দীর্ঘশ্বাস

দীর্ঘশ্বাস
বিয়ের সাত বছর পর সংসারটা ভেঙেই গেল আমার। ঠিক কতটুকু পুরুষত্বে তৃপ্তি দিতে পারলে নিজের বউকে সুখী করা যায় জানিনা। তবে এইটুকু শুধু জানি আমার পুরুষত্বের খোঁচা দিয়েই নীপা আমাকে ডিভোর্স দেয়। নীপা হয়তো জানত পুরুষদের আঘাত করার জন্য এটাই সবচেয়ে মোক্ষম অস্ত্র। আর তার ব্যবহার সে সঠিক ভাবেই করেছিল। যদি এটা ছিল তার অজুহাত ; কিন্তু ডির্ভোসের কারণ ছিল ভিন্ন।
নিজেদের পছন্দে বিয়ে হয়েছিল আমাদের। এক মেয়ের বাবা আমি। বিয়ের সপ্তম বিবাহ বার্ষীকি ধুমধাম করে পালন করেছিলাম আমরা। সেটার রেষ কাটতে না কাটতেই নীপা আমার হাতে ডির্ভোস লেটার ধরিয়ে দিয়েছিল। বড় মেয়েটার বয়স পাঁচ। আজকাল ওর দিকে তাকাতে আমার ভয় হয়। মনে হয়, বাবা হিশেবে পারব কী ওকে সামাল দিতে,মানুষের মত মানুষ করে তুলতে? মাঝেমাঝে ওর মাকে দেখার জন্য বায়না ধরে, বলে ”মা কোথায়?এখনো আসছে না কেন?” নীপা যেদিন সব কিছু গুছিয়ে চলে যাচ্ছে, মেয়েটা ভেবে ছিল তার মা কাজে যাচ্ছে,কাজ শেষ করেই ফিরে আসবে। যাই হোক, প্রথমে আমি চাকরি করতাম একটা এনজিওতে। বেতন খুব বেশি না হলেও স্বামী-স্ত্রীর টোনাটুনির সংসার বেশ ভালোই চলছিল। বিয়ের আগে আমরা যেসব জায়গায় মধুর সময় কাটাতাম, বিয়ের পরেও প্রতি ছুটির দিনে সেসব জায়গায় ঘুরতে যেতাম। আর রাতে ডিনার করে বাসায় ফিরতাম।
বিয়ের দু’বছরের মাথায় আমাদের ভালবাসার ফসল জেরিন পৃথিবীর মুখ দেখে।আমার দায়িত্ব যেন তখন আরো বেড়ে যায়। কিন্তু তার কিছু দিনের মধ্যেই আইনি জটিলতায় আমাদের প্রতিষ্টানটি বন্ধ হয়ে গেল।ঢাকা শহরে চারমাস চাকরি ছাড়া ছিলাম। মাঝেমাঝে মেয়েটা কে খাওয়ানোরর জন্য দুধ কেনার টাকাও ছিল না। তারপর এক বন্ধুর সহায়তায় অন্য এক প্রাইভেট কম্পানি তে চাকরি পাই।সেলারি ছিল বিশ হাজার। বাসাভাড়া, সংসার, বাচ্চার খরচ, মাসের অর্ধেক যেতেই কিছুই থাকত না। বাধ্য হয়ে একটা কম ভাড়ার বাসা নিলাম। তবু সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হত। একদিন নীপা হুট করেই বললো, ” দেখো নিয়াজ এভাবে তো চলছে না। আমি যদি একটা চাকরি নেই আরো ভালো ভাবে চলতে পারব।”
কথাটা হেসে উড়িয়ে দিলাম। জেরিন কে পায়ের উপর বসিয়ে দোল-দোল খেলা খেলছি। তখন নীপা আমার পাশে এসে বসল। “আমি চাকরি করলে তোমার কী কোন সমস্যা?” কথাটা শেষ করে নীপা আমার দিকে নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে উত্তরের অপেক্ষায় তাকিয়ে আছে। চোখ মুখ শক্ত করে বললাম, ” তুমি চাকরি পাবে কোথায়? আর পেলেও জেরিনকে দেখবে কে?” কথা শেষ হতেই দেখি নীপার চোখ-মুখ খুশিতে চকচক করে উঠে।আমাকে অবাক করে দিয়ে বললো, ” চাকরির ব্যবস্থা একটা হয়েছে। আমার বান্ধবী রুমানা যে প্রাইভেট হসপিটালের রিসিপশনে কাজ করে, সেখানে একটা পোস্ট খালি হয়েছে। আমাকে বলেছে,আমি রাজি থাকলে সে ব্যবস্থা করে দিতে পারবে কথা শেষ হতেই ধমক দিয়ে বললাম, “এসব চিন্তা মাথা ঝেড়ে বাদ দাও। বাচ্চাটা বড় হচ্ছে,এখন সব সময় তোমাকে ওর প্রয়োজন। ” ভালবেসে বিয়ে করার এই এক জ্বালা! কিছু বলা যায় না, শাসন করা যায় না। করলেও মুখ ফুলে অভিমান করে বসে থাকে।
নীপার ক্ষেত্রেও তাই হল, খাওয়াদাওয়া এমনকি আমার সাথে কথা বলাও বন্ধ করে দিল। অত:পর, নীপার সব শর্ত মেনে নিলাম। বয়স্ক একটা কাজের মহিলা রাখা হল, জেরিন কে দেখাশোনা করার জন্য। নীপা সকালে যেত বিকেলে ফিরে আসত। চাকরির মাস খানেক পরেই দামি একটা ফোন কিনে।মাঝেমাঝে পার্লারে যেত।আমি শুধু অবাক হয়ে দেখতাম,মাত্র ১০হাজার টাকার সেলারি তাকে কেমন করে আত্মবিশ্বাসী করে তুলছে। দামি-দামি শাড়ি নানান জিনিসপত্র কিনে আনত।ভেবে পেতাম না এত কম টাকায় কিভাবে সম্ভব। অফ-ডে তেও বাসা থেকে বেড়িয়ে যেত। বলত, ‘কাজের চাপ আছে, যেতে হবে।’ একদিন তার পিছু নেই। হঠাৎ চোখের আড়াল হয়ে যায়। দ্রুত ছুটে গেলাম ওর হসপিটালে। ওরা জানাল অফ-ডে তে ওর ডিউটি নেই। সেদিন রাত নয়টা নীপা বাসায় আসল। গলার স্বর যতটা পারা যায় সংযাত করে জিজ্ঞেস করলাম, “কোথায় ছিলে সারাদিন? “
-কেন অফিসে।
-ওরা যে বলল ছুটির দিনে তোমার কোন ডিউটি নেই।
নীপা চিৎকার করে বললো, “তুমি কি আমায় সন্দেহ কর?” নীপার গলার আওয়াজ শুনে মেয়েটা জেগে উঠেছে।নীপাকে দেখেই খুশি গলায় চেঁচিয়ে ডেকে উঠল, “আম্মু।” রাতে খাওয়া শেষে মেয়েটা যখন ঘুমিয়ে যায়; তখন আবার জিজ্ঞেস করলাম, “সত্যি করে বলো, কোথায় ছিলো?” সে আস্তে করে বললো, ” রুমানাদের বাসায় গিয়েছিলাম।” জানি মিথ্যে বলেছে। তবু সে রাতে আর কিছু বলিনি। ভালবেসে বিয়ে করার পরেও যে আবার নতুন করে প্রেম করা যায়, নীপা কে না দেখলে হয়তো বিশ্বাস করতাম না। একদিন সকালে নীপা ওয়াশ রুমে ঢুকে,ভুলে তার ফোন লক করে যায়নি। আমি সাথে সাথেই ফোনটা হাতে নিই। প্রথমেই মেসেঞ্জারে ঢুকি, একটা আইডি থেকে ক্রমাগত মেসেজ আসছে। মেসেজ সিন করতেই আমার চোক্ষু চড়কগাছ “বাবু, সোনা, বেবি মেসেজ রিপ্লাই দিচ্ছ না কেন” উপরের মেসেজ গুলো দেখে বুঝলাম এই লোকটা আমার বউয়ের প্রেমিক। ওয়াস রুম থেকে বেরে হয়েই নীপা চিৎকার করে বললো, ” অন্যরের ফোন হাত দাও কেন।” বিদ্রুপের একটা হাসি দিয়ে বললাম , “ইশতিয়াক চৌধুরী কে?” ভেবেছিলাম কথা শুনে চুপসে যাবে। কিন্তু চোখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে জবাব দিলো, “আমার বস।”
– ও আচ্ছা বস বুঝি তার কর্মচারী কে বাবু সোনা বলে ডাকে?
এবার সে কথার জবাব দিচ্ছে না। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। রাগ নিয়ন্ত্রণ না করতে পেরে আচমকা একটা চড় বসিয়ে দিলাম। তার কিচ্ছুক্ষণ পর নীপা ব্যাগ গুছিয়ে জেরিন কে সাথে নিয়ে বের হয়ে গেল। আমার শ্বশুর শাশুড়ি ঢাকাতেই থাকেন। জানি সেখানে গিয়েই উঠবে। ২ ঘণ্ট পর শাশুড়ি কে ফোন দিয়ে জানলাম, সে সেখানেই আছে। পরদিন নীপাকে আনতে গেলাম।আমাকে দেখেই শাশুড়ির মুখটা কালো হয়ে গেল। ড্রয়িং রুমে জেরিন কে গল্প করছি,কিন্তু নীপা তখনো আমার সামনে একবারও আসেনি। বেশ কিছুক্ষণ পর শাশুড়ি নাস্তা নিয়ে রুমে ঢুকে, সাথে নীপার বড় ভাবি। শাশুড়ি গম্ভীর মুখে বললো, “বাবা একটা কথা বলি কিছু মনে করবা না তো।” আমি অভয় দিতেই তিনি বলতে শুরু করলেন, “দ্যাখো বাবা তোমার সমস্যার জন্য আমার মেয়েটার জীবন তো এভাবে নষ্ট হতে পারে না। তুমি ভালো একজন ডাক্তার দেখাও।” উনি কি নিয়ে কথা বলছেন কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। বোকার মত প্রশ্ন করলাম, “মানে?কি বলছেন মা এসব; আমি কি জন্যে ডাক্তার দেখাবো? “
তখনি নীপার ভাবি আমতা-আমতা করে বললো, ” যদিও এসব লজ্জার কথা।কিন্ত অভিভাবক হিশেবে আমাদের একটা দায়িত্ব আছে।একটা সমাধানেও আসতে হবে। নীপা কাল বলল, তোমার নাকি ফিজিক্যালি সমস্যা আছে। এজন্য তোমার সাথে সে সংসার করতে চাইছে না।” কথা শুনে লজ্জায় মুখ তুলে তাকাতে পারছিলাম না। ভাবছিলাম, নীপা কীভাবে পারল আমার সাথে এমন নোংরা খেলা খেলতে? অনেকক্ষণ পর আস্তে করে বললাম, “যদি সম্মতি দেন নীপাকে নিয়ে যেতে চাই।” রাতে নীপাকে নিয়ে বাসায় ফিরলাম।ওই বিষয়ে কোন কথাই বলিনি।কারণ একদিন পরেই আমাদের বিবাহ বার্ষিকী ছিল। অফিস থেকে দুদিন ছুটি নিলাম। নীপা কে সাথে নিয়ে ঘুরলাম-ফিরলাম, রাতে বাসায় ফিরে কেট কাটলাম। নীপার হাসিমুখ দেখে মনে হয়েছিল, এবার বুঝি সে পরিবর্তন হবে। রাতে অফিস থেকে ফিরলেই সে বলছে, ” তোমার সাথে আমার সংসার করা সম্ভব না।”
-কেন সম্ভব না?
– দেখো এত কিছু বলতে পারব না।
– ও আচ্ছা ইমতিয়াজ লোকটা বুঝি আমার চেয়ে অনেক বেশি আদর করে তোমাকে?
-একদম বাজে কথা বলবে না।
– নিজের মা ভাবির কাছে স্বামীর নামে কুৎসা রটানো বুঝি ভালো কথা?
নীপা এবার কথার উত্তর না দিয়েই ভিতরে চলে গেল।আমি পরদিন ইমতিয়াজ চৌধুরী সর্ম্পকে খোঁজ খবর নিলাম। লোকটা সেই হাসপাতালের ম্যানেজার। ঢাকায় নিজস্ব ফ্ল্যাট আছে।প্রথম বিয়ে টিকেনি, ডির্ভোস। আমি যে শাড়ি, কাপড়-চোপড় গুলো কিনে দিয়েছিলাম সেগুলো রেখে নীপা ব্যাগ গুছাতে থাকে। হঠাৎ জেরিন এসে বললো, “আম্মু আমার নতুন জামা গুলো কোথায়, সেগুলো নিচ্ছ না কেন?” নীপা কথার উত্তর দেয়নি।আমি মেয়েটাকে কোলে নিয়ে পাশের রুমে গেলাম। ভেজা চোখে বললাম, ” তোমার আম্মু কাজে যাচ্ছে, তাই তোমাকে নিচ্ছে না।” নীপা চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর শাশুড়ি কে কল দিলাম। সব কিছু খুলে বলার পর তিনি হাস্যকর ভাবে বললেন, “তুমি আমার মেয়ের সাথে প্রেম না করলে ওকে আরো ভালো জায়গায় বিয়ে দিতে পারতাম। এখন তোমার সমস্যার জন্য সে থাকতে চাইছে না,আমি করবো বলো?’ সেদিন শাশুড়ির কথা শুনে বুঝলাম, মা-মেয়ে মুদ্রার এপিঠ -ওপিঠ। এইজন্য হয়তো মুরুব্বীরা বলে বিয়ের আগে কনের মা সর্ম্পকে খোঁজ খবর নিতে, আচার ব্যবহার কেমন তা জানতে।
নীপা চলে যাওয়ারর দুদিন পর, গ্রামের বাড়ি থেকে নিজের মা’কে নিয়ে আসলাম। মা নিজেই জেরিন কে দেখাশোনা করে। প্রতিদিন মা আমাকে চাপ দেন আরেকটা বিয়ে করার জন্য। একদিন মা বললেন, “যে মেয়ে তালাকের পাঁচদিন পরেই যদি বিয়ে করে করতে পারে আর তুই এভাবে বসে আছিস কেন?” চুপ থাকি কিছুই বলিনা। প্রতিদিন জেরিন কে সাথে নিয়ে ঘুমাই। মেয়েটা আমার হাতে মাথা রেখে ঘুমায়। তখন মেয়েটার মুখের দিয়ে চেয়ে ভাবি, আমি বিয়ে করলে জেরিন হয়তো মা পাবে। কিন্তু একজন সৎ মা কি সব সময় পারে অন্যের মেয়েকে নিজের মেয়ের মত আপন করে নিতে? অফিসে ছিলাম, বাসার মালিক ফোন দিয়ে করে হাসপাতালে আসতে বললেন। জানালেন, মা অসুস্থ । তড়িঘড়ি করে হাসপাতালে ছুটে গেলাম, ডাক্তার জানাল সিরিয়াস কিছুনা; প্রেশার বেড়ে গিয়েছিল।
সেদিন হাসপাতালেই মা আমাকে বললেন, “মায়ের দোয়া যেখানে, সেখানে সন্তানের কোন অমঙ্গল হয় না।।” হঠাৎ দেখি মা অস্রু ভেজা চোখে আমার হাত চেপে ধরলেন। “আমি কখন মারা যাই ঠিক নাই। আমি একটা পাত্রী দেখেছি তুই মানা করিস না বাবা।” মায়ের অনুপ্রেরণায় ডিবোর্সের এক বছরের মাথায় দ্বিতীয় বিয়ে করি। মেয়েটার নাম কাকলি। গ্রামের মেয়েরা সাধারণত নাজুক হয়। কিন্তু কাকলি কথা বার্তায় চঞ্চলা চপলা হাসিখুশি মুখ। জেরিনের সব দায়িত্ব কাকলির উপর ছেড়ে দিলাম। কাকলি আচার ব্যবহার দেখে মনে হয়না এটা তার সৎ মেয়ে। নিজের মেয়ের মত করেই জেরিনকে আগলে রাখে।
আস্তে আস্তে জেরিন বড় হতে থাকে।ওর বিছানা আলাদা করে দেই। মেয়েটা এখন একা-একা ঘুমাতে শিখে গেছে। মাঝেমধ্যে মাঝরাতে ঘুম ভেঙে য়ায়। চুপিচুপি মেয়েটার রুমে গিয়ে দেখি, কোলবালিশ ঝাপটে ধরে ঘুমিয়ে আছে। মেয়েটার মাথায় তখন হাত বুলাই। ভাবতে থাকি, জৈবিক তাড়নায় বিয়ে করে হয়তো আমি সুখে আছি। নীপাও হয়তো বা সুখে আছে। কিন্তু আমাদের মেয়েটা তিলেতিলে যে চাপা কষ্ট নিয়ে বড় হচ্ছে, সেটা কতটুকুই বা উপলব্ধি করতে পারি…
গল্পের বিষয়:
গল্প
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত