নির্ভরতা

নির্ভরতা
অনেক কষ্টে বাগানবাড়ির এই পাশটায় দুই রুমের যে বাসাটাতে ব্যাচেলর জীবনের লেজ টানার সৌভাগ্য হয়েছে, তার একটা নাম দিয়েছি বর্ডার। বর্ডার নাম দেয়ার অনেকগুলো কারণ আছে। এই বাসাটা বাগানবাড়ির শেষ বাসা। পেছনেই ভবানীপুরের মনোরম প্রকৃতির বন-জঙ্গল। আরেকটা কারণ, বাসার ঠিক পেছনের বাসাটাতেই কাঁটা তার দিয়ে ঘেরাও করা। কি আশ্চর্য! কোটি কোটি মানুষে পরিপূর্ণ এই গাজিপুর শহরে সীমান্তের রূপরেখা কেন আঁকবে? এখানে কি কোন নো ম্যান্স ল্যান্ড আছে?
অবশ্য আরও সমস্যা আছে। রোজ একটা পুলিশ টহল দিয়ে বেড়ায়, যেন সীমান্তের অতন্ত্র প্রহরী। সমস্যার এখানেই শেষ নয়, শীতের শুরুতে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার আশায় মানুষ যেমন সুদুর তেতুলিয়া চলে যায়, এখানেও এমন কিছু আছে। দূর থেকে সূর্যের প্রতিফলিত আলোয় কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখে মানুষ ভীষণ খুশি। ধরা যাবে না, ছোঁয়া যাবে না, কাছেও যাওয়া যাবে না, শুধু দূর থেকে দেখেই ভীষণ খুশি হয়। জাতি হিসাবে আমরা এমনই, অল্পতেই খুশি। এখানে আমিও তেমন কিছুর অপেক্ষায় থাকি।
যে বাসাটার কথা বলছিলাম, আমার জানালার দিকে মুখ করে তার একটা বেলকুনিও আছে। এত রুক্ষ পরিবেশেও আমি তার নাম দিয়েছি শান্তি বেলকুনি। নামটাকে বাজারি করার উদ্দেশ্যে না হলেও, আমার সৃজনশীলতা বাসার অন্য সদস্যদের কাছে তুলে ধরতেই আমি অ্যারো চিহ্ন এঁকে বড় করে দেয়ালে সেঁটে দিয়েছি। নিচে পার্মানেন্ট মার্কারে নামটাও দিয়েছি, ‘শান্তি বেলকুনি’। শুধু তাই নয়, সতর্কতা জুড়ে দিতেও আমি ভুলিনি! ‘অনুমতি ছাড়া তাকানো নিষেধ’!
এবার একে একে সমস্যাগুলোর জট খুলে দিই। যে বাসাটা কাঁটাতারে ঘের দেওয়া, সেই বাসারই একটা বেলকুনি আমাকে থামিয়ে দিয়েছে। চোখকে বানিয়ে ফেলেছি প্রাকৃতিক বাইনোকুলার। রোজ সকালে আমি কোন কারণ ছাড়া নিচে যাই। গলির মাথায় দাঁড়িয়ে থাকি। ওই যে শান্তি ব্যালকুনির কথা বললাম, সেই বাসাটা থেকে রোজ সকাল সাতটায় শান্তি নেমে আসে, সকালের জান্নাতের শান্তি। অনুনোমোদিত পুলিশটা তারই বাবা। তার বাবার ধারণা, দেশের সব ছেলেরা তার অর্থ, সম্পত্তি এসব নিয়ে পালিয়ে যাবে। সতর্কতার সর্বোচ্চ শৃঙ্গে পৌঁছে গেছেন তিনি। আমাকে আরও অবাক করে দিয়েছে যেদিন জানতে পারলাম, এটা কলেজ পড়ুয়া শান্তি। সামনেই তার এসএসসি পরীক্ষা। এছাড়া যেটা জানতে পেরেছি, সেটা আমার প্রয়োজন পড়ে না। স্কুলের ব্যাচে নিবেদিতা লেখা থাকলেই কি? আমি নাম দিয়েছি শান্তি।
বাগানবাড়ির এ পাশটার নাম বর্ডার দেয়াটা স্বার্থক হয়েছে, যেদিন শান্তি একা গলিতে দাঁড়িয়ে ছিল। লম্বা ভ্রমণের পর তেতুলিয়া গিয়ে অনেকেই কাংখিত সেই কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পান না আবহাওয়ার কারণে। যারা দেখতে পায়, কেবল তারাই পৃথিবীর অন্যতম সৌভাগ্যবান। আমিও অনেক অধ্যবসায়ের পর আজ যাকে একা দেখছি, সে আমার বহুদিনের সাধনার ছিল। তবে কথা দিচ্ছি, আমি কখনই আর ওকে হিমালয়ের সাথে তুলনা করব না! পৃথিবীর সপ্তমাশ্চার্যের তালিকা যারা করেছে তারা কোনদিন এই শান্তি দেখেনি। দেখলে বর্তমানে সাত নাম্বারে থাকা জায়গাটা এই তালিকায় থাকতে পারত না। এই শান্তি তালিকার এক নাম্বারে থাকলে সাত নাম্বারে থাকবে বর্তমানের আট, বুঝলেন? জ্যামিতি কম বোঝায় যে স্যার আমাকে মেরেছিলেন, তিনি যদি নিবেদিতাকে সামনে নিয়ে দাঁড় করাতেন, নিশ্চিত আমি নিবেদিতার নাক দেখেই নব্বই ডিগ্রী কোণ বুঝে যেতাম। অথচ, এই সমকোণী কোণ বোঝাতে চাঁদা ব্যবহার করে! চারু ও কারুকলায় তুলির সাইজ নিয়ে যখন দ্বিধায় ভুগতাম, নিবেদিতার আঙুলগুলো দেখা হয়নি। দেখলেই মুখস্থ করে ফেলতাম, সবচেয়ে ছোটো তুলি, নিবেদিতার কনিষ্ঠ আঙুল।
যা ঘটার তাই ঘটল। আমি ভীতুর মত নিবেদিতার আশপাশে ঘোরাঘুরি করলাম আর নিবেদিতা চোখের পলকেই রিক্সা ডেকে চলে গেল। হুঁশ ফেরার পর দেখি নিবেদিতার রিক্সা কুয়াশায় মিলিয়ে যাচ্ছে। উসাইন বোল্টের সমস্ত শক্তি নিজের ভেতর সঞ্চার করে দৌড়াচ্ছি। পেছন থেকে ডেকে রিক্সা থামানোর সাহস বা অধিকার কিছুই আমার নেই। অনেক দৌড়ালাম, যখন তার রিক্সার সামনে গিয়ে দাঁড়াই, আমি তৃষ্ণার্ত কাকের মত পানি খুঁজছিলাম সেটা বোধ হয় সে বুঝেছে। রিক্সা থেকেই ঘাড় ঘুরিয়ে পেছন দিকটা দেখে নিল। মৃদু হেসে হাত বাড়িয়ে পানির বোতল বাড়িয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করল..
-এইটুকুন দৌড়াতেই এত হাঁপাচ্ছেন? আমি ঢক ঢক আওয়াজ তুলে বোতলের সব পানি খেয়ে নিলাম। পানি খেয়ে ঝাড়ি শোনার ইতিহাস আজ অবধি না থাকলে আজই হয়ে যাচ্ছে।
-জ্বী, আমি সামান্য এক বোতল পানি খেয়ে নিবেদিতার ঝাড়ি শুনলাম।
-আরে করছেন কি? সব পানি খেয়ে নিলে আমি খাবো কি? নিবেদিতার কপাল কুঁচকানো। আমি কিছুটা ভয় পেলাম, সাথে লজ্জাও। লজ্জায় মাথা নিচু করে চিকন সুরে বললাম..
-সরি।
-হ্যাঁ! আপনার সরিতে আমার বোতল ভরে যাবে তো!
-আসলে তৃষ্ণা পেয়েছিলো খুব..
নিবেদিতা আর কিছু বলল না। রিক্সা থেকে নেমে রিক্সার ভাড়া চুকিয়ে দিবে ঠিক তখনই কি মনে করে রিক্সায় উঠে গেল। অস্থিরতার কাছে হেরে যাচ্ছি। প্রশ্ন করব, এখানে নামছেন যে? কিন্তু করার আগেই আবার রিক্সায় উঠে গেল। ডান পাশে চেপে বসে বাম পাশে ইশারায় আমাকে রিক্সায় আমন্ত্রণ জানালো। আমার কাছে মুহুর্তের জন্য সবকিছু স্বপ্নের মত মনে হল।
-ভেবেছিলাম রিক্সা থেকে নেমে হেঁটে গিয়ে পানি কিনবো!
-তাহলে? আবার উঠলেন যে?
-কিন্তু না! আপনি অনেক বড় অপরাধ করেছেন, তাই শাস্তিও অনেক বড়!
-কি রকম শাস্তি?
-অনেক দূর গিয়ে তারপর পানি কিনে দিবেন!
-পানি কিনে দিতে আমার কোন সমস্যা নেই, কিন্তু সমস্যা একটা হয়ে গেছে..
-কি সমস্যা আবার?
-আসলে আমি শুধু হাঁটতে বের হয়েছিলাম তো, মানিব্যাগ সঙ্গে আনিনি!
-মিথ্যা কথা আমি একদমই পছন্দ করি না।
-বিশ্বাস করুন আমি সত্যি বলছি, আপনি চেক করে দেখতে পারেন।
-আমি দ্বিতীয়বার বললাম। মিথ্যাবাদীদের আমি পছন্দ করি না।
এজন্যেই মানুষ বলে রুপ দেখে প্রেমে পড় না। যাকে দেখার জন্য জানালার ধারে জমে বরফ হই, সে বিশ্বাস করে না। আমি চুপসে গেলাম। অন্যদিক ফিরে উদাস মনে রিক্সায় বসে আছি। হঠাৎ নিবেদিতা সুরে সুরে জিজ্ঞেস করল..
-হাঁটতে বেরিয়েছিলেন? সত্যি? ঘটনা তাহলে এই! আমি যে সত্যিই মিথ্যা বলছিলাম ব্যাপারটা মাথায় ছিল না। থাকলেও নিবেদিতাকে বলতাম সেটাও না। ব্যাপার হলো, নিবেদিতা আমার ব্যাপারে জানে। আমি কি করব বুঝতে পারছিলাম না। রিক্সার থেকেও আমার বুকের ভেতরটা বেশি কাঁপছে।
-রোজ হাঁটতে বের হন তাই না? ভাল কথা! তো আজ এখানে দৌড়ে এলেন কেন? হাঁটার গতি বেড়ে গিয়েছিলো?
আমি জানি আপনি কিছু বলতে পারবেন না। আরে আরে লজ্জা পেতে হবে না। পুরুষ মানুষের লজ্জা পেতে নেই! মামা সামনে রাইখেন তো। নিবেদিতার টানা বেশ কয়েকটা কথা শেষ হলো। রিক্সাও থামলো। আমি থেমে গেছি আরও বেশ কিছুক্ষণ আগেই।
-এখানে ৪৫৫ টাকা আছে।
-কি করবো?
-আপনাকে লোন দিলাম। পানি কিনে দেন।
-পানি কিনতে কি এত টাকা লাগে? ১৫ টাকাই তো যথেষ্ঠ!
-ভদ্রতাজ্ঞান নাই, সৌজন্যতাবোধ নেই, ছিঃ ছিঃ আপনি একটা মেয়েকে সকাল সকাল শুধু পানি কিনে দিয়েই ছেড়ে দিবেন? ব্রেকফাস্টের দরকার নেই? একটা মেয়ে আমাকে এভাবে হাতের তালুতে রেখে নাচিয়ে বেড়াচ্ছে অনেক্ষণ যাবত। আর আমিও পাক্কা নাচিয়ের মত নেচে যাচ্ছি। আমার ভাল লাগছে, নাচতে নাকি ভাসতে সে জানি না। তবে ভাল লাগছে। যে দুপুর রোদের তীব্রতা বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ। আমি ঠিক এমনই এক দুপুরে দাঁড়িয়ে আছি একটা বালিকা স্কুলের সামনে। নিজেকে বখাটে মনে হচ্ছে। ছোটবেলায় জানতাম বালিকা স্কুলের সামনে বখাটে ছেলেরা দাঁড়িয়ে থাকে। প্রেমে পড়লে সবকিছু করা যায়। বখাটেও হতে হয়। প্রেমই আমাদের বখাটে বানিয়ে দেয় হয়ত।
আমি এসেছি নিবেদিতার দেয়া ৪৫৫ টাকা পরিশোধ করতে। প্রথমদিনের আলাপচারিতায় মনের ভেতর যে ফুলের বাগান গড়ে উঠে ছিলো, সেটা একদিনে মরমর অবস্থা। একদিন ওভাবে রিক্সা ভ্রমণ, আলাপচারিতা আমার ভেতরে কতখানি আশা জাগিয়েছে আমি নিজেও জানি না। সেদিনকার দেয়া তারিখ মতে নিবেদিতার টাকা ফেরত দিতে গেলাম আজ। একে একে মেয়েরা বের হচ্ছে, নিবেদিতার দেখা পাই না। স্কুল প্রাঙ্গন ফাঁকাও হয়ে গেল। অপেক্ষার প্রহর গুণতে গুণতে সিগারেটের ধোঁয়া বাতাসে ছাড়ছি চোরের মত। নিবেদিতা না জানি দেখে ফেলে! নিতান্ত ভাগ্য সহায়, নিবেদিতাও এলো প্রায় আধা ঘন্টা পর আমিও ততক্ষণে সাধু সেজে দাঁড়িয়ে আছি। কপালে হাত রেখে দৌড়ে এসে বলল..
-আমি সেদিন ভুলেই গিয়েছিলাম আজ আমাদের ল্যাব আছে। ল্যাব থাকলে আধা ঘন্টা লেট হয়। আপনাকে কষ্ট দিলাম, ধুর!
-ও কিছু না, অপেক্ষা করতে আমার ভালই লাগে।
-বাহ! আপনি দারুণ ফ্লার্ট পারেন।
-এই নিন টাকাটা, ৪৫০..
-বাকি পাঁচ টাকা কই? দেখেন আমি হিসাব নিকাশে খুবই সিরিয়াস। আপনি ধার যা নিয়েছেন তাই দিবেন।
-আসলে ভাংতি ছিল কিন্তু তখন সিগারেট কিনতে গিয়ে ভাংতি না পেয়ে এই পাঁচ টাকা দিয়ে ফেলেছি। সমস্যা নেই এই নিন দশটাকা, বাকি পাঁচ টাকা ধার দিলাম আপনাকে। নিবেদিতার রাগ করা উচিত কিন্তু রাগ করল না। “আসেন” এক শব্দ বলে এগিয়ে গেলো। যথা আজ্ঞা, মনে মনে বলে এগিয়ে গেলাম তার পেছন পেছন। আব্বু আজ আন্টির বাসায় গেছে। সেদিনই জানতাম আজকে আব্বু আসবে না, তাই আপনাকে এই তারিখ দেয়া।
-উনি কি খুবই রুক্ষ? আপনাকে একা ছাড়েন না?
-ছাড়বে, বিয়ের পর। মানে আব্বু এটা বলে আর কি।
-বাহ! ভাল তো। একটু টাইটে রাখা ভাল।
-হু! না হলে আপনার মত আহাম্মক হয়ে যাবে। জানালা দিয়ে মেয়ে দেখেন?
-আমি আকাশ দেখি, মেয়ে টেয়ে দেখি না তো!
-আপনার জানালার পর্দাটা বিচ্ছিরি হয়ে গেছে, লন্ড্রিতে দিতে পারেন না?
-ব্যাচেলর পর্দা তো, তাই!
মনের ভেতর খঞ্জনা বেজে উঠল। আমার জানালার পর্দার দিকে কিভাবে চোখ যায় নিবেদিতার? সেও কি আমায় দেখে? নাহ! আমাকে দেখবে না। আমার নিজের চিন্তাধারায় সমস্যা আছে। হয়ত কখনও চোখ পড়েছিলো।
-আপনাদের বাসার একটা নাম দিয়েছি, ভেলপুরির ঝালে লাল হয়ে গাল ফুলিয়ে হাসতে হাসতে বলছিলো নিবেদিতা।
অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করি, কী নাম?
-না না, এটা বললে আপনি আমাকে মেরেই ফেলবেন, হাত নাড়িয়ে বলল।
-আপনি আমাদের বাসা নিয়ে এত গবেষণা করেন কেন? হেসে হেসে প্রশ্ন করে ফেললাম আমি। ভেতরে ভয় কাজ করছে।
-আপনি করেন কেন? পাল্টা প্রশ্ন নিবেদিতার!
-কই করলাম? থতমত খেয়ে গেছি এবার।
-মিথ্যা পছন্দ করি না আমি! যাক এটা বলতে আপনি লজ্জা পাবেন, তাই জোর করব না।
এড়িয়ে যাবার উদ্দেশ্যেই চুপ করে গেলাম। ভেলপুরি শেষে ঝালমুড়ি, সবশেষে কুলফি। গুণে গুণে ৯৫ টাকা খরচ করল। রিক্সা ডাকলো মাওনা যাবে বলে। নিরব দর্শকের ভুমিকা পালন করছি ততক্ষণ। আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে রিক্সায় চেপে বসে আছি, খানিকটা বিস্মিত, অনেকটা চিন্তিত। ও কি ভালবাসে আমাকে?
-ভীষণ চাপ আমার, জানেন? আব্বু একা ছাড়তেই চায় না। আপনিই বলেন ক্লাশ টেনের একটা মেয়ের কি নিজের ভাল মন্দ বোঝার ক্ষমতা নেই?
-তা তো বটেই। বাবাদের মেয়েদের নিয়ে চিন্তা থাকবেই।
-তাই বলে এত? কই তিথী, হিয়া ওদের তো নেই। ও আপনাকে বলা হয়নি, ওরা আমার ফ্রেন্ড। পাস্টফ্রেন্ড। পাস্টফ্রেন্ড বোঝেন?
-উঁহু!
-পাস্ট ফ্রেন্ড হল অতীত বন্ধু। ওরা মুভি দেখতে যায়, স্কুল শেষে এখানে ওখানে যায় আর আমি? আমাকে ওরা কেন ফ্রেন্ড বলবে বলেন? আমি ওদের সাথে চলি? এটাতেও সমস্যা আব্বুর!
-মেয়েদের সাথেও চলতে সমস্যা?
-ছিল না। সেই ক্লাস ওয়ান থেকেই ওদের সাথে ঘুরি। কিন্তু যখনই আব্বু দেখলো ওরা প্রেম করে, ওদের সাথে চলাফেরা একদমই নিষেধ করে দিয়েছেন।
-বুঝতে পারছি না আসলে।
এত্ত নিরাপত্তা ভাল লাগে না। আর এইসব প্রেমটেম? হাহাহা! আমি এসবে মোটেও আগ্রহী নই। আব্বুকে এই ব্যাপারটাই বোঝাতে পারি না। কিন্তু না! আমার আব্বু বুঝবে না, আমার আব্বু ভাবে আমি ওদের প্রভাবে প্রভাবিত হতে পারি, প্রেম করে ভেগে যেতে পারি কোন ছেলের সাথে, যেমনটা করেছে বড় আপু নিবেদিতাকে যুগ যুগান্তরের পরিচিতা মনে হচ্ছে। যেভাবে একের পর কথা বলে যাচ্ছে, যেন আমি অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য কেউ তার। এতে সুখও পেলাম, কষ্টও পাচ্ছি প্রেমের ব্যাপারে তার আগ্রহ নেই ভেবে। চুপ করে আছি। নিবেদিতাও এখন চুপচাপ। মাওনায় ইয়াকুব, কিতাব আলী প্লাজা ঘন্টাখানেক হেঁটে হেঁটে এটা সেটা কি কি জানি কিনলো। বাসায় ফেরার পালা। বাসায় ফিরতে ফিরতেও নিবেদিতার গল্প বলা চলছে। রিক্সার চাকাও ঘুরছে আপন গতিতে। কিন্তু মনে হচ্ছে খুব দ্রুত, খুবই! একটা সময় থেমেও গেল। সময়ের দৌড়ে নিজেকে বড্ড অসহায় মনে হল। স্বর্গ থেকে পৃথিবীতে ফিরে আসা এতটা বেদনাময় কেন?
নিবেদিতার বাপের প্রতি কৃতজ্ঞতা, এত কড়া নিরাপত্তার ভিড়ে অন্তত একটা ফোন ব্যবহারের স্বাধীনতা দিয়েছেন তাই। আর যুগের প্রতিও কৃতজ্ঞতা, ফেসবুক নামক জিনিসটার জন্য। এমন কিছু না থাকলে নিবেদিতার সাথে কথা বাড়াতাম কি ভাবে? কিন্তু বিপদ অন্য জায়গায়। কথা খুঁজে পাওয়া যায় না, বড্ড মুশকিল। কথা খুঁজে না পেলেই আমি দেখতে চাই তাকে। মন খারাপের স্মারক দেখিয়ে বাবার দোহাই দেয় নিয়ম করে। আজকে দিল না। প্রশ্ন করলো.. -কাল বিকেলে? লাফিয়ে উঠে দাঁড়ালাম আমি।
প্রেমের প্রতি অনাগ্রহ থাকলে থাকুক। মনের কথা লুকিয়ে রাখার বিরুদ্ধে আমি। আমি বলবো, নিবেদিতাকে মনের সব কথা বলব। শান্তি কাহিনী বলব আরও বলব কবুতর হয়ে জানালায় বসে থাকার কথা। হয়ত নিবেদিতা উড়ে যাবে, অথবা ডানা মেলে বসবে। সে ডানায় আশ্রয় নিবো, নিবেদিতাকে কবুতর বানিয়ে মনের কুঠিরে পুষবো। দুই কবুতরে সুখের মাতম তুলবো। বাকুম, বাকুম শীতের বিকাল। কুয়াশায় কয়েকটা বিল্ডিং পর আর কিছু দেখা যাচ্ছে না। আকাশে কিছুক্ষণ পরপর পাখিরা এসে জানান দিয়ে যায়। অনেক পাখি, অনেক অনেক অনেক “সহেনা যাতনা দিবস ও গনিয়া গনিয়া বিরলে, নিশি দিনও বসে আছি শুধু পথ পানে সখা হে এলে না”
-এলাম তো! নিবেদিতা ভ্রু কুঁচকে বলল..
-মানে?
-উত্তর, তোমার কথার।
-ওটা আমার কথা নয়, গানের। গানটা আমার নয়, রবীন্দ্রনাথের।
-তোমার ব্যালকনিতে আজকাল বুয়া আসে না?
-ছুটিতে গেছে, পর্দাটা নীল রঙা নিতে পারতে।
-আগে না ডান দিকে একটা স্কেচ বোর্ড ছিলো?
-ভেঙ্গে ফেলেছি রাগ করে।
-তবে আঁকবে কিসে?
-তোমার চোখের পাতায়। টেবিলটা আগোছালো রাখো কেন?
-কিভাবে জানলে?
-বারান্দার মাঝে এসে দাঁড়ালে দেখা যায়।
-এত কিছু দেখো?
-চোখ চলে যায়। তুমি দেখো না? ভাব নিচ্ছো?
-লুকোচ্ছি!
-লুকিয়ে লাভ?
-হারাচ্ছি না!
-বললে বুঝি হারিয়ে ফেলবে?
-সম্ভাবনা থেকে যায়। হারানোর শক্তি নেই।
-বাসা তো অন্যরকম। বাবা এক ঘন্টার জন্য বাহিরে বেরিয়েছে, তাই তো দেখা।
-সেজন্যেই বলছি না।
-নাকি বলবে সাহস নেই? মনে তো হচ্ছে তাই।
-প্রতিটি প্রেমিকই সাহসী হয়। একটা সাধারণ ছেলে যখন প্রেমে পড়ে তখন কি হয় জানো?
-কি হয়?
-হিংস্র, অকুতোভয়, নির্লজ্ব, বেহায়া, অধৈর্য্য, সাহসী!
-মিশ্র কেন?
-যখন ভালবাসে, ভালবেসে পায় না, তখন পাওয়ার জন্য হিংস্র হয়।
পৃথিবীর সমস্ত প্রাণীর চেয়ে প্রখর! কথা না হলে, দেখতে না পেলে ধৈর্য হারা হয়ে যায়। ভাবতে থাকে, কবে দেখবো? সে ভীষণ সাহসী হয়ে পড়ে প্রেমিকাকে বাহুডোরে বেঁধে রাখার জন্য। বেহায়া হয় প্রেমিকা যদি কষ্ট দেয়, আর নির্লজ্ব হয় ভীষণ আবেগে, ঘোর অমানিশায়, আঁধারে কিংবা পূর্ণিমায়, ভালবাসা কাছে পেলে। সেই কবুতর হাতের তালু ছুঁয়ে অথবা…
-থাক! আর না, চুপচাপ থাকো।
-আবার গাও?
-রবীন্দ্র? লা লা লা… দিন যায় রাত যায়, আমি বসে হায়, দেহে বল নাই, চোখে ঘুম নাই…
-অনেক পড়ার চাপ?
-হু! প্রেমে পড়ার।
আশপাশের মসজিদগুলোতে আজান দিচ্ছে। নিবেদিতা আর সময় ব্যয় করেনি। আমাকে নিয়েই নেমে গেলো ছাদ থেকে। তার ছাদে কাটানো বিকালটা জীবনের সেরা কোন এক বিকেল হয়ে থাকবে ভাবতে ভাবতেই চলে আসলাম। নিবেদিতাকে বিব্রত দেখাচ্ছিলো। আমারটা দেখা যাচ্ছে না। বুকের কাঁপন দেখা যায় না। ধুপধাপ আওয়াজ শোনা যায়, সেটা আমি না জানলেও নিবেদিতা জানতো বোধ হয়। সিড়িঘরের কোণে ধাক্কা দিয়ে বুকে কান পাতলো নিবেদিতা। কতক্ষণ? এক সেকেন্ড? দুই সেকেন্ড? কিন্তু আমার কাছে তখন শতাব্দি পেরুনো অনুভুতি মনে হল। তবুও অতৃপ্ত আমি, আরও কিছুক্ষণ বুকে কান পেতে থাকো নিবেদিতা। ভেতরের শব্দরা ভাঙ্গুক, গল্প বলুক তোমায়। আমাদের কথা বলুক। নিবেদিতা সব শুনেছে? উদ্দেশ্যমূলক নয়তো তার এমন কিছু করা? এই সিঁড়ি ঘর এতটা অন্ধকার কেন?
বুকের ভেতর ঝড় বেড়ে গেল মুহূর্তে। কপাল ছুঁয়ে দিলো কিছু একটা, নিবেদিতার ঠোঁট। ভীষণ করে কেঁপে উঠলাম। আরও ঝড়! ঠোঁটে কেন ঝড় বইছে? আমি সইতে পারবো না নিবেদিতা। আমি পারছি না। নিবেদিতা চলে গেল। আমাকে একা অজ্ঞান রেখেই চলে গেল। দৌড়ে পালালো, যাবার আগে ভীষণ উত্তপ্ত নিঃশ্বাস। ঠোঁট ছুঁয়ে শুধু একটা বাক্য, ‘ছেড়ো না আমায়’ আর কিছু মনে নেই আমার। ঝড় থামছে না। বছর কেটে গেল। বুকের কাঁপনে যে প্রেম শুরু হয়েছিলো, আমাকে সে প্রেম নিয়ে যাচ্ছিলো কোন নতুন জগতে। হারিয়ে যাচ্ছিলাম। এক বছরে কতশত ঝগড়া হয়েও হয়নি! হবে কিভাবে? যে ঝগড়ায় হুমকি আসে, কথা বলা যাবে না, সে ঝগড়া করার সাহস আমার নেই। ওর সাথে কথা না বলে থাকা সম্ভব? এক বছরে চলে গেছে নিবেদিতার লুকিয়ে দেখা করার সময়গুলো। এখন সে ফাঁকি দিতেই পটু। বাসায় ঠিক ঠাক রেখে আমাকেও ধরে রাখছে। শুধু ধরেই রাখছেই না, আঁটকে রাখছে।
এক বছরের আনন্দ ভাসছে তার চোখে মুখে। এই এক বছরে কত কত স্মৃতি জমেছে! সেসবের সাক্ষী কেবল শহুরে রাস্তা, ল্যাম্পপোষ্টগুলো। স্বভাবতই আমার প্রথম কথা থাকে, কিভাবে এসেছো? বাসায় কি বলেছো? হাসি দেয় নিবেদিতা। তোমার জন্য পৃথিবী পালানোর সাহস রাখি আমি, আর আমার চালাক বাবাকে ফাঁকি দেয়া ব্যাপার? প্রেমে পড়লে প্রেমিক সাহসী হয় শুনেছি। রূপবতী প্রেমিকাও বুকে সাহসের খনি রাখে, নিবেদিতাকে দেখেই শিখছি। জাঁকজমক রেস্টুরেন্টের কোণায় নিবেদিতা আইস্ক্রিম খাচ্ছে নিশ্চিন্তে। কিন্তু আমি জানি, তার মনে অনেক ভয়। বাসায় জেনে যাওয়ার ভয়, আমাকে হারিয়ে ফেলার ভয়। লুকাতে গিয়েও পারে না। যেমনটা এখন পারছে না। কোনদিন বাসায় ঝামেলা হয়, আমার কাছ থেকে দূরে চলে যাও, আমার উদাসি বাক্য শুনে শুনে চোখ টলমল করে উঠল তার। আবার লুকিয়েও নিলো।
-কতক্ষণ? জিজ্ঞেস করলাম নিবেদিতাকে।
-আড়াই ঘন্টা, কোচিং এ এক্সাম বলেছি।
-আসতে চাননি?
-অবশ্যই! ম্যানেজ করেছি। সে তোমার না জানলেও চলবে।
-চলো, হাঁটি।
-কোথায়?
-শহরে!
-ফ্লাইওভারে.
-আচ্ছা।
মাওনা ফ্লাইওভার পেরিয়ে জৈনাবাজারের দিকে হাঁটছি। হলুদ বাতি নেই এখন শহরে, সবই ফ্লুরোসেন্ট। নিবেদিতাও হাঁটছে। একটু পরপর গাড়ি যাচ্ছে, নিবেদিতা ভয়ে আমার বাহু ধরে রাখে। অনেকগুলো ভয় নিবেদিতার। সবগুলোকে ভেতরে রেখে আমাকে ধরে আছে।
-পাখি হলে ভাল হত।
-শালিক?
-উঁহু, কবুতর।
-তোমাকে তো কবুতর বলি, সাদা কবুতর শান্তির প্রতীক।
-তাতে কি? ওটা আগে। ভালবাসায় শালিক হয়ে গেছি। আর আমি শালিক না হলে তুমি একলা শালিক হয়ে থাকবে, এক শালিকে দুঃখ আসে।
-জোড়া শালিকে সুখ?
-হু। জোড়া শালিক হয়ে উড়ে বেড়াতাম। জানালায় বসতাম, তোমার সেই জানালায়।
-বেলকুনিতে?
-আব্বু দেখবে!
-খুব ভয়?
-একদমই না! উড়ে পালিয়ে আসতাম।
-কিন্তু আমরা তো পাখি না, ডানা নেই আমাদের!
-বাহু তো আছে, হাত আছে। নির্ভরতা।
উদ্দেশ্যহীন এই হেঁটে চলা দু’টো মানুষরূপী ডানা ঝাপটানো নিজেদের না চেনা আনকোরা পাখিজোড়ার ভেতর অদলবদল হয়েছে। সৃষ্টির রহস্যে তাদের হৃদপিন্ড বদলে গেছে। মনের ভাষা বুঝতে পারে একে অন্যের। পথের ভাষা বুঝতে বুঝতে বন্ধুর পথগুলোকে সরলরেখায় মিলিয়ে নিতে পারলেই কেবল তারা সুখের ডানা ঝাপটে বেড়াবে।
এখনও অনেক দূর বাকি, অনেকদূর। ট্র্যাজেডির গল্পে মানুষ আঁটকে থাকে, সুখের গল্পে মন থাকে না। তবুও, এক বছরের চলাচলে উড়ে উড়ে ঘুরে বেড়িয়ে শহর জুড়ে প্রেম দাপিয়ে রাত জুড়ে আবেগের উল্কা আকাশ থেকে নামিয়ে এক সকালে হয়ত কোন রক্তিম সূর্য উঠবে, সে সূর্য দু’জনেই একই বেলকনি অথবা একই জানালায় উপভোগ করবে। অথবা, অনেক বছর পরে দু’টো পাখি আলাদা খাঁচায় থাকবে। আলাদা দু’টো বেলকুনি আর জানালা। সূর্য কিংবা পূর্ণ চন্দ্র দেখা যাবে দু’টো জানালা, বেলকনি থেকেই। কিন্তু সে দু’টো ঘরে কখনই জানালা ভেদ করে আলো প্রবেশ করবে না। সম্ভাবনা দু’টোই। আপাতত আমরা প্রথমটাকেই স্বপ্ন দেখি। ভালবেসে হেঁটে যাই মাইলের পর মাইল। স্বপ্ন দেখার শর্ত থাকে। ভালবাসতে হয়, ভালবেসে পাহাড়সম দেয়াল হয়ে রক্ষা করতে হয় পাশে থাকা মানুষটাকে, সমুদ্রসম আবেগের জোয়ারে ভেসে বেড়াতে হয় দু’জন মিলে।
বিশ্বাসের গাছ রোপণ করে নির্ভরতার ফুল ফুটিয়ে সে ফুলের গন্ধে চারপাশ ম ম করবে, মৌমাছিরা রেনুর খোঁজে দিগ্বিদিক ছুঁটোছুঁটি করবে, তবেই স্বপ্ন দেখা যায়। আমাদের তো রোজই এসব হয়, তাই না নিবেদিতা? চলো হাঁটি, সরলপথে, বক্রপথে, ভাঙা পথে সাঁকো বানাই। মাঘের শুরুর দিকে ঠান্ডা পড়েছে বেশ। নিবেদিতা একটু উষ্ণতার আশায় বাহু ধরে হাঁটছে। কিছু বলছে না। আমরা দু’জনেই হাঁটছি নিঃশব্দে, উদ্দেশ্যহীন। কিছু নিরবতা কথা বলে, অজানা যাত্রার শেষও থাকে। বেতার হৃদপিন্ড যোগাযোগ ব্যবস্থায় খবর পৌঁছায় দু’টো মনে। শুধু খবরও না, নির্ভরতা ফুলের ঘ্রাণও পাঠায় সে। নিবেদিতা বাহুতে হাত রাখতেই আমি নির্ভরতার ঘ্রাণ পাচ্ছি। নিবেদিতাকে প্রশ্ন করতে মন আনচান করছে,
-নিবেদিতা তুমি কি নির্ভরতার ঘ্রাণ পাচ্ছো? কিন্তু এতে নিরবতা আর কথা বলবে না। থাকুক! আপাতত নিরবতা কথা বলুক। আমার বিশ্বাস গাছ পাতা নাড়িয়ে জানিয়ে দিলো, নিবেদিতাও পাচ্ছে, ভীষণ করে নির্ভরতার ঘ্রাণ! আর অজানা যাত্রার স্টপেজ? সে না হয় অন্য কোনদিন!
গল্পের বিষয়:
গল্প
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত