অন্য বিচার

অন্য বিচার

একটা ভয়ঙ্কর রাত কাটানোর পর গত সন্ধ্যা তে নেওয়া সাংবাদিক বৈকুণ্ঠের সেল ফোন নম্বরে একটা ফোন করল সায়ন্তনী। যতটুকু পারল, প্রয়োজনীয় কথা বার্তা দ্রুত সেরে নিল। একটু পরেই ওর ফ্ল্যাটের সামনে পর পর গাড়ি এসে থামতে লাগল। একে একে উঠে আসতে লাগল বিভিন্ন খবরের কাগজ আর টিভি চ্যানেলের রিপোর্টাররা। এক গাদা সাংবাদিক আর চিত্র সাংবাদিকরা যখন ওর কথা শোনার জন্য বুম গুলো বাড়িয়ে দিচ্ছিল, তখন সায়ন্তনীর রীতিমত অস্বস্তি হচ্ছিল। কেউ একজন ওর মুখে একটা ওড়না জড়িয়ে দিয়েছে। যাতে, চট করে কেউ ওকে না চিনে ফেলে। ও একটা একটা করে নোংরা নোংরা প্রশ্ন গুলোর উত্তর দিতে দিতে হাঁপিয়ে উঠছিল।
পর পর সেই একই প্রশ্ন,

–আপনি কি সত্যিই কোনো ভূতের হাতে ধর্ষিতা হয়েছেন? না কি সাজানো সব? সায়ন্তনী নীরবে মাথা নেড়েছিল।– নিজের এত বড় অপমান নিয়ে কেউ মিথ্যে বলেনা।
–ভূতের অস্তিত্ব কখনও বিশ্বাস যোগ্য?
— আগে বিশ্বাস করতাম না। এখন নিজে ভুক্তভোগী।
— আচ্ছা ভূতের অস্তিত্ব যদি বিশ্বাস ই করি, তবে কায়া হীন হয়ে সে কিভাবে ধর্ষণ করতে পারে?
— প্রশ্ন টা শুনে সায়ন্তনীর মুখ, চোখ লজ্জায় লাল হয়ে গেল। কোন জবাব দিতে পারল না ও।
— আচ্ছা যদি ধরেই নেই, আপনি একটা ভূতের জন্য ধর্ষিত হয়েছেন, তবে কে সে?

কি শত্রুতা ছিল আপনার সঙ্গে? পর পর উত্তর দিতে দিতে একসময় সায়ন্তনী কেঁদেই ফেলল। সারা শরীর ওর রাগে আর অপমানে তখন কাঁপছে। মুখ চোখ ঘোর লাল বর্ণ ধারণ করেছে। একজন মহিলা পুলিশ ওকে সেই সময় কিছুক্ষনের জন্য মেডিকেল টেস্ট করতে না নিয়ে গেলে ও হয়তো মাথা তুলে দাঁড়াতে পারত না। সেখানে ও টু ফিঙ্গার টেস্ট দিতে গিয়ে আর এক দফা হেনস্তা হতে হল ওকে। তারপর ফিরে আসার পর আবার একই প্রশ্ন! সারাদিন এক গাদা ধকল সহ্য করার পর বিকেল বেলা ও বাড়ি ফিরলে ওর ফ্ল্যাটে বৈকুণ্ঠ এল।

— এখন কেমন আছেন সায়ন্তনী?
— রক্ত শূন্য ফ্যাকাসে মুখে সায়ন্তনী মৃদু হাসল। এর চেয়ে লোকটা আমাকে মেরে ফেললে ল্যাটা চুকে যেত। আমি আর পারছি না মিস্টার সেন। কিন্তু আমি জানি, যে পাপ আমি করেছি, তার তুলনায় এই শাস্তি অতি নগণ্য। আমি আজ সমাজের কাছে ঘৃণ্য একটা জীব হয়ে থাকব। আমি এমন একজন ধর্ষিতা, যার জন্য কোন মানুষের সামান্য তম অনুভূতি হবে না। হবে না কোন প্রতিবাদ বা মোমবাতি মিছিল। — সায়ন্তনী কাঁদতে লাগল।

— দেখুন সায়ন্তনী, আমি যতদূর বুঝতে পারছি। সমাজের চোখে যতক্ষণ না পর্যন্ত অপূর্ব নির্দোষ প্রমাণ হয়, তত দিন কিন্তু এই ঘটনা আবার ঘটতে পারে। তাই আপনি কাল একজন দক্ষ আইনজীবী নিয়োগ করুন। আর অপূর্ব রায় ধর্ষণ মামলার ফাইল টা রি ওপেন করুন। তারপর সব অপরাধ স্বীকার করে নিন। একমাত্র এতেই আপনি একটা অশরীরী শক্তির হাত থেকে বেঁচে যেতে পারেন। সায়ন্তনী বৈকুণ্টের কথায় ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল। ফ্ল্যাশ ব্যাকে পুরানো সব ঘটনা গুলো রোমন্থিত হতে লাগল। এক অতীত অপরাধের মাসুল গুনতে হল গত কাল। অথচ দিন টা শুরু হয়েছিল বেশ ভাল ভাবেই।

মিলন ভোরে উঠে ব্যক্তিগত কাজে বেড়িয়ে গেল। ওখান থেকে ও অফিস চলে যাবে। তার অনেক পর সায়ন্তনী উঠল। তারপর গুন গুন করে গান গাইতে গাইতে মোবাইল টা নাড়া চাড়া করতে লাগল। পরিচিত অনেক ক্লায়েন্ট কে গুড মর্নিং পাঠাতে হবে। এমন সময় ফ্ল্যাটের সদর দরজা টা একটা শব্দ করে হাট করে খুলে গেল। সেদিকে না তাকিয়েই ও বলল, — কে ঝুমুর এলি নাকি? দু বার ডাকার পরও কেউ সাড়া না দেওয়া তে ও বিছানা থেকে নেমে এল। দরজা টা খুলে বাইরে দেখে বেশ অবাক ই হল। এখন সকাল ন টা বাঁজে । মেয়ে টা আজ এত দেরি করছে কেন! দরজা টাই বা নিজে থেকে খুলে গেল কিভাবে ? ভাবনার মধ্যেই সিঁড়ি ভেঙে ওর দোতলার ফ্ল্যাটে এল ঝুমুর। ওর বহুদিনের ঠিকে ঝি।

— কি হল বৌদি? কেউ এসেছিল নাকি?
— বুঝতে পারছি না। দরজা টা হঠাৎ খুলে গেল! আমি ভাবলাম তুই। যাই হোক, তুই এসেছিস যখন শুনে রাখ। আমার আজ ফিরতে রাত হবে। তুই ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে চলে যাস। আমি আজ একটু তাড়াতাড়ি ই বের হব।

ঝুমুর কে সব কাজ বুঝিয়ে দিয়ে সায়ন্তনী বাথরুমে ঢুকল। আজ একটা স্পেশাল ডিল আছে ওর । একে একে সব পোশাক খুলে ফেলে সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে ও শাওয়ারের তলায় দাঁড়াল। বাথরুমের ভিতরের বড় আয়না টি তে ফুটে উঠল ওর উচ্ছ্বল যৌবনের প্রতিটি শরীরী বিভঙ্গের ছবি। এই শরীরই ওর অ্যাসেট। ওদের বিজনেসের মূলধন। স্নান করতে এসে নিজের নগ্ন রূপে নিজেই পুলকিত হয় সায়ন্তনী। তারপর আর ও সুস্পষ্ট ছবি পেতে তোয়ালে দিয়ে পরিস্কার করতে থাকে আয়না তে জমে থাকা সূক্ষ্ম জল কনা আর সাবানের ফেনা গুলো কে। আর তারপর ই ভয়ঙ্কর চিৎকার করে উঠে দু-তিন পা পিছিয়ে যায় ও। এ যে বিভৎস রক্তাক্ত একটা মুখ! কার ছবির প্রতিবিম্ব এটা? আয়না তে কিভাবে এল? কোন রকমে গায়ে তোয়ালে জড়িয়ে থর থর করে কাঁপতে কাঁপতে বাথরুম থেকে বেড়িয়ে এল ও। ঝুমুর ওকে এই অবস্হাতে দেখে অবাক তো পরের কথা, প্রচণ্ড ঘাবড়ে গেল। সায়ন্তনী জীবনে এত রক্তাক্ত আর এত ভয়ঙ্কর কোন মুখ কখনো দেখে নি।

বেশ কিছুক্ষন লাগল স্বাভাবিক হতে। ঝুমুর চা করে আনতে সেটা খেয়ে একটু ধাতস্থ হল ও। তারপর মিলন কে ফোন করে একটা গাড়ি পাঠাতে বলল। মিলন হল ওর বয় ফ্রেন্ড। যার সঙ্গে প্রায় পাঁচ -ছয় বছর ধরে ও লিভ ইন করে।
বেলা এগারো টা নাগাদ মিলন একটা ওয়াগনার পাঠাল। এবার ওকে সেক্টর ফাইভে অফিস যেতে হবে। অফিস মানে মিলন আর ওর একটা যৌথ ইউনিট। একটা আইনি সহায়তা কেন্দ্র। এখানে মানুষের জীবনের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে পরামর্শ দেওয়া হয়। ভিতরে অবশ্য অন্য গোপন অভিসন্ধি চলে। মানুষের দুর্বলতার সুযোগ বুঝে, তাকে বিভিন্ন ভাবে ব্ল্যাক মেল করা হয়। যত রকম ভাবে পারা যায় লুটে নেওয়া হয় ক্লায়েন্ট কে। গাড়ি টা একটা এগারো তলা বিন্ডিং এর সামনে এসে থামল। সায়ন্তনী গাড়ি থেকে নেমে হন হন করে লিফটে সপ্তম তলা এসে নিজের অফিসে ঢুকল। ভাগ্য ভাল সে সময় কোন ক্লায়েন্ট ছিল না। মিলন আনমনে কি একটা টাইপ করছিল কম্পিউটারে। ও ঢুকতেই মুখ না তুলে বলল, — কি হল, হঠাৎ নিজের গাড়ি না চালিয়ে এসে, ড্রাইভার পাঠাতে বললে?

— খুব ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা হল মিলন। গাড়ি চালাবার মতন মানসিক জোর আজ আর নেই।
— মানে? কাজ ফেলে মিলন অবাক হয়ে সায়ন্তনীর দিকে তাকাল। সায়ন্তনী ধীরে সুস্থে সব বললে মিলন সব হেসে উড়িয়ে দিল।

—ছাড় তো ওসব। একটু ভূতের সিনেমা কম দেখ। দেখবে কোন সমস্যা থাকবে না।– মিলন ব্যাপার টাকে হালকা করতে চাইলে সায়ন্তনী বোকা বনে চুপ করে গেল। একটা ভাল খবর দেই। একটা মাড়োয়ারী ক্লায়েন্ট পেয়েছি। লোক টার বৌ বাচ্চা সব দেশে থাকে। একটু ছলা, কলা জানলেই পুরো সম্পত্তি হাতিয়ে নেওয়া সহজ।

— কথা টা বলে মিলন লক্ষ্য করল, সায়ন্তনীর মন অন্য দিকে পড়ে।
— কি ভাবছ বল দেখি এখনও? মিলন একটা সিগারেট ধরিয়ে আর একটা সায়ন্তনী কে এগিয়ে দিল। তারপর লাইটার ধরিয়ে তাতে অগ্নি সংযোগ করল।

— তোমার অপূর্ব কে মনে আছে? — এক মুখ ধোঁয়া ছেড়ে সায়ন্তনী জিজ্ঞাসা করল।
— অপূর্ব, অপূর্ব হ্যাঁ হ্যাঁ মনে পড়েছে। যার পাশে তুমি শোয়ার পরই আমরা রাতারাতি বড়লোক হয়ে গেলাম? সে তো।

— হ্যাঁ হ্যাঁ, সে। এখন কোন জেলে যেন আছে?- সিগারেটের ছাই ঝেড়ে সায়ন্তনী জিজ্ঞাসা করল।
— জেল? না না ও কোন জেলে নেই। — মিলন আবার টাইপ করতে করতে বলল।
— মানে? ছাড়া পেয়ে গেল নাকি? — সায়ন্তনী আঁতকে উঠল যেন।
— আরে না না, ছাড়া পায় নি। স্যুইসাইড করেছে গত কাল।

ওকে এক জেল থেকে অন্য জেলে নিয়ে যাবার সময় প্রিজন ভ্যান থেকে হঠাৎ বেড়িয়ে পড়ে একটা ব্রিজের মাথার উপর থেকে নিচে রেল লাইনে লাফ দেয়। স্পট ডেড। ল্যাটা চুকে গেছে। এই তো আজকের পেপাড়ে প্রথম পাতাতেই দিয়েছে।– কথাটা বলে মিলন পেপার টা সায়ন্তনীর দিকে এগিয়ে দিল। মিলনের কথায় সায়ন্তনী পেপারের ছবিটা দেখে দুশ্চিন্তা ভরা মুখ নিয়ে বলল, — ও স্যুইসাইড করেছে! গত কালকেই?

— হ্যাঁ, তাই করেছে। কিন্তু তোমার এত ভয় পাবার কি আছে? ভয় পেলে কাজ কারবার বন্ধ করে দিতে হয়।
মিলনের কথায় চুপ করে রইল সায়ন্তনী।

ফ্ল্যাশ ব্যাকে অতীতের কথা গুলো মনে পড়ে যেতে লাগল ওর। আজ থেকে প্রায় চার বছর আগে সৌম্যদর্শন ছেলেটি ওদের অফিসে আসে। প্রচুর টাকার মালিক। পূর্ব পুরুষ এক সময় জমিদার ছিল। কলকাতা তে তিনটে বাড়ি। সম্পত্তি গত একটা মামলার পরামর্শের জন্য আসে। প্রথম দিনই ওদের দুজনের দৃষ্টি আটকে যায় অপূর্বের প্রতি। ওদের মনে হয়, ছেলে টাকে খুব সহজেই বলির পাঁঠা করা যাবে। আর হল ও তাই। একদিন বিকেল বেলা অপূর্ব আসতেই ওকে মাদক মেশানো সরবত খেতে দেয় মিলন। তারপর ও নেশাচ্ছন্ন হয়ে গেলে ওর পোশাক সম্পূর্ণ খুলে সোফায় বসানো হয়। ততক্ষণে সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে যায় সায়ন্তনী ও। তারপর বিভিন্ন পোজে নিজের মোবাইল থেকে দুজনের পাশাপাশি বেশ কিছু ছবি তুলে নেয় ও। ব্যাস কেল্লাফতে। আস্তে আস্তে চেতনা ফিরে আসে অপূর্বর। আর তার পরেই নিজের আর সায়ন্তনীর পাশাপাশি নগ্ন শরীর দেখে দেখে ভূত দেখার মতন চমকে ওঠে। শীতের রাতেও ঘেমে নেয়ে স্নান করে যায়। ততক্ষণে নিজের মোবাইল বার করে সব ছবি গুলো অপূর্বের সামনে মেলে ধরে সায়ন্তনী।

— এ আ-আপনি কি করেছেন? ছি ছি, — অপূর্ব দু হাতের চেটো দিয়ে মুখ ঢাকে।
— কি করেছি তো বুঝতেই পারছেন। — মিষ্টি হেসে সায়ন্তনী ওর গলা টা জড়িয়ে ধরে ওকে নিজের উন্মুক্ত শরীরের কাছে নিয়ে আসে। ছিটকে সরে যায় অপূর্ব। তার পর দ্রুত পোশাক পরে নেয়।

— বলছি, এসবের মানে কি? কেন করেছেন এসব নোংরা কাজ?

ততক্ষণে পাশে এসে দাঁড়াল মিলন। — আপনার অনেক টাকা আছে। এই ছবির জন্য প্রতি মাসে আমাদের কিছু জলপানির ব্যবস্থা করলে নিশ্চয়ই সমস্যা হবে না।

— তার মানে আপনারা আমাকে ব্ল্যাক মেলিং করবেন? — রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলল অপূর্ব।
–হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন। — নিজের গায়ের পোশাক টা ঠিক করতে করতে উঠে দাঁড়াল সায়ন্তনী। তারপর একটা সিগারেট ধরাল। তারপর মিলনের দিকে আর অপূর্বের দিকে একটা করে এগিয়ে দিল।

— কত টাকা চান আপনারা বলুন তাড়াতাড়ি?- সিগারেট টা মেঝে তে ছুড়ে ফেলে বলল অপূর্ব।
— বেশী না, লাখ পাঁচেক দিয়ে শুরু হোক।– এক মুখ ধোঁয়া অপূর্বের মুখের উপর ছেড়ে বলল মিলন। এই সায়ন্তনী, তুমি কি কিছু ভাবছ? বার বার অন্যমনষ্ক হয়ে পড়ছ?

–সরি, হ্যাঁ ঐ ছেলেটার কথা আজ খুব মনে পড়ছে জান। কেন জানি না, আজ আর কিছুতেই ওর কেস টা থেকে বের হতে পারছি না। সায়ন্তনীর কথায় মিলন হাসল। তারপর ওর পাশে বসে ওকে জাপটে ধরে, খান কতক চুমু খেয়ে বলল, চল আজ দুপুরে অফিস বন্ধ করে দুজনে একটু লং ড্রাইভে যাই। কোন ধাবা তে লাঞ্চ করে নেব।

— যাবে? বেশ হয় তবে। — সায়ন্তনী বেশ উৎসুক হয়ে বলল।

তারপর মিনিট দশ পনেরোর মধ্যে দুজনে বেড়িয়ে পড়ল। মিলন ই ড্রাইভ করছিল। কিছুক্ষনের মধ্যেই ওরা ভি. আই. পি. রোড ছাড়িয়ে বেলঘোরিয়া এক্সপ্রেস ওয়ে দিয়ে এগিয়ে চলল। কিন্তু সায়ন্তনীর আজ পুরানো ঘটনা গুলো বার মনে পড়ে যাচ্ছিল। প্রথম পাঁচ, ছয় মাস অপূর্ব মাসে পাঁচ লাখ করে দিয়ে যাচ্ছিল। তারপর হঠাৎ ভাটা পড়ে। সেদিন টা আজ ও মনে পরে, যেদিন এসে ও মিলনের আর ওর হাতে পায়ে ধরে ব্যাপার টা মিটিয়ে নিতে বলে। ওর দিক থেকে এত টা চাহিদা না থাকলেও মিলন কিছুতেই সোনার ডিম দেওয়া হাস কে ছাড়তে চাইল না। যতদূর সায়ন্তনীর মনে আছে, এখন কার ফ্ল্যাট টাও অপূর্বর থেকেই হাতিয়ে নেওয়া। তখন অবশ্য ওদের মনে নিজেদের পেশা সম্পর্কে সামান্য তম ঘৃণার উদ্রেক ও হয় নি। তবে আজ কেন হচ্ছে? এটা কি ঘৃণা না ভয়?

— আরে ইয়ার, এবার কি একটু মুড ঠিক করবে, নাকি? ডানকুনি ক্রশ করে একটা ধাবার সামনে গাড়ি দাঁড় করিয়ে বলল মিলন।
— না না, ঠিক আছি আমি। চল যাওয়া যাক।

গাড়ি টা পার্ক করে মিলন সায়ন্তনীর হাত ধরে ভিতরে ঢুকল। ওয়েটার কাছে আসতেই দুটো চাইনিজ ডিশ অর্ডার করল মিলন। তারপর নিচু গলায় মিস্টার ঘনশ্যাম তিওয়ারির কেস ফাইল টা নিয়ে আলোচনা করতে লাগল।

— শোন ভাল করে, লোক টার এমনি তেই মেয়েদের প্রতি দুর্বলতা আছে। তোমাকে খুব বেশী পরিশ্রম করতে হবে না। বরঞ্চ, আমি যা শুনেছি, তাতে গোপন ক্যামেরার সামনে লোকটার ঘনিষ্ঠ হতে গিয়ে আবার নিজের ইজ্জত দিয়ে বসো না।

— ঘনশ্যাম তিওয়ারি মানে, সেই মারোয়ারি টা? — সায়ন্তনী একটা স্যুপের বাটি থেকে স্যুপ তুলতে তুলতে জিজ্ঞাসা করল।

— হ্যাঁ, ঐ লোকটাই। মাথায় রেখ, এখানে কিন্তু আমি তোমাকে বিজনেস পার্টনার হিসাবে দেখাই নি। একজন নাম করা কল গার্ল বলেছি।

— বাঃ, খুব ভাল করেছ। নিচে নামতে নামতে না জানি কোথায় গিয়ে ঠেকব। — সায়ন্তনী অনুযোগের সুরে বলল।
—আরে পাগলি, এটা একটা টেকনিক। বোকামি করো না।

মিলন কথা টা বলে ওয়েটার কে ডেকে একটা হুইস্কি অর্ডার করল। তারপর একটা সিগারেট ধরিয়ে বাইরে এসে পায়চারী করতে লাগল। সায়ন্তনী অনেকক্ষণ ধরে কেবিনের হালকা নীল আলো টার দিকে তাকিয়ে ছিল। একটু দূরে একজন সৌম্যদর্শন যুবক এসে বসেছে। দেখতে অনেক টা অপূর্বের মতন ই। ঘুরে ফিরে সেই ছেলে টার কথাই মাথায় আসছে।

অপূর্বর ফ্ল্যাট টা হস্তগত করার পর, ছেলেটার পরিবারে বড় সর কোন দুর্যোগ নেমে ছিল। বার বার ফোন করে আর হোয়াটস্যাপে মুক্তি চেয়েছিল। যাতে ওর ছবি গুলো ফেরত দেওয়া যায়। কিন্তু মিলন রাজি হয় নি। বরঞ্চ পর পর তিন মাস কিছু দিতে না পারায় ওর নামে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ধর্ষণের মামলা দায়ের করে। এর পরেই দুর্দিন নেমে আসে অপূর্বর জীবনে। ধর্ষণ মামলা তে জড়িয়ে যাবার পরই অপূর্বর স্ত্রী ওর বিরুদ্ধে ডিভোর্সের মামলা দায়ের করে। ওর বোনের এক জায়গা তে বিয়ের পাকা কথা পর্যন্ত হয়ে গেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত একটা ধর্ষকের পরিবারের সঙ্গে ওরা আর সম্পর্ক রাখতে চায় নি। যার ফলে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করে ওর বোন। কিন্তু সমাজ অপূর্বর পাশে দাঁড়ায় নি। বরং চারদিকে ওর মতন এক জমিদার বংশের ছেলের অপকর্ম নিয়ে কলকাতা তে বিভিন্ন কাগজে ছি ছি পড়ে যায়।

ব্যাপার গুলো তে যে সায়ন্তনীর একে বারেই খারাপ লাগে নি, তা নয়। তবে টাকার লোভ বড় দায়। আর ঐ ছবি গুলো তো বড় অ্যাসেট। তাই, আইনের ছাত্রী হওয়ার সুবাদে ও কেস টাকে আরও জটিল করে দিল। যাতে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ধর্ষনের মামলা থেকে অপূর্ব ছাড়া না পায়। অবশ্য ওকে বিশাল টাকা দিয়ে কেস উইথড্র করতে বললে সেটা আলাদা কথা। এইসময় ওর সমর্থনে প্রচুর মহিলা সংগঠন ও এগিয়ে আসে। বিভিন্ন নারীবাদী আন্দোলনে হঠাৎ করেই সায়ন্তনী পরিচিত মুখ হয়ে যায়। সবাই ওকে দেখলেই বলা বলি করতে থাকে প্রতিবাদী কণ্ঠ হিসাবে। বলা বাহুল্য, মিলনের কেরামতি তে এই কেস টা তে অপূর্ব শেষ পর্যন্ত হেরে গেল। ওর পক্ষে তখন বড় কোন উকিল নেবার ক্ষমতা টুকু ছিল না। ব্ল্যাকমেলিং এর সপক্ষে কোন অকাট্য প্রমাণ ও যোগার করা সম্ভব হয় নি ওর। শেষ পর্যন্ত ওর দশ বছরের জেলই হয়ে গেল। আর সায়ন্তনী এক ব্যতিক্রমী লড়াই জিতে নারীবাদী আন্দোলনের প্রতীক হয়ে বিভিন্ন খবরের কাগজের শিরোনাম হয়ে উঠল। কিছুক্ষন দু হাতে মুখ ঢেকে রাখল ও। শরীরের ভিতরে কেমন একটা অস্বস্তি হচ্ছে। এটা কি গ্লানি না অন্য কিছু?

–ম্যাডাম, আপনার লাইটার টা দেবেন?

হঠাৎ করে প্রশ্ন টা আসায় সায়ন্তনী অন্যমনস্ক হয়ে পার্স খুলে লাইটার টা বার করে লোক টার দিকে এগিয়ে দিল।
তারপর মনে পড়ল, এখানে এসে তো ও একটাও সিগারেট খায় নি। তবে লোক টা কিভাবে বুঝল, যে ও সিগারেট খায়? আশ্চর্য হয়ে ও লোক টার দিকে তাকাল। ততক্ষণে লোক টা পাশ ফিরে সিগারেট ধরিয়ে একটা টান দিয়েছে। তারপর ওর দিকে ফিরে এক মুখ ধোঁয়া ছাড়ল লোকটা। ধোঁয়ার জালে লোক টার মুখ টা পুরো ঢাকা পড়ে গেছে। সায়ন্তনীর শরীর টা কোন এক অজানা কারণে কেঁপে উঠল।

— কে আপনি?

লোকটা কোন উত্তর করল না। ধোঁয়ার কুণ্ডলী টা একটু পাতলা হতেই সায়ন্তনী চিৎকার করে উঠল। এ যে সেই সকালে দেখা রক্তাক্ত মুখ টা! — অপূর্ব! সায়ন্তনীর চিৎকারে মিলন দৌড়ে এল। — কি হল ডার্লিং? এমন ভয় পেলে কেন?

— সেই মুখ টা মিলন। উফ, কি ভয়ঙ্কর! আর সহ্য করতে পারছি না। আমাকে এখন ই এখান থেকে নিয়ে চল প্লিজ। সায়ন্তনীর চিৎকারে আরো কয়েক জন ছুটে এসেছিল ওখানে। মিলন সবাই কে আশ্বস্ত করে সায়ন্তনী কে নিয়ে বাইরে এল। তারপর ওকে সীটে বসিয়ে গাড়ি ছেড়ে দিল। গাড়ি তে বসে সায়ন্তনী চোখ বন্ধ করে সীটে নিজেকে এলিয়ে দিল। তারপর কিছুক্ষণ পর একটা জোরালো ব্রেক কষা তে কল্পনার জগত থেকে একেবারে বাস্তবে এল।
গাড়ি টা একটা ব্রিজের শুরুতে তে পার্ক করে মিলন গাড়ি থেকে নামল।

— এটা কোথায় এলাম মিলন?– সায়ন্তনী চোখ দুটো বড় করে দেখার চেষ্টা করল। তারপর গাড়ি থেকে নেমে এসে দাঁড়াল। দেখল, একটু দূরে একটা ব্রিজ, যার অনেক নীচ দিয়ে রেল লাইন গেছে।
— এটা সেই জায়গা, যেখান থেকে গত কাল অপূর্ব ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছিল।
— হাঁটতে হাঁটতে সায়ন্তনীর পিঠে একটা হাত রেখে মিলন গম্ভীর হয়ে বলল।
–উফ, কেন আবার আমাকে এখানে নামালে তুমি? জানই তো আমি এসব সহ্য করতে পারি না।

রেলিং এর পাশে দাঁড়িয়ে আমার ই তো মাথা ঘুরছে! সায়ন্তনীর কথায় পিছন থেকে কেউ হাসল। বলল, — তাহলে বুঝে দেখুন, ছেলে টা কতটা উপর থেকে পড়ছে। শুধু একটু মরবে বলে। কথা টা শুনে চমকে গিয়ে ওরা দুজনেই পিছন ঘুরল। এতক্ষণ খেয়াল করে নি, সন্ধ্যার আলো আঁধারি তে একটা লোক ওদের ঠিক দু হাত দূরে দাঁড়িয়ে আছে। কে আপনি? বেশ অবাক হয়ে মিলন জিজ্ঞাসা করল। ওদের ডাকে লোক টা ধীরে ধীরে পিছন ফিরতেই ওরা দুজনে এক জন আর এক জন কে ভয়ে জাপটে ধরল।

এতো সেই লোকটা! সেই ভয়ঙ্কর রক্তাক্ত মুখ! এ যে অপূর্ব! — সায়ন্তনী ভয়ে চিৎকার করে উঠল। এরকম বিভৎস চেহারা দেখার পর মিলনের সাহসও ছুটে গেল। ও সায়ন্তনীর একটা হাত ধরে ব্রিজের নিচে রাখা গাড়ির দিকে দৌড়তে লাগল। তারপর দু জনে ভিতরে ঢুকতেই মিলন প্রচণ্ড স্পীডে গাড়ি পিক আপে তুলল। একটা ঝাঁকুনি খেয়ে গাড়ি টা ছুটে চলল। কিন্তু বেশী দূর যেতে পারল না। লুকিং গ্লাসের দিকে তাকিয়ে মিলন দেখল অপূর্ব গাড়ির পিছনের সীটে বসে ভয়ঙ্কর ভাবে হাসছে! এত ভয়ঙ্কর মূর্তি কোন দিন দেখে নি মিলন। ব্রিজের উপর গাড়ি উঠতেই গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হারাল মিলন। গাড়ি টা রেলিং এ একবার ধাক্কা খেয়ে নিচের রেল লাইনে গিয়ে পড়ল। আর মুহূর্তের মধ্যে ই চলন্ত এক্সপ্রেস ট্রেনের সামনে তাল গোল পাকিয়ে গেল। রেলিং এ ধাক্কা খাবার পর সায়ন্তনী মাথায় চোট পেয়ে কোন মতে দরজা ভেঙে ছিটকে পড়লেও মিলন আর বের হতে পারল না। দুর্ঘটনার প্রাথমিক ধাক্কা টা কাটিয়ে সায়ন্তনী চিৎকার করে উঠল। চোখের সামনে মিলন কে ওভাবে মরতে দেখে ও স্থবির হয়ে গেল।

— মি…ল…ন ওর আর্তনাদ টা ব্রিজের উপরে তরঙ্গায়িত হয়ে দূরে মিলিয়ে গেল। ব্রিজের উপর দিয়ে তখন পর পর গাড়ি বেড়িয়ে যাচ্ছে। কেউ ওকে সাহায্যের জন্য এগিয়ে এল না। মিলন কে এভাবে চলে যেতে দেখে রেলিং ধরে মাথা ঝুঁকিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল ও। নিচে এখন আর গাড়ি টার চিহ্ন মাত্র নেই! চিহ্ন নেই মিলনের ও! কতক্ষণ ও, এভাবে দাঁড়িয়ে ছিল জানে না। হঠাৎ কাঁধের উপর কারোর হাত পড়তেই ও ঘুরে দাঁড়াল। — সেই বিভৎস মূর্তি টা! ও এক টা মরিয়া ধাক্কা মেরে লোক টিকে সরিয়ে নিজে ব্রিজের উপর দিয়ে দৌড়াতে লাগল। বার বার পিছনে তাকিয়ে দেখল, অপূর্বর অশরীরী আত্মা ও ধোঁয়ার কুণ্ডলী হয়ে ওর পিছনে তাড়া করে আসছে।

–বাঁচাও, বাঁচাও, শরীরের সব টুকু শক্তি গলায় এনে সায়ন্তনী চিৎকার করল। সঙ্গে সঙ্গে একটা স্যান্ট্রো এসে ওর পাশে থামল। চালকের আসন থেকে হাত বাড়িয়ে কেউ দরজা খুলে ওকে টেনে তুলল।

— আপনি কি কোন ও বিপদে পড়েছেন? তেমন হলে আমি আপনাকে সাহায্য করতে পারি।
— ড্রাইভারের আসনে বসা লোক টি কে বেশ চেনা চেনা লাগল ওর। হ্যাঁ মনে পড়েছে, একটা বিখ্যাত চ্যানেলের প্রখ্যাত সাংবাদিক বৈকুণ্ঠ বনিক।

— আ-আপনি?
— বৈকুণ্ঠ বনিক, নমস্কার। কিন্তু আপনার কপাল ফেটে যে বাজে ভাবে রক্ত পড়েছে! আসুন, সামনে কোন জায়গা থেকে আপনাকে প্রাথমিক চিকিৎসা করে আনি।

— বৈকুণ্ঠ বাবুর কথায় সায়ন্তনী প্রায় আঁতকে উঠল।
— না না, ব্যস্ত হবেন না। আমি ঠিক আছি। পারলে আমাকে একটু লেক টাউনের ফ্ল্যাটে পৌঁছে দিন। — সায়ন্তনী হাতের রুমাল টা দিয়ে ক্ষতস্থান টা বার বার ঢাকার চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু রক্ত বাঁধ মানল না। ফিনকি দিয়ে বের হতে লাগল।

— বলছি, রেলিং এ ঝুঁকে কি করছিলেন?
–রে-রেলিং?

উত্তেজনা আর ভয় কে কোন রকমে চাপার চেষ্টা করল সায়ন্তনী। ও নিজে উকিল বলেই জানে, উকিল, সাংবাদিক আর পুলিশের কাছে হা করতে নেই। সব কথা বার করে আনবে।

— না না, সেরকম কিছু না। একটা পাগল তারা করছিল। দৌড়াতে গিয়ে পাঁচিলে ধাক্কা খেলাম। — কোন রকমে কথা ঘুরিয়ে নিল সায়ন্তনী।

— চোট টা কিন্তু মনে হয় শুধু আপনার মাথায় না। মনে ও প্রভাব ফেলেছে, মিস সায়ন্তনী সেন।
— বৈকুণ্ঠের কথায় সায়ন্তনী ঘাবড়ে গেল। আপনি আমাকে চেনেন?
— চিনতাম না,

তবে অপূর্ব বাবুর সঙ্গে আপনার মামলা টা জনসমক্ষে আসার পর ই চিনলাম। তা একা একা কি করছিলেন এই ব্রিজের উপর। এটা জানতেন নিশ্চয়ই গত কাল অপূর্ব বাবু এখান থেকেই স্যুইসাইড করেছেন?
বৈকুু্টের কথা শুনে সায়ন্তনীর বুক টা ধরাস করে উঠল। লোকটা আরও কোন প্রশ্ন করবে না কিরে বাবা?
মুখে অবশ্য একটা হাসি ফুটিয়ে বলল– হ্যাঁ, দেখতে এসেছিলাম। তাতে কি অন্যায় করেছি?

গাড়ি টা একটা বড় ওষুধের দোকানের সামনে পার্ক করে বৈকুণ্ঠ ওকে ধরে ধরে নামল। তারপর দোকানের ভিতর বসিয়ে কপালে স্টিচ করাল। তিনটে স্টিচ পড়ল। সায়ন্তনী বেশ অবাক ই হল লোক টার সাহায্য করার মানসিকতা দেখে। ও আবার গাড়ি তে উঠে বলল, — অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে। নিজের এত বড় ইমেজ বাদ দিয়ে আমাকে সাহায্য করার জন্য। সায়ন্তনীর কথায় বৈকুণ্ঠ হাসল। বলল– ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করবেন না। অসুস্থ কে সেবা করা সবার দায়িত্ব। কিন্তু আপনার মুখ চোখ দেখে মনে হচ্ছে আপনি খুব মানসিক আঘাত পেয়েছেন। কি লুকোচ্ছেন বলুন তো? বৈকুণ্ঠের কথায় বুক টা আবার ধরাস করে উঠল ওর। তবু মুখে হাসি নিয়ে বলল, — কি লুকাবো?

— কি লুকাবো মানে? আমাকে বিশ্বাস করতে বলেন, যে এই ভর সন্ধ্যা তে বাড়ি থেকে এত দূরে একটা নির্জন ব্রিজের উপর আপনি তামাসা দেখছিলেন? বৈকুণ্ঠের কথায় সায়ন্তনী মুখ নিচু করল। তা দেখে বৈকুণ্ঠ আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু একটা ফোন আসায় গাড়ি টা স্লো করে ফোন টা ধরল। বেশ কিছুক্ষন অপর প্রান্তের কথা শুনে সায়ন্তনীর দিকে তাকিয়ে বলল, — যে ব্রিজের নিচে আপনি ঝুঁকে দেখছিলেন, তার নিচে কিছুক্ষণ আগে ব্রিজের উপর থেকে একটা গাড়ি পড়ে গেছে। সঙ্গে সঙ্গে ট্রেন চলে আসে। আর গাড়ি টিকে ধাক্কা দিয়ে পঞ্চাশ মিটার দূরত্বে ফেলে দেয়। গাড়ি টি তে একজন আরোহী ছিল। তার শরীরের আস্ত কিছু কিন্তু পাওয়া যায় নি। একদম স্পট ডেট।

— উফ্, প্লিজ চুপ করুন। আর নিতে পারছি না। দয়া করে আমাকে একটু একা থাকতে দিন। — মিলন কে হারাবার শোকে হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলল সায়ন্তনী। একটা বড় ফ্ল্যাট বাড়ির সামনে এসে বৈকুণ্ঠ গাড়ি থামাল। তারপর হেসে বলল– নিন ম্যাডাম, আপনার অপূর্ব ফ্ল্যাট চলে এসেছে।

— কি বললেন? চোখ মুছে নামতে গিয়ে হঠাৎ থমকে দাঁড়াল সায়ন্তনী।
— বললাম অপূর্ব ফ্ল্যাট। কেন কিছু সমস্যা হল? সায়ন্তনী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নাড়ল। নিজের মনেই ভাবল, সত্যিই তো এটা অপূর্বর ফ্ল্যাট। কিন্তু বৈকুণ্ঠ বাবু কিভাবে জানল?  জানলা দিয়ে একটা কাগজের চিরকুট বার করে সায়ন্তনীর হাতে দিল বৈকুণ্ঠ। — নিন, এতে আমার ফোন নাম্বার দেওয়া আছে। দরকার হলে কল করবেন।

সায়ন্তনী কাগজ টা নিয়ে শুকনো হেসে তারপর সিঁড়ি বেয়ে ওঠা শুরু করল। বৈকুণ্ঠ গাড়ি তে স্টার্ট দিয়ে জোরে জোরে বলল, –সত্য কখনো চাপা যায় না ম্যাডাম। খুব ভাল হতো যদি সমস্যা গুলো খুলে বলতেন। বৈকুণ্ঠের কথা টা শুনে সায়ন্তনী একবার থমকে দাঁড়াল। তারপর উপরে উঠে গেল। উপরে উঠে ঘরের দরজা ভাল করে লক করল ও। তারপর অতি সন্তর্পণে আলো জ্বালিয়ে বাথরুমে ঢুকল। বেসিনের উপরেই আয়না টা ফিট করা। ভাল করে আয়না টা দেখে ও ভয়ার্ত ভাবে মুখে, চোখে জল দিল। তার পর আস্তে আস্তে খুলে ফেলল জিনস আর টপ। হ্যাঙার থেকে ওভার কোট টা দ্রুত নামিয়ে পরতে যাওয়ার সময় ই কে যেন ওকে পিছন থেকে জাপটে ধরল। ও প্রবল আতঙ্কে চিৎকার করে আয়না তে তাকাতেই দেখল সেই অপূর্বের ভয়ঙ্কর মূর্তি! নিজের সমস্ত মানসিক শক্তি কে একত্রিত করে সায়ন্তনী এবার রুখে দাঁড়াল। ঘুরে দাঁড়িয়ে প্রচণ্ড শক্তিতে আঘাত করল অপূর্বর রক্তাক্ত মুখের উপর। কিন্তু ঘুষি টা একটা ধোঁয়ার কুণ্ডলী তে আঘাত করে ফিরে এল। — কি চাই? কেন বার বার ফিরে আসছ তুমি? মিলন কে হত্যা করে ও শান্তি পাও নি?

— চিৎকার করে উঠল সায়ন্তনী। অপূর্ব ওর কথায় হাসল। বড্ড গা জ্বলিয়ে দেওয়া সে হাসি। কোন কথা না বলে সায়ন্তনীর ডান হাত টা ধরে হির হির করে টেনে এনে বিছানা তে ফেলল ও। তার পর জোর করে বিবস্ত্র করতে লাগল ওকে। অপূর্বের খসে খসে পড়া রক্ত মাংসের গন্ধে সায়ন্তনী বমি করে ফেলল। কিন্তু নিস্তার পেল না। ওর হাত দুটো কে মুচড়ে সম্পূর্ণ উলঙ্গ করে বিছানা তে চেপে ধরল অপূর্ব। তার পর খামচে ধরতে লাগল ওর পুরুষের শরীরে শিহরণ জাগানো দেহ সুধা কে। অপূর্বর বিকট চেহারার সামনে নিজেকে অসহায় মনে করল সায়ন্তনী। অপূর্বর বলিষ্ঠ বাহুর আড়াল থেকে কোন ক্রমে মুখ টা বার করে চিৎকার করল ও।

— বাঁচাও, কেউ আছ? প্লিজ হেল্প মি।
— কেউ বাঁচাবে না তোমায়। যেমন আমাকে কেউ বাঁচায় নি। — কর্কশ কণ্ঠে অপূর্ব বলে উঠল।
— আমাকে ছেড়ে দাও অপূর্ব। আমি জানি আমরা তোমার সাথে অনেক, অনেক অন্যায় করেছি। তোমার মৃত্যুর জন্য আমরা দায়ি। তবু আমাকে ছেড়ে দাও। সায়ন্তনীর কথায় অপূর্ব অট্টহাস্য করে উঠল।

— তা আর হয় না শয়তানী। –এক ভয়ঙ্কর কর্কশ কণ্ঠে বলে উঠল অপূর্ব।
— যে অপরাধ না করে ও আমি আর আমার পুরো পরিবার শেষ হয়ে গেলাম। তা পুরণ করে নেওয়াই শ্রেয়। এতে কিছুটা হলে ও মেনে নেব, যে আমি বিচার পেয়েছি।

অপূর্বর গলার স্বর যেন ক্রমশ ভয়ঙ্কর থেকে আরো ভয়ঙ্কর হয়ে গেল। অপূর্বর শক্তির কাছে সায়ন্তনী হেরে যেতেই ওর শরীর ক্রমশঃ শিথিল হয়ে যেতে লাগল। ওর যোনি যেন ছিন্নভিন্ন হয়ে যেতে লাগল। তারপর কখন যে ও জ্ঞান হারিয়েছে, তা আর ওর মনে নেই। যখন জ্ঞান ফিরল, তখন নিজেকে রক্তাক্ত বিছানা তে আবিষ্কার করল। পা দুটো মাটিতে ঠিক ঠাক ফেলার শক্তি টুকু ও যেন আর নেই। ধীর পদক্ষেপে ও কোন ক্রমে বাথরুমে এল। শাওয়ারের তলায় মেলে ধরল ওর কলুষিত যৌবন কে। সারা শরীরে নখের দাগ। জায়গায় জায়গায় রক্ত শুকিয়ে রয়েছে। এক রাতের মধ্যে ওর ওর শরীর যেন মরুভূমি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কান্না তে ভেঙে পড়ল সায়ন্তনী। ওর মনে হল, এর থেকে ওকে মেরে ফেললেই ভাল করত অপূর্ব।

গল্পের বিষয়:
গল্প
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত