সময়ভ্রম

সময়ভ্রম
ইশান চৌধুরী নামটি নানুর বাড়ি আর দাদুর বাড়ির সবাই জানে। জানবেই বা না কেন। নামটা যার সে প্রথম বারেই BCS কমপ্লিট করা এক ব্রিলিয়ান্ট ছাত্রের পরিচয়। দুই ঈদ ছাড়া গ্রামে যাওয়া হয়না। মা বাবা না থাকায় দাদুর বাড়ি আর নানুর বাড়ির আমার উপরে যেন সমান অধিকার।
যাই হোক এই কুরবানির ঈদে গ্রামের বাড়িটা ভুলার মতো নয়। দিনটি ছিলো ঈদের ৩ দিন আগে। গরু কেনার এটাই শেষ দিন। গরুবাজারে প্রচুর ভিড়। এমন এক দিনে দাদুরবাড়ি অবস্থানকালে নানুর ফোন আসে। নানাভাইয়ের অবস্থা খুব একটা ভালো না। সচরাচর ঈদের দিন বিকেলে হলেও আজ এখনই যেতে হবে। শরিরের উপর কিছুই না।
রওনা দিলাম গাড়িতে। গাড়ি গিয়ে থামলো শ্যামনগর বাজারে। এখান থেকে রিক্সায় যেতে হয়। তবে আজ জানলাম রিক্সা যাবেনা। শ্যামনগর সবচেয়ে বড় গরুবাজার৷ বাজারেও ভীড়। রিক্সাওয়ালারা আজ কোথাও যাবেনা। অনেকের নিজেদের গরুও হাটে বেচতে এসেছে৷ বাজারের একটা দোকানে বসলাম। ঠিক দোকান না। এটা একটা কাছারি। নামাজের জায়গা। একজন এসে ৩ টা মিস্টি দিলো। দুই গ্রামে দাদুভাই আর নানুভাইয়ের অনেক প্রতিপত্তি থাকায় সবাই সম্মান করে। এক পাগল পাশে এসে বললো।
পাগলঃ কী হয়েছে বাবু?
আমিঃ সুন্দরপুর যাবো। রিক্সা যাচ্ছে না।
পাগলঃ এই ব্রিজ টা পেরিয়ে জংগলের মাঝে দিয়ে একটা রাস্তা আছে৷ সোজাচলে যাও। খালের ব্রিজ পড়বে। সেটা পেরুলেই সুন্দরপুর। আমি ভাবলাম৷ কখনো হেটে যাইনি। আজ হেটেই যাই। হঠাৎ এক লোক এসে মানা করলো।
লোকঃ বাবু যাবেন না৷ এই দিকে ভুতপ্রেত থাকে।
আমিঃ আমি এইসবে বিশ্বাস করিনা৷ সুন্দরপুর যাওয়া জরুরি।
রওনা হলাম৷ ব্রিজে উঠার সাথে সাথে অনেক লোক মানা করতে লাগলো। কিন্তু নানুভাইকে দেখা জরুরি। ব্রিজ পেরুতেই মানুষের কোন মানা শুনতে পেলাম না আর। পিছনে তাকিয়ে দেখি মানুষ নিজেদের কাজে ব্যাস্ত হয়ে গেছে। আমি আর পিছনে ফিরলাম না। হাটা শুরু করলাম।
প্রায় ১৫ মিনিট হাটার পর একটা মাইলস্টোন দেখলাম৷ লিখা আছে সুন্দরপুর ২ কিলোমিটা৷ বাহ, কাছেই চলে এসেছি। আরও ১৫ মিনিট হাটার পর দেখলাম আশেপাশ টা কেমন জানি অন্ধকার হয়ে গেছে। মনে হলো যেন সন্ধ্যা ৫-৬ টা বাজে। কিন্তু আমি রওনা হয়েছি সকাল ১০ টায়। এটা হয়তো জঙ্গলের কারনে অন্ধকার। আরও কিছুক্ষন হেটে দেখলাম সুন্দরপুর ১ কিলোমিটার। ভাবলাম তাড়াতাড়ি এসে গেছি। সময়ের ধারনা নেওয়ার জন্যে ঘড়িতে তাকাতেই আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। আজব, এখন ৫.৫৬ বাজে। কিন্তু কীভাবে সম্ভব। হিসেবে আমি প্রায় ৮ ঘন্টা হাটছি৷ অথচ মাত্র দেড় কিলোমিটার এলাম৷ মোবাইলে টাইম দেখলাম। আসলেই ৫.৫৬ বাজে। আমি একটু অবাক আর ভীত অবস্থায় হাটতে শুরু করলাম৷ ভয়ে পানি পিপাসা পেয়ে যায়। মুখ শুকিয়ে গিয়েছিলো। হঠাৎ দেখলাম একটা মেয়ে ছুটে আসছে। আমার দিকে, একটা গ্লাস হাতে।
মেয়েঃ বাবু, পানিটা খেয়ে নাও। তোমার পিপাসা পেয়েছে।
আমিঃ আপনি কে? আমি ঠিক চিনতে পারলাম না৷ [পানি খাওয়ার পর] ধন্যবাদ
মেয়েঃ তোমার এক আপনজন আমি। হয়তো তুমি ভুলে গেছো। আসি আমি
আমিঃ এই মেয়ে দাড়াও। কে তুমি?
মেয়েঃ জানতে পারবে বাবু। হাটতে থাকো। রাতের বেলা কোথাও বিশ্রাম নিও না। এই জঙ্গল ভালো না। মেয়েটা ছুটে চলে গেলো। আমি আবার হাটলাম। রাত হলো। হাপিয়ে গেছি কিন্তু বিশ্রাম নিতে মন চায় না। হঠাৎ দুরে কোথাও থেকে আজান শোনা গেলো। ভাবলাম এশার আজান। কিন্তু মোবাইলে দেখি প্রায় সকাল ৬ টা বাজে। আজব, মাত্র আধ ঘন্টা আগে পানি খেলাম। পানি পিপাসা আবার পেয়েছে। সকাল হয়ে গেছে। কীভাবে। ধীরে ধীরে জঙ্গল শেষ হলো। একটা খালের পাশে পৌছালাম৷ এইখানে কয়েকটা বাড়ি আছে। খাল পেরুলেই সুন্দরপুর। কিন্তু কীভাবে পেরুবো বুঝলাম না। দেখলাম একজন মোটামুটি ৫০ বছর বয়স্ক লোক বসে আছে। একটা মাচার উপর।
আমিঃ তুমি রফিক ভাইয়া না?
রফিকঃ কে তুমি।
আমিঃ ভাইয়া আমি ইশান।
রফিকঃ কেমন আছো ভাই। কতো দিন পর দেখা।
আমিঃ খুব ভালো আছি।
রফিকঃ তুমি জঙ্গলে কী করছিলে।
আমিঃ আসলে ভাইয়া [সব খুলে বলার পর]
রফিকঃ তোমার রিয়া কে মনে আছে?
আমিঃ কেন মনে থাকবে না ভাইয়া। ওর জন্যেই তো আজও আমি কোন মেয়ের কাছে যাইনি। কিন্তু এতো বার গ্রামে এলাম। তোমাদের আর খুজে পাইনি। কেউ বলেনি তোমরা কোথায়। ভাইয়া কোথায় রিয়া?
রফিকঃ ১৫ বছরে অনেক কিছু হয়েছে। কাল সন্ধ্যায় যে মেয়েটা তোমাকে পানি দিয়েছে। সেটাই রিয়া। একটা ছেলের সাথে জড়িয়ে গ্রামের এক লোক ওর চরিত্রে দাগ লাগিয়ে দিয়েছিলো। আমার বোন আত্মহত্যা করেছে৷
কথাটা শুনে আমার মাথা ঘুরে গেলো। আমিঃ সে আমাকে পানি দিয়েছিলো। আর আড়াই কিলোমিটার আসতে আমার এক দিন লাগলো।
রফিকঃ এক জঙ্গল অভিশপ্ত। এইখানের এক গাছে আমার বোন গলায় দড়ি দিয়েছে। গ্রামের মানুষ আমাদের বের করে দিয়েছে গ্রাম থেকে। আমরা এইখানে থাকি। খালের ওপাশে যাওয়া নিশিদ্ধ। এখানের পোলটাও নেই৷
আমিঃ আমি কীভাবে বাড়ি যাবো।
রফিকঃ আমার সাথে এসো।
আমি রফিক ভাইয়ের সাথে হাটতে থাকলাম। নিজের পায়ের দিকে তাকিয়ে হাটছিলাম। আর কান্না পাচ্ছিলো। বুকে একটা ব্যাথা হচ্ছিলো। হঠাৎ দেখলাম অনেক মানুষের আওয়াজ৷ আমি আবার শ্যামনগর বাজারে এসে গেলাম৷ বাজারে ঢুকে সেই কাছারিতে বসে পড়লাম। রফিক ভাইকে খুজে পেলাম না। ভাবলাম গ্রামের মানুষ বের করে দিয়েছে তাই আসেনি৷ এক লোক ছুটে এলো আর বললো
লোকঃ এক সপ্তাহ কই ছিলেন বাবু
আমিঃ [হকচকিয়ে] এক সপ্তাহ মানে?
মোবাইলের তারিখ দেখলাম৷ সত্যিই এক সপ্তাহ কেটে গেছে৷ আমি আর কোন কথা বললাম না৷ রিক্সা নিয়ে সোজা নানুর বাড়ি এলাম। নানা এখন ভালো আছে। কারও কোন কথার জবাব না দিয়ে নানা নানিকে নিয়ে এক রুমে এসে সব বললাম।
নানাঃ ইশান, ওই জঙ্গল থেকে তুমি একমাত্র মানুষ যে বের হতে পেরেছে। ওটাকে অভিশপ্ত জঙ্গল বলে। রিয়া কে আমরা অনেক চেয়েছি বাচাতে। কিন্তু সময় পাইনি৷ কিছু করার আগেই ও আত্মহত্যা করেছিলো৷ সেইদিন ওর সাথে আমরা তোমার বিয়ের কথা বলতে গিয়েছিলাম৷ কিন্তু গ্রামের এক বখাটের হাতে পড়ে যায় রিয়া৷ ওর চরিত্র নিয়ে অনেক প্রশ্ন ওঠে৷ হয়তোবা মেয়েটা ভেংগে পড়েছিলো। তাই চলে যায়। ওর আত্মহত্যার পর ওর ভাইকে গ্রাম থেকে বের করে দেওয়া হয়। ওরা ওই খালপাড়ে থাকে৷ কিন্তু আমরা শুনেছি তারাও মারা গেছে৷ আমরা ওই বখাটে কঠিন ছেলেটাকে শাস্তি দিয়েছি।
আমিঃ নানা, আমি আবার ওইখানে যেতে চাই।
নানিঃ যাস না৷ তোর কিছু হলে আমরা মরে যাবো।
নানাঃ ওকে যেতে দাও৷ ওর কিছু হবেনা৷ ওর ক্ষতি করার কেউ নেই ওখানে। ওরা বরং ওর আপন।
সুন্দরপুর থেকে খালটার পাশে আবার এলাম। এইবার একটা গাছের মাধ্যমে খাল পেরিয়ে আবার সে জঙ্গলের ধারের মাচায় এসে বসলাম৷ হেটে হেটে গেলাম ভাঙ্গা কুড়েঘর গুলোর দিকে। দেখলাম ২ টা কঙ্কাল ঝুলে আছে। বুঝলাম এরা রফিক ভাইয়া আর ঝিলিক আপু (রফিকের স্ত্রী)। কুড়েঘরের পাশে একটা কবর। বুঝলাম এটা রিয়া। কিছুক্ষন কান্না করলাম। হঠাৎ আরেকটা কান্নার আওয়াজ ভেসে এলো৷ একটা মেয়ের গলা। দেখলাম আমার পিছনে গাছ ধরে দাড়িয়ে কান্না করছে।
আমিঃ ঝিলিক আপু।কেমন আছো। [কাদতে কাদতে]
ঝিলিকঃ আমরা তো নেই রে ইশান৷
আমিঃ তুমি না আমার একমাত্র বোন। কেন আমায় ছেড়ে চলে গেলে।
ঝিলিকঃ আমি বাধ্য ছিলাম রে ভাইটা। আরেকটা কান্নার আওয়াজ শুনলাম। দেখলাম মাচায় বসে আছে রফিক ভাইয়া।
রফিকঃ ইশান, আমার বোনটা তোমার জন্যে অনেক অপেক্ষা করেছে। একবার দেখা করে এসো। আমি একটা মিস্টি সুরে গান শুনতে পেলাম। জঙ্গলের ভিতর থেকে। নিজের ভালোবাসা মৃত হলেও। ভয় পাইনি। গিয়ে দেখলাম লাল শাড়ি পরা এই সেই মেয়েটি। পানি দিয়ে বলেছিলো। বাবু খেয়ে নাও।
রিয়াঃ কেমন আছো।
আমিঃ দেখে বুঝতে পারছো না? তোমাকে ছাড়া কতো কষ্ট হয়।
রিয়াঃ বাহ রে। ১৫ বছর ছিলে তো আমায় ছাড়া। আমি তো মাত্র ২ বছর আগেই মারা গেছি এর আগে।
আমিঃ আমি তোমার ছোট বেলার একটা ছবি রাখতাম। আর তোমাকে দেখতে চেয়েছিলাম বিয়ের আগেই।
রিয়াঃ দেখেছো তো। কান্না কেন?
আমিঃ এভাবে?
রিয়াঃ ওরে পাগল। আমি সবাইকে ছেড়েছি। তোকে ছাড়িনি। যখন একলা লাগবে। এখানে চলে আসিস। আমাকে পেয়ে যাবি।
আমিঃ তুই আমার সাথে চল।
রিয়াঃ পারবো না৷ এটাই আমার বাড়ি।
আমিঃ একটু সময়ে কী হবে?
রিয়াঃ কোথায় একটু সময়? ঘড়ি দেখ। ১ দিন হয়ে গেছে। এটা সময়ভ্রমের জঙ্গল। এইখানে আমার সাথে তোর থাকাটা সব সময় দীর্ঘস্থায়ী। এই বলে রিয়া একটা কুয়াশায় মিলিয়ে গেলো। রিয়া ওর ভাই আর ওর ভাবির কবর ওদের গ্রামের বাড়ির পাশে আবার দেওয়া হয়। তারপর থেকে গ্রামে এলে ওই জঙ্গলে যাই। যদিও রিয়াকে আর দেখিনি। তবে অনুভব করি। কেউ যেনো এসে বলে। তোমার পানি পিপাসা পেয়েছে। এই নাও।
গল্পের বিষয়:
গল্প
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত