জীবন

জীবন
বাবা যখন বলে “বাচ্চারা গায়ে ঘেঁষবে এটা আমার পছন্দ না!” তখন আমার বয়স মাত্র ৪। আমি আর বাবার সামনে যেতাম না।বাবা আসতো একদিন।সকালে ভোরে এসে দুপুর ১২ টার দিকে চলে যেতো।আমার কাজিনদের বাবাকে দেখতাম উইকেন্ডে তাদেরকে নিয়ে ঘুরতে যেতে।কিন্তু আমার ভাগ্যে এটা লেখা ছিলো না হয়তো। আমার যখন ৬বছর বয়স তখন এক রাতে আমার ঘুম ভেঙ্গে যায় কান্নার শব্দে।দেখি যে আম্মু নামাজের বিছানায় বসে কাঁদছে।আমি খাট থেকে নেমে আম্মুর গলা জড়িয়ে বললাম,
“কাঁদো কেন তুমি?”
“আল্লাহর কাছে গভীর রাতে কেঁদে কিছু চাইলে আল্লাহ নিরাশ করেন না।”
“সত্যি?”
“হ্যাঁ মা,সত্যি।”
“তুমি কি চেয়ে কান্না কারছো?”
“এটা আমার আর আল্লাহর মধ্যে সীমাবদ্ধ।কাউকে বলা যাবেনা।”
“বললে কি হয়?”
“গোপনীয়তা ভঙ্গ হয়।আস্তে আস্তে বুঝবা তুমি।” আসলেই আমি আস্তে আস্তে বুঝেছি সব।আম্মু সবার সাথে হাসিমুখে থাকতেন।মাঝে মাঝে দাদু বলতেন,
“মৌরি,তুমি কেন এসব সহ্য করছো?” আম্মু বলতো,
“মা,ধৈর্যের ফল পাবো একদিন।আমি এখন কোনো একশন নিলে আমার মেয়েটার ক্ষতি হবে।মানসিকভাবে সে ভেঙ্গে পড়বে।আমি ধৈর্য ধরেছি,আল্লাহ্ সব দেখছেন।” আমি বুঝতাম না কি নিয়ে কথা বলছে তারা।বাবা আসলে আম্মু খুব বেদিশা থাকতো।কি দিবে না দিবে এসব নিয়ে খুব ব্যস্ত হয়ে যেতো।অথচ যখন আম্মুর টাইফয়েড হয়েছে তখন বাবা খোঁজ পর্যন্ত নেয়নি।ছোট চাচ্চু যখন বলে যে,
“ভাবির টাইফয়েড। অবস্থা বেশি ভালো না।” বাবার জবাবটা ছিলো এরকম,
“চলাফেরা করে কেমনে যে টাইফয়েড হয়ে যায়?টাকা পাঠাচ্ছি, কি কি দরকার কিনে নিস।” ছোট চাচ্চু সেদিন কেঁদেছেন।কাঁদতে কাঁদতে বলেন,
“আমাদের মাও এতো করেনি আমাদের জন্য যা আমাদের ভাবি করেছেন।আর সেই ভাবির এমন সময়ে আমরা কি করতে পারছি?” তখন প্রথমবারের মতো আমি বাবাকে কল করি।বলি,
“বাবা,তুমি আসো প্লিজ।আম্মুর খুব কষ্ট হচ্ছে। ” বাবা বলেছেন,
“আমি কি ডাক্তার নাকি ফেরেশতা যে আমাকে দেখলে কষ্ট কমে যাবে?টাকা পাঠিয়েছি।আরও লাগলে বলবা।পাঠিয়ে দিবো।” মেজাজ খুব গরম হয়ে গেছিলো।আমি বাবাকে বলেছি,
“তোমার টাকা ছাড়াই আমি আমার আম্মুকে ঠিক করবো।লাগবেনা তোমার টাকা।”
তারপর চাচ্চুই সব করে।আম্মু বলেছিলো তাহাজ্জুদে নাকি কেঁদে কিছু চাইলে তা পাওয়া যায়।আমি সেবার আমার আম্মুর প্রাণ ভিক্ষা চেয়েছিলাম।আম্মু সুস্থ হয়ে উঠে।কিন্তু কেমন জানি হয়ে যায়।আগের মতো কথা বলেনা।কাজ করে নিরিবিলি।আমি তখন ইন্টারমিডিয়েটে পড়ি।আম্মুকে একদিন ঝেঁকে ধরি,
“বলোনা আম্মু,কেন বাবা এরকম?কি হয়েছে বলো প্লিজ!” আম্মু আমাকে বলে,
“সব ঠিকই আছে। তোমার বাবা ঠিক আছে।এসব নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবেনা।তুমি শুধু ভালো করে পড়ালেখা করে নিজের পায়ে দাঁড়াও।এতেই আমার শান্তি।” আমি আম্মুর কাছে উত্তর না পেয়ে গেলাম চাচ্চুর কাছে।চাচ্চু আমাকে বলল,
“তুই বড় হয়েছিস।তোকে বলা যায়।কিন্তু কিভাবে নিবি ব্যাপারটা তা আমার জানা নেই।”
“যেভাবেই নিই,আমার জানা দরকার কি হয়েছে!”
“তোর যখন জন্ম হয় তখন ভাইয়া খুব খুশি ছিলেন।
তোর মাকে আর তোকে উনার অফিসে নিয়ে যান।সেখানে সবাইকে দেখিয়ে বেড়ান, তার একটা মেয়ে হয়েছে।তোর আম্মু তখন অসুস্থ।চেহারা ভেঙ্গে গেছে,চোখের নিচে কালি।বাচ্চা হওয়ার পর প্রায় সব মেয়েই ভেঙ্গে পড়ে একটু।পরে আবার ঠিক হয়ে যায়।এটার সুযোগ নেয় তোর বাবার অফিসের এক মহিলা কলিগ।
তোর যখন ৯মাস বয়স তখন ভাইয়ার অফিসের এক লোক ফোন দিয়ে বলে,তোর বাবা আর ওই মহিলা লিভ টুগেদার করছে।একসাথে থাকে তারা,তবে বিয়ে করেনি।সরকারি চাকরি তো।বিয়ে খবর জানাজানি হলে সমস্যা হবে।তাই তারা বিয়ে করেনি।তখন আমরা বুঝতে পারি,তোর বাবা তো এখন প্রায় বাড়িতে আসেই না।আমরা এতোদিন খেয়ালই করিনি।তোর আম্মুকে তোর বাবা ছাড়তে পারেনি শুধু মাত্র তোর দাদুর জন্য।এই একটা মানুষকে তোর বাবা খুব মানে।তোর আম্মু আজ পর্যন্ত জিজ্ঞেসও করেনি যে,কেন এই কাজটা করলো!তোর মাকে কখনো কষ্ট দিস না।তোর বাবা টাকা দিচ্ছে, মনে রাখিস টাকা ই সব না।তোর বাবাকে সম্মান করবি।কারণ দিনশেষে তোদের কাছেই আসবে তোর বাবা।”
এসব শুনার পর আম্মুর মতো অসহায় আর কাউকে ভাবতে পারিনি।সেদিনই টিউশনি ধরলাম।আর বাবাকে বলে দিলাম, “বাবা,তোমার টাকার কোনো দরকার নাই।তুমি তোমার চিন্তা করো।ভালো থাকো।আমাদের আর খোঁজ নিতে হবেনা।আমরা আমাদের মতো থাকবো।” বাবা কিছু বলার আগেই ফোন কেটে সিম খুলে ভেঙ্গে ফেললাম।দাদু বললেন, “মৌরির কাজটা তুই করে দিলি।মৌরির মতো মেয়েকে যে কষ্ট দিতে পারে সে আর যাই হোক,মানুষ না!” আমি জানিনা মাকে সুখে রাখতে পারবো কিনা,তবে কখনোই আমার জন্য মাকে কষ্ট পেতে দিবো না।
গল্পের বিষয়:
গল্প
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত