ভ্রম২

ভ্রম২
কামরুজ্জামান সাহেব মনে করার চেষ্টা করলেন। তিনি কমপক্ষে সাতবার রুনাকে ডেকেছেন। বৃদ্ধ বয়সে এই এক সমস্যা। কেউ কথার দাম দিতে চায় না। যেন এক পরগাছা, উড়ে এসে জুড়ে বসেছেন কোথা থেকে। রেগে গিয়েও লাভ নেই, এরা রাগকেও পাত্তা দেবে না। যেন রাগটা তাঁর ব্যাধি, খুব সাধারণ একটা ব্যাপার। এতে মাথা ঘামানোর কিচ্ছু নেই। একটা বিড়াল তাঁর পাশে মিঁউ মিঁউ করছে। কামরুজ্জামান সাহেব বড় বড় চোখে চশমার উপর দিয়ে বিড়ালটার দিকে তাকালেন, যেন কিছু একটা বলতে চাইছে কামরুজ্জামান সাহেবকে। কামরুজ্জামান সাহেব চমকে উঠলেন।
-কামরুজ্জামান সাহেব! আপনার সময় শেষ। আপনি এখন বিড়াল প্রজাতির কাতারে। দ্যাখেন না, আমার কথাকেও কেউ দাম দেয় না। সারাদিন ক্ষুধার জ্বালায় ছটফট করে যখন কাকুতি-মিনতি করে বলি, দয়া করে একটু খেতে দিন জনাব। তখন আপনারা কী করেন? হাতের কাছে যা পান তাই ছুড়ে মারেন এই নিরীহ প্রজাতির দিকে। আপনাদের একটু দয়া হয় না। এখন বুঝেন। কামরুজ্জামান সাহেব ধমক দিয়ে বললেন..
-যা, যা! দূর হ।
বিড়ালটা একই অবস্থায় হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। যেন কোন পরোয়া নেই। যেন একটা বিড়াল আরেকটাকে হুংকার দিচ্ছে এমন। একটু অবজ্ঞার হাসিও লেগে আছে বিড়ালটার চোখে-মুখে। মুখে ভেংচি কাটছে। বেশ চিন্তায় পড়ে গেলেন কামরুজ্জামান সাহেব। ঘটনা কী দাঁড়াচ্ছে তাহলে? তিনি এখন মিঁউ মিঁউ জীবন কাটাবেন? কামরুজ্জামান সাহেবের মনে পড়লো তাঁর বাবার কথা। তাঁর বাবা প্রায়ই বলতেন..
-মা-বাবার জন্য যতটুকু তোমরা করবে, তার পুরো প্রতিদান তোমাদের সন্তানদের কাছ থেকে হিসাব মত পাবে।
কই কামরুজ্জামান সাহেব তো তাঁর বাবাকে যথেষ্ট ভালবাসতেন এবং শ্রদ্ধা করতেন। এমনকি তাঁর বাবা যখন হাটতে-চলতে অক্ষম হয়ে গেলেন তখন কামরুজ্জামান সাহেব তাঁর পিছুপিছু ছায়ার মত থেকেছিলেন। দিন-রাত বাবার পাশে বসে থাকতেন। কখন কি দরকার হয়ে পড়ে। তাঁর খাওয়া-দাওয়া থেকে শুরু করে গোসল এমনকি বাবার মলমূত্রও পরিষ্কার করতে সামান্য দ্বিধাবোধ করতেন না বাবার প্রতি তাঁর অপার শ্রদ্ধা ও ভালবাসার টানে। তারপর বাবা যেদিন তাঁকে ছেড়ে চিরদিনের মত চলে গেলেন সেদিন যেন বুকের মধ্যখানে কোথাও একটি বায়ুশূন্য চিপসে যাওয়া বেলুনের মত ফাঁকা কিছু একটা টের পেলেন। এরপর রাতদিন যেন ব্যথা-বেদনার পিড়াপিড়ি।
-বাবা বলো কেন ডেকেছো। রুনা এসে কামরুজ্জামান সাহেবের পাশে দাঁড়াল।
-কী করছিলি এতক্ষণ? কর্কশ গলায় বললেন।
-দু’দিন পরই তো শ্বশুর বাড়ি চলে যাবি। এখনও বাবা-মায়ের প্রতি টান আসলো না?
-বাবা রেগে যাচ্ছো কেন? আমি ব্যস্ত ছিলাম। আশিক ফোন করেছিলো।
-আশিক ফোন করলেই কথা বলতে হবে?সারাদিন কী এত কথা বলিস ওর সাথে?
কামরুজ্জামান সাহেব আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন। আবার ফোন বেজে উঠলো। রুনা একদৌড়ে চলে গেল ফোন রিসিভ করতে। কামরুজ্জামান সাহেব বিড়বিড় করে বললেন.. -দেখো, জেনারেশনের অবস্থা। যেন আজ পারলে আজই চলে যায় এই ছেলের হাত ধরে। কামরুজ্জামান সাহেব ভেবে পান না দিনরাত এত কী কথা বলে এরা! যতক্ষণ রুনা বাসায় থাকে ফোনটা ওর কানের সাথে লেগেই থাকে। বিয়ের আগে তিনি তাঁর স্ত্রী রাশিদাকে একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন। তখন তো যোগাযোগ ব্যবস্থা এখনকার মত এতো সহজ ছিলো না। যা ঐ চিঠিপত্র পর্যন্তই! দুই-তিন রাত জেগেও চিঠিতে রঙ-রসের কিছু লিখতে পারলেন না। চিঠি অবশ্য তিনি পাঠিয়েছিলেন এবং তাতে লেখা ছিলো ক’টি কথা রাশিদা কেমন আছ? তোমাদের বাসার পাশে কদমগাছটিতে এত ফুল ফুটেছে! ঘ্রাণ পাও না? কদম ফুল আমার খুব পছন্দ। আর কোন লেখা তাঁর কলম দিয়ে বের হল না। রাশিদা তাঁদের বাসর রাত্রিতে কামরুজ্জামান সাহেবকে কঠিন গলায় বললেন..
-কেমন চিঠি পাঠালে তুমি? আমি লজ্জায় মরে যাই। কাউকে মুখ দেখাতে পারি না। কামরুজ্জামান সাহেব অপরাধীর স্বরে বললেন..
-কি করবো? লজ্জায় লিখতে পারি নি কিছু। চিঠি লিখতে বসলেই সব তালগোল পাকিয়ে ফেলি। তখন কেবল তোমাদের বাসার পাশে কদমগাছের কথা মাথায় চলে আসে। এমনকি কদমফুলের ঘ্রাণও পেয়েছি আমি।
-তোমাকে চিঠি লিখতেই কে বললো?
-লিখতে ইচ্ছে করছিলো যে খুব।
সেদিন রাশিদা ভয়ই পেয়ে গিয়েছিলেন কামরুজ্জামান সাহেবের কথা শুনে। এই লোক নিয়ে সংসার করতে হবে? কোন ভুল করলাম না তো! রাশিদা কোন ভুল করেননি। বাকি জীবনে রাশিদার বারবার মনে হয়েছিলো কথাটা। লোকটা একটু সরল প্রকৃতির, এই যা। এই ছিলো কামরুজ্জামান সাহেবদের প্রজন্ম। আর এখনকার প্রজন্ম! কামরুজ্জামান সাহেব ভাবতেই পারেন না, ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাচ্ছে। তাঁর এক শিক্ষক কোন কিছুতে তাঁর মতের বাইরে দেখলেই বলতেন..
-গো-টু-ডগ।
কামরুজ্জামান সাহেবের মনে হচ্ছে ভবিষ্যৎ সেই “গো-টু-ডগের” দিকে যাচ্ছে। রুনার বিয়ের জন্য পাত্র দেখা হলো। বিয়ে ঠিকঠাক। হঠাৎ রুনা বেকে বসলো। ঘটনা কী? জানা গেল কোন ছেলের সাথে নাকি ওর সাত বছরের ভাব-ভালবাসা। কথাটা শুনে কামরুজ্জামান সাহেবের আক্কেলগুড়ুম অবস্থা। তার মানে পিচ্চি কাল থেকে এই ছেলের সাথে ওর ভালবাসাবাসি? ছেলে ভাল। কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার, ভাল সেলারির চাকরি করে। অপছন্দ করার কোন কারণ নেই। শেষ পর্যন্ত ওর সাথেই রুনার বিয়ে ঠিক হল। আজ ওদের বিয়ে। বল্টুটা একাই সব সামলাচ্ছে। এতদিনে বল্টু প্রমাণ করলো ও চাইলে অনেক কিছুই করতে পারে। শুধু এই ইচ্ছেটা ওর নেই। বল্টুর দুইদিনের কর্মকাণ্ডে ছেলের প্রতি কামরুজ্জামান সাহেবের ধারনা পাল্টে গেল। তাহলে কি বল্টু এতদিন বোকার অভিনয় করে থাকতো! কামরুজ্জামান সাহেব মনে মনে স্থির করলেন..
-না, এখন থেকে ওকে ওর আসল নামেই ডাকতে হবে। বল্টুর ভাল নাম আব্দুল্লাহ আল আলীম চৌধুরী। আব্দুল্লাহ ছিলেন নবী করিম হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এর বাবা। আলীম নামের অর্থ জ্ঞানী ব্যক্তি। আরবি শব্দ। বল্টুর জন্মের দু’দিন পর জৈনপুর থেকে একজন পীরসাহেব তাঁদের পাড়ায় ধর্ম প্রচারণায় এসেছিলেন। কামরুজ্জামান সাহেব বল্টুকে নিয়ে গিয়েছিলেন পীরসাহেবের কাছে ফুঁ দিয়ে আনার জন্য। তিনি নাম রেখে দিলেন আব্দুল্লাহ আল আলীম। চৌধুরী তাঁদের বংশের টাইটেল।
জ্ঞানী শব্দের ওয়েট যতটুকু, বল্টু ঠিক তার ইনভার্স। তাই কামরুজ্জামান সাহেব ওকে বল্টু নামেই ডাকেন। আজ হঠাৎ কামরুজ্জামান সাহেবের মনে হল বল্টুর আলীম নামটাই ঠিক ছিল। অবশ্য বল্টু নামের মধ্যে যে পরিমাণ মমতা ও ভালবাসা আছে আলীম নামের মধ্যে তাঁর ঘাটতি অনেক। রুনা ওর বল্টু ভাইয়াকে অন্ধের মত ভালবাসে। বল্টুর নামে কোন দুর্নাম রুনা সহ্য করতে পারে না। মাঝে মাঝে কামরুজ্জামান সাহেব রুনাকে দু’একবার ক্ষেপীয়ে তোলেন। ভাইয়ের প্রতি বোনের এত ভালবাসা দেখে কামরুজ্জামান সাহেবের চোখে পানি এসে যায়। গর্বে বুক ফুলে ওঠে। তখন তাঁর এই ছোট্ট সংসারটাকে স্বর্গ মনে হয়। রুনার বান্ধবী হিমা। ওরা সমবয়সী। সেই ছোটবেলা থেকে ওরা পাশাপাশি এ বাড়ি দুটি মাতিয়ে রেখেছে সারাক্ষণ। কি অদ্ভুত মিল ওদের, একই দিনে দুজনের বিয়ে ঠিক হয়েছে! হিমাদের বাড়িতেও বিয়ের ধুমধাম চলছে। ওদের দুজনের কি দুর্ভাগ্য কেউ কারও বিয়েতে থাকতে পারবে না। সেদিন কামরুজ্জামান সাহেব হিমার বাবাকে গিয়ে বললেন..
-হামিদ ভাই, হিমার বিয়েটা দু’একদিন পিছিয়ে দেন না। ওরা এত ভাল বন্ধু অথচ কেউ কারও বিয়েতে থাকতে পারবে না ব্যাপারটা মানা যায় না। হামিদ হক ভ্রু-কুঁচকে কপালে বিরক্তির রেখা এনে বললেন..
-আপনি পিছিয়ে দেন না একদিন! আজাইরা প্যাঁচাল পাড়তে আসেন।
হামিদ হকের কথা শুনে কিছু শক্ত কথা কামরুজাম্মান সাহেবের মুখে এসে গিয়েছিলো। শেষ পর্যন্ত নিজেকে সামলে নিয়ে ফিরে এলেন । মনে মনে বললেন..
-শালা বদ! দুই নম্বর! সারাটা জীবন অন্যকে নকল করে গেলি।
কামরুজ্জামান সাহেবের মনে পড়তে লাগলো বদ হামিদের কাণ্ডকারখানা। রুনার ছোটবেলায় ওকে একটি নতুন জামা কিনে দিলে দু’দিন পর দেখা যেত একই জামা হিমার গায়ে। হামিদ পুরো শহর ঘুরে একই দোকান বের করে মেয়ের জন্য একই জামা কিনে নিয়ে আসতেন। রুনাকে যে স্কুলে ভর্তি করানো হল, দু’দিন পর একই স্কুলে হিমা। কামরুজ্জামান সাহেবের বাড়ির ডিজাইন কপি করে বাড়ি বানালেন হামিদ হক। শেষ পর্যন্ত মেয়ের বিয়ের দিনটাকেও কপি করলো এই বদ! ভাগ্য ভাল জামাইটা কপি করা গেল না। বল্টু এসে কামরুজ্জামান সাহেবের পেছনে দাঁড়ালো। ঘাড় ফিরিয়ে পেছনে তাকিয়ে বল্টুকে দেখে তিনি বিরক্ত হয়ে বললেন..
-তোকে কে ডাকলো? রুনাটা কই? সেই কখন থেকে বসে আছি। আমাকে বসিয়ে রেখে ফোনে কথা বলছে। একটু দেখে আয় তো কী করছে এতক্ষণ! জোরে একটা চর বসাবি গালে। পারবি তো? বল্টু নরম গলায় বলল..
-বাবা ফোনে আমি কথা বলছিলাম।
-রুনা কই?
-রুনা কই তা তুমি ভাল করেই যানো। ও গত আট বছর আগে টাইফয়েডে মারা গিয়েছিল। কামরুজ্জামান সাহেব এবার অসহায় দৃষ্টিতে বল্টুর দিকে তাকিয়ে অনিশ্চয়তার ভঙ্গিতে থেমে থেমে বললেন..
-তাহলে আজ যে রুনার বিয়ে!
-কোথায় তুমি বিয়ে দেখলে?
-বিয়ে না হলে বাড়িতে এতো হইচই কিসের?
-হইচই আমাদের বাড়িতে হচ্ছে না। আজ হিমার বিয়ে। ওদের বাড়িতে লোকজনের চেঁচামেচির শব্দ পাচ্ছ তুমি।
কামরুজ্জামান সাহেবের প্রচণ্ড মাথা ব্যথা করছে। চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে।
-বল্টু আমাকে ধরে একটু খাটের কাছে নিয়ে চলতো। বল্টু আর কোন কথা বললো না। কামরুজ্জামান সাহেবকে ধরে নিয়ে খাটের উপর শুইয়ে দিলো।
-তুই কার সাথে কথা বলছিলি?
-আশিকের সাথে।
-কোন আশিক?
-বাবা তুমি ক’জন আশিককে চেনো? আমার বন্ধু আশিক।
কামরুজ্জামান সাহেবের চোখে ঘুম চলে এলো। তিনি চোখ দুটো বন্ধ করলেন। বিড়ালটা আবার মিঁউ মিঁউ করে ডাকছে। কামরুজ্জামান সাহেব বিড়ালের ডাক শুনতে শুনতে গভীর ঘুমে তলিয়ে যাচ্ছেন। আর কানে প্রতিধ্বনি হচ্ছে..
-কামরুজ্জামান সাহেব! আপনার সময় শেষ। আপনি এখন বিড়াল প্রজাতির কাতারে। কামরুজ্জামান সাহেব তাহলে কি এতক্ষণ ভ্রমে ছিলেন। তাহলে তিনি এখনও স্পষ্ট বিড়ালের কথা কিভাবে শুনতে পারছেন?
গল্পের বিষয়:
গল্প
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত