কখন যে ঝড় আসে

কখন যে ঝড় আসে

একটি অ্যান্টিরোমান্টিক প্রস্তাবনা কোনও কালবৈশাখীই অকালবৈশাখী নয়। কারণ কালবৈশাখীর মধ্যে  একধরনের অনিশ্চয়তা আছে যা নিষ্ঠুর, কিন্তু নিয়তিনির্ধারিত। প্রকৃতির মধ্যে এই সৃষ্টি এবং ধ্বংসের লীলা নিয়ে যে প্রচুর রোমান্টিক এবং আধ্যাত্মিক কাব্য রচিত হয়েছে, তা মনে হয় এখন আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। দুর্গার প্রবল বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়ার মতো বা জ্বরের মধ্যে পড়ে বাইরে প্রবল ঝড়ের আবহে প্রতি মুহূর্ত সেই অনিশ্চয়তার সঙ্গে দাবা খেলার মতো কালবৈশাখীকে ভিলেন বা অশনির দূত হিসেবে মনে করার পিছনেও সম্ভবত ভুল কিছু নেই। মোদ্দা কথা, আসলে নতুন কিছুই নেই, যা এখন কালবৈশাখী সম্পর্কে বলা যেতে পারে।

সব কথাই কালিদাস রায় থেকে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত বলে গেছেন। একমাত্র কবীর সুমনের ভাষায় বলা যেতে পারে, এখন মেঘ মানেই নোংরা জল। কিন্তু তা তো বিশেষ ভাবে কালবৈশাখী সম্পর্কে বলা হল না। ধরা যাক আমি কারও সঙ্গে দেখা করতে যাব এবং খটখটে রোদ্দুরে সেই দেখা করতে যাওয়ার সময়ে আকাশে মেঘের ছিটেফোঁটা নেই। যা রয়েছে তা একধরনের ভ্যাপসা গরম এবং আমার পক্ষে আবহাওয়াবিদের মতো হিউমিডিটি মেপে জীবনের গতিপথ নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তাহলে যখন কালবৈশাখী আসবে সেই অনিশ্চিত রুদ্রের মত, তখন আমাদের দুজনকে সেই কার্নিসের নীচে ভেজা কাকের মতো কাঁপতে হবে। আর সেই সময় বৃষ্টি বৃষ্টি করে মনের মধ্যে কোনও ময়ূর নেচে উঠবে না নিশ্চিত। তাই রোমান্টিকতার সঙ্গে ঝড় বৃষ্টি নিয়েও প্রচুর লেখা হয়ে গেলেও, এই সব মুহূর্তে  বানিয়ে বানিয়ে কাব্য আসে না। এমনকী পরবর্তী সময়েও আসে না। তবে অতি ঠেলা খেলে নোংরা জলের চেয়েও খারাপ কিছু কবিতার মতো দেখতে প্রেমের গ্যাদগ্যাদে ওভারডোজ বেরিয়ে আসতে পারে। কিন্তু সে সব পাতে দেওয়ার যোগ্য মোটেই নয়।

আজিকে যতেক বনস্পতির সেই কবে পড়েছিলাম। আজও মনে আছে। কারণ দৃশ্যটি পাল্টায়নি। এই কলকাতা শহরেই কত গাছ পড়ে যায়। সেই সব গাছের দেহ যখন রাস্তাজুড়ে পড়ে থাকে, দেখতে খারাপ লাগে। কালবৈশাখীকে খিস্তি মারতে ইচ্ছে করে। আরও খারাপ লাগে, যখন বুঝতে পারি, এভাবে গাছগুলির কালবৈশাখীর প্রভাবে হাওয়ার ধাক্কায় পড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ শিকড় দুর্বল হয়ে যাওয়া। মানুষ এমনিতেই গাছবিহীন ভাবে ভালো থাকবে বলে গাছের শাখাপ্রশাখা কেটে দিতে ভালোবাসে। মানুষের অসামান্য প্রকৃতিপ্রেম কিনা! কিন্তু এই যে গাছগুলিকে দুর্বল করে দিয়েছি আমরা, তার জন্য হাওয়ার দাপট পেলেই গাছগুলি পড়ে যায়, এ বিষয়টি মোটেই রোমান্টিক কিছু নয়। গাছের সঙ্গে প্রকৃতির যে শত্রুতা নেই, তা বুঝতেই পারি। কিন্তু মানুষের শত্রুতার এই ইতিহাস মনে হয়  ক্ষমার অযোগ্য। গাছ লিখতে পারলে তা পৃথিবীর ইতিহাসে গণহত্যার বিশ্বকোষ রূপে স্বীকৃত হত। কিন্তু কথা বলতে পারে না যেহেতু, তাই আমরা গাছকে কাটতে পারি। আমরা সেই সব মানুষকেও মেরে ফেলতে পারি, যারা কথা বলে। মানুষ এবং গাছের কী অদ্ভুত সম্পর্ক।

প্রেম নেই, কবিতা নেই? কেন থাকবে না? তবে তার চেয়েও বেশি যা থাকার কথা, তা মনে হয় আস্তে আস্তে মুছে যাচ্ছে জীবন থেকে। আর তা হল, বিস্ময়বোধ। মাঝেমাঝে কালবৈশাখী আসা এ জন্যই ভালো, কারণ, তা আমাদের দুই দুগুণে চার –এর পৃথিবীকে কিছুক্ষণের জন্য ঘেঁটে দেয়। এই ধরুন, কোনও মঞ্চ বাঁধা ছিল ভাষণের জন্য, কালবৈশাখীতে সব উড়ে গেল। কারুর বাড়ির জানলার কাচ ভেঙে গেল, কারো পুরো সন্ধে তথাকথিত ভাবে নষ্ট হল, বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে পড়ে গিয়ে সব জায়গা অন্ধকার ইত্যাদি। কারোর ক্ষতি হওয়াটা সম্ভবত প্রকৃতিরও লক্ষ্য নয়, কিন্তু এ কথা ঠিক,প্রকৃতির নিজস্ব নিরভিসন্ধি থাকেই। সেই নিরভিসন্ধির অন্যতম একটি বিষয় হল এলোমেলো করে দেওয়া। আমরা গড়পড়তা মানুষ জীবন নিয়ে খুব একটা পরীক্ষানিরীক্ষা করতে ভালোবাসি না।

আমাদের উন্মাদ হতে বা পাগল হতে ভয়। নিয়ম ভেঙে অন্য কোনও ভাবে বাঁচাটা যে চাই না তা নয়, কিন্তু সেই বাঁচাটা বাঁচতে চাওয়ার মধ্যে যে ঝুঁকি থাকে, যে ‘ঝড়’-এর দরকার হয় আমাদের তথাকথিত সামাজিক ব্যবস্থায়, সেই চাপ নিতে আমরা সচরাচর সক্ষম হই না। বা নিতে চাই না। কারণ আমরা আমাদের কমফোর্ট জোনে থাকতে ভালোবাসি। জীবন যদি বিচলিত হয়ে পড়ে, তবে যেন দূর থেকেই তাকে দেখতে পাই, যেন জীবন দিয়ে তাকে দেখতে না হয়। তো, কালবৈশাখী এমন ধারার মানুষের জীবনে একটা বিপর্যয় তো বটেই। মনে করেই দেখুন, হাঁসফাঁস করা গরম, চ্যাটচ্যাটে শরীর, আমরা ক্রমাগতই আক্ষেপ করছি ‘ ইশ একবার বৃষ্টি হলে কী ভালই না হত’ কিন্তু কালবৈশাখী যখন এলো, যখন ঝড়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল সব, শহরে যখন গাছ পড়ে প্রচুর ট্র্যাফিক জ্যাম, জল জমে থই থই, তখন আমাদের আবারও আক্ষেপ ‘ এমন একটা কালবৈশাখী এলো, সন্ধের সব প্রোগ্রাম দফারফা’! আরে ভাই চাইছিস টা কী? মৃদুমন্দ কালবৈশাখী বলে তো কোনও বিষয় হয় না।

আমি জলেও নামব কিন্তু বেণীও ভিজবে না, এমনটা প্রকৃতি বরদাস্ত করে না। কেউ কেউ অবশ্য ভাগ্যবান থাকেন, যাঁরা কালবৈশাখীও দেখেন সুরক্ষিত জানলা বা বারান্দা থেকে। কিন্তু তাঁদেরকেও পরোক্ষ ভাবে ঝড়ের প্রকোপ সইতেই হয়। মোদ্দা কথা প্রকৃতির যে রুদ্ররূপ, তার বলি হন সকলেই। এলোমেলো হয়ে যায় জীবন। আমাদের বিস্ময়বোধ বাড়ে। আর একটি বিষয় হয়, আর তা হল, প্রকৃতি বলে একটি বৃহৎ অস্তিত্ব যে আছে, একটি অকল্পনীয় আকারের বা আকারহীন অবস্থার যে সত্ত্বা বলে বিষয় আছে, সে সম্পর্কে আমরা প্রায়শই ভুলে যাই। যেন বা আছে, থাকার কথা বলেই সে আছে। কিন্তু তার এভাবে নিজেকে জানান দেওয়ার প্রয়োজন আছে খুব, তা প্রকৃতির হঠাৎ হঠাৎ মনে পড়ে। মনে যখন পড়ে, তখন প্রকৃতি তার তাণ্ডবলীলা চালাতে শুরু করে দিয়েছে। এই একঘেয়ে প্রভু-দাস-কেরানির জীবনে নিয়মকে ভেঙে ফেলার দরকারটা প্রকৃতির এই কালবৈশাখীর মধ্যে দিয়ে টের পেয়ে যাওয়াটা মন্দ ব্যাপার নয়। আর এটাকেই পুরোদস্তুর রোমান্টিক ব্যাপার যদি বলি, তাহলে কেউ আপত্তি করবেন?

পূর্বাভাস কখনও মেলে না ভাগ্যিস মেলে না! এই কথা শুনলে সবাই তেড়ে আসবেন। কিন্তু আসল কথা হল, পূর্বাভাস যদি মিলে যেত, তাহলে কালবৈশাখী তার রোমান্টিকতাই হারিয়ে ফেলত। ধরুন, আপনি নিশ্চিত জানেন, একটা নির্দিষ্ট সময়ে কালবৈশাখী আসবে। দাঁড়িয়ে থাকলেন ছাতে। আর কালবৈশাখী এল। যেন স্টেশনে মেট্রো আসছে। প্রেমটাই চলে যেত কালবৈশাখীকে নিয়ে। তার প্রতি প্রেম আছে, কারণ সে বারবার নতুন। তার প্রতি প্রেম আছে, কারণ সে প্রতিবার আকস্মিক, প্রতিবার অনিশ্চিত। তার প্রতি ভয় আছে, কারণ সে প্রতিবার এলোমেলো করে দেয়। আর এ কারণেই তাকে বেশি ভালোবাসি।

হয়তো রোমান্টিকতা বলতে এটুকুই, কালবৈশাখী কখন আসবে, তা জানি না। অপেক্ষা করে বসে আছি, সে আসবে, কিন্তু সে যখন আসবে আর আমাকে আদর করবে, আমাকে ঠেলে ফেলে দেবে, আমাকে ধ্বংসই হয়তো করে দেবে, তখন আমি তার হাত থেকে বাঁচার জন্য ছুটব। প্রকৃতির কাছে প্রার্থনা করব, থেমে যাও, থেমে যাও, থেমে যাও। কারণ আমার সে ক্ষমতা নেই, তোমাকে সম্পূর্ণভাবে গ্রহণ করার। তুমি যে আসবে তা আমি জানতাম না। তেমন তুমি যেমন হঠাৎ করে চলে যাবে, সেটিও আমি জানতাম না। যেন বিশ্বপ্রকৃতির এক গোপন নিরভিসন্ধি তোমার মধ্যে দিয়ে ফুটে ওঠে। কিন্তু এ সব কথা বিশ্বাস করুন, কালবৈশাখীকে বলাই যায় না। সে একাধারে সৃজনশীল এবং রুদ্র। সে একইসঙ্গে প্রেম এবং বিরহ। তাকে হারিয়ে ফেলব এ কথা সে জানে, তাই সে আসে আকস্মিক। আর চলে যায়। কিন্তু তার এই আসা আর যাওয়া বসন্তের বাতাসটুকুর মতো নয়।

যত জানি, তত জানি নে আদৌ কি কিছু বলার ছিল আমার কালবৈশাখী সম্পর্কে? মনে হয় না। শুধু বারবার প্রার্থনা করব, সে যেন এমনভাবেই থাকে। অজানা, অচেনা, বারবার নতুন এবং হঠাৎ হানা দেওয়া আগন্তুকের মতো সুন্দর। আর যেহেতু কালবৈশাখী চিরকালের মতোই অধরা, অজানা, চিরকিশোরী বা চিরকিশোর, তাই তার সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানি না। কালবৈশাখী যখন আসে, প্রতিবার সে যে অনুভূতিমালার জন্ম দেয়, তা নতুন। আর সে যখন আবার আসে, তখন, তার আগের সমস্ত অনুভূতিমালা ঝড়ের দাপটে মুছে যায়। তাকে জানি না বলেই তার জন্য অপেক্ষা করি। তাকে জানি না বলেই, সে আসে, রাজার মতো, আমাকে ভিখারি করে যায়।

গল্পের বিষয়:
গল্প
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত