ফিরে পাওয়া ষ্পর্শ

ফিরে পাওয়া ষ্পর্শ
জাবির যখন খুব ছোটো তখন তার বাবা মায়ের মধ্যে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়।যদিও তাদের মধ্যে ডিভোর্স হয়নি কিন্তু সংসারে চরম অশান্তির কারনে জাবিরের মা জাহেদা খানম চিরবিদায় নিয়ে চলে যায়।তখন জাবিরের বাবা আহাম্মদ আলী তাকে ফেরানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়।জাবিরের দাদা,দাদী,চাচা,চাচী আর ফুফুরা কেউ জাবিরের মা জাহেদাকে পছন্দ করতো না।গরীবের মেয়ে হলেও জাহেদা ছিলো উচ্চ শিক্ষিতা,ভদ্র আর শান্ত।
অপরদিকে আহাম্মদ আলীদের পরিবার ছিলো মধ্যবিত্ত শ্রেণির। চার ভাই আর দুই বোনের মধ্যে আলী ছিলো ২য়।পেশায় ছিলো কলেজ শিক্ষক।আলীর অপর তিন ভাইও চাকরি করতো বিভিন্ন সরকারি দফতরে।আর বোন দুজন ছিলো প্রাইমারী শিক্ষক। তাদের সংসারে কোনো অভাব অনটন না থাকলেও কারো কারো মনে ছিলো প্রচন্ড লোভ।যদিও তারা এটাকে স্বপ্ন বলে অভিহিত করতো। মেজো ছেলে আহাম্মদ কে নিয়ে সকলের খুব উচ্চাকাঙ্খা ছিলো।এমন সুদর্শন আর মেধাবী ছেলের জন্য অনেক বড় লোকের মেয়ে পাগল ছিলো।তাদের বাবারাও ঘটক পাঠিয়ে প্রস্তাব দিয়েছিলো।কিন্তু আলী পছন্দ করতো তার চেয়েও মেধাবী ও সুনয়না জাহেদা খানমকে।পরিবারের সমস্ত আপত্তিকে অগ্রাহ্য করে আলী বিয়ে জাহেদাকে। বিয়ের পর থেকেই শুরু হয় অশান্তি।
জাহেদাও কলেজের ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষক ছিলো।বেশ জনপ্রিয়। কিন্তু আলীর ভাই বোনরা চাইছিলো জাহেদা যেনো চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে সংসারে মনযোগী হয়।তার জন্য সব সময় তার উপর নানা রকম চাপ সৃষ্টি করে যাচ্ছিলো।সেসব মোকাবেলা করে জাহেদা সংসার আর চাকরি দুটোই চালিয়ে যাচ্ছিলো।কিন্তু বিপত্তি সৃষ্টি হলো জাবিরের জন্মের পর।নবজাতকের সেবা যত্ন,সংসার আর চাকরি সব সামলে উঠা জাহেদার জন্য অনেক কঠিন হয়ে পড়লো।যৌথ পরিবারে সকলের সহযোগিতা না পাওয়ায় সে একদম হাঁপিয়ে উঠে।কোনো রকমে কয়েকটা বছর পার করে ছেলেটা যখন স্কুলে যাওয়া শুরু করে তখনই একদিন বাড়িতে তুচ্ছ একটা ঘটনা নিয়ে সবাই জাহেদার উপর চরাও হয়।
আলীও ভুল বুঝে জাহেদাকে।তখনই জাহেদা সংসার ছেড়ে যাওয়ার কথা আলীকে জানায়।আলী তখন আপত্তি জানালেও জাহেদা তাতে কর্ণপাত না করে চলে যায়।সাথে ছেলেকে নিতে চাইলেও সবাই মিলে বাধা দেয়।ফলে জাহেদাকে একাই বেরিয়ে যেতে হয়।কিন্তু তখন সে এক মাসের অন্তঃসত্ত্বা হলেও সে টের পায়নি। কলেজের কাছে একটা বাসা ভাড়া নিয়ে উঠে জাহেদা। দূর সম্পর্কের এক ভাগ্নীকে সাথে নেয় সে।জুই নামের মেয়েটি তখন নবমে পড়তো।বেশ বুদ্ধিমতি আর ভালো মেয়ে জুই।খালার সেবা যত্ন করেও ঠিক মতো লেখাপড়া করে গেছে সে।মাঝে মাঝে আলী বাসায় এসে জাহেদার কাছে থাকতে চাইতো।কিন্তু জাহেদা এলাও করতোনা।এরপর যখন জাহেদার কোলে কন্যা সন্তান আসে তখন প্রথমে আলী তাকে ভুল বুঝলেও একটা সময় বুঝতে পারে ওটা তারই সন্তান।তখন সে লজ্জায় আর স্ত্রীর সামনে যায়নি।
মেয়েটা যখন স্কুলে যাওয়া শুরু করে তখন জাহেদা বদলি হয়ে অন্য শহরে চলে যায়।ফলে স্বামী স্ত্রীর মাঝে আর কোনো যোগা যোগ থাকেনা।দুজন দুজনের সাথে কোনো যোগাযোগ রাখার চেষ্টাও করেনি।আর এদিকে যৌথ পরিবারে সকলের আদরে বড় হতে থাকে জাবির।কিন্তু রাতে মাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমানোর অভ্যাসের কারনে ঘুমাতে যাওয়ার সময় হলেই সে তার মায়ের জন্য কান্নাকাটি করতো।আর ওকে তখন সামলাতো ওর বাবা।ওর মাকে গিয়ে নিয়ে আসার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ওকে ঘুম পাড়াতে হতো।আস্তে আস্তে জাবির বড় হতে থাকে।পড়াশুনা আর নানারকম উৎসব আনন্দে সময় কেটে যায় ওর।স্কুল,কলেজ,বিশ্ববিদ্যালয় পাস করে বিদেশে চলে যায় পি,এইচ,ডি করতে।সেখানে গিয়ে সে পরিচিত হয় এমন এক বাঙালি ছাত্রীর সাথে যে নাকি জাবিরের মায়ের ছাত্রী ছিলো।ওদের পরিবারের সব কথা ওই মেয়েটি জানতো তার মেমের মাধ্যমে।ওর নাম শিউলী।
শিউলি তার মেমের বাসায় গিয়ে পড়তো।প্রায়ই বাসায় প্রিয় মেমের নানা কাজ করে দিতো।একসাথে বসে খেতো।গল্প করতো।সে চাইতো তার মেম যেনো নিজের সংসারে ফিরে যান।কিন্তু পরিবারে কিছু দুষ্ট লোকের কারনে তার মেম রাজি হতেন না।শিউলি জাবিরের সাথে মিশতে মিশতে একদিকে যেমন তার নিজের প্রতি ওকে খুব দুর্বল করে ফেলেছিলো সেই সাথে জাবিরকে মায়ের প্রতি খুব অনুরাগী করে তুলেছিলো।হঠাৎ কাউকে কিছু না জানিয়ে শিউলিকে সাথে নিয়ে দেশে ফিরে আসে জাবির।সবাই খুব অবাক হয়।হঠাৎ এভাবে চলে আসার কারন জানতে চায় পরিবারের লোকজন। জাবির কারও কোনো কথার জবাব দেয়না।কারো সাথে ভালো করে কোনো কথাই বলেনা।সেসময় একদিন জাবিরের মায়ের কলেজে ওর মাকে বিদায় সম্বর্ধনা উপলক্ষে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে কলেজের শিক্ষার্থীরা।বক্তারা একেকজন আসছেন আর বক্তব্য দিয়ে ফিরে যাচ্ছেন নিজ আসনে।হঠাৎ মাইকে বক্তা হিসেবে ঘোষণা আসে জাবিরের নাম।
মেমের সন্তান পরিচয়ে ওর নামটা বলা হলে জাহিদা খুব অবাক হয়।কখন,কিভাবে অতিথিদের মাঝে জাবির এসে বসেছে টেরই পায়নি ওর মা।নাম ঘোষণার সাথে সাথে মাইক সামনে রেখে দাড়ায় জাবির।কতক্ষণ নিরবে দাড়িয়ে থাকে সে।তারপর ঘাড় ফিরিয়ে নিজের মায়ের মুখটা চেয়ে দেখে কয়েক সেকেন্ডে।মায়ের পাশে আরেকটা সোফায় বসা তার ছোটো বোনকেও দেখতে পেয়ে কতক্ষণ চেয়ে থাকে সে।তার বোনটাও খুব অবাক হয়ে নিজের ভাইকে দেখতে থাকে।এরপর জাবির ধীরে ধীরে বক্তব্য উপস্থাপন করতে থাকে।প্রচন্ড আবেগ নিয়ে নিজ মায়ের প্রতি তার যা যা অনুভূতি ছিলো,আছে সব চমৎকার ভাষায় বলে যায়।দর্শক শ্রোতা সকলের চোখে তখন জলের রেখা।তারা গোপনে চোখ মুছতে গিয়ে একে অন্যের কাছে ধরা পড়তে থাকে।বিশেষ করে ও তখন বলছিলো,
“জানো মা,তুমি চলে যাওয়ার পর এমন কোনো রাত নেই যে রাত আমি মা মা বলে কাঁদিনি।এমন কোনো বেলা খাবার আমি খেতে পারিনি যখন গুমোট কান্নায় আমার শ্বাসনালীতে খাবার আটকে বিষম খাইনি।এমনকি বিদেশে গিয়েও।তা সত্ত্বেও তোমাকে খুব ঘৃনা করেছি।কারন আমাকে সারাক্ষণ তোমার নামে নিন্দা মন্দ শুনতে হয়েছিলো।তাই শত ইচ্ছে তাকা সত্ত্বেও কখনও তোমার কাছে যেতে পারিনি।যেতে চাইনি।যন্ত্রণার আগুনে পুড়ে পুড়ে আমি একেবারে খাক হয়ে গেছি।পৃথিবীতে ভালোবাসা বলে কিছু আছে তা ভুলেই গেছিলাম।কিন্তু আমার বন্ধু শিউলি আমার সব ভুল ভেঙে দিয়েছে।তাই আমি ছুটে এসেছি আমার মায়ের কাছে।সব ফেলে।” তারপর হঠাৎ নাটকীয় ভঙিতে মায়ের দিকে ফিরে দুহাত ছড়িয়ে মাকে ডেকে বলে,”এসো মা,তোমার ছেলেকে বুকে টেনে নাও”
এমন একটা মুহুর্তের জন্যই অপেক্ষায় ছিলো জাহিদা। তার বিশ্বাস ছিলো একদিন তার ছেলে তার বুকে ফিরে আসবেই।আজ সেই বহুল প্রতীক্ষিত দিন।তাই উঠে দাড়িয়ে ছলছল চোখে নিজ পুত্র, কলিজার টুকরা,নাড়ী ছেঁড়া ধন জাবিরের দিকে ছুটে যেতে থাকে।সামান্য একটু দূরত্ব। অথচ পথটা যেনো শেষই হচ্ছেনা।অনন্ত কাল লেগে যাচ্ছে। যখন গিয়ে পৌছলো তখন মা ছেলের কান্নায় পুরো অডিটোরিয়াম ভিজে একাকার হয়ে গেলো।সকলের চোখের জলে নিজ নিজ বক্ষ ভাসতে থাকে।সে কান্না কেবল কষ্টের নয় অনেক আনন্দেরও।আর মায়ের হাতের পরশ ফিরে পেয়ে নতুন এক জীবন ফিরে পায় জাবির।
গল্পের বিষয়:
গল্প
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত