রহমানের শেষ সময়

রহমানের শেষ সময়

সাল তখন ১৯৭১। জানুয়ারী মাস। রহমান ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে চান্স পেয়েছে। রহমান বাঁশখালী নামক একটি গ্রামে বাস করে। রহমান তার মা বাবার একমাএ ছেলে। মা বাবাকে বিদায় জানিয়ে সে ঢাকার উদ্দেশ্য রওনা হয়। সেখানে গিয়ে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়। সেখানে গিয়ে রহমানের ভালই দিন যাচ্ছিল। জানুয়ারী, ফেব্রুয়ারি মাস খুব ভালভাবেই কেটে গেল বন্ধুদের সাথে। এই দুই মাসের মধ্যে সে একবার বাড়িতেও গিয়েছিল। কিন্তু মার্চ মাসে এসে একটু সমস্যা হল। চারদিকে নানারকম অান্দোলন শুরু হয়। রহমান বাড়ি যাওয়ার জন্য তৈরি হয় কারন ৭ই মার্চ এর ভাষনের পর নানা রকম গণ অান্দোলন হতে থাকে। তাছারা ঢাকা ইউনিভার্সিটি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে যায়।

তাছারা রহমানের বাবা বলেছিল এত ঝামেলার মধ্যে ঢাকা থাকার দরকার নেই। রহমান ছাড়াও অনেক ছাএ বাড়ি যেতে চেয়েছিল কিন্তু  যেতে পারেনি। কারন অনির্দিষ্টকালের জন্য হরতাল ডাকা হয়। তাদের হোস্টেলের সামনে দিয়ে মারামারি শুরু হয়। বাইরে বের হওয়ার মত কোন রকম অবস্থা ছিল না। সবাই কি করবে বুঝতে পারছিল না।
দেখতে দেখতে মার্চ মাসের পঁচিশ তারিখ চলে অাসে। কারোর অার বাড়ি যাওয়া হলো না। পঁচিশে মার্চ ঐ দিন রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সৈন্যরা নিরস্ত্র বাঙালির ওপর অাক্রমন শুরু করে অার এই অাক্রমন শুরু করে ইয়াহিয়া খানের অাদেশে।

অাক্রমন শুরু হয় রহমানদের হোস্টেল থেকে। সবাই তখন ঘুমিয়ে তখন পাকিস্তানি বাহিনীর সৈন্যরা ঢুকে একের পর এক ছাএের ওপর গুলি চালাতে থাকে। রহমান ঘুমন্ত অবস্থায় গুলির  অাওয়াজ শুনতে পায়।সে বুঝতে পারে তাদের হোস্টেলে পাকিস্তানি সৈন্যরা ঢুকে পড়েছে। রহমান ও তার কয়েকজন বন্ধু ধীরে ধীরে রুম থেকে বের হয়। রহমানের রুম হোস্টেলের একদম কোণায়, তাই এখনো ওখানে পাকিস্তানি সৈন্যরা পৌছাইনি। পাকিস্তানি সৈন্যরা মারতে থাকে ছাএদের। তারপর রহমানও তার বন্ধুরা বারান্দায় বের হয়। ঠিক তখনি রহমান বারান্দার লাইট অফ করে দেয়। ধীরে ধীরে ওরা নীচে নামতে থাকে, তারপর রহমান বুঝতে পারে তাদের সামনে পাকিস্তানি কয়েকজন সৈন্য রয়েছে। তারা সুযোগ বুঝে সেখান থেকে বের হয় কারন জায়গাটা পুরো অন্ধকার ছিল। তারপর ওরা গেটের কাছে যায়, ঠিক তখনি ওদেরকে ঘিরে ফেলে পাকিস্তানি সৈন্যরা। রহমান সহ ওরা পাঁচজন ছিল। রহমানের বন্ধুদের এক এক করে গুলি করতে থাকে।

ঠিক তখনি পাকিস্তানি সৈন্যদের নেতা ডাকতে থাকে বাকি সৈন্যদের। ওরা ভুলে রহমানকে ছেড়েই ওদের নেতার কাছে চলে যায়। তখন রহমানের এক বন্ধু অাধমরা অবস্থায় বলে, পালা রহমান পালা এখান থেকে। রহমান বলে, না অামি তোদের ছেড়ে যেতে পারব না। তারপর ওর বন্ধু বলে, তোকে যেতেই হবে, তারপর রহমানের বন্ধু রহমানকে ধাক্কা মেরে গেটের বাইরে পাঠিয়ে দেয়। তারপর মরে যায় রহমানের বন্ধু। রহমান দেয়ালের অাড়াল থেকে দেখল কিভাবে শয়তানরা গুলি করে মেরে অাবার ছাএদের তিনতলার ছাদ থেকে নিচে ফেলে দিচ্ছে। রহমান দেরি না করে ঢাকার রাজপথ দিয়ে দৌড়াতে থাকে। দৌড়াতে দৌড়াতে হোচট খেয়ে পড়ে যায় অার সে সড়ক বাতির অালোতে দেখে রাস্তার পাশ দিয়ে পড়ে অাসে মানুষের লাশ, যাদেরকে ঐ শয়তানরা মেরেছে। তারপর দেখে অনেক পাকিস্তানি সৈন্যর গাড়ি অাসছে। তারওর রহমান একটা গাছের অাড়ালে লুকায়। ঐ গাড়িগুলো চলে যাওয়ার পর রহমান অাবার দৌড়াতে থাকে। কোথায় যাবে বুঝতে পারছিল না।

তারপর সে দেখতে পায় একটা হোন্ডা। রহমান হোন্ডা চালাতে জানত। সে ধীরে ধীরে হোন্ডার কাছে গেল। অার সাথে সাথে সামনে পড়ে গেল এক পাকিস্তানি সৈন্য। যেই গুলি করতে নিল তখনি রহমান রাস্তা থেকে বালু তুলে ঐ পাকিস্তানি সৈন্যর চোখে মারল। অার ঐ পাকিস্তানি সৈন্যটা চোখ ডলতে লাগল। রহমান তখন দেখতে পেল হোন্ডায় চাবি লাগানো। তারপর হোন্ডায় উঠে চালাতে শুরু করল। হোন্ডায় সে কতদুর যাবে বুঝতে পারছিল না। রাস্তায় চারপাশে অাগুন জলছে। ভয়ংকর হয়ে উঠেছে পরিবেশ।

রহমান হোন্ডা চালাতেই অাছে। একটা পাকিস্তানি সৈন্যদের গাড়ি রহমানের পিছু নিল।  পকেটে রহমানের ফোন বাজছে। তখন ওর মা ফোন করেছিল। গাড়ি থেকে গুলি করল একজন পাকিস্তানি সৈন্য।  গুলিটা রহমানের পায়ে লাগল। তবুও সে হোন্ডা চালাতেই লাগল। রহমান ভাবল, সে যদি মারা যায়, সে তার মা বাবার কোলে মৃত্যুবরন করবে অন্য কোথাও নয়।  কিছুক্ষন পর একজন পাকিস্তানি সৈন্য রহমানকে অাবার গুলি করল। গুলি রহমানের পিঠে গিয়ে লাগল। রহমান তবুও খুব কষ্ট করে হোন্ডা চালাতে লাগল। অারেকদিকে পাকিস্তানি সৈন্যদের গাড়ি ব্রেক ফেল হয়ে এক্স্যিডেন্ট করল। তা দেখে রহমান খুব খুশি হলো। তার পেছনে অার কোন গাড়ি নেই। রহমান ট্রেনের অাওয়াজ শুনতে পেল। তারপর সে কোনরকমে স্টেশনে গিয়ে দেখল ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে। তারপর খুব কষ্ট দৌড়াতে দৌড়াতে ট্রেনে উঠল।

অাসলে তখনো স্টেশনের কাছে পাকিস্তানি সৈন্যরা পৌছাতে পারেনি। তার অাগেই ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে। ট্রেনের যেসব যাএী ছিল তারা সবাই ঢাকা ছেড়ে পালাচ্ছে। অারেক দিকে রহমানের খুব খারাপ অবস্থা। সে যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছে। ট্রেনের একজন যাএী রহমানকে বলল, তোমায় বুঝি ঐ শয়তানরা গুলি করেছে। রহমান বলল, হ্যা। ট্রেনের একজন হেল্পার এসে বলল রহমানকে, ভাই এখন কোন ডাক্তার নেই এখানে, অাপনাকে এখন কি করে বাচাবো? অারেকজন হেল্পার রহমানের পিঠে যেখানে গুলি লেগেছে সেখানে বড় পরিস্কার কাপড় বেধে দিল, অার পায়ে ক্ষত স্থানে কাপড় বেধে দিল যাতে রক্ত না বের হয়।

হেলপার রহমানকে বলল, ভাই এছাড়া অার কিছু ব্যবস্থা নেই এখানে, অাপনার  গুলিতে অাহত মত কয়েকজন মানুষ মারা গেছে। অারেকজন হেলপার বলল এসে,কিছুক্ষন অাগে, অার অাপনার ক্ষত একটু কম অাছে, অাপনি যেখানে যাচ্ছেন সেখানে পৌছে চিকিৎসা করে নেবেন। রহমান বলল, ধন্যবাদ। ট্রেন রাজশাহী স্টেশনে এসে থামল। রাজশাহীর অবস্থা তেমন ভাল ছিল না তখন।  তারপর দুইজন ট্রেনের হেলপার রহমানকে সিএনজিতে উঠিয়ে দিল। রহমান বাঁশখালী চৌরাস্তায় যেতে বলল। ওখানে ওর বাড়ি। স্টেশন থেকে রহমানের বাড়ি খুব দুরে নয়। সিএনজি ওয়ালা রহমানকে একেবারে রহমানের বাড়ির সামনে নিয়ে অাসল। রহমান কোনরকমে ওর বাবা, মাকে ডাকতে থাকল। ওর মা বাবা বেরিয়ে অাসল। ছেলের এই অবস্থা দেখে চমকে উঠল ওর মা বাবা। সিএনজি ওয়ালাকে ভাড়া দিয়ে ওর বাবা রহমানকে কোলে তুলে নিল। ওর মা কান্না শুরু করল ছেলেকে দেখে।

রহমানকে বিছানায় শোয়ালো ওর বাবা। ওর বাবা দেখে তার হাতে রক্ত লেগে অাছে। তারপর ওর মা বাবা দেখল রহমানের পিঠে গুলি লেগে অাছে, অাবার পায়ে ও গুলি লেগেছে। রহমানের মা বাবা দেখে অাতকে উঠল। রহমানের মা বলল,তারাতারি যাও, গাড়ি নিয়ে এসো, ছেলেকে হাসপাতালে নিতে হবে। তারপর রহমানের বাবা গাড়ি অানতে যেই বের হবে ঠিক তখনি রহমান বলে উঠল, বাবা কোথাও যেও না, অামার অার সময় নেই। রহমানের মা বলল, ও কথা বলিস না বাবা, তুই অামাদের এক মাএ সন্তান। ওর বাবা বলল, অামি গাড়ি অানতে গেলাম, তোকে অামরা বাঁচাবোই বাবা। এই বলে রহমানের বাবা গাড়ি অানতে বেড়িয়ে গেল।রহমান ওর মাকে বলল, অামার অার সময় নেই মা, বাবাকে অাটকাও। রহমানের মা রহমানকে বলল, না বাবা তোকে বাঁচতেই হবে অামাদের জন্য। তারপর রহমান ওর মাকে বলল, মা অামাকে শেষবারের মত ভাত খাওয়াবে না? রহমানের মা ভাত নিয়ে অাসল।

রহমানের মা রহমানকে খাইয়ে দিতে লাগল। মাএ দুইবার ভাত মুখে নেওয়ার ওর রহমান বলল ওর মাকে, পানি দাও মা। রহমানের মা রহমানকে পানি খাওয়ালো। রহমান ওর মাকে বলল, মা তোমার কোলে অামার মাথাটা নাও মা, শেষ নিঃশাষ অামি তোমার কোল থেকে নিতে চাই। রহমানের মা কাঁদতে লাগল। রহমান অাবার বলল, মা অামার শেষ ইচ্ছে পূরন করো মা। তারপর রহমানের মা কাঁদতে কাঁদতে রহমানের মাথা তার কোলের ওপর রাখল। রহমান ওর মায়ের দিকে খুশি মনে তাকিয়ে বলল, মা, কেঁদো না, অামায় একটু শান্তিতে যেতে দাও। রহমানের মা কান্না থামাতে পারল না। কিছুক্ষন পর মায়ের কোল থেকে রহমানের মাথা পরে গেল। মারা গেল রহমান।রহমানের মা পাগল প্রায় হয়ে গেল। অাশেপাশের প্রতিবেশীরা রহমানের বাড়িতে অাসল। ঠিক ঐ সময় রহমানের বাবা গাড়ি নিয়ে অাসল। রহমানের বাবা ঘরের ভিতর ঢুকে দেখে রহমানের মা কাঁদছে। রহমানের বাবা ছেলেকে জরিয়ে ধরে কাঁদতে লাগল। ফজরের অাযান দিল। রহমানের মা বাবা পাগল প্রায় হয়ে গেল।

তারপর মসজিদ থেকে মৌলভি এসে শান্তনা দিতে লাগল রহমানের মা বাবাকে। রহমানকে দাফন কাফন খাটিয়ায় তোলা হল তখন রহমানের মা খাটিয়া ধরে কাঁদতে লাগল। প্রতিবেশীরা রহমানের মাকে খাটিয়ার কাছ থেকে সরিয়ে অানল। তারপর রহমানকে কবরস্থানে কবর দিয়ে অাসা হল। ওর মা বাবা ছেলের শোকে নিথর হয়ে গেল। রহমানের মৃত্যুর সাত দিন পর হালকা নরমাল হলো ওর মা বাবা। তারপর  রহমানের রহুের শান্তি কামনার জন্য দোয়া মাহফিলের অায়োজন করল ওর মা বাবা। এভাবেই শেষ হল রহমানের জীবন। এক পিতামাতা হারালো তাদের সন্তানকে। অার এটা হলো ঐ শয়তান পাকিস্তানি সৈন্যদের জন্য। ১৬ই ডিসেম্বর যখন বাংলাদেশ বিজয় লাভ করে তখন রহমানের মা বাবা হাতে ছেলের ছবি নিয়ে এবং জাতীয় পতাকা নিয়ে বাংলাদেশের বিজয় লাভের মিছিলে শামিল হয়।

গল্পের বিষয়:
গল্প
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত