সই

সই
মাইয়্যা! কোন ভাতাররে শইল দেখাইতে ভেজা শইলে খাড়াইয়া আছোস? দুঃসম্পর্কের ঠাকুমা শিবানির এমন প্রশ্নে শিপ্রা কপাল কুঁচকে মুখ ভেংচি দিয়ে জানিয়ে দেয় বুড়ির এমন তীর্যক কথায় টলে যাওয়ার মেয়ে শিপ্রা না। শিপ্রা সাতসকালে খালে গিয়েছিল, সেখান থেকে ফিরেছে চোখ লাল করে। ফেরার সময় এক আঁটি শাপলা তুলে নিয়ে এসেছে মায়ের মারের হাত থেকে বাঁচতে। শিপ্রার মা কল্যাণী চুপচাপ দুমুখো চুলোয় বাঁশের পাতা ঠেলে চলেছে আর আড়চোখে শিপ্রাকে দেখছে। শিপ্রা মায়ের এমন মৌনতাকে বড্ড ভয় পায়, চিৎকার চেচামেচি করলে নিস্তার মেলে, তবে মা যখন চুপ মেরে থাকে তখন দু চার ঘা পিঠে পড়বেই, এ যেন অলিখিত সংবিধান মা মেয়ের মাঝে। শিপ্রা মনে মনে ভগবানের অনুগ্রহ কামনা করছে যেন গায়ের পানি দ্রুত ঝরে যায়, পানি ঝরলেই সে ঘরে উঠবে। গায়ে পানি নিয়ে ঘরে উঠলে মা যে কুরুক্ষেত্র বাধিয়ে দেবে সে কথাও বেশ জানা তার।
শ্যামল খালি হাতেই বাড়ি ঢুকল। কল্যাণীর চোখে শ্যামলের খালি হাত দুটো পড়তেই তার গা জ্বলে উঠল, দাঁত কটমট করে রাগ সামলে নেবার বৃথা চেষ্টা করলো। কল্যাণী শ্যামলকে বারবার বলেছিল আসার সময় যেন গাই গরুটার জন্য কুড়ো আর ছোটো মেয়েটার জ্বরের ওষুধ নিয়ে ফেরে। শ্যামল বারান্দায় বসেই মাটির ঘটের বাসি জলটুকুন কয়েক ঢোকে শেষ করে অনুযোগের সুরে কল্যাণীকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলল, গোলাপ দার শালী নাকি বিষ খাইল, সে ঐখানে গেছে বইলা আইজ আর টেকা পাইলাম না। কল্যাণী আর ধৈর্য ধরে রাখতে পারে না , চুলোর ধার থেকে উঠে চিলের মতো ছোঁ মেরে শিপ্রার চুল ধরে কয়েক ঝাঁকি দিয়ে মাটিতে ফেলে দেয়, পিঠে ধুপধাপ কিল বসাতে বসাতে বলল, বেলাজ মাইয়্যা, বুকে উড়না দিতে কয়দিন কইছিলাম? উড়না ছাড়া বেশ্যাগিরি করতে যাস কেন মাগির ঝি?
শিপ্রা গুঙিয়ে কেঁদে ওঠে, মায়ের পা ধরে প্রতিবারের মতো একই বুলি আওড়ে বলে, আর যামু না খালে, মা কালীর দিব্যি। স্বয়ং মা কালীর উপস্থিতিও কল্যাণীকে থামাতে পারবে না যেন। কল্যাণী যতক্ষণ না হাঁপিয়ে উঠবে ততক্ষণ মেয়েকে ছাড়বে না। শ্যামল সাহস করে না কল্যাণীকে কিছু বলার। মেয়ের জন্য কেবল মায়া হয় তার। শ্যামল বেশ বোঝে সংসারে তার অক্ষমতার দায়ে মেয়ের পিঠে এমন চড় কিল বসছে। তারই বা কি করার? মহাজনের শালী বিষ খাবার দায় কি তার? মহাজনের আজ টাকা দেবার কথা ছিল, টাকা মেলেনি। তবে সে কুড়ো, ওষুধ কিনবে কী দিয়ে? কল্যাণী হাঁপিয়ে যেতেই শিপ্রাকে ছেড়ে দেয়। আবার চুলোর ধারে ফিরে এসে বেশ শান্তভাবেই চুলোয় জ্বাল দেয়, খুন্তি দিয়ে ক্ষুদের ভাত নেড়ে দেখে ফুটলো কি না। না ফোটেনি এখনো, ধোন্দল সেদ্ধ হয়ে এসেছে প্রায়।
শ্যামল কল্যাণীর এমন মেজাজের বাহার দেখে অবাক না হয়ে পারে না। এই মেঘ, এই বৃষ্টি। দারিদ্র্যের পোশাক গায়ে পরে নিতেই মানুষ অভিনেতা হয়ে ওঠে, সুনিপুণ অভিনয়ে উপরে বসে থাকা দর্শকটাকেও বোধহয় অবাক করে দেয় শ্যামলের মতোই৷ গাবতলার দিকে শ্যামলের চোখ পড়তেই দেখা গেলো মেরির মাকে, শ্যামল একটু নির্ভার হয়। শ্রিপ্রা উঠান ছেড়ে ঘরে গিয়ে যে নিঃশব্দে কাঁদছে এটা শ্যামলের জানা। মেরির মা আসলে শিপ্রার কান্না থামবে আর ওদিকে কল্যাণীও প্রাণ খুলে দুটো কথা বলার মতো মানুষ পাবে এই ভরদুপুরেও। শ্যামল বড়ঘরের দিকে পা বাড়ায় ছোটো মেয়েটার জ্বরের খোঁজ নিতে। মেরির মায়ের নিজের একটা সুন্দর নাম আছে, রোজী। তবে এই গাঁ কিংবা আশপাশের দশ গাঁয়ের মানুষ তাকে মেরির মা নামেই চেনে, ডাকে, খোঁজে। বয়স তার ষাট ছুঁয়েছে কিংবা ছোঁয়নি। মেরির মা নিজেও তার বয়সের ঠিকঠাক হিসেব দিতে পারে না। ঘরে দুই নম্বর সতীন ঢুকতেই ঘর ছাড়া হতে হয় তাকে। স্বামী বিবর্জিতা হয়ে বাবার ঘরে ফেরার অনাগত ব্যথাটুকুকে প্রশ্রয় না দিয়ে এই ভিন দেশে এসে মাথা গোঁজে মেরির মা। প্রথম দিকে এর ওর বাড়িতে ফরমায়েশ খাটলেও সুবিধা করতে না পেরে ভিক্ষের থলি নিয়ে বেরিয়ে যায় এর ওর দুয়ারে দুয়ারে।
ভুবেনগড়ের গ্রামে মেরির মা এসেছিল সমান দুই যুগ আগে। আশ্বিনের এক গুমোট দুপুরে শ্যামলের বাড়ির পেছনের রাস্তা দিয়ে যেতেই কল্যাণীর গোঙানিতে ছুটে এসে দেখল কল্যাণী বারান্দার খুঁটিতে মাথা হেলান দিয়ে পেট চেপে ধরে গোঙাচ্ছে, মেরির মা আরো দু চারজনকে ডেকে এনে শ্যামলের প্রতিমা রঙ করার ঘরকেই আঁতুড়ঘর করে নেয়। শেষ সন্ধ্যার দিকে প্রতিমা রঙ করার ঘরে প্রতিমার মতো শিপ্রার জন্ম হলে সবাই যার যার মতো চলেও গেলেও মেরির মা সারা রাত বসে ছিল কল্যাণীর পাশে। শ্যামল মাটির হাঁড়ি, ব্যাংক, পুতুল নিয়ে গিয়েছিল উজানহাটির মেলায়। পরদিন ভোরে শ্যামল বাড়ি ফিরে মেরির মাকে পারলে মাথায় তুলে নেয়। দিদি ডেকে রাধামাধবকে সাক্ষী রেখে বলে, শ্যামল তার জানটাও দিতে দুবার ভাববে না মেরির মায়ের জন্য। সেই থেকে শ্যামলদের বাড়িতে আসা যাওয়া মেরির মায়ের।
শিপ্রাকে কোলেপিঠে করে মানুষ করা, আঙুল ধরে হাঁটা শেখানো, এর-ওর বাড়ি থেকে ভিক্ষের সঙ্গে দেয়া জিলেপী, বাতাসা কিংবা দানাদার ঠিক সে আঁচলে গুঁজে এনে লুকিয়ে খাইয়েছে শিপ্রাকে। এখনো সেই একই কাজ করে চলে মেরির মা। শিপ্রার সাথে মাটিতে খোট এঁকে পাঁচগুটি খেলে দুজন, সিলক ধরাধরি কিংবা নানা পদের খুনসুটি চলে দুজনার মাঝে। দুজনার মান-অভিমান হলে কনুই আঙুলে আঙুল ছুঁয়ে আড়ি কাটে, আবার বুড়ো আঙুলে বুড়ো আঙুল ছুঁয়ে ভাব করেই সই পাতায়। ভিক্ষে করে খেলেও মেরির মা আত্নসম্মানের বেলায় আপসহীন! কখনো আত্নমর্যাদার বিসর্জন দিয়ে শ্যামলের বাড়ি পড়ে থাকে না, মাসে বড়োজোর দুবেলার বদলে তিনবেলা ভাত মুখে তোলে না। তার নিজের একখানা ঘর আছে খালের শেষ মাথার বুড়ো বটগাছের নিচে। সে নিজে রাঁধে, নিজে খায়। মাঝেমধ্যে অতিথি হয়ে শিপ্রার পা পড়ে মেরির মায়ের ঘরে। আঙুল দিয়ে ডান মাড়িতে আটকে থাকা পান বাঁ মাড়িতে নিতে নিতে মেরির মা অভিযোগের সুরে বলল, অহনো ভাত অয় নাইরে কল্যাণী! ছোডো মাইয়্যাডার না জ্বর? ভাত খাওয়াইয়া বড়ি খাওয়াবি কহন?
– আর বড়ি, এই নরকের ভিতরে হগলতের মরণ লেহা, বড়ির কপাল কারো নাই দিদি। মেরির মা আঁচল থেকে একটা হোমিওর ছোট্ট শিশি খুলেকল্যাণীর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, নরেন ডাক্তারে কইলামআমার ছোডো সইয়ের জ্বর, ওষুধ দেও তো ডাক্তার, জ্বর সারলে টেকা, নাইলে সব ফাঁকি।কল্যাণী ওষুধের শিশি হাতে নিয়ে বলল, মানলো ডাক্তারে!
-মানবো না কেন! আমারে নরেন বেশ খাতের করে বুঝলি। টেকা পয়সা আমার কাছ থেইকা নেওনের মানুষ নরেন না। দেরি করিস না, চাইরডা ভাত নামা বাডিত, আমি ছোডো সইরে খাওয়ায়ইয়াওষুধটা খাওয়াইয়া দেই। কল্যাণী ব্যস্ত হাতে কোনোরকম সেদ্ধ হওয়া ক্ষুদের ভাত বাটিতে বাড়তে বাড়তে ফিসফিসিয়ে বলে, বড়োডারে দিছি কয় কিল আজকা। উড়না ছাড়া খালে যায়, তাবৎ দামড়া পোলারা আহে খালে। শরমের কথা না কও?
-কানতাছে নি? গলা নিচু করে প্রশ্ন করে মেরির মা। হু, কান্দে মনে অয়।
-আইচ্ছা, ভাত জুড়াক। আমি দেহি সে করে কী। মেরির মা চৌকাঠ পেরিয়ে ঘরে ঢুকে দেখল শিপ্রা নিরবেকেঁদে চলেছে। মেরির মাকে দেখে শিপ্রা এবার ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল, মেরির মা শিপ্রার মাথাটা বুকে টেনে নিতে শিপ্রা তাকে দুহাত দিয়ে জাপ্টে ধরলো। মেরির মা শিপ্রার মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলল, থাক আর কান্দে না, চোখ ফুলাইয়ায়া ফালাইছস কাইন্দা। অহন ভাত খাওনের বেলা, চোখ মুইছা ত্যাল নিয়া বারান্দায় যাইয়া বয় আমি ত্যাল দিয়া দিমু। শিপ্রা ভেবেছিল মেরির মা তাকে আহ্লাদ দিয়ে কথা বলবে, আরো কান্নার সুযোগ করে দেবে। শিপ্রা মনেমনে আশাহত হয়ে কান্না থামিয়ে চোখ মুছে নিতে নিতে বলে, আইচ্ছা আইতাছি। মেরির মা মনেমনেহাসে শিপ্রার এমন অভিমানে।
কাঁদতে চাওয়া মানুষ যখন কান্নারসুযোগ পায় না প্রিয় মানুষটার কাছ থেকে তখন খাঁটি অভিমান ভরকরে তার চোখেমুখে। শিপ্রার চোখমুখ জুড়ে এখন রাজ্যের অভিমান, কান্নার সুযোগ হারানোর অভিমান। দুদিন ধরে বিরামহীন বৃষ্টি পড়ে চলেছে। কাঁচা মাটির হাঁড়ি, কলস পোড়ানোর কোনোরকম বন্দোবস্তো করে উঠতে পারছে না শ্যামল। এদিকে মহাজন বলে দিয়েছে নতুন মাল না দিলে টাকা দেবে না। ঘরে চাল নেই আজ তিনদিন ধরে। ক্ষুদের ওপর ভরসা করে তিনদিন চলেছে, ক্ষুদও আজ সকালে শেষ হয়ে গিয়েছে। কল্যাণীও বুঝতে পারছে শ্যামলের অসহায়ত্ব। তাই তো শিপ্রাকে ডেকে একখানা মস্ত বড় কলার পাতা হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, তোর সইয়ের কাছ থেইকা দুই বেলার ভাতের চাইল লইয়া আয় যা। শিপ্রা বোঝে এই অভাবের দিনে তার মা তার নীতিতে আটকে থাকতে পারছে না কেবল তাদের কথা ভেবেই। কল্যাণীর কথা হলো মেরির মার কাছ থেকে একটা দানাও চাওয়া যাবে না, সে ভালোবেসে কিছু দিলে অন্য হিসেব।
ভিক্ষে করা মানুষের কাছে ভিক্ষে চাইবার মতো লজ্জা আর কি আছে পৃথিবীতে? কল্যাণী এই দর্শন মেনে এসেছে এতদিন। এই অভাবের দিনে মেয়ে দুটোর কথা চিন্তা করে দর্শন আঁকড়ে ধরে রাখার মতো শক্তি, সাহস চূড়ান্ত অসহায়ের থাকে না। কালীমন্দির পেরিয়ে আসতেই কেউ শিপ্রাকে পেছন থেকে গলা বাড়িয়ে ডাক দিল। মাথা ঘোরাতেই দেখা গেল গৌতম আসছে শিপ্রার দিকে। শিপ্রা বারবার নিজেকে মনেমনে গালি দেয় কেন সে নতুন হলদে জামাটা পরে বের হলো না। গৌতম দৌড়ে এসেছে শিপ্রার দিকে। হাঁপাতে হাঁপাতে গৌতম বলল, এই দিনে কই যাও শিপ্রা? তাও আবার একলা, অহনের জ্বর কইলাম ভালা না, জ্বর হইলে ওষুধ আইনা দিব কেডা? গৌতম একনাগাড়ে একগাদা প্রশ্ন করে আবার হাঁপাতে থাকে। শিপ্রা পায়ের বুড়ো আঙুলে মাটি খুঁচতে খুঁচতে বলে, আমার মাথার উপরে তাও তো কলাপাতা আছে। আপনের তো তাও নাই, আপনের জ্বর হইলে?
– আমার জ্বর হইলে তুমি একবার দেখতে আইয়ো, আর তোমার হইলে নরেন ডাক্তারের ওষুধ দিয়া আসমু। শিপ্রার যেন সংবিৎ ফেরে! মুহুর্তেই মনে হয় কেন সে গৌতমকে ওমন প্রশ্ন করতে গেলো! খানিকটা বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে। শিপ্রা দ্রুত কদমে পা বাড়ায়। পেছম থেকে গৌতম আবার গলা বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করে, কই যাও শিপ্রা, কইলা না তো? শিপ্রার দাঁড়িয়ে যেতে ইচ্ছে করে, তবুও দাঁড়ায় না। কখন কে দেখে ফেলে! এমনিই কুমোরপাড়ার মানুষ কুৎসা রটাতে বেশ পটু। শিপ্রা হাঁটা অবস্থায় জবাব দেয়, সইয়ের বাড়ি যাই।
গৌতম ভিজতে ভিজতে শিপ্রার চলে যাওয়া দেখে। এতেই যেন শান্তি! শিপ্রা মনেমনে নিজেকে শাসন করে, কেন সে দাঁড়াল! কেন সে কথা বলতে গেলো গৌতমের সঙ্গে! সারা পথ নিজেকে শাসন করতে করতে মেরির মায়ের ছোট্ট ছনের ঘরের সামনে এসেই বাইরে থেকে গলা বাড়িয়ে শিপ্রা ডাক দিলো, সই গো! ঘরে আছো? মেরির মায়ের কান বেশ সজাগ৷ বজ্রপাতের আওয়াজের মাঝেও শিপ্রার ডাক শুনতে ভুল হয় না তার। মেরির মা এক ডাকেই দরজা মেলে বলল, আয় ঘরে আয় রে সই। জনমানবহীন এই খালের শেষ মাথার ঘরের দিকে আসলে যে কারোরই এমন দিনে ভয় পাবার কথা। শিপ্রার ওসব ভয় হয় না। মেরির মা রাঁধতে বসেছে। তরকারিতে নুন ছিটিয়ে দিতে দিতে বলল, এই দিনে বাইর হইলি কেন? একটু পরপরই ঠাডা পড়তাছে। শিপ্রা মেরির মায়ের সামনে কখনো কোনো বিষয়ে লজ্জা পায়নি। আজও পেলো না৷ টনটনে গলায় বলল, ঘরে চাইল নাই, মা চাইল নিতে পাডাইছে। চাইল আছে তোমার ধারে?
– হ, থাকবো না কেন? ঐ দেখ চৌকির নিচে ব্যাগ, ব্যাগ ধইরা লইয়া যা৷ শিপ্রা মাথা ঝুঁকে চৌকির নিচে দেখে অবাক হয়ে বলল, অত চাইল না তো! দুই বেলার ভাত রান্ধনের চাইল।
– লইয়া যা তো মাইয়া, বেশি কথা কইস না। না, অহন যাইস না। তরকারি নামাই, খাইয়া যাবি। শিপ্রা মেরির মায়ের শাড়িতে মাথাটা মুছে নিয়ে চৌকির ওপর উঠে বসে। খানিকক্ষণ দ্বিধা করে বলল, সই! তুমি একজনরে আইচ্ছামতো বইকা দিতে পারবা? যাতে আমার লগে কথা না কয়।
-কারে বকন লাগব? মেরির মা প্রশ্ন করে৷ গৌতম দারে, সে খালি নানা ছুতা ধইরা আমার লগে কথা কইতে আহে। আমিও না কথা না কইয়া থাকতে পারি না, কথার জবাব না দিয়া দুই কদম আগাইতে পারি না। কথা কওনের পর মনে হয় কথা কওন ঠিক অয় নাই। তারে তুমি আইচ্ছামতো বইকা দিবা যেন আমার কাছে না আহে আর। মেরির মা ইষৎ হেসে টিপ্পনী কেটে বলল, খারাপ কিছু কয়নি রে সই?
-না, খারাপ কিছু কয় না। যাই কওক, সে যেন কথা না কয় আমার লগে আর। খুন্তিটা তরকারির ঝোলে ডুবিয়ে তা জিহ্বার ডগায় লাগিয়ে নুন, ঝাল ঠিকঠাক কি না দেখে নিয়ে মেরির মা আগের মতোই টিপ্পনী কেটে বলল, গৌতম তো ভালো মানুষ রে! তোগো কুমোরগো লাহান অল্প পয়সার কামে লাইগা নাই, নৌকায় মাল টানে। ভালা কামাই তার। শিপ্রা রেগে গিয়ে বলল, তার কামাইয়ের ফিরিস্তি আমারে দেও কেন? তুমি তার বইকা দিবা নি কও?
– আহ, চ্যাতোস কেন! যা, ওরে আমি না কইরা দিমু তোর লগে কথা কইতে। যা এবার বাসনডা ধুইয়া আন কল থেইকা, ভাত বাড়ি। শিপ্রা, কলার পাতাটা মাথায় নিয়ে কলপাড়ে চলে আসে দুটো বাসন নিয়ে। মেরির মা মনেমনে একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে বসে। বড়সড় সিদ্ধান্ত! আজ আর বিরামহীন বৃষ্টি না পড়লেও থেমে থেমে গুড়িগুড়ি বৃষ্টি পড়ছে। শ্যামল আর কল্যাণী পলিথিনি টানিয়ে, চুলোর চারপাশে চটের বস্তা,খড়কুটো দিয়ে কোনোরকমে চুলো জ্বালিয়ে কাঁচা কলস পোড়াচ্ছে। বারান্দায় বসে শিপ্রা তার ছোটো বোনটাকে নিয়ে পাঁচ গুটি খেলছিল। দূর থেকে গৌতমকে আসতে দেখেই শিপ্রা দৌড়ানোর ভঙ্গিতে ঘরের ভেতর চলে গেলো। গৌতম মাঝারি আকারের এক গাছ পাকা কাঁঠালনিয়ে শ্যামলের বাড়িতে ঢুকেই আড়চোখে শিপ্রাকে খুঁজেনিলো, শিপ্রাকে খুঁজে না পেয়ে সরাসরি শ্যামলের কাছে এসে কাঁঠালটা হাত থেকে নামিয়ে বলল, মায়ে কাডলডা দিল কাকা।
এমন বৃষ্টির দিনে গাছ পাকা কাঁঠাল আর মুড়ি মানেই বিশেষ কিছু। শ্যামল কৃতজ্ঞতার বদলে একগাল হেসে বলল, তোর কাজকাম কেমন চলে রে গৌতম, টেকা আহে কেমন? গৌতমের সাথে শ্যামলের অন্যদিন দেখা হলে শ্যামল গৌতমের দিকে ফিরেও তাকায় না। আজ এই ভালো ব্যবহারটুকুর পুরোটাই যে মেকি তা গৌতম বেশ বোঝে। গৌতম আড়চোখে আবার ঘরের দিকে তাকিয়ে শিপ্রাকে না দেখতে পেয়ে মনেমনে হতাশ হলেও মুখে মেকি হাসি নিয়ে বলল, হ কাকা, ভালাই টেকা আহে তো। কল্যাণী শ্যামলের উদ্দেশ্য জানে বলেই কল্যাণী শ্যামলের কথায় তাল মেলায় না, আগ বাড়িয়ে কিছু জিজ্ঞেস করে না। ঘরে বিয়ের উপযুক্ত থাকা মেয়েদের মায়ের চোখ হয় চারটে, কান হয় তিনটে, তারা বাড়তি চোখ কানে সব দেখতে পায়, শুনতে পায়, বুঝতেও পায়। শীতে কেনা ক্রিমটা শিপ্রা ব্যস্ত হাতে মুখে ঘষে আয়নায় নিজের মুখটা বার কয়েক দেখে নিয়ে, নতুন ওড়নাটা বুকে জড়িয়ে আবার বারান্দায় এসে বসে। গৌতম যেন এবার জানে পানি পায়। এই পানি বেশিক্ষণ টিকলো না হুট করে শ্যামলের বাড়িতে অতিথি হয়ে আসা কল্যাণী বড় দাদা বিকুর কারণে।
বিকু একগাদা টোপলা হাতে নিয়ে বাড়িতে ঢুকতেই শিপ্রারা দুই বোন, কল্যাণী, শ্যামল মহানন্দে ছুটে গেলো তার দিকে। বছর পাঁচেক পর যে এলো বিকু! বিকুকে নিয়ে মহা উল্লাস লেগে গেলো। গৌতম বুঝতে পেলো তার যে কিঞ্চিৎ গুরুত্ব তৈরি হয়েছিল তাও হারিয়েছে এই মাত্র।গৌতম আর দাঁড়ায় না, চুপিসারে কেটে পড়ে। গৌতমের প্রস্থান কেবল একজনেরই চোখে পড়ে, তার গৌতমের এমন নিরব অভিমানে ঠিক কেমন যেন লাগে, বোঝানোর মতো না, বলার মতো না। বহুদিন বাদে শ্যামলের ঘরে মুরগী জবাই হয়েছে, বড়ো চিতল মাছ এসেছে। সবকিছুর আয়োজন করেছে বিকু। কল্যাণীর সারা মুখজুড়ে অদ্ভুত এক উজ্জ্বলতা এসেছে। বাপের বাড়ির কল্যাণে স্বামীর সংসারে বিন্দুমাত্র ঔজ্জ্বল্যতার দেখা মিললেই মেয়েদের মুখ এমন অদ্ভুত উজ্জ্বল হয়। কল্যাণী হাসি-হাসি মুখ করে রেঁধে চলেছে, পাশেই বিকু আর শ্যামল বসা। বিকু পানে যৎসামান্য চুন লাগিয়ে মুখে পুরে দিতে গিয়েও দিলো না৷
শ্যামলের হাতখানা ধরে চাপা গলায় বলল, একখান ভালো ঘর পাইছি রে শ্যামল। পোলার বাপের চাতাল আছে দুইখান, জমিজিরাতের হিসাব নাই। পোলা সব দেখে অহন। এই ঘর হাতছাড়া করোন যাইব না। কল্যাণীর চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে ওঠে। শ্যামল দ্বিধা নিয়ে বলল, শিপ্রার বয়স ষোল পার হইলো না এহনো যে দাদা বিকু পানখানা মুখে পুরে দিয়ে আরাম করে চিবিয়ে নিচ্ছে। শ্যামল উত্তরের অপেক্ষায় বিকুর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে, বিকু পানের পিক ফেললেই উত্তর মিলবে। বিকু পানের পিক ফেলে কপাল কুঁচকে বলল, ষোল কি মাইয়্যালোকের লাইগা কম বয়স নি? বেশি বুঝিস না। এই ঘরেই মাইয়্যা দেওন লাগব। শ্যামলদের যে গাই গরুটা আছে সেটা এসেছে কল্যাণীর বাবার বাড়ি থেকেই। সে গরুর দুধ বেচে সংসার কিছুটা চলে। বড় ঘরখানাও করে দিয়েছে বিকু। সংসারে পায়ের তলায় মাটি না থাকা পুরুষের ভূমিকা ঢোঁড়া সাপের মতো। কেবল ফোসফাস আর বৃথা ছোবল, তবে বিষহীন। শ্যামল আর কথা বাড়ায় না। যদিও সম্বন্ধ বেশ উঁচুঘরের বলেই শ্যামল সম্মতি না দিয়েও পারে না। কল্যাণী ব্যাকুল হয়ে বলল, বড়’দা হেরা কিছু চায় নাই?
– উঁহু! হেরা কি ছোটোলোক আমাগো লাহান? হেরা চাইব না। আমাগো তো চক্ষুলজ্জা আছে। আমি দিমু হাজার পঞ্চাশেক টেকা। বাকি হাজার পঞ্চাশেক দিবি তোরা৷ পালঙ্ক, একটু সোনাদানা আর মানুষ খাওয়ানোর ব্যাপার তো আছেই। এইটুক না করলে শিপ্রার দাম থাকব ঐ ঘরে? কল্যাণী শ্যামলের দিকে অসহায়ের মতো তাকায়। এই তাকানোর অর্থ বিকু মুহূর্তেই বুঝে তড়িঘড়ি করে বলল। আহ! তোগো গাইটা বেচবি, আর এই বড়ো ঘরের পিছনের জমিটাও বেচবি। এমন ঘর যদি হাতছাড়া অয় তাইলে কোনোদিন আমারে পাবি না, এই কইয়া দিলাম। শ্যামল জানে বিকু যে পথ বাতলে দিয়েছে ঐ পথেই হাঁটালাগবে। এছাড়া দ্বিতীয় সুযোগ নেই তার হাতে। বিকু সকাল হতেই চলে গিয়েছে। দুদিন পর ছেলের বাড়ির লোক আসবে শিপ্রাকে দেখতে। আয়োজনের ত্রুটি যেন না থাকে এমন হুঙ্কার দিয়ে গিয়েছে বিকু। মেরির মা ভিক্ষে করতে যাবার আগে শিপ্রাদের বাড়িতে এসেছে বিকু এসেছে সেই খবর পেয়ে। কল্যাণী পিঁড়িটা এগিয়ে দিয়ে বলল, দাদা তো চইলা গেলো গো দিদি। তয় হুনো, দারুণ একখান খবর আছে।
-আহ চইলা গেলো বিকু! তা কী খবর আছে ক দেহি। শিপ্রার লাইগ্যা সম্বন্ধ আনছে দাদা। বাসুড়িয়ার কার্তিক পাল আছে না? তার পোলার লাইগ্যা সম্বন্ধ। বিরাট ঘর গো দিদি, ভগবান মুখ তুইলা চাইল। মেরির মা কেমন বিচলিত হয়ে পড়ল। উৎকন্ঠা নিয়ে বলল, অহন চাতালের ব্যবসা করে হেই কার্তিক?
-হ, তুমি চেনো দেহি দিদি! অবাক হয়ে বলল কল্যাণী। মেরির মা ডানে বাঁয়ে দ্রুত মাথা নেড়ে বলল, না কল্যাণী! আমার সইরে ঐ ঘরে দিমু না। কল্যাণী দুম করেই দমে গিয়ে, চোখমুখ কালো করে বলল, কেন দিদি! এই কথা কও কেন?
– হেরা মানুষ ভালা নারে, ঐ ঘরের চাইয়া তুই গৌতমের ধারে শিপ্রারে দে, হাজার গুণে ভালা থাকব আমাগো মাইয়া। কল্যাণী কিছু বলার আগেই ঘর থেকে শ্যামল বেরিয়ে ত্যাড়া গলায় বলল, না দিদি! ঐ গৌতমের ধারে আমার মাইয়্যা দিমু না। এত বড়ো ঘর রাইখা এই ভাঙা ঘরে মাইয়্যা দিমু কোন দুঃখে?
– আমি যা কইতাছি শোন শ্যামল, হেরা মানুষ সুবিধার না। আর শিপ্রারে ঐ ঘরে আমি দিমু না।মেরির মা তেজ দেখিয়েই বলল কথা কল্যাণীও পাল্টা তেজ দেখিয়ে বলল, তুমি না দেওনের কেডা দিদি? আমার দাদা যহন একবার কইছে তহন ঐ ঘরেই যাইব। আর হেরা মানুষ যে কেন ভালা না সেইডা তো বুঝছি, ঐ গৌতমের লাইগাই তো হেরা মানুষ খারাপ হইয়া গেছে না?
মেরির মায়ের মাথাটা কেমন যেন চক্কর দেয়। কল্যাণীর কথাটা তীরের মতো বেঁধে। মেরির মা আর সাহস করে বলতে পারে না ঐ কার্তিক যে ভিক্ষে দেবার নাম করে তাকে ঘরে আটকে গায়ের সব কাপড় খুলে নিয়ে তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল দেড় যুগ আগে। মেরির মা তার স্বামীর অত্যাচার ভুলে গেলেও ঐ নরপিশাচ কার্তিকের সেদিনের ওমন ঘটনা কখনো ভুলতে পারবে না সে। কল্যাণী এমন কথার পরে মেরির মা আর সেদিনের ওমন রোমহষর্ক বিচ্ছিরি অতীতের কথা বলার সাহস পায় না। মাঝে কল্যাণী যদি বলে ফেলে মেরির মা গৌতমের সঙ্গে বিয়ে দিতেই মিথ্যাচার করছে তবে যে এর চেয়েও বড়ো কষ্ট আর কিছুতে রইবে না। মেরির মা আর কথা বাড়ায় না, লাঠিতে ভর দিয়ে বেরিয়ে যায় শ্যামলের বাড়ি থেকে। কেউ পেছন থেকে ডাকে না তাকে। আজ আর ভিক্ষে করার মতো মনের জোর নেই তার। খামাখা অন্যর মেয়ের ওপর অধিকার খাটাতে গিয়ে বিরাট অন্যায় হয়েছে এমনটাই ভাবে সে। যেই বুড়ো চোখ দুটো এতদিন মরা নদী ছিল আজ যেন তা বর্ষার ভরা পদ্মা হয়ে গিয়েছে। কেবল জল আর জল!
শিপ্রাকে দেখতে এসে ছেলেপক্ষ পছন্দ করে গেলো। কাছেই ভালো দিন থাকায় বিয়ের দিনও ঠিক হয়ে গেলো। গাই বেচা হলেও জমির দাম যে কজন বলল সবাই পানির দাম বলল। ওমন দামে জমি বেচবে না শ্যামল। বাকি টাকা জোগাড় নিয়ে মহা দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলো সে। শিপ্রাকে মানা করে দেয়া হয়েছে সে যেন মেরির মায়ের কাছে না যায়, মেরির মা শিপ্রাকে কী না কী বলে মন ভুলিয়ে দেয় এই ভয়ে কল্যাণী এমন কঠিন পরোয়ানা জারি করেছে। শিপ্রা সকাল থেকে কিছু মুখে তোলেনি । সইয়ের ওমন অপমানে সে মনেমনে মরে যাবার উপক্রম। শিপ্রা এই প্রথম মায়ের হাতে মার খাওয়া ছাড়াই কাঁদছে। নিরবে, নিঃশব্দে৷ জানালায় কেউ একজন টোকা দিল। দ্রুত চোখ মুছে নিয়ে জানালা মেলতে দেখা গেল গৌতম দাঁড়িয়ে আছে। মুখটা কেমন শুকিয়ে আছে মানুষটার। গৌতম ধরা গলায় থেমে থেমে বলল, তোমার নাকি বিয়া?
শিপ্রা ধীরে ধীরে মাথা নাড়ায়। শিপ্রা কান্না গিলে খেয়ে নিল, কেঁদে দিলেই যেন সব শেষ। গৌতম মাথা নিচু করে ছোট্ট করে বলল, ও! শিপ্রা ব্যাকুল হয়ে বলল, ভগবানের কাছে কইবেন আমারে যেন কোনোদিনও জ্বর না দেয়। জ্বর হইলে নরেন ডাক্তারের ওষুধ ছাড়া আমি ভালো হমু না, নরেন ডাক্তাররে তো আমি ফালাইয়া যাইতাছি। গৌতম আর দাঁড়াতে পারে না। এতদিন শিপ্রা ছুটে পালিয়েছে, আজ গৌতম পালালো। অনেক জোরে, যতটা জোরে পালালে দুঃখ বাতাসে মিশে যায়। বিয়ের দুদিন আগে মেরির মা লোকমুখে শুনল শ্যামল টাকার জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছে। মেরির মা তার ঘরের মেঝে খুঁড়ে এতদিন পাঁচ,দশ টাকা করে জমানো টাকার ব্যাগটা বের করলো। ব্যাগখানা নিয়ে মাঝ রাত্তিরের দিকে কল্যাণীকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে ব্যাগখানা তার হাতে দিয়ে বলল, আমার সইয়ের একখান টিকলির শখ আছিল, স্যাকরা ব্যাটার কাছ থেইকা একখান টিকলিও আইনা দিস৷
কল্যাণী লজ্জায়, অপরাধবোধে মেরির মা চলে যাবার সময় বার কয়েক দিদি, ও দিদি বলে ডাকলেও মেরির মা ফিরে তাকায়নি। কল্যাণী জোর খাটাবার সাহসটুকুনও দেখাতে ভুলে যায়! শিপ্রার বিয়ে হয়ে গেলো বেশ ধুমধাম করেই। কপালে একখানা টিকলি জুটেছিল তার। বিয়ের আগের দিন, বিয়ের দিন মেরির মাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি। গৌতমটা মাল টানার অযুহাতে বাড়ি ফেরেনি গত চারদিন ধরেই। শ্যামল, কল্যাণী হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেও মনের কোণে চিকন অপরাধবোধ রেখে মেরির মায়ের খোঁজ নিতে লাগল। মেরির মা কোথাও নেই! চুপিসারে যেমনি এসেছিল এই ভুবেনগড়ে , ঠিক তেমনিই চুপিসারে হারিয়ে গেলো! মাস তিনেক পেরিয়ে গেছে শিপ্রার বিয়ের। শিপ্রাকে নিতে এসেছিল শ্যামল। কার্তিক বলে দিয়েছে এ বছর বাড়ির বউ কোথাও যাবে না। শ্যামল জোর করে দুটো কথা বলতে পারেনি৷ কেবল জি হুজুর করে খালি হাতে ফিরতে হয়েছে। মাগো.. আল্লাহর ওয়াস্তে কিছু ভিক্ষা দেন..!
এ যে সইয়ের গলা! শিপ্রা বিছানা ছেড়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। বাড়িতে এখন কেউ নেই। মেরির মা মস্ত ঘোমটা টেনে রাখলেও শিপ্রা ঠিক চিনে নিয়েছে৷ শিপ্রা ঝড়ের বেগে বারান্দা থেকে নেমে মেরির মাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলল “আমার সই গো… ও আমার সই, কই আছিলা তুমি! ” মেরির মা নিজেকে ধরে রাখতে পারে না৷ কান্নার জবাব এই প্রথম কান্নায় দিল মেরির মা। শিপ্রা মেরির মাকে ঘরে টেনে নিয়ে গেল। মেরির মাকে বিছানায় বসিয়ে ব্লাউজ খুলে ফেলে বলল, বুকটার দিকে একটু চাইয়া দেখো! মেরির মা আঁতকে ওঠে! উৎকন্ঠা নিয়ে বলল, কিসের দাগ রে সই! শিপ্রা চোয়াল শক্ত করে বলল, শুধু তো বুক দেখলা! সারা শইল জ্বলন্ত বিড়ি দিয়া পুড়াইয়া দিছে শুয়োরের বাচ্চায় আমারে! এই দেহো পিঠে! শিপ্রা পিঠখানা মেরির মায়ের দিকে ঘুরিয়ে দিতেই মেরির মায়ের চোখে পড়ল পুরো পিঠ জুড়ে কেবল লাল লাল দাগ, শক্ত কিছু দিয়ে পিটানো হয়েছে! মেরির মা আর বসে থাকতে পারে না, বসা থেকে উঠেই শিপ্রাকে জড়িয়ে ধরে কান্না ধরা গলায় বলল, কেন করছে এমন! কী করছিলি রে সই?
– ছোটো ঘরে রাইত হইলে সে যাত্রার মাইয়্যা আনে, তার চাতালের বন্ধু আমার ঘরে আহে! আমি কেন বাধা দেই, এই হলো আমার দোষ! তোর বাপেরে, মামুরে কস নাই এই কথা? মেরির মা প্রশ্ন করে৷
– মামু কয়, ঐ জানোয়ারের বাচ্চা নাকি কয়দিন পর ঠিক হইয়া যাইব, এই বয়সে পোলারা এমন নাকি করে। আর বাপে! সে তো চোখ তুইলা একখান কথা কওনের মুরোদ রাহে না। মেরির মা চোখ মুছে দেয় শিপ্রার। শিপ্রার মুখখানা দু হাত দিয়ে আলগোছে ধরে বলল, যাবি আমার লগে? যেইদিক দুই চোখ যায়। যাবি সই? শিপ্রা গুঙিয়ে কেঁদে উঠে ব্যাকুল হয়ে বলল, হ যামু সই! যামু আমি মস্ত ধানের মাঠের মাঝ দিয়ে আইল ধরে লাঠিতে ভর দিয়ে হেঁটে চলেছে মেরির মা, উদ্দেশ্য জানা নেই। তার পেছন পেছন শ্লথ, ক্লান্ত পায়ে হেঁটে চলেছে শিপ্রা। বিত্ত বৈভবকে পেছনে রেখে পাখির মতো বাঁচার লোভে খাঁচা ছেড়ে দিল সে আজন্মের মতো।
গল্পের বিষয়:
গল্প
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত