আনজুমান

আনজুমান
আমার যখন কাল রাতে ঘুম আসছিলো তখনি আনজুমান আমাকে ছোট্ট একটা মেসেজ পাঠালো “পারলে মাফ করো। করবা না মাফ?” এরপর আমার চিন্তা ভাবনায় মনের ভিতর শুধু আনজুমান আর আনজুমান খেলছিল।কাল রাতে প্রচুর বৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু এই মেসেজ পাওয়ার পর মনে হচ্ছিল বৃষ্টি গুলো আমার চোখেই ঝড়ছে। কি অদ্ভুত তারপরে আমার আর একটুও ঘুম হয়নি।
আমি হাজার বার চেষ্টা করেছিলাম চোখ দুটায় একটু ঘুম আসুক। আফসোস কাল রাতে যদি এমন মেসেজ না আসতো আমি আজকে সুন্দর একটা সকাল উপভোগ করতে পারতাম।কিন্তু আমার চোখ দুটো লাল হয়ে আছে সেটা আমি বুঝতে পেরেছি। পুরো শরীর ক্লান্ত হয়ে আছে।জমির চাচা নৌকা চালাতে চালাতে আমাকে একটু আগে জিজ্ঞেসও করে ফেলেছে “তোমার চেহারা এমন দেখায় ক্যাঁ? রাইতে ঘুম যাইবার পারো নাই?” আমি চাচাকে কিছু বলি না। শুধু নদীর ওকূলে যতটুকু চোখ যায় তাকিয়ে আছি। আমার চুপ থাকা দেখে চাচা বললেন “আয়েশার বিচারে কাইল আছিলা? আসল ব্যাপার হইলো কি টেহা যার কাছে থাহে মানুষ তার কথায় কয়।টেহা যার কাছে নাই তারে কেউ দু পয়সা দিয়েও গনে না।”
আমি এই বিচারে গতকাল ছিলাম।আয়েশা শহরে থাকে। মাঝে মাঝে গ্রামে এসে তার বৃদ্ধ মাকে দেখে যায়।সবাই বলে আয়েশা শহরের একজন পতিতা। ও যখন এবার গ্রামে আসছিল গ্রামের সাদিকুর মেম্বর ওর সাথে রাত কাটাতে চেয়েছিল। সাদিকুর রহমানের যেমন টাকা পয়সা আছে আবার বড় বড় মানুষের সাথে হাত আছে। এটা গ্রামের সব মানুষই জানে। তবে তার স্বভাব চরিত্র ভালো না। তার দুইটা বউকে সে পিটিয়ে মেরে ফেলেছিল। কিন্তু পুলিশ যখন আসছিল তখন বলেছিল গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে।যাক সে সব কথা। আয়েশা তার কথায় রাজি না হওয়াতে সাদিক মেম্বর তার নামে বিচার বসিয়েছিল “এই মেয়ে গ্রামের মান ইজ্জত সব ডুবাইতেছে। ওর থেকে আর দশটা মেয়ে এসব নোংরামি শিখতেছে।
গ্রামে এসব পাপ হতে দিমু না, আমি যতদিন বাইচা আছি।” বিচারে যখন আয়েশা সব খুলে বলেছিল আসল কারণটা তখন সাদিকুর রহমান রেগে বলেছিল “তুই হইলি একটা মাগি। শহরে পর পুরুষের লগে হুইতে পারো আমার সাথে হুইতে সমস্যা কি আছিলো? আমি টেকা কম দিমু তা কি কইছিলাম। আমার বউ দুইটা মইরা গেছে। ওদের কথা মনে পড়ে। একটু সখ হইছিল। দুঃখের কথা কইছিলাম আমারে একটু সময় দে। আবার তুই ইজ্জতের কথা কস। মাগিদের আবার কিসের ইজ্জত? আমি চাচাকে বলি “প্রায় আমি একটা স্বপ্ন দেখি। আমার বাবার পকেটে কয়েকশত টাকা ছিল। হাস বিক্রির টাকা। রাতে বাবা ফিরার পথে এই কয়েকশত টাকার জন্য আমার বাবাকে কয়েকজন মিলে খুন করে। মা আমাকে নিয়ে বসে থাকে, কাঁদে। রাতে ঘুমাতো না।
এক সময় মা পাগল হয়ে যায়। মাকে বাসায় বেধে রাখে। আমি কাছে গেলে শুধু আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। আর বলে “ক্ষুধা লাগছে? কিছু খাবি?” এই স্বপ্নটা আমি বার বার দেখি। তারপর স্বপ্নটা ভেঙ্গে যায়। এই স্বপ্নগুলো সত্য। বাবা মাঝে মাঝে ঘুমে আসে। মাথায় হাত বুলায় দেয়। আর বলে “তোর মা আমার জন্য ছটফট করে। আমি তোর মাকে আমার কাছে নিয়ে আসলে তুই অনেক কষ্ট পাবি?” কিন্তু কাল রাতে আমি কোন স্বপ্ন দেখিনি। সারাটা রাত বৃষ্টির কান্না শুনেছি। আকাশের গর্জন শুনেছি। এমন গম্ভীর শব্দ করে বৃষ্টি কান্না করলে ঘুম কি হয় চাচা? মাঝখানে আমার একটা অন্যরকম জীবন শুরু হয়েছিল। এই জগতটার সাথে আমি পরিচিত ছিলাম না। কিভাবে বাঁচার মত বাঁচতে হয়, শ্বাস নিতে হয় আনজুমানের সাথে পরিচয় না হলে আমি বুঝতামই না। ওর সাথে পরিচয় হলো জাহাঙ্গীর নগর ইউনিভার্সিটিতে।
আমি যখন ভাসিটিতে ভর্তি হই। আমি কারো সাথেই তেমন মিশতাম না। ভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার কয়েক মাস যাওয়ার পর হঠাৎ করে একদিন ও আমার থেকে দু হাত দুরে বসে আমাকে বলেছিল “এই যে, একটু বসি? ভালো আছেন?” আমি হঠাৎ ধাক্কা খেয়েছিলাম কথাটা শুনে।কারণ আমি তেমন এই শহরের মানুষদের মত এতো ফার্স্ট ছিলাম না। আমি গ্রামে বেড়ে উঠা একটা ছেলে।ছোট বেলা থেকেই মায়ের ইচ্ছা আমি অনেক পড়ালেখা করবো।আফসোস আমি পড়ালেখা করি কিন্তু আমার মা জানে না, বুঝে না তার ছেলেটা কোথায় পড়ে এখন কতটুকু বড় হয়েছে। আমি যখন ভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে মায়ের কাছে গিয়ে কান্না করেছিলাম। মা তখনো আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। চোখের পানি মুছে দিয়ে সেই কথাটাই বলেছিল “ক্ষুধা লাগছে? কিছু খাবি?”
আমি আনজুমানকে বলেছিলাম “এখন হয়তো ভালো লাগছে। কিন্তু কখন মন খারাপ হয়ে যায় তার ঠিক নেই। আপনি ভালো আছেন?” আমি তার কথার উত্তর দিলেও সে আমার কথার উত্তর দেয় নি। আমাকে আবার প্রশ্ন করেছিল “এইভাবে বলার কারণ কি? আর আপনি সব সময় এমন হয়ে থাকেন কেন? আমি কি আপনাকে বিরক্ত করে ফেললাম?” আমি একটু সময় নিয়ে বলেছিলাম “মাকে ছাড়া এই শহরে আছি তো তাই। ভার্সিটিতে আসলে একটু ভালো লাগে ভার্সিটির এমন মায়া লাগানো পরিবেশটা দেখে। পরিবেশেটা অনেক সুন্দর।আমি একটুও বিরক্ত হইনি।
আনজুমান আমাকে বলেছিল “জানেন যাদের মন আছে তাদের মনে প্রকৃতি বেঁচে থাকে।মায়াবী এই প্রকৃতির বিস্তৃত নিজের মাঝে ধারণ করতে হলে দরকার লাগে শুধু একটা অন্তরদৃষ্টি।দেখার মত চোখ থাকলে সবই সুন্দর।যদি মন না থাকতো তাহলে কি কবিরা প্রকৃতি নিয়ে এতো সুন্দর সুন্দর কথা লিখতে পারতো? আচ্ছা আপনাকে একটা কবিতার শেষের কিছু লাইন শুনাই হ্যাঁ? জীবনানন্দ এর কবিতা ধানের রসের গল্প পৃথিবীর— পৃথিবীর নরম অঘ্রাণ পৃথিবীর শঙ্খমালা নারী সেই– আর তার প্রেমিকের ম্লান নিঃসঙ্গ মুখের রূপ, বিশুষ্ক তৃণের মতো প্রাণ, জানিবে না, কোনোদিন জানিবে না; কলরব ক’রে উড়ে যায় শত স্নিগ্ধ সূর্য ওরা শাশ্বত সূর্যের তীব্রতায়…
এটা আমার পছন্দের কবিতার কিছু লাইন।আর এমন হয়ে থাকবেন না কেমন? মানুষের সাথে মিশবেন, কথা বলবেন। দেখবেন সব ভালো লাগবে। এই যে আমাকে দেখুন। কেমন বক বক করে যাচ্ছি আপনার সাথে? অবশ্য বাসায় আমাকে একটা নাম উপাধি দিয়েছে আমার প্রাণ প্রিয় বাপজান। আমাকে বাকবাকুম বলে ডাকে। আচ্ছা আপনিই বলুন, আল্লাহ মুখ দিয়েছে কথা বলার জন্য। মনের ভাব প্রকাশ করার জন্য। চুপ করে থাকার জন্য?”
সেই থেকে আনজুমানের সাথে আমার পরিচয়।একটা সময় ও আমার খুব কাছের বন্ধু হলো। যার সাথে সব বলা যায়। দুঃখের কথা, সুখের কথা। মনের ইচ্ছার কথা। ও মাঝে মাঝে আমাকে এই সেই বলতো।যেদিন কোন প্রেজেন্টেশন থাকতো ও শাড়ি পরে আসতো। আমি দেখতাম কিন্তু ভান করতাম না দেখার মত। ও বলতো “এই আমাকে একটু ভালো করে দেখো।তোমার কি মনে হচ্ছে না আকাশ থেকে পরী নেমেছে?” কথা গুলো আমার খুব বুকে লাগতো। ওর প্রায় কথাই আমার বুকে লাগে। কিন্তু আমার ক্ষুদ্র অস্তিত্বটা ওর সামনে লুকিয়ে রাখতেই পছন্দ করতাম।
মা যখন মারা গেলেন আমি তখন ভার্সিটির তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। আনজুমানের সাথে আমার তখন ভালোবাসা ছিলো।আমি কখনো ভাবিনি আনজুমানের মত এমন মেয়ে আমার ভালোবাসায় আবদ্ধ হবে।মা মারা যাওয়ার সময় আমি তেমন কান্নাই করিনি। শান্ত ছিলাম। নানু আমাকে বলতো “তুই কাঁদিস না ক্যান আমার মেয়েটার জন্য? ও না তোর মা হয়?” আমি তারপরো কাঁদিনি। নানুকে বললাম “আমি মায়ের যন্ত্রনা গুলো বুঝতাম। বিগত বছর গুলো মায়ের যন্ত্রনা গুলো চোখের মাঝেই ধারন করেছি।
এগুলো দেখেই বড় হয়েছি। তোমার মেয়েটা খুব কষ্ট পেয়েছে নানু।এতো কষ্ট বুকে নিয়ে একটা মানুষ এতো বছর কিভাবে বেঁচে ছিল? আমার মা টা মরে গেছে ভালো হয়েছে। আমি চাই আমার মাটা শান্তিতে থাকুক। এটা ভাবতেই আমার নিজের কাছেও একটু শান্তি লাগছে। তার বিশ্রামের প্রয়োজন ছিল। আমার মা এখন খুব করে বিশ্রাম নিবে। আচ্ছা নানু আমি যে কাঁদলাম না। এমন করে বললাম তাহলে আমি কি মায়ের খুব খারাপ একটা ছেলে?” আমার নানু জড়িয়ে ধরে কান্না করেছিল অনেক। আমার চোখ দিয়েও পানি বের হয়ে আসছিল। কিন্তু আমি কাউকে দেখাইনি। দেখাতে ভালো লাগতো না।
সালটা ২০১২ আমরা তখন ভাসিটি পাস করেছি। আমার তখন মাথায় চাকরির চিন্তা। আনজুমানকে নিয়ে যে স্বপ্ন গুলো দেখেছি সেগুলো বাস্তবায়ন করার চিন্তা।কিন্তু আমাকে খুব অসহায় মনে হতো। মাঝে মাঝে কাঁদতে ইচ্ছা করতো। আমি তেমন কিছুই করতে পারছিলাম না। হঠাৎ করে ও একদিন বললো “আমি তোমাকে কিছু টাকা দেই। কিছু একটা শুরু করো। চাকরি কখন পাবে ঠিক নেই। পরিবার থেকে আমার যদি কিছু হয়ে যায় একবারো কিছু ভাবছো?” আমি তেমন কিছু বলতে পারতাম না।ওর যথেষ্ট সাপোর্ট ছিল আমার জন্য।ও নিজেই কয়েক্টা চাকরির ইন্টারভিউ ঠিক করে দিয়েছিল।কিন্তু তেমন কিছুই হয়নি তখন।
ঠিকি চার মাস পর ওর বিয়ে ঠিক হয়।আমি তখন রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছি একটা চাকরির জন্য আর টিউশনি করে বেড়াচ্ছি। ও যখন আমার সাথে দেখা করলো আমি বললাম “কিছু বলবা? তোমাকে এতো বিষণ্ন দেখাচ্ছে কেন?” ও আরো একটু সময় নিয়ে বললো “তোমার তো কোন গতি হলো না।তোমার কোন কিছু করার মুরিদ নেই। আসলে সবি আমার কপাল। এতোদিন তোমার কথা ভেবে সময় নষ্ট করেছি। আর ভাববো না। আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে। ছেলে কানাডা থাকে।
ছোট বেলা থেকেই তুষারপাত আমার পছন্দের।টেলিভিশনে যখন তুষারপাত পড়া দেখতাম তখন একটা ফিল হতো। এই তুষার পাতের সময় যখন চারপাশে মানুষজন তাকায় তখন মনে হয় চারপাশে তুষারপাতের স্তুপে বিশাল বিশাল সাদা ভাস্কর্য। আর কিছুদিন পর তো একদম কাছ থেকেই দেখবো। আমার ভাগ্য অনেক ভালো না?” আমি কি বলবো বুঝতে পারছিলাম না। শুধু নিচের দিকে তাকিয়ে বললাম “তুমি আমাকে এইভাবে অপমান করে কথা বলো কেন?” ও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো “আমার মাথায় মনে হয় প্রবলেম আছে। না হয় তোমার মত ছেলের সাথে এখনো পড়ে আছি।শোভন আমি জানি আমার বাবা মা কোনদিন এই সম্পর্ক মেনে নিবে না।আমাকে নিয়ে পালাবে?”
কথাটা বলেই ও ফুপাতে লাগলো। আমার খুব খারাপ লাগছিল।আমি ভাবছিলাম আমার মত ছেলের সাথে থাকলে জীবনে ও শুধু কষ্ট পেয়েই যাবে। ঠিক এখন যেভাবে কাঁদছে সারাটা জীবন কাঁদতে হবে। ওর ফ্যামিলির সাথে সম্পর্ক বিনষ্ট হবে। সুখ জিনিসটার সাথে কখনো আর পরিচিত হতে পারবে না। আমি অনেক কষ্টে কাঁপতে কাঁপতে বলেছিলাম “স্যরি। এমন সাহস আমার নেই।” তারপরই আমি উপলব্দি করলাম আমার গালে প্রচন্ড ব্যাথা। কারণ ও কষে একটা থাপ্পড় লাগিয়েছিল। তারপর আমার সামনে থেকে চলে গিয়েছিল।
আজকের রোদটা খুব তীক্ষ্ণ। আমি ঢাকায় চলে আসি। কাজে জয়েন দেই।নানুর শরীরটা ভালো নেই। ইদানিং ফোন করে কান্নাকাটি করে। তাই নানুকে দেখতে গিয়েছিলাম। কিন্তু আমি ভাবছি আনজুমান হঠাৎ আমাকে এতোবছর পর মনে করলো কেন? এসব ভাবতে ভাবতেই এক সপ্তাহ পর এক সন্ধ্যায় আমি আনজুমানকে ফোন দিলাম। ও চুপ করে ছিল। আমিও চুপ করে ছিলাম। ও নিজেই নিরবতা ভেঙ্গে বললো “খুব ব্যস্ত ছিলে? বা সংকোচে ছিলে ফোন দিবে কি দিবে না। তাই না? আমি মেসেজ দিয়ে বিরক্ত করলাম?”
আমার মাঝে একটা হাহাকার ভর করে। আগের মতই ওর কথা বলার ধরনটা রয়ে গেছে। আমি প্রসঙ্গ বদলে বললাম “কেমন আছো? কতদিন পর কথা হচ্ছে।তোমার কথা বলো। সংসার কেমন চলছে?” ও দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ঝিম মেরে থাকলো। আমি বুঝলাম কিছু একটা প্রবলেম।তারপর ও আরো একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো “ভালো। আমি আগামী মাসে আবার চলে যাবো। আমি ভেবে ছিলাম তোমার সাথে হয়তো কথা হবে না। তুমি নাম্বারটা বদলাওনি। যাই হোক এখন কথা হচ্ছে এটা ভেবে একটু শান্তি লাগছে। নাম্বার বদলাওনি কেন? আমি ফোন করবো বলে? আমার জন্য অপেক্ষা করছো? হা হা। আচ্ছা তুমি যে আমার সাথে কথা বলছো তোমার বউ শুনছে না?”
আমি চুপ করে থাকি।তারপর বলি “আমি খুব সাধারণ একটা মানুষ।আমি ঠিক এখনো বুঝিনা আনজুমান, ভার্সিটিতে তুমি অনেক ভালো ভালো ছেলে থেকে প্রপোজ পেয়েছো। তা স্বত্তেও আমাকে এমন করে কি বুঝে ভালোবাসছিলে?” সে আমার কথার প্রতিভাষ না দিয়ে বললো “আমি খুব ক্লান্ত জানো। এই যে একটু বেঁচে আছি, শ্বাস নিচ্ছি সব কিছুতেই ক্লান্ত লাগে।আমার বাচ্চাটা আমাকে ছাড়া কিছু বুঝে না।কতবছর পর নিজ দেশে আসলাম। সেই যে তোমার সাথে রাগ দেখিয়ে বিয়ে করে দেশ ছাড়লাম আর তিন মাস হলো আসছি।বেশ খাতির যত্ন করলো সবাই এই কয়েক মাস।কাল একবার দেখা করবে?”
ওর সাথে দেখা হলো এরপরের দিন বিকাল পাঁচটায়।ও কেমন যেন বদলে গেছো।আমি তার দিকে তাকলাম। বললাম “তুমি অনেক শুকিয়ে গেছো। সত্যিই তোমায় ক্লান্ত দেখাচ্ছে।” ও তেমন কিছু বললো না। আমি আবার বললাম “আমি আসলে প্রেম ভালোবাসা এসব নিয়ে বুঝতে চাইনি। কিন্তু ঢাকায় এসে তোমার সাথে পরিচয়ের পর মনে হলো কারো প্রতি ভালো লাগা জন্মানো খারাপ কিছু না। কিন্তু তুমি মাফ চাইলে কেন মেসেজে? তুমি আমার জন্য যা করেছো তার জন্য আমি সত্যিই তোমার কাছে কৃতজ্ঞ। আমি ঠিক মত তোমাকে দামটা দিতে পারিনি। আমি এতো বছর ধরে শুধু ভেবে এসেছি আমার জন্য তোমার মাঝে একটা ঘৃনা তৈরি হয়েছে। জানো আমার খুব খারাপ লাগতো। আমি সত্যিই চাইনি তোমার জীবনটা আমার সাথে থেকে নষ্ট হোক। আমার উচিৎ হয়নি তোমাকে এমন করে চাওয়াতে। মাফ তো আমার চাওয়ার কথা। তুমি আমাকে মাফ করে দিও। ভালোবাসলে, ভালোবাসার মত ভালোবাসতে হয়। স্বপ্নটা বাস্তবায়ন করার জন্য চেষ্টা করতে হয়। আমি সত্যিই পারিনি।কিন্তু আমার কোন পথ ছিল না।”
ও আমাকে বলে “এসব কথা ছাড়ো। তোমার প্রতি আমার একটুও ঘৃনা নেই। ক্ষমা চেয়েছি সেদিনের চড়টার জন্য। আমি জানি তোমার পরিস্থিতিটা তখন কেমন ছিল। এসব কাহিনী পুরানো। ঠিক নতুন বাড়িটার মত। এক সময় নতুন বাড়িটার মাঝেও জং ধরে।রং গুলো খসে খসে পড়ে।কাউকে চাইলেই পেতে হবে এটা কোথাও লেখা আছে? বলো আছে?”
আমি অনেক কষ্টে কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারলাম না। আজ অনেক দিন পর আবার ওর জন্য আমার কষ্ট হচ্ছে। আমি বললাম “সব কিছু মিলিয়েই জীবন। একটা বিষয় নিয়ে জীবন হয় না। আমি আসলে বুঝিনি কি করবো। কি করলে কি হবে। বয়সটাই বা তখন কতো। কিন্তু কয়েক বছর পর আমি উপলব্দি করেছি আমি ভয়ানক একটা ভুল করেছি। তোমাকে আমার কতটা দরকার ছিল আমি হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি।কোন কিছু হারিয়ে ফেললেই আমরা এর মর্মটা বুঝি।তার আগে এর মূল্যায়ন দিতে পারি না। আমাকে মাফ করে দিও।”
এর একটু পরেই আনজুমান আমার হাতটা ধরে। ও যখন আমার হাতটা ধরলো আমি তখন অন্য রকম একটা মানুষ ভাবতে শুরু করলাম। একদম ঠিক আগের মত অনুভবটা অনুভব করলাম।দুজনে দুজনের চোখে তাকিয়ে থাকলাম। কেউ কোন কথা বললাম না। কেন জানি আমি কান্না করলাম। ওর হাতটা সরিয়ে বললাম “তুমি কেন আমার সাথে দেখা করতে চাইলা? পুরানো ধুলো পড়া বইটা এইভাবে খুললা? তুমি কি বুঝো না? তোমাকে না পাওয়ার আঘাতটা আমার সত্ত্বায় কিভাবে আঘাত করে?
খবরদার তুমি আমার সাথে আর দেখা করবা না।” আমার কথা শুনে আনজুমানও কান্না করে। তারপর চোখের কোনের জল মুছে আমাকে বললো “আমি দেশের বাহিরে থেকেই তোমার খবর রেখেছি। আমি জানি তুমি এখনো বিয়ে করোনি। আমার বিয়ের পরও এক বছর পর যখন তোমার ব্যাপারে বন্ধুদের মাধ্যমে খোঁজ নিলাম জানতে পারলাম তুমি এখনো টিউশনি করে বেড়াও। আমি আসলে বুঝাতে পারবো না শোভন তুমি আমার জন্য কি। তাই ফারাজের মাধ্যমে একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দেই। এটা তোমার অজানা। তোমার কোন কিছু নিয়ে জোর করা আমার অধিকারে নেই।তবে অনুরোধটুকু তো করতে পারি? এইভাবে আর না। একটা বিয়ে করো। কেন নিজেকে এইভাবে রেখেছো? আমার মনে হলো তোমার সাথে একবার দেখা করা দরকার। তাই করলাম।কথা দিলাম আর যোগাযোগ রাখবো না।রেখেইছি বা কখন। আমি অনেক স্বার্থপর তাই না?”
আমি কান্না করতে লাগলাম।আমি জানি ও পবিত্র। ওর ভালোবাসাটা পবিত্র।আমি ওর চোখ দেখেই বুঝি সেই চোখে আমার প্রতি কতটা ভালোবাসা।আমার এমন কান্না দেখে ও বললো “দেখো আমি কি খারাপ তাই না? তোমার চোখে জল এনে দিলাম। দুঃখিত।আচ্ছা একটা কবিতা শুনাই। কতদিন তোমায় কবিতা শুনাই না। দেখি তোমার মনটা আবার স্থির করতে পারি কিনা।সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতা।
মন দিয়ে শুনো হ্যাঁ শরীর ফুরোয় ঘামে ভেসে যায় বুক অপর বাহুতে মাথা রেখে আসে ঘুম ঘুমের ভিতরে বারবার বলি আমি ভালোবাসাকেই ভালোবাসা দিয়ে যাবো অনেক রাত। আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে তারা গুনি।মানুষের জীবন গুলো এমন কেন।যে জীবনে সুখ দুঃখের মিশ্রন। একটু আগে নানুর সাথে কথা হয়েছে। আমার সাথে নানু যখন কথা বলতে চায় পাশের বাসার আসিফা খালার মেয়েকে বলে। আমি জানতে পারি সেই আয়েশা আর নেই। আয়েশার মা জানতো না আয়েশা শহরে এমন কাজ করতো। মানুষের মুখে শুনতো। কিন্তু বিশ্বাস করতো না।যখন বুঝলো তার মেয়ে এমন করে আয়েশার মা গলায় ফাঁসি খায়। মায়ের এমন মৃত্যু দেখে তার ঠিক একদিন পরে আয়েশাও গলায় ফাঁস দেয়।আমার খারাপ লাগে।
এই সমাজটা কত ভয়াবহ। সমাজের মানুষ গুলো ভয়াবহ।  তাই ভালোবাসাটা ভয়াবহ। কিন্তু ভালোবাসা কখনো ভয়াবহ হয় না। আমাদের সমাজের মানুষের স্পর্শেই আমরা ভালোবাসাটা ভয়াবহ করে ফেলি।সেই ভয়াবহের মাঝে আমি একজন অবুঝ। আর বাকি অবুঝদের মত এটাও বুঝলাম আমি ভাগ্যবান আনজুমানের মত একজন পেয়েছি। আনজুমান হওয়ার জন্য একটা মন থাকা দরকার। কেউ চাইলে সহজে আনজুমান হতে পারে না। যে আনজুমানের কাছে আমার জন্য ভালোবাসা বেঁচে থাকবে। বেঁচে থাকবে আমার অস্তিত্বটা তার মাঝে। কারণ সে একজন আনজুমান…
গল্পের বিষয়:
গল্প
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত