রাতারগুল

রাতারগুল
“তুমি যাবে না আমার সাথে?”
“না,যাবো না।”
“তোমার আমার সাথে যাওয়া উচিত।এটা কি বুঝতে পারছো না?”
“তা পারছি।কিন্ত ইচ্ছের বিরুদ্ধকাজ আমার অপছন্দ সেটা তো তোমার জানা।”
“ইচ্ছের বিরুদ্ধ কাজ সবারই অপছন্দ।তবে সেই অপছন্দের কাজ যদি তোমার পছন্দ হয়,তখন?”
“তুমি ডিরেক্টলি বলো কি বলতে চাচ্ছো?”
“তোমাকে বিয়ে করাটাও আমার অপছন্দের তালিকাতেই ছিলো।”
সে আর কথা বাড়ালো না।বাথরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে এলো।মিনিট পনেরো লাগলো তার রেডি হতে। মাসিমনির বিয়ে এটেন্ড করলাম।বৌভাতে থাকার জন্য অনেক অনুরোধ করলো দাদু।থাকতে পারলাম না।পরদিন অফিস ছিলো।
ঐ দিনের কথা কাটাকাটির পর সে আমার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিলো।তবে তাকে দেখে মোটেও মনে হচ্ছে না সে আমার ওপর রেগে আছে।সে সম্পূর্ন স্বাভাবিক আচরন করছে,আমার বাসায় ফোন দিয়ে সে দিব্যি মায়ের সাথে হাসি মুখে কথা বলছে,তার কলেজের বান্ধবীদের সাথে ভিডিও কনফারেন্সও খুব ভালো ভাবেই ইনজয় করলো।
অস্বাভাবিক শুধু একটা বিষয়ই ছিলো,আমার সাথে কথা না বলা। অফিসের রাস্তাটা খুব বেশি বাজে হয়ে গিয়েছে।উবার-পাঠাও কেউই ঐ রাস্তায় যেতে চায় না।আর গেলেও প্রায় ডাবল ভাড়া চার্জ করে।এভাবে চলতে থাকলে এই শহরে সারভাইভ করা দায় হয়ে যাবে। মাসি মনি ফোন দিলো।তারা হানিমুনে রাতারগুল যাচ্ছে।আমরা যাবো কিনা জিজ্ঞেস করলো।আমি তুর্নার সাথে কথা বলে জানাবো বলে ফোন রেখে দিলাম।
বিয়ের প্রায় সাত মাস চলছে।দুজনের সম্পর্কের গ্রাফ সর্বদাই উঠানামারত অবস্থায় ।হাসি মুখে আমি সকালে বলছি তো কাজের প্রেসারে রাতে অকারনেই হালকা রুড বিহ্যাভ করেছি।মেয়ে হিসেবে সে অমার্জিত নয়,তাই দিন দুয়েক আমার এমন বহুমুখী আচরন সহ্য করে নিলো। তবে সে সর্বংসহাও ছিলো না,একটা চাপা ক্ষোভ সে মনে দমিয়ে রাখতে পারতো।আর সেটাকে চেপে রেখেই আমায় তার ক্ষোভের আচ অনুভব করানোর একটা অদ্ভুত ক্ষমতা তার মধ্যে ছিলো। অফিস থেকে বাসায় ফিরে তুর্নাকে ঘরে দেখলাম না।দরজা খোলা ছিলো।কিন্ত এভাবে পুরো বাসার দরজা খোলা রেখে সে বাসায় নেই,এটা বিবেকহীন কাজ ছাড়া আর কিছুই না।অসম্ভব গরম লাগছিলো।গোসল করতে হবে।টাওয়েল টা হাতে নিয়ে বাথরুমের দিকে এগোতেই দেখি দরজা আটকানো।সে কি ভেতরে।কিন্ত এই অসময়ে সে বাথরুমে কেন?
সে আমার সামনে দিয়ে চুলগুলো মুছতে মুছতে ড্রয়িং রুমের দিকে চলে গেলো।খানিকটা গিয়ে, থেমে গেলো সে।আমি তখনো তার দিকে তাকিয়ে আছি।সে আমার দিকে ঘুরে তাকিয়ে আমায় প্রশ্ন করলো,”কিছু বলবে?”
আমি খানিকটা লজ্জা পেলাম।মাথা নিচু করে খানিকটা তড়িঘড়ি করে বাথরুমে ঢুকে পড়লাম।কথা বন্ধ করার পর এই প্রথম সে আমার সাথে কথা বললো।তবে কথাবলার পুনঃযাত্রা যে এভাবে শুরু হবে সেটা ভাবতে পারি নি।
বাথরুম থেকে বের হয়ে ড্রয়িং রুমে গেলাম।গিয়ে দেখি সে টিভি অন করে বসে আছে।সনি টেন চ্যানেলটিতে রেসলিং চলছিলো।মেয়েদের রেসলিং দেখার একটি সুপ্ত ইচ্ছা সব ছেলেদেরই থাকে।তবে ছোট বেলায় আম্মু আর বড়বেলায় বউদের ভয়ে কেউই তা দেখার দুঃসাহস করে না। তাকে এভাবে মেয়েদের রেসলিং দেখতে দেখে অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছিলো আমার।এটাকি মেয়েদের সহজাত প্রবৃত্তি?দুটো মেয়ে মারামারি করছে,তা আসলেই একটা বিরাট বিনোদনের ব্যাপার অন্য মেয়েদের ক্ষেত্রে।এটা ফিকশন নয়,ফ্যাক্ট?
দুজন মিলে নিঃশ্চুপ থেকে প্রায় তিনটি রেসলিং ম্যাচ দেখলাম।হটাৎ করে সে আমার দিকে রিমোট এগিয়ে দিলো।আমি রিমোটটা হাতে নিতেই সে সোফা ছেড়ে উঠে যেতে উদ্ধত হলো। খানিকটা সাহস জুগিয়েই তার ডান হাতটা টেনে তাকে আবার সোফায় টেনে বসালাম।সোফায় বসা মাত্রই আমি তার হাতটা ছেড়ে দিলাম।যা করেছি এইমাত্র তা নিয়ে আমি সত্যিই ভয়ে ছিলাম। ভয়ে ভয়ে তার মুখের দিকে আমি তাকালাম।ঘটনাটায় সেও খুব ভালো করেই অবাক হয়েছিলো,তা তার চোখ আর মুখের অভিব্যাক্তি দেখেই বোঝা যাচ্ছে।আমি তখন মাথা নিচু করে ছিলাম। প্রায় মিনিট পাচেক চুপ থাকার পর সে আমার মুখের সামনে দুটো তুড়ি মেরে বললো,”এই দিকে তাকাও।” আমি তার দিকে তাকাতেই সে বললো,”কিছু বলবে?” আমি খানিকটা সময় নিয়ে স্থির হলাম। বললাম,”রাতারগুল যাবা?”
“কেন?”
“মধুচন্দ্রিমায়।”
“কার মধুচন্দ্রিমা?”
এই প্রশ্ন শুধু আমি কেন,পৃথিবীর কোন পুরুষই তার বঊয়ের কাছে কখনই আশা করবে না। আমি তার দিকে বড় বড় চোখ করে কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকলাম।সে আমায় পাত্তা না দিয়ে টিভির দিকে তাকিয়ে থাকলো। কিছুক্ষন পর আমার দিকে তাকিয়ে বললো,”চা খাবে?” আমি মাথা নেড়ে হ্যা বললাম। আজ বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকলেও হবে না।আর এই মেট্রোপলিটন শহর গুলোতে বৃষ্টির ফোটা আর কিচেন-ট্যাপ হতে ঝরে পড়া জলবিন্দু আলাদা করার সুযোগ নেই। আজকের মতো অফিস শেষ।অফিস বিল্ডিং এর নিচে দাড়িয়ে আমি।খুব বৃষ্টি হচ্ছে।একটাও রিকশা-বা সিএনজি এর দেখা নেই।মুষুলধারে বৃষ্টির প্রকোপ বেড়েই চলেছে। একটা হুডতোলা রিকশা হটাৎ করেই সামনে এসে দাড়ালো।রিকশার ভেতরে কেউ আছে কিনা বোঝা গেলো না।বৃষ্টির তোড়ে সব কিছু খুব ঘোলাটে লাগছিলো।রিকশা খালি ভেবে রিকশাওয়ালা কে হাতে ইশারা দিয়ে কাছে ডাকলাম।
রিকশাওয়ালা কাছে আসতেই রিকশার ভেতর থেকে একটি লোক চাপাতি হাতে নিয়ে হটাৎ বেরিয়ে এলো।এলো পাথাড়ি প্রায় দশ থেকে পনেরোটা কোপ বসিয়ে দিলো আমার সারা গায়ে।আমি মাটিতে লুটিয়ে পড়লাম।শেষের দুটো কোপ আমার ঘাড়ে এসে লেগেছিলো।বৃষ্টির তোড় তখনো খুব জোর ছিলো। আমার চোখের সামনে দিয়েই আমার রক্তমাখা বৃষ্টির জল নালার দিকে বয়ে যাচ্ছিলো। চোখ মেলতেই নিজেকে একটা ছোট আবদ্ধ ঘরে খুজে পেলাম।উপরে একটা দশ ওয়াটের নিয়ন বাতি জ্বল জ্বল করছিলো।আমার হাত দুটো ছোট সিংগেল বেডের দুমাথার সাথে বাধা।মাথা প্রচন্ড ব্যাথা করছিলো,খানিকটা শক্তি জুগিয়ে বলার চেস্টা করলাম,”কেউ আছেন,এই যে,কেউ শুনছেন?”
আমার বিছানার নিচে থেকে একটি মাঝ বয়েসি ছেলে আর একটি বছর ১৭এর মতো একটি মেয়ে শুয়ে ছিলো। তাদের মাথা দুটি বের করে উকি দিয়ে আমার দিকে তাকালো একবার।ছেলেটি বললো,”ভাইজান,একটু চুপ থাকুন।পাচ মিনিট।আপনার সব প্রশ্নের জবাব পাবেন।” আমি চুপ থাকতে পারলাম না।আমার সাথে কি হচ্ছে?কেন হচ্ছে এসব।হটাৎ করেই তূর্নার কথা মনে পড়লো।সে কেমন আছে।আমি কতদিন ধরে এখানে আছি,সে কি ঠিক আছে। এসব চিন্তা আমায় ভেতর থেকে কুড়ে খাচ্ছিলো। আমার আবার চিৎকার দিয়ে বলার চেস্টা করলাম,”আমি কোথায় আছি?কেন এখানে আমি।কেউ বলো দয়া করে প্লিজ।”
আজ তিন মাস হয়ে গিয়েছে শুভ্র বাসায় নেই।তুর্নার এই ৯০দিনের প্রতিটি দিনই একটা রেগুলার রুটিনে চলেছে।শুভ্র অফিস থেকে সন্ধার আগে ফিরতো প্রতি দিন।সেদিন রাত বারোটা পর্যন্ত অপেক্ষা করলো তুর্না।তাকে ফোনে না পেয়ে থানায় মিসিং ডায়েরি করলো।দুদিন পর পুলিশ তুর্নাকে নিয়ে শুভ্রর অফিসে গেলো অফিসের সামনে থাকা সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়া সেদিনের ফুটেজ চেক করতে।কিন্ত প্রচন্ড বৃষ্টির তোড়ের কারনে সেদিন ক্যামেরায় কিছুই ধরা পড়লো না। পুলিশের কাছে একটাই ভরসা ছিলো,শুভ্রর ফোন ট্রাক করা যেটা পড়ে ছিলো শুভ্রর অফিসের সামনে থাকা ময়লার নালীতে। নিয়ম করে তুর্না প্রতিদিন থানায় যায়।নতুন কোন বেওয়ারিশ লাশ পাওয়া গিয়েছে কিনা খোজ খবর নেয়।শহরের প্রতিটি থানায় সে শুভ্রর এক কপি ছপি পাঠিয়ে দিয়েছে,যাতে করে কোন অজ্ঞাত লাশ পাওয়া গেলে তা দেখতে যদি শুভ্রর মতো হয় তবে তুর্নাকে যেন খবর দেয়া হয় সে লাশটি শুভ্রর কিনা তা নিশ্চিত করার জন্য।এভাবেই কাটছে কেটে যাচ্ছে তার ব্যাস্ত সূচি।
এদিকে শুভ্র তথা আমি সেই ঘুপচি ঘরে থেকে ক্রমাগত প্রশ্নগুলো করেই যাচ্ছি।অনেকক্ষন পর আমার বিছানার নিচে শুয়ে থাকা ছেলে-মেয়ে দুজন নিজেদের কাপড় ঠিক করতে করতে দরজা খুলে বেরিয়ে গেলো।তারা বেরিয়ে গিয়ে দরজাটি আবার লাগিয়ে দিলো। কিছুক্ষন একটি মোটা মহিলা আমার ঘরে ঢুকলো।সাথে কয়েকটা কম বয়েসি মেয়ে আর একটা লিকলিকে মাঝবয়েসি ছেলে।মোটা মহিলাটি পান চিবুচ্ছিলো।পুরো ঠোট লাল হয়ে আছে উনার।জর্দার সুগন্ধ পাচ্ছিলাম।উনার পরনে জামদানি শাড়ি টাইপ কিছু একটা গলায় মোটা মুক্তোর মালা।নাকে নথ।সাথে থাকা নেয়েগুলোর সাজগোজও খানিকটা ওমন।তবে তাদের নাকে নথ নেই।তবে মেয়েগুলোর কোমরে বিছা ছিলো।এই মোটা মহিলাকে দেখলেই কোন এক পতিতালয়ের সর্দানী টাইপ মনে হয়। মহিলাটি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে লিকলিকে লোকটিকে আমার হাতের বাধন খুলে দিতে বললেন। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,”কেমন আছো? ” আমি বললাম,” জ্বি,ভালো।”
“তুমি এখানে কেন এলে কিভাবে এলে এটাই তো ভাবছো তো?”
“হ্যা,আমি এটাই ভাবছি।আমাকে যেতে হবে।আমার প্রশ্নের উত্তর গুলো দিয়ে আমায় ছেড়ে দিন।আমায় যেতে হবে।”
“কোথায় যাবা তুমি?”
“আমার বাসায়।আমার উনি একা থাকতে পারে না।”
“পারে না বলা ঠিক হবে না ,বলো পারতো না।এখন ঠিকই পারে।প্রায় তিন মাসের বেশি হয়ে গিয়েছে তুমি এখানে।ভালো কথা সে কি এখনো তোমার বাসায় আছে আদৌ?হাহা!”
“তার মানে আমি তিন মাস ধরে এখানে?”
বিস্ময়ে আমার মাথা ফেটে যাচ্ছে। মহিলাটি বললো, “প্রায় তিন মাস আগে এখানে বঙ্গোপসাগরে একটি ঘুর্নিঝড় হয়।সে ঝড়ে প্রায় তিনটি ইলিগাল জাহাজ ডুবির ঘটনা ঘটে বঙ্গোপসাগরে।যার একটির মধ্যে ছিলে তুমি।আধমরা অবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যের কোথাও পাচার হচ্ছিলো।ভাগ্য তোমার ভালো যে তুমি এই দ্বীপের পূর্ব তীরে পড়ে ছিলে আর আমাদের নজরে পড়েছো।”
“আমি এখন আছি কোথায়?”
“দক্ষিন বঙ্গোপসাগরে জাগা একটি চর এ।কয়েকবছর আগেই জেগেছে।তুমি যেখানে আছো এটা মূলত একটা পতিতালয়।আর তুমি একটি গ্যাং এর ফাদে পড়ে মরতে বসেছিলে।খোদ ওপরোয়ালা তোমায় বাচিয়েছেন।”
“গ্যাং?”
“হ্যা,গ্যাং।’র’ গ্যাং।
এদের কাজের ধরন খুবই আলাদা।এদের বায়ার মূলত মধ্যপ্রাচ্যের কিছু ধনী লোক।যাদের বিশ্বাস যে কানের নিচে তিল আছে এমন লোকের পায়ের পাতার মাংস খেলে যৌবন শক্তি চীরস্থায়ী হয়।এই গ্যাং মূলত বাংলাদেশের কিছু আন্ডারওয়ার্ল্ড গডফাদার দ্বারা পরিচালিত হয়।” “কিন্ত আমার কানের নিচে কি তিল আছে?'” “ছিলো,এখানকার হতুড়ে ডাক্তার আপনার কানের তিল এসিড দিয়ে সরিয়ে দিয়েছেন।তিন মাস অচেতন থাকায় আপনি তা টের পান নি।” ” আমি ফিরে যেতে চাই।আমায় সাহায্য করুন” আমার কথা মোটা মহিলাটি শুনলো কিনা আমি বুঝতে পারলাম না।হটাৎ করেই উনি উনার সাথে থাকা সবাইকে বের করে দিলেন। একটি সীমকার্ডের মতো কিছু একটা আমার হাতে দিয়ে বললেন, ‘গিলে ফেলুন তারপর বলছি এটি কি?”
আমি কিছুটা ইতঃস্তত করলাম।গিলতে চাইলাম না।মহিলাটি একটি ধারালো ছুরি বের করে আমার গলায় ধরলেন।আমি মাইক্রোচিপ টি গিলতে বাধ্য হলাম। গেলার পর উনি আমায় বললেন, “আপনি যে করেই হোক এই মাইক্রোচিপটি আর্মি হেডকোয়ার্টারে পৌছে দেবেন।কিছু কনফিডেন্সিয়াল তথ্য আছে।আর হ্যা,র গ্যাং এর ব্যাপারে এ টু জেড সব তথ্য এতে আছে।’ আমি খানিকটা ইতঃস্তত করে বললাম,”আমায় আপনি বিপদে ফেলছেন।আমি শুধু ঘরে যেতে চাই।এইটুকু দয়া করুন শুধু।” উনি আমার মাকে একটি বিভৎস গালি দিয়ে বললেন, “এতক্ষনে কোন শেখের পেটে থাকতি।ঘুর্নিঝড়ে জাহাজ ডোবার পর ক্ষত বিক্ষত দেহ জাহাজের কন্টেইনার থেকে বের হয়ে তীরে এসেছে,তোর ভাগ্য সহায় ছিলো সেটুকু পর্যন্তই।এখন যে কথা বলছিস সেটা আমাদের দয়া মনে কর।যা বলছি কর।”
সেখান থেকে বের করে আমায় চোখ বেধে একটি ট্রলারে ওঠানো হলো।প্রায় দুই দিন ট্রলার চললো। আমার পাশে দাড়িয়ে থাকা লোকেদের একজনের ওয়াকিটকিতে একটি মানুষের আওয়াজ শুনতে পেলাম,”আম্মা যাবতীয় প্রমানাদী চোখ বান্দা কু**বাচ্চাকে দিয়ে দিয়েছে।ঐ হালায় তীরে পৌছালেই আমি শেষ।ফেলে দে।দেরী করিস না।” লোকটি জবাবে বললো,”ম্যাডাম তো উনাকে তীরে পৌছে দিতে বললো,স্যার।” “তোর মেয়েতো এবার ক্লাস সেভেনে উঠবে নাহ?কেমন আছে সে খোজ নিছিস?” কথাটি শেষ হওয়ার আগেই আমায় জলে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলো লোকটি।বাচার জন্য ছটফট করার মতো শক্তি ছিলো না গায়ে।সমুদ্রে তলিয়ে যেতে যেতে তূর্নাকে সমুদ্রের নীল জলে মিশে যেতে দেখলাম।মা-বাবার কথাও মনে পড়লো।শান্তির পথে এ যাত্রা আমার শুভ হোক,নিষ্কন্টক হোক। আর্মি হেডকোয়ার্টারে বসে আছি।পাশেই ও বসে আছে।আমার দেহের ভেতরে একটি চিপ আছে তা মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে অনেক আগেই চেক করে নিয়েছিলো আর্মি পারসোনেলরা।
সেবার ডুবে গেলেও মরি নি।সমুদ্র আমার মতো পাপীকে নিতে অস্বীকৃতি জানায় তাইতো নিজ দায়িত্বে তীরে পৌছে দেয় আমায় সৌভাগ্যবশত সেদিন আমাকে সমুদ্র তীর থেকে কতিপয় কোস্টগার্ড সদস্য আমায় উদ্ধার করে।জানি না আমার এই তৃতীয় জীবন কার দেয়া? সমুদ্রের দান নাকি কোস্ট গার্ড সদস্যদের। হসপিটালে আরো সপ্তাহখানেক ভর্তি ছিলাম।খানিকটা স্বাভাবিক হতেই তুর্নাকে খবর পাঠাই।সে আসে।তাকে সব খুলে বললাম।তুর্নার বাবা আর্মির উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা হওয়ায় বাকি কাজ সারতে সমস্যা হয় নি।সেই চিপ আর্মির কাছে হস্তান্তরিত করে বাসায় ফিরি। বাসায় ফিরে আশার পর পরই তুর্না আবার কথা বলা বন্ধ করে দেয়।তিন দিন আমিও চুপ ছিলাম।অভিমান করেছে হয়তো। পরদিন সকালে সে খুব ভোরে উঠে আমায় জাগালো, আমি ঘুম ঘুম চোখে বললাম,”কি হইছে?” সে বললো,”যাবা?” আমি বললাম,”কই?”
“রাতারগুলে?”
“কেন যাবো?”
“মধুচন্দ্রিমায়”
আমি বললাম”কার মধুচন্দ্রিমা? ” সে আমায় দুইটা লাত্থি দিলো।অন্যদিকে মুখ করে আবার শুয়ে পড়লো । “আমরা আসছি রাতারগুল।কোন হোটেল থাকলে প্লিজ কেউ একটা ডাবল বেড এসি রুম এক সপ্তাহের জন্য বুক করে রাখবেন ।ধন্যবাদ।”
গল্পের বিষয়:
গল্প
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত