আমার সংসার

আমার সংসার
ময়নাকে বলতে পারছি না যে শরীর ভালো না তাই অফিস যেতে পারছি না। শুয়েই ছিলাম। আটটা বেজে যায় অথচ আমি উঠছি না দেখে ময়না কাছে এসে মুখের উপর থেকে চাদর সরিয়ে বলে, “শরীর খারাপ? অফিস যাবে না আজ? আচ্ছা রেস্ট নাও।”
আমাকে কিছু বলার সুযোগ দেয় না ময়না। আমার সত্যিই শরীর খারাপ। গা এতো ব্যথা কেন হলো হঠাৎ করে বুঝতে পারছি না। পিঠ-ঘাড় নাড়াতে পারি না এমন। অনেক ভেবে মনে হলো এটা গ্যাসের ব্যথা। ময়না আবার এসে বললো,
“উঠবে না? ফ্রেশ হয়ে নাস্তা করে আবার ঘুমাও।” ময়না চলে যায়। আবার আসে। চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে বলে, “কী হয়েছে তোমার? আমার ভয় লাগছে। করোনা নয়তো?” আমি হেসে ফেলি। পিঠে ব্যথার কথা বলি। ময়না দ্রুত বলে, “তাহলে পিঠ মালিশ করে দিই? অলিভ অয়েল গরম করে।” আমি প্রায় লাফিয়ে উঠি। বলি- না না। লোকে জানলে বলবে বউকে দিয়ে হাত-পা টেপায়। ময়না অবাক হয়। বিছানায় বসে আমার পাশে। বলে- “এটা কী কথা? তোমার শরীর খারাপ হলে আমি সেবা করবো না? পাড়ার লোকে এসে হাত-পা টিপে দিলে বুঝি ভালো? নাকি বুয়া করবে এসব কাজ?”
– তবু লোকে জানলে খারাপ কথা বলবে।
– তোমার এইসব ভাবনা আমাকে অবাক করছে জানো! লোকে জানলেই কী? স্বামীকে তার স্ত্রী যত্ন করবে, এতে যারা খারাপ বলবে তাদের মতো নিকৃষ্ট কেউ নাই আমার চোখে। আমার পেটে ব্যথা হলে তুমি গরম কাপড়ের স্যাঁকা দাও না? বলো দাও না? চুপ কেন? হ্যাঁ না বলো? আমি মুখের উপর আবার চাদর তুলে দিই। আস্তে করে বলি-
– হু দিই।
– এহ লজ্জা পাওয়া হচ্ছে। আমার মাথা ব্যথা হলে কপাল কে টিপে দেয়? যারা কূটনামি করে এসব কথা নিয়ে তারা নাকি তুমি? তাহলে আমি আমার স্বামীর পা টিপে দিলে কোন বেটির কী? কোন ব্যাটার কী?
– হাহাহা। তুমি দেখি ঝগড়া করছো।
– না ঝগড়া না। কাদের ভয়ে তুমি লজ্জা পাচ্ছো? যারা স্বামীর সেবা করতে জানে না তাদের? সংসারের সুখ মানে কী, ভালোবাসা-মায়া মানে কী যারা জানে না তাদের?
– আহ চুপ করো। নাস্তা দাও। আমি গোসল করে নিই।
ময়না চলে যায়। দরজার পর্দা দুলতে থাকে। আমি তাকিয়ে থাকি ময়নার স্পর্শে দুলতে থাকা পর্দার দিকে। মনে হয় এইতো সুখ দুলছে। আনন্দ দুলছে। ভালোলাগা দুলছে। আমার চোখ ভিজে আসে। খাওয়ার পর ময়নাকে বলি-
– চলো আজ শপিঙে যাই। ময়না মুখের মধ্যে রুটি গুঁজে মোটা গলায় বলে-
– কীসের শপিঙ?
– কোনোকিছুরই না। এমনিই কিনবা হাবিজাবি। লোকে বলতে পারবে না শপিঙ করি না আমরা।
– আবার লোক লোক করছো? কোন লোকে এসব বলে বলবে আমাকে?
– না মানে যদি কেউ বলে!
– শোনো সবার চাহিদা এক না। কোনো মেয়েকে তুমি মাসে ১০ টা করে শাড়ি কিনে দিলেও মন ভরবে না। আবার কেউ কেউ বছরে ২-৩ টা শাড়ি কেনে। তাছাড়া আমি বের হই কই যে এত শাড়ি লাগবে আমার?
– তোমাকে তো জোর করেও কোথাও নেওয়া যায় না।
– আমার ওসব ভালো লাগে না। আমার সংসার গোছাতেই ভালো লাগে। আশপাশের একশোটা সংসার থেকে আমার সংসার আলাদা, এটা ভাবতেই আমার ভালো লাগে।
– তুমি শাবানা। হাহাহাহা।
– কেন রীনা খান হলেই বুঝি আসল নারী হওয়া যায়?
– হাহাহাহাহাহা।
– হাসো কেন? শরীরের ব্যথা গায়েব?
– না না। ব্যথা আছে।
– তুমি যে ফেব্রুয়ারি মাসে ইন্ডিয়া থেকে ৬ টা শাড়ি আনলে, তা কিন্তু আমি পড়িনি এখনো। তাই শপিং লাগবে না।
বিকালে ময়নাকে নিয়ে জোর করে বের হলাম। চাইনিজ খাবে না সে। জোর করেও রাজি করাতে পারলাম না। তার আবদার ফুসকা খাবে। আমার আবদার দেখে ও অস্বস্তি নিয়ে বলে-
– অদ্ভুত তুমি এমন হীনমন্যতায় ভোগো কেন? তুমি তো আমাকে কোনোদিক দিয়ে সামান্য অভাব অবহেলায় রাখো নাই। আমার লাইফস্টাইলই এমন। আমি চুপ হয়ে যাই। ময়নাকে ফেরার পথে ফ্ল্যাটের কথা বললাম। ময়না চোখ কপালে তুলে বলে-
– আমার ফ্ল্যাট মানে? এটা আমাদের ফ্ল্যাট। এই ফ্ল্যাটে না থাকলে আমি কী করবো এই ফ্ল্যাট দিয়ে? ফেলে দেবো? বাবার সম্পত্তি বড় ভাই, মেজো ভাইই তো সব নিয়েছে। একটা ফ্ল্যাট দিলো বাবা আমাকে, সেটা আমারই রয়ে গেলো? তোমার হলো না? তোমার ঘাড়ের উপর বসে আছি সেটা কিছু না? ব্যাংক অ্যাকাউন্টও ত সব আমার নামে করেছো।
– ঘাড়ের উপর বলছো কেন, সংসার সামলাচ্ছো। এরচেয়ে বড় কিছু হতে পারে?
ময়না আমার হাত চেপে ধরে। চিমটি দেয়। রাগে অভিমানে। আমি চুপ হয়ে যাই। ময়না মাথা নুইয়ে আমার মুখের দিকে তাকায়। বলে- কাঁদছো নাতো? তুমি যা ছিঁচকাদুনে। আমি হেসে ফেলি। ময়না আবার বকবক করতে থাকে- “কারা তোমাকে ফ্ল্যাট নিয়ে কথা শোনায়? কোন ফকিন্নি? আসলে ওরা সংসার জীবনে খুব অসুখী। ওদের হিংসে হয়। তাই অন্যের সুখ দেখলে কায়দা করে এসব বলে হালকা করে নিজেকে।” আমি বলি-
– তবু তুমি একটু বেশি সাধারণ। এ যুগে এমন মেয়ে পাওয়া টাফ।
– এ যুগে তোমার মতো লোক পাওয়াও টাফ। চুপ থাকো।
আমাকে চুপ থাকতে বলে ময়না বকবক করেই যায়। আমি শুনি চুপ করে। আমার ভালো লাগে। ভীষণ ভালো লাগে।
শুধু ভাবি, এতটুকুতেই আমাদের সুখ! আমাদের সুখ এখানেই।
গল্পের বিষয়:
গল্প
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত