ত্রি-মোহনা

ত্রি-মোহনা
অদিতির সাথে অর্ণবের বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনাটা আশেপাশের মানুষজনকে একটু অবাকই করে দিলো। ওদের বিয়েটা পারিবারিক ভাবে হয়নি, বরং নিজেরাই একে অন্যকে পছন্দ মত বিয়ে করেছে। এটা নিয়ে যে কম ঝামেলা পোহাতে হয়েছে তেমনটা নয়। অদিতির বাবা একজন পুলিশ কর্মকর্তা। তাই মেয়ের সদ্য বিবাহিত স্বামীকে জেলে ঢুকাতে খুব বেশি বেগ পেতে হয়নি। কেস ফাইল করা হলো অপহরণ বলে। যথারীতি মামলাটা কয়েকদিন যখন পর আদালত পর্যন্ত গড়ালো তখন অদিতি নিজের বাবার বিরুদ্ধে বেঁকে বসেছিলো। অদিতির বয়স তখন তেইশ। তাই আদালতে তার সাক্ষীটা গ্রহণযোগ্য হলো। বলাই বাহুল্য যে, সেদিন অদিতি বাবার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলো। তারপর আর ওর বাবা ওকে নিজের বাড়িতে আশ্রয় দেয়নি।
এইদিকে অর্ণবের ছোট খাটো একটা চাকরি। নতুন সংসারের হাল ঠিকমত বইতে পারছিলো না। আর তাছাড়া মাথার উপর ছোট ছোট দুইটা বোন। বাবা বছর চার আগে ইহলোক ত্যাগ করেছে। তাই পরিবারের হালটা নিজের কাঁধে নিতে হয়েছিলো। অদিতি শিক্ষিত মেয়ে, স্বামীর এমন টানাপোড়ন দেখে নিজেও একটা চাকরির ব্যবস্থা করে নিলো। অর্ণব অবশ্য এতে কোনো আপত্তি করেনি। আসলে আপত্তি করাটা ঠিকও হতো না। তারপর বেশ ভালোও কাটছিলো দুইজনের। কিন্তু কী এমন হলো যে হুট করেই এত কঠিন একটা সিদ্ধান্ত নিতে হলো? ডিভোর্স বললেই তো আর ডিভোর্স হয়ে যায় না। দেশে আইন আছে। তবে হ্যাঁ, আইনের আশ্রয় না নিয়ে যদি নিজেরাই কাজটা করতে চায় তাহলে সেটা সম্ভব কিন্তু পরে যদি অর্ণব বা অদিতি হুট করে বেঁকে বসে? তাই দুইজনেরই কোনো তাড়া নেই। আদালতের রায় ওরা মেনে নিয়েছে। ৬ মাস এক সাথে থাকার পরও যদি তারা নিজেদের সিদ্ধান্তে অটুুট থাকে তাহলে সরাসরি বিচ্ছেদ। কোর্ট থেকে দুইজন বেশি হাসিখুশি ভাবেই বেরিয়ে আসলো। ওদের দেখে মনেই হবে না যে তারা জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে পৌছে গেছে।
– তারপর? কিছু প্লান করে রেখেছো? কোর্টের সিড়ি বেয়ে নিচে নামতে নামতে প্রশ্নটা করলো অদিতি।
– কিসের?
– এই যে, কথাটা বলতে গিয়েও আটকে যায় অদিতি। অর্ণব প্রশ্নটা বুঝতে পেরে বললো,
– উমম, এখনো কিছু ঠিক করিনি। তবে হাতে তো সময় আছে। তাছাড়া তুমি জানো বিয়ে নিয়ে আমি এখনো কিছু ভাবছি না। বোন দুটোকে মানুষ করাই আমার প্রথম লক্ষ্য। তাছাড়া চাকরি তো করছি। দেখি তারপর কী হয়। তুমি কিছু ঠিক করেছো?
– আমার আবার নতুন করে ভাবনা কিসের? আগে থেকেই তো সব ভেবে রেখেছি। কোর্টের সময়সীমা পার হলে দেশের বাইরে চলে যাবো।
– অমিতের কাছে?
– হ্যাঁ।
অদিতি আর অমিত দুইজন একই ভার্সিটি থেকে পড়ালেখা করেছে। অমিত অদিতির দুই ব্যাচ সিনিয়র। ভার্সিটি পাশ করেই সে দেশের বাইরে চলে যায়। অদিতির তখনও দুই বছর বাকি। ইচ্ছে ছিলো দুইজনই একই সাথে যাবে, কিন্তু হঠাৎ করেই অমিতের এমন করে চলে যাওয়া মেনে নিতে পারে না অদিতি। ভেঙে পড়েছিলো ভেতর ভেতর। আর তখনই পরিচয় হয় অর্ণবের সাথে। প্রথমে বন্ধুত্ব তারপর আর সময় ব্যয় না করে অদিতি ওর সাথেই বাসা থেকে বের হয়ে যায়। তাড়াহুড়ার করার যথেষ্ট কারণও ছিলো। এইদিকে মেয়ের বছর বিশ পেরিয়ে যেতেই বাবার চিন্তা বাড়তে থাকে। ঘরে যদি যুবতী মেয়ে থাকে তাহলে বাবা মার চিন্তা হওয়াটায় স্বাভাবিক। অদিতি বার বার বিয়ে ভেঙে দিলেও, শেষে আর কোনো উপায় না দেখেই বেরিয়ে পড়তে হয়েছিলো অর্ণবের হাত ধরে। কিন্তু অাশ্চর্যের বিষয় এই যে ওদের মধ্যে কিন্তু ভালোবাসার কোনো সম্পর্ক ছিলো না, কেবলই বন্ধুত্ব। এটা অদিতির বাবাও জানতো। শুধু বাবা কেন? অর্ণবের বন্ধু মহল থেকে শুরু করে অদিতির বন্ধু মহলেরও সবাই জানতো। আর তাই সবাই যখন জানলো যে ওদের বিয়ে হয়ে গেছে তখন বেশ অবাকই হয়েছিলো সবাই। তারপর আবার যখন কোর্টে অদিতি বাবার পক্ষ না নিয়ে অর্ণবের পক্ষ নিলো তখন সবাই ধরেই নিয়েছিলো যে গোপনে গোপনে তাদের মাঝে কিছু তো একটা চলছিলো। যদি তাই না হবে তাহলে এমনটা করবে কেন? কিন্তু দুই বছর পর সবাই যখন আবারও শুনলো যে ওরা ডিভোর্সের জন্য আবেদন করেছে কোর্টে তখন আবারও একটা ধাক্কা খেলো সবাই।
দেখতে দেখতেই ছয়টা মাস যে কীভাবে কেটে গেল বুঝতেই পারলো না অর্ণব। আজ ঘুম আসছে না ওর। কালকেই কোর্টে গিয়ে কেবল দুইটা সাক্ষর করলেই দুই বছরের সেই চেনা মানুষটা একেবারে অচেনা হয়ে যাবে। আসলেই জীবন বড়ই অদ্ভুত। কখন কোন দিকে মোড় নিবে বলা খুব মুশকিল। কথাগুলো ভাবতে ভাবতে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে অর্ণবের। তারপরই একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। এমনটা হওয়ার তো কোনো কথা ছিলো না। তবে কী সে চায় না যে অদিতি ওকে ছেড়ে যাক? কথাটা মনে হতেই চোখটা বিছানার ওপর চলে যায় অর্ণবের। অদিতি গভীর ঘুমে, মেয়েটা সে দুই বছর ধরে দেখছে। কিন্তু আজ যেমনটা দেখছে আর কোনোদিন এমনটা হয়নি। তাড়াতাড়ি চোখ ফিরিয়ে নেয় অর্ণব। মনে একটা অপরাধবোধ কাজ করে। সকাল সকালই দুইজন বেরিয়ে পড়লো। অদিতির মনে কী চলছে এখন? সে কী খুশি হয়েছে? হওয়ারই কথা। একটু পরই অদিতির সব স্বপ্ন পূরণ হতে চলছে। অর্ণবের মনে কিন্তু চলছে অন্য কিছু। সে খুব করে চাইছে যে, অদিতি একবার বলুক যে এইসবে কাজ নেই। যেমনটা আছি তেমনটাই থাকি। কথাগুলো মনে হতেই অর্ণবের মনে মনে বেশ হাসি পেল। কী সব আজগুবি কথা ভাববে সে? এমনটা ভাবনাতেও আসা উচিত নয়।
– অর্ণব, কী হলো? নামো।
অদিতির কথায় ঘোর কাটে অর্ণবের। চমকে উঠে একবার। তারপর আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো, তাদের গাড়িটা এসে থেমেছে কোর্টের সামনে। কোনো কথা বলে না, নিঃশব্দে নেমে পড়ে গাড়ি থেকে।
– তাহলে, আপনারা কী এখনো নিজেদের সিদ্ধান্তে অটুট আছেন? প্রশ্নটা করে সামনের কালো কোর্ট পরে বসে থাকা উকিল। প্রশ্নটা শুনে অর্ণব একবার অদিতির দিকে তাকালো। বুকের ভেতরটা কেমন যেন দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে।
– কোথায় সাক্ষর করতে হবে?
অদিতির কথায় উকিল একটা কাগজ বাড়িয়ে দিলো অদিতির দিকে। ডিভোর্সটা সেই দিচ্ছে। কারণ অর্ণব যদি ডিভোর্স দেয় তাহলে মোটা অঙ্কের একটা টাকা দিতে হবে অদিতিকে। আর অদিতি সেটা কোনো ভাবেই চায় না। সাক্ষর করার পর কাগজটা অর্ণবের দিকে এগিয়ে দেয় অদিতি। কাঁপাকাঁপা হাতে এগিয়ে নেয় কাগজটা। তারপর এক টানে নিজের নামটা লিখে উকিলের দেখিয়ে দেওয়া স্থানে। আর তারপর? সব শেষ। কোর্টের বাইরে এসেই অদিতি বললো,
– তোমার জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে।
– কী?
– উহু, এখন তো বলবো না। একটু পরই জানতে পারবে।
কথাটা বলেই এইদিক ঐদিক তাকাতে লাগলো অদিতি। তারপর কাউকে একটা দেখে প্রথমে হাত নাড়লো তারপর ছুটে গেল সেইদিকে। অর্ণবও সেইদিকেই তাকিয়ে ছিলো। আর তারপরই যা দেখলো তাকে বুকের হৃদপিণ্ডটা লাগাতে শুরু করলো। যেন এখনই বেরিয়ে আসবে জিনিসটা। অমিত দাড়িয়ে আছে।
– কী!কেমন লাগলো সারপ্রাইজ?
অর্ণব যেন কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। কথাগুলো গলার মাঝখানটায় এসে কেমন যেন দলা পাকিয়ে যাচ্ছে বার বার।
– ধন্যবাদ, আমাদের সাহায্য করার জন্য। কথাটা বলেই অর্ণবের দিকে হাত বাড়িয়ে দেয় অমিত। অর্ণবও হাত বাড়িয়ে দেয় অমিতের দিকে। তারপর বলে,
-তোমাকেও ধন্যবাদ, আমার উপর বিশ্বাস রাখার জন্য।
– সত্যিই অমিত, বাবা বিয়ের জন্য উঠে পড়ে লেগেছিলো। কী করবো বুঝতে পারছিলাম না। পরে যখন অর্ণবকে সব খুলে বললাম, তখন সেই এই প্লানটার কথা বলে। সত্যি বলতে কী আমি তো প্রথমে কী করবো বুঝতেই পারছিলাম না। পরে যখন তুমিও বললে যে তোমার দেশে ফিরতে দুই তিন বছর লাগবে, তখন এটা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিলো না। কথাগুলো একদমে বলে অমিতের কাঁধে মাথা রাখে অদিতি।
– ওমম, আচ্ছা তাহলে আমি এখন যাই। আসলে আমারও একটা কাজ আছে। তুমি ব্যাগ গুছিয়ে রেখেছো তো? সময় করে একদিন এসে নিয়ে যেও। আর হ্যাঁ তোমাদের দেখলে মাও খুব খুশি হবে। কথাগুলো বলতে গিয়ে জিহ্বাটা বার বার জড়িয়ে আসছিলো অর্ণবের। কিন্তু এমনটা হওয়ার তো কথা ছিলো না। সেই তো অদিতিকে এই পরিকল্পনার কথাটা জানিয়েছিলো।
– না অর্ণব, আমার হাতে সময় নেই। আমি অদিতির সকল কাগজ পত্র সেরে রেখেছি। কাল সকালের ফ্ল্যাইটেই আমাকে ফিরতে হবে।
– কালই?
– হুমম কাল।
– তুমি কী আমার সাথে যাবে? নাকি আমি নিজে ব্যাগপত্র নিয়ে আসবো?
– কেন? তুমি কালকে এয়ারপোর্টে যাবে না?
– আসলে যেতেই চাইলাম, কিন্তু যেতে পারবো না। একটা কাজে আটকে গেছি। তাহলে এখন আমি আসি।
কথাটা বলেই আর দেরি করে না অর্ণব। সোজা নেমে যায় রাস্তায়। তারপর একটা রিক্সা ডেকে তাতে উঠে পড়ে। একটা নির্জন জায়গা দরকার। মানুষের এই কোলাহলে ওর কেমন যেন দম বন্ধ লাগছে। অদিতি তাকিয়ে থাকে ওর চলে যাওয়া ব্যস্ত রাস্তার দিকে। একটু পরই ভিড়ের ভেতর মিলিয়ে যায় রিক্সাটা। অনেক রাতে যখন অর্ণব বাড়ি ফিরলো তখন সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। আর ঘুমাবেই না বা কেন? ঘড়িতে এখন আড়াইটা বাঁজে। নিঃশব্দে নিজের ঘরে ঢুকে পড়ে সে। চারিদিক অন্ধকার। ওর জীবনের মতই। আলোর সুইচ চাপতেই চমকে উঠে সে। তারপর মনে মনে হাসে। প্রতিদিন মেয়েটা এখানেই শুয়ে থাকতো। তাই চোখের ঘোর এখনো কাটেনি। হয়তো মেয়েটাকে সে ভালোবেসেই ফেলেছিলো। বাসাটাই স্বাভাবিক, একই ছাদে নিচে কাটিয়েছে ২ বছরেরও বেশি সময়। এখন ভাবতেই অবাক লাগছে ওর যে এতটাও নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ ছিলো কীভাবে?
– বলোনি তো কখনও! কথাটা শুনে চমকে উঠে অর্ণব। তাহলে কী এটা ওর চোখের ভ্রম নয়? অদিতি! কিন্তু তার তো এখন…..
– তুমি? আর অমিত কোথায়?
– ফিরে গেছে। আমি কিন্তু এখনো উত্তর পাইনি।
– সাহস হয়নি কখনো।
– আজ না হয় একটু সাহসী হলেও পারো।
অর্ণব দেখলো অদিতির চোখের কোণে একটা দুষ্টমির হাসি খেলে যাচ্ছে। চোখের ভাষা যেন আর বলছে, এই রাতে একটু সাহসী হলে খুব একট ক্ষতি হবে না বোধহয়।
গল্পের বিষয়:
গল্প
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত