নাকফুল

নাকফুল
গত সপ্তাহে আমাদের তেত্রিশতম বিবাহ বার্ষিকী চলে গেলো। সংসার জীবনের তেত্রিশটি বসন্ত পেরিয়ে এসেছি। বিংশ শতকের এক ফাল্গুনের আগুন ঝরা দুপুরে সম্পুর্ণ অপরিচিত এক যুবকের হাতের স্পর্শে জীবনে প্রথম বার কেঁপে উঠেছিলাম। এক হাত ঘোমটায় মুখ ঢেকে গমগমে গরমে ঘরভর্তি মানুষের সামনে নিচু গলায় উচ্চারন করেছিলাম, ” কবুল, কবুল, কবুল” সাথে সাথেই তৃপ্তির হাসি হেসে সমস্বরে সবাই বলে উঠেছিলো, ” আলহামদুলিল্লাহ” আমার বড় ভাবী পাশ থেকে চিমটি কেটে ঠোঁট বেঁকিয়ে বলেছিলো,
– কি রে মিনু, এত জলদি বলে দিলি। তোকে না শিখিয়ে দিলাম আরো কিছুক্ষন ঝুলিয়ে রাখতে। বোকা মেয়ে। আমি চুপ করে রইলাম। ঝরঝর করে ঝড়ে পড়া চোখের জলে ভাবির এঁকে দেয়া কাজল আর কুমকুমের সাজ সব একেবারে ধুয়ে যেতে বসেছে তখন।
কবুল শব্দটার সাথে সাথেই যেনো কোথায় একটা মিহি সুতোর টান পড়লো। আপনজনেদের সাথে বুঝি এবার বাঁধন আলগা হবার পালা। আমি মুহুর্তেই কাগজপত্রে সিরাজ আলীর মেয়ে থেকে ফরিদ উদ্দিনের স্ত্রীর তকমা পেয়ে গেলাম। জীবনের সব কান্নাই জমা করে রেখেছিলাম নিজের বিয়েতে কাঁদবো বলে। চাচাতো বোন আর ভাবীরা মিলে আমাকে ফরিদ উদ্দিন নামক সেই ভদ্রলোকটির পাশে এনে বসালো। আড়ষ্ট আমি প্রাণপন চেষ্টায় আছি, কিছুতেই যেনো তার শরীরে আমার স্পর্শ না লাগে। লজ্জা এবং ভয় একই সাথে যেনো আমার চারপাশে আগল তুলে রেখেছে। আমি চাইছি না সে আগল ভাঙুক। হঠাৎ দেখি হাত বাড়িয়ে ভদ্রলোক কিছু দিতে চাইছেন। আমি ইতিউতি তাকাই। না উনি তো আমাকেই দিতে চাইছেন। নেই না। দু হাত কোলের মাঝে গুঁজে মাথানিচু করে বসে থাকি। আচমকা দেখি হাত টেনে কিছু একটা ধরিয়ে দিয়েছেন। ওমা এটা তো একটা রুমাল।
– চোখ মুখ মুছুন। কাজল ধুঁয়ে দেখতে পেত্নীর মতো লাগছে। আয়না দেবো? নিজেই দেখুন একবার। ঘোমটার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে দেখি বিছানার ওপর ছোট্ট একটা আয়না রাখা। প্রথম মুখ দর্শনের অভিপ্রেতেই রাখা হয়েছে বোধহয়। মুখ দেখাদেখিকে কেন্দ্র করে হাসি তামাশা। তারপর বয়োজ্যেষ্ঠদের উপস্থিতিতে পান চিনি। একের পর এক আনুষ্ঠানিকতার ভীড়ে আমি আমি শুধু সেই অচেনা মানুষটিকেই দেখছিলাম।
খদ্দরের ঘিয়ে রঙা পাঞ্জাবি আর সাধারন একটি টুপি পরিহিত ফরিদ উদ্দিন ততক্ষণে ধীরে ধীরে আমার মনের দখল নিতে শুরু করেছে। তার ওই প্রথম বলা একটি বাক্যেই যেনো দখিন হাওয়ার একটা ঝাপটা এসে লেগেছিলো শরীরে। আস্থার বীজেরা এভাবেই বুঝি ডালপালা মেলে। মনে হলো, যে অন্যের অনুভূতির প্রতি এতোটা সংবেদনশীল। তার সাথে নিঃসন্দেহে বাকী জীবনটা পার করে দেয়া যায়। আমি সেই রুমালে সেদিন আয়না না দেখেই চোখ মুছেছিলাম। তবে যতোদিন তিনি পাশে ছিলেন ততো দিন আর দরকার পড়েনি সে রুমালের। আর এতো বছর বাদে ফের স্মৃতির সুবাস সমেত সেই রুমাল আবার লবন জলে ভিজে যাচ্ছে। কিন্তু আজ আর কেউ পাশে নেই। কেউ না।আষাঢ়ের ঝড় জলের দিনে মাঝরাতে বিদ্যুৎ চমকালে কিংবা প্রচন্ড শব্দে বাজ পড়লে দুহাতে কষে ঝাপটে ধরতাম তাকে। ভীতি আর শংকা নিয়ে যখন তার সানিধ্যে আকুল হতাম। হাসতে হাসতে অভয় দিয়ে বলতেন,
– আমিতো এখানেই আছি মিনু। তোমার কাছেই। কোত্থাও যাবো না। সে কথা তিনি রাখেননি। এখন আমি বাজ পড়লেও বিছানা আঁকড়ে দু হাতে কান চাপা দেই না আর। বুকের ভেতর অহর্নিশি শুণ্যতার যে ভাঙন চলছে। তার শব্দ বাজ পড়ার শব্দের চেয়েও তীব্র। তফাত শুধু আমি ছাড়া কেউ তা শোনেনা। বিয়ের পর প্রথম বিবাহ বার্ষিকীতে একটা সাত পাথরের হীরের নাকফুল চেয়েছিলাম। আজ দেবো কাল দেবো করে শেষ অবধি আর কেনাই হলোনা। তাও তিনি আমার অগোচরে টাকা জমিয়েছিলেন। সেই টাকা দিয়ে আমি হাসপাতালের বিল শোধ করেছি। কে জানতো এত বড় যার হৃদয়। তাতেই রক্ত কনারা হুড়মুড়িয়ে ঘুরে বেড়াতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে পড়বে। হার্টে দু’টো ব্লক নিয়ে অপারেশান থিয়েটারে ঢোকার আগে আমাকে ইশারায় কাছে ডেকে বললেন,
– মিনু, ওরা তো আর মন ভরে খেতে দেবেনা। একদিন একটু গোটা গোটা করে আলু দিয়ে গোরুর মাংস, সাদা ভাত সাথে ঘন করে মাশকলাই এর ডাল রেঁধে এনো। স্যুপ খেতে খেতে সব খাবারের স্বাদ একেবারে ভুলে গেছি। আমি রেঁধেও ছিলাম। তবে খাওয়া আর হয়নি। ডাক্তারের কড়া নির্দেশে আর কিছুদিন বেশি বাঁচার আশায় আমি সেসব হাসপাতালের আয়াদের খাইয়েছি। তারপরও সুস্থ ছিলো ক’মাস। নিজে হেঁটে বাজারে যেতো। ইচ্ছেমতো সব যেচে বেছে কিনতো। দামদর করা ছিলো তার প্রিয় অভ্যেস। আমি বলতাম,
– এত দামদর করে টাকা বাঁচিয়ে কি করবেন শুনি? তার সাধাসিধা উত্তর,
– হীরের নাকফুল বুঝি আর চাইনা তোমার? আমি তাচ্ছিল্যের স্বরে বলতাম,
– ধুর, ক’দিন বাদে মেয়ের বিয়ে দেবো এখন আর ওসব মানায়?
– তোমার এই মুক্তোর নাকফুলটা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে মিনু। আমি থাকতে ওই উজ্বল মুখে হীরে জ্বলবে না? এটা ভারী অন্যায়। আমি রাগী রাগী গলায় উত্তর দিতাম,
– টাকা জমাচ্ছেন ভালো কথা। ওই টাকায় গুণগুণের বিয়ে দেবো। মেয়েকে বুঝি গয়না দেবেন না?
– সব দেবো। যার যা চাই সব। আমি প্রশান্তির হাসি হাসতাম। তারপর একদিন এমন এলো, আমার হাসিমুখেও জন্মের গ্রহণ লাগলো। ভোরে ওঠার অভ্যেস উনার। উঠে নিজেই সবাইকে জাগাতেন। আমাকে ডেকে তুলে বললেন,
– মিনু, এক গ্লাস পানি দিবে। বুকটা জ্বালাপোড়া করছে। উৎকন্ঠা চেপে বললাম।
– দাড়ান আনছি। গ্যাসের ঔষধ খেয়েছেন কাল রাতে? প্রেশারের ঔষধ তো আমিই খাইয়েছি।
– হ্যাঁ খেয়েছি। কথা না বাড়িয়ে পানি দাও আগে। আমি তড়িঘড়ি করে ডাইনিং থেকে পানি আনলাম। ছেলে মেয়েদের ঘুম থেকে তুললাম। এসে দেখি চোখ বুজে শুয়ে আছেন। উঠিয়ে পানি খাওয়ালাম। খেলেন। তারপর বললেন।
– গরম লাগছে। ফ্যান বাড়িয়ে দাও। বাড়ালাম। অথচ জানলার বাইরে তাকিয়ে দেখি আকাশে মেঘ। ভাদ্র মাসের সকালের মৃদুমন্দ ঠান্ডা বাতাস বইছে। আমি কিচেনে যাওয়ার আগে জিজ্ঞেস করলাম,
– কেমন লাগছে এখন? উত্তরে বললো,
– আগের চেয়ে ভালো। গরম লাগা কমেছে এখন। শোনো, বৃষ্টি হবে মনে হচ্ছে। খিচুড়ি করো আজকে। ছেলে মেয়ে গুলি খুশি হবে।
– আচ্ছা করছি। কিছু লাগলে ডাক দিও। চাল ডাল ধুয়ে সিংক এ রেখেছি। খিচুড়ির সাথে ছোট করে কাঁটা আলু উনার অনেক পছন্দ। আলু, পেঁয়াজ কাটলাম। বুয়াও এসে পড়েছে ততক্ষণে। খিচুড়ি বসিয়েছি। এরই মাঝে শুনি ডাকছেন,
– মিনু, মিনু, মিনু ডাকের মাঝে হয়তো এমন কিছু ছিলো যে শুনে গুণগুণ আর তপু ও ছুটে গেলো। আমি গিয়ে দেখি চোখ বোঁজা। এই মাত্র না ডাকলেন। এই অল্প সেকেন্ডের ব্যাবধানে ঘুমিয়ে গেলেন। কিভাবে সম্ভব? গায়ে হাত দিয়ে ডাকলাম।
– এই যে শুনছেন? ডেকেছেন আমাকে? সাড়া নেই। তবে গা তখন ও গরম। গুনগুন বার কয়েক ডাকলো। না তাও সাড়া দিলো না। বুয়া এসে পেছন থেকে বললো,
– খালাম্মা নাড়ি দেখেন। আমি ধমক দিয়ে বললাম,
– কিসের নাড়ি দেখবো। এই মাত্রই তো আমাকে ডাকলো। অজ্ঞান হয়ে গেছে মনেহয়। দাঁড়াও পানির ঝাপটা দেই।
আমার অস্থিরতা দেখে তপু কাছে গিয়ে হাত ধরে নাড়ি দেখলো। বুকে কান পাতলো। হঠাৎ করেই এক নিমিষে ওর চোখের রঙ বদলে গেলো। তারপর গুণগুণ কে চিৎকার করে বললো,
– গুনগুন আমি গাড়ি আনছি। এক্ষুনি হাসপাতালে নিতে হবে। গুনগুন গলা ফাটিয়ে কাঁদছে। আমি হতভম্বের মতো নির্বাক বসে আছি। হাসপাতালে নিতে হলো না। তিন তলার ভাড়াটে মেডিসিন ডাক্তার। এসে চেক করে শীতল গলায় বললেন, ” হি ইজ নো মোর, সম্ভবত সিভিয়ার কার্ডিয়াক এট্যাক “
আমার চোখে তবুও জল নেই। পোড়া গন্ধে ঘর ছেয়ে গেলো। বুয়া হন্তদন্ত হয়ে ছুটে গিয়ে চুলা বন্ধ করলো।হাড়ি ভর্তি খিচুড়ি পুড়ে ভস্ম হয়ে গিয়েছে। গুণগুণ মুর্ছা গেছে। তাকে সামলাচ্ছেন আমার বড় বোন। তপু ব্যাস্ততায় বোধহয় মন খুলে কাঁদারও সময় পাচ্ছেনা। এত বছরেও তার কিনে দেয়া মুক্তোর নাকফুল সহসা খুলিনি। আজ আমার আত্নীয় স্বজন এসে সবার আগে নাকের নাকফুলটাই খুলে নিলো। খুলতে গিয়ে ভেঙে দু টুকরো হয়ে গেলো সেটি। আমি ভাঙা নাকফুল হাতের তালুতে নিয়ে স্তব্ধ হয়ে বসে রইলাম। ভালোই হলো। আর তো পরার অবকাশ পাবো না। এতগুলো দিন পার হয়ে গেলো কিভাবে কিভাবে জেনো। তেত্রিশতম বিবাহ বার্ষিকী এলো। শূন্য বাড়িতে দিন ভর নানান কাজে নিজেকে ব্যাস্ত রেখেছিলাম। তবুও বার বার মনে পড়েছে। উনি থাকলে ভুলে যাওয়ার দন্ডে দন্ডিত হয়ে মুখ কাঁচুমাঁচু করে ছোটখাটো কোনো উপহার নিয়ে বাড়ি ফিরতেন। আর বলতেন,
– পরের বার আর ভুলবোনা দেখো। তোমাকে আমি আগে মনে করিয়ে দেবো। প্রমিজ। উনি কথা রাখেন নি। ক্রমশ গুণগুণের বিয়ের দিন ঘনিয়ে আসছে। অনেক দেখেশুনে ছেলে ঠিক করলাম। ছেলে ব্যাবসায়ী। অর্থনৈতিক অবস্থাও যথেচ্ছ সমৃদ্ধ। জাত বংশেও উঁচু অবস্থান। তবে শিক্ষাগত যোগ্যতায় কিছুটা পিছিয়ে। বি এ পাশ। সবেধন নীলমণি তো আর কেউ হয় না। একটু উনিশ বিশ হবেই। গুণগুণ প্রথমে গাঁইগুঁই করলেও পরে ছেলের সাথে দেখা করে কথা বলার পর রাজি হলো। বিয়ের এক সপ্তাহ আগে পার্লারে গিয়ে নাক ফুঁটো করলো গুণগুণ। ওরা ইংরেজিতে বলে ” পিয়ার্সিং”। সাথে সাথেই নাকফুল পরিয়ে দিলো। নাকফুল না বলে নোজপিন বলাটা ওদের ঠোঁটে ভালো ফোটে। অথচ আমি যখন ক্লাস ফাইভ ছেড়ে সিক্সে পা দিলাম। আম্মা বড় খালার হাতে সূঁই ধরিয়ে দিয়ে বললেন,
– আপা, মিনুর নাকটা এইবার বিন্দায়া দ্যান। ওর বাপে ফুল বানাইবার দিছে। বড় খালা ঝট করে নাকটা এক হাতে ধরে অন্য হাত দিয়ে টুক করে সূঁই ফুঁটিয়ে দিলেন। তৎক্ষনাত ব্যাথা বোধগম্য না হলেও পরে ভীষন ভুগেছিলাম। আম্মা কায়দা করে শুকনো মরিচের বোঁটা ফেলে ভেতর সর্ষের তেল ঢুকিয়ে আগুনে গরম করে দিতেন। বলতেন,
– এত অল্প ব্যাথায় কাতর হইলে কি চলবো। পাথর হইতে হইবো। তবেই না মাইয়া মানুষ। একসময়ের নরম মসৃন কাঁদামাটি সম আমি এখন অবশ্য শক্তপোক্ত পাথর হতে শিখে গেছি। সহজে ভাঙি না। গুণগুণের বিয়ের তারিখ এগিয়ে এলো। বিয়ের তত্ত্বে বাহারী নামী দামী ডিজাইনার শাড়ি অলংকারের বড় বড় রঙিন সব ডালা। সবাই মিলে উৎসুক হয়ে একবার একটা খুলছে, দেখছে আর মন্তব্য করছে। নানা জন নানা মত। কারো বিয়ের বেনারসির রঙ পছন্দ হচ্ছে তো কারো আবার ওড়নাটা বেমানান লাগছে। কারো প্রসাধনীর ব্র্যান্ড পছন্দ হলেও আবার জুতা জোড়া ভালো লাগছে না। এসব কান্ডের ফাঁকে গুণগুণের বড় জা আমার হাতে গয়নার বাকসো গুলো দিয়ে গেলো। মুঠোর মধ্যে ছোট্ট একটা বাকসো দিয়ে বললো, “এটা আলাদা রাখুন। হীরের তো।” আমি বাকসো গুলো নিয়ে মেয়ের কাছে গেলাম। সবার আগেও দেখুক। একে একে সবার সামনেই খুলছি। গলার কন্ঠহার, তার সাথে মিলিয়ে এক জোঁড়া চাঁদ বালি। আর হাতের বাওটি, মান্তাসা। গুনগুনের বাবাও অবশ্য একটা সরু কাজের সীতাহার আর টিকলি গড়িয়ে রেখেছিলো। সেসব ও দিলাম। এত এত গয়না দেখে সবাই মেয়ের কপাল নিয়ে ধন্য ধন্য করছে।
এবার সেই ছোট্ট বাকসোটা খুললাম। ভেতর থেকে মৃদু আলোর বিচ্ছুরণ দেখে বুঝে নিলাম। এটা একটা হীরের নাকফুল। সাতটা ছোট হীরে খুব যত্ন করে বসানো হয়েছে। বড় আপার হাতে দিয়ে বললাম গুণগুণকে পরিয়ে দিতে। আর নিজে ডুবে গেলাম অতীতের সেই চোরাবালিতে। এমন নয় যে উনি শুধু ভালোইবাসতেন। কষ্ট দেন নি কখনো। দিয়েছেন। অসংখ্য অসংখ্য বার। কখনো কারনে কখনো অকারনে। তবে ছেড়ে চলে যাবার পর কেন যেনো কষ্টের স্মৃতিতে আর বুক ভার হয়না। একমাত্র কারো প্রস্থানই মনে হয় সুখস্মৃতির ছাই উসকে দিয়ে যায় বার বার। আমি নিত্য সে স্মৃতিপোড়া আগুনে জ্বলে জ্বলে খাক হই। মেয়েকে বিদায় দিতে হবে এবার। অনুষ্ঠানাদি সবই সম্পন্ন হয়েছে খুব ভালো ভাবে। গুণগুণ আমাকে জড়য়ে ধরে হু হু করে কাঁদছে। আমি চোখ মুছিয়ে দিয়ে বললাম।
– কাঁদছিস কেনো বোকা মেয়ে? সুখের দিনে কেউ কাঁদে?আমার কথা শুনে ওর কান্না দ্বিগুণ হারে বাড়লো। তপুটা কোথায় মুখ লুকিয়ে বসে আছে কে জানে। গুনগুন গাড়িতে উঠে কান্না থামিয়ে অভিমানের স্বরে বললো,
– আর কিছু বলবেনা মা? তাকিয়ে দেখি মায়াকাড়া মুখে হীরের নাকফুল ফুলের মতই ফুটে আছে। মেয়ের হাতটা ধরে বললাম, তোর নাক যেনো কখনো খালি না হয় রে মা। ওই হীরে যেনো আমৃত্যু এভাবেই আলো ছড়িয়ে যায় তোর মুখে। গুনগুন আবারো কাঁদতে শুরু করেছে। আমি গাড়ির জানলায় দাঁড়িয়ে দেখি গুণগুণের বর একটা সাদা টিস্যু ধরিয়ে দিয়েছে ওর হাতে। আর বলছে,
– চোখ মুছুন। কাজল ধুঁয়ে দেখতে পেত্নীর মতো লাগছে। আয়না দেবো? গুনগুন লজ্জায় লাল হয়ে মাথা নিচু করে আছে। তারপর ঘোমটায় আড়ালেই ঠোঁট টিপে হাসছে। ওদের গাড়ি ছেড়ে দেয়। আমি তেত্রিশ বছর আগের ফাল্গুনের দিনের মতো, আজো বার বার চোখ মুছে যাচ্ছি। আমার হাতের মুঠোয় সেদিনের সেই সাদা রুমাল।
গল্পের বিষয়:
গল্প
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত