শাসন

শাসন
রিশাকে আমি চড় মারার সাথেই ওর দাদু মানে আমার শাশুড়ী মা আমার সাথে চিৎকার করে উঠল,তুমি এটা কি করলা বৌমা, এত্ত বড় মেয়ের গালে এক ঘর মানুষের সামনে চড় মারলা তাও আমার সামনে? কান্ডজ্ঞান হারিয়ে বসে আছ নাকি? রাগে আমার গা কাঁপতে থাকে আমি রিশার হাত ধরে টেনে ওকে ঘরে এনে দরজা লাগিয়ে দেই। আমার শাশুড়ী,ননদ দরজা ধাক্কাতে থাকে আমি পাত্তা দেইনা।
মেয়েকে চিরুনি দিয়ে মারতে মারতে বলতে থাকি, অসভ্য মেয়ে, তুমি বড় হইছ না? সবে ক্লাস নাইনে উঠেছ এত্ত বড় তুমি হয়েছ যে স্কুলে না গিয়ে বাইরে ঘুরে বেড়াও? আজ আসুক তোমার বাবা তখন তোমার ব্যবস্থা করব। লেখা পড়ার তো এইনা ছিরি ভাইকে দেখেতো শেখনাই কিছু। আমার ছেলের নখের ও যোগ্যি না তুই। আমাদের মান সম্মান ডোবানোর জন্য উঠে পড়ে লেগেছিস। রিশা কাঁদতে থাকে আমি ওকে রেখে বের হয়ে আসি। ওর রুমে গিয়ে সব তোলপাড় করি। টেবিলের ড্রয়ার, আলমারী,তোশকের নিচে, ব্যাগের ভেতর, বইয়ের তাকে। কিছু না কিছুতো আছেই। ইদানিং প্রায়ই টাকা চায় এই সেই উছিলায়। ছোট মানুষ গুরুত্ব দেইনাই। এখন বুঝতেছি ও টাকা চায় কেন,কিছু একটা তো আছেই। আমার শাশুড়ী ডাকতে থাকেন, বৌমা দুপুর তিনটা বাজে বাড়িতে মেহমান সে খেয়াল আছে তোমার? ভাত দাওনা কেন টেবিলে? জামাইকে কি না খাওয়াইয়া রাখবা? আমি খাবার দিতে যাই। আমার ননদ বলে ভাবি, রিশাকে ডাক।
-নাহ্ ওর ভাত বন্ধ।
-বৌমা জিদ করোনা। রিশাকে ডাক দাও।
-মা বেয়াদবী নিবেন না,
আর নিলেও আমি নিরুপায় আজ দুপুরে রিশার ভাত বন্ধ। ওর বাবা আসুক। রাফি বাবা টেবিলে আয় সোনা। পরে পড়িশ। না খেলে পড়াশোনা করবি কি করে? আমার ননদ রাগ করে খাবার রেখে উঠে যায়। সব কিছুতে বাড়াবাড়ি। আমার মেয়েকে আমি শাসন করব না আদর করব সেটা আমার ব্যাপার,বেড়াতে আসছে দু দিন থাকবে চলে যাবে। তানা সব কিছুতে নাক গলানো চাই। রাফি-রিশার বাবা ফিরল রাত আট টা নাগাদ। রিশার রুমের আলমারীর কাপড়ের নিচে একটা ডায়েরী পেয়েছি। ডায়েরি টা বের করে নিয়ে এসে ওকে ওর রুমে পাঠিয়ে দিয়েছি। ওর দাদু খাবার নিয়ে অনেক সাধাসাধি করেছে উনি খাবেন না। বেয়াদ্দপ হয়েছে মেয়েটা।
রাগ দেখায়, জীদ করে। আজ ওর একটা ব্যবস্থা করব৷ চাকরী করলাম না শুধু মাত্র ছেলে মেয়েকে মানুষ করতে গিয়ে আর এই মেয়ে কিনা তলে তলে আমার চোখ ফাঁকি দিচ্ছে! আজ বাড়ীতে ননদ,ননদাই আসায় আমি স্কুল থেকে আনতে যেতে পারিনি। রাফিকে পাঠিয়েছিলাম ও নাকি গিয়ে রিশাকে পায় নি। মিনিট দশেক পর রিক্সায় ফিরতে দেখা যায় ওকে ওর বান্ধবীর সাথে। এত্ত চালাক হয়েছে মেয়েটা, জানে যে আজ মা নিতে যাবেনা এই সুযোগ। ওর বাবাকে নাস্তা দিয়ে ডায়রীটা নিয়ে বসি। নীল রং এর ডায়েরী,কখন লিখে ও আমার তো চোখে পড়েনা। এত চোখে চোখে রেখেছি ছেলে মেয়েকে তাও চোখ ফাঁকি দিল। ছেলেটাকে মানুষ করতে পারলেও বোধয় মেয়েটাকে পারলামনা। আমি ব্যস্ত হাতে ডায়েরী টা খুলি। প্রায় মাঝামাঝির দিকে একটা কবিতা। কবিতা লেখা হচ্ছে তাহলে আজকাল অথচ পড়তে বসতে বললেই নানান বাহানা শুরু হয় তার, ঘুম পায়,মাথা ব্যথা, মনে রাখতে পারেনা। কি করব আমি এই মেয়েকে নিয়ে দিশেহারা লাগে আমার। পাতা উল্টাই ছোট একটা লাইন,
‘আমার রাতে ঘুম আসেনা” পড়তে বসলে ঘুমে নাকি পড়ে যায় অথচ লিখেছে তার নাকি রাতে ঘুম আসেনা। প্রেম করছে নাতো? শুনেছি প্রেমে পড়লে এমন অস্বাভাবিক অনেক কিছুই হয়, আমাদের সময় বাবা এসব ছিলনা, আজকাল কার ছেলে মেয়েদের তো এমন ভাব যেন বয়ফ্রেন্ড নাই বলতে লজ্জা হয়! আমি আবারো পাতা উল্টাই,
”বাবাকে বললাম বাবা আজ বাইরে খেতে নিয়ে যাবে? বাবা বলল পড়াশোনায় মন দাও আমি ফেরার সময় নিয়ে আসব, কি আনতে হবে মাকে বলে দিও আমাকে জানিয়ে দিতে। কেন কি এমন হত সবাই মিলে একটু বের হলে? স্কুল আর বাসা, বাসা আর স্কুল। দম বন্ধ লাগে আমার। আমি পরের পেজে যাই,
‘”মা কে আজ বললাম আমার কাছে ঘুমাও, মা রাজি হলনা অথচ প্রায়ই রাতে মা বাবার সাথে রাগারাগী করে আমার ঘরে এসে ঘুমায় মাঝে মাঝে কান্না করে আমি বুঝতে পারি, আমার ইচ্ছে করে মাকে জড়িয়ে ধরি কিন্তু আমি জেগে আছি জানলে যদি বকা দেয় তাই সাহস পাইনা” আমি পাতা উল্টাতে থাকি,
“আমার পড়তে খুব কষ্ট হয়, মনোযোগ থাকেনা পড়লে কিছু মনেও থাকেনা, যত দিন যাচ্ছে ততই সমস্যাটা বাড়ছে,মাকে বললে মা বলে পড়ায় মন নাই তাই এসব অজুহাত দেখাই।”
“ফুপি এসেছে জেনি আপু ও এসেছে আমার খুব ইচ্ছে করে আমি জেনি আপুর সাথে গল্প করি কিন্তু মা বেশীক্ষণ মিশতে দেয়না বলে বড় বোনদের সাথে এত কিসের কথা তুমি ছোট মানুষ এখন পড়াশোনা করার সময় আড্ডা দেওয়ার অনেক সময় পরে পাবে।”
“আমার রাজু আঙ্কেলদের সাথে মিশতে ভাল লাগেনা একদম, উনার ছেলে জনি খুব অসভ্য ইঙ্গিত করে কিন্তু আমি বাবাকে বলতে পারিনা বাবার ধারনা আমি তার বন্ধুদের সামনে নিজেকে অসামাজিক প্রমানিত করতে চাই তাই যেতে চাইনা।”
“মা আজ দাদুর সাথে খুব ঝগড়া করল,তারা কেউ কাউকে দেখতে পারেনা সব সময় বাসায় একটা অশান্ত পরিবেশ, ফুপি আসলে ভাল লাগে আমার, কিন্তু ফুপিতো বেশীদিন থাকেন না। দাদু ফুপি আসলে মায়ের সাথে আরো ঝগড়া করে। মা প্রায়ই মামা বাড়ী চলে যেতে চায়, আচ্ছা মা কি সত্যিই চলে যাবে?”
“ভাইয়াকে বাবা মা অনেক ভালবাসে আমাকেও বাসে কিন্তু ভাইয়াকে বেশী বাসে। আমারো ইচ্ছে করে আমিও ভাইয়ার মত ভাল রেসাল্ট করি কিন্ত আমার তো পড়া মনে থাকেনা।”
“আমার সারাদিন ঘুম পায় কিন্তু সারা রাত ঘুম আসেনা,ক্লাসে মন বসেনা শুধু ঘুম পায়। “
“সেদিন তন্বিদের বাসায় সবাই গেল কিন্তু আমি যেতে পারলাম না, বন্ধুরা নাকি সব নষ্টের গুরু। আচ্ছা ওদের মায়েরাও একি কথা ভাবে? তাহলে আমরা সবাই কি সবাইকে নষ্ট করে দিব কিন্তু কিভাবে?”
“সারা ফোন করেছিল, মা পাশে বসে থাকে কি যে অস্বস্তি হয়, একদিন না করেছিলাম বলে পুরা একটা সপ্তাহ ফোন ধরতে দিলনা।”
“মা আমাকে কিসব পোশাক পরায় আমার ভাললাগেনা কিন্তু মা, বাবা কেউই বুঝতে চায়না বলে আমি বেশী বোঝা শুরু করেছি,আচ্ছা আমি কবে আমার পছন্দের পোশাক গুলো পরতে পারব?”
“আমার কবিতা লিখতে ভাললাগে, মাঝে মাঝে চুরি করে লিখি যেন মা দেখে না ফেলে, কিন্তু আমার খুব ইচ্ছে করে আমি বাবা, মা, দাদী, ফুপি সবাই কে দেখাই কিন্তু সাহস হয়না।”
“ফিজিক্স আমার একদম ভাললাগেনা, আর সেদিন নাম্বার কম পাওয়ায় মা যখন চৈতীর সামনে চড় মারল সেদিন থেকে বইটা দেখলেই আমার টুকরা টুকরা করে ফেলতে ইচ্ছে করে।”
“আমার এ বাড়ীতে একদম ভাল লাগেনা, আমাকে কেউ বোঝেনা কেউনা।”
“মাঝে মাঝে মন চায় দূরে কোথাও চলে যাই কিন্তু কোথায় যাব?”
” ক্লাসে যেতে ইচ্ছে করেনা একটুও, ইস্ আমি যদি সকাল দশটা পর্যন্ত ঘুমতো পারতাম, যদি চাইলেই বস্তা বস্তা কবিতা লিখতে পারতাম, যদি বন্ধুদের সাথে প্রিয় সিরিয়াল গুলা দেখতে পারতাম!” “বাবা আজ ভাইয়াকে ল্যাপটপ কিনে দিয়েছে আমি বলেছিলাম আমাকে একটা মোবাইল কিনে দিতে, সিম লাগবেনা শুধু একটু গান শুনব,গেম খেলব, বাবা রাজী হলনা বলল সময় হলে দিবে, রেজাল্ট ভাল হলে দিবে কিন্তু আমি জানি দিবেনা কারন আনার রেজাল্ট ভাইয়ার মত ভাল হবেনা।”
“আমার ভীষন অস্থির লাগে, কিচ্ছু ভাললাগেনা।”
“আজ ক্লাস থেকে বের হয়ে পুরা একঘন্টা লাইব্রেরিতে বসে ছিলাম আমার ক্লাস করতে অসহ্য লাগে।”
“আমার খুব কান্না পায় খুব। “
“আজ চৈতী বলল আমি নাকি ডিপ্রেশন এ পড়েছি ওর এক কাজিনেরও এমন হতো ডাক্তার দেখিয়ে ছিল। আমাকে নিয়ে যাবে ডাক্তার এর কাছে। সুস্থ হয়ে গেলে নাকি আমার আবার সব ভাল লাগবে স্কুল,বন্ধু,পড়াশোনা,বাসা….সব”
“কাল মাকে মিথ্যা বলে টাকা নিয়েছি মা সন্দেহ করলেও টাকাটা দিয়েছে, আগামী পরশু ফুপি আসবে মা স্কুল থেকে আনতে যাবেনা তখন চৈতীকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাবো,খুব ভয় করছে। ইস্ মা যদি নিয়ে যেত আমাকে।”
“বাবা কে, মা কে অনেক ভালবাসী ওরাও আমাকে ভালবাসে কিন্তু ওরাতো জানেনা যে আমি কি করতে ভালবাসি ওরা শুধু জানে ওরা কি ভালবাসে ওরা আমাকে দিয়ে সেটাই করাতে চায় ওরা যা ভালবাসে। আমি তো আজকাল ভুলেই যাই যে আমি কি ভালবাসি।”
“আচ্ছা আমি যদি সবাই কে ছেড়ে দূরে কোথাও চলে যাই তাহলে কি মা, বাবা, দাদু, ভাইয়া কষ্ট পাবে,ওরা কি কাঁদবে আমার জন্য?” “বাবার ড্রয়ার থেকে একটা ব্লেড নিয়েছি জ্যামিতি বক্সের ভেতর লুকিয়ে রেখেছি, এর পর যদি কোনদিন আমার গায়ে হাত তুলেনা আমি কিছু একটা করব অবশ্যই করব।” আমি আর পড়তে পারিনা চোখের পানিতে ডায়েরীর পাতা গুলো ভিজে যেতে থাকে। বনি ঘরে ঢুকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে আমি ডায়রিটা ওর হাতে দিয়ে রিশার ঘরে যাই। অন্ধকার ঘরে রিশা ঘুমচ্ছো আমি ওকে জড়িয়ে ধরে শুই,” হয়তবা অনেক দেরী করে ফেলেছি তা বলে কি একেবারেই দেরী হয়ে গেল রে মা?”
রিশা আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে, শেষ কবে মেয়ে কে এমন দৃঢ় আলিঙ্গন করেছি মনে করতে পারছিনা, তবে মাতৃত্ব কে অনুভব করতে পারছি, যে মাতৃত্ব শুধু সন্তানের সুখ ছাড়া কিছুই বুঝেনা। নিজের সন্তান কে অবচেতন মনে দূরে দিয়েছি কখন বুঝতেই পারিনি। না হল মেয়েটা আমার সবার সেরা, না হল সভ্য শান্ত, হল না হয় একটু দূরন্ত থাকল না হয় একটু পিছিয়ে তাতে কি খুব ক্ষতি হবে? বাঁচার মত করে না বেঁচে প্রতিনিয়ত একটু একটু করে শেষ হয়ে যাওয়া থেকে কি হেসে খেলে কৈশরটা ওকে কাটাতে দেওয়াটা কি আমার খুব অন্যায় হবে? রিশা আমার কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলে ওঠে, “মা তুমি কি ভয় পেয়েছিলে? আমার না তোমাদেরকে ছেড়ে কোথাও যেতে ইচ্ছে করেনা, কষ্ট হয় মা, তোমার জন্য তোমাদের সবার জন্য আমার বুকটা কেঁপে ওঠে।
আচ্ছা আজ যদি রিশা একটা ভুল করে বসত তাহলে আমরা হয়তবা ভাবতাম বাবা মায়েরাতো একটু শাসন করবেই তা বলে সুইসাইড?? অথচ আমি কিনা নিজের অজান্তেই একি করছি বাবা মা হয়ে সন্তান কে শেষ করে দিচ্ছি।
রিশার মত এমন হাজারো স্বেচ্ছায় হারিয়ে যাওয়া প্রাণ গুলোর ভেতরের গল্প আমাদের অজানাই রয়ে যায়। আমরা সুইসাইড টাই জানি সত্যটাকে জানিনা জানতে চাইওনা যে জীবন স্বেচ্ছায় গিয়েছে তাকে জেনে কি লাভ? এভাবেই লুকিয়ে থাকা ছোট ছোট হতাশা থেকে প্রতিনিয়ত তৈরী হয় নিত্য নতুন হারিয়ে যাবার সংবাদ। আর আমরা মেতে উঠি সেই ভুল করা মানুষটার ভুল গুলা ধরার কাজে। আমি মেয়ের কপালের চুলগুলা সরিয়ে পরম আদরে চুমু খাই, না ভুল বললাম মেয়ের কপালে না, চুমু খাই আমি আমার সন্তানের কপালে।
গল্পের বিষয়:
গল্প
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত