মা

মা
আমি যে স্কুলে পড়তাম সেই স্কুলে আমার মা আয়া হিসেবে কাজ করতো। মায়ের প্রধান কাজ ছিলো স্কুলের বাচ্চাদের দেখাশোনা করা। সেই সুবাধে আমি ফ্রিতে সেই স্কুলে পড়তাম। মিরপুরের নামী দামী স্কুলের ছাত্র হয়েও অন্য সব ছাত্রদের মত চলাফেরা করতে পারতাম না। যখন ক্লাস থ্রি তে পড়ি তখনি বুঝে গিয়েছিলাম অভাব কি।
যার কারনে টিফিনের সময় স্কুল নলের কাচা পানি খেয়ে নিজেকে টিফিন খেয়েছি বলে শান্তনা দিতাম। এভাবেই চলছিলো আমার স্কুল লাইফ। কিন্তু অন্যসব ছাত্রদের, যখন, বার্গার, নুডুলস সহ অন্যান্য নামী দামী খাবার খেতে দেখতাম তখন খেতে ইচ্ছে করলেও উপায় ছিলো না। তাই সবার থেকে লুকিয়ে বেড়াতাম। নতুন বছরের আগেই আমাদের ফাইনাল পরীক্ষা চলে আসলো। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারলে চতুর্থ শ্রেনীতে উঠবো। খুব মন দিয়েই পড়ালেখা করতাম। সবার থেকে ভালো মার্ক আসলেও, রোল নং দশ এর উপরেই থাকতো। আমাদের ক্লাসের স্যার ম্যাডামের ছেলে মেয়েরা পড়তো। যাদের নির্দিষ্ট রোল করা ছিলো এক থেকে দশ এর মধ্যে। তখনি আমি শিখেছিলাম অনিয়ম কাকে বলে, ভ্রষ্টাচার কাকে বলে। ডিসেম্বর মাসেই পরীক্ষা শুরু হলো।
পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করে তের নম্বর স্থানে আসলাম। নতুন বছর চলে আসলো, নতুন নাম নিয়ে, নতুন স্বপ্ন, নতুন সময় নিয়ে। ইতিমধ্যে আমাদের স্কুলে ভর্তি কার্যক্রম শুরু হয়ে গেছে। জানুয়ারীর মধ্য তারিখ থেকে ক্লাস শুরু হলো। সেদিন আলোচনা এবং পরিচিতি বিষয়ক ক্লাস ছিলো। আমি শেষের ব্যাঞ্চটি গুপটি মেরে বসে আছি। অনেক নতুন পুরাতন ছাত্র ছাত্রীদের আগমন হলো। হঠাৎ একটি মেয়ে আমার পাশে এসে বসলো। তার বসার গতি এতই জোরালো ছিলো যে আমি ব্যাঞ্চের অপর প্রান্ত দিয়ে পরে যাচ্ছিলাম। মেজাজ টা খুব বিগড়ে গেলো। কিন্তু তার দাত ফোকানো হাসি দেখে কিছু বলতে পারলাম না। সামনের কয়েকটি দুধদাঁত পরে গিয়েছে দাতের ফাকা দিয়ে ভিতরের জিভ দেখা যাচ্ছিলো। আর যাই হোক তার হাসিটা আমার খুব ভালো লেগেছিলো বলে কিছু না বলে চুপচাপ বসে ছিলাম। এরই মধ্যে সে বলে উঠলো।
০- তুমি তো অনেক স্ট্রোং ছেলে। পরতে গিয়েও বার বার বেচে গেলে।
— আমি পড়লে বুঝি তোমার ভালো লাগতো?
০- তা না, কিন্তু অনেক দিন হলো মানুষ আছাড় কিভাবে খায় দেখিনা। আজকেও মিস হয়ে গেলো।
— কিভাবে খায় তা দেখতে চাও, খেলে কেমন লাগে তা দেখবে না?
০- সেটাও তো দেখতে চাই। কিন্তু কিভাবে
— সমস্যা নেই আমি আছিনা আমি দেখাবো।
০- আচ্ছা দেখাও
তার অনুমতি পাবার সাথে সাথে এক ধাক্কা দিয়ে ব্যাঞ্চ থেকে ফেলে দিলাম। সে কেদে উঠেই আমাকে এলো পাথারি খামচি আর ঘুসি দিতে লাগলো “এই তুমি মারতেছো কেন? তুমি তো বললে আছাড় খেলে কেমন লাগে দেখতে চাও? তাইতো আমি দেখালাম।
-০ ও হ্যা তাইতো। আমিই তো দেখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আছাড় খেলে তো অনেক ব্যাথা হয়।
— এই জন্যই তো আমি আছাড় খেতে চাইনা।
০- হুম, আচ্ছা স্যরি। আজ থেকে আমরা বন্ধু কেউ কাউকে আছাড় দিবো না।
কথাটি বলে সে ফোকলা দাত গুলো বের করে আবার হেসে দিলো। আমিও তার সাথে হেসে দিলাম। ততক্ষনে পুরো ক্লাসের ছেলে মেয়েদের নজর আমাদের উপর। তারাও আমাদের সাথে খিলখিলিয়ে হেসে দিলো। মনে মনে বলতে লাগলাম, মেয়েটি কত বোকা। কথাটি ভাবতেই আমার হাসি দ্বিগুন হয়ে গেলো।
কয়েকদিন পর বাবা রোড এক্সিডেন্ট এ মারা গেলে। পরিবারের অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে গেলো। আমাদের তিন বোন, মা আমি সহ পরিবার চালাতে খুবই কষ্টকর হয়ে উঠলো। নিজেদের আহার গোছাতে দুই বোন গার্মেন্টস এ ঢুকে গেলো। সিদ্ধান্ত হলো, আমি আর আমার ছোটবোন পড়ালেখা করবো। আর মা, বড় আপু, মেজ আপু সংসার চালাবে। ক্লাসে বসে আছি, দাতফোকলা মেয়ে সুমাইয়াকে খুজতেছি সে এখনো আসেনি। কিছুক্ষন পর অপেক্ষা কাটিয়ে সে আসলো। এসেই পিঠে এক থাপ্পড় দিয়ে, “কি করিস?” জিজ্ঞেস করলো। আমিও নাছড় বান্দা তার চুল টেনে দিয়ে বললাম, “তোর চুল টানি” সে হেসে দিয়ে তুই কি উদাহরণ না দিয়ে কথা বলতে পারিস না?
০- তুই কি আমাকে না মেরে জিজ্ঞেস করতে পারিস না।
— তোর সাথে পারুম না। আচ্ছা অংক পারোস।
০- হু পারি।
— আমাকে দেখাবি?
০- দেখালে কি দিবি আমাকে?
— আমার টিফিন দিবো।
০- আচ্ছা দেখাবো।
এর পর থেকে আমাদের বন্ধুত্ব অন্য এক মোড় নিলো। আমি তাকে অংক কষে দিতাম। সে তার টিফিনের অংশ আমাকে দিতো। এখন আমার টিফিন খাওয়া নিয়ে কোন সমস্যা ছিলো না। খুনসুটি, টিফিন ভাগাভাগি, অংক কষাকষি, আর মারা মারি নিয়ে আমাদের বন্ধুত্ব সবার নজর কাটলো। সুমাইয়ার সাথে থাকাকালীন আমি আমার নিজের কথাই ভুলে যেতাম।
ঘরের অভাব, বাবা না থাকার কষ্ট সবকিছু চুটকি তে ভুলে যেতাম। এভাবেই চলতে থাকে আমাদের প্রাইমারী স্কুল জীবন। আমি যখন হাই স্কুলে উঠলাম। তখন বড় আপু তারই সাথে গার্মেন্টস এ কাজ করে একটি ছেলেকে বিয়ে করে, আর মেজো আপু কাজ করে। আমাদের আয়ের সংখ্যা একজন কমে গেলো। এবার হাইস্কুলে আমার পড়ালেখার খরচ চালানো কষ্টকর হয়ে গেলো। আমার ছোটবোন পড়ালেখা ছেড়ে দিয়ে গার্মেন্টস এ ঢুকলো। আমার জীবনে অন্য রকম মোড় আসলো। এটাই সবচেয়ে কঠিন এবং ভয়ংকর ছিলো। আমরা যেখানে থাকতাম সেখান থেকে তিন কিলোমিটার দূরে স্কুলে হেটেই যেতাম। কিন্তু সেখানে গিয়ে আর সুমাইয়া কে পেলাম না। বন্ধুহীন হয়ে গেলাম। ময়লা জামা কাপড় আর অগোছালো মাথার চুল দেখে কেউ বন্ধুত্ব করতে আসতো না। একজন বন্ধু পাবার জন্য হাহাকার করতে লাগলাম। চাতকের মত কোন পলক না ফেলে অবিরাম এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতাম বন্ধুপথের দিকে। কেউ নেই, বন্ধুও নেই।
একদিন বাসায় এসে দেখি মা বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করে যাচ্ছে। স্পষ্ট মায়ের চোখে জল দেখতে পেলাম। আমাকে দেখে মা স্বাভাবিক হবার নাটক করলেও ধরা পরে যায়। তারপরেও মা বিছানা থেকে উঠে, “বাবা তুই আসছিস? হাত মুখ ধুয়ে নে, আমি ভাত আনতেছি” কথাটি বলে পেট চেপে ধরে উঠে গেলেন। আমি ঠিক বুঝতে পেরেছিলাম, মায়ের পেটে প্রচন্ড ব্যাথা কিন্তু মা তো মায়েই। শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত তার কর্তব্য রক্ষা করবে। আর সন্তানের মংগলের জন্য নিজের প্রানটাও সপে দিবে হাসি মুখে। এমন জননী মা ছাড়া এ পৃথিবীতে আর কেউ হয়না। মা ভাত নিয়ে সামনে বসলেন। আমি শুধু মায়ের দিকে তাকিয়ে রয়েছি, তার এমন মমতা দেখে। আমাকে ভাত দিয়ে আবার বিছানায় শুয়ে পড়লেন। আমি ভাতের থালা ঠেলে দিয়ে মায়ের কপালে হাত দিয়ে, “মা তোমার কি হয়েছে? “
০- কিছুনা বাবা একটু গ্যাস্ট্রিক এর ব্যাথা শুরু হইছে।
আমি আর কিছু বললাম না। বাসা থেকে বের হয়ে বড় আপুর বাসায় চলে গেলাম। গিয়ে আপুকে কথা গুলো জানালাম। বড় আপু মেজ আপুর গার্মেন্টস এ গিয়ে তাকে নিয়ে বাসায় আসলো। সবাই মিলে মা কে সরকারী হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। সেখান থেকে কিছু টেস্ট করানোর জন্য বলা হলো। আপু নিজে থেকে সমস্ত টেস্ট করিয়ে পরের দিনের অপেক্ষা করলাম রিপোর্ট আসার।
পরেরদিন স্কুলে না গিয়ে মায়ের রিপোর্ট আনতে গেলাম। রিপোর্টে যা পেলাম তার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। মায়ের পেটে পাথর হয়েছে। যত দ্রুত সম্ভব অপারেশন করাতে হবে। আপু আর আমি ডাক্তারের সাথে কথা বলে জানতে পারলাম। অপারেশন করাতে প্রায় পঞ্চাশ হাজার টাকার মত লাগবে। যেখানে আমাদের পঞ্চাশ টাকা যোগার করতে একদিন চলে যায়, সেখানে কয়েকদিনের মধ্যে এত টাকা যোগাড় করা এক প্রকার অসম্ভব। সবাই টাকার খোজে লেগে গেলাম। যে করেই হোক আগামী মাসের মধ্যে মায়ের অপারেশন করাতে হবে। বাবা হারিয়ে বুঝেছি, কত কষ্ট আর এই মমতাময়ী মা হারালে জীবনটাই নরক হয়ে যাবে। এখন মায়ের ভালোবাসা পেয়ে যতটুকু নিজেকে সামলিয়ে রেখেছি এত টুকু ভালো থাকাও হয়ত হবেনা। এসব কথা মনে আসতেই এক অজানা ভয় আমাকে ঘিরে রাখতো।
পড়ালেখা বাদ দিয়ে নেমে গেলাম কাজের সন্ধানে। আমি তো কোন কাজই পারিনা। তবে কে আমাকে কাজ দিবে। কোন উচ্চ বিলাশি মানুষের সাথে আমার বন্ধুত্ব না হলে, বস্তির ছেলে মেয়েদের সাথে খুব ভালো মিল ছিলো। তাদের মধ্যেই একজন রাশেদ, আমার অনেক ভালো বন্ধু বটে। তার কাছে গেলাম। সে গাড়ির হ্যালপার ছিলো। তাকে আমার সমস্যার কথা জানালাম। সে তার ওস্তাদের সাথে কথা বলে আমাকে একটি গাড়িতে লাগিয়ে দিলো। ভোর পাঁচটা থেকে শুরু করে রাত অবধি কাজ করলে তিনশো টাকা পাওয়া যাবে। বেতন না পেতেই হিসেব কষা শুরু করলাম, যদি এক মাস কাজ করি নয় হাজার টাকা পাবো। সেই হিসেবে ছয় মাস কাজ করলে মায়ের অপারেশন করানো যাবে। কিন্তু এত সময় তো নেই হাতে, যেভাবে হোক মায়ের অপারেশন করাতেই হবে। পরের দিন থেকে কাজে লেগে লেগাম। প্রথম দিনের টাকা এনে মায়ের বালিশের নিচে রাখলাম, মায়ের ঘুম ভেংগে গেলো, “কি রাখলি বালিশের নীচে?”
০- টাকা রাখছি। টাকা রাখার কথা শুনে মা যততত্র করে উঠে বালিশের নীচে হাতরিয়ে টাকা বের করলেন, “এই টাকা তুই কই পাইলি?”
০- আমি গাড়ির কাজ করতেছি। আজকে প্রথম দিন কাজ করলাম। প্রতিদিনের টাকা প্রতিদিন দিয়া দেয়। এই টাকা জমাইয়া তোমারে অপারেশন করামু। আমি তো হিসেব করছি ছয় মাস কাজ করলেই অপারেশন এর টাকা হয়ে যাবে।
আমার কথা শুনে মায়ের চোখ থেকে গল গল করে পানি ঝরে পড়লো। বড্ড ভালোবাসার চাদরে জড়িয়ে আমাকে বুকে টেনে নিলো। কপালে একটি চুমা দিয়ে, “বেচে থাক বাবা। জীবনে অনেক বড় হো!” এরই মধ্যে বড় আপু চলে আসলো, সে তার বিয়ের গহনা গিরবি রেখে মায়ের টাকা জোগাড় করছে। আমার কর্মকান্ডের কথা মা আপু কে জানালেন। আপু আমাকে কাছে নিয়ে বুকে জরিয়ে ধরলেন, আর বললেন, “আমার লক্ষ্মী ভাই এত বড় কবে হইলো?” একটু হাসিমাখা মুখ নিয়ে বললাম, “গরীব মানুষের একটু তাড়াতাড়ি বড় হইতে হয়।” পরের দিন মাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলাম অপারেশন এর জন্য। রাতের বেলা অপারেশন করবে সেই রাতে আমাদের আর ঘুম হয়নি, সারা রাত জেগে ছিলাম। সকাল বেলা মায়ের জ্ঞান আসলো, আর একদিন পর তাকে আমরা বাসায় নিয়ে যেতে পারবো। মাকে নতুন করে ফিরে পেয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে ভাগ্যবান মনে হচ্ছিলো।
টানা সাত মাস গাড়ির কাজ করে বোনের বন্ধক রাখা গহনা ছাড়িয়ে আনলাম। কিন্তু এতদিন স্কুলে যেতে পারিনি। আমার বয়সি ছেলে মেয়েরা স্কুল ব্যাগ কাধে করে স্কুলে যায়, আর আমি “ডাইরেক্ট যাত্রাবাড়ী, গুলিস্তান, পল্টন, জিপিও চত্তর” বলে যাত্রী ডাকতে ব্যস্ত। ঋন শোধ হবার পর আবার স্কুলে যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ততদিনে আমার নাম স্কুল থেকে কেটে দিয়েছে। পড়তে হলে আগামী বছর ভর্তি হতে হবে। ততদিন বসে থেকে কি লাভ। সিদ্ধান্ত নিলাম এমন কাজ করবো যেন পড়ালেখা আর কাজ দুটোই করতে পারি। এক কম্পিউটার এর দোকানে গেলাম, সেখানে গিয়ে কাজের সন্ধান করলাম মিললো না। তারপর কম্পিউটার দোকানের আশরাফ স্যার কে বললাম, “আপনারা তো কম্পিউটার এর কাজ শেখান। আমি কাজ শিখতে ভর্তি হবো।” একটু আগে যে ছেলেটি কাজ চেয়েছিলো দোকান ঝাড়ু দেবার জন্য। সেই ছেলেই এখন আবার কম্পিউটার এর কাজ শিখবে। একটু অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন,
০- কাজ শিখে কি করবে তুমি?
— আমি যদি কম্পিউটারের কাজ জানতাম তাহলে আপনি আমাকে অবশ্যই কাজ দিতেন। কম্পিউটার দোকানে কাজ করার যোগ্যতা আমার নেই, তাই কাজ দিতে পারছেন না। কিন্তু আমি যদি যোগ্যতা অর্জন করে আসি তাহলে আপনি তো অবশ্যই কাজ দিবেন। আমার কথা শুনে কম্পিউটার এর কিছু ছাত্রছাত্রী সহ আশে পাশের লোকজন আমার দিকে তাকিয়ে ছিলো। জানিনা তারা এমন অদ্ভুত দৃষ্টিতে আমার দিকে কি দেখছিলো। স্যারের মুখ মলিন হয়ে গেলেন, তার চোখ জলমল করতে ছিলো। আমার মাথায় হাত রেখে বললেন, “জীবনে অনেক বড় হও। আর আমার এখানে তুমি কম্পিউটার শিখবে, আর কাজ করবে। আমি তোমাকে মাসে মাসে বেতন ও দিবো।”
জানিনা স্যারের কাছে আমার কোন কথা ভালো লেগেছিলো, যেটাই হোক আমার ভীষন ভালো লাগছে এমন সুযোগ পেয়ে। দৌড়ে মাকে গিয়ে বললাম সব, মা তো খুশিতে আত্মহারা, চুমু দিয়ে, “বাবা অনেক বড় হও”। সবার মুখ থেকে এই একটি দোয়াই ছিলো। এসব দোয়াগুলোই আমাকে নতুন নতুন সাফল্যের রাস্তা দেখাতে শুরু করলো। মাস খানেকের মধ্যে সমস্ত অফিসিয়াল কাজ শিখে ফেললাম, কম্পোজ স্পিড এত বেশি হয়ে উঠেছিলো যে স্যার আমার সাথে কম্পোজ করে পারতো না।
চেষ্টা আর লগন এর দ্বারা আমি তা অর্জন করেছিলাম। আশরাফ স্যার সবার কাছে গর্ব করে আমার কথা বলতে লাগলো, তার অনুপ্রেরনা আমাকে আরো সাহস দিতে লাগলো। নতুন বছরের ভর্তি আসতে আসতে, অফিসিয়াল, গ্রাফিক্স , ট্রাবুলশুটিং এর কাজে বেশ দক্ষ হয়ে উঠলাম। এত অল্প বয়সে এত কাজ পারি বলে প্রশংসার শেষ ছিলো না। নতুন ক্লাসে ভর্তি হলাম, সাথে এখন কম্পিউটার শিক্ষক হিসেবে আশরাফ স্যারের ওখানে কাজ করি।
সময়ের ধারায় আমার অনিশ্চিত জীবন এক সুন্দর ভবিষ্যৎ এর আলোড়ন খুজে পেলো। স্কুল পেড়িয়ে কলেজ, তারপর ভার্সিটি আজ আমি কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার। বাংলাদেশের বড় আইটি ফার্মের “হেড অফ ইনচার্জ পদে নিয়োযুক্ত আছি। ম্যাডিকেল এলাউন্স, ফ্ল্যাট, গাড়ি, সহ মোটা অংকের বেতন প্রদান করা হয়। আজো মা একই কথা বলে “অনেক বড় হও” কিছুদিন আগেও আশরাফ স্যারের সাথে দেখা হলো, আজো তার মুখে আমার জন্য জয়ধ্বনি।
কিন্তু মনের মাঝে একটি মেয়ের ছবি আজো একে যাই সুমাইয়া। জানিনা সে কোথায় আছে, কি করছে? আমার কথা কি তার মনে আছে নাকি? হয়ত আমি তাকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম। তার ফোকলা হাসির প্রেমে পড়েছিলাম। আজো তার দুষ্টুমি, চিৎকার করে কান্না, তার টিফিন ভাগ করে খাওয়া, আর অংকের দুর্বলতার কথা আজো আমাকে অতীতে টেনে নেয়। এত কিছু বদলে যাবার পরেও তাকে বদলিয়ে ফেলতে পারিনি। আজো মনের এক কোনে তার ফোকলা দাতের হাসি বিরাজমান। সাফল্যের উচ্চ শিখরে এসেও একটি কথা আজো বুঝিনি, আমি তাকে ভালোবাসি নাকি তার ফোকলা দাতের হাসি?
গল্পের বিষয়:
গল্প
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত