স্বপ্ন

স্বপ্ন
– এই মেয়ের কোন সমস্যা আছে?
– নেই।
– দেখতে অসুন্দর?
– না।
– তাইলে বিয়ে করতে অসুবিধা কোথায়?’
– আমি এখন বিয়ে করতে পারবো না আম্মা।
আম্মা রাগে ফুঁসছে। ফর্সা মুখটা লাল হয়ে গেছে রাগে। অদ্ভুত কোন কারণেই আম্মা যখন খুব রেগে যান তখন খুব কাঁদতে থাকেন। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদেন। আমার কান্না ভালো লাগেনা। আর আম্মার কান্না সে তো কখনোই না। ছয় বছর বিভুঁইয়ে জীবন কাটিয়ে বাংলাদেশে পা রেখেছি আজ দশদিন। বিগত আটদিন কেটেছে স্বপ্নের মতো। নানার বাড়িতে আজ দু’দিন । গতকাল বড় আপা ফোন করে খুব কেঁদেছে।
– তুই ও রেগে আছিস আমার উপর?
– না আপা।
– আসলি না কেন তাহলে আমার এখানে?
– আসবো আপা।
– আগে কি আমার এখানে আসা যেতোনা?
– যেতো আপা।
– আসলি না কেন?
– নানির শরীর একটু বেশি খারাপ তাই।
– ও আমি কিছুই জানিনা!
বুঝছি বিয়ে দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেছিস তোরা। এখন আমি তো কেউ না। আপাকে বোঝাতে গিয়েও ব্যর্থ হলাম। কথা শেষ না করেই আপা কাঁদতে কাঁদতে ফোন রেখে দিলো। আপার ধারণা আমি আসার পর ও আসতে পারেনি বলে আমরা রেগে আছি ওর উপর। গতরাতে যখন খাবার টেবিলে আম্মা জানালেন আমার বিয়ে। মেয়ে পছন্দ করেই রাখছেন। আমার দুঃসম্পর্কের খালাতো বোন নিতু। তখন থেকে বলছি। এখন বিয়ে করবোনা আম্মা বিয়ের একটা প্রস্তুতি থাকা লাগে। যতবার বলি আম্মা ততবার নানান প্রশ্ন করতে থাকেন। সেসব প্রশ্ন ঘুরেফিরে একই রকম হয়।
– বিয়ের জন্য আলাদা কিসের প্রস্তুতি?
– থাকে আম্মা।
– তুই বিয়ে করতে পারবি না নাকি নিতুকে বিয়ে করবি না?
– আম্মা বিয়ে করতে পারবো না। তাছাড়া নিতু ছোট বোনের মতো।
– মানুষ কি কাজিন কে বিয়ে করে না?
– করে
– ধর্মের কোথাও লেখা আছে কাজিন বিয়ে করা যাবে না?
– না
– শোন নিতুর সাথেই তোর বিয়ে হবে। এবং তা খুব দ্রত।
শেষ কথাটুকু আম্মা বেশ উত্তেজিত কণ্ঠেই বললেন। তারপর মাথা ঘুরে পড়ে গেলেন। ধরাধরি করে বারান্দায় শুইয়ে দিলাম। আম্মার মাথায় পানি ঢালছে নিতু। বিদ্যুৎ চলে গেছে। বারান্দায় একটা চার্জার লাইট রাখা হয়েছে। নিবুনিবু করে জ্বলছে। সম্ভবত দিনে চার্জ করেনি কেউ। আকাশে পূর্ণিমা চাঁদ। খোলা উঠোন চাঁদের আলোয় আলোকিত। প্রথমবার নিতুকে দেখলাম ভালো করে। চাঁদের আলো মুখের উপরে পরে সুন্দর চেহারা ভয়ংকর সুন্দর করে তুলেছে। চোখ সরিয়ে নিলাম যেন কিছুক্ষণ দেখলেই প্রেমে পরে যাবো।
হুমায়ুন আহমেদ স্যারের বইতে পড়েছিলাম “মেয়েরা লতানো লাউগাছের চারার মতো, এই দেখা যাচ্ছে ছোট্ট একরত্তি এক চারা কয়েকটা দিন অন্যমনস্ক থাকার পর চোখে পড়লেই দেখা যাবে নিজেকে সে ছাড়িয়ে দিয়েছে চারপাশে, সতেজ বলবান এক জীবন”। বছর ছ’য়েক আগেও নিতু ছিলো বাচ্চা একটা মেয়ে। আর এখন পরিপূর্ণা নারী। আম্মার জোড়াজুড়িতে রাতেই বিয়ে হলো ঘরোয়া আয়োজনে। রাজি না হয়ে উপায় ছিলোনা। আম্মার সুস্থ্যতা জরুরি। আম্মার মাথায় পানি ঢালছিলো যখন নিতু। তখনই মেয়েটা মনে দাগ কেটে নিয়েছে। এই অল্প সময়ে অল্প কিছুই কেনাকাটা করা সম্ভব হয়েছিলো। আপা হুট করে বিয়েতে আসতে পারেনি। আম্মাও দেরি করতে রাজি না। আম্মার ধারণা আমি মত পাল্টে ফেলতে পারি সকালেই। আপার জন্য অপেক্ষা করতে বলছিলাম। আম্মা বললো আগে বিয়েটা হোক তারপর আসবে ও। রাত এগারোটায় আপা ফোন করলো।
– এমনটা করতে পারলি?
– কি করলাম আপা?
– কি করিস নি? এইভাবে হুট করে বিয়ে করার মানে কি?
– আম্মারে জিজ্ঞাস কর।
– একটা মাত্র ভাই। আমার কি স্বপ্ন ছিলোনা তোর বিয়ে নিয়ে?
– ছিলো আপা।
– একদিন দেরি করলে কি ক্ষতি হতো?
– কিছুই হতো না আপা।
– তোরা এইভাবে পর করে দিতে পারলি?
– কি বলো এসব?
– তোর দুলাভাই একা ব্যবসা সামলায়। হুট করে সময় বের করতে পারেনা।
– জানি আপা।
– কাল আমি একাই আসছি মিলি’কে নিয়ে।
মামার বিয়ে হচ্ছে ও আনন্দ করতে পারছে না। কাঁদতে কাঁদতে চোখ ফুলিয়ে ফেলছে। গোল্লায় যাক ওর ব্যবসা। সকালের ট্রেনেই আসছি তোর দুলাভাইকে বলেছি। ও টিকিট আনবে আসতে পথে।
– আচ্ছা আপা  বাসর ঘরে মুখোমুখি বসে আছি। এটা ঠিক বাসর ঘর না। ফুল দিয়ে সজ্জিত থাকে ফুলসজ্জা। এই ঘরের চারকোনাতেও একটা ফুল পাওয়া যাবে না। নতুন বিছানার চাদর আর বালিশ দেওয়া হয়েছে দুইটা। কেউ কোন কথা বলিনি এখনো। ভাবলাম জিজ্ঞেস করা উচিত কেমন আছে। বললাম
– নিতু কেমন আছিস?
– আমার সাথে তুই তুকারি করবেন না। ভালো লাগে না। তুমি করে বলবেন বুঝতে পারছেন?
– হু
– আমি ভালো আছি। অনেক বেশিই ভালো আছি।
খুব অস্বস্তি বোধ করছিলাম কথা বাড়াতে। কিছুটা সংকোচ ও। নিতু বুঝতে পেরেই কি না নিজে থেকে কথা বলা শুরু করলো। খুব আগ্রহ নিয়ে কথা বলছে নিতু। লক্ষ্য করলাম নিতুর উপর আমার মায়া পড়ে যাচ্ছে। তার কথা শুনতে ভালো লাগছে। তাকে দেখতে ভালো লাগছে। তার চোখ দুটো ভয়ংকর রকমের সুন্দর।
চোখের সৌন্দর্য বাড়াতে কাজল দরকার হবে না। খুব অল্প সময়ে নিতুর প্রতি মায়া জন্মে গেলো। মায়া ভালোবাসার মতোই হুট করে জন্ম নেয়। কারো প্রতি মায়া না জন্মালে তাকে ভালোবাসা যায় না। আমি ভালোবাসতে শুরু করেছি নিতুকে। সেই পিচ্চি নিতু। যে সামনে এসে ভেংচি কেটে দৌড়ে পালাতো। ভোরের আলো জানালা দিয়ে মুখে এসে পড়েছে। বললাম জানালার পর্দা টেনে দাও তো নিতু আরেকটু ঘুমাবো।চেনা পুরুষ কণ্ঠের আওয়াজ কানে এলো। ‘নিতুরে পাইলেন কোথায়? নিতু কে?’ চোখ খুলে দেখলাম ইব্রাহিম ভাই। আমার চোখ খুলতে দেখেই বললেন। ‘ সজীব ভাই পেঁয়াজ মরিচ কেটে রেখেছি ৷ উঠে রান্নাটা করে ফেলেন। আমি অফিস যাচ্ছি’।
গল্পের বিষয়:
গল্প
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত