মায়ার বাধঁন

মায়ার বাধঁন
বিয়ের এক সপ্তাহ পর্যন্ত ভালো মত কথাই বলেনি নুসরাত। এত লাজুক মেয়েটা! এক সপ্তাহ পর কি এক কারনে বলেছিল, আজ অফিস থেকে একটু তাড়াতাড়ি আসবেন? সেদিন অফিসে এতটুকু কাজ করতে পারিনি। নুসরাত খুব নরম মনের একটা মেয়ে। খুব কম কথা বলতো। “চা খাবেন বা কিছু লাগবে” এ টাইপ কথা খুব কম বলে। অনেকটা হুট করে আসে, আশপাশ দেখে, তারপর বলে- চা দিচ্ছি। উত্তরের অপেক্ষা করে না, হনহন করে চলে যায়। একটু কথা বলা হয় না।
মেয়েটা খুব লাজুক। রাতে ঘুমানোর সময় তার সে কি যুদ্ধ! এতটুকু ছোঁয়া সে লাগতে দিবে না নিজের গায়ে। কোন এক রাতে ঘুমের ঘোরে ওর পিঠে হাত রেখেছিলাম। মাঝরাতে ওর কান্নায় ঘুম ভেঙে যায়। আমি চোখ কচলাতে কচলাতে জিজ্ঞেস করি, কি হলো? ও বলে, “আপনি আমার পিঠে সারারাত হাত রেখেছেন” বলে আমার দিকে তাকিয়ে আবার কান্না। সে রাতে খুব খারাপ লেগেছিলো, রাগের চোটে ঘরের বাইরে গিয়ে সোফায় ঘুমিয়ে ছিলাম। অথচ সকালে উঠে উল্টো আমিই বললাম, সরি এমন আর হবে না। কত বড় ডাহা মিথ্যে বলেছি সেদিন! বিয়ের দুই বছর হল, মেয়ের লজ্জা কমে না। এর মধ্যে ভুলিয়ে ভালিয়ে ওকে যে ছুঁই নি তা নয়। কিন্তু পরক্ষনেই কান্নাকাটি। কি করলেন এটা? তখন আর বলতাম না সরি। উল্টো হাসতাম। আমার হাসি দেখে আরও কান্না করতো। পরে পাশে এসে গুটিশুটি মেরে ঘুমাতো। আমি ওকে আলতো করে জড়িয়ে ধরে রাখতাম। লাজুক মেয়েটা লজ্জায় লাল হয়ে ঘুমাতো। সারা রাতে সেই লাল আভা যেত না। কি মায়াবী একটা দৃশ্য ছিল!
এক রাতে দেখি কান্নাকাটি করে বালিশ ভিজিয়ে একাকার। আমি সরল মনে লাইট জ্বালিয়ে জিজ্ঞেস করি, কি হল? ভেবেছিলাম বলবে, আমার পেটে পা তুলে দিয়ে ঘুমুচ্ছিলেন। তা না বলে বললো, মাথাটা খুব ব্যাথা করছে। মাথা চেপে ধরে বিছানায় এদিক ওদিক করছে ও। আমার ভেতরটা মুচড়ে গেল। সারা রাত আমার বুকে মাথা রেখে শুয়ে ছিল। আমি মাথা টিপে দিয়েছিলাম। ও ঘুমালো। চেহারায় লালচে আভা সেদিন আর পেলাম না। না আর কোনদিনও পাইনি। ডাক্তারের এতগুলো মেডিসিন খেয়ে খেয়ে মুটিয়ে গেল নুসরাত। চলতে ফিরতে পারতো না খুব একটা। তারপর ন্যাড়া মাথায় ঘরের এক কোণে বসে থাকতো। আগের মত কাঁদে না। এখন ওর কান্নার রোগ আমাকে ধরেছে। আমি কাঁদি। ও ঘুমালে হাত টা মেলে রাখে, আমি ওর হাতে আমার হাত গুজে দেই। ও মাঝে মাঝে তন্দ্রা ভাব নিয়ে আমার দিকে একবার তাকায়। তারপর হাসে আবার ঘুমায়। আমি তখন কাঁদি। বালিশ ভিজিয়ে কাঁদি। একদিন কি মনে করে ও আমাকে বললো,
:- আমি তো মরে যাবো। আমি মরে গেলে তুমি কি আবার বিয়ে করবে?
:- হ্যা।
:- কি?
:- আরে মজা করলাম।
:- ঠিক আছে। মরে গেলে বিয়ে করে নিও। কিন্তু মুখের উপর এভাবে হ্যা বলে দিবে ভাবতে পারিনি।
মেয়েটা ভয়ানক আবেগে মাঝে মাঝে আমাকে জড়িয়ে ধরে। সেই নুসরাত, যে কিনা রাতে পিঠে হাত রাখার জন্য কান্না করতো। ও এখন আমাকে জড়িয়ে ধরে চোখ বুজে থাকে। আমার হাত নিয়ে ওর পিঠে দেয়। ওর আচরণ দেখে আমি কান্না করা করি খুব। জানি, সময় নেই আর খুব একটা। একদিন সত্যি সত্যি লজ্জাবতীটা আমায় ছেড়ে চলে গেল। খুব একা হয়ে গেলাম। কেমন যেন বাউন্ডুলে হয়ে গেল সব। কিছুই ভালো লাগতো না।
তারপর তারপর কেটে যায় অনেক দিন। পরিবারের সবাই চায় বিয়ে করি। কিন্তু নুসরাতের জায়গায় কাউকে বসাতে মন সায় দিচ্ছিল না। সবার জোরাজোরিতে এক পর্যায়ে রাজি হয়।
তবে রাজি হওয়ার মূল কারণ হচ্ছে, মেয়ের নাম ও নাকি নুসরাত। তবে এ মেয়ে খুব লাজুক না হলেও মাঝে মাঝে লজ্জা কাকে বলে, কত প্রকার ও কি কি তা দেখিয়ে দেয়। খুব মজা করতে জানে। খুব খেয়াল নেয়। ওর ও একটা অভ্যাস আছে নুসরাতের মত, হাত মেলে ঘুমানো। ওই মেলে রাখা হাত আমি গুটিয়ে দেয়। মেলে রাখা হাত দেখলে আমার নুসরাতের কথা মনে পড়ে। কারণ আমি যে আর কাঁদতে চায় না। মাঝে মাঝে ওকে কানে কানে ফিসফিস করে বলি, মাথা ব্যাথা করছে? মাথাটা টিপে দেই? ও শুধু অদ্ভুত ভাবে তাকাই, আর আমি বুকে জড়িয়ে নেয়।
গল্পের বিষয়:
গল্প
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত