অর্পা

অর্পা
দ্বিতীয় বিয়ের কথা শুনে একটু নড়েচড়ে বসলাম। বুকের ভেতর টা কেমন হু হু করে উঠলো। বেশ কয়দিন ধরে অফিস থেকে ফেরার পর আমার ঘরে মায়ের যাতায়াত বেড়ে গিয়েছে। আদর সমাদরের পাশাপাশি তার কিছু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অভিযোগ শুনতে হয় আমাকে। কাজের বুয়ার ঝুঁই ঝামেলা, তার একাকিত্বের ভারী দাঁড়িপাল্লা, কোমড়ের ব্যাথা! অভিযোগ দিয়ে কথা শুরু হলেও তার শেষটুকু আবদারে গিয়ে মিশে। এ ঘর লক্ষ্মী ছাড়া আর কতদিন থাকবে?
তবে আজ আর ইশারা অথবা ইঙ্গিতে নয়, মা সরাসরি বলে বসলেন, এভাবে আলাদা থাকার চেয়ে ডিভোর্স পেপার মেয়ের বাড়িতে পাঠিয়ে দিলে হয় না? ডিভোর্স দিতে বলছো মা? তা নয়তো কি? এত উড়নচণ্ডী মেয়ে নিয়ে আর যাই হোক সংসার হবে না। স্বামী স্ত্রী আলাদা থেকে কি সংসার ধর্ম পালন করা যায় নাকি? আমি কোনো উত্তর দিলাম না। মাথা নিচু করে বসে রইলাম। মা কিছুক্ষণ উত্তরের আশায় আমার মুখ পানে চেয়ে রইলো। ঘরে পিন পতন নীরবতা। শুধু আমার ঘন ঘন নিশ্বাসের শব্দ পুরো ঘরময় ছোটাছুটি করছে। মা বুঝতে পারলেন। তিনি হতাশ ভঙ্গিতে উঠে চলে গেলেন।
আমি শার্ট খুললাম না। অফিস ব্যাগটা আলনায় ঝুলিয়ে বিছানায় হাত পা ছেড়ে শুয়ে পরলাম। সামনের দেয়ালে আমার এবং অর্পার একটি ছবি টাঙ্গানো আছে। ছবিটা আমাদের বিয়ের তৃতীয় দিন তোলা হয়েছিলো। গোসল করে মাত্রই বের হয়েছে মেয়েটা। ভেজা চুল। শাড়ির কুঁচি এলোমেলো। কোমড়ে বিন্দু বিন্দু পানি জমে আছে। ক্যামেরায় টাইমার সেট করা। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মাত্রই আঁচলখানি সামলিয়েছে অর্পা। সাথে সাথে তাকে পাজকোলা করে তুলে নেই। লজ্জায় ও মুখ লুকিয়ে ফেলে আমার হালকা লোমশ বুকে। পরপর কয়েকবার ফ্ল্যাশ লাইটের আলোয় আরো আলোকিত হয়ে ওঠে আমাদের চারিপাশ। সেসময় কতটা কাছে ছিলাম আমরা। যতটা কাছে থাকলে উত্তপ্ত নিশ্বাস অনুভব করা যায়!
অর্পা আর আমার বিয়েটা প্রেমের ছিলো। বয়সের ব্যবধানটাও বেশ। ও তখন ভার্সিটির প্রথম বর্ষের ছাত্রী। আর আমি সারাদিন চাকরি করে বাড়ি ফিরে সম্মুখীন হই ‘বিয়ে কবে করছি’ অথবা ‘এখনো কেনো করছি না’ এজাতীয় প্রশ্নের। ওদিকে বন্ধুরা তখন বৌ নিয়ে ফেসবুকে বিরামহীন ছবি পোস্ট করে যাচ্ছে। গরম তেলে পানির ছিটে দিলে যেমন ফোঁস ফোঁস করে ওঠে, আমার মনের অবস্থা তার চেয়ে কোনো অংশে কম ছিলো না। সবচেয়ে কাছের বন্ধু দীপুটাও বিয়ে করে ফেললো। ওর হলুদের অনুষ্ঠানে গিয়েই পরিচয় হলো অর্পার সাথে। কি অদ্ভুত সুন্দর নেচেছিলো সেদিন মেয়েটা! কি তার ভঙ্গিমা! চাহনি। আত্মসংযমী আর হতে পারিনি। নিজের সহজাত ব্যক্তিত্বের পরোয়া না করে কথা বলি ওর সাথে।
প্রথমে ফেসবুকে হাই, হ্যালো। তারপর ফোন নাম্বার আদান প্রদান। রাত জেগে কথা বলার সময়গুলোতে ওকে কাছে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা আমায় কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিলো। ঘুনে ধরা কাঠের মতো নড়বড়ে হয়ে যাচ্ছিলাম। অর্পা ছাড়া যেনো বাঁচার সবকটি রাস্তা গোলকধাঁধা বলে মনে হচ্ছিলো। অর্পাও ভালোবেসে ফেলেছিলো আমাকে। অল্প বয়সী হলেও নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে সচেতন ছিলো। বিয়ের আগে বার বার বলেছে, পড়াশোনার ক্ষতি হবে না তো? আমায় চাকরি করতে দিবে তো, আসিফ? ভরসা জুগিয়েছি। হাতে হাত চেপে বলেছি, তোমার ক্যারিয়ারে হস্তক্ষেপ করার অধিকার আমি চাই না।
জীবনের দীর্ঘ ত্রিশ বছর বয়স পার করেও বাস্তবতা সম্পর্কে আমার ধারণা কতটা স্বল্প ছিলো তা বুঝতে পারি বছর দুই পর। অর্পার তখন ফাইনাল ইয়ার চলছে। আমি বাড়িতে। কোনো এক সরকারি বন্ধের ছুটি কাটাচ্ছি। ঘুম পুরোপুরি কাটে নি। চোখের পাপড়ি জোড়া হালকা ফাঁক করে দেখলাম অর্পা জানালার কাছে বসে আছে। থেকে থেকে শরীর কেঁপে উঠছে। ভ্রু জোড়া কুঁচকে নিঃশব্দে ওর দিকে এগিয়ে যাই। কাঁধে হাত রাখতেই অর্পা অসহায় ভঙ্গিতে আমার দিকে তাঁকায়। কাঁদতে কাঁদতে চোখ ফুলিয়ে ফেলেছে। চোখেমুখে অজানা ভয়। অর্পা আমাকে জড়িয়ে ধরে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে। আমি অর্পার ভয়ের কারণ সেদিন জানতে চাইনি। বরং বিকালে দুই কেজি মিষ্টি নিয়ে আসি। তার মধ্য থেকে এক কেজি মিষ্টি শ্বশুড়বাড়ি নিজে হাতে গিয়ে দিয়ে আসি। বাবা হতে চলেছি। এ এক অন্যরকম অনুভূতি!
হয়তো আমার চোখের দিকে তাঁকিয়ে অন্য কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা অর্পা ভাবতেও পারেনি। এদিকে বাবা হওয়ার অনুভূতি আমাকে এতটা স্বার্থপর বানিয়েছিলো যে অর্পার গ্র্যাজুয়েশনের কথাটা বেমালুম ভুলে গেছিলাম।
বিয়ের পর পড়াশোনা করতে গিয়ে সংসারের প্রতি অর্পা বেশ অমনোযোগী ছিলো। অথবা ইচ্ছে থাকলেও উপায় খুঁজে পাওয়াটা ওর বয়সী মেয়ের জন্য ছিলো দুষ্কর। তবুও যেদিন ক্লাসের ঝামেলা থাকতো না ও চেষ্টা করতো অন্তত দু একটি নতুন আইটেম রান্না করে খাবার টেবিলে সাজিয়ে রাখতে। মায়ের অর্পাকে নিয়ে বেশ অভিযোগ ছিলো। সংসার ফেলে পড়াশোনা করাটা তার চোখে ভালো লাগবে না খুব স্বাভাবিক বিষয়। জেনারেশন গ্যাপ বলে কিছু একটা তো আছে!
মায়ের অভিযোগগুলো বৃদ্ধি পেলো যখন গর্ভাবস্থায় অর্পা রেগুলার ক্লাসে যেতে লাগলো। কেনো জানি না, সেসময়টা মায়ের সাথে ঘাঁড় ঝাঁকিয়ে হ্যা বোধক ইঙ্গিতে আমি অভ্যস্ত হয়ে গেলাম। অর্পা তখন কোণঠাসা। প্রতিদিন সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে দেখতাম চোখ দুটো গণগণে লাল। ফুলে আছে। যেনো এখুনি ঠিকরে বেরিয়ে আসবে। বুঝতাম। হয়তো সারাদিন কেঁদেছে। কিন্তু কাঁদার কারণ জানতে চাই নি। যেদিন অর্পার মিসক্যারেজ হলো, সেদিন হয়তো আমার স্বার্থপরতা সীমা অতিক্রম করে নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছিলো। শান্তনা আবার কাকে বলে? দোষারোপের চেয়ে প্রকৃষ্ট কিছু কি আদৌ বিদ্যমান এ জগতে? আমার বাচ্চার খুনী। কি আত্মপর মা রে বাবা! ছিঃ কি হতো পড়াশোনা ছেড়ে দিলে? ক্যারিয়ারের জন্য নিজের বাচ্চাকে মেরে ফেললো! এমন মেয়েকে কিনা ভালোবেসে বিয়ে করেছিলাম। অর্পা সেদিন পা ধরে বলেছিলো, আমার কোনো দোষ নেই। বিশ্বাস করো! আমার কোনো দোষ নেই!
দোষ গুণ বিচার করা কি কোনো সুপুরুষের লক্ষণ? উত্তর খুঁজি নি। অর্পা কতটুকু সতর্কতা অবলম্বন করে চলাফেরা করেছিলো জানতে চাই নি। মুখ ফুটে যে মানুষটা এবোরশনের কথা বলে নি সে মানুষটা খুনী কিভাবে হয় জানতে চাই নি। প্রয়োজন মনে করি নি। দোষারোপ করেছি। জখমে নুন ছিটিয়েছি। একজন কাপুরুষের গুণাবলী নিজের মাঝে ভালোভাবেই ধারণ করতে সক্ষম হয়েছিলাম আমি! অর্পা চলে গিয়েছিলো। এত অপবাদ সে মেনে নিতে পারে নি। যে ভরসার হাতে হাত চেপে সে জীবনের এত বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো, সেই ভরসার হাত জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়ে ভেঙ্গে গুড়িয়ে যাবে তা হয়তো তার কল্পনার চার দেয়ালের বাহিরে ছিলো।
এক বছর হলো। আমরা আলাদা আছি। জীবনটা আবার ঘুনে ধরা কাঠের মতো নড়বড়ে। জ্বলন্ত বুকে টগবগিয়ে তেল ফুটছে। পানির ছিটে লাগলেও এখন আর ফোঁস ফোঁস করে ওঠে না। অন্য কাউকে নয়। অর্পাকেই আমার প্রয়োজন। গোলকধাঁধায় হারিয়ে গিয়েছি। সঠিক পথে ফিরে আসার জন্যও অর্পাকেই প্রয়োজন। জ্বলন্ত বুকে হীমশীতল অনুভূতির জন্য হলেও অর্পাকেই প্রয়োজন। নতুন করে সবকিছু শুরু করার জন্যও অর্পা নামক ভালোবাসাকেই আমার প্রয়োজন। দেয়ালে টাঙ্গানো ছবিটির দিকে তাঁকিয়ে নতুন করে সিদ্ধান্ত নেই। বুকের অর্ধেক পাথর যেনো শুধুমাত্র সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাথে সাথেই বিলীন হয়ে গেছে! ক্লান্তিতে চোখজোড়া বুঁজে আসে।
পরদিন।
বাইরে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। শ্বশুড়বাড়ির নিচে চাপা গলিটায় দাঁড়িয়ে আছি। মোবাইলের স্ক্রীণে ফোটা ফোটা পানি। হাত কাঁপছে। এক বছর পর সেই নাম্বারে কল করছি। যে নাম্বারে কল করলে এক স্নিগ্ধ কন্ঠস্বর শুনতে পাওয়া যায়। যে কন্ঠস্বর আমায় সারা রাত জাগিয়ে ভোরের সৌন্দর্য উপলব্ধি করিয়েছে বহুবার! যে কন্ঠস্বর আমায় জড়িয়ে রেখেছে মায়ার অদৃশ্য বাঁধনে, যে বাঁধন আমৃত্যু আমায় ফিরিয়ে আনবে তার কাছে। আমার ঘুনে ধরা জীবন সে মেরামত করবে। গোলকধাঁধা থেকে ফিরিয়ে আনবে সেই চৌরাস্তার মোড়ে যেখানে অনুভূতিরা ভালোবাসা ফেরি করে বেড়ায়।
রিং হচ্ছে। ফোন রিসিভ করা হলেও ওপাশটা নিশ্চুপ। কাঁপা কন্ঠে বললাম, একটু নিচে আসবে অর্পা? লাইনটা কেটে গেলো। হ্যা অথবা না কোনো উত্তর মেলেনি। তবুও দাঁড়িয়ে আছি। বিশ্বাস। অর্পা হয়তো নিচে আসবে। কাউকে ভালোবেসে বিশ্বাস করলে তার ফলাফল সবসময় হতাশামিশ্রিত হয় না।
অর্পা আসছে। ওইতো গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে আসছে। মুখ থেকে বাচ্চা ভাবটা কি কখনো যাবে না? মনের অজান্তেই একটু হেসে নিলাম। ভাবছি, অর্পাকে জড়িয়ে ধরলে ওর মাথাটা ঠিক আমার বুক স্পর্শ করে। আমার হৃদপিন্ডের প্রতিটি স্পন্দন ওর শ্রবণগোচর হয়। অর্পা যত কাছে এগিয়ে আসছে আমার শ্বাস প্রশ্বাস তত ভারী হচ্ছে। মাত্র এক হাত দূরত্ব এখন আমাদের মাঝে। অনেক দেরী করে ফেলেছি তাই আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা নয়। অর্পাকে বুকে চেপে ধরলাম। বৃষ্টির বিন্দু বিন্দু ফোটায় শার্ট খানিকটা ভিজেই গিয়েছিলো। কিন্তু অর্পাকে বুকে চেপে ধরার পর শার্টের সেই অংশটুকু এখন অশ্রুসিক্ত। আমার গাল গড়িয়েও কখন পানি পরতে শুরু করেছে লক্ষ্যই করি নি! তবে দীর্ঘ একবছর ধরে জ্বলতে থাকা গণগণে বুকে একটুকরো হিমালয়ের উপস্থিতি খুব করে বুঝতে পারছি!
গল্পের বিষয়:
গল্প
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত