললো,
-আরে মা আপনি কাঁদছেন কেনো?
-বাবা আমি আসতে চাইনি।
আমার ছেলে চাকরি করে বড় অফিসে। ছেলে বিয়ে করেছে। ছেলে বড় ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছে। ভাড়া বাসায় ছেলে আর ছেলের বউয়ের সাথে থাকি। ছেলের বউ আমাকে জোর করে ধমক দিয়ে পাঠিয়ে বলেছে। যেভাবে পারো টাকা গুলো জমা করে আসো যাও। তারা বড় বিজি মানুষ। আজকে জমা দিতে আসতে না পেরে আমাকে পাঠিয়েছে। ছেলে আর ছেলের বউ আমাকে মানুষই মনে করে না। অনেক অনেক কথা শুনতে হয়। কি করবো বাবা খেতে তো হবে বেঁচে আছি যখন। আল্লাহ মরণ দেয় না কেনো আমার।
-আচ্ছা মা কাঁদবেন না। আর মা এসব বলতে নেই। দেন আপনার টাকা আমি জমা নিচ্ছি। মাহমুদের সিরিয়ালে ৪ জন লোক দাড়িয়ে রয়েছে। মাহমুদ তাদেরকে বললো,
-সাময়িক অসুবিধার জন্য আপনাদের কাছে আমি দুঃখিত। দয়া করে এই সিরিয়ালে আপনারা টাকা জমা দিন। মা আপনি ঐ সোফায় গিয়ে বসুন। আমি আপনার টাকা জমা করে আপনার কাছে আসতেছি। টাকাটা দিন?
বৃদ্ধা মা হাত ব্যাগ থেকে হাজারি নোট যা আছে সব দিলো,
-দশ হাজার জমা দিতে বলছে বাবা।
-আচ্ছা মা। মাহমুদ টাকা জমা করে কিছুক্ষণ পর বৃদ্ধা মহিলার পাশে গিয়ে বসে বললো,
-মা আপনার ঠিকানাটা আমাকে বলুন? আমি আপনার সাথে খুব তাড়াতাড়ি যোগাযোগ করবো।
-শ্যামনগর, বারিধারা এতদূর জানি আর কিছু জানিনা বলে আবার কেঁদে উঠলো।
-ও আচ্ছা মা আপনার ফোন আছে? জীর্ণশীর্ণ হাত ব্যাগ থেকে কেসিং ভাঙা নকিয়া মোবাইল বের করে বললো,
-হ্যা এই যে ভাঙা মোবাইলটা আছে। মাহমুদ মোবাইলটা নিয়ে নিজের নাম্বার তুলে ফোন দিয়ে নাম্বার সেভ করে নিলো।
-মা সামনের শুক্রবার আমি আপনাকে ফোন দিলে যেভাবে আছেন সেভাবেই আপনি বের হয়ে রিকশা করে এই ব্যাংকের সামনে চলে আসবেন। আমি আপনাকে নিয়ে যাবো আমার বড় বাসায়।
-ঠিক আছে বাবা আমি আসবো।
-আচ্ছা আপনি এখন যান আর দু’দিন থাকেন বাসায় কোনোরকম। তারপর আপনার সব দায়িত্ব আমি ছেলে নিবো।
মাহমুদ গিয়ে ক্যাশে বসলো। মি. আসাদকে উদ্দেশ্য করে বললো,
-আমার মা নয়বছর আগে মারা গেছে, তার আগেই বাবা মারা গেছে। মায়ের সেবা করতে পারিনি। এই মাকে নিয়ে নিজের মা মনে করে সেবা করবো। আর হ্যা আবারো বলছি, মায়েরা লিখতে জানেনা, পড়তে জানেনা ঠিকমতো। কিন্তু ঠিকমতো আমাদের মানুষ করতে জানে। খেয়েছি নাকি খাইনি। কোনটা ভালো কোনটা খারাপ হবে তাই মা শিখিয়েছে। মায়েরা কিছু জানে না বলেই মায়ের পায়ের নিচেই জান্নাত স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা লিখে রেখেছে। আপনার আমার মতো পুরুষের পায়ে লিখে রাখেনি। কথা বলতে মা শিখিয়েছে। দোয়া করি আপনাকে যেন আল্লাহ হেদায়েত দেয়। দুইদিন পর….
-মা তুমি কি খাবে আদেশ করো? যা খাবে যেভাবে খাবে সেভাবেই আমার স্ত্রী রান্না করবে। আমার স্ত্রী হেব্বি রান্না পারে মা। বলো কি খাবে?
-মাহমুদ আমার কিছু খেতে হবে না। তুমি আমাকে সেদিন থেকে মা ডাকতেছো তাতেই আমার পেট ভরে যাচ্ছে। খুশিতে আমি আত্মহারা হয়ে যাচ্ছি। আমার ছেলে ইফরাদ আর তুমি মাহমুদের সাথে কতটুকু তফাৎ তা আমি বুঝাতে পারবো না।
-মা এসব বাদ দাও। তুমি আমার মা। নতুন করে সব শুরু। বলো কি খেতে চাও?
-কিছুই না মাহমুদ। তোমরা যা খাও তাই রান্না করো।
-আচ্ছা ঠিক আছে মা। এখন সোয়া ১২ টা বাজে। আমি গোসল করতে যাচ্ছি। জুমাতে যাবো। তোমার কিছু লাগলে আমার স্ত্রী আনিকাকে ডাক দিও। মাহমুদ জুমার নামাজ পড়ে আসলে তিনজনে খেতে বসলো। মাহমুদ মুরগি, লাল শাক মায়ের প্লেটে তুলে দিয়ে বললো,
-খাও মা। না জানি কত অবহেলায় রেখেছে তোমাকে। এই যে মা তোমার জন্য টেংরা মাছের ঝোল রেঁধেছে। ওটা নিও। বৃদ্ধা মা খাবার মুখে দিতে গিয়ে পারছে না। চোখ দিয়ে পানি পড়ছে।
-আরে মা কান্না করবে না একদম। আমি এসব সহ্য করতে পারিনা। বুঝেছো। মাহমুদ বাম হাতে বৃদ্ধা মায়ের চোখের পানি মুছে দিলো। আরো দু’দিন পর মাহমুদ বৃদ্ধা মাকে নিয়ে সুন্দর করে ভালো মানের কাপড় পড়িয়ে মিষ্টি সহকারে ব্যাংকে নিয়ে গেল। মাকে সোফায় বসে থাকতে বললো। সবাই আসার জন্য। সাড়ে দশটার মধ্যে সবাই এসে পড়ে। মাহমুদ উঠে বের হয়ে মাকে ডাক দেয়,
-মা আসো এদিকে। বৃদ্ধা মা উঠে গেলে মাহমুদ তার ক্যাশের পাশে নিয়ে যায়। তারপর মিষ্টির বক্স খুলে বললো,
-এই নাও মা। এই যে মি. আসাদ সাহেবকে মিষ্টি মুখ করাও আগে। মি. আসাদ মাহমুদের দিকে তাকালো। বৃদ্ধা মা একটা মিষ্টি নিয়ে মি. আসাদের মুখের দিকে এগিয়ে দিয়ে এক গাল হেসে বললো,
-খাও বাবা। খুব মজার মিষ্টি। মি. আসাদ না করতে চেয়েও পারেনি। মিষ্টি মুখে নিলো। কোনোরকম অনুশোচনা বোধ করে খাচ্ছে। মাহমুদ আঁড়চোখে তা খেয়াল করতে লাগলো। বৃদ্ধা মা তারপর একে একে সব অফিসারদের মিষ্টি খাওয়ালো। সবাই খুশি হলো হাসছিলো কিন্তু মি. আসাদ কিছুতেই হাসতে পারছে না। খাওয়ানো শেষ হলে হাত ধুয়ে বৃদ্ধা মা সোফায় গিয়ে বসলো। অনুশোচনা বোধ করে আচমকা উঠেই মি. আসাদ বৃদ্ধা মাকে জড়িয়ে ধরে বললো,
-সরি মা। সেদিনের ব্যবহারের জন্য আমাকে ক্ষমা করে দিন।
-ছেলেরা কখনো মায়েদের কাছে দোষী হয়না। যাও বাবা কাজ করো। এই দৃশ্য দেখে সবাই এবার হাততালি দিচ্ছে।
গল্পের বিষয়:
গল্প
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত