চলো পাল্টাই

চলো পাল্টাই
আমাকে সেলসম্যান ভেবে মেয়েটি বললো,
– ঐ যে উপরের জুতোগুলো নামিয়ে দেখান তো! আশেপাশে সেলসম্যানদের কাউকে দেখতে না পেয়ে জুতোগুলো নামালাম আমি। মেয়েটি তার একটি পা বাড়িয়ে দিলো সামনের দিকে। বললো,
– দেখুন তো ভালোভাবে হয় কিনা।
আমিও আর কিছু বললাম না। বসে মেয়েটিকে জুতো পরিয়ে দিতে যাব এমন সময় পেছন থেকে কে যেন বলে উঠলো,
– কিরে স্নেহা, থাপ্পড় খাবি!
হ্যাঁ, যে মেয়েটির পায়ে জুতো পরিয়ে দিতে যাচ্ছিলাম তার নামই স্নেহা। স্নেহা এবার তার পা সরিয়ে নিলো।
বললো,
– কিরে তানহা, তুই এখানে কোত্থেকে এলি?
বুজতে পারলাম, যে মেয়েটি থাপ্পড়ের কথা বলেছে তার নাম তানহা। আমার বরাবরের অভ্যেস হলো মেয়েদের পায়ের দিকে তাকানো। এখানেও তাই করলাম। বসে থেকেই পেছনের দিক থেকে সামনে আসতে থাকা মেয়েটির পায়ের দিকে তাকালাম। পায়ের নখ বড় নাকি ছোট সেটা বুঝার কোন ক্ষমতা নেই। স্কিন কালারের মোজা পরে আছে। পরের দৃষ্টিটা সরাসরি চেহারার দিকে। নাহ, চোঁখ ছাড়া আর কিছুই দেখার সাধ্য নেই। এরপর আবার চোঁখগুলো চেয়ে আছে স্নেহা নামের মেয়েটির দিকে। আমার চোঁখে চোঁখ পড়লে তবেই না দেখে নিতাম তার চোঁখে জাদু আছে নাকি নেই! এসব ভাবছি এমনসময় তানহা বললো,
– তোকে না কতদিন বলেছি, দোকানে এসে এসব করবিনা। নিজের হাতে জুতো পায়ে দিবি। মনে থাকেনা নাকি?
স্নেহা বললো,
– আমি তো আর তোর মতো মাদার তেরেসা নই। আমার মনে থাকেনা এসব। এবার তানহা বললো,
– বাসায় চল পরে কি করে মনে রাখানো যায় সেটা দেখছি আমি। এবার বল জুতো পছন্দ হয়েছে কিনা। স্নেহা,
– হয়েছে, তবে পায়ে দিয়ে দেখতে হবে ঠিকঠাক হয় কিনা। স্নেহার কথা শুনে এবার আমার হাত থেকে জুতোজোড়া হাতে নিয়ে তানহা বললো,
– আয় তোকে জুতো পরিয়ে দিচ্ছি। এমন সময় সেলসম্যান আসলো। সে আমার জন্য বিয়াল্লিশ সাইজের জুতো আনতে স্টোর রুমে গিয়েছিল। আমার সামনে জুতোজোড়া রেখে বললো,
– এই নিন স্যার, এই এক জোড়াই ছিল স্টকে। ভাগ্য ভালো আপনার। আমি ওর দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললাম,
– আপনার কাস্টমাররা এসে দাঁড়িয়ে আছেন, এত দেরি করলে চলবে? এবার সেলসম্যান ছেলেটি হেসে দিয়ে বললো,
– ওকে স্যার, দেখছি আমি। আপনি বিল কাউন্টারে পেমেন্ট করে দিন। আজকাল শহরের শপগুলোতে গেলে সেলসম্যানরা নর্মালি স্যার স্যার বলেই সম্বোধন করে থাকে। শুধু আমাকেই না, সবাইকেই করে। তবে এক্ষেত্রে মাঝেমধ্যে হয় কি, যে কিনা বাইরে অতি সাধারণ কেউ শপে গিয়ে সেও সেলসম্যানদের মুখে স্যার স্যার শুনে ক্ষণিকের জন্যে অন্যরকমের স্যার/মেডাম বনে যান। সেলসম্যানদেরকে মানুষই মনে করেননা। যেভাবে খুশি তাঁদের সাথে আচরণ করেন যা কিনা মোটেও কাম্য নয়। যে ছেলেটি সেলসম্যানের চাকরী করে, খুঁজ নিলে হয়ত জানতে পারবেন সেও একটি ভালো পরিবারের সন্তান। নিজ এলাকায় তাঁরও ভালো সম্মান ও নামডাক আছে।
তো এখানে এসেছে কেন? এসেছে, জীবনের কঠিন বাস্তবতার সাথে লড়াই করতে। এসেছে, হয়ত সে এই চাকরীটা করলে তাঁর বাবার জন্য কিছুটা হলেও সংসারের বোঝা টানতে কষ্টের লাগব হবে। এদের অধিকাংশই পড়াশোনা করে। আট/দশ ঘন্টা ডিউটি করে মাস শেষে যা পায় তার কিছু টাকা শেয়ারে থাকা ফ্ল্যাট/বাসার ভাড়াসহ আনুষাঙ্গিক খরচ মেটায়। কিছু টাকা নিজের পড়াশোনার খরচের জন্য রাখে। আর কিছু টাকা বাড়িতে পাঠায়। এভাবেই চলতে থাকে এদের জীবন। কখনোসখনো আবার জমানো টাকা খরচ করে এখানে-সেখানে তুলনামূলক আরেকটু ভালো চাকরীর আশায় সিভি জমা দেয়। এখানেও অনেক ফর্মালিটি রয়েছে যা কিনা ঠিক রাখতে গিয়ে এদের শরীরের রক্ত পানি করা টাকা দেদারসে ঢালতে হয়। যাইহোক, মেয়েগুলো এবার লজ্জায় পড়ে গেল। ফিসফিস করে স্নেহা বললো,
– সরি ভাইয়া। আমি ভেবেছিলাম আপনিই হয়ত এবার আমি বললাম,
– কোন ব্যপারনা, এমনটি হয়েই থাকে।
বিল পেমেন্ট করে আমি বেরিয়ে আসবো এমন সময় কেউ পেছন থেকে ডাকলো মনে হলো। হ্যা, স্নেহা ডেকেছে। পেছন ফিরে ওকে দেখে দাঁড়িয়ে পড়লাম আমি। কাছে আসলো ও। ওড়নায় নিজের আঙ্গুল বারবার পেঁচিয়ে নিচ্ছিলো ও। আমি বললাম,
– কি ব্যাপার, কিছু বলবেন? স্নেহা,
– আপু কি যেন আপনাকে বলতে চায়। আমি কিছুটা অবাক হলাম। বললাম,
– তো, সে কথাটি কি আপনিই বলবেন নাকি আপনার আপু?
এমন সময় তানহা এগিয়ে আসলো আমার দিকে। আমি নিজের গলাটা একটু ঠিক করে নিলাম। কি না কি বলে বসে কে জানে! এবার তানহা বললো,
– এইযে মিস্টার, আপনিই তো রিয়াদ তাইনা? আমি অবাক হয়ে গেলাম। বললাম,
– হ্যাঁ, আমিই রিয়াদ। কেন? তানহা বললো,
– আপনি ‘তানহা’ নাম দিয়ে শুধু গল্প লিখেন কেন? ফেসবুকে যে প্রায়সই আপনার গল্প পাই তাতে আমার নাম কেন দেন হুমম? আমি একগাল হেসে বললাম,
– আসলে, তানহা বলতে কেউ নেই আমার লাইফে। এটি কাল্পনিক একটি চরিত্র। গল্পে ‘তানহা’ নামের মেয়েটির দ্বারা বিভিন্ন পজেটিভ দিক ফুটিয়ে তুলার চেষ্টা করি এই যা। তবে, আসলেই যে তানহা নামের মেয়েরা এমন সচেতন আর ভালো তার প্রমাণ পেলাম আজ। সবাই যেন আপনার মতো হয়। এমনকি, আপনার মতো ছেলেরাও যেন জুতোর দোকানে গিয়ে সেলসম্যানের দিকে পা বাড়িয়ে না দেয় জুতো পরিয়ে দিতে। ওরা যেটা করে চাকরীর জন্যই করে। তবে আমরা চাইলে ওদেরকে আর সেটা করতে হবেনা। অনুরূপ অন্যান্য ক্ষেত্রেও। আমার কথাগুলো শুনে তানহা মুচকি হাসি দিলো। ওর পুরো মুখটি দেখতে না পেলেও এবার চোঁখে চোঁখ পড়ায় ওর জাদুর চোঁখে পুরো সৌন্দর্যই যেন আমি দেখতে পেলাম। নাহ বাস্তবে নয়, কল্পনায়। তবে, গল্পে দেয়া মেসেজটি যেন আমরা আমাদের বাস্তব জীবনে রূপদান করতে পারি সেই আহ্বানই থাকবে সকলের প্রতি। চলো পাল্টাই!
গল্পের বিষয়:
গল্প
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত