উড়নচণ্ডী মেয়ে

উড়নচণ্ডী মেয়ে
জান্নাত, নে শাড়িটা পরে নে। দেখ্ কী সুন্দর৷ রঙটাও এখনো চমৎকার আছে। সেই কবেকার শাড়ি ৷ তোর বাবা কিনে দিয়েছিল। শাড়ি?! শাড়ি দিয়ে কী হবে? তুমি জানো না শাড়ি আমি সামলাতে পারি না। সামলাতে পারিস না আবার কী কথা। সামলাতে পারতে শিখতে হবে। বিয়ের পর কী যে করবি তুই। তোমার কী মনে হয় মা, বিয়ের পর আমি শাড়ি পরব?
বাজে কথা না বলে শাড়িটা পরে তৈরি হয়ে নাও। ওরা এক্ষুনি এসে পড়বে,বলে রাগে গজগজ করতে করতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন জান্নাতের মা রাহেলা বেগম। মায়ের কথা রাখতে জান্নাতকে সাজতে বসতে হল আয়নার সামনে, শাড়ি পরতে হল। আসলে আজ জান্নাত আর অভির বিয়ের ব্যাপারে কথা বলতে আসছে অভির বাড়ির লোকেরা। চারবছর ধরে প্রেম করছে ওরা ৷ ওরা দুজনেই একই অফিসে চাকরি করে ৷ ওখানেই পরিচয় ওদের। কলিংবেলটা বেজে উঠল। দরজা খুললেন জান্নাতের বাবা, আদিল শেখ ৷ সহাস্য মুখে স্বাগতম জানালেন অভি ও তার পরিবারকে। দুই পরিবারের আলাপচারিতার শেষে মিনিট দশেক পরে, ডাক পড়ল জান্নাতের। জান্নাত ভুলে গেল মায়ের শেখানো গত রাতের সবকিছু ৷ ধীর পায়ে চলা, গায়ে শাড়ির আঁচল জড়িয়ে রাখা, চায়ের ট্রে নিয়ে লাজুক মিষ্টি হাসি মুখে সবার সামনে উপস্থিত হওয়া, ইত্যাদি ইত্যাদি। সে সবসময় যেরকম গতিতে হাঁটাচলা করতে অভ্যস্ত, হাঁটল সেই গতিতেই ৷ কোন রকমে শাড়ি সামলে উপস্থিত হল সবার সামনে, সালাম দিলো সবাইকে।
আপনারা সবাই ভালো আছেন তো?” স্বভাবমত গলার স্বর উঁচুতে উঠে গেল জান্নাতের ৷ ব্যাপারটা হয়তো কারুর পছন্দ হল না। তাই জান্নাতকে উত্তর দেওয়ার পরিবর্তে একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করল সবাই ৷ শুরুটা করলেন অভির মা। বসো জান্নাত, শাড়িটা কি নিজে পরেছ ? অভ্যাস নেই বুঝি ? খিলখিলিয়ে হেসে উঠল জান্নাত,উৎসাহিত হয়ে আবার সেই জোরেই বলে ফেলল, ঠিক বলেছেন। আমি শাড়ি ঠিক করে পরতে পারি না। আচ্ছা, স্থির হয়ে বসো, আর অত জোরে কথা বলো না, বাড়ির বৌ হতে যাছো, অত চঞ্চলতা মানায় না। ও জোরে বলে ফেললাম? Sorry . আমার মাও বলেন আমি নাকি খুব চঞ্চল। হুম, ওই চঞ্চলতাটাই কাটাতে হবে। কেন আন্টি, আমি যেমন, ঠিক তেমনটা থেকে কি আপনাদের বাড়ির বৌ হতে পারব না? মুখে মুখে কথা বলো না বেশি, তো বাড়িতে কি কি কাজ করা হয়? সত্যি বলতে কি আমি কিছুই করি না, ছুটির দিনে একটু আধটু ঘর গোছাই ৷ আর মাঝে মধ্যে ইউটিউবে রান্নার ভিডিও দেখে রান্না করি কিছু।
আসলে তোমাকে ওই বাড়িতে আপার সাথে সাথে কাজ করতেই হবে, বুঝলে? বুঝতেই পারছ আপার বয়স হয়েছে, একা হাতে সামলাতে পারে না সবকিছু, তাই আমরা অভির বিয়েটা তাড়াতাড়ি দিতে চাইছি, বললেন অভির আন্টি৷
কেন অভি আন্টিকে কাজে হেল্প করে না? কি? আমার বাবু পুরুষমানুষ, সে সংসারের কাজ করবে? চঞ্চলতার সাথে সাথে তোমার মাথার ও দোষ আছে দেখছি, চোখ পাকিয়ে বললেন অভির মা। কেন আন্টি? মেয়েরা যদি ঘরের কাজে মাকে সাহায্য করতে পারে, তাহলে ছেলেরা করতে আপত্তি কোথায়, ঘরটা কি শুধুই মেয়েদের? ছেলেদের নয়? বলেছি তো একটু ঘরের কাজই করতে, তার জন্য এত কথা কীসের, বললেন অভির আন্টি। জান্নাতের মা বললেন, জান্নাত অনেকক্ষণ ধরে তুমি বেশি কথা বলছ, এবার চুপ কর, না আপা, জান্নাত সব কাজ করবে। আপনাকে কোনো চিন্তা করতে হবে না।
আমার কাজ করতে আপত্তি নেই মা। কিন্তু সংসারটা যখন ছেলে মেয়ে উভয়েরই, তখন এই আশাটা শুধু মেয়েদের কাছেই কেন করা হয়, ছেলেদের কাছে নয় কেন? আর যেখানে কথাটা এরকম যে, ঘরের কাজ করার জন্য বিয়ে দেওয়া হচ্ছে, সেখানে আমার তো নিজেকে পরিচারিকা ছাড়া আর কিছুই মনে হচ্ছে না। অভির মা বললেন, তো পড়াশোনা করেছ বলে কি নিজেকে পুরুষ মানুষ ভাবছ নাকি,মেয়েরা কখনোই পুরুষ মানুষের ওপরে ওঠে না বুঝলে। আমি ওপরে উঠতে চাই না আন্টি, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলতে চাই। তা তোমার পড়াশোনা কতদূর যেন, আমার বাবু ফিজিক্সে অনার্স | গ্র্যাজুয়েশনে ৫৮% নম্বর পেয়েছিল। সোনার টুকরো ছেলে আমার। আমি মাস্টার্স করেছি, গনিতে। ও! তা কত নম্বর পেয়েছিলে? ৭৩% পেয়েছিলাম। থাক মেয়ে মানুষের অত পড়াশোনা লাগে না, স্বামীর থেকে বউয়ের বেশি শিক্ষিত না হওয়াই ভালো, যা করেছ, করেছ। আর চিন্তা করো না বেশি দূর আগানোর।
আন্ট আমি আসলে PhD টা করব বলে ভাবছিলাম। PhD সংসারের কাজ করে সময় পেলে তো করবে। আমি সংসারের কাজ করে সময় পেলে PhD করব সেটা নয়, PhD করার পাশাপাশি সংসারের কাজ করব। এত কথার পরে পরিবেশ বেশ থমথমে, জান্নাত বুঝলো অভির বাড়ির কারুরই তাকে একদমই ভালো লাগেনি। কিন্তু সে তো নিজেকে বদলিয়ে অভিকে পেতে চায়নি কোনোদিন। সে নিজে যা, সেটা নিয়েই অভিকে ভালো রাখতে চেয়েছে, ভালবেসে পাশাপাশি থাকতে চেয়েছে সারাটাজীবন৷ অভির বাড়ির লোকেরা কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে যায়। জান্নাত চেয়ে থাকে অভির দিকে, একটা বারও আজ সে মিলির দিকে তাকিয়ে হাসল না। তাহলে কি অভিও জান্নাতের সাথে নেই। পরের দিন দেখা হল অফিসে দুজনের, অভি তখনও গম্ভীর। জান্নাত কথা বলতে গেলেও তেমন কথা বাড়ালো না। টিফিন টাইমে জান্নতকে ডেকে বলল, শোনো জান্নাত , আমাদের বিয়েটা হচ্ছে না। কেন?
তোমাকে পছন্দ হয়নি আমার বাড়ির লোকেদের ৷ তুমি এত জোরে জোরে কথা বল কেন? এত বাচাল কেন তুমি?
কী বলছ, তুমি-ই না বলতে আমার এই স্পষ্ট কথা বলা তোমার ভালোলাগে ৷ আমি যে টুকটুক করে অনেক কথা বলি তোমার সেটা আদুরে লাগে৷ যা বলতাম, বলতাম ৷ সংসার করতে গেলে ওসব চলে না। তোমার এত চঞ্চলতা কীসের? মা তো বলেছে তুমি একটা উড়নচন্ডী,আর তুমি কাল গায়ে শাড়ির আঁচল দাও নি কেন। আমি তো যথেষ্ট ভদ্রভাবেই শাড়ি পরেছিলাম, স্লীভলেস বা ডিপকাট কোনো ব্লাউজও পরিনি৷ আমার শরীরের কোনো গোপন জায়গা কি তোমাদের সামনে খোলা ছিল? না, কিন্তু গায়ে আঁচল দেওয়াটা একটা ভদ্রটা। তাই, তাহলে যখন তুমি আগের বছর ঈদে আমায় সাটিনের স্লীভলেস কালো ব্লাউজটা কিনে দিয়েছিলে, পাতলা কালো শাড়িটার সাথে পরার জন্য, তখন কোথায় ছিল তোমার এই ভদ্রটা? তখন তো আমাকে সেই রূপেই দেখতে চেয়েছিলে।
রাস্তায় নিয়ে ঘোরা প্রেমিকা আর ঘরের বউ কখনো একই রকম হতে পারে না। তাহলে আমিও তোমার ঘরের বউ হতে পারব না অভি, তুমি বরং অন্য কাউকে খুঁজে নিও,এরকম মানসিকতার মানুষের সাথে আমার পক্ষে থাকা সম্ভব নয়। দুজনের দুটো পথ আলাদা হয়ে গেল। সেদিন অফিসে বাকি সময়টা জান্নাত কোনরকমে কাটালো, চোখ ফেটে জল আসছিল তার ৷ কত স্মৃতি, কত খারাপ লাগা, ভালোলাগা- এসব ভুলবে কি করে। প্রতিদিন অভি তাকে অটোস্ট্যান্ড পর্যন্ত পৌঁছে দিত। আজ একবার ফিরেও দেখলো না। কত সহজে সবকিছু ছেড়ে বেরিয়ে আসতে পারল ও| বাড়িতে ঢোকার আগে চোখের জল মুছে নিজেকে ঠিক করে নিল জান্নাত । মা বাবাকে কিছুতেই বুঝতে দেওয়া যাবে না তার কষ্ট। শক্ত থাকতে হবে তাকে ৷ বাড়ি ঢুকেই তাড়াতাড়ি নিজের ঘরে ঢুকে গেল ও| পিছু পিছু মা এল।  কিরে অভির সাথে কথা হয়েছে? কী বলল? বলেছে বিয়েটা করবে না। কি বলিস এসব।
হ্যাঁ, বলেছে আমার মতো উড়নচন্ডীকে বিয়ে করতে পারবে না, ওর বাড়ির লোকেদের আমায় পছন্দ হয়নি। সে তো হবেই না, গতকাল যথেষ্ট অসভ্যতামি করেছিস তুই, এরকম অসভ্য মেয়েকে কেউ বিয়ে করবে না, আইবুড়ো থেকেই বুড়ি হবি তুই। রাগ করছ কেন মা, বুড়ির জন্য নিশ্চয়ই কোনো বুড়ো আছে, যার উড়নচন্ডী বুড়ি-ই পছন্দ। মা বাবার সামনে শক্ত থাকলেও প্রতিরাতেই চোখের জলে বালিশ ভেজে জান্নাতের৷ তবে অফিসে গিয়ে অভির সাথে আর কোনরকম কথা বলার চেষ্টাও করেনি সে। অভির মানসিকতা দেখে ওর মন উঠে গেছে, কিন্তু স্মৃতিবিজরিত কষ্টটাই যেন যেতে চায় না কিছুতেই ৷ ইতিমধ্যেই অফিসের সবাই জেনে গেছে ওদের ছাড়াছাড়ির কথা। অফিসে দুটি গোষ্ঠীও তৈরি হয়ে গেছে। কারুর চোখে জান্নাত ঠিক, কারো মতে আবার জান্নাত সত্যিই বড্ড উড়নচন্ডী ৷ এইভাবেই কেটে যায় তিন-তিনটে মাস।
হঠাৎ একদিন অভি অফিসে এসে নিমন্ত্রণ করল সবাইকে। আগামী মাসে তার বিয়ে ৷ অফিসে মুখে হাসি নিয়ে সমস্ত কাজটা সামলালেও বাড়ি এসে রাতে অন্ধকার ফাঁকা ঘরে একাকী মিলির চোখের জল বাঁধ মানল না।
না, অভির বিয়েতে সে কিছুতেই যেতে পারবে না,কিন্তু হ্যাঁ, তার বউকে দেখার জন্য অপেক্ষা করবে সে, হয়তো বা, পথে ঘাটে দেখা হয়ে যাবে কোনদিন। মাস দুয়েক পরে, সেদিন পাশের বাড়ির রিমির সাথে জান্নাত কেনাকাটা করতে গিয়েছিল বসুন্ধরায়৷ কানের দুল বরাবরই খুবই পছন্দের জিনিস জান্নাততের। হঠাৎ পেছন থেকে অত্যন্ত নিচু স্বরের একটি মেয়েলি কন্ঠস্বর এলো – পিছন ফিরে জান্নাত দেখল, খুবই শান্ত, নম্র একটি মেয়ে ৷ তার পরনে শাড়ি, গায়ে আঁচল টানা | মেয়েটি সেই নীচু স্বরেই তার স্বামীকে ডাকল- শুনছ, ওই ঝুমকোটা কিনে দেবে? কত দাম? বলে এগিয়ে এল তার স্বামী, এসেই হতবাক। মিলিও আর বেশিক্ষণ ওই দোকানে দাঁড়ালো না।
হ্যাঁ,অভি তার মায়ের পছন্দ মতই মেয়ে খুঁজে নিয়েছে জীবনসঙ্গিনী হিসেবে। আর যাই হোক, কোনদিন মায়ের একটি বাধ্য ছেলেকে ভালবাসতে তো পেরেছিল জান্নাত। মনে কষ্ট লাগলেও অভির বউটিকে ভালোই লেগেছে জান্নাতের। মিষ্টি মেয়ে, সত্যিই তার মত জোরে জোরে কথা বলে না, জোরে জোরে হাসে না। দপদপ করে হাঁটে না।
জান্নাতের বাড়িতে আবার শুরু হয়েছে তার জন্য পাত্র খোঁজার তোড়জোড় ৷ জান্নাত সাফ জানিয়ে দিয়েছে, পটের বিবি সেজে এক ঘর ভর্তি লোকের সামনে কোনো ইন্টারভিউ দিতে বসতে পারবে না সে, নিজেকে বড় পণ্য বলে মনে হয়৷ জান্নাতের সিদ্ধান্তে তার মা-বাবা বড়ই অসন্তুষ্ট। প্রতি মুহুর্তে বাড়িতে চলে এই নিয়ে অশান্তি। জান্নাত কিন্তু তার সিদ্ধান্তে অনড়। তার বিশ্বাস, এই উড়নচন্ডীপনাকে আপন করে নেবে এরকম নিশ্চয়ই কেউ আছে। সেই প্রতীক্ষায় কেটে যায় আরো কয়েকটা মাস। মা, নিচে অনেক মালপত্র দেখছি, কারা এলো। আরে, আমাদের পাশের ফ্ল্যাট এ যে শরীফ আহমদ থাকতেন, ওনারা ফ্ল্যাট বিক্রি করে মেয়ের বাড়ি, খুলনা চলে গেছেন। তাই যারা কিনলেন, তারা এসেছেন, দেখ, ওদের বারান্দায় কি সুন্দর সুন্দর ফুলগাছ৷ উফ্, লোকের ঘরের দিকে তাকিও না তো।
আরে ওনারাও তো বারান্দায় দাঁড়িয়ে এদিকেই তাকিয়ে হাসছেন। মনে হয় আলাপ করতে চান। দরকার নেই অত আলাপের, ছেলেটা কেমন ড্যাবড্যাব করে চেয়ে আছে দেখো, মা-ছেলে জোড়ায় যেন সার্কাস দেখছে। অসভ্যের মত কথা বলিস না তো, প্রতিবেশী মানুষ আলাপ তো করবেনই। তুমি করো আলাপ, আমার দরকার নেই। সপ্তাহখানেক পরে একদিন বিকেলে অফিস থেকে বাড়ি ফিরছিল জান্নাত। প্রচন্ড বৃষ্টি নামলো,তাড়াতাড়ি ফ্ল্যাটের গেটে ঢুকতে গিয়ে পড়ল পা পিছলে গেলো। লাগেনি তো? আমার হাতটা ধরুন। হঠাৎ একটা ছেলের কন্ঠস্বর,ওই পাশের ফ্ল্যাটের ছেলেটা না? ওর হাত ধরে কোনরকমে উঠল জান্নাত, ডান পা টাতে বেশ লেগেছে। দারোয়ান আংকেল, এই জায়গাটা এত পিছল, আমি পড়ে গেলাম, কাল একটু পরিষ্কার করার ব্যবস্থা করো। কোনো বয়স্ক মানুষ পড়লে কী হত, চেঁচিয়ে উঠল জান্নাত।
রাস্তার বা দারোয়ান আংকেলের আর কি দোষ বলুন, বৃষ্টির মধ্যে কেউ যদি ওরকম দপ্ দপ্ করে হাঁটে তাহলে না পড়ে উপায় আছে, নিন, তাড়াতাড়ি গেটের ভিতরে ঢুকে পড়ুন, ভিজে যাবেন। মানে, আমি দপ্ দপ্ করে হাঁটি? না, না, আপনার হাঁটাটা বেশ সুন্দর, বেশ জোরালো, সত্যিই তো আস্তে আস্তে হাঁটবেনই বা কেন, যদি জোরে হাঁটতে পারেন। আমি তো প্রায়ই আপনার হাঁটা দেখি, বেশ ভালোলাগে। কিন্তু বৃষ্টির মধ্যে একটু স্পিডটা কন্ট্রোল করলে আপনারই ভালো, আর কি ৷ ওকে আজ আসি৷ সামনে রাগ দেখালেও ছেলেটির কথা শুনে মনে মনে হাসল জান্নাত, মনে মনে বলল,” ফাজিল ছেলে। পরের দিন সকালে জান্নাত যখন অফিসের জন্য বেরোল, হঠাৎ দেখা সেই ফাজিল ছেলেটির সাথে। আপনার পা কেমন আছে? ভালো। কিছু লাগিয়ে ছিলেন। মা ব্যথানাশক মলম লাগিয়ে দিয়েছিলেন। আচ্ছা বেশ, তা আমাদের তো নিজেদের নামটাই জানা হয়নি, আমি হিশাম আমি জান্নাত। আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করবো? বলুন। আপনি কি কোনো কারণে আমার ওপরে রেগে আছেন। কেন, বলুন তো।
আমি আপনাকে যখনই দেখি তখনই বেশ জোরে জোরে কথা বলতে দেখি আপনাকে, শুধু তাই-ই নয়, বেশ অনেক অনেক কথা বলেন আপনি। আমার আপনার সেই প্রাণবন্ত মিষ্টি স্বভাবটা বেশ ভাললাগে। কিন্তু, আমার সাথে কথা বললেই আপনি এত কম কথা বলেন কেন? আমার কথা আপনার ভালোলাগে? উড়নচন্ডী মনে হয় না আমাকে? না, চঞ্চল পাহাড়ী ঝরনার মত লাগে, বলেই হেসে চলে গেল হিশাম। মিলি ভাবল, কি বলে গেল ছেলেটা! আমি উড়নচন্ডী না, আমার চঞ্চলতাই ওর ভাললাগে, যাক গে, বেশি ভেবে কাজ নেই। ওসব এখন বলবে, আর তারপর বলবে প্রেমিকা আর ঘরের বউ আলাদা রকমের হতে হয়। সপ্তাহখানেক পর একদিন শুক্রবার দুপুরে হঠাৎ কলিংবেলটা বেজে উঠল জান্নাতদের ফ্ল্যাটের ৷ দরজা খুলতেই দেখে সেই ফাজিল হিশাম আর তার মা।
বাড়িতে তোমার মা বাবা কেউ নেই? হ্যাঁ, আছেন, আপনারা আসুন, মা, এদিকে একটু এসো। কেন, কে এসেছে?” দুপুরের কাঁচা ভাতঘুম হঠাৎ ভেঙে যাওয়াতে চোখ কচলাতে কচলাতেএলেন জান্নাতের মা। আসসালামু আলাইকুম আমি শর্মিলা, এই আমার ছেলে হিশাম, আপনাদের পাশের ফ্ল্যাটে থাকি৷ ওয়ালাইকুম আসসালাম, আমি দেখেছি আপনাদেরকে বারান্দা থেকে, তা বলুন, কেমন আছেন? ভালো, আরো ভালো যাতে থাকতে পারি তাই এসেছি। মানে? ঠিক বুঝলাম না আপা। বলছি, আমার ছেলেটির জন্য আপনার এই মিষ্টি মেয়েটাকে দেবেন? আমার মেয়ে মিষ্টি, ও কিন্তু খুব চঞ্চল আপা। তা আমি সবই দেখেছি, ওর চঞ্চলতাই তো মাতিয়ে রাখবে আমাদের সারাটা বাড়ি, আমার বাড়িতে থাকবে আমার মেয়ে হয়ে।
হতবাক জান্নাতের মা,জান্নাতেএ কাছে এসে বললেন, এখানে এই রঙচটা নাইটিটা পরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কি শুনছ? যাও গিয়ে একটা শাড়ি পরে এসো ৷ আর গায়ে আঁচল দেবে। না, না, শাড়ি পরতে হবে না। এরকমই ওকে বেশ মিষ্টি লাগছে, আমি আমার প্রস্তাবটা জানালাম, আপনাদেরও তো একটা মতমত আছে, আপনারা চিন্তাভাবনা করে জানাবেন, আমার ছেলে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, আপনারা চাইলে সমস্ত খোঁজ খবর নিতে পারেন৷ আমরা কিছু মনে করব না, বলে চলে গেলেন ওরা। আজ সেই ঘটনার এক মাস পরের একটি দিন। আজ উড়নচণ্ডী জান্নাতের সাথে ফাজিল হিশামের বিয়ে ৷ এবার থেকে হিশামদের পুরো ফ্ল্যাটটা জান্নাত খিল্ খিল্ হাসিতে, হাঁটার দপ্ দপ্ শব্দে, জোরে জোরে কথার আওয়াজে ভরপুর হয়ে উঠবে৷ আর হিশাম ও তার পরিবার তাতে খুবই খুশি।
গল্পের বিষয়:
গল্প
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত