রাজকুমার

রাজকুমার
সুমনের সাথে এত বছর পর এভাবে হঠাৎ দেখা হয়ে যাবে ভাবতেই পারিনি। সুমনকে দেখে যতোটা চমকাবার কথা ছিল আমি তার চেয়ে বেশি চমকে গেছি আজ। একটা সময় সুমন আমার ক্লাসমেট, ভাল বন্ধু অতঃপর আমরা প্রেমে পড়েছিলাম। আমার আর সুমনের মধ্যে অর্থনৈতিক ফারাক ছিল চোখে পড়ার মত। যেখানে আমি রোজ নিজের বাবার গাড়ি করে কলেজ যেতাম, সেখানে সাধারণ একটা গ্রাম থেকে উঠে আসা সুমন শহরের কলেজে পড়বে বলে লজিং এ থেকে রোজ একটা ভাঙ্গা সাইকেল চেপে আসত। প্রথম দিকে আবেগে ভরপুর ছিলাম বলে তার কোন কিছুতেই আমার আপত্তি ছিল না। যদিও অন্য বন্ধু বান্ধবীরা আমাকে এ নিয়ে ক্ষেপাতো। ছোটবেলা থেকে অতুল প্রাচুর্য মাঝে বড় হয়েছি বলে একটা সময় ঐ প্রেমে আমি হাঁপিয়ে উঠি।
সুমন আমার চেম্বারের টেবিলের সামনের চেয়ারে বসে পড়ল, পাশে শূণ্য চেয়ারটায় তার সাথে থাকা মেয়েটি বসল।
নিশ্চয় মেয়েটা তার বউ হবে। মেয়েটাকে চিনিচিনি মনে হচ্ছে। হ্যা মনে পড়েছে, মেয়েটার নাম নিরুপমা। আমাদের কলেজের পিয়ন বিজন কাকার মেয়ে। আমাদের থেকে এক বছরের জুনিয়র মেয়েটি। অবাক হচ্ছি, সুমন হিন্দু মেয়ে বিয়ে করেছে। এবার খেয়াল করলাম , সুমন আমার দিকে এক দৃষ্টে চেয়ে আছে। নীরবতা ভেঙ্গে জিজ্ঞেস করলাম, আমাকে চিনতে পেরেছো সুমন! সে চোখ নামিয়ে বলে চিনব না কেন ! নিরুপমার দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কেমন আছো নিরুপমা। নিরুপমা আমার মুখে তার নাম শুনে অবাক হয়, আমি বুঝতে পেরে বলি, তুমি বিজন কাকার মেয়ে তাই না। কলেজে অনেকবার তোমাকে দেখেছি।
নিরুপমা কিছু বলার আগেই সুমন বলে উঠে, মাহমুদা আমি নিরুপমাকে বিয়ে করেছি। বিজন কাকা মারা যাওয়ার পর ও খুব একা হয়ে যায়। কি বলব বুঝতে পারছি না। ভেতরটা যেন অনেকদিন পর কেমন করে উঠলো। এতদিন পর যদিও এসবের কোন মানে হয় না। সুমনের সাথে আমার ব্রেকাপটা হওয়ার কথাই ছিল। একটা সময় সদ্য যৌবনে পা দেয়া এই আমার একজন ভালবাসার মানুষ দরকার ছিল। সুমনের মত বয়সে বড়, প্রাণচঞ্চল একজন অভিবাবকের দরকার ছিল। সুমন ছিল সেদিকটায় বেশ পারফেক্ট। কলেজের শুরুর দিনগুলোতে কথা বলতে বলতে বন্ধুত্ব তারপর কী করে আমরা পরস্পরেরর তুমুল প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম। কারণে অকারণে আমার অভিমান ভাঙ্গানো, তুমুল বৃষ্টিতে হাত ধরে বৃষ্টিতে ভেজা, আমার ভাল লাগার প্রতিটি অনুসঙ্গে তার সদয় উপস্থিতি আমাকে তার দিকে আকর্ষণ করত।
সুমনের ফাঁকা পকেট, ভাঙ্গা সাইকেলে চেপে কলেজ আসা, আনস্মার্ট সব মিলিয়ে কোন কিছুই আমার চোখে বড় করে ধরা পড়েনি। সুমন পড়ালেখায় খুব মনযোগী ছিল না কিংবা আমার প্রেমে পড়ার পর হয়ত তার পড়ালেখা দিন দিন কমে যাচ্ছিল। আমি যতোটা না প্রেমে মশগুল ঠিক ততোটাই পড়াশোনায় সিরিয়াস। বাবার স্বপ্ন ছিল আমাকে ডাক্তার বানানোর। আমি সেদিকে বেশি মনযোগী ছিলাম। সুমনের বর্ণিল চেহারা একটা সময় আমার কাছে প্রকটভাবে ধরা পড়লো। কিছুটা মানিয়ে নিতে সমস্যা হচ্ছিল। কারণ অকারণে তার ফোন দেয়া বিরক্তিকর লাগছিল। ততোদিনে উচ্চমাধ্যমিক কলেজ শেষ করে সবে মেডিকেলে ভর্তি হলাম। মেডিকেলে ভর্তিযুদ্ধে যখন খুব ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম তখন সুমনের অস্থিরতা বেড়ে যায়। সময় অসময়ে দেখা করা, ফোনে কথা বলা কোনটাই সম্ভব হচ্ছিল না।
ভর্তি শেষ করে একদিন সুমনের কথায় তার সাথে দেখা হলো আগের থেকে সুমন বেশ বদলেছে নাকি আমি বদলে গেছি বুঝতে পারছি না। যেখানে এক সময় আমার পাগলামিতে ভরপুর থাকত এখন সেখানে সুমনের পাগলামি বেড়েছে মাহমুদা বলো সুমন আমি শুনছি ইদানিং তুমি আমাকে এড়িয়ে যাচ্ছো, বুঝতে পারছো তুমি ! কই নাতো ! মেডিকেলে ভর্তি নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম বাবা। আচ্ছা, আমাদের সম্পর্কের পরিণতি কি! কী আবার ! আমরা এবার একটা সিদ্ধান্তে আসতে কী পারিনা। কবে বিয়ে সাদি করব। এবার আমার বেশ রাগ হলো। যেখানে পড়াটাই শেষ হলো না আর তার উপর এসব পাগলামি দেখো সুমন বিয়ের সময় এখন নয়। আমরা দুজনেই এখনো পড়াশোনায়। বিয়ের পর ও পড়াশোনা করা যায়। না যায় না। তুমি হয়ত আমাকে এখন ওভাবে চাইছো না। এই কদিনে তুমি বেশ বদলে গেছো মাহমুদা।
সুমনের দিকে কিছুটা রাগতস্বরে থাকালাম। মলিন প্যান্ট, রুক্ষ চেহারা, কেমন যেন একজন দাঁড়িয়ে আছে আমার সামনে। আমি এমন রুক্ষ সুক্ষ, আনস্মার্ট কাউকে চাইনিতো আমার পাশে। কী করে তবে সুমনের প্রেমে আমি একদিন মজেছিলাম ভেবে পাই না। নিজেকে নিজেই গালি দিই। আমি চিরদিন একজন রাজকুমার চেয়েছিলাম কিন্তু এই মুহুর্তে সুমনকে আমার রাজকুমার মনে হচ্ছে না। কিছু বলছ না যে, সুমন প্রশ্ন করে। দেখো সুমন, তোমাকে সরাসরি কিছু কথা বলি। আমার বাবার স্বপ্ন আমি ডাক্তার হব। আমি যেকোন মুল্যে তাই হতে চাই। সেজন্য অনেক সময় দরকার। তোমার আমার যক পার্থক্য , বাবা কখনোই মেনে নেবে না। আর বাবার বিরুদ্ধে গিয়ে আমি কিছু করতে পারব না। সবচেয়ে ভাল হয় আমাদের সম্পর্ক এখানেই শেষ হোক।
তোমার প্রতি একটা সম্মান রেখেই আমি এই সম্পর্ক শেষ করতে চাই। কী বলছো মাহমুদা ! তুমি কী আমাকে ছাড়া থাকতে পারবে। হু পারব। পৃথিবীতে না পারার মত কিছু নেই। আমি যাচ্ছি, তুমি আর কখনোই যোগাযোগ করো না আমার সাথে। পড়াশোনা করো, চাকরী করে একটা সুন্দর দেখে বউ বিয়ে করো। আমার ভাল লাগবে। আজকের পর আমাদের আর দেখা হবে না। এক নি:শ্বাসে কথা শেষ করে সেদিন আমি পালিয়ে এলাম। পেছনে সুমনের কান্না, চিৎকার সব উপেক্ষা করে সেদিন পালিয়ে এসেছিলাম বলে হয়ত আজ ডাক্তার হয়ে তার সামনে বসে আছি। সম্বিৎ ফিরে পেলাম অতীত স্মৃতি থেকে। সুমনের বউ অন্তঃসত্ত্বা । ভাল করে চেকাপ করে বিদায় দেবার প্রাক্কালে সুমন আমার হাতে আমার ভিজিট পাঁচশত টাকা ধরিয়ে দিল।
আমি না না বলতেই কিছুতেই মানলো না। হয়ত অনেক অভিমান, অনেক কষ্ট তার। চলে গেল বউকে নিয়ে। আমি চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে রইলাম। কী হত যদি আমি থাকতাম তার সাথে। বাসায় ফিরে এসে বার বার অতীতে ফিরে যাচ্ছিলাম। মন কেমন কেমন হয়ে উঠছে বার বার। পুরোনো ডাইরিতে খুঁজে পেলাম সুমনের ফোন নাম্বার। যদিও জানি না আদৌ সে নাম্বার সে ব্যবহার করে কীনা। চাইলে আজ নাম্বার রাখতে পারতাম কিন্তু কিছুটা দ্বিধা সংকোচ মিলিয়ে আর রাখা হলো না। একবার রিং হতেই সেই চিরচেনা কণ্ঠস্বর….হ্যালো আমি মাহমুদা বলছি সুমন। তুমি দেখছি নাম্বার চেঞ্জ করোনি। নিশ্চয় ভেবেছিলে কোনদিন আমি ফোন দেব।
হাহা সুমন হাসতেই আছে। কতদিন পর আজ সুমনকে অচেনা লাগছে। সুমন তোমার কী আমাকে মনে পড়ে না। এতদিন পর এসব বলতেই কী ফোন দিয়েছো। না না তা হবে ক্যানো তাহলে তুমি কবে বিয়ে করেছো ! মাহমুদা বিয়ের তো আজ অনেক বছর। নিরুপমা কী করে আমার প্রেমে পড়ে গিয়েছিল। তার বাবার শেষ কয়েকটা দিন আমি পাশে ছিলাম। মেয়েটার কোন ছায়া ছিল না বাবা মারা যাওয়ার পর। আমার ও আম্মা চলে যাবার পর কেউ ছিল না। তাই দুজন দুঃখী পরস্পরের দুঃখ ভাগ করতে এক হয়েছি। আমার বড় একজন মেয়ে। ছয় বছর হলো। আর আরেকজন আসছে সামনে। যার জন্য তোমাকে দেখাতে গেছি। অবশ্য আগে জানতাম না তুমি চেম্বারে বসো। জানলে কী আসতে না। জানি না মাহমুদা। বাদ দাও তোমার কথা বলো।
আমার কোন কথা নেই। আমি তোমার মেয়েকে দেখতে আসব। ঠিকানা দাও। এই প্রথম সুমন না করতে পারলো না। বাসার ঠিকানা দিল। কিন্তু সেটা আমার শহর থেকে বেশ দূরে। পরদিন যাব বলে সিদ্ধান্ত নিলাম। পরদিন বেলা এগারোটার নিজের প্রাইভেট কারে রওয়ানা দিলাম।যেতে যেতে প্রায় দুপুর গড়িয়ে বিকেল এসে গেলো। ঠিকানামত বাসায় এসে পৌছলাম। সুমনের দেয়া ঠিকানায় পৌছাতে অবশ্য তেমন সমস্যা হয়নি। মুল গেইট খোলাই ছিল। কাউকে না দেখে একেবারের বাসার ভেতরের গেইট এসে কলিং বেল দিতেই নিরুপমা দরজা খুলে দিলো..দিদি আসুন ভেতরে।
এই প্রথম সুমনের বাসায় আসলাম। বেশ পারপাটি গোছানো, খুব সুন্দর ছিমছাম বসার ঘরটা। দেয়ালে সবুজ আর লালের মিশেলে রং দেয়া, দেয়ালে টাঙ্গানো বঙ্গবন্ধুর ছবি একপাশে, অন্যপাশে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কবি নজরুলের ছবি টাঙ্গানো। সোফার একপাশে ফুলদানি সাজিয়ে বেশ যত্নে রাখা সব। নিরুপমাকে পেয়ে নিশ্চয় অনেক সুখী এখন, অথচ এতকিছু করে কী সুখ সে পেলো। এর মাঝে মেয়েকে নিয়ে রুমে ঢুকে সুমন..সরি গোসল করতে দেরি হলো। না না ঠিক আছে, সমস্যা নেই। তোমার মেয়েটা বেশ বড় হয়ে গেছে। এদিকে আসো মামনি। কী নাম তোমার ! বর্ষা..আসতে আসতে মেয়েটি বলে। চমকে উঠি আমি। আমাদের একটা স্বপ্ন ছিল, প্রথম সন্তান হবে মেয়ে। নাম হবে বর্ষা। সুমন এই নামটা দিয়েছিল। বর্ষার হাতে তার জন্য আনা কিছু গিফট দিতেই সে মায়ের কাছে চলে গেলো। রান্নাঘর থেকে আওয়াজ পাচ্ছি টুং টাং। হয়ত আমাকে কিছু দেয়ার জন্য নিরুপমা চা নাস্তা তৈরি করছে। মাহমুদা তুমি বিয়ে করোনি এবার সুমনের প্রশ্ন।।
মেডিকেলে সিনিয়র ব্যাচের এক রাজকুমারের প্রেমে পড়েছিলাম আবার। তারপর ডাক্তার হবার আগেই বাধ্য হয়ে দুজনে বিয়ে করেছিলাম। প্রথমদিকটায় সব স্বপ্নের মত ছিল। যেমন চেয়েছিলাম ঠিক তেমন রাজকুমার ছিল চয়ন।
তারপর খুব বেশিদিন সুখ কপালে সয়নি। আস্তে আস্তে লোকটার আসল চরিত্র প্রকাশ পেতে লাগলো। অল্প স্বল্প নেশা থেকে দিন দিন বাড়তে থাকলো। আমার উপর অকারণে নির্যাতন বেড়েই গেলো। দু দুটি সন্তান গর্ভ ধারণ করেও রাখতে পারিনি। আসলে সুখ আমার জন্য নয়। তোমার স্বামী এখন কোথায় ! এরপর নির্যাতন সইতে না পেরে একেবারে আলাদা হয়ে গেছি। এখন আমি আমার মতই থাকি, একা একা। সারাদিন ব্যস্ত থাকি হাসপাতালে ডিউটি। বিকেলে নিজের চেম্বারে বসি। আর রাত জেগে চাঁদ পাহারা দেই। এই আমার জীবন সুমন।
সুমন কিছু বলার আগেই নিরুপমা চা নাস্তা নিয়ে রুমে ঢুকে। আমার কিছু খেতে ইচ্ছে নেই নিরুপমা। রাস্তায় ফেরিয়ালা কাছে থেকে কত কি খেয়েছি। কী বলেন দিদি। প্রথম আসলেন আমাদের বাসায়। অনিচ্ছা সত্ত্বেও নাস্তা খেতে শুরু করি। ভাল লাগছে না কিছুই । কেন আসলাম এখানে। নিজের হাতে কোরবানি দেয়া প্রেমকে দেখতে আসা । নাকি নিরুপমা নামের মেয়েটির সাথে থাকা তার আসল রাজকুমারের সুখী সংসার দেখতে আসা। কিছুই বুঝতে পারছি না। জীবনে প্রতিষ্টিত হয়ে কত কী স্বপ্ন দেখেছিলাম অথচ তুচ্ছ নিরুপমার সুখটুকু আমার হল না। নিজের পায়ে সব মাড়িয়ে আজ কেনই বা আফসোস করছি। চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বললাম সুমন আমাকে উঠতে হবে। তোমাদের সংসার দেখতে এসেছিলাম , ভীষণ ভাল লাগলো। এখন উঠি। সুমন বাঁধা দেয়। অল্পক্ষণ থাকো। আজ নিরুপমার জন্মদিন। অন্তত একটা ঘন্টা থাকো। জন্মদিনের কেকটা কেটে তারপর যাও।
সুমনের অনুরোধ ফেলতে পারলাম না। যদিও সন্ধ্যা হতে খুব বেশি বাকী নেই । বেশি রাত হয়ে গেলে, অচেনা জায়গায় একা একা যাওয়াটা বেশ রিস্ক হবে। দেখা গেলো পরে আজ আর ফেরা হবে না। কিন্তু নিরুপমার সংসারে সে একটা মুহুর্ত থাকতে চায় না। তবু সুমনের অনুরুধ উপেক্ষা করতে পারিনি এবার, কিছুক্ষণ থাকার সিদ্ধান্ত নিলাম।
নিরুপমাকে সাথে নিয়ে পুরো বাড়িটা ঘুরে দেখি অনিচ্ছা সত্ত্বেও। বর্ষা মেয়েটা আমার পাশে পাশে হাঁটছে। জন্মদিনের কেক কাটা ছাড়া বাড়তি কোন আয়োজন চোখে পড়ছে না দেখে তাড়া দিলাম সুমনকে। কেক সামনে এসে আনা হলো। একপাশে নিরুপমা, একপাশে বর্ষা আর সুমন দাঁড়িয়ে কেক কাটছে। আমি নিরুপায় হয়ে পাশে দাঁড়িয়ে আছি। নিরুপমা আর সুমন একে অপরকে কেক খাওয়াচ্ছে। কেন যেন আমার ভেতরটা ক্রমশ পুড়ছে। এমন কেন হচ্ছে। আমি নিজেই তো সব কবর দিলাম। তবে আজ আমার এতদিন পর কেন এমন হলো।
এখানে না আসলেই বোধহয় ভাল ছিল। কেক কাটা শেষ করে বিদায় নিলাম। যদিও সুমন কিছুটা পথ আমার সাথে আসতে চেয়েছিল কিন্তু আমি নিজেই মানা করলাম। আমি গাড়িতে উঠেই স্টার্ট দিলাম। সন্ধ্যা পেরিয়ে এখন কিছুটা অন্ধকার। সম্ভবত বৃষ্টি আসবে, আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। মনটা বেশ বিষণ্ণ । মনের উপর এখন আর আমার নিয়ন্ত্রন নেই। বড় রাস্তার মোড়ে এসে গাড়ী বাঁক দিতেই অঝোর ধারায় বৃষ্টি নেমে এলো। আমি ছুটে চলছি অন্ধকার মাড়িয়ে অল্প আলোয়। কেন জানি আজ অনেকদিন পর চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে বার বার। গাড়ীর গ্লাস আর চোখের পাতা ভিজেই চলছে।
সারা বাড়িটা ঘুরে দেখার সময় নিরুপমার কাছে শুনেছে সুমন একটা হাই স্কুলে শিক্ষকতা করে। ছাত্র প্রাইভেট পড়ায়। আমার তার সুমনের সম্পর্কে সবটুকু জানে নিরুপমা। সুমনই তাকে সব বলেছে। সব জেনে নিয়েই কী সুন্দর সংসার করছে মেয়েটা। অথচ কত অবলীলায় সে সব ছেড়ে দিয়ে কেবল রাজকুমার খুঁজতে বেরিয়েছিলো এতদিন। অথচ আসল রাজকুমার কে নিজেই একদিন ফেলে চলে গিয়েছিল। আজ আর তার কোন অধিকার নেই।
গাড়ী এখন উল্কার বেগে ছুটে চলছে। মনের ভেতর কী সব কথা এসে ভীড় জমাচ্ছে। আচ্ছা এই মধ্যবিত্ত সংসারে যদি সে থাকত তবে কী খুব ক্ষতি হত ! এমন কী আকাশ ভেঙ্গে যেত যদি এই রাজকুমারের পাশে থেকে দুমুঠো ভাত কম খেতো। সুমনকে পাওয়ার স্বপ্ন তার ছিল না। অথচ এই হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নের জন্য আজ এত কষ্ট, হাহাকার , কান্না সব চেপে ধরেছে তার সমস্ত সত্ত্বা। তবুও এটুকুই সান্ত্বনা, ওরা ভাল আছে।
গল্পের বিষয়:
গল্প
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত