চলতি পথে

চলতি পথে
জানালার পাশে সিট পরেনি দেখেই মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো।রাগে গিজগিজ করতে করতে ব্যাগটা কোনোমতে রেখে সিটে বসে পরলাম। বসতে না বসতেই ফোন বেজে উঠলো।আব্বু ফোন দিয়েছে…
-আব্বু তোমাকে কয়বার বলেছি বলো 2 সিটের টিকেট কাটার কথা?কি করলা তুমি?
-আরে মা টিকেট একটাই ছিলো আমি কি করবো বল?
-হ্যাঁ হইছে যাও!
-হাহাহা! মা,রাগ করিস না।
-হু আচ্ছা যাও রাখো ফোন ।আর অজথা টেনশন করবা না একদম।আমি পৌছে তোমাকে কল করবোনে।
-আচ্ছা মা সাবধানে যা।
“আব্বুর ফোন রাখতেই পাশ থেকে একটা কন্ঠস্বর ভেসে আসলো”-
-আপা আপনে কই যাবেন? পাশে তাকিয়ে দেখি, মধ্যবয়সী একটা লোক হাসিহাসি মুখ করে তাকিয়ে আছে। অনিচ্ছা সহিত বললাম’ঢাকা যাচ্ছি।’
-ও আইচ্ছা। কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বললো- আসলে এতক্ষণ আপনার কথা শুইনা বুঝলাম আপনার ও আমার বউয়ের লাহান ব্যাধি আছে।হাহাহা। এই পর্যায়ে এসে আমার প্রচন্ড বিরক্ত লাগতে শুরু করলো।মনেমনে ভাবলাম,একে তো সিট নিয়ে মেজাজ খারাপ তার উপর আবার উটকো লোকের জালা।ধুর!” উনি একটু হেসে বললেন,
-আমেনার মা ও জানালার পাশে ছাড়া বইতে পারে না।তার আবার ঘুরানির ব্যারাম আছে।জানালার পাশে বইলে নাকি তার ঘুরানি পায় না।আজকেও তারলাইগাই এক এসটেন্ড(স্ট্যান্ড )আগে থেইকা গাড়িত উইঠা সিট লইতে হইছে!তারে বসাইয়া নাইমা যামু। “এই মূহূর্তে লোকটাকে আমার অসাধারণ লাগলো!ভাবলাম, আরেহ! আজকাল এত গভীর টান আছে নাকি কারো জন্য কারোর! অনুভব করতে লাগলাম কতখানি টান নিয়ে তিনি কথাগুলো বলে যাচ্ছেন!!” বললাম,নামবেন কেনো?আপনি যাবেন না?
-যাইতে তো চাইছিলাম আফা!কিনতুক মালিক ছুটি দেয় নাই।কত কইরা কইলাম একটা দিন ছুটি দিতে!দিলো তো না-ই উল্টা চাকরি ছাঁটাইয়ের হুমকি দিলো!
ডাক্তার আফা কইছে এই সময়ে নাকি মা ও বাচ্চারে বেশি বেশি যত্নআত্তি করতে আর পুষ্টিকর খাওন খাওয়াইতে ।তাছাড়া আমার বড় মাইয়াডা নানা বাড়িত থাইকা পড়া শুরু করছে।কেলাস (ক্লাস) টুতে উঠছে ওইহানেও খরচপাতি আছে ।এই সময়ে যদি কাজটা হারাই তাইলে তো পথে বসন লাগবো।তারলাইগা আর বাড়াবাড়ি করলাম না। হালকা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, গরীব মাইনষের কাম-ই তো বড়লোক গো কথা মতো চলা।গরীব গো কোনো কথা নাই আফা।হাহা! “আমি চুপ করে আছি।কি-ই বা বলার আছে আমার!!যে যত বড় তার গলার স্বর ও ততো উঁচুতে !আর যে যত ছোটো তার গলার স্বর ও ঠিক ততটাই নিচুতে!” স্ট্যান্ড চলে আসতেই লোকটা তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললো,
-হে আবার রাস্তাঘাট আউলাইয়া ফেলায়!যাই নিয়ে আসি। ‘আমি মৃদু হাসি দিলাম।আনমনে ভাবতে লাগলাম ,এখনো এমন মানুষ আছে!আমার ধারনা ক্রমশই ভুল প্রমাণিত হতে লাগলো। এরই মধ্যে দেখলাম উনি আপাদমস্তক ঢাকা একজনকে ধরে নিয়ে আসছেন।আমার আর বুঝতে বাকি রইলো না উনিই সেই ‘আমেনার মা’।উনি আমার পাশে বসিয়ে দিতে দিতেই বলল,
-আহারে আফা।আপনার অনেক কষ্ট হইতাছে তাই না?ইশশ আমার বউডার যদি আপনার লাহান ব্যাধি না থাকতো তাইলে আর এই কষ্ট ডা পাওন লাকতো না। “তখন পাশ থেকে মেয়েটা বললো, আফা আপনার বেশি খারাপ লাগলে আপনে বসতে পারেন এইখানে।
-আরে না না কি বলেন আপু!আমার এখন আর খারাপ লাগছে না।আপনি বসেন ঠিক মতো। ‘বাস ছেড়ে দিবে তখন মেয়েটা তাড়া দিতে লাগলো-আরে নামেন না ক্যান?বাস ছাইরা দিবো তো।
-আরেকটু থাকি না।
-বাস তো ছাইরা দিতাছে।থাকবেন কেমনে।নামেন তাড়াতাড়ি।
-তুমি পারবা তো যাইতে ঠিক মতো?
-পারমু না ক্যা! আমি কি বাইচ্চা পোলাপান নি?আর আফা টা তো আছেই!আর এসটেনডে তো আব্বা আইবই নামায়া নিতে । আপনে অজথা টেনশন কইরেননা তো।নামেন এহন।
“উনি নামলো ঠিকই কিন্তু বাস ছারার পর ও জানালার পাশে দৌড়াতে দৌড়াতে বলতে লাগলো,’দশ মিনিট পরপর তোমারে কল দিমুনে।আর পানি আছে ব্যাগে একটু পর পর খাইবা।ডাক্তার আফা কি কইছে মনে নাই!’ “বাস তার নিজের গতিতে চলতে শুরু করলো।আমেনার মায়ের দিকে আর তাকাচ্ছি না।আমি আবেগি না।কিন্তু  ছলছল চোখ আমার খুবই বাজে লাগে। ‘মানুষের চোখের পানি অনেকটা চুম্বকের মতো!আসে পাশের সবাইকে আকর্ষণ করে ফেলে!’ আমি কিছুটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম!হঠাৎ একটা ডাকে ঘোর কাটলো আমার! পাশে তাকাতেই দেখলাম ১০-১২বছরের রোগা-পাতলা একটা ছেলে ৩-৪ প্যাকেট চকোলেট নিয়ে দাড়িয়ে আছে।আমি তাকাতে বললো’
-আফা চকোলেট কিনবেন?এগুলান অনেক মজা একটা খাইয়া দেখেন! আমি একটা হাসি দিয়ে বললাম, ‘আরেহ তোমারই তো চকোলেট খাওয়ার বয়স পার হয়নি!আর তুমি এগুলা বিক্রি করতে বের হয়েছো?
-কি যে কন আফা!গরিব মাইনষের আবার বয়স!গরীব মাইনষের কোনো বয়স-টয়স নাই!জন্মের পরেই তাগো বয়স ১০-১২ বছর বাইরা যায়!হেহেহে “আমার বিস্ময়ের আর সীমা রইলো না!এইটুকু ছেলে কত গভীর চিন্তাভাবনা! বিস্ময় কাটিয়ে জিজ্ঞাস করলাম,তোমার নাম কি?” ছেলেটা দাত বের করে হেসে বললো,
-রাজা! আল্লাহ্ বানাইলো প্রজা আর বাপ-মায় নাম রাখলো রাজা!হেহেহে!
আমি হেসে বললাম,’কি সুন্দর নাম!তোমার মা-বাবা জানে যে তুমি একদিন রাজার মতোই হবা তাই রেখে দিয়েছে।
বাস থামতে রাজা বললো-‘আফা আপনে খুব ভালা।আমরা তো গরিব তাই আমগোর লগে কেউ সুন্দর কইরা কথা ও কয় না।কিন্তুক আপনে কইলেন।যাই আফা। “আমি বললাম, আরে আরে কই যাও! তোমার মজার চকোলেট না দিয়েই চলে যাচ্ছ যে!” রাজা চোখ-মুখ উজ্জ্বল করে চকোলেট গুলো দিতে দিতে বললো,
-আইজ বইনডারে পেট ভইরা খাওয়াইতে পারমু!
“রাজা নেমে যাচ্ছে আর আমি অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে তাকিয়ে ভাবতে লাগলাম,’কত মানুষের বয়সের ভার বেড়ে যায় কিন্তু দায়িত্বের ভার বইতে পারে না!আর রাজার মতো কত বাচ্চারা বয়সের ভার বাড়ার আগেই দায়িত্বের ভার বয়ে বেরায়!'” চলতে চলতে মানুষের কত কিছুরই না সাক্ষী হতে হয়! আমেনার মা একটু পরপর পানি খাচ্ছে।কিছু ফল-মূল ও খাচ্ছে। বাধ্য মেয়ের মতো তার বরের কথা পালন করছে।আহ কি সুন্দর বন্ধন! ক্লান্তিতে চোখ বুঝে আসছে!হঠাৎ বাসের ঝাঁকুনিতে হকচকিয়ে চোখ মেলে তাকাতেই দেখলাম আমার বিপরীতি পাশে একটা মেয়ে নির্জীব চোখে জানালা দিয়ে বাহিরে তাকিয়ে আছে আর তার চোখ বেয়ে বেয়ে টপটপ করে পানি পরছে।হয়তোবা এই চোখের পানি দিয়েই একটা মন ভাঙার গল্প তৈরি হবে। মেয়েটাকে দেখে আমার অর্পিতার কথা মনে পরে গেলো।সেদিন কলেজ এসে বললো,
-দোস্ত আমরা কাল কোর্টে বিয়ে করে ফেলবো।
-হোয়াট!তুই তো ওই ছেলেরে এখনো সরাসরি দেখলি-ই না!বিয়ে করবি মানে!
-তাতে কি হইছে ও আমাকে অনেক কেয়ার করে।আর আম্মু-আব্বু ও বাসা থেকে প্রেশার দিচ্ছে।আমি ডিসিশন নিয়ে নিয়েছি দোস্ত।তুই আর বাঁধা দিস না।
“সেইদিন আমি আর অর্পিতা টাইম মতই গিয়েছিলাম কোর্টে।কিন্তু ওর সেই কেয়ারিং বয়ফ্রেন্ড আসে নাই।যার মায়ায় পরে মেয়েটা মা-বাবার মায়া ছেরে যেতে চেয়েছিলো,সে-ই ওরে ছেরে গেলো।আহহ প্রকৃতির কি অদ্ভুত লিলাখেলা।সেদিন অর্পিতা ঠিক এই মেয়েটার মতোই নির্জীব চোখে তাকিয়ে ছিলো পথের দিকে। মেয়েটার দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে ফেললাম।নির্জীব চোখে বেশিক্ষণ তাকানো সম্ভব না।সেই চোখে নিষ্প্রাণ ভাষা যে কাউকে গ্রাস করে ফেলার ক্ষমতা রাখে! কিছু কিছু ঘটনায় মানুষের চোখে-মুখে সুখের রেখা এঁকে দেয়।আবার কিছু কিছু ঘটনায মানুষকে আবেগে আপ্লুত করে ফেলে।
স্মৃতি সবসময় সুখটাকে মুছে ফেলে, দুঃখটাকে ধরে রাখে! নানা ঘটনার সাক্ষী হতে হতে আমি আমার গন্তব্যে চলে এসেছি। বাস থেকে নেমে আমি রিকশার উদ্দেশ্যে হাঁটতে শুরু করলাম।মাথা ঝিমঝিম করছে।সারাদিনর ক্লান্তি টা এতক্ষণে অনুভব করলাম!ঘোর কাটতে শুরু করছে। জীবন তার আপন গতিতে চলতে থাকে।জঞ্জালে ভরা ইট-পাথরের এই শহরে হঠাৎ মাঝেমধ্যে আবেগের ছোঁয়ায় যেন পাথর একটু পানির ছোঁয়া পায়!
গল্পের বিষয়:
গল্প
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত